Mar 31, 2023

অপাংশু দেবনাথ

এখন যেখানে বসবাস করি

এখানে মেঘ ডাকলে বিদ্যুৎ মুখ লুকায়,
এখানে আমার প্রণয়ের কোনো নদী নেই
এখানে দারপাল্লায় বিক্রি হয় আঁটি।

এখানে নেই জরুরী কোনো প্রণম্য-পাহাড়, 
এখানে রুটিনে চলে সময়ের নাগর
এখানে সান্ত্রীরা বিরহের গান গায় অহরহ।

এখানে সন্ধ্যার বুকে মেঘ গর্জায় কখনো,
এখানে জলে ভাসতে দেখি লোহার তরল,
এখানে কে যেন গায় অচিন দেশের গান।

এখানে ভরাচৈত্রের রাতে শীত শীত করে এ শরীর ,
এখানে গাড়ি পাওয়া দুস্কর দুপুর গড়ালে,
এখানে বিনাবাথরুমে চলে নারীর বিরহ-স্নান।

এতোসব নাই নিয়ে কাটে বেলা, কাটে রাত,
এখানে আলোকিত এ অসুখ জুড়ে তুমিই থাকো। 
শূন্য ঘরে অন্তরে বাহিরে, ওহে প্রণম্য প্রজ্ঞা আমার!
একটু একটু করে শুধু আমাকেই গড়ছো অহোরাত।

রোকেয়া ইসলাম

ভালোবাসা

একটা আকাশ নেমে এসেছে
টুকরো বৃষ্টিগুলো টানছে আমার শাড়ীর আঁচল ধরে
দিনের সকল শর্ত মেনেই একদিন পৃথিবীতে রোদ ঝরেছিল
তোমার শর্তগুলো ছিলনা সুকঠিন 
তবু আমি ঝরতে পারিনি,
পারিনি ঘণমেঘ হয়ে নামতে 
সুখেঠাঁই নিতে তোমার কোঠায়
অথবা স্নিগ্ধরোদ হয়ে বাসা বাধতে
আলোর গাঢ়কাজলে

একদিন তুমি ফুটেছিলে প্রেম হয়ে
আজ শুধু ভালোবাসা।

সৌমিত বসু

আলোয় -মায়ায়

সম্পর্ক সমুদ্রের ঢেউ নয়
একবার নেমে গেলে পরক্ষণেই
আবার উঠে আসার জন্য মরিয়া হয়ে উঠবে।

মরাবিকেলের আলোয় 
শূন্য হয়ে যেন ঘরে না ফেরা
যেন জল নামা বালির চড়ায়
নিচুমুখে কেউ খুঁজে চলেছে
হারিয়ে যাওয়া বোতামের রং

আলো আর জল নেমে গেল এইমাত্র
কোনোদিন বিশ্বাস কি ডেকে উঠবে জানালার পাশে?

তৈমুর খান

বর্ষা সংবাদ 

সহজ মুখগুলি হাওয়ায় ভেসে উঠল 
পরিজ্ঞাত নীলিমায় অবগাহন হোক 

ঈশ্বরের কাছাকাছি উপলব্ধির চোখ 
আত্মনিবেদনে চেয়ে থাকে   । যদিও 
বিরহমায়া অনালোকিত প্রয়োগে 
অন্ধকারে উড়ে যায় বিশেষণ 
তাকেই বিশেষ্য বলে জানে সব লোক 

মৃগরাজের পদচারণায় কারও পতাকা কেঁপে ওঠে 
দেখি অরণ্য সঞ্চার হয় গার্হস্থ্য জীবনে 

ঘন ঘোর বিহ্বল পৃথিবীতে সব প্রেমিকেরাই 
মেঘদূতের পোশাকের রং চিনে নেয় 
দিগন্তের এপারে ওপারে দ্বিপ্রহর 
মাটির ফাটলে জমে শোক 

অবশেষে কান্নার ভেতর বর্ষা আসে 
দুই কূল থই থই ভাসে আনন্দলোক   ।

সন্দীপ সাহু

তুমি, শুধু তুমি

তোমার শব্দ-রঙ আঁকবে ঝরণা!
নেয়ে নেয়ে আমি ছোঁব রামধনু,
ছোঁব আকাশ-মাটির প্রেমক্ষণ,
ছোঁব প্রজাপতির রাঙানো ডানা,
ছোঁব জোছনা মাখানো সূর্য-রঙ,
ছুঁতে ছুঁতে পৌঁছে যাবো তোমার কাছে।
অপেক্ষায় রয়েছো তুমি, শুধু তুমি।
তোমার সমস্ত রঙটুকু অগস্তমুনির
মতো নিঃশেষে পান করে,

কৃষ্ণ হয়ে উঠবো, অনন্ত প্রেমিক।

কুশল ভৌমিক

তিস্তা যেদিন ভাগ হয়ে যায়

তিস্তা যেদিন ভাগ হয়ে যায়
বাতাসের বিপরীতে দোল খায় টাঙ্গাইল ও হুগলী 
সীমান্তের মতো সম্পর্কগুলোও আটকে থাকে
বর্ডারলাইন বরাবর -কাঁটাতারে। 

গঙ্গার জল একই নিয়মে গড়িয়ে পড়ে পদ্মায়
একই বাতাসে দুলতে থাকে
যশোর রোডের শতবর্ষী বৃক্ষ 
রবীন্দ্র-নজরুল একই দ্যোতনায় দূর করে দেয়
যাবতীয় সেমিকোলন, হাইফেন 
কেবল ভিসা অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে 
দিদাইয়ের চোখের জল 
রাষ্ট্রের ভেতর তৈরি করে নো-ম্যানস ল্যান্ড! 
ভদ্রেশ্বর সি,সি,চ্যাটার্জি রোডে ছড়িয়ে পড়া
বড়ো মামার দীর্ঘশ্বাস 
গঙ্গা পদ্মা যমুনা পেড়িয়ে আছড়ে পড়ে 
সদুল্যাপুর স্কুল মাঠে
আঁজলা ভরে সেই দীর্ঘশ্বাস মা তুলে দেয় 
দিদাইয়ের আঁচলে। 

সেই থেকে দিদাই জানে
তাঁর হৃৎপিন্ড বরাবর কেউ চালিয়েছে করাত 
এপার-ওপার 
মাঝখানে তিস্তার জল 
টকটকে লাল...

রুদ্র মোস্তফা

মুখোমুখি শুন্যতায়

মুখোমুখি শূন্যতায় রোদের হরতাল 
ছায়ার স্লোগানে ভিড়ে গেছে আমাদের নাগরিক মন।
তবু চোখ কাঁপে তোমার বারান্দার টানে 
বাসন্তী,ভেঙে ফেলো ভেজা খোঁপা 
ঠোঁটে মাখো জমানো বসন্তের লাল 
মনের ভূমি তলিয়ে যাক দৃষ্টির অনুপ্রাসে 
চোখে চোখে শুরু হোক ভূমিকম্প 
প্রতীক্ষার উপত্যকায় উড়িয়ে দাও হাসির পতাকা 
ঝুলবারান্দার আঙটায় ঝুলিয়ে দাও
অনেক কথার বিকেল  
আমি কংক্রিটের অনশন ভেঙে খুলে নেবো  
শরীরভাঙা রাতের সরস গল্প। 

শান্তনু ভট্টাচার্য

মার্চপাস্ট 

নিঃসঙ্গতাগুলো চোখের সামনে 
মার্চপাস্ট করে যাচ্ছেএগিয়ে যাচ্ছে - 
হলুদ অরণ্যের পাতায় পাতায় লেগে আছে আগুনের ক্রোধ 

হাতে বেহালা  
মন চাইছে বেজে উঠুক- ম‍্যাডি ওয়াটার ব্লুজ
কিন্তু ছড় সরছেনা কিছুতেই

এক একটা ক্ষণকালে
নদী... মেঘ...চায়ের দোকান 
লেখার কাগজ -ছেড়ে গেল আমায়,
রেখে গেল নির্বাসন

সেটাই চেটেপুটে গিলতে গিলতে
গোধূলি বেলায় বসি নিজের মুখোমুখি 

 খুব  ইচ্ছে -

একদিন দরজায় সমুদ্র এসে 
হাত ধরে নিয়ে যাবে দখিনা দিগন্তে
যেখানে শুধু পূবালী বাতাসের মার্চপাস্ট
...আর নির্বাসিত আমি

পৃথ্বীরাজ দেবনাথ

১. অধমর্ণ

জন্মের ঋণ পরিশোধ করব বলে পথে এসে দাঁড়াই,
এই পথে ছায়া নেই,
উত্তপ্ত নগ্ন রৌদ্রের বসেছে বাসর এই নির্জলা কান্তারে, 
এমনকি নিদ্রার কাছেও স্বপ্ন আর অবশিষ্ট নেই।

২. প্রত্যাশা

হঠাৎ কোন এক আর্দ্র সন্ধ্যায়,
কবোষ্ণ আলিঙ্গনে যিনি আমায় আবদ্ধ করবেন,
তিনিই জরা,নামান্তরে নিষাদ।
নিষাদের কোনদিন প্রতিষ্ঠা হয়নি,
তবুও যুগযুগান্তে নিষাদ রাত্রি জাগে,
শাশ্বত নক্ষত্রলোক চোখে নিয়ে।

৩. মৈত্রেয়

তৃষ্ণার্ত হয়ে বসে আছি,
রসের খোঁজ নেই।
রসাতল বেয়ে 
ডুবে যাও ভোগবতী ধারায়,
আমার সমাধি ফল্গুতে,
আমার অনন্ত উত্থান নৈরঞ্জনায়।
আমি তৃষ্ণার্ত হয়ে বসে আছি,
বোধিসত্ত্ব অভিলাষে।

৪. অনুসন্ধান

গতিময় মানুষ কি নিজেকে খুঁজেছে
ছায়ায়, স্বপ্নে বা রমণে?
ভাবনার পরৎ সব খুলে ফেলে
মানুষ কি নিজেকে খুঁজেছে
নির্জন নগ্নতায়?
আমি জানি যে বাস্তবতার
বহির্ভাগেই রয়েছে দীপালিকার আলো,
কারুকার্য, মৈথুন ভাস্কর্য
  আর গর্ভগৃহে
যিনি শূন্য, তিনিই ধারণ করে রেখেছেন
শূন্যময়তার কৃষ্ণগর্ভ মেঘ।
ক্রমশ তিনিই ঝরে পড়বেন দুর্বার গতিতে
আত্মবিগ্রহের বেদীতে, ধ্যানে, ধ্যানবিন্দুর মগ্ন চূড়ায়।

অদিতি তুলি

ভ্রুম

অক্ষিপটে কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয়
ইট পাথরের চার দেয়ালের এই ঘরটাকে একটা প্রাগৈতিহাসিক নড়বড়ে দোতালা বাড়ি মনে হয়
আঁচিলে উত্তরের হাওয়ায় দোলে গৃহকর্ত্রীর জলরঙা শাড়ি 
প্রশস্ত রোয়াক বাড়ী
পরিচ্ছন্ন একটা রন্ধনশালা 
শিমুল তলায় রান্নাবাটি পুতুল খেলার ঘর
তুলসীতলায় মাটির প্রদীপ 
শানবাঁধানো সবুজ জলের ঘাট
হিজলতলায় কানাঁকুয়োর অদলবদল ডাক
ধবধবে সাদা সিথাঁন
মায়া মায়া এক চিরচেনা মুখের অবয়ব
যেতে যেতে হাওয়ায় মিলায় 
চোখের তারায় অব্যক্ত দৃশ্যপট
তৃষ্ণার্ত ঠোঁটের অস্ফুট মায়াডাক 
কপালের ভাজে প্রখর রোদের তাপ
উষ্ণতা কেবলই ছুঁতে চায় সেই শ্যামল শীতল হাত

তীব্র জ্বরের মরশুমে
পুড়ে যায় শরীর 
পুড়ে যায় অভুক্ত হৃদয় 
পুড়ে যায় সমস্ত দিনলিপি 

অক্ষিপটে কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয়
কেটে গেলে ভ্রুম
ইট পাথরের একটা চার দেয়াল জেগে রয়!! 

(তেসরা মার্চ তেইশ)

নমিতা সরকার

জীবন জলের নদী 

যে নদীর তীরে আত্মার ভীড় জমাতে অধীর আগ্রহে, পাড়ের সুডৌল মাটিগুলো দু'হাতে আবেশে আবেগে জড়িয়ে নিতে জীবন জলের পিপাসায়...

সে নদী তোমার আজ বড় অচেনা, চেনা সেই দুই পাড়ের শিহরিত কাশফুলের দোলা যেনো বিষকাটালির গাছে ছড়িয়ে আছে তোমার চোখের বালিতে...

কেনো যে আর নদীর বুকে ভীড় জমাও না, জল তরঙ্গে মেতে ওঠো না, নেচে ওঠো না, হেসেও ওঠো না জোৎস্নার আলোয়।

অথচ নদীর কূলে মাথা রেখে কত রাত কত প্রহর কেটে ভোর হতো জল তরঙ্গের খেলায়...

নদী তোমার আত্মার গন্ধ নিয়ে অপেক্ষা করে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, নদীর বুকে কবে আবার ভীড় জমাবে ভীষণ আবেশে, ভালোবেসে নদীর জলে ভেজাবে আবার কবে তোমার প্রেমের হাত।

কাজি নিনারা বেগম

বিষন্নতা 

বিষন্নতায় কাটিয়ে উঠতে গিয়ে আবারও থমকে গেলাম। ভেবে ছিলাম একটু স্বস্তির  নিঃশ্বাস   নেব।  না যূগের আবর্তিত সব হারানো সুর। স্বপ্নিল আশায় বন্ধ দূচোখ উলঙ্গ পৃথিবীতে আমি পাগল না বৈরাগী না সন্ন্যাসী। ভাবনার খুঁজি তাকে ঐ ধরাধামে মহাকাল কোথায়। আকাশে আজ শৈল্পিক রঙের সমাহিত সাদা নীলে কূজ্জটিকা। আধ ফালি চাঁদ পাশাপাশি শুক্র গ্রহের মিলন। কবির হাজারো কবিতারা ছন্দে ছন্দে প্রচলিত মুল কাব্যের যবনিকাপাত।

অভিজিৎ পাল

তুই যে পুরুষ

তুই যে পুরুষ -
  বুকের ব্যাথা বুকেই রাখিস
  মুখ ফুটে তুই বলিস নে , 
  হৃদয় ভেঙে চূর্ণ হলেও
  উফ্টুকো তুই করিস নে । 

তুই যে পুরুষ -
  সবার দায় মাথায় তুলে
  পেছন ফেরে তুই তাকাস নে , 
  সবার মনের খেয়াল রাখিস
  নিজের দিকে তুই দেখিস নে। 

তুই যে পুরুষ -
  সংসারের ফেনিল উচ্ছ্বাস দেখে
  নেশায় বুদ তুই থাকিস নে , 
  মরু নেশায় ছুটতে ছুটতে
  নোনা জলের খেয়াল তুই রাখিস নে । 

তুই যে পুরুষ -
  ঝিনুক থেকে মুক্তো বিলিয়ে
  আফ্সোসটুকু তুই করিস নে, 
  ভেঙে ভেঙে তুই গড়ে যা
  মুখ খুলে কাউকে যেন বলিস নে ।

ঝিমলি আচার্য

 নদী মুক্তির সন্ধানে 

 ক্লান্ত নিরীহ নির্বাক আমি
খুঁজি  মুক্তির নিশানা ।
তোমার চরণ আমার বুকে
তাইতো একটু সাহস জাগে  
তুমি যদি নদী হতে --
আমি যেতাম ঘুমের দেশে ।
ক্ষুদ্র মাঝি ক্ষমা প্রার্থী 
এত- মহৎ গুণ আমার আছে নাকি ?
নিরলস ভালবাসায় গুছিয়ে নিয়েছ 
বৃহৎ সংসার ।
স্নেহের আলিঙ্গনে ডুবিয়ে রেখেছ 
কত প্রাণ কত উদ্ভিদ ।
আকাশ বাতাস ভূমিপৃষ্ঠে--
জীব জগৎ তোমার মায়ায় 
             "জীবিত"।
অনাহারের মুখে আহার তুলেছ 
পলি জমি সাজিয়ে ।
প্রতিবাদ করেছো স্বগৌরবে 
নিরব ভূমিকা নিয়ে ।
 কখনো অপরাধীর 
চিহ্ন রেখেছো যত্ন করে 
তোমার তীরের ধারে ।
অভিমানে রাগে ফুলে ফেঁপে  
উঠে, কত প্রাণ কত ঘর বাড়ি 
নিংড়ে নিয়েছ তোমার গর্ভে ।
তোমার প্রতিবাদের ভাষা 
বোঝতে আমরা অপারগ ।
মা -- হওয়া বড়ই কঠিন 
যে " মা " সেই পারে ।
নির্বোধ আমরা করছি প্রবঞ্জনা
 "প্রশ্রয় আজ হারিকাষ্ঠে  "
নিঃস্বার্থ ভালোবাসার স্পর্শ--
মা তো আছেই পাশে ।
ভরসার হাত মাথায় নিয়ে 
চঞ্চল পৃথিবী অবিরাম চলে ।
সহিষ্ণুতার গ্লানি ভেঙ্গে
মায়ের আঁচল ছিন্ন করে--
যেও নাকো তুমি ঘুমের দেশে ,
আমি থাকি তোমার সন্তান হয়ে  ।

শুভ্ৰা সাহা

বসন্ত স্বপ্ন

এই বসন্তে একটি রঙিন স্বপ্ন-
বার বার উঁকি দেয়- আড়াল থেকে,
গহন আড়াল-- কোনদিন যা --
চাপাও পড়েছিল না,,
ভাবনায়ও আসেনি সে মোহ ।

 নতুন উৎপত্তিস্থলটা এখন
 অনেক অতি আধুনিক,
 আধুনিকতা সৌখিনতাকেও
 যেন ছাড়িয়ে, তাড়িয়ে,, দুমড়ে মুচড়ে ,
 একাকার করে তোলে।

 ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও অঙ্কুরোদগম. হয়।
 কিন্তু তার মধ্যে জল ঢাললে-
 সর্বনাশ !  ফিকে হয়ে যাবে সব ৱঙ,
 হয়তো জৌলুস বিহীন হয়ে -
 তাৱ গর্ভপাত ঘটবে।

 এ যেন আবিৱ রঙের ফানুস,
 রাঙিয়ে দিলে চেহারাটা কেমন-
 অন্যরকম --সৌখিন ,
 জল ঢাললে -মেকঅ্যাপ- ধুয়ে মুছে সাফ।         
আবার সস্থানে বিরাজ ।

 তবুও বসন্ত রঙিন তো করে মন,
হোক না মরীচিকা --
যাক না ধুয়ে আবিৱ প্ৰলেপ,
তবুও দুইয়েৱ মাঝখানটা
এঁকে দেয় -রঙিন স্বপ্নের ঠিকানা।

অলকা গোস্বামী

ঘুম

যত্নে আহ্লাদে কাছে ডাকি,
চোখ ভরে.... কই আসে না
সে তো।
অনেক সাধতে হয় 
চোখ দুটি 
বুজে পড়ে থাকা রাতভর ।
কত কত ইচ্ছের সমাহারে
স্বপ্ন গড়ে
নিয়ে যায় হাত ধরে
গলি ঘুঁজি , নদী পারে।
কখনও আমার ছোট্ট হাত ধরে
 শৈশব 
পৌছে দেয় বাড়ীর দোর গোড়ায় ।
ভোরের আলোয় কুয়াশার মত
মিলিয়ে যায় আদর ঝরা রাত।

কোনো কোনো রাত 
ভীষন অন্ধকার
কারচুপি, লড়াই,
জন জঙ্গল, ভীড়....।

 কৌরব ভিড়ে হারিয়ে
 নিজেকে চিনতে পারি না।
ঘুম ভেঙে ত্রস্ত আমি,
প্রখর রোদে পলাশ রং মেখে, 
 খুঁজে ফিরি পাণ্ডব নীড়।

সঞ্জয় দত্ত

১.বিবাহ

কেউর বিয়ে হলে আমার খুব মায়া হয়,
তাকে ইচ্ছে করে ঠেলে দেওয়া হয় আগুনের মুখোমুখি।

২. বন্ধন

জীবনের সাথে অংক করে দেখি,
সমাধানের হাত বাড়িয়েছেন মা আর ফলাফল এসেছে বাবা।

লিটন শব্দকর

বাঁশি 

মায়ের জন্য মন কেমন করা রোদ, 
সারাদিন ধরে ছায়াতে বেজে যায় একটি বাঁশি
              কিশোরের মুখের আয়নাআলোয়
              আগামীর ছবি 
যতটুকু দারিদ্রতা 
        গৃহস্থবাড়ির দাওয়ায় ভিজেছিল এককালে 
        সেই ভিজে বিদঘুটে গন্ধ 
        অ্যালার্মের সাথে সাথে অভিনব রূপ নেয়
প্রতিদিন নতুন করে ভুলে যাই শৈশব, কৈশোর
বাঁশি আর যাপন

রমা চন্দ্র

সংলাপ

এখন রাত্রি এগারোটা-
শুয়ে পড়েছে কোলাহল,
জনপথ জনবিরল
মালবাহী যান চলছে অবিরল...
মায়াবী এক স্বপ্ন হরিণের 
নিঃশব্দ আনাগোনা-
নিশাচর শিকারীর ধূর্ত পদচারণা...
নিয়ন আলোর নিচে-
পাহাড়াদার সারমেয়র ঘুম,
দূরের ক্যাফেতে- 
চীনি লাইটের আলোয় উৎসবের ধূম
আধপাগলা এক পথিক নির্ঘুম-
একাকী পথচলা...
বাতাসের সাথে কথা বলা
সুর হয়ে ফেরে দখিনা বাতাসে
কোন এক খোলা বাতায়নের আশে
যেথা কস্তুরির সুগন্ধ ভাসে...!
বন্ধ অলিন্দ পথিকের মনে এনে দেয়-
শ্মশানের চন্দনের গন্ধ
কবরের গোলাপের বিলাপ...
কফিনের উপর ঝরে পড়া 
বসন্ত ফুলের কিছু সংলাপ...
এমন ভাবেই পথিক আর ঘড়ির কাঁটা-
ভাঙে গহীন রাতের নিকষ আঁধারটা...!

অভিজিৎ দত্ত

নারী 

আমি নারী 
সব পারি 
তবে মানুষরূপী পশুদের কাছে 
কেন আমরা হারি? 

দেখোনি মা দুর্গার দানবদলনীরূপ 
পড়োনি দশভুজা হয়ে উঠার কাহিনী 
তবে কেন নিজেকে ভাবো অসহায়  ? 
চাই শুধু আত্মবিশ্বাসী ও নির্ভীক হওয়া
দেখবে কখন যেন বদলে গেছে পৃথিবী টা।

নারী তোমাকে শ্রদ্ধা করি 
তোমার থেকেই সৃষ্টি সকলেরি 
তোমাকে যারা করে হেয়,অমর্যদা
বৃথা তাদের জন্ম নেওয়া ।
যেখানে তুমি পেয়েছো সম্মান আর শ্রদ্ধা
সেই সমাজের হয়েছে অগ্রগতি 
পেয়েছে সকলের ই প্রশংসা।

তবে আর দেরী কেন নারী?
এখনই উঠে দাঁড়াও 
সব বাধা ,বিপদকে হারিয়ে 
পৃথিবী কে বদলাও ।

বিধর্না মজুমদার

 একবিঘা জমি

তোমার জমির মালিক হতে চাই 
একবিঘা জমির!
একবিঘা জমি আমার স্বপ্ন, 
আমার ভালোবাসার প্রতীক।।

কল্যাণী ভট্টাচার্য্য

আমি সেই মেয়ে

আমি সেই মেয়ে
যে রাত জেগে বসে থাকে
শুধু স্বপ্ন দেখে আর
কবিতা লেখার বায়না ধরে। 

আমি সেই মেয়ে
যার মনের মাঝে লুকিয়ে থাকা প্রতিবাদ
উগরে দিতে চায় কবিতার মাঝে
কিন্তু আর পারে না। 

আমি সেই মেয়ে
যে কবিতার মাঝে ভাবান্তর কে
প্রকাশ করতে চায়
কিন্তু হয়ে উঠে না। 

হ্যাঁ
আমি সেই মেয়ে
যে নাকি কবিতা লেখার জন্য
বার বার হোঁচট খায়
আবার উঠে দাঁড়ায়। 

তবুও
কবিতা লেখার চেষ্টা করে
আবার পড়বার ও সাহস পায়। 

কবিতা আমার প্রাণের প্রাণ
কবিতা আমার বিশ্বাস। 
কবিতা আমার হৃদয় ভরা
আমার আনন্দ দান। 
কবিতার মাঝে পেয়ে থাকি আমি আমারই স্থান।

শুভ্রা সাহা

বিজয় লক্ষ্মী নারী

নিতাই আজ প্রায় দেড় মাস পর হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরছে ।করোণা নেগেটিভ আসার পরও ওকে , আরো অনেক দিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল । কারণ ওর লাঞ্চে ইনফেকশন ধরা পড়েছে ।এখন অনেকটাই সুস্থ। তবে সতর্ক থাকতে হবে। বিশ্রাম নিতে হবে। কিন্তু এই অভাবের সংসারে কিভাবে বিশ্রাম নেবে নিতাই?    নিতাই ভাবে --হয়তো আমাকে বাঁচাতে দেনার দায় এক গলা হয়ে আছে।   তবুও রক্ষা আমার একার হয়েছে। ঘরের আর কারও হয়নি । নতুবা  সব বরবাদ হয়ে যেত।  ভাগ্যিস সেদিন বাজারে করোনা টেস্ট করিয়ে ছিলাম। কিন্তু আমার তো কোন উপসর্গ ছিল না। সামান্য একটু গলা ব্যথা ছিল। তাতেই বিকেলে খবর এলো আমি পজেটিভ।  হাসপাতাল থেকে তো ঔষধ , পত্র লিখে ছেড়ে দিয়েছিল.। বলেছিল কিছু লাগবেনা, বাড়িতে গিয়ে ওষুধ গুলো খাবেন , আর আলাদা ঘরে থাকবেন। কারো সঙ্গে মিশবেন না । সব আলাদা ব্যাবস্থা রাখবেন। কিন্তু আমার ঘরে বৃদ্ধ মা-বাবা বউ  চার বছরের বাচ্চা । তাই ডাক্তারদের কাছে অনেক কাকুতি-মিনতি করে হাসপাতালে রয়ে গেলাম। কারণ আমার এই ছোট্ট বাড়িতে আলাদা থাকার কোন ব্যবস্থা নেই। 

হাসপাতালে থেকেই   ঘরের  লোকজনের দুর্দশার কথা চিন্তা করে  সারাক্ষণ ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে  নিতাই। টাকা পয়সাও  ছিল না তেমন কিছু। সঙ্গে কয়েকশো টাকা ছিল, সেটা রমনী বাবুর হাতে বাড়িতে পাঠিয়েছে। এতে আর কদিন  গেছে   ?  যদিও হাসপাতাল থেকে শুনেছে দীপ্তি  ওর ছোট্ট, স্টেশনারি দোকানটা  খুলে বসেছে।  নিতাই এর ধারণা এতদিনে হয়তো বোকা দীপ্তি দোকানটার বারোটা বাজিয়ে  লাটে তুলে দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত, সংসার চালাতে নিজেকে হয়তো দিনমজুরের কাজ করতে হবে। 

কতই না সাত পাঁচ ভেবে চলছে নিতাই। এতদিনে হয়তো দীপ্তি নিজের গলার চেইন, কানের দুল, সব গয়নাই বিক্রি করে দিয়েছ। মনে মনে এসব কথা ভাবতে গিয়ে ওর পাশে অটোতে বসা দীপ্তির গলার দিকে তাকায় ।দীপ্ত ওকে আনতে গিয়েছিল হাসপাতাল থেকে । নিতাইদেখে, না - চেনটা তো গলায়ই আছে! কেমন চকচক করছে! কানের দুল আছে ,হাতের বালা টাও তো রয়েছে!  দীপ্তি কে দেখলে তো মনে হয়না ও অভাবে আছে ! কত টাকা দেনা করেছ কে জানে  ! 

দীপ্তিও যেন অনেকদিন পর আজএকটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। এতদিনে মানুষটাকে ঘরে ফেরাতে পেরেছে । কিনা গেছে ওদের উপর দিয়ে এই দেড় মাস । সেদিন সন্ধ্যায় হঠাৎই নিতাই এর পাশের দোকানের রমণী বাবু  এসে খবর দেয়, নিতাই এর করোণা হয়েছে। হাসপাতালে  ভর্তি  হয়েছে। এগুলো আমাকে দিয়েছে বাড়িতে পৌঁছে দেবার জন্য। এই বলে, কয়েক শ' টাকা দোকানের চাবি আর ওর বাইসাইকেল টা বাড়িতে দিয়ে যায়। তারপর   থেকেই তো শুরু দীপ্তির সংগ্রাম । কিভাবে সংসার চালাবে। বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়ি ,ছোট্ট একটা বাচ্চা । দোকান বন্ধ ,রোজগার নেই । খাবারের ব্যবস্থা নেই । অন্যদিকে স্বামী হাসপাতালে। কি করবে দীপ্তি ?. তাছাড়া দীপ্তি সাদামাটা আটপৌরে মেয়ে । লেখাপড়া ক্লাস এইট পর্যন্ত ।, তেমন কোনো চালাকচতুরও নয়। তবুও পাড়ার ক্লাব থেকে কিছু সাহায্য করেছে। কিন্তু সেটাতো সাময়িক। হাসপাতালের খরচ আছে । সবকিছু হাসপাতাল থেকে পাওয়া যাচ্ছে না । দীপ্তি যেন অথৈ জলে পড়ে । 

    ওদের পাশের বাড়িতেই থাকে মহিলা মোর্চার সদস্যা রীতা। ওর স্বামী হাসপাতালে আছে জানতে পেরে  , খবর নিতে বাড়িতে এসেই  দীপ্তি র করুন কাহিনী শুনে ওকে সাহস দেয় , ওকে সহায়তা করার  আশ্বাসও দেয়। 

রীতার পরামর্শমতো একদিন অভাবী দীপ্তি নিজের  স্বামীর ছোট্ট স্টেশনারি দোকানটি খুলে বসে। দোকানে  জিনিসপত্র  বিশেষ কিছুনেই । দোকানে  বসেই দীপ্তি বুঝতে পারেে, কেন ওদের এতদিন এত অভাব অনটনে দিন কাটাতেে হয়েছে। নিজেই   ধীরে ধীরে মালপত্র দেখে দেখে  দাম দেখে নেয় ও বিক্রি করতে শুরু করে দেয়।  রীতা   ও মহিলা মোর্চার কয়েকজনে মিলে ওকে কিছু টাকা ধার দেয়  ,দোকানের  মাল পত্র কেনার জন্য।  ধীরে ধীরে দীপ্তি জড়তা কাটিয়ে  নিজের মধ্যে  শক্তি সঞ্চয় করে তোলে। দীপ্তির দোকান ফুলে-ফেঁপে উঠে । মালপত্রে দোকান. ঠাঁসা ঠাঁসি । সকাল ৮ টা থেকে বেলা দুটো পর্যন্ত বাজার খোলা। দীপ্তির এখন আর দোকান থেকে  মুখ তোলার উপায় নেই । পাড়ার মহিলারা বেশিরভাগই দীপ্তির দোকানের কাস্টমার । সঙ্গে অন্যান্যরা তো আছেই। এই দেড় মাসেই দীপ্তি একজন সফল ব্যবসায়ী হয়ে ওঠে। নিতাইয়ের ছোট্ট দোকানটি আজ জিনিস পত্রে ঠাঁসা হয়ে বাজারের মধ্যে সেরা স্টেশনারি দোকান হয়ে উঠে । 

  হঠাৎই ভাবনার ছেদ পড়ে । অটো এসে বাড়ির দরজায় দাঁড়ায়। ঘর থেকে অটোর আওয়াজ শুনে বৃদ্ধ মা-বাবা আর ওর ছেলে বাইরে বের হয়ে আসে । নিতাই এতদিন পরে বাড়িতে ঢুকে  দেখে বাড়িঘর বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন  । 

তাছাড়া ঘরে কিছু নতুন আসবারপত্র ও এসেছে। নিতাই দীপ্তিকে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই নিতাইয়ের মা বলে ---এ সব বৌমার জন্য হয়েছে । বৌমা আমাদের ঘরের লক্ষী । আর ও তোর দোকান কে খুব ভালোভাবে চালিয়েছে। এমন সময়  রীতা ও মোর্চার দিদিরা এসে উপস্থিত হয়।  রীতা নিতাইকে বলে  ---আপনাকে দেখতে এলাম। আর জানাতে এলাম  ,দীপ্তি আজ বিজয় লক্ষ্মী নারী । ওকে আমরা  ৮ই মার্চ মহিলা মঞ্চে সম্বর্ধনা দেবো।

দীপু দেবনাথ

স্বার্থপর কবি  

আমি একজন স্বার্থপর কবি,                              
কবিতার লেখা ছাড়া কিছুই বুঝতে চায় না        
কিন্তু, আমার লেখার মূলে রয়েছে                               
যারা আমায় স্বার্থপর বলেছে                                 
আমি সেই ডানা কাটা পাখি                                  
অন্যের ডানা ধার করে
উড়তে চাই আপন সুখে
আমি একজন স্বার্থপর কবি                      
শূন্যতাকে ভরাটের স্বার্থে
পারি দিয়েছি জন সমুদ্রে 
নীতিগত ভাবে আমরা কেউ সত নয়,                        
রয়েছে তাই স্বার্থের ছটা
আমারও কবিতায়
প্রদীপের ন্যায় দগ্ধমান কবি কথা,
পরন্তু বিকেল ফুরোলেই  জাগে কবি চেতনা                 
মনের ভাষা কবিতায় ফুটে,
লোকের মুখে সবেই যেন স্বার্থের ছটা

জয়িতা ভট্টাচার্য

পিঞ্জর

যদি ছায়া হতে পারতাম 
যদি ওই দুটি গালে চুমু 
কপালে একবার।
এক্ষুনি পাল্টে যেত সব

তারপর।সেইসব রাত নেমে এলে
দেখি আমি অন্ধকার।
চুপচাপ কিশলয় পড়ে সেই মেয়ে।
বাঁশবন চুপিচুপি বলে দেয় সব
কালো কালো পথ গড়িয়ে যায় গর্তে
টর্চের আলো।হ্যারিকেন দপ দপ করে।
আকাশ আর মাটির মাঝে সেইসব
শূন্যে ঘোরতর স্মৃতি যায় আসে।সেও আসে।
চাঁদ মাখা সে প্রবেশ করে ভোরের ভেতর।
আলো নেই।এখানে আর আলো জ্বলে না।
ক্ষমতা আর পরাক্রমের 
শুনশান ইতিহাস লেখে।আকাশ আর মাটির মাঝে। 
তোমাকে ভেবে চোখের জল
ভেসে গেল 
 রূপকথার মতো,বিষণ্ণ সন্ধ্যা এলে ভাবি
তোমাহীন কোনো 
 মুক্ত জীবনের কথা।

বৃন্দাবনী সারং

জয়িতা ভট্টাচার্য 

ছড়িয়ে দিচ্ছ বেলি ফুল, মানভঞ্জন  পালার শেষে হরির লুঠ।
প্রেমের রস গড়িয়ে যাচ্ছে ওয়াটস্যাপ  থেকে ভিডিও কলে।ব্লক।
কলির কেষ্ট অনেক।
মেলে দিচ্ছ মনোহারি পণ্য,  একটা চুমুর সঙ্গে আরেকটি বিনামূল্যে।
দূর থেকে দেখে নিচ্ছি জল উঁচু জল নিচু।ভয়ঙ্কর ঈর্ষাক্রান্ত তোমার ঠোঁটের প্রান্তে লেগে  রক্তের মতো বিস্ময়।
পোড়ে বনস্পতি...
পুড়ে ছাই হয়ে যায়!

সারা আকাশ ঘুরে
কুলায় ফেরত ক্লান্ত পাখি দেখে পার্ক স্ট্রিট শান্ত এখন।

মায়া রানী মজুমদার

স্বর্ণলতা

হেলে দুলে চলি, আমি স্বর্ণলতা, 
মম দেহে নেই স্থান কোন পাতা।
স্বর্ণের মত রঙ, যেন আমি রাণী, 
শোসকের মতো আমি রস টানি। 
বর্ধিত হই আমি  পর'গাছা হয়ে, 
কেঁপে উঠি ঐ ঝঞ্ঝাবায়ুর ভয়ে।
ধীরেই বেড়ে উঠি, বৃক্ষ রস চুষে, 
বৃক্ষ কিন্তু  মোরে  নাহি প্রত্যাশে।
অত্যাচারে করি  জর্জরিত তারে, 
নীরবে সয় কষ্ট বলিতে না পারে।
ডালা থেকে ডালায়  করি বিস্তার, 
বৃক্ষ ভাবে  মনে আর নাই নিস্তার।।
থাকি আমি দিব্যি, রস চুষে নিয়ে।
বৃক্ষ চুষে মাটি থেকে শিকড় দিয়ে।
ঝড়ের বেগে হেলে দুলে থাকি ভয়ে, 
ঝড় বিনা করি না ভয়,থাকি নির্ভয়ে।
কাঁপে বুক ঝড়ের'ই তান্ডব লীলায়, 
সদা মনে ভয়, যদি খসে পড়ে যায় ? 
পরগাছাদের দেহে নেই তেমন জোর, 
অপরের রস চুষে রাত্রি থেকে ভোর।

লালমিয়া মোল্লা

এসো জ্যোতির্ময় 

এসো, 
গাঢ় হিম অন্ধকার শেষে 
এসো আমার আলো--
হেমন্তের শিশিরে ভিজে 
বুলবুলির ঠোঁটে, 
আম-মুকুলের গন্ধ গায়ে মেখে 
সজনেফুল-শুভ্র আমার আলো--

এসো আমার জলচৌকির ঘরে। 

এ ঘর আমার বাপ-পিতামোর ঘর
গোবর এনে ঠাম্মা দিত লেপে, 
মায়ার ছোঁয়ার স্পর্শ অতঃপর--

চৌকি জুড়ে হিম-সন্ধ্যার বাস
শিরদাঁড়াতে অবাধ্য এক স্রোত, 
একটি কেবল সঙ্গী আমার আছে
গল্প শোনায় মধ্যরাতের পেঁচা। 

ছয় বেহারার পালকি চড়ে এসো
বন্ধু আমার দীপ্ত জ্যোতির্ময়--
ঘাস-শিশিরে ধুইয়ে দেব পা, 
আঁধার ঘরে চাঁদের অভ্যুদয়।

এসো, 
আমার সূর্য-সোনা বন্ধু এসো
এসো আমার হীরকদ্যুতি আলো। 

তুমি আসবে বলে 
ঝড় উঠেছে মাতাল বেহালায়
আর সেতারে আগুন ঝলমলালো।

গোপী নাথ ঘোষ

গঙ্গাস্নানের বদ্বীপ

পৃথিবীর মানচিত্র বদলে দেবো আমি
কোন যুদ্ধের দামামায় নয়
নয় কোন ধ্বংসের হোলিখেলায়।
মানচিত্র বদলে যাবে ভালোবাসার বসন্তে 
ঘৃনার বদলে ছেয়ে যাবে মাঠ গোলাপের সুগন্ধে।
শুধু থাকবে মানবতার গান
শিশুর কলকাকলিতে মুখরিত প্রাণ।
স্নেহের দুপুর হবে তপ্তপ্রেমের মরু
সবুজ পাতার ঝিরিঝিরি তরু। 
সুরের মূর্ছনায় ঢেকে যাবে সব বেদনার রঙ 
মানবতায় ঘেরা প্রাচীন শহর।
যে শহরের নাম ছড়িয়ে যাবে দিকবিদিক
অনাথের নাথ হবে, হবে অন্নপূর্ণা 
প্রেমময়ী গঙ্গাস্নানের বদ্বীপ। 
প্রাচীণ রোম হতে মেসোপোটেমিয়া 
সিন্ধু থেকে নীলনদ, হালের সুইস হতে প্লেটোর গ্রীস, শেকসপিয়ারের ফরেস্ট অফ আর্ডেন হবে এ বদ্বীপ।
যেখানে তুচ্ছ আচারে বিচার হবেনা
প্রেমিকার করা চোখের শাসন হবে নিশ্চিত । 
লুটেরা সব প্রেমিক হবে
গায়ক হবে রাজনীতিবিদ।
শংখচিলের মতো আকাশ আমার 
তুমি হবে গাংচিল। 
মাঘের শেষে ফাগুনের মতো
এ ধরাকে হতেই হবে এমন একদিন।

প্রতীক হালদার

শান্তি খুঁজি 

ক্লান্তি বলে শান্তি খুঁজি 
চল না ছুটি চাই,
ঘুমের দেশে একটু ঘুরে 
সুখের হদিশ পাই।

কড়া নিয়ম প্রতিদিনই 
পাল্টে ফেলি চল,
নতুন রঙে স্বপ্ন এঁকে 
মনের কথা বল।

নদীর ঢেউয়ে রাস্তা মেপে 
একটু ঘুরে আসি,
মেঘলা বেলার  পাহাড়টাকে 
বড্ড ভালোবাসি।

চল না ছুটি দুজন মিলে 
ওই পাহাড়ের গায়,
পাহাড় ঘেঁষা সূর্যটাকে 
একটু কাছে চাই।

চল না উড়ি ঘুড়ির সাথে 
মুক্ত হয়ে আজ,
আবার হবে সময় করে
জমানো সব কাজ।

প্রদীপ কুমার মাইতি

কৃষক সর্বহারা

ঘরে ঘরে সবার অন্ন
যোগায় কৃষক ভাই,
মাটির বুকে ফসল ফলায় 
মাটি জীবন তাই।

সারাজীবন কাটে তাদের 
অশ্রুসিক্ত জলে,
তাদের ব্যথা কেউ বোঝেনি 
চাষাভুষা বলে। 

রাজ গৃহ চায়নি তারা
বিলাসব্যসন ও নয়, 
চায়নি তারা কোরমা পলাও
ভাত দুমুঠো চায়।

ধরায় যত বৃক্ষ লতা 
তুলছে মাথা তারা,
কৃষক ভাইয়ের জন্য মোদের
সবুজ বসুন্ধরা। 

ঋনের বোঝা মাথায় নিয়ে
কৃষক সর্বহারা,
শত আঘাত বুকে ঢেকে 
ফসল ফলায় তারা। 

গর্জে ওঠো কবির কলম
প্রতিবাদের ভাষা,
শৃঙ্খল ছিড়ে অধিকারে তারা
দেখুক নতুন দিশা।

রীতা চক্রবর্তী ( লিপি )

ঋতুরাজ বসন্ত

শহরের ব্যস্ত জীবন থেকে
উত্তুরে হাওয়ার ছুটি হয়ে গেছে অবশেষে,
দীর্ঘ শীত ঘুম শেষে শহর জেগেছে
ঋতুরাজ বসন্ত এসেছে চিরায়ত অভ্যাসের বশে।
দখিনা বাতাস চামর দোলায় 
কৃষ্ণচূড়ার ডালে 
পলাশ শিমুল রাঙা শাড়ি পরে
শুধু প্রেম পিরিতির কথা বলে।
ঝরা পাতা উড়ে এসে গায় বিরহের গান 
কানেকানে কত কথা বিচ্ছেদে মৃয়মান।
হঠাৎ একটি পাতা ঝরেই বলে,
আম্র শাখে ডাকছে বসে  
কোকিল নাকি সই?
ডাক না তাকে এই আসরে 
মনের কথা কই!!

মীনাক্ষী চক্রবর্তী সোম

পিছুটান

সেদিন তোমাকে দেখেছি নতুন করে
নীল পাহাড়ের দেশে, পথিকের বেশে।
কিছুক্ষণ কেটে গেছে অপলক 
কেমন আছি --- জানতে চাইলে কৌতূহলবশত
থরথর কেঁপে উঠেছি, জবাব ছিল না কোনও
যন্ত্রহৃদয় তোমাকে আজও জানাতে পারিনি  
বুকের মধ্যে রাগ বিরক্তি জমাট বেঁধে 
চাপ চাপ কষ্টবাসা তৈরি হয়েছিল সেদিন 
উজাড় করে দিতে চেয়েও
তোমার পাথর বুকে ছিলনা ঝরনা 
তুমি চেয়েছিলে চরাচর জুড়ে শুধু অবকাশ যাপন।
সে এক সময় ছিল, 
আঁকড়ে ধরতে চেয়ে কেঁদেছিল প্রাণ
উদাসীন হৃদয় ভালোবাসায় বাঁধতে জানেনি।
আজ পর্ণমোচী বসন্ত দিনে ডেকেছ যখন 
আমায় জড়িয়ে রাখে অদৃশ্য অক্টোপাস পিছুটান ।।

দীপান্বিতা পান্ডে দীক্ষিৎ

আকাশের বুকে

নূতন কিছু না সৃষ্টি হলে দিনটা কেমন যেন লাগে ,
যা কিছু হোক ভাল মন্দ সমান সমান নূতন অক্ষরেখায় ৷
নিজের সৃষ্টি ধুমকেতু উপহার কালক্ষেপের ইতিহাস,
একদিন সব কিছু মানে খুঁজে পাবে তার আবিস্কারের ৷
নিয়মেরই বেড়াজালে এধার ওধার চারপাশে
অর্থ দিয়ে অনর্থের পরিমাপ৷
দুরে সরে থাকা বারেবার 
মনের  আকাশ থেকে '
সেই আকাশে চাঁদ সূর্য তারারা বাঁচে নিজের সরল রেখায়৷
অনেকেই অনেক অণু পরমাণু মন খোঁজে নক্ষত্রের আলোকে,
তাদের নামের ঠিকানা কেউ পায় কেউ হারায় কেউ শুধু খুঁজে মরে ক্রমাগত অনিশ্চিত ঠিকানা,
একটু বাঁচার আশায় ৷
 কেউ বেঁচে থাকে উজ্বল তারকায় ,
আর কেউ সুদুর আকাশের বুকে শুধু ভেসে বেড়ায় বৃষ্টি ঝরাবে বলে ৷

ছন্দা দাম

ফিরে যাই

বেদনার কাছাকাছি সেই গভীর হৃদয় পুকুর ধারে...
একটানা বিষণ্ণতার ঝিঁঝিঁ ডাকা দুপুরে
একা আমি আর আমার হারিয়ে যাওয়া মন...
টুপটাপ পাথরের মত যেন স্মৃতির তারা খসে পড়ে।

অজান্তে হারিয়ে যাবে... বুকের বাঁদিকের জমিনে
স্বপ্ন সোঁদা মাটিতে নিকানো ঘরটার অস্তিত্ব,
আমি শুধু হাসি অজ্ঞতার হাসি,সবই অনিত্য জানি তবু ইচ্ছে তুলিতে রাঙাই দিন অনাগত।

ব্যথাদের আদরে সযত্নে আগলে রাখা পাঁজরে...
ছোট্ট মায়াময় একটা দেরাজে চিরকুট রাখা,
অভিমানি আমিটা সেইখানে লুকানো অন্তরালে...
খুলে দেখা হয়নি কখনোই.. কি এতে লেখা!!

দুর্বোধ্য কথার যানজটে ফেঁসে পৌছানো হয়নি...
নির্জনতায় ঘেরা সেই জানালার ধারে,
আলপিন পড়া নিস্তব্দতায়...ডেকে ফেরে...রোজ
সহজিয়া আমিটাকে এমন করে...ইচ্ছে হয় যাই ফিরে।

রিপন সিংহ

বিহগ উড়ে

হে প্রিয় তুমি এলে কিভাবে
পাঠাল কে 
কোন হেতুতে পাঠাল
কেন এসেছো!

কোন গোত্রে মিশবে
কতটুকু ফিরবে
কে তোকে পথ দেখাবে
জান কে তুমি?

মানব জীবন, বিহগের ভোগ সন্ধান
মানব জীবন কেনাবেচায় আসা।

পামেল উর্বীরূপে আঁধার কাটে
প্রাচ্যের আলোতে দিশা হারিয়ে উড়ে
কোন্ এক অজানা দেশে।

যেয়ো না নভশ্চর 
তুমি গেলে আর আসবে না
হা মনের বিহগ কার সাধ্যি তোকে কয়েদি করে
তুমি গেলে কে থাকবে এই ঘরে!

যমুনার তীরে বাঁশিতে রাধা রাধা
এই ডাক ভুলে যেয়ো না তুমি
যেয়ো না ভুলে।

পাপিয়া দাস

কি লিখব বসন্ত বিকেলে?

বসন্ত সংখ‍্যায় ত্রিধারা পত্রিকায় 
লিখতে বসেছি বসন্ত বিকেলে-
কি লিখব ভাবতে ভাবতে
চলে গেলাম স্বপ্নদ্বারে---
আজ লিখব আমার ত্রিধারাকে নিয়ে
অনেক লেখা তোমায় নিয়ে
বসন্ত বিকাল বয়ে যাবে তবুও শেষ হবে না লেখা।
যাকে কাছে পেয়ে আমি ফুটতে শিখেছি
যার কারনে লোকে আমায়
একবার হলেও  কবি বলে আখ‍্যা দেয়
যদিও  এখনো আমি কবি হতে পারিনি
কিন্তু যে বসন্তের কারনে আমার  চারপাশে 
এদিক ওদিক জুড়ে ফুলের   সুবাস
যার ডালে বসে আমি উড়তে শিখেছি
পেয়েছি অনাবিল  আনন্দ 
পেয়েছি যার প্রতিটি নিঃশ্বাসে বিশ্বাসের গন্ধ
আজ বসন্ত বিকালে মনে পরছে
ত্রিধারার পরিচয়,প্রকাশিত বই
আর বইমেলার সব ইতিহাস।
রক্তিম পলাশের মতো 
ফাগুনের দিনে তুমি নতুন নতুন সাজে
সেজে ওঠো  রঙীন সাহিত‍্য জগত হয়ে
সেই রঙে সাজিয়ে দাও দেশ বিদেশের সাহিত‍্য 
নাম যশ ছড়িয়ে  পড়ুক
পূর্ব -পশ্চিম -উওর আর দখিনের  হাওয়ায়।

গীতশ্রী ভট্টাচার্য্য

খোল

খোলের আওয়াজে এখনো বুকের ভেতর থরথর করে কাঁপে অর্জুনের। তবে এখন সামলে নেয়। অচেতন হয়ে পড়েনা। 

খাঁটি বৈষ্ণব বাড়ির ছেলে অর্জুন। বাড়িতে রাধা গোবিন্দের নিত্য সেবা, ভোগ রাগ, আরতি কীর্তন। বিশেষ তিথি গুলিতে প্রহর ভিত্তিক কীর্তনের ব্যবস্থা। সব মিলিয়ে মধুর দিনযাপন। 

পাশেই রাই দের বাড়ি। একসাথে পড়ে ওরা, একই স্কুল, এক ক্লাস। দুটো বাড়ির মধ্যে দারুণ ভাব। আসা যাওয়া লেগেই থাকে। রাই দিনে চার পাঁচবার ওদের বাড়ি ছুটে ছুটে আসে। অর্জুনের ও ওদের ঘরে অবাধ যাতায়াত। 

রাই শান্ত, অর্জুন উচ্ছল। দুজনের মধ্যে গাঢ় বন্ধুত্ব। 

সেদিন দোল পূর্ণিমা। অর্জুন দের বাড়ি মন্দিরে পূজো, কীর্তন চলছে। সকাল থেকেই ব্যস্ততা। ভোগ রান্নার সুগন্ধে ম ম করছে গোটা পাড়া।

রাইকে আবির দিতে ছুটে যায় অর্জুন।  বাধা পায় , এই প্রথম। আশ্চর্য অর্জুনের চোখের সামনে ভেতরে চলে যায় রাই ।

কাকিমা এসে বলেন, এই নে মিষ্টি মুখে দে। রাইর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে রে। ওরা বিয়ের পর ওকে পড়াবে কথা দিয়েছে। খুব ভাল চাকরি করে ছেলে।

অর্জুনের কানে কী আদৌ কোনো কথা ঢুকেছে! বিয়ে হবে রাই র, এরচেয়ে মিথ্যে কথা যেন আর কিছু হতেই পারেনা।

একদৌড়ে বাড়ির নাট মন্দিরে ঢোকে। তখন মহা সমারোহে কীর্তন চলছে। খোলের মহানাদ। অচেতন হয়ে পড়ে অর্জুন। 

তারপর অনেক কথা, অসুস্থ অর্জুনকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাওয়া হয় শহরে। মনোবিদের পরামর্শে, ওষুধে ধীরে ধীরে সেরে উঠে। কিন্তু , ওই খোল , মৃদঙ্গের আওয়াজে বেসামাল হয়ে পড়ে আজও।

বিয়ের পর রাইয়ের সাথে দেখা হয়েছে কয়েকবার। ওরা দুজনে কেউ কাউকে কোনোদিন ভালবাসার কথা বলেনি, কিন্তু তাও দুজনেই জানত যেন ওরা পরস্পরের।  সেই অল্পবয়সে প্রকাশ করে উঠতে পারেনি নিজেদের ভালবাসা।

রাই বাপের বাড়ি এলে অর্জুনের কাছে ছুটে আসে। এক ঝলক দেখা, দুটো কথা আর দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া কিছু নেই। অর্জুন নিজের স্ত্রীকে বলেছে সাবকথাই। রোহিণী বোঝে, কিন্তু কোথাও ওর মনেও একটা কাঁটা বিঁধে থাকে।

মনেহয়, স্বামীকে পুরোপুরি সে পায়নি। খন্ডে বিভক্ত ওর অর্জুন। মহাভারতের অর্জুনের মতই। তবু, মন প্রাণ দিয়ে আগলে রাখে ওকে। ভালবেসে, যত্নে, মমতায়।

রাই এখন অর্জুনকে দোষারোপ করে মেসেজে, কখনো ফোনে। এত বছর পর না পাওয়ার বেদনা যেন ওকে আগ্রাসী করে তোলে। প্রবল ভাবে সে কামনা করে তার ভালবাসার প্রথম পুরুষকে। 

অর্জুন অবসাদে ভোগে। নিজেকে সত্যিকরের  অপরাধী ভাবতে শুরু করে। মনে হয়, রাইকে সে ঠকিয়েছে। ঠকিয়েছে রোহিণীকেও।  নিজের অন্তর্দ্বন্দ্বে নিজেই ক্ষত বিক্ষত হয়। 

এখনও ফাল্গুন আসে। দোল পূর্ণিমা আসে। বাড়িতে পূজো, কীর্তনের আয়োজন চলে। 

অর্জুনের শুধু মনে হয়, বিগ্রহের বেদিতে যেন শ্যামের পাশে রাই নেই। শূন্য পড়ে আছে সেই স্থান।

উফফ, আবার খোলে চাপড় পড়ে।

শ্বেতা_ব্যানার্জী

ভাবিকাল

ভোরের লিকার চায়েও দেখি অন্ধকার 
ঠোঁট রাখতে ভয় পাই কাপে, 
পাছে অন্ধকারে মেশে আমার শরীরে.... 

হারিয়ে গেছে দোল পূর্ণিমার রঙ,
হারিয়েছে দোলনচাঁপা, পোড়া অশ্বত্থের ছায়া মেখে 
শুন্যতায় চোখ রাখে কালপ্যাঁচা।

স্ব-ইচ্ছায় হারাচ্ছে বনস্পতির বন ছায়া, 
কাকেরা হারাচ্ছে বাসা, গৃহস্থ সংসারে 
তাদের নিত্য যাওয়া আসা..। 

এখনো লিকার চা হাতে বসে আছি,
সময়ের নড়াচড়া স্তব্ধ এখন 
স্থবির আসবাবপত্রের মতন। 

প্রযুক্তির জটাজালে  সভ্যতার চিরুনি 
আঁচড়ে চলে সমকালের খেদ।
তবুও নিরুত্তর  উপগ্রহ। 

স্নায়বিক উত্তেজনা ছড়ায় ভাবিকাল
বর্তমানের কোলে বসে...।
আমারও নিরুচ্চার ঝুঁকি না নেবার ঝোঁকে...। 

আমরা অপেক্ষামান শান্তির খোঁজে 
শান্তিরা ডানাঝাপটায় বন্ধ খাঁচায় বসে
বলে গ্যাছে ভোর চুপিসারে 
আমি ফিরবো শিশুর কান্না হয়ে ------

চন্দ্রা বিশ্বাস

কালি-কলম-মন 

মন-মানচিত্রের উপর দাঁড়িয়ে 
ঠিকানা হারিয়ে ফেলি বিশ্ব-জমানায়,
ভাবনার গতিপথ সড়কের ধুলোমাটিতে 
মায়া-মোহের স্মৃতিতে গড়াগড়ি খায়।
বনপথে পথচারীর কাঁধে হাত রেখে
মন-পথিক শিল্পীর তুলিতে ছবি আঁকে,এঁকেই যায় ,
খড়ের চালায় ঢাকা, মাটিতে নিকোনো রোয়াকে বসে 
অবোধ মন-শিশুর অবাক দৃষ্টিতে  ভেসে ওঠে ,
কৈশোরের হাডুডু, এক্কাদোক্কা আর শান্ত নদীতে বন্ধুরা মিলে একসাথে ঝাঁপাঝাঁপি।ইলেকট্রিকের তারে বসে ভাবুক
কাক খাবার খুঁটে খেতে ভুলে যায়,
ফাঁকা পথে উদাস রিকশাওয়ালার
অযথা প্যাঁক প্যাঁক শব্দ। 
ভাঙা বাড়িটার কানাচে লুকোনো মা-বিড়ালের 
সদ্য চোখ ফোটা বাচ্চাগুলোর অসহায় চাহনি ,
ঘুলঘুলিতে খড়কুটোর বাসায় প্রেমলীলায় মগ্ন চড়ুই-দম্পতী।
খেজুর গাছে বেঁধে রাখা রস- চুয়ানো মেটে কলসীটা,
স্টেশনের সিঁড়ির পাশে বসে থাকা অভাগা ভিখিরীর 
বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা।
মনের মণিকোঠা থেকে উঁকি মারে 
এমনই কত শত বিস্মিত বিমূর্ত স্মৃতিরা,
অসহায় মন তখন স্বপ্ন ও সত্যের দোলাচলে।
           

সুচরিতা পাটারী

জিন প্রবাহ

স্বর্ণলতার বাহ্যিক রূপ আর কোমলতায় মুগ্ধ হয়ে ঠাঁই দিয়েছিলাম,
কিন্তু মূলে চির ধরতেই বুঝেছিলাম সে চোষক অস্ত্র বহন করে।
এক সমুদ্র অভিমান আর অভিযোগ নিয়ে যখন পথচারী হলাম,
পথের পাশেই দেখি খাটো মসৃণ একজাতীয় গাছ,
যার পাতাগুলো ছিলো ভেতর থেকেই মখমলে। 
আমার বয়ে চলা সমুদ্র সে সিক্ত করে নিলো নিমেষেই।
তাঁর আবার জিনগত তেজ আছে।
সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ,কোনো খাদ নেই সেই তেজে।
দোষ কেবল, সে বড্ড অবুঝ বড্ড খামখেয়ালি তাঁর।
 জল শিথিল হতে হতে যখন ভারী মেঘ জমে গেলো,
মখমল তখন আর সেই ভার সইতে পারলো না।
ভেঙে খতিয়ে দেখলো না মেঘের জলবিন্দু।
 ঘাড় ফিরিয়ে বুঝিয়ে দিলো,
জল ধারণ তাঁর জিনে নেই।
 কিন্তু জলের স্পর্শ পেতে পেতে যে একটা সময় জিন বদলে যায়,
সেটুকু তাঁর খেয়ালে নেই হয়তো।।
 তবু মসৃন-মখমলে-সৎ কচু গাছটিকে, 
যথাসম্ভব বাঁচতে দেওয়াই আমার মনুষ্যত্বের জিন ধারা।।

শর্মি দে

 কথামৃত

থামতে শেখোনি!
এই ছিল তোমার শেষ আপ্তবাক্য।
জবাব দিতে পারিনি।
সে যে বোহেমিয়ান, থামতে শেখেনি! স্রোতে প্রতিস্রোতে বহে চলেছে সে--
সাগর পেরিয়ে দিগন্ত ছুঁতে চায়!
অথচ তুমি তাকে চিনতে পারলে না।
চিনতে পারলে না তার জীবন আকরিকের ভাস্কর্য!
এমনকি জানার চেষ্টাটুকুও করলে না তোমার অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে!

তুমি বারবার বলেছিলে,
সে আত্মশ্লাঘাতে ভরপুর।
না--, তোমার বিচ্ছিন্ন ভাবনা সম্পূর্ণ ভুল!
তার অসম্পূর্ণ সত্তাটা তোমারই অববাহিকার ঘাটে পাবে কোজাগরী পূর্ণতা, 
আর সেই ঘোলাটে স্বপ্নেই ছিল সে আবেশিত!
নিবিড় নিলয় অলিন্দে বেড়ে যায় তার রক্তপ্রবাহ তোমার অতলান্তিক আনকোরা আকুলিবিকুলি স্পর্শে, বার--বার।

দীক্ষিত করেছিলে ভোরের মন্ত্রে,
বলেছিলে কবিতায় ডুবে যেতে,
যে কবিতার পরতে পরতে খোদাই আছে খাজুরাহোর কথামৃত।
তবেই প্রতিধ্বনিত হবে অনুচ্চারিত শব্দে পড়ন্ত হৃদয়ের জীবন্ত জিজ্ঞাসা!

জানো, বড্ড জানতে ইচ্ছে করে, তুমি কেমন আছো?
বই পড়ছো ?
সঞ্চয়িতার মলাট ছিঁড়ে অস্থিকঙ্কাল বেরিয়ে গেছে,
তবুও বারবার তাকেই পড়ছো!
পুরোনো ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে নতুন করে কিনে আনো
         চোরাবালির কথামৃত!

সোনালী মণ্ডল

রাঙিয়ে দিয়ে যাও

আমার নিষিদ্ধ প্রেমের হাতছানিতে,
তুমি বেলা শেষের আপেক্ষিক মোহ,
ভোরের সতেজ স্নিগ্ধ আলোয় থাকি,
কলঙ্কের চাদরে ঢেকে এক নির্লজ্জ বদনামি।
তোমার আঁচড়ের ক্ষতে তৃষ্ণার  প্রলেপে,
গুছিয়েছি সযত্নে স্মৃতির এক মহাকাব্য।
ভেসেছি অনবরত উজানের অকৃপণ টানে,
মরীচিকার মায়ায় ঘর বাঁধি চুপিসারে।
আমার অব্যক্ত ভাষায় উন্মুক্ত দ্বারে,
নির্লিপ্ত বিনিদ্র নির্ভীক প্রতীক্ষমান প্রহরী।
স্বাগত তোমায় প্রস্ফুটিত সুগন্ধ সৌরভে,
রাঙিয়ে দিয়ে যাও সম্পর্কের স্বীকৃতির রঙে।

সুপ্রতিম ভৌমিক

বসন্ত আজ জাগ্রত ধরার পরে

মধু বসন্ত আজ
ফাগুনের ডাকে
জাগ্রত ধরার পরে,
কুহুতান সদা কর্ণে বাজে,
রাঙা পলাশ, শিমুল, কৃষ্ণচূড়া,
কাননে বিরাজে,
পুষ্পোদ্যানে পুষ্প রাশি রাশি
ছড়ায় মাধুরী,
সৌরভ মনোহরন ।
উতলা পবন মাঝে মাঝে
নৃত্যে উঠে মেতে,
মৃদু মৃদু বহে 
দখিনা মৃদুল সমীরণ ।
ধরনী যে হাসে
রঙ্গিলা হোরীর আশে
কুঙ্কুম আবীর ফাগে,
বিচিত্র বর্ণা বসন্ত নির্যাসে
রাঙিয়া উঠবে কখন ?