Jul 31, 2023

চন্দন পাল

 ভ্রমনকাহিনীঃ থাইল্যান্ড

পাসপোর্ট 

,,,,,,,, অস্বীকার করি না গুগল, ইউটিউব অনুসন্ধান করে শুদ্ধতর ভ্রমণবিদ্যা অর্জন করা যায় । তবে, চাক্ষুষেরও একটি আনন্দ আছে। কুয়াশা স্প্রে, জিরাফের জিব, ঢেউ সাঁতার, স্কাই স্কেপার, নিয়ন্ত্রিত ভেপু , মেঘের পোলাপান গোচরে এসেছে। 

২৩/৬

,,,,,,,,  আকাশ বাতাস নদী সাগর পাহাড়, নতুন মানুষ, চলন বলন, আচার সংস্কৃতি খাদ্যাভ্যাস দেখতে কার না ভাল লাগে। আমারও ভাল লাগে। সে লক্ষ্যে দেশান্তর পাসপোর্ট প্রস্তুত করেছিলাম প্রায় সাত বছর আগে, কিন্তু সুযোগ এল ২০২৩ জুনের শেষ দিকে। এর আগে ভারত ভ্রমন হয়েছে দুএকবার, প্রতিবেশী রাষ্ট্রেও গিয়েছি। কিন্তু বিদেশ! প্রথমবার। বিলুপ্ত প্রায় পশুপাখি,প্যারাসুট উড়ান, সমুদ্রদ্বীপ, ডুবুরি, ডুবোজাহাজ, জলঝাপ, চড়াই উৎরাই, নিশিসৈকতরূপ চোখের সামনে অপূর্ব চিত্তাকর্ষক। আবার ওতে নিজে জড়িয়ে গেলে বুঝা যায় অভিযানগুলি তত সহজ নয়। এর জন্য চাই মানসিক প্রস্তুতি, সামর্থ্য! শক্ত হৃদয় ও স্বাভাবিক রক্ত চাপ। রাত আটটায় আকাশ থেকে তারাময় কলকাতা দেখতে দেখতে দমদম পৌঁছে গিয়ে সবার আগে যে কাজটা করতে হল তা, টাকা ভাঙিয়ে 'ভাট'(থাইল্যান্ডী মুদ্রা) নেওয়া। একটা নির্দিষ্ট পরিমান ভাট না থাকলে ভিসা পাওয়া যায় না। কলকাতা 'সানসিটেল' হোটেলে সব ব্যবস্থা থাকায় খুব সুবিধা হল। পরদিন ঐ হোটেলেই প্রাত:রাশ সেরে বিদেশ যাত্রা শুরু।

 ২৪/৬

,,,,,,, নেতাজী সুভাষ বিমানবন্দর থেকে সুবর্ণভূমি! বিমান বন্দর, মানে কলকাতা থেকে থাইল্যান্ড পর্যন্ত আড়াই ঘন্টা উড়ানের মাঝে যখন ভোজ ও ঠান্ডা পানীয় জোগান দেয় তখন সময়টা সহজেই কেটে যায়। জানালা দিয়ে আকাশের সংসার, মেঘের পোলাপান দেখতে বেশ ভাল লাগে। কেউ সাদা, কেউ নীল, কেউ সোনালী, কেউবা আধা-আধি। আবার উড়োজাহাজ উঠা-নামার সময়, ঘরবাড়ি জমিগুলো বড় থেকে ছোট হওয়া, মানচিত্র চিহ্নিতকরন (ম্যাপ পয়েন্টিং) এর মত লাগে আর রাতে বিদ্যুৎ বাতির মিটমিটি আলো দেখে মনে হয় যেন তারামন্ডল দেখছি।  তিরোপতি পাহাড় থেকে রাতে নিচে নামার সময়ও দৃশ্যটি দেখা যায় (চেন্নাই)।

,,,,,,,,,,, আমাদের দলের প্রায় চল্লিশ জন আপণিক যখন বিমান বন্দর ছেড়ে প্রিন্স কোং আয়োজিত শীততাপ বাসে উঠি তখন আমাদের গন্তব্য থাইল্যান্ডের বিখ্যাত শহর 'পাট্টায়া'/ পাত্তায়া/ Pttaya। বাসে পথপ্রদর্শিকা যাকে পেলাম সে থাইভাষী কুমারী "অ্যামী", সাথে একজন অনুবাদকও ছিলেন, সন্দীপ দা। অ্যামী প্রথমে ইচ্ছুক যাত্রীদের সাতশটাকায় লোকেল সিম বিতরণ করলো। অ্যামী যথেষ্ট সময়নিষ্ঠ, ভদ্র ও ইংরেজি পটু। তাঁর হাতে একটা ফোল্ডিং ফলক থাকতো, তাতে লেখা 'ক্লাসিক টাইলস'। ভিড়ভাড় এলাকায় সে ওইটি উঁচু করে তুলে রাখে ফলে কেউ দিশা না পেলে দূর থেকে ক্লাসিক টাইল লেখা দেখে এগিয়ে গেলে সবাইকে পেয়ে যায়। তাঁর থেকে জানলাম ভারত সম্রাট অশোকের প্রেরণায় থাইল্যান্ডে বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃত ভাষা প্রবেশ করেছে। সে ভাষা থেকেই বিমান বন্দরটির নাম 'সুবর্ণভূমি'। গর্ববোধ হল। তত সুবর্ণখনি না থাকলেও মূল্যবান পাথর খনি আছে। অ্যামী আমাদের একটি বৃহদাকার অলঙ্কার বিপনি বিতানে নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে একটি যাদুঘর ছিল। তাদেরই ব্যবস্থাপনায় টয়ট্রেনে করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নমুনাকর্ম দেখালো: কিভাবে খনি থেকে হীরা পান্না নীলা উত্তোলন পরিশোধন বাছাই কাটাই নির্মান করা হয়। প্রায় ২০০ থেকে ২০ লক্ষ টাকা দামের অলঙ্কার রয়েছে বিপনিটিতে। নাম বিস্মৃত। সমবিভ্যাহারীদের কেনাকাটা শেষ হলে, সেখান থেকে বেরিয়ে ' ট্রাইমিটে'একটি বুদ্ধমন্দির দেখলাম, যার ভিতর নিরেট স্বর্ণের বুদ্ধমূর্তি রয়েছে। ওজন ৫,৫০০ কেজি। (স্থাপিত তেরোশ' শতাব্দী) আকারে বিশ্বসেরা না হলেও মূল্যমানে সেরা । অ্যামী বলল, বার্মা বর্গীলুটের সময় বহু কষ্টে সিমেন্ট কাদা দিয়ে ঢেকে রেখে একে বাঁচানো হয়েছিল।

,,,,,,,,,, এদেশে মোট জনসংখ্যার ৯০ ভাগ বৌদ্ধ, দশ ভাগ হিন্দু, মুসলমান, খ্রিষ্টান ও অন্যান্য। চাল আখ আলু!(যা থেকে ক্যামিকেল হয়) প্রধান ফসল। পর্যটন ও ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রাংশ আয়ের বড় উৎস।  চৈনিক এবং ভারতীয় পর্যটকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। সত্তরটির ওপরে সুদৃশ্য নগরী আছে। আছে আরামের সাগর সৈকত ও ভারতীয় খাবারের হোটেল। বিভিন্ন দেশের হোটেলও আছে। রাজতন্ত্র শেষ হয়েছে বেশিদিন হয়নি। আশ্চর্যজনক ভাবে রাজাদের উপাধিতে হিন্দু প্রভু রামচন্দ্রের মিল পাওয়া যায়। যথাঃ রামা এক, দুই, তিন। শেষ রাজা রামা ১০, 'ভাজিরালংকর্ন'। রাজতন্ত্র উঠে যাওয়ায় বর্তমানে জার্মানে থাকেন তিনি। তার রানী 'সুথিদা' একজন বিমানবালা। রাজারা নিজেদের সূর্যবংশ জাত বলে মনে করেন। তাদের ভগবান বুদ্ধও সূর্য বংশীয় বলে মানেন। খানে খানে রাজ সম্পত্তি ভাড়া দেওয়া আছে। জুলাইয়ে রাণীমার জন্মদিন, তাই প্রত্যেকটি সম্পত্তির সামনে তার বড় ছবি লাগানো হয়েছে । ভারতীয় একশ টাকায় সেখানে প্রায় চল্লিশ 'ভাট'(স্থানীয় মুদ্রা) পাওয়া যায়। সেদিক দিয়ে দেখলে আমাদের টাকার মান কম। আর ঘড়িসময়ও দেড় ঘন্টা দ্রুত। অর্থাৎ আমাদের রাত আটটা থাইল্যান্ডে রাত সাড়ে নয়টা। সারাদিন সারারাত 'সেভেন ইলাভেন' নামে ন্যায্যমূল্যের একটি দোকান খোলা থাকে। কিছুদূর পর পর এই দোকানটি পর্যটকদের জন্য অতিশয় নিরাপদ ও শীততাপনিয়ন্ত্রিত। ব্যবহারিক নব্বই শতাংশ সামগ্রী ঐ দোকানে পাওয়া যায়।

২৫/৬

,,,,,,, পাট্টায়ার সেকেন্ড রোডে আমরা যে হোটেলে উঠেছিলাম তার নাম 'গোল্ডেন বীচ হোটেল'। ১১তলা, প্রায় এক হাজার শয্যা। পরিপাট্যে ভরা হোটেলে রাতের খাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়ি পাট্টায়া শহর নিশিভ্রমনে। নির্দেশিকা অ্যামী আগেই বলেছিল পাট্টায়া শহর রাতে জেগে থাকে আর দিনে নিরিবিলি। হোটেল থেকে এক কিমি দূরে সমুদ্র আর 'ওয়াকিং স্টিট'। নামের সাথে মিল রেখেই স্টিট্ টিতে শুধু হাঁটো আর হাঁটো এবং উপভোগ কর রাতের দোকানপাট, আলোঝলমল, নাচগান(রক) আর থাই মহিলা-পুরুষ ও কুমারীর মেলা। শরীরমালিশ এখানকার বিখ্যাত লোকসংস্কৃতি।  আমার কেন জানি মনে হল সাগর পারে এ জায়গাটি পর্যটকদের আকর্ষনেই দিনে দিনে গড়ে উঠেছে। সাগরপারের ওয়াকিংস্ট্রিটে হাঁটলেও আবহাওয়া উষ্ণ বোধ হল। এর মূল কারণ শ্বাসপ্রশ্বাস ও শীততাপ যন্ত্র নির্গত গরম হাওয়া। প্রতিটি বাড়ি, গাড়ি, হোটেল, রেস্তোরাঁ থেকে অবিরত শীততাপযন্ত্রের গরম হাওয়া বেরুচ্ছে। একঘন্টা পর স্টিট থেকে চলে যাই সাগর পারে। সেখানে সমুদ্র গর্জন এস্রাজ সুরে মোহিত করছে বেলাভূমি, রাতবাতি, পামসারি, রোদছাতা আর অলস পর্যটকদের। দেখলাম প্রায়ান্ধকারে কেউ কেউ চড়কিবঁড়শি বাইছে, দুটি কিশোর বক্সিং অনুশীলন করছে (রাত বারটায় খেলাচ্ছলে না-কি শীতলবালু আবহাওয়ার কোন ভূমিকা আছে বুঝতে পারিনি)। অনেকে বিছানার মত বড় জায়গা জুরে কচিকাঁচা নিয়ে বসে আছে। কখন ঘুমুবে কখন জাগবে জানিনা।

২৬/৬

,,,,,,, পরদিন সকালে হোটেলে বনেদী প্রাতঃরাশ সেরে রওনা হলাম 'কোড়েল' দ্বীপের উদ্দেশ্যে। থাইল্যান্ডে বিভিন্ন দ্বীপের মধ্যে এটি একটি। স্টীমারটি যেতে যেতে পথে একটি ভাসমান জেটিতে (বিশ্রামাগার) থামল। এখানে চারটি কসরতের জন্য ব্যাক্তিগত টিকিট কাটতে হয় ছয়হাজার টাকায়। শুনেছি, কসরতগুলি ভারতের গোয়া সহ কিছু সমুদ্রপারেও গড়ে উঠেছে। প্রথমে প্যারাসেইলিংঃ এখানে বায়ুথলী (লাইফজ্যাকেট) পরিয়ে প্যারাসুটের সাথে মানুষকে বেঁধে দেওয়া হয়। ত্রিশ হাত লম্বা একটা শক্তদড়ি মোটরবোট থেকে প্যারাসুটে বেঁধে, মোটরবোট জোরে ছুটালে প্যারাসুট ওপরের দিকে উঠতে থাকে সাথে মানুষও, পাঁচসাত মিনিট পর আবার মানুষটিকে জেটিতে ফিরিয়ে আনে। তারপর ডুবসাঁতারঃ ২) এখানে মানুষকে ডুবুরি পোষাক পরিয়ে অক্সিজেন হ্যালমেট লাগিয়ে, জলের নিচে ঠেলে দেওয়া হয়। শ্বাসপ্রশ্বাসের কোন অসুবিধা হয় না কিন্তু প্রথমবার কানে একটা ভয়ানক চাপ অনুভূত হয়, কেউ কেউ এই চাপে ভয় পেয়ে ওপরে উঠে আসে, তাদের জলের নিচে হাঁটা বা ছোটমাছকে রুটি খাওয়ানো আর হয় না। টাকাটাই বিফল। তারপর দূরন্ত জলমোটর সাইকেলঃ ৩) এখানে মোটর সাইকেল জলের ওপর দিয়ে দ্রুত গতিতে ছোটে, কখনো লাফিয়ে চলে, ভয়ানক দ্রুত মোড় কাটে, পাঁচ মিনিট শরীরের তাল ধরে রাখতে হয়। বায়ূথলী (লাইফজ্যাকেট) পরা থাকে ডুবে যাওয়ার ভয় নেই। তারপর ব্যানানাবোটঃ ৪) চারজন একসাথে বসে সমুদ্র জলের সাথে খেলতে খেলতে দ্রুত গতিতে ছোটে। শেষে ভিজে একসা হয়ে পাঁচ মিনিট পর ফিরে আসে। সবশেষে স্টীমার আমাদের কোড়েল দ্বীপে নামিয়ে দেয়। জায়গাটি (একটি জেলার সমান হবে মনে হয়, ড্রোন ক্যামারা থাকলে ভাল বুঝা যেতো) সমুদ্র মাঝে সবুজ টিলা, তার অর্ধচন্দ্রাকৃতি পাদদেশে দীর্ঘবালুকাভূমি। রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়ায় ছাউনি পাতা সৈকত। ছাউনির নিচে হকাররা স্থানীয় কুঠির শিল্প সহ অন্যান্য সামগ্রী বিকি করে। ছবি ও স্নানের উত্তম পরিবেশ এই দুধ-সাদা বেলাভূমি । স্বল্পবাসে অনেকেই স্নান করছেন।  আমরাও সদলবলে স্নান সাড়লাম।  তবে সাঁতার কাটা বিপদজনক একের পর এক ছোটবড় ঢেউয়ের কারনে। স্বাসের জন্য যেই মুখ খোলা হয়, সেই মুখেই জল ঢুকে যায়। নিজেও কিছু জল খেয়ে অবসন্ন হয়েছি তবে পারে না পৌঁছা পর্যন্ত সাঁতারে ক্ষান্ত হইনি। প্রথম অভিজ্ঞতা। যাঁরা ইংলিশ চ্যানেল পারি দেন তাঁদের অক্সিজেন হেলমেট থাকে নাকি শান্ত জলপথ, জানিনা। সেদিন 'মুম্বাই সে' রেস্টুরেন্টে দু'বেলা খেয়ে পাট্টায়া শহর কে বিদায় জানানো হয়।

,,,,,পরদিন পাট্টায়া থেকে ব্যঙ্ককের পথে সবুজ জঙ্গল, টিনের একচালা, লাল মাটি হারিয়ে ক্রমশ ইটের জঙ্গল আর উড়ন্ত অজগরের ভিড়ে প্রবেশ করি মানে ফ্লাইওভার। ক্রমে কংক্রিট দেওয়ালের ঘনত্ব ও উচ্চতা বাড়তে থাকে। নির্নিয়মান রাস্তা বাগান সেঁতু যেমন দেখেছি, তেমনি দেখেছি বড় বড় ইমারত। আমাদের দেশের মতই ক্রেন আর লিফ্টকে কাজে লাগানো হয়েছে। এখানে গাড়িচালকরা ভেপু(হর্ন) খুব কম বাজান। (একটা ভিডিওতে দেখা যাবে আধা কিমি রাস্তায় ২০০টির মত গাড়ি চলমান কিন্তু আমাদের দেশের মত পে-পু র প্রতিযোগিতা নেই চৌমাথা হলেও)। গাড়ি থেকেই দেখেছি গনেশ পুজো উপলক্ষে মানুষের ভিড়। এখানে গনেশ ঠাকুর সৌভাগ্য ও ধনরত্নের দেবতা হিসাবে পূঁজিত হন। ব্রহ্মা পূজাও হয়। বুদ্ধ পূজা সর্বাধিক। ব্যঙ্কক থাই-উপসাগর ও চাও-ফ্রায়া নদীর বদ্বীপে সেজে উঠেছে।  মুল শহর বেশ পরিপাটি। স্থান বিশেষে অবিরত ঝাড়ু ক্রিয়ায় ঝকঝকে তকতকে। কোথাও আবার কুয়াশা স্প্রে করা হচ্ছে। সুউচ্চ টাউয়ার ও প্রাসাদের নক্সা অভিভূত করে তোলে। এর মধ্যে 'সিমলন' এলাকায় ৭৭ তলাবিশিষ্ট একটি ভাঙা প্রাসাদ দেখালো অ্যামী, যা প্রকৃতপক্ষে ভাঙা নয়, সেটা প্রাসাদ কর্তৃপক্ষের একটা প্রচার কৌশল। অবাক করে দিয়ে ওটির নাম দেওয়া হল 'স্কাই স্কেপার' ৩ । ইতিমধ্যে গাড়ি এসে থামল 'ওয়াটার গেইট' হোটেলে। মধ্যাহ্ন ভোজের পর কিছুক্ষণ শহর বাজার ভ্রমণ। পরদিন সাফারি পার্ক (অভয়ারণ্য) ও ম্যারিন পার্ক (জলজন্তু কসরত) প্রদর্শনীতে নতুনত্বের অপেক্ষায় নিশিযাপন হল এক বনেদী হোটেল 'ব্যঙ্কক প্যালেসে'। ২৭/৬

,,,,, সকাল নয়টায় প্রাত:রাশ সেরে গাড়ি ছুটিয়ে গিয়ে থামল পার্কের গেইটে। এখানে কিছু বিধিনিষেধ অর্জন , টিকিট কাটা ও প্রাকৃতিক কাজ সারা হল। তারপর গাড়ি সহ অভয়ারণ্যে প্রবেশ। একে একে চটকদার জেব্রাদল, হিমু, ঊট পাখির রাস্তা দখল, সাদা শিংযুক্ত বাইসন ও হরিণ, জলহস্তী সন্তরণ দেখলাম। দেখলাম একটা গেইট পেড়িয়ে, বাঘ সিংহের ঝুন্ড । ভাগ্যিস আমরা সবাই গাড়িতে বন্দী, জন্তুরা সব মুক্ত । আবার একটি গেইট পেড়িয়ে  বুঝলাম এটা বাড়তি সতর্কতা হিংস্র পশুদের জন্য। প্রতি তেমাথায় ডোরাকাটা জীপ নিয়ে প্রতিরক্ষা কর্মীরা প্রহারারত। তারপর গাড়ি এসে একটি কাঠের দোতালার সামনে থামল। দোতালায় উঠে গিয়ে দেখি  জিরাফেরা এক হাত লম্বা লাল জিব বের করে পর্যটকের হাত থেকে কিছু খাচ্ছে আর আদর নিচ্ছে। বুঝলাম জিরাফের উঁচু গলা ও চেহারাকে কাছে থেকে অনুভব করার জন্য কর্তৃপক্ষের একটা কৌশলী আয়োজন। কিছু ছবি ভিডিও তোলারপর, পায়ে হেঁটে দ্বিতীয় গেইট দিয়ে প্রবেশ করলাম ম্যারিন পার্কে। প্রথমে লেজ ঝুলা টিয়াপরিবারের আড্ডা, তারপর দাঁতাল সী-লায়নের দেখা, তারপর পৃথিবীর বৃহত্তম ইঁদুর (একেকটা শূকর ছানার সমান) দেখলাম।  বাদবাকি রাজহাঁস, সারস, লালছোপ বিলেতী আইরের কথা না বললেও চলে। এরাও প্রতি দলে প্রায় ৩/৪ শ, প্রতিদিন মানুষ দেখে দেখে এতটাই অভ্যস্ত যে আমাদের পাত্তাই দিল না। পার্কের একটি হোটেলে লান্সের ব্যবস্থা ছিল।  ভিড়ের জন্য দাঁড়িয়েই খেতে হল, কারণ ততক্ষণে ডলফিন শো শুরু হয়ে যাচ্ছে । চমৎকার লাগলো এটা দেখে যে মাছেরাও কিভাবে মানুষের কথায় নাচে, লাফায়, চুমু খায়। সীল মাছের প্রদর্শনীও সেরূপ শুধু তাকিয়েই থাকতে হয়, ভিডিও করার দিকে মনযোগ থাকে না। শেষে সিনেমা স্যুটিং প্রদর্শনীঃ ভেড়া,ঘোড়ার ছুটাছুটি গুলিবারুদ, বোম, আগুন, জল নিয়ে একটি গ্রামের যাপন কাহিনী বাস্তব করে তুলল কলাকুশলীরা। বিভিন্ন স্কুলের কচিকাচারাও দর্শকাসনে ছিল। অভিনয়কৃত আগ্নেয়াস্ত্রের শব্দ ও হঠাৎ জলের ঝটকা তাদের শিহরিত করে তুলেছিলো।  আরেকটা জিনিস আমার কাছে একেবারে নতুন লাগলো: ভিড়বহুল খোলা জায়গায় মানুষের বসা ও চলার পথে, একতলা উচ্চতায় কতগুলি কাল রঙের হাফ ইঞ্চি লতানো পাইপ বাঁধা ছিল, যা এক ফুট অন্তর অন্তর সূঁচফোটানো ছিদ্রযুক্ত। জল প্রবাহ দিলে ঐ পাইপের ছিদ্র পথে ধূঁয়ার মত জল বেরিয়ে এসে পথিকের গায়ে লেগে কুয়াশার মত অনুভূতি সৃষ্টি করে। ভিড় ও সূ্যরশ্মির অসহ্য গরমের সময় ঐ কুয়াশা আশির্বাদ মনে হয়। প্রদর্শনী গ্যালারীর ওয়াল-ফ্যানগুলিতে ঐ কুয়াশা স্প্রে লাগানো ছিল। ম্য্যরিন পার্ক ও মন্দির হাঁটা পথের খানে খানেও ওই ব্যবস্থা উপভোগ করেছি। 

,,,, তারপর সেখান (সাফারি ওয়ার্ল্ড) থেকে বেরিয়ে গেলাম আবার শহর বাজার দর্শন ও কেনাকাটায়। আমাদের দেশের মত বড় বড়  বহুতল বাজার রয়েছে। রয়েছে হিন্দি ইংরেজি জানা রসিক দোকানদার। তারাও খুশি হিন্দিভাষীদের পেয়ে। আমাদেরও মনে হল যেন ইন্ডিয়াতেই আছি।  সামগ্রীর দাম কোনটা কম কোনটার বেশি। একমাত্র অভিজ্ঞ ক্রেতারাই লাভবান হবেন। 'ইন্দিরা মার্কেট' ও 'ওয়াটার গেইট' মার্কেট থেকে আমি নিজে দু'একটা জিনিস কিনেছি এর মধ্যে  ব্যাতিক্রমী গেঞ্জি টি ছেলের খুব পছন্দ হয়েছে। কারন তাতে ওর ছবি আঁকা। আমি আমার মোবাইল থেকে দোকানদারকে ছেলের ছবি দিলাম। ২০ মিনিটের মধ্যেই একটি পরিস্কার গেঞ্জিতে তা ছেপে দাম নিল ভারতীয় তিনশ টাকা। আরও অনেকেই কিনল। হাসি খুশি নতুনত্বের অনুভবে গল্পে ভিসা সময়ও এগিয়ে এলো।  চারদিনের বিদেশ সফরের আরও কত গল্প, পরে স্মৃতি হয়ে ধরা দেবে। তখন আবার আড্ডায় বসবো।

,,,,, সব দলেই দুএকজন ব্যাতিক্রমী মতাদর্শের লোক থাকে। আমাদের মধ্যেও ছিল। যাদের জন্য কিছু  সময় নষ্ট হয়েছে যা অফেরতযোগ্য। আমি নিজেও কিছু ছবি ও ভিডিও তুলতে গিয়ে দেরী করেছি,দলছুট হয়েছি। কিন্তু, শেষ দিনে দলছুট একজনের গাড়িতে উপস্থিতি এত দেরী (রাতে দেড় ঘন্টা) হল যে ঊনচল্লিশজনের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটল। ফলস্বরূপ যে তিরস্কার ও কৈফিয়ত উচ্চস্বরে বর্ষিত হল তখন আমরা ভুলে গিয়েছিলাম যে আমরা বুদ্ধের দেশ থাইল্যান্ডে আছি। ভুল ভাঙল তখন, যখন দেখলাম আশেপাশের ঝুলবারান্দা থেকে অধিবাসীগণ হা হয়ে অনভিপ্রেত তাকিয়ে আছেন। সলজ্জ আমরা তখন স্বর নিচু করে 'সিজন হামার্ক' হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম যা বিমানবন্দরের সন্নিকটে। অবশ্য প্রকৃতির আশির্বাদও আমরা পেয়েছি। ব্যঙ্কক পরিচলন তাপমন্ডলে [১৬° উত্তর ] থাকায় তাপপ্রবাহ লাগলেও বৃষ্টি একদিনও আনন্দে বিঘ্ন ঘটায়নি।

 ২৮/৬,,,,সুবর্ণভূমি ছেড়ে ইন্ডিগো তে প্রাতঃরাশ, নেতাজী সুভাষ বিমানবন্দরে লান্স, সবমিলিয়ে নিরাপদ বাড়ি ফিরা পর্যন্ত একটি স্মরনীয় পুলকভ্রমনের জন্য প্রিন্স কোং, ত্রিপুরায় সুযোগ্য বন্টনকারী (ক্লাসিক টাইলস্) ও দক্ষ বিক্রয়কর্মীকে কুর্নিশ জানাই। ধন্যবাদ জানাই সকল পাইলট, বাসগাড়ির চালক, অ্যামী, সন্দীপ দা আর শৃঙ্খলা পরায়ণ থাইল্যান্ড বাসীকে।

গোপালচন্দ্র দাস

 এ পৃথিবী তোমার-আমার

এস পৃথিবীকে ভালবাসি--এ পৃথিবী তোমার- আমার।বিরবির করে চলেছেন কবি শরদ্বিন্দু সেন।পেটে ভাত নেই,অথচ পেটে আজ নল পড়েছে।চল সেন---।

- এই কোথায়?মাথায় আঘাত করল কেউ।কতক্ষণ কাটল কে জানে!

আমার মুখের চোখের কাপড় সরানো হল।সামনে একজন সিগার টানছে।               --আমি ডন,মুন্না।লোক আমাকে মাথা মুন্না ডাকে।যারে ভাল লাগেনা,তার ঘাড়ে মাথা রাখিনা।মাগার,তোমাকে ভালবাসি বস্‌---তুমি সুধার যাও?

কবি বললেন,এটাই তোমাদের সমস্যা মুন্না।তোমরা ভালবাসা বিনিময় করতে পার না,সহ্য‌ও করতে পার না।মুন্না বলল,দিব্যি বলছি মাইরি---এখনই একজনকে ভালবেসে এসেছি কবি!

- এটা শুধু টাকা আর শরীরের বিনিময় মুন্না,এটা ভালবাসা নয়!

- তুমি ছাইপাশ লিখে কি পেয়েছ?আমার টাকা আছে।দেশের প্রতিটি লোকের ভাগ্যলিপি আমার ল্যাপটপে!তুমি কি স্বাধীন?পিস্তলের সাইলেন্সার পাইপ মাথায় ঠেকিয়ে বলছে,তুমি কি মুক্ত সেন?

- আমি মুক্তির উৎসবের সূচনা দেখতে পাচ্ছি মুন্না!সবাই মুক্তির মঞ্চে হাত ধরাধরি করে নাচছে,গাইছে এস পৃথিবীকে ভালবাসি,এ পৃথিবী তোমার-আমার।

- হ্যা হ্যা হ্যা, হাসল মুন্না।এটা কি?

- এক ইঞ্চি লোহার টুকরো।

- কিছুক্ষণের মধ্যেই এই টুকরো তোমার শরীরে বিঁধবে,যন্ত্রণায় ছটফট ছটফট করে তুমি মারা যাবে,তখন তোমার ভালবাসার কি হবে কবি?

- মৃত্যু সবার জন্য অবধারিত মূর্খ মুন্না!তুমি আমার শরীরকে মারতে পার,আমার উদ্দেশ্য আদর্শকে নয়?

- আচ্ছা! ধ্রুম---সবাই আনন্দ কর,নাচরে!কবি মরছে---নেচে নেচে ওর আদর্শকেও ভাসান দাও।আরেকবার পিস্তল গর্জে উঠল,ধ্রুম--

            কবির মুখে রক্ত উঠে এল।ঠোঁটে বাঁকা হাসি রেখে বললেন,আমার সামনে কতগুলো কঙ্কাল নাচছে!

- মুন্না বলল,এই দেখ আমরা বেঁচে আছি,দিব্যি নাচছি।

- কঙ্কাল নৃত্যের আরেক নাম মৃত্যু মুন্না!অনেক কষ্টে কবি বললেন,তুমি এক মাস কাউকে টাকা না দিয়ে দেখ,তোমার মান,অহংকার, বিলাসী জীবন,সুখ,আশা,ক্ষুধা, প্রেম এগুলো কোথায় যায়।টাকা ছাড়া তোমার কিছুই নেই মুন্না!

- কালু   - জ্বি বস্

-জিন্দা মানুষের চামড়া দিয়ে ডপলি বানিয়েছিস?- না বস্

- আর মাথা দিয়ে ঢোলক?- না বস্।

-তুই আনাড়ি,আজ বানিয়ে ফেল।

- তার প্রয়োজন হবে না মুন্না, তুমি আনাড়ি---তোমাদের এক পা কবরে!

আকাশে কালো মেঘের সাজ।তার‌ই মধ্যে কবি সেঁজুতি দেখতে পেলেন।

                   চারিদিকে কবির হত্যার খবর দাবনলের মত ছড়িয়ে পড়েছে।হাজারো লাখো মানুষের ঢল,হাতে হাতে প্লে-কার্ড,মৌন মিছিল, মশাল মিছিল, কালো ব্যাজ পড়ে মানববন্ধন।সামরিক ফৌজ রাস্তায় নেমেছে,ধরপাকড় শুরু হয়েছে।সাধারণ লোকেরা মুন্নাদের মত লোকদের ধরে ধরে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, কেউ জানেনা।হিংস্র জীব-জন্তুর এক জঙ্গলে হাত পা ভাঙ্গা মুন্না মুখ বাঁধা অবস্থায় মাটিতে পড়ে আছে।সে গুমরে গুমরে আর্তনাদ করছে,আমাকে মৃত্যু দাও---আমাকে মৃত্যু দাও!কতগুলো পাখিডাকা ভোর গেল,কেউ এল না বরং মুহুর্মূহু প্রকৃতি থেকে যেনো ভেসে এল,এস পৃথিবীকে ভালবাসি,এ পৃথিবী তোমার-আমার।

মো: ইউসুফ আলম

 ঝরা পাতা

“ আজ ঝরা পাতা ভালো লাগে, ভালো লাগে শরৎ
চাইছি আমার মনের ঘায়ে, একটু তোমার পরশ”
কেমন আছো ?
ভালো ?
নাকি শুকিয়ে গেছো আরো ?… তোমার ডায়েট প্ল্যান টা আমি কোনদিনই বুঝে উঠতে পারিনি। আজকাল তোমাকে দেখার জন্য প্রায়ই মনটা ব্যাকুল হয়ে উঠে।
এই শীতকাল এলেই তোমার শরীর খারাপ হয়ে যায়, নিশ্বাসে সমস্যা হয়।
তুমি জানো ?
আমাকে ছেড়ে যখন চলে গেছিলে তখন ভেবেছিলাম খুব, কাঁদলে তো তোমার খুব অ্যালার্জি হয়। মনে মনে চেয়েছিলাম যাতে না কাঁদো।
আচ্ছা বলোনা, কেমন আছো ?
ভালো ?
মনে পড়ে আমাকে ?
সেই অভিমান, রাগ, আদর, চুমু, রাত জেগে কথা বলার সেই দিনগুলি ?
আমার গলায় গান না শুনে ঘুমাতেই না, কি পাগলামি না করতে। একটা ছোটো বাচ্চার মত আবদার করতে সবসময়।
মনে তো পড়েই, হয়তো কাওকে বুঝতে দাওনা। আমার থেকে কঠিন তুমি, সেই ছবি তো বজায় রাখতে হবে।
তুমি জানো ?
তুমি চলে যাওয়ার পর আমি খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। ঘাড় থেকে মাথা হয়ে কপাল অব্দি খুব ব্যাথা করতো। বাড়িতেও কিছু বলিনি। নিজেই ডাক্তার এর কাছে গেছিলাম, ডাক্তার বললো নিজেকে আর অত্যাচার না করতে। নাহলে নাকি নার্ভ এর ঔষধ খেতে হবে। কি করবো বলো… অনেক রাত ঘুমাতে পারিনি। চোখের নিচে কালো ছোপ পড়ে গেছে।
শরীরটা কেমন জানি তামাটে হয়ে গেছে। খাবার না খেতে খেতে শরীর অনেক দুর্বল হয়ে গেছে।
তুমি জানো ?
তুমি ছেড়ে চলে যাবার পর নিজেকে একরকম বন্দী করে রেখেছিলাম একলা ঘরে। কোনোকিছুই ভালো লাগতোনা। ফোন নম্বর টাও পাল্টে নিয়েছিলাম তোমার কথা মত।
তুমিই তো চেয়েছিলে, তুমি চাইলেও যেনো আমাকে ফোন করতে না পারো, তাই জন্য আমি যেনো নম্বর টা পাল্টে ফেলি.. মনে আছে ?
ফোন কি করেছিলে আমার খবর জানার জন্য ?
হয়তো করেছিলে…।
তুমি জানো ?
রোজ রাতে কোনো না কোনোভাবে আমার স্বপ্নে চলে আসো তুমি। কথা হয়, রোজ গভীর রাতে স্বপ্ন ভেঙে উঠে বসে থাকি। কাঁদি মাঝে মাঝে। আবার নিজেকে সামলাই।
চোখের জল এখন বাগ মানে, শিখেছি কান্না ভিতরে আটকাতে। কিন্তু গলার ভাঙা আওয়াজটা সামলাতে পারিনা, এখনো কান্না পেলে চুপ করে থাকি যেনো কেও না বুঝে। কথা বললেই তো সবাই বুঝে যাবে যে।
তুমি জানো ?
তোমার সেই সবুজ রঙ এর ছোট ক্লিপ’টা আর তোমার খাওয়া আইস ক্রীম এর সেই চামচ দুটো এখনো যত্ন করে রাখা আছে। এগুলাই আমার কাছে খুব দামি। তুমি বলেছিলে আমি নাকি ফিল্মি। এসব জমিয়ে রাখি বলে। আজ দেখো, এগুলা ছাড়া আর কিছুই নেই আমার কাছে তোমার স্মৃতি হিসেবে। তোমার কথা রাখতে গিয়েই তোমার সব ফটো আমি ডিলিট করে দিয়েছিলাম।
তুমি জানো ?
খুব মনে পড়ে তোমার মুখ, তোমার রাগ, তোমার হাসি, তোমার আদর, তোমার স্পর্শ, তোমার একঘেয়েমি। এই দেখো, আবার চোখ ভিজে গেছে।
আজ সকাল থেকেই কেনো জানি ঘোলাটে লাগছে সবকিছু।
তুমি জানো ?
খুব ইচ্ছে করে একবার দেখি, একবার জিজ্ঞেস করি… কেমন আছো ?
জানি সম্ভব না আর।
তুমি জানো ?
তুমি আসার আগে যতটা একা ছিলাম, চলে যাওয়ার পর আরো অনেক বেশি একা হয়ে গেছি। অনেকের সাথেই যোগাযোগ বন্ধ।
খুব চেয়েছিলাম, বলেও ছিলাম… যেও না।
কেঁদে বলেছিলাম তোমার হাত ধরে, প্লিজ যেওনা, আমি ভেঙে যাবো। কিছু ঠিক হবেনা। তোমাকে ছাড়া কিছুই ভাবতে পারিনা।
চেয়েছিলাম তুমি থাকো আমার এই কঠিন সময়ের সাক্ষী হয়ে। জীবনের প্রতিটা মুহূর্তে, প্রতিটা পদক্ষেপে আমি তোমাকে পাশে চেয়েছিলাম।
ছাড়ো, এসব বলে কি লাভ।
তুমি’ই বা কি করতে !
একটা সুখী, অনটনহীন জীবনের ভরসা তো দিতে পারছিলাম না আমি। চলে গেছো একটা সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য, আমি মোটেও রাগ করে নেই এখন আর।
তোমার মনে আছে ?
তোমায় বলেছিলাম যে,
একদিন আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম, কোনো এক ঈদ এর সকালে আমি নামাজ পড়ে বাড়ি ফিরেছি, আর তুমি স্নান সেরে আধো ভিজা চুল নিয়ে নীল শাড়ী পড়ে গেট খুলছো।
সে স্বপ্নকে বাস্তব করার খুব চেষ্টা করেছিলাম, হয়নি।
তুমি জানো ?
প্রতিটা রাস্তা, প্রতিটা সকাল, প্রতিটা রাত আমাকে তোমার কথা মনে করিয়ে দেয়।
গাছের নিচে বসে এই বসন্তে ঝরাপাতা গুলোর দিকে তাকিয়ে আজ নিজেকে এদের দলেরই একজন বলে মনে হয়। এদের জীবনেও সবুজ এসেছিল, প্রাণ ছিলো, আজ বেরঙ ।
তোমার মনে আছে ?
অভিমান করে যখন ঝগড়া করতে, তোমাকে হাজার বাহানা দিয়ে মানিয়ে নিয়ে আমি আদুরে গলায় ফোন এ বলতাম, তোমার পেটে একটু হাত রেখে ঘুমাই ?
হয়তো, তোমার পেটে হাত রাখতে পারিনা বলেই ঘুম আঁড়ি দিয়েছে।
আজ ১৪২ দিন।
তোমার সাথে কথা নেই, দেখা নেই। শুধু আজও মনে আছে, যেদিন শেষবার তোমাকে দেখেছিলাম, তুমি দেখোনি আমায়।
আমি দূরে লুকিয়ে তোমাকে দেখেছিলাম, কালো জিন্স, কালো একটা টপ আর উপরে বোতাম খোলা তোমার সেই প্রিয় তোমার ভাষায় Winter Check শার্ট টা।
কাঁধে প্রিয় ব্যাগ। ডান হাতে মোবাইল।
চোখ ভেজা অবস্থায় আমি ফিরছিলাম যখন, ইচ্ছে মত কেঁদেছিলাম, তুমি তো জানোও না।
সেদিন জানতাম, এক শহরে থাকলেও, দেখা আর হবেনা।
আর অপেক্ষা করতে হবেনা তোমার কলেজ যাওয়ার সময় একটু দেখবো আশা নিয়ে। তোমাকেও কোনো কিছুতে বাধা দেবোনা, আমার টলমলে চাকুরী নিয়ে তোমার ভাবনা গুলোর অন্ত হওয়া দরকার ছিলো।
তুমি জানো ?
তোমার ফেসবুক এর একটা ফটো তে যখন একটা ছেলে তোমার হাসি আর ঠোঁট নিয়ে মন্তব্য করেছিল, রাগে অভিমানে আমি সেই রাতে ধুয়ায় ডুবে গেছিলাম, কেঁদেছিলাম ।
আগে যাদের সাথে তুমি কথা পর্যন্ত বলতে না, কারণ তোমার নজরে ওরা খারাপ ছিল, কিংবা আমি ওদের পছন্দ করতাম না, আজ ওদের সাথে তোমার আড্ডা। খুব অপমানিত লাগে আমার। তাই এখন আর তোমার ফেসবুক ওয়ালও দেখিনা।
অনেকটা স্বাভাবিক আছো হয়তো, নাকি দেখানোর চেষ্টা করো… জানিনা।
আমি ভালো নেই। প্লিজ যেভাবে বাস্তবে চলে গেছো, সেভাবেই আমার ভাবনা থেকেও চলে যাও।
একটা রাত ঘুমাতে চাই। না, আর তোমার পেটে হাত রেখে না, এভাবেই ঝরা পাতা দের মতো নিশ্চিন্তে বেরঙ হয়ে ঘুমাতে চাই।
জানো টমটম ?
এই নামে আমি তোমাকে রাগানোর জন্যই ডাকতাম। কিন্তু, জীবনের এক মুহূর্তে সময় এভাবে রেগে গিয়ে আমাদের আলাদা করে দেবে ভাবিনি। খুব অসহায় লাগছে, একলা এই ঘরে আমার। জানিনা কোন রেশমী জোছনায় সুখের খুঁজে কার বুকে ডুবে আছো সব ভুলে। ভালো থেকো ভুলে গিয়ে, এখনো তোমার জন্যই দোয়া করি। ঈশ্বর যেনো তোমাকে সবকিছু দেন যা তুমি চাও, যা আমি দিতে পারিনি।
বছর কুড়ি পর দীর্ঘশ্বাসে ভর করে দেখা হয়ে গেলে কোথাও, চিনতে পারবে তো ?
আমি জানি, তুমি…..
কিগো শুনছো ? ওঠো…. এই উঠো…
আজ আবার অফিসে দেরি হয়ে যাবে। এই….
হঠাৎ ঘুম ভাঙলো, দেখি নীল শাড়ি পড়া আমার বউ স্নান সেরে ভিজা চুলে আমাকে ডাকছে 
হাসি মুখে ঘুম থেকে উঠলাম আর ওর কপালে একটা হামি খেলাম। আর ভাবতে লাগলাম স্বপ্ন টার কথা, স্মৃতির পাতায় হারিয়ে গিয়েও বেঁচে আছে।

কল্যাণী ভট্টাচার্য

প্রকৃত সুখ

"কাঁটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে, দুঃখ বিনা সুখ লাভ হয় কি মহিতে"। পৃথিবীতে মানুষ ক্ষণস্থায়ী তাই এই ক্ষণিক সময়ের জন্য কে না সুখী হতে চায়। সুখী হতে গেলে কি কি প্রয়োজন- প্রথমেই একটা মজবুত মন। যে মন অল্পে তে ভেঙে যায় না। যে মন পুনরায় আশায় বুক বাঁধতে জানে। অর্থাৎ সুখ হল একটা মানসিক পরিস্থিতি যেটা সন্তোষ্টি আনন্দ পরিতৃপ্তি ইত্যাদি অনুভূতির মাধ্যমে প্রকাশ পায়। তবে একেক জনের সুখের ব্যাপার একেক রকম। সুখী হওয়ার সহজ উপায় অন্য কারোর সাথে নিজেকে তুলনা না করা। সুখের পরিধি কতদূর তা কারোর জানা নেই। সুখী থাকতে গেলে জীবনে কারো কাছ থেকে বেশি কিছু আশা না করাই ভালো। মানুষের সুখ দেখে কখনো হিংসা করা উচিত নয়। অন্যের সুখ দেখে যদি আপনার কষ্ট লাগে গা জ্বলে যায় আপনার ভালো লাগে না তবে আপনি কখনো সুখী হবেন না। আপনি যদি সমাজের এমন কিছু মানুষের কথা ভাবেন যারা একবেলা পেট ভরে খেতে পারে না। ভালো পোষাক পড়ার ক্ষমতা নাই। যাদের হাত না থাকার কারণে নিজের কাজ নিজে করতে পারে না দেখবেন তাদের থেকে আপনি অনেক সুখী। কখনো খারাপ মানুষের পাল্লায় পড়বেন না। যেখানে বিপদের আশঙ্কা সেখান থেকে ফিরে আসাই ভালো। কখনো ঝগড়া বিবাদে জড়িত না হওয়াই ভালো। সুখী হওয়াটা নির্ভর করে আমাদের চিন্তা ভাবনার উপর। আমাদের চিন্তা ভাবনা যত সহজ হবে আমাদের সুখী হওয়াটা ও সহজ হবে। সবসময় সহজ সরল ছোটখাটো চিন্তা করবেন। নিজের উপর সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাস রাখতে হবে। নিজেকে কখনো ছোট ভাববেন না। যথাসম্ভব নিজের ভুল নিজে ধরার চেষ্টা করবেন। অতিরিক্ত রাগ হিংসা বেশি কথা বলা বর্জন করা ভালো। নিজের লক্ষ্য পূরণের জন্য কাজ করুন। পরিবার এবং ভালো বন্ধুদের সময় দিন। পরিবার চালানোর মতো ইনকাম করার চেষ্টা করুন। অতিরিক্ত প্রশংসায় আমল দেবেন না। কেউ গালি দিলে সেটাকেও আমল দেবেন না। দিনের শেষে নিজেকে একটু সময় দিন। সারাদিনের ক্লান্তির পর রাতে সময়মতো ঘুমানোর চেষ্টা করুন। তাতে শরীর ও মন দুটোই ভালো থাকবে। তাই মনের সুখই প্রকৃত সুখ।

মাধুরী লোধ

বিউটি ফুল 

ভুত আমার পুত পেত্নী আমার ঝি ,রাম লক্ষন সাথে আছে করবে আমায় কি 

লিচু চুরি করতে গাছে মগ ডালে উঠেছে বিউটি ও রীনা । ওদের মনে হচ্ছে লিচু গাছের ডালা গুলো যেন কাঁপছে , নড়ছে চড়ছে । এটা থানা  এলাকার মজুমদার দের ছাড়া বাড়ি । মজুমদার দের পূর্ব পুরুষদের শশান ।সবাই সৎভাবে মৃত্যু ও সৎকার করেছে উত্তর পুরুষরা তারপর ও অনেকেই নাকি রাত বিরাতে কান্না শুনতে পান ,হাসির শব্দ পান অনেকেই ভয় ও পেয়েছেন । দিনের বেলায় কিছুটি নেই ।সারি সারি আম জাম লিচু কাঁঠাল তাল গাছ আছে ।গরু ছাগল চড়ে । পাশে বসেছে নতুন কোতয়ালী থানা সারা রাত আলো জ্বলে ।তার পর ও গা ছমছম বিষয়টি প্রচার থাকায় ফলফলাদি আনতে পারতপক্ষে কেউ ছাড়া বাড়ীতে যায় না ।

রীনা বিউটি ছাগল খুঁজতে এসে দেখতে পায় থোকা থোকা লিচু পেকে আছে গাছে । দুজনের জিভে টসটস করছে জল ,ব্যস দুজনে লিচু পারবে সাব্যসহ্য হলো ।

রীনা বলে এ বাড়িতে ভুত আছে ।আমগাছ জামগাছ লিচু কাঁঠাল জাম্বুরা তাল সব গাছে ভুত মশাইরা থাকেন ।

বিউটি বলে থাকলে থাক ,ভুত আমাদের কচু করবে ।ভুত আমার পুত পেত্নী আমার ঝি রাম লক্ষন সাথে আছে করবে আমায় কি ।

ঝড়ো বাতাস ব ইবার মতো সা করে একটা নাকী স্বর চেঁচিয়ে উঠলো  তাই নাকি রে ।

বিউটি গোঁ ধরে বললো লিচু না পেড়ে বাড়ি যাবো না ।

রীনা বলে লিচু চোর বলে পুলিশ থানায় আটকে রাখবে ।

বিউটি থানার দিকে হাত জোড় করে বলে ও পুলিশ কাকুরা আমরা চোর ন ই ছোট মানুষ । লিচু খেতে ইচ্ছে করছে তাই গাছে উঠে লিচু পাড়বো ।

রীনা তাড়া দিয়ে বলে গাছে উঠলে উঠ দেরি হয়ে যাচ্ছে ।

দু বোন লিচু পাড়তে গাছে উঠে । লিচু ঝুলছে পাতা ডালায় । অনেক উপরে উঠার পর ও লিচু পারতে পারছে না বিউটি বা রীনা । লিচু থাকা ডালা গুলো রহস্য জনক ভাবে নড়ছে । রীনা এবার ভয়ে ভয়ে বলে ঐ দেখ লিচু গাছে ভুত ।

বিউটি ভুত কে দেখতে পায় না । গাইতে থাকে হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে ,হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে ।

রীনা কাঁদো কাঁদো গলায় বলে চল নেমে যাই । লিচু খেতে হবে না ।

লিচু না পেড়ে গাছ থেকে নামবো না । সে একটু চেঁচিয়ে বলে এই যে ভুত মশাই আপনার নাম কি

লিচু গাছের ডালা আবার নড়েচড়ে উঠলো । কেউ যেন নাকি গলায় বললো বিউটি ফুল ভুত  বিউটি ফুল ভুত ।

বিউটি তো আমার নাম তোমার নাম কি ।

ফুল ফুল ফুল ।হা হা হা ।

রীনা বলে আমাদের বিপদ ।গাছ থেকে লাফ দে ।

বিউটি বলে গাছ থেকে পড়ে হাত পা মাজা ভাঙ্গবে । সারা জীবন বিছানায় থাকতে হবে ।

রীনা বলে তাহলে উপায় ।

বিউটি বলে ভুত আমার পুত পেত্নী আমার ঝি,রাম লক্ষন সাথে আছে করবে আমায় কি ।

এবার সারা গায়ে যেনো জোরে কম্পন । অট্টহাসি ।তাই নাকি রে, ভুতের আছড় এখনো তো খাওনি বাছাধন ।

রীনার চোখে জল ।সে শক্ত করে গাছের ডালা ধরে হরে কৃষ্ণ হরে রাম জপ করতে লাগলো ।

বিউটি বলে ও বিউটি ফুল ভুত মশাই আমরা তো ছোট মেয়ে । লিচু খেতে ইচ্ছে করছে তাই গাছে উঠেছি ।অন্যায় হয়েছে মাপ করে দাও ।এই কান মলছি আর কখনো লিচু পাড়তে আসবো না । জীবনে আর কোনদিন লিচু খাবো না । এবার বাড়ি যেতে দাও ।

ভুত কে ফেলা করিস অবজ্ঞা করিস তোদের শাস্তি হবে ।


বিউটি বলে আমরা তো ছোট কে ভুত কে ভবিষ্যত কিছু তো জানি না । আচ্ছা ভুত মশাই তুমি নাচতে পারো

তখনই লিচু গাছের ডালা গুলো একবার এদিকে আর একবার ওদিকে হেলতে দুলতে লাগলো রীনা ভয় পেয়ে বলে নাচ থামাও আমি পরে যাবো মরে যাবো ।

ভুত অট্টহাসি দিয়ে বলে রীনা ভুঁত রীনা ভুঁত ।

বিউটি বলে ভুত মশাই তোমরা এখানে থাকো কেন

ভুত বলে কেউ তো আমাদের গয়া কাশি সীতাকুণ্ডে দিয়ে আসে না । মজুমদার দের গুষ্টির ছেলে বুড়ো যে মরে সবাইকে এনে  রেখে যায় ।

তোমরা কতোজন থাকো এখানে বিউটি আবার প্রশ্ন করে ।

তিন পুরুষ চারপুরুষ বা তার আগের পুরুষ রা থাকেন । আমি অতশত বুঝি না বাপু ।

তাহলে তোমরা কি খাও ভুত মশাই 

ভুত বলে মাছ মাংস দ ই মিষ্টি পায়েস ।আরে বাবা বুঝ না কেন মজুমদার দের জ্ঞাতি গোষ্ঠী বড়ো । ওদের বিয় শ্রাদ্ধ অন্নপ্রাশন শুভ কাজে তো আমাদের ডাকে বাড়ান দেয় , পিন্ড দেয় । তাছাড়া এলাকার সকলের বাড়িতে নেমতন্ন হলে আমরা ডাক পাই ।যাই ।নাচ গান করি । পেটভরে খাই ।

তোমাদের কেউ তো দেখে না ।

ভুত বলে দেখবে কি করে আমাদের তো হাত পা মাথা শরীর সব পুড়িয়ে দিয়েছে শশানে তুলে । আমাদের আত্মা আছে । মানুষ আমাদের দেখে না আমরা এটা সেটায় ভর করে ঠিক চলে যাই ।

তোমরা মানুষ কে ভয় দেখাও কেন।

মোটেই ভয় দেখাই না ।ভুতকে ভয় পাওয়া মানুষের একজাতীয় বেরাম । ওরা হোঁচট খেলে ও বলে জিন ভুত আছড় করেছে ।ভুত তাড়াবার জন্য ওঝা বৈদ্য ডেকে টাকা ওড়ায় ।

বিউটি বলে আমি ভুত কে ভয় পাই না ।

ভুত বলে সাহসী মেয়ে বিউটি । কোন কাজে ভয় পেলে তুমি ফাস্ট হতে পারবে না ।এই রীনা ভুত একটা লিচু ও পাড়তে পারেনি , ভুতের ভয়ে কাঁপছে । ওকে সারাজীবন ঠকাবে নিজের লোকরা ।

বিউটি বলে তোমা কি বলে ডাকবো বিউটি ফুল ভুত মশাই ।

ভুত বলে দাদু কাকু মামা মেসো পিসু জেঠু যা খুশি ।

বিউটি বলে আমি বলবো ভুত দাদু । আমার দাদুকে দেখিনি । জম্মের আগেই মারা গেছেন ।

ভুত বলে সে না হয় ডাকবে । অনেক ক্ষন তো গাছের ডালায় বসে আছো মা বাবা চিন্তা করছে ।

আমরা তো ছাগল খুঁজতে এসেছি ।

ভুত বলে ছাগল তো অনেক আগেই বাড়িতে চলে গেছে ।

তুমি কি করে জানো ।

ভুত বলে আমি দেখেছি ।

এই এলাকার সবাইকে তোমরা চেনো ।

ভুত বলে চিনি ।তুই হলি মনির নাতিন , রীনা হলো ফণির নাতিন ।

বিউটি বলে আজ থেকে তুমি আমাদের বন্ধু ভুত মশাই ।

ঠিক আছে ঠিক আছে । পড়ালেখা করে বড় মানুষ হতে হবে । ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে । তবেই তো ব্্শের নাম উজ্জ্বল হবে ।

রীনা বলে আমার ক্ষিধা লেগেছে । মাথা ধরেছে ‌বমি বমি লাগছে ।ভুয দাদু তোমার পায়ে পড়ি । এবার বাড়ি যেতে দাও ।

ভুত নাকি স্বরে বলে গাছ থেকে নামতে কে মানা করেছে । নেমে যাও নেমে যাও ।

বিউটি বলে  লিচু খেতে গায়ে উঠলাম লিচু না পেড়ে চলে যাবো ।

ভুত বলে লিচু পাড়তে কে মানা করেছে আমি তো কিছু করিনি ।

বিউটি বলে তোমার সাথে বকবক করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেছি এখন তুমি লিচু পেড়ে দাও ।

ভুত বলে তোমরা নেমে যাও । আমি লিচু পেড়ে দেবো ।

রীনা বিউটি লিচু গাছ থেকে নেমে এসে গামছা দিয়ে গা হাত মাথা ঝাড়তে লাগলো ।আর দেখলো আশ্চর্য জনক ঘটনা । লিচুর ভাল গুলো নেমে আসছে ওদের কাছাকাছি ।

ডুত বলে যতোখুশি নিয়ে যা ,পেট ভরে খাস । বাড়ির সবাই কে বলবি বিউটি ফুল ভুত দাদু দিয়েছে ।

বিউটি বলে থাঙক ইউ ভুত দাদু ।

বিউটি ফুল ভুত বলে আবার আসিস ।আম জাম লিচু কাঁঠাল জাম্বুরা তাল বেল আতা আনারস কাউ করমচা তেঁতুল বড় ই আমলকী সব আছে এখানে নিয়ে যাস ।

রীনা বলে আসবো ভুত দাদু ।

ভুত বলে আমাদের কথা কাউকে জানাস না , জানতে পারলে ওঝারা এসে আমাদের তাড়িয়ে দেবে ।

বিউটি বলে বলবো না ভুত দাদু । কিচ্ছু টি বলবো না কাউকে ।

বিউটি রীনা র হাতে অনেক গুলো পাকা লিচু । ওদের খুঁজতে এসেছে মা বাবা দিদি দাদারা ।একের পর এক প্রশ্ন বাণ এ জজরিত বিউটি রীনা ।সবার সব প্রশ্নের উত্তর এ দুজনে হাসে রহস্যময় হাসি ।

জগন্নাথ বনিক

পাইনি আমি বাবার আদর 

দুঃখ আমার নিত্য দিনের,
কান্না করি প্রতিদিন।
সবাই আমায় বলে দুঃখি,
সুখ ছিলো না কোনো দিন।
বাবা কে আমি চোখে দেখিনি,
পাইনি বাবার আদর।
দুঃখ যাদের জীবন গড়া,
আপন মানুষ ও হয় পর।।
এই ভাবেই চলে প্রতিদিন,
 আমি দুঃখির জীবন।।

দুঃখির বাবার নাম ছিল ধনঞ্জয়, মায়ের নামছিল মিনু, দুঃখির বাবার শরীরটা ভালো ছিল না । সবসময় রোগ নিয়ে কষ্ট করত। দুঃখির দাদু চিত্তরঞ্জন রায়, দুঃখির বাবাকে  অনেক ডাক্তার দেখিয়েছে। যতদিন ঔষধ সেবন করে  ততদিন শরীরটা ভালো থাকে। আর  ঔষধ বন্ধ করলেই, ব‍্যথা, যন্ত্রণায় ছটফট করে । বেশী দূর পড়াশোনা করেননি দুঃখির বাবা। দুঃখির দাদু চিত্তরঞ্জন রায়ের কাপড়ের দোকান ছিল, ভালোই চলে কাপড়ের দোকান। দুঃখির বাবা ধনঞ্জয় সেই কাপড়ের দোকানে টেইলারিং করত।  একদিন দুঃখির দাদুর বন্ধু নীবারণ  কাপড়ের দোকানে এসে গল্প করছিল।  গল্পের প্রসঙ্গ শেষ না হতেই, দুঃখির দাদু চিত্তরঞ্জন - বন্ধু নীবারণ কে বলে  - বন্ধু  একটি মেয়ে দেখে দেয় - ছেলে ধনঞ্জয় কে বিয়ে করাব - বয়স তো আর কম হচ্ছে না । বন্ধু নীবারণ বলে  যে  আমার  শ্বশুরবাড়ির কাছে একটি মেয়ে আছে  - নাম - মিনু -- মেয়েটির বাবা নেই , ভীষণ গরিব - যদি বলিস আলাপ করে দেখতে পারি। কিন্তু  কোনো যৌতুক পাবি না ।   আমার যৌতুক লাখবে না  বন্ধু, মেয়েটা ভালো হলেই চলবে।  যাক - মাস খানেকর মধ্যেই মেয়ে দেখা  এবং  দুঃখির বাবা  ধনঞ্জেয় বিয়ে হলো, মিনুর সাথে - বিয়ের - আট (৮) মাসের মধ্যেই দুঃখির মা - মিনু  গর্ভবতী হলো। পরিবারে সকলের মনে  একটা খুশির আনন্দ। বহুদিন পর বাড়িতে নতুন অথিতি আসবে । সবাই যখন  আনন্দে আত্মহারা, ঠিক সেই সময়েই দুঃখির বাবা -- ধনঞ্জয়ের সেই পুরোনো রোগটা দেখা দিল। নাক দিয়ে  ঝরঝর করে  রক্ত পরা শুরু করল। তড়িঘড়ি করে  ডাক্তার দেখিয়ে - হাসপাতালে ভর্তি করানো হলো। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না  - দুঃখির - মা তখন তিন (৩) মাসের গর্ভবতী। ঠিক সেই সময়েই দুঃখির বাবা  ধনঞ্জয় এই পৃথিবীর থেকে বিদায় নিলো। এই দিকে  - দুঃখির মা - মিনুর সব স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেল। দুঃখির - দাদু, চিত্রঞ্জন এবং  দুঃখির ঠাকুর  মা  পাগল প্রায় - তাদের একমাত্র ছেলে ধনঞ্জয় কে  হারিয়ে। একদিকে ছেলে হারানোর শোক - আরেক দিকে  ঘরে গর্ভবতী পুত্রবধূ।  দুঃখির বাবা  ধনঞ্জয়ের শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পরে  - দুঃখির মামার বাড়ির লোক এবং দুঃখির বাবার বাড়ির লোকেরা বসে একটা সমাধানের পথ খুঁজতে লাগল - দুঃখির মায়ের জন্য। দুঃখির  মা  মিনুর বয়স তখন  আঠারো ( ১৮ ) বছর। এই দিকে   মিনু স্বামী হারা  আবার গর্ভবতী। মিনুর জীবন তখন  অন্ধকার। দুঃখির মামার বাড়ির লোকেরা, দুঃখির মা মিনু কে, দুঃখির মামার বাড়িতে নিয়ে যেতে চাইছিল। কিন্তু  দুঃখির মা মিনু বাপের বাড়ি যেতে রাজি হয়নি। দুঃখির - দাদু চিত্তরঞ্জন এবং  ঠাকুরমার চিন্তা করে  দুঃখির বাবার বাড়িতেই থেকে গেল। অবশেষে দুঃখির বাবা ধনঞ্জয়ের মৃত্যুর সাত (৭) মাস পরে  দুঃখির জন্ম হলো।  দুঃখির জন্মের পর  - দুঃখির দাদু , ঠাকুর মা সবাই খুশী হয়ে ছিল। দুঃখির মুখের দিকে তাকিয়ে স্বামী হারানোর দুঃখ ভুলে গিয়ে দুঃখির দাদু, ঠাকুরমাকে সঙ্গে নিয়ে আজও দুঃখির বাবার বাড়িতেই আছেন দুঃখির মা - মিনু।  আস্তে আস্তে দুঃখি বড়ো হতে লাগল। দুঃখির বয়স যখন  আট (৮) বছর তখন দুঃখির মাকে বলে  - মা, দিয়া, রিয়াদের  বাবা আছে , তাদের কত আদর  করে । আমার বাবা কোথায়--  মা,। দুঃখির কথা গুলো শুনে দুঃখির মা - মিনু - চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পরে। আর ঘরের ভিতরে ফুলের মালা দেওয়া ছবিটা দেখিয়ে বলে , এই যে ছবির লোকটা তোর বাবা , আকাশের তারা হয়ে গেছে - মা - আর  কোনো দিন ফিরে আসবেনা।  তাই বাড়িতে থাকে না । দুঃখি তখন বুঝতে পারে  বাবার আদর, আর কোনো দিন পাবে না ।    ঘরে টাঙানো ধনঞ্জয়ের ছবির দিকে তাকিয়ে থাকে  আর দুঃখির চোখের জল গড়িয়ে পরে।

সূত্রা সরকার সাহা

 মনে পড়ে সেই দিন

১।

আড়াইডাঙ্গা গোবরজনা কালী মন্দির।পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে কালিন্দ্রী নদী। চারিদিকে আমবাগান।বট,পাকুড়, আরো অন্যান্য গাছ দিয়ে মায়ের মন্দির ঘেরা। 'মা ' এর মন্দিরে বসলে প্রাণ জুড়িয়ে যায়।পাশ দিয়ে কালিন্দ্রী নদী বয়ে চলেছে আপন খেয়ালে।পাখি তার কলকাকলিতে ভরিয়ে রেখেছে মন্দির প্রাঙ্গণ।নির্জন এলাকা । দিনের বেলা যেতেই গা ছমছম করে। আমরা মায়ের মন্দিরে মা বাবা আত্মীয় স্বজনের সাথে পূজো দিতে যেতাম। বাবার সাথে বিকেলে নদীর ধারে গিয়ে বসতাম। আমি তখন খুব ছোট। সন্ধ্যেবেলা সূর্যদেব অস্ত যাচ্ছেন। নদীর জলে তার লাল রঙ ছড়িয়ে দিয়েছেন। সন্ধ্যেবেলায় পাখি তার আপন কুলায় ফিরছে। চারিদিকে ধ্বনিত হচ্ছে পাখির কুজন। টিয়া,গাঙশালিক নদীর পাড়ে মাটির গর্তে একবার ঢুকছে আর একবার বেড়োচ্ছে। ছোটবেলার স্মৃতি আজও গাঁথা রয়েছে মনে। জাগ্রত মায়ের মন্দির।মাগো লেখনীছলে তোমায় প্রণাম

২। 

এখনো সেই মন্দির রয়েছে।বাবা কর্মসূত্রে সেখানে থাকতেন। আমার ছোটবেলা কেটেছে সেখানে।দেবী এখানে সারা বছর পূজিতা। কালীপুজোর দিন সারারাত মায়ের মন্দিরে পাঁঠা বলি ও পূজো হয় । প্রচুর পাঁঠা বলি,মোষ বলি অর্থাৎ পাঁরা বলি বলে সেটাও হয়। পায়রাও। শশ্মান কালী। একবার মন্দিরে আমার মায়ের সাথে বসে রয়েছি।কাকু চাকুরি পেয়েছে। তাই মানত মায়ের মন্দিরে পাঁঠা বলি দেওয়া হবে। সেই উদ্দেশ্যে আমরা সেখানে গেছি। দূরে একটি গরুর গাড়িতে পুরুষ মানুষ শুয়ে রয়েছেন নির্বিকার অবস্থায়। মন্দিরে পুরোহিত রয়েছেন মায়ের কাঠামোর সামনে। আমাদের পাশে একজন মহিলা ও বসে রয়েছেন।এই ত্রিশ বত্রিশ বয়স হবে। শীর্ণকায় শরীর। কালো কুচকুচে চুল ছাড়া। কোঁকড়ানো চুলের কিছু অংশ পিঠের উপর ছড়িয়ে পড়েছে। আমার নিজের চোখে দেখা----পুরোহিত মহাশয় মায়ের হাতের জবাফুল মহিলার হাতে দিলেন। মহিলা কোলে দুই হাত নিয়ে বসে রয়েছেন। আবার রাঙা জবা তার হাতে দেওয়া মাত্রই মহিলা শিস্ দিতে থাকলেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা।আর মাথা নাড়াতে থাকেন। পুরোহিত মহাশয় জিজ্ঞাসা করছেন আপনি কে? বলুন। উনি শুধু মাথা নাড়িয়ে যাচ্ছেন। আমরা সকলে হতবাক। আমি ছোট। তাই কৌতুহল, পাশাপাশি ভয় দুটোই মনের মধ্যে চলছে। একটু দূরে দাদুকে গিয়ে প্রশ্ন করি--- দাদু কি হয়েছে?দাদু বলেন দেখ কি হয়? এদিকে পুরোহিত মহাশয় বলেই চলেছেন----আপনি কে? হঠাৎ মহিলা বলে ওঠেন নাকে সুরে আমি "নারা"। তোর বংশে বাতি দিতে রাখবো না। অর্থাৎ কেউ বেঁচে থাকবে না।বলছে আর শিস্ দিয়ে চলেছে। দাদুকে জিজ্ঞেস করি -দাদু নারা কে? দাদু বলেন "নরসিংহ"উনাকে ধরেছেন।এই টুকুই মনে আছে।----এরপর কি হয়েছে জানা নেই।তবে তখনই জানতে পেরেছিলাম মহিলার কেউই বেঁচে নেই। শুধু ওই স্বামী রয়েছেন। এখন উনি ও মৃত্যু শয্যায়। দুপুরবেলায় নাকি চুল ছেড়ে থাকতে নেই।ডাক্তার রা তার স্বামীর অসুখ সারাতে পারছেন না। তাই মায়ের মন্দিরে উনাকে নিয়ে আসা হয়েছে। ঘটনাটি উল্লেখ করলাম এই যে মায়ের প্রতি মানুষের অগাধ বিশ্বাস। উনি এসেছেন যদি তার স্বামীকে সুস্থ করে তুলতে পারেন এই আশায়।

৩। 

আমরা তিন বোন।ভাই নেই। আমার মা প্রায়ই মানত করতে আসেন এই মন্দিরে। একদিন আমি আর মা মায়ের কাঠামোযুক্ত মূর্তির সামনে বসে রয়েছি। হঠাৎ মায়ের কোলে একটি রাঙা জবা মা কালীর হাত থেকে পড়ে। পুরোহিত মহাশয় বলেন এটি রেখে দিন আপনার ভালো হবে। এরপর সত্যি সত্যিই আমরা ভাই পাই। শুধু তাই নয় যেদিন ভাইয়ের জন্ম হয়েছে বাবা স্বপ্নে মায়ের আদেশ পান--"যা তোর ছেলে হয়েছে কোলে নিবি না"! বাবা নাস্তিক ছিলেন। কিন্তু এই ঘটনা সত্যি হওয়ার ফলে বাবা এবং আমাদের কাছে এই মা কালী জাগ্রতা দেবী। যাইহোক বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর। এরপর আমার আর এক বোন হয়। বর্তমানে আমরা চারবোন এক ভাই।

৪। 

এই মন্দিরে প্রতিবারের মতো সেইবার ও কালীপূজোর মেলা বসেছে। আমি তখন ক্লাস ফাইভে সম্ভবতঃ। সময়টা ঠিক মনে পড়ছে না। আমরা চার ভাইবোন মা ও ঠাকুরমা সকলে মিলে মেলা দেখতে গিয়েছিলাম। বাবা কিন্তু সঙ্গে নেই। মায়ের মন্দিরে মেলা বসেছে।গ্রাম্য মেলা। তার সৌন্দর্য ই আলাদা। মন্দির প্রাঙ্গণে আসতে গেলে গ্রাম থেকে অনেকটা পথ নদীর ধারে দিয়ে আসতে হয়।বড় বড় লোহার কড়াইয়ে পাঁপড়, জিলিপি ভাজা হচ্ছে।সন্দেশ,মণ্ডা,মিঠাই, নকুল দানা,গজা,বাতাসা কি না আছে। খেলনার রকমারি দোকান।চড়কি, নাগরদোলা কত কি। আমরা সকলে মেলায় আনন্দে ঘুরছি।মা পাঁপড় ভাজা কিনে দিচ্ছেন আমরা খাচ্ছি। ঠাকুরমার কোলে ভাই রয়েছে। একবারে ছোট। আমার ঠাকুরমা কানে শুনতে পেতেন না।যার জন্য খুব খারাপ অবস্থা। যাইহোক পূজো চলছে। একের পর এক পাঁঠা বলি, পায়রা ও পাঁড়া বলি। চারিদিকে উৎসব আনন্দে মাতোয়ারা। আমরাও আনন্দিত। মা আমাদের খেলনা কিনে দিচ্ছেন।বাঁশি বিক্রেতা বাঁশি বাজাচ্ছে।কেউ বাঁশি কিনছে,কেউ পাঁপড় বা জিলিপি খাচ্ছে,কেউ বা পূজো দিচ্ছে।সব মিলিয়ে আনন্দের ফোয়ারা বইছে। কুলফি আইসক্রিম কিছু বাদ নেই। নাগরদোলা,চরকি, তালপাতার সেপাই আহা কি মজা! আমরা আনন্দে ঘুরছি। এমনকি বটগাছের কোটরে কোথা থেকে একজন সাধুবাবা এসে রয়েছেন। মায়ের সাধনায় মগ্ন। তাকে দেখার জন্য লোকের ভিড়। উনি সেখানে একটি খুব ছোট বিচার থেকেও ছোট নৌকায় এসেছেন। মায়ের মাহাত্ম্য এর থেকে সহজেই অনুমেয়।

৫। 

সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। প্রচুর লোকের সমাগম। সবাই মেলা ঘুরে দেখছে। হঠাৎ চিৎকার। মানুষ বলি পড়েছে পাঁড়া বলি দিতে গিয়ে।তুমুল উত্তেজনা।যে যেদিকে পারে ছুটে পালাচ্ছে। একদিকে পাঁপড় ভাজার কড়াইয়ে গরম তেল, লুচি ভাজার কড়াইয়ের গরম তেল, জিলিপি ভাজার --সে কি হুলুস্থুল কাণ্ড। চারিদিকে উনুন জ্বলছে।কে কোন দিকে পালাবে ঠিক করতে পারছে না। মা আমাদের হাতে হাত ধরে রয়েছেন। সাবধানে মেলা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু খুব কষ্টকর অবস্থা। মেলা থেকে বের হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যে ঠাকুরমাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা মেলা থেকে বের হবো কি--ঠাকুরমা ও ভাইকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।কেউ বলছেন মানুষ বলি পড়েছে,কেউ বা পাঁড়া বলি দিতে গিয়ে খুঁত পাওয়া গেছে বলি হয় নি। বিভিন্ন ধরনের কথাবার্তা। আমাদের অবস্থা শোচনীয়। ঠাকুরমা ও ভাইকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা কাঁদতে শুরু করে দিয়েছি।মা কি করবেন বুঝতে পারছেন না। সাংঘাতিক অবস্থা। চিন্তা করে কুল কিনারা পাওয়া যাচ্ছে না। ঠাকুরমা কি ভাইকে নিয়ে নদীতে পড়ে গেল না কি হলো কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।

৬। 

মা বলেন তুই বাড়ির দিকে যা আর আমি মেলাতে দেখি। আমি নদীর ধারে দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে সকলকে জিজ্ঞাসা করতে করতে বাড়ির দিকে ---। মায়ের মুখ শুকিয়ে গেছে। চোখে জল। এবার কি হবে?মন খারাপ নিয়ে বাড়ির পথে ---বাবা আমাদের আস্ত রাখবে না।কী ভয়াবহ অবস্থা। সবচেয়ে চিন্তার বিষয় ঠাকুরমা কানে শুনতে পান না। আমরা কী করব? শুধু মা গোবরজনাকে ডেকে চলেছি --মা করুণাময়ী আমাদের করুণা করো। কোথায় গেল ওরা? হাঁটতে হাঁটতে চারিদিকে দেখতে দেখতে বাড়ি যাচ্ছি। পথে জিজ্ঞাসা করছি কেউ দেখতে পেয়েছেন কি না। অবশেষে বাড়ি ফিরে দেখি ঠাকুরমা ও ভাই বাড়ীতে। ইতিমধ্যে মা ও এসে পৌঁছেছেন।স্বস্তির নিশ্বাস।বাবা অফিস থেকে ফিরে এসে সব শুনে হতবাক।স্বস্তির নিঃশ্বাস। সেদিন কী দুর্যোগ গেছে তা আমি ছোট হলেও বুঝতে পেরেছিলাম।আর তা আজও মনে আছে। করুণাময়ী মা গোবরজনা আমাদের করুণা করেছিলেন। জয় মা।

শর্মি দে

শতাব্দীর প্রথম সূর্যোদয়


জিয়া!!

নামটার সাথে চরিত্রের কোনো মিল নেই। শান্ত নির্ঝরিনি পাহাড়িয়া জিয়ার আয়ত চোখদুটি যেনো এক বিহ্বলতার বার্তা দেয়! মাতৃহারা মেয়েটি মিতভাষী। বাবার চোখের মণি। জিয়ার চোখের দিকে তাকালেই ওর বাবা কোথায় যেনো হারিয়ে যায়...

      জিয়া যতক্ষণ বাবার কাছে থাকে, ততক্ষণ তার পৃথিবী স্নিগ্ধ শান্ত রূপময়। স্কুলের বান্ধবীদের সাথে কথা বলতে ওর একদম ভালো লাগে না। ওরা সবসময় ওদের মায়ের কথা বলে। আর জিয়ার মন পুড়তে থাকে। বাড়ি ফিরে সে এক দৌড়ে চলে যায় বাড়ির পাশের ঝর্নার কাছে, ওর মা যে ওখানেই আছে!

      জিয়ার বাবা ইয়ান নিতান্তই শান্ত প্রকৃতির। গ্রামের সবাই ওকে সম্মান করে। ওদের গ্রামের নাম ডং । এখানেই শতাব্দীর সবচেয়ে প্রথম সূর্যরশ্মি এসে পড়ে ভারতের মাটিতে। এখানের জনসংখ্যা মাত্র ৩৫ জন। একটাই ডাকবাংলো বাংলোটি দেখাশোনা করে ইয়ান। কখনো কখনো ও অসুস্থ হলে জিয়ার মা সুয়িনের উপর দায়িত্ব পড়ে। পাহাড়ি এলাকা, প্রথম সূর্যোদয়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতে সবসময় ট্যুরিস্টরা আসতেই থাকে। তাই ইয়ানের সংসারে অভাব নেই কোনো কিছুরই। জিয়া ওদের ভালোবাসায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিয়ে একটু একটু করে বড় হচ্ছিল।

        জিয়ার মা সুয়িন অপরূপা। পাহাড়িয়া সবুজ যেন ওর সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে আছে। সবসময় হাসিখুশি। আর মনটা একটু খারাপ হলেই ঐ ঝর্ণার পাশে চলে যায়। জিয়াও তাই করে। সব কষ্টের উপশম যেন ঐ ঝর্ণার কলকল শব্দে! আর ইয়ানের এটাতেই ভয়, মায়ের মত মেয়েকেও না হারিয়ে ফেলে! এই ঝর্নাই তো ওর মাকে--!

নাঃ, আর ভাবতে পারে না ইয়ান। তার বুক হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠে! সেই দিনটির কথা ইয়ান ভুলতেই পারে না! 


অরুণাচল প্রদেশের ডংগ্রামটিকে প্রকৃতি যেন নিজের হাতে অফুরান সৌন্দর্যের ভাণ্ডার দিয়ে সাজিয়ে রেখেছে! পাহাড়িয়া মেঘের লুকোচুরি যেন পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে রূপের ডালি সাজিয়ে রূপকথার রাজ্যে পরিণত করেছে। কখনো মেঘ কখনো কুয়াশার আস্তরণ, সবুজ গালিচা বিছানো টিলার পর টিলা গাছগাছালি এক নয়নাভিরাম দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে। যেন ছবির মতো সাজানো গ্রাম। অপরূপা এই গ্রামের ভোরের সূর্যোদয় যেন নতুন জীবনের সূচনা করে, নতুন করে বাঁচতে শেখায়। তাই ট্যুরিস্টরা এখানে এলে কয়েকদিন কাটিয়ে যান। সেবার ট্যুরিস্টরা খুব বেশি করে আসতে থাকেন। শীতটাও বেশ ঝাঁকালো ভাবেই পড়েছিলো। অত্যধিক পরিশ্রমে ইয়ান অসুস্থ হয়ে পড়ে। অগত্যা সুয়িনকেই ট্যুরিস্টদের দেখাশোনা করতে হয়। ইয়ান সুস্থ হয়ে উঠলেও বিছানা ছেড়ে উঠতেই পারছিল না দুর্বলতার কারণে। একদিন সুয়িন বাড়ির কাজ মিটিয়ে বাংলোতে যেতে একটু দেরি হয়ে যায়‌। তাই কাজ শেষ করতে বেলাও শেষ হয়ে আসে। বাংলোতে ছিলো কয়েকটি ছেলে ট্যুরিস্ট। তারা ভোর তিনটেয় বেড়িয়ে যায় সূর্যোদয় দেখার জন্য তাই সুয়িনের সাথে তাদের দেখা হয় না। তারা ফিরে আসার আগেই সুয়িন বাড়ি ফিরে আসে। কিন্তু সেদিন সুয়িনকে তারা দেখে ফেলে। সুয়িনের সৌন্দর্য দেখে ওদের হুঁশ উড়ে যায়‌। ওদের মনে পাশবিক নেশা চেপে যায়। ওরা সুয়িনকে নানা অজুহাতে আটকে রাখে। বার বার চা কফি টিফিন বানাতে বলে, আর নিজেরা মদ্যপান করতে থাকে। সুয়িনের সরলতায় ভরা মন। ওদের কুমতলবটা বুঝতে পারে নি। যেমনি চা আর টিফিন নিয়ে ওদের রুমে ঢুকে, ওরা দরজায় ছিটকিনি লাগিয়ে দেয় আর অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। সুয়িনকে টানা হ্যাচড়া করতে থাকে। সুয়িন কাঁদতে কাঁদতে ওদেরকে বারণ করে, ওরা তখন পশুর মতো ওর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর কাপড় চোপড় ছিঁড়ে ফেলে। সুয়িন চিৎকার করতে থাকে। ওরা তখন পৈশাচিক শক্তি নিয়ে একের পর এক ধর্ষণ করতে থাকে। খুবলে খুবলে ওর কোমল নরম দেহটাকে .... সহ্য করতে পারে নি সুয়িন‌! নিষ্ঠুর পশুদের ছোবল থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি সে...জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। যতক্ষণ চেতনা ছিল ততক্ষণ তার আর্তচিৎকার পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে, কিন্তু ভালোবাসার মানুষটির কানে পৌঁছাতে পারেনি।

    সে বছর বর্ষাতে ঐ ঝর্না ফুলে ফেঁপে দানবীর আকার ধারণ করে। আর জিয়ার মার গর্ভে বড় হতে থাকে অসুরের বীজ! একদিন সেই ঝর্ণাধারার সাথে জিয়ার হতভাগী মাও ভেসে যায় অকূল দরিয়ায়... ইয়ান জানতেও পারেনি সুয়িনের অব্যক্ত যন্ত্রণার কথা, কী অসহনীয় বেদনা নিয়ে অভাগী এই পৃথিবী ছেড়ে গেছে...জানতো শুধু এই ঝর্ণা ,তাইতো জিয়া এলেই ওকে মায়ের আদরে বুকে টেনে নেয়!

সুজন দেবনাথ

হয় খরচ নে, না হয় দশ টাকা দে

রতন এই প্রথম ত্রিপুরার বাইরে বেরোলো। তাই বাইরের পরিবেশ পরিস্থিতি তার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। আগরতলা থেকে ট্রেনেই তার যাত্রা কোলকাতার উদ্দেশ্যে। অল্প টাকায় স্লিপারেই টিকিট কাটলো সে। ভাবলো বাহারি মানুষের ভিড়ে তার দীর্ঘ সময় জার্নির বোরিংন্যাস টা কাটিয়ে অনায়াসে সে গন্তব্যে পৌঁছে যাবে। কিন্তু ব্যাপারটা যে আসলে এতো সহজ নয় সেটা তার বোধের অগম্য। 

পথে যেতে যেতে সে দেখলো হাজার মানুষের ট্রেনে উঠানামার ভীড়। স্থানে স্থানে উঠছে কতো ফেরিওয়ালা, ওরা ফেরি করছে আবার নেমে পড়ছে। কতো বাউল গান শুনিয়ে ভিক্ষে করছে, কতো গরীব দুঃখী নিঃসংকোচে ধনীর কাছে হাত পাতছে। কেউ কানাকড়িতে সন্তুষ্ট করছে, আবার কেউবা নেই বলে খালিহাতেও ফিরিয়ে দিচ্ছে। রাস্তার অসহায়দের সাহায্য করা রতনের দীর্ঘদিনের সাধ। তাই সে বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় কিছু খুচরা পয়সা সঙ্গে নিয়েছিলো এবং যথাসাধ্য চেষ্টা করলো কাউকে খালি হাতে না ফিরাতে। কিন্তু সবাই যে ভিখারী ঠিক তা নয়। নানান অঙ্গ ভঙ্গিতে হাত পাতাও কিছু মানুষের পেশা। আর ট্রেনে বসেই রতনের চোখে এক এক করে ফুটে উঠল বহুরূপী মানুষের বহু চিত্র। চোখের সামনে কতো মিথ্যেরা সত্যি হয়ে যায় তা এই যাত্রাতেই রতনের দারুণ অভিজ্ঞতা।

মাঝপথে একটা স্টেশন থেকে হঠাৎ একদল হিজড়ে ট্রেনে উঠেই মানুষকে দে দে বলে জোর করতে লাগলো। রতন ওদের খুব ভয় পায়। ওরা নাকি কথায় কথায় অভিশাপ দেয় এবং তা নাকি ফলেও। একজন ক্রমশ চাঁদা তুলতে তুলতে রতনের দিকে এগুচ্ছে। কিন্তু উনার চাঁদা তোলার ধরন টা অন্যরকম। যখনই কেউ চাঁদা না দেয় অমনি নির্লজ্জের মতো পড়নের কাপড় টা উপুড় করে বয়স ভেদে সকলকে দেখাচ্ছে! এই নোংরামী টা রতনের মোটেই ভালো লাগেনি। লোকটি ধীরে ধীরে রতনের সামনে এসে দে বলে হাত বাড়িয়ে দিলো। রতন পরিস্কার জানিয়ে দিলো দেবোনা। 'তবে দ্যাখ আমি কি' বলে যেইমাত্র নির্লজ্জের মতো পুনঃ একই আচরণ করতে যাবে, অমনি রতন বলে উঠলো দাঁড়াও! বহুক্ষণ ধরে দেখছি তুমি একই আচরণ করছো, এটাই কি তোমার ব্যবসার কায়দা? তুমি অন্য কোনো কাজ করতে পারোনা? উনি বললেন কি করবো বল, আমায় যে কেউ কাজ দেয়না, তাই বাধ্য হই! তুই বল আমাদের কি পেট নেই? আমরা না খেয়ে বাঁচি?

রতনের নরম মনটা মুহূর্তে কেঁদে উঠলো। সে লোকটাকে বললো, আমি তোমায় একটা কাজ দেবো, তুমি করবে? সে বললো নিশ্চয়ই। সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটা লোকটার হাত ধরে যাত্রীদের কাছে নম্র ভদ্র ভাবে চাঁদা তুলতে শুরু করলো এবং একহাজার টাকা তুলে উনার হাতে তুলে দিয়ে বললো এই টাকা দিয়ে কিছু বুট বাদাম আর চকোলেট কিনে তুমি ট্রেনেই বেঁচাকেনা করো। উনি বললো 'আমি একজন হিজড়া' কেউ আমার থেকে খরচ করবে না। তখন রতন ওকে বললো, তাহলে ব্যবসার কায়দা তো তোমার জানাই আছে, হয় খরচ নে, না হয় দশ টাকা দে……।

প্রীতম চক্রবর্তী

 বৃহন্নলা

" কিগো দাদা - বৌদি - মাসি - মেসোরা কোই সবাই ..........?"

"বেড়িয়ে এসো , বেড়িয়ে এসো ।"

এসব বলে একদল পুরুষ কণ্ঠধারী নারী অদ্ভুত কায়দায় করতালি দিতে দিতে বাড়িতে ঢুকে পড়লো । আজ নিথীশবাবুর ছোটমেয়ে রুদ্রাক্ষীর বিয়ে। বাড়িতে বেশ আড়ম্বর আয়োজন । এরই মধ্যে হঠাৎ কিছু লোক এসে বাড়ির পরিবেশটাই যেনো পাল্টে দিলো ।

" আরে সব চেয়ে চেয়ে কি দেখছো ? " 

" মেয়ে কোই ? "

" এই বাবলী , চম্পা - রুপমতী গান ধর দেখি ..........."

তারপর ওরা ঢোলক বাজিয়ে কয়েকজন গান ধরলেন - 

"বন্ধু বিনে প্রাণ বাঁচে না ........"

আর বাকি কয়েকজন শুরু করলেন নৃত্য । ততক্ষনে কন্যার মা - বাবা দুজনেই ঘরের ভেতর লুকিয়ে পড়লেন । এরই মধ্যে বেশকিছু দর্শক বিয়ে বাড়িতে এসে জড়ো হলেন এবং তাদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হলো -

" হিজড়া আইসে, হিজড়া আইসে । " 

কয়েকজন আবার বাড়ির বাচ্চাদের আড়াল করে লুকিয়ে রাখলেন । মনে হলো কোনো ভিনগ্রহী যেন বাড়িতে ঢুকেছে । আধুনিক সভ্যতা যেন মানতে নারাজ যে এরাও আমাদের মতো মানুষ । 

যাই হোক বেশ কিছুক্ষন নাচ - গানে পরিবেশটাকে মাতিয়ে অবশেষে তারা হাঁক দিলেন -

" কোই গো মেয়ের বাপ ......... বাইরে এসো ......... "

"এবার আমাদের বিদেয় করো ।"

এদের দলের সর্দার জেসমিন ঘরে যাবার জন্য এগোবার উপক্রম করলেই একজন ভদ্রলোক এসে উনার হাতে দুশো টাকার একটি নোট দিতে চাইলেন ।

জেসমিন উনার দিকে তাকিয়ে - 

" কিরে হিরো ভিক্ষে দিচ্ছিস ......."

" হিজড়েরা কারো বাড়িতে ভিক্ষে করতে যায় না বুঝলি"

"হিজড়েরা দান নেয়, আর এর বদলে অনেক আশীর্বাদ দিয়ে যায় ।"

" যা যা কেটে পর ..... মেয়ের বাপকে ডাক । "

" বলে দে পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে আসতে ।" 


    ঘরে বসে নিথীশবাবু সবটাই শুনছিলেন । তথাপি খিটখিটে মেজাজের লোক নিথীশবাবু বেরিয়ে আসার কোনো আগ্রহ প্রকাশ করলেন না । 

কিছুক্ষন বাদে দলের সর্দার জেসমিন উনার দল নিয়ে সোজা ঘরের দরজার সামনে গিয়ে ডাক দিলেন । 

" কী হলো মেয়ের বাপ পয়সা দেবার ভয়ে বাইরে বেরোচ্ছেন না ?"

" লাগবেনা পয়সা আসুন আসুন বাইরে আসুন ।"


নিথীশবাবু খানিকটা বিরক্ত হয়েই দরজার কপাট খুলে বেরিয়ে এলেন। এসেই মুখে একটা অস্পষ্ট হাসি দিয়ে বললেন-

 " বলুন কত টাকা চাইছেন আপনারা ?"

জেসমিন উচ্চস্বরে উত্তর দিল -

"এতক্ষণ ঘরে লুকিয়ে থেকে এখন টাকার কথা বলছেন......." 

"ঠিক আছে দিন পাঁচ হাজার টাকা । "


নিথীশবাবু হতভম্ব হয়ে -

" আরে এসব কি বলছেন । বহু কষ্টে মেয়েটাকে বিয়ে দিচ্ছি ঋণ - ধার করে । অতো টাকা দেবার সাধ্য আমার নেই ।" 

তখন বাকিরা কিছু বলতে চাইলেও জেসমিন ওদেরকে থামিয়ে -" ঠিক আছে দিন দুহাজার টাকা , কিন্তু এর থেকে এক পয়সাও কম মানবো না । "


কিন্তু ততক্ষণে নিথীশবাবুর স্ত্রী বিমলা দেবীর মনে কোথাও যেন একটা খটকা লাগছিল । জেসমিনকে সে যেন কোথাও দেখেছে । উনার অন্তরটা যেন কেঁপে কেঁপে জানান দিচ্ছে জেসমিন উনার আপন কেউ ।

যাই হোক তারপর নিথীশবাবু ওদের হাতে দুহাজার টাকা ধরিয়ে দিলেন । 

টাকা নিয়ে ওরা বললো - 

" আপনার মেয়েকে ডাকুন আমরা আশীর্বাদ করবো । "

নিথীশবাবু রুদ্রাক্ষীকে ডেকে আনলেন। 

জেসমিন উচ্চস্বরে - 

" এই চম্পা - বাবলী উলু দে উলু দে ......"

রুদ্রাক্ষীর মাথায় হাত রেখে জেসমিন - 

" তুই স্বামীর ঘরে খুব সুখী হবি বোন। আমি জীবনে যেসব সুখ পাইনি তুই সেই সমস্ত সুখ পাবি । বছর ঘুরতেই সন্তানের মুখ দেখবি । অতুল সম্পদ হবে তোর স্বামীর । "


তখন নিজের অজান্তেই বিমলাদেবীর চোখ বেয়ে জল নেমে এলো । 

বিলম্ব না করে বিমলা দেবী জেসমিন কে জিজ্ঞেস করেই ফেললেন -

 " তোমার বাড়ি কোথায় মা ?"

 

জেসমিন হেসে উত্তর দিলো-

" বাড়ি ! হা হা হা .... আপনাদের মতো ভদ্রলোকেরা আমাদেরকে সমাজে থাকতে দেয় নাকি ?"

" আপনারা হচ্ছেন ভদ্রলোকের জাত, আপনারা সন্তান পয়দা করেন নিজেদের স্বার্থের জন্য আর সন্তান পছন্দ না হলে পথের আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলতেও আপনাদের বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ হয় না । "

নিথীশবাবু এতক্ষণ চুপচাপ সব শুনছিলেন। কিন্তু একথা শুনে তিনি হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলেন ।


" কি সব বলছেন আপনি?"

জেসমিন এবার বিজ্ঞের ভাব ধরে -

" বাবু.... যখন আমি এক বছরের শিশু তখন মা - বাবা আমায় রেলস্টেশনে ফেলে রেখে যায় , শুধুমাত্র হিজড়ে হয়ে জন্ম নিয়েছিলাম বলে ।" 

" আচ্ছা বলুন না হিজড়ে হাওয়াটা কি আমার অপরাধ ছিল ?" 

"কিন্তু জীবনভর এই শাস্তিটা আমিই ভোগ করছি । "

" একদল লোক রেলস্টেশন থেকে উঠিয়ে নিয়ে আমাকে হোমে রেখেছিল , ওরা আমাকে নবজাতক থেকে বড়ো করেছিল ঠিকই কিন্তু আমার বয়স যখন পাঁচ বছর তখন হোম কতৃপক্ষও আমাকে আর রাখতে চায় নি, আমি হিজড়ে বলে ।"


বিমলাদেবীর দুচোখ বেয়ে অশ্রুধারা পড়ছিল । 

জেসমিন আবারো বললো -

" পথে পথে ঘুরেছি, পেটে ক্ষিদের জ্বালায় চিৎকার করে কেঁদেছি , কিন্তু কেউ একবিন্দুও সহানুভূতি প্রকাশ করেনি। " 

 " তারপর যখন পেটের ক্ষুধা ভয়ানক রূপ ধারণ করতো তখন পথের আস্তাকুঁড়ের পচা - গলা খাবার খেতাম । মাঝে মাঝে কেউ দয়া করে কিছু খাবার দিতো। এভাবেই ক্ষূন্নিবৃত্তি হতো আমার।"

 

বিমলাদেবী বললেন - " তারপর এই দলে কিভাবে এলে ?"

জেসমিন বললো - 

" তারপর একদিন আমি এক বৃহন্নলা দলের নজরে আসি । তারা আমাকে নিয়ে যায় তাদের সর্দার সোনালীর কাছে ।" 

" ইনি আমাকে গ্রহণ করেন । আমাকে স্নেহ - ভালোবাসা দিয়ে বড়ো করে তুললেন। তিনিই আমাকে নাম দিলেন জেসমিন । "


জেসমিনের চোখে একটু জল দেখা দিল - 

" আজ হয়তো সোনালী মা নেই । কিন্তু যাবার আগে তিনি আমাকে গুরুদায়িত্ব  সপে গিয়েছিলেন যে, এই পাষাণ সমাজ থেকে বিতাড়িত কোনো হিজড়ে শিশু যেন পথে - ঘাটে পড়ে কষ্ট না পায় ।"

" আপনাদের থেকে যে অর্থ নেই মা , সেগুলা দিয়েই ভদ্রলোকের সমাজ থেকে বিতাড়িত হিজড়ে শিশুরা খাবার পায় , পড়াশুনা করে । "


        লজ্জায় - ঘৃণায় অপমানিত নিথীশবাবু এতক্ষণ সবকিছু শুনবার পর, উনার পাথরের হৃদয়টা যেন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে চোখ বেয়ে জল নামছিল ।

        

বিমলাদেবী কাঁদতে কাঁদতে হাত জোড় করে বললেন - 

" আমরাও অপরাধী রে মা । আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে আমার গর্ভের প্রথম সন্তান হিজড়ে হয়ে জন্ম নিয়েছিল । এতে আমি মনে কষ্ট পেয়েছিলাম বটে কিন্তু সন্তানকে পরিত্যাগ করার অভিপ্রায় ছিল না ।"

" তবে সমাজ ও পরিবারের চাপে একবছর পর আমার স্বামী বাচ্চাটিকে রেলস্টেশনে রেখে এসেছিল । আমিও নির্দয়া পাষাণী মা হয়ে সবটাই মেনে নিয়েছিলাম । কিন্তু তারপর আর আমার সন্তানটির কোনো খোঁজ পাইনি । "


জেসমিন এবার হাসতে হাসতে উত্তর দিল -

" সেই সন্তান আর কেউ না, আমিই ছিলাম মা ।"

" সোনালী মা অনেক আগেই আমার পিতৃপরিচয়  আমাকে বলেছিল ।" 


নিথীশবাবু আর বিমলাদেবী বিস্মিত হয়ে কাঁদতে লাগলেন । 

নিথীশবাবু গদ গদ কণ্ঠে - 

" জানি মা আমি বাবা হবার যোগ্য নই, আমি পাষাণ , আমি ভীতু । আর তোর কাছে তো আমার ক্ষমা চাওয়ারও মুখ নেই । তবে আশীর্বাদ করিস মা তোর বোনটা যেন সুখে থাকে ।"

বিমলাদেবী কাতরস্বরে - " মারে আজ এতগুলো বছর পর তোকে দেখতে পেয়ে মনে অনেকটা শান্তি পাচ্ছি । তবে জানিস, আমি মা হবার যোগ্য নই । ঈশ্বর আমাকে ক্ষমা করবে না ।" 


এবার জেসমিন ওদের দুজনকে ধরে বললো - 

" না মা - বাবা তোমাদের আর দোষ দিয়ে কি হবে । তোমরা আমাকে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছো এটাই অনেক । সবটাই আমার ভাগ্যের পরিহাস।"

" আর তোমরা যদি সেদিন আমাকে পথে না ফেলে আসতে তাহলে আমার মতো বাকী অভাগীদের পাশে কে দাঁড়াতো বলো ।"


এবার রুদ্রাক্ষীর গালে আদর করে জেসমিন-

" বোন তুই অনেক সুখী হবি । আমার জীবনের সমস্ত সুখ আমি তোকে দিলাম।  "

" আজকে তোকে দেখার জন্যেই আমি এই বাড়িতে এসেছিলাম । সুখী থাক বোন । নে এই গয়নাটা তোকে দিলাম । " 

বলেই জেসমিন ওর গলা থেকে একটি চেইন খুলে রুদ্রাক্ষীকে দিল । 


তারপর - "চললাম মা , তোমরা ভেবে নিও যে তোমাদের প্রথম সন্তান আর নেই । "

বিমলাদেবী এবার কেঁদে চিৎকার করে -

" থেকে যা না মা , অন্তত আজকের দিনটা ।"

জেসমিন হেসে - 

" না মা আমার জীবন এই জগতের সুখের জন্য নয় । তাছাড়া আমি এখানে থাকলে তোমাদের ভদ্রসমাজের লোক এখানে আসবে না । আমি তো হিজড়ে তাই ।"

" তাছাড়া আমার বোনের পরিচয়টাও আমি আমার সঙ্গে রাখতে চাই না ।"

" আমি চললাম মা "

" এই চল রে বাবলী - চম্পা । " 

বলেই সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলো জেসমিন ও তার দলের সদস্যরা । 

তখনও বিমলাদেবী এবং নিথীশবাবু কাঁদছিলেন ।

অভিষেক অধিকারী

আর একটি প্রেমের কাহিনী

নিঝুম রাত,

শহরের ব‍্যস্ততা এখন স্তব্ধ হয়ে গেছে। এর মধ‍্যে দিয়ে হেঁটে চলেছে সে। পাশে একটা বড় পার্ক, সন্ধ‍্যে পর্যন্ত যেখানে তরুণতরুণীদের ভিড় লেগে থাকত এখন সেই পার্কও যেন ঘুমিয়ে পড়েছে নিজের যৌবনের স্বপ্ন নিয়ে। পার্কের ভিতরে একটা ছোট্ট ল‍্যাম্প পোষ্ট, সেখানে এখন আলো জ্বলছে কিন্তু তাও যেন নিভু নিভু। সেই নিভু নিভু আলোর পাশে ছোট্ট বেঞ্চিতে গিয়ে সে বসে পড়ল। 

 “অরুণ”

একটু দূর থেকে একটা নারীকন্ঠের আওয়াজ ভেসে এল। বেঞ্চে বসা ‍‍ব‍্যক্তিটি একটু ঘুরে তাকিয়ে দেখল ধীর পদক্ষেপে একজন মহিলা হেঁটে আসছে। মহিলাটি এসে লোকটির পাশে বসে পড়ল। অন্ধকারে মহিলার মুখ ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। লোকটি একটা টুপি পড়ে আছে। তার টুপি দিয়ে মুখটা ঢাকা।

“রমা”

লোকটি বলে উঠল।

“হ‍্যাঁ, আজ বহুকাল পরে আবার তোমার সাথে দেখা” রমা বলে ওঠে। এরপর খানিক্ষণ ওরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকে। এবার অরুণের কন্ঠ শোনা যায় “ রমা সেই কবে তোমাকে দেখেছিলাম। আমি যখন প্রথম দিন ক‍্যামেরার সামনে দাঁড়াই তুমি তখন অন‍্য ফ্লোরে কাজ করছিলে। ফ্লোরে যাওয়ার সময় আমাকে দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখলে। সেদিন শুট‍্যিং করতে গিয়ে অন‍্য নায়িকা আমার সামনে থাকলেও আমি সংলাপ বলেছিলাম তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে।“   রমা মৃদু হেসে ওঠে। “সেই কবেকার কথা আজও তোমার মনে আছে?” রমার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে। অরুণ বলে ওঠে “ আর সেই দার্জিলিং এর দৃশ‍্য তোমার মনে আছে রমা? নীল রঙের শাড়ি পরেছিলে তুমি, চা বাগানের পাশ দিয়ে যখন হেঁটে আসছিলে, তোমার চুলটা হাওয়ায় উড়ছিল।“ “তুমিও তো ব্রাউন কালারের কোট আর মাথায় হ‍্যাট চোখে গগলস পরেছিলে” লজ্জায় রমা বলে ওঠে।“প্রোডাকশনের লোকজন কিন্তু তোমার দিকে তাকিয়েছিল রমা” অরুণ বলে।“বেশ চলছিল আমাদের কিন্তু....” রমা বলে ওঠে। অরুণ বলে ওঠে “তোমার স্বামী মেনে নিতে পারেনি....”। “তোমারো তো স্ত্রী সন্তান ছিল” রমা বলে। “হয়তো আমার চাওয়া আর পাওয়ার মধ‍্যে কোন সামঞ্জস‍্য ছিল না....” অরুণের হতাশ ভরা উক্তি। “ না গো না আমরা সত‍্যি ভালো বেসেছিলাম কিন্তু আমাদের উচ্চাশা এর পরিণতি পেতে দেয়নি” রমার উক্তি। “রমা” অরুণ রমার হাত চেপে ধরে। “সেই নকল ক‍্যামেরার পৃথিবী থেকে আজ আমরা মুক্ত, স্বাধীন, এস রমা আমরা এবার বাস্তব পৃথিবীতে গড়ে তুলি আমাদের ভালোবাসার সংসার, যাতে কোন নকল কিছু থাকবেনা, থাকবে শুধু অনুরাগ”।  রমা মৃদু হেসে ওঠে। এরপর নিজের মাথাটা সে অরুণের কোলে রাখে। রাতের নিস্তব্ধতা সাক্ষী হয়ে থাকে দুটি মুখোশহীন নটনটীর সত‍্যিকারের মিলনের, যে মিলন হয়তো তারা বেঁচে থাকতে হয় নি।

শৈলেন দাস...

মিলি

পড়া লেখা করে খুব ভালো ডিগ্রি অর্জন করা মিলি আজ ডিপ্রেশন এর জ্বালায় ভুগছে,শুধু মিলি নয় বর্তমান জেনারেশন এ  এমন আরো অনেক ছেলে মেয়ে দেখছি আমি,তবে সবার থেকে মিলির গল্পটা একটু অন্য রকম,সে ছুট বেলা থেকেই পড়া শুনায় ভালো ছিল,সেই ছুট বেলা থেকে পড়া শোনার শেষ বছর অবধি সে প্রত্যেকটি ক্লাসে প্রথম বিভাগে পাস করা মেয়ে,হাই স্কুল লেবেল সার্টিফিকেট পাওয়ার পর আর্টস নিয়ে সে সিলচরের খুব নামি দামি একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এডমিশন নিয়েছিল।যদিও সায়েন্স নিয়ে পড়ার ইচ্ছে ছিল তার,পরিবারের আর্থিক অবস্থা এতটা ভালো না থাকায় আর্টস নিয়েই পড়তে হলো থাকে।আর্টস নিয়ে পড়লেও তার জ্ঞান ছিল প্রত্যেকটি স্ক্রিমের,যেটাকে ইংরেজিতে মাল্টি ট্যালেন্টেড বলে।ইংরেজি বৎসর 2017 সালে মিলি হাইয়ার সেকেন্ডারী সার্টিফিকেট অর্জন করে সেখানেই আবার বেচলার অফ আর্টস করে,2020 সালে বিনা বেকে সে BA শেষ করলো...BA শেষ হওয়ার পর তার বাবা বললো কি রে মা তুই কি আরো পড়বি,দেখ তর যদি পড়ার ইচ্ছে থাকে আমি আমার শেষ সামর্থ পর্যন্ত চেষ্টা করবো পোড়ানোর,মিলি পরিবারের পরিস্তিতি দেখে পড়ার ইচ্ছে থাকা সত্বেও না করলো এখানেই তার পড়ার সমাপ্তি হল।সব পরীক্ষায় সে প্রথম হয়ে এসেছে এবার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা চাকরির পরীক্ষার জন্য তৈরি হল।কত সরকারি বেসরকারি অফিসে ফ্রম বড়লো আজ পর্যন্ত তার চাকরির খবর পেলাম না।তার থেকে বরং পড়া লেখা না করা অনেক ছেলে মেয়ে সুখ সমৃদ্ধতে জীবন অতিবাহিত করছে......

মীনাক্ষী চক্রবর্তী সোম

পেটের দায়


চমককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কালরাতেও গেট বন্ধ করেছে। সকাল আটটা বেজে গেলেও গেট খোলেনি দেখে একে একে সকলে নেমে এসে খোঁজ করে চমকের। হঠাত করে নেই হয়ে গেল জলজ‍্যান্ত একটি ছেলে। চিন্তার জট পাকানো স্বাভাবিক।

           লুকিয়ে লুকিয়ে টাকা গুনছিল চমক। আজ তার বেতন হয়েছে । বয়েস কত আর হবে বড় জোর উনিশ। দাঁড়িগোফ গজায়নি ভালো করে। তাই দেখলে বয়সের তুলনায় ছোটই দেখায়। সংসারের দায়িত্ব কাঁধে পড়লে অভিজ্ঞতা বয়স থেকে বড় করে তুলে। চমক স্কুলের ছাত্র ছিল যখন ওর দাদা বলীন কৃষ্ণ এপার্টমেন্টের সিকিউরিটি পদে যোগ দেয়। একেবারে শুরুতে দাদা বলীন বাড়িতে গেলে চমক এসে দাদার ডিউটি করে দিত। শহরে টাকা ধরতে জানতে হয় । বলীন মশার কয়েল কোম্পানিতে যোগ দেওয়ায় চমক চলে এল সিকিউরিটি হিসেবে। 

        যে অর্থে সিকিউরিটি বোঝা যায় তেমনটা নয় এখানে। জলের সুইচ দিয়ে খেয়াল রাখতে হয় যাতে ওভারফ্লো না হয়, দুটো গাড়ি অফিসটাইমে বেরোয় বিকেলে ফিরে আসে, তখন গেট খুলে দেয় সে আর একদিন পরপর সকালে সিঁড়ি ঝাঁট দিতে বলা হয়েছে।রেসিডেন্সিয়াল এরিয়ার কৃষ্ণ এপার্টমেন্টের বারঘর আবাসিকদের সকলের আপনজন চমক। সন্তান স্নেহে সিক্ত সে। ম‍্যাগি, চিপস্, একপিস পিৎজা ছাড়াও বাটি করে মাছের ঝোল বা মাংস ইত্যাদি প্রায় প্রতিদিন চলে আসে কারও না কারও বাড়ি থেকে । 

           ভীষণ ঘুমকাতুরে ছেলে চমক। আটটা অব্দি নিরলস ঘুমিয়ে থাকে । বলে কয়ে লাভ হয়নি। হকার পেপার নিয়ে গেটে দুমদাম শব্দ করে, কাজের মাসিরা গজগজ করতে থাকে। চমকের সেসব পৌঁছয় না। গেটের বিপরীতে থাকা মুদি দোকানীরা চেয়ে থাকে। অগত‍্যা আবাসিকদের মধ‍্যে ম‍্যাডাম দিদি দায়িত্ব নিয়েছেন সকালবেলা গেট খোলার। এক এক করে সিঁড়ির ও পার্কিংয়ের লাইটগুলো অফ করে গেটের তালা খুলে দেন তিনি । 

            প্রান্তিক গ্রামে ছেলেটির বড় হয়ে ওঠার করুণাসিক্ত কাহিনি আবাসিকরা সকলেই জানে। চার-পাঁচটা গ্রামের জন‍্য একটিই স্কুল বরাদ্দ। শিক্ষকরা শহর থেকে গিয়ে পাঠদান করেন। রাস্তাঘাট ভালো ছিল না,। সারাদিনে দু-তিনটি বাস ও ম‍্যাটাডর দেখা যেত। শিক্ষকদের উপস্থিতির উপর নির্ভর করত ক্লাসের সংখ্যা। শিক্ষকদেরকে ফিরে যেতে হবে বলে সময়ের আগে ছুটি হয়ে যেত কখনো কখনো। এহেন স্কুল থেকে ম‍্যাট্রিক পাস করে কলেজে পড়ার কোন ইচ্ছে বা তাগাদে কোনটাই নেই চমকের। তিনভাই একবোনের সংসারে চমক মেজ। অভাব অনটন নিত‍্যসঙ্গী। বাবার একফালি জমি রয়েছে কিন্তু পুরো পরিবারের ভরণপোষণের পক্ষে যথেষ্ট নয়।  তাই মাঝেমাঝেই হাজিরা কাজ করতে বাধ‍্য। বলীন আর চমক পেটের দায়ে বাড়ি ছাড়া। 

           বলীন মশামারা কয়েলের কারখানায় কাজ করে। মাসকাবারি বেতন ভালো দেয়।  সিফটিং ডিউটিতে রাত্তিরেও ডিউটি পড়ে। সেরকম সময় ভাই চমককে দেখতে এসে বলীন সারাদিন ঘুমোয়। অনেক দায়িত্ব বলীনের। বাবার শরীর ভালো থাকে না। মা ও বোন ঘর-কন্নার কাজ সামলে নেয়। বিকেলে বাড়ির সামনে পান-তামুল-গুটখা-চিপস-গুটখা-চিপস টেবিলে নিয়ে দোকান সাজায় বলীনের মা। আজকাল নারী সবলীকরনে সরকার যথেষ্ট ত‍ৎপর। বলীন আলোচনা করে সেসব জেনে নিয়ে সরকারি সুযোগ সুবিধা করে দিয়েছে মাকে। প্রতি মাসে নিয়ম করে বলীন গ্রামে যায়। যেতে হয়। মরমী, ওর ভালোবাসা, প্রতিজ্ঞা করিয়েছে। মাসে একদিনের জন‍্য হলেও আসতে হবে বলীনকে। কথা রাখে বলীন। 

        ম‍্যাডাম দিদিকে সমীহ করে বলীন। গুগল পে করে গ্রামে টাকা পাঠাতে ম‍্যাডাম দিদিই ভরসা। সেদিনটিতে সুখ-দুঃখের গল্প করে বলে টাকা না পাঠালে বাড়ির সবাই কষ্ট পাবে। কথা হল বেশির ভাগ টাকা বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে কম টাকায় কেমন করে চলবে বলীন। শহরে সবকিছুই মহার্ঘ। বলীন বলে যায়, এখানে সবাই ওকে খুব স্নেহ করে। একটু চাল ফুটিয়ে নিলেই হয়ে যায়। এসবই করোনা কালের কথা। তুলনায় চমক অনেকটাই বালকসুলভ। খুব মেঘলা দিনে অথবা খুব ঠাণ্ডায় ছেলেটি একা বসে থাকে দরজার সামনে। কেমন যেন বেদনা বিধুর দৃশ্য। আবাসিকরা আসা যাওয়ার সময় দেখে   পার্কিঙে বসে থাকা চমককে। গল্প করার মত তেমন বিশেষ কোন কথা থাকে না। তার অনুরোধে বলীনকে বলা হল সাধ‍্যমত একটি স্মার্টফোন কিনে দিলে ভাইটির একাকিত্ব ঘুচবে। 

           করোনার প্রকোপ কমছিল, এমন এক বিকেলে চমকের চোখেমুখে খুশির ঝিলিক। হাতে একটি স্মার্ট ফোন। যাক, অবসর সময়টুকু ভালো কাটবে তার। কিন্তু হিতে বিপরীত হল। ফোন পাবার পর চমকের ঘুম ভাঙে না সকালে। রাতে গেম খেলার কথা অবলীলায় বলে। বয়েসটাও নিদারুণ ঝক্কির। আলসেমিতে ঝাড়ু হাতে নিতে অনীহা। বাড়তি কিছু দিলে সাহায্য করে দেয়। ইতিউতি মেদ জমছে শরীরে। রান্না করতে তেমন দেখা যায় না। সারাক্ষণ হাতে সবপেয়েছির দেশ আর মুখে গুটখা ভরা। একদিন দেখা গেল পাগলের মত একা একা কথা বলছে সে। পরে জানা গেল কানে ব্লু টুথ লাগিয়ে রাখে । দায়িত্বহীন দায়িত্বরক্ষী নিয়ে চলে যাচ্ছিল বেশ।  সন্তানস্নেহে বেতনভুক চমক ছিল নিজের মত করে। 

             দারুণ রকমের সংসারী ছেলে চমক। যে বয়সে ছেলেরা আনন্দোৎসবে খরচ করে দেদার, সেরকম সময়গুলোতে সংসার চালাতে সাহায্য করে সে বাবাকে।  দারিদ্র্য মানুষকে অভিজ্ঞপুষ্ট করে তোলে। বাড়তি দুটো পয়সা আয়ের উৎস সন্ধানে কাজ খোঁজে চমক। পাড়ায় ট্রাকে করে জিনিসপত্র আসে, সেমত কারো মতামত না নিয়ে কথা বলে রাখে সে । মুশকিল হল আবাসিকদের কাজে বেরনোর সময় সেটা, অগত‍্যা হলনা । গ্রামে পাঠানোর জন‍্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে রাখে একটু একটু করে। বাড়ি যাবার সময় বিশালবপু ব‍্যাগ নিয়ে যায়। 

        এহেন চমক একদিন উধাও হয়ে গেল কাউকে কিছু না জানিয়ে। তখন গরমের বন্ধ চলছে। দেরি করে জানাজানি হল আবাসিকদের মধ্যে । ঘর খোলা সম্ভব হচ্ছে না কারণ চাবি নিয়ে চলে গেছে। কেউ বলল পুলিশে খবর দিতে, কেউ আবার সাবধান বাণী শোনায়। কমবয়েসী ছেলেকে সিকিউরিটি পদে রাখার দায়ে কুকথা শুনতে হবে হয়তো। জল্পনার পঙ্খীরাজ ডানা মেলে। কি হবে, যদি মন্দ কিছু ঘটায়!! বিকেলে অফিস ফেরতাদের সবার উপস্থিতিতে তালা ভাঙা হলে দেখা গেল সব জিনিস হাপিস। খুদে ছেলের চালাকির কাছে পরিণত বয়সীরা হেরে গেল! "আড়া কাটা তোতা, বুঝলে" বলে উঠলেন প্রেসিডেন্ট, "যতই আদর দাও, সে বাঁধন কেটে পালাবেই"।  রাগের চোটে অনেক কথাই বেরিয়ে পড়ছে নানাজনের মুখ থেকে। এমন সময় প্রেসিডেন্টের ফোন বেজে উঠল। অপরিচিত নম্বর। ট্রু কলার দেখে তিনি বললেন হ‍‍্যালো.........। 

             সমস্ত আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু সেই ফোনকল। হতবাক আবাসিকরা অনুভব করে পেটের দায় বড় দায়।

            

শুভ্ৰা সাহা

একুশে জানুয়ারি

আজ একুশে জানুয়ারি। এ দিনটির জন্য সারা বছর অপেক্ষা করে থাকে কমল। ওদের বিবাহবার্ষিকী ।যদিও এই দিন ওর সম্পূর্ণ নিজস্ব। কারো সঙ্গেই মনের গোপন আকুতিকে শেয়ার করে না  ও । করলেও বুঝবে না  কেউ।কাউকে বোঝাতেও চায়না কমল।কারণ এত খুশিতে ভরা ছিল ওদের জীবন ! পৃথার ছোট ছোট আবদার গুলো যেন এই দিনের জন্য অপেক্ষা করতো। সেগুলির কোনোটাতেই   কমল না করত না ।  

  দিন কেমন পাল্টে যায় ,মানুষ কেমন বদলে যায় ,সবাই কেমন ঘটনা গুলিকে ভুলে যায়। কমলও. মাঝে মাঝে ভুলে যায় ,আবাৱ বসে বসে ভাবেও মানুষ কি করে ভুলে যায় ! কি করে ভুলে যাওয়া যায় ! নিজের একান্ত আপন জনকে ! যাকে ছাড়া একদিন মনে হত এক মুহূর্তও থাকা যাবে না। হয়তো এসব এই ব্যাপারগুলো সবার জীবনে আসে। 

পৌরাণিক কাহিনীতে পড়েছিল রাজা হরিশচন্দ্র একদিন ভুলে গিয়েছিলেন, উনার স্ত্রীকে ,উনার সন্তানকে ,আর আমরা তো মনুষ্য জাতি। স্বার্থের জন্য অনেক কিছুই ভুলে যাই। ব্রেন থেকে অনেক কিছুই অনেক সময় সরে যায়। আবার কোন এক সময় হঠাৎ করে মনেও পড়ে যায়। মনটা যে কি ভীষণ বস্তু তা বলে বোঝানো যাবে না।  মুহূর্তে মুহূর্তে চেঞ্জ হয়ে যায় ।এটাকে আয়ত্ত করাই যেন সবচেয়ে বেশি কঠিন ব্যাপার ।

 এভাবে কোমল হঠাৎ হঠাৎই ভাবনায় জড়িয়ে যায় ।এ ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসতে চায় সে।   আৱ নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে চায় । কাজ বলতে সামাজিক কাজ। পাড়ার মানুষের খোঁজ খবর নেওয়া । যতটা সম্ভব গরিবদের পাশে দাঁড়িয়ে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। অবশ্য. এর জন্য রাজনৈতিক নেতারাও কম যান না । অনেক সময় তাদের তরফ থেকেও কমল এর ডাক পড়ে। যদিও কমল রাজনীতির ধার ধারে না। অসহায়দের সহায়তা করাই ওর কাজ।

কমলের একটি ছেলে । বিদেশে থাকে ,চাকরি করে । বাড়ির অন্যান্য ভাই দের সঙ্গে একান্নবর্তী পরিবারে রয়ে যায় কমল । 

কমল ২১ শে জানুয়ারি কে ভোলে না। এটি  তার সম্পূর্ণ নিজস্ব , এদিন পৃথার সঙ্গে আত্মিক মিলন অনুভব করে  ও। ওই দিনটিতে কোনো নির্জন জায়গায় নিজেকে বেঁধে রাখতে চায়, ২৫ বছর আগে আকাশে পাড়ি দেওয়া পৃথার  কাছে। এই দিনে নির্জন মুহূর্তে চোখ বোজা কমলকে ধরা দেয় একান্ত আপন করে পৃথা।

মনচলি চক্রবর্তী

 জল ভাত 

 ( আগরতলার কথ্য ভাষায় লেখা) 

দুপর বেলা করীমের পেট  জ্বলতাছে খিদায়।ধানের জমি তিক্কা আইয়া দেখে কিচ্ছু  নাই খাইব কি? এমন কি দুইডা জল ভাত ভাতও নাই ডেগে। পেটের ক্ষুধায় তার মাথা গরম হইয়া গেছে গা।আজকে তার ইচ্ছা করতাছে মাইয়াডারে মাইরাই লাইবো।সারাদিন বাড়িত থাকে তাই দুইডা ভাত রানতো ও পারে না। 

করীমের বউ মরছে মাইয়াডার জন্মের সময়। 

বাপ আর মাইয়ার অভাবের সংসার।

মাইয়ার বয়স ৮- ৯ বছর হইছে।কোনরকম চলে খাওন  বাপ মাইয়া দুইজনের।করীম জমিত কাজ করে।সারাদিন কাজের পরে আইয়া পেটে আগুন জ্বলতাছে তার।রাগে একটা বাঁশ লইছে আজকে মাইয়ানননডারে মাইর দিবো।এমন সনয় লগের বাড়ির কাকি আইয়া কয় মারবা মাইয়া ডারে কেন? তাই ছুডো একটা মাইয়া হাত পুড়াইয়া দুইডা রান্দে।আজকে  তর ঘরো চাল আছল নি, মাইয়াডা কিতা  করবো। আমি দিতাম আইছি চাল দুইলা তাই রাখছে না। মাইয়ার কি জিদ নিছে না বাবা রাগ করবো কইয়া।কালকে মাইয়া ডা ভাত রানতো গিয়া মার গালতে হাত টা পুড়াইয়া লাইছে যে দেখচত নি তুই? মা মরা মাইয়াডারে মারবি?

 কাকির কথা শুইনা করীমের হাত তিক্কা বাঁশ টা পইরা গেছে।করীম ঘরো গিয়া মাইয়া ডার  হাতের পুড়া জায়গাডা  দেইখা চোখের জল আর রাখত পারছে না।বুকে মাইয়াডারে জড়াইয়া কাইন্দা দিসে।করীম কয় -মা মরা মাইয়াডারে  এতো কষ্ট দিতাছি  - হায় আল্লা!

বাপ মাইয়ারে কষ্টে  দেইখা কাকির চোখেও জল আইয়া পরছে।কাকি চোখ মুছতে মুছতে কয় আমি চাল আলু আনতাছি তরা ভাত খা ,বাপ মাইয়ার চোখের জলে তো আর পেট ভরত না।করীম কয় কাকী,লাগদনা আমি বাবুর কাছে টাকা পামু কাজের। টাকা দিয়া চাল আনুম আর মাছ ও কদ্দুর আনুম পারলে। মাইয়াডা হাত পুড়াইয়া রান্দে আমি বাপ হইয়া খাই।আজকে আমি নিজে রান্দুম, আর মাইয়াডারে খাওয়াইয়া দিমু নিজে।এমন বাপ আমি মাইয়াডারে ভালোভাবে খাওয়াইতে ও পারি না আদর যত্ন ও করতাম পারি না।

কাকি শুইনা কয় - করীম আবার বউ আন। তরেও খাওয়াইবো আর মাইয়াডারে ও আদর করবো।কাকীর কথা শুইনা করীম হাসতে হাসতে কয় আমরা বাপ মাইয়া ভালোই আছি কাকি।বউ আনুম সংসারে অশান্তি করবো, আর মা মরা মাইয়াডারে বকবো,মারবো, অনাদর করবো। শেষে আমার মাথা গরম হইবো আর  বউডা খুন হইবো।দরকার নাই কাকী, ভালোই আছি আমরা বাপ মাইয়া। কম খামু তবুও শান্তিতে থাকুম।মাইয়া ডারে বকি,যত্ন করিনা,ভালা খাওয়ন ও পারি না দিতাম। তাও মাইয়াডা আমার সব গো কাকি।মাইয়াডা আমার জান।

শেষবেলায় করীম বাজার তিক্কা চাল আর মাছ আনছে, রানছে নিজে।সন্ধ্যা সময়  কাকি আইয়া দেখে করীম তার মাইয়ারে ভাত খাওয়াইয়া দিতাছে। 

কাকী খুশি হইয়া কথা না কইয়া বাড়িত গেছে গা।

শম্পা ঘোষ

আসলে যেমন হয়

লোকে বলে এ অঞ্চলে অনুপম দের বাড়িটা নাকি অদ্ভুত রকমের-বাড়ির কংক্রিট থেকে দেওয়াল সবই পাথরের সামনের বিস্তৃত লন সেখান থেকে চলন রাস্তা আবার সেটাও বাঁকুড়ার লাল মাটি দিয়ে সুন্দর করে বানানো মফস্বল অঞ্চলে এতটা জায়গা জুড়ে এত বড় বাড়ি দেখা যায় না। অনুপমেরও মনে হয় বাড়িটা সত্যিই অদ্ভুত রকমের ঠান্ডা পাথরের তৈরি বাড়িটাতে সত্যিই দম বন্ধ হয়ে যায় তবে এর মধ্যে তার ওই দক্ষিণের ঘরটাকে সবচেয়ে স্বস্তির জায়গা বলে মনে হয়। ঘরটায় এখন যদিও সে বেশি সময় কাটাতে পারে না বছর খানেক আগে পর্যন্ত দাদুর ঘরটাই ছিল তার সবকিছু ।

বাবার টেটিয়াপোনা আর দিনরাত্রি টাকা-পয়সার হিসাব নিকাশ মায়ের অবুঝ শাসন দিদির আধুনিক বন্ধুদের হুজ্জুতি থেকে তো এই ঘরটাই মুক্তি র। দাদুর কাছে দেশ স্বাধীনের গল্প তিল তিল করে বাবা কাকাদের গড়ে তোলার গল্প আর সবচেয়ে ভালো লাগে ঠাকুমার কথা শুনতে। কিন্তু কি যে সব হয়ে যায় ইদানিং দাদুর শরীরটাও খারাপ। বাড়িতে এটা যেন কোন এক অবাঞ্ছিত সমস্যা, এই অনুভূতি অনুপমকে বিব্রত করে বিষন্ন করে তোলে অনুপম সবকিছু থেকে পালিয়ে বাঁচতে চায়। দিন কয়েক আগে বিএ ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়েছে বন্ধুদের রোজই নতুন নতুন কোন না কোন প্রোগ্রাম ভালো লাগেনা এসব অনুপমের কদিন হলো দাদুর খুব বাড়াবাড়ি অবস্থা যাচ্ছে। কাজ ছাড়া হতে ইচ্ছেই করে না। আবার শোনা যাচ্ছে দাদুর একটু শরীর ভালো হলেই নাকি তাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতে হবে মা নাকি এসব কি নিতে পারবে না আর। বাবাও যেন কিরকম নীল লিপ্ত টাকা পয়সা ছাড়া লোকটার কোন দিকে লক্ষ্যই থাকেনা রাগে মাথার ভেতর যন্ত্রণা আরম্ভ হয়ে যায় অনুপমের অথচ অনুভব মনে করে এই দাদু না থাকলে সে আজ এই অনুপম হতে পারত না।

উড়নচণ্ডী বদমেজাজি কিছু একটা হয়ে থেকে যেত। মাঝে মাঝে ভাবে তাই হলেই বোধহয় ভালো হতো। তাহলে তো বুঝি এত কষ্ট নিয়ে চলতে হতো না। দাদুকে বুঝতেও না। আর এসব ভাবনাচিন্তার কোন মানেই থাকতো না। এসব ভাবতে ভাবতে অনুপমের দম বন্ধ হয়ে আসে। সাইকেলটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে তারপর সোজা দামোদরের পার বাড়ি থেকে পালিয়ে এ জায়গায়ই তাকে নিশ্চিন্ত আরামের নিরাপত্তা দেয় দাদুকে আজ ভালো দেখেনি সে। তবুও বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছে তাহলে কি সে বাস্তবে মুখোমুখি দাঁড়াতে ভয় পাচ্ছে মনটা গুছিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। এখনই সাইকেলটা দাঁড় করিয়ে আজ পড়া সিগারেটটা বার করে ধরায় এরপর এ কত ছেলে খেলতে আসে নানা রকম খেলা দৌড়ঝাঁপ টানা পড়েন অনেকটা যেন জীবনেরই মতো সন্ধ্যে নেমে আসে। এ সময় আবার ভিড় হয় একদল ছেলেমেয়েদের। এরা পাশাপাশি পাড়ের বিভিন্ন জায়গা দখল করে বসে পড়ে কিছুটা সময় কাটায় অন্য জগতের হয়ে অনুপমের মনে হয় এটা স্বপ্ন কিন্তু এর স্বপ্ন গভীর ঘুমের খুব তাড়াতাড়ি ভেঙে যাবে সিগারেটটা অনেকক্ষণ শেষ হয়ে গেছে। অনুপম ঠিক করে নেয় আজ বাড়িতে সে কিছু একটা করবেই কিছুতেই দাদুকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতে দেবে না প্রয়োজন ওই বাড়িটার বিরুদ্ধে যাবে। সে এখন যথেষ্ট বড় তাই তার নিজস্ব মতামতের দাম দিতেই হবে। উঠে পড়ে সাইকেলের প্যাডেলে জোরে চাপ দেয় প্রচন্ড গতিতে সাইকেলটাকে ছোটায়। বাড়িতে সামনে এসে অদ্ভুত লাগে। লোকো কিছু জমা হয়েছে ঢুকতে গিয়ে দেখে দাদুর নিশ্চল দেবতা ততক্ষণে ঘর থেকে বাইরে সরিয়ে আনা হয়েছে বাবা মাথায় হাত দিয়ে বসে, দিদি কাঁদছে আর মা !কি জানি কোথায়? মাথা কাজ করছে না তার উদ্ভ্রান্তের মতো পালাতে ইচ্ছা করছে। সবাইকে ধরে মারতে ইচ্ছা করছে। যন্ত্রণায় সারা শরীর ছিড়ে যাচ্ছে। অনুপম সোজা এগিয়ে যায়। বাবা তার দিকে তাকিয়ে বলে 'শেষ সময়টা তোকেই খুঁজে ছে,এদিকে আয়'-অনুপম সোজা চলে যায় সেই দক্ষিণের ঘরে, জানালার রডগুলো ধরে একটু নিঃশ্বাস নিতে চাইছে। খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে জীবনের মানেই কি তবে এই নিশ্চুপতা? হঠাৎ শেষ হয়ে যাওয়া কিসের হাত ধরে তবে এগিয়ে যাওয়া? জড়বস্তুর সঙ্গে অনুভূতিগুলো মিশে নিথর পাথর হয়ে গেছে সবকিছু।

মিতা রায়

শ্রদ্ধাঞ্জলী

    একটা সেমিনার শেষে কলকাতা থেকে আগরতলা ফিরছিলাম। ফ্লাইট লেইট ছিল,তাই লাউঞ্জে ঘন্টা দু-এক বসে আছি। একটা গল্প বইয়ের পাতায় চোখ রেখেছিলাম। হঠাৎ কানে ভেসে পরিচিত স্বর!যথারীতি একটু এদিক ওদিক তাকিয়ে বুঝে নিলাম। কথার উতসস্থল আমার সামনের রো ছেড়ে তার পরের রো।এখান থেকে যেটুকু চোখে পড়লো এক জোড়া বৃদ্ধ-বৃদ্ধা।

   একজনের চকচকে টাকের চারপাশে সাদা- পাকা চুলের মাঝে কয়েকটা কালো চুল।কিছুটা যেন বলছে স্মৃতিটুকু থাক।খুব নিচু স্বরে  উত্তপ্ত কিছু আলোচনা হচ্ছিল বুঝতে পারছিলাম।

(২)

     এ ভাবে উঁকি-ঝুঁকি মারাটা অশোভন।তাই নিজেকে সংযত করে গল্পের বইয়ের পাতায় মন দিতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু টুকরো টুকরো কয়েকটি শব্দ ভেসে এসে আমার কানে ঢুকছিল।তার মধ্যে আমার জন্মস্থানের নাম টা দু'বার কানে আসায় কৌতুহল বেড়েই চলল!......

কিছুহ্মন বাদে টয়লেট থেকে ফেরার সময় ভাল করে লহ্ম্য করলাম, ফ্লাইট আরও আধঘন্টা সময় চেয়ে নিল।

লাউঞ্জে বসে বসে হয়রান।তবে মন্দ নয়,শীততাপনিয়ন্ত্রিত!

হঠাৎ লাউঞ্জে একজনকে দেখে মনে হল বহু বছর পর আমার স্কুলের হ্যাড স্যার, শ্রী সৈকত বোস!স্যার কে দেখে চিনতে কয়েক সেকেন্ড সময় লেগেছিল!..... 

উনার পাশের সিটটা।খালি দেখে,পাশে গিয়ে বসলাম।

লাউঞ্জে ফ্লাইটের অপেক্ষায়।

আমি পা ছুঁয়ে প্রণাম করে বললাম,----"স্যার,আমি শুভম ঘোষাল। ৯৩ 'র মাধ্যমিকের ব্যাচ,স্যার মনে পরছে?"

হাই পাওয়ার লেন্সের ভেতর থেকে দুটো ঘোলাটে চোখ আমার দিকে ফিরে তাকাল।আস্তে আস্তে চোখের দৃষ্টি উজ্জ্বল হয়ে উঠে, সারা মুখে সেই সুন্দর হাসি ছড়িয়ে পড়ল।

বললেন,----"শুভম"....ঘোষাল বাবুর ছেলে?শুনেছিলাম  বড় ডাক্তার হয়েছিস!খুব নাম-ডাক হয়েছে তোর!....

শেষ কথাটায় কেমন একটা শ্লেষের সুর বেজে উঠল!.... 

পাশে বসা মাসিমা কে প্রণাম করে বললাম, সুজয়দার কাছে এসেছিলেন? 

সুজয়দা হেড স্যারের একমাত্র ছেলে। আমার থেকে দু'বছরের সিনিয়র ছিল।বড় ইঞ্জিনিয়ার, পিটসবাগে' থাকে জানতাম। মাসিমা, হ্যাঁ বলে,মাথা নিচু করে বসেছিলেন। স্যারও গম্ভীর হয়ে গেলেন। 

বললাম,----"কতদিন ছিলেন সেখানে? কোথায় কোথায় ঘুরলেন স্যার?"

----"ছিলাম প্রায় দু'মাস।ছেলে আর বৌমা খুব ব্যস্ত, তাও ঘুরিয়েছে টুকটাক।"---স্যার বললেন।

(৩)

একবার মনে হল উনারা বোধহয় কথা বলতে চাইছেন না।পাশের চেয়ার ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে বসি।কিন্তু যেতে গিয়েও পারলাম না।

হেড স্যারের কাছে দীর্ঘদিন পড়েছিলাম। খুব কাছ থেকে উনাকে দেখেছিলাম। উনি ছিলেন মানুষ গড়ার কারিগর। এত সুন্দর করে সবকিছু বোঝাতেন।পড়ানো ছাড়াও অনেক কিছুই উনার কাছ থেকে শিখেছিলাম। টাকার বিনিময়ে প্রাইভেট উনি কোনদিন পড়ান নি।আমাদের চা বাগানের বস্তিগুলোতে গিয়ে সন্ধ্যাবেলায় বিনা পয়সায় অনেককে পড়াতেন।এ ছাড়া বইপত্র দিয়ে গরীব ছাত্রদের যথেষ্ট সাহায্য করতেন। কত গরীব ছাত্রের পরীক্ষার ফি দিয়ে দিতেন। 

   মাধ্যমিকের আগে বাবার ভীষণ শরীর খারাপ হয়েছিল। বহুদিন বাবা বিছানায় ছিল।জমানো টাকা-পয়সা সব শেষের দিকে। আমাদের এক টুকরো জমি মা বিক্রি করবে ভেবেছিল। কিন্তু স্যার, কোথা থেকে খবর পেয়ে একদিন এসে মা'কে বলে গেছেন, জমি যেন বিক্রি না করে।আমার দায়িত্ব উনি নিয়েছিলেন! কয়েক মাস উনার বাড়িতে খাওয়া -দাওয়া করে পড়াশোনা করেছিলাম। মাসিমা,নিজেদের গরুর দুধ,গাছের ফল,পুকুরের মাছ,লাউ,কুমড়ো,....শীতের সব্জি প্রায় সবই আমার হাত দিয়ে মাকে পাঠাতেন।বাবার চিকিৎসার জন্য অনেকভাবে 

সাহায্য করেছিলেন।...... 

কোনদিন কোন ছাত্র কে বকতে বা।শাস্তি দিতে দেখিনি স্যার কে!

   একবার আমার বন্ধু তরুণ কারোর টিফিন চুরি করে খেতে গিয়ে ধরা পরেছিল।

তরুণের মা চার-পাঁচ বাড়ি কাজ করে ওর পড়ার খরচ চালাতো!ও টিফিন  কখনোই আনত না।স্যার, সব জানতে পেরে,তরুণকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে খাইয়েছিলেন।তারপর থেকে প্রায় প্রতিদিন দুপুরেই স্যারের বাড়িতে ওকে খেতে ডাকতেন মাসিমা। মাসিমার ছিল দয়ার শরীর।সব ছাত্রদের মাতৃস্নেহে ভালোবাসতেন।আমরা কখনো কোনও কাজে গেলে মাসিমার হাতে বানানো নাড়ু,সন্দেশ খেয়ে আসতাম।

    সুজয়দা,পড়াশোনায় মেধাবী ছিল। পড়ানোর সময় হেড স্যার, সব'দাই বলতেন, ---দেশের সব স্কলার ছেলে মেয়েরা বাইরে চলে গেলে দেশের উন্নতি হবে কি কিরে?আজ নিজের খুব লজ্জা লাগছিল,এই কথাটা মনে হওয়ায়! 

   আমিও বহু বছর বাড়ির বাইরে। যদিও দেশের মাটিতে বসেই আমি চাকরি করছি।আমিও স্যারের শিক্ষায় প্রাণিত হয়ে ডাক্তারি পাশ করে প্রথম কয়েক বছর এক গ্রামীণ হাসপাতালে ছিলাম।বিনে পয়সায় চিকিৎসা করতে চেষ্টা করতাম। কিন্তু  রাজনৈতিক পাটি'র দাপটে আর রুগীদের আত্মীয়দের অত্যাচারে সব নীতি বিসজ'ন দিয়ে কয়েক মাসেই পালিয়ে এসেছিলাম। তারপর বাইরে পড়তে এসে, বিদেশেই কাটিয়েছি কয়েক বছর! বাবা-মা বহু বার ফিরতে বললেও ফিরতে পারিনি!অবশেষে, বাবা মারা যাওয়ার পরই ফিরে এসেছিলাম।..... 

সব মনে পরছে  একে একে....!

ফ্লাইট এর সময় হয়ে গেছে।তাই প্লেনে উঠে বসলাম।একজন কে রিকোয়েষ্ট করে স্যারের পাশের সিটটাতে বসলাম।

অল্পহ্মণ পরে স্যার,আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ---"তোর ফ্যামিলি কোথায়? একা যাচ্ছিস?"

বললাম,ওরা আগরতলা বাড়িতে আছে।

মাসিমা বললেন,----"বাঃ,ভালো।তোমার মা অন্তত বৌ-নাতি-নাতনি নিয়ে আনন্দে আছেন তাহলে।"....

মাসিমা বলে চলেছিলেন, ----"আমার ছেলেটা কি করে এতো বদলে গেল জানি না!

আমাদের বোধহয় কোথাও কোন ফাঁক ছিল!"ওনার চোখ দিয়ে কয়েকফোঁটা জল গড়িয়ে পরল!

----"আঃ,কি হচ্ছে? নিজেকে সামলাও!"--------স্যার,একটা চাপা ধমক দিলেন, যেটা উনার চরিত্রের সঙ্গে বেমানান!".....

----কেন চুপ করবো? এ ভাবে ফিরে যাচ্ছি...... ওখানে গিয়ে সবাইকে,কি বলবো বল তো?জমি বাড়িটাও বিক্রি করে দিয়ে এলে তুমি!...."সে কিছু একটা ব্যবস্থা হবেই।আগে তো পৌঁছাই!".....স্যার উত্তর দিলেন!

..


(৪)

     বুঝতে পেরেছিলাম, কোথাও তাল কেটে গেছে! 

বললাম, ----"স্যার, আমি আপনাদের ছেলের মত।আমাকে যদি খুলে বলেন,কি হয়েছে? যদি আমি কিছু করতে পারি......।"

তুই বাড়ি ফেরার আগেই সব জেনে যাবি।স্যার, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন!

   সুজয় আর ওর বউ বহু বছর বিদেশে। অনেক বছর পর ওদের একটি ছেলে হয়।বহুদিন ওরা বাড়ি আসে না।সুজয় আমাদের পাকাপাকি ভাবে বিদেশ চলে যেতে বলেছিল। ওরা সে দেশের গ্রীন কাড' পেয়ে গেছিল। 

এতদিন আসি নি।কিন্তু নাতির ফটো দেখে তোর মাসিমা কে আর রাখতে পারলাম না।সুজয় চাইছিল,আমরা পাকাপাকি ভাবে ওর কাছে চলে যাই।ও নিজে এসে সব ব্যবস্থা করে জমি,বাড়ি সব বিক্রি করে আমাদের নিয়ে গেছিল,দু'মাস আগে।আমার ইচ্ছে ছিল না।কিন্তু এই বেকার বৃদ্ধর কথায় কেউ কান দেয়নি।এখানে এসেই বুঝলাম, ওদের আসলে বাচ্চা দেখার জন্য আয়ার দরকার ছিল।ক্রেসগুলো ছ'মাসের আগে বাচ্চা নেবে না।বৌমা,বাধ্য হয়ে আমাদের আনিয়েছিল।বাচ্চাটার ছ'মাস হতেই ওকে ক্রেশে দিয়ে আমাদের ফেরার টিকিট ধরিয়ে দিল সুজয়!

----বললো,শীত আসছে আমাদের কষ্ট হবে ঠান্ডায়!

.......একটি বৃদ্ধাশ্রমে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে নেট ঘেটে!.......

---স্যার, এতটুকু বলেই চোখ বুজলেন!

বাচ্চাটা এই দু'মাসেই আমাদের ন্যাওটা হয়ে গেছিল।খুব মুখ চিনত!দেখলেই দু'হাত বাড়িয়ে কোলে উঠতে চাইত!মাসিমা,কান্না ভেজা গলায় বলেন......!

আমার মনে পরে,সুজয়দাকে যতটুকু দেখেছিলাম, পড়াশুনা ছাড়া কিছুই জানতেন না।আজ নিজের বাবা-মা কে এভাবে অবহেলা করছে শুনে খুব খারাপ লাগছে!...আমাদের পাশের বাড়ির নগেন জ্যাঠুর ছেলে  কলকাতায় ভাল চাকরি করত।বাবা-মা কে সেভাবে দেখভাল করত না।বহু পুরনো  জরাজীর্ণ বাড়ি ভেঙে পরছিল।মেরামতের দরকার ছিল।স্যার, স্কুলের সব ছাত্র দের নিয়ে নিজেই একজন লোক সম্বল করে ওনাদের বাড়ি মেরামত করে দিয়েছিলেন! চিকিৎসার ব্যবস্থাও করে দিয়েছিলেন। 

এমনি টুকরো টুকরো বহু কথা মনে পরছিল!


(৫)

     আলম নামে একটি মুসলিম ছেলে পড়ত আমাদের সঙ্গে। ওর বাবা ডাকাতি করতে গিয়ে ধরা পরে।গুলি লেগে মারা গেছিল। ডাকাতের ছেলে বলে সবাই আলমকে একঘরে  করে দিয়েছিল।একমাত্র স্যার, আমাদের বুঝিয়ে বলেছিলেন  কেউ সখ করে ডাকাত হয় না!আর ওতে আলমের কোন দোষ নেই তাও বলেছিলেন। সস্নেহে আলমের চোখের জল মুছিয়ে ওকে বুকে টেনে নিয়েছিলেন! সেই আলম আজ একটি এন,জি,ও..চালায়।বন্ধ চা বাগানের পরিবারগুলো কে নানাভাবে সাহায্য করে।সেদিন স্যার, যদি ওর পাশে না দাঁড়াতেন,তবে আলম আজ ভেসে যেত।হয়তো বাবার থেকেও বড় ডাকাত তৈরি হত একদিন, অভাবের তাড়নায়!! 

আজ স্যারের ছেলের কৃপায় ওনার ঠিকানা হতে চলেছে "বৃদ্ধাশ্রম"!! মন টা খচ্ খচ্ করছিল!

    এয়ারপোর্টে লাগেজের জন্য দাঁড়িয়েছিলাম।নেটওয়ার্ক আসতেই কয়েকটি দরকারি মেইল,ফোন করে নিলাম।

     স্যার, আমাকে বললেন, একটা উপকার করবি?একটি বাড়ি ভাড়া ঠিক করে দিবি?

যে ক'টা টাকা পেনশন পাই,তা দিয়ে আমাদের চলে যাবে!"...... এবার আমার চোখের কোল ভিজে উঠল!

---বললাম,------" স্যার, আপাতত, আমার উপর সব ছেড়ে দিন,ব্যবস্থা করছি।

   স্যারদের নিয়ে বাইরে এসে দেখলাম, কাজল,অনীশ,রাহুল,আলম,প্রতীকদা সবাই অপেক্ষা করছে।সবাই ছুটে এসে স্যারের ট্রলিটা টেনে নিল।আমি পরিচয় করালাম স্যারের সঙ্গে, উনার সব প্রাক্তন ছাত্রদের।কারোর কথা মনে আছে,আবার কেউ বা আবছায়া! অনেক অনেক বছর বাদে,তাই!সবাই স্যার কে প্রণাম করল।আজ সবাই প্রায় সুপ্রতিষ্ঠিত। আমার ফোন পেয়ে সবাই ছুটে এসেছে স্যারের জন্য! 

   আলম,আগরতলায় একটি ফ্ল্যাট নিয়েছে।আলম জানালো,সে স্যারদের নিয়ে যেতে চায়।সবাই মিলে স্যার আর মাসিমা কে নিয়ে গেলাম।

------আলমের এন জিও টা একটা অনাথ আশ্রম খুলেছে। স্যার কে ওখানেই রাখতে চাই আমরা সবাই।

-----"এ ভাবেই "শ্রদ্ধাঞ্জলী" দিতে চাই আমাদের প্রিয় হেড স্যার কে!"......

    বিভিন্ন বয়সের বাচ্চাদের মাঝে স্যার খুব ভালো থাকবেন। স্যার আর মাসিমা রাজি হলেন। 

----"স্যার, মাসিমাকে বললেন,"কে বলে আমার সন্তান কাছে নেই?এরাও তো আমার ছেলে।।আজ সবাই কেমন ভাবে, 'আমাদের আপন করে নিল"!.......

     স্যারের চোখে আনন্দের অশ্রু!!.............. 

পঙ্কজ কান্তি মালাকার

নামে কি আসে যায়

(১)

মাধাই পাটনীর দিন কাটে বরাকের বুকে,রাত কাটে ঘুমের সুখে, অবসরবেলায় জাল বুনে, সন্ধেবেলা নাম গান গায় -এই নদী-নৌকা-জাল-মাছ আর নামগান নিয়েই মাধাইর জীবনবৃত্ত। ভোর হওয়ার আগেই যখন শুধু আলো ফুটতে শুরু করে সেই ভোরে নৌকা আর জাল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। সকাল সাতটার আগে পৌঁছে যায় বসাই, তাকে কম মাছ দিলে চলবে না,নইলে দুপুরে মাছ নিতে বড়দা এলে গাড়ি পাড়বে। বড়দা জগাই মা'কে ও তার সংসার নিয়ে শহরে থাকে, মাছের দোকান করে।মাধাই স্ত্রী ও ছোট বাচ্চাদের নিয়ে গ্রামে থাকে।মাধাইর ছেলে মেয়েকে পড়াশোনা তার দাদাই করায় শহরে রেখে। সে খুব সরল সিধে,বোকা যাকে বলে।যা বুঝে তাই বুঝে, বাস্তবজ্ঞানের খামতি আছে।বাল্যে মেধার অভাবে পড়াশোনাটাও হলো না,স্কুল গেল নদী এলো জীবনে। বাবার সাথে আসতো জাল থেকে মাছ কুড়োতে -সেই থেকে উত্তরাধিকারে জাল নৌকা নদী এলো তার জীবনে। নদীর বাইরে তার জীবন নেই,সে কাণায় কাণায় জানে এই নদীকে, কোথায় কি মাছ ঘাই দিচ্ছে,কোন ডরে কি মাছ আছে -এগুলো খবর রাখে মাধাই । ঘরের খবর রাখে বৌ, বাড়ির খবর রাখে জগাই।


হঠাৎ করে একদিন সাতসকালে বসাইর সাথে জগাই হাজির। মাছ নিয়ে বসাই চলে গেল। এখন ওই দোকান চালায়, ছেলে অনেক বড় হয়েছে,কলেজে পড়ছে।জগাই বলল ,"ঘরে চল, এনার্সি নিয়া কথা আছে।" নৌকা বেঁধে জাল হাতে নিয়ে মাধাই বড়দার সাথে ঘরে গেল।মাধাই বছর কয়েক আগে থেকেই শুনছে এনার্সি চলছে।জগাই সবকিছু করেছে।তাকে বসাই একটা টিভির মতো মোবাইল দিয়ে ফটো তুলে নিয়ে গিয়েছিল।


জগাই বসলো চেয়ারে,দাওয়ায় বসলো মাধাই।ছোট্ট অণিমা জেঠু ও বাবার জন্য চা নিয়ে এলো, ঘোমটা টেনে বসাইর মা দরজার আড়ালে এসে বসলেন। চা খেতে খেতে জগাই বললেন,"মাধাইরে, এনার্সিত তোর নাম, ছোট বউয়ের নাম আইছে কিন্তু বসাই ফুলন অণিমা কেউর নাম আইছে না।"

-কেনে আইছে না? প্রশ্ন করলো মাধাই।

-তোর ডকুমেন্ট ইতার মাধব দাস আর বাচ্চাইনতের ইতাত মাধাই দাস কেনে?

-আমি কিতা কইতাম? তুমি আর বসাইর মায়েঔ ইতা জান' ।

-হকলটির বার্থ সার্টিফিকেট স্কুল সার্টিফিকেট'ও মাধাই দাস লেখা, বসাইর ভোটার আইডিত'

একটু থেমে জগাই ধীরে ধীরে বললেন ,"বার্থ সার্টিফিকেটে ভুল করব হসপিটালের ক্লার্কে আর অখন আমরার ভোগান্তি।" জাল-মাছ-নদী আর নাম-গান নিয়ে মগ্ন থাকা মাধাই এতদিন ভুলেই ছিল যে কুষ্টিতে তার নাম মাধব, ডকুমেন্টে তার নাম মাধব, মাধাই তার ডাকনাম। " মাধাই হোক আর মাধব হোক মানুষ তো আমি একজনঔ।"

-এটা এনার্সিয়ে বুঝত' নায়

-এনার্সিত নাম আইলেউ কিতা আর না আইলেউ কিতা?

-হায়রে বুরবক! এনার্সিত নাম না আইলে বাংলাদেশী করি দিব। -বাক্যটি তীরের মত কর্ণবিদ্ধ করল মাধাইর।- সুবলের খবর জানসনি?

-না, তারে ত' সাপ্তাদিন থাকি দেখরাম না

-দেখবে কিলা? হেরে ত' বাংলাদেশী কইয়া ডিটেনশন কেম্প' ভরি দিছে

-মানে?

- মানে তার পূর্ণা ডকুমেন্ট কিচ্ছু দেখাইতে পারছে না, সন্দেহ কইরা বিদেশি বানাই দিছে।

- দেখাইবো কই থাইক্কা? তার ঘর ত' প্রত্যেকবারঔ নইদ্যে ধইয়া লইয়া যায় -বাসনপত্র গরু ছাগল লইয়া যায়, ডকুমেন্ট থইয়া যাইবো নি?

-অন্ধ আইনে অতা বুঝবনি ? আমার লাগা দোকান কালা মিঞার উপরে বিদেশি কেইস চলের

- বড়দা সুবলরে কিতা এখন দেশ থাকি খেদাই দিব নি? -কিতা কইতে? সরকারে জানে কিতা করব

-আইচ্ছা বড়দা যেরার নাম এনার্সিত আইত নায় হেরারে কিতা করব'? 

-কিতা করব' কেউ জানে না, বাংলাদেশী টাংলাদেশী মানাইবো, সরকারের ঘর থাকি নাম কাটি দিব ওতাঔ করবো আর কিতা।

- বড়দা যদি বাইচ্চাইনতের নাম না আয় তে বাংলাদেশী পড়ি দিব নি?

- না না ইতা কিচ্ছু অইত নায় কিচ্চু একটা বন্দোবস্ত করমু, চিন্তা করিছ না।


'চিন্তা করিছ না' বললে কি চিন্তা আসে না? চিন্তার বিষয়ে চিন্তা তো আসবেই। যদি ছেলেমেয়েদের বাংলাদেশী বলে জেলে নিয়ে যায়, যদি সরকারের ঘর থেকে নাম কেটে দেয়, তবে দেশে থাকতে দেবে? এতসব ভাবছিল মাধাই। আজ দুপুরে মাছ ধরতে যায়নি, জাল নিয়েও বসেনি , স্নানেও যায়নি , সারাদিন খুঁটিতে হেলান দিয়ে দাওয়ায়ই বসেছিল। অল্প বৃষ্টিও হচ্ছিল তাই বর্ষার মা গরম খিচুড়ি আর ছোট মাছ ভাজা আলু ভাজা করেছিল। পাতে বসে অল্প খিচুড়ি মুখে দিয়ে "গলা দিয়া নামের না" বলে পাতেই হাত ধুয়ে নেয়।


(২)

সন্ধ্যেবেলা সন্ধ্যেবাতি দেওয়ার সময় বসাইর মা হাতে ধূপতি নিয়ে এসে দেখে বারান্দায় বেঞ্চে বসে রয়েছে চিন্তিত বসাইর বাপ। " ওগো অত চিন্তা কইর' না, বড়দায় কইছইন নু কিচ্ছু একটা বন্দোবস্ত করবা। তোমার হাইপ্রেসার ডাক্তারে নু কইল' বেশি চিন্তা করতায় না , যাও যাও প্রার্থনা কর গিয়া, চিন্তা দূর হইবো।" কথাগুলো কানেই নেয় নি, বড়দার কথাগুলোই তার কান ভরে রয়েছে।


"চলো বাবা শতনাম পইড়া শুনাইমু" অনিমা এসে বাবার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল ঠাকুর ঘরে। শত নাম পড়া শুরু করল অনিমা, মিষ্টি তার গানের গলা সুর করে গায়-

জয় জয় গোবিন্দ গোপাল গদাগর।

কৃষ্ণচন্দ্র কর কৃপা করুণাসাগর।।

জয় জয় গোবিন্দ গোপাল বনমালী।

শ্রীরাধার প্রাণধন মুকুন্দ মুরারী।।

প্রতি পদের পরেই সে ধুঁয়া গায়, ফুলন দোহার দেয়। গানে ধুঁয়ার বিরতিতে অর্থাগমের বিশেষ সুযোগ পাওয়া যায়।আজ যেন গলার সুর মেলাতে পারছিল না মাধাই।

হরিনাম বিনে রে গোবিন্দ নাম বিনে।

বিফলে মনুষ্য জন্ম যায় দিনে দিনে।।

দিন গেল মিছা কাজে রাত্রি গেল নিদ্রে।

না ভজিনু রাধা কৃষ্ণ চরণার বিন্দে।।

আজ মাধাইর তাল কেটে যাচ্ছিল , কোনোমতেই তাল ধরে রাখতে পারছিল না। মাথায় ভাবনা স্রোতের মতো আসছে। "হ্যাঁ, আমি তো মিছা কাজেই দিন গত করেছি, রাত অলস নিদ্রায়, পরিবারের কথা কখনো ভাবিনি"। আজ সে কাব্যের ব্যাচার্থ নয়, ব্যঞ্জনার্থ নয়, নিজের অবস্থার সাথে অর্থ বুঝে নিচ্ছে। অনিমা শিশু মানুষ, সে বাবার দিকে খেয়াল না করে আনন্দে গেয়েই চলেছে।

কৃষ্ণ ভজিবার তরে সংসারে আইনু।

 মিছে মায়ায় বদ্ধ হয়ে বৃক্ষসম হইনু।।

 ফল রূপে পুত্র কন্যা ডাল ভাঙ্গি পরে।

 কাল রূপে সংসারেতে পক্ষ বাসা করে ।।

কেন সংসার করলাম সব কিছু ভুলে জাল আর মাছের মায়ায় অন্ধ হয়ে নিজেরই কাল নিজেই তৈরি করলাম। এলো রে কাল এনার্সি, পুত্রকন্যার ডাল বুঝি এই ঝড়ে ভাঙ্গে ?

বসুদেব রাখি আইলো নন্দের মন্দিরে।

 নন্দের আলোয় কৃষ্ণ দিনে দিনে বাড়ে।।

কেন বাপ রেখে গেলি এই সংকট দেশে? এই দেশে পদে পদে বিপদ, নাম নিয়ে বিপদ....

নন্দ রাখিল নাম নন্দের নন্দন।

যশোদা রাখিল নাম যদু বাচাধন।।

 উপানন্দ নাম রাখে সুন্দর গোপাল।

 ব্রজবালক নাম রাখে ঠাকুর রাখাল।।

 সুবল রাখিল নাম ঠাকুর কানাই।

 শ্রীদাম রাখিল নাম রাখালরাজা ভাই।।

 ননী চোরা নাম রাখে যতেক গোপিনী।

 কালসোনা নাম রাখে রাধা বিনোদিনী ।।

কানাইয়ের মত শত নয়, হাজার নয়, মা-বাপ গ্রামবাসী আদর করে এক নাম ডাকে মাধাই।যে কৃষ্ণ সে কানাই,যে  মাধব সেই মাধাই এতটুকু কি বুঝে না নিষ্প্রাণ এনআরসি? 'আমি মাধব আমিই মাধাই' নিজের এই অন্তর ব্যথা উদগীরণ না হয়ে তার'ই অন্তর দেশে লাভার মত মাথা কূটছে। -বাচ্চারা গান গেয়েই চলছিল, সে কোথাও যেন থেমে গিয়েছিল । গান তার কানে বাজছিল না, সে তার দুশ্চিন্তাস্রোতে মগ্ন।


শতনামের নাম অংশের পর মহাত্মাংশে বাচ্চারা গলা খুলে কীর্তন জুড়ে দিল।মাধাইর ঘোর ভাঙলো-

 অনন্ত কৃষ্ণের নাম অনন্ত মহিমা।

 নারদাদি দেবে যারে দিতে নারে সীমা।।

নাম ভজ নাম চিন্ত নাম কর সার।

অনন্ত কৃষ্ণের নাম মহিমা অপার।।

শত ভরি সুবর্ণ গো কোটি কন্যা দান।

 তথাপি না হয় কৃষ্ণ নামের সমান।।

- হয় না, হয় না, কিছুই নামের সমান হয় না।-

 যেই নাম সেই শ্রীকৃষ্ণ ভজ নিষ্ঠা করি।

নামের সহিত আছেন আপনি শ্রী হরি।।

এনার্সিতে নাম এলে তবেই ভারতীয়, ছেলেমেয়ে ভারতীয়। বিপদভঞ্জনকে ভক্তি করে চিন্তামনির ঘাড়ে চিন্তা ছেড়েও দুশ্চিন্তা যে নামে না। আজ সে গান গায়নি। বিছানায় উঠেছে, ঘুম আসে না।

(৩)

চোখ খোলাই রইল, চোখে সে দেখে অন্ধকার,মোরগ কুরুক্কু কুরুক্কু করে উঠল, ঝটকা লাগলো মাধাইর। রোজ ভোরের মতো বাচ্চাদের গায়ে কম্বল টেনে দিয়ে জাল আর বৈটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। অন্যদিন ঘুম থেকে উঠে প্রভাতী গায়, গান শুনে,বসাইর মার ঘুম ভাঙ্গে, লাল চা করে দেয়।সেদিন বসাইর মার ঘুম ভাঙতে দেরি হল উঠে দেখে বসাইর বাপ চলে গেছে জালে।

হাজার দুশ্চিন্তা হোক পেটের চিন্তা তো করতে হবে। সাতটার সময় বসাই এলো," আজ এত কম মাছ বাবা?" মাধাই কোন উত্তর করল না। মাছের চাঙাড়ি নামিয়ে দিয়ে নৌকা ঘুরিয়ে চলল মাছ দরিয়ায়।

সকাল দশটা নাগাদ বসাইর মা'এর মোবাইল রিং করে উঠলো, ডিসপ্লেতে নাম 'বড়দা'।

-হ্যালো বড়দা

-ছোট বউ মাধাই আইছে নি?

- না , আইজ তাইন অখনও আইছইন না।

-তারে আইলে কইও উকিলের লগে আলাপ করছি একটা এফিডেভিট করতে লাগবো, নামের এফিডেভিট দিয়া অন্য ডকুমেন্ট বার করতে লাগবো বা ডকুমেন্ট ইতাত নাম সংশোধন করলে অইবো।

-বড়দা আমি তো জানতাম কিচ্ছু না কিচ্ছু পথ বার হইব, বসাইর বাপে কাইল সারাদিন চিন্তা করছইন।

- তারে কইও চিন্তা করত না। কাইল আমরা শিলচর যাইমু ,সকালে রেডি হইয়া আইতো কইও। 

বসাইর মা সুখবরটা পেলেও বসাইর বাপে তো পায়নি। মাথার উপর সূর্য তেজে উঠছে, চিন্তারও পারদ চড়ছে। যদি নাম না আসে তবে কি সুবলের মত জেলে নেবে ছেলেমেয়েদের? এই বিপদ তাদের ঘাড়ে না এসে কেন আমাদের ঘাড়ে এলো না , এদের তো পুরো জীবনটা বাকি  -প্রেসার চূড়ান্ত, সহযোগ চড়া রোদ । নৌকার গলুই থেকে মাথা ঘুরে বরাকের ছেলে বরাকের কোলে পড়ল, হাত হাতড়েও নৌকার বাট ধরতে পারেনি।

(৪)

সুবল পাটনির কিশোর ছেলে সুবলের নৌকা চালাচ্ছিল, সুবলের পরিবারটাকে অন্নজল জুটাতে তো হবে। সে দেখেছিল নৌকা থেকে মাধাইকাকা অনিচ্ছায় পড়তে। সে তাড়াতাড়ি নৌকা নিয়ে এসে মাধাইকে তুলতে তুলতে মাধাই জল খেয়ে প্রাণ হারায়। এসব মানতেই চায় না বসাইর মা। "নদী নায়, নদী নায়, রাক্ষসী এনার্সিয়ে খাইছে বসাইর বাপরে।" -বলে গলা ফাটিয়ে কাঁদে, আকাশ ফাটিয়ে বাতাসে তরঙ্গ ছড়ায়।


অতনু রায় চৌধুরী

মধ্যবিত্তের জীবন

প্রতিদিনের মত অফিসে অফিসে ঘুরে চাকরি না পাওয়ার ব্যর্থতা নিয়ে ভিড় বাসে বাড়ি ফিরছিলাম হঠাৎ করেই চোখে পড়লো পথের ধারে কাপড়ের দোকানে একটি সুন্দর তাঁতের শাড়ি ঝুলিয়ে রেখেছে। ভাবলাম মায়ের জন্য নিয়ে গেলে মা নিশ্চয়ই খুশি হবে। সেই কথা ভাবতে ভাবতে পকেটে হাত দিতেই দেখি গাড়ি ভাড়াটা ছাড়া আর কোনো টাকা নেই আমার কাছে। খুব খারাপ লাগলো, নিজের কাছে নিজেকেই অনেক তুচ্ছ বলে মনে হতে লাগলো। এই ২৫ বছর বয়সে শিক্ষীত হয়েও আজ আমি বেকার। অন্য দিকে পরিবারের আর্থিক অবস্থাটাও বেশি ভালো যাচ্ছে না। জমানো টাকা যা ছিল তা দিয়ে আমার মা বাবা আমার ইঞ্জিনিয়ার হবার স্বপ্নটা পূরণ করল। তাঁরা ভেবেছিল পড়াশোনা শেষে আমার একটি ভালো চাকরি হবে। তারপর দিদির বিয়েটা দিয়ে দেবে । কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ভেবে রাখা সবকিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেলো। আর অন্যদিকে পাএ পক্ষের যৌতুক দেওয়ায় অক্ষম হবার কারণে দিদির বিয়েটা বারবার ভেঙ্গে যাচ্ছিল। আজকাল দিদিও খুব চুপচাপ থাকে,  আমারও বাবার সাথে কথা বলতে খারাপ লাগে কারন আজ আমার কারনেই পরিবারের এমন অবস্থা হয়েছে হয়তো। বাড়িতে এখন মায়ের কাছেই সব কথা প্রকাশ করি। যদিও মায়ের মনেও ভীষণ কষ্ট তবুও মা হাসিমুখে থাকে ।


ভাবলে চোখে জল আসে আজ থেকে প্রায় পাঁচ বছর আগেও আমাদের পরিবারটা ভীষণ হাসি খুশি ছিল। রোজ ভোরে বাবা আমাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে দিত পড়তে বসার জন্য । তারপর সকালে মা বাবা আমি দিদি আর ঠাকুরমা একসঙ্গে টিফিন খাওয়ার জন্য বসতাম। দিদিকে বেশী টিফিন দিয়েছে এই নিয়ে প্রায় দিনই দিদির সাথে আমার ঝগড়া হতো। তখন ঠাকুরমা বলতো দিদিতো শ্বশুর বাড়ি চলে যাবে তাই দিদিকে ইকটু বেশি দেওয়া হয়েছে । তখন দিদি বলত দিদি নিজে যেদিন চাকরি পাবে সেদিন দিদি বিয়ে, শ্বশুর বাড়ি এসব নিয়ে ভাববে । কিন্তু সময়ের এমন খেলা দিদির চাকরিটা হয়েও হলো না । তখন দিদির মন ভাঙ্গলেও দিদি মনে করেছিল আমি পড়াশুনা শেষ করে নিশ্চয়ই একটি চাকরি পাবো। 

আসলে দিদি আমায় খুব ভালোবাসতো আবার সময়ে সময়ে শাসন ও করত । যখন বিকেল হলে খেলার মাঠে চলে যেতাম দিদিই আমাকে সন্ধ্যে হবার আগে বাড়িতে ডেকে নিয়ে আসত এবং রোজ রাতে আমি লেখাপড়া করছি কী না সে খেয়াল দিদিই রাখত। রাতে খাওয়া শেষ হয়ে গেলে ঠাকুরমার কাছ থেকে গল্প শোনা এটা আমার আর দিদির প্রতিদিনের অভ্যাস ছিল। ঠাকুরমা চলে যাবার পর সেই অভ্যাসটা ধীরে ধীরে বদলে গেল। আমি আর দিদি গল্প শুনতাম না ঠিকই কিন্তু গল্পের বই পড়তাম রোজই। তখন ধীরে ধীরে গল্পের বই পড়াটা আমাদের অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল ।

ঠাকুরমার ঝুলি, ব্যোমকেশ, ফেলুদা এসব নানা গল্পের বই পড়েছিলাম। গল্পের বই পড়তে পড়তে আমি আর দিদি দু'একবার ভেবেছিলাম আমরা দুজনে মিলে একটি বই লিখবো কিন্তু তা আর হয়ে উঠলো না । এইভাবে দিনগুলো কাটতে কাটতে ধীরে ধীরে যতই পারিবারিক সমস্যাগুলো বাড়তে লাগলো ততই গল্পের বইয়ের সাথে আমার দূরত্বটা বেড়ে গেল। সত্যি কথা বলতে এখন আর গল্পের বইয়ের মাঝে নিজেকে হারিয়ে দিতে পারি না । প্রতি মুহূর্তে মাথায় ঘুরে নানারকম চিন্তা । এখন মনে হয় এইভাবেই হয়তো প্রতিটি মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনগুলো কাটে, বুক ভরা স্বপ্ন নিয়ে হাসিমুখে শূণ্য পকেটে হাঁটে ।

দীপা সরকার

শ্যামবর্ণা

দেখো সোহম দেখো, এভাবেই  প্রতিটা মেয়ে দেখিয়ে দেবে তারা যোগ্য, ভীষণরকম ভাবে যোগ্য।

শুধু তোমাদের মত কিছু লোক সৌন্দর্যের সংজ্ঞা জানো না বলেই আজকে আমার মত মেয়েগুলো অত্যাচারিত, লাঞ্চিত হয়।

তবে দিন ফিরছে এমন ভাবেই দিন ফিরছে...

শুচরিতা সান্যাল, আজকের ইভেন্টের বিজয়ী। সানন্দা ২০২৩...

সৌন্দর্যের প্রতিযোগিতায় আজকে এই শ্যামবর্ণা মেয়েটাই এগিয়ে। যাকে হয়তো ছোটবেলায় আমার মতোই হাজার কথা শুনতে হয়েছে তার এই গায়ের রং নিয়ে।

সমাজ আমাদের মত কালো মেয়েদের বারবার টেনে হিঁচড়ে পেছন টেনে ধরে রাখে। এগুতে চাইলেই মনে করিয়ে দেয়, কালো ত্বকে আবার সৌন্দর্য কি?

যেমন তুমি আমার চোখে মুখে কোনোকালেই সৌন্দর্য খুঁজে পাওনি ঠিক তেমন।

বিয়ের পর থেকে এ বাড়ির প্রত্যেকটা লোক আমার যোগ্যতা বিচার করেছে আমার গায়ের রঙে।

তুলনা থেকে তাচ্ছিল্য কোনোটাই বাদ যায়নি যা ধেয়ে আসেনি আমার উপর।

তোমাদের বারবার বোঝাতে চেয়েছি মানুষের সৌন্দর্য কখনোই তার চামড়ায় নয়, সৌন্দর্য থাকে দেখার চোখে।

যা তোমাদের মত মানুষের চোখে নেই।

যদি থাকতো আমার মত মেয়েরাও তোমাদের চোখে সুন্দরী হয়ে ওঠতো।

তবে শুচরিতা সান্যালের আজকের এই জয়, কিছু মানুষের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো, শ্যামবর্ণারাও সুন্দর।

এই জয় শুধু একা শুচরিতা সান্যালের নয়, এই জয় প্রতিটা শ্যামবর্ণা মেয়ের।

এভাবেই দেখার নজরটা বদলে গেলে ঠিক এমন ভাবেই জিতে আসবে প্রতিটা শ্যামবর্ণা তাদের যোগ্যতায়, তাদের কাজে।

তাদের কেউ আর অযোগ্য তকমা দিয়ে পিছিয়ে রাখতে পারবে না, কোনোভাবেই না।

রীতা চক্রবর্তী ( লিপি )

বর্ষা রাতের অতিথি

বর্ষাকালের সন্ধে। সারাদিন অবিশ্রান্ত বৃষ্টির পর মেঘ কেটে আকাশে উঁকি দিয়েছে এক ফালি চাঁদ । শেষ সন্ধের ভেজা বাতাস ভারী হয়ে আছে কামিনীফুলের গন্ধে । দূরে একটি লাল রঙের জীর্ণ মলীন দালান বাড়িতে সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বলে উঠল। ওই রংচটা জরাজীর্ণ বাড়িটির একমাত্র বাসিন্দা বিমলা দেবী তুলসী তলায় বাতি জ্বালিয়ে কাঁসর ঘন্টা বাজিয়ে ধীরে ধীরে ঝুলন্ত ব্যালকনিতে এসে ইজিচেয়ারে বসে পড়লেন। রুটিন মাফিক বিমলা দেবীর সর্বক্ষনের সঙ্গী মালা একটু বাদেই খানিক কুচো নিমকি সহ এককাপ চা নিয়ে এলো। মালাকে দেখেই তিনি বললেন, ' শরীরটা বড় ম্যাজম্যাজ করছে আজ, চা পানের একদম ইচ্ছে নেই রে মালা'! মালা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল মধুমেহ রুগী বিমলা দেবীর জন্য। ও দু'পা এগিয়ে এসে ওনার কপালে হাত রেখে বললো, ' কী হয়েছে জ্যাঠাইমা? তোমার শরীর খারাপ করেছে? কই দুপুরে তো তুমি কিচ্ছুটি বললেনা?  দাদাবাবুকে ফোন করব? 

— না রে কিচ্ছু হয়নি আমার। এমনি ঝড় বাদলার দিনগুলো আমায় বড্ড উদাস করে দেয়। উৎকন্ঠিত মালা স্বগোক্তির মতো গজগজ করতে করতে বললো, " কী জানি বাপু, দাদাবাবুকে ফোন করব বললেই জ্যাঠাইমা সুস্থ হয়ে ওঠেন। এদিকে দাদাবাবু বলে গেছেন, শরীর খারাপ হলেই যেন তাকে খবর দেওয়া হয়। বিমলা দেবী বললেন, 

—শরীর নিয়ে এত ভাবিস না তো মালা! তুই যাবার সময় বাইরের লাইটটি বন্ধ করে দিস, আলোটা বড্ড চোখে লাগছে। মালা বললো, তবে আমি এখনি রাতের রান্না চড়িয়ে দিচ্ছি। রান্না হয়ে গেলে তুমি আজ তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়বে। এই বলে দিলুম। 


         নিকষ  আঁধারে বসে আছেন বিমলা দেবী। তিনি জীবনস্রোতে ভাসতে ভাসতে অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে এখানে এসে পৌঁছেছেন। এখন তাঁর অফুরন্ত অবকাশ। বসে বসে দেখছেন সময়ের সাথে সাথে বাড়িটিকেও বার্ধক্য এসে গ্রাস করেছে।  ওনার নিজের মতই বাড়াটিও আজ রঙহীন জরাজীর্ণ অশীতিপর হয়ে আছে। পলেস্তারা খসে পড়ছে নানা স্থানে। হবে নাই বা কেনো! এ বাড়ির বয়স তো কম নয়! অনিকেতের জন্মের পূর্বেই গড়া হয়েছিল বাড়িটি। একসময় ঘরগুলো গমগম করত লোকজনের আনাগোনায়। আর আজ...! ভেবেই তিনি একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। ধীরে ধীরে মন ডুব দিল স্মৃতির অতলে।

         সব তো ঠিকঠাকই চলছিল। বিয়ের পর বিমানবাবুর মধ্যে অস্বাভাবিকতা কিছুই ছিল না। পরিবারের প্রতি ছিলেন দায়িত্বশীল। দুহাতে রোজগার করেছেন আর খরচ করেছেন তারও বেশি। তখনই এই বাড়িটি বানিয়ে ছিলেন বিমানবাবু। বাড়ি ভর্তি লোকজন। শশুড় শাশুড়িকে নিয়ে ছিল ওনাদের ভরা সংসার। এরপর অনিকেত এলো। বছর পাঁচেক বাদে শুরু হলো নকশাল আন্দোলন, আর বিমলা দেবীর সংসারের সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেলো।

         

               বিমলা দেবী লক্ষ্য করছেন কিছুদিন থেকে বিমান বাবু যখন ব্যবসা পত্তর গুটিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন তখন সঙ্গে দু'তিনজন অচেনা লোকও তাঁদের বাড়ি আসেন। তারপর একটি বন্ধঘরে কিছুসময় তাঁদের গুজুর গুজুর ফুসুর ফুসুর চলে। কিছুসময় বাদে ওই অপরিচিতরা দমকা হাওয়ার মতো বেড়িয়ে উধাও হয়ে যান। বিমানবাবুকে জিজ্ঞেস করলে কোনো সদুত্তর পাননা বিমলা দেবী। কানাঘুষা শুনতে পেলেন, তিনি যেন কী সব আন্দোলনে জড়িয়ে যাচ্ছেন। ধীরে ধীরে ব্যবসাপত্তর লাটে ওঠার উপক্রম হলো। তিনি সারাদিন ভবঘুরের মত ঘুরে বেড়ান । ঘরে যতক্ষন থাকেন ততক্ষন অস্থির হয়ে পায়চারী করেন নয়তো গুম মেরে বসে থাকেন। এতে বিমলা দেবীর হয়েছে মহা বিপদ। 

        তখন সত্তরের দশক চলছে।  নকশাল আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠেছে বঙ্গভূমি। আন্দোলন যত গড়াচ্ছে ততই শহর জুড়ে বাড়ছে বোমাবাজি,খুন জখম রাহাজানি। মানুষ ঘর থেকে বেরোতে ভয় পাচ্ছে। চারিদিকে থমথমে পরিবেশ,কেমন যেন একটা আতঙ্ক গ্রাস করে আছে। এমনি এক বিপন্ন দিনে অঝোর বর্ষার বিষন্ন সন্ধ্যায় একটি লোক এসে দরজায় খুট্ খুট্ আওয়াজ করল আর বিমানবাবু সেই যে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন আর কোনদিনই ফিরলেন না...


                     দু'দিন থেকে অঝোর বৃষ্টি সঙ্গে দমকা হাওয়া। কাজ না থাকলে লোকজন তেমন বাইরে বেরোচ্ছে না। তার উপর সদ্য সমাপ্ত হয়েছে পঞ্চায়েত ভোট। ভোটের ডামাডোলে শহরও থমথমে হয়ে আছে। বিমলা দেবী শুনশান পথে দৃষ্টি মেলে বসে আছেন। অতীত তাঁকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে।  হঠাৎ লোডশেডিং হয়ে গেল। বৃষ্টির তোড়ে ল্যাম্পপোস্টের আলোগুলো এতক্ষণ কেমন ঝাপসা ফিঁকে হয়ে জ্বলছিল কিন্তু এখন একেবারে ঘুটঘুটে অন্ধকার।   ক'দিন থেকে ইনভার্টারটিও খারাপ হয়ে আছে। তিনি মালাকে ডেকে বললেন, ঘরে একটি মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখতে। এই বৃষ্টিমুখর দিনগুলোতে তিনি অতীতের হাতছানি দেখতে পান আর স্মৃতিমেদুর হয়ে ওঠেন। আজো তার অন্যথা হয়নি।

                     হঠাৎ খুট্ খুট্ খুট্ খুট্... সদর দরজায় কেউ যেন কড়া নাড়ছে। বিমলা দেবী কান পেতে শুনলেন। আবার অস্থির একটি খুট্ খুট্ খুট্ খুট্ শব্দ। তিনি   ধীরে ধীরে উঠে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। মনে মনে ভাবলেন নিশ্চয় পাশের বাড়ির কেউ হয়তো কোন প্রয়োজনে এসেছে, নাহলে এই দুর্যোগের রাতে কেউ ঘরের বাইরে... আবার যেন একটু জোরেই খূট্ খুট্। তিনি এস্ত পায়ে গিয়ে দরজাটি খুলে দিলেন আর ঝড়ের বেগে একটি ছেলে ঘরে প্রবেশ করেই আবার দোরটি  দিয়ে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বিমলা দেবীর পায়ে লুটিয়ে পড়ে বলল, " মা আমাকে আপনি বাঁচান,ধরতে পারলে ওরা আমায় মেরে ফেলবে " বলে কাঁদতে লাগলো। অভিজ্ঞ বিমলা দেবী ছেলেটিকে ভালো করে যাচাই করে দেখলেন, ভদ্রলোকের ছেলে বলেই মনে হল। বয়স আনুমানিক পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে এবং মুখটি দেখে নিরীহ বলেই মনে হচ্ছে। তিনি এবার বললেন," তুমি কে বাছা! কোথা থেকেই বা এসেছো, একটু খুলে বলো দিকিনি!" ছেলেটি বললো, সম্প্রতি যে ভোট হয়েছে সেখানে ভোট গননার শেষে ওদের দল পরাজিত হয়েছে আর বিজয়ী দলের ছেলেরা আনন্দে উল্লাস করতে করতে ওকে একা পেয়ে হাতে লাঠি ছুঁড়ি নিয়ে ওর পিছু নিয়েছে। ধরতে পারলে ওকে  একেবারে প্রাণেই মেরে ফেলবে।   উনি যদি দয়া করে ছেলেটিকে একটু আশ্রয় দেন তাহলে সে এবারে হয়তো প্রাণে বেঁচে যাবে। তখনি বিমলা দেবী বাইরের গেইটে কিছু লোকের হৈ হট্টগোল শুনতে পেলেন  এবং মনে মনে কিছু চিন্তা করে তাঁর মুখটি করুন হয়ে ঊঠল। আবার অতীত এসে তাঁকে জাপটে ধরল। মনে হলো , ঠিক এমনি করেই হয়তো বিমান বাবু কারো দ্বারে গিয়ে একদিন আশ্রয় ভিক্ষা চেয়েছিলেন এবং আবেদন নামঞ্জুর হওয়াতে  হয়তো বেঘোরে তাঁর প্রাণটাই দিতে হয়েছে! তিনি ভেবে ফেললেন,না যে করেই হোক ছেলেটিকে বাঁচাতেই হবে। ততক্ষণে হৈ হট্টগোল এসে দরজায় হামলে পড়েছে এবং চিৎকার করে বলছে, 'মাসীমা দরজা খুলুন, আমরা আপনার ঘর সার্চ করব'। তিনি তড়িঘড়ি ছেলেটিকে ভেতরের ঘরে নিয়ে একটি বড় ওয়াড্রোবের দরজা খুলে দিয়ে ছেলেটিকে সেখানে ঢুকিয়ে আবার বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে দিলেন। এরপর সদর দরজা খুলে বজ্র কঠিন কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা কে? কী চাই আপনাদের"? দলের ভেতর থেকে সমস্বরে চিৎকার উঠলো,আমরা আপনার বাড়ি সার্চ করব'। আরো বললো, ওরা দেখেছে,শত্রু দলের একজন এই বাড়িতে এসে লুকিয়ে পড়েছে। বিমলা দেবী বললেন যে তিনি এখানে কাউকে প্রবেশ করতে দেখেননি কিন্তু ছেলেগুলো লাঠিসোটা নিয়ে গোটা বাড়িটাই টর্চ জ্বালিয়ে খুঁজতে খুঁজতে না পেয়ে দু' তিনজন ঘরে প্রবেশ করে গোটা ঘরে তল্লাসি শুরু করল। বিমলা দেবী মনে মনে  দুগ্গা দুগ্গা জপতে লাগলেন। তিনি আরচোখে বখাটে গুলোর গতিবিধি জরিপ করছেন, দেখলেন একটি ছেলে ঘরের কোণের আলমারির হাতল ধরেও টানাটানি করলো,বন্ধ দেখে আর বিশেষ কিছু না বলে অন্য ঘরে চলে গেল। এভাবে কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর ওরা শীকার খুঁজে না পেয়ে আবার রাস্তায় নেমে পড়ল। ধীরে ধীরে ওদের হট্টগোল দূরে মিলিয়ে যেতেই তিনি ছেলেটিকে বাইরে বের করে আনলেন এবং এককাপ গরম দুধ খাইয়ে ওর সঙ্গে গল্প জুড়ে জানতে পারলেন, ও মাস্টার্স করেছে কিন্তু শত চেষ্টা করেও একটা চাকরি জুটাতে পারেনি আজো। এদিকে বাড়িতে মা ও একটি ছোটবোন ও একটি ছোটভাই ওর ওপরই নির্ভরশীল। তাই পয়সা রোজগারের আশায় সে বিপক্ষ দলের হয়ে কিছু কাজ করছিল। কিন্তু সেই দল হেরে যাওয়াতে শাসক দলের আস্ফালনে সত্যিই এবার সে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। সব শুনে বিষন্ন বিমলা দেবী ছেলেটিকে বললেন, আঁধারে না বেরিয়ে আজ রাতটি ওখানেই থেকে যেতে। তিনি মালাকেও ডেকে বললেন এক কৌটো চাল যেন বেশি রান্না হয় আজ।

                     পরদিন ভোরের আলো ফুটতেই ছেলেটি তার জীবনদায়ী মাকে প্রণাম করে আশীর্বাদ চেয়ে নিয়ে তার জন্মদাত্রী মায়ের কাছে যাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল। তিনি ছেলেটির মঙ্গল কামনায় দু'হাত কপালে ঠেকিয়ে বললেন দুগ্গা দূগ্গা...ছেলেটি রওয়ানা হয়ে গেল তার গন্তব্য পথে।

সংগীত শীল

শ্রাবণের এক দুপুর

ভরদুপুর। খেয়ে শুয়েছিলাম। আজকাল শুয়ে বসে দিন কাটছে। এইসবে একেবারেই অভস্ত্য নই, তবুও নিরুপায়। 

ঠাম্মা ভাত মেখে দেয়। সাহিতা স্নানের জল তুলে রাখে। সকলে দেখেশোনে রাখছে।

কিছুক্ষণ পর পর দাদু এসে জিজ্ঞাসা করে— “সঙ্কা(ডাকনাম) শরিল ভালা লাগের না?”(আঞ্চলিক ভাষায় জিজ্ঞেস করছিল শরীর ভাল আছে কি-না।)

অন্যদিকে মুখ করে বলি— “আমি ঠিক আছি।”

দাদু আর কিছু বলেন না। চেয়ে থাকেন। এভাবে চেয়ে থাকেন বলেই আমার কষ্ট হয়। মনের মধ্যে জমাট বাঁধে পাহাড়। নির্জনতার সাথে সন্ধি আর একঘেয়েমি ভাব।

উদ্ভট সব ভাবনাচিন্তার মাঝে শোনা যাচ্ছে হইহুল্লা। ছেলেরা মাঠে খেলতে এসেছে। আমার ছোটবেলাও কেটেছে সেই মাঠে।

এরকম দুপুরে মা দরজা দিয়ে রাখতেন। আমি খেলতে চলে যেতাম বলে। খেলতাম না; খেলা দেখতাম। বল আসলে ছুটতাম বলের পেছনে।

গতিশীল জীবনে আমরা এগিয়ে গেছি। জড়িয়ে আছে শুধু মোহনীয় মুহুর্ত।

টিনের ছাদে সজোরে শব্দ হল। গেটের বাইরে দুয়েকজনের ফিসফাস কথা শুনা যাচ্ছিল। বাইরে গিয়ে দেখলাম একটি বল উঠোনে গড়াগড়ি খাচ্ছে। মনে হল আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে, পুচ্ছ তুলে নাচছে!

দাদু গেট খুলে দিল। ওরা বলটি নিয়ে চলে গেল।

মনে হল যেন ছোট্ট আমিটা তাদের মাঝেই আছি।

দীপান্বিতা পান্ডে দীক্ষিৎ

একটি ছেলের আত্মকথা

তখন আমি বছর তিনেক মায়ের আঁচল ছেড়ে পা রাখলাম নূতন অধ্যায়ে ৷ ২০০৯ এর এপ্রিল প্রথম স্কুলে পদার্পন | আমি আর মা অজানা  এক রাজ্যে প্রবেশ করলাম মনে কি রকম হচ্ছিল কিছুই বুঝতে পারছিলাম না ৷ প্রথম পাড়ি অদেখা কত দৃশ্য দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম স্কুলের সামনে ৷ গেটের সামনে মেলার মতো মনে হল কি হচ্ছে কিহবে ৷ কেউ কাঁদছে কেউ মায়ের কোলে কেউ বাবার হাত ধরে নানা রকমের উৎকণ্ঠা মায়েদের মুখে ৷

সাহসী ছেলের মতো ঢুকে গেলাম স্কুলের মধ্যে তারপর সকলকে দেখে আস্তে আস্তে ভালো লাগতে লাগলো ৷ মা গাছের তলায় বসে থাকলো ছুটির পর আমাকে নিয়ে বাড়ি আসবে ৷

এরপর শুরু হল নিত্যদিনের অভ্যাস ।

রাজেশ কাকুর গাড়িতে প্রথম কিছু দিন যেতে লাগলাম মা বসে থাকতো৷ তারপর আস্তে আস্তে ভয়টা কাটতে লাগলো ৷ এমনি করে আমি একটু একটু করে বড় হতে লাগলাম ৷ লেখাপড়া শুরু হল ম্যাডাম স্যারদের সাথে কখনএকটা সুইট রিলেশন গড়ে উঠেছিল বুঝতে পারিনি ৷ একটা দিন স্কুল ছুটি থাকলে বন্ধুদের জন্য মন কেমন করতো৷ এই ভাবে একটার পর একটা জীবনেব সিঁড়িতে উঠতে লাগলাম ৷ ভালমন্দ অনেক সুখ স্মৃতি নিয়ে বড় হতে লাগলাম যতবড় ততচাপ তত নিজেকে বুঝতে শেখা ৷

বুঝতে বুঝতে এখন অনেকটায় আগালাম  এখন শুধু সামনের দিকে তাকানো, পিছন ফিরে দেখার নেই অবসর ৷ রেজাল্ট বেরোনোর পর প্রাইজ গুলো যখন হাতে পেতাম মনটা আনন্দে ভরে যেত ৷ অ্যানুয়াল প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশন সেরিমনির দিনটার আনন্দ ই আলাদা স্বাদের ৷ সারা বছর চেয়ে থাকতাম ঐ দিনটার জন্য ৷ এভাবেই ওয়ান টু থ্রি ফোর এর দরজার দিকে এগোতে লাগলাম ৷

একদিন স্কুল থেকে কৃষ্ণ সাজলাম মা বাবা দিদি দাদা বড়রা সাজিয়ে দিলেন খুব মজা পাচ্ছিলাম ৷ স্কুল সব কম্পিটিশনে নাম নিয়ে নিত ৷ সব গুলোতে পার্টিসিপেট করতে পেতমনা সময়ের অভাবে ৷ তবে ডিভোশনাল ব্যাপারটা মনে খুব নাড়া দিত ৷ স্পিরিচুয়াল পরীক্ষযায় প্রথম স্থান পাওয়াই মা বাবা স্যারদের সাথে প্রাইজ আনতে নরেন্দ্রপুরে গিয়েছিলাম ৷ ২০১৭ সেদিনের আনন্দ টা ছিল একেবারেই অন্য রকমের ৷ মনটা উদার আদর্শ জ্ঞানে ভরপুর হয়ে গিয়েছিল ৷

তারপর নিয়মিত চলতো নানা রকমের পরীক্ষা কম্পিটিশন, অংশগ্রহণ করে বেশ ভালো লাগতো ৷ এভাবে কখন যে এতগুলো বছর পার হয়েগেল কিছুই বুঝতে পারলাম না ৷ আর মাত্র কয়েকটা মাস তারপর স্কুল লাইফের শেষ অধ্যায় একটা নস্টালজিক এ্যালবাম হয়ে স্মৃতির পাতায় উজ্বল হয়ে রয়ে যাবে ৷ এতগুলো বছর  বন্ধুদের সাথে উঠাবসা দুঃখ সুখের মুহুর্তগুলো কাটানো ৷ ম্যাডাম স্যারদের নিয়ম শাসন ভালবাসা সব মনের আকাশে বন্দী হয়ে ধ্রুবতারার মতো জ্বলজ্বল করে থেকে যাবে সারা জীবন ৷ যখন খুশি এগুলোর স্বাদ আর ফিরে পাবনা কোনোদিন ৷ ছোটো ভাই বোনদের প্রতিদিনের দেখা আর দেখাতে পাওয়া যাবেনা ৷ স্কুলের অ্যাঙ্কেল অ্যান্টিদের ও খুব মিস করবো , বিশেষ করে স্কুলের ঘন্টা কে খুব মিস করবো ৷ ছুটির পর স্কুলের গেটের সামনে আলুকাটা ফুচকা আইসক্রিম চটপটি মামার চাটনি এগুলোর স্বাদ তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াবে অনুক্ষণ ৷ আর বাসের আঙ্কেলদের খুব মিস করবো ৷ প্রীন্সিপাল স্যার কে সেই রূপে তো আর দেখতে পাবোনা ৷ দেখতে পাবোনা নানা রঙের স্কুলটাকে খুব মিস করবো মিস করবো সবকিছুকে ৷ বাথরুম যাওয়ার আছিলায় বন্ধুদের সাথে গল্পের বাহানা ও আর পাবোনা ৷ এখন মনে হচ্ছে বড় তাড়া তাড়ি বড় হয়ে গেল ৷ যদি ছোটো হয়ে থেকে যেতাম তাহলে খুব ভালো হতো৷ এখন আমি এমন জায়গায় দাঁডিয়ে আছি যার সামনে খোলা হাজার দুয়ার কোনটা দিয়ে বেরোনো যায় সেটার অপেক্ষায় ৷