খোল
খোলের আওয়াজে এখনো বুকের ভেতর থরথর করে কাঁপে অর্জুনের। তবে এখন সামলে নেয়। অচেতন হয়ে পড়েনা।
খাঁটি বৈষ্ণব বাড়ির ছেলে অর্জুন। বাড়িতে রাধা গোবিন্দের নিত্য সেবা, ভোগ রাগ, আরতি কীর্তন। বিশেষ তিথি গুলিতে প্রহর ভিত্তিক কীর্তনের ব্যবস্থা। সব মিলিয়ে মধুর দিনযাপন।
পাশেই রাই দের বাড়ি। একসাথে পড়ে ওরা, একই স্কুল, এক ক্লাস। দুটো বাড়ির মধ্যে দারুণ ভাব। আসা যাওয়া লেগেই থাকে। রাই দিনে চার পাঁচবার ওদের বাড়ি ছুটে ছুটে আসে। অর্জুনের ও ওদের ঘরে অবাধ যাতায়াত।
রাই শান্ত, অর্জুন উচ্ছল। দুজনের মধ্যে গাঢ় বন্ধুত্ব।
সেদিন দোল পূর্ণিমা। অর্জুন দের বাড়ি মন্দিরে পূজো, কীর্তন চলছে। সকাল থেকেই ব্যস্ততা। ভোগ রান্নার সুগন্ধে ম ম করছে গোটা পাড়া।
রাইকে আবির দিতে ছুটে যায় অর্জুন। বাধা পায় , এই প্রথম। আশ্চর্য অর্জুনের চোখের সামনে ভেতরে চলে যায় রাই ।
কাকিমা এসে বলেন, এই নে মিষ্টি মুখে দে। রাইর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে রে। ওরা বিয়ের পর ওকে পড়াবে কথা দিয়েছে। খুব ভাল চাকরি করে ছেলে।
অর্জুনের কানে কী আদৌ কোনো কথা ঢুকেছে! বিয়ে হবে রাই র, এরচেয়ে মিথ্যে কথা যেন আর কিছু হতেই পারেনা।
একদৌড়ে বাড়ির নাট মন্দিরে ঢোকে। তখন মহা সমারোহে কীর্তন চলছে। খোলের মহানাদ। অচেতন হয়ে পড়ে অর্জুন।
তারপর অনেক কথা, অসুস্থ অর্জুনকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাওয়া হয় শহরে। মনোবিদের পরামর্শে, ওষুধে ধীরে ধীরে সেরে উঠে। কিন্তু , ওই খোল , মৃদঙ্গের আওয়াজে বেসামাল হয়ে পড়ে আজও।
বিয়ের পর রাইয়ের সাথে দেখা হয়েছে কয়েকবার। ওরা দুজনে কেউ কাউকে কোনোদিন ভালবাসার কথা বলেনি, কিন্তু তাও দুজনেই জানত যেন ওরা পরস্পরের। সেই অল্পবয়সে প্রকাশ করে উঠতে পারেনি নিজেদের ভালবাসা।
রাই বাপের বাড়ি এলে অর্জুনের কাছে ছুটে আসে। এক ঝলক দেখা, দুটো কথা আর দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া কিছু নেই। অর্জুন নিজের স্ত্রীকে বলেছে সাবকথাই। রোহিণী বোঝে, কিন্তু কোথাও ওর মনেও একটা কাঁটা বিঁধে থাকে।
মনেহয়, স্বামীকে পুরোপুরি সে পায়নি। খন্ডে বিভক্ত ওর অর্জুন। মহাভারতের অর্জুনের মতই। তবু, মন প্রাণ দিয়ে আগলে রাখে ওকে। ভালবেসে, যত্নে, মমতায়।
রাই এখন অর্জুনকে দোষারোপ করে মেসেজে, কখনো ফোনে। এত বছর পর না পাওয়ার বেদনা যেন ওকে আগ্রাসী করে তোলে। প্রবল ভাবে সে কামনা করে তার ভালবাসার প্রথম পুরুষকে।
অর্জুন অবসাদে ভোগে। নিজেকে সত্যিকরের অপরাধী ভাবতে শুরু করে। মনে হয়, রাইকে সে ঠকিয়েছে। ঠকিয়েছে রোহিণীকেও। নিজের অন্তর্দ্বন্দ্বে নিজেই ক্ষত বিক্ষত হয়।
এখনও ফাল্গুন আসে। দোল পূর্ণিমা আসে। বাড়িতে পূজো, কীর্তনের আয়োজন চলে।
অর্জুনের শুধু মনে হয়, বিগ্রহের বেদিতে যেন শ্যামের পাশে রাই নেই। শূন্য পড়ে আছে সেই স্থান।
উফফ, আবার খোলে চাপড় পড়ে।