Oct 28, 2022

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

ঘরোয়া মানুষ

ঘাড় ফেরালেই একটা মুখও দেখা যায় না  
যে মুখে আছে প্রশান্তির আলো,
শুধু ভ্রষ্ট কথার রঙিন ফুলঝুরির তীব্র আলোয় 
ঝলসে যায় মানুষের মুখগুলো ।

এই ঝলসানো মুখের মানুষগুলো স্বপ্ন ছুঁতে গিয়ে 
রাস্তায় দাঁড়ায় । রাস্তায় হাঁটে দল বেঁধে
আশায় থাকে একদিন তারা পৌঁছে যাবে
আকাশ গঙ্গার মৃদু আলোর শিবিরে ।

আরো অনেকেই সাথী হয় স্বপ্নের খোঁজে
দগ্ধ মানুষেরা নিজেরাই নিজেদের পথ করে নেয়। 

মন্থন শেষে বিষের ভান্ড ফেলে অমৃত কলস নিয়ে 
দৌড়ে পালায় বাহুজীবীরা ।
বারবার স্বপ্ন ভেঙে যায় মাটির মানুষদের ।

আঘাতের পর আঘাত পেয়ে আবার জড়ো হয় 
ঘরোয়া মানুষগুলো । আবার গড়ে মানববন্ধন ।
তালুর বাঁধনে বাঁধনে হয়ে যায় অলৌকিক আত্মীয়তা‌ ।
ভাঙতে ভাঙতে বারবার ওঠে বন্ধনের গান ।

অপাংশু দেবনাথ

এমন আরোগ্য 

অসুখে শরীর ক্লান্ত হলেও সুখের বার্তা বহন করি,
কোন্ সুখের পেছনে ছোটা,ছুটতেই থাকা নির্জনে দূরে। 

সুখের কোনো ঠিকানা আছে!

মানুষের কাছে গিয়ে দেখি অসুখ নিয়ে ছুটছে ওরা। 
দিন ঢলে গাছের পাতায়, পাখিদের খড়ের ছায়ায়
সব রোদ জমা করে রাখে পালকের উষ্ণ কবিতায়। 
 
তার কাছে  যেতে চাই যেন ধোঁয়া ধোঁয়া পথ, 
রাখি তবু হৃদয়ের সকল-শপথ।
হৃদয়ের তাপ কমে গেলে শরীরের চঞ্চলতা 
কমে আসে প্রিয়!
কাজের ভারে নুব্জ্য মানুষটি জানে ভালোবাসা কারে কয়!

কার জন্য এত সুখ খুঁজে ফেরো পাখির ডানায়? 
পাখিরাও একে একে মরে যাবে সুখের সন্ধানে ঠিক, 
তবু ওদের মতন সুখে থাক মানুষের গরল-স্বজন।

তৈমুর খান

আত্মপরিচয়

ঘুরপাক খেতে খেতে
ঘুরপাক খেতে খেতে
একটা আধা শহরে বাড়ি
অবেলার কাক,হাটুরে ফেরিওয়ালা
আর বিক্রি হওয়া মেয়ে
একে একে ফিরে এলে দেখা হয়

যে যার মতন জল মাপে
দু একটা রাজনৈতিক শিকারি
মোড়ে মোড়ে কথা কাটাকাটি করে
মেয়ে পাচার হওয়া সংবাদে
মেতে ওঠে চায়ের দোকান

চোখের সামনে যেটুকু সামান্য আলো
তাও অন্ধকার হয়ে যায়
ছেঁড়া আত্মাটুকু রিফু করতে বসি
ঐশ্বরিক বিশ্বাসের সুতো নষ্ট হয়ে গেলে
কোথায় পাব আর?
বিজ্ঞাপনে দেখি সব তিল তাল হয়ে ঝরে 
কোথাও নেই সুসমাচার!

তবুও শহর
গ্রাম থেকে বাবা নদী আনে
মা সেই নদীতে ধরা পড়া মাছ
আমি ও আমার বউ মৎস্যগন্ধা
লুকিয়ে রাখি সমূহ গোপন সংবাদ!

সৌমিত বসু

তিন বছর পরের সন্ধ্যা

যতবার সূঁচের ফুটোর ভেতর দিয়ে 
গলিয়ে দিচ্ছি রোদ্দুর
তুমি হাত বাড়িয়ে টেনে নিচ্ছ গর্ভের ভেতর।
আমাদের জীবন শেষ।মৃত্যু জেগে উঠে
বসে আছে বুকের ওপর।
আলো হারিয়ে সুঁচ 
হাঁ করে বসে রয়েছে খিদেয়।

ব্রিজের ওপর থেকে আমি যতদূর দেখতে পাই
তুমিও কি তাই পাও? বলো

কুশল ভৌমিক

পরিণতি

মহাশূন্য থেকে জন্ম আমাদের 
ফের মিলাবো মহাশূন্যে।
মাঝখানে শূন্যতা পূরনের নিপুণ অভিনয়।

মৃত্যুর পর আমাদের যাবতীয় পরিচয়
নিছক একটি ফ্রেমে বন্দি,
ফ্রেমের ধুলো মুছতে মুছতে একদিন
মন থেকে মুছে যাবো সকলের।
কেবলি ছবি শুধু পটে আঁকা।

ছেলেবেলায় বাবা হাঁট থেকে
ইলিশ মাছ নিয়ে ফিরতেন,
ইলিশের পাগল করা গন্ধে মৌ মৌ করতো চারপাশ।
বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলতাম -কামাই করে তোমাকে প্রতিদিন ইলিশ খাওয়াবো
এখন কামাই আছে;বাবা নেই।
রেফ্রিজারেটর ভরে থাকে রুপোলি ইলিশে
কেবল সেই গন্ধটা নেই
বাবা এখন ফ্রেমবন্দি।

মায়ের ছবিতে ধুলো জমে প্রতিদিন।
স্ত্রী ঘুমিয়ে গেলে 
মাঝে মাঝে ছবির সাথে গল্প করি মান,অভিমান,আবদার
আকণ্ঠ পান করি শৈশব।
আমার জোছনা এখন নিয়ন আলোতে হারিয়ে গেছে।

সময় বলে কিছু নেই
শুন্য থেকে জন্মেছি
ফের মেলাবো শূন্যতেই।

কৃষ্ণকুসুম পাল

প্রেমের কবিতা

হিমালয় কবিতা লিখছে-
বরফে ঢেকেছে শরীর
সৃষ্টি হচ্ছে নদী
আকাশে তুলেছে শির
তাই সে মৌন।
              
সাগর কবিতা লিখছে
নোনা জলে উঠছে গর্জন
বুকে খেলছে অসংখ্য প্রাণী
চোখে নেই ঘুম
তাই সে উত্তাল।
               
কবি কবিতা লিখছে-
অসীম বিশ্বে সে একা
প্রেমেপাগল,প্রতিবাদে আগুন
সে হিমালয় হতে চায়
সে সাগর হতে চায়
তাই সে প্রাণ বিলায়।

তৌফিক জহুর

মালতীনগর- ০৫

উৎসর্গঃ কবি তৃষ্ণা বসাক, বন্ধুভাজনেষু
 
কৈশোরে  আব্বার হাত ধরে বকশি বাজার যাই  
সাজিয়ে রাখা সবজি মাছ মাংস, খাঁচায় মুরগী  আর সরল মানুষগুলোর কেনাবেচায় মুগ্ধ হয় চোখ 
আশিস কাকার হোটেলে চেয়ারে বসে 
পরোটা সবজি মিষ্টি দুধ চা খেতে খেতে 
কখনো জানাই হয়নি
আব্বার পকেটের আবহাওয়া সংবাদ 
খেয়েই গেছি কৈশোরের ডাংগুলি খেলার মতো, 
জেনেছি কাঁচা ছানা মানেই আশিস কাকা,
বৃষ্টির দিনে ছাতা মাথায় বাজারে যেতাম,
মনে হতো অনেক হাতির কান বাজারে ঘুরছে,
লাল মিয়া চাচার দোকানে বসিয়ে রেখে আব্বাও 
হাতির কান লাগিয়ে মিশে যেতেন ভিড়ে,
আব্বাকে খুঁজতাম, কিন্তু পেতাম না তখন
শীতে বকশি বাজারে দেখেছি যুবতী সবজিবাহার
লাউশাক বাঁধাকপি ফুলকপি টমেটো সীম গাজরের
জৌলুশে মনে হতো মাদলায় নানী বাড়ির উঠোনে 
 
ঋতু পরিবর্তনে গাছে নতুন পাতা 
বকশি বাজার শেখায় জীবনের নামতা,
পকেটের নোটগুলো মনে হলো খলসে মাছ, 
বাজারে এলোমেলো কদমে নামতা পড়ি
সবকিছু ঠিকঠাক অথচ কিছুই ঠিক নেই, 
কৈশোরে আব্বার হাসিমাখা মুখের আড়ালে
বেদনার ঘামগুলো আমার কপাল বেয়ে 
নিচে নামে, নিভিয়ে দেয় সদ্য জ্বলে ওঠা উনুন 
 
বাবা মানেই পাঞ্জাবির পকেটে বেদনা লুকিয়ে রাখা
সেলাই করা চটি পায়ে একজন আলেকজান্ডার।

উমাশঙ্কর রায়

বনসাই -১

গাছও নয়, সৈনিকও নয়
শেকড়ে মাটির গন্ধ নেই
তবুও ওরা ময়দানে
দেশপ্রেমের গল্প শোনায়! 

বোধিদ্রুম কী 
সে-কথা না জানলেও
ওরা 'বুদ্ধ-বুদ্ধ' খেলে আর
মানুষের কোলাহলে
দিব্যি চোখ বুজে থাকে! 

ওরা কেউ বটবৃক্ষ না হলেও
মার্বেল বিছানো ড্রইংরুমে
ওরাই এক একটি পর্বের সংস্করণ, প্রতিনিধি, কিংবা অলংকার। 

ওরা বনসাই। 

বনসাই - ২

যতটুকু প্রেম বিলাবে ভেবেছিল বৃক্ষছায়া - সে আর হয়ে ওঠেনি। 
কেননা সবকিছু দেখেশুনে গাছেরা লজ্জায় শুধু মাটিতে মিশে গিয়েছিল। 

ঘটনাটি তেমন কিছু নয়
এমনি ভেবে
কৌলিন্যের চাদর জড়িয়ে গা'য়
বাবু-বনসাই যেই না বেরিয়ে এল, বেরিয়ে এল স্কন্ধ সীমানার বাইরে -

শিশু কলাগাছ বলল - আসুন,
এইটুকু সামান্য আয়োজন বেঁচে আছে আজ। 
এ-বেলা আমার ছায়াতেই বসুন।

গোপেশ চক্রবর্তী

নিঝুম রাতের কাব্য 

শেকড় পর্ব -১

তুমি জানতে,এগোতে পারিনি আমি
যা ছিলো হাতে উজাড় করে দিয়েছো
তখনতো বুঝিনি  তা

ওরা বুঝে না শেকড়ের টান 
মাটি ফুঁড়ে বের হওয়া নতুনের আহ্বান 
পাতা,ডাল-পালা,পাখি, মানুষ, নদী, সমুদ্র, আকাশ, ফুল-শিশু-গান-সবাইকে কোলেপিঠে করে গড়ে তুলে শেকড়

বাবা মৃত্যু মুহূর্তে সবাইকে দেখে,সবশেষে মাথার উপরে থাকা আমার দিকে চেয়েছিলেন। কত কথা ছিল এই চাওয়াতে!তার মর্মকথা অল্প বুঝতে পেরেই মাঝে মাঝে চিৎকার করে উঠি!শেকড় কেঁপে ওঠার শব্দ পাই!

বাবা স্রোতে ভাসেনি
তাই স্রোতের মানুষ ভুলে গেছে
বাবার ছায়ার সঙ্গে লড়াই করছে আজও কিছু কেউটে
অফুরাণ কান্না জমা ছিল বুকে তাই কিছু বলে যেতে পারেনি
অতলে জমা ছিল জল নিঃশব্দে বেঁচেছিলেন একা

ভেতর মানেই বাবার কথা লিখা থাকে
ভেতর মানেই শেকড়ের সন্ধান করা
ভেতর মানেই তোমার নীরবতার হারানো মুহূর্ত 
ফেলে আসা জীবন্ত ছবি ভেসে ওঠে হঠাৎ! 
ভেতর মানেই অন্ধকার 
ভেতর মানেই এড়িয়ে যাওয়ার বিষয় 
ভেতর মানেই স্বপ্ন হারানোর ভয়
ভেতর মানেই ইচ্ছের ঝরা পালক 
ভেতর মানেই শেষ না হওয়া কথা
ভেতর মানেই রহস্যঘেরা জীবন 
ভেতর মানেই প্রেমের আঁকা আলপনা
ভেতর মানেই সীমাহীন ভালোবাসা 
ভেতর মানেই দেওয়াল ভেদ করা পাতার ছবি

শেকড় চিনে গেলেই রিপুগুলো ধেয়ে আসে দ্রুত
মনে হয় চোখে কাপড়ের পট্টি পড়া
গা লাগোয়া সবাইকে বলে দিই মূল ইতিহাস 
যার যা প্রাপ্য দিয়ে দিই
বদ্ধ দরজাগুলো খুলে দেখিয়ে দিই বাইরে কী আছে
চোখে আঙুল দিয়ে সরাসরি দেখিয়ে দিই দর্পণে কেমন লাগে সে

শেকড় বড় কাঁপন ধরায় বুকে
মাঝে মাঝে অজ্ঞাতজনেরা এসে পরিযায়ী পাখির মতো শেকড়ের কথা বলে হারিয়ে যায়! 

মা বলতেন 'চুপ থাক' ওরা বুঝে যাবে একদিন
নিজের জন্য না রেখে যে যা চাইতেন দিয়ে দিতেন নির্দ্বিধায়! 

হায়রে পাতার জীবন 
হায়রে পরিযায়ী মন
হায়রে শেকড়ের টান

শান্তনু ভট্টাচার্য

আমার ছেঁড়া পাতা 

যেভাবে পতাকায় মুড়ে কফিন নেমে আসে 
শোক উথলানো উঠোনে-- হে ছেঁড়া পাতা 
সেভাবেই দুঃখের ভারে 
ধীরে ধীরে নেমে এসো মাটিতে।

আমি বৃক্ষের কাছে বৃষ্টি চাই 
জলকে বলি একটু নুন দিও পান্তাভাতে 
'কই'-দুঃখের স্বরধ্বনি বোসো হে  এস্রাজে 
'কান্না' -- তুমি ছড় টানো.. ক্লান্তিহীন।

তবুও ব্যাকুল চোখে 
প্রথম থেকে শেষ অব্দি তোমাকেই খুঁজে যা 
নদী কিংবা মিছিলের বাঁকে বাঁকে।
মিলিয়ে যাচ্ছি মেঘে 
সপ্তডিঙায় যাচ্ছি ভেসে 

ঘাটের জলে না-পোড়া নাভির মত স্মৃতি ভাসিয়ে 
অশৌচ বস্ত্রে দুহাত পেতে রাত্রিকে বলি--
শুধু একবার পাপ দাও...
নদীর জলে স্নান সেরে ছেঁড়া পাতার মত 
শেষবার শুদ্ধ হয়ে দাঁড়াই

ঈশ্বরের মুখোমুখি।

রুদ্র মোস্তফা

ভেজা আগুনের তৃষ্ণা 

বাড়িটিকে ঘিরে খেলা করছে বিগত সূর্যের ছায়া। 
ছায়ায় ভয়ংকর দিনগুলো ভাঙা কাচের মতন 
টুকরো টুকরো বিঁধে আছে। 
বাড়িটার মূল দরজায় লেখা আছে 'জোছনা বাড়ি'।
উঠানে পিতলের কলস জলে ভরা।
জলের উপর ভাসছে জোছনা-পোড়া মানুষের মুখ। 
কলসির গায়ে প্রপিতামহ লিখে রেখেছেন, 
'যে আগুন পুষতে জানে
সে জানে জোছনার ব্যবহার।  
মানুষের ইতিহাস— সে তো ভেজা আগুনের তৃষ্ণা।'

সত্যজিৎ দত্ত

ঘড়ি

ঘড়িটা খুলে ফেলো প্লিজ! 
সময় আটকে যেতে চাইছে 
ঘন্টা মিনিটের কাঁটায়। 
পথ জুড়ে ছড়িয়ে অক্ষর, 
কিছু কুড়িয়ে নেব আদরে
কিছু শীতের অপেক্ষায়!

শুভ্রা সাহা

অনুগল্প : 

আপনজন

ছোটবেলা থেকেই নবীন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবিকে পূজা করে আসছে। মোম, ধূপকাঠি, ফুল দিয়ে গভীর শ্রদ্ধার সাথে পূজা করে। ওর পড়ার টেবিলের উপর একটা ছোট্ট রবীন্দ্রনাথের ফটো রয়েছে। মায়ের মুখে শুনেছে রবি ঠাকুরকে নাকি স্কুলে যেতে হয়নি ।বাড়িতে বসে বসেই সব পড়া শেষ করে ফেলেছে। বড় বড় সব বই লিখে ফেলেছে । স্বয়ং ভগবান না হলে এরকম কিছুতেই হতে পারে না । এটাই নবীনের ধারণা।  কারণ নবীর এত মনোযোগ দিয়ে পড়েও সব পড়া মনে রাখতে পারছে না। বই লেখা তো দূরের কথা । তাই মা যেমন করে ভগবান রাধা মাধব কে সিংহাসনে পূজা করে সেও টেবিলের উপরে রবীন্দ্রনাথকে সেইভাবে পূজা করে রোজ। মনটা খুব ভালো থাকে। আর পড়াশোনা ও ভালোভাবে করতে পারে ।সবাই ওকে ভালও বাসে। মনে যেন আলাদা একটা শক্তি অনুভব করে। জীবনে অনেক কিছু জানার আগ্রহটা অনেক বেড়ে যায়। নবীন মনে করে এটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরই আশীর্বাদ।

 নবীন যখন একাদশ শ্রেণীতে পড়ে ,স্কুলে খুব ভালো রেজাল্টের জন্য  রবি ঠাকুরের জীবনী নিয়ে লেখা একটি বই পুরস্কার পায় । অল্প কিছুদিনের মধ্যে সেই বইয়ের আগাগোড়া সব পড়ে ফেলে ।সেটিতে রবি ঠাকুরের আত্মজীবনী লেখা ছিল । নবীন তখন বুঝতে পারে রবি ঠাকুর কোন ভগবান নন। আমাদের মত রক্ত মাংসে গড়া মানুষ । তাঁর জীবনের অনেক দুঃখ কষ্ট নবীনকে ব্যথিত করে । নবীনের রবি ঠাকুরের প্রতি শ্রদ্ধা আরও বেড়ে যায় । অন্য সাধারণ মানুষের মতোই তার জীবন সুখ -দুঃখ -শোকে ভরা। ,  স্বজন হারানোর ব্যথা, আনন্দ সবই অন্য দশজনের মত । তাই নবীন তাকে ভগবান না ভেবে এবার থেকে নিজের প্রানের মনের মানুষ ভাবতে শুরু করে । প্রতিদিন তাঁকে ভক্তিভরে প্রণাম করে । তাঁর উপদেশ, বাণী, গান ,তার অন্যান্য লেখা নবীনকে চলার পথের প্রেরণা জোগায় ।নবীনের দুর্জয়কে জয় করার ক্ষমতা আরও বেড়ে যায় । সে কবিকে আপন আত্মীয় ভাবতে শুরু করে ।

সত্যজিত সেন

ম্যানুস্ক্রিপ্ট
 
প্রেতের শহর, আলো নেই I ভয়ঙ্কর আঁধার এখানে I
তোমার আসার কথা ব্রডকাস্ট হয়ে গেছে পাহাড়ে, অরণ্যে আর মেঘের চূড়ায় I 
চাঁদ আড়মোড়া ভেঙে বিছানায় উঠে বসে I ভোরের নারীর মত
সারা মুখে গোলাপের আলো। দুটি স্তন থেকে চাঁদ দুধের জ্যোৎস্না ঢেলে দেয়।
সহস্র আলোকবর্ষ দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে।  ক্ষতি নেই। 
নিশ্চয়ই কোনোদিন স্বপ্নের অলিন্দে দেখা হবে।
যেমন শুকনো ফুল উঁকি দেয় পুরোনো বইয়ের পাতায়,
মুখে তবু ঝুলে থাকে এক চিলতে রোদ্দুরের হাসি।
তুমি চোখ তুললেই ঝর্ণার আলো এসে মুছে দেবে দুঃসহ আঁধার।
ফিরে যাবে বলতেই  চাঁদ থেকে লেলিহান আগুনের শিখা।
উন্মত্ত চাঁদ ভেঙে টুকরো টুকরো জ্বলন্ত পাথর।
তুমি চোখ নামিয়ে নিতেই ফের ব্ল্যাক আউট, রাত্রির নদীর অন্ধকার।
আবার পৃথিবী জুড়ে প্রেতের শহর,কবিতার মুখে সেঁকোবিষ।
বুকের গভীরে রাখা রক্তাক্ত ম্যানুস্ক্রিপ্ট আজ অবধি ছাপানো হ’ল না।

সমরেন্দ্র বিশ্বাস

হারানো প্লুতস্বর

জীবনের সাজগোজ থেকে প্লুতস্বর হারিয়ে গেলে অশ্বমেধ যাপন 
মাটি হয়ে যায়। নক্ষত্রে নক্ষত্রে দীর্ঘশ্বাস, ঘোড়ার পা থেকে 
খুলে যায় রাজকীয় নাল। সুদূর প্রহরী প্লানেট হারিয়ে যায়
প্লুটোর মুখমন্ডল থেকে। তখন জীবনের উপবৃত্তে একাকী  
নিঃসঙ্গ পাক খাওয়া। খরগোসেরা এনে দেয় মৃত তারকা 
কিংবা মণিকাঞ্চনের আলো!

ইলেকট্রিক চুল্লীর দরজার সাটার অটোমেটিক বন্ধ। 
মাহাজাগতিক দূরত্ব থেকে তুমি ফেরত পাঠাও তোমার
বিছানায় ফেলে আসা আমার প্রাগৈতিহাসিক নক্ষত্রখচিত 
রুমাল। আর কোনও দিনও আমাদের দেখা হবে না।
বিষন্নতার সমুদ্রে হাঁটতে হাঁটতে আমিও মহাপ্রভুর অদৃশ্য
নীলাচলে নীল! কন্টকিত মাদারের ডালে ডালে দীর্ঘশ্বাস,
উঁকি মারে রক্তিম বসন্তের মৃত পাপড়ি। স্মৃতিতে হারাণো
প্লুতস্বর! গন্ধ কথা বলে, মহাজাগতিক রশ্মির সাথে ভেসে
আসে তোমারই দীর্ঘশ্বাস। বিদ্যুতের ঝলকেরা লেখে – 
এ জীবনটা বড়ো ছোটো হে। 

প্লুতস্বর হারিয়ে যাবার পর জীবন থেকে বর্ণমালারা বিদায়
নেয়। পড়ে ওঠা হয় না হারাণো রুমালের সংশোধনপত্র কিংবা
জীবনযাপনের সংবিধান।

সন্দীপ সাহু

ফুলের নাম মহম্মদ মানিক

মহম্মদ মানিক এক দেবতার নাম।
নাকি আল্লাহর, গডের?
মাল-এ হড়পা বানে ভেসে গিয়ে বেঁচে যাওয়া
ভেসে গিয়ে মরে যাওয়ার মানুষেরা,
বীর অকুতোভয় মানুষটাকে এখন পুজো করছে।
মন্ত্র ওরা নিজেরাই রচনা করেছে। ভালোবাসা থেকে।
এ মন্ত্র উচ্চারণ হয় হৃদয়ে ঝরনা পড়ার শব্দে।
উচ্চারণ হয় অক্ষিকোঠরে হড়পাবনে ভেসে যাওয়া তারা-শব্দে!

এই মন্ত্র মাটিতে আকাশে বাতাসে ফুলে ...
উড়ে উড়ে ভ্রমর হয়, ফড়িং হয়, প্রজাপতিও!
এর কোনো বর্ণমালা নেই, লিপি নেই! ভাষা আছে!
এই ভাষায় বাঁকা ধারলো চাঁদ ও ধারালো ত্রিশূল
প্রচণ্ড উত্তাপে গলে যায়। গলে গিয়ে মাটি হয়।

মাটি ফুল ফোটায়। ওই ফুলের নাম মহম্মদ মানিক!

বিপ্লব উরাং

শব্ধ

আলমারি ভর্তি বই।
বই-এর ভিতরে ঢুকে খোঁজতে থাকি-
লতুন লতুন শব্দ।
শব্দরা পথ দেখায়।
শব্দরা লতুন রাস্তা দেখায়।
শব্দ লতুন সপন আঁকতে শিখায়।
আলমারি ভর্তি বই।

কত শব্দ রাশি রাশি
সাজে আছে থরে থরে
খোঁজতে হবেক।

যদি সাচ্ ই শব্দ দিয়ে
সুন্দর বাইক‍্য গঠন করতে মাংগি(চাই)।
খোঁজতেত হবেক ই।

শব্দরাই দেখাবেক
লতুন দিনের দিশারী।

আলমারি ভর্তি বই।
খোঁজতে হবেক।

নবীনকিশোর রায়

অগ্নিধর্ম

আমাদের একই ঈশ্বর - - - 
এই আস্থার উপর দৃঢ় বিশ্বাস রেখে, 
পথে নেমে ভাবি---
আমাকে একা ফেলে সরে যায়
বহুদিকগামী পথের সাথে ভিন্ন ভিন্ন মতলবি !

কোথায়  থাকেন, কোন সাকিনে ঠিকানা--- প্রভু আমার , 
জিজ্ঞেস করতেই চতুর্দিকে টেনে নিয়ে যেতে চায়,
কেউ উত্তর দিকে তো কেউ দক্ষিণে ,
কেউ কেউ পূর্ব দিকে, আবার কেউ পশ্চিম দিশায় দেখাতে চায়!

জটিল এই ভ্রম থেকে বেরিয়ে
যে পথে বাড়ি ফিরি,
 ভাবি একটাই ঠিকানার কথা, 
ভাতযুদ্ধের চুল্লির ভিতর আগুন--- 
আর শেষ যুদ্ধক্ষেত্রে যে আগুন, সকল আগুনের ধর্ম একই .. 
পুড়ে পুড়ে অবশেষে ছাই!

আব্দুল গফফার

যন্ত্রমানব হবে, মানুষ হবে না

হাঁফিয়ে উঠেছে ছেলেটা, সারাদিন প্রাণ ওষ্ঠাগত।
আজ টিউশন,কাল প্রজেক্ট, পরশু ইউনিট টেস্ট।
এইভাবেই যন্ত্রের মতো ওর জীবনধারা-

প্রতিযোগিতায় খানখান ওর শৈশব, খেলাধুলা।
আমরাও ঘরকুনো, অসামাজিক হয়ে উঠেছি,
নেই লৌকিকতা, সম্পর্ক, কুটুম্বিতা দূর অস্ত।

হৈ হৈ,পালা করে রান্না বাড়ি বাজারের বস্তা,
সে সব এখন অতীত
একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে টুকরো হয়ে গেছে।

রোজগেরে দেখে পার করে দিল বাবা,
ব্যবসা,চাকরি, ছেলের খোঁজ নিয়ে লাভ নেই।
দুবেলা দুমুঠো পাওয়া আর গোত্র মিললেই হল।

চার হাত এক হয়েছে, ভেঙেছে পরিবার, সম্পর্ক।
প্রতিবেশী, ও সব ঠুনকো ব্যাপার এখন।
ছেলে মেয়েগুলোও যন্ত্র তৈরি হচ্ছে। 

বই খাতার ভারে ন্যুব্জ, মুখ ভার ওদের।
যন্ত্র হবে, যন্ত্রমানব হবে, কিন্তু মানুষ হবে না রে,
হারিয়ে যাবে ওরা, হারাবে সমাজ।

খোকন সাহা

বিজয়া      

এখন দুঃশাসনের প্রয়োজন নেই । 
দ্রোপদীরা ফেলে  দিচ্ছে বসন। কিংবা শাসন। 
গণতন্ত্র,  বা হেনতন্ত্রের গালেও   লেখা নেই ---
সোহাগের লম্বা দুটি হাতের  বাল্য ব্যাকরণ, বা বিস্ফোট জাগরণ। 
শুধু পাঁচ ফোঁড়নের গন্ধচক্রে
সহাস্য বদনে ঝরে --- স্বর্গের কানন।
তুমি কি সে ফুল কুড়ায়ে
ছড়াবে মাঠ। .... না, উলুবনে
ছড়াতে ছড়াতে মুক্তোর মালায়
পরাবে ---অধিকারের দিনরাত ? 

ওগো, নয়ন বিজলী রাত !
সোহাগের ডালা খুলে  ধরো -না.... 
দীণতার মন্ত্রে মুগ্ধ --- বিজয়ার প্রথম প্রভাত।
তবেই-না, সেই কোলে, 
এঁকে দিতে পারে ---
শতপুত্রের কান্না উজার
জননীর  বুকের ভিক্ষাচাতাল  
বিশ্বকরুণার আধার  ; 
মহাভারতের অমৃত কথা,
ভূ-ভারতের অন্ধকার। 

অর্ধেক আকাশ, অর্ধেক মাটি
দিয়ে  গড়ি ---
আমাদের পূজার প্রসাদ !

নন্দিতা দাস চৌধুরী

চড়াই ভাঙ্গি

অতীতের ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা মুছে ফেলতে ফেলতে পাথর হয়ে যাচ্ছি,

সূর্য-চন্দ্রহীন আকাশের শরীর বেয়ে নেমে আসে কামাতুর অন্ধকার, প্রচন্ড গুমোট , নিষিদ্ধ  বাতাস,

অন্তিম শ্বাসে আজ পথের পাঁচালী, হারিয়ে যাচ্ছে অপু-দূর্গা শূন্য ঘরে নিঃসম্বল প্রাণ,

দেশ আছে অস্থায়ী ঘরও, বেবাক সভ্যতায় বেকারত্বের কনকনে চাবুক, রুজি- রুটি জীবন সংগ্রামের গান, এসো আশ্বস্ত করি বর্তমান ,

প্রাতঃ- সন্ধ্যা ভ্রমণ আর নয়, চড়াই ভাঙ্গি তবেই গন্তব্য।

শর্মিষ্ঠা ঘোষ

হৈমন্তী 

মধ্যরাত। আদপেই নয়, অথচ ভাঙা আতপের মতো ক'টি তারা আলোর আশা জাগিয়ে আলোকবর্ষ দূর হতে উতলা করেছে দুরন্ত মেঠো ইঁদুরের চোখ। মৌচাকের গুঞ্জন প্রায় স্তিমিত। কার বাঁশির সাথে ডুলিচাঁপার গন্ধে বেসামাল বাতাস ছুটেছে চালতার ঝোপের কুয়াশায়। 

শিশিরের জলে ঝরা ফসলের গান। বুড়ো চাষা ফিরেছে ঘরে, রয়েছে ঘুমিয়ে। ঘুম আর স্বপ্নের মাঝে কোন এক আধজাগা তিতিরের তির তির ডাকে নদী স্রোতস্রাব ষোড়শী। 

এমনই কার্তিকের রাতে, নিকষ কালো এক মেয়ে, নিজের রক্তের সাথে দামড়া চাঁদ গিলে নিয়ে জিভ কেটেছিল আনন্দে...

রাহুল সিনহা

নিশিডাক

এই কলহপর রাত ও অমিল সিডেটিভ
লিখে রাখে বায়বীয় হাতছানি,
যতটা তীব্র মনখারাপ আমাকে
বন্দরের দিকে টেনে নিয়ে গেছে,
তার সুরে হারমোনিকা বাজাও,
হয়তো চন্দ্রাহতের মতো
ফিরে আসবো তোমার জানালায়।

পঙ্কজ কান্তি মালাকার

চোখবাঁধা

বিধান রেখে মাথার উপর
যুক্তি ধূলে লুটায়,
বড়শি ধরে বিচার বসে
আইন গেছে খেলায়।-

-------------    কানামাছি ভোঁ ভোঁ
             ‌যাকে পাবি তাকে ছো,
--------খেলুক কিংবা না'ই খেলুক
নাগাল পেলেই জাপটে ধরো।

এই-না হলে চোখবাঁধা
বলবে কি কেউ!
হোঁচট খেয়ে পড়ছ দেখেও
ধরবে না তো কেউ।

নমিতা সরকার

সন্ধানী মন

চেনা সুর চেনা ছন্দ আকাশের নীল মেঘে হাবুডুবু খেতে খেতে চাঁদের দেশের কৌতুহলী পথের বাকে বাকে ভীড় করে।

নক্ষত্রগুলো আকাশের বুকে গেঁথে আছে নাকি ঝুলে আছে?

অন্ধকারেই যে সুখ খুঁজে নেয় তবুও কেন যে সুখি নয়? 

কেন যে হঠাৎ ঝরে পরে মিটিমিটি জ্বলে থাকা সুখের জগৎ থেকে অচেনা পথে...

হয়তো সে নিজেও জানে না, হয়তো জানে, ঝরে পড়লো কোন পথের বাঁকে মাঠের বুকে নদীর বুকে নাকি সমুদ্রতলে... অদ্ভুত উদ্ভিদের বৈচিত্র্যের ন্যায় কৌতুহলের প্রশ্ন জেগেই থাকে।

মিঠু মল্লিক বৈদ‍্য

 নিছক সাধারণ মেয়ের কবিতা

 বলেছিলাম সেদিন 
" একটি কবিতা লিখ কবি!
নিছক সাধারণ মেয়ের ,
লিখতে লিখতে তোমার কলমের 
আঁচড়ের শব্দ স‍ৌরভে যাকে
করে তোলবে অসাম‍ান‍্যা !"

"কালো শব্দটাকে সুসজ্জিত করে সাজিয়ে দেবে
আলোর মহিমায় ,
তোমার কবিতার নায়িকা ; পরী আলোতে 
মহিমান্বিত করে তোলবে সমাজেরে ,
গুণে হবে গুণান্বিতা;
গায়ের রংটা হোক না কালো ।"

হে কবি ! "  নায়িকার
বিচার সভা ভরে দিও অদ্ভূত কলরবে।
কালোর মাঝে শত আলোয়
ভরে দিও কলেবর ,
আবেগী চোখে ঢেলে দিও আগুনের শিখা  ;
যে শিখার দীপ্ত তেজে ছাই হবে কালোত্বের লাঞ্ছনা।"

হে কবি !  তোমার নায়িকা নারীত্বের 
অনুবলে হয়ে উঠবে মহীয়ান ;
পুরুষের লোলুপ দৃষ্টি,কামজ উদ্দামতা মিটাতে
হাতে তোলবে শানিত বর্ম।
সতীত্বের মর্যাদায় অনুপমা , আর অসীম মমতার প্রগাঢ়তায় হবে উপাস‍্যা।

হে কবি ! কালোর মাঝে আলো ঢেলে
একটি সাদামাটা মেয়ের কবিতা লিখ তুমি,
যার সরল জীবন ; অনুপ্রেরণা
আত্মমর্যাদা ; অহংকার ,
কালোতেই  প্রসিদ্ধি
তিতিক্ষার আকাশে উড়বে মুক্ত বিহগ।

শারদ আকাশ,কাশ শিউলির সখ‍্যতা
তোমার  নায়িকা জীর্ণ পৃথিবীর জীর্ণতা ঘুচাতে
মেলবে  আঁচল  ; অসম্ভবে সম্ভব করে
অট্টহাসিতে ভরিয়ে দেবে আকাশ বাতাস
কালোর জয়গানে মুখরিত হবে বিচারসভা
ঘুচে যাবে মনস্তাপ , নামবে শান্তি।

একটি কবিতা তুমি লিখ কবি
নিছক সাধারণ মেয়ের কবিতা।

অপর্ণা পোদ্দার সাহা

বিষবায়ু

ক্ষতগুলি সেরে উঠুক 
বেড়ে উঠুক মনের লালিত্য
গোপন কুঠুরি হোক জেহাদমুক্ত
এতে যদি হয় ক্ষতি 
সংগোপনে একটু নতি
হাসি ফুটুক সকলের অন্তরে অতি।

চন্দ্রা বিশ্বাস

পান্ডুলিপি 

জীবন এখন হেলতে দুলতে পার হতে চায় রাজপথ
যানবাহন মন ইচ্ছে-সফরে, গতি রোখা দায়,অসম্ভব,
বিবেক ব্যস্ত, উদয়-অস্ত , দিনভর রোজনামচায়
জেব্রা ক্রসিং এ বিবর্ণ সময় , ভালো মানুষীর ঈশারায়।
মগজ ঝিমোয়, আলো-চেতনায়, হিসেব-নিকেশ পদক্ষেপে
কন্ট্রোলরুমে বিবেকবাবুও , অতি সজাগ ফেলে পা মেপে।
পলক ফেলতে মুঠোয় অতীত, বর্তমান বলে হয় কি কিছু? 
ভাবো মন ভাবো, ক্ষণেক দাঁড়াও, হুঁশিয়ার,
ভাবো আগুপিছু ।
ভবিষ্যত ও অতীতের চাপে, শ্বাসরোধে চোখে সর্ষেফুল
মনের গতিটা দাও রুখে,
আর ভুল করে, করো ক্রমাগত ভুল ।

ঝুমা শব্দকর

সেতুকথা

পাড়ে বসে কাটানো কতদিন...
হঠাৎ রৌদ্র ঝিলমিলিয়ে ওঠলে 
নৌকো ভেবে ভুল হয়
নাহ্, আমার কোনো খবর আসেনি
 
সন্ধ্যে হয়ে এলে 
উঠে যাই বালুচর ছেড়ে
      শান্ত রাস্তা থেকে স্ট্রীট লাইট, 
      মানুষের চলাচল
রাত গড়ায়; স্বল্প ঘুমের পদ্য

ক্ষীণ রেখায় পাল তোলা নৌকো
  এপার ওপার জুড়ে 
             অদৃশ্য সেতু রচনা করে।

সন্ধ্যা ভৌমিক

রহস্যের কুহেলিকা

জাগতিক কাজের ভিতর রহস্যের খেলা,
অবিরাম উড়ে যায় পাখির ডানা মেলা সারি...
তাদের গভীর চাহনি সামনের দিকে
তবু মাঝে মাঝে যণ্ত্রণার চিতার দিকে 
চোখ তুলে তাকায় স্থির‌ ‌।

অলকা গোস্বামী

কোনো এক দিন

অদূরেই কৃষ্ণচূড়া গাছ, ঝির ঝির
ছায়া এসে পড়ে ছাদের এক কোনে।
হিমের ছোঁয়া লাগে বাতাসে আজকাল,
ঝরে ঝরে পড়ছে কৃষ্ণচূড়ার পাতাও।
খালি খালি লাগে ছাদের ওই কোনটা।
কেমন একটা আঠালো মায়া ভরা
এই জীবন, কখন অজান্তেই
অচেনা সব চেনা হয়ে যায়,...
আর ঠিক তখুনি .... ছেড়ে যায় সব, ট্রেন জানলায় দৃশ্যের মত।

কোনো একদিন শুধু পড়ে থাকবে, ছাদ.... আর রোদের আলোর ঝির  ঝিরে ছায়া।

নিচে পড়ুন নির্বাচিত ১১ জন তরুণের কবিতা



মো: রুবেল

মায়া

আজকাল বাবা আমাকে সংসারের পাঠ শুনান। 
ক্ষুধার সাথে যুদ্ধ করে ঠিকে থাকার পাঠ।
বাবা আততায়ী ক্ষুধা পালন করতো পেটে।
আর আমাদের পালন করতো বুকে।
আমিও শুনি। 
হিম হয়ে আসে শরীর।
অপলক তাকিয়ে থাকি বাবার মায়া ভরপুর চোখে।
বাবা অনর্গল বলতেই থাকলেও
বাবার সংসার পাঠে আমার মনোযোগ থাকে না।
আমি আকণ্ঠ মায়া পান করতে থাক,
বাবা তো জানে না সংসার বলতে
আমি কেবলই বাবাকে বুঝ।।

রূপন মজুমদার

বসন্ত সন্ধ্যা

কোন এক বসন্ত সন্ধ্যায়
আমি কবি হয়ে দাঁড়াব তোমার সম্মুখে
দীর্ঘকাল ধরে বুকে চেপে রাখা মাটির কান্না তোমায় দেব
তুমি সোনামুখী সুঁচ দিয়ে এঁকে রেখো 
সংসারী নকশী কাঁথার মাঝে ভাঁজে ভাঁজে। 

মানুষের রেখে যাওয়া পথে হেঁটে হেঁটে 
কোলাহল জমিয়েছি দুহাত ভরে... তার সাথে..
তুমি চাইলেই তোমার ঐশ্বর্য পথে বিছিয়ে দিব
আকাশের মাত্রাহীন পদচিহ্ন।

যে চোখে জীবন্ত শ্বাস খেলা করে আগুনের সাথে
কিংবা নিঝুম রাতের স্তব্ধ নারীর কথা
তুমি ওই জোড়া চোখে খুঁজে নিও ফ্যাকাসে রঙের ঢেউ।
 
প্রাণের ভেতর যত অসংখ্য নদীর প্রত্নবেদনা  
কখনো ধূলিকণার মতো উড়িয়ে দিয়েছি রাজপথে।
অবলীলায় তাও লিখে দিবো তোমার নামে.... 

কোন এক মাতাল সন্ধ্যায়
এবার আমি সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে দাঁড়াবো। 
ক্লান্ত পথিকের নীরবতার পাশে।

রাজশ্রী তুমি চাইলে হাত ধরতে পারো।

লিটন শব্দকর

খোলাচিঠি 

ঝিঁঝিঁডাক হারিয়েছে হরিনজন্মের ভেতর 

ক্যামেরায় অশেষ অভাব, রাখঢাক, মর্মে !

মাংসগন্ধি রবিবারে বড়ো রাস্তার পাগলটা
এক হরবোলার সাথে খুব ভাব জমিয়েছে

তুমি কি আমার দেখা গাজনের মাঠে
পুরোনো শেকড়ের ঘ্রাণ খুঁজে পেলে!

কুয়োতলায় সারেঙ্গী, ছুঁয়ে দেখাও প্রজন্মে…

শিউলী দাস

তুমি

তুমি খুঁজে যাও ধরাতলে শান্তির মুখছবি 
আমি দেখি তোমাকে যেমন চিত্রপটে আঁকা রবি।
আমার জীবন গল্পের তুমিই সারাংশ ,
প্রতিটা লেখায় ঘর করেছে তোমারই অংশ।
সূর্যাস্তের গোপন কথা যেমন ধরার বুকে হয়,
আমার অন্ত শেষ বসন্ত যেন তোমার কাছে রয়।

সহিদুল ইসলাম

ধোঁয়াটে হাসি       

এক মুঠো হাসি পেয়ে      
মেঠো পথে কুড়িয়ে,
শকুনের মত নিয়ে পড়ি
খাবলে ঝাপটি দিয়ে।
ডানার উৎসুক শব্দ শুনাই,
সকল মাংশাসীদের।
হিংসায় জ্বলে ওরা,
দহনে আমার আনন্দের।

ধূপকাঠির সাদা ধোঁয়া বায়ুর গায়ে গন্ধ লেখে,
বায়ুতে যেমন বিলিয়ে যায়।
আমার কুড়িয়ে পাওয়া হাসি,
মগজে নিমেষে হারায়।

সুচরিতা পাটারী

ঘনত্ব বনাম পরিবাহীতা

সকালের যে সময়টাতে কম্বলের আমেজ কাটাতে হাঁপিয়ে উঠি,
ওবেলায় উনুনের আঁচে মায়ের কপোল-বর্ষন হয়।
দিন যত বাড়তে থাকে,
কালসিটে আঁচলের আড়ালে বর্ষার জল ক্রমে হালকা হতে থাকে,
বাহুর জংশন ক্লান্ত হয়ে অসার হতে চায়।
 আসলে ঘনত্ব হ্রাসের সাথে সাথে পরিবাহিতাও যে হ্রাস পায়।।

রুবেল হোসেন

শর্তহীন ভালোবাসা

তোমাকে খুঁজে পাই ক্ষণে ক্ষণে।     
সোনালী রাঙা পাখির ডানায়। 
তপ্ত মনে ছুঁয়ে যায়, তৃষ্ণার্ত প্রাণ
সেখানেও তোমার পরশ মাগি
বিনিদ্র রাতও জাগি 

তোমাকে যদি বলি শর্তহীন ভালোবাসো
ভালোবাসবে কি?
যদি বলি আমার কাছে এগিয়ে এসো
দ্বিধাহীন আসবে কি?

চোখটি তুলবে, ঘন কেশগুলো সরিয়ে নেবো,
লাল টিপ পড়িয়ে দেবো
একে অপরের স্পর্শে ম্লান মনে 
ভাগ করে নেবো দুঃখ-সুখ
গড়ে তুলবো মুহুর্তে প্রাসাদ
চোখে চোখ রেখে জন্ম দেবো শত কবিতা।
প্রেম ছাড়া আর কিছু চেওনা
কিছু নেই দেবার মতো,
আছে শুধু শর্তহীন, সেই ভালোবাসা।

সঞ্জয় দত্ত

ছাপ

ঘুম ভাঙলে আমার সকাল হয় প্রতিবারের মতো ।
সন্ধ্যা হতে হতে ভুলে যাই হাজারো দাগের গল্প,
এই গল্প গুলো কেউ মনে রাখতে চায় না,
তা নাহলে পৃথিবীতে অন্ধকারকে কেউ উপেক্ষা করত না!

ভুলে যেতে হবে, নতুনের আশায় বসতে হবে।
এই নিয়ম আমার পূর্বপুরুষ দেখে এসেছেন এবং আমার উত্তরপুরুষও দেখবেন।
এই  পৃথিবীর নিয়ম।
যদি লঙ্ঘিত হত তাহলে আমার অস্তিত্ব বৃথা!

নিয়মের কবলে পড়ে ভাবনার ঘরে সন্ধ্যা নামে।
আমার মতো হাজারো গল্প একটু জল খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
হিসেবের খাতায় শূণ্য ছাপ ছাড়া আর কিছু দেখি না!

রমা চন্দ্র

সাধ

সব বাধা টুটে
বহুদূর ছুটে...
আমি পাহাড়ের বুকে,
দেখি সকাল দুপুর সাঁঝে 
এক মহান মৌন 'ঋষি'
যেন ধ্যানমগ্ন নিঃসীম পরম শান্তিতে,
ক্ষণে ক্ষণে অনুভবে প্রকাশিত...
তাঁর অসীম শক্তিতে-
অভিভূত এই আমি-
বোঝেন কি অন্তর্যামি!
পাহাড় গাত্রের সবুজ অরণ্যানি...
নির্ভয়ে বিকশিত-
ফুলে ফলে বর্ণে গন্ধে শোভিত,
পশুপক্ষীর অবাধ বিচরণ...
বর্ণবৈচিত্রে পূর্ণ মধুপের গুঞ্জরণ...
মাতোয়ারা ঝর্ণার অবতরণ...
কতশত জীবের পদচারণ...
বিস্ময়ে দেখি শুনি-
সত্য‌ই 'হিমালয়' যেন এক দেবভূমি!
নাই কোন মন্দির মসজিদ গির্জা 
বিদ্যুৎ আলোর সাজসজ্জা,
শুধু পরম পুরুষ পরম প্রকৃতির খেলা...
মেঘেদের ছুটে চলা...
পাহাড়ের পাদদেশে বহমান... 
নদী জল ছুঁয়ে ফেলা,
কখনো বা উড়ে চলা 
পাহাড় শিখরে-
সূর্য রশ্মিতে স্নানের তরে!
শুধু ভাবি আনমনে 
সঙ্গী হতাম যদি মেঘেদের সনে
যেতাম‌ই ওই 'সুন্দর' এর আলিঙ্গনে!

Oct 27, 2022

অনুপ দেবনাথ

গোপন অসুখ 

আমি একটা খুব গোপন অসুখ চাই।        
খুব গোপন একটা অসুখ।
তাতে অনায়াসে সারিয়ে দিতে,
কোনো চিকিৎসা বেরোখ। 
খুব গোপন একটা অসুখ। 
যেদিন আমার চারা গাছটি বৃদ্ধ হবে।
বসন্তে যতই ফুল ফুটুক, 
ওপ্রান্তের একটি টেলিফোন।
শুধু নীরবতায় সেদিন আমাদের ভাষা হোক।

সুতপা রায়

মিলন হবে কতদিনে

দেশে দেশে পরবাসী
বাঁশি আর নূপুরের মাঝখানে
বোমারু বিমান
কৃষ্ণ মেঘে ঢাকা নীলাকাশ
বাঁশির সুরে শ্যামকল্যাণ
রাগে অনুরাগে বিরহ অভিমান

নালিশ দম্ভ বোমায়  
সুফল কিছু নয়
এসো পরবাসী,
মনের মানুষ কাছে এলে
ফুল ফোটে
ফোটে ফুল যেন বিশ্বময়