Aug 31, 2023

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

সূর্যাস্তকাল


সূর্যাস্ত নিপুণ হলে সুদর্শন হয় কোন সন্ধ্যাতারা
আকাশের অন্ধকার বিস্তারে তোমার মুখ ভাসে না।
ভালোবাসব বলে পরিপাটি হৃদয় রেখেছি তাই
তুমি কি ঘোর কাপালিক নাকি অন্য কোনো তন্ত্রে
তোমার বিছানো আঁচলে যানজট গড়ে রেখেছে বলো?

হঠাৎ কুয়াশাভোর এলে শরতকালের কথা মনে পড়ে
যে ভোরে আমার মা নক্সিকরা চটের ব্যাগ হাতে নিয়ে
বাপের বাড়ি নাইওর যাবেন বলে ঘাটে বসে থাকতেন
সম্পর্কিত দেওর মাঝির অপেক্ষায়। জারুল গাছের ছায়ায় শীতল হয়ে পানের খিলি বানাতেন।

এখন তোমার আকাশে সেসব আলপনা ভাসে না আর
এখন চন্দ্রকথা আর চন্দ্রাবলি ছেড়ে চলে গেছে 
শোলোকের মামাবাড়ির চেনা সেইসব চিত্রকথা।
ঘাট পেরুবার সেই মাতৃমঙ্গল শাঁখাভরা হাত নেই আর
তুমি আমি এখন অনেক অনেক বড়ো হয়ে গেছি

অপাংশু দেবনাথ

কুমিরাশ্রু-৩

অকারণ মন্দ-মন গোপনে সাজালে ছক,
শরীর তখন বেসামাল অর্ধপঙ্গু দিশেহারা।
এমন পঙ্গুত্ব নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কতদূর 
হাঁটা যায় রম্যনগরীর ধূপ গন্ধহীন ঘুর্ণিপাকে!

এভাবে সফল হতে চাও সময়ের ভুল রিহার্সালে? 

সবুজ পাতাগুলোকে ঈষৎ হরিৎ কিংবা 
জলপাইয়ের রক্তিম নয়ন বলে ভ্রম হয়!
দৃশ্যত উথলায় হাওয়া,রৌদ্রস্নাত কোলাহলে,
ভুল মন্ত্রপাঠে তুমি সাজাতে পারো সংসার।
সেই চেতনার রঙে ফিরতে পারে কি আর কেউ! 

আমি চারিদিকে দেখি অর্ধসত্য বহুরূপী কান্নার কাজল।

সৌমিত বসু

মায়া বৌ

বুকের ভেতর বর্ণমালার রঙ
একটা জীবন। কেমন আছো তুমি?
শুকনো পাতা গাছের কি কেউ হয়
সন্ধ্যাতারা মেয়ের চেয়ে দামী?

বিকেল যখন মেঘের সাথে হেসে
যত্নে বলে সর্বনাশের কথা
বৃষ্টি পড়ে সহসা সেই মুখে
আধোমলিন স্বপ্নে যা রূপকথা।

কমল সরকার

গেরস্থালি 

এমন নয় যে  হিসেব মত চলতে হবে সবই 
মাঝে মাঝে বেহিসেবি হলাম না হয়  আমি 
তুমিও হলে অমিতব্যয়ী খানিক , 
ফর্দ মেনে সওদা তো হয় রোজ 
তারই ফাঁকে একটু না হয় বাজে খরচা হোক ! 

বাসন কোসন জামা কাপড় থাকুক অগোছালো , 
সারা ঘরে আমি ফেললাম সিগারেটের ছাই ।
তুমিও ভাঙো ফুলদানি কাপ দুটো !
পরিপাটি রয় তো বাড়ি রোজ 
ফাঁক ফোঁকরে গেরস্থালি বিশৃঙ্খল হোক ।

এমন নয় যে নিয়ম ক’রে ভালবাসতে হবে 
মাঝে মধ্যে প্রেমের পাত্র থাকল না হয় খালি । 
তুমিও ধরো হাড়-কিপটে হলে , 
ভরা প্রেমে  দিন তো কাটে রোজ 
তারই ফাঁকে একদিন নয় উপোস-আপোস হোক ! 

কে বলেছে রোজই তোমায় লক্ষ্মীসোনা হতে ! 
মাঝে সাঝে  উড়নচন্ডী লক্ষ্মীছাড়া হও । 
আমিও ধরো আস্ত পাগল হলাম , 
রয়ে সয়ে হয় তো কথা রোজ   
কোমর বেঁধে এক দিন নয় ঝগড়াঝাঁটি হোক !

এমন নয় যে ধরাবাঁধায় চলতে  হবে সবই,
মোদ্দা কথা পারস্পরিক এই যে এতো প্রেম 
চুকিয়ে দেবো এক জন্মেই পুরো ।
উলটে পালটে বাসবো ভাল রোজ ,  
তাই বলছি নিয়ম ক’রে নিয়ম ভাঙা হোক ।

কুশল ভৌমিক

অমরত্ব

বারান্দার টবে ফুটে আছে আস্ত একটা জীবন 
পাপড়িখসা একটা বিকেল সব হারিয়ে 
জেগে থাকে পুনর্জন্মের আশায়।

মানুষ প্রত্যাবর্তনকাতর 
ইতিহাস মিথ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে 
এক টুকরো আয়নার ভেতর। 

পুরনো জামা থেকে 
খসে পড়ে স্মৃতির কুয়াশা
শুকিয়ে যায় বর্তমানের উত্তাপে। 
ভুলের
দ্বিতীয় কোনো সংস্করণ নেই।

ওহে বেলেল্লা সময়--
এ কেমন তামাটে তামাশা 
অক্ষম হাতে তবু কেন জেহাদের জুলফিকার? 
প্রেমিকের  পাঞ্জাবির পকেটে একটাও চাঁদ নেই 
অথচ ভুলভাল নক্ষত্রে ভরা আমাদের ব্রহ্মাণ্ড! 

চারিদিকে অবতারের দৌড়াত্ম্য
অলৌকিক হাট-বাজার 
কে যে কাকে দিচ্ছে অমরত্ব! 

জন্মের ভেতর আমাদের মৃত্যু
মৃত্যুর ভেতর জন্মরেখা দেখা যায়।

সন্তোষ রায়

ট্রেন ও স্টেশন                                       

একটা দিন, একটা রাত—কেবল
দু'টোই স্টেশন ।
লোয়ার বার্থে ঘুম দিলে একঘুমে
পৌঁছে যাই গন্তব্যে
তারপর শিস মেরে সারাদিন যত কাজ।
ভিখিরি ভাবে না কেউ।
তোমাকেই ভাবি বলে কিছু লিখি, কিছু টিপ মেরে বুঝে ফেলি ভেতরে বাদাম নেই । 
স্টেশন মাস্টার জানে আমি পাগল নই।
ভিক্ষের নেশা আছে কিছুটা। জানু পেতে বসি–
কী জানি কী দেবে আমায়! চাই ত অনেক কিছু—
সোনালী কাবিন চাই, সোনালী ডানার চিল চাই, আরো কত কী চাই— সোনার হরিণ— সোনার তরী 
ধনরত্ন চিনেছি অনেক— দুই স্টেশনে ঘোরাফেরা করে খুঁজি— আর কী পাই! আর কী পাই!
জিভের ডগায় নুন দিয়ে বলি, মর, নয় জীবনটাকে ঘষে ঘষে দেখ্‌ — চন্দন আছে কি না —

রুদ্র মোস্তফা

প্রতিবেশী  

এক

নীলতরঙ্গে কত কথা ওড়ে যায় আঙুলের ক্লান্তি ভুলে
রংবেরঙের রাতগুলো ঝরে পড়ে প্রতি ভোরে 
একাকী দুজন বেলকনির রোদ ধরছি ছায়ার আঁচলে
তবু আটকে থাকে বর্ণমালা চোখের কার্নিশ ধরে। 

দুই 

দুই বারান্দার মাঝে শুয়ে আছে দীঘল শূন্যতা 
কথা বলা মানা তাই বারান্দায় বুনেছি গোলাপ 
আমরা বোবা প্রতিবেশী পেয়েছি সৌরভের পূর্ণতা
সুবাসে সুবাসে ঠিক জমেছে আমাদের আলাপ।

শান্তনু ভট্টাচার্য

সম্ভ্রম 

একটা দুরন্ত হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে সম্ভ্রম 
পাখির ডানার মত পাখা মেলেছে সে-
চারের গুণিতকে মন্ত্রমুগ্ধ মাছেদের মতো 
চারপাশ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়েছে ভাগাড়ের শকুন। 

বাঁ-চোখ বুজে ডান-চোখে সেদিকে তাকাতেই 
এক গভীর সমুদ্র এসে ঘিরে ফেললো
পায়ের তলায় সরে যাচ্ছে মাটি 
লোনাজলে ডুবতে ডুবতে 
আকাশের দিকে হাত তুলে বলছি -প্রভু বাঁচাও 

কী আশ্চর্য! প্রভু সাড়া দিলেন 
অধমের প্রার্থনা মানলেন
ধীরে ধীরে নোনা জল নেমে গেলে থিতু হয়ে  
ডান-চোখ বুজে বাঁচোখ দিয়ে দেখি 
শ্বাপদেরা শুধু থাবাই চেটে যাচ্ছে 
আর সে সম্ভ্রম দেদার লাস‍্যতা বিলোতে বিলোত
দেবী থেকে উর্বশী 

দু-চোখ খুলে দেখি-আমিইএকাই পড়ে রইলাম 
বিধাতাও চলেছেন সম্ভ্রমের পিছনে পিছনে...

রোকেয়া ইসলাম

ঋণ

প্রায় শেষ বর্ষার কৃষ্ণ গহ্বর হায়েনা উদ্ধত বুট
এজিদ উত্তরসূরীরা এসেছিল ঘন ছায়া মৃত্যু এসেছিল বত্রিশ নম্বরের সিঁড়িতে
সেদিনের সেই গভীর রাতটা কেমন ছিল? 
অনেক খুন সিমেন্টের ফ্লোর উষ্ণ 
সে ম্যালা প্রশ্ন 

যেখানে আমার নীলাভ আকাশ, দৃঢ় হিমালয়, প্রদীপ্ত সূর্য 
অবারিত ফসলের সবুজ মাঠ,অগণন দোয়েলের সুর, আমজনতার বিশ্বাস 
ভালবাসা আর পিতার রক্ত -স্রোত একাকার

পনেরো অগাষ্ট ভোরে বড্ড একা হয়ে যাওয়া 
শ্রাবণ ভেজা বাতাসে অনন্ত বিষন্ন গীতি
রেডিওতে তারবার্তা, অভ্যূন্থানের এই এক রীতি... 
দুঃখী মানুষ- শোষিতের পক্ষ স্বজন আর নেই!! 
সমাধি সে অবধি ঠিকানা, এই গ্রহ পিতৃহারা 
আত্মভোলা বাঙালি স্তম্ভিত 
মাটি - পানি - বায়ু কোথায় পাই 

বাবা নেই ডাক নেই কেউ নেই সমকক্ষ
মেঘে ঢাকা দৃষ্টি সীমানা আকুল অশ্রু -পাথর
সময় কে তোমার পক্ষ। 

স্মৃতির মিনার আজো ভালবাসার অবিরাম নুন 
অবনত তোমার কাছে 
জনক তুমিই স্বাধীনতা 
আমার হাজার বছরের ডি এন এ রিপোর্টে 
তোমার খুন

তবুও রয়ে যায় অপরিশোধ্য বকেয়া ঋণ
স্পন্দিত বুকে এখানে থামতে চাই 
টুঙ্গিপাড়া বাসস্ট্যান্ড, আমাকে নামিয়ে দিন...

নবীনকিশোর রায়

অতিথি তুমি 

প্রাত্যহিক ঘর থেকে বেরিয়ে
সূর্যউঠা নতুন সকালে
আবারও একটি রামধনু রঙের
আকাশ দেখব... 

পরস্পর হাতে হাত রেখে
অনেক দূর এসে----দেখি
আপন পর এমন ভাবনা থেকে, পর ভাবনার কথাটা উঠলো! 

পিছনে ফিরে ভাবি---
বন্ধ এক ঘরে আপন হয়েছিলাম,
আছি এভাবে বহুদিন। 

অথচ,ধ্যানাচ্ছন্ন সময় 
ভেঙে কথায় কথায় 
পথ এগিয়ে যায়---

ক্ষণিকের এক অতিথি, 
প্রত্যুষের রঙ মেখে---
রামধনু রঙের আকাশের দিকে 
পা বাড়ায়... 

পঙ্কজ কান্তি মালাকার

দুই বন্দীর প্রেম

সূর্যমুখী অবাক চোখে দেখে থাকে প্রিয় রূপ,
প্রিয় আভায় রাঙিয়ে ওঠে তার চোখ-মুখ-বুক।

মোটেই নিঠুর নয় সে প্রিয়, চাহনিতেই বুঝে,
মেঘের আড়াল থেকে তার মোহনীকে দেখে।

ডানা মেলে ছুটতে চায় প্রিয়জনার বুকে,
মধ্যাকর্ষণে বাঁধা, সে বিষাদ আঁধার চোখে।

সৌরমণ্ডলের রীতি নিয়ে বন্দী পদ্মপতি,
হাতটিও বাড়াতে পারে না, তার চাহনিতেই প্রীতি।

আব্দুল গফফার

অতীত সেই চলন্তিকা

অতীত সেই চলন্তিকা, বাঙ্গালা ভাষার অভিধান,
প্রতিদিন ধ্বংস হচ্ছে কতশত বানান!
কে খবর রাখে, রাখার ধারও ধারি না,
কি লিখলাম, কেন লিখলাম একবারও ভাবিনা,
লিখতে পড়তে শুধু দৃষ্টি ব্যয় করলেই হল।
হ্রস্ব-ই না দীর্ঘ-ই, দন্ত-ন না মূর্ধাণ্য-ণ, 
দন্ত-স না মূর্ধাণ্য-ষ বা তালব্য শ,
সন্দেহ নিরসনে অবিরাম কাটাছেঁড়া চলছে -
শিখে এসেছি যা তার আর চলবে না।
নতুন পাঠ্যবই, নতুন বানান বিধি, 
নতুন নতুন শব্দবয়ন, শব্দচয়ন,
অভিধান গ্রন্থগুলি চরম অসম্মানের শিকার!
হায়রে কাব্য গল্প প্রবন্ধ উপন্যাস..সাহিত্য জগত -
বানান, ভাষা শিক্ষার চরম অবক্ষয়, এলো দুর্দিন।
বানান শব্দগুলো সব এলোমেলো, ধ্বংস,
বানানের নিয়ম, শিকেয় তুলে সব বিসর্জন।
এই লেখনীতেও ভুল আছে ধরে নিয়ে,
সকলের কাছে প্রশ্ন কি হবে বানানের ভবিষ্যত!

নমিতা সরকার

কৃষাণীর সতীন অন্তরা

হেলেদুলে পরা রোদে পোড়া সোনালি ধানের সোনালি স্বপ্নের বীজ, 

উঠোন জুড়ে খেলা করতে করতে চাষির চৌকাঠ পেরিয়ে নববধূবেশে প্রবেশ করে হাসির ঝিলিকে...  

পাঁকা ধানের স্বপ্নের ভাষায় চাষের বসবাস হৃদয়ের লেনদেনে, জেগে ওঠে কৃষাণীর বাসর আসর সাজানো ঝলমলে অন্তরে।

পূর্ণতার পূর্ণ্যপত্রে ভাগ্যবতীর আঁচল ভান্ডারে শোভা দেয় সামাজিক নিয়মে তবুও যেনো অপূর্ণ  ঘর...

যে অপ্রাপ্তির পরিপ্রেক্ষিতে নিয়মের বাঁধ ভেঙে সুখ ও সৌন্দর্যে রেঙেছে কৃষাণীর অন্তর।


সুমনা রায়

স্বাধীন তর্জমা 

আমার ঘুম না আসা চোখে জেগে থাকে অসীমান্তিক  রাত। তার বুকে দোল খায় আধফোটা চন্দ্রমল্লিকার শর্তহীন মায়া। গভীর হতে হতে নিমগ্নতা একটা বিশাল বৃক্ষ হয়ে ওঠে। তার শাখা প্রশাখায় জড়ায় শাশ্বত প্রণয়ের সুর। তাকে ছুঁয়ে দিলেই আমার চেতনার স্রোত বয়ে যায় চেনা দ্রাঘিমাংশ থেকে অচেনায়। দূরে কোথাও নবপল্লবে জন্ম নেয় আলোর এক স্বাধীন তর্জমা।

সঙ্ঘমিত্রা নিয়োগী

একটি চিত্রকল্প

যখন আমি দুপুরে ভাত খেতে বসি, 
 ভাতের গন্ধ লাটিমের মত গড়িয়ে 
এবাড়ি ওবাড়ি ঘুরে গোমতী  নদীর পাশ হয়ে পথ মাঠ  ক্ষেত পেরিয়ে
 লালগিরি গ্রামে পৌঁছোয় । 
 এরপর গন্ধ রথের চাকার মত গড়িয়ে 
ধান খেতে যেখান থেকে তৈরি হয় আমাদের আহার-- 
অন্নউৎপাদক কৃষকের বাড়ি অব্দি-- 
ছুঁয়ে ফেলে তার ঘরের কোণ, কুয়ো তলা, ছেঁড়া কাঁথা--
তার ঘাম-নুন-শ্রম আর চোখের জল...
দুবেলা খেতে বসলেই মনে পড়ে 
যারা এই অন্ন ফলায় তাদের সন্তান কেউ অভুক্ত নয় তো!

সন্দীপক মল্লিক

আজ অলক্ষুণে মৃত্যুর মিছিল 

আজ
অলক্ষুণে মৃত্যুর মিছিল
মানবিক সবুজ বনানীতে !
আজ
অব্যর্থ সময়ের পাপ
অপচয়ী প্রগতির পল্লবীতে !
আজ
দুর্বিনীত দূষিত দুঃসহ
অপঘাতী মৃত্যুর ঢেউ !
আজ
চন্দন-জীবনের সৌরভহারা
বিমুগ্ধ মমতার পরাগ !
আজ
দর্শনের ব্যভিচারে জরা
প্রাকৃতিক মানবিক দীপাবলি-দিশা !

বিধর্না মজুমদার

বাঁধন

বাঁধন যেন ছিন্ন না হয়
এই মোর চরম প্রত্যাশা
ধৈর্য্য আমাদের পাহাড় সমান
ভাঙ্গলে তবে উঠবে যেন সব ভরসা।। 

মাধুরী লোধ

প্রতিদিন থাকে খেলা

প্রতিদিন সকল মানুষ কে খেলতে হয় ভালো থাকবার খেলা
প্রতিদিন মানুষ কে তাড়িয়ে বেড়ায় মানুষের পছন্দ সন্দেহ হেলা অবহেলা ।
রোজ নামচায় মানুষের  থাকে উপরে উঠবার সিঁড়ি ভাঙ্গার প্রতিযোগিতা
থাকে ঘাম শ্রম বিনিদ্র রাত করুন খেলা ধূলা  কিছু মানুষ লেখে কথা ও কবিতা ।
মানুষ প্রতিদিন ঠকে প্রতিদিন জেতে এক একটা খেলার ভিন্ন ভিন্ন ধরন
প্রতিদিন থাকে জীবন জুয়ার বাজি যারা হারেন পিছু হটেন সামনে জোটে মরন ।
দাঁতে দাঁত চেপে কেউ কেউ করেন মরন পণ চালিয়ে যান জেতার  লড়াই ,
এনারা জেতেন এনারা হাসেন বড় বেশি দেরি হলেও উত্তর পুরুষরা করতে পারেন বড়াই ।

নন্দিতা দাস চৌধুরী

স্মৃতির ডায়েরি

মধ্যবিত্ত বুকে ঝুলে থাকে স্মৃতির  ডায়েরি,এই স্মৃতি থেকে ফিরে আসার কপাট বন্ধ,
জীবনতো চলমান, অসমান অদেখায় আরো বেশী সমান্তরাল,
রোজ রোজ তাকিয়ে থাকা প্রতিচ্ছায়া চূর্ণ হওয়া নিয়মিত কঠিন  প্রস্তরে,
বিখ্যাত  শাড়ির  আঁচলে বুক ঢাকা প্রশান্ত সাগর জুড়ে নিশানী,
আমার আমি নতজানু হয়,
সবাই একা তবুও মিছিল জুড়ে সহস্র কোটির উচ্চারণ,
শুনসান রাস্তায় হেঁটে গেলে দেখতে পাই তুমি আমার  কেউ নও,আমিও তোমার কেউ নই।

মিঠু মল্লিক বৈদ‍্য

কল্পসুখ

চল তবে হাঁটি আবার নতুন করে
অস্মৃতির আড়ালে।
কল্পলোকে বুনি কল্পজ্বাল
হারানো  শৈশব খুঁজি চত্বারির ভিড়ে আরো একবার।

চল হাঁটি আবার নতুন করে,
রাতের পথ পেরিয়ে মিলি দুজনে অরূণোদয়ের পথে
সেই চৌরাস্তার মোড়ে,যেখানে লুকিয়ে ছিল 
আড় চোখে দেখার সুখ।

কল্পলোকে পাশাপাশি দাঁড়াই দুজনে
হতাশার বিস্মৃতিতে গাই ভালোবাসার গান।
বাতাসে উড়ন্ত আমার খোলা চুল,এলোমেলো খুনসুটি
তোমার দুরন্তপনা ,এক পলকের মিষ্টি দেখায় 
হারানো সুখ কুড়িয়ে নিই আরো একবার।

চল হাঁটি আবার নতুন করে
শাসন, বাধ‍্যতার অক্ষেও অবাধ‍্যতাকে খুঁজি
গোল্লাছুট, ডান্ডাচুল্লি কিংবা গুল্লি খেলার মাঝে
সকল দায়ভার ভুলে চল মুক্ত পাখী হই ।

চল বন্ধু হই আবারও বাড়ন্ত বয়সের
দৈন‍্যতা কাটিয়ে খোলা আকাশ হই
কল্পলোকের কল্পসুখে খুঁজে শৈশব পাড়ি জমাই
অস্তাচলের পথে।

জাহাঙ্গীর মিদ্দে

প্রতিদান  

প্রতিদানে কিছু পাব এই ইচ্ছায় জল ঢালি,
এ ইচ্ছা স্বপ্নেও আসে না।
কারো কচি ধানক্ষেতে জল নেই, 
জল দিলাম, গাছ বড় হবে,
কচি ধান গাছ হাওয়ায় দোলাবে মাথা,
তা দেখাও সুখের।
অসময়ে কারো বাড়ানো হাতে
কিছু কড়ি তুলে দিলাম,
অসময়ে পড়া লোকটির ম্লান মুখে সূর্যের আভা, 
তা দেখেও মনে উল্লাস আসে।
প্রতিদান আবার কি, 
একজন ব্যর্থ মানু‌ষের কাছ থেকে -
উপকারের উপহার , না ঋণের মাশুল! 
প্রতিদান শব্দটাই তুলে দেওয়া  দরকার, 
অভিধানের পাতা থেকে!
যেমন সূর্যের অভিধানে প্রতিদানের পাতা নেই,
যদি থাকতো লক্ষ কোটি বছর ধরে 
ধার দেওয়া আলো প্রতিদানে চাইতো,
চাঁদ কি পেরে উঠতো তা দিতে, 
রাতের আকাশ অন্ধকারে ভরিয়ে!

কাজি নিনারা বেগম।

কে তুই

কে তুই শতাব্দীর  পর শতাব্দীর সময়ের স্রোতে এক প্রাচীন কোনো কঙ্কালে ঘুরে বেড়াস। সত্যি কি ভাবিস তুই কি মানুষ , কেতুই গঙ্গা ,যমুনা, গোদাবরীর তটরেখায়  প্রাচীন কোনো পরম্পরা ও সংস্কৃতির ডুবে যাওয়া ঢেউয়ের  তরঙ্গের ভেসে যাওয়া বালির ধুসর কি কোন  কঙ্কাল। নাকি তূই কোন প্রাগৈতিহাসিক যুগের  হিমাচল প্রদেশ জম্মু কাশ্মীর ও উওরাখন্ডের

দাঁড়িয়ে থাকা ইট পাথর মার্বেল পাথর নাকি ব্রক্ষ্মপুত্র

সভ্যতায়  নাকি তুই গিরিরাজ হিমালয় দন্ডায়মান পর্বতের হিমবাহের টুকরো পাথরের অদৃশ্য কোনো শক্তি।

 কে তুই  জননী জন্মভূমিশ্চ  ত্রিরঙা ভারতমাতার লূপ্ত হয়ে যাওয়া সমুদ্রের যাওয়া কি কোনো নর কঙ্কাল। কে তুই অসংখ্য দাসত্বের অসংখ্য ঘামের বিন্দু ঝড়া পুরাতন কঙ্কাল। কে তুই স্মৃতি রেখায় তলিয়ে যাওয়াপাতাল পথে নিরিবিলি হেঁটে যাস নিঃশব্দে। এই ধূলো বালির গালিচায় শুয়ে আছি  আমিও নীরবে

মৌসুমী গোয়ালা

প্রতিশোধ

দুপুরে খাবার পর বেশ আয়েশ করে ঘুমিয়েছেন দয়ানন্দ সাহা। প্রত্যেহ দোকান থেকে ফিরে স্নান খাওয়ার পর এভাবেই ঘুমানোর অভ্যাস। মাথার উপর বনবন করে ঘুরছে ফ্যান আর তিনি পাশ বালিশটিকে কোল দিয়ে শান্তির ঘুম ঘুমোচ্ছেন। এমনিকরেই আড়াই ঘন্টা কেটে যায় তার প্রতিদিন। বিকেলের চায়ের আগে যদি কোন কারণে নিদ্রাভঙ্গ হয় তাহলে রণমূর্তী ধারণ করা তার স্বভাবের একটি বিশেষ অংশ তাই বাড়ির সবাই অতি সন্তর্পনে যে যার কাজ করে যাতে ঘুমের কোনরূপ বিঘ্ন না ঘটে কিন্তু আজ এই শান্তি বেশিক্ষন স্থায়ী হলো না। বৈদ্যতিক গোলযোগের কারণে হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল পাখা আর তাতেই ঘটল বড়ো বিপত্তি।  অন্যদিন এমনটি ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে দয়াদন্দের গিন্নি তালপাতার পাখা দিয়ে বাতাস করেন। গতকদিন ধরে শরীর ভালো যাচ্ছিল না, ক্লান্তিতে অবসন্ন হয়ে তারও দু-চোখের পাতা বন্ধ। পাখা বন্ধ হওয়ার সাথে সাথেই পি..ই..ই.. শব্দ করে একজন এসে দয়ানন্দের নাকের উপর বসে নিজের তীক্ষ্ণশুর চামরায় ডুবিয়ে রক্তচোষা শুরু করে দিল আর সাথে সাথেই ঘুমের উঠল পটল। তিনি চেচিয়ে উঠলেন, ' আমার রক্তে উদরপূর্তি করবি হতচ্ছাড়া, দাঁড়া তোকে দেখাচ্ছি মজা' বলে কষিয়ে এক চড় বসালেন নিজের নাসিকার উপর। চিৎকারে সৃষ্ট কম্পনের ফলে সেও পালিয়ে গেলো। খাটের মাঝে বসে রাগে গজগজ করতে করতে চুলকানি উপ্রশমের অব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। সত্যিই তো, রাগ তো হবারই কথা। নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু রক্তের পরিবর্তে দেশ স্বাধীনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এরা তো মানবজাতিকে প্রতিনিয়ত শোষণ করে চলেছে। রক্ত নিয়ে আরো নতুন নতুন শোষকের জন্ম দিচ্ছে। তাছাড়া মানুষের রক্ত যেহেতু এদের শরীরেও প্রবাহিত হয়ে চলেছে মানবজাতির সঙ্গে একটা রক্তের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। সে সম্পর্ক তো আর নেহাত দু- চারদিনের নয়, যুগ যুগের। সে সম্পর্কের কথা মাথায় রেখেও এই অপকর্ম থেকে বিরত থাকা যায়। যদিও বা ধরে নেই অবুঝশ্রেণীর প্রাণী, বুদ্ধির বিকাশ তেমন ঘটেনি, একেবারে যে নির্বোধ সেটা মেনে নেওয়াও একেবারে ঠিক হবে না। বনজঙ্গল ছেড়ে সাদাসিধে নিরিহ প্রাণীদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলিকে বেছে নিতে কোন দ্বিধা দ্বন্দে ভুগছে না। তারচেয়ে

বরং প্রাণীশ্রেষ্ঠ হয়ে যত বিপদ মানুষের, হত্যার মতো নিকৃষ্টতম, জঘন্য কাজ করতে মন সায় না দিলেও একপ্রকার বাধ্য হয়েই করতে হচ্ছে। তার তাতে কাঁধের উপর পাপের বোঝা বেড়েই চলেছে। এ সহ্য করা যায় না। করা উচিৎও নয়। এর একটা বিহিত দরকার। এসব ভাবতে ভাবতেই রাস্তায়  ধোঁয়ার কামানের গাড়িটিকে জানালা দিয়ে দেখতে পেলেন দূর থেকে আসতে। দয়ানন্দ সাহার চোখে মুখে অপার আনন্দ। তিনি আবারও চেঁচিয়ে ওঠলেন 'প্রতিশোধ প্রতিশোধ 'বলে।

সন্তোষ সরকার

অনিবার্য

দিন আসে আর চলে যায়,
শুধু কিছু স্মৃতি মনে রয়। 
সেই সুখস্মৃতি বিজরিত সময়
বর্তমানের বুকে অশ্রু ঝরায়।

যতো ভাবি ভুলে যাবো,
অতীতের দুঃখ বিস্মৃত হবো,
তখনই হৃদয়ের অশনি সঙ্কেত 
ভেঙে দেয় সকল মোহ ।

আগামীর পথে পা বাড়ায়
ওরা রক্তের বিনিময়ে রক্ত চায়,
ধ্বংসাত্মক জীবন খাতার 
অক্ষরগুলো ক্লেদ মেখে নেয়।

ভালোবাসার কবিতায়
মেশে শোনিতের ঘ্রাণ,
বিরহের কথাগুলো আজ
গাইছে বিদ্রোহের গান।

বিশ্বজিৎ মানিক

কবিতাকে দেখেছি

কবিতাকে কখনও দেখেছি, প্রভাত সূর্যের
সোনালি আভা গায়ে মেখে রাজপথ ধরে
বটতলার জমায়েতে নিজেকে বিক্রির অপেক্ষায় প্রহর গুনতে ।
কখনও দেখেছি,সিটি সেন্টারে বা শকুন্তলা রোডে প্রতিবাদ মঞ্চে,
দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে জোরদার সংগ্রাম করতে ।
আবার কখনও দেখেছি,ফুটপাতে শূন্য থালায়
ধ্বনিত ক্ষুধার শব্দে সামিল হতে ।
কবিতাকে কখনও দেখেছি,
রাস্তার মোড়ে,বাসে,ট্রেনে
দু'পায়ে নেকড়ের আঁচরে জীর্ণ শরীরে
বজ্রকন্ঠে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদের শব্দে ।
কখনও দেখেছি,হঠাৎ মৃতপ্রায় শরীর থেকে চুঁইয়ে পড়া
তাজা তাল তাল রক্ত মেখে পড়ে থেকেও হাসতে ।
আবার কখনও দেখেছি,অরূপের মাঝে রূপকে খুঁজে নিয়ে
একটা রাত থেকে আরেকটা দিনের কাছে পৌঁছে যেতে ।
সবশেষে কবিতাকে দেখেছি,সূর্যের আলো
আর মাটির রঙ মিশিয়ে মাটিরঙ দিয়ে
ধব ধবে সাদা কাগজে মাটি ও মানুষের
সাম্য, মৈত্রী, ভালোবাসার কথা বলতে ।

রীতা রায়

লতা-বিতানের রাখীর বাঁধন 

বিতান এ শহরে নতুন। বি.এড পড়ার জন্য এসেছে। সেশন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জেলার বন্যা পরিস্থিতি বিগড়ে যাওয়ায় ক্লাস বন্ধ। নদীর ধারের দরিদ্র বন্যার্থীরা মাথা গুঁজবার ঠাঁই হিসেবে এই সরকারী বি.এড কলেজে আস্তানা গেঁড়েছে। কবে জল নামবে, কবে তারা ফিরবে, কবে ক্লাস শুরু হবে? সেই আশাতেই বিতান আছে। হোস্টেলের সবাই বাড়ি ফিরে গেলেও সে যায়নি। কারণ যাতায়াতের যা ভাড়া তার খরচ যোগানোর মতো অর্থ তার কাছে নেই। মেসের টাকা আগেই চুকিয়ে দেওয়া আছে সুতরাং বাড়ি গিয়ে বাড়তি খরচের বোঝা না বাড়িয়ে বরং কলেজের সমাজসেবা বিভাগের সাথে বন্যার্থীদের বন্যাত্রান, সহযোগিতা ইত্যাদি প্রকল্পে স্থানীয় ছাত্রছাত্রীদের সাথে ব্যস্ত থাকতে ভালো লাগছে। এর মধ্যে অনেকে তার পূর্ব পরিচিত মানে ইউনিভার্সিটির দাদা দিদি বন্ধু এরা। সুতরাং এই শহরে একা থাকলেও অসুবিধা খুব একটা হচ্ছে না।

আজ রাখী পূর্ণিমা। বাড়ি থেকে ছোটবোন ডাকে রাখী পাঠিয়ে দিয়েছে। সেটাকে কোনোরকমে নিজে নিজে হাতে বেঁধে নিয়েছে। কত হই হই করেছে এই দিনটিতে কলেজ ইউনিভার্সিটিতে। সবাই সবার হাতে রাখী পরিয়ে দিয়েছে। আর এবছর একেবারে একা। একটি মুখ বারবার ভেসে আসছে চোখের সামনে । 'মাধবীলতা' মানে লতাদির মুখ। ওর সিনিয়র ব্যাচ, একই ডিপার্টমেন্ট হওয়ার সুবাদে ঘনিষ্ঠতা বেড়েছিল। সেবার রাখীও পরিয়েছিল। নিজের দিদির মতো কত আবদার মেটাতো তার কাছে। চাহিদার অন্ত নেই। এই যেমন এখন খুব ইচ্ছে করছে লতাদির হাত থেকে একটি রাখী পরে। যেমন ভাবা তেমনি কাজ। লতাদি তো এই শহরেই থাকে। বিতান বেরিয়ে পড়লো আর ঠিকানা খুঁজে হাজির হলো সোজা লতা মানে মাধবীলতার বাড়ি।

লতা ওকে দেখে যতটা খুশি হলো, ততটাই বিস্মিত। কিছুটা লজ্জিতও। আজ এই রাখীর দিনে বিতানকে দেখে খুব আনন্দ হচ্ছে, কিন্তু! রাখী সে কাউকে পরায় না কোনোদিন। সেবার ইউনিভার্সিটির হোস্টেলে থাকার সময় সবার সাথে হুজুগে মেতে রাখী পরিয়েছিল জুনিয়র ভাইয়েদের যারা তাকে খুব ভালোবাসতো। আর তখন থেকেই বিতান তার ন্যাওটা হয়ে গেছে। কিন্তু বাড়িতে এভাবে আজকের দিনে মুখোমুখি হবে সেটা ভাবেনি সে কখনো। হাবেভাবে প্রকাশ না করলেও মনে মনে যে অস্থির সেটা বাইরে প্রকাশ না করে মেতে উঠলো খাওয়া-দাওয়া আর গল্পে।

সন্ধ্যেটা বেশ কাটলো। বিতান এবার ফিরবে।  

-- হ্যাঁ, মাঝেমধ্যে চলে আসিস এভাবে।

  -- আচ্ছা আসবো। এসে জ্বালিয়ে যাব।

  -- তোর জ্বালানো আমার ভালোই লাগবে।

দুজনের মধ্যেই একটা অস্বস্তি বিরাজ করছে। লতার বাড়িতে রাখী পরানোর প্রচলন নেই। তারা ভাইফোঁটা দেয় কিন্তু রাখী পরায় না। সুতরাং বাড়িতে একটিও রাখী নেই যে সেটা বিতানকে পরিয়ে দেবে। বিতানের চোখের ভাষা আজ তাকে কাঙাল করে তুলছে। কী ভাবছে ছেলেটা?  মুখেই শুধু ভাই, রাখীর দিনে এসে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছে ছেলেটা। হাতে রাখী নাই বা পরালো, মনে মনে ওর মঙ্গল কামনা ঠিকই করলো সে ।

বিতান নিচে নেমে এসেছে। পেছন পেছন এগিয়ে দিতে এসেছে লতা। গেটের কাছে গিয়ে বিতান হঠাৎ পিছু ফিরলো। লতার দিকে ডান হাত বাড়িয়ে হাতের রাখীটা দেখিয়ে বললো -- লতাদি, রাখীর সূতোটা ঢিলা হয়ে গেছে.. একটু শক্ত করে বেঁধে দাও তো!

লতা চমকে তাকালো বিতানের দিকে। বিতানের চোখে দুষ্টু দুষ্টু হাসি। রাখী পরতে এসে রাখী না পরে সে যাচ্ছে না। সত্যিই উপস্থিত বুদ্ধির তারিফ না করে পারা যায় না। রাখীর সূতো বাঁধতে বাঁধতে মাধবীলতার চোখ ভিজে আসলো। ভালোবাসার অশ্রুধারা সিক্ত করলো আজকের এই অটুট রাখীর বন্ধন। লাঘব হল লতার মনের ভার। বিতানও খুশি খুশি ফিরলো। লতা-বিতানের রাখীর বাঁধন দেখে বিধাতা কী সুখ পেলেন তিনিই জানেন!

জগন্নাথ বনিক

লাঠি 

লাঠি  আমার হাতের সম্বল,
ধরি আমি  শক্ত করে।
লাঠি নিয়েই চলছি আমি,
একটু ধিরে ধিরে।
লোকে আমায় দেখে বলে,
 কিগো দাদা।
লাঠি কেন তোমার হাতে,
ব‍্যথা পেয়েছো কী তোমার পায়ে?

মিতা রায়

মায়া

রান্না ঘরে ঝন্ ঝন্ শব্দে ছুটে আসে শোভন।মাত্র অফিস থেকে ফিরেছে।শব্দে শোভন বুঝে নিলো,মিঠুর হাতেই কাপ-ডিশ কিছু একটা ভেঙেছে। শোভন কিচেনে গিয়ে দেখে,মিঠু দাড়িয়ে কাপঁছে!বাচ্চা মেয়ে প্রায়ই এমন ঘটে থাকে।শোভন,মিঠুর মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বলে,ভয় পাচ্ছিস কেন? কিচ্ছু হবে না।আয় কাছে আয়।....

শোভন বা মালা মিঠুকে কিছুই বলে না। বকা ঝকা তো দূরের ব্যাপার! কাজ করতে গেলে টুকটাক ভাঙবেই। সে'টা তো মালার হ্মেত্রেও হতে পারতো। 

যা,টি ভি দেখ মিঠু।

মালা তিন্নিকে পড়াতে নিয়ে বসেছে। এক ফাঁকে উঠে গিয়ে মিঠুকে সাহস জুগিয়ে এলো। আয় তুই আমার ঘরে এসে বোস।ঠিক যেমন আদর করে মেয়ে তিন্নি কে,সে ভাবেই মিঠুকে আদরে কাছে টেনে নিল মালা।......

শোভন-মালার একমাত্র মেয়ে তিন্নি। তিন্নিকে দেখে রাখা,ওর সঙ্গে খেলা করা,এরজন্যই মিঠু বহাল। তাদের সংসারে তিন্নির সংগেই বেড়ে বেড়ে উঠছে মিঠু।প্রায় দু'বছর হয়ে গেছে মিঠু এ বাড়িতে। মিঠুকে পাওয়া সেও এক মজার ব্যাপার!...... 

শোভনরা তখন উদয়পুর থাকত।পুজোর আগে প্রতিবছরই দৈনিক পেপার,এক্সট্রা বই পত্র ওজন দরে বিক্রি করে শোভন।প্রতিবছরই একজন মধ্যবয়স্ক লোক পুরানো পএিকা, শারদীয়া সংখ্যা ইত্যাদি কিনে নিয়ে যায়।বেশ ভালো জানাশোনা হয়ে গেছে। মালা,মাঝে মধ্যে, চা,সরবত্ করে খেতে দেয়।সেই একই নিয়মে।......

(২)

মালা- শোভন দুজনেই যার যার অফিস, স্কুলে চলে যায়।কয়েকটি বছর কাজের ঠিকে মেয়েটাকে বলে কয়ে টাকা বেশি দিয়ে পাঁচ সাত ঘন্টার জন্য রেখেছিল। এখন সেই মেয়েটি আর কাজে নেই।তার বিয়ে হয়ে গেছে। তো শোভন-মালার মাথায় চিন্তা, কি করে তিন্নি কে একা রেখে যাওয়া!!..... 

দিন দিন তিন্নি বড় হয়ে উঠছে। ওর খেলার সঙ্গী চাই, নয়তো শোভন কিংবা মালাকেই সঙ্গ দিতে হয়। মাঝে মধ্যে ক্লান্ত হয়ে ফিরে দু'জনই।তখন ঠিকঠাক সামাল দিতে কষ্ট হয় তাদের!

তো একদিন শোভন, সেই পএিকাওয়ালাকে বললো,আমাকে একজন মেয়ে বা অল্প বয়সী বউ দিতে পারবে?সারাদিন ঘরে থাকবে। টুকটাক কাজকর্ম করবে, ফাই-ফরমাস খাটবে,আর তিন্নির সংগে খেলাধুলো করবে। শোভন কাকুতি মিনতি করে বলে,একটু দেখো আমার জন্য। লোকটি বললো,হ্যাঁ বাবু,আমার একটি ভাতিঝি আছে। ওই দাদার তিনটিই মেয়ে। তো ভালো বাড়ি পেলে একজনকে খাওয়া - পরায় থাকতে দিয়ে দেবে। লোকটি বললো,ঠিক আছে বাবু,আমি কথা বলে জানাবো।.....

কয়েকদিন পর একদিন  পএিকাওয়ালা,মিঠু ও তার বাবাকে নিয়ে আসে। কথাবার্তা বলে,মিঠুকে রেখে গেল তার বাবা। শোভন তার বাবার হাতে আগাম পাঁচশ টাকা দিল। মিঠুর বাবা,শোভন কে পায়ে ধরে প্রণাম করলো। আর মেয়েকে বলে গেলো,"বাবুদের মন জুগিয়ে চলবি----আর ছোট্ট বোনটির সঙ্গে খেলা করবি"। বাবা চলে যাওয়াতে মিঠুর চোখে  জল গড়িয়ে পরে!.....

মালা কাছে ডেকে নিয়ে বললো,কাঁদিস না,দেখ বোনটা তোর হাত ধরে টানছে.....মিঠু কান্না ভেজা চোখে হাসি দিলো!

(৩)

তিন্নি আর্ট পেপার নিয়ে এসে বললো,"দিদি তুমি একটি ঘর আঁকবে, আর আমি গাছ আকঁবো। মিঠু ঠিকঠাক একটি গ্রাম্য পরিবেশের ঘর আঁকলো, তিন্নি জিজ্ঞেস করলো, কার ঘর এটি? মিঠু বললো,"আমাদের ঘর"!মা,বাবা,দিদি থাকে এখন। আর আমি তো তোমাদের ঘরেই থাকি।.....তিন্নি বললো,হ্যাঁ, তুমি কিন্তু এখন থেকে এখানেই থাকবে।তোমাদের বাড়ি যাবে না। আমার সঙ্গে খেলবে,পড়বে কেমন? মিঠু খুশিতে মাথা নারে.....

মালা, শোভন  কতহ্মনই বা সঙ্গ দিতে পারে মেয়েকে বাবা-মা হিসেবে! রবিবার ছুটি  হলেও ব্যাস্ততা সে দিন আরও বেশি। সভা-সমিতি, মিটিং এই সব করতে করতে কখন যে দিন রাত চলে আসে বুঝতেই পারে না দু'জন। যদিও বিকেলে তিন্নি ও মিঠুকে নিয়ে 

প্রতি সপ্তাহেই পার্কে নিয়ে যায়।দু'জনই বেশ আনন্দে,হৈ হৈ রৈ রৈ,করতে করতে বাড়ি ফেরে। এই আনন্দের পরিবেশটা দেখার জন্য মালা, শোভন কতই না দিন গুনেছিল।বেশ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মালা।.....

আজকাল রাতেও তিন্নি মিঠুর সঙ্গে গল্প করতে করতে ঘুমাতে চায়।মিঠুও ভূতের গল্প,রাহ্মসের গল্প বলে বলে তিন্নিকে ঘুম পাড়ায়। পাশের ঘর থেকে শোভন শুনতে পায়,তিন্নি ঘুম জড়ানো গলায় জিজ্ঞেস করছে,বলো না মিঠুদি,তারপর, তারপর কি।হলো?......

এমন করে দিনগুলো বেশ ভালোই কাটছিল। বেশ কিছুদিন পর মিঠুর বাবা ফোন করে বলে,মিঠুর মা'র শরীর ভালো নেই। মিঠুকে কয়েকদিনের জন্য বাড়ি আনতে চাই। শোভন শুনে বলে,আচ্ছা ঠিক আছে। আপনি আসুন,মিঠুকে কয়েকদিনের জন্য নিয়ে যান।ফোনের কথাটা মিঠুকে বলতে ভুলে যায় শোভন। কিন্তু মালাকে জানিয়ে শোভন অফিস চলে যায়।

অফিস গিয়ে শোভন ভাবে, মিঠু চলে গেলে তো তিন্নি একা হয়ে যাবে!কি ভাবে তিন্নি থাকবে! মালাকে ছুটি নিতে হবে।প্ল্যানটা মাথায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই ভেবে নেয়.....না,মিঠুকে বাড়িতে দেওয়া যাবে না!

ফোন করার চারদিন পর মিঠুর বাবা আসে বিকেলের দিকে।অফিস ফেরত শোভন এসে দেখে মিঠু কান্না করছে। মালাও সেই সময়ে বাড়ি ফিরে আসে। ফ্রেশ হয়ে মালা, দু'জনের জন্য চা করে আনে। চা খাওয়ার পর মিঠুর বাবা বলে-আজ মিঠুকে নিয়ে যাবো, ওর মা হাসপাতালে ভর্তি আছে.......শোভন উত্তরে বলে-থাক না কয়েকটি দিন।সামনেই পুজো পুজোর পর না হয় যাবে.....নিয়ে যান,মাকে দেখিয়ে আবার দিয়ে যাবেন..... যদি আপনার অমত না থাকে।ওর মার খবরাখবর আমি ফোন করে জেনে নেবো।মিঠু কথা বলবে না হয় মাঝে মধ্যে ওর মা'র সঙ্গে।

(৪)

মিঠুর বাবা চলে যাওয়ার পর,শোভনের একটা চাপা কষ্ট হচ্ছে বুকে!মিঠুর বাবার আকুতি শোভনকে দগ্ধ করছে! মিঠুর মা'র যদি অঘটন কিছু ঘটে যায়!

শোভনের মাথা ঝিম্ ঝিম্ করছে। নিজের প্রতি ধিক্কার আসছে!....নাহ্ কাজটা ঠিক হয় নি!অমানবিকতার পরিচয় প্রকাশ পেলো। শোভনের তাই মনে হচ্ছিল!..... শোভন ভাবছে,

নাহ্ কাল আমি নিজে গিয়েই মিঠুকে তার বাড়ি দিয়ে আসবো। ভাবতে ভাবতে পাশের ঘরে এলো, এসে দেখে  তিন্নিকে জড়িয়ে, হাতে একটি তিন্নির বই নিয়ে ঘুমিয়ে গেছে মিঠু!......শোভনের মায়া হলো!

তিন্নিকে যদি, এ ভাবে অন্যের বাড়ি রেখে দিয়ে চলে আসতে হতো,তো আমার বুকটা ফেটে চৌচির হয়ে যেতো!.....

অজানা আশংকায় মন কেঁপে উঠল শোভনের!.....

মালাকে কাছে ডেকে নিয়ে বললো, কাল আমিই মিঠুকে ওর বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসবো।ওর বাবাকে বলে আসবো,কিছুদিন বাদে মা সুস্থ হলে ফের আমাদের কাছে দিয়ে যেতে! 

মালা বললো,তাই করো তবে!

(৫)

শোভন আর মালা মায়া ভরা চোখে দেখছে, মিঠু নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। মিঠুর প্রতি মায়া জন্মে গেছে..... 

ঠিক তিন্নিরই মতো.....

কখনও শোভন দগ্ধ হচ্ছে, নিজেদের স্বার্থে  মিঠুকে কি শিশুশ্রমিক বানিয়ে নিচ্ছি??......

খুকুরানী দে

দাবদাহ 

ধোঁয়াশা বয়ে ঘনীভূত হয়ে মেঘ জমে 
ঈশানের কোনে পড়ন্ত বেলায়,
আদ্রতা বেড়ে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি ঝরে
এক সময় ভোর হয়ে যায়।

অপ্রতিরোধ্য ধ্বংসের মুখ হতে 
অসম্পৃক্ত আপেক্ষিকতায় ফিরে আসা 
কালো মেঘ আমি
গোধূলির বুকে দমকা হাওয়া
চাই এক পশলা বৃষ্টি হয়ে ধুলি বয়ে যাক।
হৃদয় কে বাঁচিয়ে রাখার হয়ত মিথ্যে প্রয়াস।

আবহাওয়া মাঝে মধ্যে দমকা বাতাস  যায় বয়ে
তবে সে বাতাসও এত গরম থাকে
প্রশান্তির বদলে অস্বস্তি আসে লয়ে।
ঘাম ও বের হয় না শরীর থেকে।

বিজ্ঞান বলে দাবদাহে খাপ খেতে হলে
বেশি বেশি পানি ও করতে হবে পান
নিয়মের মতো নিয়ম করে করতে হবে স্নান 
অবহেলায় শ্বাস নিতে হবে কষ্ট,
তা থেকে মিলবে না পরিত্রাণ।