গল্প:
অবেলার বন্ধু
মনীষার এই প্রশ্নে হঠাৎ করে হকচকিয়ে গেল তৃণা।
বেশিদিন হয়নি, ছেলের বন্ধুর বোনের আইবুড়ো ভাত অনুষ্ঠানে পরিচয় হয়েছে মনীষার সাথে। প্রথম দিন থেকেই কেমন একটা হৃদ্যতা অনুভব করে তৃণা।
ছেলের সঙ্গে এই মফস্বল শহরে থাকছে তৃণা। স্বামীও চাকুরীসূত্রে অন্য শহরে। নিজেকে কখনো খুব একা মনে হয়। মনের কথা খুলে বলার মত লোক আশে পাশে কেউ নেই। দিনে একবার অন্তত অরিত্রের সাথে কথা হয়।সেই নিয়ম মাফিক খোঁজ খবর নেওয়া। অরিত্র আজকাল বেশী কথা বলে না। ভীষন টায়ার্ড শোনায়.....,তাই কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায় তৃণা। মনের ভাবনা চিন্তা সম্পূর্ন ভিন্ন দুইজনের। যদিও পরস্পর যত্নশীল। কিন্ত আরিত্রর সঙ্গে মানসিক নৈকট্যের সাঁকোটা ভাঙে গড়ে.... এরকমই চলছে।
কিন্তু কিছু একান্ত অনুভূতি কারো সাথে ভাগ করা যায় না।
এই যেমন...
খুব চুটিয়ে প্রেম করতে ইচ্ছে করে, সেই কৈশোরে যখন প্রথম কাউকে ভালো লেগেছিলো। আবছা চেহারা, আজ আর মনে পড়ে না।স্কুল ছুটির পর সিঙ্গাড়া খেতে যাওয়া, ভয়ে বুক দূরু দূরু, কেউ না দেখে ফেলে.... সেসব কি অরিত্র কে বলা যায়!! মনে মনে হাসে তৃণা।
শীতের ঘোলাটে রোদ মেখে বেরিয়ে যেতে ইচ্ছে করে... গ্রামের পথ ধরে কোনো এক অজানা অচেনা রাস্তায় ধোঁয়া ওঠা চায়ের দোকানে। অলস চোখে চারপাশের মানুষ জন দেখে আবার শেষ নাওয়ে ঘরে ফেরা।
এসব অভিযানে যাওয়ার জন্যে বন্ধু চাই।সেই যাকে দেখলেই মন ভালো হয়ে যায়। যার হাত ধরে গোধূলি বেলায় কোনো মেঠো পথে শালবনের ছায়ায় হারিয়ে যাওয়া যায়। মনীষাকে সেরকমই বন্ধু মনে হয় তৃণার।
অনেক বছর ধরে একটা শহরে থেকেও সেরকম কোনো কেউ নেই। কংক্রিটের জঙ্গলে মানুষের মন গুলো ও বড্ড পাথুরে। প্রাচুর্যের চাপে পিষ্ট। কোনো গভীরতা নেই। কথা বার্তা বড্ড মেকি।
তাই
এই মফস্বল শহরে মনীষাকে পেয়ে খুব ভালো লাগছে তৃণার।
"সে হয়না মা, মুনিয়া আমার জীবন বাঁচিয়েছে। সেদিন যদি ও আমাকে জঙ্গলের মধ্যে থেকে তুলে না আনতো তাহলে আজ আমি হয়ত বাঘের পেটে থাকতাম"।
"সবই বুঝলাম বাবু, কিন্তু তুমি তোমার জীবন বাঁচানোর প্রতিদান হিসেবে যা করতে চাইছ সেটা আমাদের পক্ষে মেনে নেওয়া....,
আমার মাথায় কাজ করছে না। আমাদের সমাজ, আত্নীয় স্বজন এরা.... সর্বোপরি ভবিষ্যতে তুমি কি অ্যাডজাস্ট করতে পারবে। আবেগ নয় বুদ্ধি দিয়ে বিচার কর বাবু।"
মা, আমার তোমাকে বলা হয়ে গেছে। তুমিই সামলাবে সবকিছু"। এই কথা বলে মৈনাক বেরিয়ে যায়।
মাস ছয়েক ধরে এনজিও র সাথে একটা প্রোজেক্ট কাজ করছে মৈনাক। বাড়ী বাড়ী গিয়ে ডাটা কালেকশন করতে হয় ওদের। তৃনার ছেলে অন্ত প্রান, তাই ছেলের সাথে এই সাঁওতাল গ্রামে পড়ে আছে।
অরিত্র কে কিভাবে জানানো যায়.... হঠাৎ করে এই কথা শুনে, ওর না শরীর খারাপ হয়....। ওখানে একা আছে, কিভাবে রিয়েক্ট করবে...! তৃণা কী করবে না কাকে বলবে, কিচ্ছু ভেবে পায় না।
"আচ্ছা মনীষার সাথে কথা বলে দেখি ....! ও হয়ত কিছু একটা ভালো বুদ্ধি দিতে পারে"।
পরদিন মনীষা কে দেখে জড়িয়ে ধরলো তৃণা।
"জানো তো তোমাকে পেয়ে ভীষণ ভালো লাগছে। ভরসা পাচ্ছি। অনেক কথা আছে। চল চা খেয়ে আলাপ করি"।
"আচ্ছা তৃণা, এখানে আসার আগে এতো বছর তুমি বড় টাউনে নিজের ফ্ল্যাট এ থাকতে।তো সেখানে কি তোমার কোনো বন্ধু ছিলনা? যে তুমি আমাকে ডেকে আনলে। তোমার সংগে আমার পরিচয়ের তো বেশীদিন হয়নি"।
আচমকা মনীষার কথায় হকচকিয়ে গেলো তৃণা।
"মনীষা, আসলে কী জানতো, তোমার মধ্যে হয়ত কোনো এক সময় আমি নিজেকে খুঁজে পাই। তাই এত কম সময়ের পরিচয়ে আমি তোমাকেই নিজের বলে কাছে ডেকেছি। আর জানতো এই বয়সে এসে সহজে বন্ধু মেলে না।.... নিজের লোকেদের ভীড়ে, পরিচিত পরিবেশে, হাসি খুশি ইমেজ ধরে রাখতে হয়। নাহলে সবাই তোমাকে করুণার পাত্র হিসেবে দেখবে। সেটাতে রেপুটেশন বজায় থাকে না। সম্পর্কের ফাটলে রিপু করে.... মেকআপ এর প্রলেপ চড়িয়ে তবে, ভিতরে তোমার যাই থাক না কেন"!
"হম,বুঝলাম। তবে কী জানতো, জিজ্ঞেস করলাম এইজন্যে। যে আজ তুমি অজ পাড়াগাঁয়ে আছো তাই আমাকে মনে রাখছ। দুদিন পর চলে যাবে।....তখন"
কথা বলতে বলতে মনীষার চোখ ভরে এলো। তৃনা বলল,
"মনীষা জীবনের পড়ন্ত বেলায় তোমাকে পেয়েছি। কিছুদিন পরেই আঁধার নামবে। তখনই তো আমরা দুজন দুজনকে বেলা অবেলায়, রাতের ঘন আঁধারে বন্ধুত্বের আলোর মশাল হাতে নিয়ে পথ চলব"।
দূরে কোথাও রেডিও তে
চির সখা হে..., গানটি শোনা যায়।