মনে পড়ে
গত পূর্ণিমাতেও চাঁদ দেখে ছিলাম পাশাপাশি বসে,
আমাদের কয়েক দশকের খুনসুটিতে ভরা
সোনালী দিনের গল্প হয়ে ছিলো গভীর রাতের তারা দেখতে দেখতে।
খোলা আকাশের নিচে মাদুর পেতে,
বেশ জমে উঠে ছিলো গ্রীষ্মের ক্লান্ত শরীরে
প্রকৃতির ঠান্ডা শীতল বায়ুর স্পর্শে,
ছাদের নির্জনতা ছিলো আমাদের দুই বুড়োবুড়ির
একান্তের পরম শান্তির স্থান।
কর্ম ব্যস্ততার কারণে আমরা দুজনেই,
বহুবার দুজনকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছি
সময় না দেওয়ার অপরাধে,
যখন তর্ক যুদ্ধের লড়াইয়ে আমি
কোমর বেঁধে খুন্তি হাতে,ঠিক তখনই তুমি,
একটু আলতো চুম্বনে হারিয়ে দিয়েছো আমাকে।
শত ব্যস্ততা থাকা সত্ত্বেও কখনো তুমি
রান্নার স্বাদ অন্য হাতের থেকে প্রত্যাশা করনি।
দিনের শেষে বাড়ি ফিরে খুঁজেছো একটা
নরম হাতের ছোঁয়া।
পিতৃত্বের স্বাদ আস্বাদনের তৃপ্তি বঞ্চিত করেছো
আমার বন্ধ্যাত্বের কারণে,মাতৃত্বের শূন্যতা
ভুলিয়েছো তোমার অকৃপণ ভালোবাসার জাদুতে।
যেদিন তোমার ছুটি থাকতো ,সেদিন
আমার অপেক্ষায় বারবার পায়চারি করতে
দরজা খোলার ব্যস্ততায়।
কখনো এসে দেখেছি অনভ্যস্ত হাতে,
কিছু নতুনত্বের রান্নার চেষ্টায় হয়ে উঠেছো গবেষক।
কর্ম জীবনে অবসর গ্রহন করায় দুই বুড়োবুড়ি
অফুরন্ত সময় কে ব্যয় করেছি অজানার উদ্দেশে
পাড়ি দিয়ে অথবা দৈনন্দিন কাজে ভাগাভাগির
অংশীদার হয়ে।
আজ তেমনি এক তারায় ভরা পূর্ণিমা,
চারিদিকে জোৎস্না রাতের আলোতে আলোকিত
হলেও আমার পৃথিবী অন্ধকারের গভীরে।
প্রতিশ্রুতির হাতটি ছেড়ে পালিয়ে গেলে আমায়
ফেলে কোন অজানায়,এমনতো হওয়ার কথা ছিলোনা।
আজ আমিও তোমার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি,
জানলার শিক ধরে পথের দিকে তাকিয়ে,
দরজা খোলার ব্যস্ততায় অভ্যাসের টানে।
কে দেবে সাড়া কলিং বেলের শব্দ শুনে?
কে দেবে কাপড়ের আঁচল দিয়ে ঘাম মুছিয়ে?
কে দেবে মুখ ঝামটি শাসনের সুরে অবাধ্য বলে?
কে দেবে দৌড়ে এসে ঠান্ডা জলের গ্লাস এনে?
বড্ড ইচ্ছে করে অভিমানে মুখ ঘুরিয়ে রাখতে,
আর একটি বার তোমায় ছুঁয়ে দেখতে,
তোমার বুকে মাথা রেখে শান্তিতে ঘুমাতে।
জানি আর কখনোই হবেনা তর্কের বড়াই ভালোবাসার লড়াই।
আর কখনোই শুনতে পারবোনা আমার নামটি
ধরে ডাক তোমার মুখে।
কেউ ইচ্ছে করে বেধে দেবে না চুলের বেনী
তোমার মতো করে।
ভিজে কাপড়ের জল পট্টি দেবেনা কপালে
বারে বারে রাত জেগে জ্বরের কারণে।
কখনো আর সাজবনা তোমার নামের শাখা সিঁদুরে,
বড্ড একা হয়ে গেলাম জীবন পথের পথে,
বড্ড শূন্যতা কুড়ে কুড়ে খায় একাকীত্বের ভিতরে,
বড্ড মনে পড়ে তোমার বাড়ির প্রতিটি কোণে কোণে।
তোমার ছোঁয়া প্রতিটি জিনিস থেকে,তোমার গন্ধ ভেসে আসে,
বড্ড দম বন্ধ হয়ে আসে নব বধূর বেশে
আসা,তোমার শয়ন কক্ষে থাকতে।
তাই তোমাকে ভেবে একাকীত্বের লড়াইয়ে
হেরে গিয়ে,আজ আশ্রয় নিয়েছি বৃদ্ধাশ্রমে।
মনের ওলিগলি তে শুধু তোমার
পথচেয়ে,বারে বারে ভ্রম জাগে,জানলার শিখ ধরে দাঁড়িয়ে,
নীরবে নির্জন গভীর রাতের
পূর্ণিমার চাঁদ দেখা নিঃসঙ্গ তাকে নিয়ে।।