Dec 30, 2023

রুদ্র মোস্তফা

মধ্যস্থতা 

দোহাই লাগে বাসন্তী, 
প্রবল প্রণয়ে আর নিজেকে ভুলো না।
যতোটা ভালোবাসায় ভালোবাসা মুছে যায় 
যতোটা ভালোবাসায় ভালোবাসা ছাড়া 
আর কিছুই  থাকে না 
সব পথঘাট ডুবে যায় অহেতুক প্রেমে 
তেমন করে ভালোবেসো না।
তার চেয়ে পারলে একটু ঈর্ষা করো,
যতোটা ঈর্ষায় প্রেম ও সম্মান পাশাপাশি বাঁচে। 
মহাসড়কে দাঁড়িয়ে পায়ে হাঁটা পথকে ঈর্ষা করো,
যতোটা আঁকাআঁকির পর সূর্য উত্তাপ ছড়ায় 
প্রবল বৃষ্টি অথবা কুয়াশার দিনে 
পারলে তেমন করে ঈর্ষাকে এঁকো।  
শুধু নিখাদ ভালোবেসো না ভালোবাসার অভ্যাসে।

চন্দন পাল

ভয়

তোর যখন ভয় লাগবে
আমার বুকে চলে আসিস ।
কিন্তু আমার যখন ! ধ্যুৎ... 
ভুলে গেছি, আমার ভয় পেতে নেই ।
তবু ভয় হয়...
আমি না থাকলে তুই কি আরেকটা বুকে... !

ওফ্! প্রেম বড় স্বার্থপর। 
প্রকৃতি আমায় শিখিয়ে দাও, কবিতাসম প্রেমহীন উদারকলা।


নবীনকিশোর রায়

ধূসর বালিচর 

আমিত্বের সকল অহংকার
সঁপে দিয়ে টিকে আছি---
অবহেলার যত সীমা পার করে
বন্ধ ঘরের ভিতর  দীর্ঘশ্বাস! 

গৃহসজ্জার ভিতর আশ্রয় 
এটুকু শৈলী জীবন নিয়ে 
কেটে যায় বেলা অবেলা... 

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে 
নিজেকে পাই, 
স্মৃতির কপাট খোলে 
ঝুলন্ত বারান্দার
সিঁড়িতে পা রেখে নেমে যাই
বহুদূর... 

আবছা আলোয় ভেসে ওঠে
বনবীথিকার সেই প্রান্তর
তোমার পদচিহ্ন আঁকা 
ধূসর বালিচর---
এগিয়ে আসে দুটি প্রসারিত হাত, জড়িয়ে ধরে মিলিয়ে যায়! 


সনজিৎ বণিক

শীতের গল্প

গতকাল বিকেলে তোমাকে দেখেছি হন্তদন্ত হেঁটে যেতে খোলা মাঠের দিকে,
ঐদিকে সত্যিই কাউকে দেখলাম না, একেবারে সুনসান লম্বা মাঠ সেখানেও তুমি একা একা, আমি তখন দৌড়ে তোমাকে ধরতে যেতেই    দেখি উল্টোদিক থেকে বেশ কজন দৌড়ে আসছে ,
শীতের আমেজটা ওদের মধ্যে বেশ ভালো লাগলো,
আমি আর এগোই নি, মজা লাগলো।

সপ্তশ্রী কর্মকার

ব্যর্থতার অভিযোগ 

কুয়াশারা প্রতারক হতেই
ভালোবাসার দখল করে শীত

তলপেটের ব্যথা উস্কে দেয়
ব্যর্থতার অভিযোগ 

বিষন্ন মাখা মনের অসুখে
গভীর রাতের কথা কান পেতে শুনে 
একাকিত্বে ফেলি দীর্ঘশ্বাস,

এই জ্বালা আমার আত্মাকে 
কুড়ে খায়,
তখন মোম গলে পড়ে চোখের জলের মতো..

ভবানী বিশ্বাস

অতীত

রাস্তা আছে, আছে আলো
আগেও ছিল, যখন আমরা হাঁটতাম! 

সেই আলোয় ভালোকরে 
মুখ দেখা যেতো না, 
অথচ আমরা দেখতাম... 

এখন ঠিকানা জানি না, 
জানি না রোড নম্বর। 

পুরোনো জায়গায় রাস্তা নতুন, 
পুরোনো ঘ্রাণটাও নেই

তুমিও নেই, ছেড়ে গেলে
অথচ আমি এখনও সেই আলোয় বসে আছি
তোমার অপেক্ষায়...

লিটন শব্দকর

পথিক ও পাখিরা 

তোমার তছরূপের ইতিকথা শোনার বহুদিন আগে
যে পথিক বাঁশি বাজিয়েছিল মেঠো পথ থেকে শহর
সে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেছে বহুদূর। বাঁশি ভাঙা...

পাখিদের জমা করা শুকনো নলখাগড়ার ওমে
কবেকার হলুদ হয়ে আসা মেলবন্ধনের চিঠি 
বলতে দেওয়ার অবকাশ ফুরিয়ে যাবার পরই
তার উড়ে বেড়ানোর শহর হারিয়ে ফেলে তাকে 

ঘুমের অব্যবহৃত সুড়ঙ্গে ছেলেভুলানো ক্যালিওগ্রাফি
সজীব শরীরে উড়ানের পর মাঠে নেমে আসা পালক
বিকেলের অস্তরাগ সোনাঝরা মনে হতো একদিন
নতুন দিনে পালক ছড়ানো মাঠ কাকে ডেকে দেখাই!

অলকা গোস্বামী

মাছের  ঝোল

খাবারে গরম ভাত আর  মাছের ঝোল হলে আর কিছুই চাইনা,দিলীপের। বিয়ের পর থেকেই দেখে আসছে পারুল। মাছের ঝোল এর উপর ভীষন একটা মায়া...। সেবার তরকারিতে নুন দিতে ভুলে গেছিল পারুল, দিলীপ দিব্যি খেয়ে উঠে গেলো। পারুল খেতে বসে দেখল তরকারি তে  নুন দেয়া হয়নি। খুব লজ্জা পেয়েছিল সেদিন। দিলীপ নির্বিকার, বলল

আরে মাছের ঝোল খুব ভালো রেঁধেছ।

হাসি পেয়ে গেছিল পারুলের। এরকম কেউ মাছের ঝোল ভালবাসতে পারে... সত্যি ভাবা যায় না।

উৎসব পার্বনে নানান পদ রান্না হলেও দিলীপের জন্যে মাছের ঝোলের ব্যবস্থা করে রাখে পারুল। সেবার ওদের  বিয়ের পর নিউ ইয়ার পার্টি দিয়েছিল বন্ধুদের নিয়ে। চিকেন, মাটন,বিরিয়ানি, পনীর নানান কিছু ...., এরই মধ্যে দিলীপ এসে জিজ্ঞেস করল, এই পারুল মাছের ঝোল করেছ তো?

আশ্চর্য এত্ত সব আইটেম আছে তারমধ্যে আবার মাছের ঝোল কি বলছ!


দিলীপ বলল, ওকে ঠিক আছে।

রাতে খুব হৈ চৈ মজা করে খাওয়া দাওয়া সেরে বন্ধুরা যে যার বাড়ী ফিরে গেলো। পারুল লক্ষ্য করছিল, দিলীপ ঠিকমত খায়নি, খাবার ছুঁয়ে দেখেছে শুধু। 

শোবার ঘরে ঢুকে পারুল দেখলো, জানালার বাইরে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দিলীপ।

এই কি হয়েছে তোমার বল তো, ভালো করে খেলেও না? পারুল জিজ্ঞেস করল। 

আরে কিছু না....

না বলতেই হবে.... তুমি আজ সবার সঙ্গে থেকেও ছিলে না, অন্য মনস্ক ছিলে, বলনা প্লিজ। 

পারুল দিলীপের হাত চেপে ধরলো... আমি তোমার  বন্ধু, তারপর স্ত্রী।আমাকে না বলতে পারা কোনো কথা তোমার থাকতে পারে না।বল... কি হয়েছে?

মুহূর্তে দিলীপের চোখ জানালার বাইরে জোনাকির আলো আঁধারিতে ছলছল করে উঠলো....।

জানতো পারুল, আমি তখন খুব ছোট। এরকমই একদিন জানিনা মনে নেই ঠিক নিউ ইয়ারস এর দিন ছিল কিনা... চার পাশের বাড়ি গুলোতে খুব উৎসব আনন্দ দেখছিলাম।

আর আমরা চার ভাই বোন, মা সারা দিন অভুক্ত। বাবা জমি জমার কাজে ওপার বাংলায় গিয়েছিলেন। সেখানে কি এক মিথ্যে মামলায় বাবাকে অ্যারেস্ট করে নেয়, পুলিশ। সে এক দিন গেছে আমাদের।

 চারদিন এর জন্যে যাচ্ছি বলে গেছিলেন বাবা সেখানে মাস গড়াতে থাকে। আমি আর আমার বড় দাদা, কত আর বয়স তখন, আমার দশ দাদার তের  হবে হয়ত। আত্মীয় স্বজনরা তখন খুব একটা সাহায্য করে নি। মা অনেক কষ্টে খাবার জোগাড় করতেন। বাবা যা টাকা দিয়ে গেছিলেন সেটা অল্প দিনেই শেষ হয়ে যায়।অল্প ধানের জমি ছিল, তিনবেলা না হলেও দিনে একবার ভাতের  যোগাড় কোনমতে হয়ে যেত। মা ঢেঁকি পাড় দিয়ে চাল নিয়ে আসতেন। দাদা স্কুল থেকে ফিরে পুকুরে বড়শি পেতে রাখত। রাতে আমরা কুপি জ্বালিয়ে পড়তে বসতাম। আর যেই গরম  ভাতের গন্ধ নাকে আসত....তখন দুই ভাই উনুনের ধারে বসে থাকা মায়ের পিছনে গিয়ে দাঁড়াতাম।....মা আমাদের লুকিয়ে চোখের জল মুছে ভাত বেড়ে দিতেন। কখনও আলু ভাতে, কোনোদিন পাতলা মাড় ভাত। এসবই বেশি। দাদা পুকুরে যে বড়শি পেতে রাখত, তাতে তখন কখনও শিঙ্গি মাছ, কখনও মৃগেল, রুই এর পোনা এসব উঠত। সেই রাতে যখন মা গরম ভাতের সঙ্গে মাছের ঝোল বেড়ে দিত.... সেই শীতের রাতে,ঠান্ডায় ধুঁয়া ওঠা ভাতের থালা.... ছোট্ট এক টুকরো মাছ পাতলা ঝোল। কী যে অমৃত লাগত খেতে কী বলব...! সেই বিনে মসলার তরকারির স্বাদ জিভে এখনো লেগে আছে। সেই দিনগুলো জীবনে অনেককিছু শিখিয়েছে। আজকের সফল দিলীপ বড়ুয়ার পিছনে সেই অভাবের দিনগুলোর অনেক অবদান পারুল। আর তখন থেকেই জানো তো মাছের ঝোল এর প্রতি আমার এই অবসেশান। কৃতজ্ঞতা ও বলতে পারো। যত রকমারি খাবার থাকুক না কেন মাছের ঝোল ভাত আমার কাছে সবসময় প্রথম ও প্রধান হয়েই থাকবে।

হ্যাঁ, দিলীপ তাই থাকবে। আমি কথা দিলাম। চল শোবে চলো। আগামীকাল আরেকটি নূতন দিন , নূতন সূর্য অপেক্ষা করছে।

অয়ন পাল

 যুদ্ধ

আপন মাঝে চলছে আমার বিশ্বযুদ্ধ আর একবার
সকলের মধ্যে টিকে থাকার চেষ্টা করি যে কতবার ৷
স্বপ্ন যে আমার, স্বপ্নই  রয়ে গেলো
এই যুদ্ধে আবার কতজন যে নাম লেখালো ।।
সবার সাথে পা মিলিয়ে চলার লড়াই আর একবার
স্বপ্ন ভুলে বেঁচে থাকার চেষ্টা যে কতবার।
দিনের শেষে আসে রাত, রাতের শেষে ঊষা
সবার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকার পাই না যে কোনো দিশা ৷৷
প্রতিদিন যে কতজন আসলো আর গেলো!
এই যুদ্ধে আবার কতজন যে নাম লেখালো ?
ডানা মেলে উড়ে বেড়ার চেষ্টা যে কতবার
আপন মাঝে চলছে আমার বিশ্বযুদ্ধ আর একবার ।

ঝিমলি আচার্য

ঠিকানা 

পেয়েছি সন্ধান পৃথিবীতে আসার 
পেয়েছি আলোর ঠিকানা ----
পেয়েছি জীবন পেয়েছি দিশা 
পেয়েছি কর্ম চেতনা।
স্নেহ মমতার আচল পেয়েছি 
জন্ম নেওয়ার তরে।
ম-বাবা পেয়েছি পুন্য করে 
মানব কুলে এসে।
আরও পেয়েছি ভূমি মাতা 
হাঁটা শিখবো বলে।
প্রকৃতি মা আহার যোগায় 
বাঁচানোর ছলে।
জল পেয়েছি জীবন ছন্দে
প্রাণ রক্ষার খাতিরে।
মানব জন্ম পেয়েছি বলে
উপভোগ করি পৃথিবীকে।
সকল মা এর একই ভূমিকা
সন্তানের মুখ চেয়ে।
তবুও আমরা ব্যর্থ সন্তান
মা এর সম্মান রক্ষার্তে।

সূত্রা সরকার সাহা

ভালোবেসে

এক আকাশ ভালোবাসা তোমার জন্য,
কাজল কালো চোখে মুগ্ধতার চাওয়া তোমার জন্য।

এক গোলাপ ভালোবাসা তোমার জন্য,
রাগোসা, বারবোন, বসরা, ডাচ,গ্যালিসিয়া, তোমার জন্য।

এক পরশ ভালোবাসা তোমার জন্য,
প্রেম মদিরায় অমৃত সুধা পান তোমার জন্য।

এক হৃদয় ভালোবাসা তোমার জন্য,
প্রাণ পরশের ওঠা নামা ঐ তোমার জন্য।

এক বুক ভালোবাসা তোমার জন্য,
শান্তির প্রলেপে শান্তি সুধা পান তোমার জন্য।

এক রাশ মুগ্ধতা তোমার জন্য,
অবাক বিস্ময়ে দৃষ্টি নন্দন চাওয়া তোমার জন্য।

এক পুলক ভালোবাসা তোমার জন্য,
অনুভবে রাশি রাশি আনন্দ লহরী তোমার জন্য।

এক অরুণ অঞ্জলি তোমার জন্য,
রক্তিম রাগে ভৈরবী সুরের তান তোমার জন্য।

এক অঞ্চল আঁধার মেঘ তোমার জন্য,
বিদ্যুৎ বৃষ্টির অনুরাগের মিষ্টি ছোঁওয়া তোমার জন্য

সুজন দেবনাথ

হাইকু

১)পথশিশু

শীত কি মিত?
নয় কিভাবে ওরা
রাত কাটায়?

২) অসহায়

কোমল কুঁড়ি,
ফুল ফোটাবে তাই
পথেই ঠাঁই।

রীতা চক্রবর্তী ( লিপি )

ঘোর

ভালোবাসার ঘোরে আবার
দেখেছি তোমায় --
দেখেছি আমি দারুচিনি দ্বীপের বাঁকে
উচ্ছল সমুদ্রের ফেনিল উচ্ছাসে,
নির্জন সমুদ্র সৈকতে
পাড় ভাঙা ঢেউ-এর তরঙ্গে,
শুকনো বালিয়াড়িতে
একাকী ইতস্ততঃ দাঁড়ায়ে,
তবু আমি কাছে যেতে পারিনি তোমার।
কখনো পথ আগলে দাঁড়িয়েছ
আমার দৃষ্টির সম্মুখে,
নিশীথ রাতের গভীর আঁধারে
আমার নির্ঘুম রাত যাপনে,
কখনো তন্দ্রা জড়ানো মধুর স্বপনে
তবু আমি কাছে পাইনি তোমায়।
আজো আবার দেখলাম তোমায়
শহরের রাজপথে
যানজটে থমকে থাকা ভীড়ের কোলাহলে
ছুটে গেছি আমি ছুঁয়ে দিতে দুটো হাত
তবু আমি ছুঁতে পারিনি তোমায়।
হঠাৎ ফিনিক্স পাখির মতোই 
হাওয়ায় হারিয়ে গেলে,
হাতড়ে বেড়াই জনারণ্যে
দু'চোখে নেমে এলো অসীম শূন্যতা
না পাওয়ার খেদ, বিরহের বিবশতা।
তাই সাধ হলেও
ফিরে আমি আজও পাইনি তোমায়।।

বসন্ত মাহাত

 এ সময়ে দেখা শোক

জীবনের বেশ খানিকটা সময় করেছি পার
বাঁচা হয়ে গেল দুই তিন যুগের মধ্যবর্তী। 
তার মধ্যেই অভিজ্ঞতার ঝোলাটা পুরোপুরি 
না হলেও খানিকটা তো হয়েছেই ভর্তি।

মৃত্যু, শোক, আনন্দ, বিলাসিতা কম দেখিনি
অস্বীকার করার যায়গা নেই, সবই নিমিত্ত।
লোক দেখানো মায়া শোক দেখিয়ে দিয়ে
খুব তাড়াতাড়ি পাল্টে ফেলে নিজের চিত্ত। 

দেখেছি স্বামীর মৃত্যুর যন্ত্রনায় স্ত্রী'র শোক
কি করুণ আর্তনাদ! নিঃসঙ্গতার চিৎকার।
কিছু দিন যেতে না যেতেই আবার তিনিই 
বিধবা পেনশনের জন্য করে তোলপাড়।

দেখেছি উত্তাল বিলাপের সঙ্গে মায়া কান্না
প্রবল কান্নায় রাজ্য-শুদ্ধ লোককে বোঝাতে। 
জানান দিতে প্রিয় মানুষটিকে হারানোর ব্যথা 
ঠিক এক মাস পর ব্যস্ত সে আখের গোছাতে। 

আবার এমন মানুষও দেখেছি মৃত্যু যন্ত্রনায়
কাতর হয়ে একটি শব্দও খরচ না করে,
দেওয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বুজে ফেলে 
দীর্ঘশ্বাস, অঝোরে চোখের অশ্রু ঝরে। 

দেখেছি কেউ অন্ধকারকে আচ্ছাদন বানিয়ে
রাত্রে হাউমাউ করে কেঁদে বালিশ ভিজায়। 
কিছু লোকের মুখে কষ্টের কথা কম শুনলেও
আচরনেই ভালোবাসার গভীরতা প্রকাশ পায়। 

কেউবা সোশ্যাল মিডিয়ায় করে না বিক্রি 
ওঠায় না ভগ্ন-হৃদয়ের অনুভূতির জোয়ার। 
বরং ব্যথিত হৃদয় সঙ্গে নিয়ে কাজ করে যায়
নীরবে নিজের কাজ করে যায় সার্থকতার।

কৃষ্ণকুসুম পাল

এখন যেমন

সকলে দিনকানা,রাতে ভালো দেখে,
ধারাবাগ-হাওয়া বুঝে কথা ঠোকে।
কান ভারী,কান পাতলা দুটোই চালু,
আপেল,আঙুর নয়,বেশী চলে আলু।
দশচক্রে ভূত দলে দলে ভগবান হয়,
ছয়কে নয়,একের লাঠি দশের মাথা ভাঙে,
শহরে রোদন নিষ্ফল,কেঁচো নরকে, ঢেঁকি স্বর্গে।
পান্থা খেয়ে নুন ফুরালে গরম ভাত আসে,
সাগর কুসুম দু'নৌকায় উল্লাসে ভাসে।
কলা খেয়ে,রথ বেচেও তপস্বী বিড়াল নয়।

চন্দ্রা বিশ্বাস

মানপত্র 

জীবন এখন হেলতে দুলতে পার হয়ে যায় রাজপথ,
গাড়িঘোড়া সব মরজি-মাফিক সফরে। 
বিবেকের সাথে মন কষাকষি তুমুলে ,
ট্রাফিক পুলিশ পিষছে খৈনি মৌতাঁতে। 
চোখ বুঁজে থাকো দয়া করে হে ঈশ্বর,
জেব্রা ক্রশিং রং ধুয়ে মুছে ফরসা।
অগুনতি বার আছাড় খাওয়াটা সামলেও,
কোন ঈশারায় খাদের কিনারে পা রাখা?
চরণ যুগল বশে নেই বাপু জানি তা,
খাড়া মই এ উঠে ব্যালান্স মাপাটা জরুরী।
আকাশ ছোঁয়ার বাসনা মনের গভীরে,
তারা গুণে গুণে সময়ের দাম নিলামে।
যে ক'টা দিন আরও টিঁকে থাকা যায় হে জীবন,
এগিয়ে চলার এডভ্যান্স গোঁজা পকেটে।
পেণ্ডুলামের দোলা তাই থামা চলবেনা,
মানপত্রেই স্বীকৃতি চাই ফোকটে। 

ছন্দা দাম

শুধু আজ

প্রতিটি মুহূর্ত বাঁচি আমি,কাল নয় আজ,
আজ নয় এখন,এই মুহূর্ত,
জীবন কখন হয়ে যাবে বাতাস বিহীন বেলুন...
কতো ইচ্ছেরা হবে পাথর,পাথরেরা নিশ্চুপ প্রথাগত!!

কথাগুলো পাঁজরের খাঁজে গুঁজে রাখা...
শোরগোল তুলে সকাল সন্ধ্যা...মিহি সূর্যের আলো ছুঁয়ে,
ভাবি জাপটে ধরবো আকাশ,রুখব নদীর স্রোত...
কিছুই করা হয়ে ওঠেনা,শুধু বুকের শ্বাসটা উঠে হাঁপিয়ে।

থেকো হৃদয়ের শহরটায়, প্রেম অপ্রমের মায়া জড়িয়ে 
সাঁঝের বেলার মাটির প্রদীপ হয়ে দিও আলো,
সজনেপাতার ঝিরিঝিরি হাওয়ায় হাতছানি দেবে জীবন
তোমাকেই বলব হৃদিকথা...যদি আমায় চেয়ে পৃথিবীটা ভোলো ।

তোমার চাওয়ার স্পর্শে জাগবে পাওয়ার তৃষ্ণা...
একটা সাগর গণ্ডুশে শুষে নেবো প্রতিটি বার,
হমকো তো আজকা জিন্দেগী জীনে সে মতলব হ্যা....
কাল ক্যা হোগা সোচনে সে ক্যা মিলেগা বলো বারবার।।

মীনাক্ষী চক্রবর্তী সোম

প্রতিদ্বন্দ্বী

সময়ের আর দোষ কি বল!
দুরন্ত গতিতে রাশটানা বিষম দায়।
নির্লজ্জ লোলচর্ম বাধা মানে না
রঙ দিয়ে ঢেকে রাখার শতেক চেষ্টা ব‍্যর্থ করে
বলিরেখার ওপর প্রগাঢ় মোমের প্রলেপ গলে যায় 
স্বপ্নসুখ সন্ধানে সময় কেটে যায় অবিরাম ।
অশেষ চেষ্টায় চিরনতুনের প্রগলভতায় মেতে
দেখনদারি প্রতিযোগিতা চলে চারপাশে 
সেখানে নিজেই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বি , 
লড়াই শুধু আমার আর আমিত্বের।।

শর্মি দে

পঁচিশ বছরের ঘুম

রাত পোহালো!

অনড় অসাড় শরীরটা নিয়ে মিতার আজ আর উঠতে ইচ্ছে করছে না। সারা রাত জ্বরে পুড়ে যাচ্ছিল শরীর।

      তা সত্ত্বেও পিয়ালের জৈবিক ক্ষুধা মেটানোর প্রতি তার কর্তব্যবোধে কোনো খামতি নেই।

      আবার ঘুমিয়ে পড়ে! হঠাৎ চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেলো।

পিয়াল চিৎকার করছে!! "বাবাই স্কুল কামাই করবে নাকি?" নাকে তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছেন মহারাণী! গজগজ করে মিতার মুণ্ডুপাত করতে শুরু করলো।

        কিন্তু দু দুবার দেখে গেছে পিয়াল। শরীর ছুঁয়ে দেখেছে টেম্পারেচার কমলো কিনা! মিতার একদিন অসুস্থতা মানে বিছানা না ছাড়া ওর জন্য বাজ পড়ার মতো অবস্থা। সামান্য টিফিন বানিয়ে ছেলেকে তৈরি করে স্কুলে পাঠাতে হিমশিম খেয়ে যায় পিয়াল।

        অগত্যা মিতা চোখের জল মুছে বাবাইকে তৈরি করে দেয়। এই একভাবেই পঁচিশ বছর কাটিয়ে দেয় মিতা। নীরবে!! বাবাই চাকরি করছে। পিয়ালও অফিস করছে তবে একটা নতুন আকর্ষণে অফিস থেকে বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে হয় না ওর।

       বাড়িতে বসে কি পরকীয়া সম্ভব! ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারের দৌলতে তাই প্রতিদিনের পর্ব শেষ করে বাড়ি ফেরে। মাঝে মাঝে ভিডিও কলে রসালাপ হয় তারপরেই প্রয়োজন পড়ে মিতার দেহের। একটা এমুইজমেন্টের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মিতা সব বুঝে! ওর আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগে তবুও চুপ করে সব সহ্য করে। সংসারটা বাঁচিয়ে রাখতে প্রাণপন চেষ্টা করতে হবে ওকে!

       আটবছরের প্রেমের বিবাহ, বিবাহিত জীবনের অটুট বন্ধনে ছিল বাঁধা। ছোট সংসারে সাহায্যের জন্য কেউ ছিল না। একা হাতে সামলেছে সব। শারীরিক কষ্ট হলেও উফ্ করতে পারেনি বা করে নি বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নারী মিতা। ওদের ভালোর কথা ভেবে চাকরিটাও ছেড়ে দিয়েছিল। 

      আর আজ! এতো বছর ত্যাগের দেবী হয়ে বৈবাহিক জীবন কাটানোর পর মিতা নিজেকে নিঃসহায় অবলা নারী হিসেবে দেখতে পায় যখন পিয়ালের চোখে মুখে অন্য নারীর প্রতি প্রেম ফুটে ওঠে! এখন মাঝেমাঝেই বলে "একটা চাকরি করার চেষ্টা করো মিতা"! হয়তো মিতাকে ছেড়ে চলে গেলে মিতার পরবর্তী জীবন নিয়ে ভাবে। কারুর পরকীয়ার গল্প শুনলেই বলে উঠে, "ঠিক তো একজনকে নিয়ে কতদিন থাকা যায়!"  মিতার ভিতর হুঁ হুঁ করে কেঁদে ওঠে। পঁচিশ বছর ধরে এতো প্রেম এতো ভালোবাসা কোথায় হারিয়ে গেল! মিতা জানে ঘরে ঘরে পরকীয়া বেড়ে চলেছে...আর আজ তার সোনার সংসারটাও?

    "মা ...মা" ডাক শুনতেই মিতার ঘুম ভাঙে! এই মুহূর্তে মিতার মনে হয় আর ঘুমালে চলবে না, ওকে জেগে থাকতেই হবে বাবাইর জন্য 

রিপন সিংহ

ক্লান্ত পথ

ক্লান্ত দেহ নিয়ে পৃথিবীর এই দোয়ারে,
কার্তিকের শেষ সন্ধ্যায়
গভীর অন্ধকারে ডাকে।
তারপর, অনেক দিন পর
এই পথে কোন একদিন দু'জনের মধ্যে অনেক স্বপ্ন ছিল;
তবুও কোনো স্বপ্ন দেখিনি বারেবারে;
আমি এক ঘুমন্ত প্রাণ,
মেখে আছে তার ঘ্রাণ,
তবুও এই পৃথিবী ম্লান!
শ্মশান, কিংবা কবর থেকে এসেছে কতবার
মিলনের চিঠি
আমি ডেকেছি তারে বারবার;
রূপকে নয় -- তারে ভালোবেসে;
যে পথে হয়েছিল দেখা
আজও সেই ক্লান্ত পথে বেচেঁ আছি।
----  আর নয় !
যেদিন কুয়াশার ভেতর বুনো হাঁস,
হংস হংসীর ডাকে,
একুশ বছর পর তোমার আহ্বানে;
তখন বলবে --- "একটিবার সুযোগ দাও"
তোমার হৃদয়ে,
তখন এই ক্লান্ত পথ থেকে মুছে যাবো চিরদিনে,
তারপর শিশির মাখা বাতাসে
হারিয়ে যাবো নতুন এক যাত্রীর ভিড়ে।

সোনালী মণ্ডল

গীতু পাগলী

গীতু পাগলীর পাঁচটি মেয়ে
ভীষণ অভাবে তারা রয়,
জীবন টাকে বাজি রেখে
তাদের স্বপ্নকে করে জয়।
একটি ছিলো বিদ্যান ভারী
দেশে ডাক্তারিতে সুযোগ পায়,
দশের মঙ্গল করে সে
বংশের নাম বাড়ায়।
একটি ছিলো ভাবুক মনের
লিখতো বসে কবিতা,
দেশ বিদেশে চিনলো তাকে
স্মারকে পেল কবির আখ্যা।
একটি ছিলো তর্কে পটু
হারানো তাকে দায়,
যুক্তির জোরে উকিল সে
সর্বদা সত্যের পাশে দাড়ায়।
একটি ছিলো পারদর্শী
হস্ত শিল্পের গুণে,
বাড়ি হলো তার স্কুল
পাড়ার গৃহবধূ দের নিয়ে।
একটি ছিলো কোকিল কণ্ঠের
গাইতো অনেক গান,
শিল্পী হয়ে বলে আজ
আমি গীতু পাগলীর সন্তান।।

নৃপেশ আনন্দ দাস

শূন্যের ভেতর

সব তো আর ভালো লাগার নয়
তবু সব ভালো লাগার চাবি গুরু-মগজ থেকে নিয়ে
আকাশের দরজা খুলে দিই ----
পাখি এসে বসে কাছের ডালটায়
ঠিক তখন লেখা শুরু হয় ভালবাসা আর সত্যের উপাখ্যান ।
আবার,
শূন্যের পরিধি মেপে মেপে, 
যখন একরাশ শূন্যতার মুখোমুখি হই,
তখন, স্বর্গ নরক হয় ।
শূন্যের ভেতর বিশ্বভ্রহ্মাণ্ড আঁকতে পারলে,
তুমি আমি একসুরে মানবতার গান গাই
জড়-জীব যেখানে মেশে শিশুর অট্টহাসিতে
সেখানে ঈশ্বর খুঁজে পাই ।।

প্রিয়াঙ্কা দেবনাথ

সুখপাখি

ক্লান্ত দেহ ঘুমের ঘোরে
এলিয়ে দেবো যখন,
ঠিক তখনই মনের ঘরে
সুখের নির্বাসন।

যতোই ভাবি গুছিয়ে নিলাম
সাধের বালির চর,
ভাঙলো আবার শক্তহাতে
সে কি দারুণ ঝড়!

হাতড়ে বেড়াই আঁধার ঘরে
কোথায় আপনজন?
সুখের পাখি সুখ ফুরালেই
খুঁজে নির্বাসন।

অভিষেক অধিকারী

প্রেম এবং

অভিব‍্যক্তির নীরবতা আজ প্রশ্ন তুলেছে,
স্তব্ধ হয়ে এসেছে সভ‍্যতার কোলাহল।
তোমার প্রতিটি সরলতায় ভরা কথপোকথন
ভাগ বসিয়েছে সেই কোলাহলে।

আমি আজ যাযাবর,
সভ‍্যতার রং মুছে দিয়ে হেঁটে চলেছি,
প্রেমের খোঁজে। 

তোমার নকশা আঁকা মানবিক সম্পদগুলো 
খেলতে চাইছে,
মানুষের কুটিল স্থাপত‍্যের সঙ্গে। 

আমি আজ এঁকে চলেছি
প্রেমের একএকটি স্থাপত‍্যবোধ।
যাতে কোন কুটিলতা নেই।

চাওয়া পাওয়ার দ্বন্দ্ব নিয়ে একটা সভ‍্যতা চালানো যায়।
কিন্তু প্রেম এসবের অতীত। 

তাই তো একটা প্রেমের খোঁজে আমি বেরিয়েছি,
সভ‍্যতার চোরাপথ থেকে সরে গিয়ে। 

রামমোহন বাগচী

হবে অবসান ? 

এ পাড়ে তে  বি-দেশী
ও পাড়ে তে বি-ধর্মী
কিসের দোষে হলাম দোষী
হারিয়ে আপন ভূমি, 
মন্ডামিটাই পেলো তারা
ভাগবাটোয়ারা করলো যারা। 
স্বদেশ হলো বিদেশ ভূমি
নদী হলো লাল, 
আমার গালে পড়লো থাপ্পর
এখানে সেখানে, হারিয়ে আপন ভূমি, 
আর কথ কাল বইতে হবে এমন অপবাদ
কার কাছে আছে জাদুর লাঠি  
ঘোচায় এই অসন্মান।।

মিঠুন রায়

স্তব্দতা

কোলাহলের মাঝেও একটা স্তব্দতা নেমে আসে পাতার ওপর।
অগোছালো ঘরের ছাঁদে বেড়ে উঠেছে একটি অপরাজিতা,
সন্তর্পণে আঁকা  অভ্যাসের মাটি আমি।
তোমার স্মৃতিকথা এখনও জেগে রয়েছে মনন ভূমিতে।
নীরবতা প্রতীক হিসেবে একটি শুকনো নদী চেয়েছিলে তুমি
একটা স্তব্দতার জন্য কেবল তোমাকে চেয়েছি।

দীপু দেবনাথ

বিসর্জন 

আঁচলটাকে বেঁধে দিলাম সংসারের উদ্দেশ্যে 
জানি বোঝ নেই বাদ্য আমি সমাজের হাতে!
আপন পরের ফারাক ভুলে, 
মেয়ে আমার নতুন ঘরে।
হাজারো তারার মাঝে আমার একটি সুখ তারা 
সূর্য ন্যায় আলো দেবে আমার গ্রহ ছাড়া।
বাঁধবে সুখের আলোর ঘর জ্বলবে নিরন্তর।
শিষ্টাচারের মঞ্চে ছেড়ে আজি করিবে পদার্পণ 
আমি হলাম উপেক্ষা,     উপেক্ষা হল আপন! 
তিল তিল ঘরে মানুষ করা আমার সেই রতন,
শূন্য হাঁড়ির ন্যায় আমার একাকিত্ব জীবন!
অশ্রু জলে জন্ম নিল আমার বুকে নদী!
মেয়ে আমার অবুঝ পাখি 
দিয়েছি বিসর্জন ঐ নদীতে,যে নদীর সূত্র আমি।

নুরুল শিপার খান

ফুলবানু

মা,ওমা খিদে লাগছে! কান্না জড়িত কন্ঠে বলে মেয়ে ফুলবানু..

রহিম মিয়ার একমাত্র মেয়ে ফুলবানু৷

গতবছর চাঁদপুরের নদীভাঙনে বাড়ি ঘর সব তলিয়ে যায় সেই থেকে ওরা ঢাকার করাইল বস্তিতে থাকে৷

রহিম মিয়ার বয়স পঞ্চান্ন ছুঁই ছুঁই কিন্তু সারাদিনের খাটুনি যেন তাকে আশি বছরের বুড়া করে দিয়েছে৷ 

মেয়ের বয়স সবে সাত বছর ,অভাবের দাগ কাটিয়ে উঠতে দেরিতে বিয়ে করেন তিনি৷ সেই কাক ডাকা ভোরে রিকসা নিয়ে বের হয় আর ফিরে আসে রাতে.. 

অবশ্য যেদিন সুযোগ পায় সেদিন দুপুরেই বাসায় চলে আসে৷

সারা দিনের খাটুনি শেষে ঘরে ফিরে রহিমমিয়া যেন স্বর্গের সুখ অনুভব করে৷ চাঁদমুখ(মেয়ে ফুলবানু)কে দেখলে যেন সমস্ত ক্লান্তি এক নিমিষেই গায়েব৷আর যখনি ঘরে ফিরে তখনি মজা(একটা মিষ্টির পুটলা)নিয়ে আসে,মেয়ের অনেক পছন্দ মিষ্টি৷

রান্না ঘর থেকে জরিনা বেগম(ফুলবানুর মা) ভাতের হাড়ি নিয়ে ঘরে ফিরলো,দেখে রহিমমিয়ার মুখ ভার৷

-কি হলো ফুলের বাপ আপনার কি হয়েছে,আপনি এমন মুখ গোমড়া করে বসে আছেন কেন?

-কথাটা কেমনে যে বলি ফুলের মা সর্বনাস হয়ে গেছে৷

-কি হইছে ফুলের বাপ?

-কাল থেকে রিকসা চালানো বন্ধ"করুনা না কি যেন একটা অসুক আইছে দেশে৷

-হ করোনা,কিন্তু তার জন্যি রিক্সা বন্ধ রাখবে ক্যান..এই অসুখ তো চীনদেশে?

-নারে ফুলের মা,শুধু চীনদেশে না ব্যাবাক (১৯৯টি)দেশে ছড়ায় গেছে,সবাই বলাবলি করছে৷

-বলেন কি ফুলের বাপ?

-হ,বাংলাদেশে নাকি পাচজন মারা গেছে,দুইজন ডাক্তারের ও নাকি এই রোগ ধরা পড়েছে৷এ রোগ নাকি ছোয়াচে,বাতাসের সাথে চলে আর মানুষের শরীরে ঢুকে৷

-কন কি ফুলের বাপ,তাহলে আমাগো কি হইবো৷

-আমি ও তাই ভাবছি-রে ফুলের মা..আমরা না হয় আধপ্যাটে দিন পার করতে পারবো কিন্তু ফুল ?

-আপনি চিন্তা কইরেন না,ওই তিনতলার খালাম্মা কইছে ওনাগো কাজের বুয়া একমাসের জন্য গ্যারামে যাইবো ওই এক মাস আমি খালাম্মাগো বাসায় কাজ করবো,আপনে শুধু ফুলেরে দেইখেন৷

-কস কি ফুলের মা,জানিস না আগামীকাল থেকে ঘরের বাইরে যাওয়া বারন,সরকারি ভাবে ঘোষনা দিছে ,মাইকে বলছে,আবার টিভিতে ও দেখাচ্ছে "লকডান না কি জানি কয় ৷

-লকডান কি ফুলের বাপ৷?

-মানে আমি ও জানিনা,তয় ঘরের ভেতর থাকতে হবে দশ দিন,বাইরে বের হলেই মিলিটারি মাইরধোর করবে৷

-কিন্তু আমরা গরীব মানুষ লকডান করলে আমাগো প্যাটে ভাত দিবো ক্যাডা?


এরি মধ্যে রমিজ মিয়া হাজির..রমিজ মিয়া সম্পর্কে রহিমমিয়ার চাচা,পাশাপাশি থাকে ওরা

-চাচা,কাল থেকে তো ঘর থেকে বাহির হওয়া নিষেধ,আপনি শুনেছেন?

-হ শুনছি তো,আর তাই ছুটে এলাম তোর কাছে,এই শোন কাল সকালে সমতা মডেল ইসকুলে যাবি আমার সাথে৷

-সরকার না ঘর থেকে বেরুতে বারন করলো?

-করেছে ঠিক আছে,কিন্তু সরকারই আমাদের কথা ভেবে চাল ডালের ব্যাবস্থা করেছে৷

-কন কি চাচা?

-হ,এই দশ দিনে দেশের সব গরীব,খেটে খাওয়া দিনমজুরদের সরকার খাওয়াবে,তয় শর্ত একটা?

-কি শর্ত চাচা?

ওই যে লকডাউন থাকতে হবে,রমিজ মিয়া চলে গেলো৷

যাক তবুও একটা উপায় হলো,ইয়া আল্লাহ তোমার দুনিয়ায় আজ ও গরীবের অন্ন জুটে৷

-----------------------------------------------

পরদিন সকালে চাচা রমিজউদ্দিনের সাথে একটা বস্তা নিয়ে বের হলো রহিমমিয়া৷

সমতা মডেল স্কুলের সামনে বিরাট বড় গাড়ি চালডাল ভর্তি৷ শত শত দিনমজুর খেটে খাওয়া মানুষের ঢল নেমেছে৷সবাইকে লাইনে দাড় করানো হলো..একে একে নাম ডেকে সবাইকে চালডাল দেওয়া হলো...দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে গেলো৷চাচা রমিজউদ্দিন ও পেলো চালডাল কিন্তু রহিমমিয়ার  নাম আর ডাকেনা৷

এবার চাচা রমিজউদ্দন রহিমমিয়াকে সাথে নিয়ে অফিসারের সাথে কথা বলল..তিনি বললেন ওনার নাম এখানে নেই...সরি আমরা কিছু করতে পারবোনা৷অন্যজন বললো আচ্ছা তোমার নাম ঠিকানা বলো আর এখানে একটা সাক্ষর দাও আমি দেখি কথা বলে কাল ব্যাবস্থা করতে পারি কিনা৷

ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ঘরে ফিরলো রহিম মিয়া,খালি হাত দেখে জরিনা বেগম জিজ্ঞেস করলো

-কি হইছে আপনার ফুলের বাপ,চাল,ডাল কই৷

-পাইনি৷

-পাননি মানে?

-ওসব আমাদের জন্য নারে ফুলের মা,ওসব হলো বড়লোকদের জন্য,,যাদের অনেক আছে তাদের জন্য৷


নিমিষেই মনটা বিষন্নতায় ঢেকে গেলো জরিনা বেগমের স্বামী রহিমমিয়ার কথা শুনে৷

পরে রমিজউদ্দিনের কাছে সব জানতে পারলো৷কিন্তু হাড়িতে যে ভাত আছে তা আজ রাতে কোনমতে চলে যাবে কিন্তু কাল ?

সকালে ফুল ঘুম থেকে উঠেই পান্তা খেতে চাইবে তখন কি করবে জরিনা বেগম৷ভাবনার দরজায় টোকা দিয়ে বলল রহিমমিয়া-চিন্তা কইরোনা ফুলের মা,সকাল হোক একটা ব্যাবস্থা হবেই৷

পরদিন সকালে জরিনা বেগম ঘুম থেকে উঠে দেখে রহিমমিয়া পাশে নেই.কখন যে ঘুম থেকে উঠে বেরিয়ে গেছে টেরই পাইনি৷রিক্সা ও নেই৷তবে কি রিকসা নিয়ে বের হলো?কিন্তু সরকার তো বলেছে "লকডন" মানে ঘর থেকে বের হওয়া যাবেনা,বের হলেই করুনা রোগে ধরবে৷

একবার ঘরে একবার বাইরে করছে..ওদিকে ফুল ও খিদের জ্বালায় কান্নাকাটি করছে৷যত বলছে তোর বাবা মজা আনতে গেছে কিন্তু কিছুতেই কান্না থামছেনা, কিযে করবে বুঝে উঠতে পারছেনা জরিনা বেগম৷

এদিকে বেলা বারোটা বেজে গেছে..সকালে দুইটাকা দিয়ে এক পিচ পাউরুটি কিনে দিয়েছিল ফুলকে সে ওটা খেয়েই খেলছে ঘরের মাঝে৷

অবুঝ শিশু সে তো আর বুঝেনা অভাব কি জিনিস,ক্ষুধা লাগলেই তাকে খাবার দিতে হবে৷


বেলা দুইটা বেজে যায় রহিমমিয়া আর ফিরে না..

মা আমার খিদা লাগছে,বুঝোনা,আমারে খাইতে দাও এই বলে কান্না শুরু করে দিয়েছে ফুল৷

হঠাৎ রমিজউদ্দিন দৌড়ে এলো-বৌ মা সিগগির চলো রহিমমিয়ারে মিলিটারিতে ধরেছে৷

-ও আল্লা গো বলে চিৎকার দিয়ে ফুলকে নিয়ে রমিজ চাচার পিছে পিছে দৌড়ে গেলো  জরিনা বেগম৷

দেখে মোটা রশি দিয়ে রহিমমিয়াকে বেধে রেখেছে মিলিটারি তাদের গাড়ির সাথে৷

কেউ সামনে যাচ্ছেনা..কিছু লোক দুরে দাড়িয়ে দেখছে৷এবার জরিনা বেগম দৌড়ে  স্বামীর কাছে গেলো

-আপনি কি করিছেন ফুলের বাপ,ওনারা আপনারে ক্যান বাইন্দা রাখছে কন?

-আমি কিছুই করিনাই ফুলের মা..আমি রিক্সা নিয়ে বাইর হইছি এটাই আমার দোষ৷

এবার মিলিটারি অফিসার জরিনা বেগমের সামনে এসে দাড়ালো-তোমার স্বামী ঘর থেকে কেন বের হয়েছে,তোমরা কি জানোনা সারাদেশ লকডাউন চলছে?সরকার যেখানে চালডালের ব্যাবস্থা করেছে সেখানে তোমরা জীবনের ঝুকি নিয়ে কেন বের হচ্ছে?

-প্যাটের জ্বালা বড় জ্বালা হুজুর,আমরা সরকারী কোন চাল ডাল পাইনা..এই যে মাইয়াডা ক্ষুধার জ্বালায় কানতেছে হুজুর,ওর কান্নার কাছে করোনা ভাইরাস কিছুইনা..

তাই ওর বাপে রিক্সা নিয়ে বের হইছে৷কোন সময় বের হইছে আমি জানিনা হুজুর৷দয়া করে ফুলের বাপেরে ছাইড়া দেন৷


এবার ফুল ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো--ও বাবা তোমার মুখে রক্ত কেন,কি হয়েছে তোমার৷

-তোর বাবা সরকারী আদেশ অমান্য করে ঘর থেকে বের হয়েছে,তাই তোর বাপেরে রশি দিয়ে বেধে রেখেছি বললেন মিলিটারী লোক৷

-ও কাকু আমার বাবারে ছাইড়া দেন,আমার বাবার কোন দোষ নাই,সব দোষ আমার৷

আমি যদি বাবার কাছে মজা (মিষটি)খাইতে না চাইতাম তাহলে আমার বাবা রিক্সা নিয়ে বের হতো না..আমি আর কোনদিন বাবার কাছে মজা খাইতে চাইবোনা কাকু৷

-তোর বাবাকে ছাড়বো তার আগে কান ধরে উঠবস কর..আর বল কোন দিন সরকারী আদেশ অমান্য করবি না?

এবার রহিমমিয়া সবার সামনে কানধরে উঠবস করলো তারপর তাকে ছেড়ে দিয়ে চলে গেলো মিলিটারি...

এবার ফুলবানু বাবাকে জড়িয়ে ধরে বললো বাবা আমি আর কোন দিন মজা খেতে চাইবোনা তোমার কাছে৷

-মারে আমি তোর হতভাগ্য পিতা যে এইটুকু মাসুম বাচ্চার মুখে খাবার দিতে পারেনা..সরকার ঠিকই আমাগো সাহায্য করে কিন্তু সে সাহায্য হাত বদল হতে হতে আর আমাদের হাতে পৌছায় না৷

প্রিয়পাঠক বর্তমান প্রেক্ষাপটকে গল্পের মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র৷

একবার ভাবুন তো আমাদের দেশে পথে প্রান্তরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এরকম হাজারো রহিমমিয়া পরিবার৷

যারা করোনার মতো মরনঘাতি ছোয়াচে রোগকে উপেক্ষা করে জীবনের ঝুকি নিয়ে নদীতে মাছ ধরছে ,আবার কেউ রিকসা চালাচ্ছে ,আবার কেউ দিনমজুরের কাজ করছে..কিন্তু কেন?

আমরা কি পারিনা ওদের পাশে একমুঠো অন্ন দেবার প্রতিশ্রুতি নিয়ে দাড়াতে?

আমরা কি পারিনা ওদের একবেলার খাবার জোটাতে?

আসুন আমরা যার যার সাধ্যমত ওদের পাশে দাড়ায়..........

প্রগতি দে চৌধুরী

যুদ্ধ-খেলা 

সাইরেনের শব্দ, গুলির আওয়াজ 
লাশ লাশের পাহাড় 
মর্টার, বোমা, রক্তের ধারা 
বুকফাটা আর্তনাদ, হাহাকার 
বারুদে বাতাস ভারী, পোড়া গন্ধ 
মৃত মায়ের বুকে শিশুর কান্না 
জন্মের আগেই ভ্রুনে মৃত্যুর ঠিকানা। 
পাণ্ডুর আকাশে চিলের উড়াউড়ি 
পঁচা শবের স্তূপ, প্রেতপুরী --

ওরা মোবাইলে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলছে 
আর সোল্লাসে চিৎকার করে বলছে 
জিতে গেছি - - জিতে গেছি।

দীপান্বিতা পান্ডে দীক্ষিৎ

প্রার্থনা

শান্তির প্রকম্পন ছড়িয়ে চারিদিকে শুধু দোষের কারখানা,
দিনরাত সব এক করে শেষে একরাশ দুঃখের হয় পাওনা৷
ক্ষণে ক্ষণে শুধু তোষামদ আর ত্যাগের আদর্শ,
শান্তি আসেনা কোনো দরজায় সবখানে শুধু অশান্ত।
এই বড়দিনে এই শুভ ক্ষণে প্রার্থনা তোমার কাছে প্রভু,
নূতন দিনে নূতনের আগমনে চারিদিকে রঙিন মনের আলো হয়ে ভরে উঠুক সবই।

রমা চন্দ্র

পার্বণ

বৈশাখেতে বর্ষবরণ-
নতুন পোশাক
নতুনের আবাহন...
জ্যোষ্ঠ মাসে জামাই ষষ্ঠী
মাছ পোলাও আম মিষ্টি,
আষাঢ় মাসে ঠাকুর পথে
রথযাত্রায় সকলে মাতে...
শ্রাবণী পূর্ণিমায় 
রাধে কৃষ্ণ ঝুলন দোলায়...
আনন্দ প্লাবনে সকলের মন ভরায়,
ভাদ্র মাসে জন্মাষ্টমী
তাল ফুলুরি লুচি পায়েস
শ্রী গোপালের চরণ চুমি...
আশ্বিন মাসে শুভ্র কাশফুল হাসে
ঝরা শিউলিতে পা ফেলে
ঘরের মেয়ে উমা আসে...,
কার্তিক মাসে দেব দীপাবলি
শ্যামা মায়ের পূজা
শেষ দিনটিতে দেব সেনাপতি
কার্তিক ঠাকুর খোঁজা,
অগ্রহায়ণে হৈমন্তীরাণী
সোনালী ধান সম্ভারে-
ভ'রে দেয় কৃষাণের উঠোন খানি 
নবান্ন উৎসব ভোরে
খেজুর রসের হাঁড়ি নিয়ে
রসকারিয়ে ঘোরে
পল্লীগ্রামের প্রতি ঘরে
পঞ্চব্যঞ্জন মাছের পদ
মণ্ডা মিঠায়ে হয় নবান্ন উৎসব,
পৌষে পোষপার্বণ
পিঠে পুলি সাজিয়ে থালা
আমরা মাতি সারাবেলা...
মাঘের শীতে জমে ওঠে
মেলা খেলা যাত্রা পালা
চড়ুইভাতি রোদের বেলা,
বাগদেবী বিদ্যালয়ে-
শ্রী পঞ্চমীতে জ্ঞানদীপ জ্বালে...
ফাগুনে পলাশ শিমুল বনে- 
দোলের রঙিন রঙে 
লাগে  প্রেমের আগুন...
চৈত্রের গাজন উৎসব গান
আনন্দধারায় পূর্ণ করে ভক্তপ্রাণ।

পান্থ দাস

স্বপ্ন

রাত নামে
আঁধারে 
একাকী স্বপ্নে,

আগন্তুক হয়েই
আসল তৃপ্তি
দিগন্ত ভ্রমণে।

মনের বাধ
ভাঙে
একা গগনে,

আস্তানাহীন হয়েই
গভীর আশার
শব্দ জাগে মনে।

সুপ্রতিম ভৌমিক

মরুভূমির মরুদ্যানে
                                       
শুষ্ক মরুভূমি
ধুধু বালুচর,
শনশন সমীরণ,
ঊষ্ণ বাতাবরণ।
বসিয়া বাতায়নে
একাকী কবি মনে,
গেঁথে যাই 
কথা মালিকা,
মরুভূমির মরুদ্যানে,
বহে উতলা পবন,
উন্মনা মন,
চঞ্চল বিহগ সম
নিমেষে যায় উড়ে
দূর অজানা ঠিকানায় ।
খুঁজে ফিরে শুধু
শান্ত শীতল হাওয়া,
সবুজ বনানী,
গগন, নীলিমায় নীল,
একটুখানি আশা,
অকৃত্রিম ভালোবাসা,
কবি মানসে কাঙ্খিত,
ঈপ্সিত ভালো বাসায় ।

সাগরিকা মজুমদার

শালিক পাখি
      
শালিক পাখি শালিক পাখি, 
কিচিরমিচির  ডাকাডাকি । 
ঝগড়া কেন করছ ভাই .. 
উঠোন ভরা ধান ছিটাই
কুটুস কাটুস খাও। 
প্রভাত এ চেচামেচি
 গোধূলি তে চেচামেচি
লাগে না  তো ভালো ভাই.. 
তাই তো বলি চুপটি  করে থাকো , 
মানুষ এর উপর ভরসা রাখো । 

উঠোন ভরা ধান আছে, 
পুকুর পানে জল। 
খেয়ে দেয়ে বসে বসে
করছো কোলাহল । 

বলি ,ও ভাই ... যাওনা  বাসায়,
সন্ধ্যা হল যে, 
পথ চেয়ে আছে, ফুটফুটে কচিকাচার দল।

গোপালচন্দ্র দাস

আঘাত 

ক্ষুধার্ত নিস্ব-জনদের সামনে খাদ্য ঝুলিয়ে রাখা এক মানসিক আঘাত।
সব আঘাতের শব্দ হয় না।
ভারী বুটের নিচে ফুল থেঁতলে গেলে
শব্দ কমে যায় পিচঢালা পথে
নির্মান বিনির্মাণে পথের পাশে গাছের কান্না
চর দখলে নদীর কান্না--কিংবা
যে শিশুটিকে বিক্রি করে যায়, মা!
সেই আঘাতে শুকনো রুটি ঢেউ খেলে তাঁর বুকে।
প্রতিদিন নিঃশব্দে শরীর থেকে রস চুষে নেয় প্রভূ
নিজেরা নরকে সংযম হারায় নিঃশব্দে---
ঘরে পর্দার আড়ালে ঘায়েল শব্দ
চারদেয়ালে আঘাত পেয়ে নিঃশব্দে কাঁদে।
যেমনটা---সব আঘাতের শব্দ হয়না।

চন্দ্রা বিশ্বাস

দিবাস্বপ্ন

আবারও ভালবাসা জাগে বিষাদের দুনিয়ায়,
অবকাশ গা ঝাড়া দেয়। 
বারান্দায়  বসে মোহমুগ্ধ নয়নে ,
শালিখ দম্পতির
মান-অভিমানের পালা উপভোগ 
করতে করতেই,
স্মৃতির দরজা হাট হয়ে খুলে যায়।
বুকের বাঁ দিকটা চিনচিন্ করে ওঠে,
অবসাদের চিতা দাউদাউ করে জ্বলে উঠে, নিভে যায়। 
নিভন্ত সেই ধোঁয়ায় চোখ জ্বালা করে, 
তবু, রজনীগন্ধার সুবাসে তখন মনে দখিণা ।

প্রদীপ কুমার মাইতি

শীত আসলে

শীত আসলে কষ্টে মরে
গরীব আর অসহায়, 
হাড় কাঁপুনি শীতে তারা
কাবু হয়ে যায়। 

শীত আসলে গরীবের ঘরে
নেই কোন সংস্থান,
হাত বাড়িয়ে ধনীরা তাদের
দেয়না কোন ত্রাণ।

সজ্জা যাদের ধূলো বালি 
কুয়াশা ভেজা রাতে,
শীত আসলে শীতার্ত মানুষ 
কাঁপে শীতের ঘাতে।

ধনী দের জীবন বিলাসবহুল 
গরম পোশাক গায়,
শীত আসলে গরীব মানুষ 
শুধুই কষ্ট পায়।

ধনীরা যখন রুম হিটারে
ঘুমায় পরম সুখে, 
ছিন্ন বস্ত্রে শীতার্ত মানুষের 
ঘুম আসেনা চোখে। 

চলো সবে শীতের পোশাক 
করবো তাদের দান,
শীতের রাতে শীতার্ত মানুষ 
পাবে তারা পরিত্রাণ।

সৃশর্মিষ্ঠা

অতঃপর

চলে গেছে 
মেঘ রোদ আলো অন্ধকার জল স্থল
সবাই

ভগাঙ্কুরে ক'টি আঁচড় 
আর আমি 

বিলাপের কাছাকাছি

শ্বেতা ব্যানার্জী

ক্রান্তিকাল

"তিনটি শালিখ ঝগড়া করে রান্নাঘরের চালে"

প্রথমেই যদি শালিখদের শাসন করা যেত,ঝগড়াটা

বাড়তে না দিয়ে, তাহলে বোধহয় সংসার সমাজে,রাজ্যে,রাষ্ট্রে ব্যপক হারে এই

ঝগড়া -ঝামেলা, অশান্তি লেগেই থাকতো না।

আসলে আমরা কোনো কিছুরই  কারণ খুঁজতে গভীর মূলে প্রবেশ না করে ডালপালা ধরে ঝুলোঝুলি করে কিছু ডাল ভেঙে গাছেরই ক্ষতি করি, প্রকারন্তরে নিজেদেরই। আর চুপচাপ বলি লেগে যা লেগে যা নারদ,নারদ। লাগলেই লাভ .... 

অস্ত্র, বিমান,নৌ বিক্রির হার বাড়িয়ে কিছু মনুফা লুটে নিজেদের ভুঁড়ি আরও একটু বাড়িয়ে নেওয়া। তাছাড়া গদি বাঁচানো অথবা গদি বাগিয়ে নেওয়া। 

হয়তো ভাবছেন আদারব্যাপারি হয়ে জাহাজের খোঁজের কী দরকার , কিন্তু সাগরে সুনামীর ঢেউ আসলে জাহাজের সঙ্গে খালের ডিঙিও যে আঁতকে উঠে... 

দুলতে থাকে অজানা আশংকায়।

দিনদিন জীবন টা যেন যুদ্ধ, যুদ্ধ হয়ে উঠছে। খাদ্যাভাসের যুদ্ধ, সংসারে মেনে না-ও মানিয়ে না-ও এর যুদ্ধ, জিনিসপত্রের দাম অগ্নিমূল্য, কড়ার তেল থেকে গাড়ির তেল, কোথায় যাবো!!  তার সাথে এসো যুদ্ধ যুদ্ধ খেলি  জুজুর ভয়ে অস্থির। তারই মধ্যে  স্থবির ও আত্মকেন্দ্রিক জীবন। 

এখন আমরা এক অস্থির  সময়ের মধ্যে দিয়ে সাঁতরে চলেছি... ডাঙায় উঠতে গেলে যে সুস্থির মানসিকতার প্রয়োজন হয় সমাজের মানুষের মধ্যে সেই সুস্থিররতা প্রায় নেই বললেই চলে। 

নীতি-নৈতিকতার ভূমিকা পালন করতে যে মানবিকতার প্রয়োজন আজ তার সামগ্রিক অধঃপতন। বর্তমান সময়ের একটি আলোচিত ঘটনার ভয়াবহতায় সবাই নির্বাক। সবার মনে   একই প্রশ্ন- আমাদের মানবিক মূল্যবোধগুলো কোথায় হারিয়ে গেল? 

হ্যাঁ, এই প্রশ্ন অনেকের মনে থাকলেও, প্রশ্নকর্তা কেউ নেই, বিবেক জাগ্রত না আহত! নৈতিক অবক্ষয় নিশ্চিত জেনেও উত্তরণের পথ খুঁজিনা।

চোখে রঙিন চশমা পরিয়ে আমাদের সো কলড্ অভিভাবকরা দূরদর্শনে দূরদর্শিতার রণকৌশল 

আলোচনায়  ওই "তিনটি শালিখের মতো "

....যেখানে  অসিহষ্ণু মানসিকতার হেঁসেল থেকে 

চাপান উতোরের উগ্র ফোড়নের পোড়াগন্ধ ছাড়া

কিছুই নাক ও  মনের দরজায় এসে পৌঁছায় না, গণতন্ত্রের ফানুস সেখানে গৎবাঁধা কিছু কথার

মোহজালের বুদবুদ হয়ে উড়তে থাকে। আর বুদ্ধিজীবিরা   ফুঃ এর উপর ফুঃ....

কিন্তু সঠিক কারণ না আমাদের বোঝাতে পারেন,

না নিজেরা বোঝেন।

আজ প্রযুক্তি কে হাতের মুঠোয় নিয়ে রঙিন স্বপ্ন উড়িয়ে বিস্ময়কর গতিতে এগিয়ে চলেছি,কিন্তু মানবিকতা!!

আমাদের জীবনে বেড়েছে বেগ,হারিয়েছি আবেগ।

ভোগবিলাসের ফুয়েল  ভরে নিয়ে জেট গতিতে জীবন কে ভোগ করতে গিয়ে মানবিকতার বিশুদ্ধতা হারিয়ে আজ "সেলফিশ জায়েন্ট "

শিক্ষিত, অতি শিক্ষিত, সমাজ দমন করতে পারেনি অপরাধ প্রবণতার ধারাবাহিকতকে, যা দিন দিন বেড়েই চলছে... 

আসলে এর পিছনেও আছে মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাধারা

যা আসলে একটি রোগ, দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে  

কোনো জ্ঞানী কখনো কোনো অনৈতিক কাজের সাথে নিজেকে যুক্ত  করতে পারেন না। 

জ্ঞান চর্চার কোনো বিকল্প নেই। জ্ঞান মানুষের মূল্যবোধকে সতেজ করে তোলে। আসুন পুঁথিগত বিদ্যা নয় প্রকৃত শিক্ষার আলো জ্বেলে ক্রান্তিকাল অতিক্রম করি...।

দীপক রঞ্জন কর

চশমা

চশমাটা যে বড়ই বেয়াদব
ধরে সবার কানে ,
বড় ছোট নারী পুরুষ
কিছুই নাহি মানে।

শিক্ষক ডাক্তার মিস্ত্রি নেতা
সকলে তা জানে ।
নাকের উপর বসে এসে
কানে ধরে টানে।

পড়তে লাগে সবার আগে সকলে তারে খোঁজে
চক্ষুর আড়াল হলে পরেই 
অভাবটা তার বুঝে।

বাবু বুড়ো জ্যাঠা খুড়োর
আদরের ধন
না পেলেই হাতের কাছে 
দিশেহারা হন।

দাদু,ঠাকুমার ভারী চশমা
হারিয়ে না যায় পাছে,
ফিতে লাগিয়ে যত্ন করে
 রাখে বুকের কাছে।

কল্যাণী ভট্টাচার্য

বিজয়ের মাস শ্রদ্ধার মাস

১৬ই ডিসেম্বর বিজয়ের দিন
বাঙালী জাতির স্মরণীয় দিন। 
দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে
হয়েছে জয়ী বাংলাদেশ। 
তাইতো মোরা করি স্মরণ
বিজয়ের দিন শ্রদ্ধায় ভালোবাসায়। 
প্রাণ খুলে মোরা গাই গান
মোদের বাংলা ভাষায়। 
মোরা গান গাই মুক্তিযোদ্ধার
গান গাই একাত্তরের মানবতার গান। 
ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে
করেছি বাংলা অর্জন। 
নিয়েছিল শপথ বাঙালী সেদিন
করিতে রক্ষা মোদের মাতৃভূমি। 
কত প্রাণ দিয়েছিল মা ভাই বোন
তবু মনে তে জেগেছে নতুন আশার ভোর। 
পাক হানাদার বাহিনী সেদিন করেছিল আত্মসমর্পণ
মা ভাই বোন করেছিল বাংলা জয়। 
অর্জিত হয়েছে মোদের 
লাল সবুজের পতাকা। 
তাইতো বিজয়ের মাস শ্রদ্ধার মাস
মোদের ভালোবাসার মাস।

গীতশ্রী ভট্টাচার্য্য

শরীর

ভোর ভোর উঠে রাই। রাতে ঘুম ভাল হয়েছে। ফ্রেশ লাগছে বেশ। পাশে এখনো অর্ক অঘোরে ঘুমোচ্ছে। হাসি পায় রাইর। সারারাত যা দাপাদাপি করেছে।নতুন  ঢুকেছে ওদের অফিসে অর্ক। প্রথম থেকেই রাইয়ের প্রতি লাট্টু। রাই ওর চেয়ে অনেক সিনিয়র। বয়সে এবং পদেও। তাও, ছেলেটির প্যাশন দেখে রাই ও একটু আধটু পাত্তা দেওয়া শুরু করেছে ইদানিং। 

রাই সিঙ্গেল। ছেলে আছে পাঁচ বছরের।  মায়ের কাছে থাকে। গুল্লু পেটে থাকতেই হিরনের সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। হিরণ আবার বিয়ে করে এখন একটি মেয়ের বাবা।  যাকগে, এসব নিয়ে কোনো মাথা ব্যথা নেই রাইর। নিজের জব , নিজের ছেলে এই ওর লাইফ। শনিবার মায়ের ওখানে চলে যায়, দুটি দিন ছেলের সাথে কাটিয়ে আবার সোম বার ফিরে আসা। এটাই রুটিন। 

অফিসে, অফিসের বাইরে অসংখ্য প্রেমিক ওর। রাই জানে সবগুলিই শরীরের প্রেম চায়। রাগ টাগ হয়না ওর। নিজের মত করে কাউকে ভাল লাগলে একটু ঘোরাফেরা, খাওয়া দাওয়া, নাইট পার্টি এসবে যায়। ইচ্ছে হলে শরীর দেওয়া নেওয়া। ব্যস্! এখানেই ইতি টানে ইমোশনের। 

আগে আগে বুঝতনা, সেন্টিমেন্টাল হত। প্রথম যখন ডিভোর্সের দু বছর পর অতীনের সাথে সেক্স হয়, সে ভেবেই নিয়েছিল ওকে ভালবাসে বলেই অতীন ওরকম করেছে। আর নিজেও সে অতিনকে পছন্দ করে। নইলে কী আর শরীর মিলে! মন না থাকলে শরীর হয়না। কত অবোধ ছিল তখন ভাবলেই হাসি পায় নিজের।

কিছুদিন আগে যখন মায়ের ওখানে গেল, মা কত কথা শোনাল। 

_ দেখ রাই, বিয়ে করে ওসব তোর যা খুশি কর। তুই কী ভাবিস আমি কোনো খবর পাইনা! তোর ওসব নষ্টামি কে সমাজ কী বলে, জানিস! 

ঠান্ডা গলায় জবাব দিয়েছিল রাই, 

_ জানি, বেশ্যা বলে। এটা নতুন কী! আর এতে আমার কিছু যায় আসেনা। তুমিও ভেবোনা এসব নিয়ে। 

_ ছি, ছি। গুল্লু বড় হলে ওকে কী বলবি তুই? কেমন মা রে তুই! মায়ের মুখের ওপর এসব নোংরা কথা বলতে তোর বাধলনা? 

_ যা বাবা, সত্যি বললেই দোষ। শোনো আমি গুল্লুর মা। ওকে আমি যতটা ভালবাসি কেউ বাসেনা। আশা করি বড় হলে সে নিজেও ওটা বুঝবে। মায়ের শরীর নিয়ে, চরিত্র নিয়ে ওর বলার কিছু থাকবেনা । এটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। 

অর্ক কে ঠেলে তুলে রাই। 

_ এই যে, উঠ বাড়ি যাও।আমার এখন অনেক কাজ। 

_ আরেকটু থাকি! আবদার করে অর্ক। 

- নো, রেডী হও আর ভাগো। আজ প্রজেক্ট টা যেন অবশ্যই জমা পড়ে। 

রাইর ঠান্ডা গলার কথা শুনে উঠে বসে অর্ক। ধীরে ধীরে তৈরি হয়ে বেরিয়ে যায়। 

সেদিকে তাকিয়ে রাইর মুখ থেকে বিচ্ছিরি একটি গালি বেরিয়ে আসে। 

এখন সে পুরুষদের মত সেক্স করে। যেখানে মনের কোনো কারবার নেই। ইচ্ছে হল তো যেকোনো মেয়ের সাথে ওরা ইচ্ছেমত সবকিছু করতে পারে। রাইর এখন আর আলাদা কোনো অনুভূতি হয়না। মেয়ে হয়ে জন্মেছে বলে কী ওর কোনো যৌনতার অধিকার থাকবেনা! আশ্চর্য তো! কারা ওকে বেশ্যা বলবে, হোর বলবে সেই ভয়ে নিজেকে বঞ্চিত রাখবে! আর যে পুরুষ বেশ্যা গুলো ওর কাছে আসে নিজের বউ বাচ্চাকে  ঘরে রেখে এদের কথা কে বলবে! শালা! 

এখন রাই শরীরের সাথে মন কে গুলিয়ে ফেলেনা। মনকে শক্ত করে আটকে রাখে নিজের কাছে। গুল্লুর কাছেই একমাত্র নিজেকে মেলে দেয় । বাকি সময় ওই খোলার ভেতরে যত্ন করে ভরে রাখে মন, ভালবাসা , অভিমান সবকিছু। 

নিজের ব্রেকফাস্ট তৈরি করে খেয়ে নেয় রাই। আজ অফিসে দুটো বড় মিটিং। ফিরতে দেরি হবে বুঝতে পারছে। বাইরে বেশ মিষ্টি রোদ উঠেছে। মেজাজটা বেশ ফুরফুরে লাগছে। 

ফ্ল্যাট লক করে বাইরে এসে গাড়িতে বসে রাই। চোখে সানগ্লাস তুলে দেয়। এখন গন্তব্য অফিস। 

কালো চশমার আড়ালে নিজের চোখের সমুদ্র লুকিয়ে নেয় রাই। রেডিওতে গান বাজে,

আমাদের গল্প গুলো....।

Dec 23, 2023

মিঠুন রায়

জন্মশতবর্ষে স্মরণ

 সমরেশ বসু: এক ব্যতিক্রমী কথাশিল্পী 

অপ্রতিরোধ্য কলমে বাংলা সাহিত্যে যিনি নিজের স্থান নিজেই প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি সমরেশ বসু । তাঁর জন্ম নাম সুরথ নাথ বসু । জীবনের প্রতি পদক্ষেপে অনিশ্চয়তা , দারিদ্র্য, তাকে বিধ্বস্ত করেছে বারবার ।কিন্তু পরাস্ত করতে পারেনি তাঁকে। বরাবরই মাথা উঁচু করে বাঁচতে  শিখেছেন । বলা যেতে পারে , জীবনের প্রতিকূলতা গুলিই তাঁকে শক্তি জুগিয়েছে।

  তিনি লিখেছেন একশোর বেশী উপন্যাস এবং তিন শতাধিক গল্প। অনেক ছোটগল্প লিখেছেন । তাঁর  রচনায় রাজনৈতিক কর্মকান্ড , শ্রমজীবী মানুষের জীবন এবং যৌনতা সহ বিভিন্ন অভিজ্ঞতার সুনিপুণ বর্ণনা ফুটে  উঠেছে।

  ১৯২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর ঢাকা শহরের রাজনগর গ্রামে জন্ম হয় সমরেশ বসুর । বাবা মোহনীমোহন বসু ও মা শৈবলিনী দেবী । পাঁচটি সন্তানের মধ্যে সমরেশ চতুর্থ । সদ্যোজাত এই চতুর্থ সন্তানের নাম রাখা হয় তড়বড়ি ।সব অংশের মানুষের সাথে সহজেই মিশে যেতেন এই বালক । প্রতিবেশীরাও তাকে খুব স্নেহ করতেন । বরাবরই ছিল নির্জনতা প্রিয় । নির্জনতার সন্ধানে চলে যেতেন শ্মশানে । স্কুলের গতানুগতিক শিক্ষা তার ভালো লাগত না । স্কুল ফাকি দিয়ে নানা রকম দুঃসাহসিক অভিযানে বের হতেন । তবে অবসর সময়ে প্রচুর গল্পের বই পড়তেন । ছবি আঁকার প্রতি প্রবল ঝোঁক ছিল । সমালোচক সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা থেকে জানা যায় সমরেশ বসু ভাল বাশি বাজাতে এবং গান গাইতে পারতেন । বালক সুরথ নাথের নাম সমরেশ দেন তাঁর বন্ধু ও শ্যালক দেবশঙ্কর মুখোপাধ্যায় । ১৯৩৯ সালে নৈহাটীর মহেন্দ্র স্কুলে ভর্তি হন  সমরেশ বসু । পরীক্ষায় ফেল করেন । এখানেই প্রথাগত শিক্ষার ইতি টানেন । কিছুদিন ঢাকেশ্বরী কটন মিলে কাজ করেন সমরেশ বসু । পরে আবার চলে আসেন নৈহাটীতে । 

  এক সময় কঠিন রোগে আক্রান্ত হন । বন্ধুর দিদি স্বামী পরিত্যক্তা গৌরী দেবী অসুস্থ সমরেশ বসুকে সুস্থ করে তোলেন । এই নারীই ছিল তাঁর প্রথমা স্ত্রী । চরম দারিদ্র্যতার জেরে এক সময় গরিফা থেকে ব্যারাকপুর পর্যন্ত সাহেবদের কোয়ার্টারে ডিম বিক্রি করে সংসার চালাতেন তিনি । এ সময় মার্ক্সবাদী ভাবধারার সাথে তিনি যুক্ত হন । ১৯৪৩ - ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত ইছাপুর বন্দুক কারখানায় চাকরি করেন তিনি । এই সময় পর্বে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েন । একসময় কারাবরণও করেন । জেল থেকে মুক্তি পাবার পর লেখাই হয়ে উঠে তাঁর নেশা । 

  আসলে জীবনে ব্যাপক অভিজ্ঞতা তাঁর সৃষ্টির পরিমাণকে বিশাল করে তুলেছে । ১৯৪৫ সালে প্রথম উপন্যাস 'নয়নপুরের মাটি' গ্রন্হাকারে বের হয় । পরবর্তী পর্যায়ে বের হয়েছে শ্রীমতী কাফে ( ১৯৫৬ ) , অমৃত কুম্ভের সন্ধানে(১৯৫৪ ) ,গঙ্গা ( ১৯৫৬ ) , শেষ দরবার ( ১৯৬৩ ) , স্বর্ণ পিঞ্জর ( ১৯৬৫ )।

    সমরেশ বসু প্রথমে গল্পকার , পরে ঔপন্যাসিক । মহাকালের রথের ঘোড়া , মানুষ শক্তির উৎস,যুগ যুগ জীয়ে, শেকল ছেঁড়া হাতের খোঁজে, তিন পুরুষ ইত্যাদি তাঁর লেখা রাজনৈতিক উপন্যাস । জগদ্দল , গঙ্গা , বাথান  ইত্যাদি গোষ্ঠী ভিত্তিক উপন্যাস । বিবর , প্রজাপতি , পাতক - এই উপন্যাস গুলিতে উচ্চবিত্ত শ্রেণীর সঙ্কট ও যৌনতার অনাবরণ প্রকাশ পেয়েছে । 

  তিনি রাজনীতি আশ্রিত উপন্যাস গুলিতে সমকালীন সমস্যা এবং শাশ্বত মূল্যবোধের মিশ্রণ ঘটিয়েছেন । মহাকালের রথের ঘোড়া তার লেখা অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস । এই উপন্যাসের নায়ক রুহিতন করছি । তার বাবা পোশপত কুরমি তরাইয়ের চা বাগানে চার পুরুষের মজুর । গল্পের শুরু থানার লকআপে রুহিতনের উপর চলছে অকথ্য অত্যাচার।নকশাল আন্দোলনের পটভূমিকায় ফুটে উঠেছে থানার উপর চলছে প্রচন্ড পুলিশি অত্যাচারের , নকশাল আন্দো রচিত এই কাহিনিতে লেখকের রাজনৈতিক দ্বিধার পরিচয় ফুটে উঠেছে রুহিতন চরিত্রে । আবার তিন পুরুষ উপন্যাসে দেখা যায় , সূর্যমোহন । সৌরীন , সুদীপ- তিন পুরুষ রাজনৈতিক জীবন থেকে রাজনীতিহীন জীবনের দিকে যাত্রা করছে । এই উপন্যাসের আর একটি চরিত্র সীতানাথ চরিত্রেও বিপ্লব সাধনার সঙ্গে মিশে গেছে রোমান্টিক স্বপ্নময়তা । 

  গ্রাম জীবনের পাশাপাশি নগর জীবনকেও খুব নিকট থেকে দেখেছেন সমরেশ বসু । তবে গোষ্ঠীজীবনের কথা লিখতে গেলে গ্রামই বার বার প্রাধান্য পায় । রাজনীতি ও গোষ্ঠী জীবন ওতোপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে  উত্তরঙ্গ উপন্যাসে । জগদ্দল উপন্যাসে পাওয়া গেছে অন্যতম জটিল রূপায়ণ । একজন কর্মচ্যুত বেকার শিল্প শ্রমিক গোবিন্দর স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গের কাহিনী ফুটে উঠেছে বি.টি রোডের ধারে উপন্যাসে । শিল্প শ্রমিকদের জীবনই এর মুখ্য বিষয় । টানাপোড়েন উপন্যাসে বিষ্ণুপুরের পাটরাঙাদের জীবনযাপনের ছবি পাওয়া যায় । ধনতান্ত্রিক সমাজে তাঁতী গোষ্ঠীর জীবন দৈন্যতার চিত্র অঙ্কিত হয়েছে - এই উপন্যাসে । আবার ছিন্নবাধা উপন্যাসের গ্রাম সমাজ ও শহরের শ্রমিক জীবনের চিত্র রূপায়িত করা হয়েছে । 'পদক্ষেপ' উপন্যাসে ইউনিয়ন আন্দোলনের স্বরূপ বর্ণিত হয়েছে । অনেকেই হয়তো জানেন না , যে জেলখানায় বসে সমরেশ বসু তাঁর প্রথম উপন্যাস ' উত্তরঙ্গ' রচনা করেন ।

    কালকূট শব্দের অর্থ বিষ । তিনি কালকূট ছদ্মনাম দিয়ে বেশ কিছু উপন্যাস লিখেছেন । অমৃত কুম্ভের সন্ধানে , কোথায় পাব তারে , ঐ সব উপন্যাসে তিনি কালকূট নাম ব্যবহার করেছেন । 'ভ্রমর' ছদ্মনামে লেখা তিনটি উপন্যাস – 'যুদ্ধের শেষ সেনাপতি ', 'হাতে তোমার রক্ত' , প্রেম - কাব্য রক্ত যথাক্রমে ১৩৮৯ , ১৩৯০ ও ১৩৯১ সালে প্রকাশ হয় । সমরেশ বসুর কালজয়ী জীবন কাহিনী থেকে প্রবাহ পত্রিকায় প্রকাশিত 'ভোট দর্পণ ' নামে রচনায় কালকূট নামটি ব্যবহার করেন ।

  ১৯৪৬ সালে পরিচয় পত্রিকায় আদাব গল্প প্রকাশ হয় । তার আগে স্বাধীনতা পত্রিকায় প্রকাশ হয় অন্যতম ছোটগল্প ' 'শের সর্দার '। এই সব গল্প তাঁকে ছোটগল্পাকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয় । অকালবৃষ্টি , ঋতু , মনোমকুর , পাহাড়ী ঢল , সুবর্ণা , বনলতা , মানুষ , চেতনার অনুকার , ধর্ষিতা , কামনাবাসনা ইত্যাদি তাঁর লেখা অন্যতম গল্প সংকল্পন। শিশু - কিশোরদের জন্যও তিনি অনেকগুলি গল্প - উপন্যাস লিখেছেন । তাঁর রচিত ছোটগল্পগুলি আমাদের মনে দোলা দেয়।যেমন- 'ফটিচার ' গল্পে আছে কয়েকটি রিক্সার মালিক আর শ্রমিক স্বার্থের লড়াই । শিশু শ্রমিকদের দৈন্যদশা নিয়ে লিখেছেন অন্যতম গল্প' নিষিদ্ধ ছিদ্র' ও 'পেলে লেগে যা' । এসমালগার ' গল্পে তেরো বছর বয়সী এক চোরাচালানকারীর কথা উল্লেখ রয়েছে । তাঁর লিখিত গল্প সম্পর্কে সুমিতা চক্রবর্তী মন্তব্য করেছেন যে,-' সত্তরের দশকের নকশালবাড়ি আন্দোলনের বিস্ফোরণের পর সেই বাস্তবতাবোধের অভিঘাত আত্মস্থ করে নিয়ে বাংলা সাহিত্যে যে একজন তরুণ গল্পকারের আবির্ভাব হয়েছিল , তাঁদের পূর্বসূরী ছিলেন সমরেশ বসু ।' 

   অন্যভাবে বলা যায়  উচ্চবিত্ত - মধ্য ও নিম্নবিত্তদের জীবনচিত্রের সঙ্গে সঙ্গে তথাকথিত ভদ্রলোক যারা নন , স্মাগলার , ওয়াগান ব্রেকার , পকেটমার , ডোম , গুনিন এদের নিয়েও অসংখ্য গল্প লিখেছেন তিনি । যেমন : সাধ গল্পের দেশে আছে গোপীনাথ নামে এক রিক্সাওয়ালা । 'মেঘলা ভাঙা রোদ 'গল্পে বিশু নামক এক ড্রাইভারের মানবিকতার কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে । 'খিঁচাকালা সমাচার' গল্পের কেন্দ্রবিন্দু এক পকেটমার । ওয়াগন ব্রেকার এবং সমাজবিরোধী ফটিককে নিয়ে লিখেছেন  আটাত্তর দিন পরে গল্পটি । ১৯৭৮ সালের এপ্রিল মাসে সমরেশ বসুর সাথে শান্তিনিকেতনে সাক্ষাৎ হয় ভাস্কর শিল্পী রামকিঙ্কর বেজের । তখন শিল্পী রামকিঙ্করের বয়স ৭২। তখন সমরেশ বসু জীবনী লিখবার তাগিদে তথ্যসংগ্রহ শুরু করলেও রামকিঙ্করের বৈচিত্র্যময় জীবন হয়ে ওঠে উপন্যাসের উপকরণ। লেখকের শেষ উপন্যাস দেখি নাই ফিরে । ১৯৮৭ সালের ৩ জানুয়ারি থেকে দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে । যদিও লেখকের আকস্মিক মৃত্যু উপন্যাসটিকে অসমাপ্ত রেখে ছিল । 

  ১৯৮৮ সালের ১২ মার্চ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন  সমরেশ বসু । 

  পরিশেষে বলা যায় , সমাবেশ বসুর সমস্ত রচনা , সব সাহিত্যকর্ম তাঁর জীবনযাপনের অঙ্গ । তাঁকে উৎকণ্ঠিত করে তুলত ব্যক্তির বিপণ্নতা । জন্মশতবর্ষে সৃষ্টিকর্মের আবহে - আবেগে - বিতর্কে বাংলা সাহিত্যে তাকে প্রাণবন্ত করে রাখা সত্যিই ভাববার বিষয় ।

সনজিৎ বণিক

সমরেশ

স্বয়ং বিষ্ণু স্বপ্নের পৃথিবীতে পদার্পন করেই চোখের জ্যোতিতে  ধারন করেছে তোমার আমার যাবতীয় মায়াজাল চূর্ণ অহংকার ও মনের সাধ আহ্লাদ যা জগৎ কে অলংকৃত করে শোভা বাড়ায়। 

চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে চোখ রেখে এঁকেছে জগতের সব মায়াজাল অন্ধবিশ্বাস আর ভুল চৈতন্যবলয়,

নগ্ন করে খুলে দিয়েছে হাজার দুয়ার সেখানে বসে মানুষ মানুষকেই করে অবহেলা ও তিরস্কার।

তাঁর কল্পজগতের আকাশে যিণি কালকূট  তাঁর বিচরণ যেন মানুষের শুদ্ধিকরণ,

তাঁর কলমের ভেতর থেকে কালির নির্যাস গ্রাম পাহাড় ও শহরজুড়ে এঁকে দিচ্ছে স্বপ্নের ভুবন যেখানে জীবিত ও মৃত মানুষেরা রোজদিন প্রার্থনা করবে দেবদেবতার।

শতবর্ষেও আজ মনে হয় হাজার দুয়ার সব খুলে যাচ্ছে সমরেশ এর কলমের প্রতিটি শব্দমালায়,ঘন আবেগে লেখা এ জগৎ ও  মানুষের বাকি সময় ভবিষ্যৎ  কথামালা আরো কতো কী।

শুভ্রা দেব

হিমঘর
        
একঘেঁয়েমি গন্ধ শুঁকে
বেমালুম ইচ্ছেরা জট বাঁধে,
ফেলে আসা ভুলের ভারে
নতজানু হয় তর্জনীর শিষ!
 
হিমঘরে গলনাঙ্কের প্রহর গোণে...
বরফ জমানো অফুরন্ত স্বপ্নরাশি,
দু'ফোঁটা নোনাজল শুকিয়ে
ভাব জমায় সুদূর বাতাসে।

শর্মি দে

বাংলার সুকুমার

শুরু হলো 'আবোলতাবোল'
কত 'ছবি ও গল্প' কত গোলমেলে গোল 
'ওবাবা!' 'খিচুড়ি' খেয়ে 'কাঠবুড়ো'টা বলে
 'গেলুম গেলুম, আমায় ধরে তোল!'
এবার গেলো দেখতে ভালো
'সৎপাত্র' যে বেজায় কালো...
উনিশ বারেও করে না পাশ
গঙ্গারামের মন উদাস!
'কাতুকুতু বুড়ো' এবার 'চিমটি কাটে ঘাড়ে' 
করে তোড়জোড় 
'ভালরে ভাল' ভাবতে ভাবতে 
খেলো আবার হোঁচট, 
'পাউরুটি আর ছোলা গুড়'!
এবার ছোটে 'কুমড়ো পটাশ'
নেচে কেঁদে হেসে
আলতা গুলে লাগায় ঠোঁটে 
যাচ্ছে সে বুড়ীর বাড়ি 
থামবে না সে মোটে!
এবার পথে পায় দুটো সাপ
টগবগে জ্যান্ত
কেঁপে বলে ক্ষমা কর বাপরে বাপ
তবুও সাপ হয়না যে ক্ষান্ত!
"ও সুকুমার ও সুকুমার" ডেকে বলে হ্যাংলায়,
ভেঙে যায় ঘুম সুকুর, পড়ে আছে বাংলায়!

সপ্তমিতা নাথ

 শিশুকবি সুকুমার 

উপেন্দ্র পুত্র "ও সুকুমার" ,
রেখে গেছো কত সাহিত্যের সমাহার।
জন্মেছ তুমি স্বর্ণযুগে,
বাঙালির নবজাগরণে ।
পরিবেশ ছিল সাহিত্য অনুরাগী,
পরিবার ছিল নামকরা চৌধুরী।
শিশু সাহিত্যিক-ছড়াকার , প্রাবন্ধিক-নাট্যকার --
সবেতেই তুমি সেরা তুমি বিজয়ী।
প্রভাবিত তুমি পিতা সহ রবীন্দ্রনাথ দ্বারা --
 বেষ্টিত ছিলে প্রফুল্ল চন্দ্র রায় ও জগদীশচন্দ্র ,সবাই বিদুষী।
 কলম তোমার ধারালো অস্ত্র  আজও শ্রেষ্ঠ,
 তাই 'ননসেন্স' বিশ্বে  আজকেও বেষ্ট সেন্স।
 সাহিত্যই নয় দর্শনেও চরাচর, তুমিও ব্রাহ্মসমাজের সংস্কারপন্থী,
মত দর্শাতে হিন্দুত্বের, রচনা 'অতীতের কথা' হে বিশ্বাসী একেশ্বরবাদী।
 সাইত্রিশ বছরের স্বল্প আয়ু, যুগান্তরের বিশদ সৃষ্টি ,
বিশ্বপরিচিত শিশু সাহিত্যিক, চিরঅম্লান তোমার সৃষ্ট সংস্কৃতি ও বৃষ্টি।

কল্যাণী ভট্টাচার্য

শ্রদ্ধায় স্মরণে

শৈবলীনি দেবী মাতা পিতা মোহিনী মোহন। 
গরীব ঘরে জন্ম তোমার তুমিই তো সমরেশ। 
বাবা মায়ের অষ্টম সন্তান তুমি প্রখ্যাত বাঙালি লেখক। 
পড়াশোনা ছিল না তেমন কলম ছিল ক্ষুরধার। 
জন্ম তোমার ঢাকা জেলার মুন্সিগঞ্জের রাধানগর। 
১১ই ডিসেম্বর (১৯২৪) শুভ জন্মদিন। 
জন্মলগ্নে নাম তোমার সুরথ নাথ বসু। 
পরম শ্রদ্ধায় জানাই তোমায় শতকোটি প্রণাম। 
বিদ্যা বুদ্ধিতে প্রখর তুমি ক্ষিপ্রতা কাজে। 
ধন্য তোমার পিতামাতা ধন্য মোদের ভারত। 
কঠোর জীবন সংগ্রামে তোমার
হয়েছে সাহিত্য সৃষ্টি। 
ব্যাতিক্রমী লেখক তুমি ব্যাতিক্রমী চরিত্র। 
বামপন্থী ছিলে বলে হয়েছিল কারাবাস। 
জীবন টানা পোড়েনের মাঝে ব্যাতিক্রমী কালজয়ী উপন্যাস। 
জাগতিক প্রেম এসেছে তোমার জীবনে বহুবার। 
দ্বিধাহীন চিত্তে করেছ গ্রহণ ভাবনি একবার। 
ফিরে এসো দেখব তোমায় এ ধরায় একবার। 
আজও তোমায় রেখেছে মনে ভারতবাসী সবাই।

সুমিতা চৌধুরী

চির সমর বিজয়ী যোদ্ধা

জীবনের তীব্র হলাহল পান করে হয়েছিলে কালকুট,
তবু থামাওনি অমৃত কুম্ভের সন্ধানে তোমার অভিযান। 
সমাজের অলিগলির যতো  বিবর, তাকে সর্বসমক্ষে এনেছিলে বাস্তবিক নগ্নতায়,
তাই বিতর্ক তোমার পিছু ছাড়েনি আজীবন। 

তবু, এতোসবের মধ্যেও যত্নে লালন করতে এক চিরসবুজ মন,
তাই তোমার গোগোল আজও শিশু-কিশোরের দোসর। 
তোমার এক ভ্রমণপিপাসু মন বেদুইন হতো পথের ফেরারী ডাকে,
চোখ-মনের সে আয়নার প্রতিফলন ঘটতো তোমার সোনার কলমে।

কর্মজীবনের প্রথমেই সর্বসাধারণের অধিকারের দাবীতে হয়েছিলে সোচ্চার, 
বরেছিলে কারাবাস নির্দ্বিধায়। 
ফিরেছিলে কলমকে হাতিয়ার করে এক নতুন জীবন যুদ্ধে,
আপন নামকে স্বার্থক করে হয়েছিলে সকল সমর বিজয়ী সমরেশ।

 জীবনের পথে ভ্রমর হয়ে প্রেম রসেরও করেছিলে বুঝি রসস্বাদন,
উপন্যাসের পাতায় ফুটে উঠেছিল তারই নির্যাস।
আবার কোথাও তোমার নিজস্ব মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা ফুটে উঠেছিল লেখনীর ছত্রে-ছত্রে,
দেশভাগ, দাঙ্গা, উদ্বাস্তু জীবনের বিভীষিকাময় অধ্যায়  প্রোথিত করেছিলে আপামর বাঙালির মন ভাবনায়।

আজীবনের নিরলস সংগ্রাম চালিয়েছিলে দৃঢ় আত্মবিশ্বাসে, 
দাঁতে দাঁত চেপে।
তবু মনোবল কখনো টলেনি এতোটুকু,
তাই তো তুমি সব সমর বিজয়ী এক নির্ভিক সৈনিক।

তোমার শাণিত কলমে তুমি আজও অপরাজেয়, এক ধ্রুবতারা। 
যে আজও পথ দেখায়, ভাবায়, আগামী প্রজন্মকেও আপন চিন্তাধারার পরিসরে।
তাই তো তুমি প্রণম্য, আপামর বাঙালি সভ্য সমাজের, 
আজও শতবর্ষ পরেও ভীষণ প্রাসঙ্গিক, সজীব, আপন উন্নত চেতনা ধারার আঙ্গিকে।।

পাপিয়া দাস

মাপকাঠি 

তোমার  আমার  ভালোবাসা 
যেন বহুদিনের।
তোমার  আমার  মনের মিল 
যেন যুগ যুগান্তরের।
আমার  জীবনে তোমায় পেয়ে
আমি হয়েছি ধন‍্য।
তুমি আমার  প্রাণের পুরুষ 
আমার  প্রিয় বলে গন‍্য।
সংসারেতে যতো আসুক বাধা
দুজনে  মিলে ঘুচাব, আছে নিশ্চয়তা।
 আমাদের  ভালোবাসার মাঝে
আছে  বিশ্বাস আর সরলতা।
তোমার  ভালোবাসায় বেঁচে আছি
জীবন হয়েছে রঙীন।
এভাবে বিশ্বাসে জড়িয়ে তুমি
চিরকালের ভালোবাসার হও সঙ্গীন।

মীনাক্ষী চক্রবর্তী সোম

অসমাপ্ত রয়ে গেল

দুর্দান্ত সময় ঘিরে বিবর আর প্রজাপতির হাতছানি
প্রাপ্তবয়স্ক হওনি বলে অহরহ বড়দের শাঁসানি,
ওদিকে অকুতোভয় ভ্রমর তখন কালকূটের দোসর।
শ্লীল-অশ্লীলকে তুড়ি মেরে ধূলিসাৎ করার 
মনন বোধ আর বেপরোয়া কলম যাঁর,
সতের বছরের আইনি যুদ্ধ শেষে 
অদম‍্য সেই আখরচাষীরই জয়জয়কার।
নির্যাতিত নিরন্নের মুখের ভাষায়
নেতি নেতি দুর্বিষহ জীবন থেকে নিংড়ে নির্যাস  
অমৃতকুম্ভের সন্ধানে অক্লান্ত এক যাত্রা
মন্থন শেষে লিখে রাখা অবিরত অন্বেষণ।
খ‍্যাপা হয়ে তাঁরেই খোঁজে বাউলমন
উত্তরঙ্গ থেকে নয়নপুরের মাটি ছুঁয়ে 
অসমাপ্ত রয়ে গেল 'দেখি নাই ফিরে'।।

অভিজিৎ দত্ত

লেখক সমরেশ বসু 

গল্প,উপন্যাস লিখে 
যিনি হয়েছিলেন বিখ্যাত 
তার আসল নাম সুরথনাথ বসু হলেও 
সমরেশ বসু নামেই তিনি ছিলেন 
সবার কাছে পরিচিত। 
জন্মেছিলেন অবিভক্ত বাংলার 
ঢাকার বিক্রমপুরে 
পরবর্তী তে তিনি চলে আসেন 
পশ্চিমবঙ্গের কোলকাতার নৈহাটিতে
দাদার কাছেতে।
লেখক সমরেশ বসুর জীবন 
 ছিল অনেক সংগ্রামে ভরা 
কমিউনিস্ট পার্টি করার অপরাধে 
যেতে হয়েছিল জেলখানা। 
তার প্রথম উপন্যাস, উত্তরবঙ্গ 
সেখানেই করেছিলেন রচনা।
গল্প, উপন্যাস লেখায় 
তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত 
কালকূট, ভ্রমর ছদ্মনামে তিনি 
লিখেছিলেন অনেক উপন্যাস 
নিজের মনের মত।
গোয়েন্দা গোগোলকে নিয়ে 
লিখেছিলেন বহু ছোটগল্প 
যা তাকে শিশুসাহিত্যে 
করেছিল বিশেষভাবে  জনপ্রিয়।
১৯৪২ এ বামপন্থী রাজনীতির
 সঙ্গে হন তিনি পরিচিত 
এর সংস্পর্শে এসে তিনি হন 
স্বশিক্ষিত ও উন্নত। 
ছোটবেলা থেকেই তার জীবন 
ছিল সংগ্রামে ভরা 
করতে হয়েছে বিভিন্ন কাজ 
মাথায় সবজি ও ডিম নিয়ে ফেরি করা।
শাম্ব উপন্যাস সৃষ্টির জন্য 
সাহিত্য আকাদেমী পুরস্কারে 
তিনি হন সম্মানিত। 
এছাড়াও নানা পুরস্কার পেয়ে 
তিনি হন বিখ্যাত। 
শতাধিক উপন্যাস ও ছোটগল্পের রচয়িতা 
কী অসাধারণ ছিল তার জনপ্রিয়তা
১৯৮৮ সালের মার্চ মাসে 
মহাপ্রয়াণ ঘটেছিল তার এই পৃথিবী থেকে।
এ বছর তার শততম জন্মদিবসে 
তাকে শ্রদ্ধা জানাই অন্তর থেকে।

পূজা মজুমদার

প্রিয় সমরেশ  

তুমি  ছিলে  বলে  জানতে  পারলাম
প্রজাপতি উপন্যাস,
তুমি  ছিলে বলে  জানতে পারলাম মহাকালের  রথের  ঘোড়া, 
তুমি  ছিলে বলে জানতে পারলাম  গঙ্গা, 
তুমি ছিলে বলে জানতে পারলাম  সওদাগর, 
তুমি  ছিলে বলে জানতে পারলাম  'বিবর'
তুমি ছিলে বলে জানতে পারলাম নয়নপুরের  মাটি, 
তুমি  ছিলে বলে জানতে পারলাম মুক্তবেণীর  উজানে।

বৈশালী নাগ

কবি সমরেশ বসু

বিক্রমপুরে জন্ম এই প্রখ্যাত ভারতীয় লেখকের নামটি তার সমরেশ বসু,
ছোটবেলা কাটে তার অসীম দারিদ্রতায় ডিম ফেরি করে,
কালকুট, ভ্রমর নামেই তার লোকো পরিচিতি;;
ছোটগল্পের সংখ্যা তার অনেক, শ্রমজীবীদের নিয়ে ছিলো তার অভূতপূর্ব লেখনশৈলী,
সাহিত্য একাডেমিতে পুরস্কারপান উনি,
১৯৮৮ সালের ১২ মার্চ নক্ষতের হয় পতন,
শতকোটি প্রণাম জানাই আজ এই সাহিত্যের চরণে।

Dec 1, 2023

অসীম পাঠক

সহযাত্রী

(নাটক না বলে কথোপকথন না বলে একে বলি জীবনের একটুকরো ছবি)
চরিত্র - অংশুমান ও দীপান্বিতা
 হাওড়া স্টেশনে হেমন্তের গোধূলি বেলায়  রাজধানী এক্সপ্রেসের  কম্পার্টমেন্টে দুজনের দেখা বারো বছর পর .... 
অংশু - অবশেষে রেল গাড়ির হঠাৎ দেখাটা হয়েই গেলো , ভাবিনি সম্ভব হবে কোনোদিন তা ম্যাডাম  কতদূর তোমার গন্তব্য ?
দীপা - দিল্লি , তুমি ? 
অংশু- কানপুর , একটা সেমিনার আছে।
দীপা - আর তো এগারো বছর আটমাস বারোদিন চাকরি , তাই না ? 
অংশু - বাপরে বরাবরই তোমার স্মৃতিশক্তি প্রবল , এতোটা মনে আছে ? 
দীপা- ঘোরো টো টো করে আর কটা বছর , আফটার রিটায়ার্ড মেন্ট কি করবে ? 
অংশু - ফার্ম হাউস ,গাছপালা পশুপাখি  নিয়ে থাকবো।
দীপা- বাঃ উন্নতি হয়েছে। যে অংশুবাবু কখনও একটা ফুলের চারা লাগায়নি সে কিনা ফার্ম হাউস করবে ... 
অংশু - সময়ের সাথে সব বদলায় ম্যাডাম , আচ্ছা তোমার কনুইয়ের নীচে সেই পোড়া দাগটা দেখি তো গেছে কিনা ... 
দীপা- তুমি অনেক রোগা হয়ে গেছো , তা ওজন কত শুনি ? 
অংশু -  সত্তর বাহাত্তর হবে বোধহয় মাপিনি, 
দীপা - তা কেনো মাপবে ? একটা অগোছালো মানুষ।
অংশু - যাক বাবা তাও অপদার্থ শব্দ টা বলোনি। 
দীপা - ভাবোনা ডিভোর্স হয়েছে বলে সে অধিকার নেই।  সমাজ বিজ্ঞানের অধ্যাপক হয়েও আসলে সমাজটাই শেখোনি , আর কি শিখেছো বলো, ঐ ছেলে পড়ানো , সেমিনার আর লেখালেখি। তা ধন্যবাদ তোমার রূপালী ঠৌট উপন্যাস এবছর একাডেমি পেলো , দারুণ লেখো তুমি, আগের চেয়ে অনেক ধার। 
অংশু- বাঃ তুমি পড়েছো ? 
দীপা- সব পড়েছি , তোমার রিসেন্ট উপন্যাসের নায়িকা মেঘনা টি কে ? মানে কার আড়ালে কাকে লিখেছো ? 
অংশু - এও কি বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপিকাকে বলে দিতে হবে ? 
দীপা- বারোটা বছর সময়ের শাসনে অনেক বদলালেও আমি বোধহয় সেই বড্ড সেকেলেই রয়ে গেলাম। 
অংশু - একা একাই কাটিয়ে দিলে বারো বছর। 
দীপা- একই প্রশ্ন আমিও করতে পারি। 
অংশু - আচ্ছা দীপা আজ না হয় শেষবারের মতো বলি,  আমার মধ্যে কি ছিলো না বলোতো ? কেনো পারোনি এই বাউন্ডুলে ভবঘুরে মানুষটার সাথে চিরকালের ঘর বাঁধতে ? আমি কি ভালোবাসতে জানি না ? 
দীপা- এসব প্রশ্ন আজ অবান্তর। আমাদের মিউচুয়াল সেপারেশনের এই বারো বছরে বাউন্ডুলে অধ্যাপক ডক্টর অংশুমান সান্যাল একবারো আমার দরজার কড়া নাড়েনি। বেশতো আছো তুমি , ঘুরছো ফিরছো সুন্দরী তন্বী ষোড়শী ছাত্রীদের নিয়ে সেলফি তোলো , প্রেমের গল্প লেখো .... 
অংশূ - আর বিরহের কবিতা সে কি তোমার অজানা ?  তোমার গান শুনলাম সেদিন ফেসবুক লাইভে।  গোটা স্ক্রিন জুড়েই প্রজাপতির মেলায় তোমার উজ্জ্বল উপস্থিতি , কি সুন্দর গাইলে সেদিন , আমার পরান যাহা চায় তুমি তাই ... 
দীপা - এই একদম ফোলাবেনা।  আরে মাফলারটা জড়াও গলাতে , ঠান্ডা লাগবে। মোজা পরেছো? এই আমি জানতাম স্যান্ডেল পরে থাকবে , ওঃ কি যে করি । ঠান্ডা লাগবে , বুকে সর্দি জমবে। বয়সটাতো আর কম হলো না। 
অংশু - হ্যাঁ ওই বিকেলে ভোরের ফুল , মরার আগে দপ করে জ্বলে ওঠার মতো তোমাকে এই দুরন্ত ট্রেনে পাওয়া । সেই রবী বাবু মরেও মরে না। 
দীপা- এই আমার প্রথম প্রেমকে নিয়ে একদম কথা বলবেনা। রবিবাবু ইজ দা বেস্ট , এভারগ্রিন লাভ। 
অংশু - তা দিল্লি কি কাজে ? 
দীপা - কেনো বেড়াতে , ওখানে বয় ফ্রেন্ড আছে যদিও আমার চেয়ে সে দশ বছরের ছোট। 
অংশু - চোখের কোনে কালি আর রঙ করা চুল নিয়ে আর প্রেম করতে হবে না। বুড়ি কোথাকার। 
দীপা-  এই খবরদার , একদম বুড়ি বলবে না। 
অংশু - হ্যাঁ তো বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা আর তুমি ছুঁলে ছত্রিশ ঘা , তার জীবন তেজপাতা। 
দীপা -  আহা রে , তাই তো কাঁচা কার্তিকের মতো সঙ সেজে নেচে বেড়াচৃছো। 
অংশু -  এসো না পাশাপাশি বসি , কম্পার্টমেন্ট তো ফাঁকাই। 
দীপা - না বাবা , মুখোমুখি বেশ আছি। অসহায় প্রহরে অসহ্য লোকটার সাথে কয়েক ঘন্টা , কি কুক্ষনেই যে দেখা হলো ... 
অংশু - প্রহর শেষের আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্র মাস, তোমার চোখে দেখেছিলেম আমার সর্বনাশ। সেদিন ও ছিলো চৈত্র সন্ধ্যা। এরকম সূর্যাস্তের মায়াবী আলোয় শিলাবতীর তীরে তোমাকে দেখেছিলাম। 
দীপা - তারপরেই প্রবল সুনামি , ভালোবাসার কালো মেঘ ঘিরে ধরলো আমাকে। সব হিসাব ওলোটপালোট হয়ে গেলো। তুমি আর ভালোবাসার লোক পেলে না ? 
অংশু - তুমি ই তো আমাকে চেনালে জীবনকে নতুন করে। তুমি পরশ পাথর। তাইতো ছেড়ে দেবার এক যুগ পরেও অভিশপ্ত জীবনের সব কটা অধ্যায় জুড়ে তোমার ভালোবাসা নিয়ে আমার বেঁচে থাকা। 
দীপা -  কি ভাবো আমি কি এতোই বোকা। এটুকু বুঝি তুমি আমাকে কখনও ভোলোনি। তাইতো তোমার লেখায় নিজেকে খুঁজে পাই। তরুনী দীপার আলোমাখা স্বপ্ন কে নতুন করে আবিষ্কার করি।  আমার বিরহে তোমার লেখা যেনো জেগে উঠে , ইতিহাসের পাতায় সোনালী অক্ষর জুড়ে ডক্টর অংশুমান সান্যাল বেঁচে থাকবে ভালোবাসার নতুন সমীকরন নিয়ে। 
অংশু -  চলো না আবার শুরু করি এই পড়ন্ত বেলায় নতুনের আবাহনে নতুন করে সানাই বাজুক। আমি ক্লান্ত বিধ্বস্ত বিপর্যস্ত। আমি হেরে গেছি দীপা আমার নিজের কাছে। 
দীপা - তা আর হয়না স্যার , এই দূরেই ভালো। তোমাকে যে আরও নতুন করে লিখতে হবে চেনা জীবনের অচেনা গল্প। আমাদের বারো বছর এক ছাদের নীচে কাটানোর পরের বারো বছর একাকীত্বের মধ্যে নির্জনতায় মোড়া শান্তি খুঁজেছি আমরা , তুমি কি পেমেছো জানি না , তবে আমি পেয়েছি তোমাকে , হ্যাঁ তোমাকে নতুন করে। 
অংশু - সত্যিকারের প্রেম মেয়েদের কাছে এক পরম আবিষ্কার। তা সেই দুর্লভ আবিষ্কার যখন হয়ে গেছে তখন আর দেরি কেনো , এসো আমার জীবন মরুভূমির বুকে মরুদ্যান হয়ে। 
দীপা-  পারিনি অংশু , কিছুই তো পারিনি, তোমার জীবনে এসে তোমার স্বপ্ন গুলোই যখন পূরন করতে পারিনি সহধর্মিণী হয়ে তখন আমার থাকা আর না থাকাতে কি এসে যায় । 
অংশু - বুঝতে পারছি তোমার উপর অবিচার হয়েছে , কিন্তু আমি কি একবারও আঙ্গুল তুলেছি , বলেছি যে তোমাকে নিতে পারছি না আর। আমার উজাড় করা ভালোবাসা দেবার পরেও অভিমান নিয়ে চলে গেলে ? একবারও ভাবলে না তো কি করবো আমি , একটা অসহায় মানুষ .... 
দীপা - যাক বাবা এসে তো ভালোই হয়েছে, কিছুটা স্বাবলম্বী তো হয়েছো । আর ... না থাক। চলো কিছু খেয়ে নাও , খাবার আছে আমার সাথে , ট্রেনের খাবার তো শরীর খারাপ করবে তোমার। 
অংশু - কয়েক ঘন্টার জন্য আর অভ্যাস বদলে কি লাভ .... জানো পুরো কম্পার্টমেন্ট জুড়েই তোমার টিফিন বক্সে রাখা বিরিয়ানির সেই গন্ধটা পাচ্ছি।  রন্ধন পটীয়সী আমার বউ এর নাম্বার ওয়ান রান্না কেও একবার খেলে ভুলে না। 
দীপা- প্রাক্তন বউ বলো। 
অংশু- সব প্রাক্তন হয়না। 
দীপা - হুম 
অংশু- নিজেকে বারবার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে জানিনা কি পাও বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপিকা ডক্টর দীপান্বিতা সান্যাল। 
দীপা- আবারও ভুল , দীপান্বিতা মুখার্জি বলো। 
অংশু - যদি জোর করে বুকে মিশিয়ে নিতে চাই। 
দীপা - কে আপত্তি করেছে আপনাকে? তা এই যে বীর পুরুষ বারো বছরে অনেক বীরত্ব দেখালেন , এখন এটুকু না হলেও নাটক জমবে। 
অংশু - দীপা আমাদের সন্তান না হওয়া বলো, আমার পরিবারের মানসিক নির্যাতন বলো , আমার উপেক্ষিত ভালোবাসা বলো , যাই বলো, তোমার না থাকা এই বারো বছরে আমি তোমাকে প্রতি মুহূর্তে আমার অনুভবে পাই। কলেজ থেকে ফেরার সময় , সেমিনারে , লেখার টেবিলে এমনকি পুরষ্কার নেবার মুহূর্তে তোমাকে ই পাই , তাই তো সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছি.... 
দীপা - হ্যাঁ শুনেছি তোমার সব প্রেরনা তোমার আলো। তোমার দেওয়া ওই নামটা আমার মনের গভীরে বাজে । কতদিন কেও ডাকেনি আলো বলে। 
অংশু - সে কি ডাকি তো , প্রতি মুহূর্তে আমি। তুমি শুনতে পাওনা তোমার দোষ। 
দীপা - সব দোষ তো আমার। (সহসা গেয়ে ওঠে)
' গগনতল গিয়েছে মেঘে ভরি, বাদলজল পড়িছে ঝরি ঝরি। এ ঘোর রাতে কিসের লাগি পরান মম সহসা জাগি এমন কেন করিছে"  ...
অংশু- আজো মুগ্ধ বিস্ময়ে তোমার গান শুনি। কি দরদ দিয়ে গাও তুমি।  দূরে যাবে তুমি নামতে হবে আমাকে পরের স্টেশনেই , 
দীপা - মুখোমুখি একখানা কবিতা শুনিয়ে যেও। এটুকুই আঁজলা ভরে তুলে রাখি না হয় বাকি দিন মাস বছরের জন্য। 
অ‌ংশু - সমাজ বিজ্ঞানের এই জংলী অধ্যাপককে তুমি পরিপূর্ণ মানুষ করেছো , সফল লেখক করেছো তোমার নীরব ভালোবাসা আহুতি দিয়ে ।
আমি নিশি – নিশি কত রচিব শয়ন
আকুলনয়ন রে !
কত নিতি – নিতি বনে করিব যতনে
কুসুমচয়ন রে !
কত শারদ যামিনী হইবে বিফল ,
বসন্ত যাবে চলিয়া !
কত উদিবে তপন আশার স্বপন ,
প্রভাতে যাইবে ছলিয়া !
এই যৌবন কত রাখিব বাঁধিয়া ,
মরিব কাঁদিয়া রে !
দীপা-  "বড়ো বেদনার মতো বেজেছ তুমি হে আমার প্রাণে, মন যে কেমন করে মনে মনে তাহা মনই জানে  তোমারে হৃদয়ে ক'রে  আছি নিশিদিন ধ'রে,  চেয়ে থাকি আঁখি ভ'রে মুখের পানে॥"
অংশু - প্রবল ভালোবেসে , ভালোবাসার অভিকর্ষজ আকর্ষণ তোমাকে বিকর্ষন করলো দীপা। সব যন্ত্রণা সব কষ্ট একা নিয়ে নীলকন্ঠ হয়ে পাড়ি দিলে দ্বীপান্তরে । আর আমি তোমার চুলের গন্ধমাখা বালিশ আঁকড়ে বারো বছর ধরে খুঁজে চলেছি তোমার ভালোবাসার ফল্গুধারা। 
দীপা - সেই যে বার আমরা হিমাচল প্রদেশ গিয়েছিলাম তোমার মনে আছে , ওখানে পাহাড়ের ওপরে রাজা রানীর পোশাকে যে ছবিটা তুলেছিলাম সেটা আজো আমার ড্রইং রুমে সযত্নে সাজানো। 
অংশু - কতবার তোমার ফ্ল্যাট যেতে চেয়েও যাইনি। চাইনি তোমার তপস্যা ভাঙাতে। আজ যখন সহযাত্রীর লিস্টে তোমাকে পেয়েছি , দেখো তুমি চলে যাবার তিনমাস আগে বলেছিলে , পরের পৌষ মেলায় একটা বাঁশি এনো। বারোবছর পর এই নির্জন কামরায় নিস্তব্ধ আকাশ সাক্ষী রেখে দিলাম সেই বাঁশি। 
দীপা - তোমার চোখের জল মোছো তো আগে। কি যে করি এই ইমোশনাল টাকে নিয়ে। কা ভাবো তুমি একাই সহযাত্রীর লিস্ট দেখো , আমি বুঝি দেখিনা , এই নাও , আট বছর আগে কাশ্মীর গিয়েছিলাম।  কথা ছিলো কখনো একসাথে যাবো । হলো না , একাই গেলাম শপিং করলাম তোমাকে ছাড়াই। কি আশ্চর্য একবারো মনে হয়নি তুমি নেই। কালো বড়ো ডায়ালের ঘড়িটা তোমার ভেঙে ফেলেছিলাম আমিই । ওরকম একটা পেয়ে গেলাম। আমার ঋন শোধ , কি বলেন অধ্যাপক সাহেব। 
অংশু - তোমার ঋনশোধ কি কখনো হয় বলো ? 
  (দীর্ঘ নিরবতা ছেয়ে যায় গোটা কামরা জুড়ে)
দীপা - এই যে মহাদেবের ধ্যান ভাঙলে খেয়ে নেবেন আর নিজের খেয়াল রাখবেন। 
অংশু - এসো না এই একটা ঝড় গতির রাতের বাকি টা আমরা চোখ চোখ রেখে একটা গেম খেলি, যার চোখের পাতা আগে বন্ধ হবে সে হারবে , আর যে জিতবে সে যা চাইবে দিতে হবে। 
দীপা - যাকে সঁপেছি প্রান মন তাকে আর কি দেবো এই অবেলায় । 
অংশু - তবু তোমাকে ভালোবেসে
মুহূর্তের মধ্যে ফিরে এসে
বুঝেছি অকূলে জেগে রয়
ঘড়ির সময়ে আর মহাকালে যেখানেই রাখি এ হৃদয় ।
দীপা - হেঁয়ালি রেখো না কিছু মনে;
হৃদয় রয়েছে ব'লে চাতকের মতন আবেগ
হৃদয়ের সত্য উজ্জ্বল কথা নয়,-
যদিও জেগেছে তাতে জলভারানত কোনো মেঘ;
হে প্রেমিক, আত্মরতিমদির কি তুমি?
মেঘ;মেঘ, হৃদয়ঃ হৃদয়, আর মরুভূমি শুধু মরুভূমি..

ভবানী বিশ্বাস

শান্ত

সূর্যাস্ত দেখলে ভাবি,
বিচ্ছেদ কত রঙিন হয়! 

কান্না পায়, কাঁদি--
রক্ত জলাকারে বেরোলে
হালকা হয় মানুষ... 

প্রেম আর বিচ্ছেদের মাঝের
মূল শব্দটিই বেঁচে থাকা-- 
প্রেমিক এভাবে বেঁচে থাকতে থাকতে
একদিন শান্ত হয়ে যায়... 

পান্থ দাস

ঘুম- একটি পর্যটন কেন্দ্র 

ঘুম ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলায় অবস্থিত একটা পাহাড়। পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম পাহাড়ি পর্যটন কেন্দ্র দার্জিলিঙের লাগোয়া ঘুম পাহাড় হল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জমজমাট একটা হিল স্টেশন। দার্জিলিঙ যাবো আর ঘুম ভ্রমণ করবো না, এমনকী আর হয়। এর উত্তরে দার্জিলিং, দক্ষিণে কার্সিয়াং, পূর্বে তিস্তা তথা কালিম্পং এবং পশ্চিমে সুখিয়াপোখরি। 

একঝাঁক আনন্দ আর ভ্রমণ পিপাসু মন নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম ঘুম ভ্রমণে । ভারতের উত্তরপূর্ব সীমান্ত রেলপথের একটা শাখা শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং রুটের মধ্যে পড়ে ঘুম রেলস্টেশন। এই ঘুম রেলস্টেশন হল পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে উঁচু রেলস্টেশন। শুধু তাই-ই নয়, এই রেল পরিবহন ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের অন্তর্ভুক্ত। কাছাকাছি আছে মনোরম পাহাড়ি সৌন্দর্য উপভোগ করার জায়গা 'বাতাসিয়া লুপ'। সারা পৃথিবীর পর্যটকদের কাছে ঘুম রেল স্টেশন অন্যতম আকর্ষণ।

 ঘুম রেল স্টেশন থেকে আরও ওপরে উঠলে পেয়ে যাবেন ঘুম বয়েজ হাই স্কুল। এই স্কুলের খেলার মাঠে পৌঁছালে মনে হবে পৃথিবীর ছাদে দাঁড়িয়ে আছেন! দার্জিলিং থেকে কালিম্পং, টাইগার হিল, সুখিয়াপোখরি, মিরিক, সান্দাকফু, বিজনবাড়ি যেখানেই যান-না-কেন, ঘুম পাহাড় ছুঁয়েই যেতে হবে, এই ঘুম হল একটি জংশন হিল স্টেশন। 

যাই হোক ঘুম ভ্রমণের এই সুখদ স্মৃতি মনের এক কোণে গাঁথা থাকলো ।