নামে কি আসে যায়
(১)
মাধাই পাটনীর দিন কাটে বরাকের বুকে,রাত কাটে ঘুমের সুখে, অবসরবেলায় জাল বুনে, সন্ধেবেলা নাম গান গায় -এই নদী-নৌকা-জাল-মাছ আর নামগান নিয়েই মাধাইর জীবনবৃত্ত। ভোর হওয়ার আগেই যখন শুধু আলো ফুটতে শুরু করে সেই ভোরে নৌকা আর জাল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। সকাল সাতটার আগে পৌঁছে যায় বসাই, তাকে কম মাছ দিলে চলবে না,নইলে দুপুরে মাছ নিতে বড়দা এলে গাড়ি পাড়বে। বড়দা জগাই মা'কে ও তার সংসার নিয়ে শহরে থাকে, মাছের দোকান করে।মাধাই স্ত্রী ও ছোট বাচ্চাদের নিয়ে গ্রামে থাকে।মাধাইর ছেলে মেয়েকে পড়াশোনা তার দাদাই করায় শহরে রেখে। সে খুব সরল সিধে,বোকা যাকে বলে।যা বুঝে তাই বুঝে, বাস্তবজ্ঞানের খামতি আছে।বাল্যে মেধার অভাবে পড়াশোনাটাও হলো না,স্কুল গেল নদী এলো জীবনে। বাবার সাথে আসতো জাল থেকে মাছ কুড়োতে -সেই থেকে উত্তরাধিকারে জাল নৌকা নদী এলো তার জীবনে। নদীর বাইরে তার জীবন নেই,সে কাণায় কাণায় জানে এই নদীকে, কোথায় কি মাছ ঘাই দিচ্ছে,কোন ডরে কি মাছ আছে -এগুলো খবর রাখে মাধাই । ঘরের খবর রাখে বৌ, বাড়ির খবর রাখে জগাই।
হঠাৎ করে একদিন সাতসকালে বসাইর সাথে জগাই হাজির। মাছ নিয়ে বসাই চলে গেল। এখন ওই দোকান চালায়, ছেলে অনেক বড় হয়েছে,কলেজে পড়ছে।জগাই বলল ,"ঘরে চল, এনার্সি নিয়া কথা আছে।" নৌকা বেঁধে জাল হাতে নিয়ে মাধাই বড়দার সাথে ঘরে গেল।মাধাই বছর কয়েক আগে থেকেই শুনছে এনার্সি চলছে।জগাই সবকিছু করেছে।তাকে বসাই একটা টিভির মতো মোবাইল দিয়ে ফটো তুলে নিয়ে গিয়েছিল।
জগাই বসলো চেয়ারে,দাওয়ায় বসলো মাধাই।ছোট্ট অণিমা জেঠু ও বাবার জন্য চা নিয়ে এলো, ঘোমটা টেনে বসাইর মা দরজার আড়ালে এসে বসলেন। চা খেতে খেতে জগাই বললেন,"মাধাইরে, এনার্সিত তোর নাম, ছোট বউয়ের নাম আইছে কিন্তু বসাই ফুলন অণিমা কেউর নাম আইছে না।"
-কেনে আইছে না? প্রশ্ন করলো মাধাই।
-তোর ডকুমেন্ট ইতার মাধব দাস আর বাচ্চাইনতের ইতাত মাধাই দাস কেনে?
-আমি কিতা কইতাম? তুমি আর বসাইর মায়েঔ ইতা জান' ।
-হকলটির বার্থ সার্টিফিকেট স্কুল সার্টিফিকেট'ও মাধাই দাস লেখা, বসাইর ভোটার আইডিত'
একটু থেমে জগাই ধীরে ধীরে বললেন ,"বার্থ সার্টিফিকেটে ভুল করব হসপিটালের ক্লার্কে আর অখন আমরার ভোগান্তি।" জাল-মাছ-নদী আর নাম-গান নিয়ে মগ্ন থাকা মাধাই এতদিন ভুলেই ছিল যে কুষ্টিতে তার নাম মাধব, ডকুমেন্টে তার নাম মাধব, মাধাই তার ডাকনাম। " মাধাই হোক আর মাধব হোক মানুষ তো আমি একজনঔ।"
-এটা এনার্সিয়ে বুঝত' নায়
-এনার্সিত নাম আইলেউ কিতা আর না আইলেউ কিতা?
-হায়রে বুরবক! এনার্সিত নাম না আইলে বাংলাদেশী করি দিব। -বাক্যটি তীরের মত কর্ণবিদ্ধ করল মাধাইর।- সুবলের খবর জানসনি?
-না, তারে ত' সাপ্তাদিন থাকি দেখরাম না
-দেখবে কিলা? হেরে ত' বাংলাদেশী কইয়া ডিটেনশন কেম্প' ভরি দিছে
-মানে?
- মানে তার পূর্ণা ডকুমেন্ট কিচ্ছু দেখাইতে পারছে না, সন্দেহ কইরা বিদেশি বানাই দিছে।
- দেখাইবো কই থাইক্কা? তার ঘর ত' প্রত্যেকবারঔ নইদ্যে ধইয়া লইয়া যায় -বাসনপত্র গরু ছাগল লইয়া যায়, ডকুমেন্ট থইয়া যাইবো নি?
-অন্ধ আইনে অতা বুঝবনি ? আমার লাগা দোকান কালা মিঞার উপরে বিদেশি কেইস চলের
- বড়দা সুবলরে কিতা এখন দেশ থাকি খেদাই দিব নি? -কিতা কইতে? সরকারে জানে কিতা করব
-আইচ্ছা বড়দা যেরার নাম এনার্সিত আইত নায় হেরারে কিতা করব'?
-কিতা করব' কেউ জানে না, বাংলাদেশী টাংলাদেশী মানাইবো, সরকারের ঘর থাকি নাম কাটি দিব ওতাঔ করবো আর কিতা।
- বড়দা যদি বাইচ্চাইনতের নাম না আয় তে বাংলাদেশী পড়ি দিব নি?
- না না ইতা কিচ্ছু অইত নায় কিচ্চু একটা বন্দোবস্ত করমু, চিন্তা করিছ না।
'চিন্তা করিছ না' বললে কি চিন্তা আসে না? চিন্তার বিষয়ে চিন্তা তো আসবেই। যদি ছেলেমেয়েদের বাংলাদেশী বলে জেলে নিয়ে যায়, যদি সরকারের ঘর থেকে নাম কেটে দেয়, তবে দেশে থাকতে দেবে? এতসব ভাবছিল মাধাই। আজ দুপুরে মাছ ধরতে যায়নি, জাল নিয়েও বসেনি , স্নানেও যায়নি , সারাদিন খুঁটিতে হেলান দিয়ে দাওয়ায়ই বসেছিল। অল্প বৃষ্টিও হচ্ছিল তাই বর্ষার মা গরম খিচুড়ি আর ছোট মাছ ভাজা আলু ভাজা করেছিল। পাতে বসে অল্প খিচুড়ি মুখে দিয়ে "গলা দিয়া নামের না" বলে পাতেই হাত ধুয়ে নেয়।
(২)
সন্ধ্যেবেলা সন্ধ্যেবাতি দেওয়ার সময় বসাইর মা হাতে ধূপতি নিয়ে এসে দেখে বারান্দায় বেঞ্চে বসে রয়েছে চিন্তিত বসাইর বাপ। " ওগো অত চিন্তা কইর' না, বড়দায় কইছইন নু কিচ্ছু একটা বন্দোবস্ত করবা। তোমার হাইপ্রেসার ডাক্তারে নু কইল' বেশি চিন্তা করতায় না , যাও যাও প্রার্থনা কর গিয়া, চিন্তা দূর হইবো।" কথাগুলো কানেই নেয় নি, বড়দার কথাগুলোই তার কান ভরে রয়েছে।
"চলো বাবা শতনাম পইড়া শুনাইমু" অনিমা এসে বাবার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল ঠাকুর ঘরে। শত নাম পড়া শুরু করল অনিমা, মিষ্টি তার গানের গলা সুর করে গায়-
জয় জয় গোবিন্দ গোপাল গদাগর।
কৃষ্ণচন্দ্র কর কৃপা করুণাসাগর।।
জয় জয় গোবিন্দ গোপাল বনমালী।
শ্রীরাধার প্রাণধন মুকুন্দ মুরারী।।
প্রতি পদের পরেই সে ধুঁয়া গায়, ফুলন দোহার দেয়। গানে ধুঁয়ার বিরতিতে অর্থাগমের বিশেষ সুযোগ পাওয়া যায়।আজ যেন গলার সুর মেলাতে পারছিল না মাধাই।
হরিনাম বিনে রে গোবিন্দ নাম বিনে।
বিফলে মনুষ্য জন্ম যায় দিনে দিনে।।
দিন গেল মিছা কাজে রাত্রি গেল নিদ্রে।
না ভজিনু রাধা কৃষ্ণ চরণার বিন্দে।।
আজ মাধাইর তাল কেটে যাচ্ছিল , কোনোমতেই তাল ধরে রাখতে পারছিল না। মাথায় ভাবনা স্রোতের মতো আসছে। "হ্যাঁ, আমি তো মিছা কাজেই দিন গত করেছি, রাত অলস নিদ্রায়, পরিবারের কথা কখনো ভাবিনি"। আজ সে কাব্যের ব্যাচার্থ নয়, ব্যঞ্জনার্থ নয়, নিজের অবস্থার সাথে অর্থ বুঝে নিচ্ছে। অনিমা শিশু মানুষ, সে বাবার দিকে খেয়াল না করে আনন্দে গেয়েই চলেছে।
কৃষ্ণ ভজিবার তরে সংসারে আইনু।
মিছে মায়ায় বদ্ধ হয়ে বৃক্ষসম হইনু।।
ফল রূপে পুত্র কন্যা ডাল ভাঙ্গি পরে।
কাল রূপে সংসারেতে পক্ষ বাসা করে ।।
কেন সংসার করলাম সব কিছু ভুলে জাল আর মাছের মায়ায় অন্ধ হয়ে নিজেরই কাল নিজেই তৈরি করলাম। এলো রে কাল এনার্সি, পুত্রকন্যার ডাল বুঝি এই ঝড়ে ভাঙ্গে ?
বসুদেব রাখি আইলো নন্দের মন্দিরে।
নন্দের আলোয় কৃষ্ণ দিনে দিনে বাড়ে।।
কেন বাপ রেখে গেলি এই সংকট দেশে? এই দেশে পদে পদে বিপদ, নাম নিয়ে বিপদ....
নন্দ রাখিল নাম নন্দের নন্দন।
যশোদা রাখিল নাম যদু বাচাধন।।
উপানন্দ নাম রাখে সুন্দর গোপাল।
ব্রজবালক নাম রাখে ঠাকুর রাখাল।।
সুবল রাখিল নাম ঠাকুর কানাই।
শ্রীদাম রাখিল নাম রাখালরাজা ভাই।।
ননী চোরা নাম রাখে যতেক গোপিনী।
কালসোনা নাম রাখে রাধা বিনোদিনী ।।
কানাইয়ের মত শত নয়, হাজার নয়, মা-বাপ গ্রামবাসী আদর করে এক নাম ডাকে মাধাই।যে কৃষ্ণ সে কানাই,যে মাধব সেই মাধাই এতটুকু কি বুঝে না নিষ্প্রাণ এনআরসি? 'আমি মাধব আমিই মাধাই' নিজের এই অন্তর ব্যথা উদগীরণ না হয়ে তার'ই অন্তর দেশে লাভার মত মাথা কূটছে। -বাচ্চারা গান গেয়েই চলছিল, সে কোথাও যেন থেমে গিয়েছিল । গান তার কানে বাজছিল না, সে তার দুশ্চিন্তাস্রোতে মগ্ন।
শতনামের নাম অংশের পর মহাত্মাংশে বাচ্চারা গলা খুলে কীর্তন জুড়ে দিল।মাধাইর ঘোর ভাঙলো-
অনন্ত কৃষ্ণের নাম অনন্ত মহিমা।
নারদাদি দেবে যারে দিতে নারে সীমা।।
নাম ভজ নাম চিন্ত নাম কর সার।
অনন্ত কৃষ্ণের নাম মহিমা অপার।।
শত ভরি সুবর্ণ গো কোটি কন্যা দান।
তথাপি না হয় কৃষ্ণ নামের সমান।।
- হয় না, হয় না, কিছুই নামের সমান হয় না।-
যেই নাম সেই শ্রীকৃষ্ণ ভজ নিষ্ঠা করি।
নামের সহিত আছেন আপনি শ্রী হরি।।
এনার্সিতে নাম এলে তবেই ভারতীয়, ছেলেমেয়ে ভারতীয়। বিপদভঞ্জনকে ভক্তি করে চিন্তামনির ঘাড়ে চিন্তা ছেড়েও দুশ্চিন্তা যে নামে না। আজ সে গান গায়নি। বিছানায় উঠেছে, ঘুম আসে না।
(৩)
চোখ খোলাই রইল, চোখে সে দেখে অন্ধকার,মোরগ কুরুক্কু কুরুক্কু করে উঠল, ঝটকা লাগলো মাধাইর। রোজ ভোরের মতো বাচ্চাদের গায়ে কম্বল টেনে দিয়ে জাল আর বৈটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। অন্যদিন ঘুম থেকে উঠে প্রভাতী গায়, গান শুনে,বসাইর মার ঘুম ভাঙ্গে, লাল চা করে দেয়।সেদিন বসাইর মার ঘুম ভাঙতে দেরি হল উঠে দেখে বসাইর বাপ চলে গেছে জালে।
হাজার দুশ্চিন্তা হোক পেটের চিন্তা তো করতে হবে। সাতটার সময় বসাই এলো," আজ এত কম মাছ বাবা?" মাধাই কোন উত্তর করল না। মাছের চাঙাড়ি নামিয়ে দিয়ে নৌকা ঘুরিয়ে চলল মাছ দরিয়ায়।
সকাল দশটা নাগাদ বসাইর মা'এর মোবাইল রিং করে উঠলো, ডিসপ্লেতে নাম 'বড়দা'।
-হ্যালো বড়দা
-ছোট বউ মাধাই আইছে নি?
- না , আইজ তাইন অখনও আইছইন না।
-তারে আইলে কইও উকিলের লগে আলাপ করছি একটা এফিডেভিট করতে লাগবো, নামের এফিডেভিট দিয়া অন্য ডকুমেন্ট বার করতে লাগবো বা ডকুমেন্ট ইতাত নাম সংশোধন করলে অইবো।
-বড়দা আমি তো জানতাম কিচ্ছু না কিচ্ছু পথ বার হইব, বসাইর বাপে কাইল সারাদিন চিন্তা করছইন।
- তারে কইও চিন্তা করত না। কাইল আমরা শিলচর যাইমু ,সকালে রেডি হইয়া আইতো কইও।
বসাইর মা সুখবরটা পেলেও বসাইর বাপে তো পায়নি। মাথার উপর সূর্য তেজে উঠছে, চিন্তারও পারদ চড়ছে। যদি নাম না আসে তবে কি সুবলের মত জেলে নেবে ছেলেমেয়েদের? এই বিপদ তাদের ঘাড়ে না এসে কেন আমাদের ঘাড়ে এলো না , এদের তো পুরো জীবনটা বাকি -প্রেসার চূড়ান্ত, সহযোগ চড়া রোদ । নৌকার গলুই থেকে মাথা ঘুরে বরাকের ছেলে বরাকের কোলে পড়ল, হাত হাতড়েও নৌকার বাট ধরতে পারেনি।
(৪)
সুবল পাটনির কিশোর ছেলে সুবলের নৌকা চালাচ্ছিল, সুবলের পরিবারটাকে অন্নজল জুটাতে তো হবে। সে দেখেছিল নৌকা থেকে মাধাইকাকা অনিচ্ছায় পড়তে। সে তাড়াতাড়ি নৌকা নিয়ে এসে মাধাইকে তুলতে তুলতে মাধাই জল খেয়ে প্রাণ হারায়। এসব মানতেই চায় না বসাইর মা। "নদী নায়, নদী নায়, রাক্ষসী এনার্সিয়ে খাইছে বসাইর বাপরে।" -বলে গলা ফাটিয়ে কাঁদে, আকাশ ফাটিয়ে বাতাসে তরঙ্গ ছড়ায়।