Jul 31, 2022

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

মায়াতাঁতের অসমাপ্ত বয়নশিল্পী

'আমার মৃত্যুর পর যেন কোন শোকসভা না হয় প্রদীপ,
 অবনমিত মেধার শহর ছেড়ে অভিমানে কেউ কেউ 
রাতারাতি চলে গেছে কুয়াশাবৃত শীতের পাহাড়ি স্টেশনে। ( ইচ্ছাপত্র–প্রবুদ্ধসুন্দর কর )

না, প্রবুদ্ধ কোন কৃষ্ণপথ রেখে যান নি শোক প্রস্তাবের জন্য । পার্থিবপ্রস্থানের আগে ছিল তাঁর ছিল আশাময় পুলওভার । হাসপাতালের  বিছানায় শুয়ে অনুভব করেন, 'আরোগ‍্যের পর হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার রাস্তাটুকু বেহেশ্ ত । নিজেকে যিনি তাঁরই দেহসচিব বলে আমৃত্যু ঘোষণা দিয়ে গেছেন তিনি তাঁর চিকিৎসাশয্যায় স্বনাম নিয়ে করছেন রসিকতা । লিখেছেন– 'আমি প্রবুদ্ধসুন্দর কর নই । আমি গত শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে ৬৫২ এ । প্রচন্ড নৈসর্গিক বিশ্বাস রেখেছেন তার শল‍্যচিকিৎসকের উপর যার ছুরি জাদুবিভায় মৃত্যু কেটে ফালা ফালা করে জীবন ছিনিয়ে আনবে । জন্মছকের বিশ্লেষণের প্রতিও তাঁর একসাগর আস্থা জীবনের উপরেই তো আলো ফেলে হে কবি ! পার্থিব পরিমণ্ডল আর এই আলো হাওয়ার বাউন্ডুলে পরিক্রমণের আর্তিই প্রতীক হয়ে আসে বারংবার । কিন্তু যে আত্মশবরক্ষক, সেই বুঝতে পারে এক রিক্ততার আলোকবর্ষের মধ্য দিয়ে ক্রমাগত তাকে মহাজগতের চক্রবালের আলোপ্রান্তরের দিকে এগিয়ে যেতে হচ্ছে । ক্রমশ সরে যাচ্ছে প্রিয়জনের যৌথস্বর,  কবিতার কোলাহল । সামনে শুধু নীল উপত্যকা । পায়ে পায়ে উড়ছে ডার্করুম মঘানক্ষত্র, ইন্দ্রজাল কমিকস, মায়াতাঁত, নৈশশিস, আত্মবিষ, যক্ষের প্রতিভূমিকা, অসুস্থ শহর থেকে,এসিড বাল্ব আর স্বনির্বাচিত কবিতার পাতা ।

কফি হাউসের সেই আড্ডা থেকে উঠে আসা 'রমেন্দ্রকুমার থেকে প্রবুদ্ধসুন্দর'ই জানান দিয়েছে শিরোনামে যাকে ধরেছ সেই শিরোপা ধারণ করবে আগত কবিতাকনভোকেশনে । 'বাংলাকবিতা' যার জন্মদানের জন্য উন্মুখ হয়েছিল বহুকাল । তীক্ষ্ণ শ্লেষ আর আত্মকশা, সুতীব্র নাগরিক বয়ান যার, তার সমূহ উচ্চারণ অমোঘ হয়ে ওঠে বাংলাকবিতায় । প্রবুদ্ধসুন্দরকে নিয়ে বারবার আত্মরতিতে মাতেন কবি প্রবুদ্ধসুন্দর । 

পিতৃসত্বা তাঁর জীবনজিন ।তিনি বলেন, ভাদুঘর থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে ভৈরববাজার / শুনেছি বাবার দৌড় এটুকুই ছিল । / আমি ঢাকা অব্দি গেছি । / বাবাকে পেরিয়ে যাওয়ার উদাহরন / এ জীবনে আর কিছু নেই । ( উদাহরণ ) । ছিন্নমূল বাবার জীবনসংগ্রামকে দেখেছেন অন্তর দিয়ে । 'উনিশ শো একান্ন সালে যে গাছটি/ আখাউড়া স্টেশন পেরিয়ে প‍্যারীবাবুর বাগানের / সামনের রাস্তা ধ‍রে হেঁটে এসেছিল / সেই গাছটি আমার বাবা । / আজও মূলত্রাণ উল্টে ধরলে দেখা যায় / বাবা পায়ের পাতায় ম‍রা রক্ত জমে / কেমন কালচে হয়ে আছে । আর যে আশ্রয়ভূখন্ডে বাবার স্থিতিবাসনা তাকে নিয়েই গর্বে তিনি উচ্চারণ করেন 'দূরদর্শনের টাওয়ারটি আমাদের আইফেল / বটতলা শ্মশানটি আমাদের মহানিমতলা / পাশে বয়ে যাওয়া নদী সেই গ্রিক পুরাণের লিথি / ধলেশ্বরে্য মিশনই আমাদের বেলূড়ের মঠ / জম্পুই হিলসই আমাদের ছোটো ভূস্বর্গ কাশ্মীর / সর্বোচ্চ বেতলিংসিব আমাদের শৃঙ্গ এভারেস্ট' ( শ্লাঘা ) । এক মর্মসচেতন রসানুভূতি রেখেই কবি অনায়াসে বলে যান– 'যে পা গুলো একদিন প্রণামের যোগ্য মনে হয়েছিল/সেগুলো শয়তানের খুর হয়ে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে  ( জ্যোতিষবচন ) । সৃজনের পরও যেন তৃপ্ত নন কবি । এজন্মের অসম্পূর্ণ প্রণয়ের সংক্ষোভে বলেন, 'পরজন্ম বলে যদি সত্যি কিছু হয় / সমুদ্রমন্থন শেষে রাহুর কবন্ধ আমি / অমরত্ব নয়, চাই, চাঁদের প্রণয় ( পরজন্ম ) । চন্দ্রলুব্ধ কাঙ্খায় ভরে আছে কবির পরজন্মের স্বপ্ন । স্বপ্ন নিয়েই অন্তরার পথে এগোতে এগোতে কবি জীবনের কাছে আহ্বান জানান–'শুধু এগিয়ে দেয়ার পথে নিচু স্বরে বোলো / দরজা ভেজানো থাকবে / টোকা দেওয়ার দরকার নেই / আলতো ঠেলে দিলেই কপাট খুলে যাবে ( দরজা ) ।

 জীবন ও অতিজীবনের মাঝখানে কবিতার তাঁবুতে যাপন আপনার । অবাধ বিচরণ না হলে এই গোষ্ঠের কী অনুপুঙ্খ বর্ণনাসফল  হয় হে 'নীল উপত‍্যকার রাখাল' ! আপনিই পেরেছেন মায়াবি পরিভ্রমণের ধারাভাষ‍্যে তুলে দিতে 'সন্ধ‍্যার সেই শান্ত উপহার' । আপনার পর্যবেক্ষণে ও বাচনবিভঙ্গে সমগ্র কাব‍্যজগৎ রক্তেপ্রবাহের বাঁকে বাঁকে জোছনার আলোছায়া গড়ে । সীমান্তবর্তী এই পার্বতীভূগোলের কবিতায় এক অত‍্যুজ্জ্বল বাঁক আপনি যা কালের মানচিত্রে চিহ্নিত হয়ে গেছে । অমরত্বের পথিক কবি আপনি তবু বলেন–

আমার মৃত্যুর পর যেন কোন শোক সভা না হয়, পল্লব 
আমি চাই না,পাপেট ও বামন, শিরদাঁড়াহীন সুশীলেরা সভায় বলুক এসে মূলস্রোতে নয়,আত্মহননের পথ
 বেছে নিয়েছিল প্রবুদ্ধসুন্দর ( ইচ্ছাপত্র ) ।

তাইতো কবি, আপনার অনির্দেশ যাত্রার পথে আমরা থামাবো না আপনার অনন্তরথ । কোন শোকসভাও নয় । শুধু আপনার শব্দের বিছানার এক প্রান্তে রেখে যাব এক স্বয়ংক্রিয় নির্দেশশলাকা । যার সংকেতে 'সন্ধ‍্যা নেমে এলে সমূহ মনোবেদনা নিয়ে জ্বলে উঠে একটি নক্ষত্র / বিষাদস্পৃষ্ট তোমার মুখ / কোনও একদিন যদি স্পষ্ট হয়ে ওঠে /  বোঝা যাবে সেই নক্ষত্রের আলো /  পৃথিবীতে এসে পৌঁছেছে সামান্য আগে ( আলো ) ।

Jul 30, 2022

মাহমুদ কামাল

বেঁচে আছি 

বেঁচে আছি
সতর্ক প্রহরে প্রহরে
আনন্দকে মাটি চাপা দিয়ে

বিষাদের সুর নিয়ে বেঁচে আছি।
ছোট্ট এই জীবন থেকে
রূপরসগন্ধস্পর্শ 
মুছে যায় অবলীলাক্রমে
প্রিয়জন হারাতে হারাতে
বেঁচে আছি
দুঃসংবাদ হয়ে যাবো বলে।

অপাংশু দেবনাথ

বেনোজল

চাঁদের উল্টো পিঠে হাত রেখে 
বলেছিল কেউ, জোছনা ছড়িয়ে দাও।

মানুষ বুঝেনি এমন গোপন ছলনার কথা 
জ্যোৎস্নাকে আলো ভেবে তাপ নিতে 
গিয়েছিল যারা, ফিরে আসেনি তো 
কেউ এইবেলা।

কথার পিঠেই গড়িয়ে পড়ছে কথাদের ছায়া।

কান বেয়ে নেমে আসে রক্ত
মুখ বেয়ে নেমে আসে রক্ত
চোখ বেয়ে নেমে আসে রক্ত

চাঁদের উল্টো পিঠে হাত রেখে 
কেউ বলেছিল, জোৎস্না ছড়িয়ে দাও
মানুষ বুঝিনি শব্দের ছলনা আছে।

সত্যজিৎ দত্ত

আয়ান ঘোষ

অনেকটা পথ পার হয়ে এসে 
ঘুরে গিয়ে টের পাচ্ছি 
জীবন আসলে এক স্মৃতির মিরর
যে কোন শালওয়ারের তলায়
দাঁড়ালে মনে পড়ে যায়
কোন এক উষ্ণ প্রস্রবণ 
পাথরের বদলে শ্যাওলার গা ছুঁয়ে 
জপ মন্ত্র 
রোলিং স্টোন! রোলিং স্টোন!

বড় বেশি পিচ্ছিলতায় ভরে যাচ্ছে এ জীবন 
এবার ধরি মাছের সাথে 
দেখা হয় না ছুঁই পানির।
আর মনে মনে ভাবতে বসে দেখি,
কে যেন আমায় বিপ্রতীপে কেটে
কষতে চাইছে নতুন করে
শুধু সমকোণ! শুধুই সমকোণ! 

সমস্ত খোলা জানালার মাঝে
তবে কি একমাত্র  গোপন কৌটো,
তোরই ভেতর গচ্ছিত রেখে প্রাণের 'ভ্রমর কইও গিয়া 
শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদের অনলে...'

সে যুগের বনমালী 
এ যুগে টের পান রাধার বিরহ সুখ
আয়ান ঘোষের বাগানে
ঝরা পাতারা নির্বিরোধে যাচ্ছে জ্বলে।

তৈমুর খান

অশোক রাজার দেশে

শোক এসে বীতশোক করবে আমাদের

মরা নদী ভরো ভরো হলে

তরণী ভাসাবো তার জলে

যেই পথে চলে গেছে সে

সে পথেই ফিরে এসে পুনর্ভবা হবে


আজ শুধু আন্দোলিত হই নীরবে-নিভৃতে

অশোক রাজার দেশে এখনো শান্তির বার্তা শুনি

এখনো বেঁচে থাকি বাঁচার বয়স গুনে গুনে…

সত্যজিৎ সেন

বন্ধক

স্বপ্নের দুপুরগুলো অন্য গ্রহে বেড়াতে গিয়েছে।
নীল আংটি ভেসে গেছে সমুদ্রফেনায়।
দেওয়ালে ফাটল বাড়ে। কার্নিশে শ্যাওলার হাসি।
তোমার নগ্ন দেহ ক্যানভাসে আঁকতে যেতেই,
দপ্ করে আলো জ্বলে ওঠে।
আলো নয়, চিতার আগুন। তুলি, রং, সমস্ত ইজেল জুড়ে
দাউ দাউ আগুনের গান। বেঠোভেন সিম্ফনি
চোখ মোছে, রাত্রির নদীর স্রোতে ভেসে চলে যায়। 
ফায়ার-ব্রিগেড থেকে পাগলাঘন্টি গাড়ি ছুটে আসে।
সলজ্জ কনের মতো আকাশের পোখরাজ চাঁদ
তোমার আগুনে পুড়ে শুকনা পাতার নীল ছাই।
তুমি কিন্তু কোনোদিনই আমার আগুন হলে না।
আমার নিজস্ব কোনো সেরকম আগুন ছিলোনা,-
তুমি জানো।
যেটুকু আগুন বেঁচে ছিলো,প্রয়োজন হতে পারে ভেবে,
তোমার দুহাতে আমি বহুদিন আগে থেকে বন্ধক রেখেছি।

সন্দীপ সাহু

ঈশ্বর নন, মানুষ

ঈশ্বর বন্দ্যো বন্দে না ঈশ্বর।
মাটিতে কান রেখে শোনে‌ মানব-স্বর।
এই স্বরে কান্না কাঁদে ঠাকুরঘরে
একাহার আর‌ সাদা কাপড়ে।

অসূর্যমপশ্যাকে সূর্য দেখাতে
সমস্ত মন‌ উজাড় করেন শিক্ষাতে।
অ আ ক খ আনলো পরিচয়
গদ্যের নির্দিষ্ট রীতি রচিত হয়।

স্বামী মরলে কী পাথর হয় নারী!
রক্ত মাংস মন নারীকে দেয় ছাড়ি!
পিতার মন কষ্টে দিশাহারা
গতি নেই পুনঃ বিবাহ ছাড়া।

ইউরোপীয় রেনেসাঁকে আবাহন করে,
অনুবাদ সাহিত্য রচিলেন ধর্ম হরে।
বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানি জীবন রচিলেন
ধর্ম-জগদ্দলে আঘাত হানিলেন।

অজেয় পৌরুষ, উচ্চতম শির
প্রণাম তোমায়, শ্রদ্ধা তোমায় বীর।

সমরেন্দ্র বিশ্বাস

ভাষণ থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে! 

ভাষণের কথাগুলো ইটের মতো উড়ে আসছে
শব্দগুলো শেকলের মতো ভারী
ডিজিটাল ভাষণগুলোকে অ্যাসিডে কেঁচে
রোদে শুকোতে দেয়ায় এই তো সময়।
জালিয়াতদের কন্ঠস্বরগুলো
এখনই আটকে না দিলে 
দিনগুলো হয়ে যাবে অবরুদ্ধ ক্রেমলিন
নাপাম বোমার গর্ত থেকে 
এখনো গল গল করে বেরিয়ে আসছে ধোঁয়া!

আদিমা মজুমদার

ওছিয়তনামা

মৃত্যুর পর কি করতে হবে তোমায়,
লিখে, সহজ করে রাখছি।
তেমন কিছু না -
কিই বা আছে আমার!
সোনা গয়না কাপড় চোপড়
সব বিলিয়ে দেবে নিকট আত্মীয়দের,
অনেকদিন তারা অপেক্ষায় ছিলো।তাই না!
বইগুলো পড়তে দেবে
যাদের চোখ স্বপ্ন দেখতে জানে।
কাজের মাসির মেয়েটাকে পড়াবো
কথা দিয়েছিলাম-
পড়াবি তো?
অনেক টাকা অফিস দেবে।
রক্ত জল করেছি,
মর্নিং ইভিনিং নাইট 
মনে আছে?
পুরনো মংগলা চরণের বাক্সে কিছু জিনিস আছে
পাঠিয়ে দিও রাস্থায়
যারা জঞ্জাল খুঁজে খায়!
প্রতিবাদী কবিতাগুলো পড়তে দিও
যুবক যুবতীদের
তাদের জমাট রক্ত
গরম হতে যথেষ্ট।
আর বাকি রইলো
লাঞ্ছনা বঞ্চনা অবজ্ঞা
জীবনে যা হাসিল করেছি
পুড়ে ছাই হোক,মেডিকেলের চুল্লীতে।
মোবাইলে গুগোল পে খুলে
মোঠেই আতংকিত হবে না-
মাসে মাসে যেনো তারা পায়।
আজ্ঞে না,তোমার টাকা নয়
আমার ফিক্সড ডেপোজিট আছে,
কি ভাবছেন।
আর একটি কথা --
মৃত্যু সংবাদ তাদের জানাবে না
টাকা না পেলে, তারা বুঝে নেবে
তাদের ডাল ভাতের মালিক আর নেই।

জাহানারা মজুমদার

কালো চসমা

সমস্ত বিশ্ব জুড়ে আফিমের চাষ
নানা রঙ মিশায়ে বাজারজাত হয়
বেশ নেশায় বুঁদ হলে হাতে অস্ত্র দাও
রক্তনদী এমনিতেই বইতে থাকবে।

সব শেয়ালের একই রা
মানুষে মানুষে প্রাচীর গড়ো
এমনিতেই মানচিত্র পাল্টে যাবে।

সকলের দেখার চোখকে নজরবন্দী করো
তোমার ইশারায় বাতাসের গতি পাল্টাবে।

কালো চশমা চোখে পরিয়ে
ঝাঁ চকচকে মন্দির মসজিদ নির্মাণ করো
সব সমস্যা বিস্মৃতির অতলে গিয়ে
তোমার জয়গানে ঝান্ডা উড়বে।

খোকন সাহা (অগ্রজ)

তিতাস - ২

কেন জানি, একটি ছবি, অবিকল কলকল
হেসে ওঠে বুকের গভীরে।
জানি-না, ঝড়ের তলানিতে,জ্যোৎস্না যখন ঘুমিয়ে পড়ে,
তার কলতল, চির চির করে কি-না
আমার তৃষ্ণার দুপুরে।

সোহাগ চিরাগ তুলে , ভয়ংকর সর্বনাশের  ঘরে
কে এঁকে দিল,  গোমতী মায়ের হাত  ! 
সেই হাতের অঞ্জলিতে ------ জলপান ,         
একটি তপ্ত দেহ ,  রুগ্ন প্রাণ..... 
বালিকার নগ্ন মুখের.আঁধার কালো.উদ্ভিন্ন চোখ।
সেই চোখের রশ্মিতে ভেজা. অবিকল গোবিন্দমানিক্য
ও জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত বাউল.  অব্যক্ত দিনের তার ।

সেই আলোর মুখ থেকে. বার বার সরিয়ে আনি
আমার গোপন অন্ধকার।  যেখানে বিভাজনের  জনপদ
রাতের গলা টিপে হত্যা করে  বালিকার নগ্ন মুখ ,
আঁধার কালো উজ্জ্বল চোখ ।
আর লজ্জার বালাই পকেটে পুরে ,
ডান কান ,  বাম কান , মলতে মলতে
কখনো মিশে যাই  ----
নগরের নিশান উড়িয়ে ,  কৌটিল্য বা চানিক্য- সার্কাসে ।

অতি সন্তর্পনে , কখনো বসি
একাধারে রঘুপতি ও গোবিন্দমানিক্যের
আলখাল্লা পড়ে ।
একটি ছবি ,  হেসে ওঠে,  অবিকল
আমার বুকের ভিতর ! 

নিয়তি রায় বর্মন

নীল নক্সায়

মহানগরে মহান ব্যক্তি
অট্টালিকায় ছয়লাপ--
শিক্ষা দীক্ষা বিত্ত বৈভব
না না কিছুতে হয় মাপ। 

ডাবল ডেকার, মেট্রো রেল
শান বাঁধানো না না চত্বর
এরই মাঝে এখানে সেখানে
ভিখারিরা কাড়ে নজর। 

কাতর মুখে হাত বাড়ায়
তাড়াহুড়োয় কেউ আদ্র
সবাই যদিও হন্তদন্ত
আবার কেউ ছোট নোট খোঁজায় ব্যগ্র। 

বেজার মুখে দিলেও অর্থ
ভিখারি জীবীর মুখ হাস্য--
একই চিত্র বাসস্ট্যান্ড নিউমার্কেটে
কত লোক যে বেঁচে আছে নিয়ে প্রবৃত্তি দাস্য। 

নরনারায়ণ সেবা হয়
বিশেষ পূজা পার্বনে--
বস্ত্র বিতরণ এখানে সেখানে
গরিব দুঃখীর হাসির প্লাবনে। 

সবাই যে কেন বাঁচে না ভাত কাপড়ে
থাকার ঘর  আর চিকিৎসায়--
তাদের কথা ভাবার লোক কম থাকে
বিশেষ শ্রেণীর নীল নক্সায়। 

রাহুল সিনহা

গৃহনাবিক

বাতিঘরে ঘুরে যায় লবণাক্ত হাওয়া
এই তার নিজস্ব ভ্রমণ
এখানেই ফিরে আসে সব রূপকথা
এবং মদের গন্ধ মৃদু।

এই তার আস্ফালন এবং আকুতি
লেখা আছে দেওয়ালের গায়ে
সন্ধ্যা ঘন হয়ে এলে সেও শুয়ে থাকে
গল্পেরা একাই পথ হাঁটে।

কবে তাকে ডেকেছিল পুড়ে যাওয়া ঘর
না পড়া চিঠির ছাইগাদা,
বন্দরের শেষপ্রান্তে আলোর ইশারা
তবু সে ক্যাবিনে বসে থাকে।

এসব কাহিনীমালা চারণের মুখে মুখে ভাসে
চলে যায় আরও দূরে, যেখানে নাবিক ঘর বাঁধে।

নবীনকিশোর রায়

গ্রহণকাল

এযাবৎকাল  আমাদের নান্দনিকতার  ক্রীড়াক্ষেত্রব্যাপী----স্বতঃস্ফূর্ত যত প্রীতিভাব সৌন্দর্য আর সৌজন্যেবোধের করমর্দন পরস্পর খেলে যেত,  
ক্রমাগত নেমে আসা বিষাদে
ঘটে যায় প্রত্যাশাহীন গ্রহণকাল! 

চেনা জানা পথে আজানা এক  রহস্য ঘিরে ধরে, 
যে পথে বাড়ি ফিরি
উভয় পার্শ্বে ফণা তুলে বিষাক্ত সর্পকুল, 

ধর্মান্ধ বেদের দল অনবরত আরোগ্যো বিধান শুনিয়ে যায়, গোপন এক আঁতাত গড়ে উঠে বাচাল  শাসনকাল জুড়ে---

অন্ধকার ঠেলে এগিয়ে যেতেই 
সম্মুখে হাড়িকাঠ, মাথা বাঁচিয়ে
মেরুদণ্ড সোজা রেখে পশ্চাৎ গমনের
শেষে দেখি,পিঠ ঠেকে গেছে দেয়ালে...

কুশল ভৌমিক

এবার অন্তত বরফ সরাও

প্রতিদিন একে ওকে তাকে এবং নিজেকে 
বেচতে বেচতে বাঁচার যে অভিনয় 
তাকে অন্তত জীবন বলে ডেকো না। 

জীবন বিক্রি ও বিনিময়যোগ্য নয় 
গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে কুকুর বেড়ালের মতো 
তোমার পায়ের কাছে হুমড়ি খায় যে দুঃখ 
তাকে একবার শক্ত করে শেকল দিয়ে বাঁধো
শেকলে বাঁধাটাও একটা শিল্প 
প্রতিটি মানুষকেই তা জানতে হয়। 

অন্যের রসুই ঘরে উঁকিঝুঁকি বাদ দিয়ে 
খুলে দাও বুকের রেফ্রিজারেটর
পুরনো স্মৃতির পুটলি যত্নের অভাবে 
কেমন পচে গলে আছে 
আর বরফ জমে কতটা শক্ত হয়ে আছে সম্পর্ক 
বিস্বাদ হয়ে গেছে যাবতীয় কুশলসংবাদ। 

চিৎকার ও হাততালি ছাড়া কিছুই শেখোনি 
এবার অন্তত বরফ সরাও।

হারাধন বৈরাগী

ঘুমকষ্ট

ঘুম কুড়োতে 
প্রতিদিন এ কি করি
এক পায়ে ভর দিয়ে
আরেক পায়ে চড়ি
জনপদ ছেড়ে বনপদে ঘুরি।

শোনশান টিলা
সারি সারি বৃক্ষ-চিতা
শ্যাওলা-আঙ্গিনা
বাস্তু-ঘুঘুর পায়চারি

ঘুমকষ্ট, হৃদিতার‌ও বাড়ি!

শ্রীমান দাস

শব্দের মায়াজালে

বুকের ভেতর অজানা স্রোত
তলদেশ ফুঁড়ে ওঠে ভয়ের বুদবুদ !
হৃদস্পন্দনে যখন উদ্ধগতি খুউব,
তোমার কবিতাঘরে তখন
আমার নিঃশব্দ পায়চারি।

তুমি মেলে দিলে শব্দের বিছানা।
আমি এলিয়ে দিলাম শরীর ...

তুমি জড়িয়ে নিলে বুক পেতে
আমি হারিয়ে গেছি শব্দের মায়াজালে।

রুদ্র মোস্তফা

ভিজে যাওয়া বর্ষা 

আকাশ-ভাঙা বৃষ্টি অভিযোজনের ছিদ্র দিয়ে 
চুইয়ে চুইয়ে কবে যেনো  ঢুকে গেছে 
আমার নাগরিক  স্নান ঘরে। 
স্মৃতির সুতো দিয়ে সময়ের মসৃণ থানে বোনা
সোনালি শৈশব সারা দেয় 
এই শহরে বৃষ্টিতে বুনোজলের  ডাকে। 

আহা, শৈশব!
ঝুম বৃষ্টিতে ঝাঁক বেঁধে কতো দিন নামি না জলে।
কতো কাল লুকাই না স্নান-রাঙা চোখ 
মায়ের শাণিত শাসনের ভিড়ে! 
কতো কাল ভাসাই না ভেলা... 
কতোকালের ভেসে যাওয়া স্কুল ফাঁকি 
ডুবে যাওয়া সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা সহ 
কেমন করে জেগে উঠে স্নান-ঘরে!

মায়ের শাণিত শাসন ক্ষয়ে গেছে 
বয়ে যাওয়া সময়ের ধারে,
তালি দেয়া ছাতার মতো জীর্ণ হয়ে গেছে 
বাবার বুকের ছাতিম—
তবু শহরে বৃষ্টিতে তাদের ঝাপসা চোখ 
চকচকে হয়ে যায়  বর্ষার জলে।
অভিযোজনের ছিদ্রে চোখ রেখে 
আমি ভিজি স্নান-ঘরে...
জানালার ওপারের বৃষ্টিতে ভিজে যায় 
দুই প্রজন্মের পুরানো বর্ষা।

সুমিতা বর্ধন

ভেঙে যাওয়া বাড়িটা

বিশাল বড় একটা বাড়ি ছিলো
তার ছিলো মস্ত এক বারান্দা
অনেক আগে একটা রেডিও ছিলো,
তাঁতেই সন্ধ্যে বেলা ছায়াছবির গান বা-
রবিবার দুপুরে নাটক শুনতাম সবাই মিলে ।
তারপর প্রযুক্তির উন্নয়নের চাপে পড়ে
ঘরে এলো এক মস্ত বড় টেলিভিশন
সবাই এক সাথে মিলে মিশে
রামায়ন ,মহাভারত বা চিত্রহার দেখার ধুম।
ক্রমে সময়ের গ্যারাকলে
মস্ত বাড়ি আর বারান্দাটা 
ভেঙে -
ছোট ছোট ফ্ল্যাট হয়ে গেলো,
সবার ঘরে একটা করে রঙিন টিভি হলো,
বাজারের ব্যবসায়ীদের মুনাফা বাড়লো প্রচুর
কারন সবার হাতে যে একটা করে বাজারের ব্যাগ,
অন্যের মুনাফা বাড়িয়ে কিন্তু
আমাদের কপাল পুড়লো অনেকটাই
আগে পুজোর চাঁদা আসতো 
বাবা বা কাকার নামে এক সাথে
কিন্তু এবারে সবার জন্য
হাজার টাকার রসিদ,
পুজোর বাজেট বেড়ে যায়
এক লাফে অনেকটাই।
আগে দুস্টুমি করলে 
বাবা বকতেন , দাদু বাঁচিয়ে দিতেন,
এখন বাবা বকলে
মা ভয়ে চুপটি করে থাকে
আর সন্তানটির অসহায় দৃষ্টি
খোঁজে নিরাপদ আশ্রয়।
আগে ইস্কুলে দুষ্টুমি করলে
মাস্টার মশাইয়ের শাসনের কথা
বাড়িতে জানতেও পারতো না আর -
জানতে পারলে বাবার হাতে আরো
কতক  শাসন জুটতো,
এখন নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি
 আদরের সন্তান দু-একটি, 
ছাত্রের গায়ে হাত তোলা যে-
শিক্ষকের স্পর্ধার বাইরে,
মন্ত্রী আমলার ভীতি প্রদর্শনে
শিক্ষকও যে নীরব ভূমিকায়।
আগে  সবাই মিলে হতো বনভোজন,
ঝাল বেশি, নুন কম ,আধসেদ্ধ রান্নাও
মহা আনন্দে  খাওয়া হতো পাত পেরে,
এখন পিকনিকের জমানা
ক্যাটারারদের মাঝে খুঁজে পাওয়া যায় না 
 ইটের ওপর হাঁড়ি করাই চড়িয়ে রান্নার সেই আমেজ।
দিন বদলায় ,সময় বদলায়
তাই  ঠাকুমা ,দিদিমা দের সাথে
রূপকথার গল্প শোনাও আর হয়ে উঠে না।
ছোট ছোট পরিবার 
বই এর ব্যাগের চাপে 
আর ইঁদুর দৌঁড়ের প্রতিযোগিতায়
সামিল এবার তুমি আমি সবাই।

সুমনা রায়

বিজ্ঞাপন 

নাটকের মতো আমি পেরিয়ে যাই 
একটা দৃশ্য থেকে আরেকটায় 
অনায়াসেই ডিঙিয়ে যাই ঘরোয়া চৌকাঠ 
এভাবে ডিঙোতে ডিঙোতে আমি 
ডিঙিয়ে যাই নিজেকেও  
পেছনে পড়ে থাকে আমার 
সবুজ ডানার ত্রিকোণগীতি
ভাটার টানে সব জল সরে গেলে 
আমার ইচ্ছেগুলো শুকনো বালিতে 
ছড়িয়ে থাকে এখানে ওখানে 
প্রিয় নদীর কাছে আর গান শেখা হয় না 
নরম দুঃখগুলো স্যুয়েটারের মতো 
আমাকে জড়িয়ে নেয় নিজস্ব ওমে 

নিজের কাছ থেকে হারিয়ে যেতে যেতে 
হাইফেনে জুড়ে থাকি অবিজ্ঞাপিত আমি 
আর আমার বিজ্ঞাপন

তুষারকান্তি রায়

খাতাকলিপত্রিকা

দেখেছো ব্রজবাসী !  দূরভাষে 
কেমন ভেসে আসছে কৃষ্ণকলি বাঁশি 
জোড়াপুকুরের জলে কেমন 
আকাশের ছায়া পড়ে আছে  ?
নিধুবনে রঙের সপ্তক ?
এবার ছুটিতে তোমার দেশে যাবো রাধারানি । তুমি শঙ্খ বাজিয়ে 
নাম না জানা গাছের নীচে 
লাল - নীল ফাল্গুন সাজিয়ে দিও ।
প্রকৃত ফুল না ছায়া! 
সেকথা ভেবো না । দ‍্যাখো উদাসী 
হাওয়ায় কেমন বয়ে যাচ্ছে 
মেঘের  এক্কাগাড়ি ,
চমকিত লিপিমালা আর 
কাঞ্চনের দিন ! 
আমি খাতাকলিপত্রিকা থেকে বেরিয়ে আসা শ্রীধারা , আট প্রহরের  কথা আর এগারোটি কবিতার মালা নিয়ে আসছি 
কখন দরজা খুলবে তুমি ?  
তোমার ভোরের ! 

নমিতা সরকার

একলা পথে

তেপান্তরের মাঠে অামি খুঁজে ফিরি ঘর,
একলা জীবন একলা পথে,সবাই যখন পর।
কেবা আপন কেবা পর কেবা আপন জনা,
জীবন পথে মাঠে ঘাটে স্বার্থের আনাগোনা।
স্বার্থ যখন শূন্য ভাণ্ডে উঁকি মেরে হাসে,
আপন সকল পর হয় কেউ থাকেনা পাশে।
শূন্য হাতে শূন্য মনে একলা যখন থাকি,
সবাই তখন পর হলেও আকাশ দেয়না ফাঁকি।
পাখি আমার আপন মনে ভাবে বসে তাই,
স্বার্থ শেষে আপন জনা দূরে চলে যায়।
যাক দূরে সুখের ঘরে সকল আপন জন,
একলা জীবন একলা পথে হাঁটবো অনুক্ষণ।


স্বরূপা দত্ত

রাত কথন

১)
কেমন শূন‍্য হয়ে বসে আছি 
অব‍্যক্ত কথারা পিছলে পড়ছে রাতের গায় 
চাঁদ, তারা, হাসনুহানার আয়োজন সব বৃথা।
জন্মান্ধ, বুঝিনি কখন এসে
কস্তুরি গন্ধ চুরি  করে নিয়ে গেছে  এক ছায়ামৃগ,
রেখে গেছে মৃতবৎ সংসার।

২)
এক পশলা বৃষ্টি শেষে
আকাশে রামধনু দেখে আমি 
ছাতা বন্ধ করলাম,
ঈশান কোণে এক ফেরারি মেঘ
তখন  নীরবে আয়োজন করছিল 
এক বিধ্বংসী কালবৈশাখী ঝড়।

পঙ্কজ কান্তি মালাকার

সংগ্রামেতর

জলপ্রলয় ছুঁয়ে গেলে তার স্পর্শদাগ দিয়ে যায়,
সন্তানের মুখ দেখে জীবনের তাগিদ যে বড়-
সংগ্রামেতর করে তুলে,কোমর ভাঙাকে মশাল করে
তুলে নিয়ে ছুটে সংসারের বিধ্বস্ত পাথারে।

প্রলয়জলে ডুবে উঠা শরীরে মাথার ঘামনদী ছুটে
স্রোতেভাসা মানবিক আয়োজন ঘরবাড়ি হাঁড়িপাতিল পুনরায় জুটায়
-প্রকৃতির স্রোতে মানবের অম্লান সংগ্রামধ্বজ প্রতিষ্ঠা করে-
কপালের আঁচড় দাগ জীবনের বিজয়চিহ্ন হয়।

সোমনাথ বেনিয়া

সৌজন্য সংখ্যা

একটি উন্মাদ সন্ধ্যা বুক বাঁধিয়ে ঝুলে আছে কার্নিসে
শুয়ে থাকা বিড়ালের গোঁফ গার্হস্থ‍্যের অবকাশ
দূর থেকে উড়ে যাচ্ছে উড়োজাহাজের পেট ভর্তি গল্প
রেডিওতে গুনগুন গানের ফিতেতে জড়িয়ে গেছে মন
একটু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়েছে ঘটিগরমের ফেরিওয়ালা
তার নিভে থাকা লম্ফের সলতে ইহজন্মের পরিণাম
মুঠোভর্তি প্রার্থনা নিয়ে চৌকাঠ থেকে পা গেছে তুলসীমঞ্চে
বহু পুরাতন অবৈধ দাগ ঠোঁটে স্মৃতি রোমান্থন করছে
তীব্র দ্রাক্ষারসের গন্ধে চাঁদ ঢলে পড়েছে বাঁশ বনের ভিতরে
কিছু কথাবার্তায় ফিরে যাওয়ার সৌজন্য সংখ্যা রাখা আছে ... 

সুবীর সরকার

কনফারেন্স


জনপদে জল ঢুকলে শিউরে ওঠে নৈশ শেয়াল।
শিস গোপন রাখি।
ভরা বাজারে কুড়িয়ে পাই সেফটিপিন
হলুদরঙের এই শহরে কোন জানালা বা দরজা নেই
ফুটনোট বলতে বুঝি ঘুঘুদের কনফারেন্স।
মঞ্চসফল নাটকের দৃশ্যে চিরকালের জিওল মাছ
তোমার কপালের ঘামে তর্জনি রাখি।
কুলগাছের ছায়ায় কেমন ঘুমোচ্ছে দুপুরের মাঠ

গৌরব নাথ

ব্যতিক্রমী


স্থির সে ছিলো না
দাঁড়িয়েই চলে যেতো
আমি কাপড় বদলাবো ভাবতে ভাবতে
সে মানুষ বদলে নিতো

আমাকে নিজের রাস্তায়‌ও জুতো পরে হাঁটতে হতো
সে মানুষের বুকে জুতো ছাড়াই চলে যেতো

আমার হাত ক্ষীণ হয়ে যেতো
আমার চোখ অবরুদ্ধ হেয়ে যেতো
আমি তাকে পোশাকের কথা বলতাম
আর সে উকালতি করে ফেলত

সে ভেঙচি একবার নয়, শতবার কেটেছে আমায়
গানে লাফাতে পারতো না
কথায় কথায় লাফাতো

বিয়েতে পাত্রী দাসীদের নক্ষত্র বানিয়েছিলো
কখনো ওদের উপর রাগ করতো
কখনো নিজের ওপর

গোপাল চন্দ্র মণ্ডল

ব্যস্ততা


কেবলই ব্যস্ততা!
প্রতিটি দিন; প্রতিটি মুহূর্ত
ব্যস্ততার জালে বন্দী প্রতিটি মানুষ
নাঃ, হাসতে ভুলে গেছি ব্যস্ততার ভয়ে
শিশুদের সরল মনও আজ চরম ব্যস্ত!
অফিস যাওয়ার ব্যস্ততায়
মায়ের মুখের দিকে চাওয়ার সময় নেই!
সরল শিশুর হাসিমুখ... তাও সময় নেই
রাস্তায় মুমূর্ষ ভিখারি
তবুও গাড়িতে তোলার সময় নেই!
সময় নেই নিজের মনের কথা শোনার
ব্যস্ততার সমুদ্র সমাজকে ভাসিয়ে দিয়েছে আজ
এ ব্যস্ততা কি প্রকৃতই ?
নাকি ইচ্ছামৃত্যুর নামান্তর ?

সৌমিত্র মজুমদার

বেদরদি সময়


হৃদয়ের কথা কেউ আর আজ
শুনতে পায়না,
মনের দরজা দরাজ করে খুলে
বুঝতেও চেষ্টা করেনা কেউ
অব্যক্ত অনুভূতিগুলো ;
এ যেন অদ্ভুত সময় 
ঘটনার ঘনঘটা চারদিকে, কিন্তু
কারো নেই কোনো হেলদোল,
অচেনার ভান করে
চেনা চেনা মানুষদের
    সাবধানে এড়িয়ে চলা শুধু !
কান পাতো
হাওয়ায় ভাসে 
সতর্ক থাকার বার্তা
মুহূর্ত এসে বলে যায়
সংযত রাখো নিজেকে ;
বোবা আমি ঝাপসা চোখে
দেখে যাই কেবল ক্ষয়িষ্ণু এই সময়।

তপনকান্তি মুখার্জি

বিশ্বস্ত ঠিকানা 


এই বেশ আছি । সুখ - দুঃখ নিয়ে সাজানো বাগান । রুটি , আলুসেদ্ধ , পানতা আর কলমিশাক ভাজা ছবি আঁকে আমাদের খিদের উঠোনে । সব ঋতুর সঙ্গেই পিঁড়ি পেতে গল্প করি , ঘুরে বেড়াই আটপৌরে জ্যোৎস্নায় । ছিন্ন আঁচলে দু - চারটে মিথ্যে হয়তো গিঁট বাঁধে , তবে তা কাঙাল করে না কখনও । অঙ্গে জড়ানো দারিদ্র আমাদের আভিজাত্য , ঘরে জ্বালানো লন্ঠন চাঁদের আলো । প্রতিদিন আমি ধানের শিস , আলু কুড়িয়ে কিংবা একশো দিনের কাজ সেরে আর সাবিত্রী পুকুরধারের শাক তুলে ঠিক ফিরে আসি ভরা সংসারে ।

শতাব্দী দেবনাথ

শোলক

মন রাখা আছে কোন এক ঈশানকোনে, 
এক যুগ কাটে তোমার গানের  অপেক্ষায়, 
কবেকার পুঁথির শোলক, 
আজও একই রকম অশ্রুমতি। 
তুমি কোন এক বেস্টুমি নামে 
পদ্মা পারে গান শুনিয়ে গেছো।
গানের অন্তরাটুকু শোনা বাকি, 
কথা দিয়েছিলে তুমি আবার আসবে। 
অনন্ত বিহীন কুড়ি ফোঁটে, 
নিরবতার করতালে। 
অহেতুক একা হাঁটে কুহুকিনী
অন্তরে আলোকশিখা নিভু নিভু ভাব। 
তবুও এসো শেষ বেলাটা হোক সহজ সরল তোমার গানের সুরে।

সায়ন্তন সরকার

আমার মন

ডাক দিয়ে দেখো আমি কতোটা কাঙাল,
কতো হুলস্থূল অনটন আজন্ম ভেতরে আমার ।
তুমি ডাক দিলে ,
নষ্ট কষ্ট সব নিমেষেই ঝেড়ে মুছে ;
শব্দের অধিক দ্রুত গতিতে পৌঁছাবো ,
পরিণত প্রণয়ের উৎসমূল ছোঁবো ,
পথে এতোটুকু দেরিও করবো না ।
তুমি ডাক দিলে ,
সীমাহীন খাঁ খাঁ মরুদ্যান হবো ,
তুমি রাজি হলে ;
যুগল আহলাদে এক মনোরম আশ্রয় বানাবো ।
একবার আমন্ত্রণ পেলে ;
সব কিছু ফেলে ,
তোমার উদ্দেশ্যে দেব উজাড় উড়াল ,
অভয়ারণ্য হব কথা দিলে ,
লোকালয়ে থাকবো না আর ,
আমরণ পাখি হয়ে যাবো - খাবো মৌনতা তোমার ।।

সুষমা দেবনাথ

ছোঁয়া

তোমার সঙ্গে মুহূর্তগুলো 
খুব মিষ্টি ছিল,
তোমার চাহনির অন্তরালে
আমার অজানা কৌতূহল ছিল,
তোমার অসমাপ্ত কথার গভীরে
আমার আগ্রহ থেকে গেছে,
তোমার মিষ্টি শাসনে
অকৃত্রিম ভালোবাসা‌ লুকিয়ে ছিল
তোমার স্পর্শে
আমি এখনো আনমনা!
কিন্তু তোমাকে ছুঁতে গিয়ে বারবার
আগুনের স্পর্শ পেয়েছি
তোমাকে আর ছুঁয়ে দেখা হলো না।

মোঃ রুবেল

নির্মম প্রতিদান
         
বাবার বুকে মাথা রাখা হয়না-
দুই যুগ অতিক্রান্ত হলো।

হঠাৎ একদিন,
বাবার বুকে নয়, বালিশে মাথা রেখে ঘুমিয়ে ছিলাম।
নির্বিঘ্নে ঘুম হয়নি।
চতুর্দিকে শুধু দায়িত্ব ভিড় করে ছিলো।
বোধহয় বাবাকেও দায়িত্ব এমনভাবেই ঘিরে রাখে।
বাবাও ঘুমাতে পারে না নির্বিঘ্নে।
হয়তো এভাবেই,
দায়িত্বকে ঘাড়ে পুষে সব বাবা বটগাছ হয়।
জীবনরস জুগিয়ে যায় প্রতিনিয়ত।
আমরা স্বর্ণলতার মতো জীবনরস শুষে বেড়ে উঠি।
নতুন একটি বৃদ্ধাশ্রম সূচনার জন‍্য।

নন্দিতা দাস চৌধুরী

এমনি করে ভেসে যাই

নদীর ভিতর  যতদূরই যাইনা কেন তারপরও  যেটুকু থেকে যায় সেতো অলীক ,
পথের ক্লান্তিতে  যখন  নুয়ে পড়ি মাঝ রাতে ঘুম  ভেঙে যায়, 
রাতভর ঝড়ের মুখোমুখি  হয়ে তোমাকে খুঁজি, 
মনের আড়ালে আর মনটাকে ঢেকে রাখতে পারিনা,
 রজনীগন্ধার  সুগন্ধ ছড়িয়ে আমাদের এক হয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় শূণ্যতায় দিন গুনেছো,
 অন্ধকারে আর ভয় করিনা,
এমুখ ওমুখ করে করে যদি আকাশে বাতাসে কানাকানি হয়েও যায় মন্দ কথার আর ধারধারি না ,
তোমাকে ছুঁয়ে দেখার প্রথম আলোয় যে গোলাপ  ফুটে উঠেছে তা মেঘের সাথে আকাশের কূলে বলাকার ডানায় ভেসে যাক দিগন্ত থেকে  দিগন্তে,
প্রেমের দাবীতে মেঘের বুকে লিখে দিয়েছি আমার পরিচয় পত্র,
স্নিগ্ধ  বিনম্র বৈধটুকু অদৃষ্টে প্রবাহমান,
সব বর্তমান একদিন  অতীত হয়ে যায় জেনেও স্রোতস্বিনীতে ভেসে যাই।

সাগর শর্মা

মেনে নেওয়া

সহায়তা করা কোনো অপরাধ নয়-
গ্রহণ করলে লাভ একথাও জানি;
লোন নেবার জন্য
ব্যাংকের সামনে ধর্না দিতেও রাজি।
মনে হয় স্বেচ্ছায় দাতব্য করতে বসেছে,
বিনামূল্যে পরামর্শ আর উপদেশের নোট ঝাড়ে
সুদের কথা অদৃশ্য কালিতে লিখে
খাতায় করমে প্রেরক বক্তা সে...
বিনিময়ে সুদ দিতে হবে না,EMI আছে তো!
তাই,আমি ঋণী হতেও অপারগ।
মহাজনি কারবারির আধুনিক সিন্ডিকেট 
ব্যাংক না হলেও
ঋণ দেবে দৃশ্যমান কালি দিয়ে
সুদের হার বা সময় সে তো সংখ্যামাত্র
সে শুধু দেবে,কিছুই নেবে না
রপ্তানি করে তবু আমদানি বন্ধ,
পরামর্শ ও উপদেশের ফাঁদে পা দিতে দিতে
ঋণী হয়ে ফেঁসে যাব একদিন
কী আর হবে - এভাবেই নির্ভর করে
বেশি হলে নিজেকেই দেব বেচে।
কথা বলে কাজ নেই-
বেপাত্তাই রয়ে যাবে আমার কথা;
আঘাত পেলেও আঘাত দিতে নেই-
শূন্য শতাংশ সুদে,
ফেঁসে গিয়েও ঋণী হবার জো নেই!
পাষাণ হৃদয়ের অধিকারী প্রবক্তাও
আঘাত পেলে স্পঞ্জ হয়ে যান;
প্রতিভা এখানে বয়স মাপে মশাই
না মানলে বন্ধুও হবে শত্রু।
অতএব,শান্তির জন্য মেনে নেওয়াই শ্রেয়।

মীনাক্ষী চক্রবর্তী (সোম)

বাস্তবের আখ‍্যান

সামনে অনন্ত আকাশ 
চারপাশে অসীম নীলাভ মায়া,
বিস্মৃতির চেতনায় জাগে
পঞ্চভূতে মিলাবে কায়া।
বৈভবে ভরা যত সুখের ডালি।
সবই রয়ে যাবে এখানে, 
নিক্তি মেপে হিসাব হবে 
জমা থেকে খরচ ওজনে।
হারিয়ে যাবার আগে 
ভালো যা কিছু থাক সঞ্চয়,
সৃষ্টিগুলো সম্পদ হয়ে  
ভবিষ্যত করুক আলোকময়।।

প্রসেনজিৎ রায়

রোজনামাচা

অভাগী হুল্লোড়ে চাপা পড়ে শহরের আর্তনাদ,
আচমকা জৌলুস হারায়  ব্যস্ত প্রাণের বিষাদ,
নীরবতা ভাঙ্গে বাঁধ অনিচ্ছার গা-ঘেঁষে,
মৃত্যুপুরী সাজে অহরহ জীবিত শহুরি বেশে |
নখদন্তে লেগে থাকে তোমার রক্তের দাগ,
পোষাক জুড়ে রীতিমত মিছে আদুরে সোহাগ,
পার্কস্ট্রিটের রাস্তার মোড়ে দমকা হাওয়ার তোপ,
তবু ভীষণ একলা থাকা বুঝি মানসিক অসুখ |
ফুরিয়ে যায় উনুনের গ্যাস আপেক্ষিক অভিমানে,
সময় জানায় সেও ফুরোলো আমার কানে কানে,
ছুরির ফলায় লেগে থাকা তরকারি বিকোয় বেশি দামে,
ব্যর্থ প্রেমিক মাতাল সাজে রাতে উইস্কি আর রামে |
তোমার  আবার পরিপাটি সংসার সম্পর্কের উষ্ণতা খুঁজে,
আমার দুর্ভিক্ষের বুকের আগুন একটু শীতলতা খুঁজে |
অভাবি আমার ইচ্ছে  উঁকি মেরে একটা নরম বুক চায়,
কালো দিনের অভিজ্ঞতার নিরিখে বোকা মনটা ভিরমি খায় |
চোখ পড়ে দেওয়াল ক্যালেন্ডারের লাল দাগানো দিনে,
বেশ কাটছে দিন গুলো কিচেন মেনুর শুকনো পেঁয়াজ- বিনে,
খোলা ফাইলের কাগজগুলো অসাবধানতায় হাওয়ায় উড়ে,
 পড়ে থাকে বেহায়া মূহুর্ত উপেক্ষায় স্মৃতিকুঞ্জ জুড়ে...

সানী ভট্টাচার্য

মা

মা শুধু মাএ একটি শব্দ নয়
মা মানে জীবন। 
মা শুধু মাএ একটি শব্দ নয় 
মা মানে প্রকৃতি। 
মা শুধু মাএ একটি শব্দ নয় 
মা মানেই মা, যার তুলনা পৃথিবীতে আর হয়না।
মা শুধু মাএ একটি শব্দ নয় 
মা মানেই যার কোলে বেড়ে ওঠা। 
মা শুধু মাএ একটি শব্দ নয় 
মা মানেই জীবন সংঘর্ষের আর এক নাম। 
মা,মা শুধু মাএ একটি শব্দ নয় 
মা মানেই আমার অস্তিত্বের প্রমাণ।

আব্দুল রহিম (নবলিপি)

এ রক্ত আমার ভারতবাসির 

ক্লান্ত দুপুর বুকে জড়িয়ে 
রোদে পুড়ে যাওয়া মাটির গন্ধ মেখে  
একবার ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছে ছিল তোমায় 
তুমি এলে না 
তারপরেই তো শুরু হল ধর্মযুদ্ধ ।

ঈশ্বরের মূর্তিগুলো একের পর এক ভেঙে পড়লো 
মানুষের বুকের  উপর
মসজিদের বড়ো বড়ো গম্বুজগুলো ভেঙে পড়লো 
মানুষের মাথার উপর 
মন্দির থেকে ,মসজিদ থেকে 
রক্ত গড়িয়ে  এসে মিশেছে রাজপথে।

এক মুসলিম শিশু  রক্তের উপর হাত বুলিয়ে বলেছিল
এ আমার বাবার রক্ত 
এক হিন্দু মেয়ে এসে রক্তের দিকে তাকিয়ে বলেছিল 
এ আমার  সন্তানের রক্ত 
আর আমি  চিৎকার করে বলেছিলাম  
এ আমার ভারতবাসীর রক্ত।

কাঞ্চন দেবনাথ

শ্রাবণধারা

ঝরছে শ্রাবণের বারিধারা,
গা জ্বালা ভাব গেলো তবে -
কিষান কিষানি উঠেছে মেতে,
সোনালী ফসল ফলাতে হবে।

সবুজ বনানী সতেজ হল,
ভরেছে পাতায় ফুলে,ফলে -
প্রকৃতির অপরূপ শোভা,
ফুটে উঠেছে ধরণীতলে।

পুকুর,নদী,খাল-বিল,
কানায় কানায় জলে-
নতুন জলে মাছেরা ও,
মনের হরিষে খেলে।

জাল নিয়ে জেলের দল,
ছুটছে নদীর পানে-
বোয়াল কাতলা পড়বে ধরা,
এই আশা যে মনে।

পাতি হাঁস নদীর জলে,
ঢেউয়ের তালে চলে-
মনের সুখে ভেক ডাকে,
নদী নালা খালে বিলে।

শ্রাবণ তোমার বারিধারা,
যেন শান্ত ভাবে ঝরে-
কিষান-কিষানির মুখের গ্রাস-
নেয় না যেন কেড়ে।

অতনু রায় চৌধুরী

বাঁচার জন্য

জীবন স্রোতে কোথায় আছি
রয়েছি কীভাবে!
তা কারোর জানা নেই 
কেবল মা, বাবাই হয়তো কিছুটা জানে।

এই যে রোজ লড়াই চলছে নীরবতার ভীড়ে
দেখতে সব সুন্দর ঠিকই তবুও হাহাকার হৃদয় জুড়ে।
নেই কোনো বিশ্লেষণ, না নেই কোনো বিবরন
বাঁচার জন্য বেঁচে আছে এই জীবন।

স্নিগ্ধা ভট্টাচার্য

ভালবাসা

কবির কবিতা নয় গো তুমি।
তুমি পথ চলার  জীবন সাথী।
তুমি আমার ভরসা , 
তোমার হৃদয় যখন ছুঁয়ে ছিল আমায়
একা একা পথ চলতে চাইনি  আমি ,
তোমায় পাশে পেতে চেয়েছি।
তুমি নিয়েছো আমায়  তোমার হৃদয় জুড়ে।
আমার ভাবনায় এসেছো বারবার।
মাঝে মাঝে ভয় হয় ,
যদি না বলা কথা গুলো , না বলাই থেকে যায়।
আমার স্বপ্নের আকাশে ভালবাসার  রঙ,
রাঙিয়েছে তোমার ভালবাসা ।  
আমি অপেক্ষায় সাজানো নীরে ।
নিত্য দিনের চলার স্রোতে মান অভিমান থাকবে মিশে।
মিল অমিলের ছন্দে গড়ব আনন্দ নিকেতন।
ক্লান্ত হলে নীরবতায় রাখবো মাথা তোমার কাঁধে।
শুধু দিও তোমার হাতে হাত।

সুপ্রতিম ভৌমিক

 বর্ষারাণী আজ নটরাণী

বৃষ্টিধারা ঝুম-ঝুম,
নাচে নূপুর পায়ে বর্ষারাণী
বাজিয়ে রুম-ঝুম ।
কখনো বা বাজায় নূপুর
এমনি বিকট শব্দে,
কানটা করে ঝালা-পালা
গুরু-গম্ভীর গরজে ।
মেঘমালা বাজায় তবলা
কখনো সুমধুর,
কখনো বা উন্মাদ নৃত্যে
বর্ষারাণীর সাথে-সাথে
বাজায় ঘোর-ঘোর ।
আর অশনি আলোকে
বিদ্যুৎ চমকিয়ে,
সৃজন করিছে 
প্রকৃতি নৃত্যমঞ্চে
বিচিত্র আলোকসজ্জা ।

আব্দুল গফফার

রঙিন তুলির শেষ টান

আজ একটা নদী আঁকব,
এঁকেবেঁকে লম্বা চলে গেছে ঐ দূরপানে।
নদীরতো কোন রং নেই,
ধূসর রঙেই টানি তুলির আঁচড়।
যদি পারাপার করি ক্যানভাসের চিত্রপটে,
জোয়ার ভাঁটা, উজান টানে।
তোমার জলে কত কি দেখতে পাই,
একূল ভাঙছে,আমার তুলিও নিম্নগামী।
ওকূল গড়ছে,রঙিন হয়ে উঠছে ক্যানভাস।
যখন স্রোতস্বিনী হও তুমি,
রঙ তুলিতে রাঙাই তোমায়।
তুমি যখন বানভাসি,
তুলি তখন শান্ত,
কোন রঙ স্পর্শ করে না তখন।
তুমি যখন বিস্ফারিত হও,
রক্তিম হয় ক্যানভাস।
তোমাকে নিয়ে আমার কল্পনার অন্ত নেই,
তুলির শেষ টানের অপেক্ষায়,
বসে আছি আজও তোমার জন্য।

শ্বেতা ব্যানার্জী

সারেঙ্গীর সুর

কে বলে আমি কবিতা লিখি!
আমি তো দাবি নিয়ে অনশনে বসিনি..।
----কেন যে ভ্রু যুগলে এতো জিজ্ঞাসার চিহ্ন'
আমি কেবল গ্রহণ লাগাতে ব্যস্ত--
যাক না শব্দগুচ্ছ রাহুর পেটে,
অথবা ঝড়ের দাপটে দেশান্তরী। 
কিম্বা থালা নিয়ে ফুটপাতের ওপর ভিখিরিনী বেশে।
ধরো যদি আমার সময়ের হিসেব ঘড়ির কাঁটার কাঁধে বর্তায় কি লজ্জায় পড়বে সে!
না,না, আমি কবিতা লিখিনা। 
দুটো শব্দের বোঝা বইলে ই কি তাকে কবি বলা যায়!?
----কবি, দুটো অক্ষরের ব্যাপ্তিতে সূর্যের আগুন। 
চাঁদের সহিষ্ণুতা, সৃজনশীল শিল্পমাধ্যমের কড়িবরগা ছুঁয়ে ছুটে চলে আকাশ ছুঁতে...
তারপর তারাদের সাথে মিলেমিশে জ্বলজ্বলে নক্ষত্র--"  
না,না, আমি কবিতা লিখিনা। 
এক অর্থে আমি "ধর্ষক"
প্রতিদিন হাজার -হাজার শব্দকে ধর্ষণ করে ছুঁড়ে দি
ডাস্টবিনে।
তারপর  ছড়িয়ে ছিটিয়ে তারা এলোমেলো... 
তখন "ডি এন এ" টেস্টে ধরা পড়ে এটা  আমার ই
কীর্তি। 
তবুও কেউ- কেউ অসাধারণ, অনবদ্য, অনুপম,অসামান্য... 
লিখে আমাকে আশ্বাসের জোয়ারে বসিয়ে মোহনায় নিয়ে যায়।
আমি বুঝি, "শব্দ ধর্ষক" কথাটা কেউ মুখ ফুটে বলেনা।

আমার শব্দেরা কোনদিন কবিতা হয়ে ওঠেনি।। 
তারা বোঝেনি  পিচগলা রাস্তায় শ্রমিকের দান, বোঝেনি করণিক বাপের কান্না, সীমান্তে শহীদ ভাইদের দুঃখ। 
বা যে শিশুটি জন্মে ই মায়ের ছোবড়া দেহে শুধু খিদে
খুঁজে গেল, তাদের কথা। 
আমার  শব্দেরা শুধু ই বৈভব মেখে বিভীষিকা বুনে গেল..।
সিস্টেমের কলকব্জা নেড়ে চাবুক চালাতে পারলোনা। 
আমার শব্দগুচ্ছকে আজ স্বাধীনতার স্বাদ দিলাম, 
উড়িয়ে দিয়ে বললাম..। 
যা---
ঘুরে আয় হিরোশিমা -নাগাসাকি, ঘুরে আয় খিদের রাজ্যে, বা কাঁটাতারের দুইপারে। আর হিমাঙ্কের
নীচে স্যাঁতসেঁতে তলকুঠুরিটায় লুকিয়ে যারা দেশরক্ষা করছে তাদের কাছে। 
যদি, আর ডি এক্সে জখম হতে পারিস,অথবা বুলেটের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে ছিন্নভিন্ন। 

সেদিনই ফিরে আসিস আমার কবিতা হয়ে..। 
নাহলে আজন্ম "শব্দধর্ষক ই.." রয়ে যাবো।

Jul 29, 2022

রামমোহন বাগচী

গোলকধাঁধা
                                       
প্রেম না ভালোবাসা ,কে প্রথম কে শেষে
বুঝতে গিয়ে হারিয়ে গেছে যৌবন, 
দিন না রাত, মৃত্যু না জন্ম ,কে প্রথম কে শেষে
পাইনি  হদিশ তাঁর সারা জীবন। 
আলো অন্ধকারে রিতুচক্রে কে আগে কে শেষে
রইলো সে আজও ধরা ছুঁয়ার বাইরে
রোদ বৃষ্টির লুকোচুরির চিত্রপটে
চেতনা খায় গড়াগড়ি । 
গোলক ধাঁধাঁর খেলায় মত
জ্ঞানের মাথায়  দিয়ে ছাতি! 
তাইতো পথের সাথে পথ মিলেনি
চলছে ওরা  আপন স্রোতে। 
ঘুমহীন রাতে পরীরা আসে  
ডালপালা হীন গাছের  তলে
নিভিয়ে জ্ঞানের আলো। 
নির্বাক হয়ে ভাবি আপন মনে
ছিলাম কোথায়, যাব কোথায় ! 
বলবে কি কেউ আমায় ? 
গোলকধাঁধার ছাঁদনা তলে পথ হারিয়ে
খাচ্ছি ডিগবাজি আগে পরের, দ্বন্দ্বে জড়িয়ে ।।

কাজী নিনারা বেগম

ঘোমটা

অদ্ভুত এক অদৃশ্য সুসজ্জিত ঘোমটার আড়ালে ,, 
জট বাঁধানো আলোর মিছিলে, 
আগুনের লেলিহানে ইচ্ছেরা চলেছে আজ! 
হিসেবের পাট  চুকিয়ে শিকড়ের সন্ধানে।
ঘুরেফিরে জড়ো করা শ্যামল ছায়াপথের ঘূর্ণন বেগের বিচ্ছুরণ হরিদ্রাভ পাতায় ! 
বৃষ্টি হীন তীর্যক রোদে অসুর অদমনীয় বসন্তের আবিরের মতো,,
হারানো স্মৃতির মেলোডি গানের রিদমে। 
 কানামাছিরা ভালোবাসা উপেক্ষিত! 
আজকের এই শহরের আর্ট গ্যালারিতে রঙ তুলির নানা রঙের বাহারে। 
আ্রর্টিফিসিয়াল আর্টিকেলে সংবাদের শিরোনাম সূসজ্জিত আসনে! 
অকৃত্রিম মান্যতায় সংক্রমণ হবে ছত্রাকের ভাবতে পারিনা কখনো!
মানবতা আজকের দিনে আ্যকোরিয়ামের জলে ভেসে হাবুডুবু খাচ্ছে।

চিন্ময় রায়

মায়াজাল

আমরা হলাম মানবজাতি-
আবদ্ব মায়াজালে।
এই দুনিয়ায় চলছি মোরা,
নিজের মতো নিজের হালে।
বেঁচে আছি মোরা আজকে,
স্বজন বন্ধুর টানে।
পরিবার-পরিজনের মধ্যেই তো ভাই,
আনন্দের হাওয়া বয়ে আনে।
ছোট থেকেই শ্রদ্ধাভক্তি আসে মোদের মনেতে,
দূর থেকেও শ্রদ্ধা ভক্তি আসে ক্ষণে ক্ষণেতে।
অপর ক্ষেত্রে বন্ধু-বান্ধব,
দ্বিতীয় পরিবার বলি।
ছোট থেকেই সকলে মোরা,
এক হয়েগে চলি।
জানি একদিন থাকবো না আর,
এই বিরাট পৃথিবীতে।
সকল মানবের মুক্তি ঘটবে,
এই বিরাট মায়াজাল হইতে।

রাহুল শীল

গাছ ও পাহাড়
                      
এখন বৃষ্টিদের দিন
মাটির গায়ে থরথরিয়ে পড়বে,
চুম্বন করবে ভূত্বক।

এখন গাছেদের দিন
হাওয়ায় উড়োবে চিরহরিৎ পাতা,
এখন ভালোবাসার দিন
তুমি আর আমি গাইব পৃথিবীর মায়াবী গান
থেকে যাবে ছাপ নদীর মতো শরীরে !
পাখিদের মতো করে আকাশ হবো
মেঘ দেখে বলব এত সুখ কে সাজিয়ে রেখেছে বারান্দায়?
এতসব পাহাড় দেখে দেখে হিসেব করবো 
উচ্চতার নিরিখে নিজেদের অভিমানের দৈর্ঘ্য।
তখন হেসে দেব দুপুরের স্নান শেষে কোনো শিশুর মতো,
একটি গাছ থেকে নেমে পড়া শেষ রাতের ছায়ার মতো।

তখন মানুষের জন্য  লিখব মানুষের ই প্রেমের কবিতা।

পাপিয়া দাস

হতাশা 

একদিন হতাশার ছুবলে
কেরে নিল তার প্রাণ।
যার রেজাল্ট সিট নাকি
রাখেনি তার মান।

সেদিন তার বুকটা হতাশাগ্রস্ত
পারেনি সে সাহস জোগাতে,
পারেনি পা দুটোকে জোর করে সামনে এগিয়ে  নিতে।
হতাশা পিছে ঠেলে দেয় 
অবিশ্বাসের মাটিতে।

সেও ভেবেছিল পাড়ি দেবে মহাকাশ
একদিন ছুবে পাহাড়ের  শিখর।
কত স্বপ্ন,কত আশা ছিল তার,
নির্বিঘ্নে  কেটে যাবে শৈশব,যৌবন আর বৃদ্ধকাল।

সুজন দেবনাথ

দ্বিধা দ্বন্ধ

জীবনের প্রতিটা বিশেষ মুহূর্তে 
অকৃতকার্য প্রাণটা আজ, 
নিজেকে ব্যর্থতায় পর্যভূষিত করেছে। 
ঝলমলে আলোর রোশনায় ভরা 
দিগন্তে আর হাঁটার ইচ্ছে নেই। 
ইচ্ছে নেই আর জীবনের মানে খোঁজার।
আজ শুধু আঁধারের গলিপথ খোঁজে, 
নিজেকে আত্মগোপন করার। 
যে আঁধারে লুকিয়ে থাকে 
জীবনের প্রতিটা ভালো-মন্দ। 
সে আধাঁরেই বিলীন হোক এবার
ব্যর্থ হৃদয়ের সকল দ্বিধা দ্বন্দ।

রমা চন্দ্র

ভেজা সুখ

বিনা আমন্ত্রণে
আষাঢ় তুমি এলে,
সাথে করে নিয়ে এলে যাদের-
ওই বর্ষা আর বাদল
তারা করল আমায় পাগল,
ওদের ভালবেসে ছুঁয়ে থাকাতে-
আনন্দ টা এখনো রয়ে গেছে...
তবে ঝুম বরষণে
স্নানের অভিলাষ টা 
কোথায় যেন হারিয়ে-
প্রস্তরখণ্ডে চাপা পড়েছে!
তুমি এসে দিলে আমায়
এমনতর নাড়া-
মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারি কি
না দিয়ে তোমায় সাড়া?
বাদলের হাতে তাই তুলে দিলাম-
নিমন্ত্রণের চিঠি,
সব বাধা টুটি 
যাব চলে ছুটি...
ওই হিমাদ্রী চূড়ায়
শ্বেতশুভ্র বরফের মাঝে-
যেখানে নক্ষত্ররাজ আশ্রয় নেয় সাঁঝে,
ঢেউতরঙ্গে মাতোয়ারা
উত্তাল সিন্ধু বুকে... 
গায়ে শ্রাবণ বরষণ মেখে-
যেখানে কবিরা কবিতা লেখে...।

শব্দ শ্রমিক

ভুল ভাষা

বহু বহুদিন আমরা মানুষের ভাষায় কথা বলতে পারি না, 
চেষ্টা করলেও পারি না।
সেই অগ্নি যুগের পর থেকেই মানুষের ভাষা মানুষ ভুলে গেছে।
আমরা এখন পশুদের ভাষায় কথা বলি,
গাধার মতো ডাক ছাড়ি।
মানুষের ভাষায় চেষ্টা করলেও খচ্চরের ভাষা বেরিয়ে যায়।
অদৃশ্য কোনো শক্তির ভয়ে আমরা মানুষের ভাষা ভুলে গেছি,
মাঝে মাঝে আমরা হালুম হালুম ডাক ছেড়ে ঝাপিয়ে পড়ার চেষ্টা করি,
কিন্তু তখনই শোষন মাখানো শাসনের চাবুকটা আমাদের আবার গাধা বানিয়ে দেয়।
আমরা প্রভুর পায়ের কাছে মিউ মিউ করে লেজ নাড়ি।
বহু বহু বছর পর আমরা উপলব্ধি করছি,
নিজেদের ভাষা আমাদের আজও শেখা হয় নি।

জগন্নাথ বনিক

শিশুরা ফুলের মতো 

সবুজে ঘেরা এই অরণ‍্যে,
কতো যে রঙিন ফুল।
ভোরের আলোতে রাতের আঁধারিতে,
ফুলের মতো সদ‍্য শিশু জন্ম নেয় মানব কুল। 

পাপড়ি মেলে আলো দেখে,
কাজল কালো আঁখি দুটি।
মোরা নিষ্পাপ ফুলের মতো,
মানব বৃক্ষে বেড়ে উঠি।

মোর বধনে আসে কান্না,
আহার লাগে যখন।
মানব বৃক্ষের দুগ্ধ পানে থামে কান্না,
আজও শিশুরা নিষ্পাপ ফুলের মতন।।

কুশল রায়

চাইছে না

ভারী অদ্ভুত হলো আনন্দ আর দুঃখ 
দু'জন এতো কাছাকাছি থেকেও ঠিক, 
একে অপরের বিপরীত হয়ে থাকে 
কেউ আনন্দ চাইলেও দুঃখ চায় না ৷
অন্যদিকে কেউ যখন খুশিতে মজা করে 
তো আবার কেউ কষ্টে কাঁদে,
তবুও সবাই এটাই চায় 
সুখ শান্তি নিয়ে যেন বাঁচতে পারে ৷
তাই কখনো কখনো কেউ এটাই ভুলে যায়,
ভালো থাকা কেবলমাত্র আপনার একার নয় 
সবাই কে ভালো রাখারও একটা দায়িত্ব আছে ৷
তবুও কিছু কিছু শ্রেনী কিঞ্চিৎ কিছু ধম্ম-জ্ঞানের জন্য 
সম্পত্তি,প্রতিপত্তি নিয়ে যেন একেবারে তেড়ে আসে ৷
ঐ বললাম যে কারণ একটাই
সেই শান্তি,সুঃখ চাই ,
হেরে যেতে চাইছে না কেউই ?

গোপী নাথ ঘোষ

সুখ

নাইকো কড়ি
তাইতো গড়ি
শূন্যে খেলা ঘর।

ঘরের কোণে 
স্বপ্ন বুনে
ইচ্ছেমতির বর।

নাইকো দুখ
তাতেই সুখ
ভাবো যদি ভাই।

তুমি হবে মর্ত্যলোকে
শ্রেষ্ঠ সুখি তাই।

রূপঙ্কর পাল

উত্তাল নদী

জলোচ্ছ্বাস, শব্দ, উথাল পাতাল ঢেউ
নৌকা টলমলে, যাত্রীরা হাপিত্যেস প্রায়;
মাঝির বিঁড়ির টান যন্ত্রণার উপশম।
মাঝে মাঝে সেই ঢেউ খেলানো দৃশ্য
ভয়ঙ্কর তবুও অবাক বিস্ময়!

জীবনের নদীগর্ভে ভাঙন গড়নের চক্র
ঠিক তদরূপ; জোয়ার ভাঁটার খেলা
অনবরত, মনমঝি ঠিক সামলে নেয়।
দিন-রাত্রি তুচ্ছ ব্যাপার-
শুধু গন্তব্য ভাবনা যেনো নির্দিষ্ট।

রঞ্জন ভাওয়াল

ব্যথা  

ব্যথা ব্যথা করে ভুগছে মানুষ  
এ এক কঠিন রোগ  
পারবে কি কেউ এ রোগ সারা তে?  
যতই করো যোগ বিয়োগ।   

কৃষকের ব্যথা হয় উদরে 
বৃষ্টির জন্য দিন গোনে 
সবুজ শস্য ফলাবে সে 
দৃষ্টি থাকে আকাশ পানে। 

মায়ের থাকে অন্তরে ব্যথা  
ছেলে যদি না হয় শিক্ষত  
বাবার  ব্যথা চোখের জলে 
শেষ বয়সে বৃদ্ধাশ্রম, থাকে যদি রক্ষিত।   

যুবক যুবতীর প্রেমে ব্যথা  
একে  অপরের হৃদয়ে জড়াজড়ি  
মোহ যখন হ্রাস পায়  
প্রেম ব্যথা হয় ছাড়াছাড়ি। 

কবির হয় মাথা ব্যথা 
যখন আসে না কোন ভাষা 
ভেবে পায় না তখন ছন্দ, ব্যাকারণ  
মনে তখন আশে হতাশা। 

রূপশ্রী চক্রবর্তী

বেহিসেবী ভাবনা

স্বপ্নিল প্রেম হৃদয়ে আমার
দুচোখে রঙিন আলো,
জীবন যুদ্ধে ক্লান্ত আমি 
দেখি আঁধার কালো ।
একটু প্রেম একটু খুশি 
আর একটু ভালোবাসা ,
বুক ভরা আবেগ মান অভিমান
বাঁচার স্তিমিত আশা ।
ধর্ম অধর্ম পাপ পুণ্যের 
মিথ্যে হিসেব নিকেশ ,
উচুঁ নীচু জাত পাত 
বেহিসেবী হিংসাদ্বেষ ।
পরচর্চা পর নিন্দা
জমজমাট আসর ,
বিলুপ্ত প্রায় সন্ধ্যারতি 
শঙ্খ ঘণ্টা কাসর ।
আনমনে ভাবি কভু 
জীবনের শেষ অধ্যায় , 
হঠাৎ করে আসে যেনো নাম
চিত্রগুপ্তের তালিকায় ।

অলকা গোস্বামী

আঁধারে কুয়াশা

ছোট ছোট স্বপ্ন ভাঙে গড়ে,
মন খারাপের কুয়াশা
 সন্ধ্যার আঁধারে;
হেঁটে হেঁটে যায় ইচ্ছে তারারা ক্ষয়াটে চাঁদের বুকে।

সেই শুরু মাটি ছুঁয়ে আকাশ,
অন্ধ লালন,ভুলভাল শব্দ হতাশ।

আবারও শুরু যাত্রা, বোঝা ভারী জীবন সাগর,
আলো বুকে জিইয়ে রাখে,
সময়ের চাহিদা যেমন।

শত চোখে জ্বলে দেখি ;
পাশাপাশি সুখ ভালোবাসা।
মরুবালি ধূ ধূ ঝড়
ঢেকে যায় সব চেনা জানা।

অশ্বিনী কুমার মন্ডল

বর্ষার হাল

বর্ষার এখন নেই ভরোসা
মিছে বাদল দিনে, 
চাষী ভাই মিথ্যে আশায়
মরছে ডুবে ঋণে। 

আশায় আশায় দিন কাটে
আসবে কখন বৃষ্টি, 
বৃষ্টি বিহীন এই পৃথিবীতে 
কিভাবে হবে সৃষ্টি? 

দিন গুনেই আষাঢ় শ্রাবণ 
শেষ হলো দুটি মাস,
হালের গরু পালেই চরে 
কিভাবে হবে চাষ। 

সৃষ্টি বিনা স্রষ্টার যেমন 
দশা খুব বেহাল, 
কৃষি বিনা কৃষক কিভাবে 
কাটবে বলো কাল?

অনন্যা ভট্টাচার্য

তারপর...... 

নতুনের পথিক আরো একবার
মান- অভিমান ফ্রেমবন্দী
দোঁসর আমার অভিজ্ঞতা। 
স্মৃতি ঝাপটা দেয় হঠাৎ
তবুও মনে শেকল বাঁধা-
ক্যানভাস আবার রঙীন হয়
ছবি ফুটে উঠে আরো একবার, 
পায়ের ঘুঙুর তাল খুঁজে পায়
তারপর----- এগিয়ে চলা নিরন্তর। 

রফি আহমদ মজুমদার

উপহাস  

ওই দিগন্তের খাদে দাঁড়িয়ে 
শেষ কসরতে ব্যস্ত জীবন ,
একটা দাবার চালে যদি 
মোড় নিয়ে নেয়   -----
একদম বাজিমাত  ।
নিঃশব্দে কিছু পাওয়া 
আর নিঃশব্দে দিয়ে যাওয়ার 
ব্যস্ততায় মহা আয়োজন  ,
কিছু ধরে রাখার কাঠখড় 
পোড়নোয় দেখি অকাল বার্ধক্য ।
জ্যোৎস্নারাতে অভয়ারণ্যে নরখাদকের 
নির্ভয়ে ঘোরাফেরা  -----
রূপোলী চাঁদের কপালে ভাঁজ , 
বিনিদ্র রজনীর দুঃসহ প্রহর , 
অনাদরে ঝরাপাতার অনন্ত বিলাপ ।
একদল বুভুক্ষুর তীব্র নরকযন্রণা
বিলাসী মনের নির্মম উপহাস ,
সব ভাগ হয়ে যাক ; ওরা থাকুক 
বেঁচেবর্তে , কেঁদেকুটে, আনন্দ-উল্লাসে ।

অভ্রজিৎ দেবনাথ

যদি নিয়ে যেতে পারো

কতজন স্বপ্ন ফেলে গেছে প্রথাগত পথে
স্পর্শিয়ার নতুন গল্প নিয়ে বসে আছি,
সমবয়সীদের স্বল্পতা বেড়ে গেলে
চলে আসি তোমার শহরে।

বিরক্ত করা আমার অভ্যেস নয়,
যদি ফিরে আসো বিরোধী প্রেমিক হয়ে
পররাষ্ট্র দখলে আমি যাব না

যদি ধরে নিয়ে যেতে পারো।

সৈকত ভৌমিক

রক্তচোষী

চারিদিকে যেন ছড়িয়ে আছে অজানা কত লাশ।
চারিদিকে যেন শৃগাল আর শকুনের বাস।
নিরীহ মানুষের রক্ত চুষতে রক্ত চোশীরা ব্যস্ত।
রাজদন্ড তো আজকাল রক্তচোষির হাতে নেস্ত।
মানুষ তো আজ মানুষ নয় শুধু শোষণের যন্ত্র।
মানুষ ও আজ নির্বিকার হয়ে খুঁজছে বাঁচার মন্ত্র।
শোষিত মানুষরাই একদিন শেষ কথা বলবে ।
তারাই একদিন শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়ে জ্বলবে ।
একদিন ঠিকই শেষ হবে অত্যাচারির অত্যাচার ।
শোষিত মানুষরাই করবে অত্যাচারির বিচার।
আবার ও পৃথিবী হয়ে উঠবে আলোকময় ।
আবার ও হবে নতুন দিনের নতুন সূর্যোদয়।

প্রিয়াঙ্কা আদক মন্ডল

কোন এক নারীর কথা

ইচ্ছে গুলো একটু একটু করে শেষ করে দিচ্ছি,
তাও আবার হাসিমুখে।
আচ্ছা তোমরা বলতে পারো,
মেয়েদের কেন  সব সময়
এত অবহেলা সহ্য করতে হয়।
সবকিছু কেন মেয়েরাই সহ্য করবে?
কেন ছেলেরা নয়?
গ্রামে থাকি বলে!
কেন এই মেয়েরা পড়াশোনা করেও
চাকরি করতে পারবে না
গরিব বলে! নাকি অন্য কিছু
আমাদের কি কোন স্বাধীনতা থাকবে না?
মেয়ে বলে কি নিজের ইচ্ছের কোন দাম নেই
মেয়েরা কি এতটাই অপরাধী!
নাকি ফেলনা!
মেয়েরা বাইরে বের হলে খারাপ পথে যাবে।
কই ছেলেদের কে তো বলা হয় না।
নাকি ছেলেরা কোনদিন খারাপ পথে যায় না।
একটা ছেলেও কিন্তু বাইরে গেলে
খারাপ পথে যেতে পারে,
খারাপ কাজে লিপ্ত হতে পারে।
আমার আমাদের সকল নারীর এই জিজ্ঞাসা সমাজের কাছে।
আমরা কেন মুখ বুজে সহ্য করব?
নারী! তুমি তোমরা প্রতিবাদী হও,
এ সমাজকে বদলাতেই হবে।
তখন দেখবে দেশের মতো
তোমরাও স্বাধীন হবে।
স্বাধীনতা পাবে!

মিঠুন রায়

আর্তনাদ 

আমার লজ্জা আবৃত করতে কেউ এগিয়ে আসেনি
কেননা আমার কাউকে তোষামোদ করার সামর্থ্য ছিলনা।
সবাই ক্ষুধার্ত সিংহের মতো লালা ঝরিয়েছে বারবার,
তাই আমি  ভোরের রঙে মিশে গেছি মেঘের সাথে।
ডুবে যাব নীল গগনের নীরবতায়,
যেন অপলক দৃষ্টিতে কেউ আমাকে দেখতে না পারে।

সূত্রা সরকার সাহা

পরিণতি

যুগ কলঙ্কে কলঙ্কিত এই যুগ মানব,
মারণ নেশায় ঐ মেতেছে যেন সব,
বেঁচে থাকার রসদ নেই যে আর,
আগ্রাসী আগুনে জ্বলছে,দগ্ধ পৃথিবী বারম্বার,
শান্তি আজ হারিয়ে গেছে সুখের নীড়ে,
বেদনা,যন্ত্রণা, হাহাকার নিত্য সঙ্গী যার,
কেমনে বাঁচিবে পরাণ, হৃদয়, হারিয়েছে অঙ্গীকার,
ভস্মীভূত অধিকার, বাঁচার মন্ত্র নেই আর,
অলিতে গলিতে মৃত্যু, নাশকতার ছকে জেরবার,
দিগ্বিদিক শূন্য, দিশেহারা, নেই পথ আর,
বিচারের আশায় বিচারাধীন ঐ বাঁচার অধিকার,
শাসন ও শোষণের নাগপাশে জীবন জীবিকা ,
জ্বলন্ত সিগারেটের ধোঁয়ায় রিং রিং কুণ্ডলী,
আশা হতাশার দোলাচলে পরাণ ওষ্ঠাগত প্রায়,
শূন্যতার আস্ফালনে মাদকতার নেশায় নির্মম পরিণতি।

সৌমেন্দ্র দত্ত ভৌমিক

ঘা গুলো অবেলায়

তার ভেতর আগুন ছিল পাথরচাপা
দীর্ঘকাল, কেউ-ই তখন দেয় নি খুলে
সেই বদ্ধ দুয়ার,
কারোর কাছে পায় নি অবশ্য সেই পাঠ
ওঠাবসা চলনবলনের সুঠাম তাল।
পুড়ে পুড়ে পুড়ে নিদাঘ নিদান
দুটি পা মেলেই আছে বসে
পরম শান্তিতে তার রিক্ত দাওয়ায়,
জমজমাট মনটি কোথায় যেন হয়েছে চুরি
পায় না খুঁজে তার ঠিকানা।
তার ভেতরে সতেজ ফুলগুলো সব
ভীষণ ভীষণ ওমে শুকনো খটখটে,
হাজার ফোঁটা অসময়ে ঝরে গেলেও
             অনাদরের সুতীব্র বাণে,
এখন এই অবেলাতে মলিন হাস্যমুখে
ঘা-গুলোর আরোগ্যতে উঠতে জেগে
কারোর দয়ার হাতটি আসে না প্রাণে।

অসীম পাঠক

ঘৃনা

ক্ষমা আর ঘৃনা শব্দদুটোর ব্যাবধান গগনচুম্বী। ঘৃনা সবাই করতে পারে , কিন্তু  ক্ষমা করতে গেলে  তার হৃদয় বড়ো হতে হবে এমন নয় , ক্ষমা তো একটা কমন শব্দ , সবাই বলে।  কিন্তু মুখের সামনে ঘৃনার কথা বলার সাহস সবার  হয়না , আসলে ক্ষমা সবাই কেই করা যায় , কিন্তু ঘৃনার ব্যাবহার অনুভূতি ভেদে বদলায় । ভালো না বাসলে ঘৃনাও করা যায়না ।  আবার অনেক সময় মনে হয়  ঘৃনাতেই শেষ হোক  নিঝুম চাঁদনী রাতে আলোয় ছুটে চলা । বেলাশেষের রাগিনী তে  ঘৃনায় ডুবে যাক ভালোবাসার অজস্র বলিরেখা। ঘৃনাতেই জন্ম নিক আরো কত শত গান কবিতা , ঘৃনাতেই মুছে যাক জীবনের লালিমা  কালিমা   সব,  --- ঘৃনার অন্তরে বিদ্বেষে অনুরাগে অভিমানে  জেগে উঠুক মনের সুপ্ত আগ্নেয়গিরি।।

হরিহর বৈদ্য

শ্রাবণ আসুক মনে

বৃষ্টি এলো শ্রাবণ আকাশ জুড়ে 
ঝমঝমিয়ে ঝরছে অনর্গল,
মন মেতেছে ময়ূরসম যেন 
আনন্দে আজ ছুটছে শিশুর দল।

ভিজিয়ে মনের পাখনা গুলো যত 
আনন্দেতে আজকে বিহবল,
স্বর্গসুখে খেলব সবাই মিলে-- 
ডাকবো সবার চল রে চল রে চল।

বুঝলাম আজ বর্ষা দিনের মানে 
প্রানের ছোঁয়া পেলযেন প্রাণ,
শক্ত মাটি ভরলো নরম ঘাসে 
শ্রাবণ দিনের এমন- ই  অবদান।

শ্রাবণ আসুক এমনি সবার মনে 
হৃদয়সাগর বক্ষভাসাক তার, 
ছন্দে তালে দুলবে তবু মন--
পেরিয়ে যাবেই দুঃখ পারাবার।।

ঝিমলি আচার্য

শেষ রক্ষা

বৌমা ওকে যেতে দাও ।
না-মা-না দয়া করুণ ,
অগাধ পরিশ্রম করব 
কোন ত্রুটি রাখব না ।
জীবন যুদ্ধের টালমাটাল 
অবস্থা, ঢালাও খাবার 
কিন্তু গলায় কাঁটা ।
সীমান্ত রক্ষী, মা হয়ে 
যেতে দিচ্ছেন ?
আমি সাধারণ মা - নই 
ভারতের বীর সন্তানের মা ।
কি লাভ হচ্ছে বলবেন ,
বীর সন্তানরা দেশ রক্ষায় 
গুলি বিদ্ধ হয়ে , বরফে বা 
ধসে চাপা পড়ে শহিদ হচ্ছেন ।
আবার কেউ বা নিঃস্বার্থ, দেশ
বাসীর সেবায় আত্ম নিয়োগে রত ।
লক্ষ্য শহিদের মা বুক চেরা  
যন্ত্রণা ভোগ করছেন --
আর আমরা! লোভের বশবর্তী 
হয়ে নিজেরাই নিজের খুনি, 
সন্ত্রাসী ,ধর্ষণকারী হয়ে উঠেছি ।
তাহলে ! শেষ রক্ষা হচ্ছে কোথায়?
বিদেশি গোষ্ঠীকে বাঁধা দিয়ে কাজ নেই ।
ভোগ করে যাই ততদিন 
যতদিন হাতে আছে প্রাণ ।

নীতা সরকার

এলো বরষা

আষাঢ়ে প্রথম দিনে
নীল আকাশে মেঘলা হলো।
মেঘ, তোর সঙ্গে যাবো ভেসে
নীল আকাশের নিচে।

এবার বুঝি বৃষ্টি এলো
ঝমঝমিয়ে টিনের চালে
বৃষ্টি ভেজা শীতল হাওয়ায়
হৃদয়ে জাগে শীতল শিহরণ।

শহর জুড়ে বৃষ্টি আজ
চারিদিকে জল থৈ থৈ
নদী, নালা, খাল,বিল
কানায় কানায় উঠল ভরে।

মন পুলকিত হয়ে ওঠে
রিমঝিম বৃষ্টির ছন্দে।
প্রাণ ভরে ওঠে আমি, কাঁঠাল
আর ইংলিশের গন্ধে।

বাতাসে ছড়ায় সুবাস
কামিনী, বকুল,কলমে।
একলা আমি বসে আছি
তোমার অপেক্ষায়।

সুপ্রদীপ দত্তরায়

ভাঙ্গা কলম

লালবাগের পথে হাঁটছিলাম গতকাল দুপুর -
রাস্তার একপাশ ঘেঁষে সবুজের শ্মশাণ ।
বাগানের কুলি কামিনের শরীরের মতো
এখানে ওখানে ছড়িয়ে আছে অবহেলায়
শিঁকড় উপড়ে ফেলা অসংখ্য গাছের লাশ -
যার অনেকটাই গুম হয়ে গেছে অদৃশ্য লাশঘরে, 
নগ্ন মাটি ধর্ষিতা নারীর মতো বিভৎস, করুণ ।
এখানেই ডলু লেকের কোলে প্রথম জীবনে
আমি আর আমার প্রেম কাটিয়েছি অনেক দুপুর
                                    নিভৃতে, নীরবতায় ।
এখন আর কৃষ্ণচূড়ারা শৃঙ্গার করে না এখানে
রাস্তার পাশে গজিয়ে ওঠা ঝোপ
আড়ালে টানে ঝলসে যাওয়া মাটিকে
                     ব্যর্থ প্রয়াসে, নিরন্তর ।
মাটিতে কান পাততেই বোবাকান্নার স্পষ্ট শব্দ,
সাদা রক্তে ছাপছাপ দম্ভ আর উচ্চ অভিলাস ।
এখানেই এককালে উজ্জ্বল ইতিহাস ছিল
সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে পৃথিবীটা এখন এতটাই নীচু
চিত্রগুপ্তের নজর এড়িয়ে যায় বারংবার ।
আসলে কলম যদি ভাঙ্গা হয় ইতিহাস রচে না,
কথাগুলো অনেকেই বুঝতে চান না !

হৃদয় শীল

সত্যের সন্ধান                

সত্যতা যাচাই করা যায় জ্ঞান দিয়ে। কুলাঙ্কিত ভরা নর  সমাজে সত্যতা খুবই কম। নিষ্ঠা আচার অভিমান্যতা সব খুবই নিরব। বুঝেও বুঝিস না তোরা সত্যের সন্ধান। হিংসায় লালশাই , অহংকারে ভরা এই নরসমাজ। করবি আর কি , আসবে সেদিন বুঝবি বহুদিন। তর্কে হিংস্র তাই  আর নয় চালিয়ে যা তোদের অভিনয়। বুক ভরা সাহসে করে দিস  সত্যের সন্ধান, চাইবি না কারুর পিছে দেখবি সামনে সত্যের জয় । জয়ের বিজয় আশা করিস না রে, আশায় যে দুঃখের বাসা। সত্যের  জ্বলিত হোক এই সমাজ। লোভে ত্রাসে ভরাই এই মন পরিত্যাগ করে,ইন্দ্রিয় সংযম।মুখের ভাষায় নয় কাজের ভাষায় উজ্জ্বলিত হোক এই প্রতিজ্ঞা।

শান্তনু মজুমদার

সংঘাত

জঙ্গল কাঁপিয়ে তালির শব্দ শোনা যায়,
সাথে অগুন্তি আগাছার নড়ন চোখে পড়ে।
জন দরবারে মামলা উঠেছে শীঘ্র হবে রায়।
জঙ্গল কাঁপিয়ে তালির শব্দ শোনা যায়।
সৎ অসতের করতালিতে সত্য বিজয় পায়।
সচ্ছ প্রমাণ বৃষ্টি হলেই শুকনো পাতা নড়ে;
জঙ্গল কাঁপিয়ে তালির শব্দ শোনা যায়,
সাথে অগুন্তি আগাছার নড়ন চোখে পড়ে।

সৌরভ দাস

 অভিযোগ-৭.

"অজস্র আবেগ নিয়ন্ত্রণ না হলে
মানুষ খুব তাড়াতাড়ি মাটি চাপা পরে, 
আগুনের চেহারা দর্শন করে আত্মা, 
চোখের সামনে শেষ হয়ে আসে জীবন, 
যাদের মনে অনেক অভিযোগ
তারা কি পেরেছে সুখী হতে? 
শুধু বেদনার খেলা ঘরে আকাশের তারা দেখেছে, 
যাদের ঘর ভাঙা
তাদের মনে হাজার প্রশ্ন, 
তারাও পৃথিবীর সুখ চেয়েছিলো, 
অধিকার পেয়েছে শুধু ওরা, 
জীবন কী আসলেই যুদ্ধ? 
নাকি শান্তি কামনা করে! 
তবে সব কবি কেন চেয়েছেন যুদ্ধ? 
মাঝে মাঝে হতবাক হলেও চুপ থাকতে হয়, 
শুনেছি পৃথিবীর ইতিহাস আবেগ-কে পরাজয় করে, 
শুধু বিজয়ী হয় রঙ্গ তামাশা আর ছদ্মবেশী ভালোবাসা।

রূপালী মান্না

কখনো যদি মনে হয়

কখনো যদি মনে হয় 
অহেতুক জায়গা দখল করে বসে আছি
সরাসরি বলে দিও,
আকারে -ইঙ্গিতে, আচারে-ব্যবহারে
বোঝানোর দরকার নেই
বোঝানোর দরকার নেই যে প্রয়োজন বা প্রিয়জন কোনো তালিকারই আর অন্তর্ভুক্ত নই। 

কখনো যদি মনে হয়
পুরানো শার্ট বেল্ট  ঘড়ি বা রুমালের মতো
বদলে ফেলা দরকার ,
তবে সরাসরি বলে দিও প্ৰিয়
আঘাতে আঘাতে জর্জরিত করার দরকার নেই।
কখনো যদি মনে হয়
ছেড়ে আসা বেঞ্চ, ক্লাসরুম, পুরানো কিছু বন্ধু বা প্রাক্তন প্রেমিকার মতোই
আমায় ঘিরে শুধু কিছু স্মৃতিই সঞ্চয় হোক
তবে সরাসরি বলে দিও জানো
সম্পর্কে মরচে ধরানোর দরকার নেই।

কখনো যদি মনে হয়
প্রানোচ্ছল নদীর মিষ্টি জল ছেড়ে
কোনো কামিনী সমুদ্রের চিবুক থেকে
পান করতে চাও নোনা জল ,
তবে সরাসরি বলে দিও প্ৰিয়
শুধু শুধু ভনিতা করার দরকার নেই। 

আমার জন্যও অপেক্ষা করে আছে
আকাশ,সমুদ্র,পাখি,জঙ্গল,নক্ষত্রলোক
বা অপেক্ষা করে আছে শতাধিক স্বরলিপি
মুক্তির আশায় ;
অথবা মুঠো মুঠো প্রেম নিয়ে অপেক্ষা করে আছে 
কোথাও কোনো অবুঝ প্রেমিকহৃদয়, 
পৃথিবীতে মানুষ জন্ম একবারই
তোমার অবহেলা সয়ে বেঁচে থাকার দরকার নেই।

অশোক মণ্ডল

হিংস্রতা

হিংস্রতার ঝড়ে কত যে ঘর পড়ে------ 
স্বার্থ আর অর্থের পিছুতে কত যে মরে।
চারিদিকে হাহাকার সংসার ঝারখার ললুপতার ছাপ
বোবা কান্নায় ভাঙছে আকাশ খুলছে কেউ বাইসস্কোপের খাপ।
হিংস্রতা যেন প্রতি পলে পলে মানবতা পিছু হঠে
কথায় কথায় উগ্রতা রোষের আগুন যেন ঠোঁটে।
বাতাসে যেন বিষ চারিদিকে বিষধর ফণির হিসহিস
অন্যায়ের ছবি ছড়িয়ে ছিটিয়ে চোখে চশমা কালো মিশমিশ।
ভূলও ঠিক হয়ে ঘোরে ঘরে ঘরে--- 
হাজারো ফাটল তবুও উজ্জ্বল রঙের জোরে।
হিংস্রতা যাক দূরে বহু দূরে মানব সমাজ থেকে 
স্বার্থের মরীচিকা যাক মরে ভালোবাসা থাক জেগে।
যেথায় কোরান বাইবেল ভাগবত গীতা মানুষের সাথে 
সেথায় ভালোবাসার সুর বাজুক হাত মিলুক হাতে।

মাধুরী লোধ

নদী

নদীর আঁকে বাঁকে শাখে লুকিয়ে থাকে কতো কথা
নদীর স্রোত ধুইয়ে দেয় ঐ না বলা কথার কথকতা ।
শুকনো বালুচরে শুকনো খড় নীরব ঘাস লতাপাতা সাক্ষী থাকে নদীর যৌবনের
গ্রীষ্মের খরতাপে বন্ধ হয় মাঝির নৌ চালন অপেক্ষা থাকে প্রবল বর্ষণের ।
নদীতে জল কমে হাঁটু জলে চলে না লঞ্চ স্টিমার লোকে বলে মরা নদী
প্রবল বর্ষণের মাঠ ঘাট ছাপানো জল গ্রাস করে নদীর আগাপাছা লোকে গাল পাড়ে ওহে রাক্ষুসী ।
নদীর এপার ভাঙ্গে ওপাড় গড়ে নদীর তীরে গড়ে উঠে মানুষ এর আবাসভূমি 
নদীর জল পৌঁছোয় ঘরে ঘরে  লাগে সেচ চাষের কাজে নদীর অপর নাম হয় জলদাত্রী ।
নদীর এপার ওপার জুড়ে হয় সেতু বন্ধন , মানুষ অনায়াসে করতে পারে যাতায়ত আত্মীয়তা
মানুষ হাসে কাঁদে নদীর জলে দাঁড়িয়ে নদীকে ভাবে পবিত্র গঙ্গা নদীতে মানুষে চলে ভাবের কতকথা ।
নদী জানে না সে নর বা নারী জল জানে না সে পুরুষ না মহাপুরুষ তার ধর্ম বয়ে চলা 
পুরুষ মহাপুরুষ নর বা নারী নিয় ঘামায় না মাথা তার ধর্ম ময়লা কয়লা ভাসিয়ে ছুটে চলা ।
আমরা যে নদী মাতৃক দেশের বাসিন্দা প্রতিদিন দেখি নদীতীরের বাসিন্দা দের উথ্থান পতন এর জীবন
নদীর জলে হয় নিরপরাধ এর সলিল সমাধি বাস্তুহারা ভিটেহারা মানুষের রোদন ক্রন্দন ।
তারপরে দেখি নদীর অন্তহীন পথ চলা  কার বাড়ি কার ঘর ভেঙ্গে কপাল পুড়েছে নেই কোন ঠিকানা
তারপর ও নদী আমাদের পরম আত্মীয় মানুষের উপকারে তার অবদানের নেই সীমা পরিসীমা ।
নদী তুমি বয়ে চলছো যুগ যুগ বহুযুগ ধরে আমাদের বাপদাদা চৌদ্দ পুরুষের গ্রাম শহরের আশপাশ ধরে 
তুমি মানুষ এর জন্য জোগাও অন্ন বস্ত্র বাসস্থান  মানুষ তোমাকে গঙ্গা গোমতী ত্রিবণী সঙ্গম মনে করে ।

রুনা নন্দী

বিয়োগে-নিয়োগ

সোহাগী দেওয়াল খানা জুড়ে 
একটা ছবি টাঙালো মেয়ে
মখমলী মেঘ আর রোদ্দুরের ছবি।
পাহাড়ের গা বেয়ে গড়িয়ে পড়া নদী
বৃষ্টির ছাটে ভিজছে প্রাক্তন প্রেম।
অনেক অনেক পুরনো কথা , খুশিতে ভরা মুখ
প্রিয় মানুষ,প্রিয় ঘর
বারান্দায় দুয়েকটা গাছের টব।
ফুটনোটে লিখে রাখা সুখী গৃহস্থালি
একে অন্যের ভিতর চারকোণা ফ্রেম
একদিন বলতো সে, সবকিছু আমাদের
এখন যদিও এটা শুধুমাত্র আমার।
কখনও ভাবিনি এমনিভাবেই একসময়
ভেঙে পড়ে ঘর , ভেঙে পড়ে জানালা
আর দরজাগুলো , স্বার্থপর সিঁড়ি
একা চিলেকোঠা।
শুনেছি জন্ম আর মৃত্যু মুখোমুখি হলে নড়েচড়ে বসে সাবেকি ঈশ্বরও।

সায়ন পাল

চিতার আগুন

শোকের পালকি দোলে ,
সুখ যায় দূরে ,                              
রোগশয্যায় ঘুমন্ত পথিক
হাটে মৃত্যুর তরে।            
জীবন সায়াহ্নে হিসাব খোঁজে,                         
ক্লান্ত চোখের বারিধারা মুছে, 
জীবনের রূপ রস ভোগ শেষ, 
এখন শুধু আগন্তুক মৃত্যুর গন্ধ বোঝে।                     
রোগের তাড়নায় হাহাকার প্রাণ,                                ক্লান্ত কোকিলের কন্ঠে দুঃখের গান,।                          যৌবনের কথা মনে যখনই আসে,                          ব্যথায় ব্যথিত বুক কান্নায় ভাসে,                                 
দিন গুনে, দিন বুঝি এই শেষ হল,                                  আপন সকলি দেখো এই পর হলো।                                চিতার আগুন যেন চোখেতে ভাসে,                            জীবন ফুলটা হয়ে বাসি দেখো গেছে ভেসে।

কল্যাণ দাস

তুমি আর আমি 

তুমি বললে জীবন সঙ্গীতময়!
ভাবলাম গান শুনতে চাইছো।
তুমি বললে খোলা আকাশ কত মনোরম!
ভাবলাম মুক্ত মনে কথা বলতে চাইছো।
তুমি বললে বসন্ত প্রিয় ঋতু;
ভাবলাম আমার রঙে রঙিন হতে চাইছো।
তুমি বললে সমুদ্র সৈকত খুব ভালো লাগে;
ভাবলাম হাতে হাত ধরে হাঁটতে চাইছো।
তুমি বললে চুলে জট বেঁধেছে;
ভাবলাম আমার হাতের স্পর্শ চাইছো।
তুমি বললে লাল গোলাপ খুব সুন্দর;
ভাবলাম খোঁপায় পরতে চাইছো।
তুমি বললে,সত্যি! পাখিরা কত ভাগ্যবান!
ভাবলাম দূরে কোথাও বেড়াতে চাইছো।
তুমি বললে আকাশে মেঘ জমেছে;
ভাবলাম বোধহয় কাঁদতে চাইছো।
কিন্তু যখন তুমি বললে
 উন্মুক্ত পথে হাঁটতে খুব বেশি ভালো লাগে;
ভাবলাম আসলে তুমি মুক্তি চাইছো।

দীপান্বিতা পান্ডে দীক্ষিৎ

তোমার সঙ্গে

আবার যদি দেখা হয তোমার সঙ্গে,
কোনো প্রশ্ন থাকবেনা আকাশ থেকে সাগর পর্যন্ত কোনো দিগন্তরেখায় ৷
চারিদিকে রামধনু রং খুশি ঝলমল সন্ধ্যা তারায় ৷
শুধু অপলক দৃষ্টি আনন্দ কানায় কানায় ,
অদ্ভুদ এক ভালোবাসা কুয়াশা র মতো ৷
আবার যদি দেখা হয় তোমার সঙ্গে,
বর্ষার জলধারার মতো বেয়ে যাওয়া ভালবাসা
দোলা দেয় আকাশ প্রান্তে ৷
শুধু  বরফের মতো জমে থাকা হিমালয় হয়ে, 
তোমার সাদা চাদরে মুড়ে রাখ সবাইকে।
আবার যদি দেখা হয় তোমার সঙ্গে,
মিলেমিশে এক হয়ে যাবো প্রকৃতি ও পুরুষে গভীর অন্তরঙ্গে৷

স্বপন দেবনাথ

নিরাঞ্জনা


নিরাঞ্জনা, তোমায় আজও পারলাম না বলতে সেই শব্দটা, 
আজও গেথে আছে খরপরশার ন‍্যায় 
আমার  হৃদয় মাঝারে। দিবানিশি শুধু 
অঝোর ধারায় বর্ষণ করছে রক্তিম লাভা।
তোমায় না বলি অতি ক্ষুদ্রাদিক্ষুদ্র শব্দটা
যন্ত্রনার বীজের ছলে রোপিত হচ্ছে হিয়ায়,
তুমি দিনান্তে, নিশান্তে, স্বপ্নে, জাগরণে 
আজও ভেসে ভেসে আস নীলাভ আকাশ হতে, 
তুমি শুধু আমার নিরাঞ্জনা নও, তুমি আমার কবিতা। 
তোমায় ঘিরে সদ‍্যজাত নবজাতকের ন‍্যায় 
জন্ম নিয়েছে কত হাজারো কবিতা!
এসো নিরাঞ্জনা, আমার কাছে এসো 
আমার  পাশে বসো, একটু শান্তির হাওয়া বয়ে দাও!
আমার  চোখ রক্ত সম হয়ে আসছে অশান্তির ঘুমে।
তোমায় না বলা শব্দটা আজ ফুটন্ত খইয়ের মতো 
ছিটকে পরবে তোমার দিকে, 
ফিরিয়ে দিও না!
ফিরিয়ে দিও না সেই শব্দটাকে, 
গচ্ছিত রেখো তোমার কাছে।

অভিজিৎ দাস।

 সুরঞ্জনা

এই শহর যখন ঘুমিয়ে পড়ে-
আমার তখন ঘুম ভেঙে যায়!
অশ্রু গড়ায় চোখের কোনে,
হাতের তালুই মুছেছি-সুরঞ্জনা,
তোমায় আমি অনেক করে খোঁজেছি।

এই শহরে ভোর হলে রোজ-
পাখিরা আমায় ডেকে যায়,
তুমি তখন অন‍্য কারো!
সে কথাও বুঝেছি - সুরঞ্জনা,
তোমায় আমি অনেক করে খোঁজেছি।

এই শহরে দুপুর হলে-
রোদের তাপে গা জ্বলে যায়,
তখনও আমি ভীষণ একা!
দাওয়ায় শুয়ে পড়েছি-সুরঞ্জনা,
তোমায় আমি অনেক করে খোঁজেছি।

বর্ষা দিনে আমার জমিন-
বানের জলে রোজ ভেসে যায়,
ঘরের সেদিন চাল উড়ে যায়! 
নীরব চোখে দেখেছি-সুরঞ্জনা,
তোমায় আমি অনেক করে খোঁজেছি।

শম্পা ঘোষ

হঠাৎ বৃষ্টি ভঙ্গ

পূর্বাভাস ছিলো না তেমনটা;
হঠাৎ ভীষণ বজ্রপাত,
তছনছ করা বৃষ্টি আছড়ে
পড়লো 
দ্বিধাগ্রস্ত পরিমেয় বুকে।
নীরব দহন জ্বালায় -
তিলে তিলে তৈরি এক স্বপ্নপুরী,
এক নীল পাখি তাতে স্বপ্ন ভেবেছিল,
উদ্দাম বৃষ্টিস্নাত হবার পর 
যখন পথচিহ্ন মুছেছিল-
তার ঝাপসা চোখ পাড়ি দিয়েছিল,
নতুন স্বপ্নের সন্ধানে।
ভাঙা পিয়ানোর সুর তোলা মূর্ছনার
আবহের ব‍্যর্থ প্রচেষ্টায়,
জুড়ে আছে মনফাগুনের সুর এখনো।
পরিপূর্ণতার আবেশে, 
রয়ে যায় স্বেদো সিক্ততা।

সেখ আব্দুল মান্নান

 স্পর্শ

স্রষ্টার কি অপূর্ব সৃষ্টি তুমি
তুমি না থাকলে গোটা পৃথিবীটাই 
হয়ে যেত জড় পদার্থ
ব্যর্থ হতো বেঁচে থাকার অর্থ।

তুমি ছিলে বলেই আচার্য জগদীশ
প্রমাণ করেছিলেন গাছেরও প্রাণ আছে 
মান অভিমান আছে,ব্যথা বেদনা আছে।

তুমি আছো বলেই আবহমান কাল 
চরাচরে বিরাজমান সৃষ্টির পাঠশালা,
জীবজগতের ধমনিতে নিমেষেই 
বইয়ে দাও তড়িৎ প্রবাহ,
ধনাত্মক ঋণাত্মকের যুগলবন্দিতে 
অঙ্কুরিত কর নতুন প্রাণ।

চিকিৎসকের সঞ্জীবনি হাত 
মুমুর্ষ রোগীর মাথায় চামড় বোলালে
বেঁচে থাকার প্রেরণা পায়,
দরবেশ ফকির ঋষি মুনিঋষি
আশাবরি হাত বুলিয়ে দিলে
পরম আশ্লেষে বুজে আসে দু চোখ।

তুমি যখন ক্ষ্যাপা দুর্বাসা হয়ে ওঠো
বিনাশের ডঙ্কা বাজে দিকে দিকে,
জীবকুলের প্রাণবায়ু ফুরিয়ে যাওয়া
অস্তিত্ব ‌বুঝিয়ে দাও তোমার পরশে।

ডঃ রঞ্জিত দে

মায়ের ভাবনা

আমার মা যেন একটা কবিতার খাতা ।
কথাগুলো যেন খুলে দিত, মনের পাতা।
মা রান্না করে বা কলস নিয়ে যায় জলে ।
গরুগুলি মাঠ পানে আপন মনে চলে।
মা শোলক বলে যেন আকাশ বাণী
আমি অর্থ বুঝি না, শুধু অবাক         ,
মাকে কখনো রাগতে দেখি নি চলে ধীরে ।
মাকে হাসতেও দেখেছি, বিপদ ঘিরে।
মা বলতো পড়া হবে তাড়া নেই ।
খুব জোর পেতাম মায়ের ভাষায়।
বাবা তাড়া দিত বলতো ভালো পাশ হওয়া চাই
মা বলতো পাশ করলেই তো হবে।
কি জানি কখন মা মনে মনে কি ভাবে!
আমিও ভাবতাম তাই হোক না ।
কখন যেন পাশের গন্ডি পার হয়ে,
পড়ার গন্ডি আমাকে এখানে এলো নিয়ে।

অভিষেক অধিকারী

এই পৃথিবীর এক প্রান্তে

শহুরে মুখগুলো আজ ঢেকে গেছে  পোষ্টারে,
এক অসহায় বন্দীর আত্মকথন
অথবা একটা সভ‍্যমানুষের আদিমত্বের স্বাদ পাওয়া..... 
সবটাই লেখা থাক রাতের নির্জন ঘেরাটোপে।
মানুষ আজ বড়  অসহায়
তার বদলে যাওয়া জীবনের চালচিত্র
রচনা করুক আর একটা গল্পকাহিনীর। 
রাতের নির্জন পথে হেঁটে যাওয়া মানুষের 
দীর্ঘশ্বাসে মত্ত হয়ে উঠুক কামনার্ত শহর।
তবুও একটা শহর গড়া চাই।
হোক না সেখানে মানুষ বলির উৎসব।
আর একটা গল্প না হয় কোন পিপাসার্ত মানুষ রচনা করুক,
পৃথিবীর এক প্রান্তে বসে,
যেখানে  যৌবনের আর একটা নতুন গল্পের শুরু হবে,
পথচলা।

গীতশ্রী ভট্টাচার্য্য

ধ্বনি

সৃষ্টির কিছু নেপথ্য সঙ্গীত থাকে যেখান থেকে
তৈরি হয় শব্দের করুণ কান্না, মিঠে হাসির জল।
উপেক্ষা করা যায়না সেই সঙ্গীত, কান্না ,হাসিকে
মিলে মিশে আত্মা হয়ে পড়ে এই শব্দরাজিরা।

রক্তের মধ্যে খেলে যায় তার দুরন্ত তেজ, 
অফুরন্ত প্রাণের উচ্ছ্বাস, তির তির
শিরশির করে বয়ে যায় শিরায় শিরায় সেই আবহ।
 প্রার্থনার আকুল পরিবেশে নিমগ্ন
মুক্তি পেতে শাব্দিক আত্মারা মন্ত্রের মত
উচ্চারিত হয় সকাল সন্ধ্যে। 

বন্দনার এই সেরা সৃষ্টি ধ্বনিত হয় 
মুমুক্ষু প্রাণের অন্তরে অন্তরে।
রূপকথার মত বদলে যায় জীবনের পট
অলক্ষ্যে তারারা ছুটে চলে প্রাণ থেকে প্রাণে।
সঙ্গীত জেগে থাক সৃষ্টির শব্দে শব্দে।
যাদু ছন্দে বয়ে যাক তমসার স্রোত, ব্যথার নদ।

মায়া রানী মজুমদার

জনশূণ্য পূণ্যস্থান

বিশ্বকর্মার বাহন রূপে তোমরাই তো ভজ,
চতুষ্পদ বোবা প্রাণী নামটি যে তার গজ। 
বাহনকেই শিকলে পদ শৃঙ্খলিত করে, 
কার্য নির্ধারিত জগন্নাথের রথ টানার তরে।
সুসজ্জিত হলো গজ পুষ্প মালায় শোভিত,
চতুর্দিকে লোকারণ্য আর আলোয় আলোকিত।
লোকারণ্যের গঞ্জনাতে বিরক্ত পোষা হস্তী,
ছুটলো যখন গজ লোকারণ্য মাঝেই অস্বস্তি।
কেউ ছুটে হুড়মুড়িয়ে, কেউ বা খায় গড়াগড়ি,
এদিক ওদিক না দেখে গজ চললো সরাসরি।
কোথায় যে গেল হারিয়ে মিলল না তো হদিশ,
ছুটাছুটি করতে গিয়ে হলো সবাই বেদিশ।
মেলার মাঝেই হারায় পুত্র, কন্যা, স্বামী, 
কেউ হারায় প্রিয়জন, মানুষ যে হয় খুব দামী।
জগন্নাথের রথ টানায় আছে অনেক পুণ্য,
গজে রথ টানতে গিয়ে পুণ্যস্থান হল জনশূণ্য।
আশা নিয়ে মনে, রথের দড়িতে দিলে টান,
জগন্নাথের কৃপায় পাপমুক্ত হয়ে়ই  দুঃখের অবসান।

অভিজিৎ চক্রবর্ত্তী

প্রকৃত শিক্ষা

শিক্ষা মূলপ্রাণ কেন্দ্র ছিল বিশ্ব প্রকৃতি তত্ত্ব। 
আধুনিক শিক্ষার মরূদ্যানে সকলে মোরা ব্যর্থ। 
চাপিয়ে দেওয়া বইয়ের বোঝা, মলাট খুলতেই লাগে সোজা। 
এখন তো আর নেই যে সাজা, মূল্যায়নে মুখ বুজা।। 
এমন হলে জ্ঞানের প্রসার,  অজ্ঞ মানুষ তার চেয়ে সার। 
নিত্য নতুন পদ্ধতির বাহার, তথ্য আহরণ নেই দরকার ।। 
পরিক্ষার পর পরিক্ষা শুধু চলে দিনে দিনে। 
শিক্ষকের বচন খাতা পূরণ শিক্ষার্থীর নিজ গুনে।। 
ডিগ্রী আর নম্বরের মেলা কথায় তাদের যায় না ফেলা। 
কাজের বেলায় শোলার ভেলা অহংকারের বরণ ডালা।। 
সংকীর্ণতা দূরে ঠেলে ফিরে যাও প্রকৃতির কোলে। 
প্রকৃত শিক্ষার বলে মরা গাঙে জোয়ার ওঠে ফুলে ।। 
কবি সুনির্মল বসুর কথায় কিংবা ছিন্ন বইয়ের পাতায় ।
সবার আমি ছাত্র হওয়ায় আজ একান্ত সহায়।।

সহিদুল ইসলাম

ঘোড়ার তেষ্টা

পাহাড় দেখতে এসেছি ঘর থেকে বহুদূরে,
চিন্তার ঘোড়া জল খায়, বাড়ির কোণের পুকুরে।
পাহাড়ের গায়ে আঁকাবাঁকা কত চিকন চিকন ধাপ,
লাফিয়ে উঠলো ঘোড়াটা, ভাবলো এগুলি সাপ।
বাতাসে না স্নিগ্ধ হলাম, না পাহাড় বুঝা হলো,
শুধু চোখ ক্লান্ত হলো, না ঘোড়ার তৃষ্ণা গেলো।

শ্রীলিম

চিরন্তনী

তুলসী তলায় আজ‌ও অমলিন রয়েছে দীপশিখা,
কোনো না কোনো ঘর রাত জাগে সীমান্তে প্রহরীর ফেরার আশে...
বসন্তে কোকিল ডাকে মধুর বোলে,
বর্ষায় মত্ত হয়ে ওঠে দাদুরি,
শিক্ষক পাঠ দান করে সবার ভালোর জন্যে,
আজ‌ও চাষী চাষ করে আশা বেঁধে বুকে,
সুযোগ সন্ধানী বিড়াল দুধ খেয়ে পালায়,
শ্রমিকেরা ঘাম ঝরায় দেশ ও দশের স্বার্থে,
আজ‌ও শিশুর স্নিগ্ধ হাসি সবার মন কাড়ে,
সন্তান কামনায় সমগ্র জীবনের বুক টাটায়!

দীপু রায়

এবং প্রেম

বুকের বাম পাশটায় লাবডুব..
দুচোখ বেয়ে উথলে ওঠে অশ্রুজল...
কামদেবের ফুলধনু হতে ছোড়া বাণ নাকি কারসাজি হরমোণের সে বিতর্কটা অবান্তর,
ভালো তো বেসেছিলাম সখী,
যে ভালোবাসার অংশীদারিত্ব মায়ের, বোনের এবং তোমারও...
পুরুষ হৃদয় যে বিখণ্ডিত সত্ত্বার,
যেখানে পান থেকে চুন খসলেই বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয় সমাজ ব্যবস্থা...
আহা ফ্যান্টাসি!!!
"পুরুষ তান্ত্রিক" আর "ফেমিনিজম" এর দড়ি টানাটানিতে ছিড়ে যায় সম্পর্কের বাঁধন, সে খবর রাখছ কেউ...!!?

প্রীতম চক্রবর্তী

নীল পাখি 

সেই শিশির ভেজা প্রভাতে,
একঝাঁক স্বপ্ন নিয়ে ভেসে আসতো 
নীল পাখিদের দল ।
তাদের ডানা ঝাপটানোর শব্দে,
আমি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখতাম ।
আকাশ তাদের আগলে রাখতো ।
সেই হিজল গাছটায় তারা
মধুর সুরে ডাকতো ।
আর আমি বসে বসে শুনতাম গাছের তলায় ।
বদ্যিদের পদ্মদীঘিতে ওরা স্নান করতো ,
আমি পদ্মপাতায় ফণির খেলা দেখতাম । 
নীল পাখিরা ছিল কৃষকের বন্ধু ,
জমির কিট, পোকা সব খেয়ে নিত ।
ভোরে ফুল দিয়ে গৃহস্থের আঙিনা ভরিয়ে দিত ।
সাঁঝের বেলায় আঁধার নামলে 
উড়ন্ত ফ্যারিস্তাদের মতো দল বেঁধে ওরা
চলে যেত সেই নীল পাহাড়ের দেশে ।
তারপর বহু বছর কেঁটে গেলো ।
হিজল গাছটা কেটে ইমারত হলো ,
পদ্মদীঘির এখন চিন্হমাত্রও নেই ।
আমি এখন দূষণের প্রদূর্ভাবে 
তিলে তিলে প্রহর গুনি,
টেলিভিশনের নীলপর্দার আড়ালে,
নীল পাখিদের গল্প শুনি ।

প্রতীক হালদার

 ব্যায়াম করো 

একটু ছুটে,একটু হেঁটে
একটু ব্যায়াম করে,
শরীরটাকে যত্ন করে 
নাও না সবাই গড়ে।
রোগ গুলো সব ঘুরছে কেবল
সবার আশেপাশে,
সাবধানেতে না থাকলে 
এগিয়ে ওরা আসে।
সাহস দেখাও রোগকে তুমি 
ভয়টা তবে পাবে,
শরীরটাকে বাসলে ভালো
পালিয়ে ওরা যাবে।
চোখটা মেলে রোজ সকালে 
একটু ব্যায়াম করো,
মুক্ত বাতাসে শ্বাসটা নিয়ে 
হৃদয়ে খুশি ভরো।
কমবে ওজন,থাকবে ভালো
চিন্তা নেবে ছুটি,
দেরি না করে নিয়ম করে
কোরো হাঁটাহাঁটি।

অম্পিকা পাল

মন্দির - মসজিদ

আমি একদিন মনানন্দে মাসির বাড়ী যাচ্ছি --
অবাক কাণ্ড! পথের মাঝেই আত্মীয়দের পাচ্ছি।
পুরো গাড়ীতে নিজেদেরই লোক,আনন্দ নয় স্বল্প ;
মহানন্দে সবাই মিলে শুরু করলাম গল্প।
দেখতে পেলাম পথের মাঝে মসজিদ একটি দাঁড়িয়ে,
চোখ মন তখন গেলো আমার সেইখানেতে হারিয়ে।
মসজিদের প্রতি ভক্তি যখন করলাম আমি নিবেদন,
এ কী রে -- তুই না হিন্দু মেয়ে! বলে উঠলেন স্বজন।
মসজিদের প্রতি ভক্তি কেনো?আমরা তো তা করিনা!
আমি তখন বলি,  তোমাদের কীসের এতো গরিমা?মসজিদ ওদের,মন্দির মোদের  এসব আবার কী?
আল্লা ওদের,ভগবান মোদের  এসব কেনো, ছিঃ!
ছোটো থেকেই পড়ে এসেছি স্রষ্টা এক ও অভিন্ন
আমার কাছে তোমাদের ধারণা সদাই লাগে ঘৃণ্য।
ভেদাভেদ নেই আমার মনে,সব ধর্মেই করি ভক্তি
জানো,আমার কাছে সরলতা নামক আছে মহা শক্তি।তোমাদের মন জটিলতায় পূর্ণ, তাইতো এতো যুদ্ধ 
তোমরা কি কোনোদিনই হবে না পবিত্র ও শুদ্ধ?
বাচ্চাদেরকে ভেদাভেদ শেখাও,এটাই তোমাদের নীতি
একটিবার গাওনা  স্বজন সংশোধনের গীতি।

সুব্রত ভৌমিক

 পথের সাথী
                     
আগেও দেখেছি বারকয়েক
ঐ গলির পথে।
যেখানে ধরেছে মানবিকতার পচন।

ফুটো নৌকার বিলাসে
ফুল সমাধির আলিঙ্গন।
হলুদ রঙের চাপে ভ্রান্ত চাতক।

বাঁধ ভাঙ্গা ব্যথার জ্বালায় চিঁহি।
মনে মনে মরি, হে সমব্যথী,
কপাট হীন দরজার প্রাণে।

টুকরো কাঁচে দেখা আশার ছবি,
অনাকাঙ্খিত বৃষ্টির ঝাঁকে, আবার শুরু
লুকোচুরি কুয়াশা দৃষ্টির।

চাঁদহীন মিত্রতায় শুধু আঁধার।
আমিও সেই কাকের লাশ,
অকৃত পথের সাথী।

মিঠু মল্লিক বৈদ‍্য

নতুন সখ‍্যতা

বেশ কাটছিল দিন
তৃপ্তির আনন্দে আর অতৃপ্তির অবসাদে।
কুঁড়িয়েছি কত ভালোবাসার ফুল
সফলতার মালা গলে হেঁটেছি পৃথিবীর পথে,
অবজ্ঞার স্বাদ ও নিয়েছি শতরূপে শতবার।

শূন‍্য হতে সিন্ধু,সিন্ধু হতে মহাসিন্ধু
সবটুকু দিয়েই চেয়েছি এগিয়ে যেতে।
অবজ্ঞা কিংবা শংসা; রেখেছি যতনে
আপন মনমন্দিরে, ভালোবেসেছি 
অতি সংগোপনে,হৃদয় দুয়ার খোলে।

কিন্তু দিনান্তে খসে যায় সকল পাওনা,
হিসাব কষাকষি জমে থাকে
হাসপাতালের বিছানায়,গড়ে উঠে
নতুন সখ‍্যতা,,,মৃত‍্যু দূতের সাথে
যদি থাকতে পারি আর কিছুক্ষণ কিছুটা সময়,

মায়াবী পৃথিবীর মায়ার বাঁধনে।
কত ধন,কত জন, কত সাঁজ, কত বাহার
কত অহং,কত সম্মান,কত গুণ, কত দোষ
সবটাই আজ হল ইতিহাস,একাকীত্বই সাথী
ধবধবে বিছানায় মৃত‍্যুর প্রহর গুনি
মৃত‍্যু দূতের সাথে নতুন সখ‍্যতা গড়ি।

বিক্রমজিৎ সাহা

সাপিনী

ঘন গভীর গরম শ্বাস
পড়ছে লোমশ বুকে
সাপিনীর বিষাক্ত নিঃশ্বাস।

আহাঃ সাপিনী 
সেও একাকিনী;
নিরব নিঝুম স্বজনহারা কুটির।
বিষময়ী দাঁতে ক্রূর হাসি...
আমি তোমায় ভালোবাসি।

সখা ওঝা তো সেজেছো
বীণ হয়েছে মুরলী বাঁশী ,
দাগ কেটেছে সাপিনী লাবন্য
আমি তোমাকে ভালোবাসি।

আষ্টেপৃষ্ঠে তোমায় লেজে পেঁচিয়ে
বুকে রেখেছে সাপিনী মাথা ;
বিষ আর ভালোবাসার ফুলে_
তারাহীন বিরাট নীল আকাশ

দীপু দেবনাথ

ঘুরি ও নাটাই 

ঘুরির গায়ে সুতো বাঁধা 
মনের কোণে তুমি!
ওরতে থাকো মনের সুখে 
ঘুরির সুতো আমার হাতে,
মেঘের কূলে ঘর যে তোমার 
থাকো আমার মনে!

বৃক্ষ সমান মন আমার 
যায় না কোথাও ওরে,
পবন তুমি আমার থেকো
ওরতে দিও ওকে।

আমার পিঠে নেই যে ডানা,
মনের সুখে উড়িয়া বেরাতাম।
দুজনে চলি দুটি পথে 
একই সুতোই গাঁথা 
বেলা শেষে এক হয়ে যায় 
স্বপ্ন যে আমাদের একেই।

ঘুরির সুতো কাটার ভয়ে 
ওরতে দেয় না বেশি,
কাটবে যেদিন সেই সুতো 
 ঘরে ফিরবে না আর কোনো দিন
শূন্য নাটাই রবে আমার হাতে 
পুরনো দিনের স্মৃতি সেজে।

রূপালী রায়

মানুষ 

আমি মানুষের ভিরে 
মানুষ হারিয়েছি কত 
খোঁজে পাই না আর ।
আমি আর খোঁজে পাই না । 
এলো চুলে ঢাকা দখিন মেরুর হাওয়া 
আমার অনেক কিছুই
উড়িয়ে নিয়ে গেছে 
আমি আর কেন খোঁজে তা পাই না । 
ভুল স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছি 
ফিরতে ফিরতে অনেক রাত ।
যে কালো রঙ ঠিকানা হারায় 
তারে কি গো আর খোঁজে পাওয়া যায় ?
আমি মানুষের ভিরে 
মানুষ  হারিয়েছি কত 
খোঁজে পাই না আর 
খোঁজে পাই না । 
সকাল পেরিয়ে দুপুরে গরিয়ে যেতে চলেছে 
মানুষের সন্ধান আর পেলাম না । 
কেন হারাতে থাকে মানুষ 
মানুষের মাঝে থেকে 
কেন খোঁজে পাই না 
সেই মানুষ ।

ছন্দা দাম

ছুঁয়ে যেও 

ধোঁয়া উঠা এক পেয়ালা চা,স্মৃতির মুগ্ধতার ঝাপি,
নাই বা বললে...তোমায় ছুঁয়ে আমি...গহীন মনে ভালোবাসা মাপি।
তবলা বোলে কাহারবা,পর্দাঠেলে নরমআদুরে রৌদ্র
পলকে ঐ আকাশনীল ব্যথার পাহাড়,নাইবা বললে
চোখ যদি হয় আদ্র।।
ঢেউ তোলে সার্টের বোতাম ছুঁয়ে, তোমার বুকের  চুপকথাদের ক্যারাভ্যান,
মন বেদুইন দিশেহারা সারাবেলা,নাইবা বললে ঐ বুক আনচান।
উষ্ণ যখন কপাল ঘিরে মায়ার জ্বর, তোমার ছোঁয়া প্যারাসিটামল যেন,
নাইবা বললে দূরেই আছো তবু... জড়িয়ে আছো 
বলতেই হবে কেন!
হরপল কেমন বিষণ্ণতা,অনুভবে নকসীকাঁথার ওম,
নাইবা বললে,এই যে থমকে থাকা,ব্যথাদের সঠিক উপশম।
কতো কথার মিছিল চলে রোজ, স্মৃতির দ্বারে দেয়
বিনিদ্র টোকা,
নোটবুকে স্মৃতিদের গন্ধ,হাতেগড়া সেই কাগজ নৌকা।।
নাইবা বললে নিমজ্জিত কথাগুলো,ডুব সাঁতারে ঠিক নেব তুলে,
তোমার তুমি আমার কাছে বড্ড প্রিয়,থাকনা বুকে
কি হবে সব বলে?
তোমতে এই যাপিতজীবন,হারালে পাল ছেড়া নাও,
ছুঁয়ে যেও কোন অছিলায়,যদি কখনো মুহুর্ত সময় পাও।।  

নীতা কবি মুখার্জী

আমাদের প্রিয় মহানায়ক (উত্তমকুমার স্মরণে)

উত্তম পুরুষ, উত্তম আত্মা, উত্তমকুমার তুমি
আমরা বাঙালি গর্ব করি, আমাদের প্রাণপ্রিয় তুমি।
হে মহানায়ক! বাঙালির তুমি অন্তরতম ধন
অন্তরে আমরা রেখেছি তোমায়, সঁপেছি যে প্রাণমন।
তোমার গরবে গরবী আমরা, নায়কের মহানায়ক
যুগে যুগে তোমার জয়ধ্বনি দেবো, যুগান্তকারীর জয় হোক।
সম্ভ্রান্ত এক বাঙালি বলতে তোমাকেই মনে পড়ে
ভুবনমোহিনী হাসি দিয়ে তুমি রাজা হলে চলচ্চিত্র-গড়ে।
চলচ্চিত্র-শিল্পকলা ভুলবে না কখনো তোমায়
তোমার আসন শিরোপরে আজ, তোমায় প্রণতি জানাই।
নিরহঙ্কারী, সদা হাস্যময়, দুখীর দরদী তুমি
নিজ অধ্যাবসায়ে জয় করলে, বাংলার পুণ্যভূমি।
আজকে তোমায় স্মরণ করি, প্রণমি চরণতলে
শ্রদ্ধা এবং বিজয়ীর মালা পরাই তোমার গলে।

সোনালী মণ্ডল

মনে পড়ে

গত পূর্ণিমাতেও চাঁদ দেখে ছিলাম পাশাপাশি বসে,
আমাদের কয়েক দশকের খুনসুটিতে ভরা
সোনালী দিনের গল্প হয়ে ছিলো গভীর রাতের তারা দেখতে দেখতে।
খোলা আকাশের নিচে মাদুর পেতে,
বেশ জমে উঠে ছিলো গ্রীষ্মের  ক্লান্ত শরীরে
প্রকৃতির ঠান্ডা শীতল বায়ুর স্পর্শে,
ছাদের নির্জনতা ছিলো আমাদের দুই বুড়োবুড়ির
একান্তের পরম শান্তির স্থান।
কর্ম ব্যস্ততার কারণে আমরা দুজনেই,
বহুবার দুজনকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছি
সময় না দেওয়ার অপরাধে,
যখন তর্ক যুদ্ধের লড়াইয়ে আমি
কোমর বেঁধে খুন্তি হাতে,ঠিক তখনই তুমি,
একটু আলতো চুম্বনে হারিয়ে দিয়েছো আমাকে।
শত ব্যস্ততা থাকা সত্ত্বেও কখনো তুমি
রান্নার স্বাদ অন্য হাতের থেকে  প্রত্যাশা করনি।
দিনের শেষে বাড়ি ফিরে খুঁজেছো একটা 
নরম হাতের ছোঁয়া।
পিতৃত্বের স্বাদ আস্বাদনের তৃপ্তি বঞ্চিত করেছো
আমার বন্ধ্যাত্বের কারণে,মাতৃত্বের শূন্যতা 
ভুলিয়েছো তোমার অকৃপণ ভালোবাসার জাদুতে।
যেদিন তোমার ছুটি থাকতো ,সেদিন
আমার অপেক্ষায় বারবার পায়চারি করতে
দরজা খোলার ব্যস্ততায়।
কখনো এসে দেখেছি অনভ্যস্ত হাতে,
কিছু নতুনত্বের রান্নার চেষ্টায় হয়ে উঠেছো গবেষক।
কর্ম জীবনে অবসর গ্রহন করায় দুই বুড়োবুড়ি
অফুরন্ত সময় কে ব্যয় করেছি অজানার উদ্দেশে 
পাড়ি দিয়ে অথবা দৈনন্দিন কাজে ভাগাভাগির 
অংশীদার হয়ে।
আজ তেমনি এক তারায় ভরা পূর্ণিমা,
চারিদিকে জোৎস্না রাতের আলোতে আলোকিত
 হলেও আমার পৃথিবী অন্ধকারের গভীরে।
প্রতিশ্রুতির হাতটি ছেড়ে পালিয়ে গেলে আমায়
ফেলে কোন অজানায়,এমনতো হওয়ার কথা ছিলোনা।
আজ আমিও তোমার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি,
জানলার শিক ধরে পথের দিকে তাকিয়ে,
দরজা খোলার ব্যস্ততায় অভ্যাসের টানে।
কে দেবে সাড়া কলিং বেলের শব্দ শুনে?
কে দেবে কাপড়ের আঁচল দিয়ে ঘাম মুছিয়ে?
কে দেবে মুখ ঝামটি শাসনের সুরে অবাধ্য বলে?
কে দেবে দৌড়ে এসে ঠান্ডা জলের গ্লাস এনে?
বড্ড ইচ্ছে করে অভিমানে মুখ ঘুরিয়ে রাখতে,
আর একটি বার তোমায় ছুঁয়ে দেখতে,
তোমার বুকে মাথা রেখে শান্তিতে ঘুমাতে।
জানি আর কখনোই হবেনা তর্কের বড়াই ভালোবাসার লড়াই।
আর কখনোই শুনতে পারবোনা আমার নামটি
ধরে ডাক তোমার মুখে।
কেউ ইচ্ছে করে বেধে দেবে না চুলের বেনী
তোমার মতো করে।
ভিজে কাপড়ের জল পট্টি দেবেনা কপালে
বারে বারে রাত জেগে জ্বরের কারণে।
কখনো আর সাজবনা তোমার  নামের শাখা সিঁদুরে,
বড্ড একা হয়ে গেলাম জীবন পথের পথে,
বড্ড শূন্যতা কুড়ে কুড়ে খায় একাকীত্বের ভিতরে,
বড্ড মনে পড়ে তোমার বাড়ির  প্রতিটি কোণে কোণে।
তোমার ছোঁয়া প্রতিটি জিনিস থেকে,তোমার গন্ধ ভেসে আসে,
বড্ড দম বন্ধ হয়ে আসে নব বধূর বেশে
আসা,তোমার শয়ন কক্ষে থাকতে।
তাই তোমাকে ভেবে একাকীত্বের লড়াইয়ে
হেরে গিয়ে,আজ আশ্রয় নিয়েছি বৃদ্ধাশ্রমে।
মনের ওলিগলি তে শুধু তোমার
পথচেয়ে,বারে বারে ভ্রম জাগে,জানলার শিখ ধরে দাঁড়িয়ে,
নীরবে নির্জন গভীর রাতের
পূর্ণিমার চাঁদ দেখা নিঃসঙ্গ তাকে নিয়ে।।

মৃদুলা ভট্টাচার্য

আকণ্ঠ

সারারাত জুড়ে আকাশের বুক ঝরে,
বৃষ্টি নামে পৃথিবীর কোলে
পাহাড় বেয়ে জল নামে 
ভাসিয়ে নিয়ে চলে সবকিছু 
নদীর স্রোতে প্রবাহিত কোল জুড়ে।
মানুষের হাহাকার বাড়ে 
ভেসে যায় একের পর এক!
কাঁদে শিশুরা, কাঁদে মহিলারা বাচ্চা কোলে, পুরুষেরা হাঁটে
কোমর জলে, _
মানুষেরা  যা পারে নিয়ে চলে মাথায় করে স্থলের সন্ধানে 
হিংস্র জলস্রোতে ভেসে যায় 
বাঁশ খুঁটি কংক্রিটের দেয়াল
গৃহস্থের আজন্ম সঞ্চয় সম্পদ
একটুকু খাবার সন্ধানে মানুষ করে হাহাকার খুঁজে আশ্রয়
আকণ্ঠ জলে বট গাছ আঁকড়ে পাখিরা করে চিৎকার
মানুষ মানুষ বলে তবু ধারে কাছে নেই মানুষ...!!

লিটন শব্দকর

অরণ্যদর্পণ

রোজকার অদেখায় নির্মেদ রোদ দলকলস ফুলে ঠোঁট ডুবিয়ে
চাঁপালিশের জ্যামিতিতে ঘুমোয়; বেড়োয় আবার রাত কাটিয়ে। 

চোখ মেলে জানালায় ভোর হতেই প্রতিবিম্বিত কীপ্যাড সার্থক,
বোস্তামি তরুণাস্থি কাছিমের জায়গা বদলানোর মতো সমার্থক।

বন নিজের মতো যখন, পশমি উদ- গায়ে ভেজা ঠাণ্ডা শ্যাওলা;
আন্দোলিত জলের রেণু মাখা সাদা চাঁদ হিমসুখ নাকের ডগায়,
প্রতিদিন আয়নারা এভাবেই সদ্যোজাত বয়স ফিরে ফিরে পায়।

ফানুসের চোরা ছিদ্র,বাদাম পাখির পালকের ছবি ক্যামেরাশূন্য!
লাল বাঁশ সাপের লেজের অংশ স্ক্রিনশটে থেকে যায় কিছুদিন, 
ততদিন মনে থাকে খুব বন যুথিয়াল গিরগিটির ঘাড় ঘোরানো।

অনেকেই জানে নতুন কেনা কাচের সর্বসমক্ষে ঘোলাটে হওয়া;
কুয়াশা ভেবেই ভুল ডরমার চামচিকের পুরনো আস্তানা পাওয়া-
আর একটুকরো কাচমঞ্চে রেসাস বানরের সম্বিৎ খুঁড়তে যেতে,
দুইদাগী বাশী ব্যাঙ শীতঘুমে হারায় অনর্থক চেনা বোঝার রাতে।

বৃষ্টি দাস

 একাকী

মনের জমকালো শহরটা আজ নিস্তব্ধ
কলমটাও যেনো আর চাইনা লিখতে,
তোমার পাঠানো পুরনো চিঠিগুলো
আমি বিভোর হয়ে যায় দেখতে দেখতে।

কিছুকাল আগে এ শহর ছিল ভীষণই চঞ্চল,
পাইন গাছটাও যেনো আমাদের প্রেমে মুখরিত হতো।
মাঘী পূর্ণিমার চাঁদের আলো যখন তোমায় স্পর্শ করতো
তোমাকে লাগতো ঠিক রাজপুত্রের মতোই।

আজ সেসব কোথায় যেন গেছে হারিয়ে
সঙ্গী হয়েছে কেবলই চোখের জল,
ভীষন ভালোলাগে আজ একাকী থাকতে
পুরনো তুমি টাকে ইচ্ছে হয় না আর দেখতে।

পায়েল সূত্রধর

কেউ কথা রাখেনি 

কেউ কথা রাখেনি,
আজ এক বছর কেটে গেল,
তার সঙ্গে কোন যোগাযোগ নেই ।

কেউ কথা রাখেনি,
মনের মধ্যে জমা দুঃখ,
হাসির আড়ালে লুকিয়ে রাখি।

কেউ কথা রাখেনি,
রাতের  আঁধারে পুরানো স্মৃতি মনে করে,
গুমরে গুমরে  মরি।

কেউ কথা রাখেনি,
জীবনের প্রথম ভালো বাসার মানুষটিকে,
চোখের সামনে অন্যের হতে দেখেছি ।

কেউ কথা রাখেনি,
পকেটে টাকার অভাবে অনেক,
আপন মানুষকে পর হতে দেখেছি ।

কেউ কথা রাখেনি,
নিজের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুকে,
সময়ের সাথে বদলে যেতে দেখেছি ।

কেউ কথা রাখেনি।

অঙ্কুর সাহা

কথাটা আর বলা হল না

আজকাল যেন 
সারাদিন আমি কোনো এক স্বপ্নে
বিভোর হয়ে থাকি ,
সে এক স্বপ্ন ,
যেখানে শুধু মোর মনের বাস
আর তোমাকে পাওয়ার আশ
জান তুমি ,
সকালে রোজই ঘুম থেকে উঠার আগে 
চোখ দুটি শুধু তোমার স্বপ্ন দেখায়
তোমার ভাবনায় রাত্রে চোখ বোজা
ও তোমার স্বপ্নে চোখ খোলা 
আমার যেন এখন নিত্য অভ্যাস
জান তুমি , দিবসে ও মাঝে মাঝে 
আমার চোখ তো তোমাকেই দেখে 
কিন্তু সমস্যা একটাই ,
তুমি যখন সামনে আমার আসো
আমি তোমাকে সেই পছন্দের কথা টুকু বলতে পারি না ,
জান তুমি , স্বপ্নে ও বলতে পারিনা
তাই ভাবলুম ,
কথায় যেদিন আমি ঠাই পাব তোমার কাছে ,
ঠিক সেদিনটাতে ,
ঠিক সেদিনটাতেই আমি বলবো সে কথাটা .....
জানো , রোজ রোজ কত শত চেষ্টা করি কথা বলার
কিন্তু , তুমি যখন সামনে আসো ...
আমি কেমন জানি নিশ্চুপ হয়ে যাই
মন চাই তখন 
অনেক কথা বলতে 
কিন্তু কণ্ঠ যেন সেই সাথটুকুই দেয় না 
যখন তুমি আশেপাশে থাকো না ,
আমি শুধু তোমার গন্ধে গন্ধে
তোমার মিষ্ট মিষ্ট বুলিতে আচ্ছন্ন থাকি
তুমি যখন কথায় মত্ত হয়ে 
একটিবার মাত্র 
আমার হাতটিতে স্পর্শ কর 
তখন যেন , কেমন 
ঠিক কেমন জানি 
মন আতুল হয়ে উঠে 
এই আতুলতায় ,
শেষে আসল কথাটাই বলতে পারি না ,
তবে একদিন ঠিকই 
মনকে মানিয়ে ,
বলবো কথাটা আর
বাকিটা হবে শুরু.....

স্বপন মজুমদার

আধুনিক গান

পায়ে পায়ে বৃষ্টি নিয়ে 
কে আসে মোর আঙ্গিনায়,
ক্লান্ত বিকেলে মেঘের আড়ালে লুকিয়ে উঁকি
দিয়ে রংধনু কি যেন বলতে চায়।

বর্ষার ভরা বুকে 
সে ছবি এঁকে,
নদী বয়ে যায় মোহনায়
মনের আবেগ বাঁধন হারা, পৌঁছে দেয় তার ঠিকানায়।

কি দেখছ আকাশ পানে
তাকিয়ে, কিছু কি আছে
চোখের সীমানায়,
কল্পনায় এঁকে আল্পনা ডুবে থাকি বিভোর ভাবনায়।

ভেবেই শুধু যাই, কিছু না পাই,ফিরে যাই হতাশায়।

কল্যানী ভট্টাচার্য্য

চাঁদনী রাতে

চাঁদনী রাতে বঁধূ হে তুমি
বসে আছ বাতায়ন খুলে। 
উদাসী মনে বসে আছ ঐ
আকাশের দিকে চেয়ে। 

প্রিয় যে তোমায় এসেছে নিতে
বঁধূ দেখ চাহিয়ে,
প্রেমের আবেসে ভেসে বেড়াও
ঐ নীল গগনের মাঝে। 

ডুবেছে চাঁদ হয়েছে আঁধার
তোমার প্রেমের পরশে বঁধূ
লাগিল যে বিরহের দোলা। 
প্রেমের গোলাপ রইল পড়ে
তোমার ঐ হৃদয় ব্যথার মাঝে। 

তাইতো বঁধূ হয়েছ আজ
তুমি কলঙ্কিনী রাধা।