ভ্রমনকাহিনীঃ থাইল্যান্ড
পাসপোর্ট
,,,,,,,, অস্বীকার করি না গুগল, ইউটিউব অনুসন্ধান করে শুদ্ধতর ভ্রমণবিদ্যা অর্জন করা যায় । তবে, চাক্ষুষেরও একটি আনন্দ আছে। কুয়াশা স্প্রে, জিরাফের জিব, ঢেউ সাঁতার, স্কাই স্কেপার, নিয়ন্ত্রিত ভেপু , মেঘের পোলাপান গোচরে এসেছে।
২৩/৬
,,,,,,,, আকাশ বাতাস নদী সাগর পাহাড়, নতুন মানুষ, চলন বলন, আচার সংস্কৃতি খাদ্যাভ্যাস দেখতে কার না ভাল লাগে। আমারও ভাল লাগে। সে লক্ষ্যে দেশান্তর পাসপোর্ট প্রস্তুত করেছিলাম প্রায় সাত বছর আগে, কিন্তু সুযোগ এল ২০২৩ জুনের শেষ দিকে। এর আগে ভারত ভ্রমন হয়েছে দুএকবার, প্রতিবেশী রাষ্ট্রেও গিয়েছি। কিন্তু বিদেশ! প্রথমবার। বিলুপ্ত প্রায় পশুপাখি,প্যারাসুট উড়ান, সমুদ্রদ্বীপ, ডুবুরি, ডুবোজাহাজ, জলঝাপ, চড়াই উৎরাই, নিশিসৈকতরূপ চোখের সামনে অপূর্ব চিত্তাকর্ষক। আবার ওতে নিজে জড়িয়ে গেলে বুঝা যায় অভিযানগুলি তত সহজ নয়। এর জন্য চাই মানসিক প্রস্তুতি, সামর্থ্য! শক্ত হৃদয় ও স্বাভাবিক রক্ত চাপ। রাত আটটায় আকাশ থেকে তারাময় কলকাতা দেখতে দেখতে দমদম পৌঁছে গিয়ে সবার আগে যে কাজটা করতে হল তা, টাকা ভাঙিয়ে 'ভাট'(থাইল্যান্ডী মুদ্রা) নেওয়া। একটা নির্দিষ্ট পরিমান ভাট না থাকলে ভিসা পাওয়া যায় না। কলকাতা 'সানসিটেল' হোটেলে সব ব্যবস্থা থাকায় খুব সুবিধা হল। পরদিন ঐ হোটেলেই প্রাত:রাশ সেরে বিদেশ যাত্রা শুরু।
২৪/৬
,,,,,,, নেতাজী সুভাষ বিমানবন্দর থেকে সুবর্ণভূমি! বিমান বন্দর, মানে কলকাতা থেকে থাইল্যান্ড পর্যন্ত আড়াই ঘন্টা উড়ানের মাঝে যখন ভোজ ও ঠান্ডা পানীয় জোগান দেয় তখন সময়টা সহজেই কেটে যায়। জানালা দিয়ে আকাশের সংসার, মেঘের পোলাপান দেখতে বেশ ভাল লাগে। কেউ সাদা, কেউ নীল, কেউ সোনালী, কেউবা আধা-আধি। আবার উড়োজাহাজ উঠা-নামার সময়, ঘরবাড়ি জমিগুলো বড় থেকে ছোট হওয়া, মানচিত্র চিহ্নিতকরন (ম্যাপ পয়েন্টিং) এর মত লাগে আর রাতে বিদ্যুৎ বাতির মিটমিটি আলো দেখে মনে হয় যেন তারামন্ডল দেখছি। তিরোপতি পাহাড় থেকে রাতে নিচে নামার সময়ও দৃশ্যটি দেখা যায় (চেন্নাই)।
,,,,,,,,,,, আমাদের দলের প্রায় চল্লিশ জন আপণিক যখন বিমান বন্দর ছেড়ে প্রিন্স কোং আয়োজিত শীততাপ বাসে উঠি তখন আমাদের গন্তব্য থাইল্যান্ডের বিখ্যাত শহর 'পাট্টায়া'/ পাত্তায়া/ Pttaya। বাসে পথপ্রদর্শিকা যাকে পেলাম সে থাইভাষী কুমারী "অ্যামী", সাথে একজন অনুবাদকও ছিলেন, সন্দীপ দা। অ্যামী প্রথমে ইচ্ছুক যাত্রীদের সাতশটাকায় লোকেল সিম বিতরণ করলো। অ্যামী যথেষ্ট সময়নিষ্ঠ, ভদ্র ও ইংরেজি পটু। তাঁর হাতে একটা ফোল্ডিং ফলক থাকতো, তাতে লেখা 'ক্লাসিক টাইলস'। ভিড়ভাড় এলাকায় সে ওইটি উঁচু করে তুলে রাখে ফলে কেউ দিশা না পেলে দূর থেকে ক্লাসিক টাইল লেখা দেখে এগিয়ে গেলে সবাইকে পেয়ে যায়। তাঁর থেকে জানলাম ভারত সম্রাট অশোকের প্রেরণায় থাইল্যান্ডে বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃত ভাষা প্রবেশ করেছে। সে ভাষা থেকেই বিমান বন্দরটির নাম 'সুবর্ণভূমি'। গর্ববোধ হল। তত সুবর্ণখনি না থাকলেও মূল্যবান পাথর খনি আছে। অ্যামী আমাদের একটি বৃহদাকার অলঙ্কার বিপনি বিতানে নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে একটি যাদুঘর ছিল। তাদেরই ব্যবস্থাপনায় টয়ট্রেনে করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নমুনাকর্ম দেখালো: কিভাবে খনি থেকে হীরা পান্না নীলা উত্তোলন পরিশোধন বাছাই কাটাই নির্মান করা হয়। প্রায় ২০০ থেকে ২০ লক্ষ টাকা দামের অলঙ্কার রয়েছে বিপনিটিতে। নাম বিস্মৃত। সমবিভ্যাহারীদের কেনাকাটা শেষ হলে, সেখান থেকে বেরিয়ে ' ট্রাইমিটে'একটি বুদ্ধমন্দির দেখলাম, যার ভিতর নিরেট স্বর্ণের বুদ্ধমূর্তি রয়েছে। ওজন ৫,৫০০ কেজি। (স্থাপিত তেরোশ' শতাব্দী) আকারে বিশ্বসেরা না হলেও মূল্যমানে সেরা । অ্যামী বলল, বার্মা বর্গীলুটের সময় বহু কষ্টে সিমেন্ট কাদা দিয়ে ঢেকে রেখে একে বাঁচানো হয়েছিল।
,,,,,,,,,, এদেশে মোট জনসংখ্যার ৯০ ভাগ বৌদ্ধ, দশ ভাগ হিন্দু, মুসলমান, খ্রিষ্টান ও অন্যান্য। চাল আখ আলু!(যা থেকে ক্যামিকেল হয়) প্রধান ফসল। পর্যটন ও ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রাংশ আয়ের বড় উৎস। চৈনিক এবং ভারতীয় পর্যটকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। সত্তরটির ওপরে সুদৃশ্য নগরী আছে। আছে আরামের সাগর সৈকত ও ভারতীয় খাবারের হোটেল। বিভিন্ন দেশের হোটেলও আছে। রাজতন্ত্র শেষ হয়েছে বেশিদিন হয়নি। আশ্চর্যজনক ভাবে রাজাদের উপাধিতে হিন্দু প্রভু রামচন্দ্রের মিল পাওয়া যায়। যথাঃ রামা এক, দুই, তিন। শেষ রাজা রামা ১০, 'ভাজিরালংকর্ন'। রাজতন্ত্র উঠে যাওয়ায় বর্তমানে জার্মানে থাকেন তিনি। তার রানী 'সুথিদা' একজন বিমানবালা। রাজারা নিজেদের সূর্যবংশ জাত বলে মনে করেন। তাদের ভগবান বুদ্ধও সূর্য বংশীয় বলে মানেন। খানে খানে রাজ সম্পত্তি ভাড়া দেওয়া আছে। জুলাইয়ে রাণীমার জন্মদিন, তাই প্রত্যেকটি সম্পত্তির সামনে তার বড় ছবি লাগানো হয়েছে । ভারতীয় একশ টাকায় সেখানে প্রায় চল্লিশ 'ভাট'(স্থানীয় মুদ্রা) পাওয়া যায়। সেদিক দিয়ে দেখলে আমাদের টাকার মান কম। আর ঘড়িসময়ও দেড় ঘন্টা দ্রুত। অর্থাৎ আমাদের রাত আটটা থাইল্যান্ডে রাত সাড়ে নয়টা। সারাদিন সারারাত 'সেভেন ইলাভেন' নামে ন্যায্যমূল্যের একটি দোকান খোলা থাকে। কিছুদূর পর পর এই দোকানটি পর্যটকদের জন্য অতিশয় নিরাপদ ও শীততাপনিয়ন্ত্রিত। ব্যবহারিক নব্বই শতাংশ সামগ্রী ঐ দোকানে পাওয়া যায়।
২৫/৬
,,,,,,, পাট্টায়ার সেকেন্ড রোডে আমরা যে হোটেলে উঠেছিলাম তার নাম 'গোল্ডেন বীচ হোটেল'। ১১তলা, প্রায় এক হাজার শয্যা। পরিপাট্যে ভরা হোটেলে রাতের খাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়ি পাট্টায়া শহর নিশিভ্রমনে। নির্দেশিকা অ্যামী আগেই বলেছিল পাট্টায়া শহর রাতে জেগে থাকে আর দিনে নিরিবিলি। হোটেল থেকে এক কিমি দূরে সমুদ্র আর 'ওয়াকিং স্টিট'। নামের সাথে মিল রেখেই স্টিট্ টিতে শুধু হাঁটো আর হাঁটো এবং উপভোগ কর রাতের দোকানপাট, আলোঝলমল, নাচগান(রক) আর থাই মহিলা-পুরুষ ও কুমারীর মেলা। শরীরমালিশ এখানকার বিখ্যাত লোকসংস্কৃতি। আমার কেন জানি মনে হল সাগর পারে এ জায়গাটি পর্যটকদের আকর্ষনেই দিনে দিনে গড়ে উঠেছে। সাগরপারের ওয়াকিংস্ট্রিটে হাঁটলেও আবহাওয়া উষ্ণ বোধ হল। এর মূল কারণ শ্বাসপ্রশ্বাস ও শীততাপ যন্ত্র নির্গত গরম হাওয়া। প্রতিটি বাড়ি, গাড়ি, হোটেল, রেস্তোরাঁ থেকে অবিরত শীততাপযন্ত্রের গরম হাওয়া বেরুচ্ছে। একঘন্টা পর স্টিট থেকে চলে যাই সাগর পারে। সেখানে সমুদ্র গর্জন এস্রাজ সুরে মোহিত করছে বেলাভূমি, রাতবাতি, পামসারি, রোদছাতা আর অলস পর্যটকদের। দেখলাম প্রায়ান্ধকারে কেউ কেউ চড়কিবঁড়শি বাইছে, দুটি কিশোর বক্সিং অনুশীলন করছে (রাত বারটায় খেলাচ্ছলে না-কি শীতলবালু আবহাওয়ার কোন ভূমিকা আছে বুঝতে পারিনি)। অনেকে বিছানার মত বড় জায়গা জুরে কচিকাঁচা নিয়ে বসে আছে। কখন ঘুমুবে কখন জাগবে জানিনা।
২৬/৬
,,,,,,, পরদিন সকালে হোটেলে বনেদী প্রাতঃরাশ সেরে রওনা হলাম 'কোড়েল' দ্বীপের উদ্দেশ্যে। থাইল্যান্ডে বিভিন্ন দ্বীপের মধ্যে এটি একটি। স্টীমারটি যেতে যেতে পথে একটি ভাসমান জেটিতে (বিশ্রামাগার) থামল। এখানে চারটি কসরতের জন্য ব্যাক্তিগত টিকিট কাটতে হয় ছয়হাজার টাকায়। শুনেছি, কসরতগুলি ভারতের গোয়া সহ কিছু সমুদ্রপারেও গড়ে উঠেছে। প্রথমে প্যারাসেইলিংঃ এখানে বায়ুথলী (লাইফজ্যাকেট) পরিয়ে প্যারাসুটের সাথে মানুষকে বেঁধে দেওয়া হয়। ত্রিশ হাত লম্বা একটা শক্তদড়ি মোটরবোট থেকে প্যারাসুটে বেঁধে, মোটরবোট জোরে ছুটালে প্যারাসুট ওপরের দিকে উঠতে থাকে সাথে মানুষও, পাঁচসাত মিনিট পর আবার মানুষটিকে জেটিতে ফিরিয়ে আনে। তারপর ডুবসাঁতারঃ ২) এখানে মানুষকে ডুবুরি পোষাক পরিয়ে অক্সিজেন হ্যালমেট লাগিয়ে, জলের নিচে ঠেলে দেওয়া হয়। শ্বাসপ্রশ্বাসের কোন অসুবিধা হয় না কিন্তু প্রথমবার কানে একটা ভয়ানক চাপ অনুভূত হয়, কেউ কেউ এই চাপে ভয় পেয়ে ওপরে উঠে আসে, তাদের জলের নিচে হাঁটা বা ছোটমাছকে রুটি খাওয়ানো আর হয় না। টাকাটাই বিফল। তারপর দূরন্ত জলমোটর সাইকেলঃ ৩) এখানে মোটর সাইকেল জলের ওপর দিয়ে দ্রুত গতিতে ছোটে, কখনো লাফিয়ে চলে, ভয়ানক দ্রুত মোড় কাটে, পাঁচ মিনিট শরীরের তাল ধরে রাখতে হয়। বায়ূথলী (লাইফজ্যাকেট) পরা থাকে ডুবে যাওয়ার ভয় নেই। তারপর ব্যানানাবোটঃ ৪) চারজন একসাথে বসে সমুদ্র জলের সাথে খেলতে খেলতে দ্রুত গতিতে ছোটে। শেষে ভিজে একসা হয়ে পাঁচ মিনিট পর ফিরে আসে। সবশেষে স্টীমার আমাদের কোড়েল দ্বীপে নামিয়ে দেয়। জায়গাটি (একটি জেলার সমান হবে মনে হয়, ড্রোন ক্যামারা থাকলে ভাল বুঝা যেতো) সমুদ্র মাঝে সবুজ টিলা, তার অর্ধচন্দ্রাকৃতি পাদদেশে দীর্ঘবালুকাভূমি। রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়ায় ছাউনি পাতা সৈকত। ছাউনির নিচে হকাররা স্থানীয় কুঠির শিল্প সহ অন্যান্য সামগ্রী বিকি করে। ছবি ও স্নানের উত্তম পরিবেশ এই দুধ-সাদা বেলাভূমি । স্বল্পবাসে অনেকেই স্নান করছেন। আমরাও সদলবলে স্নান সাড়লাম। তবে সাঁতার কাটা বিপদজনক একের পর এক ছোটবড় ঢেউয়ের কারনে। স্বাসের জন্য যেই মুখ খোলা হয়, সেই মুখেই জল ঢুকে যায়। নিজেও কিছু জল খেয়ে অবসন্ন হয়েছি তবে পারে না পৌঁছা পর্যন্ত সাঁতারে ক্ষান্ত হইনি। প্রথম অভিজ্ঞতা। যাঁরা ইংলিশ চ্যানেল পারি দেন তাঁদের অক্সিজেন হেলমেট থাকে নাকি শান্ত জলপথ, জানিনা। সেদিন 'মুম্বাই সে' রেস্টুরেন্টে দু'বেলা খেয়ে পাট্টায়া শহর কে বিদায় জানানো হয়।
,,,,,পরদিন পাট্টায়া থেকে ব্যঙ্ককের পথে সবুজ জঙ্গল, টিনের একচালা, লাল মাটি হারিয়ে ক্রমশ ইটের জঙ্গল আর উড়ন্ত অজগরের ভিড়ে প্রবেশ করি মানে ফ্লাইওভার। ক্রমে কংক্রিট দেওয়ালের ঘনত্ব ও উচ্চতা বাড়তে থাকে। নির্নিয়মান রাস্তা বাগান সেঁতু যেমন দেখেছি, তেমনি দেখেছি বড় বড় ইমারত। আমাদের দেশের মতই ক্রেন আর লিফ্টকে কাজে লাগানো হয়েছে। এখানে গাড়িচালকরা ভেপু(হর্ন) খুব কম বাজান। (একটা ভিডিওতে দেখা যাবে আধা কিমি রাস্তায় ২০০টির মত গাড়ি চলমান কিন্তু আমাদের দেশের মত পে-পু র প্রতিযোগিতা নেই চৌমাথা হলেও)। গাড়ি থেকেই দেখেছি গনেশ পুজো উপলক্ষে মানুষের ভিড়। এখানে গনেশ ঠাকুর সৌভাগ্য ও ধনরত্নের দেবতা হিসাবে পূঁজিত হন। ব্রহ্মা পূজাও হয়। বুদ্ধ পূজা সর্বাধিক। ব্যঙ্কক থাই-উপসাগর ও চাও-ফ্রায়া নদীর বদ্বীপে সেজে উঠেছে। মুল শহর বেশ পরিপাটি। স্থান বিশেষে অবিরত ঝাড়ু ক্রিয়ায় ঝকঝকে তকতকে। কোথাও আবার কুয়াশা স্প্রে করা হচ্ছে। সুউচ্চ টাউয়ার ও প্রাসাদের নক্সা অভিভূত করে তোলে। এর মধ্যে 'সিমলন' এলাকায় ৭৭ তলাবিশিষ্ট একটি ভাঙা প্রাসাদ দেখালো অ্যামী, যা প্রকৃতপক্ষে ভাঙা নয়, সেটা প্রাসাদ কর্তৃপক্ষের একটা প্রচার কৌশল। অবাক করে দিয়ে ওটির নাম দেওয়া হল 'স্কাই স্কেপার' ৩ । ইতিমধ্যে গাড়ি এসে থামল 'ওয়াটার গেইট' হোটেলে। মধ্যাহ্ন ভোজের পর কিছুক্ষণ শহর বাজার ভ্রমণ। পরদিন সাফারি পার্ক (অভয়ারণ্য) ও ম্যারিন পার্ক (জলজন্তু কসরত) প্রদর্শনীতে নতুনত্বের অপেক্ষায় নিশিযাপন হল এক বনেদী হোটেল 'ব্যঙ্কক প্যালেসে'। ২৭/৬
,,,,, সকাল নয়টায় প্রাত:রাশ সেরে গাড়ি ছুটিয়ে গিয়ে থামল পার্কের গেইটে। এখানে কিছু বিধিনিষেধ অর্জন , টিকিট কাটা ও প্রাকৃতিক কাজ সারা হল। তারপর গাড়ি সহ অভয়ারণ্যে প্রবেশ। একে একে চটকদার জেব্রাদল, হিমু, ঊট পাখির রাস্তা দখল, সাদা শিংযুক্ত বাইসন ও হরিণ, জলহস্তী সন্তরণ দেখলাম। দেখলাম একটা গেইট পেড়িয়ে, বাঘ সিংহের ঝুন্ড । ভাগ্যিস আমরা সবাই গাড়িতে বন্দী, জন্তুরা সব মুক্ত । আবার একটি গেইট পেড়িয়ে বুঝলাম এটা বাড়তি সতর্কতা হিংস্র পশুদের জন্য। প্রতি তেমাথায় ডোরাকাটা জীপ নিয়ে প্রতিরক্ষা কর্মীরা প্রহারারত। তারপর গাড়ি এসে একটি কাঠের দোতালার সামনে থামল। দোতালায় উঠে গিয়ে দেখি জিরাফেরা এক হাত লম্বা লাল জিব বের করে পর্যটকের হাত থেকে কিছু খাচ্ছে আর আদর নিচ্ছে। বুঝলাম জিরাফের উঁচু গলা ও চেহারাকে কাছে থেকে অনুভব করার জন্য কর্তৃপক্ষের একটা কৌশলী আয়োজন। কিছু ছবি ভিডিও তোলারপর, পায়ে হেঁটে দ্বিতীয় গেইট দিয়ে প্রবেশ করলাম ম্যারিন পার্কে। প্রথমে লেজ ঝুলা টিয়াপরিবারের আড্ডা, তারপর দাঁতাল সী-লায়নের দেখা, তারপর পৃথিবীর বৃহত্তম ইঁদুর (একেকটা শূকর ছানার সমান) দেখলাম। বাদবাকি রাজহাঁস, সারস, লালছোপ বিলেতী আইরের কথা না বললেও চলে। এরাও প্রতি দলে প্রায় ৩/৪ শ, প্রতিদিন মানুষ দেখে দেখে এতটাই অভ্যস্ত যে আমাদের পাত্তাই দিল না। পার্কের একটি হোটেলে লান্সের ব্যবস্থা ছিল। ভিড়ের জন্য দাঁড়িয়েই খেতে হল, কারণ ততক্ষণে ডলফিন শো শুরু হয়ে যাচ্ছে । চমৎকার লাগলো এটা দেখে যে মাছেরাও কিভাবে মানুষের কথায় নাচে, লাফায়, চুমু খায়। সীল মাছের প্রদর্শনীও সেরূপ শুধু তাকিয়েই থাকতে হয়, ভিডিও করার দিকে মনযোগ থাকে না। শেষে সিনেমা স্যুটিং প্রদর্শনীঃ ভেড়া,ঘোড়ার ছুটাছুটি গুলিবারুদ, বোম, আগুন, জল নিয়ে একটি গ্রামের যাপন কাহিনী বাস্তব করে তুলল কলাকুশলীরা। বিভিন্ন স্কুলের কচিকাচারাও দর্শকাসনে ছিল। অভিনয়কৃত আগ্নেয়াস্ত্রের শব্দ ও হঠাৎ জলের ঝটকা তাদের শিহরিত করে তুলেছিলো। আরেকটা জিনিস আমার কাছে একেবারে নতুন লাগলো: ভিড়বহুল খোলা জায়গায় মানুষের বসা ও চলার পথে, একতলা উচ্চতায় কতগুলি কাল রঙের হাফ ইঞ্চি লতানো পাইপ বাঁধা ছিল, যা এক ফুট অন্তর অন্তর সূঁচফোটানো ছিদ্রযুক্ত। জল প্রবাহ দিলে ঐ পাইপের ছিদ্র পথে ধূঁয়ার মত জল বেরিয়ে এসে পথিকের গায়ে লেগে কুয়াশার মত অনুভূতি সৃষ্টি করে। ভিড় ও সূ্যরশ্মির অসহ্য গরমের সময় ঐ কুয়াশা আশির্বাদ মনে হয়। প্রদর্শনী গ্যালারীর ওয়াল-ফ্যানগুলিতে ঐ কুয়াশা স্প্রে লাগানো ছিল। ম্য্যরিন পার্ক ও মন্দির হাঁটা পথের খানে খানেও ওই ব্যবস্থা উপভোগ করেছি।
,,,, তারপর সেখান (সাফারি ওয়ার্ল্ড) থেকে বেরিয়ে গেলাম আবার শহর বাজার দর্শন ও কেনাকাটায়। আমাদের দেশের মত বড় বড় বহুতল বাজার রয়েছে। রয়েছে হিন্দি ইংরেজি জানা রসিক দোকানদার। তারাও খুশি হিন্দিভাষীদের পেয়ে। আমাদেরও মনে হল যেন ইন্ডিয়াতেই আছি। সামগ্রীর দাম কোনটা কম কোনটার বেশি। একমাত্র অভিজ্ঞ ক্রেতারাই লাভবান হবেন। 'ইন্দিরা মার্কেট' ও 'ওয়াটার গেইট' মার্কেট থেকে আমি নিজে দু'একটা জিনিস কিনেছি এর মধ্যে ব্যাতিক্রমী গেঞ্জি টি ছেলের খুব পছন্দ হয়েছে। কারন তাতে ওর ছবি আঁকা। আমি আমার মোবাইল থেকে দোকানদারকে ছেলের ছবি দিলাম। ২০ মিনিটের মধ্যেই একটি পরিস্কার গেঞ্জিতে তা ছেপে দাম নিল ভারতীয় তিনশ টাকা। আরও অনেকেই কিনল। হাসি খুশি নতুনত্বের অনুভবে গল্পে ভিসা সময়ও এগিয়ে এলো। চারদিনের বিদেশ সফরের আরও কত গল্প, পরে স্মৃতি হয়ে ধরা দেবে। তখন আবার আড্ডায় বসবো।
,,,,, সব দলেই দুএকজন ব্যাতিক্রমী মতাদর্শের লোক থাকে। আমাদের মধ্যেও ছিল। যাদের জন্য কিছু সময় নষ্ট হয়েছে যা অফেরতযোগ্য। আমি নিজেও কিছু ছবি ও ভিডিও তুলতে গিয়ে দেরী করেছি,দলছুট হয়েছি। কিন্তু, শেষ দিনে দলছুট একজনের গাড়িতে উপস্থিতি এত দেরী (রাতে দেড় ঘন্টা) হল যে ঊনচল্লিশজনের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটল। ফলস্বরূপ যে তিরস্কার ও কৈফিয়ত উচ্চস্বরে বর্ষিত হল তখন আমরা ভুলে গিয়েছিলাম যে আমরা বুদ্ধের দেশ থাইল্যান্ডে আছি। ভুল ভাঙল তখন, যখন দেখলাম আশেপাশের ঝুলবারান্দা থেকে অধিবাসীগণ হা হয়ে অনভিপ্রেত তাকিয়ে আছেন। সলজ্জ আমরা তখন স্বর নিচু করে 'সিজন হামার্ক' হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম যা বিমানবন্দরের সন্নিকটে। অবশ্য প্রকৃতির আশির্বাদও আমরা পেয়েছি। ব্যঙ্কক পরিচলন তাপমন্ডলে [১৬° উত্তর ] থাকায় তাপপ্রবাহ লাগলেও বৃষ্টি একদিনও আনন্দে বিঘ্ন ঘটায়নি।
২৮/৬,,,,সুবর্ণভূমি ছেড়ে ইন্ডিগো তে প্রাতঃরাশ, নেতাজী সুভাষ বিমানবন্দরে লান্স, সবমিলিয়ে নিরাপদ বাড়ি ফিরা পর্যন্ত একটি স্মরনীয় পুলকভ্রমনের জন্য প্রিন্স কোং, ত্রিপুরায় সুযোগ্য বন্টনকারী (ক্লাসিক টাইলস্) ও দক্ষ বিক্রয়কর্মীকে কুর্নিশ জানাই। ধন্যবাদ জানাই সকল পাইলট, বাসগাড়ির চালক, অ্যামী, সন্দীপ দা আর শৃঙ্খলা পরায়ণ থাইল্যান্ড বাসীকে।