Nov 13, 2024

তৈমুর খান

ব্যবসা

রোজ আমাদের বিবেক বিক্রি হয়
রোজ আমাদের লজ্জা বিক্রি হয়
তোমরা শুধু দোকান খুলে রাখো
তোমরা শুধু ব্যবসা চালাও

শরীর জুড়ে তোমার দোকান
শরীরী দোকানগুলি
আমরা শুধু মোহ কিনতে যাই
আমাদের শুধু মোহের নেশা পাই

কোন্ আগুনে পুড়তে থাকে দেশ?
কোন্ আগুনে পুড়তে চায় মন?
কেউ বোঝে না, মন বোঝে না
পুড়তে পুড়তে সবাই নিঃশেষ

সবাই দেখি বিজ্ঞাপন দেয়
 বিজ্ঞাপনে শরীরী আশ্লেষ 
সব পর্দা উড়ে গেলে একইরকম টান
সব দোকানেই এখন শুধু সহজলভ্য কাম।

সমরেন্দ্র বিশ্বাস

মহারাজ তোমাকে আজও ভোলেনি

দূরে ব্লাস্টিং-এর আওয়াজ, পৃথিবীকে খুঁড়ছে মানুষ।
সমস্ত গাছগুলি দীর্ঘকায় সৈনিকের মতো স্তব্ধতায় দাঁড়িয়ে আছে
যেন এক্ষুনিই কুচকাওয়াজ শুরু হবে।
এইসব সুসংবদ্ধ সৈনিক বৃক্ষের মধ্য দিয়ে হেঁটে চলেছি
আমি মহারাজ!

ঢাল তলোয়ার দূরে ফেলে এসেছি আজ
হালকা নীল আকাশ খাটিয়েছে সামিয়ানা
গাছপোকা কিংবা ঝিঁঝিঁরা ধরেছে সানাই।
আমার শরীরে এখন কোনো লং মার্চ নেই, নেই কোন আস্ফালন
এই মুহূর্তে যে কোন মানুষের সঙ্গে
আমি মহারাজ, ভাগাভাগি ভাত খেতে পারি।

বাতাস আঁচড়ে দিচ্ছে বন-বালিকার চুল।
ওগো হলুদ মেয়ে, তুমি তো আমারই ছিলে
সেই কবে কতকাল আগে
আমরা দুজনে একই সঙ্গে ঝুলতাম
পাগলা হাওয়ায় ছুটতাম
ঘাসের জঙ্গলে গড়াগড়ি যেতাম।
বালিকা, তুমি আজ কোথায়?
অদলবদলের স্রোতে কোথায় তুমি হারিয়ে গেলে?

এই দ্যাখো, জঙ্গলের মধ্য দিয়ে তোমার মহারাজ হেঁটে চলেছে
একা একা সঙ্গী নেই সাথী নেই
শুধু সুন্দর পোষাকের নীচে একটা সিসের ভারি জামা, কিংবা রক্ষাকবচ।
এখনও হয়তো তুমি নীল শাড়ি দুলিয়ে আনমনে হেঁটে যাচ্ছ
যেন এক রাজকন্যা।
মনে কি পড়ে তোমার মহারাজকে
যাকে তুমি চুপি চুপি মুকুট পরাতে।

এই অনন্ত বনমালার মধ্য দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে
আকাশে একটা দুটো করে তারা ফুটবে
দূরে বক্সাইটের খাদানে ব্লাস্টিং এর আওয়াজে 
আমি থমকে গিয়ে দেখবো
তোমার জেন্টেলম্যান দিনগুলো ক্যালেন্ডারে উল্টো হয়ে ঝুলছে।

পথ হাঁটতে হাঁটতে কোন এক স্ট্রীটে
তুমি এখন অসহায় থমকে দাঁড়িয়েছ,
আকাশের তারায় চোখ রেখে 
তোমার নাকেও ভেসে আসছে পুরোণো দিনের গন্ধ!

হু হু করে বাতাস বইছে।
সরলবর্গীয় অরণ্যের সৈনিকেরা এখন আমার সামনে কুচকাওয়াজ করবে,
আর অক্ষমতার আক্রোশে আমি আদেশ দেব নক্ষত্রকে: ‘নীলডাউন হও।’
তারপর ক্যাম্পে ফিরে গিয়ে আহত সৈনিকের মতো অসহায় পড়ে থাকব
শুধু একটা কথাই বলার জন্যে: ‘মহারাজ তোমাকে আজও ভোলেনি।’

সোমেন চক্রবর্তী

আবার দেখা হলে 

কয়েনটা টস করে জিতে গেলাম

চাই 
      এগিয়ে এসে কথা বলুন 
      এতদিন নীরব থাকার কৈফিয়ত দিতে হবে না
      শুধু বলে যান এই সময়ের কথা 
      উপায় বাতলে দিন ছেড়ে আসা শূন্যতাকে কীভাবে ভোলা যায়

আপনি যুদ্ধবন্দী সৈনিক নন
নীরবতা ভাঙুন,
চাইলে এক পা পিছিয়ে যান। 
আবার খেলা শুরুর কথা উত্থাপন করতে পারেন
অথবা ময়দান ছেড়ে যেতে পারেন।

যদি কয়েন আপনাকে জিতিয়ে দেয়!
আপনিও হয়তো চাইবেন আমার এগিয়ে আসা

আমি তখন তাকিয়ে দেখবো আপনার দৃষ্টির ভেতর 
স্মৃতির ভেতর
কোনো শূন্যতা আছে কিনা?

জ্যোতির্ময় মুখোপাধ্যায়

দেখা হবে

এটুকুই তো? তবে দেখার 
সিদ্ধান্তে রেখো কিছু খুচরো আদর

প্রতিশ্রুতি ছিল, অধৈর্য ঊরু
থেকে স্থিতধী নাভি পর্যন্ত আমরা হেঁটে যাব

আমরা চুমু খাব, আমরা
হেলায় হারিয়ে ফেলব যাবতীয় কথা

আমরা ‘কবিতা সামনে রেখে কথা বলব’

উমাশংকর রায়

একটি গেরো ও তার দুই প্রান্ত

সাগরময় দুঃখের মুখ চেয়ে দুঃখীরাম হাসে।
দিনরাত জলে ভিজে। 
সে জলে ডুবে আর ভাসে। 

দুঃখ নিয়ে তার কোনও ভাবনা নেই। সে জানে দুঃখ মানেই অন্তহীন অপার সাগর। অন্তহীন ঢেউ। শুকোবে না কখনও। 

সেই দুঃখীরাম কানাগলি থেকে রাজপথ ঘোরে। আর চিৎকার করে বলে, কে বেঁধেছে এ গেরো?! ডাকো। ধরো তাকে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ কোন বেয়াদপি! এ কী অসভ‍্যতা তার?! 

কাকে বকছে দুঃখীরাম এভাবে ? 
সবাই কান পেতে শোনে। 

মাথায় মুকুট পরে জৈববাদীরা এলেন। মাথা নাড়লেন। গেরোটির আগাপাশতলা দেখলেন। গেরোটির হাত-পা-মুখ-উদর আবিষ্কার করলেন।
কিন্তু তারপর একদিন 
সেই দলটি জাদুকরের মতো শূন‍্যে বিলীন হয়ে গেল! 

আরও অনেকেই এলো 
দুঃখীরামের চিৎকার শুনে 

সাদা বকগুলো উড়ে এসে লাল চঞ্চু ফাঁক করে সেই যে ডুব দিলো জলে - উঠে এলো না ডাঙায় আজও! 
ওরাই বলেছিল, আমরা আসবই। 

শকুনি তার ভাগ্নের চোখে লেজার ট্রিটমেন্টের পরামর্শ দিয়ে ডুবেই মরল। 
পার পেলো না কোথাও। সব শর্ত ডুবিয়ে মারল। 

এভাবেই 
একে একে সব ধসে গেল! 
ধ্বংস হল বন! মৌন পাহাড় ফেটে পড়ল। 
লড়াই হল। যুদ্ধ হল। 
আরও কত-কী হল! 

কিন্তু দুঃখীরাম চিৎকার করে বলে, 
ওরে - বিপ্লব হল কই?! 

চিৎকার থেমে গেলে সবাই দেখে 

গেরোর এক প্রান্তে রাষ্ট্র!
অন‍্য প্রান্তে ক্লান্ত দুঃখীরাম -
পাশে তার আপামর সব সই!

দেবাশ্রিতা চৌধুরী

 নির্মোহ

আমি প্রকৃতি আমি পৃথিবী
আমি আকাশ আমি মাটি
পৃথিবীর প্রত্যেকটি ধূলিকণা আমি 

সম্পর্কের সূঁচে সুতো গেঁথে 
অবিরাম সেলাই করে যাই
আবার ছিঁড়ে যায় আবার 
প্রানপণে জুড়ে দেবার চেষ্টা 
নকশাগুলো শেষ পর্যন্ত 
ছবি আঁকতে ব্যর্থ হাহাকার 
করে সরে সরে যায়...
কুম্ভীপাকের আহ্বানে ভয়ে 
কাতর কন্ঠে মাকে ডাকি
ফিরিয়ে দাও তোমার গর্ভজল
অন্ধকারে বত্রিশ নাড়ি জড়িয়ে 
নির্মোহ হয়ে আরেকবার বাঁচি...

ভবানী বিশ্বাস

যেমন আছি

"পুতুল, ভালো আছ?"
সারাচিঠি জুড়ে শুধু এটুকু কথা...

প্রতিটি বিকেলে পুকুরপাড়ে বসে থাকা
গভীর অপেক্ষায় দিন কাটা 
তারপর বহু অপেক্ষার পর একটা চিঠি!
সেখানেও কৃপণের মতো 
শুধু ভালো থাকার কুশল জানতে চাও...

বাণীদা' ভাল থাকার বাইরে আর কিছু জানার নেই বুঝি?
নাকি চেয়েও বলতে পারো না!

শেষ পর্যন্ত আমাদের কিছুই হল না।
আমরা কিছু গড়তেও পারিনি।
পারিনি কিছু ভাঙতে...
বাণীদা, তোমার প্রশ্ন আর আমার নীরব উত্তরের মাঝে পড়ে আছি।
আমাদের আর এগোনো হল না…

নবীনকিশোর রায়

জোনাকি'র রাত 

জ্বলে নিভে, ভিতরে ভিতরে জ্বলে,নিভে না,
জীবন্ত বোধের ভিতর জোনাকি'র পেটে আগুনের ফুলকি বেঁচে থাকে! 

অমানিশার প্রতি পক্ষকাল 
অন্তর দহনের তীব্রতায়---
আগুন পুষে রাখে,পুড়িয়ে ফেলতে চায় ক্ষুধার্ত সময়ের নাগপাশ---

দুর্বিসহ অন্ধকারাচ্ছন্ন দীর্ঘরাত, 
জোনাক জীবনে কাঙ্ক্ষিত সূর্যসকাল,শতাব্দিব্যাপী কোঠরিতে বন্দিবাস, 
ঠেলে ঠেলে রাতের মিনারে চাপা পড়ে থাকে... 

সুশান্ত নন্দী

মহাবোধি এবং বৌদ্ধস্তুতি

(১)
জোছনা ভাঙা আলোপথে হেঁটে যায় শুধু বৌদ্ধ ভিক্ষুই...

(২)
"তুমি এলেই জোছনা প্রজ্জ্বলিত হবে অন্ধকারে "

(৩)
আমার সমর্পনে জুড়ে দাও অজস্র বৌদ্ধস্তুতি

(৪)
স্তব্ধতায় হেঁটে যাচ্ছি মহাবোধির দিকে

(৫)
তোমার দু চোখের প্রশান্তি আমাকে আলোকিত করে

অমিত সরকার

দু' জন দু'ঘরে  দু' তীরে

জানি না কতটুকু প্রেম,ত্যাগ,সন্মান করেছি
কতরাত জাগতে পেরেছি,
কতদিন ভাবতে ভাবতে ভাব হয়ে গেছে অন্তরের তরল ।
অনেক দূর পাহাড়,দেশ সীমানা নিষিদ্ধ আমার ,সেখানেই তোমার বাস । 
কোন ক্ষন ফিরে তাকাবার সময় হয় নি তোমার,
আমি বারবার মনে করেছি,।
কতগুলি বছর পার হয়ে, নদীর তীরে তোমার সাথে দেখা,
আমার এপাড়, তোমার ওপাড়,
তুমি সে তীরে ভালো আছো,
একবার আমন্ত্রন করনি সে তীরে যেতে,
শুধু ঐ পাড় থেকে  বললে, 
প্রতিদিনের  গৌধুলিতে এসো ।
সন্ধ্যা পাখীদের ঘরে ফেরার ছায়া দেখবো দুজনে দু তীর থেকে ।
পদ্মফুল ভাসতে ভাসতে কোথায় মিলিয়ে যাবো
দেখবো দু'জনে ।
সন্ধ্যা হতে হতে গাঢ় অন্ধকার নদীতে কুয়াশা উঠবে, তরঙ্গ মিলে যাবে নিজের সাথে ।
ফিরে যাবো দু' জন দু' ঘরে  দু'তীরে ।
এক ঘরের বাতি নিভে গেলে ,আরেক ঘরের নিভে যাবে ।
এমন এক গৌধুলি আসবে,  
একজনের সে সময়ে আজ আর  আসা হয়নি 
অপেক্ষা করতে করতে অন্ধকার,
আজ এক  ঘরে আর বাতি জ্বালায় নি ।
ঝড় উঠেছে  এক তীরে,
তবু শান্ত  ঐ তীরে আর  যাওয়া হয় নি ।

মিঠু মল্লিক বৈদ‍্য

শার্দূলী হবো এবার

এই মেয়ে তুই আবার এখানে?
তোর চিৎকারে আজও শিহরণ জাগে গায়ে,
প্রতিটি ক্ষত চিহ্ন জানান দেয়, তোরা শুধু ভোগের বস্তু । চোখের তাজা রক্ত বলে 
মানুষ রূপী হায়নাদের বর্বরতার কথা।

তোর যোনী ভরা আঠালো সাদা রস বলে 
হিংস্র শার্দূলদের যৌন ক্ষুধার বিভৎসতা।
তবুও তুই এখানে? আবারও এসেছিস মেয়ের রূপে।
যেদিন শেষ বিদায় জানালাম,বার বার বলেছি "আর কখনো আসবি এখানে।" তবুও!

বীভৎস দাবানলের মতো জ্বলতে জ্বলতে 
মেয়েটি এগিয়ে চললো আমার চোখের সামনে।
খোলা চুল,চোখে আগুন, হাতে তীক্ষ্ণ নখ
পায়ে রক্ত, কথা শুনে খানিক দাঁড়ালো সমুখে,
আমি নির্বাক।

চিৎকার করে বলে উঠলো 
অন‍্যায়ের সাথে আপোষ করিনি কখনো
আজও না,তাই এসেছি এবার রণরঙ্গিনী হয়ে
প্রতিটি অন‍্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করার অঙ্গীকারে
দেবীতে বিশ্বাস নয়,এবার খড়গ তুলবো নিজ হাতে।

প্রতিটি হিংস্র দূর্বিত্তের মুন্ডশ্ছেদে হবো ক্ষান্ত,
মিথ‍্যার বুকচিরে সত‍্যকে  স্থাপনে,
অন‍্যায়ের মুখোমুখি প্রথম প্রতিবাদে 
আমাকেই পাবে সবার আগে।
হাজার তিলোত্তমার মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে এসেছি আবার।

ঐ যে দেখছো অন‍্যায়ের প্রতিবাদে নারী পুরুষ নির্বিশেষে, রয়েছে রাজপথে 
তাদের নিরাপত্তা দিতে আমি এসেছি রণ সাজে।
এবার যুদ্ধ হবে যুদ্ধ।
আপোষহীন যুদ্ধ। জিততে হবে আমাকে।

হবো শার্দূলী
অধিকার আর নিরাপত্তার দায় নিজের,
প্রতিষ্ঠা করেই আমি হাঁটতে থাকবো পৃথিবীর পথে
নতুন পৃথিবী,যেখানে শার্দূলরা ভয়ে কাঁপতে থাকবে
তীক্ষ্ণ নখের আঘাতে ক্ষত বিক্ষত হবে যৌন ক্ষুধা।

বুঝবে সেদিন বুঝবে 
মেয়েরা ভোগ‍্য নয়,অধিকার আর নিরাপত্তা আদায়ে 
ওরা যুদ্ধ ও করতে জানে।
ত্রিশূল,বজ্র,গদা, খড়গ ওরাও তুলতে জানে
রাত দিন ওদের দখলে নিতে জানে।

Nov 2, 2024

মিলনকান্তি দত্ত

ঘোটালাভৈরোঁ 

শরীর আমাকে বারবার
আঘাত করে,আমিও
তাকে মন দিয়ে
প্রত্যাঘাত করি। কে
কার ঘা খেয়ে মরে! 
ঘুম চিৎ শুয়ে আছে
শরীর উপুড় ঢেলে দিই,
ডার্কসার্কেলের ওপরতলায় 
মিটমিট চোখের আলোয় 
ভেসে আসে ঘুমবাংলো,
শরীরে মৃত্যুর ব্যথা
মেঘে-মেঘে 
         ঘোটালাভৈরোঁ! 
যে যায় সে তার
সময়েই যায়,প্রিয়জন
চলে গেলে আমাদেরই 
অসময় মনে হয়,
সময় তো একটা 
ময়লাখলা নদী,
কখন যে সেটাও বেশ
        প্রিয় হয়ে ওঠে।

মাহমুদ কামাল

প্রিয় ট্রামলাইন

যে জীবন ফড়িংয়ের সে জীবনই আপনার
পরবর্তী দশকে দশকে
আক্রান্ত হয়েছিল নির্দ্বিধায় 
নবীন কিশোর থেকে তরুণ প্রবীণ 
আলোবিপরীত হয়ে অবলীলাক্রমে 
আপনার বৃত্তেই তাদের পঙক্তিনিচয়
তাদের কি আপনি ইশারায় ডেকেছিলেন?
ট্রামলাইন আপনাকে ডেকেছিল কাছে?
আপনি কেন জীবনের দুঃখ নিয়ে? 
হেঁটে হেঁটে অবশেষে প্রিয়ট্রামলাইন....
আপনি নেই কবিতারা আছে
ট্রামলাইন উঠে যেতে আর কিছুদিন

সেলিম মুস্তাফা

হাততালি দিও না

হাততালি দিও না
কানের ভেতর দিয়ে এগুলো আমার
মাথার ভেতরে চলে যায়—
মাথা ঝুঁকে পড়ে, পিঠ বেঁকে যায়,
কুঁজো হয়ে চলা বড় কষ্টকর

হাততালি দিও না

অপাংশু দেবনাথ

জলে তবু ভাসে

কখনো বাগানে ফুল ছিলনা বলেই,
প্রজাপতির অসংখ্য পাখা পড়ে আছে
                     সময়ের অতস-মাটিতে।
ফুল নেই একটাও তবু জল দিই 
ভাবনার ঊষ্ণ-মৃত্তিকায়।

জলের নিজস্ব গন্ধ নেই,
একথা জেনেছি আমি,তোমার প্রণয়ে।

কোন্ গন্ধ মেখে প্রজাপতি ফেলে যায় পাখা?
এখন পিঁপড়েরা সেসব পাখা নেয় টেনে।
                       কেনো যে কষ্ট হয় এমন!
রঙীন ডানায় মানুষের ভালোবাসার মৃতগন্ধে।

বিস্তৃত বাগানে প্রতি রাতে ঘুমোবার আগে,
ভাঙা পাখাগুলো সব জড়ো করে রাখি
                              জল ঢালি, শুধু জল।
এতটুকু জানি জলে তবু ভাসে রোজ
                              অসাম্প্রদায়িক ফুল।

সৌমিত বসু

ঘুম নেই অপেক্ষার চোখে 

পূর্ণতা চেয়েছি আমি। পূর্ণতা অপার।
কোন ফুল থেকে আজ কোন ফুলে যাবো।
অস্পষ্ট রাত্রির কাচ 
ঘসে ঘসে আলো করে তোলা।
কেউ কি ঘুমিয়ে আছে একরোখা মন্দির চাতালে 
ছাদের ওপর দিয়ে উড়ে যেতে যেতে নিশিডাক মায়াবী আলোয় এই ঘোর অবেলায় তোমার পাশেই দেখো ঘুমিয়ে রয়েছে কেউ 
তুমি তাকে আবিষ্কার বলো?
মা বলে যে আছে সে যাবে কেন?
জল ঢালো, জল ঢালো শিকড়ে, ফাটলে 
যেন কোনোদিন ব্যথা এসে জ্বালাতে না পারে কোনো অযাচিত সন্ধ্যার আলো ,
যেন অপরূপ এসে হাত ধরে পার করে মায়ার দুপুর।

অনেক দিনের পর মেয়েরা উড়ছে দ্যাখো সন্ধ্যার আকাশে ,
অনেক দিনের পর 
ছাদের ওপর ,কারা যেন জেগে বসে আছে।

গোবিন্দ ধর

ভোরবেলার গান

চারদিকে স্বপ্ন নিয়ে প্রহরীরা আবার দাঁড়িয়ে পড়বে।ইহাই ইতিহাস।

যদিও ইতিহাস তচনচের যাদু চলছে।যাদুবিশ্বাস নিয়ে এক প্রজন্ম বড় হচ্ছে। তাদের ভেতরে আলো ফেলা নিষিদ্ধ করে দেওয়ার হুলিয়া জারি হয়েছে অলিখিতভাবে। সেমিফাইনাল চলছে।

যদি জিতে যায় যাদুবিশ্বাস তবেই ফাইনাল। ইতিহাস এখান থেকেই হেঁটে যেতে শুনেছি হাঁসুলিবাঁক।

আমাদের বোতলবাতিজ্বলা গ্রামগুলো দাবানলে জ্বলে ওঠে শুধু আলো পৌঁছে দিতে আসেনি কেউ।

অসম্ভব রকম প্রক্রিয়ায় শিশুদের কিচিরমিচির মুছে যাবে এরকম গোলকধাঁধা রচনার পরেও ইতিহাস বারবার নতুন করে জেগে ওঠে নিশ্চিত। 

ভোরবেলার গান লেখবে বলে একদল বালক পুনরায় ইতিহাস রচনার অপেক্ষায় জেগে উঠবে নিশ্চিত। 

কুশল ভৌমিক

জন্মদাগ

ছেলেবেলায় একদিন 
ডান উরুর মাঝখানে একটা কালচে দাগ আবিস্কার করলাম 
মা জানালেন এ আমার জন্মদাগ।
সেই থেকে বহুদিন আমি একাকী বহন করেছি
জন্মদাগের রহস্য 
হঠাৎ জন্মদাগটি আমার কাছে ভীষণ অসহ্য 
আর বিরক্তিকর মনে হতে লাগলো 
প্রতিদিন স্নানের সময় সাবান দিয়ে সজোরে ঘষে 
আমি জন্মদাগটি উঠিয়ে ফেলতে চাইতাম 
মা খুব হাসতেন আর বলতেন--
"লাভ নেই খোকা, জন্মদাগ কোনোদিন ওঠে না"। 

মা নেই,বাবা নেই -অনেক গুলো বছর 
বাবার আঙুলের স্পর্শ 
মায়ের দেয়া চুমুর দাগ 
সদুল্যাপুর গ্রাম,ধলেশ্বরী নদী,শৈশবের রঙ ছড়ানো  ভিটেমাটি আর ঘূর্ণায়মান পৃথিবীর
শরীর জুড়ে লেগে থাকা অন্ধকারের মতো 
'তুমি' নামক একটি দুঃখ 
আজও লেপ্টে আছে আমার শরীরে। 

হে দুঃখ জাগানিয়া 
তুমিও কি জন্মদাগ?

কমল সরকার

খেলনা

হাত ধরে বাবা নিয়ে চলেছিলেন মেলায়।
রাস্তার এপারে আমাকে দাঁড় করিয়ে রেখে 
পছন্দমতো একটা খেলনা কিনে দিতে তিনি
চলে গেলেন অন্য পারে;

তারপর কত গাড়িঘোড়া পার হয়ে গেল সেই রাস্তা বরাবর,
কত শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা পেরিয়ে...
আমি একা একা কত খেলে গেলাম নিজেরই সঙ্গে,
নিজের মন, শরীর, নারী, বিবাহ, সংসার, সন্তান—

তবু
বাবার কিনতে যাওয়া সেই পছন্দসই খেলনাটা পাইনি বলে 
আমি আজও 
রাস্তাটুকু পেরোতে পারছি না

গোপেশ চক্রবর্তী

উল্লম্ফন

একটা কবিতার ছায়া ভাসছে 
রাতের নিঃসঙ্গ বিস্তীর্ণ জলাভূমির শব্দ বাজছে বুকে
অন্ধকার ঢেউয়ের ভেতর জ্বলজ্বল করে ওঠা আলোক বিন্দুর দিকে চেয়ে আছে মায়া চোখে পথিক
দুুরের খাঁ খাঁ রোদে গাছ কেঁটে শূন্য করে ফেলছে চরাচর 
সমস্ত চিৎকার ভেসে যাচ্ছে মহাশূন্যে 
রমণীয়-বাতাসে দাঁড়িয়ে হেলে পড়ছে নদীর দিকে এক নাবিক
প্রেমিকার বিশ্বাস রূপান্তরিত হয়ে যায় ছলে 

ভাষাবিদ বানান পদ্ধতির কথা বলে,পণ্ডিতেরা দেয় নীতির বিধান

বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে দেখছে কান্নার জল
কাঁটাতারেরও একটা নীরব চিৎকার বাজছে কানে
দুহাত শূন্যে তুলে ভেসে যাওয়া ছায়ার আশ্রয় চায় কবি
এই উল্লম্ফনের ভেতর কবিতার শরীর কেঁপে ওঠে 
কবির দীর্ঘশ্বাস ঝরে পড়া পাতার মতো উড়ে উড়ে যায়

রুদ্র মোস্তফা

আমি কোনোদিন প্রেমিক হতে পারিনি 

আমি এক হতে গিয়ে একের ভেতর হয়েছি অসংখ্য
অথচ আমি এককভাবে শুধু প্রেমিক হতে চেয়েছি।
প্রেমিক হলে নিশ্চয়  হত্যা করতে পারতাম না তনুকে
নিশ্চয় বিচার করতাম ত্বকী কিংবা সাগর-রুনি হত্যার
অমন দাউ দাউ আগুনে পুড়িয়ে মারতাম না নুসরাতকে
কিংবা আটকে দিতে পারতাম মুনিয়ার মৃত্যুও।

আমি প্রেমিক হতে গিয়ে হয়েছি ডাক্তার
আমার হাতেই বদলেছে মৃতের ময়নাতদন্ত— 
আমিই হয়েছি সাংবাদিক অথবা পুলিশ অফিসার
আমার হাতেই ঘটনা ঘুরেছে ভিন্নখাতে— 
হয়েছি ইঞ্জিনিয়ার,ভবন ধসিয়ে মেরেছি মানুষ
আমিই হয়েছি শিল্পপতি, হয়েছি খুব বড়ো আমলা 
আমি প্রেমিক হতে গিয়ে হয়েছি উকিল
জজ,ব্যারিস্টার অথবা আর যা যা হওয়া যায় 
তার সবই হয়েছি— শুধু প্রেমিকই হতে পারিনি।
কেননা, প্রেমিকেরা হয় অন্যরকম 
তাদের বুকের ভেতর থাকে প্রেম,থাকে নিজস্ব শ্রম 
হৃদয় খুঁড়ে তারা উত্তোলন করে মুঠোভরা মায়খনিজ 
প্রেমিকদের হতে হয় ভীষণ রকমের শ্রমিক।
আমি কোন দিন প্রেমিক হতে পারিনি  । 
মোহ দিয়েছে বাধা,ক্ষমতা আটকে দিয়েছে পথ—
অথচ আজীবন আমি শুধু প্রেমিক-ই হতে চেয়েছি!

সুমনা রায়

বাহাদুরি 

খুব বিখ্যাত এক জন্মদিন ভুলে গেলে 
বাবা একদিন কিছুটা রেগে বলেছিলো  
ভুলে যাওয়ার মধ্যে কোনো বাহাদুরি নেই 
তখন মাথা নিচু করে মেনে নিয়েছিলাম 
এক শীতসকালে পড়তে বসে বারান্দায় 
নরম রোদের সঙ্গে খেলছিলাম
মা রেগে বলেছিলো ফাঁকি দিচ্ছ দাও 
জেনে রেখো ফাঁকি দেওয়ার মধ্যে 
কোনো বাহাদুরি নেই 
আমি সেদিনও মেনে নিয়েছিলাম
তোমরা দুজনই যে যাঁর সময়মতো 
ছিঁড়ে দিলে সুতো, গুটিয়ে নিলে লাটাই  
তোমাদের স্নেহডোরে মাখামাখি জীবন 
ভুলে এই দ্যাখো দিব্যি আছি বেঁচে 
আকাশের চোখে চোখ রেখে বলি 
ভুলে যাওয়ার মধ্যেও বাহাদুরি আছে
যেমন আছে নিজেকে ফাঁকি দিয়ে বাঁচার মধ্যেও۔۔۔