Jul 31, 2023

মিঠু মল্লিক বৈদ‍্য

বিশ হাজারের বিনিময়ে

সকাল থেকেই চেনা সুরে কোকিলটা ডেকেই যাচ্ছে। রনিতাও ওর মিষ্টি সুরে তাল মিলিয়ে সংসারের কাজ মিটিয়ে নিচ্ছিল সময়ের মধ‍্যে। স্বামী অজিত আর ছোট তিন বছরের অনুরূপাকে নিয়েই ওর সংসার। ভালোবাসার পবিত্রতা নিয়েই অজিত ও রনিতা বিয়ে করেছিল বছর পাঁচেক আগে বাবা মায়ের অমতে। বাবার বাড়ি ও শ্বশুড় বাড়ির কোথাও এই বিবাহিত দম্পতির স্থান হয়নি সেদিন। ওরা নিজেরা একটা ভাড়াবাড়িতে সংসার শুরু করে।

নুন আনতে পান্তা ফুরানো অবস্থার মধ‍্য দিয়ে ওদের সংসার এগোতে থাকে। রনিতা ও অজিত কারোরেই আর পড়াশোনা হয়নি।সংসার চালানোর তাগিদে অজিতকে যোগ দিতে হলো রাজমিস্ত্রির কাজে। আর রনিতা দুই একটা টিউশনি করে কোন রকমে দিন কাটায়।

জীবনের সব রঙ বে-রঙ্গীন হয়ে যায়। তবুও এক বৎসর কষ্টের মাঝেও আনন্দ খোঁজে ওরা কাটাচ্ছিল দিন।আস্তে আস্তে শুরু হয় ঝগড়া। এর মধ‍্যে অজিতের মা বাবা ছেলের কষ্ট সহ‍্য করতে না পেরে ওদের বাড়িতে নিয়ে গেল বটে কিন্তু রনিতার শুরু হয় নতুন লাঞ্ছনা। অজিতও তেমন একটা কেয়ার করতো না, কেমন জানি উদাসীন থাকতো। মাঝে মাঝে  সারাদিন কাজের শেষে একটু নেশা করে বাড়ি ফিরতে শুরু করলো। রনিতা কিছু বললে প্রথম প্রথম বকাবকি করতো,পরে পরে সেই মাত্রা বাড়তে থাকে। এদিকে শ্বশুর -শাশুড়ীও ভীষণ যন্ত্রণা করতো। দিনের পর দিন ওকে না খাইয়ে রাখতো।বাবার বাড়ি থেকে টাকা পয়সা চেয়ে নেওয়ার জন‍্য চাপ দিত।আর রনিতা তা অস্বীকার করলে শুরু হতো নির্যাতন।

সহ‍্য করতে করতে রনিতা মা হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করে। কিন্তু সেটাও সহজ ছিল না। এই সময়েও ওকে নানা ভাবে অত‍্যাচার করতো ওরা।একদিন সহ‍্য করতে না পেরে রনিতা পঞ্চায়েতের দ্বারস্থ হয়। এর পর বিভিন্ন সালিস বৈঠকের মধ‍্য দিয়ে রনিতার নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয় পঞ্চায়েত। ডরে ভয়ে শ্বশুর শ্বাশুড়ি কিছুদিন চুপ থাকলেও অজিতের অত‍্যাচার চলতেই থাকে। মা হওয়ার আশায় রনিতা দিনের পর দিন মেনে নেয় সবটুকু।  না না ওর কোন স্বাদের অনুষ্ঠানের বাড়াবাড়ি ছিল না,ছিল না প্রতিনিয়ত চিকিৎসকের পরামর্শ। সারা প্রেগনেন্সির জার্নিতে শুধু দুই থেকে তিনবার ডাক্তার ওকে দেখেছে। শত প্রতিকূলতা পেরিয়ে অবশেষে রনিতার কোন আলো করে আসে টুকটুকে একটি ছোট্ট মেয়ে। তার পর থেকে রনিতার উপর অত‍্যাচার মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। ভাই ও বাবাকে জানানোর চেষ্টা করেও ব‍্যর্থ হয়। অসহায় রনিতা সন্তানের মুখ চেয়ে নীরবে সহ‍্য করে সবটা দীর্ঘ দুই বছর।

ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায় এক রাতে। অজিত নেশায় মত্ত।  মাংশ ও রান্নার নানা সরঞ্জাম সহ এক বন্ধুকে নিয়ে বাড়ি আসে। রান্নার নির্দেশ আসে রনিতার কাছে। মেয়েকে ঘুম পারিয়ে যত্ন করে রান্না করে খেতে দেয় ওদের। খাওয়া দাওয়া শেষে রনিতা যখন ঘরে যায় দেখে  বিছানায় ঘুমিয়ে আছে অজিত ও বন্ধু সবুজ। ছোট্ট মেয়েটা পাশে। রনিতা কোন কথা বলার আগে অজিত বলে সবুজকে সন্তুষ্ট করতে হবে রাতে।তাই এই বিছানায় ওকে থাকতে হবে সে চলে যাবে বাইরে। কারণ সে বিশ হাজার টাকা ধার নিয়েছে সবুজের কাছ থেকে। রনিতা স্বপ্নেও ভাবেনি এতো নীচে নেমে যাবে তার ভালোবাসার মানুষ টি। যার হাত ধরে একদিন বাবা মা ভাই বোনকে ছেড়ে  সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে  বেরিয়ে এসেছিল সেই মানুষটি আজ বিশ হাজার টাকার বিনিময়ে বিক্রি করতে চাইছে তাকে। কান্নায় ভেঙ্গে পরে অজিতের পায়ের উপর। ওর পৃথিবীতে  বিশ্বাস,ভরসা, ভালোবাসা সব মিথ‍্যা হয়ে এক শূন‍্যতা হাহাকার স্থান করে নিল। নিজেকে শেষ করার কথা মনে আসতেই ছোট্ট মেয়েটা মা বলে কান্না করতে থাকে।

অজিত রনিতাকে সবুজের দিকে ধাক্কা মেরে বাইরে বেরিয়ে সমানে থেকে দরজা বন্ধ করে দিল। রনিতা নিজের সম্মান,আত্মমর্যাদা বাঁচাতে সবুজের পায়ে পরে ভিক্ষা চাইতে থাকে।  সবুজ সেই মুহূর্তে অসুর হয়ে না উঠে রনিতাকে শান্ত করার চেষ্টা করে। রনিতার প্রতি কেমন যেন মায়া জাগে। সারারাত রনিতা সবুজের সংগে একঘরে থাকে আর ওর জীবনের অতীতটাকে বলতে থাকে সবুজের কাছে। মেয়েটাকে বুকে নিয়ে সে অবুঝের মতো কাঁদতে থাকে।সবুজ ওকে ছুঁয়ে ও দেখেনি। সকাল হতেই কোকিলটা ডেকে চলছে।এক করুণ সুর।

এর পর প্রায় রাতেই সবুজ আসতো।অজিত কোন বাঁধা দিত না। সবুজ রনিতার হাতের রান্না খেতে পছন্দ করতে লাগে, ওর সাথে কথা বলে সময় কাটিয়ে আনন্দ পেতে লাগে।  সেই রাতে সবুজের আচরণের পর থেকে রনিতা সবুজকে শ্রদ্ধা করতে থাকে। আস্তে আস্তে ওদের মধ‍্যে একটা অজানা সম্পর্ক গড়ে উঠে। অজিত হারায় তার সবটুকু অথচ তার টেরও পেলো না। বিশ হাজারের বিনিময়ে  সে আজ সম্পূর্ণ একা।রনিতার চোখে এক অদ্ভুত তৃপ্তি। সবুজ দাঁড়িয়ে সামনে।করুণ সুরে ডেকেই চলছিল কোকিলটা।