Dec 30, 2022

অপাংশু দেবনাথ

ষট্‌পদী-তিন

চতুর বিকেল,শূন্য মাঠ, চারিদিকে কুয়াশা-কবচ,
বুক পেতে ডাকে সেই রাত্রি, আয় মরমি-প্রভাত।
সকল-সুখ সাজিয়ে রাখি,হয়তো তুমি গোপণে,
ভ্রমডানা মেলে উড়ে যাও, হারাও আদি অসুখে।

ভালোবাসা যদি নিঃস্ব করে,সব ভুল থাকে পড়ে,
ঈশ্বর জানে এই হৃদয়ে, ফুটেছে ফাল্গুনি-ফুল।

সন্তোষ রায়

শেকড়যাত্রা 

আমার আয়ুর সমান গাছ
আমি তার নিচে হাত-পা মেলা
সে আমার থেকে অনেক বড়
আমি ছোট হতে হতে শেকড়ে ফিরি।

সে যত আকাশ চায়
আমি চাই জল
নিজেকে চেনার তৃষ্ণা প্রবল।

কৃষ্ণকুসুম পাল

পাঁচ প্রেমে পাকা

প্রেম কি,না জেনে,প্রেম করে বোকা,
মরো না,মেরো না,পাঁচ প্রেমে পাকা।
প্রথম ধোকা খেয়ে,তোমার শুধু কান্না,
দ্বিতীয় ধোকা খেয়ে,ভাবো প্রেম আর না,
তৃতীয় ধোকা খেয়ে,নির্জনে একা,জীবন শেখা,
চতুর্থ ধোকা খেয়ে,বিয়ে করে এঁটে থাকা ,
পাঁচে আর প্যাঁচে নয়, পৃথিবী সাথী,
জীবন দিন যাপন আর সাঁঝে বাতি।
                 
প্রেম তো প্রেম নয়-অসীম আকাশ,
প্রেম যা'কে সে ষড়ঋতুর ঘূর্ণী বাতাস,
তোমার মেঘের মতো মিছে ছোটাছুটি,
তুমি কাঁদবে,বন্যা হবে, কাদায় লুটোপুটি।
প্রেম বিনিময় প্রথা নয়, প্রেমে নেই জয়,পরাজয়,
চার পালালেও,পঞ্চম তোমার জন্য পথ চেয়ে রয়।

সৌমত বসু

মায়া বৌ-২৪ 

আমি রাত্রির কথা লিখি , 
লিখি আত্মজনের আলো 
লিখি বেহুলা চলেছে ভেসে 
পাশে লখিন্দরের শব।

তুমি গাঙচিল হয়েছিলে 
কতো উঁচুতে মেলেছো ডানা
দেখি পাতার উপর আঁকা 
সেই আনন্দ ছায়াছবি।

লিখি জীবন তো একটাই
তাকে এভাবে পোড়াতে হয় ?
দেখি চোখেমুখে এসে লাগে 
শুধু বিশ্বাস পোড়া ছাই।

আব্দুল গফফার

গোল নিয়েই যত হিসাব

একটা গোল তার কোন মুল্য নেই, 
শূন্যের সংখ্যা বাড়িয়ে দাও,
শত হাজার লাখ কোটি কোটি-
কত হিসাবের খেলা সারাদিন,
যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ লাভ লোকসান..।
খেলার মাঠে প্রতিযোগিতায় কত উল্লাস,
বারপোস্টের মধ্যে ঢুকলেই হল, গো ও ও ল!
ফুটবলের উন্মাদনা উচ্ছাস সেই গোল-কে ঘিরেই,
গোল না পেলেই ভুল নিয়ে কাটাছেঁড়া-
কার দোষ,ভুল কার ?
এই নিয়ে বাধে কত গন্ড'গোল'।
জয় হলেই মেরে দিয়েছো গোল,
পরাজয়ে চোখ ছানাবড়া, পাকায় গোল।
হেঁসেলেও 'গোল' এর খেলা-
রমণীর হাতের গুণে রুটি হয় গোল
বাঙালির সেরা আবিষ্কার রসের গোল-লা গোল।
তাইতো মিঠাই এত জনপ্রিয়,
চাঁদ সূর্য পৃথিবী, ভুবন জুড়ে গোল,
গোলের কত মহিমা-
গোল নিয়েই যত হিসাব।

শান্তনু ভট্টাচার্য

সাপ 

মাঝে মাঝে বেশ  বুঝতে পারি
নিজেকে গোটাতে গোটাতে কুণ্ডলী পাকিয়ে ফেলছি 
তবে কি শরীরে জমেছে নিদারুণ বিষ?
না বেঁকেই চলেছে শিরদাঁড়া

অসহ‍্য গ্রীষ্মের দাবদাহ মাঝে
অসহায় শীতঘুম চারিদিকে।

এখন লাখ টাকার প্রশ্ন- 
আক্রমণ না হয় বাদই দিলাম 
আত্মরক্ষার সময়ে উঠে দাঁড়িয়ে শত্রুর চোখে চোখ রেখে মারতে পারবো ছোবল?

নাকি শীতঘুমে মজতে মজতে শুধু  
খোলস বদলে বদলে কাটিয়ে দেব চিরকাল...

কুশল ভৌমিক

অলজ্জ দুঃখগুলো

একটা ট্রেন চলে যাবার পর
মফস্বলের স্টেশনটা যেমন শুরু করে অস্থির পায়চারি  
হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় যাত্রীদের বাড়ি
আমার মন খারাপগুলো ঠিক তার বিপরীত। 
কেমন যেন ঘরকুনো, শত গঞ্জনা সয়েও সংসারে পড়ে থাকা বাঙালি বউ
ভাঁজে ভাঁজে দাগ পড়ে যাওয়া পুরনো শাড়ি
মুখ গুজে শুয়ে থাকে আলমিরায়।

তারপর বহু বহুদিন পর তালা ভেঙে বের করে আনি
জানালা খুলে দিয়ে বলি-বিদেয় হ
নাছোরবান্দা দুঃখগুলো
দুলতে থাকে বারান্দায়, রেলিঙে, কার্নিশে
ইলেকট্রিক পাখায়, ফুলের টবে, এটোবাসনে 
ভাঙা কাঁচের টুকরোর মতো ঘরময় ছড়িয়ে পড়ে 
নিজস্ব ভঙিমায়। 

উপায়ান্তর না দেখে দুঃখের টুকরোগুলো 
পুটলিতে বেঁধে তুলে রাখি আলমিরায়
যেভাবে সতর্ক রমণী লকারে ভরে রাখে
স্বর্ণালঙ্কার।

নন্দিতা দাশ চৌধুরী

অবগুন্ঠনে ডুবে যাই 

মাঝ রাতের যে ভাবনা তোমায় রাত ভর জাগিয়ে রাখে আমি হন হন করে ছুটে যাই সেই আচ্ছন্ন  করা ভাবনার কাছে,

নক্ষত্র  মাখা রাতের গন্ধে যেখানে তোমার সাগর চোখের ক্যানভাসে মেঘ ভাঙা শব্দ ভাঙার উল্লাসী নৃত্যের জলছবি আঁকা, আমি ছুটে যাই, 

ঝুমুরের সাথে মাদলের সুরে উপসুরে নিরবধি ছুঁয়ে থাকার কৌশল নিই, ভালোবাসলে নিজের তো আর কিছুই  থাকেনা পায়ে পায়ে হোঁচট খেয়ে মরতে হয়

অপরাজিতার নীল রঙ  বারবার  আমায় কাঙাল করে যেমন করে গজলের সরগম,

পাশানের মাঝে শিল্পের সৃষ্টি তাই বলে পাশানই শিল্প নয়, 

একটা শব্দহীন কাতরতা আমার দোরগোড়ায় পাথর  ভাঙে পাহাড় ভাঙে আকাশ  ভাঙে,ক্রমান্বয়ে আমি কালের চিতার অবগুন্ঠনে  ডুবে যাই।


রুদ্র মোস্তফা

প্রেমিক ও পুরুষের পার্থক্য 

মানুষের ভিড়ে মানুষের শোভা
আমাকে মনে করিয়ে দেয়
শীতের সকালের কুয়াশা কুড়ানো রোদের মুখে 
পুরে দেওয়া পরিত্যক্ত প্রেমিকার 
আশ্চর্য রঙিন প্রণয়ের কথা। 
অপরাহ্নে উড়ে যায় যেন অনেক কথার ধুলো।
বিরান মাঠ এগিয়ে আসে চুমোর ঠোঁট বাড়িয়ে। 
শহরের ব্যস্ত গাড়িগুলো 
ব্রেক কষে, একে একে থেমে যায় যেন কার সামনে.... 
স্মৃতির সামনে বসে চক্কর খাই লাটিমের মতো।
এ এক দারুণ খেলা! 
তুমি নেই যে শহরে সেই শহরে তোমার ভিড় 
বাড়িয়ে দেয় প্রেমিক ও পুরুষের পার্থক্য।

গোপেশ চক্রবর্তী

সঙ্গী 

বোধের ভেতর মায়া-স্টেশন 
তুমিও হও প্রকট-

একদম একা না-হলে...

নিবারণ নাথ

প্রেম

প্রতি রাতই যে বৃষ্টি ধূঁয়ে দেয় শরীর
এক উন্মাদনা আমাকে
বিব্রত করে
রক্তচাপ বাড়ে।

ভোরের কুয়াশায়
আহ্লাদে নাচে হাত পা
বাড়ির রাস্তায় দেখি সেই বৃষ্টি। 

অন্তমিলে 
আমি এক নষ্ট পুরুষ।

তৈমুর খান

বকশিক (অনুগল্প)

 হন্তদন্ত হয়ে রোজকার মতো আজও ট্রেনে উঠেছি। সকাল সাড়ে আটটায় ট্রেন। এক মিনিট দেরি হলেই মিস হয়ে যাবে। আজও ভিড়ে ঠাসা ট্রেন সিট ফাঁকা নেই বললেই চলে। সিটের এক ধারে একটি ব্যাগ রাখা আছে। কার ব্যাগ? কার ব্যাগ? বারকয়েক চিৎকার করে কারও সাড়া না পেয়ে ব্যাগটাকে কোলের ওপর নিয়েই বসে পড়ি। ট্রেন চলতে শুরু করে। প্যাসেঞ্জার ওঠানামা করতে-করতেই তিন-চার স্টেশন পেরিয়ে যায়। কিন্তু ব্যাগের মালিক কই? এখনো কেউ খোঁজ করল না! আর দুই স্টেশন পেরিয়েই আমাকে নামতে হবে। সেখান থেকে টোটো ধরে পনেরো মিনিট এগিয়ে গেলে তারপর আমার অফিস।

    আমি একটা বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। সর্বসাকুল্যে বাইশ হাজার টাকা বেতন পাই। এখনও ঘর করে উঠতে পারিনি। দীর্ঘদিন থেকেই ছেলে বাইক কেনার বায়না করলেও ওকে থামিয়ে রেখেছি। আর কয়েক মাস যাক তারপর কিনে দেবো। এমনি করেই তিন বছর পেরিয়ে গেছে। একমাত্র মেয়ের জন্য বিয়ের ঋণ নেওয়া ব্যাংকের টাকা এখনও পরিশোধ করা যায়নি। বছরে একবার ভেলোর যেতে হয় স্বাস্থ্য চেকআপের জন্য। তার জন্য আগে থেকেই ছুটি জমিয়ে রাখতে হয়। প্রতি মাসের ঘর ভাড়া দিয়ে, ওষুধের জন্য আলাদা করে কিছু খরচ রেখে এবং প্রতিমাসে ছেলের জন্য কোচিং সেন্টারের ফি বাবদ খরচ যোগ করে বাদবাকি যা থাকে তাতে কোনওরকম বেঁচে থাকা যায়। এরপর শখ-তামাশা-আহ্লাদ বলে আর কিছু থাকে না।            গিন্নি মাঝেমাঝেই খোঁচা মেরে বলে: 

    তোমার আর অভাব ঘুচবে না! কখনও একটা দামি শাড়ি দিতে পারলে না। হাতখরচের জন্য মাসে এক হাজার টাকাও দিতে পারোনি। নিজেদের একটা ঘরও হল না আজ পর্যন্ত!

     এসব কথার উত্তর দিতে গিয়ে আমার কন্ঠস্বরে কম্পন অনুভব করেছি। গলা নামিয়েই বলতে হয়েছে:

 দেখে নিও একদিন সবই হবে। ছেলেটাকে বড় হতে দাও আর ব্যাংকের ঋণ শোধ করে ফেলি। তারপর থেকেই আমাদের আর কোনও খরচ থাকবে না। তখন তোমাকে হাতখরচও দিতে পারব।

 কতকী ভাবতে-ভাবতেই ট্রেন আমার গন্তব্যে পৌঁছে গেছে। সিট থেকে উঠতেই সামনে দাঁড়ানো একজন প্রায় জোর করেই বসে পড়লেন। হাতের ব্যাগখানা ওর হাতে দিয়ে বললাম: 

    কার ব্যাগ জানি না, এই সিটেই রাখা ছিল, চাইলেই দিয়ে দেবেন। বলেই দ্রুত ব্যাগখানা তাকে দিয়ে নেমে পড়লাম।

 ততক্ষণে মাইকে ঘোষণা হচ্ছে:

   একটি বিশেষ ঘোষণা, এই ট্রেনের তিন নং কম্পার্টমেন্টে পঞ্চাশ লক্ষ টাকার একটি ব্যাগ রাখা ছিল। ব্যাগটি যিনি নিজের কাছে রেখেছেন দয়া করে স্টেশন মাস্টারের কাছে জমা দিয়ে যান।কালো রঙের লাল বর্ডার দেওয়া ব্যাগ। কর্তৃপক্ষ তাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা বকশিশ দেবেন।

   ঘোষণাটি শুনতে-শুনতেই আমার একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গেল। ওই ব্যাগটি কালো রঙের লাল বর্ডার দেওয়াই ছিল! 

    বার কয়েক নেমে আসা কম্পার্টমেন্টের দিকে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলাম।ততক্ষণে পুলিশ এসে ঘিরে ফেলেছে চারিপাশ।

সন্দীপ সাহু

শেষের কবিতা

ঘনতম অতল নীল, প্রেমিকার মতো
চোখ চেয়ে ইশারা করে। ইশারায়
তারায় তারায় নৌকা ভেসে আসে!
নৌকাটা নীল গোলাপে একেবারে ভর্তি!

ভেসে এসে গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে
বাসর শয্যায় নোঙ্গর ফেলে! প্রেমিকার মতো হেসে!
কখনো কেউ ভালোবাসেনি! যোগ্যতাও ছিল না!
সমস্ত ব্যর্থতাগুলো একে একে জরো হয়!

বিরোধী দলের মতো চিৎকার করে 
অনাস্থা এনে সমস্ত শাদাকে কালোতে মোছে!
বৈধ সম্পর্কগুলো চাবিকাঠি খুঁজতে
দেহে ময়নাতদন্ত চালায় দক্ষ ব্যোমকেশের মতো!

সাতপাকে ঘুরলেই সাত জন্ম, পাঁকে ডোবে!
পাঁকে পাঁকে সম্পর্কগুলো চাবিকাঠির ওপর
অধিকার নিয়ে পচা গন্ধ ছোটায়! ওই গন্ধে
মানুষ মরে। মানুষ মরলে সম্পর্ক থাকে কি!

ঘন অতল নীল আবার চোখ তুলে চায়!
চাবিকাঠি বৈধ সম্পর্কের মৃত মানুষগুলো কাছে রেখে,
ওই চোখের ইশারা-পথে এগিয়ে যাই।সেই চোখ 
সেই হাসি নায়িকার মতো ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে!

শিল্পীর কাছে একান্ত অনুরোধ, ওর একটা
ছবি এঁকো! মুখটা কোরো ঠিক আমার মতো!
মুখে যেন কাপুরুষের জামা পরিও না!
লড়াই করে পরাজয়ের যে রঙ হয়, তা-ই এঁকো!

জানি তুমি অম্লান বদনে আঁকতে পারবে!
তুমি এমন একটা নদী, জোয়ার ভাটা সমানে খেলে!

নিয়তি রায় বর্মন

মায়ের অশ্রু

আমার মায়ের অনেক কষ্ট
পিতৃহীন সংসারে মায়ের উৎকন্ঠার শেষ নেই--
কোটি কোটি ভাই বোনের গ্রাসাচ্ছাদন, হায়! 
কাগজে স্বাধীনতা এলেও সন্তানের জীবনে বসন্ত আসে নি। 
মায়ের সন্তানরা অনেক কেজো, দুই হাত দুই পায়ে অনেক বল--
সোনার ফসল ফলায়, গগন চুম্বী অট্টালিকা সাজায়--
জগৎজোড়া নাম তাদের। 
চারু শিল্পে, কারু শিল্পে, সাহিত্য সংস্কৃতিতেও 
বিশ্ব জয় করেছে অনেক সম্মানে ও পদকে। 
মায়ের রবি, সত্যজিৎ, জগদীশ, অমর্ত্য, 
অভিজিৎ প্রত্যেকে মায়ের অলঙ্কার। 
বীর নেতাজী, সূর্য সেন, ক্ষুদিরাম, ভগৎ সিং, 
সোমেন চন্দ, প্রীতিলতা, কল্পনা, কল্পনা চাওলা স্বনামেই জ্যোতিষ্ক। 
দেশের অন্নদাতা নিরন্ন, শ্রমিকরা কাজ হারায়--
কোভিড ঊনিশ জালে সবাই দিশেহারা। 
মায়ের সাম্রাজ্যের ভার যারা নিয়েছেন--তারা দিক ভ্রান্ত--
মায়ের চোখের অশ্রু আর শুকোয় না। 

খোকন সাহা

বাঁধ ও বাধা

' কি করে কাছে টানি
দুই পাঁজরের ঝাপটানি '।
ঘুরে ফিরে অসংখ্যবার
এইখানে  থামি ;
যেখানে আবিস্কারের চেয়ে
অনাবিস্কারের রক্তগুলি 
জ্বল জ্বল বাণী ।

হয়তো ঝোঁপঝাড়ের মুখে
অথবা প্রণতি সিন্ধু তীরের চোখে
চাপা হাসি চরিয়ে যায়
মিতালি বঁধুয়ার জলমাটিতে ----- ;
কত রকমের ফুল ফোটা,
কত খোলা চোখের জ্বলন্ত শাসানি ----
পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা খুলে যায় ;
আর তার রঙ রেখায় ফুটে ওঠে
ভূমিকাসুন্দর পৃথিবীর জানালা ।

তবুও সময়ের বাকমেরু
অন্ধকার থেকে ছুটে চলে ---
রোদ্দুরের দিকে।
আমাদের রক্তের নদীতীর হাটবাট পালাগান জুড়ে,
তখন তোমার অধৈর্য মুখ থেকেও
ফুটে ওঠে -----ফুল আর স্বপ্ন পংক্তিমালা  । 
ভেঙ্গে যায় সব বাঁধ ও বাধা ।

নমিতা সরকার

আবেগের রঙ নেই 

নিজেকেই ভুলে গেছি প্রকৃত সুখ  পাখির পৃথিবীতে ঘুরে ঘুরে, না না এভাবে আর নিজেকে দূরে সরানো ঠিক হবে না...

অনেক তো হলো নিজেকে ভুলে ফুলে ফুলে উড়ে বেড়ানো ভ্রমরের গান শোনা, 

চোখের ঘুম সরতে না সরতে যে সুকণ্ঠ পাখির স্বর শুনতে ইচ্ছে জাগে অধির আগ্রহে... 

সে পাখি, আমার কাছে আসতে ভুলে গেছে, ভুলে গেছে আমার ভুবন গায়ে ঘুরে ঘুরে গান শোনাতে অথচ তাকে শুনতে আমি নিজেকে ভুলে গেছি-

অনেক তো হলো নিজের আত্মাকে অনুভূতির ব্যস্ত শহরে আবেগের অদ্ভূদ রঙে রাঙিয়ে দেওয়া... 

আবেগে নাকি প্রেম নেই... 

তাহলে নিশ্চয়ই চিতার দহন জ্বালা আছে, তারজন্যই হয়তো নিজস্বতাকে ভুলে আবেগের আগুনে আহুতি দিতে হয়...

আর পাখি আমার আপন মনে আপন প্রেমে উড়ে উড়ে ঘুরে বেড়ায় সুখের নেশায়... 

থাকসে পাখির ইচ্ছে ডানায় আপন বাসায়, আমি নাহয় নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকি অগ্নি চিতায়।

পৃথ্বীরাজ দেবনাথ

অকিঞ্চিৎকরগুচ্ছ

ডুব দাও, ডুব দাও
পিছলে যাচ্ছে সময়।
হে হিরণ্যগর্ভ! আমার জন্যে অবশিষ্ট রয়েছে কি আর কোন সূর্য উদয়?

একখানি স্বপ্ন ক্রমশ সর্পিল গতিতে 
অন্তর্হিত হচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে,
রেশ তার রয়ে যাচ্ছে, 
অথচ বিষয়বস্তুর গভীরে আদি আর অকৃত্রিম পরমশূন্য।
তাহলে স্বপ্নটি কার? 

দিনান্তে বা নিশান্তে জাগে আমার অহং, জাগে আমার প্রাণ। বিস্ময়ে ক্লান্ত আমি, তবুও দিগন্তে অশ্বমেধের ঘোড়া, তবুও যুদ্ধের প্রান্তরে উন্মুক্ত সাম্রাজ্যের তলোয়ার। হে ঋতবান, আর কত রক্তের বিনিময়ে তুমি প্রেমিক হবে?

অদিতি তুলি

বয়স বাড়লেই ঘর ছাড়ে মানুষ

মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে হঠাৎ আমার কথাই তোমার মনে পড়ে আমি জানি। 
একটা চাপা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলেই হয়ত ভাবো মেয়েটা কি করছে ঠিক মত খাচ্ছে কি না মাথায় তেল দিচ্ছে কি না....।
গত শীতে দুটো কাঁথা দিয়েছিলাম একটা কম্বল আগেই ছিল। 
এবার না হয় আরো একটা কম্বল পাঠিয়ে দেব।  যা চাপা স্বভাব কখনো মুখ ফুটে কিছু বলে না। 
অনিয়ম করে করে আবার কোন অসুখ না বাধায়। 
মেয়েটার আর কত হল বয়স..! 
এসব ভাবতে ভাবতে রাতের প্রহর বাড়ে,  জাগতিক নিয়মে বাড়ে চিন্তাগুলিও। 
হয়ত দু এক ফোটা জল ও গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে তোমার অজান্তেই। 
তখন হয়ত আমাদের ঘরের পেছনের হিজল গাছটা থেকে টুপটুপ করে ঝরে পড়ে ফুলগুলো মাটিতে। ঝোপের ধারে কুয়ো থেকে ঝিঁঝি পোকার ডাক ভেসে আছে। নাম না জানা দু একটা পাখির ক্ষীণ শব্দ মিলিয়ে যায় উত্তরে।  
তোমার এই চাপা সংলাপের দীর্ঘশ্বাস কেউ হয়ত শোনে না দেখে না বোঝে না কিন্তু আমি অনুভব করতে পারি নয়ত আমার বুকের মধ্যে এত চাপা কষ্ট কেন হয়? 
নিজেকে বড্ড ভারী লাগে।  
চিৎকার করে ডাকতে ইচ্ছে করে তোমায় মা -
মা  মা  মা....
আমি ভালো নেই….।
অথচ মাধ্যমিকের পর আমি সেমন্তীকে কত করে উপহাস করেছিলেম -
 "তুই কি সারাজীবন বাচ্চাই থাকবি? বড় হবি কবে? মায়ের আঁচল ধরে সারাজীবন বসে থাকলে গেঁয়ো ভূত হবি ..."
বয়স বাড়লেই ঘর ছাড়ে মানুষ 
আমিও ছেড়েছিলাম
এখন বড্ড ঘরে ফিরতে ইচ্ছে করছে..! 
মনে হচ্ছে দেয়াল ঘড়ির কাটা তিনটি উপহাস করে বলছে আমায় তুমি তো জড়িয়ে গেছো এক
আস্তাকুঁড়ে সভ্যতায়, শিল্পায়নের ঘূর্নিপাকে।। 
ঘড়ির কাটায় ঠিক রাত দুটো চল্লিশ 

সাগর শাহ্

এক নিমেষেই শেষ

চলছে দেখো দমের গাড়ি 
দম ফুরাইলেই শেষ, 
মিছে মায়ার দুনিয়া-দারী 
কাটছে নাতো রেষ।

তুমি আমি সেই গাড়িরচাকা, 
চলেছি দেখো আঁকাবাকা
পায়না তো চালকের দেখা। 
কি সমান্তরাল ভাগ্যরেখা.! 

জমাট বাঁধা গোলক-ধাঁধা 
গাড়ি চলছে সাদামাটা, 
নিত্য দিনই চলে গাড়ি 
চলছে চলুক বেশ।

কালো কেশটা সাদা হলেই 
গাড়ির গতি শেষ। 
তাও ভয় করে গাড়ির মনে 
সবইতো জানে মহাজনে।

কতদিন আর চলবে গাড়ি 
হয়ে কেবল দেশান্তরি, 
এভাবে তে কেমনে দিবে
হিসাবনিকাশ আপন বাড়ি। 

এভাবে তেই চলছে গাড়ি 
চলছে চলুক বেশ, 
দমের গাড়ি দম ফুরাতে 
এক নিমেষেই শেষ।

দুলাল চক্রবর্তী

শান্তি রক্ষার্থে

গিন্নি যেন নয়ন মনি
খাটে বসে রয়,
সব দেখভাল করে
বিশ্রাম পেতে হয়।

হালকা একটু ফল-মূল
বারে বারে চায়,
খাবার জিনিস নজরে পড়লে
হাতে নিয়ে খায়।

গিন্নির মনে খুশি আনতে
কর্তা করেন কাজ,
রাঁধুনী সেজে কর্তা করে
নেই যে মনে লাজ।

ভালো- মন্দ খাবার করে
রোজ খাওয়াতে হয়,
গিন্নি তুষ্ট থাকলে পরেই
জগৎ শান্তি রয়।

সংসারাতে শান্তি রাখার জন্য
সদা তৎপর স্বামী,
গিন্নির হুকুম তালিম করা
সেবার চেয়েও দামি!

অলকা গোস্বামী

নবান্ন

খুব খুব কাছে দুজন,
শীতের অলস দুপুর,
 কিংবা শিশির ভেজা মধ্যরাতে;
ইচ্ছে করলেই ছুঁয়ে যাওয়া যায় সর্বস্ব।
প্ৰেমই হারায় চোরা নদীর বাঁকে।

শুধুই দুজন,
অদৃশ্য হাজার জনের ভীড়ে,
নিজেদের অস্তিত্ব খুঁজে পায়না অহরহ, যা
হারিয়েছে কবেই অপ্রাপ্তির
 ট্রাফিক জ্যামে।

কত যে অছিলা....,
শেষ কালে
তবু ছুঁতে চায় দুটি হাত পরস্পরে,

অঘ্রান 
ঘরে ঘরে ধানের পোয়াতি ভাঁড়ার,
হৃদয়ের কোথাও...,
খুব কাছেই
দুজনের নবান্ন উৎসব।

লিটন শব্দকর

দেখা আর না দেখায়

ভিক্টোরিয়া ল্যাম্পপোস্ট জ্বলে উঠেছে 
ভালোবাসায় ভালোবাসায়

বাদামের ঠোঙা হাতে চোখজোড়ার দিঘীতে ডুব
অবশিষ্ঠ কথা মাছেদের সাথে

মৃগেলের ঠাহরে পথবাতির আলো ধরে আমি
ছড়িয়ে দিতেই খই, তুমুল বৃষ্টি
ফুরোলে, ঠা ঠা শুকনো দুপুরের রোদে
রুপোলী আঁশের সাথে প্রথম দেখা

দৃষ্টি সরানোর অনভ্যাসে বৃষ্টি আসে
চোখ বলে বাকি রোদ রুপোলী হবে 
ঠোঙার বাদামে ক্রমশ ঘন বিকেল

জগন্নাথ বনিক

স্বপ্ন 

হলুদ খামে বন্দি থাকো,
অনেক দামি তুমি।
তোমায় খুঁজে পাওয়ার স্বপ্ন,
আজও দেখি আমি।।

আসবে কী তুমি আমার কাছে,
সত্যি হবে কী আমার স্বপ্ন।
তোমার জন্য আজও অপেক্ষায়,
দিও না তুমি আমার জীবনে দু-স্বপ্ন।।

Dec 27, 2022

ভবানী বিশ্বাস

সুখ দৃশ্য

মহিলাটা হাঁটছেন, 
মাথায় খাড়া রোদ।

ওই গ্রামের সরকার বাড়ির
পইঠায় বসলেন, 
সঙ্গে শিশুটি। 
পানের আসর শেষে
পুকুরে নামলেন। 

তারপর হাঁটছেন,হাতে কলমী। 
সাদা আঁচলটা শিশুর মাথায়, 
একটু হাপাচ্ছেন আর হাঁটছেন। 

শিশুটি তাঁর হাত ধরে হাঁটছে।
বলছে- ঠাম্মা!
আজ আমরা শাকপাতা দিয়ে ভাত খাব।

ছন্দা দাম

প্রলয় আনো

তাকাও ওহে পাহাড়,
পায়ে যে ঢেউটা আছাড় খেয়ে পড়ে...তার নীরব ক্রন্দন শোনো কি?
রাসায়নিক স্নানে দগ্ধ তার পাথুরে হৃদয় ও...
বুকে বয়ে ফেরে হেমলকের নীল জল,ভাসায় দু কূল...
সন্তান সন্ততির ক্ষিধের জঠর যাতনার তৃপ্তি দেয়।
ক্ষত বাড়ে দিনে দিনে... নিশ্চুপ নদীর অভিধানের ভাষারা হারায়,
প্রকাশের দৈন্যতা বুকের ভেতরে গুমড়ে গুমড়ে মরে!

তাকাও ওহে পাহাড়,
ভেঙে ফেলো গুরু গর্জনে ঐ গম্বোজের চুল্লিটা,...
বমি করে যে বিষাক্ত ধোঁয়ার কুণ্ডলী,
দখিনা বাতাসের পথ বদলে সৃষ্টি করো ঝড়,
গুড়িয়ে দাও সিমেন্টের অসুরগুলোর ইটগাথা দেহ!

ওহে পাহাড়...কতো আর নিঃসীম শূন্যে দৃষ্টি ছুঁড়ে তাকিয়ে থাকবে মূকবৎ!
আকাশের মেঘগুলোকে মুঠোয় ভরে নিয়ে...
ঘর্ষণ করে জন্ম দাও নতুন এক অশনীর,
ঝড় জলোচ্ছ্বাস স্রোতের তোড়ে ভাসিয়ে নিয়ে তাকে সৃষ্টি,
গঠিত হোক অর্বাচীন এক পৃথিবী...
ইথেন,মিথেন, হিলিয়াম...
আরো কতো বিষোদগারী দানব ডুবে যাবে এই প্লাবনে।।

পারমিতা মুস্তাফি

চড়ুই ভাতি

মিষ্টি শীতের দুপুর বেলা,
চড়ুই ভাতি হবে -
গাইছে যত নয়নতারা,
মাঠে ঘাটে এক সাথে।
রোদের ঝিলিক পরছে  গায়ে,
আহা কি আরাম -
হাসির ঢেউয়ের চমক লাগে,
নেই কোনো বিরাম।
ছোট্ট ছেলে খেলছে খেলা,
সবুজ মাঠ  টাতে -
কত রকম ফুলের বাহার,
সবুজ মাঠের প্রাতে।
এমন দিন কি ভুলতে পারি,
দারুন আনন্দ -
আবার আসুক এই দিনটাই,
চির বসন্ত।

শ্বেতা ব্যানার্জী

২২২ X বলছি

হ্যালো, হ্যালো, দ্রি,দ্রি দ্রি...।
ডোমিথি, ইরিয়স, এদের কে তৈরি রাখ।
হ্যাঁ, হ্যাঁ,  লালমুখো উই , আর হাজার হাতের মাকড়সা। 
পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার মানুষ, ওদের উচ্ছেদ চাই।
ইরিয়স চারদিকে জাল বিছিয়ে ওদের ঘিরে রাখুক, 
তারপর ডোমিথিদের ছেড়ে দাও। 
ওদের বুঝতে দাও উচ্ছেদের প্রতিকার নেই। 
ওরা আমাদের মাটি কেড়েছে, কেড়েছে জল,গাছপালা, থাকার বাসস্থান। 
 বাতাসে বিষাক্ত  বিষ ঢেলে দাও, নিঃশ্বাসের সুগভীর কষ্ট দাপিয়ে বেড়াক ওদের বুকে। 
 সভ্যতার নামে যে বর্বরতা দিয়ে ওরা পৃথিবী দাপাচ্ছে, তারও বেশি নৃশংস হও তোমরা। 
 কোনো ভ্যাক্সিন সৃষ্টির আগেই ল্যাবরেটরিতে জীবাণু XXX,  --- জেট থেকে ছড়িয়ে দাও।
জৈবিক ঝড় তুলে ধ্বংস কর, অতি সভ্যতা। 
হ্যালো, হ্যালো, কন্ট্রোল রুম,  ২২২ X বলছি----
এবার প্যারাশুটে নেমে যাও উপবৃত্তাকার পথে। 
কেড়ে নাও "ম্যান্টল " যা পৃথিবীর উষ্ণ গলিত স্রোত 
পৃথিবীর হৃদস্পন্দন। ধ্বংস কর চৌম্বক শক্তি,
ম্যান্টলের ব্রিজম্যানাইট, যা পৃথিবীর বাঁচার রসদ। 
পৃথিবীকে অ- বাসযোগ্য করে তোলো।
হ্যালো, হ্যালো, দ্রি,দ্রি,দ্রি
ইনোভাস  বিএফআর রকেট তৈরি তো।

অনুভব ধর রায়

চিঠি দিও


চিঠি দিও,
তোমার না বলা কথাগুলো লিখে—
হলদে খামে কিংবা পাখির পায়ে বেঁধে,
পাঠিয়ে দিও; আমার মনের কোনো এক দিকে।

চিঠি দিও,
শত যান্ত্রিক বাঁধা উপেক্ষা করে,
স্মার্টফোনে কথা কিছুদিন বা নাই হোক!
তোমার হাতের স্পর্শে উজ্জ্বল হোক—সেই চিঠিখানা।

চিঠি দিও,
তোমার রোজ ভালোবাসার অভ্যাসে,
শত ব্যস্ততার ফাঁকে; আমি সেই চিঠি পড়ে নেবো,
যতই জোৎস্না ভর্তি হয়ে চাঁদনী রাত আসুক—
কিংবা বৃষ্টি হয়ে ভিজুক সেই চিঠিখানা!

চিঠি দিও,
তোমার মন খারাপের দিনে,
না কোনো আন্দোলনে,
আকাশের ঠিকানায় লিখে কিংবা মনের সকল অভিযোগ জানিয়ে দিও,
তবুও চিঠি  দিও!
তোমাকেই শুধু লিখে দিও।

চিঠি দিও 
ঐ যৌবনে ফিরে গিয়ে নয়,
মনের কথা লিখে দিও—
এই যুগ যেন স্নিগ্ধ হয়।

চন্দ্রা বিশ্বাস

তুমি কার

জীবন আনত মস্তকে করজোড়ে,
কাঁধের ঝোলা সামলে, কলিং বেলে হাত
বেল বাজে, বেজে যায়, বেজে ওঠে শ্ঙ্খধ্বনিও।
জীবন পূজায়, যে যার মত, দোর খোলে না।
ধূপকাঠির ফেরিওয়ালা হতাশায় ঘুরে দাঁড়াতেই,
কাকে চাই? ব্যস্ত পরিচারিকা উঁকি মারে।
না মানে , যদি ধূপকাঠি , লাগবে? 
কত্তামা পূজোয়, দরজা সজোরে বন্ধ হলো।
ডাল পোড়ার গন্ধে মাতে বাতাবরণ।
পূজা,ধূপকাঠি, ডালপোড়া, কলিংবেল, শঙ্খধ্বনি
ফেরিওয়ালা, পরিচারিকা, কত্তামা,
শব্দ-গন্ধময় জীবন পঞ্চমে।
পঞ্চ তন্মাত্রময় এই জীবনে 
হে ঈশ্বর, তুমি কার?

গীতশ্রী ভট্টাচার্য্য

সখা

তবু, ইচ্ছে জাগে আবার জেগে উঠি স্ফুলিঙ্গের মত
তারপর নয় দপ করে নিভে যেতাম হালকা হাওয়াতেই।
আমার চাওয়াটা কোনো অসাধারণ কিছু নয় জানি
তবু, আমি জাগতে পারিনা, জ্বলে উঠতে পারিনা।

এই যে সমস্ত দুপুর জুড়ে ঠকঠক শব্দেরা মাথায় ঘা মারে, ভেতর থেকে বের করে আনতে চায় দু চারটে 
অর্থহীন শব্দ, তাদের প্রসব করতে গিয়েই আমি 
অচেতন হয়ে পড়ি রক্তক্ষরণে আর ক্লান্তিতে।

তবু, সাধ হয় একটিবার ফুল হয়ে ফুটুক আমার আমি
নাই বা থাকল বেশিক্ষণ গাছের বোঁটায়, ঝরে পড়ুক 
মুহূর্তে, অকালে হারিয়ে যাক ঘাসের মাঝে। 
পাঁপড়ি গুলি শুধু এধার ওধার ঘুরে বেড়াক, পখিলার মত রঙিন,  উড়ে উড়ে বসুক কোনো ডালে।

আবার জ্বলে উঠার জন্য একটি চকমকি পাথরের 
খুব দরকার, দরকার কিছু জ্বালানি।
হাত বাড়িয়ে দাও সখা, তোমার উষ্ণতার বারুদে
অন্তত একবার স্ফুলিঙ্গ হই, ফুল হই, কবিতা হই।

মিঠুন রায়

অভিলাষ (গল্প)

ভোরবেলায় হাল্কা ঠান্ডা লাগতেই সুজয় বুকের উপর ছেঁড়া কাঁথা খানিকটা টেনে নিল। গতকাল রাতে ঘুমাতে পারেনি সে। এমনি

তে সুজয় একটি প্রাইভেট জব করে। পাশাপাশি অসুস্থ বাবার চিকিৎসা রং জন্য সে ওভারটাইম করে।

সম্প্রতি সে বিয়ে বাড়িতে ফুলের সাজসজ্জার কাজ হাতে নিয়েছে। উপার্জন খুব একটা মন্দ নয়। সুজয়ের মাতৃবিয়োগ হয়েছে ছয় মাস আগে।

  মাতৃশোক এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি সুজয়। কিন্তু কিছু করার নেই।ঘরে বৃদ্ধ বাবা বিছানায় শয্যাশায়ী প্রায় দুই বছর ধরে।

  আচমকা দরজায় কলিং বেল বাজতেই ঘুম ভাঙ্গল সুজয়ের। কাজের মাসী যে এসে গেছে। দরজা খুলতেই নজরে পড়ল একটি ছিমছিমে মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।কে তুমি,আমি সোমা। আপনাদের বাড়িতে তে কাজ করে, সেই সবিতা দেবের ছোট মেয়ে।

মায়ের শরীর ভীষণ খারাপ।তাই আজ আসতে পারেনি। আমিই এখন কাজ করব আপনার বাড়িতে।

   সুজয় আর কথা না বাড়িয়ে, তাকে কাজ বুঝিয়ে দিয়ে চলে গেল। বাথরুম থেকে বেরিয়ে বাবার রুমে গিয়ে দেখে,সোমা  সুজয়ের বৃদ্ধ বাবাকে সুপ খাওয়াচ্ছে। প্রথম দিনের কাজকর্মে সোমা যেন সুজয়ের মন অনেকটা জয় করে নিল।ব্রাকফাস্ট করতে করতে একসময় সুজয় বলে উঠল, সোমা তুমি লেখা পড়া কতটুকু করেছ।

  আমি গতবছর বি এ পাশ করেছি।বি এ পাশ করে তুমি অনর্থের বাড়িতে কাজ করছ।না,আসলে মায়ের অসুস্থতার দরুণ এসেছি আপনার বাড়িতে। সুজয়ের চোখে জল এল।

     আসলে অন্যের কষ্টে  চোখে জল আসাটাই স্বাভাবিক। দুপুরে রান্নার বিষয় সহ বাবার ঔষধের কথা বুঝিয়ে সুজয় চলে গেল অফিসে।আজ অফিসে গিয়েও কাজে যেন মন বসে না।সোমার হতভাগ্য জীবনের কথা যেন বারবার মনে পড়ছে। মনে হচ্ছে যেন অল্প সময়ে সোমা জায়গা করে নিয়েছে সুজয়ের মনে। সন্ধ্যায় অফিস থেকে বাড়ি ফিরে সুজয় দেখল , টেবিলে রাতের খাবার সাজানো। এমনকি ফ্লাস্কে গরম জল পর্যন্ত রাখা। হাত  পা ধুয়ে বাবার কাছে যেতেই অশীতিপর বৃদ্ধ বাবা বলে উঠলেন,বড় ভালো মেয়ে সোমা।নিজ হাতে আমাকে তিন বেলা পথ্য দিয়েছে।ও তে পরিবারে যাবে, সেখানেই ঘর আলোকিত করে রাখবে। সত্যিই এমন মেয়ে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। সুজয়ের মনের কথাটা যেন ওর বাবা বলে ফেলেছে।

     রাতের খাবার খেয়ে সুজয় বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবতে  সোমার কথা।যদি সোমা চিরদিনের জন্য এই বাড়িতে থেকে যায়, তবে বেশ ভালোই হতো।কখন যে স্বপ্নের জগৎ থেকে ঘুমের অতলে চলে গেছে সুজয়,তার সে নিজেও জানেনা।

   এভাবে বেশ কিছুদিন কেটে গেল। হঠাৎ হাজির সবিতা মাসী।কি গো,এখন শরীর কেমন।আছি বেশ।আজ সোমা আসে নি।

না,এখন আর ও আসবে না। 

কেন, সোমার বিয়ে ঠিক হয়েছে।ওর বড় মামা বিয়ের সম্বন্ধ এনেছে।পাএ পেশায়  অটো চালক। নিজের দুখানা অটো।

কথাটা শুনে যেন সুজয়ের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল।এ কি শুনলাম। সত্যিই তো, নিজেকে বড় অপরাধী মনে হচ্ছে। একদিনও তো সোমাকে নিজের অন্তরের সুপ্ত প্রেমের কথা জানানো হয় নি।

     নিজের এই ভুলের জন্য আজ সে অনুতপ্ত। তবে কি সোমা এ জীবনে আর তার হবে না। রাতে বিছানায় শুয়ে বারবার এই কথা ভাবছিল সে। রাতে খাওয়াও হয় নি।কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে,তার মনে নেই।

   সকালবেলায় ঘুম ভাঙ্গল অন্য খবরে। বাড়িতে বেশ জনসমাগম।আর কিছুক্ষণ বাদেই সবিতা দেবী সোমাকে নিয়ে হাজির হবেন।আজ তে সুজয়ের সাথে সোমার কোট ম্যারেজ।ছয় মাস বাদে বিয়ে। কিন্তু সুজয় তে কিছুই জানল না।তার বাবা গতকাল সবিতা দেবীর সাথে এ বিষয়ে একেবারে পাকা কথা বলেছে। সবকিছু শুনে যেন বিলম্বে হলেও সুজয় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে।আর জড়িয়ে ধরল তার বাবাকে।তার মনের অভিলাষ পূর্ণ করার জন্য।

প্রদীপ কুমার মাইতি

কে বলে সূর্য অস্তাচলে

কে বলে সূর্য অস্তাচলে?
মাটির হাহাকারে দিনের শেষে সূর্য ঘরে ফিরে
সিক্ত নয়নে তুষের আগুনে জ্বলে ধিকিধিকি করে। 
তাই সে অন্তরালে। 
সূর্য কভু যায় না অস্তাচলে।
সূর্য ফিরে আসে অন্ধকার পাড়ি দিয়ে ভোরের আকাশে  প্রত্যাশার স্বপ্ন এঁকে দিতে, 
সূর্য ফিরে আসে আমাদের অন্তরের অন্তস্থলে বেঁচে থাকার ঠিকানায় মুক্তির মশাল তুলে দিতে,
সূর্য  ফিরে আসে দেহের শিরা- উপশিরায় জমাট রক্তে উত্তাপ ছড়িয়ে দিতে,
সূর্য ফিরে আসে বিপ্লবী মন্ত্রে যজ্ঞের আগুন জ্বালিয়ে দিতে,
যে আগুনে পুড়ে ছাই হবে শোষণের চাকা,
নিপীড়ন, উৎপীড়ন, লোভ-লালসা যাকিছু আছে স্তব্ধ হবে একা-একা।
সেদিন নয় বেশি দূরে।
যে দিন সূর্য আর জ্বলবে না ধিকিধিকি,
ফিরবে ঘরে জয়ের ভেলায় আলোকোজ্জ্বল আঁখি। 
দিনের শেষে ফিরবে না আর নয়ন ভরা জলে, 
সূর্য কভু যায় না অস্তাচলে।

কৃপা ঘোষ

স্বপ্নপুরীর গান

বৃষ্টি তুমি একবার জানিয়ে দিয়ো তাকে
তার আমার ভালোবাসার গল্পঃ জমে আছে।

চোখের দিকে তাকায় না সে ,দেখে না আসক্তি
একা একাই আমি পরে গুমরে গুমরে মরি।

আসবেনা কী? তুমি !
প্রহর গুনি আমি
 
বাসবে না কী? ভালো !
আর কতকাল থাকবো অবহেলো

ব্যাকুলতার বেদনা গান গায় বাতাসে 
কবে জানিনা এই শব্দ তুমার কাছে পৌঁছবে।

রাত্রিরা নিঝুম আজ 
কিটেরা স্তব্ধ শুনাতে আমাকে তোর আসার শব্দ।

কৃষ্ণ ধন শীল

প্রভাতী শোভা

ভোরের কূজন যেন শ্যামলে ভজন, 
আলতো আভায় মনে লাগে শিহরণ, 
কচি কচি কিশলয়ে কচি কাচার দল
নির্ভয়ে নেচে গেয়ে করে শোরগোল। 
ফুল কলি ফুটে ওঠে আপনিতে হাসে, 
কাক-চাতক কত পাখী আকাশেতে ভাসে, 
ফুলে ফুলে ঢলে অলি লুটে নেয় রজ্ঞন, 
প্রভাত ফেরীর ভ্রমরা জুটে করে গুঞ্জরণ। 
এতক্ষণে পূবের ভানু বাড়ায় তার জাল, 
নীল-সাদায় ভরে গগন ছেড়ে দিয়ে লাল, 
ঘাসের'পরে রামধনু বিলীন হয়ে যায়, 
রঙহীন কর্মসূচী শুরু হয় তাই।

মীনাক্ষী চক্রবর্তী সোম

আখাউড়া সীমান্তে 

স্মৃতিমেদুর মনগহনে অবিকৃত ছিল  যাপনকালের ইতিবৃত্ত।
একদিন বিষণ্ন সময়ের কথকতা সাথে নিয়ে 
পাড়ি দিয়েছিল কাঁটাতারের ওপারে 
কোনদিনও ফিরবে না বলে 
নাকি ফেরার রাস্তা বন্ধ বলে
সেদিন কেঁদেছিল খুব।
দেখা হল না 
গাভীন গরুর সন্তান....
সবুজ ধানের খেত হলদে হওয়া....
গোলা ভরা হয়নি তখনও....
ঠাকুর দালানে মূর্তিতে কাজলের টান....
আজন্ম লালিত ভিটের নাড়িছেঁড়া বড় কঠিন!!
বাপ-ঠাকুর্দার সঞ্চিত স্মৃতি বন্ধক রেখে
নিরুদ্দেশের উদ্দেশ্যে যাত্রায় ছিল উদ্বেগ!
অনেক বছর পর দাগের এপারে দাঁড়িয়ে 
মাটির গন্ধ শুঁকে চোরা দীর্ঘশ্বাসেরা
অজান্তেই সারি দিয়ে চলে যায় দিগন্তে ।
লালপেড়ে শাড়িতে অথর্ব শরীর
ছুঁয়ে পেতে চায় হারিয়ে যাওয়া শেকড়ের সন্ধান।
দুপাশে দুদেশের সীমান্ত প্রহরীকে সাক্ষী রেখে
প্রণাম করে উঠে চোখ মুছেছিল আঁচলের খুঁটে
আখাউড়া সীমান্তের সবুজ প্রহরী
তারও চোখ ভিজেছিল বুঝি মায়ের সৌরভে ।।

প্রতীক হালদার

সংসারের কাণ্ডারী 

নৌকার ন্যায় সংসার টার
কাণ্ডারী যে বাবা,
ঝঞ্ঝা-তুফান যতই আসুক 
শিরদাঁড়া রাখে সোজা।

সংসারেতে অর্থ নিয়ে 
যুদ্ধ যখন চলে,
ঝরে পড়া ঘামের কণা 
তোমার কথা কথা বলে।

নেই অজুহাত,নেই বিশ্রাম 
নেই তো তোমার শখ,
গাছের ছায়ার মতো তুমি 
সংসারে-ই রক্ষক।

নতুন জামা,নতুন জুতো 
খেলনা কিবা খাবার,
শুধুমাত্র তোমার পরিশ্রম 
এসব করে জোগাড়।

ভাবনা তোমার অনেক বেশি
তাই তো তুমি সেরা,
সংসারটা তাই তো বাবা
তোমার শ্রমে ঘেরা।

সাগর শর্মা

এইখানে সূর্য উঠে

এইখানে সূর্য উঠে-দিনের আলো ফিরে আসে বারবার,
সোনালি রোদে ঘেমে উঠা পাতা পত্ররন্ধ্র দিয়ে হাঁপ ছাড়ে;
প্রভাত রাঙা হয় আজও ওই দূরে জুরি নদীর পারে।
কলকলে বয়ে চলে,লক্ষ্য তার দূরের গাজীপুর পাহাড়,
ধ্রুপদীর সুরে চোখের আড়ালে কে দোলায় সেতারের তার?
শীতের সবুজ পাতা শিশিরের ভারে কাত হয়ে পড়ে;
বসন্তে শুধু নয়,এখানে কোকিল বারোমাস গেয়ে চলে রাগিনীর সুরে।
সন্ধ্যায় অচেনা রেল কুহুরবে বয়ে চলে শত যাত্রীর ভার।।

এখানে শরৎ এলে এখনও শিউলি সাদা হয়ে ফোটে,
পুজোর গন্ধ পেয়ে বাঙালি হৃদয় নিয়মিত করে আনচান।
সোনালি ধান জন্ম নেয় গ্রামগঞ্জের শস্যশ্যামল মাঠে-
এ রীতি আজকের নয়,যখন একাত্তরে বাঙালি দিয়েছিল প্রাণ;
সবকিছু এক ছিল,হারানো অতীত ভেবে কেবলই বুক ফাটে!
এইভাবে হেমন্তও আসে,অপেক্ষায় থাকি কবে শুনব হেমন্তের গান।।

সজীব কুমার পাল

অলৌকিক এক সংসার (গল্প)

      তুষার এই জীবনকে ভালোবাসে না।সে চেয়ে ছিল অন্য কোনো জীবন।যে জীবনে সুখ থাকবে অথচ অহংকার থাকবে না,প্রেম থাকবে কিন্তু সেই প্রেমে অবহেলা থাকবে না।তবে কি তুষার জুই এর কাছে অবহেলিত?জুই কি এখন অন্য আকাশের নিচে বসে জ্যোস্না রাতের চাঁদের আলোর খেলা দেখে?তুষার আবার ভাবতে থাকে ,আচ্ছা পুরুষ জাতি নারীদের সৌন্দর্যে নিজেকে সঁপে দেয়,নাকি নিজের যৌবন উত্তেজনার কঠিন বাস্তবতায় নারীর প্রতি প্রবল আকর্ষণ জন্মায়? যদি নারীর সৌন্দর্যে পুরুষ মোহিত হতো তাহলে পৃথিবীর অসুন্দর নারীরা কখনো পুরুষের ভালোবাসা পেতো না।আজ রোববার ।তুষারের অফিস নেই।ঘরে বসে আছে।হাতে মোবাইলটা নিয়ে জুইকে ফোন দিল,,,,

-"হ্যালো "

-কেমন আছো জুই?

- ভালো ।তুমি কেমন আছো?

- পৃথিবীতে সবচেয়ে সহজ ভালো থাকা,আবার সবচেয়ে কঠিন ভালো রাখা ।আমি ভালো নেই ,তবে ভালো আছি।

- কি বলছ এইসব ?

- আচ্ছা জুই তোমার কাছে ভালোবাসা মানে কি?

- জীবন।

- কেমন জীবন ?

- যে জীবনে নদী থাকবে অথচ জলের স্রোত থাকবে না।সেই নদীতে "তুমি" নামে একটা মাঝি থাকবে, তার লগি দিয়ে "আমি" নামে একটা মানুষকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে সাত সমুদ্র তেরো নদী। হঠাৎ করেই প্রবল বৃষ্টি হবে।সেই বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে "আমি" নামে সে মানুষটা "তুমি" নামে মাঝিকে বলবে ,"আচ্ছা,অঝোর বৃষ্টিতে সাগরের মতো নদীতে কখনো ঝড় ওঠে?"তখন মাঝি বলবে," ওঠে ।সেই ঝড় অন্যরকম,সেখানে মিলন হয় জলের সাথে হাওয়ার।,,,,,,"

তুষার জুইকে থামিয়ে বলছে ,"কই সে জীবন তো আজও আমি পাইনি?"

- তুমি আমাকে আপন করতে চেয়েছ,ভালোবাসাকে নয়।কারণ আমাকে তোমার প্রয়োজন,একটা পুরুষক একটা নারীকে একটা বয়সে কাছে চায় ।তুমি সেই চাওয়ার টানে চেয়েছ আমায়।

তুষার কোনো কথা বলল না আর।কলটা কেটে দিলো।জুই অনেকবার কল করছে ,মোবাইলের শব্দ তার কানে পৌঁছাতে পারছে না ।সে এখন অন্য একটা জগতে।সে ভাবছে,সে কি তবে জুইকে শুধু রাতের সঙ্গী হিসেবে চেয়েছে! কখনো জীবনের সঙ্গী হিসেবে নয়!কিন্ত তুষার ত তাকে নিয়ে সংসার করতে চেয়েছে ঠিক তবে বিয়ের পর ।কিন্তু বিয়ের আগে যে সংসার ভালোবাসার নামে গড়া হয় সেই সংসারের সুখ উপভোগ করতে সে চায়।যে সংসার দেখা যায় না,ছুঁয়া যায় না।শুধু অনুভব করা যায় ।

সুপ্রতিম ভৌমিক

অন্ন চাই (গল্প)

            অনাথ, ক্ষুধার্ত, অন্নহারা শিশুরা ক্ষুধা নিবারণ হেতু পথে বেরিয়েছে । খাদ্যের সন্ধানে দ্বার হতে দ্বারে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে পথ চলছে । কোথাও অন্নের সংস্থান মেলেনি । আশাহীন অন্তরে ক্ষুধার তাড়নায় পথ পাড়ি দিচ্ছে । অবশেষে দলবদ্ধ হয়ে এসে পৌঁছেছে এক দানবীর উদার মনুষ্যের দ্বারে ।

                  প্রকৃত মানবিকতার অধিকারী সেই মানব গৃহ হতে অনাথ, অন্নহীন শিশুদের কন্ঠধ্বনি শুনতে পেলেন । দ্বারে এসে প্রত্যক্ষ করলেন, একদল অন্নহীন অসহায় শিশুকে ; শিশুরা ক্ষুধার্ত, আহার প্রার্থী, ভিক্ষা চাইছে । আর শিশুরাও ভাবছে তিনি হয়তো কিছু একটা দেবেন,জঠর জ্বালা উপসম হেতু । গৃহকর্তাকে সম্মুখে উপস্থিত দেখে তারা নিরাশ অন্তরে একটুখানি আশার পরশ পেলো , মনে আশার আলো জাগলো । গৃহকর্তা শিশুদের আশ্বস্ত করে অন্দরমহলে প্রবেশ করলেন । গৃহ হতে দু'হাত  ভরে সেই দানবীর অন্ন নিয়ে খুশীতে বাইরে বেরিয়ে এলেন । শিশুদের সামনে এসে প্রাণ মন উজাড় করে অন্নদানে রত হলেন । ক্ষুধার্ত শিশুদের প্রসারিত উন্মুক্ত হস্তে অন্ন ঢেলে দিলেন । আর শিশুরাও তা' আপন মনে অনাবিল আনন্দে গ্রহণ করে ক্ষুধা নিবারণের খানিকটা পথ খুঁজে পেলো ।

স্বপন দেবনাথ

এসেছিলে একদিন

হঠাৎ এসেছিলে একদিন এই বিজন পথের বাঁকে 
চেয়েছিলাম আমরা দুজন দুজনার দিকে।
হয়েছিল অনেক কথা , যদিও ছিল না বলার কিছু
তথাপিও তোমার শব্দের ধ্বনিরা ধাবমান তোমার পিছু।
প্রস্ফুটিত এই পথের ধারে কতশত রকমারি ফুল
তোমার সেই কবরীর মাঝে খেয়েছিল তারা দোল ।
যৌবনের অরুণোদয় থেকে পরেছিল এক ক্লান্তির ছায়া 
তোমার স্পর্শে স্নিগ্ধ হলো আমার কবোষ্ণ কায়া ।
রূপে পরাক্রান্ত হয়ে তুমি করেছিলে কলরব 
তোমার রবে বিভোর হয়ে আমি হয়েছি পরাভব।

কল্যানী ভট্টাচার্য্য

সঠিক ইন্দ্রিয়

তুমি সুন্দর তুমি শ্রেষ্ঠ স্রষ্টা
তোমার শক্তি নীরেট
জীবন মৃত্যুর অনুভূতি তুমি। 
যেমন হয় আলো আঁধার
আকাশ,বাতাস,জল,বায়ু
সুখ দুঃখের সম্মিলন। 
শিরায় উপশিরায় রক্তের উপস্থিতি
ঠিক তেমনি তুমিই এ ধরিত্রীর
বেঁচে থাকা। 
তুমি কোমল,তুমিই সর্বশক্তিমান
বিলিয়ে দেওয়া তোমার অধিকার। 
গড়ে তোলাই তোমার পরিচয়
শাসন তোমার অধিকার। 
সযতন স্পর্শে যুঝে নাও
জাগিয়ে তোলো জেগে থাকা
ইন্দ্রিয়ের সঠিক প্রয়োগ চাই।

পাপিয়া দাস

নির্লজ্জ

কোথা থেকে এল 
তিন তিনটে বেড়াল।
প্রতিদিনই ঘরে বাইরে
যন্ত্রণা দেয়  বেসামাল।
কর্তা যখন মারতে যায়
বলি মারবে একটু যতনে।
আমরা যদি খাবার  না দেই
খাবার  পাবে ওরা কেমনে।
ভীষণ জ্বালাতন করে সারাক্ষণ 
স্বভাব তো ওদের নির্লজ্জতা।
বাঁচিয়ে বাাঁচিয়ে রাখি তাদের
তারাই করে আমার  সাথে কপটতা।
চুরি করে খাবার খাই
আবার  বিছানায় ওঠে ঘুমাতে চায়
কতো জ্বালা সহ‍্য করব
তিন তিনটে বিড়ালের।
আমি দয়া দেখাই  তাদের প্রতি
নষ্ট করে,চুরি করে খায়
সবার খাবার।

রাজীব বসাক

ধর্না

আমি ধর্না দেবো নির্জন প্রান্তরে,
শূন্য মরুভূমির বালুচরে,
যেখানে সকাল হবে শূন‍্যতায়,
সন্ধ্যা আসিবে মরুর বালুঝড়ে।।

আমি ধর্না দেবো মৃত্যুর পরে,
যখন ধোঁয়া হয়ে বিলীন হবো,
যখন আমায় ভুলে যাবে সব, 
আমি ধর্না দেবো আমার শূন‍্যতায়।।

আমি ধর্না দেবো ভুলের মাঝে,
দূর্ভীক্ষমাখা শহরের তীরে,
যেখানে ভোরের আলো ছড়াবে,
আর্তনাদ আর মৃত্যুর কলরবে।।

আমি ধর্না দেবো মিথ‍্যার শাসনে,
রক্তচক্ষু আর অত‍্যাচারের পদযাত্রায়,
ভূমির মাটি যখন রক্তে রাঙা,
যেখানে রাত না ফুরিয়ে চলে আসে সন্ধ্যা।।

সংগীত শীল

নিস্পন্দ

তোমার তানপুরার মতো
অনেকদিন আগে থেকে
আমাদের সম্পর্কেও ঘুণ ধরেছে
শিল্পী যেমন মাধুরি মিশিয়ে 
গানগুলোকে আগলে রাখে;
আমরা পারিনি; তাই মুক্তি দিয়েছি।

হুলুস্থুলি খাঁ খাঁ দুপুর নেই বলে বোধহয় 
হ্যাপিত্যেশের কোনো সমাগম পাচ্ছি না।
হয়তো দগ্ধ চোখে ঝর্ণার জল বইছে,
অনুচ্চারিত বর্ণমালা গলা শুকিয়ে কাঠ!

এ্যালবামের স্মৃতিগুলি নিষ্প্রভ বেলায় হারিয়ে ফেলবো দুজনে,
জমানো অভিসারও একদিন কেটে যাবে।
নতুন মানুষ শ্রাবণে দীপশিখা জ্বালাবে
নতুন গানে নতুন প্রেমে বাঁধবে।

শেওলাপড়া শ্বেত পাথরে লেখা নামটি 
অবশেষে নিস্তব্ধতার ভীড়ে লুকোবে,
তোমার আমার দেখা হবে কথা হবে
শুধু কুসুমের নীড়ে পাল্টে যাবে স্বপ্নের খেলাঘর।

রমা চন্দ্র

স্পর্শ

নিদ্রাহীন রাতের আঁধার ভাঙে...
চৌকিদারের বাঁশি,
ফুটপাতে শায়িত বয়োবৃদ্ধের কাশি,
রেলগাড়ির হুইসেল...
রেলপথে চাকার ঘর্ষণ
রাতজাগা শিকারীর আঘাতে
নিরীহ পাখির অসহায় ক্রন্দন...,
গাড়ির ঘোষণা-
অনুক্ত একাকিত্বের বেদনা,
ঝিঁঝিঁ পোকা সারমেয়দের একটানা চিৎকার...
বদ্ধ উন্মাদের বিকার-
সব মিলেমিশে একাকার...!
এক ভীষণ শক্তিশালী শব্দশেল
অবিরত অবিরাম...
কান পর্দায় দেয় টোকা
উত্তেজিত অডিটরি নার্ভটি বোকা!
অস্থিরতায় ছাড়ি শয্যা
শুরু করি পদচারণা 
অজান্তে বারান্দায় যাই
মায়ের হাতের মাধবীলতার ছোঁয়া পাই,
পলকে স্পর্শিত আমি
চাঁদনী প্লাবনে ভেসে যাই-
দূর-নীহারিকায়...!

দীপান্বিতা পান্ডে দীক্ষিৎ

শুধু নিজেকে নিয়ে

সকলেই বড় ব্যস্ত নিজেকে নিয়ে, 
তাকাবার  নেই সময় অন্য কোনো দিকে ৷
ইচ্ছা সকলেই দেখুক আমাকে৷
আর আমি উঠে গেছি খুব উপরে,
নিচেটা বড্ড ছোটো মনে হয়
 দেশলাইয়ের বাক্স কি লিলিপুটেব মতো ৷
তাই সব গুলো ঠিক দেখা হয়ে উঠেনা,
কেবলই বড়গুলো থাকে ফ্রেমে বাঁধানো ৷
সাদা কাগজ না হলে অক্ষরগুলো পরিচিতি পাই না,
অর্থ না হলে অনর্থের সংস্থান হয় না ৷
মুল্যবোধ এখন লুকিয়ে থাকে কালো চাদরে ,
পাছে সম্মান হারায় লক্ষ তারার মাঝে ৷
আকাশটা শুধু ঢাকা থাক অমাবস্যার আঁধারে ৷

সায়ন্তন সরকার

সময়যাপন

ফেনা ওঠা সমুদ্রের মতো
ফনা তুলে সবাই ছুঁতে চায় আকাশ
ব্যর্থ প্রয়াস সময়ের পরিহাস ;
অঙ্গে তারুণ্যের তরঙ্গ
ঢেউ এর মতো ভেঙে যায় ,
মোহনায় মোহভঙ্গ হয় ;
তবু আসমুদ্রহিমাচল ;
ঢেউ এর পর ঢেউ এসে যায়
কেউ কেউ কেমোফ্লেজ করে ,
কেউ বা ফেকলুর মতো
কেউ কেউ করে ছুটে মরে
সাময়িক সুখ সময়ে ,
থিতিয়ে যায় নিয়মের নিয়ন্ত্রনে
কালের কলমে অমৃতের বিষে ,
মিশে যেতে হয় ;
গভীরতার সাথে সময়যাপনের
অনন্ত সুখ সবার সয় না !

রিয়া বৈদ্য

তোমাকেই

হে সাথী, তোমার প্রাণের ভিতরে
বিপ্লবের আগুন জ্বলেছিল ,
তোমার ভরাট কণ্ঠে
এখনও শুনি সম্প্রীতির সুর
তোমার হৃদয় ক্ষেতে ফুটেছিল
ভালোবাসার গন্ধরাজ ।
পথ ভ্রষ্ট পথিকের অচেনা পথে
প্রকৃত বন্ধু তুমি ।
আদর্শে ধুয়ে নিয়েছো
শরীরে নোনা ঘাম ।
জীবনের পথ পরিক্রমায়
ছড়িয়েছে সত্যের বচন ।
তোমার না বলা কথারা
ভেসে ওঠে আয়নায় ,
খেই হারানো শব্দগুলো
জড়িয়ে ধরে শুধু তোমাকেই !

অম্পিকা পাল

গর্বিত

সেদিনের উপহাস করা মানুষগুলো
তাকে এগিয়ে দিচ্ছে-
ওরা নিজেরাই জানেনা কীভাবে-
ওরা শুধু দমন করতে জানে,
দুঃখ দিতে জানে,
শোষণ করতে জানে!
কিন্তু ওরা জানেনা ওদের দেওয়া দুঃখরাই 
সন্তান রূপে জন্ম নিচ্ছে 
খাতার পাতায়।
সে একসাথে তাদের 'পদ্য' বলে ডাকে।
ওরা বিকশিত হচ্ছে, দেশ-বিদেশে হচ্ছে প্রকাশিত!
আর তাদের মা
যে একটা সময় ভয়ে ভয়ে থাকতো,
মুখের উপর কোনো উত্তর দিতে পারতো না,
সে আজ পদ্যের গরবে গরবিনী।
সেদিনের উপহাস করা মানুষগুলো 
আজ চুপ হয়ে গেছে।
আজ সে 
মুখের উপর দিতে পারছে
জমানো প্রশ্নের উত্তর!
আজ অবাঞ্চিত যা কিছু,
চাপিয়ে দেওয়া মনগড়া নিয়ম;
তার বিরুদ্ধে গিয়েও 
সফলতার হাসি হাসে ;
আজকাল কবিতারও জন্ম দেয় সে,
'যেন' শব্দটি কবিতায় যুক্ত করলেও-
তাতে রয়েছে গভীর সত্য।
আধুনিকতার পরশে 
তারা আরো প্রাণবন্ত হয়ে উঠে।

দিন দিন প্রেমিকরা কবিতার প্রেমে পড়ে
কিন্তু কে!
কে তার জীবনের পদ্য পড়বে,
প্রেমে নয় ভালোবাসায়?

Nov 29, 2022

অপাংশু দেবনাথ

ষট্‌পদী-এক

আজন্ম বুকে চাষ করেছি স্বপ্ন কিংবা ভুল,
সারা জীবন ধরে জেনেছি, আমিই প্রথম ফুল।

হেঁটে যাও বলে হাওয়ায় ওড়ে সে আঁচল,
এই জীবন বুঝি শেখায়, ভালোবাসা সমর্পণ।

স্নান সেরে ওঠে এখনো কি পোড়াও শরীর?
বুকে চাষ করি বারোমাস তোমার অসুখ!

তৈমুর খান

পরজন্ম

পথ গুটিয়ে থাকুক 
গুটিয়ে থাকুক পথ 
তস্তরিতে পাণ্ডুবর্ণ আলো 
আবছা ভবিষ্যৎ।
 
মুঠোয় জোনাক রাখি 
জোনাক রাখি মুঠোয় 
সঞ্চয় এটুকুই 
পিপাসা থাকুক কলসির ফুটোয়।
 
দুয়ার আগলায় চোখ 
চোখ আগলায় দুয়ার 
নিঃস্ব ইচ্ছাগুলি বাঁচে 
বাঁচিয়ে রাখে খোঁয়াড়।
 
জলছবিতে সূর্য 
সূর্য জলছবিতে 
পরজন্ম এঁকে রাখি 
নিসর্গ নিশিতে।

সৌমিত বসু

মায়াবৌ - ১৩১

ছাই উড়ছে। চোখের ওপর দিয়ে গুঁড়ো গুঁড়ো ছাই উড়ে যাচ্ছে বাতাসের সীমানা পেরিয়ে। আমি ভাবি ,কোথাও হয়তো বা লেগেছে আগুন। কারো পুড়ে যাওয়া আসবাব ,বিছানাপত্র হু -হু করে ছড়িয়ে পড়ছে বুঝি বাতাসের সাথে।

ইস্কুলে বেরোবো ,আবার সামনে সেই ছাই। আমি ভাবি, কারোর জীবনে বা লেগেছে আগুন। সংসার ভেঙে ভেঙে চতুর্দিকে। তারই  ছাই ওড়ে দিনের বাতাসে।

বিকেলে পার্কে দেখি মুখচোখ সাদা হয়ে ছাইয়ের প্রলেপ। এবার ভেবেছি ,কারোর কবিতাখাতা হয়তোবা আগুনে পুড়ছে।হয়তোবা পুড়ে যাচ্ছে হারমোনিয়াম।

রাতে স্বপ্নের ভেতর দেখি ছাই ওড়ে। আলোটা জ্বালাই।ছাইগুলো মেখে নিই দু-হাতে আঙুলে।ভালো করে দেখি ,ও মেয়ে ,এতো তোর শরীর পোড়া ছাই।

কুশল ভৌমিক

মানুষ কে উড়তে দিন 

মানুষ কে উড়তে দিন
কেননা প্রতিটি মানুষ ভেতরে ভেতরে
একেকটা পাখি
পরিযায়ী মেঘের মতো মানুষ ভেসে বেড়াতে চায় আত্মরচিত সুনীল আকাশে 
দোহাই আপনাদের, এমন অদৃশ্য শেকলে
মানুষকে বাঁধবেন না
তাকে দিন উড়বার স্বাধীনতা। 
একবার, অন্তত একবার,মানুষ বুঝতে শিখুক -
এইসব কাঁটাতার, ব্যারিকেড, সংবিধান
নরেন্দ্র -ট্রাম্প-ওসামাদের বাইরেও
 মানুষের একটা আকাশ আছে,
যে আকাশটা শুধুই মানুষের। 

মানুষ কে উড়তে দিন
মানুষ বিশ্বাস করুক -
উন্মুক্ত আকাশটাই মানুষের মাতৃভূমি।

অনিক রায়

শ্মশানের যৌবন

হ্যাঁ ফিরেছে শ্মশানের কাঙখিত যৌবন, 
শ্মশান সাজছে নব আভরণ।

সাজাও সাজাও নদীর পাড়ে ফুলশয্যার খাট, 
বয়সের বাধা নেই কাকে যে টেনে নেবে- 
পেতে যৌবনের স্বাদ!
নতুন নাটে নাম হয় বসে চাঁদের হাট। 

হ্যাঁ শ্মশানের যৌবন ফিরেছে, আগুনে  ঘেরা চাদরে। 
শ্মশানের নাকি অহংকার হয়েছে, শ্যামা মা-র আদরে- শুনেছি যার দিকে তাকায় শ্মশান, 
তাকেই মোহিত করে।
যৌবনের অস্তি রাখে শেষ কাঠের কোটরে, 
তোমরা বাজাও খোল করতাল।
 চর্চা হোক শ্মশানের যৌবনের, 
নীরব নিশিত জ্বালাও প্রদীপ-
একে একে সঙ্গী হবো যৌবনের, প্রতিটি ক্ষণের।

পঙ্কজ কান্তি মালাকার

হাসি মোহন

তার গোলাপ ঠোঁটের হাসিতে
আনন্দ ছড়ায় বাতাস,
পলাশ রাঙা কপোল আভায়
রঞ্জিত হয় আকাশ,

তার বকুলচোখের তীর চাহনি
আদর বোলায় মনে,
গালে হাত দিয়ে ভাবছি তা'ই
বুঁজাচোখে আনমনে।

দাঁতপড়া মুখে ফ্যালফ্যালিয়ে
তখন বুড়ি দিল দেখা
"রসে মজেছ দাদুভাই!" -বলে
দিল মোরে ঝটকা,

"যাও সরে চামড়াকুচোঁ
দাঁতপড়া বুড়ি",
তেড়েমেড়ে বুড়ি বলে
"এককালে বুড়িও ছিল ছুড়ি,

এককালে এই রূপবাহারে
মজত রাজ্যের ছোড়া,
এই রূপবাহারে মুগ্ধচোখে
তোর দাদু হত আত্মহারা,

এখন আমার দিন গেল
মনে কি ধরবে তোর?
আন না এক রূপসুন্দরী
চামড়াকুঁচ পর্যন্ত কর ঘর।"

এই কি তবে রূপের মোহন
কচুরজলের মত!
বুড়ি ভাঙেনি স্বপ্ন,সত্য দেখালো
দিনের আলোর মত।

সুমিতা বর্ধন

ভিন্নতা

মনে হয় নিরুত্তাপ, নির্জীব একটি মানুষ,
উত্তাপের মাত্রা  কবেই শূন্যের কোঠায়, 
দিন যায়, সময় বয়ে  যায়
সেই গতিতে  কোন ফারাক  পড়ে না,
পার্থিব গতিতেও যে অবিশ্বাস,
চলার পথে কেমন একটা ধোঁয়াশা অন্ধকার,
সেই অন্ধকারের গতি পথ ধরেই
নির্জীব, নিরুত্তাপ মানুষের চলা,
হঠাৎ খেয়ালের বশে  দৃষ্টি  যায়
অন্ধকারের আকাশ ফুঁড়ে 
ভোরের  সূর্য উঠে,
কিন্তু ঐ সূর্যের তাপ ও যে 
বড়োই  শীতল ঠেকে।

রুদ্র মোস্তফা

প্রথা বিলুপ্তির পরের প্রথা 

ক্রীতদাস পিতার নয়নে কেউ পুঁতে ছিলো হিরে,
আভিজাত্যের আশায় রোজ সে চোখ খনন করছি...
অনেক বিপ্লব বয়ে গেছে কাগজের বুক চিরে  
আমরা তবু খনির মজুর জন্ম দিচ্ছি অভ্যাসের আঁতুড়ঘরে।
ভুলে যাচ্ছি কে কার জনক!
চোখের সুরঙ্গ ধরে খুঁজছি ভালো থাকার সকল শর্ত
খুঁড়ে চলছি পুঁজির গোপন গর্ত! 
রূপকথার রঙিন আদর ভুলিয়ে দিচ্ছে সমাজ
কথার রূপে আমরা হারাচ্ছি কণ্ঠের নির্মল স্বাধীনতা 
পুত্রের চোখ ফসকে পালাচ্ছে পিতার কোলাজ 
প্রতিদিন ভুলে যাচ্ছি পূর্বের পরাধীনতা। 
কেউ বলেনি হিরায় বিষ থাকে, 
কখনো কেউ প্রশ্ন করেনি, কে চড়ালো তার মূল্য? 
খনি ভেবে খুঁড়ে চলছো যাকে 
সে যে তোমার-ই পিতা,তুমি যে তারই সমতুল্য। 
পাথর গড়িয়েছে অনেক 
না দেখে মায়ের মুখ,দেখছি নয়া সাম্রাজ্যের ঘোমটা 
নিজেই বিক্রি করে নিজের মাথা 
আমরাই টিকিয়ে রাখছি দাস প্রথা— প্রথা বিলুপ্তির পরে।

সমরেন্দ্র বিশ্বাস

জেব্রার থিওরোম  


জেব্রার সাদা কালো দাগে হাত বুলিয়ে কেউ কি সমাধান করতে পারে জ্যামিতির থিওরোম? চিড়িয়াখানা থেকে বেরিয়ে এসেছে যে স্কুল, সেখানে আমার সেকেন্ডারীর ক্লাসটা ঝোলানো আছে ধার করা জামার ছেঁড়া পকেটে।

টানটান টাকার-সেতার বাজে ফেমাস স্কুলে। শহরে শহরে শিক্ষকদিবসের ইভিনিং শো-তে আজকাল খুব ভীড়। আমার কি আর ম্যাট্রিক, থুরি, সেকেন্ডারীটা পাশ করা হলো না? আকাশ থেকে উড়ে আসে বইএর বিচিত্র মলাট; কাকের পালকেরা লেপ্টে থাকে ল্যাপটপের সৌখীন ঘাসে। জীবনের ক্যালেন্ডার আর পরীক্ষার সিলেবাসে কোন তালমিল আছে কি? তবুও যানজটে দিশেহারা আমি পৌঁছে যাই প্রেইরী ঘাসের জঙ্গলে। সেখানে ফিস্‌ দেয়া সম্ভ্রান্ত ছেলেমেয়েরা ঘাসের বেলুন ফোলাচ্ছে। জেব্রার জামা পরে শিক্ষকেরা ঘুরে ঘুরে ঘাস খাচ্ছে।

বিজ্ঞাপনের সাইরেণ বাজলে তথাকথিত শিক্ষা পর্ষদের জুতোর লেস খুলে যায়। ঘোষিত  হয় – হায়ার সেকেন্ডারী পাশের ধূলোট বাদামী রাস্তা পোলট্রির মুরগীদের মতো মিথ্যে মিথ্যা মিথ্যা! মেশিনে ঢালাই করা নতুন নতুন রাস্তা চলে গেছে অসম্ভব সমস্ত বর্ণাঢ্য থিওরোমের দিকে, সেখানে সোনার খনি বাজছে! আপাততঃ টাকা দিয়ে কয়েকটা ফড়িং ধরে আনতে পারলেই এডুকেশন সিস্টেম ছাত্রদের গলায় ঝোলাবে কর্পোরেট মেডেল, ভূর্য্যপত্রের স্বাক্ষরবিহীন ডিজিটাল মার্কসশীট।

বর্ণাঢ্য থিওরোম আর মেশিনে ঢালাই নতুন রাস্তারা সুনীল আকাশের দিকে মাস্টার্স ডিগ্রীর ডিজিটাল রুমাল নাড়ছে। কয়েকটা সাদা পায়রা সেই সব রুমাল পকেটে গুঁজে তাদের স্বচ্ছ্বল ডানায় অন্য দিগন্তের দিকে উড়ে গেলো, যেখানে লকারে ঘেরা জীবনের ডিকশেনারি। 

জেব্রার সাদাকালো দাগে হাত বুলিয়ে ভাবাচ্যাকা আজও আমি বসে আছি থিওরোমের কিনারায়। বিষয়টা খুবই সহজ, অথচ আমার এখনোও ম্যাট্রিক পাশটা হলো না।

কৃষ্ণকুসুম পাল

প্রেমের কবিতা

হিমালয় কবিতা লিখছে-
বরফে ঢেকেছে শরীর
সৃষ্টি হচ্ছে নদী
আকাশে তুলেছে শির
তাই সে মৌন।
               
সাগর কবিতা লিখছে
নোনা জলে উঠছে গর্জন
বুকে খেলছে অসংখ্য প্রাণী
চোখে নেই ঘুম
তাই সে উত্তাল।
               
কবি কবিতা লিখছে-
অসীম বিশ্বে সে একা
প্রেমেপাগল,প্রতিবাদে আগুন
সে হিমালয় হতে চায়
সে সাগর হতে চায়
তাই সে প্রাণ বিলায়।

আব্দুল গফফার

এখন বড় একাই লাগে

নীলাঞ্জনা একবার তাকিয়ে দেখো,
আমার দুচোখের পলক স্তব্ধ!
তোমার পটলচেরা চাহনিতে একবার দৃষ্টি ফেরাও,
শুভদৃষ্টি হয়ে ফিরে আসুক -
তোমার গভীর অনুরাগের ছোঁয়া।

নীলু তোমার মনে পড়ে,
যেদিন আমাদের প্রথম দেখা-
আগুন আর বৃষ্টি খেলায় মেতে উঠেছিল,
বৃষ্টিকে সাক্ষী রেখে তোমার উতলা মন,
গ্রাস করেছিল আগুনের আঁচকে!

ওত পেতে বসে থেকে, 
কত সময় কেটে গেছে প্রেমালাপে;
কখন জন্ম নিয়েছিল ঘর বাঁধার স্বপ্ন বুঝিনি-
যে স্বপ্ন বৃষ্টি আগুনকে মাড়িয়ে,
আজও ফানুসের মত ছুটে বেড়াচ্ছে!

জানো তোমার ভালোবাসার অঝোড় বৃষ্টিতে - 
অবগাহন করে চলেছি নিরন্তর।
কোনদিন আর আসবে না, শুভলগ্নের সেই মুহূর্ত,
আগুনে জ্বেলে পুড়ে খাক আমার মনবাগান।
আমাকে এখন বড় একাই লাগে!

নমিতা সরকার

সত্য

ঘুম আমার জেগে আছে রাতের শহরে আলোক সজ্জার ভীড়ে ব্যস্ততার শহরে -
গাড়ির সাইরেনের বেজে ওঠা সমস্ত শব্দ উপেক্ষা করে হৃদয়ে বেজে উঠে একটি শব্দ আমি কে বা কে আমার?
মাতাপিতার বিন্দু বিন্দু রক্তকণিকা ক্ষয় করে পৃথিবীর বুকে যে জীবন প্রতিস্থাপন করেছি তাদের হতে পেরেছি? না তাদেরও হতে পারি নি - 
তাই তোমারো হতে পারি নি, তবুও সেই তোমাকেই খুঁজি বারবার -
আমার জন্মই বলে দিয়েছে মৃত্যু অনিবার্য তাই আমি শুধুই তার।

রাহুল সিনহা

নিশিডাক

এই কলহপর রাত ও অমিল সিডেটিভ
লিখে রাখে বায়বীয় হাতছানি,
যতটা তীব্র মনখারাপ আমাকে
বন্দরের দিকে টেনে নিয়ে গেছে,
তার সুরে হারমোনিকা বাজাও,
হয়তো চন্দ্রাহতের মতো
ফিরে আসবো তোমার জানালায়।

নন্দিতা দাস চৌধুরী

ঘনছায়া আশ্রয়


প্রতিদিন নিভৃতে তোমার  সাথেই কথা বলি আর ডুব দেই অতলে,
ভালো করে তাকিয়ে দেখি অগোছালো জীবনটাকে যা এখনো অপেক্ষায় রাত গুনে,
প্রেমিক  হওয়া তো সহজ কথা নয় তবুও পা তো সেদিকেই বাড়াই,
আকাঙ্ক্ষা আরাবল্লী পর্বত, প্রতিনিয়ত ছুটছে পূর্ণা গিরণা খাম্বাতের টানে,
যে ঘাটে তুমি মাঝি সে ঘাটেই আমার জলসোঁই সে যত ঝড় তুফানই হোক না কেন,
যে ভাবনা আমায় অন্তরে অন্তরে বাউল করে সেতো তোমারই অভ্যর্থনা, এক ঘনছায়া আশ্রয়।

শান্তনু মজুমদার

 ইন্দ্রের সভা (গল্প )


শুভ সকালের খাবার খেয়ে বাড়ি থেকে নিজের প্রিন্টিং এর দোকানে যাচ্ছিল সাইকেলে করে। চন্দ্রাদের বাড়ির সামনে ভিড় দেখে এগিয়ে গেলো। জ্যেঠিমার শরীর এমনিতেই ভালো নেই অনেকদিন ধরে। কিছু আজে বাজে ঘটে গেলো না তো আবার। কিন্তু কেউই যে বাড়ির ভেতর ঢুকছে না করোনা আতঙ্কে। 

শুভ ঢুকবে কি না ভাবছে। এমনিতেই চন্দ্রার বাবা শুভকে দু' চোখে দেখতে পারেন না। কোন প্রেম টেম নয়। শুধু সমবয়সি বন্ধুত্ত্ব। মনের মিল একটু বেশী। কিন্তু উনাকে কে কি বোঝাবে। চন্দ্রার বাবা তো শুভকে সুযোগ পেলে অপমান করতে ছাড়েন না। উনি চাকরি বাকরি করে না এমন ছেলে একদম পছন্দ করেন না। তাও আবার সামান্য দোকানদার শুভ, যে কিনা উনার মেয়ের সাথে একটু যেন বেশী ঘনিষ্ট। একদমই সহ্য হয় না উনার।

অনেক সাহস করে, আর বাড়ি থেকে বেরোবার সময় একটা ঘটনার কথা মনে হতেই শুভ তাদের বাড়িতে ঢুকে গেলো। 

কি বাজে অবস্থা। মাসিমা অসুস্থ হয়ে পরে গেছেন বাজে ভাবে। এমনিতেই দুটো কিডনী  খারাপ। পড়ে গিয়ে কিডনী জয়েন্টে আরো মারাত্মক ব্যথা পেয়েছেন। চন্দ্রা আর জ্যেঠু একা তুলতে পারেননি মাটি থেকে। রুগ্ন মানুষটার সাথে তারা দুজনও নিচে বসে রয়েছেন অ্যাম্বুলেন্সের অপেক্ষায়। জ্যেঠু নিজেও অসুস্থ খুব। পারকিনসন্স, স্পন্ডালাইটিস এর সমস্যা আছে। অ্যাম্বুলেন্সে চন্দ্রার সাথে শুভও উঠলো। লোকাল হাসপাতাল থেকে রেফার করা হল রাজধানীর গোবিন্দ বল্লভ পন্থ হাসপাতালে। সব মিলিয়ে প্রায় দু' লাখ টাকা লাগবে। অপারেশন হবে। 

চন্দ্রার বাবা সারা জীবন সামান্য বেতনে সরকারি চাকুরি করেছেন। যা রোজগার করেছেন সব স্বামী, স্ত্রীর চিকিৎসা, সন্তানদের পড়াশোনা ও বড় মেয়ের বিয়েতেই শেষ। পেনশনের টাকা দিয়ে অনেক কষ্টে সংসার চলে। ফোনে চন্দ্রার মুখে দু' লাখ টাকার কথা শুনে    পাগলের মত এদিক ওদিক অনেককেই অনুরোধ করলেন এই দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানোর জন্যে। বড় মেয়ের জামাই কিছু টাকা পাঠালো। দুদিনে ৫০ হাজার টাকা ব্যবস্থা হল। বিমর্ষ হয়ে পড়লেন তিনি। তখনই জানতে পারেন উনার অপছন্দের শুভ তার তিনটি দামী কম্পিউটার, একটি দামী প্রিন্টার ও প্রজেক্টর বিক্রি করে এবং নিজের কিছু সেভিংস মিলিয়ে প্রায় এক লক্ষ ৭০ হাজার টাকা ব্যবস্থা করে নিয়েছে।

প্রায় এক মাস অতিক্রান্ত। চন্দ্রার মা আজ অনেকটাই সুস্থ। শুভ আর চন্দ্রা আজ উনাকে নিয়ে বাড়ী ফিরছে। ট্রেনে আসার সময় চন্দ্রা শুভকে বললো, "জানিস শুভ আমি জানতাম মার কিছু হবে না। যেদিন মা পড়ে গেলো ঠিক তখনই আকাশে ইন্দ্রের সভা বসেছিল। আমি আগে কখনো দেখি নি। কিন্তু বইতে পড়েছি। তখন ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করলে সবাই মিলে আশীর্বাদ করেন।"

শুভ মনে মনে হাসে। ওইদিন সাইকেলে উঠার আগে আকাশে চোখ পড়তেই দেখেছিল সূর্যের চারিদিকে গোল রামধনু। আগে কোনদিন দেখে নি। মাকে ডেকে দেখাতেই মা বলেছিল, "প্রণাম কর বাবা, ইন্দ্রদেবের সভা বসেছে। তোর মঙ্গল হবে। আশীর্বাদ নে বাবা। তুই যা করবি তাতেই জগতের মঙ্গল হবে। তোরও ভালো হবে।"

চন্দ্রাকে বলল শুভ সেই কথা। দুজনেই দুজনকে নতুন করে আজ দেখতে লাগলো। সাতরঙা তৃপ্তির হাসি দুজনের মুখে।

সাগর শাহ্

তোমরা হও আগুয়ান

ওহে নওজোয়ান হও আগুয়ান
ভাঙ্গ জালিমের ঘাঁটি।
বাংলায় আজ আগাছা জন্মেছে,
অনুর্বর আজ মাটি। 

নজরুল সুকান্ত ফিরবে কবে.! 
প্রতিবাদী এক মিছিল হবে,
গরীব দুঃখী আছি সবে।
বলো না,বলো আমায়
তারা আবার ফিরবে কবে.?

কে আছ এমন, কে এমন রবে ?
তবে কি কেউ নেই.!
যে এমন তাদের মতো হবে।
তবে কি গরীব দুঃখী ভোগবে.!
নিপীড়ন নির্যাতনে,
বিদ্রোহ জানাবে শুধু মনে মনে।

বাংলার মাটি হবে খাঁটি, 
যদি তোমরা হও আগুয়ান। 
ওহে নবীন নওজোয়ান 
আমার উদাত্ত আহ্বান, 
তোমরা হও আগুয়ান।

মো: রুবেল

সমর্পণ

যে মেয়েটা তোমার বুকে আকাশ খুঁজে।
যে মেয়েটা ঐ আকাশের পাখি হতে চায় অনায়াসে।
যে মেয়েটার 'তুমিহীন' প্রবল প্রলয়ের উদ্ভাবন।
যে মেয়েটার সব তোমার নামেই সমর্পণ।
যে মেয়েটা স্বপ্ন সাজায় অবিরত।
যে মেয়েটা সব প্রথা ভাঙে নিজের মতো।
যে মেয়েটার মেঘের মতো জমাট দুঃখে,
যে মেয়েটা 'সুখ বলতে' তোমায় বুঝে।
যে মেয়েটা তোমায় নিয়ে বাঁচতে বলে,
আর যাই হোক
সে মেয়েটা তোমায় ভালোবাসতে জানে।।

শান্তনু মজুমদার

আর কত দিন

কাজে মন বসে না।
দেখেছি বাবার মনভাঙা খাটুনি,
আপোষহীন চুপ জীবন।
মাথার খুলিটাকেও সাদা হয়ে ছাই হতে দেখেছি।
বুক ভেঙেছে, চোখ ভেজে নি।
কেউ তাঁকে মনে রাখেনি।
শুধু দাগ গুলি থেকে গেছে 
আলোচনায়।

মুক্ত পথিক এবার ভবঘুরে হতে চায়।
গলি পথ, মাঠ, অন্যের ড্রইংরুম,
বইয়ের গন্ধ, ট্রেনের কামরা-
মানুষ থেকে অনেক আলাদা।
তারা শর্ত লঙ্ঘনে হারিয়ে যায় না দূরে।
দুহাত মেলে কাছে টানে।

আকাশ অনেক বড়,
তোমার পৃথিবী বিশাল,
চোখের সীমানা ছাড়িয়ে বৃষ্টি পরে।
সেই বৃষ্টিতে আমি ভিজি।
আর কটা দিন, ভিজতে দাও।
যতদিন না খুলিটা সাদা হয়।

মীনাক্ষী চক্রবর্তী সোম

চন্দ্রাহত

অভিসার রাত্রিতে 
ছায়াপথের সাথে কত রাত হেঁটেছে চাঁদ।
বিনিদ্র যাপনে ফিরেও দেখেনি  
আকাশের নীলিমায় ছিল সমর্পণের ইঙ্গিত।
নিঃশব্দ পদচারণায়  
চন্দ্রাহত জোছনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে 
মুখ ঢেকেছিল মেঘের ওড়নায় 
সাথে ছিল অগুনতি নক্ষত্রপুঞ্জ।
সূর্যের প্রতীক্ষায় থাকা আলো
তখনো বিদ্রোহ করে নি 
সেরকম প্রতিবাদের ভাষা 
ওদের জন্য লিখে রাখেনি কেউই।
লিখেছিল শুধু আলোকবর্ষ,
দূর থেকে বয়ে এনেছিল 
অনেক উল্কাপাতের সাথে আশঙ্কার সারি।
ধূমকেতু তখনো জাগেনি
যে পরিমাণ আলোর প্রয়োজন  
আশ্লেষে, প্রতিবাদে অথবা বিদ্রোহে
সেটুকু ধূসর হয়ে মিশেছিল সূর্যের সাথে ।
রোদের সাগর সাঁতরে পেরিয়ে এলে
ছায়াপথের মোহনায় মেশা যায় 
একথা চাঁদও জানে।।

পারমিতা মুস্তাফি

তুমিই মূল

ঝড় উঠেছে এলোমেলো সব,
কতই না রং মাখবো -
কত যে সাজবো দিঘল  চুলে,
কত না আচার শুনবো।
বর  এলো বর এলো -
কাজলা দিদির মেয়ে,
দেখতে এসে বললো শেষ -
আমি তোমার হয়ে।
সেই যে এলো রাজকুমার -
রাজপুত্র শুয়ে,
এক যে আছে রাজ কন্যে -
কদমতলা হয়ে।
হাসি খুশি মিনতি দি -
ঘুমিয়ে আছে চিতে,
এক যে আছে চাঁদমামা -
গাইছে সমান শীতে।
চাঁদের বুড়ি চরকা কাটে -
গন্ধে ভরা ফুল,
একুল ওকুল দুকুল আছে -
তুমিই আমার মূল।

জগন্নাথ বনিক

আপন পরের খেলা 

আপন মানুষ কাছের যেমন,
আপন মানুষ আবার পর।
আপন পরের চলছে খেলা,
     এই পৃথিবীর ঘর।

যাকেই আমি আপন ভেবে,
বলছি মনের কথা।
দুঃখ দিয়ে কষ্ট দিয়ে আপন মানুষ,
দিয়ে যায়, আবার মনের ব‍্যথা।।

ভাই বলো, বন্ধু বলো,
সবাই আপন মানুষ।
অর্থের স্বার্থে হয় যে পৃথক,
থাকে না তখন আপন মানুষের হুঁশ।।

একই রক্ত আপন পরের,
রঙ যে আবার লাল।
এই পৃথিবী তোমার আমার,
হিংসা নয়, যুদ্ধ নয়, ভালোবাসা থাকে যেন চিরকাল।।

গৌতম দাস

চ্যানেল

যান্ত্রিক জমানায় বৈদ্যুতিক
সংযোগ ছাড়াই চলে এক চ্যানেল।
ঝড়, বৃষ্টি, তুফানেও এই চ্যানেল পরিষ্কার দেখায়।
চোখের ইশারায় আর মুখোশের দাপটে চলে এটা।
রোগী,যোগী, তীর্থস্থান দর্শনেও ফাটাফাটি কাজ করে এই চ্যানেল।
লাইনে দাঁড়াতে দাঁড়াতে যখন কোমর ভাঙার অবস্থা।
হঠাৎই চোখে পড়ে চ্যানেলে দেখায় গন্তব্যস্হলের রাস্তা।
পূজা মন্ডপে আর শনিতলাতে-
নকুলদানা না পেয়ে কারোর মনে লাগে দুঃখ। 
একই স্হানে চ্যানেলের এক চুটকিতে -
চলে আসে আপেলের টুকরো আর ভোগ।
বাড়ি ঘরের আয়োজনেও পিছপা হয়না এই চ্যানেল।
সমাজের লোকে শুনে শুধু খিচুড়ি আর সব্জি,পায়েস এখন শেষ।
ওমা আড়ালে দিচ্ছে পায়েস যাদের চ্যানেল আছে বেশ।
এই চ্যানেলটা ভীষণ ভোগী-
কারোর মেধা পিষে মেরে, কামিয়ে খেয়ে সাজে শান্ত যোগী।
চ্যানেলটার আছে এক ধাঁধা-
ঘোড়াকে দাবিয়ে রেখে বানিয়ে ফেলে গাধা।
হাঁটে, ঘাটে, মাঠে সর্বত্র চলছে চ্যানেলের কড়াল গ্রাস।
শিরদাঁড়া সোজা করে না দাঁড়ালে-
চ্যানেলে দেখাবে উর্বর সমাজের সর্বনাশ।

অভিষেক অধিকারী

পাথুরে প্রমাণ 

সংকেত চিহ্নের প্রতিটি স্বাক্ষর,
আর একটা উদ্দাম আশাহীন খাদ,
এঁকে চলে সভ‍্যতার প্রত্ন চিত্র।

একটা নগর ঐতিহ‍্যের কারখানা
সঙ্গে মৃত্তিকা স্তরের শেষ পদচিহ্ন 
নিয়ে আসে যুগচক্রের প্রশ্ন।

একটা যুগ নিজেকে প্রমাণ করতে পারে,
প্রমাণ করতে পারে নিজের অস্তিত্ত্বের।
খননকৃত পাথুরে দ্রব‍্যের কাছে তার নিজেকে
মেলে ধরার কিছু নেই।
 
সে ধরা দেয় না,
পাথুরে লিপিকার গায়ে তার কোন স্বাক্ষর নেই।
সে স্বাক্ষর করে না।
হাজারটা পাথুরে স্থাপত‍্যের জনসভায় তার কোন স্থান নেই।
তবুও খননকার্য চলতে থাকে,
আর একটা যুগচক্রকে ব‍্যঙ্গ করতে
একটা পাথুরে প্রমাণের আশায়।

মীরা পাল

অনিশ্চয়তার সময়টুকু

এখন আর জ্যোৎস্নার জলে গা ভাসিয়ে দিই না
যদিও অনিশ্চয়তার মেঘ এখন সারা আকাশ জুড়ে,
বাঁধভাঙা প্রবল জলোচ্ছ্বাসে এক লহমায় জীবন ভাসিয়েছিল খরস্রোতে!
শহর জুড়ে সেদিন ছিল শুধু মন খারাপের বর্ষা,
বন্যার জলে ডুবে থাকা শহরেও জীবন খুঁজতে দেখেছি,
মানব সৃষ্ট বিপর্যয়; বুকের ভিতর অবিরাম ক্রন্দন,
বাঁচার লড়াই, সর্বস্বান্তের হাহাকার গুঞ্জরণের ঝড়..
জেগেছিল কেবল নৈশব্দ আর অব্যক্ত উৎকন্ঠা রাত একাকী...
অবচেতনের প্রতিটা রাত জানে জমানো কষ্টকথা,
তাইতো আর মায়ার বাঁধনে জড়াতে সাহস হয় না-
অথচ জ্যোৎস্না রাতের আলো ভালোবাসার মালা গেঁথে
আবারও মায়ায় জড়াতে চায়।

ড.রঞ্জিত দে

পাহাড়ে একদিন 

ছোট পাহাড় ঘোরানো রাস্তা,
কয়েকঘর বসতি-দুয়ারে লাউ ঝিঙের লতা,
পাশে কলা,কাঁঠাল,আম-গাছে গাছে।
পাহাড়ের গায়ে গায়ে ছোট ছরা-
ওটাই নদী-ওখানে ঘুরে বেরায় কয়েকটা হাঁস। 
পাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে বন মোরগ। 
বনফুলের গন্ধে আন্দোলিত বাতাসে-
বন পাখি মনের সুখে ডেকে চলে,
উপজাতি রমণীদের নিত্য দিনের কাজ-
ঐ ছোট নদীর স্বচ্ছ জলে,
তামাটে হয়ে আসা বিকালের রোদে,
ঘরে ফিরে জুমিয়া বোনেরা-
জুমের ফসল ঘিরে তাদের কাজ।
শীত নেমে আসে পাহাড়ের বুকে-
দূরে কোনো জুম ক্ষেতে জ্বলে উঠে আগুন, 
আগামী দিনের ফসলের আশায়। 
পাহাড়ে একদিন ভোরের আলোয় হাঁটতে হাঁটতে, 
বিকালে কুয়াশা মাখা হলুদ আলোয় দেখেছিলাম যাকে,
হারিয়ে যাওয়ার আগে খুঁজে নেবো ভেবেও,
যাওয়া হলো না,রাস্তা ভুলে যাই বারে বারে।।

কাজী নিনারা বেগম

জীবন রহস্য

ব্যর্থতার চাদর গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছি।
তবুও  ধৈর্যের ইচ্ছের হাঁসিগুলো বড় রহস্যময়, 
নতুন   রঙে রঞ্জিত স্বপ্নের দেয়ালে।
ইঁট কাঠ পাথরের পুরানো বাড়িটির পা ছড়ানো আভিজাত্যের অমসৃণ দেয়ালে। 
সমাজে বিতাড়িত হয়েও লাথখোর হয়েও চলেছি   একা,
অদ্ভুত এক জীবন  রহস্যের চলচ্চিত্র সেখানে শুধু মুখোশের আড়ালে  পাঠ আদায়ের পালা। 
পালা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ!

রমা চন্দ্র

অভীপ্সা

রামধনুকে ধরব বলে
যেমন বাড়াই ইচ্ছা...
তুমি চোখের কাছাকাছি
কেবল‌ই খেলি কানামাছি!
ঝকঝকে সাঁঝের আকাশে-
শুকতারার আশে,
দূর- কাঞ্চনজঙ্ঘায়
সূর্যোদয়ের পাশে!
ছুঁয়ে যাওয়া মন
স্পর্শিত হ‌ওয়ার অপেক্ষায়...
চঞ্চল হৃদয় খোঁজে-
শুধু খুঁজে চলে যায়...
কবিতা লিখবে বলে
জীবনের শেষ অধ্যায়-
জীবনরূপী উপন্যাসের...
সাদা পাতায়!

অপর্না পোদ্দার সাহা

ডাকঘর

হাজার চিঠি লালঘরে
জমে থাকে রোজ
ডাক পিওনের হাতটি ধরে
পাই যে তোমার খোঁজ। 

অপেক্ষারা থাকে বুঝি
হৃদয়ান্ত ডোরে
ভোর হতেই চেয়ে থাকি
রাণার পাখীর 'পরে।

অফিস আদালত কর্মব্যস্ততা 
ছুটাছুটি নিত্য
অজানাকে খুঁজে বেড়াই
পাহাড় প্রমাণ সত্য। 

আয় ব্যয় হিসাব নিকাশ 
সবই তোমায় যুক্ত
পরপারে পৌঁছে গেলে 
অর্থকড়ি সব মুক্ত।

সাগর শর্মা

স্বপ্নিল পাখি

স্বপ্ন দেখতে দেখতে রাতে অনিদ্রা হয়!
সকালে টিভিতে মৃত্যুর হেডলাইন দেখে-
চেয়ারেই ঘুমিয়ে পড়ি।

এ স্বপ্ন আমাদের নয়-
তবু স্বপ্ন দেখে সকলেই ঘুম তাড়াবার জন্য।
পথ অন্য পথে মিশে গেলে
অজানা দেশ থেকে স্বপ্ন ভাড়া করে আনি!
অবচেতনে চিন্তা করতে চাইলে,
মনোবিজ্ঞান বই খুলে দেখি
ঘুমের বদলে স্বপ্ন দেখার পদ্ধতি খুঁজি।

এই শহরে কেউ ঘুম খুঁজতে এসো না!
শুয়ে শুয়ে শরীর অবশ হলে,
গান শুনিয়ে যাবে স্বপ্নিল পাখি।

স্বপন দেবনাথ

ছত্রে ছত্রে তুমি

তোমার ওই লালচে-বাদামী চোখের আঙ্গিনায় বসে 
লিখতে চাই তোমায় নিয়ে একটি কবিতা,
যেখানে ছত্রে ছত্রে থাকবে শুধু তুমি -
আর তুমি।
তখন ভোরের সূর্য উঁকি দেবে আমার হৃদাকাশে 
আর তুমি পৃথিবীর পরে বসে থাকবে 
আমার কবিতার ছন্দালঙ্কার হয়ে ।

অসীম পাঠক

সোমরস

জীবনের স্বপ্ন আঁকি তোমার বুকে, চন্দ্রালোকিত জ্যোৎস্নার মাদকতায় তোমার মুখে শতাব্দীর ক্লান্তিরেখা গুলি  আমার কপালে এঁকে বলি  এসো --- আমার ভালোবাসার মোহানায় মিশে যাও এক নিবিড় পূর্ণতায়, জীবনের মাদকতায় অস্ত গোধূলির সন্ধ্যারাগে প্রেমের সোমরস আকন্ঠ পানে আমি নেশাতুর হতে চাই , আমি যে প্রেমের পূজারী ,কামনার ক্রীতদাস নই , মৃত্যুর শীতলতায় ডুবে যাবো যেদিন সেদিনও আমার ওষ্ঠে লেগে থাকবে শাশ্বত  ভালোবাসার সোমরস।

গীতশ্রী ভট্টাচার্য্য

 রক্তজবা (গল্প)

আজ ধ্যানে বসে কিছুতেই জপে মন বসছেনা ভৈরব চৌধুরির। এই দীর্ঘ জীবনে এরকম খুব কম ঘটেছে। মন যখনই কোনো কারণে উতলা হয়েছে তক্ষুনি এই মন্দিরে ছুটে এসেছেন। ধ্যানমগ্ন হয়ে মন কে প্রশমিত করতে পেরেছেন। আজ এমন কেন? 
অশিতিপর ভৈরব এখনো সম্পূর্ণ সুস্থ। ঋজু দেহ, বলিষ্ঠ বাহু। মা তারার একনিষ্ঠ উপাসক। স্ত্রী মঞ্জরী গত হয়েছেন অনেকদিন। একমাত্র কন্যা উমা,না তার নাম তিনি মুখেও আনেন না। 
সকাল থেকেই ভক্তবৃন্দের আগমন লেগে থাকে এই কুটিরে। ভয় এবং শ্রদ্ধা মিশ্রিত ভাব নিয়ে আসে সকলে। ভৈরব চৌধুরীর বজ্রকঠিন ব্যক্তিত্বের কাছে আপনা থেকেই সকলে নতমস্তক হয়ে পড়ে। মায়ের ভোগ রাগের জন্য যে সমস্ত বস্তু ভক্তরা নিয়ে আসে, তাই স্বহস্তে রান্না করে মাকে ভোগ দেন। মায়ের প্রসাদ ই তার খাদ্য। দুপুরে কেউ এলে সেই ব্যক্তিও ভোগ প্রসাদ পায়। 
আজ দুপুরেও মাকে ভোগ নিবেদন করে বাইরে প্রতীক্ষা করছিলেন ভৈরব। একটি মহিলা তখন ঢুকে আসে ভেতরে।সাদা মলিন সাদা শাড়ি, একমাথা ঘোমটা। জীর্ণ শীর্ণ দেহ। মুখ দেখা যাচ্ছেনা। অভাবী বলেই বোধ হচ্ছে। দূর থেকে দু হাত জড়ো করে সে প্রণাম জানায় মন্দিরের দিকে, ভৈরবের দিকেও। 
ইঙ্গিতে ওকে উঠোনে বসতে বলেন । অন্ন প্রসাদ গ্রহণ করে তারপর যেতে বলে মন্দিরে প্রবেশ করেন তিনি। উঠোনের একপাশে পুরনো নিমের ছায়ায় মহিলাটি বসে পড়ে। যেন সে কত ক্লান্ত। 
একখানা শালপাতায় করে মায়ের ভোগ এনে ওর কাছে রাখেন ভৈরব।
 _ কিছু লাগলে চেয়ে নিও, লজ্জা করনা। 
মাথা হেলায় মহিলা। 
অদূরে একটি সিঁড়িতে বসেন ভৈরব। অতিথির খাওয়া শেষ হলে তিনি প্রসাদ গ্রহণ করবেন। এটাই ওর নিজস্ব নিয়ম। 
একটু ঘুরে বসে মহিলাটি মাথায় ঠেকিয়ে প্রসাদ খেতে শুরু করে। অন্যমনস্ক ভাবে এদিক সেদিক তাকাতে তাকাতে মেয়েটির আঙুলে নজর যায় ভৈরবের। এই সবুজ পান্নার আংটি বড় পরিচিত। এত সাহস কী করে হল ওর! রাগে চোখ দুটো লাল হয়ে আসে। দ্রুত ওর কাছে দাঁড়িয়ে বলেন, তুমি কে আমি বুঝতে পেরে গেছি। উঠ, এখান থেকে বেরিয়ে যাও। তোমার সাহস দেখে আমি অবাক হয়ে গেছি। 
ঘোমটা খসে পড়ে ওর। দুচোখে জলের ধারা।
_ বাবা!
এই একটি শব্দ শুধু বেরিয়ে আসে। 
গেটের দিকে হাত তুলে ইঙ্গিত করেন ভৈরব। অর্ধভুক্ত খাবারের থালা ছেড়ে ধীরে ধীরে বেরিয়ে পড়ে উমা। ভৈরব কে এখন গোটা উঠোন জল দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। গোবর ছড়া দিতে হবে। 
সারাদিন ভৈরব আর মুখে কিছু দেননি। বাড়ি ঘর পরিষ্কার করতে করতে বেলা চলে গেছে। সন্ধ্যে হতেই এসে মন্দিরে ঢুকেছেন। কিন্তু, জপে মনোসংযোগ হচ্ছেনা কিছুতেই। তারা মায়ের মুখে উমার মুখ ফুটে উঠছে বারবার। ওর চোখের জল যেন মায়ের চোখে টলটল করছে। 
উমা একমাত্র সন্তান ওদের। আদরে, শাসনে বড় করেছেন। পড়াশোনা করতে করতেই ভালবেসে ফেলে একজনকে। যার সাথে কিছুতেই ভৈরব সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেন না। নিচ কুলশীল ওদের। মেয়েকে কড়া প্রহরায় রাখেন। লেখা পড়া সবকিছু বন্ধ করে দেন। কিন্তু, নিয়তির কবল থেকে কারো রক্ষা নেই। এমন কঠিন পাহারার মধ্যে থেকেও উমা পালিয়ে যায় একদিন। বিয়ে করে সেই ছেলেটিকে। 
রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে অভিশাপ দেন ভৈরব , খুব শীঘ্রই পাপের শাস্তি পাবি। বিধবা হয়ে পথে পথে ঘুরবি। মঞ্জরী জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন এসব শুনে। এরপর খুব বেশিদিন বাঁচেন নি মঞ্জরী। তখন থেকেই একা ভৈরব। উমার কথা মনে আনাও পাপ বলে ভাবেন। নিজেকে আরো বেশি সঁপে দেন তারা মায়ের জপ ধ্যানে। 
আজ ওর হাতের পান্নার আংটি দেখে চমকে উঠেছেন । এটি তিনিই ওকে ধারণ করিয়েছিলেন । অদ্ভুত এর নকশা। দুটো সাপের মুখ সামনে। মাঝখানে পাথরটি। 
এত অভাবের মধ্যেও উমা এটি বিক্রি করেনি! আশ্চর্য! 
আজ আসনে বসে শুধু মনে হচ্ছে এই জপ, যাগ যজ্ঞ সবকিছু মিথ্যে। শুধুই আড়ম্বর। যার মনে বিন্দুমাত্র ক্ষমা, স্নেহ নেই সে কীসের মানুষ! সেতো পাথর। বুক ফেটে হাহাকার বেরিয়ে আসতে চায়। কিন্তু কণ্ঠ শুষ্ক।মেয়েটি হয়ত কতদিন ভাল করে খেতে পায়নি। আর আজ তিনি ওকে খাবারের পাত থেকে উঠিয়ে বিদেয় করে দিলেন! মহাপাপ করেছেন , মহাপাপ।
তারা মায়ের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকেন ভৈরব। চোখ বেয়ে নেমে আসে অশ্রুধারা। উমা আর আসবেনা , জানেন তিনি। তবু অপেক্ষা করে থাকবেন। যদি আসে , তবে ক্ষমা চাইতে হবে ওর কাছে। নইলে মুক্তি নেই, মুক্তি নেই। 
শুকিয়ে যাওয়া রক্তজবার মত লুটিয়ে পড়ে থাকেন ভৈরব চৌধুরী।

চন্দ্রা বিশ্বাস

কবি ও কাব্য

তিথি-লগ্নের শুভ ও অশুভর যথার্থ ব্যাখ্যা 
ঠিক ঠিক মিলে যায় কিনা আমার জানা নেই ।
মাহেন্দ্রক্ষণ অথবা অমৃতযোগ ঠিক কোন ক্ষণ টুকু 
তা নিয়ে গবেষণায় বসতে আমি রাজি নই ,
শুধু বুক উজাড় করে , "আমি ভালবাসি" এই দুটো শব্দ
যে মুহূর্তে বলে ফেলা গেলো ,
সেই মুহূর্তটুকুই জীবনের সেরা মুহূর্ত, মহা শুভ ক্ষণ।
প্রকৃত কবি কোন জন, তা আমার জানা নেই ,
ঠিক ঠিক কবিতা হয়ে উঠলো কোন ছন্দবদ্ধ অংশ টুকু,
সে ও এক বিতর্কিত বিষয় ।
সবটুকু দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে, "আমি ভালবাসি" 
এই দুটো শব্দ,যিনি বলে ফেলতে পেরেছেন,
তিনিই প্রকৃত কবি। আর, আ---র
"আমি"ও "ভালোবাসি"এই দুটো শব্দ মিলেই
রচিত হয়ে গেলো, বিশ্বের সেরা কবিতাটি।

অলকা গোস্বামী

আমিও নারী

কবিতার সারাংশ আমিই ছিলাম,
ছিলাম ভালবাসার মোড়কে।
কেওনঝাড় এর উদ্দাম ঝরনা
আমারই চলার ছন্দে।
অরন্য সবুজ শৈশব আমার
কৃষ্ণচূড়া লাল যৌবন,
যত্নের বাগান থেকে বিদায় নিয়ে,
গেলাম পরের ঘর।

বৃষ্টি ঝরিয়ে মেঘেদের ছুটি
শরৎ আকাশ নীল,
তুলোর মত সাদা মেঘ,
ভেসে বেড়ায় চারদিক।

জীবন নদী বয়ে চলে ধীরে
সুখ পাখি বাঁধে ঘর,
দানপত্র আমি তুলে দিই হাতে
চির সবুজ হোক মিলন।

অভিযোগের গাঁঠারি ভরে, চোখ ভরা অভিমান।

চারিদিকে শুধু ধূ ধূ বালি,
আর তেপান্তরের মাঠ।

স্বপ্নভাঙা যাপন নদী, অকুলান সাথে ভাসে।
জীবনটা দামী, কোনো
আপোস আর চলেনা তার সাথে।

প্রেমে অপ্রেমে অল্পেতেই
খুশি,
বোঝেনা কেন সমাজ,
নারীসত্তা শুধুই  সম্মানটুকু চায়।

শ্বেতা ব্যানার্জী

মহাকর্ষ এক প্রেমিকার নাম

-----তারপর তুমি বললে 
তুমি যেন মৃত নক্ষত্র, 
অবাক দৃষ্টিতে আমি তোমার দিকে তাকিয়ে রইলাম, 
তুমি বললে, তোমার মহাকর্ষের বন্ধন ছেড়ে আমি কিছুতেই বেরিয়ে যেতে পারিনা। 
তোমার আকর্ষণ নয়, তোমার ভালোবাসার তরঙ্গ
আমাকে ভাসিয়ে রাখে।
ও তাই!! আমি বুঝি কৃষ্ণগহ্বর!!
হ্যাঁ সুপার ম্যাসিভ, যেখানে  আমার হৃদয়ের ম্যাসিভ আ্যটাক।
দ্যাখো, আমি তোমাকে কেন্দ্র করে কেমন ঘুরে চলেছি...।
তোমার অনন্যতায় তুমি অসীম  ---
তুমি সময়কে দাঁড় করিয়ে জবাবদিহি করো।
 তোমার দিগন্তে আমার জমা রাখা মন আজও ফিরিয়ে নিতে পারলাম না, 
কবির ভাষায় "ওই যে সুদূর নীহারিকা... "
ব্রহ্মাণ্ডের সহজ সরল গ্যাসে নিউক্লীয়ভাবে আবদ্ধ
হয়ে আজ আমাদের মন,  দুটি হিলিয়াম অণু।
তুমি বোঝনা এটা ফিউশন। 
আমাদের ভালোবাসার বিস্ফোরণ। যে বিস্ফোরণের 
আলোর রোশনাই নক্ষত্র হয়ে সংসার করে আমাদের
মনের আকাশে। 
কিন্তু ভয় হয় অনির্বাণ, 
কিসের ভয় আমি থাকতে। 
ভালোবাসার বিস্ফোরণ যদি হাঁফিয়ে ওঠে?  যদি জ্বালানি ফুরিয়ে যায়?
আমি আছি তোমার সাথে সূর্যের তেজদীপ্ত রূপ নিয়ে। 
তুমি যে বললে আমার ভালোবাসা কৃষ্ণগহ্বর। 
সে তো আমার মনের  "ইভেন্ট  হরাইজন টেলিস্কোপে" 
প্রকৃত ভালোবাসা উপলব্ধি করতে হয়,স্পর্শ নয়।
কৃষ্ণ ও কালী দুইজনেই কালো। 
প্রেম ও সংহার যেখানে মিলেমিশে একাকার। 
যেমন পদার্থবিদ্যার সূত্র ভেঙে আমরা দুই অপদার্থ প্রেমিক।

সংগীত শীল

নাহার

আঁকা বাঁকা পথের অপকটে 
আপন গভীরে আমাদের সূচপাত।
বিচিত্র বিস্ময় পুলকিত হতে থাকে
অপ্রস্তুত মুহুর্তে রোমাঞ্চিত শিহরণ জাগে দুজনার।

অমলিন স্মৃতিরা প্রহার করছে  বরাবর
তবুও কি অপরিসীম মমতা তোমার!
আমার হৃদয়াভ্যন্তরে;
অনুল্লিখিত বর্ণমালার ভিড় জমছে।

তোমার ছোঁয়াতে শীতল প্রাপ্তির অবগাহন,
দু-চোখের কাজল আমার শরীর বেয়ে নেমে আসে।
নক্ষত্রপুঞ্জ খসে যেন
ভেসে যাচ্ছি জলোচ্ছাসে।

চাঁদ মাখানো সুখের অতল সাগরে
আশা আকাঙ্ক্ষাগুলো লুটিয়ে দিয়ে,
ইচ্ছে হয় নিছক পিপাসাকাতর স্নায়ুতে,
স্পর্শ সুখের ঘ্রাণ নিতে।

প্রদীপ কুমার মাইতি

কত ঝরবে রক্তের ফোঁটা 

কত ঝরবে রক্তের ফোঁটা। 
রক্তস্রোতে ভেসে যাওয়া মাটির দিকে তাকিয়ে বোবা চোখ এক নদী জলে ডুবে থাকবে আরো কত দিন?
কতদিন থাকবে আরো স্বজন হারানো অভিশাপ,
বাতাসে ভাসবে শোকের দীর্ঘশ্বাস।
শহরে-গ্রামে,পথ-প্রান্তরে রক্তে ভেজা মাটির বুক থেকে ভেসে আসে কত শিহরিত কান্না,
জনতার স্রোত লাভ লোভের অঙ্ক কষে, নীরব প্রতিবাদে ফিরে আসে।
কেন খুন হয় স্বপ্ন গুলো? কার স্বার্থে? জানি তাঁরা মখমলের সজ্জায় শুয়ে স্বার্থের উদরে রাজ ভোগের ঢেকুর তোলে, 
ওরা পিশাচ, ওরা জল্লাদ,
ওদের অস্ত্রে উল্লাস করে ওদেরই ভাড়াটে উন্মাদ। 
ঝড় আসছে ঝড় আসবেই উড়ছে ধুলোবালি, 
লক্ষ জনতা নেমেছে পথে আগুন হয়েছে লাল,
পুড়ে ছাই হবে স্বার্থের সৌধশিখর, 
মখমলের সজ্জায় প্রহরী হবে ঘৃনার আগুন, 
রাজ ভোগের ঢেকুরে উদগিরিত হবে চাপ-চাপ রক্ত,
পুড়ে ছাই হবে পিশাচের বোনা জাল।
মাটির বুকে জন্ম নেবে নতুন সভ্যতা,
রক্ত নয় জীবন চাই জাগবে মানবতা।

পৃথ্বীরাজ দেবনাথ

বিচ্ছিন্নতা

সকালবেলা উঠে দেখি 
আমি বিচ্ছিন্ন। অথচ সূর্য উঠেছে, পাতা ঝরে পড়েছে, নদী বয়ে গেছে তার মত।
আমি নিশ্চিতভাবে বিচ্ছিন্ন। 

তাই মূল খুঁজে বেড়াই।
মূল খুঁজতে খুঁজতে রূপকথা তার নিজস্ব পথে বাঁক নেয়। বৃষ্টি নামে। দৃশ্যপট পাল্টে যায়, কালের গর্ভে জন্মায় আরেক দৃশ্যপট।

এই যে এত আলো, এত ছায়া 
আর এত উত্তাপ, এরই মধ্যে
নদী বয়ে গেছে? 
এরই মধ্যে সন্ধ্যা নেমেছে ধীরে,
এরই মধ্যে একটি প্রদীপ জ্বলেছে তুলসীতলায়,
এরই মধ্যে আমি জেগেছি,
আরও একবার দুঃস্বপ্নে 
বিচ্ছিন্ন হব বলে।

শর্মি দে

চন্দ্রাবলী বিষাদ

কোমল নিষাদেও সে বিরহী!

সুমেরু কুমেরুর ব্যবধান সময়ের অনুভূতির সাথে যেন ক্রমাগত বেড়েই চলেছে...
এরই মাঝে দুএকটুকরো হৈমন্তিক ইশারা,
নিকুঞ্জবন আজও নেচে উঠে কথাকলি সাজে!

বিন্দু বিন্দু ঘামের ফোটায় কখনো বা অজান্তে ভাগ করে বৃষ্টিসুখ,
ভিতর ঘরে জমে থাকা তার বিজন অসুখ।

একদিন সে প্রশ্রয় দেয় তার চাতক ইচ্ছেদের
ওরা যেন মায়াময় করে তোলে তার চন্দ্রাবলী রাত।
উদাসী হাওয়া যুবতী হলে...
কুজ্ঝটিকা ছুঁয়ে ঘাসফুল সাজালো নির্ঘুম রাতের আকাশ!
সোহাগী পাপড়িগুলো মেলে তার ময়ূরী পেখম
কুয়াশার অবগুণ্ঠনে ঢাকা পড়ে যায় তার সোমত্ত বিষাদ!

শতাব্দী দেবনাথ

শীত ঘুম

আধো আধো কুয়াশায় ঘুমন্ত সব ফড়িং, 
শিশির ভেজা চাঁদরের প্রলেপ ঘাসে... 
কত বার ভিজেছে মন ঘন কুয়াশায় 
হিসেব নেই তার... 
আগুনের  মিঠে তাপের ছোঁয়ায় হঠাৎ-ই চোখ লেগে যায়,
বাঁধ সাধে শুধুই অগনিত ইচ্ছে গুলো। 
শীত ঘুমে স্বপ্নের মায়া জালে 
ইচ্ছেরা সাড়া দেয় বাস্তবতার রূপে। 
আচমকাই দমকা হাওয়ায় বজ্র বিদ্যুতে 
আগুনের নীল শিখা বয়ে আনে অশ্বিনী সংকেতের বোঝা, 
কোমল শিশিরের শব্দে তিন প্রহরের  ঘুম কেটেছে আমার।
চোখ খুলেই অস্পষ্ট বাস্তবতা.. 
পরিণত পায় অবাস্তব কল্পনায়।।

রামমোহন বাগচী

জীবনের যাদুকর

ভাবি মনে মনে এটাই কি জীবন ?
অন্তর হীন আত্মীয়ের যাদুর খেলায়
ঝড়ে আত্মার অশ্রু। 
মুক বধির শিক্ষার রাজ প্রাসাদে  
দাপিয়ে বেড়ায় অন্তর হীন আত্মা
ছড়িয়ে রঙ্গিন  স্বপ্ন। 
স্বপ্নের মাঝে আছে স্বপ্ন, এ এক অপূর্ব স্বপ্ন
ধরা ছোয়ার  বাহিরে থেকেও নির্ভয়ে
চালায় আপন খেলা, দিবানিশি। 
সরস্বতীর হংস উড়ে আকাশে
ভুলে নির্মল নীরের সরোবর
শুভ্র চরিত্রে অভিনয়ের স্বর্ণপদক পরে গলে। 
যাদুঘরে যাদুর খেলা,যাদুকর বিনে
এমনি মন্ত্র শিখায়, মন্ত্র হীন আত্মা  
ছরিয়ে মায়ার জাল রাজার ভান্ডারে। 
বিশ্বের অর্ঘ দূত প্রেরণার উৎস
জ্ঞানের জোয়ার ভাটার , রত্নের ভান্ডার
রাধানগরে কৃষ্ণের অবতার। 
চক্ষু হীন আত্মা ছড়িয়ে মায়ার জাল    
প্রজাহিতৈষী মন্ত্রের নকল ঋষি করে
প্রজার সর্বনাশের  মন্ত্র পাঠ।।। 
ভাবি মনে মনে এটাই কি জীবন ?

ছন্দা দাম

ছেলেটা পণ করেছিল

ছেলেটা পণ করেছিল কাঠের লাঙ্গল হবে...
পৃথিবীর বুক চিড়ে সবুজ আঁচলে সাজাবে এক ফোঁটা দুগ্ধ সুধা,
ছেলেটা পণ করেছিল হলুদ ধানের গোলা হবে...
আঁধারের ওপারে যারা হারিয়ে গেছে ফোটাবে তাদের চোখে আলোর ক্ষুধা।

ছেলেটার পণ ছিল শক্ত হাতের পাঁচ আঙুলে... 
ভেঙে ফেলবে সব অর্থহীন ব্যরিকেট ,
হয়তো মাটি ছোঁয়া হাতে থাকবে না প্রযুক্তির আঁকিবুঁকি...
কিন্তু শান্তির ছায়াময় নিঃশ্বাসে ভরে থাকবে তার প্রিয় বুকপকেট।

ছেলেটা মশালের আলোয় অ আ ক খ র স্বরলিপি লেখবে আশ্বাস দিয়েছিল...
প্রজন্মগুলো ঘুমহীন রাত তারই অপেক্ষায় ঠাঁয় দাঁড়িয়ে...
হাত বাড়িয়ে মাইলস্টোন  ছুঁয়ে দেবে এই স্বপ্নে 
আকাশটা দিগন্তের অন্ধকার ঈশানে যায়নি হারিয়ে।।

কতো স্বপ্ন,কতো বাস্তব কতো ইচ্ছে ,কতো পূর্ণতা...
ছেলেটার ছোট্ট নোটবুকের কালো অক্ষরে ঘুমিয়ে আছে...
ছেলেটা আজো জোনাকির কাছে আলো চায় ধার..
একটা শান্তির ঘুম ছেলেটা খুঁজে ফেরে...
এখনো সন্ধ্যের শোকতারা জ্বলা রাতের কাছে।

অনির্বাণ মিশ্র

প্রেয়সী

রূপের আগুন জ্বালি কে তুমি গো বনমালী
এ জনমে হলে ওগো রাধা।
এমনি সে প্রেমডোর বাঁধিয়াছ হৃদে মোর
 পড়েছি তোমারি প্রেমে বাঁধা।।
মোহন মুরতি খানি সমুখে চিকুর টানি
অপার লাবণী শোভা পায়।
কাজলে রাঙানো আঁখি অপরূপ শোভা দেখি
রবি শশী লাজে মরি যায়।।
ললাটের ওই বিন্দু, হৃদয়ের প্রেমসিন্ধু
চাহনি তব তীরসম ধায়।
প্রেয়সী গো প্রেমময়ী গীতি বর্ণ ছন্দময়ী
কবির প্রেরণা তুমি তাই।।

 


Oct 28, 2022

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

ঘরোয়া মানুষ

ঘাড় ফেরালেই একটা মুখও দেখা যায় না  
যে মুখে আছে প্রশান্তির আলো,
শুধু ভ্রষ্ট কথার রঙিন ফুলঝুরির তীব্র আলোয় 
ঝলসে যায় মানুষের মুখগুলো ।

এই ঝলসানো মুখের মানুষগুলো স্বপ্ন ছুঁতে গিয়ে 
রাস্তায় দাঁড়ায় । রাস্তায় হাঁটে দল বেঁধে
আশায় থাকে একদিন তারা পৌঁছে যাবে
আকাশ গঙ্গার মৃদু আলোর শিবিরে ।

আরো অনেকেই সাথী হয় স্বপ্নের খোঁজে
দগ্ধ মানুষেরা নিজেরাই নিজেদের পথ করে নেয়। 

মন্থন শেষে বিষের ভান্ড ফেলে অমৃত কলস নিয়ে 
দৌড়ে পালায় বাহুজীবীরা ।
বারবার স্বপ্ন ভেঙে যায় মাটির মানুষদের ।

আঘাতের পর আঘাত পেয়ে আবার জড়ো হয় 
ঘরোয়া মানুষগুলো । আবার গড়ে মানববন্ধন ।
তালুর বাঁধনে বাঁধনে হয়ে যায় অলৌকিক আত্মীয়তা‌ ।
ভাঙতে ভাঙতে বারবার ওঠে বন্ধনের গান ।

অপাংশু দেবনাথ

এমন আরোগ্য 

অসুখে শরীর ক্লান্ত হলেও সুখের বার্তা বহন করি,
কোন্ সুখের পেছনে ছোটা,ছুটতেই থাকা নির্জনে দূরে। 

সুখের কোনো ঠিকানা আছে!

মানুষের কাছে গিয়ে দেখি অসুখ নিয়ে ছুটছে ওরা। 
দিন ঢলে গাছের পাতায়, পাখিদের খড়ের ছায়ায়
সব রোদ জমা করে রাখে পালকের উষ্ণ কবিতায়। 
 
তার কাছে  যেতে চাই যেন ধোঁয়া ধোঁয়া পথ, 
রাখি তবু হৃদয়ের সকল-শপথ।
হৃদয়ের তাপ কমে গেলে শরীরের চঞ্চলতা 
কমে আসে প্রিয়!
কাজের ভারে নুব্জ্য মানুষটি জানে ভালোবাসা কারে কয়!

কার জন্য এত সুখ খুঁজে ফেরো পাখির ডানায়? 
পাখিরাও একে একে মরে যাবে সুখের সন্ধানে ঠিক, 
তবু ওদের মতন সুখে থাক মানুষের গরল-স্বজন।

তৈমুর খান

আত্মপরিচয়

ঘুরপাক খেতে খেতে
ঘুরপাক খেতে খেতে
একটা আধা শহরে বাড়ি
অবেলার কাক,হাটুরে ফেরিওয়ালা
আর বিক্রি হওয়া মেয়ে
একে একে ফিরে এলে দেখা হয়

যে যার মতন জল মাপে
দু একটা রাজনৈতিক শিকারি
মোড়ে মোড়ে কথা কাটাকাটি করে
মেয়ে পাচার হওয়া সংবাদে
মেতে ওঠে চায়ের দোকান

চোখের সামনে যেটুকু সামান্য আলো
তাও অন্ধকার হয়ে যায়
ছেঁড়া আত্মাটুকু রিফু করতে বসি
ঐশ্বরিক বিশ্বাসের সুতো নষ্ট হয়ে গেলে
কোথায় পাব আর?
বিজ্ঞাপনে দেখি সব তিল তাল হয়ে ঝরে 
কোথাও নেই সুসমাচার!

তবুও শহর
গ্রাম থেকে বাবা নদী আনে
মা সেই নদীতে ধরা পড়া মাছ
আমি ও আমার বউ মৎস্যগন্ধা
লুকিয়ে রাখি সমূহ গোপন সংবাদ!

সৌমিত বসু

তিন বছর পরের সন্ধ্যা

যতবার সূঁচের ফুটোর ভেতর দিয়ে 
গলিয়ে দিচ্ছি রোদ্দুর
তুমি হাত বাড়িয়ে টেনে নিচ্ছ গর্ভের ভেতর।
আমাদের জীবন শেষ।মৃত্যু জেগে উঠে
বসে আছে বুকের ওপর।
আলো হারিয়ে সুঁচ 
হাঁ করে বসে রয়েছে খিদেয়।

ব্রিজের ওপর থেকে আমি যতদূর দেখতে পাই
তুমিও কি তাই পাও? বলো

কুশল ভৌমিক

পরিণতি

মহাশূন্য থেকে জন্ম আমাদের 
ফের মিলাবো মহাশূন্যে।
মাঝখানে শূন্যতা পূরনের নিপুণ অভিনয়।

মৃত্যুর পর আমাদের যাবতীয় পরিচয়
নিছক একটি ফ্রেমে বন্দি,
ফ্রেমের ধুলো মুছতে মুছতে একদিন
মন থেকে মুছে যাবো সকলের।
কেবলি ছবি শুধু পটে আঁকা।

ছেলেবেলায় বাবা হাঁট থেকে
ইলিশ মাছ নিয়ে ফিরতেন,
ইলিশের পাগল করা গন্ধে মৌ মৌ করতো চারপাশ।
বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলতাম -কামাই করে তোমাকে প্রতিদিন ইলিশ খাওয়াবো
এখন কামাই আছে;বাবা নেই।
রেফ্রিজারেটর ভরে থাকে রুপোলি ইলিশে
কেবল সেই গন্ধটা নেই
বাবা এখন ফ্রেমবন্দি।

মায়ের ছবিতে ধুলো জমে প্রতিদিন।
স্ত্রী ঘুমিয়ে গেলে 
মাঝে মাঝে ছবির সাথে গল্প করি মান,অভিমান,আবদার
আকণ্ঠ পান করি শৈশব।
আমার জোছনা এখন নিয়ন আলোতে হারিয়ে গেছে।

সময় বলে কিছু নেই
শুন্য থেকে জন্মেছি
ফের মেলাবো শূন্যতেই।

কৃষ্ণকুসুম পাল

প্রেমের কবিতা

হিমালয় কবিতা লিখছে-
বরফে ঢেকেছে শরীর
সৃষ্টি হচ্ছে নদী
আকাশে তুলেছে শির
তাই সে মৌন।
              
সাগর কবিতা লিখছে
নোনা জলে উঠছে গর্জন
বুকে খেলছে অসংখ্য প্রাণী
চোখে নেই ঘুম
তাই সে উত্তাল।
               
কবি কবিতা লিখছে-
অসীম বিশ্বে সে একা
প্রেমেপাগল,প্রতিবাদে আগুন
সে হিমালয় হতে চায়
সে সাগর হতে চায়
তাই সে প্রাণ বিলায়।

তৌফিক জহুর

মালতীনগর- ০৫

উৎসর্গঃ কবি তৃষ্ণা বসাক, বন্ধুভাজনেষু
 
কৈশোরে  আব্বার হাত ধরে বকশি বাজার যাই  
সাজিয়ে রাখা সবজি মাছ মাংস, খাঁচায় মুরগী  আর সরল মানুষগুলোর কেনাবেচায় মুগ্ধ হয় চোখ 
আশিস কাকার হোটেলে চেয়ারে বসে 
পরোটা সবজি মিষ্টি দুধ চা খেতে খেতে 
কখনো জানাই হয়নি
আব্বার পকেটের আবহাওয়া সংবাদ 
খেয়েই গেছি কৈশোরের ডাংগুলি খেলার মতো, 
জেনেছি কাঁচা ছানা মানেই আশিস কাকা,
বৃষ্টির দিনে ছাতা মাথায় বাজারে যেতাম,
মনে হতো অনেক হাতির কান বাজারে ঘুরছে,
লাল মিয়া চাচার দোকানে বসিয়ে রেখে আব্বাও 
হাতির কান লাগিয়ে মিশে যেতেন ভিড়ে,
আব্বাকে খুঁজতাম, কিন্তু পেতাম না তখন
শীতে বকশি বাজারে দেখেছি যুবতী সবজিবাহার
লাউশাক বাঁধাকপি ফুলকপি টমেটো সীম গাজরের
জৌলুশে মনে হতো মাদলায় নানী বাড়ির উঠোনে 
 
ঋতু পরিবর্তনে গাছে নতুন পাতা 
বকশি বাজার শেখায় জীবনের নামতা,
পকেটের নোটগুলো মনে হলো খলসে মাছ, 
বাজারে এলোমেলো কদমে নামতা পড়ি
সবকিছু ঠিকঠাক অথচ কিছুই ঠিক নেই, 
কৈশোরে আব্বার হাসিমাখা মুখের আড়ালে
বেদনার ঘামগুলো আমার কপাল বেয়ে 
নিচে নামে, নিভিয়ে দেয় সদ্য জ্বলে ওঠা উনুন 
 
বাবা মানেই পাঞ্জাবির পকেটে বেদনা লুকিয়ে রাখা
সেলাই করা চটি পায়ে একজন আলেকজান্ডার।

উমাশঙ্কর রায়

বনসাই -১

গাছও নয়, সৈনিকও নয়
শেকড়ে মাটির গন্ধ নেই
তবুও ওরা ময়দানে
দেশপ্রেমের গল্প শোনায়! 

বোধিদ্রুম কী 
সে-কথা না জানলেও
ওরা 'বুদ্ধ-বুদ্ধ' খেলে আর
মানুষের কোলাহলে
দিব্যি চোখ বুজে থাকে! 

ওরা কেউ বটবৃক্ষ না হলেও
মার্বেল বিছানো ড্রইংরুমে
ওরাই এক একটি পর্বের সংস্করণ, প্রতিনিধি, কিংবা অলংকার। 

ওরা বনসাই। 

বনসাই - ২

যতটুকু প্রেম বিলাবে ভেবেছিল বৃক্ষছায়া - সে আর হয়ে ওঠেনি। 
কেননা সবকিছু দেখেশুনে গাছেরা লজ্জায় শুধু মাটিতে মিশে গিয়েছিল। 

ঘটনাটি তেমন কিছু নয়
এমনি ভেবে
কৌলিন্যের চাদর জড়িয়ে গা'য়
বাবু-বনসাই যেই না বেরিয়ে এল, বেরিয়ে এল স্কন্ধ সীমানার বাইরে -

শিশু কলাগাছ বলল - আসুন,
এইটুকু সামান্য আয়োজন বেঁচে আছে আজ। 
এ-বেলা আমার ছায়াতেই বসুন।

গোপেশ চক্রবর্তী

নিঝুম রাতের কাব্য 

শেকড় পর্ব -১

তুমি জানতে,এগোতে পারিনি আমি
যা ছিলো হাতে উজাড় করে দিয়েছো
তখনতো বুঝিনি  তা

ওরা বুঝে না শেকড়ের টান 
মাটি ফুঁড়ে বের হওয়া নতুনের আহ্বান 
পাতা,ডাল-পালা,পাখি, মানুষ, নদী, সমুদ্র, আকাশ, ফুল-শিশু-গান-সবাইকে কোলেপিঠে করে গড়ে তুলে শেকড়

বাবা মৃত্যু মুহূর্তে সবাইকে দেখে,সবশেষে মাথার উপরে থাকা আমার দিকে চেয়েছিলেন। কত কথা ছিল এই চাওয়াতে!তার মর্মকথা অল্প বুঝতে পেরেই মাঝে মাঝে চিৎকার করে উঠি!শেকড় কেঁপে ওঠার শব্দ পাই!

বাবা স্রোতে ভাসেনি
তাই স্রোতের মানুষ ভুলে গেছে
বাবার ছায়ার সঙ্গে লড়াই করছে আজও কিছু কেউটে
অফুরাণ কান্না জমা ছিল বুকে তাই কিছু বলে যেতে পারেনি
অতলে জমা ছিল জল নিঃশব্দে বেঁচেছিলেন একা

ভেতর মানেই বাবার কথা লিখা থাকে
ভেতর মানেই শেকড়ের সন্ধান করা
ভেতর মানেই তোমার নীরবতার হারানো মুহূর্ত 
ফেলে আসা জীবন্ত ছবি ভেসে ওঠে হঠাৎ! 
ভেতর মানেই অন্ধকার 
ভেতর মানেই এড়িয়ে যাওয়ার বিষয় 
ভেতর মানেই স্বপ্ন হারানোর ভয়
ভেতর মানেই ইচ্ছের ঝরা পালক 
ভেতর মানেই শেষ না হওয়া কথা
ভেতর মানেই রহস্যঘেরা জীবন 
ভেতর মানেই প্রেমের আঁকা আলপনা
ভেতর মানেই সীমাহীন ভালোবাসা 
ভেতর মানেই দেওয়াল ভেদ করা পাতার ছবি

শেকড় চিনে গেলেই রিপুগুলো ধেয়ে আসে দ্রুত
মনে হয় চোখে কাপড়ের পট্টি পড়া
গা লাগোয়া সবাইকে বলে দিই মূল ইতিহাস 
যার যা প্রাপ্য দিয়ে দিই
বদ্ধ দরজাগুলো খুলে দেখিয়ে দিই বাইরে কী আছে
চোখে আঙুল দিয়ে সরাসরি দেখিয়ে দিই দর্পণে কেমন লাগে সে

শেকড় বড় কাঁপন ধরায় বুকে
মাঝে মাঝে অজ্ঞাতজনেরা এসে পরিযায়ী পাখির মতো শেকড়ের কথা বলে হারিয়ে যায়! 

মা বলতেন 'চুপ থাক' ওরা বুঝে যাবে একদিন
নিজের জন্য না রেখে যে যা চাইতেন দিয়ে দিতেন নির্দ্বিধায়! 

হায়রে পাতার জীবন 
হায়রে পরিযায়ী মন
হায়রে শেকড়ের টান

শান্তনু ভট্টাচার্য

আমার ছেঁড়া পাতা 

যেভাবে পতাকায় মুড়ে কফিন নেমে আসে 
শোক উথলানো উঠোনে-- হে ছেঁড়া পাতা 
সেভাবেই দুঃখের ভারে 
ধীরে ধীরে নেমে এসো মাটিতে।

আমি বৃক্ষের কাছে বৃষ্টি চাই 
জলকে বলি একটু নুন দিও পান্তাভাতে 
'কই'-দুঃখের স্বরধ্বনি বোসো হে  এস্রাজে 
'কান্না' -- তুমি ছড় টানো.. ক্লান্তিহীন।

তবুও ব্যাকুল চোখে 
প্রথম থেকে শেষ অব্দি তোমাকেই খুঁজে যা 
নদী কিংবা মিছিলের বাঁকে বাঁকে।
মিলিয়ে যাচ্ছি মেঘে 
সপ্তডিঙায় যাচ্ছি ভেসে 

ঘাটের জলে না-পোড়া নাভির মত স্মৃতি ভাসিয়ে 
অশৌচ বস্ত্রে দুহাত পেতে রাত্রিকে বলি--
শুধু একবার পাপ দাও...
নদীর জলে স্নান সেরে ছেঁড়া পাতার মত 
শেষবার শুদ্ধ হয়ে দাঁড়াই

ঈশ্বরের মুখোমুখি।

রুদ্র মোস্তফা

ভেজা আগুনের তৃষ্ণা 

বাড়িটিকে ঘিরে খেলা করছে বিগত সূর্যের ছায়া। 
ছায়ায় ভয়ংকর দিনগুলো ভাঙা কাচের মতন 
টুকরো টুকরো বিঁধে আছে। 
বাড়িটার মূল দরজায় লেখা আছে 'জোছনা বাড়ি'।
উঠানে পিতলের কলস জলে ভরা।
জলের উপর ভাসছে জোছনা-পোড়া মানুষের মুখ। 
কলসির গায়ে প্রপিতামহ লিখে রেখেছেন, 
'যে আগুন পুষতে জানে
সে জানে জোছনার ব্যবহার।  
মানুষের ইতিহাস— সে তো ভেজা আগুনের তৃষ্ণা।'

সত্যজিৎ দত্ত

ঘড়ি

ঘড়িটা খুলে ফেলো প্লিজ! 
সময় আটকে যেতে চাইছে 
ঘন্টা মিনিটের কাঁটায়। 
পথ জুড়ে ছড়িয়ে অক্ষর, 
কিছু কুড়িয়ে নেব আদরে
কিছু শীতের অপেক্ষায়!

শুভ্রা সাহা

অনুগল্প : 

আপনজন

ছোটবেলা থেকেই নবীন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবিকে পূজা করে আসছে। মোম, ধূপকাঠি, ফুল দিয়ে গভীর শ্রদ্ধার সাথে পূজা করে। ওর পড়ার টেবিলের উপর একটা ছোট্ট রবীন্দ্রনাথের ফটো রয়েছে। মায়ের মুখে শুনেছে রবি ঠাকুরকে নাকি স্কুলে যেতে হয়নি ।বাড়িতে বসে বসেই সব পড়া শেষ করে ফেলেছে। বড় বড় সব বই লিখে ফেলেছে । স্বয়ং ভগবান না হলে এরকম কিছুতেই হতে পারে না । এটাই নবীনের ধারণা।  কারণ নবীর এত মনোযোগ দিয়ে পড়েও সব পড়া মনে রাখতে পারছে না। বই লেখা তো দূরের কথা । তাই মা যেমন করে ভগবান রাধা মাধব কে সিংহাসনে পূজা করে সেও টেবিলের উপরে রবীন্দ্রনাথকে সেইভাবে পূজা করে রোজ। মনটা খুব ভালো থাকে। আর পড়াশোনা ও ভালোভাবে করতে পারে ।সবাই ওকে ভালও বাসে। মনে যেন আলাদা একটা শক্তি অনুভব করে। জীবনে অনেক কিছু জানার আগ্রহটা অনেক বেড়ে যায়। নবীন মনে করে এটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরই আশীর্বাদ।

 নবীন যখন একাদশ শ্রেণীতে পড়ে ,স্কুলে খুব ভালো রেজাল্টের জন্য  রবি ঠাকুরের জীবনী নিয়ে লেখা একটি বই পুরস্কার পায় । অল্প কিছুদিনের মধ্যে সেই বইয়ের আগাগোড়া সব পড়ে ফেলে ।সেটিতে রবি ঠাকুরের আত্মজীবনী লেখা ছিল । নবীন তখন বুঝতে পারে রবি ঠাকুর কোন ভগবান নন। আমাদের মত রক্ত মাংসে গড়া মানুষ । তাঁর জীবনের অনেক দুঃখ কষ্ট নবীনকে ব্যথিত করে । নবীনের রবি ঠাকুরের প্রতি শ্রদ্ধা আরও বেড়ে যায় । অন্য সাধারণ মানুষের মতোই তার জীবন সুখ -দুঃখ -শোকে ভরা। ,  স্বজন হারানোর ব্যথা, আনন্দ সবই অন্য দশজনের মত । তাই নবীন তাকে ভগবান না ভেবে এবার থেকে নিজের প্রানের মনের মানুষ ভাবতে শুরু করে । প্রতিদিন তাঁকে ভক্তিভরে প্রণাম করে । তাঁর উপদেশ, বাণী, গান ,তার অন্যান্য লেখা নবীনকে চলার পথের প্রেরণা জোগায় ।নবীনের দুর্জয়কে জয় করার ক্ষমতা আরও বেড়ে যায় । সে কবিকে আপন আত্মীয় ভাবতে শুরু করে ।

সত্যজিত সেন

ম্যানুস্ক্রিপ্ট
 
প্রেতের শহর, আলো নেই I ভয়ঙ্কর আঁধার এখানে I
তোমার আসার কথা ব্রডকাস্ট হয়ে গেছে পাহাড়ে, অরণ্যে আর মেঘের চূড়ায় I 
চাঁদ আড়মোড়া ভেঙে বিছানায় উঠে বসে I ভোরের নারীর মত
সারা মুখে গোলাপের আলো। দুটি স্তন থেকে চাঁদ দুধের জ্যোৎস্না ঢেলে দেয়।
সহস্র আলোকবর্ষ দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে।  ক্ষতি নেই। 
নিশ্চয়ই কোনোদিন স্বপ্নের অলিন্দে দেখা হবে।
যেমন শুকনো ফুল উঁকি দেয় পুরোনো বইয়ের পাতায়,
মুখে তবু ঝুলে থাকে এক চিলতে রোদ্দুরের হাসি।
তুমি চোখ তুললেই ঝর্ণার আলো এসে মুছে দেবে দুঃসহ আঁধার।
ফিরে যাবে বলতেই  চাঁদ থেকে লেলিহান আগুনের শিখা।
উন্মত্ত চাঁদ ভেঙে টুকরো টুকরো জ্বলন্ত পাথর।
তুমি চোখ নামিয়ে নিতেই ফের ব্ল্যাক আউট, রাত্রির নদীর অন্ধকার।
আবার পৃথিবী জুড়ে প্রেতের শহর,কবিতার মুখে সেঁকোবিষ।
বুকের গভীরে রাখা রক্তাক্ত ম্যানুস্ক্রিপ্ট আজ অবধি ছাপানো হ’ল না।

সমরেন্দ্র বিশ্বাস

হারানো প্লুতস্বর

জীবনের সাজগোজ থেকে প্লুতস্বর হারিয়ে গেলে অশ্বমেধ যাপন 
মাটি হয়ে যায়। নক্ষত্রে নক্ষত্রে দীর্ঘশ্বাস, ঘোড়ার পা থেকে 
খুলে যায় রাজকীয় নাল। সুদূর প্রহরী প্লানেট হারিয়ে যায়
প্লুটোর মুখমন্ডল থেকে। তখন জীবনের উপবৃত্তে একাকী  
নিঃসঙ্গ পাক খাওয়া। খরগোসেরা এনে দেয় মৃত তারকা 
কিংবা মণিকাঞ্চনের আলো!

ইলেকট্রিক চুল্লীর দরজার সাটার অটোমেটিক বন্ধ। 
মাহাজাগতিক দূরত্ব থেকে তুমি ফেরত পাঠাও তোমার
বিছানায় ফেলে আসা আমার প্রাগৈতিহাসিক নক্ষত্রখচিত 
রুমাল। আর কোনও দিনও আমাদের দেখা হবে না।
বিষন্নতার সমুদ্রে হাঁটতে হাঁটতে আমিও মহাপ্রভুর অদৃশ্য
নীলাচলে নীল! কন্টকিত মাদারের ডালে ডালে দীর্ঘশ্বাস,
উঁকি মারে রক্তিম বসন্তের মৃত পাপড়ি। স্মৃতিতে হারাণো
প্লুতস্বর! গন্ধ কথা বলে, মহাজাগতিক রশ্মির সাথে ভেসে
আসে তোমারই দীর্ঘশ্বাস। বিদ্যুতের ঝলকেরা লেখে – 
এ জীবনটা বড়ো ছোটো হে। 

প্লুতস্বর হারিয়ে যাবার পর জীবন থেকে বর্ণমালারা বিদায়
নেয়। পড়ে ওঠা হয় না হারাণো রুমালের সংশোধনপত্র কিংবা
জীবনযাপনের সংবিধান।

সন্দীপ সাহু

ফুলের নাম মহম্মদ মানিক

মহম্মদ মানিক এক দেবতার নাম।
নাকি আল্লাহর, গডের?
মাল-এ হড়পা বানে ভেসে গিয়ে বেঁচে যাওয়া
ভেসে গিয়ে মরে যাওয়ার মানুষেরা,
বীর অকুতোভয় মানুষটাকে এখন পুজো করছে।
মন্ত্র ওরা নিজেরাই রচনা করেছে। ভালোবাসা থেকে।
এ মন্ত্র উচ্চারণ হয় হৃদয়ে ঝরনা পড়ার শব্দে।
উচ্চারণ হয় অক্ষিকোঠরে হড়পাবনে ভেসে যাওয়া তারা-শব্দে!

এই মন্ত্র মাটিতে আকাশে বাতাসে ফুলে ...
উড়ে উড়ে ভ্রমর হয়, ফড়িং হয়, প্রজাপতিও!
এর কোনো বর্ণমালা নেই, লিপি নেই! ভাষা আছে!
এই ভাষায় বাঁকা ধারলো চাঁদ ও ধারালো ত্রিশূল
প্রচণ্ড উত্তাপে গলে যায়। গলে গিয়ে মাটি হয়।

মাটি ফুল ফোটায়। ওই ফুলের নাম মহম্মদ মানিক!

বিপ্লব উরাং

শব্ধ

আলমারি ভর্তি বই।
বই-এর ভিতরে ঢুকে খোঁজতে থাকি-
লতুন লতুন শব্দ।
শব্দরা পথ দেখায়।
শব্দরা লতুন রাস্তা দেখায়।
শব্দ লতুন সপন আঁকতে শিখায়।
আলমারি ভর্তি বই।

কত শব্দ রাশি রাশি
সাজে আছে থরে থরে
খোঁজতে হবেক।

যদি সাচ্ ই শব্দ দিয়ে
সুন্দর বাইক‍্য গঠন করতে মাংগি(চাই)।
খোঁজতেত হবেক ই।

শব্দরাই দেখাবেক
লতুন দিনের দিশারী।

আলমারি ভর্তি বই।
খোঁজতে হবেক।

নবীনকিশোর রায়

অগ্নিধর্ম

আমাদের একই ঈশ্বর - - - 
এই আস্থার উপর দৃঢ় বিশ্বাস রেখে, 
পথে নেমে ভাবি---
আমাকে একা ফেলে সরে যায়
বহুদিকগামী পথের সাথে ভিন্ন ভিন্ন মতলবি !

কোথায়  থাকেন, কোন সাকিনে ঠিকানা--- প্রভু আমার , 
জিজ্ঞেস করতেই চতুর্দিকে টেনে নিয়ে যেতে চায়,
কেউ উত্তর দিকে তো কেউ দক্ষিণে ,
কেউ কেউ পূর্ব দিকে, আবার কেউ পশ্চিম দিশায় দেখাতে চায়!

জটিল এই ভ্রম থেকে বেরিয়ে
যে পথে বাড়ি ফিরি,
 ভাবি একটাই ঠিকানার কথা, 
ভাতযুদ্ধের চুল্লির ভিতর আগুন--- 
আর শেষ যুদ্ধক্ষেত্রে যে আগুন, সকল আগুনের ধর্ম একই .. 
পুড়ে পুড়ে অবশেষে ছাই!

আব্দুল গফফার

যন্ত্রমানব হবে, মানুষ হবে না

হাঁফিয়ে উঠেছে ছেলেটা, সারাদিন প্রাণ ওষ্ঠাগত।
আজ টিউশন,কাল প্রজেক্ট, পরশু ইউনিট টেস্ট।
এইভাবেই যন্ত্রের মতো ওর জীবনধারা-

প্রতিযোগিতায় খানখান ওর শৈশব, খেলাধুলা।
আমরাও ঘরকুনো, অসামাজিক হয়ে উঠেছি,
নেই লৌকিকতা, সম্পর্ক, কুটুম্বিতা দূর অস্ত।

হৈ হৈ,পালা করে রান্না বাড়ি বাজারের বস্তা,
সে সব এখন অতীত
একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে টুকরো হয়ে গেছে।

রোজগেরে দেখে পার করে দিল বাবা,
ব্যবসা,চাকরি, ছেলের খোঁজ নিয়ে লাভ নেই।
দুবেলা দুমুঠো পাওয়া আর গোত্র মিললেই হল।

চার হাত এক হয়েছে, ভেঙেছে পরিবার, সম্পর্ক।
প্রতিবেশী, ও সব ঠুনকো ব্যাপার এখন।
ছেলে মেয়েগুলোও যন্ত্র তৈরি হচ্ছে। 

বই খাতার ভারে ন্যুব্জ, মুখ ভার ওদের।
যন্ত্র হবে, যন্ত্রমানব হবে, কিন্তু মানুষ হবে না রে,
হারিয়ে যাবে ওরা, হারাবে সমাজ।

খোকন সাহা

বিজয়া      

এখন দুঃশাসনের প্রয়োজন নেই । 
দ্রোপদীরা ফেলে  দিচ্ছে বসন। কিংবা শাসন। 
গণতন্ত্র,  বা হেনতন্ত্রের গালেও   লেখা নেই ---
সোহাগের লম্বা দুটি হাতের  বাল্য ব্যাকরণ, বা বিস্ফোট জাগরণ। 
শুধু পাঁচ ফোঁড়নের গন্ধচক্রে
সহাস্য বদনে ঝরে --- স্বর্গের কানন।
তুমি কি সে ফুল কুড়ায়ে
ছড়াবে মাঠ। .... না, উলুবনে
ছড়াতে ছড়াতে মুক্তোর মালায়
পরাবে ---অধিকারের দিনরাত ? 

ওগো, নয়ন বিজলী রাত !
সোহাগের ডালা খুলে  ধরো -না.... 
দীণতার মন্ত্রে মুগ্ধ --- বিজয়ার প্রথম প্রভাত।
তবেই-না, সেই কোলে, 
এঁকে দিতে পারে ---
শতপুত্রের কান্না উজার
জননীর  বুকের ভিক্ষাচাতাল  
বিশ্বকরুণার আধার  ; 
মহাভারতের অমৃত কথা,
ভূ-ভারতের অন্ধকার। 

অর্ধেক আকাশ, অর্ধেক মাটি
দিয়ে  গড়ি ---
আমাদের পূজার প্রসাদ !

নন্দিতা দাস চৌধুরী

চড়াই ভাঙ্গি

অতীতের ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা মুছে ফেলতে ফেলতে পাথর হয়ে যাচ্ছি,

সূর্য-চন্দ্রহীন আকাশের শরীর বেয়ে নেমে আসে কামাতুর অন্ধকার, প্রচন্ড গুমোট , নিষিদ্ধ  বাতাস,

অন্তিম শ্বাসে আজ পথের পাঁচালী, হারিয়ে যাচ্ছে অপু-দূর্গা শূন্য ঘরে নিঃসম্বল প্রাণ,

দেশ আছে অস্থায়ী ঘরও, বেবাক সভ্যতায় বেকারত্বের কনকনে চাবুক, রুজি- রুটি জীবন সংগ্রামের গান, এসো আশ্বস্ত করি বর্তমান ,

প্রাতঃ- সন্ধ্যা ভ্রমণ আর নয়, চড়াই ভাঙ্গি তবেই গন্তব্য।