Apr 30, 2022

অপাংশু দেবনাথ

অসুখের বাড়ি

অসুস্থ ভিড়ে বসে আছি। অসুখেরা হাঁটে।
চোখে ছায়া ফেলে নির্জন-কোলাহল।
এসব ছায়াদের জড়ো করি।

দিনের শেষে মনে হয়,
এত অসুস্থতা ছায়ারূপে জমে আছে আমার শরীরে।
শরীরের শীতলতা কমে। পোড়া গন্ধ বাড়ে।

ভিড় ভেঙে ছায়া ফিরে অন্য অসুখের বাড়ি।

তৈমুর খান

ঘাতক
         
হিংস্রতাগুলি এখনো রূপক হয়ে 
মাঠে নামে রোজ
রূপকথা ভেবে ওদের ডেকে আনি ঘরে
বন্ধুত্ব হয়
কখনো কখনো ঠোঁট ছুঁয়ে ফেলি
অথবা দুই হাত

নিমগ্ন আলোর মতো ওদের রোশনাই
বারান্দায় ছড়িয়ে পড়লে
নিজেকে অপার্থিব মনে হয়

ভ্রান্তির পথে বাসনাদের গূঢ় যাতায়াত
কখনো কখনো ছায়ায় মায়াসাপ ঘোরে
বিশ্বাস ভঙ্গ হয় আলোও যখন তরবারি
ঘাতকেরা বেরিয়ে আসে সব সর্বনামে
বিশেষ্য তখন একাই দাঁড়ায়
সিজারও খুন হয় ব্রুটাসের কাছে....

কুশল ভৌমিক

সুতরাং তুমি বাঁচো

যদি এক্ষুনি সূর্য ডোবে 
নেমে আসে আলোখেকো অন্ধকার 
তবুও এটাই সত্যি জেনো
ভোরের ডোরবেল বাজাতে বাজাতে
আমাদের জানালায় সলাজ উঁকি দেবে রোদ 
সুতরাং তুমি বাঁচো। 

বুকের ভেতর অমাবস্যা নিয়েও গেয়ে ওঠো জোছনার গান আর ভেবো না
ঈশ্বর শুধুই মানুষের-

আকাশে উড়ছে যে শঙখচিল 
হিরন পয়েন্টে করুণ চেয়ে থাকা ঘাই হরিনী
কাঁটাবনে লোহার খাঁচায় বন্দি ছোট্ট মুনিয়া
ব্যাকুল ডাকতে থাকা পিউকাঁহা 
বিলের ধারে ধ্যানমগ্ন কানিবক 
সৈকত জুড়ে ফুটে থাকা সাগরলতা
ওদেরও ঈশ্বর আছেন।
ঈশ্বর সকলের
এই বিশ্বাস না নিয়ে তুমি মরো না। 

যদি পারো দরোজা খুলে বেড়িয়ে এসো
দেখো কী সুন্দর নির্মল আকাশ 
ভাবো, পুরো আকাশটাই একটা ছাদ 
পৃথিবীটা একটা ঘর 
পুরো ঘরটাই ঈশ্বরের
এখানে ক্যাথলিক প্রোটেস্ট্যান্ট নেই
শিয়া অথবা সুন্নী নেই
শাক্ত কিংবা বৈষ্ণব নেই
এখানে মানুষ এবং প্রাণের কলরব।

এবার তুমি কাঁদো 
আর বেঁচে থাক কেবল এই মুহুর্তটির জন্যই 
দেখ কী পবিত্র আমাদের চোখের জল-
'সকল অহঙ্কার এবার ঘুচুক চোখের জলে'।

কমল সরকার

নদীমাতৃক

আমাদের খুব কান্না পেলে
কিংবা খিদে পেলে খুব,
রাগে অভিমানে দুঃখে ও বিপদে
ছুটে গেছি এক অন্তর্গত নদীর কাছে। 
নদী তার উদ্‌গত ঢেউয়ের গহিনে
অন্তর্লীন করে নিয়েছে 
আমাদের যাবতীয় মনখারাপের নুড়ি। 
আমাদের এই শাশ্বত নদী
নিরবধি বয়ে গেছে
রান্নাঘর থেকে শোওয়ার ঘর
শোওয়ার ঘর থেকে উঠোন
উঠোন পেরিয়ে সুদূর সমুদ্রে...
অতঃপর সমগ্র পৃথিবীকে আমরা
নদীমাতৃক বলে জেনেছি

রুদ্র মোস্তফা

ফসকে যাওয়া চুম্বনের গল্প 

ঠোঁট থেকে ফসকে গেছে যে চুম্বন
তার পতনের পারে জন্মেছিলো অভিমান 
অথচ অভিমানের জন্মবৃত্তান্ত খুঁজতে গিয়ে 
বেমালুম ভুলে গেছি চোখের সরোবরের কথা—
যেখানে পদ্মের মতো ভালোবাসা ফুটে ছিলো 
নোনাজলের নহর সাঁতরে নান্দনিক অপেক্ষায়—
যেখানে হাত বাড়িয়ে শব্দহীন ভাষা 
ছুঁয়ে ছিলো প্রার্থনার মতো প্রাণ—
মেপে ছিলো ঠোঁট থেকে ঠোঁটের নৈকট্য 
কিংবা জড়াজড়ি করে থাকা শরীর ও মনের দূরত্ব।

নমিতা সরকার

প্রাকৃত

কত শত শরীরের ভাজে ভাজে 

বিবেকহীন কালো কলমের শীসে  রক্তের কালি লিখে দিচ্ছে শুধুই নির্মমতার ইতিহাস। 

বর্বরতা আজ পাহাড় ছুঁয়েছে.... 

ঝর্ণা বলে; আমি আপন ধর্মে মিশে নুড়ি থেকে বিশাল  শিলাকে স্পর্শ করে মিশি সমুদ্রের জলে আর পদ্মা মেঘনা গঙ্গা যমুনার স্রোতে ভাসি প্রকৃতির মাঠে মাঠে।

তোমাদের মতো ধর্ম নিয়ে তর্ক করি না....

বৃক্ষ বলে; আমার শরীর জুড়ে ছোট ছোট পরগাছা আমি ভালোবেসে বুকে আগলে রাখি জাত বুঝিনা জাত খুঁজি না, তাই লালন ফকিরের গানের একাতারার সুর আজও হৃদয়ে।  

তোমাদের হৃদয়ে সে সুর তোমরা বাজাতে পারো না.....

অসাম্প্রদায়িক চেতনায় যুদ্ধের চিতা জ্বালাও হিংসার দাবানলে....

প্রকৃত ধর্মের মানে তোমরা বোঝ না।

খোকন সাহা(অগ্রজ)

মহারাজ

বানাও উঁইয়ের স্বর্গ , অর্থহীন মরা বক্তৃতায়  ;
ধূর্তবীজ বেড়ে ওঠে , সমাজের লকলকে ডগায় ।

আর যত ভিক্ষাভক্ত  ,  হল্লারক্ত,  পাথরবধির কলরোল ;
লতাগুল্মগন্ধের শিকড় কাটে,  চোরাগোপ্তা গর্তের বিড়াল।

ধর্মতত্ত্ব ভুতগ্রস্ত , রাজপাঠ শব্দকুন্ড সনৎকার  ;
ব্রীড়ানম্র নীতিভুষন , কীটদষ্ট ভণিতার বাজার ।
কালেভদ্রে উদ্দাম বালিতে  পুঁতেছিল যারা বুক ,
ইতিহাসের জ্বল জ্বল  চোখ ; তাঁদের করুণ কপালে

ভিজে ওঠে ----- ভ্রষ্টকালের রক্ত-জঠর
'না-মানুষ না-জন্তুর কারাগার '।
আত্মজীবনী ছিঁড়ে খুঁড়ে,  ভাষা খায় কলিজার চাবুক  ;

ফেনিয়ে ওঠে ছিলা,  বাঁকিয়ে ধনুক ।
কশেরু কঠিন সহনে শিরা ,  জ্বালিয়ে বিদ্যুৎ ।

এইসব মুখে মাত্ ,  পিঠে হাত ,  শীত সুড়সুড়ি  ;
মাথা থেকে মেধার মড়ক , খুলে পড়ে  দৌড়াদৌড়ি ।

আত্মাহুতি দানের তারে , তবু হেটেঁ যায়  জন্মের পরোয়ানা ।
খুঁটি ধরে মারে টান , মারে চোখ , প্রত্যাশার প্রতারনা ।

এইভাবে ছিপ ফেলে ,  ছাপ খেলে ,  বসে থাকে মাছ  ;
মাছি নয় ,  মানুষের খেলা দেখে ,  শকুন মহারাজ ।
                   

হারাধন বৈরাগী

উজানমাছমারা রিজার্ভ ফরেস্ট

শহরের শ্বাসকষ্টগুলো ক্রমশ
হামাগুড়ি দিচ্ছে উজানমাছমারা
রিজার্ভফরেস্টের বুকের  দিকে
যেখানে বয়ঃসন্ধির -গাবুর গাবুরী
কুড়িয়ে নিচ্ছে আঁজলা ভরে !

তাপীব

বুনন ছেঁড়া ভাবনা

ভাবনাগুলো পাখা মেলে,
নকশা-স্মৃতি বেবাক ভুলে;
উড়ছে কোথা' অসীম আকাশ জুড়ে।

বাঁধন কাটা ঘুড়ি-স্থিতি,
লাটাই-সন্ধির খেলাপ-কৃতি;
রং-বেরং এর সূতোর বুনন ছিঁড়ে।

শুক্লমেঘের রথে চড়ে,
পাহাড়চূড়োর গন্ডি ছেড়ে,
যাচ্ছে উড়ে দিগম্বরের দেশে।

দেহযষ্ঠী যোজন দূরে,
ধী-শক্তিও আর্তি স্বরে,
গাইছে ত্তৎ-গীত পুন:-নিষ্ঠাবেশে।

ধী- বুদ্ধি
 ত্তৎ-অপেক্ষা
দেহযষ্ঠী- শরীর

সুতপা রায়

ইমন

দিনের যাবতীয় ক্লান্তি নিয়ে
সন্ধ্যা যায় রাত্রির কাছে
রাত্রি চিত্রিত ক্ষুদ্র আলোর
  বিন্দুতে
বিন্দুগুলো আকাশের তারা 
তাই একবার পথের দিকে
 আর একবার আকাশের দিকে চোখ রেখে 
পথ পাড়ি দেয় সন্ধ্যা

একদিন কে যেন হঠাৎ 
সব তারাদের লুকিয়ে রাখে
মনে হয় মৃত্যুদূত দাঁড়িয়ে  
সামনে বা পেছনে
ডাইনে অথবা বাঁয়ে 
তখনই চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হয়, 
এখনো  সুন্দর অমলিন
সন্ধ্যা মানে অবসান নয়
নতুন সূর্যোদয়ের প্রস্তুতিকাল
অন্ধকারকে ঢেকো না নিশ্ছিদ্র কালোয়
জ্বলুক তারার বাতি
চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ুক মাধবী সুবাস

চন্দন পাল

ফিরে আয়

 রোয়াকে আলো রেখে    
 দুয়ারে পিঠ ঠেকে, 
          চোখ বিছিয়েছিলাম পথে।
তুই ডাকবি বলে,        
অভয়ে বাঁধবো বলে,
          রইবি দীপ্ত প্রাণোচ্ছ্বল রথে।

বসি চৌকাঠ 'পরে,        
হাটুদ্বয় মুড়ে, 
             দেয়াল আদরে টানে  শির। 
দোলে পরদা মৃদুবায়,      
ক্লান্ত নয়ন জোড়ায়,
             বুঝিনি কখন হলোরে ভোর।

তুই ফিরেছিস,      
তোলে আলো ধরেছিস, 
               বুঝি আর ভয় নাই!
আলোময় চারিধার,      
নিভেছে নয়ন আমার!
            একবার ডাক-না বাবাই।

মুঠোফোন সুধা-গরল,    
 বয়ঃসন্ধি তুই সরল, 
         গা ভাসাস নি জানিরে জানি!
গড্ডরপাল বা'হে,      
ভ্রমে টানিল প্রবাহে, 
         দিলি তুই ঝাঁপ, কদাচার মানি।

নিদর্শন দিয়ে একা,       
বাঁচালি লক্ষ সখা, 
           সকাশে ঐ দিনপঞ্জি লিখন।
জেগে উঠে রাজা প্রজা,  
চেতনায় বাঁক তাজা, 
            পথ খুলে ঐ বিবেক কথন।

আরও কত মিছে নেশা,     
অবোধেরা করে পেশা
             পেশাদারি ডুবে কই! মজুতে।
নিজের আখের ঘুচায়,      
সমাজের কিবা দায়,
             অপত্য বাড়ে তার, দুধ ও ভাতে।

শুন্ ঐ পেশাদারি     
মনে রাখিস হায়!খানি,
            যার গেলো, সেই তো বুঝে।
হায়!দাতা করে গোঁসা   
মারে যদি তোর পেশা
            জিতবে কি তুই, তখন যুঝে ?

সঙ্ঘমিত্রা নিয়োগী

জাতিস্মর

বৃষ্টি !তুমি অনেক পুরনো।নিস্তব্ধ দুপুর হাতে তুলে দিয়েছো।দীর্ঘপল্লব চোখে শুধু স্মৃতি টেনে আনো।
এখনো সমসাময়িক হতে শেখোনি।
ট্রামলাইন,ফ্লাইওভার,  তপ্ত অনুভূতি ভেঙে ,কাছাকাছি এসো,পাশাপাশি বসো।
তুমি আত্মশুদ্ধি থেকে অনেক বেশি।
তোমার প্রাচীনতা খুলে আমি ঢুকে যাবো জাতিস্মরে।।

প্রেমাংশু শ্রাবণ

জতুগৃহ 

তোমার শরীরে মেঘের নরম 
ছড়িয়ে আছে অনুচ্চারে
সেই নরমই জতুগৃহ, আগুন লাগে 
ঝিলের পারে। 

আগুন জ্বলে এই শরীরে,উপন্যাসের 
দুপুর পাতায় 
পোড়ার গন্ধে কাঁচা সড়ক পালক
গোঁজে হিসেব খাতায়। 

রোজই ভাবি তোর শরীরে বিনিসুতোয়
উড়িয়ে ঘুড়ি, 
নুড়ি ঘাসের আন্তরিকে গড়িয়ে
দেবো নদীর চুড়ি। 

তুই তো জানিস উজান পথে আমার
চিঠির সব খেয়াতে
তোর মাদলের শব্দ মানেই প্রবল
জোয়ার পূর্ণিমাতে।

তাও দেখি তুই তর্জনীতে বিরুদ্ধতার
গন্ধ মেখে 
অন্য কোথাও জোছনা আঁকিস 
আমার স্বপ্ন দূরেই রেখে। 

তাই ভেবেছি-কলমিলতা চিবুক ভেজায়
যে নামতাতে
সেই ঠোঁটে রোজ ভিজবো গোপন 
তোর সোহাগে মধ্যরাতে!

সমরেন্দ্র বিশ্বাস

অনুদিত জাহাজ
 
তোমাকে অনুবাদ করবার জন্যে
মাপছিলাম সেন্টিমিটার,
তুমি জিজ্ঞেস করলে, নীল জলের মানে?
উত্তরটা জানতাম 

সমুদ্রযাত্রার কয়েক দিন পরে
নির্জন লাল খামে তুমি উপহার দিলে
অনুবাদ করা জাহাজ!

জাহাজের ওড়নার মতো তখন থেকেই আমি
উড়ছি, তোমার সাথে উড়ছি!

সুমনা রায়

ছায়াসঙ্গী

“তোমার প্রশ্রয় তো কিছু কম নয়। কোনো কিছুরই তোয়াক্কা নেই। এবার বোঝো!"

রত্নদীপা চুপচাপ চায়ের কাপদুটো টেবিল থেকে তুলে নিতে নিতে একবার ছেলের ঘরের বন্ধ দরজার দিকে তাকায়। ভেতরে যেন অনেকগুলো দরজা দুমদাম করে বন্ধ হয়ে যায়। চলে যায় রান্নাঘরের দিকে যেখানে নিজেকে সবচেয়ে বেশি কাছে পায়। পঁচিশ বছরে নিলয়ের এইসব কথা শোনাটা এখন অভ্যস্ততায় দাঁড়িয়ে গেলেও আজ যেন ব্যথাটা ভেতরে চিনচিন করছে। এমনিতে নিজেকে সামলে চুপ থাকে আর আজ চেষ্টা করেও ভেতর থেকে দু ঠোঁটের ফাঁকে কথা টেনে আনতে পারছে না। আজ যে অনেক কথা শুনতেই  হবে এটা জানাই ছিল। শোভন আবার চাকরিটা ছেড়ে এসেছে। এতো ভালো প্যাকেজ! এতো ভালো পোস্ট! তারপরও।

প্রতিবার শোভন নতুন চাকরিতে ঢোকার সময় রত্নদীপা বিদেশের মাটিতেও নাম না জানা বেশি বেশি ফুল দেবদেবীর চরণে দেয়। অসহায় প্রার্থনা করেন ছেলের মতিগতি শুধরে দিতে। কিন্তু কোনোবারই তার শঙ্কা আর প্রার্থনা পৌঁছয় না জায়গামতো। চোখের সামনে ছেলের পাগলামোগুলো দেখে। তিনবছরে কতবার যে দেখেছে বিষাদ নদীর ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া! ছোট থেকে এই ছেলের জন্য কত কথাই না শুনতে হয়েছে! নিলয়ের কাছে, শোভনের স্কুলের টিচারদের কাছে; আত্মীয়দের কাছে। বকুলতলায় কতবার যে ও স্কুল পালিয়ে নদীর ধরে চলে যেত! গাছের তলায় বসে থাকতো চুপচাপ। বাড়ি ফিরে সন্ধ্যায় পড়তে বসে অন্যমনস্ক হয়ে পড়তো। উল্টো পাল্টা কী কী বলতো। যেদিন বললো, “জানো মা আজ দেখলাম আমার প্রিয় গাছটা হেঁটে যাচ্ছে কনকলতা নদীর কাছে। কনকলতার হাত ধরে কত কী গল্প করছে! কনকলতা তাকে গান শোনাচ্ছে। একসময় সে কনকলতার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লো।“ 

রত্নদীপা খুব ভয় পেয়েছিল সেদিন। অনেক কথাই চেপে গেলেও এই কথাটা নিখিলকে না বলে পারেনি। শ্বশুর বাড়ির কেউ কেউ বলেছে মাঠে মাঠে বেলা অবেলায় ঘুরে বেড়ায়। নির্ঘাত ভুতে  ধরেছে। কেউ বলেছে কালাজাদু করেছে। কেউ তো সরাসরি পাগলই বলে দিয়েছে। চুপ থেকেছে রত্নদীপা। ভেতরে দুঃখের একটা নীরবনদী বয়ে গেছে তিরতির। তারপরই নিখিল ট্রান্সফারের তোড়জোড় করে। শহরে চলেও আসে। সংসার আর ছেলের কথা ভেবে রত্নদীপা নিজের ভালোলাগার ঘরে সেই কবেই তালা লাগিয়ে দিয়েছে।

পড়াশুনোয়-গানে-গিটারে ছেলেটা একেবারে চৌখস। তাই তেমন কোনো কমপ্লেন আর আসে না। আসে বড় বড় সার্টিফিকেট, মেডেল। নিখিল বুকভরা গর্ব নিয়ে বিদেশে পাড়ি দেয় সুখের সংসার নিয়ে।

সুখ আর দুঃখ বুঝি সংসারে পেন্ডুলামের মতোই। স্থির থাকে না। এবার সমস্যা হয়ে গেছে চাকরিতে। খুব ভালো ভালো চাকরি কদিন পরে পরেই ছেড়ে দেয়। অচেনা কোনো কান্ট্রিসাইডে চলে যায় কিছুদিনের জন্য। আর যখন বাড়িতে থাকে টেবিলল্যাম্প জ্বালিয়ে হাতদুটো দিয়ে দেওয়ালে ছায়ার নানারকম আকৃতি তৈরি করে। ঘন্টার পর ঘন্টা। রাতের পর রাত। তাকিয়ে থাকে আপন খেয়ালে। কখনো ডাকতে গেলে জোর করে আটকে মাকেও দেখায় নদীর, মাঠের, গাছের, ফুলের,পাখির কাহিনী। রত্নদীপাও মাঝে মাঝে হারিয়ে যায় ওখানে। নিখিলের অবশ্য এই ভালোলাগাগুলো চাপাই থাকতো যদি সেদিন হঠাৎ শোভন অসুস্থ হয়ে না পড়তো। ঘন ঘন অসুস্থ হয়ে পড়ছে আজকাল। অনেক ডাক্তার দেখানো হলো কিন্তু তেমন পরিবর্তন কিছু নেই। নিখিলের মর্নিংওয়াকের বেশ কজন বন্ধুর মধ্যে একজন বাঙালিও আছেন। নিখিলের মনখারাপটা কিছুদিন ধরেই লক্ষ্য করেছেন। সেদিন জিজ্ঞেস করে পুরো ব্যাপারটা জেনে ওকে হাসপাতালে ডাকলেন। মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে রত্নদীপার মন চাইছিলো না কিন্তু নিখিল জোর করেই নিয়ে গেলো। ডাক্তারবন্ধু কয়েকদিন অনেকটা সময় একা শোভনের সাথে গল্প করলেন। পরীক্ষা নিরীক্ষার পর রিপোর্টগুলো খুব মন দিয়ে দেখলেন। তারপর নিখিল আর রত্নদীপাকে চেম্বারে দেখেই হেসে উঠলেন খুব জোরে। “হিরাইফ (Hiraeth)। এ নস্টালজিক লংগিং ফর এ প্লেস হুইচ ক্যান নেভার বি রিভিজিটেড। সোজা মানেটা হলো শোভনের কোনো রোগই নেই। একটা গ্রামবাংলাকে ও বুকে লালন করে যাচ্ছে সারাজীবন ধরে। আপনারা আপনাদের স্বপ্নে ওকে বাঁচিয়ে রাখতে চাইছেন কেন! ওর ভালোবাসায় ওকে বাঁচতে দিননা! ওর প্রিয় গ্রামটায় যেতে দিন। ওর প্রিয় জগতে। শ্যাডোগ্রাফি কেন করে জানেন? ওই গ্রাম আর নদীটাই ওর ছায়াসঙ্গী। ওদের নিয়েই ছায়ার মায়ায় খেলে যায়। নিখিল রত্নদীপার দিকে চেয়ে থাকে। আনন্দ আর দুঃখের মিশ্ররাগে উজ্জ্বল হয় শেষ বিকেলের কলাপাতা মোড়া রোদ। রাঙামাটির পথ ভেসে ওঠে চোখের ঝাপসা পর্দায় …

গোপালচন্দ্র দাস

পুরনো ঘর দেখলে আমার ভাঙতে ইচ্ছে করে

পুরনো ঘর দেখলে
আমার ভাঙতে ইচ্ছে করে।
আমার ঘর দুটো পুরনো
একটির চাল আমার টেকো মাথার মতো
অন্যটির টিন আমার সঙ্গির মাথার চুলের মতো---মেহগনি রং।
নতুন ঘর নির্মানের কথা উঠলে
উদার হয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যাই।
আমি নতুন ঘর না চাইলেও
কজন লোককে খুসি করার জন্য অন্তত 
একটা নতুন ঘর চাই।
ঘটা করে দিনশেষে নতুন কামরা পাই
নতুন রং ফকফকা আলো
আমার সঙ্গি হাসিখুসি বিজয়িনী।
দেয়ালে টাইলস ,মেঝে গ্রেনাইট
ভেতরে আগুনের প্রয়োজন বোধ করি।
আমি মোমের পুতুল হয়ে জিজ্ঞেস করি
পুরনো ভাষা আর ভালোবাসা চলবেতো!
নাকি তাও বদলাতে হবে?
ওদিক থেকে শব্দ এলো 
পরিবর্তন এলে ক্ষতি কী? 
পুরনো ঘরের চালের ফুঁটো দিয়ে চাঁদ দেখা 
একটি অভ্যাসগত দুঃখ---বদলে যাও
আমাদের জন্য
পুরনো ঘর দেখলে
আমার ভাঙতে ইচ্ছে করে।

স্বরূপা দত্ত

ডাকবাক্স

ডাকবাক্সগুলো  কেমন হাবার মত দাঁড়িয়ে থাকে এখন রাস্তার পাশে। লাল রং তেমন আর রোমাঞ্চিত করে না আমায়। অথচ কত না ঝড় তুলেছিলাম এর বুকে এক সময়। আমাদের  মধুর আলাপনে ছিল অফুরন্ত জল, উচ্ছল।  বালুর  স্তর জমে জমে  বাক্স হয়েছে  বিকল। কথা হারিয়েছে ভাষা। লাল বাক্সের ইন্তেকাল হলে ক্ষয়িষ্ণু মন নিয়ে ঘোরাঘুরি করি ইনবক্স থেকে ইনবক্সে। এখানে তো দেখি বেনীআসহকলা! তবু কেন ঝড় ওঠে না বুকে?দুর্বোধ‍্য ভাষা, ক্লান্তিকর। হাঁফ ছেড়ে বেরিয়ে আসি। বুঝেছি, বয়স হচ্ছে। অচল আমিও, হয়তো একদিন লাল বাক্সের পাশে গিয়ে হাবার মতন দাঁড়িয়ে থাকব। তখন না হয় আবার লাল রংকেই ভালোবাসব।

ড. সন্দীপক মল্লিক

বাঁচে না পারাবত-মনন 

মানবিক অস্বাভাবিক তৃষ্ণায়
বস্তু ও বিষয়ের বিন্যস্ত অনটন !
অপ্রস্তুত সব রিরংসা-বিতানও !
আয়ুষ্মান ভাবনায় ব্যর্থ কালিক দর্শন !
অদৃশ্য রমণ-আবেগ মৃত্যুর গতিপথে !
পৌরুষ অস্থির প্রেম ও বস্তুর যোগানে !
নারী ও জননী অসহায় সজ্জিত শূন্যতায় !
মানবিক পতনের আড্ডায় বাঁচে না পারাবত-মনন !

বিনয় শীল

অনন্ত প্রবাহী

নিরন্তর গতি মোর
বলছি আমি তাই,
কোনো কালে কারো তরে
কভু থামি নাই ।।

জীবন আমার জেনো
আদি-অন্ত হীন,
মোর অঙ্গে দাগ কাটে
বৎসর মাস দিন ।।

অনন্ত প্রবাহী আমি
তবু নিমেষকাল,
অতিব মহত্ত্বপূর্ণ
মহিমা বিশাল ।।

জীবন যাপিছো যারা
এই ধরাতলে,
অবজ্ঞা করো না মোর
প্রতি অনুপলে ।।

সাগর নাথ

চাঁদ হলে তুমি

তুমিজান সুখ স্বর্গ দেখেছি আমি,
দেখেছি যেন চাঁদের আলো।
তোমাকে যে দেখেছি ,চাঁদ নও তুমি,
তবু যেন দ্বিগুণ কেন তুমার ওই আলো।।
তুমি জাননা রাএি অবশেষে চাঁদ ডুবে যায়,
দেখাদেয় অনিশ্চয়তা।
তুমি রুপি চাঁদ ডুবেনা আর,
জাগেনা হৃদয়ে আর ব্যাথা।।

তুমি যেন আলো হলে আমার জানকি তুমি,
পরেনা চাঁদের কথা আর মনে ।
চাঁদ রুপি আলো চাইনা আমি,
তুমি রুপি আলো চাইছি হৃদয়ের বণে।।
জানকি তুমি চাঁদকে বাসিনা ভালো,
ধরতে পারিনা থাকে অনেক দূর।
তুমিই যে চাঁদ আমার ,সুখ দিয়ে মুরে দেব ,ওচাঁদ তুমি যে মোর।।
একদিন নেমে আসে চাঁদের বুকে কালো,
ঘুট ঘুটে যেন অন্ধ।
তুমি রুপি চাঁদ ডুবেনা আর,
হয়যে আলো হয়না বন্ধ।।

সুজিত বালা

অনুভূতিগুলো আজ অসাড়

অনুভূতির ছোঁয়াতে কত ছবি হৃদয় আঁকে।
নীল আকাশের বুকে
মেঘ আর রামধনু কত ছবি ।

সমুদ্রের জলরাশি ঢেউয়ের ঝুঁটিতে উচু নিচু শ্বেত পাহাড় গড়ে।
অনুভূতির চেতনায় অপরের দুঃখে হৃদয় কাঁদে।
আপদে বিপদে ছুটে যায় দুঃখীর পাশে।

 প্রতিবাদে কলোপাতাকা মোমবাতি মিছিল হয় শহর জুড়ে।
 আত্মসুখ স্বার্থসিদ্ধির কালো মেঘ জমেছে আকাশে ।
অন্যের মেয়ে নিজের মেয়ে  মনে হয় না অন্তরে।
নাবালিকার অপরিণত শরীর
দুমড়ে মুচড়ে ছিঁড়ে খায়
বনের রাজা সিংহ।
অসহায় পিতা মাতার দুঃখে কাঁদে না অন্তর।
অনুভূতিহীন হৃদয়গুলো 
ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে অনুভূতিগুলো আজ অসাড়।

গোপাল চক্রবর্তী

ব্যাধি 

আজ পৃথিবীর কোথাও মঙ্গল উৎসব নিশ্চয়!
কোথাও আজ বাজে মন্থিত করতাল।
ছায়া, একটু বসো, এখানে
পুরুষের রোগশয্যার পাশে।
ঔষধ হও তুমি।
জানি সময়ের মতো হারানো ছাড়া কারোর হাতেই কিছু নেই।
এই মুহূর্ত লগ্ন এই নিথর মৃত বিকেল
নিরাময় শুধু তুমি
ক্ষণিক বসো
"বেঁচে আছি আমি"
--সেই উদ্ভূত বিশ্বাসে
আলেখ্যের অজস্র অনুমিত সংকেত ছুঁড়ে দাও
আমার ভবিতব্য মৃত্যুর দিকে।

দীপান্বিতা ভট্টাচার্য

বিবর্তন

সৃজনে সবার আনাগোনা,
দিচ্ছে সবাই ওই পথেই হানা।
আমি না হয় মেতে উঠলাম অনাসৃষ্টিতে!
তোমার চোখের অপলক দৃষ্টিতে।
চিত্রকর তার তুলি দিয়ে যেমন প্রাণপ্রতিষ্ঠা করে,
রং মাখিয়ে প্রাণবন্ত করে তোলে তার কল্পনা।
তোমার সেই মায়াবী দৃষ্টি তে আমি ও বারবার
অজান্তেই নিজেকে হারাই, নিজেকে সাজিয়ে তুলি মিথ্যা মায়ায়, মিথ্যা আভূষণে...
সেজেছি কত নব পরিধানে।
সেই দৃষ্টির যে হয় না কোন তুলনা।
বড্ড অগোছালো, নিষ্পাপ ও আনমনা। খামখেয়ালী ও চঞ্চলতায় মত্ত,
কখনও অমৃত আবার কখনও বিষাক্ত।
মুখ কে ত্যাগ করে মুখোশ কে যে করেছি নিজ,
অনাসৃষ্টিতে'ই রূপণ করেছি ভালোবাসার বীজ!
দিবারাত্রির সন্ধিক্ষণে পথ হারাই বারবার....
গোপন তারার আলোয় তোমার করুণ দৃষ্টিতে
সুন্দরতা খুঁজে ফিরি অনির্বার।।

পঙ্কজ কান্তি মালাকার

মাঝেমধ্যে এরকম কারেন্ট যাওয়া ভালো

মাঝেমধ্যে এরকম কারেন্ট যাওয়া ভালো-
ইনভার্টার জিরো হয়
পাওয়ার বেঙ্ক জিরো হয়
মোবাইল চার্জ জিরো হয়
সবাই বেরিয়ে আসে মোবাইলের দুনিয়া থেকে
আগের মতো সামাজিক জীবনে,
বন্ধুদল একসাথে স্নিগ্ধ জোৎস্নায় ঘুরতে বেরোয়
পাড়ার কাকুরা আবার রকে ফিরে
কাকিমারা তালপাখা হাতে উঠোনে জড়ো হয়ে বসে,
পাড়ার এন্টারপ্রেনার দাদাটাও ডেকে খবরাখবর নেয়
-এমন মধুর সামাজিকতা যদি ফিরে আসে
তবে মাঝেমধ্যে এরকম কারেন্ট যাওয়া ভালো।

মাঝেমধ্যে এরকম কারেন্ট যাওয়া ভালো-
"জীবন মানে জি-বাংলা" মিথ্যেটা চুপ হয়
বৌমা শাশুড়ির সাথে দুটো মনের কথা মন খুলে বলে
ননদ বৌদির সাথে রঙ্গরসের গফ করে
ঠাকুমা নাতি নাতনিকে কিচ্ছা শুনায়
কিংবা বাল্যকালে হারিকেনের আলোয় পড়ার অভিজ্ঞতা,
নিউজ পাগল বুড়ো যদি গলা খুলে ধরে
ও মাঝি বাইয়া যাও রে.......
-এমন করে যদি ফিরে আসে জীবনের প্রাণ
তবে মাঝেমধ্যে এরকম কারেন্ট যাওয়া ভালো।

শব্দ শ্রমিক

শুকনো পাতা

অগ্নি শিখার দাবানলে,
শোষক জ্বলুক দলে দলে।
শোষক মারো শ্লোগান তুলে,
শুকনো পাতায় আগুন জ্বেলে।
প্রেম শুকিয়ে শুকনো পাতা,
বঞ্চনা বারুদ শলাই কাঠি।
দুইয়ের যোগে তপ্ত আগুন,
ছড়িয়ে পড়ুক কোটি কোটি।
জানলা গলে দরজা খুলে,
আসুক সবাই সেই মিছিলে।
রক্ত শোষক আঘাত দিলে,
আঘাত হানো সবাই মিলে।
বৃহৎ শক্তি সর্বহারা,
মুক্তি নেই লড়াই ছাড়া।
বিণ. হোক শোষক কারা?
শুকনো পাতার আগুন দ্বারা।
অগ্নি শিখার দাবানলে,
শোষক জ্বলুক দলে দলে।
শোষক মারো শ্লোগান তুলে,
শুকনো পাতায় আগুন জ্বেলে।

রমা চন্দ্র

নুপুর-কান্না

রাতের দুঃখ ভেঙেই...
যাকে জোটাতে হয় অন্ন-
আপন দেহটাকে ক'রে পণ্য,
তার মলিন মুখ...
রক্তে সিফিলিস এইডস ক্ষয় রোগ-
চাপা শোক,
হৃদয়ে নিদারুণ ক্ষোভ নিয়েই-
মেটাতে হয় আদিম তৃষ্ণা!
বুকে নিয়ে একরাশ বিতৃষ্ণা,
বিবর্তনের অগ্রগতিতে...
আধুনিক সভ্যতার গায়ে 
এ এক পুরাতন ক্ষত,
যা থেকে রক্তক্ষরণ হয় অবিরত...
এ যেন দীপের নিচের ঘন অন্ধকার!
কিশোরী নর্তকীর নুপুরের হাহাকার...
বিশ্ব চরাচরে আর কোন কিছু নয় তো গোপন-
মানবতাহীন এ কেমন মানববন্ধন!
অস্ফুট যন্ত্রনায় মাথা কুঁড়ে মরে
দিন প্রতিদিন...
কত শত অসহায় 'মা-বোন'।

গীতশ্রী ভট্টাচার্য্য

হাইওয়ে

খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যায় ললিতার। দুজন লোক ঘরে। শ্বাশুড়ি আর বউ।  যাদব শহরে কাজ করে। ওদের ঘরে টিভি নেই। এমনি এমনি বিজলী পুড়িয়ে কী লাভ! তাই জলদি খাওয়া দাওয়া করে দুজনেই নিজের নিজের বিছানায় শুয়ে থাকে। ভোরে উঠে পড়ে তাই।

একটু আশেপাশে হেঁটে আসে ঘুম থেকে উঠে।  বয়স হয়েছে। তাও একেবারে মাজা পড়ে যায়নি এখনও। হাঁটতে হাঁটতে পথের দুপাশে যা শাক টাক পাওয়া যায়, সেটা তুলে নিয়ে আসে চাদরের ভেতরে ঢুকিয়ে। 

দুদিন ধরে আবহাওয়া ভাল নেই। বৃষ্টি পড়ছে থেকে থেকে। তাও , বেরিয়েছে বুড়ি। গায়ের চাদর টেনে নেয় পিঠের উপর দিয়ে। বিহু এসেই পড়ল। এবারে তাঁতে বসতে পারেনি বউ পখিলি। বাচ্চা হবে ওর।  পেট নিয়ে এখন বসা কষ্ট ওর ।  ললিতাই  বারণ করেছে।

অন্য বছর বিহুর আগে কিছু গামোচা, চাদর তৈরি করে পখিলী। ওর হাতের কাজ ভাল। পাড়ার বউ ঝি রা বিহুবান দেওয়ার জন্য ওর থেকেই গমোচা , রুমাল নিয়ে যায়। 

হাতে কিছু টাকা আসে এই করে। এবার আর হবেনা। না হোক, এতদিনে কৃষ্ণ গোঁসাই মুখ তুলে চেয়েছেন। আইতা হবে ললিতা। 

বউয়ের জন্য হাঁটতে বেরোলে রাস্তার পাশের গাছ থেকে বগরি, জলপাই যা যখন পায় কুড়িয়ে নিয়ে আসে। এই অবস্থায় কত কিছু খেতে সাধ যায়, সে কী আর বোঝেনা ললিতা। কিন্তু , কোথা থেকে জোগাড় করবে। না একটু ফল, না ডিম, না দুধ কিছুই দিতে পারেনা। তবু, বউয়ের মুখের হাসি দেখলে মন শান্ত হয়ে পড়ে। 

যাদব কে কষ্ট করেই বড় করেছে সে। যাদবের বাবা  যখন মারা যায়, সে তখন মেট্রিক দিয়েছে। পাস ও করল। কিন্তু, আর পড়াবার টাকা কোথায়! নিজেই ছাত্র পড়িয়ে হায়ার সেকেন্ডারি দিল। পাস করতে পারেনি। 

ললিতা হাঁস মুরগি পুষে, ওদের ডিম বিক্রি করে সংসার চালিয়েছে। মাঠে ধান রুয়ার দিনে অন্যের খেতে ধান রুয়েছে, কারো বাড়িতে ধান সেদ্ধ, চাল ভাজার কাজ থাকলেও করেছে তখন। এভাবেই চলে যাচ্ছিল তখন মা ছেলের দিন। 

বাড়িটা ছিল বলে রক্ষে।

গ্রামের ছেলে নবীন শহরে কাজ করে অনেকদিন ধরে। সে ই ললিতা কে বুঝিয়ে যাদব কে নিয়ে শহরে নিয়ে যায়। কাজে ঢুকিয়ে দেয়।

দেখেশুনে বিয়ে দেয় পখিলির সাথে। বাপ মা নেই ওর। মামাবাড়ি থেকে বড় হয়েছে। এখানে এসে ললিতার  সাথে খুব মিশে গেছে। বউ কে চোখে হারায় শ্বাশুড়িও। 

এতদিন বাচ্চা কাচ্চা আসেনি বলে একটু মন মেরে থাকত বউ। ললিতা সবসময় বুঝিয়েছে , ধৈর্য ধরতে বলেছে। 

যাক, এবারে কনমানি আসবে। ললিতার সময় পেরিয়ে যাবে এখন তর তর করে। 

পখিলি কদিন ধরেই কাঁচা আম খেতে চাইছে। এদিকের  কোনো গাছে এখনো আম সেরকম আসেনি। হাইওয়ের দিকে রমেশ মাস্টারের বাড়িতে বেশ আম ধরেছে। গাছটা রাস্তার দিকেই ঝুঁকে থাকে। 

গত রাতে বেশ ঝড় বৃষ্টি হয়ে গেল।  তাই সকাল সকাল উঠেই বেরিয়েছে যদি দুটো আম পায়। বউটা তাহলে দুপুরে ভর্তা বানিয়ে খেতে পারবে।

রমেশ মাস্টারের বাড়ির সামনে গিয়ে বেশ কটা কাঁচা আম পড়ে থাকতে দেখে মন খুশ হয়ে যায় বুড়ির। মেখলার কোঁচরে ভরে নেয় আমগুলো। 

আবার ঝিরঝির করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ললিতা জোরে পা চালায়। একা আছে ঘরে বউ। আজকাল ললিতার চোখের দৃষ্টিও ঝাপসা হয়ে আসছে। 

পেছন থেকে হঠাৎ  লরি এসে সজোরে ধাক্কা মারে ললিতাকে। হাইওয়ে দিয়ে স্পিডে গাড়ি যায় সারাদিন , সারারাত। 

বাড়ির চোতালে ললিতাকে শুইয়ে  রাখা আছে। যাদব পৌঁছে গেছে বাড়ি। পখিলি আছড়ে আছড়ে কাঁদছে।  

সূর্যের শেষ আলো এসে তখন ললিতার কপালে পড়েছে। ওর শরীর স্থির। 

মেখলার ভাঁজ থেকে কটা আম গড়িয়ে পড়ে থাকে ভিজে উঠোনে।

অভিষেক অধিকারী

প্রতিবাদ

পাথরের বুকে লিখে রাখা এক ফালি সভ‍্যতা
গল্প বলে চলে যান্ত্রিক পশুদের দ্বারা আক্রান্ত মনুষ‍্যবোধের ।
শোষিত অরণ‍্যের কথকতা,
কংক্রিটের পদলেহনকারী কর্পোরেটের আত্মকথা,
সব কিছুই লেখা থাকে পাথরের গায়ে।
তবুও আজ পশুরাই গল্প লেখে,
লেখে তাদের যুদ্ধজয়ের কাহিনী।
পরাজিতের শরীর থেকে খোবলানো মাংস নিয়ে অধিকার স্থাপনের লড়াই এর সরেশ গল্প বলে চলে তারা।
অজস্র মৃতদেহের উপর দিয়ে তাদের ট‍্যাঙ্কার চালানোর গল্প উপভোগ করে নিরীহ সাদা ঘুঁটিগুলো।
হ‍্যাঁ ওরাই গল্প লেখে, 
পশুদের গল্পগুলোকে হয়তো কোন জ‍্যামিতিক নক্সায় ফেলা যায় না।
তবে গণিতের সরল নিয়ম মেনে ফলন্ত গাছগুলোকে ওরা কেটে ফেলে।
তারপর সেখানে নগর বসায়,
নজরদারী করে।
অরণ‍্য আবারও অরণ‍্যই হয়ে ওঠে।
আদিমতম পঞ্জিকার হিসাবে লেখা থাকে পশুকৃতিত্বের কাহিনী।
ছাপানো মানচিত্রগুলোর রঙ আবার এক হয়ে যায়।
আবারও একটা লোক দেখানো প্রতিবাদ হয়।
পশুরা চলতে থাকে।
শহরের প্রতিটি বিদ‍্যালয়ে বই হাতে বসে থাকে শিশু।
ওরাও বই পড়ে,
যার বিষয় হয় পশুদের রূপকথা, তাদের আত্মজাগরণের কাহিনী।
শিক্ষকরা আনন্দ সহযোগে পড়িয়ে যায় বইটা।

ছন্দা দাম

হিসেবে গরমিল

বারবার তিমেরে কোথাও হারিয়ে যাই
অজানা টানেলের বুক চিরে,
রঙ পেন্সিল আঁকা খাতাটার ছবি
ছুঁয়ে দিলেই রঙ ঝরে পড়ে।

ঘুরপথ জীবনের অলিতে গলিতে
ডাক দেয় স্মৃতি ফেরিওয়ালা,
আমার সহজ সরল জীবনে দেখি
বারবার চলে সাপলুডু খেলা।।

কাপড়ে পেঁচানো খেলার পুতুল
সুতো বাঁধা হাত,পা,হৃদয়, শরীর
ছায়ানট যেন সকলে নিজ চরিত্রে
হ্যাচকা টান পড়লে হতে হবে হাজির।

ভালবাসার ছত্রাক বাসা বেঁধেছিল দেয়ালে,
দিন প্রতিদিন সবুজাভা ছড়ায়,
পিছুটান....  হিসেবের খাতায় গড়মিল,
স্বপ্নের ঘুড়িটা ভোকাট্টা হয়ে পড়ে যায়।।

কল্যানী ভট্টাচার্য্য

পয়লা বৈশাখ

আসছে দেখো পয়লা বৈশাখ
পাখির কলতানে, 
চারিদিকে আজ দামামা বাজে
নববর্ষের প্রাক্কালে। 
মাঠ ভরা ধান আর
সোনালী ফসল মাঠে, 
নতুন ফসল নিয়ে দেখো
কৃষক মাতে আনন্দে। 
খোকাখুকী উঠছে মেতে
নতুন পোশাক পরে, 
পুরানো যত সুখ দুঃখ
মুছে যাবে নববর্ষের সাজে। 
বিদায় দিয়ে সব বেদনা
জাগবে খুশীর ঢেউ, 
আনন্দের প্লাবন যাবে বয়ে
প্রতি ঘরে ঘরে। 
উঠবে বেজে শঙ্খধ্বনি
আগমনীর কালে, 
সুখ দুঃখ সব মুছে আজ
এসেছে পয়লা বৈশাখ।।

বর্ণালী দেবনাথ

তোমার অস্তিত্ব

নব জন্মে রবি উদিয়মান হয়ে ফোটে,
কালো তরঙ্গের নিশির কাটে,
স্পর্শ করো হয়ে তুমি প্রভাতের শিশির ৷

রোদ ভরা ক্লান্ত দুপুর
তার শরীর এলিয়ে দেয় 
বাষ্পীভূত জলের ছায়ায়,
তুমি তখনও বিরাজমান আমার মায়ায়।

আদিত্য এখন রক্ত বর্ণ ফেরে অচিন আবাসে,
পাখিরা ছুটে নিজ নীরের লক্ষ্যে,
তুমি আবার গ্রাস করো আমারে নিরাশার পক্ষে।

চন্দ্র যখন শয্যাশায়ী
মরণ দশায় পরিযায়ী অমাবস্যার রাতে,
তারারা যখন পথভ্রষ্ট কিরণে প্রভাতে,
তখনও আমি নিশ্চুপ
তোমার ভাবনা বিরাজমান আমাতে।

কনিকা রায়

স্বপ্ন ডানা

রমেন আলী ইস্কুলে যায়
মন টি বড়োই ভার,
এবার ঈদে নতুন পোশাক        
হয়নি যে ভাই তার।

রমেনের আজ মনের মধ্যে      
মেঘে আকাশ কালো,
রাজপুত্র হতাম যদি 
কত হতো ভালো।

এমন সময় হেড মাস্টার
বলেন ভীষণ রেগে,
এই যে রমেন ভূগোলের
মানচিত্র দেখা দেখি একে।

রমেন এবার হঠাৎ করে
আকাশ থেকে পড়ে,
ও তো ছিল এতক্ষন‌ 
ঐ শপিং মলের ঘরে।

এমন সময় মাস্টারমশাই      
কোত্থেকে এলো চলে,
এবার রমেন পড়লো যে ভাই
ভীষণ গ্যারাকলে।

পাপিয়া দাস

একা

একা থাকাটা খুবই কঠিন।
একা কথাটা শরীরে ঘা এর মতো আঘাত  করে।
একা শব্দটি লিখতে খুবই  সহজ
কিন্তু  আক্ষরিক অর্থে বিশাল অর্থ বয়ে চলে নদীধারার মতো।

সমস্ত  কিছুর ত‍্যাগের ফলশ্রুতি এই একা।
পৃথিবীর  সুখ উল্লাস বাদ দিলেই আসে একা।
জন্মলগ্নে আসা আর শশ্মানের যাত্রাও  একা।

মানুষ অহংকারে জড়িয়ে থাকে
 লোভ লালসার আষ্টেপিষ্টে পরে নানা বিপাকে।
কত খারাপ  কাজে লিপ্ত হয়ে যায়।
একা আসা আর যাওয়ার কথা,
মানুষ ভুলে যায়।

সুরভী দেবনাথ

প্রকৃতির প্রেম

চিনতে পারছো আমায়?
মনে পড়ে সেই দিনগুলো? 
বছর খানিক আগে আমিই যে ছিলাম তোমার ওই মেঘাচ্ছন্ন গহীন কোঠর, 
যেখানে তোমার অবাক চোখ দুটো ছুঁড়ে দিতো কত কৌতূহল!
আমার গানের সুরে ভেসে যেতে তুমি তেপান্তরে !
সহুরে জঞ্জাল থেকে পালিয়ে আসতে আমার ভেজা এলোকেশে ভিজতে!
মুক্ত বিহঙ্গের মতো উড়ে বেড়াতে আমার আদরের চাদর জড়িয়ে! 
কতো কতো বার আমায় জড়িয়ে ধরে বলতে ভালোবাসো আমায়!
তবে আজ,
আজ যে তোমার প্রেমিকা নিঃস্ব!
তার গায়ে অজস্র আঁচড় পড়ছে অবিরাম,
তার কন্ঠ আজ রুদ্ধ,
তার গা বেয়ে পড়ছে শুধু রক্তিম ঝর্না!
প্রেমের শীতলতা ফুরিয়ে আজ আমি আবেগহীন মৃত্তিকা মাত্র!
তবুও নিশ্চুপ, অভিমানহিন ঠায় দাঁড়িয়ে!
কেননা প্রেমিকার প্রেম পরীক্ষা তো নিজের সর্বস্ব উজাড় করেই !
তবে তুমি কথা দাও,
কাল যখন আমি মিলিয়ে যাবো ধরণী তে,
আমার বুক চিরে হবে তোমার নিত্য আনাগোনা,
তোমার শরীরে জড়াবে আমার নতুন রূপের সমীরণ,
তোমার স্মৃতি কঠোরেই আমার অস্তিত্ব খুঁজে নেবে আমরণ!!

স্নিগ্ধা ভট্টাচার্য

প্রেম আসে চুপিচুপি

চুপিচুপি তুমি   বলেছো কথা কানে কানে।
নীল সাগরের বুকে ঝিনুক কুঁড়তে ,  গুনছি ঢেউ ।
নোনা জলে ভিজে দেখেছি তোমার প্রেমের গভীরতা ।

পাহাড় আমায়   দেয়  গম্ভীর প্রেমের নীরবতা। 
উদাস নয়নে তাকিয়ে তোমা পানে ।
রিমঝিম রিমঝিম ঝর্না জল।
নাম না  জানা ফুলের সাথে  ছুটে প্রজাপতি মন ।

গোপন হৃদয়ে রাখি  যতনে পাপড়ি সুরভী মাখা।

চুপিচুপি তুমি বলেছো কথা ,, গোপনে নিয়েছো আমার সকল ভালবাসা।
নদী তটে আকাঁ বাঁকা ,পথে কুড়িয়েছি নুড়ি । 

সুখ নদী হয়ে ছুটে চলি,   রেখে আসি জলে যা   ছিল অভিমান।
সবুজ ঘাসে ঘাসে পা ফেলে নমি ধরিত্রীরে ।    
সব ভুলে আজ দুহাত বাড়িয়ে নেই  অমৃতের স্বাদ।

অভিজিৎ চক্রবর্তী

ষোড়শীর প্রেম

বছরের শেষ সময় ফাগুন মাসের ভরা যৌবনে তোলপাড় প্রকৃতি মা। তাঁরই এক ষোড়শী কন্যা, নাম তাঁর সুলক্ষনা। তাঁর উড়ো  উড়ো মন যৌবনের মাতাল স্রোতে প্রেমের নৌকা বায়। কৃষ্ণপ্রেমে রাধা যেমন তীর্থের কাকের মতো প্রতীক্ষার প্রহর গুনে ঠিক তেমনি সুস্মিতাও তাঁর প্রেমিকের জন্য আকুল হয়ে ছটফট করে। আধুনিক প্রযুক্তি বিজ্ঞান অনেক আগে থেকে প্রভূত উন্নতি লাভ করলেও তাঁদের দুই পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে সেই আনন্দের ভাগিদার হওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। মোবাইলে কথা হলেও তাঁদের মধ্যে দেখা হয় না কারণ দামী স্মার্ট ফোন কিনতে গেলে অনেক টাকার প্রয়োজন কিন্তু অবুঝ মন তো

তা বুঝে না। সত্যিকারের প্রেম টাকার চেয়েও অনেক দামী। তারা বছরের মাঝে ঋতুভেদে চুপি চুপি লুকিয়ে দেখা করতো নদীর ধারে, আম বাগানে, পুকুর পাড়ে আরও নানা স্থানে। কত শত সহস্র স্বপ্ন তাদের ঘিরে বাসা বেঁধে ছিল। ধীরে ধীরে প্রেমের তপ্ত দহনে তাদের সম্পর্কের গাঢ়ত্ব বৃদ্ধি পায়, বৃদ্ধি পায় একের প্রতি অপরের  দূর্বল মনোবৃত্তি,  কামের দহনে তাদের শরীর পুড়ে ছাঁই হয়ে যায়। তারা নেপথ্যের আড়ালে মিলনের আনন্দে বিভোর হয়ে উঠে কিন্ত তার ফলাফল সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণ অবগত নয়। তাদের এই অবাঞ্চিত মিলন ভবিষ্যতে তাদের কাল হয়ে দাঁড়াবে এটা তারা কখনো ভাবেনি। ভরা যৌবন সামাল দেওয়া সহজ সাধ্য ব্যাপার নয়,  তারা কামের দহনে পূর্ণ নিমজ্জিত। তাদের অবাঞ্চিত ভালোবাসা হঠাৎ একদিন  সমাজের সামনে এসে পড়লো,  গ্রামের সকলে হতবাক হলেও তারা একটুও বিচলিত হয়নি কারণ তারা জানত একদিন না একদিন তাদের এমন অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে। গ্রামের বয়ঃজ্যষ্ঠদের পরামর্শে উভয় পরিবারের সম্মতিক্রমে বিয়ের দিনক্ষন ঠিক হয় কিছু দিনের মধ্যে সকল বিধিবিধান মেনে তাদের(সুস্মিতা ও শিমূলের)বিয়ে সম্পূর্ণ হয়। বিয়ের প্রথম এক বছর তাদের মধ্যে প্রেম ভালোবাসা এত গাঢ় ছিলো যে দুইজনকে কখনো একা দেখা যায়নি,  শিমূল যেখানেই যেত সাথে করে সুস্মিতাকে নিয়ে যেত। কিন্তু এক বছর পার হতেই তাদের আর্থিক অবস্থা একেবারে ভেঙ্গে পড়ে, ফলে তাদের টাকার চেয়েও দামী ভালোবাসা আজ টাকার অভাবে ফাটল ধরে।  কথায় বলে -- "পকেটে না থাকিলে টাকা দুনিয়াটা ফাঁকা,  অভাব যখন দরজায় এসে দাঁড়ায় ভালোবাসা তখন জানালা দিয়ে পালায়। " শিমূল অভাবের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে ভুল পথে পা বাড়ায় নেশার কালো ঘুটঘুটে অন্ধকার তাকে গ্রাস করে। সে দিনের পর দিন মাতাল হয়ে বাড়ী ফিরে আর তার মায়ের কথায় তাল মিলিয়ে সুস্মিতার উপর নানা অত্যাচার অবিচার শুরু করে দেয়। সুস্মিতাকে তার বাপের বাড়ী থেকে টাকা পয়সা নিয়ে আসার জন্য উৎপীড়ন শুরু করে। পর্যায়ক্রমে কিছু দিন পর পর এরূপ শোষণ চলতেই থাকে। সুস্মিতা সম্পূর্ণ নিরুপায় হয়ে নিষ্ঠুর পাষান মূর্তি কাছে প্রার্থনা করে। কিছু দিন পর সুস্মিতার ঘর আলো করে এক কন্যা সন্তান জম্ম লাভ করে কিন্তু এই ফুলের মতো নিষ্পাপ মেয়েটি যেন কাল হয়ে এসেছে তাদের পরিবারে। পরিবারের সকলে মেয়েটিকে নিয়ে শোরগোল শুরু করে দেয়, কানাকানি করে বলতে শুনা যায়, কে এই মেয়ের ভরণপোষণ গ্রহণ করবে, আবার অনেকে মেয়েটিকে অলক্ষী, অপয়া বলে নামকরণ করে। মনে হয় যেন মেয়ে জন্মানোর সাথে সাথেই তাদের এক বিশাল ক্ষতি হয়ে গেছে। তখন থেকে সুস্মিতার উপর অত্যাচারটা দ্বিগুণ হয়ে গেলো। এই ছোট্ট ফুলের মতো নিষ্পাপ মেয়েটি কি পাপ করেছিল কে জানে, যার পরিণতিতে সে পরিবার পরিজন সকলে থাকা সত্ত্বেও অনাথ শিশুর মতো একা নিঃসঙ্গ সঙ্গীহীন বন্ধুহীন। কিছুবছর এই ভাবে কেটে গেল,  মেয়েটি ধীরে ধীরে বড়ো হয়ে উঠেছে ফলে তার মনে নতুন নতুন চাহিদার উৎপত্তি হলেও তা সে গলা টিপে হত্যা করে। শিমূল প্রতিদিন মাতাল হয়ে বাড়ী ফিরে আসে, স্ত্রী ও মেয়ের চাহিদা পূরণ করতে না পেরে তাদের উপর অন্যায় অবিচার অত্যাচার শুরু করে। একদিন তাদের স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া চরম আকার ধারণ করে। সে (শিমূল) ও তার মা ওইদিন সুস্মিতাকে প্রাণে মারার হুমকি দেয়,  কিন্তু তার শ্বাশুড়ীর কথায় এত রাগ না করলেও কিন্তু জীবনে যাকে সবচেয়ে বেশী ভালোবেসে ছিল, যাকে মন প্রাণ দেহ সবকিছু সঁপে দিয়েছিল, সে তাকে মারার হুমকি দেওয়ায় সে সেই সময়ে সেই স্থানেই বেঁচে থেকেও মৃত্যুবরণ করে।  তার আর বেঁচে থাকার কোনো ইচ্ছেই রইলো না মনে। সে পাষান পাথরে পরিণত হয়। তার স্ত্রী ( সুস্মিতা) মেয়েকে সাথে নিয়ে বাড়ী থেকে বের হয়ে যায় নিরুদ্দেশে।  সে গ্রামের অদূরে এক গভীর কূপে তার মেয়ে সহ ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে।

সুমা গোস্বামী

পিচ রাস্তার রোজনামচা

একটা পিচ রাস্তা এখন নীরব হয়ে গেছে ।

একটু আগেও কিছু চেনা চেনা মুখের
হাসি ঠাট্টায় সঙ্গীত মুখর ছিল ।

দুরন্ত পথিকের মতোই
ঋজু ভঙ্গিতে প্রাণবন্ত হয়েছিল বেশ কিছু সময় ।

স্বপ্নালু দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছিল
কৈশোর ও যৌবনের বন্দরে ভেসে আসা 
বেশকিছু চেনা-অচেনা মানুষের পদচারণা ।

এখন সেই পিচ রাস্তার দুধারে
কিছু নীরব-ক্লান্ত গাড়ীর বিশ্রামাগার ।

নিঝুম রাস্তা এগিয়ে চলেছে রাতের অপেক্ষায় ।

রাতের পরেই তো রঙ খেলবে নতুন ভোর ।

এভাবেই আবর্তিত হয়েই চলেছে
পিচ রাস্তার বিরামহীন রোজনামচা ,
ঠিক যেভাবে আবর্তিত হয়
মধ্যবিত্তের একঘেয়ে শ্রান্ত-ক্লান্ত জীবন ।

অলকা গোস্বামী

কিছু চাওয়া

একাকীত্ব তোমায়
ভালো লাগা শুরু হয়ে গেছে কবেই।
শুকনো পাতা ঝরে গেছে উদাসী হাওয়ায়।
সময়ের রেলিং ধরে উঠে আসি,
মনের মধ্যেই খুলে বসি কথার ঝাঁপি,
শব্দের কারুকাজ মুখরিত আকাশ বাতাস।

 স্মৃতির সরণী ধরে হেঁটে যাই
আবারো...
কিছু ব্যাথা,নিরবতা, আকুল করে,

ভর সন্ধ্যে চাঁদ দেখা যায় গলি পথে,
শুকনো গাছের ডালে 
মিট মিট তারা জ্বলে।
 
সরল সিধা জীবন ই হোক
নূতন সৃষ্টির প্রতিটি শিকড়ে।

তপন সরকার

লজ্জাবতী নারী

আজকের নারীরা আর নেই
লুকানো পর্দার অন্তরালে,
সমাজের সব কাজেই পারদর্শী
যুগের পরিবর্তনের তালে।
সত্যিই কি লজ্জা নারীর ভূষণ
এই সত্যের উক্তি,
নারী সর্বক্ষেত্রে বিরাজমান হলেও
লজ্জা তার শক্তি।
বাচ্চা সামলানো পতির সেবা
একা হাতে করে,
রান্না করা বাসন মাজা 
সারা দিনের তরে।
মাঝে মধ্যে সময় পেলে
টিভি সিরিয়াল দেখা,
আরও যদি পায় সময়
মোবাইলে রান্না শেখা।
সারাদিন ঘরকে সামাল দিয়ে
কখনো বাইরে গেলে,
পরিবারের জন্য ক্রয় করে
নতুন কিছু পেলে।
পরিবার সমাজকে রক্ষা করে
এগিয়ে চলে নারী,
সব কাজে পারদর্শী নারী
বিদেশে দেয় পাড়ি।
সমাজকে রক্ষা করতে হোলে 
নারী সুরক্ষায় দৃষ্টি,
সুন্দর এই পৃথিবী গড়তে 
নারী করে সৃষ্টি।

রূপালী মান্না

ত্রিপুরা যে আমারও

দাপুটে এক কালবৈশাখী
ছিন্ন  করেছে স্বপ্ন , 
তবুও তো হৃদয় থেকে
করতে পারেনি ভিন্ন ।
ত্রিপুরার উদয়পুরে
ক্ষতির পরিমান উপচে পরে ,
লেখক পাঠক প্রকাশকরা 
কান্না চেপে গুমরে মরে ।
কতশত পোস্ট দেখতাম 
বইমেলা নিয়ে, 
পুলকিত হত মন
কবিতাপাঠ দেখে ।
দূরে আমি থাকি বলে
ভেবো নাকো পর, 
ত্রিপুরা যে আমারও গর্ব
আমারও অহংকার ।
সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা
নেই আমার জানা ,
রাত পেরিয়ে সূর্য উঠুক 
এটুকুই প্রার্থনা ।

বিথিকা দাস

মিথ্যে অহংকার

তোমার জন্য থাকুক প্রিয়,
রত্নখচিত, লক্ষ টাকার ঘর। 
আমার আছে মিঠে রোদে 
ভেজা মুক্ত নীলাম্বর। 
তোমার থাকুক নরম বিছানা, 
আর গন্ধ মেশানো স্নান। 
আমার আছে শান্তির ঘুম,
আর সোঁদা মাটির ঘ্রান। 
তোমার থাকুক 'সুখ আর সুখ'
রাশিরাশি রঙ আলো। 
আমার মাটির ঘরে মাটির পিদিম, 
আনন্দে টলোমলো। 
পঞ্চভূত হতে সৃষ্ট আমি, 
হব পঞ্চভূতেই লীণ।
ভ্রমে করে মরি, বৃথা জারিজুরি, 
ক্রমে নাড়ী হয়ে যায় ক্ষীণ। 
তবু মিছে অহম্, যায়না এখনো, 
ভাবি - করছি সবই আমি। 
কেন যে বুঝিনি, শুধু নিমিত্ত আমি, 
সবই করায় অন্তর্যামী। 
                                

সুশান্ত কবিরাজ

রক্তটা মুছে নিও তুমি

রক্তটা মুছে নিও তুমি
উরু দিয়ে গড়িয়ে পরা রক্ত  ; 
বোলোনা বিচার চাই 
কেনো ? তোমার ব্যাগে ন্যাপকিন নাই  ?

তবে তো সম অপরাধী তুমি  
না হয় দোষ হয়েইছে চারি আনি।
তাই বলে শাসকের 'পরে চক্রান্ত করে এতো কানাকানি  ? 
সব কিছুরই তো সমাধান আছে 
আগে টেবিলে বসে আলোচোনা হোক।
পরপর কত জন লোক করেছিলো আনাগোনা।
ইঞ্চিকাঠে ধর্ষনের পরিমাপটা হোক তো আগে  জানা ।
বাজে বকে কী হবে ? একথা তো জানা ; 
মাপ মতো টাকা পাবে বেঁচে গেলে চাকরি নেবে
খুব বেশি মারা গেলে
বাড়ির লোকের চাকরি মেলে ,
জীবন ভোরে টানা।
তাই , রক্তটা মুছে নিও তুমি
কলঙ্কিত শাসকে
কলঙ্কিত না হয় যেন এ বঙ্গভূমি ।

হর্ষময় মণ্ডল

ব্যর্থতার বিজ্ঞাপণ

হাসির একটা সিলেবাস 
থাকলেও থাকতে পারে
কিন্তু কান্নার দুঃখের 
কোন সিলেবাস হয়না ।
যেমন হয়না ব্যর্থতার বিজ্ঞাপন।
আমি সব কথা অকপটে বলতে পারি
কিন্তু ভালোবাসি এ কথাটা বলতে পারিনি!
তুমি মন বুঝে নিয়ে যদি একবার বলতে
আমি তোমাকে ভালোবাসি
তাহলে সমুদ্র সেচে মুক্তা এনে দিতাম
এনে দিতাম পারিজাত 
তোমার হুকুমেই চালাতাম দশদিক ।
তারপর তোমার জীবন নিয়ে তুমি কি করবে তোমার ব্যাপার 
আমি আর ফিরেও তাকাতাম না,
 সোনার হরিণের পিছনে ছুটে
 হাহাকার ভরা মরীচিকায় পড়েছি মুখ থুবড়ে
 রয়ে গেলাম ব্যর্থতার বিজ্ঞাপন হয়ে
 সিলেবাস বিহীন দুরন্ত কান্নায়।

রাহুল দেবনাথ

তনয়া

এই তনয়া শোন,
তুই আমার কবিতা হবি
ভাঙ্গা মনের দেওয়ালে
তোকে নিয়ে স্বপ্ন আঁকাবো
নতুন কোনো কাব্যগ্রন্থে
তোকে আমি এক পৃষ্ঠা জায়গা দেবে।
আচ্ছা এক কাজ কর,
তুই বরণ আমার ভাবনা হোস
তোকে আমি দিবা-রাত্রি
শিরে করে রাখবো।
না হয় আরেক কাজ কর,
কোনো রূপকথার দেশে,
তুই আমারে রানী হোস
দিশেহারা এই কবি মন মহাশয়
তোর সকল অনুমতি মেনে চলবে।
ভালোবাসার প্রলেপ লাগিয়ে
হৃদয়ের ক্যানভাসে ছন্দের টানে টানে
কবিতা বুনবো অহর্নিশ।

নন্দিতা দাস চৌধুরী

ধ্বণী প্রতিধ্বণীতে

অতলান্ত চোখে আগুনের  স্রোত,
হৃদয়ের নীল মরন খেলায় কগজের ডিঙি ভাসাই মধ্যরাতে,
ঘুমের ভিতর স্বপ্ন ভাঙ্গার  পথে ছুটি বুক  খোলা মাঠে,
সৃষ্টিসাগর বুকে ঢেউ সম্ভোগের তালে দোল লাগে হৃদপিন্ডে,
হেয়ালি পায়ে হেঁটে যাই  হিজল বিছানো পথে ,
তোমার  রূপসী নদীতে ডুব দেই  বারবার,
অন্ধকার রাতে নক্ষত্রের  আলো পড়ে যখানে,
 তুমি মূর্তিকার হয়ে উঠলে নিমেশেই,
আমায় ভেঙে চূরে করে দিলে একাকার,
এই ভাঙা ছেঁড়া দেহে মধ্যরাতের নীল আকাশে হন্যি  হয়ে খুঁজে বেড়াই  সেই  আলাপন,
 আর প্রতি মুহূর্তেই  ধাবিত হই ধ্বণী প্রতিধ্বণীতে।

শর্মিষ্ঠা ঘোষ

অ্যাবর্শান

আপাদমস্তক 
নীরব মেয়েটি
কাঁপছে নাকের নোলক, কাঁদছে জন্মশ্লোক।
      তুলতুলে শরীরে বুলেট ট্রেনের ঘর্ষণ চন্দ্রবিন্দুহীন।

অ্যামিটারের কাঁটায় প্রকাশ্য অসহায়তা।
অমানুষের উত্তেজনা
ভুরিভুরি মাংসল চুম্বন! গালিগালাজের শ্রুতিনাট্য!

কখনও বা অস্ফুটে প্রিয় কবিতা!
সময়ের ব্যঙ্গ...
মেয়েটি প্রতিদিন মরে, হুহু চিতা-জ্বলা মন;
সহমরণে, 
একান্তের গোধূলি স্বপ্নরা—
চারপাশে পচে সাংবিধানিক শব্দরা,

কানা বাতিস্তম্ভ
যতক্ষণ বাল্বটা জ্বলছিল, মেয়েটি গর্ভবতী।  
আচমকা আলোটা নিভে গেলে, 
মেয়েটি কালো রক্ত মেখে অন্ধকার ফুঁসে বেরিয়ে এলো।

রিয়া বৈদ্য

মনুষত্ব

শহর জুড়ে হিমেল পরশ, রাতের উষ্ণতার পারদ ক্রমাগত নিম্মমুখী।বাইরে ঠান্ডা থাকলেও অফিসের ফোনের জন্য বারান্দাতে এসে দাঁড়িয়েছি। গলির মুখে মধু পাগলি আজকেও রাস্তায় রাস্তায় কীসের সন্ধানে যেনো ঘুরে বেড়াচ্ছে? গায়ে জড়ানো একটা চিটচিটে তুলোর কম্বল, মুখে বিড় বিড় করছে। একদিন ভালো করে শুনেছিলাম আমি বিড় বিড় করছিল সে, " আমার মেয়ে, আমার মেয়েকে দেখেছো কোথায়?" হঠাৎ দেখি তিনটে ছেলে মেয়ে এসে মধু পাগলি কে একটা গাড়িতে তুলে নিয়ে চলে যায়। আমি শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি। ওদের যাওয়ার পথে মনে একটা ভয়ের সঞ্চয় ও হয়।যতই পাগল হোক না কেন, এতোদিন ধরে আমাদের পাড়াতে রয়েছে, তাকে এইভাবে নিয়ে চলে গেল কয়েকজন! যদি কিছু বাজে হয় তার সাথে! কিন্তু আমি বা কী করবো একা এক রাতে? একরাশ চিন্তা নিয়ে ঘুমাতে এলাম । এরপর কাজের চাপে ধীরে ধীরে ঘটনাটা ভুলে ও যাই।

      কয়েক মাস পরে একটা কাজে বেনিয়া পুকুরের দিকে গিয়েছিলাম। হঠাৎ নজরে এল একটা অ্যাসাইলামে আমাদের পাড়ার সেই মধু পাগলি ও এখন সুস্থের দিকে । খানিকটা কৌতুহল বশত রিসেপশনে গিয়ে জিজ্ঞাসা করি মধুকে এখানে কে নিয়ে আসে? ওরা যা বর্ননা দেয় ,তাতে বুঝি ওই ছেলে মেয়ে গুলোই ওকে এখানে দিয়ে যায়। এতদিন পাড়াতে থাকার সত্ত্বেও আমরা কিছু করিনি,অথচ অচেনা কয়েকটা ছেলে মেয়ে প্রায় অসম্ভব কাজটাকে সম্ভব করে দেখিয়ে দিল।দেখে খানিকটা লজ্জার সাথে গর্ব ও হল।লজ্জাটা ছিল নিজের মানবিকতা কে বিসর্জন দিয়েছিলাম বলে। গর্বটা ছিল এখনও মনুষ্যত্ব বেঁচে আছে ।খুঁজলে হয়তো এই শহরের বুকে আরও অনেক মধু আর ওই ছেলে মেয়ে গুলোর মতো মানুষের গল্প পাওয়া যাবে,যাদের জন্য মানুষ এবং মনুষ্যত্বের গান আমরা দিনের শেষে গর্ব করে গাইতে পারি। বৈদ্য 


শহর জুড়ে হিমেল পরশ, রাতের উষ্ণতার পারদ ক্রমাগত নিম্মমুখী।বাইরে ঠান্ডা থাকলেও অফিসের ফোনের জন্য বারান্দাতে এসে দাঁড়িয়েছি। গলির মুখে মধু পাগলি আজকেও রাস্তায় রাস্তায় কীসের সন্ধানে যেনো ঘুরে বেড়াচ্ছে? গায়ে জড়ানো একটা চিটচিটে তুলোর কম্বল, মুখে বিড় বিড় করছে। একদিন ভালো করে শুনেছিলাম আমি বিড় বিড় করছিল সে, " আমার মেয়ে, আমার মেয়েকে দেখেছো কোথায়?" হঠাৎ দেখি তিনটে ছেলে মেয়ে এসে মধু পাগলি কে একটা গাড়িতে তুলে নিয়ে চলে যায়। আমি শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি। ওদের যাওয়ার পথে মনে একটা ভয়ের সঞ্চয় ও হয়।যতই পাগল হোক না কেন, এতোদিন ধরে আমাদের পাড়াতে রয়েছে, তাকে এইভাবে নিয়ে চলে গেল কয়েকজন! যদি কিছু বাজে হয় তার সাথে! কিন্তু আমি বা কী করবো একা এক রাতে? একরাশ চিন্তা নিয়ে ঘুমাতে এলাম । এরপর কাজের চাপে ধীরে ধীরে ঘটনাটা ভুলে ও যাই।

      কয়েক মাস পরে একটা কাজে বেনিয়া পুকুরের দিকে গিয়েছিলাম। হঠাৎ নজরে এল একটা অ্যাসাইলামে আমাদের পাড়ার সেই মধু পাগলি ও এখন সুস্থের দিকে । খানিকটা কৌতুহল বশত রিসেপশনে গিয়ে জিজ্ঞাসা করি মধুকে এখানে কে নিয়ে আসে? ওরা যা বর্ননা দেয় ,তাতে বুঝি ওই ছেলে মেয়ে গুলোই ওকে এখানে দিয়ে যায়। এতদিন পাড়াতে থাকার সত্ত্বেও আমরা কিছু করিনি,অথচ অচেনা কয়েকটা ছেলে মেয়ে প্রায় অসম্ভব কাজটাকে সম্ভব করে দেখিয়ে দিল।দেখে খানিকটা লজ্জার সাথে গর্ব ও হল।লজ্জাটা ছিল নিজের মানবিকতা কে বিসর্জন দিয়েছিলাম বলে। গর্বটা ছিল এখনও মনুষ্যত্ব বেঁচে আছে ।খুঁজলে হয়তো এই শহরের বুকে আরও অনেক মধু আর ওই ছেলে মেয়ে গুলোর মতো মানুষের গল্প পাওয়া যাবে,যাদের জন্য মানুষ এবং মনুষ্যত্বের গান আমরা দিনের শেষে গর্ব করে গাইতে পারি।

গোবিন্দ মোদক

অবুঝ অভিমান 

গোপনীয়তার চারপাশে লুকিয়ে থাকে 
আরও কিছু গোপনীয়তা
যেগুলোকে তুমি চোখে দেখোনি।
অথচ তারা প্রতিনিয়তই তোমাকে দেখে 
আর আরও গোপন কন্দরে
লুকিয়ে ফেলে তাদের অস্তিত্ব।
অথচ এ বিষয়ে 
সম্যক কোনও বোঝাপড়া কোথাও নেই, 
না তোমার তরফে, না ওদের।
তবু খোলা আকাশের নিচে যে সব প্রস্তর মূর্তি 
নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে দূরের দিকে 
তেমনই কোনও সাদা মেঘ তাদের হয়ে 
সংকেত পাঠায় ভিন্ন নক্ষত্রলোকে।
আলোকবর্ষ পার হয়ে স্বাতী-অরুন্ধতীর কাছে 
জমা হয় কিছু জমা-খরচের দিনলিপি 
আর অবুঝ অভিমানের কিছু রোজনামচা।
তখন গোপনতম একটি খবর
তাদের কাছ থেকে উড়ে এসে
আশ্রয় নেয় তোমার একমাত্র ডাক-বাক্সে; 
কিন্তু সে খবর তুমি কখনোই পাও না, 
একটা সবুজ চিঠি 
অনাদিকাল ধরে অপেক্ষা করতে থাকে 
কোনও হাতের উষ্ণ স্পর্শ পাবার জন্য।

ইন্দিরা গাঙ্গুলী

জীবন চলে না এক ই পথে 

জীবনের চলার পথ
সব সময় এক ই ভাবে 
চলে না ।
ছোটো বেলায় বাবা, মায়ের 
হাত ধরে পথ চলা শুরু ।
তারপর বড়ো বেলায় 
অন্য পথে চলা শুরু ।
একেক জনের চলার পথ 
একেক রকম ।
কেউ হয় টিচার আবার কেউ 
অফিসার ।
মধ্য বয়স টা কাটে সবার ই
কাজের ব্যস্ততায় ।
বুদ্ধ বয়সে অবসরপ্রাপ্ত 
জীবন কাটে যে যার মতোন।
কারো কারো জায়গা হয় বুদ্ধাশ্রমে ।
এক জীবনের অনেক অভিজ্ঞতা হয় আমাদের ।
জীবন তো একটা যুদ্ধ ক্ষেত্র
জীবনে চলার পথে ওঠা , নামা 
দুটো ই আছে ।
দুটি কেই গ্রহন করতে হবে 
মন থেকে ।
এক ই পথে জীবন চলে না 
সমান তালে ।

লালন চাঁদ

জীবন 
               
আমাদের রক্তে এখন আগুন 
দৃঢ় মেরুদণ্ড 
কাড়া নাকাড়া 
জীবন এখন রক্ত। চাপ চাপ রক্ত   ।।
আমাদের মাথার উপর বোমারু দানব
যুদ্ধ যুদ্ধ যুদ্ধ দিনরাত 
আমরা যুদ্ধে হারি 
আমরা যুদ্ধে জিতি 
জীবন যেনো হার মানা হার   ।।
তবু আছি 
সামনে প্রতিদিন মৃত‍্যু মিছিল 
আমরা মরে যাই 
আমরা বেঁচে উঠি 
আমরা জীবন কে সয়ে নিই অনায়াসে ।।
x

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

সালতামামি

সে তো যাবেই চলে ছন্দে পতনে
থাকবে যারা করবে সালতামামি
বিদায়ে, আবাহনে মাতবে আয়োজনে
কথা কিছু রাখবে মনের গহীনে।
আবার আসবে এমনই এক দিন
হারিয়ে যাবে নতুন - পুরাতনের কোলে
যেমন ঝরা পাতা বসন্তে বাদলে।
কোন সুদূর থেকে আসবে ভেসে ছবি
সবাক চিত্র ফুটবে দু’চোখ জুড়ে
কল্পমদির স্মৃতিপটে বাঁধবে বাসা চিরতরে
কোলাজ হয়ে রইবে হৃদয় জুড়ে।
এক দিন সব হবে একাকার
নিস্তব্ধ বসুন্ধরায় জানবে না কেউ নাম
হারিয়ে যাবে সব কোলাজ, সব স্মৃতি
সন মাস দিন বছর শুধু মিথ্যে হিসেব যত
সকাল সন্ধ্যা ফিরবে অবিরত।
ফিরবে না তো বিস্মৃত অবয়ব
অবয়বে কী বা যায় আসে
আসলেই ফানুস সব, নিশ্চিত ভোকাট্টা
আকাশ মাটির পথের দিশায়
অবিরাম পথ হাঁটা। 
এই ছেলে তুই আকাশটাকে ধর
এই মেয়ে শোন একটি পাহাড় তোর  
নদীও তোর, ঝরনাও তোর
আমি সবটুকু আজ দিলাম তোকে 
সব মিলিয়ে ছবি হওয়ার আগে
সময় সোপান আগলে ধর, 
যাবেই চলে একের পর এক 
দিন - মাস - বছর।

সুরজিৎ নম

সময়

সময় তুমি একটু দাঁড়াও পুরোনো স্মৃতি জেগেছে মনে। সময় তুমি থমকে দাড়াও নাইলে যে সব পর হবে। কতো না স্মৃতি জাগছে মনে সাদা কালো আর রামধনু আঁকা। সময় তুমিএকটু  দাঁড়াও স্মৃতিরা সব জাগছে মনে।কতো না হাঁসি কান্নায় আর  খেলেধুলে কাটিয়ে দিতাম  দিন।সময় তুমি কোথায় গেছ পাইনা তো  সেই দিন। বড় বড় বোঝা এখন বই পুস্তক এর চাপ।সময় এখন যাচ্ছে কিভাবে বোঝাই বিপাক।সময় তুমি যাচ্ছ ভালো শরীরটাকে বৃদ্ধ করে।পারো যদি একটু সময় করে মনটাকে একটু নবীন করতে।

রুপালী রয়

 রঙ



একটা বিকেল আসুক 
তোমার আমার দিশাহীন  প্রেমের 
বার্তা ছড়িয়ে দিতে ।
 দূর আকাশে , দিগন্ত পারে
 একটা ছায়াহীন ভালোবাসার মুকুট বুনতে
তোমার আমার আবার দেখা হোক 
একটা নিরিবিলি শান্ত হিজলের গন্ধ মাখা 
বসুমতীর তীরে ।
আকাশ যখন হাওয়ার তালে 
গাইবে গান ,
ঝিনুক যখন মনের সুখে 
আলোর সাথে করবে মাতামাতা 
সেই আলোতে মিলব দুজন 
আলতো রঙে সাজি ।
পরের বার দেখা হলে 
আমি  হিজল গাছ আর
তুমি হইউ মাঝি ।
x

শান্তনু মজুমদার

রাস্তা‌

হয়তো ছবি রূপ পাবে কবিতায়,
কবিতায় সম্পূর্ণতা আসবে কোন অসমাপ্ত যাত্রাপথের।
পথিকের না জানা শেষ যাত্রা;
না শুরুর শেষ, চিরন্তন অন্তিম  লগ্ন,
লগ্নভ্রষ্টা হলেই নতুন জীবন। 
লাল নীল হলুদের মেলায় আবার শুরু।
সেই শুরুতে আমি কেবল খুঁজে ফিরি রাস্তা।

অভিজিৎ রায়

শ্রমিক

আমরা কাজ করি বলে নাম পড়েছে শ্রমিক
নির্দ্বিধায় বলতে পারি আমরাই প্রকৃত দেশপ্রেমিক
মোদের নিরন্তর পরিশ্রম বানিয়ে দেয় মানুষকে কোটিপতি
আবার আমরাই একজোট হয়ে করতে পারি সবার দুর্গতি
আরে আমরা যদি কাজ না করি কে দেবে খাদ্যের যোগান?
শত পরিশ্রমের পরও মোরা পাইনা প্রকৃত সন্মান।
ধনী আরো ধনী হয় গরীবের কাধে চরে
বাবুদের অন্যায়, অবিচার সহ্য করি মোরা নির্বিচারে
আমরা ভবি সাবার কথা
 কিন্তু কেউ বুঝেনা মোদের ব্যাথা
পেটের তাগিদে অনেকেই ছেড়েছি বাড়ীঘর
কাজের খুঁজে ঘুরে বেড়াই মোরা দেশ দেশান্তর
অন্যের মুখে হাঁসি ফুটাতে গিয়ে মোরা মাজেমাঝে না খেয়েও থাকি
দুঃখ মোদের কেউ একবারও জিজ্ঞেস করে না কিভাবে বাঁচি
তবুও শত পরিশ্রমের পর করি সবাইকে সন্মান
দেশের সেবায় যেন করতে পারি আত্ম বলিদান
আমরা কাজ করি বলে নাম পড়েছে শ্রমিক
নির্দ্বিধায় বলতে পারি আমরাই প্রকৃত দেশপ্রেমিক
মোদের নিরন্তর পরিশ্রম বানিয়ে দেয় মানুষকে কোটিপতি
আবার আমরাই একজোট হয়ে করতে পারি সবার দুর্গতি
আরে আমরা যদি কাজ না করি কে দেবে খাদ্যের যোগান?
শত পরিশ্রমের পরও মোরা পাইনা প্রকৃত সন্মান।
ধনী আরো ধনী হয় গরীবের কাধে চরে
বাবুদের অন্যায়, অবিচার সহ্য করি মোরা নির্বিচারে
আমরা ভবি সাবার কথা
 কিন্তু কেউ বুঝেনা মোদের ব্যাথা
পেটের তাগিদে অনেকেই ছেড়েছি বাড়ীঘর
কাজের খুঁজে ঘুরে বেড়াই মোরা দেশ দেশান্তর
অন্যের মুখে হাঁসি ফুটাতে গিয়ে মোরা মাজেমাঝে না খেয়েও থাকি
দুঃখ মোদের কেউ একবারও জিজ্ঞেস করে না কিভাবে বাঁচি
তবুও শত পরিশ্রমের পর করি সবাইকে সন্মান
দেশের সেবায় যেন করতে পারি আত্ম বলিদান

সহিদুল ইসলাম

ঈশ্বর

কর্ম,তাহা বাধ্য বস্তু। জীবনের মহা সূত্র, 
ধর্ম অস্তিত্বের। প্রাণ পায় বাঁচার শক্ত মন্ত্র। 
ঘাম ঝরিয়ে মাথা হেটিয়ে মনে আনি চঞ্চলতা, 
মৃন্ময় দেহ মাটি করে, কাজে করি সৃজনতা।
অলসতা ভর করে, ভ্রম জাগে, মাঝে মাঝে
প্রশ্নরা দেয় ঘোড়দৌড়, উত্তর মোরে খুঁজে। 
আমি গোড়া হয়ে লেগে থাকি কর্মে শক্তভাবে, 
মাথার পোকারা মরে যায়,পাত্তার অভাবে।

কর্মজীবনহীন কবির কবিতা পড়ে মোহিত না হই,
তালির সাগরে ডুবা সবজান্তা অলসের মন্ত্র না লই।
আমি ঘর্ম সিক্ত বদনের ভারে বিশ্বাসী সাধনায়,
কর্মজীবীরা ঈশ্বর, আমি বাঁচি এই ধারনায়।

লিটন শব্দকর

অরণ্যপট 

কবিতার ভাঁজে ইমারত, চায়ের কাপ জুড়ে বৃষ্টি,
নদীর মতো ছলছল ঘুমে অগুনতি ডহরের সৃষ্টি।
শালিকের চোরা কূজন; স্তব্ধ বনজুইয়ের পাহাড়,
অর্থ খুঁজে ফেরে শহরে কৃষ্ণমৃত্তিকা উপসংহার।
কার্বন কপিটি আসলেই রোদের যুবতী ঝাউবন,
মস্ত একা সাদা বিকেলে অরণ্যের সুখজ সন্তাপ।

সেখ আব্দুল মান্নান

অদৃশ্য অস্তিত্ব

কে তুমি অদৃশ্য অস্তিত্ব মুখ লুকিয়ে 
আমাদের কায়ায় নিয়েছো সমস্ত দায় 
নিজের কাঁধে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত
দিনভর  কাজে অবিচল থেকে
রাতেও আমাদের ঘুম পাড়িয়ে তুমি
নিশ্চন্তে ঘুমিয়ে থাক সারা রাত
সকালে ঘুম ভাঙলেই তুমি আবার
শুরু কর তোমার কাজ 
দক্ষ কারিগর নিপুণ মুন্সিয়ানায় 
তুমি হাসালে আমরা হাঁসি 
কাঁদালে আমরা কাঁদি
ঠিক তোমার আজ্ঞাবহ বাঁদী
মানব কল্যাণে তুমি যখন যা চাও
তাই করিয়ে নাও আমাদের দিয়ে
তুমি ছাড়া মূল্যহীন আমাদের পঞ্চ ইন্দ্রিয়
তুমি শ্রমিকের শ্রমশক্তির উদ্গাতা
কৃষকের শানিত ফালের শক্তি
পড়ুয়ার প্রেরণা বিজ্ঞানীর ফসিল
তুমি কুমারীর অব্যক্ত প্রেমের মহাশক্তি
দেবালয়ে পুজারীর উপাসনার ভক্তি
প্রেমিক প্রেমিকার প্রেমের আর্তি
গরিবের কুঁড়ে ঘরে অন্ধকারের আলো
বেঁচে থাকার আত্ম অহঙ্কার 
দ্বারে দ্বারে ভিখিরির এক মুঠো অন্ন
তুমি জাগতিক সৃষ্টির উৎস
লয় প্রলয়‌ ধ্বংস
নিজেকে নিজে যাচাইয়ের কষ্টিপাথর
তুমি শোক তাপের কান্না
সুখ শান্তি আনন্দের অনর্গল হাসি
পরাজিত সৈনিকের নতুন উদ্যম
এত কাজে এত সাজে তুমি বিরাজ করছ
আমাদের মাঝে অনন্ত অদৃশ্য অস্তিত্ব
কি নামে ডাকলে তুমি সাড়া দেবে একবার।

অশোক মণ্ডল

চলছে 

ভুল-ঠিকের কবির লড়াই 
মানবতা গুমরে কাঁদে হায়।
অধিকার কাঁচের চুরির মত ভেঙে চুরমার 
নাহ্য যেন কফিন বন্দী প্রতিবাদ সাহস কার?
সমাজ রাষ্ট্র চলছে এগিয়ে সুরে বেসুরে 
আসল সত্য বুঝেও তোতা পাখির বুলি শুধু ঘোরে।
চারিদিকে চারিধারে বেশ চলছে---
নানা জন ন্যায় অন্যায়ের নানা কথা বলছে
কেউ বা ভালো কেউ আবার মন্দের সুর ছাড়ছে
মানবতার অপমৃত্যু বোবা কান্নার শব্দ বাড়ছে।

শতাব্দী

নিসঙ্গ

রজনী গন্ধা বাউলের মতো দুলছে প্রতিনিয়ত তার সমস্ত আঙ্গুল, পথের ক্লান্ত পথিক বিষাদের সুরে, জলে ভরা দু আঁখি তার পানে, বাদামি চোখের কোটায় তার  নিসঙ্গতা, ওই যেন ডাকছে একা এক নিরঞ্জনা।
দিনান্তে পাখি উড়ে যাই নীড়ে, 
অনাগত অন্দরে, আহা !কি  উত্তেজনা।। 
বাতাসে তোমার চুলের সুবাস অদ্ভুত ভাবে ম-ম, 
বার বার তোমার দিকেই টানছে। 
হিয়ার সকল উষ্ণতা ছড়িয়ে বিমুগ্দ্ধ হয়ে একই কথা বলছে 

সঙ্গী তোমার নিসঙ্গতা,ভেবে নিও সে ছিলো এক প্রেমের আল্পনা।।

অদিতি তুলি

বাইশ বছর

একটি কবিতা লিখ কবি অগ্নির নীলাভ শিখার মত
কষ্টে কষ্টে আক্ষেপের নোনাজল জমেছে বরফ পাহাড় সমান
স্বপ্নভঙ্গ,  অপূর্ন ইচ্ছা,  না পাওয়ার গল্পে গল্পে
ভীষন ভারী এক কাব্য হয়ে যাক
রঙিন পৃথিবীর বিলাসী মানুষের ভীড়ে
স্বচ্ছল মানুষের যাপিত জীবনের গল্প শুনে শুনে
সফল হাজারো প্রেমিক প্রেমিকার
বৃষ্টিবিলাস জ্যোৎস্নাবিলাসের গল্প লিখে লিখে
সংশোধিত হয় বাদ পড়ে যায় তোমার কলমযুদ্ধ হতে -

এক অনবদ্য জীবনের গল্প
মধ্যবিত্ত বাবার বাইশ বছরের এক তরুনীর গল্প।

যে জীবন তুষের আগুন নিভৃতে জ্বলেপুড়ে ছাই হয়
যে জীবন ফল্গু নদী নিরবে বয়ে বয়ে যায়
এ সমাজ শিক্ষা চায়,  অর্থ চায়,  সম্মান চায়
তাই সে থেমে যেতে পারে না।
থাকেনা কোন পিছুটান এগিয়ে চলে মরুপথ
লড়াই করে যায় টিকে থাকার জন্য
গতিশীল পৃথিবীর পথে পথে
স্রোতের উপর গা ভাসিয়ে ভাসিয়ে

হাজার ইচ্ছের অপমৃত্যু ঘটে
অঙ্কুরে বিনিষ্ট হয় লালিত স্বপ্ন
পোশাকী প্রেম আবেগের রংমহল
ঠাই পায় না সেই বিদ্রোহী জীবনে

ওহে কবি, রঙিন চশমা খুলে ফেলো
চর্মচক্ষু দিয়ে দেখো বিবেক দিয়ে ভাবো
ভালবাসতেও এযুগে অর্থ লাগে
স্বপ্নের পুরুষকেও ফিরিয়ে দিতে হয়
বাইশ বছর এক জ্বলন্ত অগ্নি
যে আগুন ভস্মীভূত করে সমস্ত শখ,  ইচ্ছে,  স্বপ্ন

ওহে কবি,  জেনে রাখো
পৃথিবী যখন ঘুমে আচ্ছন্ন হয়
মোমবাতির আলোয় রচিত হয়
কিছু অনবদ্য জীবনের গল্প
বাবার ভারী বোঝা টানার
আত্মনির্ভরশীল উপার্জনক্ষম হবার পান্ডুলিপি।।

সুধীর রায়

আজকের দিনের পাঁচালী

শরীরটা ভীষন খারাপ,বিছানায় শুয়ে আছি,
কিছুই যেন ভালো লাগে না!
কি করলে ভালো লাগবে? তাও জানিনা!
না, কিছুতেই শান্তি নেই!
সকাল,দুপুর দুবেলার ওষুধ খাওয়া হলো,
কিছুতেই যেন পেটের ব্যথা ছাড়ার নাম নেই!
শরীরটা ও ভীষন ব্যথা করছে-
সব কিছুতেই কেমন জানি বিরক্ত ভাব!
শরীরে শান্তি না থাকলে যা-হয়!
দিনটা ও আজ যেন শেষ নেই!
অনেকক্ষণ বিছানায় শুয়ে শুয়ে পেইজে-
কবিদের লেখায় লাইক, কমেন্ট করলাম,
তবুও যেন সময় যেতে চাইছে না!
কি জানি কখন সন্ধ্যা হয়?
বিরক্ত! বিরক্ত! বিরক্ত!আর সইছে না!
কিছুক্ষণ পর লিখতে শুরু করলাম,আজকের দিনের পাঁচালী!
লিখতে লিখতে হঠাৎ একটা টিং করে শব্দ হলো,
মেসেঞ্জারে প্রবেশ করে দেখি,
আমার ভাতিজি পলি একটি মেসেজ পাঠিয়েছে-
"কেমন আছেন আঙ্কেল?"
যথারীতি তাকে অসুস্থতার কথা জানিয়ে দিলাম।
অসুস্থতার কথা জানতে পেরে মেয়েটা-
একের পর এক মেসেজ পাঠাতে শুরু করলো!
"ঠিক মতো ওষুধ খাবেন, শরীরের প্রতি যত্ন নেবেন আঙ্কেল।"
ইত্যাদি! ইত্যাদি!........
অধিকাংশ মেয়েরা এমনিতেই একটু নরম মনের মানুষ হয়,
তাও আবার আঙ্কেলবলে কথা!
সে যাই হোক, এতক্ষণে মনে হচ্ছে একটু যেন কমেছে ব্যথা।
তবুও শরীর এবং মন থেকে অবসাদ যেন যেতে চাইছে না!
দেখতে দেখতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো,
একটু পরে গোধূলির সূর্য বিদায় নেবে,
বকের পাখায় সূর্য লুকিয়ে ধরার বুকে আঁধার নামবে।
হে ঈশ্বর! রাতটা যেন শুভ হয়,
সবার জীবনে সুখ শান্তি নিয়ে আসোক আগামী ভোরের সূর্যোদয়।

সৈকত মজুমদার

স্মৃতি 

তোমার কাছে এখন আর 
কোনো অভিযোগ নেই আমার, 
এমনকি কোনো আবদার! 

এতকাল যা ছিল সব বিস্মৃতি, 
ভুলে যেতে চাই তোমার সব
রেখে যাওয়া অতীত স্মৃতি। 

আজ থেকে তোমার আমার 
লোকদেখানো সম্পর্কের হোক ইতি!

দ্বৈপায়ন দাস

আশা 

উড়াল পাখি উড়াল পাখি 
কোথায় যাও উড়ে?
যাযাবর বুঝি,
মোর আঙ্গনে ক্রীড়া করোনা কেন তুমি?
মোর আঙ্গন পুষ্পভরা 
স্নিগ্ধ শুভ বায়ু।
আসলে মোর কাননে,
তুমি হবে দীর্ঘজীবী, পরমায়ু।
শোনো মোর নিস্বার্থ কন্ঠ,
এসো মোর আঙ্গনে।
 তোমার কিচিরমিচির শুনি হই প্রফুল্লিত,
আমার আঙ্গন কি দিতে পারে না 
আনন্দ প্রীতি ভালোবাসার সুগন্ধ।
এসো মোর কাননে 
পুষ্প রয়েছে তোমার আসায় ।
না পাবে নাগাল নিষাদ 
করিতে পারিবে না কোনো আঘাত।
আড়ালে রাখিবে তোমায়,
উড়িতেও পারিবে মোর কাননে 
বিনা নিরাশায়।

Apr 29, 2022

সৌমেন্দ্র দত্ত ভৌমিক

ব্যর্থ অভিজ্ঞতায়

তারপরেও সন্দেহের জঞ্জালে দু পা বাড়িয়ে
নানা কঠিন অঙ্কের ফাঁদে বন্দি।
কিছুতেই সহজসাধ্য নয় জাল কেটে বেরোতে,
কিছুতেই সহজলভ্য নয় বাধাগুলো ডিঙোতে ,
মানসিকতার গোলকধাঁধায় জড়ানো নানান ফন্দি।
অতএব সুখকে আলবিদা জানিয়ে গুটি গুটি পায়ে
অশান্তির মহাভোজে রসনার তৃপ্তিতে ব্যস্ত জীবন।
এতবার কানমলা খেয়ে নাকখত দিয়েও
অসম্পূর্ণ শিক্ষায় কেন তৎপর হামাগুড়ি দিতে?
বেলতলাটা ন্যাড়ার যদি খুব পছন্দসই জায়গা
তবে পায়ে পায়ে দুঃখগুলো আসে কুমন্ত্রনাতে।
তারপরেও কষ্টের চোখ রাঙানিতে কেন এত ভ্রান্তি ?
লক্ষণরেখা না মেনে যথেচ্ছ দৃপ্ত ব্যবহারে
অগোছাল চলনবলনে থাকে না কোনো কান্তি।
এরপরেও ভয়াল অভিজ্ঞতায় নাছোড়বান্দা হয়ে
কেনই বা বিপদের সাথে করি অশুভ সন্ধি ?

মৌসুমী খাতুন

সুখের ফেরারী

যেখানে শুধু দুঃখ কষ্ট ঘুটঘুটে অন্ধকারে
 নিজের বাসা বেঁধছে শক্ত করে
জীবনে ঘোর অমাবস্যা নেমেছে
যেখানে শুধু হতাশা,
হটাৎ করে দরজায় কড়া নাড়ে সুখের ফেরারী
বলে, একটু ভালোবাসা দেবে?
আমি সর্ব সুখ দেবো তোমায়।
ভয় করে, ভয় করে দরজার কাছে যেতেই
আর নিজেকে নিজেই বলি
আমিতো অভিশপ্ত,
সুখ আমার দুঃস্বপ্ন ,
এখুনি কেটে যাবে।
আমি একটু চুপ করে বসতেই
আবার যেনো দরজা নড়ে উঠলো,
জোরে জোরে হাঁকছে 
কইগো .....
দেবেনা একটু ভালোবাসা?
আমি সর্ব সুখ দেবো তোমায়।
আমি এবার নিশ্চিতরূপে 
স্তব্ধ হয়ে গেলাম,
কিছুক্ষন পর বললাম 
ভুল ঘরে এসেছো বোধহয়,
আমি সে নই যার সন্ধানে এসেছো।
তখন সুখের ফেরারী বললো
না না তুমিই সেই, আমি ভুল নই।
আমার প্রতিটি কথা বললাম আঁধার আলোর,
কিছু হলোই না তার ওপর।
বললো ,
আমি হাত বাড়িয়েছি তুমি শুধু শক্ত করে ধরো।
আমি বার বার না করতেও
সে হ্যাঁ করিয়ে নিলো।
আশ্চর্য হয়ে গেলাম,
মুখে কতইনা না না করে গেলাম
কিন্তু শেষে আগে পিছে না ভেবে,
তার কথা ভেবে হ্যাঁ করে দিলাম
শুধু একটু শান্তির নেশায় ।
জানিনা এই নেশা কি সারা জীবনের জন্য
নাকি সে ক্ষণিকের ?

Apr 28, 2022

কাজী নিনারা বেগম

 নিউক্লিয়াস

এ শহর কাপছে  ধুঁকছে মানুষ ধূমকেতুর নিউক্লিয়াসে,,

আগামীর হাত ধরে হেঁটে চলছি একা। 
প্রতি রোধে প্রতিবাদে জ্বলছে আগুন,, 
শোষণ নৈরাজ্যবাদী শাসন বিরোধী দেওয়ালে পোষ্টার সেঁটে মোমবাতি প্রজ্বলনের দাবদাহে।।
উলঙ্গ মস্তিষ্কের মানবতা কসাইয়ের ছূড়ির ফলার আগাতে টূকরো বিবর্ণ মাংসের পিণ্ডে,,
কখনো কখনো মাছিদের সম্মেলনে। 
বাতায়নে শুধু বেইমানি রক বাজের খেলায় মেতেছে প্রতারনা ভন্ডামি,,
সমাজের একঘেয়ে কলঙ্কিত কামনার পাহাড়ে জীবন জঠরে লাঞ্চিত নির্ভয়া অভয়া ফেলে আসা রাতের অন্ধকারে।। 
বারবণিতার আত্ম চিৎকারের বিলাপ গতির ডানা মিলবে,,
হয়তোবা ফুটপাতের কুকুরের কুন্ডলী দেয়া আস্তাকুঁড়ে মাছিদের মহাভুজ থামবে। 

কর্মিতা বনিক

 নিজস্ব

কখনো কখনো একটু একলা হতে হয়
নিজের সঙ্গে সঙ্গী হওয়ার একাকী হতে হয়।
পাশাপাশি হেঁটে চলা মানুষগুলো
সময়ের মতই অস্থায়ী ।
নিঃস্ব হয়ে যাবার আগে 
নিজেকে চিনে নিতে হয় ।
খুব বেশি একা হওয়ার আগে 
নিজেকে সামলে নিতে হয়
জীবনযুদ্ধে একার লড়াই 
নিজেকেই শিখে নিতে হয় ।
সব কিছুই কেমন বেমানান
যদি না হতে পারি পরোপকার ।
অসম্মান টুকু ফিরিয়ে দিতে 
বাধেনা লোকলাজ
সবার প্রিয় সবাই হোক 
নিজেরাই একান্ত।

রেশমী নাথ

ভাবনার নিবেদন 

নিবেশিত  বেলার সন্ধ্যালগনে 
আমার হৃদয় যখন তোমার গহীন কাননে,
সে বেলার একটি ফুল তুলি আনি - 
যেটি বাঁধিব আমি তোমার খোঁপায় 

স্বপ্নতৃষ্ণায় বিভোর হ‌ইয়া 
ডাকিব অন্তরের গহণলয়ে 
যেদিক পানে চাহিয়া করেছিলে 
তুমি আমারে চিরবিদ্ধ!

ওহে রঙ্গিনী ! 
ঐ পারের অস্তশালার পড়ন্ত দুপুরে 
তাও  আজ‌ও কেন আসনি ?

আসক্তি যখন আমার অন্তর্গহনে 
তীরবিদ্ধ করে 
আমার ভেতরের অলিগলি তোমার সান্নিধ্যের সাধনায় আলুলায়িত করে ।

বহিয়া যাবে সময়, বয়ে যাবে 
সময়ের অন্তঃলগন 

পড়ন্ত বেলার  শেষ বেলার  ভাবমূর্তির 
অঙ্কন ধরি তুমি আসিবে যখন ।
ওগো;
প্রণয়িণীর বেশ ধরি আসিবে যবে ।
মনে করিও অপেক্ষার ক্ষণ তোমার লয়ে বেড়েই যাবে ।।

অভিজিৎ পাল

তোমাকে ভালোবেসে

তোমাকে ভালোবেসে জানতে পেরেছি
ভালোবাসার আসল মানেটা কী ?
জানতে পেরেছি অভিমানেরও পাহাড় জমে ,
নীরব কান্নায় বুকের ভেতরও ঝড় উঠে ,
বোবা চিৎকারে বুকের পাঁজর কম্পিত হয় ,
বিনা কারণে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয় ,
চোখের ভাষাতেই মনের অবস্থা প্রকাশ পায় ,
ইগো-তে বাঁচা একেবারেই মানা ,
মন ভালো কিবা খারাপ তার সঠিক কারণটাই থাকে অজানা ।

গৌরব নাথ

আমার লুপ্ত চোখে

প্রজ্ঞাচক্ষু আলতো প্রয়াসে খুঁটে খুঁটে বের করল,
আমার মধ্যে থাকা স্বত্বাস্বত্ব;
যেখানে বিলুপ্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে ভালোবাসে
কিছু দুষ্টুমি, কিছু কৃপণ ইচ্ছে
আরো কিছু একটা...!

তবে তার স্বন পাশের কানেও অপূর্ণ
কিবা শূন্য!
উপলব্ধির মাচায় তাকে আমি ধরে রাখি
বসন্ত কিবা শীতে ভাঙা কন্ঠের খানিকটা নীচে
বাঁ পাশে।

সে অতটা চটপটে নয় বটে....
নিশ্চুপ হয়ে কলজে জড়িয়ে 
জানালার পাশে বসে ছিঁড়ে ফেলা পাতা গুনতে থাকে।

তবে 'মাঝে মাঝে তার দেখা পাই' 
কুহুমন্দ্রের বেলা ফুড়ালে বলে 'আমি চলে যাই'!
যাইই!
শেষ হয় উলম্বে বাড়তে থাকা তিতিক্ষা
আবার আরম্ভের জন্য,...‌ নিরন্তর।

আবার কাজ শুরু হয় অন্তরের অন্যত্র
শ্রীজাতের লেখায় শেষ হয় চোরাবালির মোহ।
অবসরে যাওয়া এক জন্মের এলো মৃত্য‌!
সুখবর.... 
আরেহ্! আসবে আবার!
নদী পেরোলেই আবার নতুন তট দেখবে,
ঘুরে ফিরে... শেষ সকলের বর্তমানের শেষে। 

আমিও বলি কয়েক পা সময় এগিয়ে
'একদম জং ধরা মেশিন শক্তপোক্ত হয়ে এলো যে'!
আর বিকেলে আলোয়ান মুড়ে বসে থাকা আমি
কান্ডারি দৃড় রেখে নিভৃতে বলি ঐ অন্তরের দলিলকে
চল আবার ঘেঁটে দেখি...
উইপোকা ছুঁলো না তো!ঘুমিয়ে যাওয়া রাতের বন্ধ কিছু আশা
সাথে থাকা প্রতিলিপি।

বৃষ্টি দাস

সবুজ ঘেরা গ্রাম

দ্বারকেশ্বর নদীর তীরে
আছে আমাদের গ্রাম,
মাঠে চলে গরুর গাড়ি
নাইকো চলে ট্রাম।

পুকুর পাড়ে হাঁসের দল 
করছে আনাগোনা,
ঘরে বসে লিখছি আমি
সকল বর্ণমালা।

গরু বাছুর চরছে মাঠে
খাচ্ছে সবুজ ঘাস,
গ্রামে বাস করা সব প্রাণী
প্রাণ খুলে নেয় শ্বাস।

প্রজাপতি ঘুরে বেড়ায় 
রঙিন পাখনা মেলে,
সকাল হতেই নদীর কূলে
মাছ ধরতে যায় জেলে।

ভোর হতেই পাখির কুজন
শোনা যাচ্ছে ওই দূরে,
মন প্রাণ সব জুড়িয়ে যাই
তাদের মিষ্টি সুরে।

কাজের শেষে বাড়ি ফিরে
সকল চাষী ভাই,
এইভাবেই সমস্ত দিন আসে আর যায় ।

গ্রাম আমাদের খুবই ছোট 
সবুজ দিয়ে ঘেরা,
হাজার নগরের ভিড়েও কেবল 
আমাদের গ্রাম সেরা। 

অভিজিৎ দাস

বর্ষার দেখা

সেদিন পথে যখন আমি একা -
বর্ষার সাথে হঠাৎ হলো দেখা!
অল্প রোদে মুচকি হেসে বলে,
একটু চলো ভিজভে ঠাণ্ডা জলে।
ভিজতে কি আর আমার আছে মানা?
বর্ষা যদি ডাকে এমন করে।
আমিও জানি মেলে দিতে ডানা-
পাখির মতো বৃষ্টি কিংবা ঝড়ে!
বর্ষা ডাকে আমায় অবিরত-
শুকনো পাতায় শিশির ঝরার মতো
তখন কি আর করতে পারি মানা?
তার সাথে যে পুরোনো জানাশোনা।
অগত‍্যা তাই ভিজি ওৎপ্রোত,
ভিজিয়ে গেলো বৃষ্টিকনা যতো।
বর্ষা আবার হারিয়ে গেলো দূরে -
আমি এখন ভীষণ একা একা।
ভাবছি বসে চুপটি করে ঘরে,
আবার যদি হতো বর্ষার দেখা!

রামমোহন বাগচী

সৃষ্টি হউক গ্রহণ মুক্ত! 
                        
কাল্পনিক নেশায় মত্ত শ্রেষ্ঠ জীব ! ভুলে স্রষ্টা কে। 
হাজার নামে আছো তুমি সৃষ্টির হৃদয়ে। 
ভালো বাসে তোমায়, ভুলে তোমার ভালো বাসাকে। 
সবার কন্ঠে তোমার নাম, তবুও জ্বলছে আগুন সৃষ্টির হৃদয়ে। 
সৃষ্টির স্রষ্টা তুমি ? এ কেমন সৃষ্টি তোমার  ? 
নিজেকেই নিজে করছো আঘাত  ! 
এ কেমন খেলায় মত্ত তুমি, করে হাজার ভাগ
তোমার লীলায় মত্ত তুমি, বুজা বড় ভার। 
জোৎস্নার আকাশে উড়ে অগ্রগতি হৃদয়ে সঞ্চিত অভিমান। 
অনুশোচনার অগ্নি গর্বে দগ্ধ কর তোমার সৃষ্টির গৃনীত অভিমান। 
তোমায় খুঁজি তোমার সৃষ্টির মাঝে, 
 বিমুগ্ধ চোখে দেখি যেন অপূর্ব সুন্দর সৃষ্টি তোমার। 
দূর্বসার স্পন্দনে যেন শুনি নির্ভেজাল শান্তির গান।।

ডাঃ তারক মজুমদার

তবুও

এক মুঠো --
সময় ভিক্ষা  চেয়ে
শুনেছি ব্যস্ততার সাতকাহন। 

সময় দাবানলে পুড়ছে সময়
পুড়ছে যত সময়
মুখোশ আর মনুষ্যত্ব--

তবুও ভালবাসার  আবাহন।

গোলোকেশ্বর সরকার

মেঘ

আকাশে মেঘ  ।   নীল  আকাশের বুকে  সাদা মেঘগুলি একদিক থেকে অপর দিকে ছুটছিল । মেঘগুলি বিভিন্ন রূপ ধারণ করেছিল । কখনও বাঘ,  কখনও  শিংওয়ালা হরিণ, কখনও  শুঁড় বিশিষ্ট  হাতির আকার  নিচ্ছিল ।  পার্কে বসেছিল  তিন  কলেজ --বন্ধু  । একজন ছেলে, দু'জন মেয়ে । ছেলে বন্ধু বলল, " দেখ, দেখ । মেঘের মধ্যে একটি নৌকো  ।  নৌকোর ওপরে বসে একজন মাঝি নৌকো চালাচ্ছে ।"    অপর দু'জন মেঘের ভেতর মেঘ দিয়ে তৈরি করা  নৌকা --মাঝির  ভাস্কর্য দেখতে পেল  । বলে উঠল, "আরে, তাই তো , তাই তো !" একজন মেয়ে বন্ধু  বলল, "তাকা , তাকা । মেঘের  অন্দরে   বিছানা পাতা শোওয়ার  খাট  দেখা যাচ্ছে ।"  অন্য দু'জনে  মেঘের মধ্যে মেঘ দিয়ে বানানো শিল্পী মেঘের বিছানা--খাটের কারুকাজ  চোখে দেখে বলে উঠল, " বেশ তো, বেশ তো  !"  অপর মেয়ে বন্ধু বলে উঠল , " চেয়ে দেখ, চেয়ে  দেখ । মেঘের  অভ্যন্তরে একটি ঘর দেখা যাচ্ছে ।"    বাকি দু'জন বন্ধু  মেঘের মধ্যে মেঘ দিয়ে  ঘরামি মেঘের হাতে  নির্মাণ  করা ঘর দেখে বলল, " ঠিক, ঠিক !" 

 আয়না  সামনে  রেখে  শ্যাম্পু করা চুল চিরুনি দিয়ে আঁচড়াতে আঁচড়াতে  কুড়ি বছরের মেয়ে  নীলাঞ্জনা আয়নার  ওপর পড়া মেঘের  মধ্যে  ' ভ্রুণ 'দেখতে পেল ।

চিন্ময় রায়

সোশ্যাল নেটওয়ার্ক

বিজ্ঞানেরই আশীর্বাদে আজ,
বিশ্ববাসী আনন্দে।
কতকথা প্রকাশিত হয়,
আজ ফেসবুকেরই মধ্যে।
হোয়াৎসঅ্যাপ এর মাধ্যমেতে,
কতো কথাই হয়।
আসুন সকলে মিলে বলি আজ,
সোশ্যাল নেটওয়ার্কের জয়।
ইন্সটাগ্রামের মধ্যে মোরা,
কতো নায়িকাদের দেখে।
কতো যোগসুত্র বেরিয়ে আসে,
সোশ্যাল নেটওয়ার্ক থেকে!
এই সোশাল নেটওয়ার্কের জন্যই আজ,
কত মেয়েরা স্টার।
কেউ করে স্নেক ভিডিও,
আবার কেউবা টিকটকার।
ছেলেরা থাকেন পাবজি-তে আজ,
কেউবা ফ্রি-ফায়ারে।
মোবাইল স্কিনে ক্লিক করে করে,
এনিমিদের মারে।
সোশ্যাল নেটওয়ার্ক মোদের করেছে-
অলস অকর্মণ্য।
তবুও মোরা বেঁচে আছি আজ,
সোশ্যাল নেটওয়ার্কের জন্য।

অশ্বিনী কুমার মন্ডল

প্রত্নতত্ত্ব 

এই পৃথিবীতে অনেক সভ্যতার সমাধি ঘটেছে 
বহু যুগ পূর্বে হয়তো বা অগ্নুৎ্পাতে অথবা ভুমিকম্পে 
কিম্বা উল্কাপাতে নতুবা চিরতুষারে ঢাকা পড়ে ?
অথচ এখনো মানুষ শিক্ষা নেয়নি আগের থেকে 
সেই একই ভুল করে চলেছে বারংবার অন্তহীনভাবে? 
মানুষ হতে চেয়েছে এ গ্রহের সর্বসুখী যন্ত্রমানব?  
সভ্যতার কালো ধোঁয়া যেদিন সম্পূর্ন গ্রাস করবে 
এই সুনীল আকাশকে সে দিন আর সূর্য রশ্মি 
আকাশ ভেদ করে পৃথিবীতে আসবে না! 
কোনো গঠের রাখাল আর চরাবে না ধেনু
পৃথিবীর এই সবুজ প্রান্তরে নীল আকাশের নীচে? 
কালাচাঁদ আর বাজাবে না বেণু কদম্বের ডালে 
রাধিকা আর আসবে না যমুনায় জলে কলস কাঁখে? 
আমাদের এই সভ্যতার উন্নয়নের চাকা
হয়তো চাপা পড়ে যাবে মাটির নীচে! 
আবার হয়তো আমরা ফিরে যাবো 
সেই কার্বনিফেরাস যুগে বা হিম যুগে
মানুষ নয় অন্য কোনো রুপে হয়তো আবির্ভূত হবো! 
তখন আমাদের জীবাশ্ম গুলো 
আবিষ্কার করবে অন্য কোনো উন্নত জীব। 
আমরা হবো রিসার্চ এর বিষয় ? 
আমরা যেভাবে প্রাচীন হরপ্পা-মহেঞ্জোদারো 
বা সুমেরীয় সভ্যতা আবিস্কার করেছি। 
সেই  দিনের মতো একই ভাবে হয়তো আমাদের বর্তমান 
সভ্যতাও একদিন ভগ্নস্তূপের নীচে চাপা পড়বে। 
তারপর বহু যুগ পরে আবার আবিষ্কৃত হবে 
এই সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ রাখাল দাসের মতো
কোনো এক বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিকের হাতে ? 
আর এক একটা ভুল খুঁজে বার করবে
আমাদের সমাজ জীবনের, নগর পরিকল্পনার? 
এই অতি আধুনিক সভ্যতার ধ্বংসের পর
হয়তো শুরু হবে এক নতুন যুগের। 
আবার সূর্য্য উদিত হবে পূর্ব কোণে
নব আশার আলোয় অঙ্কুরিত বীজ 
স্বাগত জানাবে রক্তিম সূর্য্যকে।

নীতা কবি মুখার্জী

প্রিয় কবি--শঙ্খ

চলে গেছেন  আমাদের প্রাণের প্রিয় কবি
এখন  তিনি তাই হয়ে গেছেন শুধু ছবি।
না ,ছবি নয়, তিনি থাকবেন হৃদয়ে মননে
আমাদের মনের মনি-কোঠায় সশ্রদ্ধ আলিঙ্গনে।
শঙ্খ কবি--শঙ্খের মতোই পবিত্র, শাশ্বত
তোমাকে রাখবো আমরা হৃদয়ে, জাগ্ৰত।
বাস্তববাদী কবি, সাম্যবাদী কবি, সমাজের ত্রুটির কথা বলেছো দৃপ্তকণ্ঠে
তাই আজ গলা ধরে আসে, কথা নাই কণ্ঠে।
আছে শুধু পূজা, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা
বাংলার ঘরে আবার এসো ,কবি,
এইটুকু রাখি আশা।

সানী ভট্টাচার্য

ভালোবাসা

ভালোবাসা তুমি শান্ত নও 
অবাধ অসীম চঞ্চল 
ভালবাসা তুমি ক্লান্ত নও 
পদ্মা বরাকের জল 
ভালবাসা তুমি নীল রং 
অনন্ত আকাশে ঘেরা 
ভালবাসা তুমি লাল রং 
মৃত্যু ফাঁদে ভরা 
ভালবাসা তুমি এমন ফর্সা 
যেমন শান্তির দূত 
ভালবাসা তুমি এত কালো 
মায়াবী কিংবা অদ্ভুত 
ভালবাসা তুমি এত সবুজ 
যেমন আমাজন - বর্ষাবন
ভালবাসা তুমি পাশে থাক 
সবার প্রিয় জন
ভালবাসা তোমায় খুঁজে বেড়াই 
হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা এসএমএস এ
ফেসবুক এর চঞ্চলতা দেখি 
রমণীদের মুখে 
ভালবাসা যেন তুমি মোহময়ী 
কিংবা কান্নার রব 
ভালবাসা তুমি সবার প্রিয়
যেমন কিশোর শৈশব 
ভালবাসা তুমি এত গভীর 
সাত সমুদ্র জানে 
ভালবাসা তুমি হৃদয়ে থাক 
ঈশ্বর তা মানে 
ভালবাসা তুমি চাঁদের হাট
বিলাসী সভ্যতার গায়ে
ভালবাসা তুমি ঘুরে বেড়াও 
নীরবে নগ্ন পায়ে 
ভালবাসা আমি আজও একা 
দেখা করো অল্প!
ভালবাসা তুমি ছাড়া নেই 
জীবনের কোনো  বিকল্প।

আব্দুল গফফার

থাকতে চায় নিভৃতচারী হয়ে

মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণের চোরাস্রোতে,
নিত্য ভিড় করে অক্ষরমালা-
সারি সারি কতশত শব্দগাথা।

মিশ্রিত চিন্তনের রং, রঙিন শব্দ,
ক্রমশ উজ্জ্বল কবিতার ক্যানভাস-
আগুয়ান,গতিবান সাধের লেখনী।

মুহুর্মুহু কাটা ছেঁড়া, শব্দের টেক্কা,
অগ্রজ কে, পশ্চাদে কার অবস্থান-
কমা,দাঁড়ি,লাইন, নিমেষেই সমাপ্ত।

ভাবনার প্রকাশ, ঠাঁই শ্বেতপত্রে,
ছিন্ন ডায়েরি-লেখনীর সহাবস্থান।
প্রচারহীন, তাই কবি নিভৃতচারী-

কলমের আঁচড় স্তব্ধ, নেই মুদ্রণ,
জোটবদ্ধ নয় শব্দশ্রমিক-
ডাক নেই মঞ্চে, ধূসর পরিচিতি।

লিখতে চায়, আরো লিখতে চায়,
চায় না প্রচার,চায় না মঞ্চ-
থাকতে চায় সে নিভৃতচারী হয়ে

Apr 26, 2022

সোনালী মণ্ডল

সময়

সময় তুমি চতুর ভীষণ,
মাঝে মাঝে ভাবি আনমনে
বাক যুদ্ধের লড়াইয়ে হারিয়ে দেবো তোমাকে,
কিন্তু পারিনা তোমার ছলাকলার জাদুতে।
তুমি কখনো এসে দাঁড়াও না বলে
কখনো বা চলে যাও কিছু বলে।
পারিনা ছুঁতে,পারিনা মনের কথা বলতে,
একটু থমকে যদি যেতে তাহলে বোধ হয় সব কিছুরই একটা ভিন্ন রূপ দেখতে।
সময় তুমি ভীষন চতুর,
কখন যে খেলার ছলে কৈশোরের মোহে কেড়ে নিয়েছো শৈশবকে,
আবার অর্থ নাম যশের তৃষ্ণায় কেড়ে নিয়েছো যৌবন কে।
মনুষত্বের চাওয়া পাওয়ার হিসাব মেলাতে নির্বাক থেকেছে কর্তব্যের আকাশ।
ক্লান্ত হয়ে দুর্বল অস্থির ভাঁজে ভাঁজে,
জমা ব্যাধির ক্ষতে যখন খুঁজেছি
নরম হাতের আলতো ছোঁয়া,
ছুঁতে চেয়েছে আবেগের বিষাদের দেওয়াল,
পরিশ্রান্ত অশান্ত জীবনের মাথা রেখে,
শান্তির খোঁজে যখন খুঁজেছে নিরাপদ কোল,
তখনো কেড়ে নিয়েছো শেষ আশ্রয় এই গোধূলি বেলায়।
সময় তুমি নিষ্ঠুর,
বেলা শেষের ডাকে যখন বসে জীবনের 
চড়াই উতরাই পথের বাঁকে বাঁকে ভেসে এসেছে,
নিখুঁত সজ্জিত রঙিন দিনের স্মৃতি,
তখন হারিয়ে ফেলেছি চলচছক্তিহীনতা।
সময় তুমি ফিরে আসবে আর একটিবার জীবন টাকে নতুন করে শুরু করতে?

Apr 25, 2022

অসীম পাঠক

অগ্নিপরীক্ষা

ঘূর্ণায়মান সময়ের রথ এসে দাঁড়ায়  মেঘমুক্ত নির্মল সুনীল আকাশের নীচে। মাথার মুকুট খুলে অগ্নিপরীক্ষা দেবে 

এযুগের রামচন্দ্র , সবাই দেখবে প্রশস্ত ললাটে সীতার নাম , তবুও ভালোবাসার অগ্নিপরীক্ষা। সীতা নয় রামচন্দ্র বলবে , হে ধরণী দ্বিধা হও ... জীবনতরীর ভারসাম্যহীন খেলায় ভাগ্যচক্র প্রমাণ করে , সবকিছু ই আপেক্ষিক নয়।

স্বেচ্ছা নির্বাসনে বিষণ্ণতা কেই আমন্ত্রণ জানায়  এযুগের সতী সীতা, তার প্রতিজ্ঞা তার জেহাদ মুক্তি র কলকাকলীতে ভালোবাসার কবুতর কে 

দূর দ্বীপে রেখে আসার ,  সেখানে নীল জলে  নীল দিগন্তে  রামচন্দ্রের ভালোবাসার আবাহন এড়িয়ে  ব্যাস্ত থাকতে চায় সে , এ যুগের রামের ধনুকে আঁকা বিরহ বেদনার স্বগত প্রলাপ।  

সীতা ব্যাকুলতা বোঝেনা , ভালোবাসার মানদন্ডে অগ্নপরীক্ষা বোঝে , ত্যাগের প্রতীকী মন্ত্রে রামকে  প্রতি পলে অনুভব করাবে নিঃসীম শূণ্যতা। যা একদিন সে পেয়েছে , আজ অশোক কাননে গভীর নিস্তবব্ধতা ছেয়ে আছে , আজ যে  ভালোবাসার অগ্নিপরীক্ষা।

জগন্নাথ বনিক

স্বপ্ন ভঙ্গ 

চেয়ে চেয়ে দেখি বলতে না পারি,
কত না শুনেছি মুখের ভাষণ।
ঠেকেছে পিঠ দেয়ালে আমার,
অথচ আজও শুনেনি আমার মুখের  একটু কথন।

চলেছি হেঁটে পথে পান্থরে,
যাচ্ছি  আজও মানুষের ঘরে ঘরে।
আমার হাতটা ধরেনি কেউ,
আজও একটু শক্ত করে।

কত যে মনের স্বপ্ন ছিলো,
আশা গুলি আজ নিরাশ হলো।
তবুও জীবন রেখেছি বাজি,
চলছি হেলে দোলে।

শ্রী গঙ্গাধর বাগ্দী

অপার্থিব

অশ্রু ঝরে বুকটা হল প্রকাণ্ড এক নদী 
কাঁদাবে কি আমায় তুমি নিরবধি ,
জানিনা রইলে দূরে তুমি কোন অভিমানে 
ভোরের পাখি ঘুম ভাঙ্গায়    নিজের কলতানে। 
 
রোজই রাঙ্গা সূর্য ওঠে  তবু হয়না যেন সকাল
নীরবে আঁধার ঘনিয়ে আসে আমার পরকাল,
ভগ্ন বুকে সইব কত আর বিষাদের জ্বালা 
উন্মুক্ত দ্বারটি বোধহয় এবার 
পড়বে তালা।

কেমনে তখন তুমি অনায়াসে করবে প্রবেশ 
কেমনই বা  তোমার মনের     কাটবে আবেশ, 
দেখবে আমায় আকাশ মাঝে তারার বেশে
নীরবে আমি দেবো পাড়ি মৃত্যুর দেশে।

স্বপন দেবনাথ

ক্ষনিকের ভালোবাসা 

হয়েছিল দেখা সেই বৈশাখী মেলায়,
দিনের শেষে সেই পড়ন্ত বেলায়।
চেয়েছিলে মোর অবুঝ মুখের পানে, 
তোমা প্রেম সুর ভেসে আসল কানে।
ক্ষণিকের জন‍্য পরে না চোখের পলক, 
মুগ্ধ, দেখে আমি  তোমারি প্রেমের ঝলক। 
ভেবেছিলাম দুজনে মিলে যাব তেপান্তর, 
মোদের মাঝে প্রেম শিখা জ্বলবে নিরন্তর।
অমনি সময় চারদিক কালো করে, 
অন্ধকার নেমে আসল কালবৈশাখীর তরে।
চারিদিক ছুটোছুটি, মনে অস্থিরতা, 
ভয়ের পাখি উড়াল দিয়ে বারাল আকুলতা।
হঠাৎ দেখি সম্মুখ হতে গেছ তুমি হারিয়ে, 
একাকিত্বে আছি আমি তোমার  অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে।

পিয়াল দেবনাথ

গোড়ার কথা

আজ রাতে তোমার সাথে অনেক কথা ছিল।
বহু কালের সঞ্চিত কথা।
একটি আস্ত বিশ্বের ব্যাপারে।
নির্জীব সজীবের অন্তরালে একটি আত্মার ব্যাপারে।
বহু দূর থেকে আসা বৃষ্টি বিন্দু
আমার জানালার বাইরে, ল্যাম্প পোস্টের আলোয়
মুক্তোর মত ঝরে;
বাতাসে হেলে দুলে।
সেই বৃষ্টি হঠাৎ আমায় ভিজিয়ে দেয়,
আমার মুখমন্ডলে আলতো ভাবে ঝরে পরে।
এই স্নেহের পরশে নিজেকে ভিজতে দিলাম।
তারা কি যেন বলতে চায় আমায়।
তাই বেরিয়ে পরলাম ঝড়ো বর্ষনে,
নিঝুম শীতল বারি বিন্দুর কথা
কান পেতে শুনতে ও মন পেতে অনুভব করতে।
ভীষণ অসহায় তারা - হে স্নেহের মূর্তমান।
তাদের স্পর্শে যে নতুন জীবন জাগে।
সৃষ্টি কালের এক প্রাচীন ভাষায় তারা বলে -
"টিপ্ - টিপ্ - টিপিক্" 
অনেক দূর থেকে আসি তোমার কাছে।
"টুপ্ - টুপ্ - টুপুস্"
দিওনা মাটিতে আছড়ে পড়তে।
"ছপাশ্ - ছপাশ্ -ছম্ ছম্"
আমার ভীষণ ব্যাথা হয়।
"ঝনাত্ - ঝনাত্ - ঝন্ ঝন্"
আমায় আগলে নাও তোমার হাতে।
তাই এই বৃষ্টি বিন্দু তালুবন্দি করে,
করলাম আমার মুখমন্ডলে স্থাপন।
ঐ বৃষ্টির জল তাই আমার মধ্যে জীবিত।
অার আমি তাদের মতই  আজ দূর্বল
ভঙ্গুর, নশ্বর ও ভীত।
তাই তুমি আমায় আজ কাছে টেনে নাও,
যত্ন সহকারে।
ভেসে যেতে দিও না রাতের অন্ধকারে।

নীরেশ দেবনাথ

সুখ

হাজার লোকের ভিড়ে ছিলে তুমি মিশে।
তোমারে প্রথম চিনি কিসে -
সে কথাটি নেই তো মোর জানা,
শুধু জানি এই - স্বপ্ন মাঝে মেলে দিয়ে ডানা 
এসেছো গিয়েছো বহুবার।
মনে হল, এই বুঝি সেই মুখ আমার প্রিয়ার।
ভালোবাসা জানি বা না জানি
প্রথম মজেছিনু দেখি তব মুখখানি;
আজ তুমি নও স্বপ্ন সমা,
আমি আজ তোমারি মাঝে সমা।
তুমি কত সুন্দর, কত সুন্দর তব মুখ
জন্ম-জন্মান্তর যা চেয়েছি - মিলেছে সেই সুখ।

ধ্রুবজ্যোতি চক্রবর্তী

প্রিয়

আমার হিয়ার মাঝে 
তব পরশখানি ফুটিয়ে তোল
আমার আঁধারে তোমার আলো খানি দীপ্ত কর
আমার তন্দ্রা তোমার আখি ভোরে সাজায়ে লহ
তোমার রজনী আমার কিরনে ভরিয়ে লহ
দিন শেষে আজ কহ হে সখা ছাড়িয়া যাইবে না কভু
সকল দূঃখ সুখ লইব ভাগ করি
করি এ প্রতিজ্ঞা 
নববর্ষে নব অঙ্গীকার করি 
চলিব মোরা হাতে হাত ধরি।

পুলক রায়

গোবরে পদ্মফুল

প্রবাদ বাক্য বাস্তবের রূপান্তর প্রকট সত্য। নবেন্দু দিব্যেন্দু সুখেন্দু পূর্ণেন্দু ইত্যাদির যৌথ সংসার ।প্রত্যেকেরই দুটি বা তিনটি করে ছেলে মেয়ে ।পৃথা দিব্যেন্দুর প্রথম কন্যা ,মামার বাড়ি থেকে মাধ্যমিক পাস করার পর গ্রামে গ্রামে রটে গেল পৃথা এখন বিবাহযোগ্য কন্যা ।যদিও বংশের অন্যান্য ছেলে মেয়ে কেউ ইস্কুলে যায় বা স্কুল পালানোর মত মাঠে ডাংগুলি, মার্বেল ,দাপাদাপি ছুটোছুটি করে বিকেলে বাড়ি ফিরে আসে স্বরস্বতীর পিন্ডি চটকে।

   হঠাৎ একদিন মেঘ না চাইতে জলের মতো এক ঘটকউপযুক্তছেলে(পাত্র )সহযোগে সম্বন্ধ নিয়ে অগ্রহায়ণের শীতের বিকালে উপস্থিত। কথাবার্তা দেখাশোনা সব নিমেষের মধ্যে

শেষ হলে আনন্দ উৎসবের সন্ধান খুঁজে পেল সকলে। "ওঠ মেয়ে তোর বিয়ে"। বাড়ি শুদ্ধু সকলের আনন্দে উচ্ছ্বাসের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস বাতাসে বাড়ি বাড়ি গ্রাম শুদ্ধু ছড়িয়ে পড়ল। কারো কারো মুখে প্রকাশ পেল আমাদের  পৃথা সাক্ষাৎ লক্ষী এক কথায় বিয়ে, ভাবা যায়। তাছাড়া বড় ঘরের উচ্চ শিক্ষিত ছেলে, এসব কোন ঘরের কন্যাগ্রস্থ পিতা মাতা ,কাকু কাকিমা ছাড়ে? রাতারাতি বিসমিল্লাহ সানাই এর সুরে অঘ্রানের তৃতীয় সপ্তাহে পতিগৃহে যাত্রা সমারোহে সম্পন্ন হয়ে যায়।


         অষ্টমঙ্গলা, দ্বিরাগমন, হানিমুন ,প্রথম জামাই ষষ্ঠী ইত্যাদিঅনুষ্ঠানেআসা-যাওয়ায় যখন বোঝা গেল জামাই মিলুকে মিশুকে দিলখোলা দরদী পরোপকারী সহানুভূতি প্রবণ ইত্যাদি, তখন সব শ্বশুর-শাশুড়ির হৃদয় গর্বে 56 ইঞ্চি হয়ে দাঁড়ায় ।গর্বে চঞ্চল চক্ষু ও মনের কথা কয় ,মেয়ের মুক্তমনের স্বাধীনতা যদি বাপের বাড়ির জলে মিশে জল বাড়ায় তবে মেয়ে-জামাইয়ের সব আসা-যাওয়া উৎসবের রূপ নেয়।

পতির বেহিসেবি পয়সায় বিলাসিতা সোনার গয়না পোশাকি আড়ম্বরের পর মন কান্দে গ্রাম্য বাবা-মা ভাই ও আত্মীয়দের অসচ্ছলতার জন্য। স্বামীর অর্থ খরচ করা বেড়ে যায় স্বহস্তে কিন্তু স্বামীকে না বলে বাপের বাড়িতে অর্থ দিলে অন্য অর্থে চুরি করা হয়, অন্যায়। এই দূরদর্শিতা মাধ্যমিক বিদ্যাগুনে। এমন স্বজ্ঞান কর্তব্য পরায়না প্রাজ্ঞ স্ত্রীর জন্য জামাইবাবাজীবন স্ত্রীর কথায় অন্ধ। পৃথার চোখেই জামাই শ্বশুরবাড়ির সবাইকে চেনেন জানেন এবং বিশ্বাস করেন।

পৃথা প্রিয়দর্শনী কর্তব্য পরায়না বাক ও কর্ম চতুর আহ্লাদিনী হৃদয়হরনী , কুহকিনী ও বটে ।পৃথার বিয়ে হয়েছে ব্যবসায়ী বিলাসের  সাথে। বর্তমানে পৃথা একমাত্র কন্যা সন্তানের মা। পুত্র সন্তানের কামনায় জামাই বিলাস তিরুপতির মানত করে এবং হাতের নাগালেই সিদ্ধি লাভ হয় কিন্তু নারী কালনাগিনী অন্ধবিশ্বাসে।পৃথার গর্ভে দ্বিতীয় সন্তান এলে পৃথা পুত্র সন্তানের সুখা পেক্ষা পিতা ও সহোদরের সুখান্বেষণে স্বামীর কাছে গল্প করে তোমার এই বিস্তৃত ব্যবসায় যদি আমাদের সুমন টা কে সংসারে ঠাঁই দাও কিছুটা তো স্বস্তি পেতে পারো। 

বর্তমান এই দুর্মূল্যের বাজারে এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সদিচ্ছায় দ্বিতীয় ইস্যুর প্রয়োজন আছে কি? সুমনকে পুত্র-স্নেহের সংসারে ঠাঁই দিয়ে মানুষ করলে ওই ভবিষ্যতে আমাদের পুত্র সন্তানের কাজ করে দিতে পারবে। বয়সে তোমার থেকে কত ছোট দেখেছ।তাছাড়া আমাদের মেয়েটাকে আরো ভালো করে মানুষ করতে হবে ।সে বিরাট বড় হবে, ভবিষ্যতে প্লেন চালাবে ,সে দেশ বিদেশ ঘুরবে তার সাথে আমরাও ঘুরবো ভবিষ্যৎ ভালো হবে ।সুমন তখন আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য দেখবে জমি জায়গা লক্ষ্য করবে।

পৃথার কথা বিলাসের পছন্দ হয়নি তাই গম্ভীর মুখে রাত্রে বিছানায় পাশ ফিরে শোয় অশান্তি গোপন করে এবং মনে মনে ভাবে নিজের ছেলে মেয়ে  বাপ-মাকে দেখে না, সম্বন্ধী দেখবে ?আকাশ কুসুম স্বপ্ন !এইসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ে।

দিন গড়ায় সুমনের ঠাঁই হয়ে যায় বোনের বাড়িতে বোনের সদিচ্ছায় ।অন্যদিকে পৃথার উল্টি  উদগীরণ বাড়ির সবার চোখে পড়ে ।সকলেই চাপা আনন্দে উৎফুল্ল হয়। এসব অগ্রাহ্য করে মাতৃত্ব বিসর্জন দিয়ে, স্বামীকে ভুল বুঝিয়ে, শাশুড়িকে হেয় প্রতিপন্ন করে ওষুধ সেবনে ভ্রুন নষ্ট করে  বৃষবিক্ষের বীজ রোপন করে। এই কৃতকর্মের জন্য সমগ্র পরিবার ও বিলাসের হতাশা যন্ত্রণা ব্যাকুল কান্না লোকচক্ষুর দৃষ্টি এড়ানো গেলোনা, অথচ আত্মসুখে পৃথার সহোদর সব জেনেও ভগ্নির বাড়িতে কর্মব্যস্ত। বাবা-মাকে শেয়ার পর্যন্ত করলো না। ভ্রুন প্রাণ পেল না,বংশ প্রদীপ ঠাঁই পেল না, বিলাস কন্যা ভাই বোনের সম্পর্ক বুঝলো না, হিন্দু শাস্ত্র মতে বিলাস মুখাগ্নি রক্ষাকর্তা পেল না । জামাইয়ের বে-হিসাবি অর্থে পৃথা ও সহোদর সুমন ছিনে জোঁকের মত বসে স্বার্থসিদ্ধির স্বপ্ন পূরণ করতে থাকে।


কথায় বলে "ধর্মের কল বাতাসে নড়ে "ভ্রুন নষ্ট করে মরনরোগ সঙ্গী করে পরপারের খাতায় নাম লেখায়। পৃথা যাওয়ার পূর্বে জীবন সাথীর হাত ধরে বলে- ক্ষমা করো আমায় ,তোমার স্বপ্ন সত্যি করতে পারিনি, তোমার কথা রক্ষা করতে পারিনি ,তাই চললাম। যেকোনো মৃত্যুই দুঃখের কারণ ।দিদির মৃত্যু ভাই অনুভব করলে ও ষোল কলা ইচ্ছা পূরণের লক্ষ্যে পিতা-মাতাকে চিন্তার অকূল সমুদ্রে রেখে চুপ থাকে। সন্তান হারানোর জ্বালা সব পিতা-মাতার বুকে শেল বিদ্ধ করে ,তাই আজ ও অশ্রু সম্বরন করতে পারেন না ।দিন যায়, ক্ষন যায়, সময় বদলায়। স্মৃতি জলে ঢিল পড়া  ঢেউয়ের মত মিলিয়ে যায়। আজ মেয়ে পৃথার দৌলতে বাপের বাড়ি পরিচয় যোগ্য শহুরে অট্টালিকায় খয়ের খাঁ। ক অক্ষর গোমাংস মামা চাঁদের হাটের উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাই মেয়ের প্রশংসায় আজ  সন্তান হারা পিতা নির্দ্বিধায় উচ্চারণ করে আমার মেয়েপৃথা যদি আর দু'টো বছর বাঁচতো তবে আমি শিলাইদহের জমিদারিত্ব সহ কোটিপতি হয়ে যেতাম। এখানে স্বস্তি এবং অনুশোচনা কি একে অপরের পরিপূরক জানি না!

তাই বলি--

যদি কুরুক্ষেত্র হয় শকুনি বিধান ,

তবে সংসারে সম্পর্কিতকে দিও না স্থান।


পৃথা ইহলোক ত্যাগ করেছে 5 বছর আগে। বিপত্নীক বিলাস তাই শ্বশুরবাড়ীর অভিমুখী খুব একটা হয় না ,তবু সম্পর্কটা অস্বীকার করে না কারণ নাবালিকা কন্যার জন্য।মামার বাড়ি প্রীতি সব সন্তানের কাছে অন্যরকম, যতদিন যায় সম্পর্ক ততটাই বিপরীত পথে হাঁটতে থাকে। যেটুকু সম্পর্ক টিকে আছে তা জামাইয়ের বিলাস বৈভব সম্পত্তির জোরে। দাদু দিদা দু-একবার নাতনিকে হারিয়ে যাওয়া মেয়ের স্মৃতিটুকু হিসেবে আদরে আবদারে নিয়ে গেছে ,হয়তো বা জামাইকে ও। মামা বাড়িতে গোপনে কেউ কেউ জিজ্ঞাসা করেছে -"বাবা তোকে  ভালোবাসে তো ?মারধর করে নাকি? যা চাস এনে দেয় তো?" ইত্যাদি ইত্যাদি। নাতনি চুপ করে সব শুনে বাড়ি ফিরে বাবাকে সব শেয়ার করেছে, বাবা শুধু জিজ্ঞাসা করে কে কে জিজ্ঞাসা করেছিল? সঙ্গে আর কে কে ছিল?সব শোনার পর বাবা মেয়েকে বোঝায়--মা তুমি এত অল্প বয়সে মাতৃহীন হয়েছে, তাই সবার মনে একটা সংশয় তৈরি হয়েছে। তাছাড়া স্বরস্বতীর পিন্ডি চটকানো অকালকুষ্মাণ্ডের বিদ্যা বুদ্ধি সংকীর্ণ মনের কাছে বেশি কি আশা করা যায়?

দেখতে দেখতে আরও কয়েক বছর কেটে গেছে, নাতনি এখন গ্রাজুয়েট ।বাড়িতে থাকে সময় অতিবাহিত করার জন্য ছবি আঁকে ,দু-চারটি মেয়েকে টিউশনি পড়ায়, মাঝে মাঝে খুড়তুতো ভাইদের সঙ্গে খেলে গল্প করে ।যখন  দেখে তারা মামা বাড়ি যায়, পিসতুতো ভাই বোনেরা তার মামাবাড়ি আসে, তখন একাকীত্বটা নিরবে ঢাকে মায়ের ছবি তে, মনস্থির করে। বাবার চোখে পড়লে বাবা মনে শক্তি যোগায়-- মায়ের প্রতি ভক্তি থাকলে তুইও বড় হবি প্রতিষ্ঠা পাবি। বিদ্যাসাগর মাইকেল বিবেকানন্দকে দেখেছিস তো ,তোকে ধরে রাখবে কে ? তুই ও আমার মা আমার শক্তি।

এবার মামার দেশের বাড়ি থেকে নিমন্ত্রণ পত্র এসেছে মায়ের খুড়তুতো বোন তথা মাসির বিয়ে ।বাবার যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না কিন্তু রক্তের সম্পর্ক মেয়ের ইচ্ছেটা বাবা অবহেলা করতে পারল না। বিয়ের দিন দুজনে উপস্থিত হল ।দিদিমার অভ্যর্থনায় রাত্রিটা কোনমতে কাটলো, "কোনমতে" বলার কারণ নিজের দিদা দাদু ছাড়া কেউই তেমন আর আগের মতো চেনে না ,মায়ের অবর্তমানে। মায়ের কাকু-কাকিমার ও অন্যান্য মামা মাসিরা সকলেই যেন অপরিচিত অনুষ্ঠানে। রাত্রের খাওয়া টা বুফে সিস্টেম ছিল তাই অসুবিধে হলো না ।পরের দিন সকালে সদ্যবিবাহিতা মাসির পতিগৃহে যাত্রা সমাপন হওয়ায় গুটিকয়েক আত্মীয় নিয়ে বিয়ে বাড়ির পাত্র,বরকর্তা অন্যান্য সকল কাজকর্ম এবং ক্যাটারারের পরিবেশন, প্যান্ডেল ইত্যাদির আলোচনায় প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠে।তারই মাঝে সুখেন্দু দিব্যেন্দু পূর্ণেন্দু ইত্যাদির বউ ছেলে মেয়েরা যে যার নিজের নিজের ভাই ভাঁজ মেয়ে জামাইকে নিয়ে ব্যস্ত। মেয়ের দিদা যৌথ সংসারের কাজে ব্যস্ত থাকায় বিপত্নীক বিলাস বাবু  এবং মেয়ে ঠক বাছতে মনের গাঁ উজার করে ফেললেন। সকালের চা জলখাবার ,দুপুরে স্নানেরতেল গামছা জুটলো অবহেলায় অসময়। দ্বিপ্রাহরিক আহার ও  তথৈবচ। ঘড়ির কাঁটা দুটো ছাড়িয়ে গেলে বিলাস বাবু নিজেদের অবহেলা গোপন করে বাড়ি ফেরার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন দেখে হন্তদন্ত হয়ে শাশুড়িমা হাজির ।নিজের বউমাকে ডেকে বললেন--বৌমা তোমাদের নন্দাই ভাগ্নি গার্হস্থ্য অনুষ্ঠান বাড়ি থেকে ভরদুপুরে না খেয়ে চলে যাবেন তোমরা দেখবে না? ছোট বৌমা উত্তর করলো-- বাড়ির অন্যান্য কাকিমারা কাকুরা তাদের মেয়ে জামাই ভাই ভাঁজেদের নিয়ে এক একটা টেবিলে বসে আছেন কোথায় দেব ?টেবিল-চেয়ার ফাঁকা নেই !

জামাই:-মা, ব্যস্ত হবেন না। আমি এইমাত্র পাশের বাড়ির রাজুদা জোর করে ধরে নিয়ে গেছিল অনেক খাইয়েছে আর খাব না ।আপনি বরং মেয়েটা কে খাইয়ে দিন ।

শাশুড়ি :-সে কি করে হয়?

দুই শালা ভাজ শহুরে হাওয়ায় গ্রাম্য রীতিতে  অনভ্যস্ত। সব বাধা কাটিয়ে বিলাস বাবু সব অবহেলা করে গোপন করে মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন ।পথে মেয়েকে বললেন মা আমি কেন আসতে চাইছিলাম না বুঝলি? এই বংশে তোর মা ছিল গোবরে পদ্মফুল মামার বাড়ির শিক্ষাদিক্ষায়, আর সব মামারা ক অক্ষর পলাশ ফুল, আর অন্যান্য মামামাসিরা অন্তঃসারশূন্য এখন। তাই কথায় বলে "ঝিউড়ি ছাড়া শশুরঘর মিছে প্রত্যাশা জামাই আদর!"মা ছাড়া মামাবাড়ি ---দিনগুনে পাপ ক্ষয়করি।

তপনকান্তি মুখার্জি

অফুরান 

সকলের মাঝে একা হতে হতে খুচরো কথাগুলো ঘুমিয়ে পড়ে । নিজের মতো ফিরে যাই চেনা জমিতে । জীবন মোড় নেয় চুমুর মতো । চুপ হয়ে যায় পাড়াপড়শির খেউড় , নেংটি ইঁদুর আশ্রয় নেয় চালের ড্রামে । আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি , তির - ধনুক হাতে তখনও পাহারায় কালপুরুষ । ভয়ে সুড়সুড় করে মূর্তিমান অহং পালায় । আমি আমার দিকে চেয়ে থাকি , ডুবে যাই গভীরে । পায়েসের বাটিহাতে সুজাতা আসে । প্রতি গ্রাসেই ভূমানন্দ । 

কল্যাণ দাস

আমি তো এমন চাইনি!
              

জীবনটা হোক সবুজ স্বপন
জোছনা মাখা চাঁদের মতন,
তাতেই বুঝি লেগেছে গ্রহণ
আমি তো এমন চাইনি!

চেয়েছি জীবনে খুশির রেখা,
আঁকাবাঁকা পথে পাই যেন দেখা,
হাজারের ভিরে তবুও একা
আমি তো এমন চাইনি!

আমার প্রিয় তারা সকল,
আমি বন্ধু তাদের নই যে নকল,
নকলেরা সব করছে দখল
আমি তো এমন চাইনি!

আপনার চেয়ে আপন যে জন
দিয়েছি যে আমি মনের আসন,
সেথায় বুঝি ধরবে ভাঙন
আমি তো এমন চাইনি!

মনেতে জমেছে কালো মেঘ তায়
বিদ্যুৎ শুধু আজ চমকায়,
অশ্রু গড়িয়ে ঝরে কবিতায়
আমি তো এমন চাইনি!