ষোড়শীর প্রেম
বছরের শেষ সময় ফাগুন মাসের ভরা যৌবনে তোলপাড় প্রকৃতি মা। তাঁরই এক ষোড়শী কন্যা, নাম তাঁর সুলক্ষনা। তাঁর উড়ো উড়ো মন যৌবনের মাতাল স্রোতে প্রেমের নৌকা বায়। কৃষ্ণপ্রেমে রাধা যেমন তীর্থের কাকের মতো প্রতীক্ষার প্রহর গুনে ঠিক তেমনি সুস্মিতাও তাঁর প্রেমিকের জন্য আকুল হয়ে ছটফট করে। আধুনিক প্রযুক্তি বিজ্ঞান অনেক আগে থেকে প্রভূত উন্নতি লাভ করলেও তাঁদের দুই পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে সেই আনন্দের ভাগিদার হওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। মোবাইলে কথা হলেও তাঁদের মধ্যে দেখা হয় না কারণ দামী স্মার্ট ফোন কিনতে গেলে অনেক টাকার প্রয়োজন কিন্তু অবুঝ মন তো
তা বুঝে না। সত্যিকারের প্রেম টাকার চেয়েও অনেক দামী। তারা বছরের মাঝে ঋতুভেদে চুপি চুপি লুকিয়ে দেখা করতো নদীর ধারে, আম বাগানে, পুকুর পাড়ে আরও নানা স্থানে। কত শত সহস্র স্বপ্ন তাদের ঘিরে বাসা বেঁধে ছিল। ধীরে ধীরে প্রেমের তপ্ত দহনে তাদের সম্পর্কের গাঢ়ত্ব বৃদ্ধি পায়, বৃদ্ধি পায় একের প্রতি অপরের দূর্বল মনোবৃত্তি, কামের দহনে তাদের শরীর পুড়ে ছাঁই হয়ে যায়। তারা নেপথ্যের আড়ালে মিলনের আনন্দে বিভোর হয়ে উঠে কিন্ত তার ফলাফল সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণ অবগত নয়। তাদের এই অবাঞ্চিত মিলন ভবিষ্যতে তাদের কাল হয়ে দাঁড়াবে এটা তারা কখনো ভাবেনি। ভরা যৌবন সামাল দেওয়া সহজ সাধ্য ব্যাপার নয়, তারা কামের দহনে পূর্ণ নিমজ্জিত। তাদের অবাঞ্চিত ভালোবাসা হঠাৎ একদিন সমাজের সামনে এসে পড়লো, গ্রামের সকলে হতবাক হলেও তারা একটুও বিচলিত হয়নি কারণ তারা জানত একদিন না একদিন তাদের এমন অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে। গ্রামের বয়ঃজ্যষ্ঠদের পরামর্শে উভয় পরিবারের সম্মতিক্রমে বিয়ের দিনক্ষন ঠিক হয় কিছু দিনের মধ্যে সকল বিধিবিধান মেনে তাদের(সুস্মিতা ও শিমূলের)বিয়ে সম্পূর্ণ হয়। বিয়ের প্রথম এক বছর তাদের মধ্যে প্রেম ভালোবাসা এত গাঢ় ছিলো যে দুইজনকে কখনো একা দেখা যায়নি, শিমূল যেখানেই যেত সাথে করে সুস্মিতাকে নিয়ে যেত। কিন্তু এক বছর পার হতেই তাদের আর্থিক অবস্থা একেবারে ভেঙ্গে পড়ে, ফলে তাদের টাকার চেয়েও দামী ভালোবাসা আজ টাকার অভাবে ফাটল ধরে। কথায় বলে -- "পকেটে না থাকিলে টাকা দুনিয়াটা ফাঁকা, অভাব যখন দরজায় এসে দাঁড়ায় ভালোবাসা তখন জানালা দিয়ে পালায়। " শিমূল অভাবের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে ভুল পথে পা বাড়ায় নেশার কালো ঘুটঘুটে অন্ধকার তাকে গ্রাস করে। সে দিনের পর দিন মাতাল হয়ে বাড়ী ফিরে আর তার মায়ের কথায় তাল মিলিয়ে সুস্মিতার উপর নানা অত্যাচার অবিচার শুরু করে দেয়। সুস্মিতাকে তার বাপের বাড়ী থেকে টাকা পয়সা নিয়ে আসার জন্য উৎপীড়ন শুরু করে। পর্যায়ক্রমে কিছু দিন পর পর এরূপ শোষণ চলতেই থাকে। সুস্মিতা সম্পূর্ণ নিরুপায় হয়ে নিষ্ঠুর পাষান মূর্তি কাছে প্রার্থনা করে। কিছু দিন পর সুস্মিতার ঘর আলো করে এক কন্যা সন্তান জম্ম লাভ করে কিন্তু এই ফুলের মতো নিষ্পাপ মেয়েটি যেন কাল হয়ে এসেছে তাদের পরিবারে। পরিবারের সকলে মেয়েটিকে নিয়ে শোরগোল শুরু করে দেয়, কানাকানি করে বলতে শুনা যায়, কে এই মেয়ের ভরণপোষণ গ্রহণ করবে, আবার অনেকে মেয়েটিকে অলক্ষী, অপয়া বলে নামকরণ করে। মনে হয় যেন মেয়ে জন্মানোর সাথে সাথেই তাদের এক বিশাল ক্ষতি হয়ে গেছে। তখন থেকে সুস্মিতার উপর অত্যাচারটা দ্বিগুণ হয়ে গেলো। এই ছোট্ট ফুলের মতো নিষ্পাপ মেয়েটি কি পাপ করেছিল কে জানে, যার পরিণতিতে সে পরিবার পরিজন সকলে থাকা সত্ত্বেও অনাথ শিশুর মতো একা নিঃসঙ্গ সঙ্গীহীন বন্ধুহীন। কিছুবছর এই ভাবে কেটে গেল, মেয়েটি ধীরে ধীরে বড়ো হয়ে উঠেছে ফলে তার মনে নতুন নতুন চাহিদার উৎপত্তি হলেও তা সে গলা টিপে হত্যা করে। শিমূল প্রতিদিন মাতাল হয়ে বাড়ী ফিরে আসে, স্ত্রী ও মেয়ের চাহিদা পূরণ করতে না পেরে তাদের উপর অন্যায় অবিচার অত্যাচার শুরু করে। একদিন তাদের স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া চরম আকার ধারণ করে। সে (শিমূল) ও তার মা ওইদিন সুস্মিতাকে প্রাণে মারার হুমকি দেয়, কিন্তু তার শ্বাশুড়ীর কথায় এত রাগ না করলেও কিন্তু জীবনে যাকে সবচেয়ে বেশী ভালোবেসে ছিল, যাকে মন প্রাণ দেহ সবকিছু সঁপে দিয়েছিল, সে তাকে মারার হুমকি দেওয়ায় সে সেই সময়ে সেই স্থানেই বেঁচে থেকেও মৃত্যুবরণ করে। তার আর বেঁচে থাকার কোনো ইচ্ছেই রইলো না মনে। সে পাষান পাথরে পরিণত হয়। তার স্ত্রী ( সুস্মিতা) মেয়েকে সাথে নিয়ে বাড়ী থেকে বের হয়ে যায় নিরুদ্দেশে। সে গ্রামের অদূরে এক গভীর কূপে তার মেয়ে সহ ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে।