Apr 29, 2023

অপাংশু দেবনাথ

নিষাদ নন্দিনী

মানুষ নদীর কাছে ফিরে যায় একা,
সব অবসাদ তার পায়ের কাছে রেখেই 
হেসে ওঠে পুনরায়।

ঊনকোটির ভাস্কর্য দেখায় সে কাকে?
বেটলিং শিবের উচ্চতা জানিনা বলেই 
নীরমহলের গভীরতা মাপতে শিখিনি।
জলপ্রপাতের কথা বলে রাইমা ও সাইমার 
কাছে নিয়ে যায় তবু অন্য অভিসারে। 
জরাজীর্ণ হাওড়ার কথাও নির্দ্বিধায় বলে ওঠে।

সব ব্যথা কাটিয়ে সে আলোকিত প্রভাত এখন।আমি সীমান্তের কথা বলি, স্বপ্নের কথাও।

দৃশ্যান্তের শেষে মায়া জড়িয়ে থাকে মোহিত চোখে,
বিশ্বাসে ভিক্ষাপাত্রে ভরেছি। 
সব ভাণ্ড রেখে একদিন ফিরে যাবো বাড়ি।

কখনো সমুদ্র দেখাবে সে। 
ডুবে যাবার আগে সাঁতার শিখে নিতে হয়,
এ কথা বলেছে সঙ্গোপনে, কোনো ইতিহাস পূর্ব অন্ধকারে। 
খেয়ালে বন্যা এনেছে, নদীধর্ম এমনই তো হয়,
মুগ্ধ চরাচর রূপে বেখেয়ালে ডুবে যাই। 
বুকে জমে থাকে কিছু বালি,
মরাকাঠ,জলে ভাসে অর্জিত-তর্পণ!

আমাকে পললভূমির কথা বলে অভিসারে।

আমি বলি,জেনেছো কি  নিষাদ নন্দিনী!কাপালিক-জীবনে একবারই তো স্নান হয় এমন!

শৌভিক বাগচী

 মৃত্যু 

চলতে চলতে থেমে যাওয়া টাই
কি  মৃত্যু ?

হিমশীতল ছাওয়ায় 
দুদণ্ড জিরিয়ে নেওয়াকেই কি 
চলে যাওয়া বলে ?

 তমিস্রার  অতলে আলোর 
কৌণিক দূরত্বে কি অমরাবতী 
তৈরি করে মৃত্যু ?

যাপিত  ছন্দের আকাশ ভেঙে পড়া 
যদি মৃত্যুই হয় ,
তাহলে এমন মরণের সারি 
ঘিরে আছে চারিধারে .....

ছায়ার মতো ভিড় করে আছে সেখানে 
লোক ,মানুষের সাথে যার 
যোজন ফারাক ।

অমোঘ যতিপাতে সে 
মিশ্রবৃত্ত মেলায় 
তুচ্ছতার চোরাবালি তলে ,

কি বলবো তাকে ??

কুশল ভৌমিক

এসো ভালোবেসেই মরি


এই উন্মুক্ত আকাশ আমাদের মাতৃভূমি। 

ফ্রগ পরা মাছরাঙাদের পিঠ দেখিয়ে 
পুকুরের জলে শুয়ে থাকে চাঁদ 
চাঁদ ও আকাশের দূরত্ব 
ছুঁয়ে দেয় আমাদের নরম শরীর।

আমাদের জ্যোৎস্নাস্নানে ধন্য হয় রাতের আকাশ।

মিটমিট তাকিয়ে থাকা লাজুক তারাদের দিকে
দু' হাত তুলে বলি-

কী অপূর্ব এই বেঁচে থাকা!

আমাদের মৃত্যুর ভয় নেই।
মৃত্যুর ভয়ার্ত চাহনিকে পাশ কাটিয়ে 
আমরা ধরতে জানি পরস্পরের হাত
অবিশ্বাসের পৃথিবীতে আমরা বিশ্বাস ফলাই
খুব ছোট এই জীবন নামের রেলগাড়ি
পরস্পরের অভিমুখে আমাদের আনন্দ ভ্রমণ। 

আমরা ভালোবেসে বেঁচে উঠি প্রতিদিন 
ভালোবেসে প্রতিদিন মরে যাই।

বিল্লাল হোসেন

মাটি

মাটি জানে কতটা পথ বাঁধা আছে 
পায়ে আমার
পথিকের পায়  
কতটা পথ হাঁটলে তবে পথিক হব।

কতটা পথ হাঁটলে বোধিবৃক্ষের 
কাছে পৌঁছোব
মাটি জানে 
কবে হবে আমার মহাপরিনির্বাণ।

রুদ্র মোস্তফা

আমি কোনোদিন প্রেমিক হতে পারিনি 

আমি এক হতে গিয়ে একের ভেতর হয়েছি অসংখ্য
অথচ আমি এককভাবে শুধু প্রেমিক হতে চেয়েছি।
প্রেমিক হলে নিশ্চয়  হত্যা করতে পারতাম না তনুকে
নিশ্চয় বিচার করতাম ত্বকী কিংবা সাগর-রুনি হত্যার
অমন দাউ দাউ আগুনে পুড়িয়ে মারতাম না নুসরাতকে
কিংবা আটকে দিতে পারতাম মুনিয়ার মৃত্যুও।

আমি প্রেমিক হতে গিয়ে হয়েছি ডাক্তার
আমার হাতেই বদলেছে মৃতের ময়নাতদন্ত— 
আমিই হয়েছি সাংবাদিক অথবা পুলিশ অফিসার
আমার হাতেই ঘটনা ঘুরেছে ভিন্নখাতে— 
হয়েছি ইঞ্জিনিয়ার,ভবন ধসিয়ে মেরেছি মানুষ
আমিই হয়েছি শিল্পপতি, হয়েছি খুব বড়ো আমলা 
আমি প্রেমিক হতে গিয়ে হয়েছি উকিল
জজ,ব্যারিস্টার অথবা আর যা যা হওয়া যায় 
তার সবই হয়েছি— শুধু প্রেমিকই হতে পারিনি।
কেননা, প্রেমিকেরা হয় অন্যরকম 
             
তাদের বুকের ভেতর থাকে প্রেম,থাকে নিজস্ব শ্রম 
হৃদয় খুঁড়ে তারা উত্তোলন করে মুঠোভরা মায়খনিজ 
প্রেমিকদের হতে হয় ভীষণ রকমের শ্রমিক।
আমি কোন দিন প্রেমিক হতে পারিনি  । 
মোহ দিয়েছে বাধা,ক্ষমতা আটকে দিয়েছে পথ—
অথচ আজীবন আমি শুধু প্রেমিক-ই হতে চেয়েছি!

আব্দুল গফফার

মেয়েটির নাম লাঞ্ছিতা

অসহায় মেয়েটির নাম লাঞ্ছিতা,
সাবালকত্ব আসেনি তখনও!
পার হতে হয় পরের ঘরে,
অনেক সুখস্বপ্ন নিয়ে ঘর বেঁধেছিল সে,
চারহাত এক করে জীবন কাটাবে।

জীবনটা যে অর্থ আর ভোগ লালসার শিকার,
পরতে পরতে বুঝেছিল যখন সে অন্তঃসত্ত্বা!
জীবনের সর্বস্ব দিয়ে লাঞ্ছিতা আজ বড় অসহায়,

শুভ পরিণয়ের পর ভালোবাসার সাগরে, 
ভেলা বেশ ভালোই ভেসেছিল
কিন্তু ছন্দপতন ঘটে যেদিন সে গর্ভবতী হয়,
যেদিন তার কোল আলো করে কন্যাসন্তান আসে।
পরিবার প্রিয়জনের লাঞ্ছনা আর গঞ্জনা
সইতে সইতে প্রাণ ওষ্ঠাগত।

কন্যাসন্তান প্রেম ভালোবাসা পরিণয়,
এই সকল শব্দগুলি বিধির নিয়মে লেখা আছে-
নারীজাতির এই অধ্যায় ইশ্বরপ্রদত্ত এবং সহজাত।
তাও কেন লাঞ্ছিতা বড় অসহায়!!

চন্দন পাল

সাহিত্য প্রতিভার ভাবনায় 

ত্রিপুরার সাহিত্য জগতে বাংলা ভাষায় কৃতিত্বের দৃষ্টান্ত রেখেছে বাইখোরার সুমন পাটারী। ২০২২ যুব পুরুস্কার, যা বিভিন্ন রাজ্যের নজর ও গুরুত্ব কেড়েছে।

  আরও কত কৃতি,  যুব থেকে বয়স্ক হয়ে গেছেন, আবার ভবিষ্যতে হয়ে যাবেন সঠিক সন্ধান ও বাঁছাইয়ের অপূর্নতায়। এই বাঁছাই  ত্রিপুরা তথ্য সংস্কৃতি দপ্তরের একটি উল্লেখযোগ্য দায়িত্ব বলে মনে করি। আমরা জানি সাহিত্যপ্রেমী সুসমাজের সুসৈনিক। তারা সংখ্যায় যত বাড়বে ততই সমাজ দূষণমুক্ত হবে। শালিনতায় গতিমান হয়ে অন্যদেশের সাথে স্পর্ধাতুল্য চমক হবে। তাদের লালন সরকারের পিতৃতুল্য ভূমিকা বলে মনে করি দেশের স্বার্থে । এ ভূমিকা শুধু সাহিত্যে নয় সংস্কৃতির প্রতিটি ক্ষেত্রে,, যেমনঃ নাচ গান খেলা কলা সেবা ইত্যাদি ইত্যাদি। 

  অবশ্যই স্থানীয় বোদ্ধা মহলের সহযোগিতা ছাড়া এ বাছাই সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে প্রতি জেলা বা মহকুমা থেকে তিনজন প্রথম সারির বা দ্বীতিয় সারির প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্ব এগিয়ে আসতে হবে যাঁরা গড়িষ্ঠমান্য ও অধিকতর নিরপেক্ষ। একটি লেখা তিনজনের কেউ একজন বুঝতে পারেনি! তা হতেই পারে না। বোদ্ধারা সাহিত্যপ্রেমী, পাঠক, প্রকাশক, অধ্যাপক, সাংবাদিক, তথ্যআধিকারীকও হতে পারেন, এবং তাঁদের মান্য প্রচারও থাকবে। 

নির্বাচিত বোদ্ধাদের পরিচয় গোপন রাখা এবং তাঁদের  মাসিক বা বাৎসরিক সাম্মানিক দেওয়া আবশ্যক মনে করি, কারণ কাজটিতে মানসিক চাপ আছে। 

  কাজটির বিভিন্ন শাখা থাকবে ও প্রতি শাখায় নম্বর পদ্ধতি দেওয়া থাকবে। তিনজনের প্রাপ্ত নম্বর যোগ করে যে বেশি হবে সে বছরের সেরা ক্রমিক  হিসাবে গন্য হবেন। তাদেরও বাৎসরিক সাম্মানিকের ব্যবস্থা প্রয়োজন, উৎসাহের লক্ষ্যে। এখানে বিচারকও সাহিত্য রচকের দলে থাকতে পারবেন। আর যদি বিচারক সেরা নির্বাচিত হন সেক্ষেত্রে তার প্রাপ্ত সাম্মানিক অর্ধেক হলেই ভাল হবে কারণ তাঁর একটি বাঁধা সাম্মানিক রয়েছে।

যে শাখাগুলি বিচার করতে হবে,,, (১০ নম্বরের মধ্যে) 

 সেগুলি হতে পারে,,১)লেখা ও আচরণের মিল, ২)নিয়মিত কিনা, ৩)বিষয়বার্তার গুরুত্ব, ৪)শিল্পেররূপ, ৫)গঠনপ্রয়োগ, ৬)ভাষা'র সেবা, ৭)শুদ্ধ ও সচেতন সাহিত্যের মাত্রা,,, ইত্যাদি ।এছাড়া আরও কিছু বিষয় সংযোজিত হতে পারে।

   গল্প প্রবন্ধের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সাময়িকী পত্রিকা বই ও মুঠোফোনে সক্রিয়তার পাশাপাশি উপরোক্ত শাখাগুলির  অর্জন দেখা যেতে পারে ।

নমিতা সরকার

যত্নের যাতনা রঙ

আমার কষ্টগুলো কাউকে দিইনা, এগুলো দিয়ে জলরঙের ছবি আঁকতে ভালোবাসি, আকাশের রংধনু বদলে যেমন নীলের মেলায় ডুবে যেতে যেতে মেঘের বুক চিরে যেমন বর্ষা নামে তেমন করে আঁকিবুঁকি করি হৃদপিণ্ডের পাথর হওয়া টুকরো মাঝে।
পাথরের টুকরো গুলোও ডুবতে থাকে নোনা সমুদ্রের অতলে তবুও সেখানে স্বপ্নেরা চিত্র আঁকে জলজ উদ্ভিদের মতো। 
কোনো একটা সময় যেমন ডিসকভারির দৃশ্যপটে সেজে ওঠে আশ্চর্য সৌন্দর্যে। 
অবাক হয়ে নির্বাক দৃষ্টিতে জেগে ওঠে কিছু সুখ নোনা সৈকতে ঝিনুকের বুকে মুক্তার অন্তরে।

নিয়তি রায় বর্মন।

দোল বা বসন্ত – যা বহিবাংলায় ও বিশ্বে হোলি নামে পরিচিত

শীতের রুক্ষ শুষ্ক দিনের অবসান ঘাটিয়ে ঋতুরাজ বসন্ত আসে। ফাল্গুন-চৈত্র দুই মাস বসন্ত কাল। ক্যালেন্ডারে ফাল্গুন মাস শুরু হতেই যেন প্রকৃতি জগৎ বদলে যায়। গাছে গাছে কচি সবুজ পত্র, আম্রমুকুল, কোকিলের কুহুতান। পলাশ, শিমুল, রঙ্গন, কৃষ্ণচূড়া প্রকৃতিকে রাঙিয়ে দেয়। কাঁঠাল গাছে মুচির ঝাঁক— অদূর ভবিষ্যতে রসালো ফল যাবে ঘরে ঘরে ভোজন রসিকের রসনা তৃপ্ত করতে। দোলযাত্রা উৎসব শান্তিনিকেতনে বসন্ত উৎসব নামে পরিচিত। এই নামের প্রচলন করেছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ – ১৯৩২ সালে। প্রথমে ঘরোয়াভাবে হতো— ক্রমে এর বৈচিত্র বৃদ্ধি পায়। শান্তিনিকেতনে বসন্ত উৎসবে প্রাক্তনীসহ বহু মানুষের ভিড় হয়। যে শৈল্পিক ও নান্দনিকতায় সেখানে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় তা উপভোগ্য এবং শিক্ষণীয়। রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনে ধর্মের খুঁতমার্গ, সামাজিক বিধিনিষেধ বা লোকাচারের বাড়াবাড়ি কিছুই ঘেঁষতে পারেনি। বসন্ত উৎসব আন্তরিক, অমলিন এবং আনন্দের উৎস।

১৯০৭ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি, বসন্ত পঞ্চমীতে রবীন্দ্রনাথের কনিষ্ঠ পুত্র স্বল্পায়ু শমীন্দ্রনাথের উদ্যোগে শান্তিনিকেতনে ঋতু উৎসবের সূচনা হয়েছিল। এরই পরিবর্তিত ও পরিমার্জিত রূপ বর্তমানের বসন্ত উৎসব। এর সূচনা সরস্বতী পূজার দিন শুরু হলেও পরবর্তী সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিদেশ সফর ইত্যাদি কারণে দিনক্ষণ পরিবর্তন হয়েছে। নববর্ষ উদযাপন হতো অত্যন্ত আনন্দ ঘটা করে। নববর্ষ ও বসন্ত উৎসবের মতো কোন ধর্মীয় আচার অনুমোদন পায়নি। নববর্ষের দিনে গণেশ পুজো হাল খাতা, আমপাতা, সিঁদুর, পঞ্জিকা ছাড়াও যে নববর্ষ আনন্দ উৎসবে পরিণত হতে পারে তা রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষা ও বাঙালি সমাজকে শিখিয়ে গেছেন। ধর্মীয় অনুষঙ্গ ব্যতিরেকে রবীন্দ্রনাথের ভাবনার বসন্ত উৎসব ও বর্ষবরণ এক অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে আজকের বাংলাদেশ। ধর্ম- বর্ণ নির্বিশেষে সকলের উৎসবে পরিণত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে যে বসন্ত উৎসব চালু করেছিলেন তাতে যে শিক্ষণীয় দিকটি রয়েছে তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ছাত্রছাত্রীদের দলগতভাবে যে নাচ, গান, নাটকের মহড়া দেওয়া এবং উপস্থাপন করা হয় তা এখন সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। পাশাপাশি সম্প্রীতির বাণী – ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সৌভ্রাতৃত্ববোধ জাগিয়ে তোলে। আনন্দ— যে আনন্দে কোন ক্লেদ নেই— অনাবিল। কোন ধর্মীয় আচার, সংস্কার বা কুসংস্কারের কোন বেড়াজাল নেই। “ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল”- এই গান দিয়ে সকালে শাইন্তনিকেতনে বসন্ত উৎসব শুরু হয়। ছাত্রছাত্রীদের সাজ পোশাক ও ফুলের ব্যবহার লক্ষ্য করার মতো। ছোট ছোট মেয়েদের বাসন্তী রঙা শাড়ি পড়ে সারা শরীরে ফুল দিয়ে সেজে গান ও নাচের ভঙ্গিমা মুগ্ধ করে। এ এক অপরূপ কলা প্রদর্শন।

রঙিন বসন্তকে আরো রঙিন করে তোলে দোল খেলা। দোলযাত্রা বা হোলি উৎসবের পৌরাণিক উপাখ্যান রয়েছে। দোলযাত্রার আগেরদিন বহুৎসব হোলিকাদহন বা নেড়াপোড়া। ভাগবত পুরাণে আছে অসুর রাজা হিরণ্যকশিপুর অমর হবার সাধ জাগে। এই উদ্দেশ্যে তিনি ব্রহ্মার ধ্যানে বসেন এবং যথারীতি বর প্রাপ্ত হন। এই বর লাভ করে দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপু অত্যন্ত অহঙ্কারি ও উদ্ধৃত হয়ে ওঠেন। অমরত্ব পেয়ে তিনি ঘোষণা দেন কেবল তাকেই দেবতা হিসাবে পূজা করতে হবে – অন্য কোন দেবতাকে নয়। যদি কেউ তার আদেশ অমান্য করে তবে শাস্তি পাবে এমনকি মৃত্যুদণ্ডও হতে পারে। কিন্তু হিরণাকশিপুর পুত্র প্রহ্লাদ পিতার সাথে সহমত হননি এবং পিতাকে পূজা করতে অস্বীকার করেন— কারণ প্রহ্লাদ বিশ্বভক্ত, বিষ্ণুপূজাই তিনি যথারীতি চালিয়ে যান।

এতে হিরণ্যকশিপু রাগান্বিত হয়ে পুত্র প্রহ্লাদকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন। হিরণ্যকশিপু বোন হোলিকার কাছে এ বিষয়ে সাহায্যপ্রার্থী হন। হোলিকাও অমরত্ব লাভ করেছিল ব্রহ্মার নিকট থেকে। দেবহতাগণ রাক্ষসদের অমরত্ব বর সহজে দিতেন না—আর দিলেও এর মধ্যে নানা ফাঁকফোঁকর থেকে যেত। হোলিকা আগুন থেকে রক্ষা পাবার জন্য বর হিসাবে একটা বিশেষ পোশাক পেয়েছিলেন। এই সুযোগের সদব্যবহারের উদ্দেশ্যে হিরণ্যকশিপু পুত্র প্রহ্লাদকে বোন হোলিকার কোলে বসিয়ে আগুন ধরিয়ে দেন যাতে প্রহ্লাদ আগুনে পুড়ে মারা যান আর হোলিকা বেঁচে যান।

কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল আগুন লাগানোর পর পোশাকটি হোলিকার গা থেকে প্রহ্লাদের শরীরে ওঠে যায়। এতে প্রহ্লাদ আমদানি বেঁচে যান আর হোলিকা দগ্ধ হয়ে মারা যান। এতে হিরণ্যকশিপু জব্দ হলেন। এদিকে বিষ্ণু শিষ্য প্রহ্লাদের জীবন রক্ষা পেয়েছে দেখে তিনি নৃসিংহ অবতার রূপে (অর্ধমানব- অর্ধসিংহ) গোধূলি লগ্নে (দিন ও রাতের মাঝামাঝি সময়ে) আবির্ভূত হন এবং ঘরের চৌকাঠে নিয়ে যান হিরণ্যকশিপুকে এবং নিজের কোলে বসিয়ে (না বায়ুতে না স্থলে) তার পেটের নাড়িভুড়ি বের করে হাতের থাবা বসিয়ে হত্যা করে। অর্থাৎ অস্ত্রশস্ত্র কিছুই ঐ হত্যাকাণ্ডে ব্যবহার করা হয়নি। এভাবেই বিঘ্ন অবতার (নৃসিংহ) প্রহ্লাদকে রক্ষা করেন এবং দৈত্য রাজ হিরণ্যকশিপুকে হত্যা করে মানবজাতির স্বস্তি বিধান করেন। অর্থাৎ অশুভের ওপর শুভের জয়। বর্তমানে হোলির পূর্বদিনে হোলিকা দহন বা নেড়াপোড়া উৎসব এ ঘটনারই ইঙ্গিতবাহী। অশুভের বিনাশ করে শুভের সূচনা।

দুষ্টের দমন এবং ভক্তদের রক্ষার জন্য শ্রীকৃষ্ণ মথুরায় দোল উৎসবের সূচনা করেছিলেন। দোল পূর্ণিমা উপলক্ষে সকল বর্ণের মানুষকে আবির এবং রঙ খেলার মাধ্যমে এক করে নেওয়াই ছিল উদ্দেশ্য। শ্রীকৃষ্ণের প্রস্তাবে নন্দরাজা সানন্দে রাজি হন। যমুনা নদীর তীরে মাটি দিয়ে তিন ধাপ বিশিষ্ট দোলের বেদী বানানো হয়। দোলের বেদীর প্রথম ধাপে অর্থাৎ সর্বোচ্চে বসবেন শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীরাধিকা। গোপ বালক বালিকারা আবির রঙ দিয়ে দোলের বেদী রাঙিয়ে দেবে এবং শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীরাধিকার পূজা করবে। সংকীর্তন করবে- “ রাধে কৃয়, রাধে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ রাখে রাখে।” উপস্থিত সবাই নিজেদের মধ্যে রঙ খেলবে এবং গুরুজনদের রঙ দিয়ে প্রণাম করবে। দোল উৎসবটি হিন্দুদের একটি অত্যন্ত পবিত্র উৎসব। হিন্দু শাস্ত্রে রঙের একটা বিশেষ গুরুত্ব আছে। বিভিন্ন পূজায় ঘটের নীচে আলপনা দেওয়া হয় পঞ্চ রাঙে। এই পঞ্চ রঙ্ হলো— চালের গুড়া দিয়ে সাদা রঙ, লাল জবা ফুল শুকিয়ে গুড়া করে লাল রঙ, বেলপাতা শুকিয়ে গুড়া করে সবুজ রঙ, শসাহীন ধান পুড়িয়ে গুড়া করে কালো রঙ। 

বর্তমানে অসাধু ব্যবসায়ীগণ নানা রাসায়নিক উপাদান দিয়ে রঙ তৈরি করে— যা শরীরের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর। এসব কৃত্রিম রঙ থেকে চর্মরোগ, চোখ জ্বালা এমনকি অন্ধত্ব পর্যন্ত হতে পারে। দোলযাত্রা একটি হিন্দু বৈয়ব উৎসব। এটিই বহির্বঙ্গে হোলি নামে পরিচিত। বৈপ্লব বিশ্বাস অনুযায়ী ফাল্গুনি পূর্ণিমা বা দোল পূর্ণিমার দিন বৃন্দাবনে শ্রীকুয় আবির ও গুলাল নিয়ে রাধিকা ও অন্যান্য গোপিনীর সঙ্গে রঙ খেলায় মেতেছিলেন। সেই ঘটনা থেকেই দোল খেলার উৎপত্তি হয়। ঐ পরম্পরা থেকে দোল পূর্ণিমা দিন রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহ আবির ও গুলালে স্নাত করে দোলায় চড়িয়ে নগরকীর্তনে ভক্তরা বের হয়। নারীপুরুষ সকলে এতে অংশ নেয়। দোল পূর্ণিমার আগের দিন বাৎসব বা হোলিকাদহন হয়। বাংলা অঞ্চলে দোল উৎসবটি দোল পূর্ণিমার পরদিন অনুষ্ঠিত হয়। আর 'হোলিকা' থেকে 'হোলি' নামটি এসেছে। বাংলার দোল উৎসবটি সারা বিশ্বে 'হোলি' নামে পরিচিত।

দেশ বরেণ্য দেশজয়ী পন্ডিত "নদের নিমাই' জন্মেছিলেন মায়াপুরে ১৪৮৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ ফেব্রুয়ারি ফাল্গুনি পূর্ণিমাতে। পিতা বৈদিক ব্রাহ্মণ জগন্নাথ মিশ্র নাম রাখেন 'বিশ্বন্তর'। মাতা শচীরানি আদর করে নাম দেন 'নিমাই'। এ নামেই তিনি পরিচিতি লাভ করেন। গায়ের রড় অত্যন্ত ফর্সা বলে তাঁকে 'গৌর নামেও অভিহিত করা হত। মাত্র ষোল বৎসর বয়সে তার্কিক পণ্ডিত নিমাই গয়া যান পিতার পিণ্ডদান করতে। সেখানে বৈষ্ণব শ্রেষ্ঠ ঈশ্বর পুরী মহারাজের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। মহারাজ নিমাই এর মধ্যে স্বয়ং কৃষ্ণের রূপ দর্শন করেন এবং তাকে দীক্ষা দেন। দীক্ষান্তে নিমাই এর মধ্যে কৃয়প্রেম জাগ্রত হয়। নদীয়ায় ফিরে এসে সকল বৈয়বদের সাথে নিয়ে সংকীর্তন শুরু করলেন। এই আচরণে কোন উচ্চ-নীচু ভেদ ছিল না। পাণ্ডিত্বের লড়াই, পাঠশালা ত্যাগ করে হরিনামে সবাইকে এক সারিতে নিয়ে এলেন। নিত্যানন্দ প্রভুর সঙ্গে পরিচয় হলে “গৌর-নিতাই” এই দুজন সমস্ত সংকীর্তনের পুরোধা হয়ে যান। বৈদিক ব্রাহ্মণকুলে জন্ম গ্রহণ করে এভাবে নীচ জাতের সঙ্গে সংকীর্তন করা ব্রাহ্মণরা মেনে নেননি।

নিমাই পণ্ডিত বুঝেছিলেন মানুষে মানুষে ভেদ থাকলে মানুষের বা সমাজের উন্নতি হতে পারে না। মানুষের মধ্যে পরস্পরের প্রতি প্রেম ভালোবাসা জাগানো দরকার। পরস্পরের জীবনের সমস্যা পরস্পরকেই জানতে হবে— তবেই সমাধানের রাস্তা পাওয়া যাবে। শান্তি বজায় থাকবে। একমাত্র ভালোবাসা দিয়েই মানুষকে বাধা যায়। অসহায়কে দান করলে তা সম্মানের সঙ্গেই করা বাঞ্ছনীয়। মাত্র চব্বিশ বৎসর বয়সে কেশব ভারতীর নিকট থেকে সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণ করেন। তারপর তিনি গৃহ ভাগ করে বৃন্দাবন যাবার জন্য মনস্থির করলে মাতা শচিরানির আদেশে জগন্নাথ ধাম পুরীতে যান। সেখানে গিয়ে তিনি হরিনাম সংকীর্তনে উঁচু-নীচু সকল মানুষকে এক সূত্রে গাঁথার কাজ শুরু করেন। মানব প্রেম ছড়িয়ে দেন। কিন্তু তথাকথিত ব্রাহ্মণদের তা পছন্দ হয়নি বলে তাঁকে রুষ্ট রোষে পড়তে হয়। তাঁর মৃত্যুটা রহস্যময়। গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু পুরীতে থাকার সময় প্রতি বছর বসন্ত পূর্ণিমায় ভক্তদের নিয়ে নগর কীর্তনে বেরিয়ে পড়তেন।

ভক্তদের আন্তরিক প্রয়াসেই দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে অন্তত শতাধিক দেশে দোল উৎসব বা বসন্ত উৎসব বর্তমানে উদযাপিত হচ্ছে। দেশ বিদেশের মানুষ স্বীকার করে নিয়েছে এই উৎসব প্রেমের, হৃদয়ের এবং ভালোবাসার। মানব বৃত্তির জাগরণ, রাক্ষস বৃত্তির নাশ। এই বিশ্বাস নিয়েই বসন্ত উৎসব বা দোল খেলা বা হোলি অদ্যাবধি উদযাপিত হচ্ছে। এর প্রচার ও প্রসার বেড়েই চলেছে।

মধুরা বৃন্দাবনে পালিত হয় লাঠমার হোলি। পুরাণ কাহিনি অনুযায়ী রাধাকৃষ্ণের আমল থেকে সেখানে হোলি খেলায় গোপিনীরা লাঠি ব্যবহার করত। কৃষ্ণ ছোট বেলায় যশোদা মাকে প্রশ্ন করেছিলেন তিনি কেন শ্যামলা আর রাধা কেন ফর্সা। বালক কৃষ্ণকে শান্ত করার জন্য যশোদা মা মজা করে বললেন রাধার গায়ে রঙ মাখিয়ে দিতে। তাইলে আর রাধার গায়ের রঙ যে ফর্সা তা বুঝা যাবে না। কৃষ্ণ তখন বন্ধুদের নিয়ে রাধা ও গোপিনীদের রঙ মাখাতে গেলে ওরা লাঠি দিয়ে কৃষ্ণ ও তাঁর বন্ধুদের পেটায়। এই সূত্র থেকেই এখনও মথুরা বৃন্দাবনে মহিলাগণ হোলির সময় পুরুষদের মারে। এই মজার হোলি খেলা দেখার জন্য বহু লোক সমাগম হয়। দেশ বিদেশের লোক আসে এই ঐতিহ্যবাহী হোলি খেলা দেখার জন্য।

উৎসঃ বসন্ত উৎসব বা দোল পূর্ণিমার উদযাপন খ্রিস্টের জন্মের প্রায় ৩০০ (তিনশত) বৎসর পূর্বে প্রাচীন আর্যজাতি ভারতের পূর্বাঞ্চলে সূচনা করেন। মধ্যপ্রদেশের রামগড়ে পাথরে খোদাই করা গুহালিপিতে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। আবার খ্রিস্টিয় তৃতীয় শতকে বাৎসায়ন রচিত 'কামসূত্র'-তে রঙ খেলার উল্লেখ রয়েছে। ৭ম শতকে হর্ষবর্ধন রচিত ‘রত্নাবলী' এবং ৮ম শতকে 'মালতী মাধব' নাটাকে দোল উৎসবের বর্ণনা পাওয়া যায়। জীমূতবাহনের 'কাল বিবেক' ও ষোড়শ শতকে রঘুনন্দন এর রচনায় হোলি উৎসবের উল্লেখ রয়েছে। আরো নানা পৌরাণিক সাহিত্যে দোল পূর্ণিমা ও রঙ খেলার কথার উল্লেখ আছে।

ঋতুরাজ বসন্তের প্রাকৃতির বৈশিষ্ট্যও অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এ ঋতু নিয়ে কাব্য সাহিত্যেরও অন্ত নেই। তবে দোল উৎসব বা রঙ খেলা যখনই যেখানে চালু হয়েছে তা সমাজের মঙ্গলের জন্যই হয়েছে। অর্থাৎ ভেদবুদ্ধি বাদ দিয়ে পরস্পরকে আলিঙ্গন করা। ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ ভেদে উৎসবে মেতে ওঠা।

সোনালী রায় বাগচী

বিসর্জন

" উহঃহঃ...আবাগীর বেটির ঘুম কত ! আবার দেয়ালা কচ্ছেন ঢং মেরে । চাঁপা....ও চাঁপা....বলি চোখটা খুলবি , নাকি ? সকাল গড়িয়ে গেলে ঘোষ গিন্নির বাড়ির কাজটা করবে তোমার কোন ভাতারে , অ্যাঁ...? ' সক্কাল সক্কাল মায়ের চিল্লামিল্লিতে ঘুমটা ভেঙে গেল চাঁপার । ধুর...কি সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখছিল সে ...। সবে মাধুরী দীক্ষিত নাচটা শুরু করেছিল! সেও তো অমন নায়িকাই হতে চায়। কি সুন্দর সাজ , কেমন পোশাক , কত্ত বড়লোক!! মা দিলো সব নষ্ট করে....ধুর, ভাল্লাগে না । চোখ ডলতে ডলতে উঠে বসলো চাঁপা । তার চোখে মুখে এখনো পুরো না হওয়া স্বপ্নের রেশ । তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে আবার মুখ ঝামটা দিয়ে উঠলো মালতি , " বলি গতরখানা নাড়বে নাকি কোলে তুলে নিয়ে যেতে হবে ? আমার হয়েছে যত জ্বালা । মেয়ের বাপ তো জন্ম দিয়েই কোন এক ভাতারখাগীকে নিয়ে ঘর ছাড়লো...। এখন সারা জীবন এই বোঝা বয়ে চলতে হবে আমাকে । " রোজকার এই একই ঘটনা । চাঁপাও অভ্যস্ত হয়ে গেছে মায়ের শাপ শাপান্ত শুনতে শুনতে । 

               আড়মোড়া ভেঙে কলতলায় গেল সে । মুখ ধুতে ধুতেই শুনতে পেল একটা পরিচিত গলার স্বর...নারান শয়তানটা । কদিন ধরেই খুব ঘোরাঘুরি করছে এদিকে । চোখের চাউনিটাও যেন কেমন অদ্ভুত । মায়ের সাথে কি অত কথা যে বলে শয়তান মিনসেটা বোঝে না চাঁপা । কিন্তু বুকের ভেতরটা কেন জানি শিরশির করে একটু । নাঃ... আর দেরি করলে হবে না । ঘোষ বাড়ির মাসি বলেছিল আজ নতুন জামা দেবে । আর তিনদিন পরেই তো পুজো । মনটা হঠাৎই খুশিতে ভরে উঠলো চাঁপার । 

                আজ বিজয়া দশমী । বাইরে ঢাক বাজছে । ঠাকুর বিসর্জনের বাজনা । চাঁপার পরনে এখন চুমকি বসানো শাড়ি... নতুন । ঠোঁটে চড়া লিপস্টিক । চুলে রজনীগন্ধার মালা । বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদতে কাঁদতেই তার নাকে ভেসে এলো একটা তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ । বেশ বুঝতে পারলো ঘরে ঢুকে দরজাটা কেউ বন্ধ করলো সশব্দে । চোখটা বুঁজে ফেললো চাঁপা....এখন দেবীর বিসর্জন হবে ।

পঙ্কজ কান্তি মালাকার

রাঙামাটির রাজকন্যে

ক্ষীরসাগরে মুখ ডুবাবো স্বপ্ন ছিল
শীতলপাটির স্নিগ্ধতায় সাত পাঁকে বাঁধলে,
আমার গন্ধরাজ বাগানের স্বপ্ন
শিমুল তুলার মতো উড়ে গেল
রাজগাঁদার সুবাসে দু-বাহুতে জড়ালে,
ও রাঙা মাটির দেশের রাঙা মেয়ে
রোদেপোড়া দুপুর তালপাখা-হাওয়ায় রাঙালে।

ও আমার ব্যাধজীবনের ফুল্লরা
শাকান্নে সংসার রাখলে পাতে,
এই মাটির পৃথিবীতেই নিজগুণে
রূপকথার রানী হয়ে উঠলে,
জীবন যখন স্বপ্নসম আর কি স্বপ্ন দেখি?
তোমার আঁচলছায়াতেই ক্ষীরসাগর
আমি লক্ষ্মীপতি।

শুভ্রা সাহা

ভারতের নারী শিক্ষা ও ভগিনী  নিবেদিতা        

মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল ,স্বামী বিবেকানন্দের সাক্ষাতই জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ ঘটনা । জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু।  যার গতি ও পরিণতি অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত ও অভাবিত ।অখন্ড ভারতের জন্য নিবেদিতপ্রাণ । আপামর ভারতবাসীর   ভগিণী  নিবেদিতা । অসামান্য প্রতিভার অধিকারী ।এই বিদেশী নারী সূদূর  উত্তর আয়ারল্যান্ডের অধিবাসী । ভারত পথিক বিবেকানন্দ সংস্পর্শে এসে ভারতকে নিজের দেশ ও ভারতবাসী কে আপনজন রূপে গ্রহণ করেন ।পরাধীন ভারতের দৈন্যদশা  তাঁকে অত্যন্ত ব্যথিত করে । তাই স্বামী বিবেকানন্দের আদেশ অনুসারে  ভারতের নারী জাতি ও তাদের শিক্ষার দায়িত্বভার গ্রহণে উদ্যোগী হন ।কারণ নারী  ও  নিম্ন শ্রেণীর উন্নতি ছাড়া ভারতের জাতীয় জীবনের পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। ভগিনী নিবেদিতা মনে করেন শুধুমাত্র ইংরেজি  লিখতে ও পড়তে   পারাই শিক্ষা নয় । মানুষ হওয়ার শিক্ষা লাভ করতে হবে । তাই 1898 খ্রিস্টাব্দে নভেম্বর মাসে স্বামীজীর পরিকল্পনা অনুসারে বাগবাজার অঞ্চলে  একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। সেখানে ছাত্রীদের লেখাপড়ার দায়িত্ব ভগিণী  নিবেদিতা নিজেই নেন । তিনি মনে করতেন এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা আবিষ্কার করা প্রয়োজন যা ভারতের নারী সমাজকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে সমর্থ হবে । তিনি চাইতেন অতি সাধারণভাবে নিজে একাই মেয়েদের শিক্ষা দান করবেন । ছোট ছোট মেয়েদের যেভাবে বানান শেখানো হয় তিনিও সেইভাবেই শিক্ষা প্রণালী কে সাজিয়ে নেন । তার শিক্ষার মধ্যে একটা আধ্যাত্মিক ভাব ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির  ভাব উপলব্ধ করা যায় । জাত  পাতের ভেদাভেদ কুসংস্কারের বেড়াজাল থেকে মুক্ত হয়ে তিনি কয়েকজন ছাত্রী নিয়ে নিজের বিদ্যালয় এর কাজ শুরু করেন । তাঁর বিদ্যালয় এর কাজে সারদা মায়ের অফুরন্ত অবদান ও স্নেহের স্পর্শে তাকে আরো কর্মমুখী করে তোলে।  বিদ্যালয় এর খরচের জন্য কাশ্মীরের   মহারাজা আটহাজার ( 8000 )টাকা দান করেন  ।নিবেদিতা বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের বুঝিয়ে ছোট ছোট মেয়েদের স্কুলে নিয়ে আসতেন ।

তিনি একজন অভিজ্ঞ শিক্ষিকা ছিলেন।  বিভিন্ন পদ্ধতিতে খেলার ছলে তিনি শিক্ষাদান করতেন । বিদ্যালয়ে  মেয়েদের ছবি আঁকা , মাটি দিয়ে মূর্তি গড়া , সেলাইয়ের কাজ,  ঘর গেরস্থালির কাজ,  বৈদিক আচার আচরণ , পূজা-অর্চনা মানব সেবা,  রোগীর শুশ্রূষা ইত্যাদি বিভিন্ন কাজ শেখাতেন এবং নানাভাবে তাদেরকে উৎসাহিত করতেন ।  ক্লাশে নানা বিষয়ে তাদের গল্প বলতেন ।  গল্পের মাধ্যমে পাঠ্য বিষয়বস্তু কে আকর্ষণীয় করে তুলতেন । যাতে মেয়েরা পড়াশোনায় মনোযোগী হয়ে ওঠে বিদ্যালয়- কাজে নিবেদিতার অদম্য উৎসাহ ছিল । কিন্তু তাকে স্থায়ী ও  হিতকর  করে  তুলবার  জন্য অর্থের প্রয়োজন ছিল ।  ছিল কিছু নারীর । যারা বিদ্যালয় এর জন্য জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকবে  ।তখনকার হিন্দু সমাজে কোন কুমারী কন্যার পক্ষে এ  কাজ অসম্ভব ছিল । তাই যারা বাল্যবিধবা বিশেষত পিতৃ-মাতৃহীন বালিকা গনকে যথাযথ শিক্ষা দিয়ে মহৎ উদ্দেশ্যকে সফল করার পরিকল্পনা নেন। কর্মক্ষেত্রই  গৃহ এবং ধর্মই একমাত্র বন্ধন হবে । তাদের ভালোবাসা থাকবে কেবল গুরু , স্বদেশ ও জনসাধারণের প্রতি,  কিন্তু তার জন্য অর্থের প্রয়োজন ছিল । তাই নিবেদিতা বিদেশে পাড়ি দেন  অর্থেের জন্য।    ,প্রত্যাবর্তনের  পর    বিদ্যালয়টিকে  পুনর্গঠন এর উদ্যোগ নেন । সেই সময় স্বামীজির তিরোধানে তাঁর চিত্ত অশান্ত থাকায় ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে বেড়ান । পরবর্তী সময়ে নিজেকে শান্ত করে , স্বামীজি  নারী শিক্ষার উন্নতি কল্পে যে সকল পরিকল্পনা ছিল তা বাস্তবায়নে মনোযোগী  হোন ।  এর জন্য   শিক্ষয়িত্রী  নিয়োগ করেন ।  1902সালে        সরস্বতী পূজা অনুষ্ঠানের পর বাগবাজার  অঞ্চল এর ছাত্রীরা  বিদ্যালয়ে পুনরায় আসতে শুরু করে । সেইসময় বিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য নির্দিষ্ট পাঠ্যপুস্তক ছিল না ।কিন্ডারগার্ডেন প্রণালীতে মুখে মুখে শিক্ষাদানের রীতি ছিল। সেলাই   ছবিআঁকা  ,খেেলা ধুলাই ছিল প্রধান ।


নিবেদিতা  ছিলেন   একজন  আদর্শ শিক্ষাবিদ । তিনি প্রত্যেক ছাত্রীদের পর্যবেক্ষণ করতেন এবং তাদের সম্বন্ধে বিভিন্ন রিপোর্ট তৈরি করতেন ।তখন বিদ্যালয়ের ছাত্রী সংখ্যা ছিল 45 জন ।তিনি ছাত্রীদের বিবরণ, পড়াশোনা , উপস্থিতি প্রভৃতি বিষয় নিয়ে রিপোর্ট লিখতেন  ,এতে অতি অল্প সময়ে ছাত্রীদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়ে  উঠতে।  পড়তে আসার বাইরে ও ছাত্রীরা নিবেদিতার কাছে আসত বা রাস্তায় দেখা হলে তার কাছে ছুটে যেত।  তিনিও তাদের কাছে ডেকে আদর করতেন  ।  এই ছোট ছোট মেয়েদের কাছ থেকে তিনি বাংলা  শিখে নিতেন । খুব কম ছাত্রী বিদ্যালয়ে  আসতো  । অভিভাবকরা তাদের লেখাপড়ার কোন খোঁজ খবর নিতেন না   । এতে নিবেদিতা খুব দুঃখবোধ করতেন । আবার দেখা যেত বুদ্ধিমতী  ও পাঠে  মনোযোগী কোন কোন ছাত্রীর কিছুদিন পরেই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে  ।এতে তিনি হতাশ হয়ে পড়তেন । তখন বাল্য বিবাহ প্রথা কে রোধ করা প্রায় অসম্ভব ছিল  ।  তাই তিনি ঠিক করলেন এবার অন্তঃপুরিকা গণের শিক্ষার ব্যবস্থা করবেন ।  বক্তিৃতা দেওয়ার জন্য যেখানেই গেছেন তিনি মহিলা সভাই বেশি বক্তৃতা দিতেন এবং তাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহ প্রকাশ করতেন ।  এর প্রধান উদ্দেশ্য নারী শিক্ষা এবং ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্যকে স্মরণ করিয়ে তাদের দায়িত্ব পালনে সচেতন করা ।তিনি তাঁর বিভিন্ন পুস্তকেও ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্যকে তুলে ধরেন।

 

। তিনি নিজ গৃহে চন্ডী পাঠের আয়োজন করেন   এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে মহিলাদের নিমন্ত্রণ করে আসেন ।  তাদের সান্নিধ্য নিবেদিতা কে উৎসাহিত করে তুলতো ।এই ভাবে তিনি  সকলের প্রিয় হয়ে ওঠেন এবং বিভিন্ন ভাবে মহিলাদের স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার প্রেরণা যোগান  ।তাদের একটা শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য পরিকল্পনা গ্রহণকরেন ।  তিনি বয়স্ক মহিলাদের জন্য আলাদা বিদ্যালয় স্থাপন করেন ।

  নিবেদিতার বিদ্যালয়ের ছাত্রীরা  প্রাচীনপন্থী পরিবারের কন্যা  , বধূ । কাজেই পর্দা প্রথা  অক্ষুন্ন রেখেই বিদ্যালয়ে যাতায়াতের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা ছিল ।এভাবে তার বিদ্যালয়ে বিধবা ও বিবাহিত মহিলারা সহজে শিক্ষার সুযোগ পান এবং অভিভাবকরা ও নিবেদিতার বিদ্যালয় এর উদ্দেশ্য যে হিন্দু সংস্কৃতি ও রীতিনীতি অনুযায়ী পরিচালিত এ ব্যাপারে নিশ্চিত হন  । 

ভগিণী  নিবেদিতা বিদ্যালয়টি বর্ধিত হয়ে বহু সংখ্যক শিক্ষার্থী শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ লাভ করে  ।  তিনি নিজে আলাদাভাবে বিদ্যালয়ে শিক্ষয়িত্রীর কিন্ডারগার্ডেন ট্রেনিং দিতেন  ।বিদ্যালয়   সেলাই  ও অংকনের ক্লাস নিতেন  ।ইতিহাস ও ইংরেজি পড়াতেন   । প্রতিদিন বিদ্যালয় আরম্ভ হওয়ার পূর্বে বালিকারা ঠাকুরদালানে রামকৃষ্ণের প্রতিকৃতিতে পুষ্পাঞ্জলি প্রদান করত , প্রণাম পূর্বক সমবেত কণ্ঠে নানাবিধ স্তব পাঠ এর সহিত বন্দে মাতরম গানটি  গাইত।বিদ্যালয়ের  নির্দিষ্ট নাম ছিল না । স্থানীয় লোকেরা সিস্টার নিবেদিতা স্কুল বলতো ।  নিবেদিতা রামকৃষ্ণ গার্লস স্কুল নামে নাম দেন । কেউ কেউ বিবেকানন্দ স্কুল বলতেন  ।নিবেদিতা দেহত্যাগের পর বিদ্যালয় এর নাম হয় শ্রী  রামকৃষ্ণ মিশন সিস্টার নিবেদিতা গার্লস স্কুল  ।

সুমিতা বর্ধন

ইতিহাসের পাতায়

লাল বাক্স গুলো আজ আর চোখে পড়ে না
রাস্তার মোড়ে মোড়ে ওই বাক্স
লাইটপোস্টের সাথে জড়াজড়ি করে থাকা বাক্সে
 ভরা থাকতো হরেক রকম
দুঃখ বেদনা আর হাসি কান্নার সাতকাহন,
খাঁকি উর্দি পড়া মানুষগুলো
পৌঁছে দিতো ওই সাতকাহনের
দলিল বা  পরচাগুলো,
কারো মুখে হাসি ,কারো কান্না
লেখা থাকতো ওই পরচায়,
কিন্তু খবর পৌঁছতে লাগতো
 দুই চার পাঁচ বা তারও বেশি দিন,
দিন মাস বছর পেরোয়
চোখে পড়ে না সেই ডাক বাক্স
আধুনিকতার ছোঁয়ায় মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে
সেই হাসি কান্না আর সুখের দলিল গুলো।
আর সেই ডাক বাক্স থেকে যায়
ইতিহাসের পাতায়।

মোঃরুবেল

বারুদঘর

ক্রমশ সে বেড়ে উঠছে।
তবে মাংস পিন্ডে নয়,
ঘৃণা আর ঘৃণায়।
যৌবনে নদী যেমন ছলাৎ ছলাৎ শব্দে 
শিশু পাথর বয়ে আনে,
জায়গা করে দেয় তার বুকে।
একদা নদী তার অস্তিত্ব হারায়।
করে অভিমুখ পরিবর্তন।
অমনি করে সেও তার পাঁজরে ঘেরা নরম হৃদয়ে-
ভালোবাসার বদলে বসত করছে ঘৃণা কেবলই ঘৃণা।
সেও জানেনা
তার ভেতরে বয়ে চলছে যে তুমুল ঝড়
তাতে সে মানুষ নয়,
বরং হয়ে উঠছে একটা আস্ত বারুদঘর।

গীতশ্রী ভট্টাচার্য্য

নিঃশব্দ পদক্ষেপ

এস ভেঙে ফেলি সমস্ত প্রতিশ্রুতি,সেসব প্রাচীন আজ
এখন নতুন করে ঘর ভাঙার আয়োজন। 
ঘরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘুণ, উইয়ের বসবাস।
মেরামতি করেও বাঁচানো যায়না কিছু কিছু ঘর।

নিঃশব্দে হাঁটা দিয়েছি দুজনে দুদিকের পথে
আমার হাতে কোনো স্মৃতি নেই ;আছে একমুঠো 
ঘুণ কাটা, উইধরা ঝুরঝুরে মাটির সাহচর্য।
পথে ফেলে ফেলে যাব যদি কখনো ফিরে আসি।

তুমি কী নিয়েছ আমি জানিনা, হয়ত কিছুই নয়
তোমার কাছে দামী ছিলনা কোনোদিন এই ঘর;
পর্যাপ্ত মন ঢেলে দিলে হয়তপোকা লাগতনা এখানে।
নির্বাসন যেতে হতনা এমন অসময়ে, এমন অকালে।

কোনো এক নদীর ধারে এবার বসত গড়ব
নদীর জল  ভাসিয়ে নেবে সেই বাসা তার মর্জিমত; 
আবার পাড়ি দেব অন্য কোথাও, একা নিশব্দে
তোমার কাছে আমার ঠিকানা থাকবে অজ্ঞাত। 

সঞ্জয় দত্ত

 উৎসব

আজ উৎসব,কাল আবার হবে।
পরশুও হবে, এভাবে চলতি পথে দেখে যাব!
কতো সামগ্রী কেনাবেচা হচ্ছে।
কখনো মানুষ সামগ্রী হয়।
ক্ষুধার চেয়েও কম দামে বেচে।
এগুলো জীবনের উপহার।
প্রতিদিন কতো উপহার দিচ্ছে জীবন আমাকে ও আপনাকে।

একদিন রূপকথা আমাকে উৎসবে নিয়ে গেল,
সে আমাকে অনেক ভালোবাসে।
সে বলল,
চলো তোমাকে একটা ডায়েরি কিনে দি,
হঠাৎ ডায়েরি কেন?
তুমি কবিতা লিখবে।
না না আমার কলমের ভাষা  কবিতারা বুঝে না,
তাই এখনো ঘর বাঁধতে পারেনি।

চলো সময় হল, ফিরি।

ভবানী বিশ্বাস

তোমারি নাম গাই

আমি প্রেমে পড়ি। হ্যাঁ, প্রেমেই পড়ি।প্রেমে পড়ার মতো সুখ আর কী আছে জীবনে! প্রেমে পড়া আর ভালোবাসা এক নাকি! 

জানি না।জবাব নেই আমার কাছে।জবাব খুঁজতেও যাই না।

বিকালে জমির আলে বসি।যেন প্রতি দিনের রুটিন।সেগুন বাগানের ভিতর দিয়ে সূর্যের ডুবে যাওয়া দৃশ্য দেখতে মধুর লাগে। নিজেকে হালকা লাগে। আমার কবিতার মতো হালকা।হালকা, সহজ, সরল, শুকনো পাতার মতো। ঝরে পড়লেও শব্দ হয় না। শুধু সূক্ষ্মভাবে কান পাতলে ধরা দেয় তা.. 

হাঁটছি পুকুরপাড়ে। গান চলছে মোবাইলে----  "আমি তোমারি তোমারি তোমারি নাম গাই

আমার নাম গাও তুমি... "

যেন একঘোরে আছি। হঠাৎ নাকে মিষ্টি কোনো ফুলের সুগন্ধ ভেসে আসলো। চারদিকে চেয়ে দেখি পুকুরের দক্ষিণ পারে টিলার উপর এই গাছ। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারিনি। ছুটে গেলাম তার কাছে। যেন চুম্বকের মতো টানছে আমায়। তার সুবাস, রঙ এতোই আকর্ষণ করে কাছে না গেলে বোঝাই যাবে না। কাছে গিয়ে দেখি পিঁপড়ের দখলে গেছে ফুল। আমিও ভাগ বসালাম পিঁপড়ের সাথে। যদিও কার জায়গা কে ছাড়ে। যুদ্ধ করে কয়েকটা ফুল নিলাম। 

মনে হল এ ফুলও যেন আমাকেই ডাকছে। কী অপূর্ব রূপ তার। হয়তো স্বর্গের কোনো ফুল হবে! নাম জানি না। ছোটবেলায় দেখেছি। তবে এমনভাবে কখনো দেখিনি। তার প্রতি এমন টান কখনো অনুভব করিনি। হয়তো তখনও সে আমাকে ডেকেছে। আমি শুনতে পাইনি। হয়তো শোনার সেই বয়সটুকু হয়নি। আজ শুনলাম। তার কাছে গেলাম। মনে মনে কথা বললাম। পার্সোনাল কথা..। তার প্রেমে পড়লাম। হ্যাঁ, প্রেমেই পড়লাম। বলতে ইচ্ছে করছে তাকে ভালোবাসি। 

আমাদের একটা সিক্রেট কথা শেয়ার করছি, 

তাকে বলেছি তার একটা সন্তানকে আমার নিজের বাড়িতে লালন করব। সে খুশি হল.. 

তখনও গানটা চলছে, আমি তোমারি তোমারি তোমারি নাম গাই.....

বিধর্না মজুমদার

 লড়াই

ভরা দুপুরে কাষ্ঠ পেতে বসে আছে
একদল ডোম।
আত্মার সাথে প্রাণের লড়াইয়ে
প্রাণ হেড়ে গেছে, 
তাই এতো আয়োজন।
এই আয়োজনের সাক্ষী আমি তুমি আমরা।
সবাই হয় একবার না একবার।
আজ আমরা,
কাল আমাদের আয়োজনে
অন্যরা।
এটি একটি লড়াই মাত্র।।

লিটন শব্দকর

মেঘসুখ

রাঙতার ভেতর রোদের শীর্ণ ডালপালা
জন্মান্তরে বাঙ্ময় হয়ে রয় মেঘসুখ এক।

বাষ্পের ভেতর বরফের শঙ্খটি
বোঝাপড়ার প্রতিদিনই দেওয়ালে চিরকুট
একদিন সব পিন খুলে দেওয়া

মহাজনপদে হকার, খবরের কাগজ
সিঁড়িতে ছেয়ে থাকা শুকনো পাতা উড়িয়ে
তাকে ডেকে ডেকে ফিরে গেছে একদিন।

রাহুল শীল

 গহ্বর
        
চেষ্টার পরও তোমরা আমার ভেতর ঢুকিয়ে দাওনি- 'ঈশ্বর',
একটু এদিক ওদিক করে অবৈধভাবে যা প্রবেশ করিয়েছো
তা হলো শুধু বিষাদ বাতাস !

এই উষ্ণযুবক আর কতো লিখবে নারীসঙ্গ বিষয়ক পদ্য,
তার শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে কৃষ্ণগহ্বরের মতো অস্তিত্ব
শুধু শুষে নিচ্ছে সে- তোমাদের শোকার্ত নদী আর দীর্ঘশ্বাসের তীব্রতা।।

শর্মি দে

কষ্টের_প্রতিবাদ

বুকের ভেতর একটা চিনমিন ব্যথা যেন দিন দিন বেড়েই চলেছে...মায়ের করুণ চেহারা বলে দিচ্ছে রাতের কাহিনী...

আমি প্রজ্ঞা... বাড়ি প্রত্যন্ত অঞ্চলে। পাঁচবোন... এদের মধ্যে লেখাপড়ার বিষয়ে আমারই আগ্রহটা একটু বেশি ছিলো তাই মা আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করলো। একদিন হঠাৎ মামাকে ফোন করে বললো, 

---যদি পারো, আমার প্রজ্ঞাকে মানুষ করো!

মামা ছিলেন নিঃসন্তান। প্রস্তাবটা লুফে নিলেন। আর বাবা, মাথার উপর থেকে একটা বোঝা কমে গেল বলে কোনো বাধা সৃষ্টি করেননি। অভাবী সংসার, তার উপর বছর বছর পুত্রসন্তানের আকাঙ্ক্ষাতে সংসারে সদস্য সংখ্যা বাড়তেই থাকে। বাবার ইচ্ছার কাছে মাকে মাথা নত করে সব মেনে নিতে হতো। প্রতিবাদ করার ক্ষমতা নেই, মার মন কেঁদে উঠতো, জ্ঞানের আলো পেয়েছিলো তাই  মাঝেমধ্যে বলে দিত,

---আর শরীর দিয়ে পারছি না, আমার মেয়েরা কম কিসে! প্রজ্ঞাকে যত্ন করলে ওই আমাদের মাথা উঁচু করবে!

---হয়েছে , আমাকে আর জ্ঞান দিতে এসো না। আমার বংশজ চাই, একটা ছেলে চাইই চাই! বাবা ক্ষেপে উঠতো।

    মা যদি বেশি ওজরআপত্তি করতো, উপহার হিসেবে পিঠের চামড়া লাল হতো। আমার বড় দিদিদের এ বিষয়ে কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না বা হয়তো বাবার ভয়ে চুপ থাকতো। কিন্তু আমার ভীষণ কষ্ট হতো, মাকে প্রায়ই নিজের স্বামীর কাছে ধর্ষিতা হতে হতো...তখন ছোট ছিলাম, অবুঝ মন...প্রতিবাদ করার সাহস থাকলেও মায়ের দিকে চেয়ে লুকিয়ে কাঁদতাম। ফলে একটা কষ্ট জমতে জমতে বুকে পাহাড় প্রমাণ হয়ে উঠলো, যেন সুযোগ পেলেই অগ্নুৎপাত হবে। মা আমার মনের সব কথা বুঝতে পারতো। তাই সেই নিষ্ঠুর পরিবেশ থেকে বের করে দূরে সরিয়ে দিতে চেয়েছিলো।

    মাকে ছেড়ে মামার সাথে শহরতলীতে আসতে হলো। মনে হয়েছিল মাকে ব্যথাটার কথা বলে আসি কিন্তু মা কষ্ট পাবে তাই চুপ থাকলাম। খুব ভালো স্কুলে মামা ভর্তি করে দিলেন। মায়ের স্বপ্নপূরণের জন্য একাগ্রচিত্তে লেখাপড়া করতে লাগলাম। কিন্তু মায়ের জন্য মনটা কেঁদে উঠতো, আর ওই ব্যথাটা সুযোগ পেলেই চিনমিন করে বুকটাকে কুরে কুরে খেতো, বিশেষ করে যখন মামা, মামীকে খুব আদর যত্ন করতেন। মামী মামাকে সন্তান দিতে পারেননি বলে খুব কষ্ট পেতেন কিন্তু মামা এবিষয়ে অনেক উদার মনোভাব পোষণ করতেন। বুকটা প্রতিবাদ করে উঠতো, আমার বাবা কি একদিনের জন্যেও মাকে বুঝার চেষ্টা করেন নি? একদিকে মামার প্রতি শ্রদ্ধায় বুক ভরে যেতো অন্যদিকে বাবার প্রতি ঘৃণা...

    মাধ্যমিক পাশ করে মাকে দেখতে গেলাম, তাকাতে পারছিলাম না, একটা কঙ্কালসার অস্তিত্ব... হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠলো আমার মন,

---মাগো, আর কতো সহ্য করবে!

মা জড়িয়ে ধরে বললো,

---তুমি অনেক বড়ো হও মা, এই সমাজে জ্ঞানের আলো জ্বালিয়ে দাও--দেখিয়ে দাও কোনো কন্যাসন্তান পুত্র থেকে কম নয়! 

    এতো নির্যাতন সহ্য করেও মায়ের  মনোবল একটুও ভাঙেনি। মায়ের আত্মবিশ্বাস আমাকে অনুপ্রাণিত করে এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করে তোলে।

    ফিরে এলাম মামার বাড়ি। আমার মেধা আর চেষ্টায় একের পর এক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে লাগলাম। আই এ এস পরীক্ষায় রাজ্যস্তরে প্রথম স্হান অধিকার করি এক নির্যাতিত আত্মবিশ্বাসী মায়ের আশীর্বাদে! 

    তারপরই ঘটল এক অভাবনীয় ঘটনা! কাকতালীয় ভাবে জেলা উপায়ুক্ত হিসাবে আমি প্রথম নিযুক্তি পাই সেই জেলায়, যার অন্তর্গত আমার জন্মস্হান...যেখানে আমার মার অন্তরাত্মা মৃত্যুশয্যায় দিন গুনছে! অফিস জয়েন করে সেদিনই অফিসের গাড়ি নিয়ে পৌঁছে গেলাম সেখানে...মায়ের স্বপ্নপূরণে...

    আজ এলো মায়ের সেই কাঙ্ক্ষিত দিন...বাবার প্রতি ঘৃণার নাগপাশ থেকে বেরুতে মায়ের কষ্টের প্রতিবাদ যে আমাকে করতেই হবে...অন্যথায় অসহায় মায়ের সরল সুন্দর মিষ্টি হাসিখানি আমার কাছে অজানা অচেনা অদেখাই রয়ে যাবে...

     এমন মা'কে শতকোটি প্রণাম যে মার চোখের অবিরল ধারায় প্রজ্ঞার জীবন প্রজ্ঞাময় হয়ে উঠলো...

     যে কষ্টটা আমাকে এতদিন এক ঘৃণার আবেষ্ঠনে আবৃত করে রেখেছিলো...আজ বুকের মাঝে সেই কষ্ট সেই ব্যথাটা আর নেই!

রমা চন্দ্র

মানবতার দীপ

প্রদীপের নীচে অন্ধকার...
বিজ্ঞান কি টর্চের আলো-
না গণ্ডিবদ্ধ বৃত্তাকার!
ল্যাম্প পোস্টের নিয়ন বাতিতে-
পথ-ঘাট কি একাকার...
না মনের কোনে নিকষ আঁধার!
উত্তরের খোঁজে নীদ্রাহীন চোখ-
চৈত্রের আকাশে..
ঝড়ের পূর্বাভাসে !
দাবদাহে রুক্ষ জীবন...
নদনদী ও শুষ্ক ভীষণ...
নাই বরষণ...!
ক্রমাগত নিধনে সবুজ...
ভগ্নপ্রায় খাদ্য শৃঙ্খলে-
মানুষ আজও অবুঝ!
চকিত বিদ্যুৎ আলোকে-
দূর নীহারিকা হতে কে যেন বলে,
'হে মানুষ অন্তরে মানবতার দীপ জ্বালো'!

গৌতম চন্দ্র

উপলব্ধি

আমি জানি-
আমি কত কম জানি,
কম জানি-
তা অন্তরে মানি,
জাগ্রত সদা তাই-
জানার প্রয়াস খানি,
বুকে চেপে ধরি
ব‌ই খাতা পাণ্ডুলিপি
দিন প্রতিদিন
আলোর পথ সন্ধানী...
জীবন পাত্র পূর্ণ তরে-
শুনি অমৃত বাণী...
মহামানবের সাগরতীর
করেছে মোরে ঋণী।

সীমা সোম বিশ্বাস

আগুনের শিখা

যে আগুনের শিখা 
শুধুই আলো ঢালে 
নেয় না কিছু তুলে
তাকে কে পোড়াবে?
যে উজাড় করে দিতে পারে
নিজেকে ভিখারি করে
কারই বা সাধ্য আছে তাকে
অসম্মানের  মালা গেঁথে পরাবে?

প্রতীক হালদার

সুখ যে আছে 

বেলা শেষে দেখি আমিও দুঃখী
ঠিক সবারই মতো,
সুখের পিছনে ছুটেছি যত 
পেয়েছি দুঃখ বেশি তত।

চাওয়া-পাওয়ার তালিকাটা 
বড্ড বড় ছিল,
তাই তো সুখের ঠিকানাটা
 নিমেষে বদলে গেল।

সুখের জন্য আগামীতে ছোটা 
সুখ যে অধরা তাই,
অতীতের অলিগলি ভর্তি সুখেতে
জানা যে কারোর নাই।

বেলা শেষে আজ বুঝতে পেরেছি 
অতীত স্মৃতির পাতায়,
ওই সুখ টাই সত্যিকারের 
তাই তো আজও কাঁদায়।

সুখের পিছনে মিছিমিছি ছোটা 
সুখ যে সদাই আছে,
আলোতে-আঁধারে-হাসিতে-খুশিতে 
প্রতিক্ষনেতেই বাঁচে।

সুপ্রতিম ভৌমিক

সুপ্রাজের পূজোর আনন্দ

সুপ্রাজ বাবার একমাত্র সন্তান বলে খুব আদুরের ছিল ও ছোটবেলা যখন যা চাইত বাবা যথাসাধ্য তা' দেওয়ার চেষ্টা করতেন, কিন্তু হতভাগা সুপ্রাজের বাবা যখন তার অষ্টম বয়সে তাদের অকুল সাগরে ভাসিয়ে চিরবিদায় নিলেন তখন থেকেই চাওয়ার জায়গা আর থাকলো না, কত দুঃখ কষ্টে বড় হল, কত প্রতিপত্তিশালী পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজন কেউ কখনও জিজ্ঞেসও করত না পূজোর কাপড় হয়েছে কি না ?  তাই ছোটবেলা থেকেই আজোবধি তার একইভাবে চলছে, পূজোর কাপড় প্রায় প্রতি বছরই হয় না, প্রথম প্রথম মনে খুব বেশি কষ্ট হতো সুপ্রাজের, পুরোনো কাপড় পরেই পূজো দেখতে যেতো, কিন্তু এখন আর মনে তেমন কষ্ট হয় না, চিরাচরিত হয়ে গেছে, পুরোনো কাপড় পরে এখন আর পূজো দেখতেও যায়না,  যখন যেমন তখন তেমন, পূজো মানেই তো মোটা টাকার মানুষদের ।

          পূজোর তিনটি দিন সুপ্রাজ শুধু মনে মনে ভাবে, "বাবু, তুমি থাকলে পূজোর দিনগুলো কেমন কাটতো, কতই না আনন্দ স্ফুর্তি হত । তোমার সাথেই জীবনের সকল আনন্দ চিরবিদায় নিয়েছে । তুমি যেখানেই থাকো, ভালো থেকো, আনন্দে থেকো ।"

সংহিতা চৌধুরী

শকুন

আজ তিনদিন হলো,
মেয়েটির কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। 
কাঠুরিয়া হন্যে হয়ে ছুটছিল।
হঠাৎ কানে আসে একদল শকুনের ডানা ঝাপটানি শব্দ।
একটু দুরেই অত্যাচারী মুখোশের পেছন থেকে,
চেটেপুটে লালসা নিবারণে ব্যস্ত। 
রক্তনগ্ন অবস্থায় পড়ে থাকে মেয়েটি। 
অসার। চেতনাহীন।
শেষে উড়ে যায় শকুন!

আমিনুল ইসলাম

আশার আলো 

বারুদের মত জ্বলছে পৃথিবী
এক ফোটা জলের আশায়
চারিদিকে লেলিহান শিখার স্বাদ নিতে 
চলছে ধ্বংস লীলা।
শান্ত হোক পৃথিবী এই আহ্বান আমার,
ভালোবেসে জয় কর গোটা পৃথিবী
হিংসা দিয়ে নয়।
বুকে টেনে নাও আপনজন কে,
আমি জ্বলছি প্রতিনিয়ত কখনো রঙ্গমঞ্চে,কখনো বা হতাশার সাগরে,
এই জ্বলা শেষ হবে একদিন ভালবাসার আগুনে পুড়ে।

মায়া রানী মজুমদার

সুখের অনুভূতি

তোমার দুঃসাহসে আমি স্তম্ভিত,
আচরণে হলাম ওগো অভিভূত।
এতো নরম মনের মানুষ তুমি,
আপন করে নিলে আমায় চুমি।
কম বেশী সবার জীবনে রয় দুঃখ,
সোহাগ মাখা চুম্বনে পেলাম সুখ।
দিয়েছো কথা আমায় করবে রক্ষে,
সারাজীবন রাখবে ধরে তব বক্ষে। 
সোহাগমাখা চুম্বনে সুখের অনুভূতি, 
দিশেহারা ছিলাম, পেলাম গতি। 
হয়তো বা ছিলাম তব প্রতিক্ষায়।
আনন্দাপ্লুত আমি পেয়ে তোমায়।
রইবো মোরা দু'জনে পাশাপাশি, 
বলবে কথা মোর কাছে আসি।
দুজনেই করবো সোহাগ বিনিময়, 
এখন তো আর নেই মোদের ভয়।

সোনালী মণ্ডল

রানী

আজ এই নির্জন ঘরে বসে মাতৃত্বের সুখে,
কাঁচা নাড়ির টানে ক্লান্ত শরীরে,
সাময়িক চলচ্ছক্তীহিনতার ফাঁকে,
সদ্য ভূমিষ্ট হওয়া লাবণ্যময়ী ফুলটির
নাম করন করেছি রানী।
শৈশবে মরন ব্যাধির গ্রাসে
মাতৃহারা মেয়ের দুচোখে ছিলো
মাতৃ স্নেহের প্রতি এক আকাশ শূন্যতা।
পাড়া প্রতিবেশী থেকে বড় দের মুখে শোনা,
"এক মা গেছে নতুন আরো এক মা জুটবে তখন বুঝবি ঠেলা"
বর্তমানের অভিজ্ঞতা স্বপ্নেরও অধরা।
জীবনের অপরিণত বয়সের
প্রথম কুঁড়িটি ফুটে ছিলো,
রঙিন স্বপ্নের ওপর ভরসার হাত পেয়ে,
ভরসা চিরন্তন একে অপরের পরিপূরকের।
পরম শুভানুধ্যায়ী দের মতের বিরুদ্ধে
নতুন জীবনের স্বাদ খুব একটা তৃপ্তির হয়ে ওঠেনি।
অল্প কিছুদিনের মধ্যে ধোঁয়াশার অবসান ঘটলো,
প্রিয় মানুষটির পরিচয়ে পাওয়া গেলো,
সে এক উচ্চ বংশে জাত সন্তান।
তার কোনো কুলেই আমার মতো
অস্পৃশ্যের দেখা নেই,
আমার ছোঁয়ায় তাদের স্বর্বস্য অপবিত্র।
ধিরে ধিরে প্রিয় মানুষটির পরিবারের,,,
এক নগণ্য তাচ্ছিল্য তৃণ সম আচরণে
প্রাণ প্রায় ওষ্ঠাগত।
পূর্বে জানা থাকলে এমন চাঁদ ছোঁয়ার
দুঃসাহস বোধ হয় হতনা।
যে চাঁদ স্বেচ্ছায় ধরা দিয়ে ছিলো,
আমার নিম্নবর্ণের কুটির দ্বারে,
সেই চাঁদই সুকৌশলে নিপুণ হাতে,
আমার গর্ভপাতের পরিকল্পনায়
সহমত একত্রিত সপরিবারে।
পরবর্তীতে বিকল্পের খোঁজে আমার
পরিণতি খাতা কলমে।
প্রথম মাতৃত্বের তৃষ্ণায়,
নিজের দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের ওপর ভরসা রেখে,
রাতের অন্ধকারে গন্তব্য আমার জন্ম কুটিরে।
সেই আত্মবিশ্বাসের ফসল আমার রানী,
আত্মবিশ্বাস বর্ণ বৈষম্যের আঁতুড় ঘর উপেক্ষার,
আত্মবিশ্বাস চুড়ির বদলে কলমের ধার করার,
আত্মবিশ্বাস নিজ অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার।।

দীপক বন্দ্যোপাধ্যায়

যুদ্ধ

চলুন যুদ্ধে যাই
গাছ বাঁচাবার যুদ্ধে.....
লোভের আগুনে পুড়ছে সময়
বুকের পাঁজরে বাসা বাঁধছে কার্বন ছাই
এখনই সময় গাছ হয়ে জন্মায়
পাখি হয়ে গান গাই
কান্না লুকিয়ে রাখি শাখা প্রশাখায়
বৃক্ষহীন সভ্যতা বাঁচবেনা....
চলুন যুদ্ধে যাই
জল বাঁচাবার যুদ্ধে.....
লোভের আগুনে জলীয়বাষ্প সময়
শরীরে বাসা বাঁধছে আর্সেনিক
এখনই সময় জল হয়ে জন্মায়
মাছ হয়ে সাঁতার কাটি
কান্না লুকিয়ে রাখি মেঘেদের ভেলায়
জলহীন সভ্যতা বাঁচবেনা....

পৃথ্বীরাজ দেবনাথ

চলিষ্ণু

কি চলছে?
ভরপুর দুপুরে বসে ভাবি।
কয়েকটি পাতা ঝরে পড়ে যায় তখন।
কি সময়? কি সময় এখন?
এসবের উত্তর নেই জেনেও
প্রশ্ন করা হয়, প্রশ্ন শুধু করা হয় চেতনা ক্লান্ত হবে জেনেও।
তবুও ভেসে যায়, ভেসে যায়, তার আঁচলখানি ভেসে যায়, পারো যদি, তবে ঠেকাও প্রবাহ,
ওই দেখো, ভাঙা গেহে পড়ে আছে আমার সহস্র সব স্বপ্ন।

অনুভব ধর রায়

মুক্তি

দে ভেঙে দে, সকল শৃঙ্খল নকল সকল বাঁধন 
উড়ে যা তুই যা উড়ে, ওরে ভীরু অবুঝ মন
বদ্ধ দ্বার রুদ্ধ কারাগার দে এবার সব ভেঙে 
মুক্ত আকাশ শুদ্ধ বাতাস নেরে এবার জেনে l

মেদিনী বক্ষে সবার অলক্ষ্যে শায়িত কলেবর 
রাজা ও ফকির পরিচয় সম ধারণ করিছে আকর 
বন্যেরা তবু করিছে কেলি মানব বুঝিবে নারে 
বিহঙ্গ দেখিছে রঙ্গ করিয়া কাড়ায় বেন্ধেছে কাড়ে l

সহজ পাঠ করেছে জটিল নিজেরে  যারা ভাবে  জ্ঞানী 
ক্ষুব্ধ শরিত্রী অন্ধ রাত্রি, আজ কেহ নাই পরিত্রানী 
এমন সময় আসবে বলে বলেছিলেন যত আদিকবি 
হাজার বছরে রেখে গেছেন তাঁরা অমূল্য যত নথি l

মুঠোয় বন্ধী করোনা তাই প্রকৃতির সময় গতি
একটু বরষ স্নেহের পরশ মাগিছে আজ প্রকৃতি 
বদ্ধ দ্বার অন্ধ কারাগার সময় এসেছে ভাঙার
মুক্ত বাতাস মুক্ত আকাশ সময় এসেছে জানার l

রীতা চক্রবর্তী ( লিপি )

ঈশানীর বাঁকে মহাতীর্থ অট্টহাসের কথা.

                ভাবিনি কখনো সম্ভব হবে বলে, কিন্তু মায়ের অশেষ কৃপায় গতকাল  পৌঁছে গেলাম সতীপীঠ অট্টহাস। ছেলেবেলায় যখন জানার আগ্রহে নানা পত্রপত্রিকা পড়তে শুরু করেছিলাম, তখন থেকেই জেনে এসেছি এই মহাতীর্থ শক্তিপীঠের নাম। মায়ের ডাকে গতকাল শত যোজন দূর থেকেও ছুটে গিয়ে দেখে এলাম ঘন বন জঙ্গলে ঘেরা, নিরিবিলি এক আশ্রমিক পরিবেশে মায়ের ভুবনমোহিনী রূপ। পূণ্যভূমি কামাখ্যা মায়ের চরণে বসবাসরত আমরা মায়ের একান্নটি সতীপীঠের পৌরাণিক গল্প বড়দের মুখে ও নানা ভাবেই জেনে এসেছি বরাবর। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় আরও অনেক সতীপীঠ আছে যদিও, তারমধ্যে  পূর্ব বর্ধমান জেলার দক্ষিণডিহি গ্রামের এই সিদ্ধপীঠ মহাতীর্থ অট্রহাস অন্যতম। এখানে মায়ের নিম্ন অধর পতিত হওয়ার জন্যই জায়গাটির নাম হয় অট্টহাস। লোকালয় থেকে দূরে নিরিবিলি নির্জন পরিবেশে মা অট্টেশ্বরী বিরাজিতা।  মন্দিরের পাশে দিয়ে বয়ে চলেছে পুতঃপবিত্র ইশানীর ধারা। এখানে পঞ্চমুণ্ডির আসন আছে আর এই আসনে বসে বহু সাধক ও সাধু-সন্তগন কঠিন সাধনায় সিদ্ধি লাভ করেছেন। নানা অলৌকিক গল্পগাথা ও ঘটনার সাক্ষীও এই জাগ্রত সতীপীঠ। শোনা যায়,অতি প্রাচীনকালে এখানে নরবলিও হতো।

               পৌরাণিক কথা অনুসারে  আমরা সকলেই জানি,তখন উন্মত্ত মহেশ্বর,কম্পিতা ধরিত্রী। চঞ্চল নারায়ণ। দক্ষযজ্ঞস্থলে শিবনিন্দা সইতে না পেরে প্রাণ ত্যাগ করেছেন শিবজায়া সতী। সতীর দেহ কাঁধে নিয়ে তাণ্ডব নৃত্য শুরু করলেন মহাদেব। থরথর করে কেঁপে উঠল ত্রিভুবন। " জাগো সতী জাগো " ধ্বনি তুলে ছুটে চলেছেন মহাদেব। মহেশ্বরের পদক্ষেপে স্বর্গ-মর্ত পাতাল আন্দোলিত। চঞ্চল বিষ্ণু নিক্ষেপ করলেন সুদর্শন চক্র। আদেশ দিলেন সতীদেহ খণ্ড খণ্ড করে ধরিত্রীর বুকে ছড়িয়ে দিতে। বিষ্ণু আজ্ঞায় সুদর্শন চক্র সতীদেহ একান্ন খণ্ডে খণ্ডিত করে ছুটন্ত মহেশ্বরের কাঁধ থেকে ধরিত্রীর বুকে বিভিন্ন স্থানে পতিত করলেন। একসময় মহাশূন্যে শূন্য হাতে থমকে দাঁড়ালেন ব্যোমভোলা। সামনে এসে দাঁড়ালেন শ্রীহরি। মহেশ্বরকে শান্ত করতে সতী দেহের একান্নটি খণ্ড একান্নটি পীঠ হিসাবে ঘোষণা করলেন বিষ্ণু। সঙ্গে প্রতিপীঠের যোজন মধ্যে ভৈরবের বেশে স্থান হলো শিবলিঙ্গ রূপে মহেশ্বরের। সেদিনের সেই একান্নপীঠের একটি পীঠ হলো এই অট্টহাস। যেখানে দেবীর অধঃওষ্ঠ পড়েছিল। এখানে দেবীর নাম অট্টেশ্বরী। ভৈরব হলেন বিশ্বেশ। এরপর আবার এল নটরাজের চরণে পুনঃ গতির ছন্দ। সেই ছন্দে প্রবাহিত হয়ে চলেছে কাল। কালের বুকে ঘটে যাওয়া ঘটনা একদিন ইতিহাস হয়ে যায়। সতীর দেহত্যাগের ঘটনাও আজ ইতিহাস। কিন্তু ইতিহাসের হাত ধরে সভ্য যুগের মানুষ এক এক করে আবিষ্কার করে সেই একান্নটি পীঠস্থান। তৈরি করে দুর্গমতা কাটিয়ে রাস্তা ঘাট। মহাতীর্থ অট্টহাস সতীপীঠে যাওয়াও আগে দুর্গম ছিল। কিন্তু এখন ঝোঁপ-ঝাড়,বন- জঙ্গল কেটে এই মহাপীঠের ভেতরে পৌঁছে গেছে কংক্রিটের পাকা রাস্তা। ছুটে চলেছে বাস,গাড়ি সহ নানা যানবাহন। 

               এবার এখানে যদিও পৌষের কোলে শীত ঘুমিয়ে আছে তবু আলতো শীতের আমেজ গায়ে মেখে আমরা কেতু গ্রাম পেরিয়ে, ক্ষীরাগ্রাম পেরিয়ে,  পথের দুপাশে সারি বেঁধে সেজে ওঠা প্রকাণ্ড সব  তরুশাখে ছাওয়া  নির্জন ছায়াপথ মাড়িয়ে, দিগন্ত রেখায় মিশে যাওয়া তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে,ইশানীর সেতু পেরিয়ে, কৃষিজীবী গাঁ-এর নিকানো দাওয়ার পাশের পথ দিয়ে নিরোল গ্রামের অনতিদূরে পৌঁছে গেলাম দক্ষিণডিহি গ্রামের সতীপীঠের প্রবেশদ্বারে। যেখানে আকাশ ছুঁয়া উচ্চতার মহাদেব সতীদেহ কাঁধে নিয়ে ছুটে চলেছেন ত্রিভুবন কাঁপিয়ে। প্রাণ ভরে দর্শন করলাম মায়ের মূল মন্দির, ভোলা বাবার সমাধি,পঞ্চমুণ্ডির আসন,রটন্তী কালী মন্দির ( পূর্বে নাম ছিল ডাকাত কালীর মন্দির), সতী ঝিল সহ সতী ঝিলের  দক্ষিণ পারের যজ্ঞ কুন্ডের ঢিপি। মন্দিরের দাওয়ায় বসে দেখলাম অক্ষয় বটবৃক্ষ ও মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে নয়ন জুড়িয়ে দর্শন করলাম দেবীর ভৈরব বিশ্বেশের নয়নলোভন রূপ। এরপর মায়ের ভোগ হয়ে গেলে ভোগের অন্নপ্রসাদে পরম তৃপ্তিতে দুপুরের আহার  সেরে পড়ন্ত বেলায় ছুটে চললাম দিদিদের আবাসনের দিকে...জয় মা অট্টেশ্বরী

অনুপ দেবনাথ

দেখা না হলেই ভালো হতো

তোমার সাথে আজ দেখা না দেখা  হইলেই ভালো হতো,
কিংবা যদি নাইবা হতো পরিচয়! 
তোমার শহর হয়তো ভীষণ ব্যস্ত,
গলি পথে আর হয় কি যাতায়াত? 
তোমার প্রাসাদ ভীষণ বড়ো,
আমার কাছে তা দমবন্ধকর।
আমি ভীষণ ছন্নছাড়া, ভীষণ যাযাবর, 
নেইকো তোমার মতো মস্ত প্রাসাদ,
বিশাল ইমারত। 
আমার কাছে আছে একটি খড়ের গাদা আর একটি চালাঘর।
মিলিয়ে নিও একদিন হাঁটবো আমরা একই পথে,
শুধুমাত্র ভিন্ন হবে বাড়ি ফেরার পথ।
তোমার সাথে দেখা না হইলেই ভালো হতো, 
কিংবা যদি নাইবা হতো পরিচয়!

লিয়া শারমিন হক

ক্রোধ

রকিব লুকিয়ে রয়েছে।সিঁড়ির নীচে অন্ধকার যেখানে ঘন সেখানটিতে।সেই সকাল দশটা থেকে এখানে।রকিবের পরনে ধূসর পান্জাবী।হাতে, মুখে আর সেই ধূসর পান্জাবীতে চাপ চাপ রক্তের দাগ শুঁকিয়ে কালচে হয়ে গিয়েছে।চিমসে গন্ধ বের হচ্ছে।ঠকঠক করে কাঁপছে রকিব।”কি করবো এখন কোথায় যাবো? এ কি হয়ে গেলো? কেন করলাম? আমার হাতে খুন…আহ্! আর কিছুই যে ভাবতে পারছিনা! আল্লাহ্ বাঁচাও আমায়! তেমন কিছুই নয় কলেজ ঈদে বন্ধ।রমজান মাস স্যারকে টেবিলে খাবার দিয়েছি ঘড়ি ধরে শেষ রাত সাড়ে তিনটেই গরম ভাত, আলু ভাজা, ঘন মসুর ডাল,ডাবল ডিমের অমলেট। বিদ্যুৎ স্যার খাওয়া শেষ করে উঠে বেসিনে হাত ধুচ্ছিলেন। কাছে গিয়ে মিন মিন করে বলেছিলাম,”স্যার মন কেমন করছে বা…ড়ি যাবো?” ব্যস! শুনেই উনি ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালেন। তাকিয়ে, “কি বললি তুই? তোকে তো বলেছি এক বছরের ভেতর বাড়ি যাবার কথা মুখে আনবি না।” আমি ভয়ে একটু দূরে পিছিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম।ঐ ঘরেরই পশ্চিম দিকে বইয়ের আলমারি যে দিকে তার পাশে।চিৎকার করতে করতে উনি ছুটে আমায় মারতে এলেন।হাতের কাছে যা পাচ্ছেন তাই দিয়ে আমার উপর চড়াও হলেন।গ্লাস, বাটি, প্লেট ভেঙ্গে চুরমার! এক পর্যায়ে টেবিলের উপর ছুরি ছিলো ওটা উঠালেন আমার ওপর।আমি অত মার খেয়ে ভয়ে কাঁপছিলাম।উনি আমার শিক্ষক আমি কি করে উনার উপর কথা বলতাম? শুধু তো এতটুকুনই বলেছি, স্যার ঈদে ছুটি দিন।বাড়ি যাবো।মাকে ভীষন দেখতে ইচ্ছে করছে,মাকে কাল স্বপ্নে দেখেছি এতটুকুন ও বলে উঠতে পারিনি।উনি কেন কিছুতেই ছুটি দিতে চাননা? আমার মাথায় আসেনা? রাজ্যের যত কাজ আমায় দিয়ে করান।ঘরের ফায়ফরমাশ বাইরের কাজ।কলেজের পড়াশুনার পাশাপাশি সব আমায় করতে হয়।আমার দম ফেলবারও সময় থাকেনা।মাঝে মাঝে মনে হয় এই পৃথিবীতে বেঁচে থেকে কি লাভ? বুদ্ধি হওয়া থেকে শুধুই কস্ট আর কস্ট! আমায় তো দেখবার কেউ নেই।বাবা মারা গিয়েছেন সেই আমি যখন ছোটো।বাবার চেহারা মনেও পড়ে না আমার।বাবা বেঁচে থাকলে এমন হতো না নিশ্চয়? কত কস্টে মা আমায় এত দূর পড়িয়েছেন।সে শুধু আমিই জানি।কত দিন মা আর আমি না খেয়ে থেকেছি! কেউ কোনো দিন জানবেনা সে কথা।কে খেলো কি না খেলো কার কি যায় আসে? মানুষের বাড়ি কাজ করে করে মা আমায় পড়িয়েছেন।আমি SSC তে GPA 5 পেয়েছিলাম।আমার মায়ের সে কি আনন্দ? আনন্দে কেঁদে ফেলেছিলেন আমার দুখিনী মা।উনি আমার মাথায় চুমু খেতে খেতে আশীর্বাদ করেছিলেন,”অনেক বড় মানুষ হ্ বাবা! মানুষের মতন মানুষ হ্ !” এই অনেক বড় মানুষ হওয়া আমার? এই দিন দেখবার জন্য উনি আমায় আশীর্বাদ করেছিলেন? মা মা…ও মা..! কি ভাবে তোমার সন্মুখে দাঁড়াবো আমি? বলে দাও.. মা বলে দাও…! সেই মানিকগঞ্জের বিলাসপুর গ্রাম থেকে ঢাকায় কলেজে ভর্তি হবার জন্য এসেছি। আমাদের গ্রামের বিদ্যুৎ স্যার ঢাকায় থাকেন।উনি রেজাল্ট শুনে বলেছিলেন,”ঢাকায় চলে আসিস আমি ব্যবস্থা করে দেবো।” বিদ্যুৎ স্যার আগে আমাদের গ্রামের “বিলাসপুর সরকারী উচ্চবিদ্যালয়” স্কুলে শিক্ষকতা করতেন।পরবর্তীতে উনি চাকরি ছেড়ে দেন এবং ঢাকায় স্থায়ী হন।বিদ্যুৎ স্যার বলেছিলেন,”আমার এখানে কিছুদিন থাক্ তারপর হোস্টেলে উঠে যাস্।” আমি ঢাকায় কোনোদিন আসিনি কিছুই চিনিনা। উনার কথায় আশ্বস্থ হয়েই এসেছি।উনি যে ভাবে আশ্বস্থ করেছিলেন মা ও আপত্তি করেননি।বললেন,”আচ্ছা বাবা তুই যাহ্।উনি যখন এত করে বলছেন। আর আমাদের মানুষের উপর ভরসা করা ছাড়া উপায় কি বল্? কে আছে আমাদের? ঢাকা শহরে আপন বলতে কেউ নেই। কাউকে তেমন চিনিও না।যাহ্ বাবা আল্লাহ্ র  নাম নিয়ে তুই যাহ্।” ব্যস চলে এলাম।কলেজে ভর্তি হলাম।স্যারের বাসায় উঠেছি।স্যার বলেছেন, “যত দিন হোস্টেলে সিট না পাশ্ এখানেই থাক্!

মীনাক্ষী চক্রবর্তী সোম

নিমন্ত্রণ 

সারা আকাশ জুড়ে মেঘ;
মন জুড়ে বাউলক্ষ্যাপা
মেঘ আমায় বলল যাবি-- 
অনেক দূরে ওই যে নদী,
পেরোলেই খোলা মাঠ-
পাগলপারা, চল ছুটি।
থামবো তখন --
যখন দূরের একলা পাহাড়,
সামনে এসে বলবে ডেকে 
আমায় টপকে  যা।
ডানা মেলে উড়ে গেলাম
আশার আলো পথ দেখায়,
নীচে নদী-বন-পাহাড়,
আনন্দে ধরে না আর ।
নীচে আছে গভীর বন,
গহন কালো সে বনে,
মনের বাতি জ্বালিয়ে দিলাম;
দেখতে পেলাম সাতরাজার ধন।
কল্পনার জানালা খুলে দিলাম,
মেঘ ডাকছে চল ভিজব এখন। 
আমার জন‍্য রয়েছে সেখানে 
অনেক কবিতা-ছন্দ-গান।।

কল্যাণী ভট্টাচার্য্য

জীবন তরী

সুতোর টানে উড়ছে দেখো
রংবেরঙের ঘুড়ি। 
তারই মতো ঘুরছে দেখো
মোদের জীবন তরী। 
রংবেরঙের ঘুড়ির মাঝে
মন ছুটেছে শৈশবে। 
শ্যামল সবুজ গাঁয়ের 
কেমন করে কাটবে। 
মনের জীবন ঘড়ির মতো
ছুটছে কেমন করে। 
ঘড়ির কাঁটা আজকে শুধু
ছোটে পিছন পানে। 
থামবে ঘড়ি থামব আমি
জানি প্রভুর টানে।

শ্বেতা ব্যানার্জী

অহল্যা মন

ধর বৃষ্টিতে কাক ভেজা হয়ে তোলপাড় জ্বর এলো তোর। 
জ্বরের ঘরে একা  বসে তুই যন্ত্রণাটা খুবলে খাচ্ছে কপাল।
আমি তোর জানলার শার্সিতে চুপটি করে লাগিয়ে  রেখে ঠোঁট ---
বলি,এইতো আছি তোরই পাশে.জলপট্টি দেবার কী দরকার। 

তুই তখন ব্যথায় হচ্ছিস কাতর, আমি তোর পড়শী হলাম খাটে। 
ব্যথাটা'কে দু'ভাগে ভাগ করে নিয়ে  পৌঁছে যাব তোর ই মঞ্জিলে। 
তখন যদি মন বাড়াতে পারিস বলবি কী আমার কানে- কানে 
ভালোবাসা এক জায়গায়  থিতু ব্যথা গুলো যাচ্ছে কেমন উড়ে...।

তোর আঙুলে  আঙুল ছুঁয়েই দেখি আদুরে আদর পড়ছে চুঁয়ে চুঁয়ে...। 
 ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিলি গায়ে আঙুল তখন আঙুল ছুঁয়েই আছে।
বিদ্যুৎলতা হঠাৎ দিল দেখা, বললাম আমি চা করে আনি।
হাতধরে আলতো চাপ দিয়ে আদুরে গলায়  বলবি  আমি কি তা জানি।
ঘাম এসে জ্বরের মাথা ধুয়ে, পারদটাকে  নামাবে টেনে  নিচে, 
বলবি তুই দু'গালে টোল ফেলে জানিস আমি তোকে দেখলেই ঘামি,
জ্বরটা তখন বুকপকেটে রেখে, ভালোবাসা বাড়ায় পাগলামি। 
 
-----তারপর কাটে কয়েক প্রহর প্রহরী ঘেরা মন।
উঠতে গেলে হাতটা টেনে  বলিস আলতো-- স্বরে,আবার আসুক  তোলপাড়  জ্বর, ঝড় উঠুক দেনাপাওনা নিয়ে--
 এমনি করেই কথায় কথায় বেলা ভবিতব্য জমে জমে পাথর, আমি তখন  অহল্যা মন নিয়ে জেগে উঠছি তোর স্পর্শ পেয়ে ।

অসীম পাঠক

সূর্যোদয় 

ভোরের সূর্যোদয় ঠিক দেখাবো একদিন, দেখে নিও - যেদিন আহ্লাদে অবসাদে ভোরের আলোর নরম রঙে দাগ পড়বে তোমার ফর্সা গালে, যেদিন প্রানের অনুভূতিতে মিশবে আলোকিত ঝর্না। যেদিন পাখি ডাকা কাকভোরে তোমার আমার ঢিলছোঁড়া দূরত্বে ঘন কুয়াশার চাদর ভেদ করে আবির রাঙানো লাল সূর্যোদয়ে মিশবেনা  অস্তগোধূলীর সন্ধ্যারাগ। 

ভোরের ভৈরবীতে বাজবে অনাবিল জ্যোৎস্নাধারায় প্রেমের নবজীবনায়নের উষ্ণতা। সেদিন ঝোপ জঙ্গলের ওপার থেকে পাহাড়ি টিলায় পথ চলতি মানুষের অচিন সুরে রক্তমাংসের আমিতে খুঁজে নিও  আমার চোখে তোমার সূর্যোদয়। আমি যে সূর্যাস্তের ম্লান আলোয় ভালোবেসেছি দিগন্তের নীলাঞ্জনাকে। তাকে সূর্যোদয়ের ডাক দিয়ে পরিশুদ্ধ হলাম নির্মল প্রশান্তিতে ; তোমার আমার সূর্যোদয়ে পাহাড় ঝর্না মেঘ বৃষ্টির রূপকথার গল্প নেই, আছে আলো আছে জীবনের বাগিচায় রৌদ্রময় সকাল ।

রিপন সিংহ

ওহে কাঠঠোকরা 

জানিনা হঠাৎ অকারণেই স্বগত উচ্চারণ করি,
পাবনা জেনেও হাত বাড়িয়ে তোমায় ধরি।
কোন কারণ নেই তবুও চোখে ভেসে থাকে,
তোমার স্পর্শের জন্য বুকের মাঝে বেদনা জাগে।
কাঠঠোকরা পাখির মতো হৃদয় খুঁড়ে খুঁড়ে,
আমার বুকের মাঝে নীড় তৈরি করে।
রাঙা চরণ দু -খানা বুকের মাঝে রেখে,
তোমার সোনালি চঞ্চু আমায় ক্ষত করলে।
জানি একদিন দক্ষিণা বাতাসের সাথে আসবে,
অকারণেই তুমি আমাকে তোমার করে নেবে।
রাধা তিথিতে আমার আমিটাকে ছেড়ে দিয়ে,
তোমার সাথে মিশে যাবো সম্পূর্ণ তোমার হয়ে।
জীবনের সব লক্ষ্য একদিকে সরিয়ে রেখে,
আমি আবার স্বগত উচ্চারণ করি বসে।

সূত্রা সরকার সাহা

মর্মর ধ্বনি

ঐ শুনি মর্মর ধ্বনি বসন্ত বাতাসে,
ঝরা পাতা ঝরঝর ঝর মলিন হাসে,
কোকিল কণ্ঠে ক্ষণে ক্ষণে ক্ষণে কুহুতান,
ঝরা পাতার স্মৃতি বিজড়িত বিদায় গান।

উদাসী মন ধায়‌‌‌ ঐ নীল দিগন্তে,
হেথায় হোথায় বিদায় বাণী চিরন্তনী অজান্তে,
জীবন রেখার নিত্য সুখ দুখের কাহিনী,
ধরাতলে অমর হয়ে লেখা রবে জানি।

বনে বনে ফাগুনে ঐ বসন্ত বাতাসে,
স্মৃতি হয়ে বারবার ফিরে ফিরে আসে,
পলাশ শিমুল রাঙে রঙ জোছনার তান,
শেষের অশেষ বাণী ঐ বসন্তেরই দান।

স্বপন দেবনাথ

সেই সাক্ষাৎ

তপ্ত ধূলোবালির ভিড়ে
হঠাৎ তার সাথে দেখা 
যাকে খুঁজেছিলাম একদিন
সবুজে সবুজে, নীল দিগন্তে।

উন্মত্ত, পাগল করা শকট থেকে নেমেই 
চোখে চোখ পড়ল আমাদের,
যেন পথের পারে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সৌন্দর্য
এক অধীর আগ্রহে পথ চেয়ে আছে আমার।
দুদন্ড ধরেও থাকি নি সেই পথে 
এক পলকেই মুগ্ধতা নেমে এসেছিল
আকাশ জুড়ে।

সেই চাহনি , সেই অমূল্য হাসি, সেই অপেক্ষার ধরন
আমার মাঝে এনেছে যেন ---
সমুদ্রের বাঁধ ভাঙার জোয়ার ,
আজ‌ও চোখের পর্দায় ভেসে চলেছ তুমি ।
নীড়ে ফেরা নীল দিগন্তের সেই পথিকের মতো।
প্রেমমাতাল হয়ে আছি !
বিভোর হয়ে আছি তোমার প্রেমে ---
শুধু তোমার প্রেমে।

আসুক না আবার চোখে চোখ রাখার 
সেই মহেন্দ্রক্ষণ মুহূর্তটা ।
এবার না হয় একটু শান্ত হয়ে পথের ধারে 
পথিকের সেই পন্থশালায় মিলিয়ে নেব
তোমার আর আমার জমানো সেই অগ্নিলালা ।
না হয় কোনো এক নির্জন সবুজের মাঝে 
দুহাত এক করে হারিয়ে যাব প্রেমের অতল গহ্বরে।
আর না হয় গোমতীর পার হয়ে ছুটে যাবো কোনো এক 
নিরালা নীড়ে, 
অথবা ঝামেলাহীন কোনো এক  দ্বীপে।

সোনালী গোস্বামী

 মুক্ত আকাশ

অজানা পৃথিবী ডাক দেয় আমায় মৃদু সমীরণে,
যেনো এক পশলা বৃষ্টি ধুয়ে দেবে স্নেহের আলিঙ্গনে ।
বাঁধা- বিপত্তির অনেক ঊর্ধ্বে, ঊর্ধ্বতনের পরশে,
আকাশের মুক্ত নীলিমায় হারিয়ে যাবার হরষে।।

কখনো  নিজেকে নিয়ে ভাবনার পথে,
গভীর উপলব্ধির প্রকাশের সাথে।
মুক্ত বিহঙ্গের  মতো ডানায় ভর করে,
পরিযায়ীর বেশে দেশ থেকে দেশান্তরে।।

মেঘের ঘর্ষণে দুঃখের প্রাচীর ভেঙ্গে,
মনের সুখ মূল নিকেতনের রঙে।
আকাশের গভীরতায় হারিয়ে যেতে থাকি,
চেনা- অচেনার পথ চলা অনেক বাকি।

গ্রহ - তারকারাও অসীম অনন্তমেলায়,
নিজেকে সাজিয়েছে সঠিক বেলায়।
আমিও যেনো নিজেকে সাজাতে পারি,
মুক্ত আকাশ হয়ে যেনো বাঁচতে পারি।।

বিশ্বায়নের যুগে যেখানে কলের ধোঁয়ার গ্রাসে,
ফুসফুসের শিরাগুলি বিষাক্ত বায়ুর শ্বাসে।
আর  না হয় বিষময় নাইবা হলো...
পৃথিবীর নকশিকাঁথা এবার  জীবন বোধের  ভাবনা জড়াই চলো।।

অতনু রায় চৌধুরী

শান্তি

এরপরও কথা থেকে যায়,
থেকে যায় স্মৃতির চাদরে জমানো কিছু বিকেল।
জীবনে বড় হওয়ার তাগিদে
স্বপ্ন আর বাস্তবের ফাঁকে থাকে যে শৈশব
সেই শৈশবটাই সুন্দর।
 
তারপর চৈত্রের হাওয়া বৈশাখের আগমন 
সব মিশে যায় একসাথে।
দিনের শেষ বেলায় জড়িয়ে যায়
ক্লান্ত শরীর আর অভুক্ত পেট
যেখানে ডালে ভাতে মিশে গেলেই 
পরম শান্তি।

ছন্দা দাম

জ্যান্ত পাথর

আসলে আমি কোন মানুষ না...
আমি একটা অবয়ব মাত্র,
একটা অনুভুতি,একটা বোধ,অথবা ঝরা পাতার মতো একেবারে অর্থহীন কিছু!
আমি নিজের জন্য হাসি না কাঁদি না,খুশিতে মেতে উঠি না,বিরহে কাতর হয়ে যাই না,
মৃত্যুতে বিষন্নতার আঁধারে ডুবে যাই না
আসলে আমি বলতে কিছু আছে বলে বুঝতেই পারি না আমি!!
দিনান্তে সূর্য যখন মুঠো মুঠো আবির ছড়িয়ে দেয় আকাশে বাতাসে...
আমি অর্থহীন অনুভূতি হীন ভাবে তাকিয়ে থাকি শুধু,
কষ্টের তীব্র শৈত্যপ্রবাহে আমি আকুল জড়িয়ে ধরি না ভালোবাসার ওম,
বিরহের আকণ্ঠ বন্যাধারায় ডুবে যেতে যেতে আঁকড়ে ধরতে চাই না বাঁচার খরকুটো,
আমি যে কি চাই,ঠিক জানি না,
কি পেলেই বা আনন্দে ভরে যাব তাও জানি না!
আমি তোমাদের আনন্দ উচ্ছ্বাসের হাওয়ায় বর্ষশেষের ঝরা পাতার মতো একটু লাফিয়ে উঠি,
পথপাশের ক্ষুদ্র ঘাসফুলেদের বাঁচার প্রচণ্ড তাগাদা দেখে একটা নড়েচড়ে বসি প্রাণের তাগিদে,
আবার নদীকে পাথরের  প্রচণ্ড ধাক্কায় লাফিয়ে উঠে আবার সামনের দিকে প্রাণস্পন্দন নিয়ে এগিয়ে যেতে দেখে... আমার বুকের বাঁদিকটা হঠাৎ নেচে উঠে খবর দেয় বুঝি আমি জীবিত প্রাণী!
আমি আসলে জানি না আমি কি!

জগন্নাথ বনিক

পথিক 

যে পথে আমি প্রতিদিন হাঁটি,
সেই পথকে আমি ভালোবাসি।
ভালোবাসি সেই পথের দুধারে, বেড়ে ওঠা সবুজ বৃক্ষকে।
যে বৃক্ষে ফুল ফুটে,ফল দেয়,
ফুলের সৌরভে ছুটে আসে প্রজাপতি,
রঙিন পাখনা মেলে।
আর মৌমাছি এসে খেয়ে নেয়,
ফুলের মধু গুলি।
বৃক্ষের ডালে নবীন প্রবীণ পাখিরা এসে কুজন করে,
 আমি ভালোবাসি।
সেই বৃক্ষের শীতল ছায়ায়,
আমি ঘুরে বেড়াই আর স্বপ্ন দেখি।
যে পথে আমি প্রতিদিন হাঁটি,
সেই পথকেই আমি ভালোবাসি।

মিঠুন রায়

শিকার

প্রখর রোদ উপেক্ষা করেই সকালবেলায় সাইকেল নিয়ে বাজারে বের হয়েছে সুমন ভোর পাঁচটায় পত্রিকা অফিসে গিয়ে খবরের কাগজ সংগ্রহ করে। নয়টার মধ্যেই প্রায় তিনশত বেশি পত্রিকা সে গ্রাহকদের হাতে তুলে দেয়।তারপর বাড়িতে এসে প্রধান করে চলে যায় হরি বাবুর চট কলে।বহু শ্রমিক সেখানে কাজ করে।সকাল এগারটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত ডিউটি তার।হরি বাবুর সুমনকে খুব ভালোবাসেন।বি এ পাশ ছেলে। সম্পূর্ণ ভদ্র।কলেজে পড়ার সময়ই তার বাবা মারা যায়।বড় ভাই স্ত্রী -সন্তানদের নিয়ে গুজরাট থাকেন। সেখানেই চাকরি করেন।

   দেশের বাড়িতে সুমন এর সঙ্গী বলতে গেলে তার এক বৃদ্ধা মা। দুজনের সংসার।প্রতিবছর বাবার বাৎসরিক কাজের সময় সুমনের দাদা বাড়িতে আসে।তখন খুব আনন্দ হয়।

     হরি বাবুই বলতে গেলে সুমনের অভিভাবক।সুমনকে তিনি নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসেন। সুমন ওনাকে কাকা বলেই ডাকেন। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে সুমন খানিকটা ফ্রেস হয়ে চলে যায় টিউশনে। এমনটাই সুমনের রোজনামচা।

    গত পহেলা বৈশাখের সন্ধ্যায় সুমনের জীবনে একটা দারুণ ঘটনা ঘটল।তেমাথার মোড়ে হঠাৎ সুমনের সাথে দেখা হল সোহেলীর ।সোহেলী সুমনের কলেজ জীবনের বান্ধবী। শুধু বান্ধবী নয়,বলা যেতে পারে প্রেমিকা।এক সময় সুমন তাকে অন্ধের মতো ভালোবাসত। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ভুল ভাঙ্গে তার।সোহেলী বিত্তশালী ঘরের মেয়ে ছিল।তার বাবা তাকে বিয়ে দিয়ে দেয় ইঞ্জিনিয়ার পাত্রের সাথে।সুমন ভেবেছিল হয়তোবা সোহেলী এই বিয়েতে আপত্তি করবে।অথচ সোহেলী ভালো বর পেয়ে,সুমনকে এড়িয়ে যায়।হয়তোবা নিজের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা ভেবেই সোহেলী সুমনের সাথে সবধরণের সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নেয়।সুমন নীরবে মুখ বুজে সব সহ্য করে। বুকে এক রাশি স্বপ্নকে আটকে রাখে।তবে সুমনের মনে একটা গভীর বিশ্বাস ছিল যে, একদিন না একদিন সোহেলী তার নিকট আবার ফিরে আসবে। নিজের দুঃখ ভুলতে গিয়ে সে স্বেচ্ছায় সোহেলীর সব স্মৃতিকে বিসর্জন দিয়ে দিয়েছে।তবু, জীবনের প্রথম প্রেমকে আর অস্বীকার করা যায় না।যদিও বিয়ের পর একটি বারের জন্যও সোহেলী সুমনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেনি।সুমন তো অনেক আগেই সোহেলীর মোবাইল নম্বর ডিলিট করে ফেলেছে।

    সেদিন সোহেলী হঠাৎ সুমনকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে এসেছে। সুমন তাকে দেখেও না দেখার ভান করে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করে।আচমকা ভীড়ের মাঝে সুমনের হাত জড়িয়ে ধরে সোহেলী। এখনো সেই স্পর্শ।সেই অনুভূতি। অনেকটা লজ্জায় পড়ে যায় সে। এ কি,তুই কি করছিস।

হাত ছাড়।এখানে অনেক পরিচিত মানুষ জন। সবাই কি বলবে?

 সোহেলী নিজেও যেন সুমনের কথায় সংকোচ বোধ করল। সত্যিই তো। সুমনের হাত ছেড়ে বলে উঠল,তোর সাথে যে আমার অনেক কথা বলার আছে।

  সুমন তাকিয়ে দেখল ,এখন যেন সোহেলী র মুখে একটা অস্পষ্টতার ছাপ বিরাজ করছে।কলেজ জীবনের হাসি খুশী সোহেলী যেন খানিকটা বদলে গেছে। আচ্ছা, তাড়াতাড়ি বল-আমাকে আবার কাজে যেতে হবে।বলে উঠল সুমন।না,চল না-একটু পাশে বসে কথা বলি।এখানে কোথায় বসব।

সোহেলী বলে উঠল,একটু এগিয়ে গেলেই আমার বান্ধবী আয়েশার ফ্ল্যাট আছে। সেখানে বসে নীরবে কথা বলতে পারি।

হাত ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে সুমন বলে উঠল,বেশ তবে তোমাকে ত্রিশ মিনিটের বেশি সময় দিতে পারব না।

ঠিক আছে। যথেষ্ট সময়।

সোহেলী সুমনকে নিয়ে গেল আয়েশার ফ্ল্যাটে।আয়েশা তাদেরকে বসিয়ে রেখে চলে গেল স্কুল থেকে নিজের বাচ্চা আনতে। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে সোহেলী,সুমনকে বলে উঠল-আমাদের কলেজ জীবনের কথা তোর মনে আছে?সুমন হতচকিত হয়ে পড়ল।কেন,আবার এই পুরোনো কথা।সোহেলী বলে উঠল,আমি যে তোকে এখনো ভালোবাসি।এই কথাটা বলেই সোহেলী নিজের কামিজটা খুলে ফেলেছে।সুমন,চায়ের কাপটা টেবিলের উপর রেখে ,উঠে দাঁড়িয়েছে।তবে আমি আসি। পথ আগলে দাঁড়ালো সোহেলী।আমিতো তোমাকে যেতে দেব না।এখনো ত্রিশ মিনিট হয় নি। অনেক সময় বাকি আছে।

তবে এসব কি নোংরামি। সোহেলী জড়িয়ে ধরল সুমনকে। আমার শরীরের চাহিদা তুমি পূর্ণ কর।আমার স্বামী আমাকে শারীরিক সুখ দিতে অক্ষম। সোহেলী আমাকে ছাড়।আমি ভদ্র ঘরের সন্তান। আমার এই সমাজে যথেষ্ট সম্মান আছে। তোমার সাথে এখানে আসাটাই আমার ঠিক হয় নি।তুমি পরিকল্পনা করে আমাকে তোমার ফাঁদে জড়িয়েছ। সোহেলী বলে উঠল, আমার শারীরিক চাহিদা তোমাকে অবশ্যই পূরণ করতে হবে, নতুবা এই মুহূর্তে পাঁচ লাখ টাকা দিতে হবে। সুমনের দুচোখ দিয়ে তখন মন্দাকিনীর ধারা পড়ছে।সে বুঝতে পেরেছে, সোহেলী তাকে এখানে নিয়ে এসেছে নিজের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য। উদ্দেশ্য পূরণ না হলে,সে চিৎকার করে লোক জমায়েত করবে। প্রয়োজনে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দিতেও সে দ্বিধাবোধ করবে না।

  অগত্যা,সুমন বাধ্য হয়ে নিজেকে সঁপে দিল সোহেলী র হাতে। সোহেলীর শারীরিক চাহিদা পূরণ হলে ছুটে আসে আয়েশা।আয়েশাও তাকে ভোগ করে।সুমন যে আজ তাদের বাসনার শিকার হয়ে গেছে,তা বিলম্বে হলেও সে বুঝতে পেরেছে। 

     বেলা গড়িয়ে গেছে।সুমন বাড়ি ফিরে দেখে বৃদ্ধা মা ভাতের থালা সাজিয়ে বসে আছে সন্তানের জন্য পথ চেয়ে। মায়ের গলায় জড়িয়ে ধরে সে কেঁদে উঠল।কেননা,এ জগতে একমাত্র মা ছাড়া যে আর কেউ সন্তানকে নি:স্বাথ ভাবে ভালবাসেনা।

বিদিতা সেন

 স্মৃতিসুধা

সেই যে আমার দিনগুলো
বেশতো ছিল ভালো, 
আমার একটি আকাশ ছিল
ছড়িয়ে নীল আলো। 

সেই আকাশেই স্বাধীন মনের
মেলে দিতাম ডানা, 
বাদলের সাথে উড়ে যেতে
থাকত না কোনো মানা। 

সেই যে আমার মাটিতে ছিলো
সোনালী শষ্যের ধান, 
বৃষ্টিভেজা মধুর গন্ধে
জুড়িয়ে যেত প্রান। 

সেই যে মাঠটিতে ছিলো
সবুজ ঘাসের মেলা, 
প্রতিনিয়ত করিতাম সেথায়
সবান্ধবে খেলাধুলা। 

সেই যে আমার  নদীটি ছিলো
হয়ে যেত মৃদুছন্দে, 
তরঙ্গের সাথে জলকেলি
করিতাম আনন্দে। 

সেই যে আমার পাহাড়টি ছিলো
সদায় দাঁড়িয়ে নির্বাক! 
মনচাইলেই শুনাত আমায় 
প্রতিধ্বনির ডাক। 

সবকিছুই ভাসছে এখন
আমার স্মৃতিসুধায়, 
মনটা আমার হারিয়ে গেছে
জটিল জীবন ধাঁধায়। 

প্রকৃতির কোলে আছে স্নেহে
যেমনি ছিলো তারা, 
কালের শ্রোতে ভাসতে গিয়ে
আমি হয়েছি আমিহারা। 

রামমোহন বাগচী

রংএর নেশা 

রং তুলির খেলায়, রং ও তুলির ছলনা
দেখেও না দেখার নেশায় করে তাড়না ! 
অন্তর আত্মার জাগ্রত মশালের আলো 
লালসার  ফসলে  হয়েছে  কালো। 
আপোষহীন মানবতা ,গায় বিরোধী গান! 
সংগ্রাম খোঁজে বেড়ায় সংগ্রামী প্রাণ! 
প্রতিরোধের ভাষা হতাশার পাশে দাঁড়িয়ে 
হেঁটে বেড়ায় অন্ধ গলির পথ মাড়িয়ে।
ভালো আছে দেশ ও দেশের মননে     
বিছিয়ে কন্টক, আনন্দ কাননে !         
আগামী প্রজন্মের মুখে দিয়ে হতাশার প্রদীপ । 
হরি নামের ফোয়ারায় ভাসিয়ে যায় দীপ
ভিক্ষাপাত্র সাজিয়ে গুছিয়ে রাখে পাশে
তাই, নেশার তাড়নায় ভ্রমর ধেয়ে আসে , 
ভালো বাসার গন্ধ আজ নেই কোন ফুলে
সমীরণ  হারিয়ে  গেছে  নিজ  পথ  ভুলে। 
সরস্বতী হারিয়ে পথ কাঁদে পথে পথে
জ্ঞানের উৎস ক্ষমতা দখলের সাথে, 
আপসহীন সংগ্রামের নেশা, ভাসে ছলনায়
বেঁচে আছো রং তুলি ,অজ্ঞানের করুণার ছোঁয়ায়।

সুজন দেবনাথ

 আশা

আকাশ তলে বসে বসে রোজ
নিরালায় তারা গুনি,
রঙিন পৃথিবী আঁকবো বলেই
হাজারো স্বপ্ন বুনি।

কখনো কালো মেঘেদের দল
ব্যাঘাত ঘটায় কাজে,
কুড়ানো স্বপ্ন হারিয়ে যাওয়া
হয়তো ভীষণ বাজে।

তবু বাঁচতে গেলে গড়তে হবে
আবার নতুন করে,
জানি অস্ত রবি উঠবে আবার
নিত্য নবীন ভোরে।

জয়িতা ভট্টাচার্য

অবচেতন 

মাঝে মাঝে শীত খুব।
মাঝে মাঝে উষ্ণতা উধাও। 
অনন্ত গহ্বরে ডুব
শীতল রমণ থেকে বহু দূরে
দূরে সরে যাই।
জীর্ণ কাঁথার ভেতর টলমল নদী
ওইখানে ভাসাই শৈশব
কাগজের ডিঙি,
ওখানে দাঁড়িয়ে  আমার মা
আর আমার বাবা আকাশে 
তার হাত ছুঁয়ে আছে 
বাগান থেকে উড়ে আসছে 
নীল প্রজাপতি 
আমার চোখ থেকে গড়িয়ে 
গড়িয়ে পড়ছে কষ্ট 
এই অন্তরাল আমাকে নিয়ে যায় নির্বাণে

অলকা গোস্বামী।

গল্প

অবেলার বন্ধু

মনীষার এই প্রশ্নে হঠাৎ করে হকচকিয়ে গেল তৃণা।

বেশিদিন হয়নি, ছেলের বন্ধুর বোনের আইবুড়ো ভাত অনুষ্ঠানে পরিচয় হয়েছে মনীষার সাথে। প্রথম দিন থেকেই কেমন একটা হৃদ্যতা অনুভব করে তৃণা।

ছেলের সঙ্গে এই মফস্বল শহরে থাকছে তৃণা। স্বামীও চাকুরীসূত্রে অন্য শহরে। নিজেকে কখনো খুব একা মনে হয়।  মনের কথা খুলে বলার মত লোক আশে পাশে কেউ নেই। দিনে একবার অন্তত অরিত্রের সাথে কথা হয়।সেই নিয়ম মাফিক খোঁজ খবর নেওয়া। অরিত্র আজকাল বেশী কথা বলে না। ভীষন টায়ার্ড শোনায়.....,তাই কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায় তৃণা। মনের ভাবনা চিন্তা সম্পূর্ন ভিন্ন দুইজনের। যদিও পরস্পর যত্নশীল। কিন্ত আরিত্রর সঙ্গে মানসিক নৈকট্যের সাঁকোটা ভাঙে গড়ে.... এরকমই চলছে।

কিন্তু কিছু একান্ত অনুভূতি কারো সাথে ভাগ করা যায় না।

এই যেমন...

খুব চুটিয়ে প্রেম করতে ইচ্ছে করে, সেই কৈশোরে যখন প্রথম কাউকে ভালো লেগেছিলো। আবছা চেহারা, আজ আর মনে পড়ে না।স্কুল ছুটির পর সিঙ্গাড়া খেতে যাওয়া, ভয়ে বুক দূরু দূরু, কেউ না দেখে ফেলে.... সেসব কি অরিত্র কে বলা যায়!! মনে মনে হাসে তৃণা। 

শীতের ঘোলাটে রোদ মেখে বেরিয়ে যেতে ইচ্ছে করে... গ্রামের পথ ধরে কোনো এক অজানা অচেনা রাস্তায় ধোঁয়া ওঠা চায়ের দোকানে। অলস চোখে চারপাশের মানুষ জন দেখে আবার শেষ নাওয়ে ঘরে ফেরা।

এসব অভিযানে যাওয়ার জন্যে বন্ধু চাই।সেই যাকে দেখলেই  মন ভালো হয়ে যায়। যার হাত ধরে গোধূলি বেলায় কোনো মেঠো পথে শালবনের ছায়ায় হারিয়ে যাওয়া যায়। মনীষাকে সেরকমই বন্ধু মনে হয় তৃণার।

অনেক বছর ধরে একটা শহরে থেকেও সেরকম কোনো কেউ নেই। কংক্রিটের জঙ্গলে মানুষের মন গুলো ও বড্ড পাথুরে। প্রাচুর্যের চাপে পিষ্ট। কোনো গভীরতা নেই। কথা বার্তা বড্ড মেকি।

তাই

এই মফস্বল শহরে মনীষাকে পেয়ে খুব ভালো লাগছে তৃণার।

"সে হয়না মা, মুনিয়া আমার জীবন বাঁচিয়েছে। সেদিন যদি ও আমাকে জঙ্গলের মধ্যে থেকে তুলে না আনতো তাহলে আজ আমি হয়ত বাঘের পেটে থাকতাম"।

"সবই বুঝলাম বাবু, কিন্তু তুমি তোমার জীবন বাঁচানোর প্রতিদান হিসেবে যা করতে চাইছ সেটা আমাদের পক্ষে মেনে নেওয়া...., 

আমার মাথায় কাজ করছে না। আমাদের সমাজ, আত্নীয় স্বজন এরা.... সর্বোপরি ভবিষ্যতে তুমি কি অ্যাডজাস্ট করতে পারবে। আবেগ নয় বুদ্ধি দিয়ে বিচার কর বাবু।"

মা, আমার তোমাকে বলা হয়ে গেছে। তুমিই সামলাবে সবকিছু"। এই কথা বলে মৈনাক বেরিয়ে যায়।


মাস ছয়েক ধরে এনজিও র সাথে একটা প্রোজেক্ট কাজ করছে মৈনাক। বাড়ী বাড়ী গিয়ে ডাটা কালেকশন করতে হয় ওদের। তৃনার ছেলে অন্ত প্রান, তাই ছেলের সাথে এই সাঁওতাল গ্রামে পড়ে আছে।


অরিত্র কে কিভাবে জানানো যায়.... হঠাৎ করে এই কথা শুনে, ওর না শরীর খারাপ হয়....। ওখানে একা আছে, কিভাবে রিয়েক্ট করবে...! তৃণা  কী করবে না কাকে বলবে, কিচ্ছু ভেবে পায় না।

"আচ্ছা মনীষার সাথে কথা বলে দেখি ....! ও হয়ত কিছু একটা ভালো বুদ্ধি দিতে পারে"।

পরদিন মনীষা কে দেখে জড়িয়ে ধরলো তৃণা।

"জানো তো তোমাকে পেয়ে ভীষণ ভালো লাগছে। ভরসা পাচ্ছি। অনেক কথা আছে। চল চা খেয়ে আলাপ করি"।

"আচ্ছা তৃণা, এখানে আসার আগে এতো বছর তুমি বড় টাউনে নিজের ফ্ল্যাট এ থাকতে।তো সেখানে কি তোমার কোনো বন্ধু ছিলনা? যে তুমি আমাকে ডেকে আনলে। তোমার সংগে আমার পরিচয়ের তো বেশীদিন হয়নি"।


আচমকা মনীষার কথায় হকচকিয়ে  গেলো তৃণা।

"মনীষা, আসলে কী জানতো, তোমার মধ্যে হয়ত কোনো এক সময় আমি নিজেকে খুঁজে পাই। তাই এত কম সময়ের পরিচয়ে আমি তোমাকেই নিজের বলে কাছে ডেকেছি। আর জানতো এই বয়সে এসে সহজে বন্ধু মেলে না।.... নিজের লোকেদের ভীড়ে, পরিচিত পরিবেশে, হাসি খুশি ইমেজ ধরে রাখতে হয়। নাহলে সবাই তোমাকে  করুণার পাত্র হিসেবে দেখবে। সেটাতে রেপুটেশন বজায় থাকে না। সম্পর্কের ফাটলে রিপু করে.... মেকআপ এর প্রলেপ চড়িয়ে তবে, ভিতরে তোমার যাই থাক না কেন"!

"হম,বুঝলাম। তবে কী জানতো, জিজ্ঞেস করলাম এইজন্যে। যে আজ তুমি অজ পাড়াগাঁয়ে আছো তাই আমাকে মনে রাখছ। দুদিন পর চলে যাবে।....তখন"

কথা বলতে বলতে মনীষার চোখ ভরে এলো। তৃনা বলল,

"মনীষা জীবনের পড়ন্ত বেলায় তোমাকে পেয়েছি। কিছুদিন পরেই আঁধার নামবে। তখনই তো আমরা দুজন দুজনকে বেলা অবেলায়, রাতের ঘন আঁধারে বন্ধুত্বের আলোর মশাল হাতে নিয়ে পথ চলব"।

 দূরে কোথাও রেডিও তে

চির সখা হে..., গানটি শোনা যায়।

দীপান্বিতা পান্ডে দীক্ষিৎ

প্রণাম

প্রতিদিনের ভালবাসার অভিনয় ছেড়ে,
দেখি আমার আমি কে ৷
বরফ সাদা হিমালয়ে নিস্তব্ধ আকাশের মাঝে,
কত কথা বলে যায় নিঃশব্দে ৷
নেই প্রতিশোধ নেই উত্তাপ শুধুই দাড়িয়ে থাকা আজীবনI 
বাধার পাহাড় রক্ষা চারিধার প্রমানের নেই প্রয়োজন৷
নিজের অস্তিত্ব নিজের মাঝে,
বলে বারবার টিকে থাকার অধিকার ৷ 
আয়োজন প্রহসন সময়ের নিরীক্ষণে ,
প্রমাণ নির্ভর করে কর্মের বীজে ৷

মনচলি চক্রবর্তী

সবুজের স্পর্শ ও"ঊনকোটি শ্রীঙ্গেরী সারদা পিঠম" লোকমুখে  (তিরুপতি বালাজি মন্দির)

সৃষ্টিকর্তা নিজে সবুজের অমৃত স্পর্শে  শস্যশ্যামলা বসুন্ধরা সাজিয়েছেন।সবুজের পরশে ধন্য জীবকূল। সবুজ প্রকৃতি, সবুজ বনানী, সবুজ মাঠ,সবুজ পাহাড়।সবুজের মাঝেই লুকিয়ে আছে প্রাণের স্পন্দন । সবুজ প্রকৃতিই  আমাদের প্রকৃত জীবন সঙ্গী।

ত্রিপুরার প্রাচীন ঐতিহ্যমন্ডিত  সবুজ শহর কৈলাশহর। শহরটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য  আর দর্শনীয় স্থান সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। 

কৈলাশহরের অনতিদূর , বিলাশপুরে(ডলুগাঁও)

অঞ্চলে অবস্থিত সুবিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে   নব নির্মিত দক্ষিন ভারতের মন্দিরের   আদলে গড়া অপূর্ব   "ঊনকোটি শ্রীঙ্গেরী সারদা পিঠম"মন্দির লোকমুখে  তিরুপতি বালাজি মন্দির। 

"ঊনকোটি শ্রীঙ্গেরী সারদা পিঠম" লোকমুখে 

বালাজি মন্দির  বা  বিষ্ণুমন্দির। যেখানে বিষ্ণুদেবের পূজার্চনা  হবে।

দক্ষিন ভারতের মন্দিরের স্থাপত্য ভাস্কর্যের সংমিশ্রণে সুসজ্জিত মন্দিরটি নিজ মহিমায় মহিমান্বিত। দীর্ঘ দিনের পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টার ফলশ্রুতি নবনির্মিত এই  মন্দির। 

সবুজ পাহাড়, নদী, সবুজ ঘাস আর বনানীর  মাঝেই গড়ে উঠেছে  সুন্দর স্থাপত্য ভাস্কর্যের অপূর্ব নিদর্শন তিরুপতি মন্দির।সবুজে ঘেরা বনানী ঘেঁসে আঁকাবাকা পথ চলে গেছে মন্দিরের দিকে। চারিদিকে শুধু সবুজের সমারোহ আর পাখিদের কলতান। সবুজ ঘাসের মাঝে পাহাড়ি মাটির লাল পথ গেছে মিশে।প্রবেশ পথে বিশাল সবুজ এক আকাশচুম্বি  উচ্চ বৃক্ষ  আমন্ত্রণ করছে যেন দর্শনার্থীদের।এই সুউচ্চ সবুজ বনস্পতি মন্দিরের শোভা বর্ধন করছে। চারিদিকে সবুজের সমারোহ।সবুজের চাদরে মোড়া সুউচ্চ রং তুলির টানে সুসজ্জিত  পর্বতের ন্যায় মন্দির।মন্দিরের স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের নিপুণতা দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো। বিভিন্ন দেবদেবীর উজ্জ্বল  মূর্তিতে সুসজ্জিত মন্দির। মূর্তির রূপ আকৃষ্ট করে দর্শনার্থীদের।মূর্তি গুলো যেমন স্বাভাবিক তেমনি  সজীব। 

তিনটি ভাগে সুসজ্জিত এই মন্দির টি।দুধারের  দুটি   ক্ষুদ্রাকৃতির সুউচ্চ সুসজ্জিত  মন্দিরের মাঝে বিশাল আকাশচুম্বি তিরুপতি তথা বিষ্ণুর মন্দির।  পূজার্চনার  মূল স্থান।সুন্দর কারুকার্যে সুসজ্জিত  সেই মন্দিরের প্রবেশ দ্বার। প্রবেশ দ্বারের উপরে দেবদেবীর মূর্তি।প্রবেশ দ্বার উন্মোচিত হলেই বিশাল আকারের পাথরের বিষ্ণু মূর্তির অধিষ্ঠান।তিরুপতি তথা বিষ্ণু মূর্তির সৌন্দর্য  অপার।  দুদিকের মন্দির দুটিতে  অপরূপ বিভিন্ন দেবদেবীর  মূর্তি নির্মিত ।অত্যন্ত নিপুণতায় শিল্পী  রূপ দিয়েছেন, প্রান দিয়েছেন মূর্তিগুলোর মাঝে। 

দাক্ষিণাত্যের মন্দির গুলির শিল্প স্থাপত্য ভাস্কর্য চিত্রকলার ছাপ রয়েছে এই মন্দির টিতে।মন্দিরের শীর্ষ দেশ কারুকার্যে উজ্জ্বল। দেওয়ালের  ও মন্দির প্রাঙ্গনের চিত্র কলা অপূর্ব। নবনির্মিত এই মন্দিরটিকে নিয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনা ও অসমাপ্ত কাজগুলো সম্পূর্নতা পেলে মন্দিরটি সমগ্র রাজ্যবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। সবুজ প্রকৃতির হাতছানি ও সুউচ্চ সুসজ্জিত মন্দির টি ভবিষ্যতে কৈলাশহর তথা  ত্রিপুরা রাজ্যর  পর্যটন মানচিত্রে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।

ঝিমলি আচার্য

অপেক্ষা 

বাবা একটু শোন 
বল কেন ডাকলে ।
বলছি একটা শিউলির চারা লাগবে, 
হঠাৎ শিউলির চারা ?
শিশু জন্মদিয়ে লালন-পালন করে--
ওকে স্নেহ ডোরে গেঁথেছি ।
এখন চারা পোঁতে ওকে মানুষ করব ।
কেন ? কিছু হয়েছে? 
না না, ইচ্ছে হয়েছে তাই ।
বল ছোট না বড় চারা, 
মানুষ করব তো তাই--
ছোট চারাই আনিস ।
 রক্তমাংসের শরীরে ক্রোধ, হিংসা ,
লোভ ,ভয় ,মান অভিমানের ওঠা -বসা
নিত্য রিপুচক্রের ঘূর্ণাবর্তন ।
আর ধৈর্যশীল সহিষ্ণু প্রাণী  উদার চিত্তে
প্রতিকূলতাকে শিরে ধারণ করে
শ্রেষ্ঠ ধর্ম পালনে নিমজ্জিত ।
তাই ধর্মপরায়ণের প্রতি একটু 
যত্নশীল হই ,কি বলিস ?
ঠিক আছে ঠিক আছে তাই হবে --
মা ধর তোমার ছোটকে কতইনা 
তিরস্কার পোহাতে  হল ।
ছোটর জন্য নিতেই হবে 
ও সমুদ্র এক বিন্দুমাত্র ।
চল ওর যোগ্যতম জায়গা সাজাব 
 কোন কষ্ট যেন ওকে স্পর্শ করতে না পারে ।
ছোটর যত্নে দাদা কোমর বেঁধে লেগে পরল ।
খুব ভালো লাগছে মা ওকে সাথে পেয়ে ।
ছোটর মধ্যে অনুভূতি জেগেছে 
আলো-ছায়া আকাশ-বাতাস 
সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে উপভোগ করছে ।
মা আনন্দ আনন্দ আর আনন্দ, 
কদিন বাদে ছোট আমাকে সাহায্য করবে ।
তোর জন্ম থেকে আজও এই 
আনন্দ উপভোগ করছি--
কেন জানিস ? 
তুই ওকে আর আমি তোকে 
নিজের হাতে মানুষ করছি তাই ।
শিউলি শরৎ এর আকাশ বাতাস --
মুখরিত করে তোলে" মা " এর আগমনী বার্তায় ।
প্রতিটি হৃদ স্পন্দনে বেজে ওঠে আনন্দের ঝঙ্কার ।
শিউলি হাঁপিয়ে তোলেছে মা 
ওর কোন দায়িত্ব নেই ?
আছে আছে ধৈর্য ধর ।
অনেক অপেক্ষার পর আজ 
শিউলির শোভায় সুশোভিত ।
ছোটকে নয় " মা " তুমি 
আমাকে মানুষ করেছ ।
খোকা তোর শোভার অপেক্ষায় 
                   আমি ।

চন্দ্রা বিশ্বাস

মেয়ে বেলা

সবুজের সরসতা চিরে, ঘোলাটে কুয়াশার প্রচ্ছদ ফুঁড়ে 
প্রথম আলোর শরীরে বর্বরতা কেটেছিল দাগ, 
কুঁড়ি থেকে ফুলের ফুটে ওঠা দেখা হয়ে ওঠেনি তখনও,
বোঝা হয়ে ওঠেনি প্রজাপতি-ভ্রমরের নুপুর-নিক্কণে তৃপ্ত পরাগ মিলন রহস্য। 
তারপর কখন ধীরে ধীরে, কালের কালির আঁচড় মনে ও শরীরে ।
দর্পণের সামনে দাঁড় করাই নিজেকে, জেগে ওঠে নদীচর বানভাসি থেকে,
মনেতে দুপুুর গড়ায়, নারকোল পাতারা দোল খায়,
দোল খায় আবেগে বিভোর, 
হিপনোটাইজড্ এক উত্তীর্ণ কৈশোর। 
প্রখর রৌদ্রেও মনে মনোরম জ্যোৎস্না, জ্যোৎস্না অগোছালো, 
দিনরাত মন-মাথা সব এলোমেলো। 
সময় শরীরে সাঁঝের গভীরে মন ভাঙে কান্নায়,
মিষ্টি মেয়েবেলা চোখের জলেতে মুছে মুছে যায়, 
আর, তুচ্ছ  মেয়ে জন্মটার মৃতদেহ পড়ে থাকে চরম অবহেলায়, জন্মাবধি চেনা সেই  ভুবনডাঙার মাঠটায়।