প্রবন্ধ
প্রান্তিক সমাজ ভাবনায় অদ্বৈত মল্লবর্মণ
প্রান্তিক ও শ্রমজীবী জনজীবনের কথাকার অদ্বৈত মল্লবর্মণ তাঁর সাহিত্যকৃতির মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন শ্রমজীবী মানুষের কথা, মানুষের ক্ষুধা দারিদ্র্যতার কথা।
অদ্বৈত মল্লবর্মণের জন্ম তৎকালীন ত্রিপুরার ব্রাম্মনবাড়িয়া জেলার গোকর্ন গ্রামে তিতাস নদীর পাড়ে মালোপাড়াতে।
তিনি নিজে যেমন প্রান্তিক মালো জনগোষ্ঠী থেকে উদ্ভূত তেমনি শৈশব থেকেই দেখেছেন এইসব ছিন্নমূল, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষের জীবন যাত্রা।জাল ও জলকে কেন্দ্র করেই তাদের জীবন আবর্তিত।এইসব দারিদ্র্যক্লিষ্ট মানুষের জীবন ছবি তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর --" তিতাস একটি নদীর নাম" উপন্যাসে।
সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও শ্রমজীবী জনগণের জীবন সংগ্রামের অমর গাঁথা তাঁর এই " তিতাস একটি নদীর নাম" উপন্যাস।
এই তিতাস একটি নদীর নাম " উপন্যাসটিই হলো অদ্বৈত মল্লবর্মণের প্রান্তিক সমাজ ভাবনার একটি অন্যতম প্রামাণ্য দলিল।
লেখক এমন একটি জনগোষ্ঠী থেকে উঠে এসেছেন এবং যে জনগোষ্ঠীর ছবি তাঁর এই উপন্যাসে বিধৃত করেছেন যারা সমাজের একেবারে প্রান্তীয় জনগোষ্ঠীর লোক।জল,জাল,জনমুজুরি যাদের বাঁচার একমাত্র অবলম্বন। দুর থেকে কোন কাল্পনিক গল্প বা উপন্যাস তিনি রচনা করেন নি কারণ বাংলা সাহিত্যে এমন নদী কেন্দ্রীক উপন্যাস আরো অনেক আছে। কিন্তু এই সমস্ত উপন্যাসের ঔপন্যাসিকরা এই জনগোষ্ঠী থেকে উদ্ভূত নয় কিংবা তাঁরা ঐসব জনগোষ্ঠীর সাথে সম্পৃক্ত নয়। অথচ অদ্বৈত মল্লবর্মণ এই প্রান্তীয় জনগোষ্ঠীর এক অন্যতম প্রতিনিধি। শৈশব থেকেই দারিদ্র্যতার কষাঘাতে বড় হয়েছেন তিনি। দরিদ্র পিতামাতার ঘরে তাঁর জন্ম। স্বভাবতই তাঁর লেখক দর্পণে অনিবার্যভাবে ফুটে উঠবে প্রকৃত বাস্তবতার উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।
তিতাসের বহমান জলধারার মতই লেখক তাঁর উপন্যাসে মালো সমাজের ছবি বিধৃত করেছেন।
তিতাস পাড়ের দারিদ্র্যক্লিষ্ট, মৎস্যজীবী সম্প্রদায় মালো সমাজের বাস।জাল ও জলকেই কেন্দ্র করে তাদের জীবন জীবিকা।
চারটি খন্ডের আটটি পর্বে বিন্যস্ত এই উপন্যাস।
খন্ডগুলির যোগসূত্র বা কেন্দ্রীয় চরিত্র বলতে ঐ তিতাস নদী যে- "তিতাস শাহী মেজাজে চলে।তার সাপের মত বক্রতা নাই। কৃপণের মত কুটিলতা নাই। কৃষ্ণ পক্ষের ভাটায় তার খানিকটা শুষিয়া নেয়, কিন্তু কাঙাল করে না, শুক্ল পক্ষের জোয়ারের উদ্দীপনা তাকে ফোলায় কিন্তু উদ্বেল করে না।"
সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও জীবনসংগ্রামের অমর গাঁথা তাঁর এই -- "তিতাস একটি নদীর নাম " উপন্যাস। অদ্বৈত তাঁর এই উপন্যাসে দেখিয়েছেন শোষক এবং শোষিত শ্রেনীর কোন ধর্ম বা জাত নেই। উপন্যাসে তিনি তা তুলে ধরেছেন তিন বিশিষ্ট চরিত্রের মাধ্যমে। তিনি লিখেছেন --" ধনী কৃষক জোবেদ আলীর বাড়িতে কর্মরত দুই দায়বদ্ধ শ্রমিক করম আলী ও বন্দে আলী বলদ ও ষাঁড়ের মত সারাদিন জোবেদ আলীর জমি ও বাড়িতে খাটে। নিজের বাড়িতে যাওয়ার কোন অধিকার নেই। তাদের স্ত্রীরা ও অন্যের বাড়িতে কম মজুরিতে খাটে। তাদের জীবনে আনন্দ - সুখের কোন স্থান নেই। মালিকের দাস ও দাসী হয়েই তাদের জীবন কাটাতে হয়।একই অবস্থা মালো পাড়ার জেলে সম্প্রদায়ের। তিনি লিখেছেন, " বেপারী পিন্দে লেস পাইরের ধুতি,আর জাল্লার লেংটি শুকায় না।"
মহাজনী শোষনের এক নির্মম চিত্র এঁকেছেন অদ্বৈত তাঁর তিতাস উপন্যাসে।
তৎকালীন সময়ে ভারতের গ্রামীণ শ্রমজীবী নারী সমাজ কিভাবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণ ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন তার ও আভাস রয়েছে তাঁর রচনায়। সবচেয়ে কম খেয়ে কিংবা না খেয়ে পরের বাড়ীতে উদয়াস্ত শ্রম দিয়ে ক্লান্ত অবসন্ন অবস্থায় বাড়ি ফিরে সংসারের সমস্ত দায় তাদেরই বহন করতে হয়।
উপন্যাসে করম আলী ও বন্দে আলীর স্ত্রী-দের অবস্থা বর্ননা করতে গিয়ে অদ্বৈত মূলতঃ তৎকালীন সমাজের নারীদের দুর্দশাকেই তুলে ধরেছেন যা আজও আমাদের বর্তমান সমাজে সমান প্রাসঙ্গিক।
তিনি ছিলেন বাস্তববাদী লেখক। তাঁর লেখায় কল্পনা ও রোমান্টিকতার কোন স্থান ছিল না। কলমের কালির তুলিতে তিনি বাস্তবের ছবি আঁকতেন।যা আমরা তাঁর "তিতাস একটি নদীর নাম" উপন্যাসে দেখতে পাই।
লেখক, ঔপন্যাসিক অদ্বৈত মল্লবর্মণ তিতাস নদী ও মানুষের অন্তরাত্মার ছবি এঁকেছেন। তিতাস তাঁর কাছে একটি নদীই শুধু নয়, তিতাস যেন তাঁর কাছে এক জীবন্ত জলপরি।তার বুকে কান পেতে তিনি শুনেছেন তার বুকে বয়ে যাওয়া জলের গোপন কথা, তার বুকে বসবাসকারী জলজীবি মানুষের মনের গোপন ব্যথা বেদনার কথা।জল ও জীবনকে তিনি এক করে দেখেছেন। অধ্যাপক শান্তনু কায়সার একারনে " তিতাস একটি নদীর নাম" উপন্যাসকে নদী ও মানুষের যুগলবন্দী বলেছেন।সুস্নাত জানা বলেছেন , " জেলে জীবনের মহাকাব্য"।
তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসে লেখক অদ্বৈত মল্লবর্মণ মালো সমাজের জলকেন্দ্রীক জীবন জীবিকা, সমস্যা সংকটের পাশাপাশি অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সাথে তাদের জীবন প্রবাহের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত লোক সংস্কার, লোক রীতিনীতি ইত্যাদি উপস্থাপন করেছেন। জীবন জীবিকা, সমস্যা সংকট, আচার আচরন, খাওয়া খাদ্য, সংস্কৃতি সবটাকে লেখক আশ্চর্য দক্ষতার সাথে তুলে ধরেছেন। তাছাড়া তাঁর বিভিন্ন প্রবন্ধে নিবন্ধে লোকসংস্কৃতির নিখুঁত বর্নাঢ্য সমাহার আমরা দেখতে পাই।যেমন -- ত্রিপুরার বারমাসী গান,পল্লীসংগীতে পালাগান,মাঘমন্ডল,বরজের গান, শেওলার পালা, ভাইফোঁটার গান, অপ্রকাশিত পল্লীগীতি, অপ্রকাশিত পুতুল বিয়ের ছড়া, অপ্রকাশিত বাউল সঙ্গীত ইত্যাদি।
তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থে মাটির কাছাকাছি অন্ত্যজ শ্রেনীর অবহেলিত নিষ্পেষিত অংশের শিক্ষার এক আলোকপ্রাপ্ত এক আধুনিক মনের মানুষ।
মালো সমাজের রিক্ততা,নিঃস্বতা বর্ণনা করেই তিনি ক্ষান্ত থাকেন নি।এই রিক্ততা,নিঃস্বতার মধ্যে দিয়ে জমি ও জলের শোষিত মানুষ কেমন করে ঐক্য,অভিন্নতা এবং আত্মীয়তা অনুভব করে - সেই অনন্য চিত্রটিও প্রস্ফুটিত করে তুলেন লেখক অদ্বৈত মল্লবর্মণ।
মানুষে মানুষে সম্পর্কেরই এক বিশেষত্ব সেখানে ফুটে ওঠে। অনন্তর মার মৃত্যু হলে বাবা মার সঙ্গে বিবাদ করে বাসন্তী অনন্তকে আগলায়। সেই অনন্তই অভিমানে তাকে ছেড়ে যায়। বনমালীর নৌকায় উদয়তারার সঙ্গে চলে যায় বনমালীর গ্রামে। নদীর বুকে নৌকা প্রতিযোগিতার সময় উদয়তারাদের কাছে মার খায় বাসন্তী, অনন্তকে ফিরে পেতে চায়।পরে তিতাসের জলে দাঁড়িয়ে তারাই আবার দুজনে মিলে অনন্তর কথা পাড়ে।কত বিচিত্র অনুপঙ্খ ই না ধরা পরে নদী পাড়ের মানুষদের ঘরে বাইরের জীবন।
তিতাসের তীর জুড়ে মানবসমাজের যে বসতি গড়ে উঠেছে, সেই প্রকৃতির কোলে বসবাসকারী মানুষের যাপিত জীবন,হাসিকান্না, মানবিক মূল্যবোধ, জীবন বোধ, সংস্কার,লোকজ বিশ্বাস, দারিদ্র্য - অশিক্ষা - অনাহারের অর্থনৈতিক জীবন, সংস্কৃতি ও শোষণের অভিঘাত ফুটিয়ে তুলেছেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ তাঁর এই উপন্যাসে। যার প্রাসঙ্গিকতা ও গুরুত্ব আজ ও আমাদের কাছে সমান বহমান।