বসন্তের রং
মোহন ছোট্ট একটি গ্রামে থাকে। গ্রামটা ছোটো তাতে কি হয়েছে, প্রকৃতি উজাড় করে সাজিয়ে দিয়েছে তাকে।
বসন্তের আগমনে কোকিলের মধুর সুর হৃদয় উতলা করে।
লাল কৃষ্ণচূড়া,পলাশ, শিমূলে বসন্তের রং মেখেছে।কোকিল ডাকে গাছের ডালে সুরে সুরে, ফুলে ভ্রমরেরা গুনগুন করে।
বসন্তে নতুন রং মেখে সুন্দরী হয়ে উঠেছে মোহনের ছোট্ট গ্রাম রামপুর। গ্রামের শেষেপ্রান্তে মা, বাবা,আর মোহন বাস করে ।মোহনের বাবা চাষবাস করে। মোহন ছোটবেলা থেকেই পড়াশুনোতে ভালো ছিলো কিন্তু কলেজে পাশের পরে আর পড়া হয়ে উঠে নি।
মোহন কিছু দিন হলো চাকুরি পেয়েছ।রামপুরের প্রাথমিক স্কুলে পড়াতে শুরু করেছে।
আসা যাওয়ার পথে তার চোখ শুধু খুঁজে বেড়ায় তার ভালবাসা রাধিকাকে, নীরবে চোখের জল ফেলে যায় ওর বাড়ির দিকে তাকিয়ে।
রাধিকার সাথে একসময় মোহন ছোটবেলায় খেলাকরতো,একসাথে স্কুলে যেতো।বসন্তে দুজনে একসাথে কোকিলের ডাক ডাকতো, বকুল ফুল তুলতো।বসন্তের উৎসবে সবার সাথে রাধিকা আর মোহন ও মেতে উঠতো।
রাধিকার বাবা মোহনের সাথে বেশি কথা বলা, স্কুলে যাওয়া, দুজনের একসাথে থাকাটা বেশি পছন্দ কোরতনা। কারন মহোনের বাবা গরীব চাষি। ওদের টাকা নেই, জমি নেই,মোহনের পরিবার খুব সাধারণ।
একটা সময়ে কখন যে মোহন খৈলার সাথি
রাধিকাকে মনে মনে ভালোবাসতে শুরু করেছিলো সে নিজেও সেকথা বুঝতে পারে নি।স্কুল শেষ করে কলেজে উঠছে দুজনেই।এরই মধ্যে একদিন মোহন শুনতে পেলো রাধিকার বাবা ওর বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে।ছেলে অনেক বড় ব্যাবসা করে,অনেক টাকা পয়সা আছে,জমি আছে তাদের।
রাধিকার বাবা গরীব, সাধারণ লোকেদের খুব একটা পছন্দ কোরতনা , খুব টাকার গরম ছিলো ওর বাবার।
রাধিকা খুব সুন্দরী উনার একমাত্র মেয়ে। মোহনের সাথে রাধিকার মেলামশাটাও উনার পছন্দ নয়, উনার ও বয়স হচ্ছে বড়লোক ছেলে পেয়েছেন বিয়ের দিন ও ঠিক করে ফেলেছেন উনি খুব তাড়াহুড়ো করে।
রাধিকার বিয়ের কথা শুনেই মোহনের মনটা উদাস হয়ে গেলো। রাধিকাকে ভালোবেসে ফেলেছে এই কথাটাও আর বলা হয়ে উঠলো না মোহনের।
কারন মোহন খুব সাধারণ আর গরীব ।
বাবা চাষ করে, নিজে কষ্ট করে কলেজে পড়ছে।
কিভাবে মনের কথাটা বলবে? যদি টাকা থাকতো, চাকুরি করতো তবে হয়তো বা রাধিকাকে তার মনের কথাটা মুখ ফুটে সে বলতে পারত।চোখের জল ফেলা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা রইল না মোহনের।
রাধিকা কলেজে পড়তে চাইছিলো ওর বিয়ে করার ইচ্ছেই ছিলো না , কিন্তু ওর বাবা বিয়ে দেবেই ওর।পাত্র ওর চেয়ে বয়সে অনেকটাই বেশি ।
রাধিকার বিয়ের দিন এসে পরেছে, মোহন অনেকবার বলার চেষ্টা করেও রাধিকাকে কিচ্ছু বলে উঠতে পারলোনা।
সুন্দর ভাবে রাধিকার বিয়ে হয়ে গেলো, আর মোহন ঘরেবসে শুধু চোখের জল ফেলছিলো।রাধিকা শ্বশুর বাড়ি চলে গেলো ।
মোহন গ্রামের যেদিকেই তাকায় শুধু রাধিকাকেই দেখে। তার মন শুধু খুঁজে বেড়ায় রাধিকাকে।
বসন্ত এসেছে, আকাশে, বাতাসে, গাছে, ফুলে সবখানে মনে হয় যেনো নতুন রং লেগেছে।কোকিল ডাকছে সুরে সুরে। মোহন শুধু রাধিকার কথা ভাবে আর কষ্ট পায় মনে মনে ।দোলের দিন রং খেলার সময় মন খারাপ করে ঘরে বসে থাকে। অনেক দিন হয়ে গেলো রাধিকাকে দেখেনা সে মন ভরে ।
কলেজ শেষ করে চাকুরি পেয়েছে এখন মোহন।গ্রামের সবাই বলাবলি করে রাধিকাকে বাড়িতে আসতে দেয় না ওর স্বামী।
দিন কেটে যাচ্ছে হটাৎ একদিন খবর এলো গ্রামে রাধিকার স্বামী মারা গেছে।
রাধিকার বাবা মা ওকে বাড়িত নিয়ে এসেছে ।মোহন শুনতে পেলো গ্রামের সবাই বলাবলি করছিলো রাধিকার স্বামী নাকি অনেক ধরনের বাজে নেশার সাথে যুক্ত ছিলো , খুব বাজে লোক ছিলো।স্বভাব চরিত্র ও ভালো ছিলো না ওর স্বামীর।
এসব কিছু বাড়ির সবাই জানতে পারবে, তাই রাধিকাকে ওর স্বামী ওর বাড়িতে আসতে দিতো না। রাধিকার বাবা কোনো রকম খোঁজ খবরও ভালোভাবে নেয়নি তখন। দেখেছে শুুধু অনেক টাকা আছে ছেলেটির।
নানা রোগে অসুস্থ হয়ে ওর স্বামী মারা গেছে। রাধিকাকে সামন্য শান্তি ও দেয়নি লোকটা, গ্রামের সবাই বলাবলি কোরছিলো।
মোহনের মা গিয়েছিলো রাধিকাদের বাড়িতে গ্রামের সবার সাথে। বাড়িতে মোহনের মা এসে বলছিলো- এমন সুন্দরী মেয়েটা কেমন হয়ে গেছ, শুকিয়ে গেছে,পাথর হয়ে গেছে।
ওর স্বামী ওকে অনেক দুঃখ দিয়েছে, অনেক কষ্ট দিয়েছে। রাধিকা কিছু কথাও বলছে না,খেতেও চাইছে না। চোখে জল এসে পরলো মোহনের এসব কথা শুনে। সারাদিন রাত্রি শুধু চোখের জল ফেলছে নাকি রাধিকা ।
যাকে মোহন এতো ভালবাসে তার কপালে এতো কষ্ট,এতো দুঃখ
মানতে পারছিলো না মন থেকে সে।
দুদিন পরে মোহন ভাবলো একবার নিজে গিয়ে রাধিকাকে বাড়িতে দেখে আসবে।গ্রামের , কজন মিলে রাধিকার বাড়িতে গেলো মোহন ।রাধিকার বাবা ও অনেকটা বদলে গেছে, মনের কষ্টে নরমও হয়ে গেছে।
খারাপ ব্যবহার করে নি ওদের সাথে।
গিয়ে দেখে রাধিকা নীরবে বসে আছে । মোহন শুধুই ভাবছে এটা কোন রাধিকা?।ওকে তো চিনতে পারছেনা মোহন।সাদা শারী পরা,চোখ মুখ শুকনো,চুল খোলা পাগলের মতো। এই রাধিকার মাঝে তো কোনো প্রানই নেই।এভাবে রাধিকাকে দেখতে না পেরে তাড়াতাড়ি মোহন ওদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে। হাটতে হাটতে মোহন শুধু ভাবছে কাকে দেখলো সে।তার রাধিকা তো কোথায় হারিয়ে গেছে ।একটা গাছের নিচে বসে শুধু সে ভাবছে আর কাঁদছে।
দেখতে দেখতে একটা বছর হয়ে গেছে।
বসন্ত এসে গেছে তার নতুন রং নিয়ে।কোকিল ডাকছে সুরে সুরে।
দোল পূর্ণিমা সামনেই আকাশে বসন্তের উজ্জ্বল চাঁদ উঠেছে । মোহন জানালার দিকে তাকিয়ে রাধিকার কথাই ভাবছে ।বসন্ত এসেছে,প্রকৃতিও নতুন ভাবে সেজে উঠেছে । শুধু সাজ নেই তার রাধিকারই।নেই প্রাণ খোলা হাসি তার মুখে। নেই কোনো আনন্দ ও আর উচ্ছাস।
দোল পূজোর দিন গ্রামের সবাই মন্দিরে গেছে,
মোহনও গেছে।আসার সময় দেখে রাধিকা ওর মায়ের সাথে পূজো করতে যাচ্ছে ।
সব রং হারিয়ে সব সাজ হারিয়ে কেমন যেনো হয়ে গেছে রাধিকা।বিবর্ণ প্রজাপতির মতো। আগের প্রানবন্ত রাধিকার সাথে এই রাধিকার কোনো মিল নেই।
দোলের পরের দিন রং খেলা, গ্রামে সবাই আনন্দে সকাল থেকেই রং খেলা নিয়ে মেতে উঠেছে। মোহনকে সবাই টানাটানি করছে খুব রং খেলতে। কিন্তু এসব কিছুই মোহনের ভালো লাগছে না। একটা গাছের ছায়ায় বসে চুপচাপ শুধু ভাবছে ।হটাৎ করে কি তার মাথায় এলো হাটতে হাটতে গ্রামের মন্দিরে গিয়ে ঠাকুরেরর পায়ের রক্তিম সিঁদুরের থালা নিয়ে হাটতে হাটতে রাধিকার বাড়িতে এসে গেলো। বাড়িতে ডুকে দেখে রাধিকা ফুল তুলছে। মোহন কিছু না বলেই রাধিকার মাথায় সিঁদুর দিয়ে দিলো।রাধিকা অবাক হয়ে শুধু তাকিয়ে রইলো মোহনের দিকে। রাধিকার কপাল, আর শাড়িটাও লাল রঙ্গের সিঁদুরে রঙিন হয়ে গেলো।
মোহন রাধিকার হাতটা ধরে শুধু বলে উঠলো-
রাধিকা দেখো বসন্ত এসেছে তার সব রং নিয়ে , আমি আমার ভালবাসার লাল রং দিয়ে আজ তোমায় রাঙ্গিয়ে দিলাম।
ঘর থেকে রাধিকার বাবা ছুটে বেড়িয়ে এলেন। এসব দেখে উনি রাগে হাতের লাঠিটা দিয়ে মোহন কে মাথায় আঘাত করতে গেলেন। এমন সময়ই রাধিকার মা এসে উনার হাতটা ধরে ফে, ললেন। রাধিকার মা বললেন- একবার আমার মেয়ের জীবনের লাল রং টা হারিয়ে গেছে সাদা শাড়ি পড়েছে ,অনেক কষ্ট পেয়েছে মেয়েটা আর নয়। এবার আমার মেয়ে নতুন জীবন শুরু করবে।
আশে পাশের সব লেকেরা এসে সবটা দেখলো।সবাই মিলে বুঝিয়ে রাধিকারর বাবা কে বিয়ের জন্য রাজি করালেন । রাধিকা আর মোহন কে নিয়ে গ্রামের সবাই মিলে মন্দিরে গেলো। রাধিকার আর মোহনের বাড়ির সবার সামনে রাধিকার আর মহোনের বিয়েটা হয়ে গেলো।
রাধিকার জীবনে আজ বসন্ত সব রং দিয়ে রঙিন করে সাজিয়ে দিলো।ভালোবাসার রং মেখে লাল শাড়ি, আর লাল সিঁদুরে মোহনের রাধিকা আবার প্রানবন্ত হয়ে উঠলো।
আজ বসন্তের কোকিলও নতুন সুরে মধুর গানে মেতে উঠলো।