অসুস্থ ভিড়ে বসে আছি। অসুখেরা হাঁটে।
চোখে ছায়া ফেলে নির্জন-কোলাহল।
এসব ছায়াদের জড়ো করি।
দিনের শেষে মনে হয়,
এত অসুস্থতা ছায়ারূপে জমে আছে আমার শরীরে।
শরীরের শীতলতা কমে। পোড়া গন্ধ বাড়ে।
ভিড় ভেঙে ছায়া ফিরে অন্য অসুখের বাড়ি।
প্রাকৃত
কত শত শরীরের ভাজে ভাজে
বিবেকহীন কালো কলমের শীসে রক্তের কালি লিখে দিচ্ছে শুধুই নির্মমতার ইতিহাস।
বর্বরতা আজ পাহাড় ছুঁয়েছে....
ঝর্ণা বলে; আমি আপন ধর্মে মিশে নুড়ি থেকে বিশাল শিলাকে স্পর্শ করে মিশি সমুদ্রের জলে আর পদ্মা মেঘনা গঙ্গা যমুনার স্রোতে ভাসি প্রকৃতির মাঠে মাঠে।
তোমাদের মতো ধর্ম নিয়ে তর্ক করি না....
বৃক্ষ বলে; আমার শরীর জুড়ে ছোট ছোট পরগাছা আমি ভালোবেসে বুকে আগলে রাখি জাত বুঝিনা জাত খুঁজি না, তাই লালন ফকিরের গানের একাতারার সুর আজও হৃদয়ে।
তোমাদের হৃদয়ে সে সুর তোমরা বাজাতে পারো না.....
অসাম্প্রদায়িক চেতনায় যুদ্ধের চিতা জ্বালাও হিংসার দাবানলে....
প্রকৃত ধর্মের মানে তোমরা বোঝ না।
ছায়াসঙ্গী
“তোমার প্রশ্রয় তো কিছু কম নয়। কোনো কিছুরই তোয়াক্কা নেই। এবার বোঝো!"
রত্নদীপা চুপচাপ চায়ের কাপদুটো টেবিল থেকে তুলে নিতে নিতে একবার ছেলের ঘরের বন্ধ দরজার দিকে তাকায়। ভেতরে যেন অনেকগুলো দরজা দুমদাম করে বন্ধ হয়ে যায়। চলে যায় রান্নাঘরের দিকে যেখানে নিজেকে সবচেয়ে বেশি কাছে পায়। পঁচিশ বছরে নিলয়ের এইসব কথা শোনাটা এখন অভ্যস্ততায় দাঁড়িয়ে গেলেও আজ যেন ব্যথাটা ভেতরে চিনচিন করছে। এমনিতে নিজেকে সামলে চুপ থাকে আর আজ চেষ্টা করেও ভেতর থেকে দু ঠোঁটের ফাঁকে কথা টেনে আনতে পারছে না। আজ যে অনেক কথা শুনতেই হবে এটা জানাই ছিল। শোভন আবার চাকরিটা ছেড়ে এসেছে। এতো ভালো প্যাকেজ! এতো ভালো পোস্ট! তারপরও।
প্রতিবার শোভন নতুন চাকরিতে ঢোকার সময় রত্নদীপা বিদেশের মাটিতেও নাম না জানা বেশি বেশি ফুল দেবদেবীর চরণে দেয়। অসহায় প্রার্থনা করেন ছেলের মতিগতি শুধরে দিতে। কিন্তু কোনোবারই তার শঙ্কা আর প্রার্থনা পৌঁছয় না জায়গামতো। চোখের সামনে ছেলের পাগলামোগুলো দেখে। তিনবছরে কতবার যে দেখেছে বিষাদ নদীর ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া! ছোট থেকে এই ছেলের জন্য কত কথাই না শুনতে হয়েছে! নিলয়ের কাছে, শোভনের স্কুলের টিচারদের কাছে; আত্মীয়দের কাছে। বকুলতলায় কতবার যে ও স্কুল পালিয়ে নদীর ধরে চলে যেত! গাছের তলায় বসে থাকতো চুপচাপ। বাড়ি ফিরে সন্ধ্যায় পড়তে বসে অন্যমনস্ক হয়ে পড়তো। উল্টো পাল্টা কী কী বলতো। যেদিন বললো, “জানো মা আজ দেখলাম আমার প্রিয় গাছটা হেঁটে যাচ্ছে কনকলতা নদীর কাছে। কনকলতার হাত ধরে কত কী গল্প করছে! কনকলতা তাকে গান শোনাচ্ছে। একসময় সে কনকলতার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লো।“
রত্নদীপা খুব ভয় পেয়েছিল সেদিন। অনেক কথাই চেপে গেলেও এই কথাটা নিখিলকে না বলে পারেনি। শ্বশুর বাড়ির কেউ কেউ বলেছে মাঠে মাঠে বেলা অবেলায় ঘুরে বেড়ায়। নির্ঘাত ভুতে ধরেছে। কেউ বলেছে কালাজাদু করেছে। কেউ তো সরাসরি পাগলই বলে দিয়েছে। চুপ থেকেছে রত্নদীপা। ভেতরে দুঃখের একটা নীরবনদী বয়ে গেছে তিরতির। তারপরই নিখিল ট্রান্সফারের তোড়জোড় করে। শহরে চলেও আসে। সংসার আর ছেলের কথা ভেবে রত্নদীপা নিজের ভালোলাগার ঘরে সেই কবেই তালা লাগিয়ে দিয়েছে।
পড়াশুনোয়-গানে-গিটারে ছেলেটা একেবারে চৌখস। তাই তেমন কোনো কমপ্লেন আর আসে না। আসে বড় বড় সার্টিফিকেট, মেডেল। নিখিল বুকভরা গর্ব নিয়ে বিদেশে পাড়ি দেয় সুখের সংসার নিয়ে।
সুখ আর দুঃখ বুঝি সংসারে পেন্ডুলামের মতোই। স্থির থাকে না। এবার সমস্যা হয়ে গেছে চাকরিতে। খুব ভালো ভালো চাকরি কদিন পরে পরেই ছেড়ে দেয়। অচেনা কোনো কান্ট্রিসাইডে চলে যায় কিছুদিনের জন্য। আর যখন বাড়িতে থাকে টেবিলল্যাম্প জ্বালিয়ে হাতদুটো দিয়ে দেওয়ালে ছায়ার নানারকম আকৃতি তৈরি করে। ঘন্টার পর ঘন্টা। রাতের পর রাত। তাকিয়ে থাকে আপন খেয়ালে। কখনো ডাকতে গেলে জোর করে আটকে মাকেও দেখায় নদীর, মাঠের, গাছের, ফুলের,পাখির কাহিনী। রত্নদীপাও মাঝে মাঝে হারিয়ে যায় ওখানে। নিখিলের অবশ্য এই ভালোলাগাগুলো চাপাই থাকতো যদি সেদিন হঠাৎ শোভন অসুস্থ হয়ে না পড়তো। ঘন ঘন অসুস্থ হয়ে পড়ছে আজকাল। অনেক ডাক্তার দেখানো হলো কিন্তু তেমন পরিবর্তন কিছু নেই। নিখিলের মর্নিংওয়াকের বেশ কজন বন্ধুর মধ্যে একজন বাঙালিও আছেন। নিখিলের মনখারাপটা কিছুদিন ধরেই লক্ষ্য করেছেন। সেদিন জিজ্ঞেস করে পুরো ব্যাপারটা জেনে ওকে হাসপাতালে ডাকলেন। মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে রত্নদীপার মন চাইছিলো না কিন্তু নিখিল জোর করেই নিয়ে গেলো। ডাক্তারবন্ধু কয়েকদিন অনেকটা সময় একা শোভনের সাথে গল্প করলেন। পরীক্ষা নিরীক্ষার পর রিপোর্টগুলো খুব মন দিয়ে দেখলেন। তারপর নিখিল আর রত্নদীপাকে চেম্বারে দেখেই হেসে উঠলেন খুব জোরে। “হিরাইফ (Hiraeth)। এ নস্টালজিক লংগিং ফর এ প্লেস হুইচ ক্যান নেভার বি রিভিজিটেড। সোজা মানেটা হলো শোভনের কোনো রোগই নেই। একটা গ্রামবাংলাকে ও বুকে লালন করে যাচ্ছে সারাজীবন ধরে। আপনারা আপনাদের স্বপ্নে ওকে বাঁচিয়ে রাখতে চাইছেন কেন! ওর ভালোবাসায় ওকে বাঁচতে দিননা! ওর প্রিয় গ্রামটায় যেতে দিন। ওর প্রিয় জগতে। শ্যাডোগ্রাফি কেন করে জানেন? ওই গ্রাম আর নদীটাই ওর ছায়াসঙ্গী। ওদের নিয়েই ছায়ার মায়ায় খেলে যায়। নিখিল রত্নদীপার দিকে চেয়ে থাকে। আনন্দ আর দুঃখের মিশ্ররাগে উজ্জ্বল হয় শেষ বিকেলের কলাপাতা মোড়া রোদ। রাঙামাটির পথ ভেসে ওঠে চোখের ঝাপসা পর্দায় …
ডাকবাক্স
ডাকবাক্সগুলো কেমন হাবার মত দাঁড়িয়ে থাকে এখন রাস্তার পাশে। লাল রং তেমন আর রোমাঞ্চিত করে না আমায়। অথচ কত না ঝড় তুলেছিলাম এর বুকে এক সময়। আমাদের মধুর আলাপনে ছিল অফুরন্ত জল, উচ্ছল। বালুর স্তর জমে জমে বাক্স হয়েছে বিকল। কথা হারিয়েছে ভাষা। লাল বাক্সের ইন্তেকাল হলে ক্ষয়িষ্ণু মন নিয়ে ঘোরাঘুরি করি ইনবক্স থেকে ইনবক্সে। এখানে তো দেখি বেনীআসহকলা! তবু কেন ঝড় ওঠে না বুকে?দুর্বোধ্য ভাষা, ক্লান্তিকর। হাঁফ ছেড়ে বেরিয়ে আসি। বুঝেছি, বয়স হচ্ছে। অচল আমিও, হয়তো একদিন লাল বাক্সের পাশে গিয়ে হাবার মতন দাঁড়িয়ে থাকব। তখন না হয় আবার লাল রংকেই ভালোবাসব।
হাইওয়ে
খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যায় ললিতার। দুজন লোক ঘরে। শ্বাশুড়ি আর বউ। যাদব শহরে কাজ করে। ওদের ঘরে টিভি নেই। এমনি এমনি বিজলী পুড়িয়ে কী লাভ! তাই জলদি খাওয়া দাওয়া করে দুজনেই নিজের নিজের বিছানায় শুয়ে থাকে। ভোরে উঠে পড়ে তাই।
একটু আশেপাশে হেঁটে আসে ঘুম থেকে উঠে। বয়স হয়েছে। তাও একেবারে মাজা পড়ে যায়নি এখনও। হাঁটতে হাঁটতে পথের দুপাশে যা শাক টাক পাওয়া যায়, সেটা তুলে নিয়ে আসে চাদরের ভেতরে ঢুকিয়ে।
দুদিন ধরে আবহাওয়া ভাল নেই। বৃষ্টি পড়ছে থেকে থেকে। তাও , বেরিয়েছে বুড়ি। গায়ের চাদর টেনে নেয় পিঠের উপর দিয়ে। বিহু এসেই পড়ল। এবারে তাঁতে বসতে পারেনি বউ পখিলি। বাচ্চা হবে ওর। পেট নিয়ে এখন বসা কষ্ট ওর । ললিতাই বারণ করেছে।
অন্য বছর বিহুর আগে কিছু গামোচা, চাদর তৈরি করে পখিলী। ওর হাতের কাজ ভাল। পাড়ার বউ ঝি রা বিহুবান দেওয়ার জন্য ওর থেকেই গমোচা , রুমাল নিয়ে যায়।
হাতে কিছু টাকা আসে এই করে। এবার আর হবেনা। না হোক, এতদিনে কৃষ্ণ গোঁসাই মুখ তুলে চেয়েছেন। আইতা হবে ললিতা।
বউয়ের জন্য হাঁটতে বেরোলে রাস্তার পাশের গাছ থেকে বগরি, জলপাই যা যখন পায় কুড়িয়ে নিয়ে আসে। এই অবস্থায় কত কিছু খেতে সাধ যায়, সে কী আর বোঝেনা ললিতা। কিন্তু , কোথা থেকে জোগাড় করবে। না একটু ফল, না ডিম, না দুধ কিছুই দিতে পারেনা। তবু, বউয়ের মুখের হাসি দেখলে মন শান্ত হয়ে পড়ে।
যাদব কে কষ্ট করেই বড় করেছে সে। যাদবের বাবা যখন মারা যায়, সে তখন মেট্রিক দিয়েছে। পাস ও করল। কিন্তু, আর পড়াবার টাকা কোথায়! নিজেই ছাত্র পড়িয়ে হায়ার সেকেন্ডারি দিল। পাস করতে পারেনি।
ললিতা হাঁস মুরগি পুষে, ওদের ডিম বিক্রি করে সংসার চালিয়েছে। মাঠে ধান রুয়ার দিনে অন্যের খেতে ধান রুয়েছে, কারো বাড়িতে ধান সেদ্ধ, চাল ভাজার কাজ থাকলেও করেছে তখন। এভাবেই চলে যাচ্ছিল তখন মা ছেলের দিন।
বাড়িটা ছিল বলে রক্ষে।
গ্রামের ছেলে নবীন শহরে কাজ করে অনেকদিন ধরে। সে ই ললিতা কে বুঝিয়ে যাদব কে নিয়ে শহরে নিয়ে যায়। কাজে ঢুকিয়ে দেয়।
দেখেশুনে বিয়ে দেয় পখিলির সাথে। বাপ মা নেই ওর। মামাবাড়ি থেকে বড় হয়েছে। এখানে এসে ললিতার সাথে খুব মিশে গেছে। বউ কে চোখে হারায় শ্বাশুড়িও।
এতদিন বাচ্চা কাচ্চা আসেনি বলে একটু মন মেরে থাকত বউ। ললিতা সবসময় বুঝিয়েছে , ধৈর্য ধরতে বলেছে।
যাক, এবারে কনমানি আসবে। ললিতার সময় পেরিয়ে যাবে এখন তর তর করে।
পখিলি কদিন ধরেই কাঁচা আম খেতে চাইছে। এদিকের কোনো গাছে এখনো আম সেরকম আসেনি। হাইওয়ের দিকে রমেশ মাস্টারের বাড়িতে বেশ আম ধরেছে। গাছটা রাস্তার দিকেই ঝুঁকে থাকে।
গত রাতে বেশ ঝড় বৃষ্টি হয়ে গেল। তাই সকাল সকাল উঠেই বেরিয়েছে যদি দুটো আম পায়। বউটা তাহলে দুপুরে ভর্তা বানিয়ে খেতে পারবে।
রমেশ মাস্টারের বাড়ির সামনে গিয়ে বেশ কটা কাঁচা আম পড়ে থাকতে দেখে মন খুশ হয়ে যায় বুড়ির। মেখলার কোঁচরে ভরে নেয় আমগুলো।
আবার ঝিরঝির করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ললিতা জোরে পা চালায়। একা আছে ঘরে বউ। আজকাল ললিতার চোখের দৃষ্টিও ঝাপসা হয়ে আসছে।
পেছন থেকে হঠাৎ লরি এসে সজোরে ধাক্কা মারে ললিতাকে। হাইওয়ে দিয়ে স্পিডে গাড়ি যায় সারাদিন , সারারাত।
বাড়ির চোতালে ললিতাকে শুইয়ে রাখা আছে। যাদব পৌঁছে গেছে বাড়ি। পখিলি আছড়ে আছড়ে কাঁদছে।
সূর্যের শেষ আলো এসে তখন ললিতার কপালে পড়েছে। ওর শরীর স্থির।
মেখলার ভাঁজ থেকে কটা আম গড়িয়ে পড়ে থাকে ভিজে উঠোনে।
ষোড়শীর প্রেম
বছরের শেষ সময় ফাগুন মাসের ভরা যৌবনে তোলপাড় প্রকৃতি মা। তাঁরই এক ষোড়শী কন্যা, নাম তাঁর সুলক্ষনা। তাঁর উড়ো উড়ো মন যৌবনের মাতাল স্রোতে প্রেমের নৌকা বায়। কৃষ্ণপ্রেমে রাধা যেমন তীর্থের কাকের মতো প্রতীক্ষার প্রহর গুনে ঠিক তেমনি সুস্মিতাও তাঁর প্রেমিকের জন্য আকুল হয়ে ছটফট করে। আধুনিক প্রযুক্তি বিজ্ঞান অনেক আগে থেকে প্রভূত উন্নতি লাভ করলেও তাঁদের দুই পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে সেই আনন্দের ভাগিদার হওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। মোবাইলে কথা হলেও তাঁদের মধ্যে দেখা হয় না কারণ দামী স্মার্ট ফোন কিনতে গেলে অনেক টাকার প্রয়োজন কিন্তু অবুঝ মন তো
তা বুঝে না। সত্যিকারের প্রেম টাকার চেয়েও অনেক দামী। তারা বছরের মাঝে ঋতুভেদে চুপি চুপি লুকিয়ে দেখা করতো নদীর ধারে, আম বাগানে, পুকুর পাড়ে আরও নানা স্থানে। কত শত সহস্র স্বপ্ন তাদের ঘিরে বাসা বেঁধে ছিল। ধীরে ধীরে প্রেমের তপ্ত দহনে তাদের সম্পর্কের গাঢ়ত্ব বৃদ্ধি পায়, বৃদ্ধি পায় একের প্রতি অপরের দূর্বল মনোবৃত্তি, কামের দহনে তাদের শরীর পুড়ে ছাঁই হয়ে যায়। তারা নেপথ্যের আড়ালে মিলনের আনন্দে বিভোর হয়ে উঠে কিন্ত তার ফলাফল সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণ অবগত নয়। তাদের এই অবাঞ্চিত মিলন ভবিষ্যতে তাদের কাল হয়ে দাঁড়াবে এটা তারা কখনো ভাবেনি। ভরা যৌবন সামাল দেওয়া সহজ সাধ্য ব্যাপার নয়, তারা কামের দহনে পূর্ণ নিমজ্জিত। তাদের অবাঞ্চিত ভালোবাসা হঠাৎ একদিন সমাজের সামনে এসে পড়লো, গ্রামের সকলে হতবাক হলেও তারা একটুও বিচলিত হয়নি কারণ তারা জানত একদিন না একদিন তাদের এমন অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে। গ্রামের বয়ঃজ্যষ্ঠদের পরামর্শে উভয় পরিবারের সম্মতিক্রমে বিয়ের দিনক্ষন ঠিক হয় কিছু দিনের মধ্যে সকল বিধিবিধান মেনে তাদের(সুস্মিতা ও শিমূলের)বিয়ে সম্পূর্ণ হয়। বিয়ের প্রথম এক বছর তাদের মধ্যে প্রেম ভালোবাসা এত গাঢ় ছিলো যে দুইজনকে কখনো একা দেখা যায়নি, শিমূল যেখানেই যেত সাথে করে সুস্মিতাকে নিয়ে যেত। কিন্তু এক বছর পার হতেই তাদের আর্থিক অবস্থা একেবারে ভেঙ্গে পড়ে, ফলে তাদের টাকার চেয়েও দামী ভালোবাসা আজ টাকার অভাবে ফাটল ধরে। কথায় বলে -- "পকেটে না থাকিলে টাকা দুনিয়াটা ফাঁকা, অভাব যখন দরজায় এসে দাঁড়ায় ভালোবাসা তখন জানালা দিয়ে পালায়। " শিমূল অভাবের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে ভুল পথে পা বাড়ায় নেশার কালো ঘুটঘুটে অন্ধকার তাকে গ্রাস করে। সে দিনের পর দিন মাতাল হয়ে বাড়ী ফিরে আর তার মায়ের কথায় তাল মিলিয়ে সুস্মিতার উপর নানা অত্যাচার অবিচার শুরু করে দেয়। সুস্মিতাকে তার বাপের বাড়ী থেকে টাকা পয়সা নিয়ে আসার জন্য উৎপীড়ন শুরু করে। পর্যায়ক্রমে কিছু দিন পর পর এরূপ শোষণ চলতেই থাকে। সুস্মিতা সম্পূর্ণ নিরুপায় হয়ে নিষ্ঠুর পাষান মূর্তি কাছে প্রার্থনা করে। কিছু দিন পর সুস্মিতার ঘর আলো করে এক কন্যা সন্তান জম্ম লাভ করে কিন্তু এই ফুলের মতো নিষ্পাপ মেয়েটি যেন কাল হয়ে এসেছে তাদের পরিবারে। পরিবারের সকলে মেয়েটিকে নিয়ে শোরগোল শুরু করে দেয়, কানাকানি করে বলতে শুনা যায়, কে এই মেয়ের ভরণপোষণ গ্রহণ করবে, আবার অনেকে মেয়েটিকে অলক্ষী, অপয়া বলে নামকরণ করে। মনে হয় যেন মেয়ে জন্মানোর সাথে সাথেই তাদের এক বিশাল ক্ষতি হয়ে গেছে। তখন থেকে সুস্মিতার উপর অত্যাচারটা দ্বিগুণ হয়ে গেলো। এই ছোট্ট ফুলের মতো নিষ্পাপ মেয়েটি কি পাপ করেছিল কে জানে, যার পরিণতিতে সে পরিবার পরিজন সকলে থাকা সত্ত্বেও অনাথ শিশুর মতো একা নিঃসঙ্গ সঙ্গীহীন বন্ধুহীন। কিছুবছর এই ভাবে কেটে গেল, মেয়েটি ধীরে ধীরে বড়ো হয়ে উঠেছে ফলে তার মনে নতুন নতুন চাহিদার উৎপত্তি হলেও তা সে গলা টিপে হত্যা করে। শিমূল প্রতিদিন মাতাল হয়ে বাড়ী ফিরে আসে, স্ত্রী ও মেয়ের চাহিদা পূরণ করতে না পেরে তাদের উপর অন্যায় অবিচার অত্যাচার শুরু করে। একদিন তাদের স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া চরম আকার ধারণ করে। সে (শিমূল) ও তার মা ওইদিন সুস্মিতাকে প্রাণে মারার হুমকি দেয়, কিন্তু তার শ্বাশুড়ীর কথায় এত রাগ না করলেও কিন্তু জীবনে যাকে সবচেয়ে বেশী ভালোবেসে ছিল, যাকে মন প্রাণ দেহ সবকিছু সঁপে দিয়েছিল, সে তাকে মারার হুমকি দেওয়ায় সে সেই সময়ে সেই স্থানেই বেঁচে থেকেও মৃত্যুবরণ করে। তার আর বেঁচে থাকার কোনো ইচ্ছেই রইলো না মনে। সে পাষান পাথরে পরিণত হয়। তার স্ত্রী ( সুস্মিতা) মেয়েকে সাথে নিয়ে বাড়ী থেকে বের হয়ে যায় নিরুদ্দেশে। সে গ্রামের অদূরে এক গভীর কূপে তার মেয়ে সহ ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে।
মনুষত্ব
শহর জুড়ে হিমেল পরশ, রাতের উষ্ণতার পারদ ক্রমাগত নিম্মমুখী।বাইরে ঠান্ডা থাকলেও অফিসের ফোনের জন্য বারান্দাতে এসে দাঁড়িয়েছি। গলির মুখে মধু পাগলি আজকেও রাস্তায় রাস্তায় কীসের সন্ধানে যেনো ঘুরে বেড়াচ্ছে? গায়ে জড়ানো একটা চিটচিটে তুলোর কম্বল, মুখে বিড় বিড় করছে। একদিন ভালো করে শুনেছিলাম আমি বিড় বিড় করছিল সে, " আমার মেয়ে, আমার মেয়েকে দেখেছো কোথায়?" হঠাৎ দেখি তিনটে ছেলে মেয়ে এসে মধু পাগলি কে একটা গাড়িতে তুলে নিয়ে চলে যায়। আমি শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি। ওদের যাওয়ার পথে মনে একটা ভয়ের সঞ্চয় ও হয়।যতই পাগল হোক না কেন, এতোদিন ধরে আমাদের পাড়াতে রয়েছে, তাকে এইভাবে নিয়ে চলে গেল কয়েকজন! যদি কিছু বাজে হয় তার সাথে! কিন্তু আমি বা কী করবো একা এক রাতে? একরাশ চিন্তা নিয়ে ঘুমাতে এলাম । এরপর কাজের চাপে ধীরে ধীরে ঘটনাটা ভুলে ও যাই।
কয়েক মাস পরে একটা কাজে বেনিয়া পুকুরের দিকে গিয়েছিলাম। হঠাৎ নজরে এল একটা অ্যাসাইলামে আমাদের পাড়ার সেই মধু পাগলি ও এখন সুস্থের দিকে । খানিকটা কৌতুহল বশত রিসেপশনে গিয়ে জিজ্ঞাসা করি মধুকে এখানে কে নিয়ে আসে? ওরা যা বর্ননা দেয় ,তাতে বুঝি ওই ছেলে মেয়ে গুলোই ওকে এখানে দিয়ে যায়। এতদিন পাড়াতে থাকার সত্ত্বেও আমরা কিছু করিনি,অথচ অচেনা কয়েকটা ছেলে মেয়ে প্রায় অসম্ভব কাজটাকে সম্ভব করে দেখিয়ে দিল।দেখে খানিকটা লজ্জার সাথে গর্ব ও হল।লজ্জাটা ছিল নিজের মানবিকতা কে বিসর্জন দিয়েছিলাম বলে। গর্বটা ছিল এখনও মনুষ্যত্ব বেঁচে আছে ।খুঁজলে হয়তো এই শহরের বুকে আরও অনেক মধু আর ওই ছেলে মেয়ে গুলোর মতো মানুষের গল্প পাওয়া যাবে,যাদের জন্য মানুষ এবং মনুষ্যত্বের গান আমরা দিনের শেষে গর্ব করে গাইতে পারি। বৈদ্য
শহর জুড়ে হিমেল পরশ, রাতের উষ্ণতার পারদ ক্রমাগত নিম্মমুখী।বাইরে ঠান্ডা থাকলেও অফিসের ফোনের জন্য বারান্দাতে এসে দাঁড়িয়েছি। গলির মুখে মধু পাগলি আজকেও রাস্তায় রাস্তায় কীসের সন্ধানে যেনো ঘুরে বেড়াচ্ছে? গায়ে জড়ানো একটা চিটচিটে তুলোর কম্বল, মুখে বিড় বিড় করছে। একদিন ভালো করে শুনেছিলাম আমি বিড় বিড় করছিল সে, " আমার মেয়ে, আমার মেয়েকে দেখেছো কোথায়?" হঠাৎ দেখি তিনটে ছেলে মেয়ে এসে মধু পাগলি কে একটা গাড়িতে তুলে নিয়ে চলে যায়। আমি শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি। ওদের যাওয়ার পথে মনে একটা ভয়ের সঞ্চয় ও হয়।যতই পাগল হোক না কেন, এতোদিন ধরে আমাদের পাড়াতে রয়েছে, তাকে এইভাবে নিয়ে চলে গেল কয়েকজন! যদি কিছু বাজে হয় তার সাথে! কিন্তু আমি বা কী করবো একা এক রাতে? একরাশ চিন্তা নিয়ে ঘুমাতে এলাম । এরপর কাজের চাপে ধীরে ধীরে ঘটনাটা ভুলে ও যাই।
কয়েক মাস পরে একটা কাজে বেনিয়া পুকুরের দিকে গিয়েছিলাম। হঠাৎ নজরে এল একটা অ্যাসাইলামে আমাদের পাড়ার সেই মধু পাগলি ও এখন সুস্থের দিকে । খানিকটা কৌতুহল বশত রিসেপশনে গিয়ে জিজ্ঞাসা করি মধুকে এখানে কে নিয়ে আসে? ওরা যা বর্ননা দেয় ,তাতে বুঝি ওই ছেলে মেয়ে গুলোই ওকে এখানে দিয়ে যায়। এতদিন পাড়াতে থাকার সত্ত্বেও আমরা কিছু করিনি,অথচ অচেনা কয়েকটা ছেলে মেয়ে প্রায় অসম্ভব কাজটাকে সম্ভব করে দেখিয়ে দিল।দেখে খানিকটা লজ্জার সাথে গর্ব ও হল।লজ্জাটা ছিল নিজের মানবিকতা কে বিসর্জন দিয়েছিলাম বলে। গর্বটা ছিল এখনও মনুষ্যত্ব বেঁচে আছে ।খুঁজলে হয়তো এই শহরের বুকে আরও অনেক মধু আর ওই ছেলে মেয়ে গুলোর মতো মানুষের গল্প পাওয়া যাবে,যাদের জন্য মানুষ এবং মনুষ্যত্বের গান আমরা দিনের শেষে গর্ব করে গাইতে পারি।
সময়
সময় তুমি একটু দাঁড়াও পুরোনো স্মৃতি জেগেছে মনে। সময় তুমি থমকে দাড়াও নাইলে যে সব পর হবে। কতো না স্মৃতি জাগছে মনে সাদা কালো আর রামধনু আঁকা। সময় তুমিএকটু দাঁড়াও স্মৃতিরা সব জাগছে মনে।কতো না হাঁসি কান্নায় আর খেলেধুলে কাটিয়ে দিতাম দিন।সময় তুমি কোথায় গেছ পাইনা তো সেই দিন। বড় বড় বোঝা এখন বই পুস্তক এর চাপ।সময় এখন যাচ্ছে কিভাবে বোঝাই বিপাক।সময় তুমি যাচ্ছ ভালো শরীরটাকে বৃদ্ধ করে।পারো যদি একটু সময় করে মনটাকে একটু নবীন করতে।
ঈশ্বর
মেঘ
আকাশে মেঘ । নীল আকাশের বুকে সাদা মেঘগুলি একদিক থেকে অপর দিকে ছুটছিল । মেঘগুলি বিভিন্ন রূপ ধারণ করেছিল । কখনও বাঘ, কখনও শিংওয়ালা হরিণ, কখনও শুঁড় বিশিষ্ট হাতির আকার নিচ্ছিল । পার্কে বসেছিল তিন কলেজ --বন্ধু । একজন ছেলে, দু'জন মেয়ে । ছেলে বন্ধু বলল, " দেখ, দেখ । মেঘের মধ্যে একটি নৌকো । নৌকোর ওপরে বসে একজন মাঝি নৌকো চালাচ্ছে ।" অপর দু'জন মেঘের ভেতর মেঘ দিয়ে তৈরি করা নৌকা --মাঝির ভাস্কর্য দেখতে পেল । বলে উঠল, "আরে, তাই তো , তাই তো !" একজন মেয়ে বন্ধু বলল, "তাকা , তাকা । মেঘের অন্দরে বিছানা পাতা শোওয়ার খাট দেখা যাচ্ছে ।" অন্য দু'জনে মেঘের মধ্যে মেঘ দিয়ে বানানো শিল্পী মেঘের বিছানা--খাটের কারুকাজ চোখে দেখে বলে উঠল, " বেশ তো, বেশ তো !" অপর মেয়ে বন্ধু বলে উঠল , " চেয়ে দেখ, চেয়ে দেখ । মেঘের অভ্যন্তরে একটি ঘর দেখা যাচ্ছে ।" বাকি দু'জন বন্ধু মেঘের মধ্যে মেঘ দিয়ে ঘরামি মেঘের হাতে নির্মাণ করা ঘর দেখে বলল, " ঠিক, ঠিক !"
আয়না সামনে রেখে শ্যাম্পু করা চুল চিরুনি দিয়ে আঁচড়াতে আঁচড়াতে কুড়ি বছরের মেয়ে নীলাঞ্জনা আয়নার ওপর পড়া মেঘের মধ্যে ' ভ্রুণ 'দেখতে পেল ।
অগ্নিপরীক্ষা
ঘূর্ণায়মান সময়ের রথ এসে দাঁড়ায় মেঘমুক্ত নির্মল সুনীল আকাশের নীচে। মাথার মুকুট খুলে অগ্নিপরীক্ষা দেবে
এযুগের রামচন্দ্র , সবাই দেখবে প্রশস্ত ললাটে সীতার নাম , তবুও ভালোবাসার অগ্নিপরীক্ষা। সীতা নয় রামচন্দ্র বলবে , হে ধরণী দ্বিধা হও ... জীবনতরীর ভারসাম্যহীন খেলায় ভাগ্যচক্র প্রমাণ করে , সবকিছু ই আপেক্ষিক নয়।
স্বেচ্ছা নির্বাসনে বিষণ্ণতা কেই আমন্ত্রণ জানায় এযুগের সতী সীতা, তার প্রতিজ্ঞা তার জেহাদ মুক্তি র কলকাকলীতে ভালোবাসার কবুতর কে
দূর দ্বীপে রেখে আসার , সেখানে নীল জলে নীল দিগন্তে রামচন্দ্রের ভালোবাসার আবাহন এড়িয়ে ব্যাস্ত থাকতে চায় সে , এ যুগের রামের ধনুকে আঁকা বিরহ বেদনার স্বগত প্রলাপ।
সীতা ব্যাকুলতা বোঝেনা , ভালোবাসার মানদন্ডে অগ্নপরীক্ষা বোঝে , ত্যাগের প্রতীকী মন্ত্রে রামকে প্রতি পলে অনুভব করাবে নিঃসীম শূণ্যতা। যা একদিন সে পেয়েছে , আজ অশোক কাননে গভীর নিস্তবব্ধতা ছেয়ে আছে , আজ যে ভালোবাসার অগ্নিপরীক্ষা।
গোবরে পদ্মফুল
প্রবাদ বাক্য বাস্তবের রূপান্তর প্রকট সত্য। নবেন্দু দিব্যেন্দু সুখেন্দু পূর্ণেন্দু ইত্যাদির যৌথ সংসার ।প্রত্যেকেরই দুটি বা তিনটি করে ছেলে মেয়ে ।পৃথা দিব্যেন্দুর প্রথম কন্যা ,মামার বাড়ি থেকে মাধ্যমিক পাস করার পর গ্রামে গ্রামে রটে গেল পৃথা এখন বিবাহযোগ্য কন্যা ।যদিও বংশের অন্যান্য ছেলে মেয়ে কেউ ইস্কুলে যায় বা স্কুল পালানোর মত মাঠে ডাংগুলি, মার্বেল ,দাপাদাপি ছুটোছুটি করে বিকেলে বাড়ি ফিরে আসে স্বরস্বতীর পিন্ডি চটকে।
হঠাৎ একদিন মেঘ না চাইতে জলের মতো এক ঘটকউপযুক্তছেলে(পাত্র )সহযোগে সম্বন্ধ নিয়ে অগ্রহায়ণের শীতের বিকালে উপস্থিত। কথাবার্তা দেখাশোনা সব নিমেষের মধ্যে
শেষ হলে আনন্দ উৎসবের সন্ধান খুঁজে পেল সকলে। "ওঠ মেয়ে তোর বিয়ে"। বাড়ি শুদ্ধু সকলের আনন্দে উচ্ছ্বাসের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস বাতাসে বাড়ি বাড়ি গ্রাম শুদ্ধু ছড়িয়ে পড়ল। কারো কারো মুখে প্রকাশ পেল আমাদের পৃথা সাক্ষাৎ লক্ষী এক কথায় বিয়ে, ভাবা যায়। তাছাড়া বড় ঘরের উচ্চ শিক্ষিত ছেলে, এসব কোন ঘরের কন্যাগ্রস্থ পিতা মাতা ,কাকু কাকিমা ছাড়ে? রাতারাতি বিসমিল্লাহ সানাই এর সুরে অঘ্রানের তৃতীয় সপ্তাহে পতিগৃহে যাত্রা সমারোহে সম্পন্ন হয়ে যায়।
অষ্টমঙ্গলা, দ্বিরাগমন, হানিমুন ,প্রথম জামাই ষষ্ঠী ইত্যাদিঅনুষ্ঠানেআসা-যাওয়ায় যখন বোঝা গেল জামাই মিলুকে মিশুকে দিলখোলা দরদী পরোপকারী সহানুভূতি প্রবণ ইত্যাদি, তখন সব শ্বশুর-শাশুড়ির হৃদয় গর্বে 56 ইঞ্চি হয়ে দাঁড়ায় ।গর্বে চঞ্চল চক্ষু ও মনের কথা কয় ,মেয়ের মুক্তমনের স্বাধীনতা যদি বাপের বাড়ির জলে মিশে জল বাড়ায় তবে মেয়ে-জামাইয়ের সব আসা-যাওয়া উৎসবের রূপ নেয়।
পতির বেহিসেবি পয়সায় বিলাসিতা সোনার গয়না পোশাকি আড়ম্বরের পর মন কান্দে গ্রাম্য বাবা-মা ভাই ও আত্মীয়দের অসচ্ছলতার জন্য। স্বামীর অর্থ খরচ করা বেড়ে যায় স্বহস্তে কিন্তু স্বামীকে না বলে বাপের বাড়িতে অর্থ দিলে অন্য অর্থে চুরি করা হয়, অন্যায়। এই দূরদর্শিতা মাধ্যমিক বিদ্যাগুনে। এমন স্বজ্ঞান কর্তব্য পরায়না প্রাজ্ঞ স্ত্রীর জন্য জামাইবাবাজীবন স্ত্রীর কথায় অন্ধ। পৃথার চোখেই জামাই শ্বশুরবাড়ির সবাইকে চেনেন জানেন এবং বিশ্বাস করেন।
পৃথা প্রিয়দর্শনী কর্তব্য পরায়না বাক ও কর্ম চতুর আহ্লাদিনী হৃদয়হরনী , কুহকিনী ও বটে ।পৃথার বিয়ে হয়েছে ব্যবসায়ী বিলাসের সাথে। বর্তমানে পৃথা একমাত্র কন্যা সন্তানের মা। পুত্র সন্তানের কামনায় জামাই বিলাস তিরুপতির মানত করে এবং হাতের নাগালেই সিদ্ধি লাভ হয় কিন্তু নারী কালনাগিনী অন্ধবিশ্বাসে।পৃথার গর্ভে দ্বিতীয় সন্তান এলে পৃথা পুত্র সন্তানের সুখা পেক্ষা পিতা ও সহোদরের সুখান্বেষণে স্বামীর কাছে গল্প করে তোমার এই বিস্তৃত ব্যবসায় যদি আমাদের সুমন টা কে সংসারে ঠাঁই দাও কিছুটা তো স্বস্তি পেতে পারো।
বর্তমান এই দুর্মূল্যের বাজারে এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সদিচ্ছায় দ্বিতীয় ইস্যুর প্রয়োজন আছে কি? সুমনকে পুত্র-স্নেহের সংসারে ঠাঁই দিয়ে মানুষ করলে ওই ভবিষ্যতে আমাদের পুত্র সন্তানের কাজ করে দিতে পারবে। বয়সে তোমার থেকে কত ছোট দেখেছ।তাছাড়া আমাদের মেয়েটাকে আরো ভালো করে মানুষ করতে হবে ।সে বিরাট বড় হবে, ভবিষ্যতে প্লেন চালাবে ,সে দেশ বিদেশ ঘুরবে তার সাথে আমরাও ঘুরবো ভবিষ্যৎ ভালো হবে ।সুমন তখন আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য দেখবে জমি জায়গা লক্ষ্য করবে।
পৃথার কথা বিলাসের পছন্দ হয়নি তাই গম্ভীর মুখে রাত্রে বিছানায় পাশ ফিরে শোয় অশান্তি গোপন করে এবং মনে মনে ভাবে নিজের ছেলে মেয়ে বাপ-মাকে দেখে না, সম্বন্ধী দেখবে ?আকাশ কুসুম স্বপ্ন !এইসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ে।
দিন গড়ায় সুমনের ঠাঁই হয়ে যায় বোনের বাড়িতে বোনের সদিচ্ছায় ।অন্যদিকে পৃথার উল্টি উদগীরণ বাড়ির সবার চোখে পড়ে ।সকলেই চাপা আনন্দে উৎফুল্ল হয়। এসব অগ্রাহ্য করে মাতৃত্ব বিসর্জন দিয়ে, স্বামীকে ভুল বুঝিয়ে, শাশুড়িকে হেয় প্রতিপন্ন করে ওষুধ সেবনে ভ্রুন নষ্ট করে বৃষবিক্ষের বীজ রোপন করে। এই কৃতকর্মের জন্য সমগ্র পরিবার ও বিলাসের হতাশা যন্ত্রণা ব্যাকুল কান্না লোকচক্ষুর দৃষ্টি এড়ানো গেলোনা, অথচ আত্মসুখে পৃথার সহোদর সব জেনেও ভগ্নির বাড়িতে কর্মব্যস্ত। বাবা-মাকে শেয়ার পর্যন্ত করলো না। ভ্রুন প্রাণ পেল না,বংশ প্রদীপ ঠাঁই পেল না, বিলাস কন্যা ভাই বোনের সম্পর্ক বুঝলো না, হিন্দু শাস্ত্র মতে বিলাস মুখাগ্নি রক্ষাকর্তা পেল না । জামাইয়ের বে-হিসাবি অর্থে পৃথা ও সহোদর সুমন ছিনে জোঁকের মত বসে স্বার্থসিদ্ধির স্বপ্ন পূরণ করতে থাকে।
কথায় বলে "ধর্মের কল বাতাসে নড়ে "ভ্রুন নষ্ট করে মরনরোগ সঙ্গী করে পরপারের খাতায় নাম লেখায়। পৃথা যাওয়ার পূর্বে জীবন সাথীর হাত ধরে বলে- ক্ষমা করো আমায় ,তোমার স্বপ্ন সত্যি করতে পারিনি, তোমার কথা রক্ষা করতে পারিনি ,তাই চললাম। যেকোনো মৃত্যুই দুঃখের কারণ ।দিদির মৃত্যু ভাই অনুভব করলে ও ষোল কলা ইচ্ছা পূরণের লক্ষ্যে পিতা-মাতাকে চিন্তার অকূল সমুদ্রে রেখে চুপ থাকে। সন্তান হারানোর জ্বালা সব পিতা-মাতার বুকে শেল বিদ্ধ করে ,তাই আজ ও অশ্রু সম্বরন করতে পারেন না ।দিন যায়, ক্ষন যায়, সময় বদলায়। স্মৃতি জলে ঢিল পড়া ঢেউয়ের মত মিলিয়ে যায়। আজ মেয়ে পৃথার দৌলতে বাপের বাড়ি পরিচয় যোগ্য শহুরে অট্টালিকায় খয়ের খাঁ। ক অক্ষর গোমাংস মামা চাঁদের হাটের উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাই মেয়ের প্রশংসায় আজ সন্তান হারা পিতা নির্দ্বিধায় উচ্চারণ করে আমার মেয়েপৃথা যদি আর দু'টো বছর বাঁচতো তবে আমি শিলাইদহের জমিদারিত্ব সহ কোটিপতি হয়ে যেতাম। এখানে স্বস্তি এবং অনুশোচনা কি একে অপরের পরিপূরক জানি না!
তাই বলি--
যদি কুরুক্ষেত্র হয় শকুনি বিধান ,
তবে সংসারে সম্পর্কিতকে দিও না স্থান।
পৃথা ইহলোক ত্যাগ করেছে 5 বছর আগে। বিপত্নীক বিলাস তাই শ্বশুরবাড়ীর অভিমুখী খুব একটা হয় না ,তবু সম্পর্কটা অস্বীকার করে না কারণ নাবালিকা কন্যার জন্য।মামার বাড়ি প্রীতি সব সন্তানের কাছে অন্যরকম, যতদিন যায় সম্পর্ক ততটাই বিপরীত পথে হাঁটতে থাকে। যেটুকু সম্পর্ক টিকে আছে তা জামাইয়ের বিলাস বৈভব সম্পত্তির জোরে। দাদু দিদা দু-একবার নাতনিকে হারিয়ে যাওয়া মেয়ের স্মৃতিটুকু হিসেবে আদরে আবদারে নিয়ে গেছে ,হয়তো বা জামাইকে ও। মামা বাড়িতে গোপনে কেউ কেউ জিজ্ঞাসা করেছে -"বাবা তোকে ভালোবাসে তো ?মারধর করে নাকি? যা চাস এনে দেয় তো?" ইত্যাদি ইত্যাদি। নাতনি চুপ করে সব শুনে বাড়ি ফিরে বাবাকে সব শেয়ার করেছে, বাবা শুধু জিজ্ঞাসা করে কে কে জিজ্ঞাসা করেছিল? সঙ্গে আর কে কে ছিল?সব শোনার পর বাবা মেয়েকে বোঝায়--মা তুমি এত অল্প বয়সে মাতৃহীন হয়েছে, তাই সবার মনে একটা সংশয় তৈরি হয়েছে। তাছাড়া স্বরস্বতীর পিন্ডি চটকানো অকালকুষ্মাণ্ডের বিদ্যা বুদ্ধি সংকীর্ণ মনের কাছে বেশি কি আশা করা যায়?
দেখতে দেখতে আরও কয়েক বছর কেটে গেছে, নাতনি এখন গ্রাজুয়েট ।বাড়িতে থাকে সময় অতিবাহিত করার জন্য ছবি আঁকে ,দু-চারটি মেয়েকে টিউশনি পড়ায়, মাঝে মাঝে খুড়তুতো ভাইদের সঙ্গে খেলে গল্প করে ।যখন দেখে তারা মামা বাড়ি যায়, পিসতুতো ভাই বোনেরা তার মামাবাড়ি আসে, তখন একাকীত্বটা নিরবে ঢাকে মায়ের ছবি তে, মনস্থির করে। বাবার চোখে পড়লে বাবা মনে শক্তি যোগায়-- মায়ের প্রতি ভক্তি থাকলে তুইও বড় হবি প্রতিষ্ঠা পাবি। বিদ্যাসাগর মাইকেল বিবেকানন্দকে দেখেছিস তো ,তোকে ধরে রাখবে কে ? তুই ও আমার মা আমার শক্তি।
এবার মামার দেশের বাড়ি থেকে নিমন্ত্রণ পত্র এসেছে মায়ের খুড়তুতো বোন তথা মাসির বিয়ে ।বাবার যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না কিন্তু রক্তের সম্পর্ক মেয়ের ইচ্ছেটা বাবা অবহেলা করতে পারল না। বিয়ের দিন দুজনে উপস্থিত হল ।দিদিমার অভ্যর্থনায় রাত্রিটা কোনমতে কাটলো, "কোনমতে" বলার কারণ নিজের দিদা দাদু ছাড়া কেউই তেমন আর আগের মতো চেনে না ,মায়ের অবর্তমানে। মায়ের কাকু-কাকিমার ও অন্যান্য মামা মাসিরা সকলেই যেন অপরিচিত অনুষ্ঠানে। রাত্রের খাওয়া টা বুফে সিস্টেম ছিল তাই অসুবিধে হলো না ।পরের দিন সকালে সদ্যবিবাহিতা মাসির পতিগৃহে যাত্রা সমাপন হওয়ায় গুটিকয়েক আত্মীয় নিয়ে বিয়ে বাড়ির পাত্র,বরকর্তা অন্যান্য সকল কাজকর্ম এবং ক্যাটারারের পরিবেশন, প্যান্ডেল ইত্যাদির আলোচনায় প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠে।তারই মাঝে সুখেন্দু দিব্যেন্দু পূর্ণেন্দু ইত্যাদির বউ ছেলে মেয়েরা যে যার নিজের নিজের ভাই ভাঁজ মেয়ে জামাইকে নিয়ে ব্যস্ত। মেয়ের দিদা যৌথ সংসারের কাজে ব্যস্ত থাকায় বিপত্নীক বিলাস বাবু এবং মেয়ে ঠক বাছতে মনের গাঁ উজার করে ফেললেন। সকালের চা জলখাবার ,দুপুরে স্নানেরতেল গামছা জুটলো অবহেলায় অসময়। দ্বিপ্রাহরিক আহার ও তথৈবচ। ঘড়ির কাঁটা দুটো ছাড়িয়ে গেলে বিলাস বাবু নিজেদের অবহেলা গোপন করে বাড়ি ফেরার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন দেখে হন্তদন্ত হয়ে শাশুড়িমা হাজির ।নিজের বউমাকে ডেকে বললেন--বৌমা তোমাদের নন্দাই ভাগ্নি গার্হস্থ্য অনুষ্ঠান বাড়ি থেকে ভরদুপুরে না খেয়ে চলে যাবেন তোমরা দেখবে না? ছোট বৌমা উত্তর করলো-- বাড়ির অন্যান্য কাকিমারা কাকুরা তাদের মেয়ে জামাই ভাই ভাঁজেদের নিয়ে এক একটা টেবিলে বসে আছেন কোথায় দেব ?টেবিল-চেয়ার ফাঁকা নেই !
জামাই:-মা, ব্যস্ত হবেন না। আমি এইমাত্র পাশের বাড়ির রাজুদা জোর করে ধরে নিয়ে গেছিল অনেক খাইয়েছে আর খাব না ।আপনি বরং মেয়েটা কে খাইয়ে দিন ।
শাশুড়ি :-সে কি করে হয়?
দুই শালা ভাজ শহুরে হাওয়ায় গ্রাম্য রীতিতে অনভ্যস্ত। সব বাধা কাটিয়ে বিলাস বাবু সব অবহেলা করে গোপন করে মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন ।পথে মেয়েকে বললেন মা আমি কেন আসতে চাইছিলাম না বুঝলি? এই বংশে তোর মা ছিল গোবরে পদ্মফুল মামার বাড়ির শিক্ষাদিক্ষায়, আর সব মামারা ক অক্ষর পলাশ ফুল, আর অন্যান্য মামামাসিরা অন্তঃসারশূন্য এখন। তাই কথায় বলে "ঝিউড়ি ছাড়া শশুরঘর মিছে প্রত্যাশা জামাই আদর!"মা ছাড়া মামাবাড়ি ---দিনগুনে পাপ ক্ষয়করি।
অফুরান
সকলের মাঝে একা হতে হতে খুচরো কথাগুলো ঘুমিয়ে পড়ে । নিজের মতো ফিরে যাই চেনা জমিতে । জীবন মোড় নেয় চুমুর মতো । চুপ হয়ে যায় পাড়াপড়শির খেউড় , নেংটি ইঁদুর আশ্রয় নেয় চালের ড্রামে । আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি , তির - ধনুক হাতে তখনও পাহারায় কালপুরুষ । ভয়ে সুড়সুড় করে মূর্তিমান অহং পালায় । আমি আমার দিকে চেয়ে থাকি , ডুবে যাই গভীরে । পায়েসের বাটিহাতে সুজাতা আসে । প্রতি গ্রাসেই ভূমানন্দ ।