ফুলবানু
মা,ওমা খিদে লাগছে! কান্না জড়িত কন্ঠে বলে মেয়ে ফুলবানু..
রহিম মিয়ার একমাত্র মেয়ে ফুলবানু৷
গতবছর চাঁদপুরের নদীভাঙনে বাড়ি ঘর সব তলিয়ে যায় সেই থেকে ওরা ঢাকার করাইল বস্তিতে থাকে৷
রহিম মিয়ার বয়স পঞ্চান্ন ছুঁই ছুঁই কিন্তু সারাদিনের খাটুনি যেন তাকে আশি বছরের বুড়া করে দিয়েছে৷
মেয়ের বয়স সবে সাত বছর ,অভাবের দাগ কাটিয়ে উঠতে দেরিতে বিয়ে করেন তিনি৷ সেই কাক ডাকা ভোরে রিকসা নিয়ে বের হয় আর ফিরে আসে রাতে..
অবশ্য যেদিন সুযোগ পায় সেদিন দুপুরেই বাসায় চলে আসে৷
সারা দিনের খাটুনি শেষে ঘরে ফিরে রহিমমিয়া যেন স্বর্গের সুখ অনুভব করে৷ চাঁদমুখ(মেয়ে ফুলবানু)কে দেখলে যেন সমস্ত ক্লান্তি এক নিমিষেই গায়েব৷আর যখনি ঘরে ফিরে তখনি মজা(একটা মিষ্টির পুটলা)নিয়ে আসে,মেয়ের অনেক পছন্দ মিষ্টি৷
রান্না ঘর থেকে জরিনা বেগম(ফুলবানুর মা) ভাতের হাড়ি নিয়ে ঘরে ফিরলো,দেখে রহিমমিয়ার মুখ ভার৷
-কি হলো ফুলের বাপ আপনার কি হয়েছে,আপনি এমন মুখ গোমড়া করে বসে আছেন কেন?
-কথাটা কেমনে যে বলি ফুলের মা সর্বনাস হয়ে গেছে৷
-কি হইছে ফুলের বাপ?
-কাল থেকে রিকসা চালানো বন্ধ"করুনা না কি যেন একটা অসুক আইছে দেশে৷
-হ করোনা,কিন্তু তার জন্যি রিক্সা বন্ধ রাখবে ক্যান..এই অসুখ তো চীনদেশে?
-নারে ফুলের মা,শুধু চীনদেশে না ব্যাবাক (১৯৯টি)দেশে ছড়ায় গেছে,সবাই বলাবলি করছে৷
-বলেন কি ফুলের বাপ?
-হ,বাংলাদেশে নাকি পাচজন মারা গেছে,দুইজন ডাক্তারের ও নাকি এই রোগ ধরা পড়েছে৷এ রোগ নাকি ছোয়াচে,বাতাসের সাথে চলে আর মানুষের শরীরে ঢুকে৷
-কন কি ফুলের বাপ,তাহলে আমাগো কি হইবো৷
-আমি ও তাই ভাবছি-রে ফুলের মা..আমরা না হয় আধপ্যাটে দিন পার করতে পারবো কিন্তু ফুল ?
-আপনি চিন্তা কইরেন না,ওই তিনতলার খালাম্মা কইছে ওনাগো কাজের বুয়া একমাসের জন্য গ্যারামে যাইবো ওই এক মাস আমি খালাম্মাগো বাসায় কাজ করবো,আপনে শুধু ফুলেরে দেইখেন৷
-কস কি ফুলের মা,জানিস না আগামীকাল থেকে ঘরের বাইরে যাওয়া বারন,সরকারি ভাবে ঘোষনা দিছে ,মাইকে বলছে,আবার টিভিতে ও দেখাচ্ছে "লকডান না কি জানি কয় ৷
-লকডান কি ফুলের বাপ৷?
-মানে আমি ও জানিনা,তয় ঘরের ভেতর থাকতে হবে দশ দিন,বাইরে বের হলেই মিলিটারি মাইরধোর করবে৷
-কিন্তু আমরা গরীব মানুষ লকডান করলে আমাগো প্যাটে ভাত দিবো ক্যাডা?
এরি মধ্যে রমিজ মিয়া হাজির..রমিজ মিয়া সম্পর্কে রহিমমিয়ার চাচা,পাশাপাশি থাকে ওরা
-চাচা,কাল থেকে তো ঘর থেকে বাহির হওয়া নিষেধ,আপনি শুনেছেন?
-হ শুনছি তো,আর তাই ছুটে এলাম তোর কাছে,এই শোন কাল সকালে সমতা মডেল ইসকুলে যাবি আমার সাথে৷
-সরকার না ঘর থেকে বেরুতে বারন করলো?
-করেছে ঠিক আছে,কিন্তু সরকারই আমাদের কথা ভেবে চাল ডালের ব্যাবস্থা করেছে৷
-কন কি চাচা?
-হ,এই দশ দিনে দেশের সব গরীব,খেটে খাওয়া দিনমজুরদের সরকার খাওয়াবে,তয় শর্ত একটা?
-কি শর্ত চাচা?
ওই যে লকডাউন থাকতে হবে,রমিজ মিয়া চলে গেলো৷
যাক তবুও একটা উপায় হলো,ইয়া আল্লাহ তোমার দুনিয়ায় আজ ও গরীবের অন্ন জুটে৷
-----------------------------------------------
পরদিন সকালে চাচা রমিজউদ্দিনের সাথে একটা বস্তা নিয়ে বের হলো রহিমমিয়া৷
সমতা মডেল স্কুলের সামনে বিরাট বড় গাড়ি চালডাল ভর্তি৷ শত শত দিনমজুর খেটে খাওয়া মানুষের ঢল নেমেছে৷সবাইকে লাইনে দাড় করানো হলো..একে একে নাম ডেকে সবাইকে চালডাল দেওয়া হলো...দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে গেলো৷চাচা রমিজউদ্দিন ও পেলো চালডাল কিন্তু রহিমমিয়ার নাম আর ডাকেনা৷
এবার চাচা রমিজউদ্দন রহিমমিয়াকে সাথে নিয়ে অফিসারের সাথে কথা বলল..তিনি বললেন ওনার নাম এখানে নেই...সরি আমরা কিছু করতে পারবোনা৷অন্যজন বললো আচ্ছা তোমার নাম ঠিকানা বলো আর এখানে একটা সাক্ষর দাও আমি দেখি কথা বলে কাল ব্যাবস্থা করতে পারি কিনা৷
ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ঘরে ফিরলো রহিম মিয়া,খালি হাত দেখে জরিনা বেগম জিজ্ঞেস করলো
-কি হইছে আপনার ফুলের বাপ,চাল,ডাল কই৷
-পাইনি৷
-পাননি মানে?
-ওসব আমাদের জন্য নারে ফুলের মা,ওসব হলো বড়লোকদের জন্য,,যাদের অনেক আছে তাদের জন্য৷
নিমিষেই মনটা বিষন্নতায় ঢেকে গেলো জরিনা বেগমের স্বামী রহিমমিয়ার কথা শুনে৷
পরে রমিজউদ্দিনের কাছে সব জানতে পারলো৷কিন্তু হাড়িতে যে ভাত আছে তা আজ রাতে কোনমতে চলে যাবে কিন্তু কাল ?
সকালে ফুল ঘুম থেকে উঠেই পান্তা খেতে চাইবে তখন কি করবে জরিনা বেগম৷ভাবনার দরজায় টোকা দিয়ে বলল রহিমমিয়া-চিন্তা কইরোনা ফুলের মা,সকাল হোক একটা ব্যাবস্থা হবেই৷
পরদিন সকালে জরিনা বেগম ঘুম থেকে উঠে দেখে রহিমমিয়া পাশে নেই.কখন যে ঘুম থেকে উঠে বেরিয়ে গেছে টেরই পাইনি৷রিক্সা ও নেই৷তবে কি রিকসা নিয়ে বের হলো?কিন্তু সরকার তো বলেছে "লকডন" মানে ঘর থেকে বের হওয়া যাবেনা,বের হলেই করুনা রোগে ধরবে৷
একবার ঘরে একবার বাইরে করছে..ওদিকে ফুল ও খিদের জ্বালায় কান্নাকাটি করছে৷যত বলছে তোর বাবা মজা আনতে গেছে কিন্তু কিছুতেই কান্না থামছেনা, কিযে করবে বুঝে উঠতে পারছেনা জরিনা বেগম৷
এদিকে বেলা বারোটা বেজে গেছে..সকালে দুইটাকা দিয়ে এক পিচ পাউরুটি কিনে দিয়েছিল ফুলকে সে ওটা খেয়েই খেলছে ঘরের মাঝে৷
অবুঝ শিশু সে তো আর বুঝেনা অভাব কি জিনিস,ক্ষুধা লাগলেই তাকে খাবার দিতে হবে৷
বেলা দুইটা বেজে যায় রহিমমিয়া আর ফিরে না..
মা আমার খিদা লাগছে,বুঝোনা,আমারে খাইতে দাও এই বলে কান্না শুরু করে দিয়েছে ফুল৷
হঠাৎ রমিজউদ্দিন দৌড়ে এলো-বৌ মা সিগগির চলো রহিমমিয়ারে মিলিটারিতে ধরেছে৷
-ও আল্লা গো বলে চিৎকার দিয়ে ফুলকে নিয়ে রমিজ চাচার পিছে পিছে দৌড়ে গেলো জরিনা বেগম৷
দেখে মোটা রশি দিয়ে রহিমমিয়াকে বেধে রেখেছে মিলিটারি তাদের গাড়ির সাথে৷
কেউ সামনে যাচ্ছেনা..কিছু লোক দুরে দাড়িয়ে দেখছে৷এবার জরিনা বেগম দৌড়ে স্বামীর কাছে গেলো
-আপনি কি করিছেন ফুলের বাপ,ওনারা আপনারে ক্যান বাইন্দা রাখছে কন?
-আমি কিছুই করিনাই ফুলের মা..আমি রিক্সা নিয়ে বাইর হইছি এটাই আমার দোষ৷
এবার মিলিটারি অফিসার জরিনা বেগমের সামনে এসে দাড়ালো-তোমার স্বামী ঘর থেকে কেন বের হয়েছে,তোমরা কি জানোনা সারাদেশ লকডাউন চলছে?সরকার যেখানে চালডালের ব্যাবস্থা করেছে সেখানে তোমরা জীবনের ঝুকি নিয়ে কেন বের হচ্ছে?
-প্যাটের জ্বালা বড় জ্বালা হুজুর,আমরা সরকারী কোন চাল ডাল পাইনা..এই যে মাইয়াডা ক্ষুধার জ্বালায় কানতেছে হুজুর,ওর কান্নার কাছে করোনা ভাইরাস কিছুইনা..
তাই ওর বাপে রিক্সা নিয়ে বের হইছে৷কোন সময় বের হইছে আমি জানিনা হুজুর৷দয়া করে ফুলের বাপেরে ছাইড়া দেন৷
এবার ফুল ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো--ও বাবা তোমার মুখে রক্ত কেন,কি হয়েছে তোমার৷
-তোর বাবা সরকারী আদেশ অমান্য করে ঘর থেকে বের হয়েছে,তাই তোর বাপেরে রশি দিয়ে বেধে রেখেছি বললেন মিলিটারী লোক৷
-ও কাকু আমার বাবারে ছাইড়া দেন,আমার বাবার কোন দোষ নাই,সব দোষ আমার৷
আমি যদি বাবার কাছে মজা (মিষটি)খাইতে না চাইতাম তাহলে আমার বাবা রিক্সা নিয়ে বের হতো না..আমি আর কোনদিন বাবার কাছে মজা খাইতে চাইবোনা কাকু৷
-তোর বাবাকে ছাড়বো তার আগে কান ধরে উঠবস কর..আর বল কোন দিন সরকারী আদেশ অমান্য করবি না?
এবার রহিমমিয়া সবার সামনে কানধরে উঠবস করলো তারপর তাকে ছেড়ে দিয়ে চলে গেলো মিলিটারি...
এবার ফুলবানু বাবাকে জড়িয়ে ধরে বললো বাবা আমি আর কোন দিন মজা খেতে চাইবোনা তোমার কাছে৷
-মারে আমি তোর হতভাগ্য পিতা যে এইটুকু মাসুম বাচ্চার মুখে খাবার দিতে পারেনা..সরকার ঠিকই আমাগো সাহায্য করে কিন্তু সে সাহায্য হাত বদল হতে হতে আর আমাদের হাতে পৌছায় না৷
প্রিয়পাঠক বর্তমান প্রেক্ষাপটকে গল্পের মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র৷
একবার ভাবুন তো আমাদের দেশে পথে প্রান্তরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এরকম হাজারো রহিমমিয়া পরিবার৷
যারা করোনার মতো মরনঘাতি ছোয়াচে রোগকে উপেক্ষা করে জীবনের ঝুকি নিয়ে নদীতে মাছ ধরছে ,আবার কেউ রিকসা চালাচ্ছে ,আবার কেউ দিনমজুরের কাজ করছে..কিন্তু কেন?
আমরা কি পারিনা ওদের পাশে একমুঠো অন্ন দেবার প্রতিশ্রুতি নিয়ে দাড়াতে?
আমরা কি পারিনা ওদের একবেলার খাবার জোটাতে?
আসুন আমরা যার যার সাধ্যমত ওদের পাশে দাড়ায়..........