Aug 31, 2023

রীতা রায়

লতা-বিতানের রাখীর বাঁধন 

বিতান এ শহরে নতুন। বি.এড পড়ার জন্য এসেছে। সেশন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জেলার বন্যা পরিস্থিতি বিগড়ে যাওয়ায় ক্লাস বন্ধ। নদীর ধারের দরিদ্র বন্যার্থীরা মাথা গুঁজবার ঠাঁই হিসেবে এই সরকারী বি.এড কলেজে আস্তানা গেঁড়েছে। কবে জল নামবে, কবে তারা ফিরবে, কবে ক্লাস শুরু হবে? সেই আশাতেই বিতান আছে। হোস্টেলের সবাই বাড়ি ফিরে গেলেও সে যায়নি। কারণ যাতায়াতের যা ভাড়া তার খরচ যোগানোর মতো অর্থ তার কাছে নেই। মেসের টাকা আগেই চুকিয়ে দেওয়া আছে সুতরাং বাড়ি গিয়ে বাড়তি খরচের বোঝা না বাড়িয়ে বরং কলেজের সমাজসেবা বিভাগের সাথে বন্যার্থীদের বন্যাত্রান, সহযোগিতা ইত্যাদি প্রকল্পে স্থানীয় ছাত্রছাত্রীদের সাথে ব্যস্ত থাকতে ভালো লাগছে। এর মধ্যে অনেকে তার পূর্ব পরিচিত মানে ইউনিভার্সিটির দাদা দিদি বন্ধু এরা। সুতরাং এই শহরে একা থাকলেও অসুবিধা খুব একটা হচ্ছে না।

আজ রাখী পূর্ণিমা। বাড়ি থেকে ছোটবোন ডাকে রাখী পাঠিয়ে দিয়েছে। সেটাকে কোনোরকমে নিজে নিজে হাতে বেঁধে নিয়েছে। কত হই হই করেছে এই দিনটিতে কলেজ ইউনিভার্সিটিতে। সবাই সবার হাতে রাখী পরিয়ে দিয়েছে। আর এবছর একেবারে একা। একটি মুখ বারবার ভেসে আসছে চোখের সামনে । 'মাধবীলতা' মানে লতাদির মুখ। ওর সিনিয়র ব্যাচ, একই ডিপার্টমেন্ট হওয়ার সুবাদে ঘনিষ্ঠতা বেড়েছিল। সেবার রাখীও পরিয়েছিল। নিজের দিদির মতো কত আবদার মেটাতো তার কাছে। চাহিদার অন্ত নেই। এই যেমন এখন খুব ইচ্ছে করছে লতাদির হাত থেকে একটি রাখী পরে। যেমন ভাবা তেমনি কাজ। লতাদি তো এই শহরেই থাকে। বিতান বেরিয়ে পড়লো আর ঠিকানা খুঁজে হাজির হলো সোজা লতা মানে মাধবীলতার বাড়ি।

লতা ওকে দেখে যতটা খুশি হলো, ততটাই বিস্মিত। কিছুটা লজ্জিতও। আজ এই রাখীর দিনে বিতানকে দেখে খুব আনন্দ হচ্ছে, কিন্তু! রাখী সে কাউকে পরায় না কোনোদিন। সেবার ইউনিভার্সিটির হোস্টেলে থাকার সময় সবার সাথে হুজুগে মেতে রাখী পরিয়েছিল জুনিয়র ভাইয়েদের যারা তাকে খুব ভালোবাসতো। আর তখন থেকেই বিতান তার ন্যাওটা হয়ে গেছে। কিন্তু বাড়িতে এভাবে আজকের দিনে মুখোমুখি হবে সেটা ভাবেনি সে কখনো। হাবেভাবে প্রকাশ না করলেও মনে মনে যে অস্থির সেটা বাইরে প্রকাশ না করে মেতে উঠলো খাওয়া-দাওয়া আর গল্পে।

সন্ধ্যেটা বেশ কাটলো। বিতান এবার ফিরবে।  

-- হ্যাঁ, মাঝেমধ্যে চলে আসিস এভাবে।

  -- আচ্ছা আসবো। এসে জ্বালিয়ে যাব।

  -- তোর জ্বালানো আমার ভালোই লাগবে।

দুজনের মধ্যেই একটা অস্বস্তি বিরাজ করছে। লতার বাড়িতে রাখী পরানোর প্রচলন নেই। তারা ভাইফোঁটা দেয় কিন্তু রাখী পরায় না। সুতরাং বাড়িতে একটিও রাখী নেই যে সেটা বিতানকে পরিয়ে দেবে। বিতানের চোখের ভাষা আজ তাকে কাঙাল করে তুলছে। কী ভাবছে ছেলেটা?  মুখেই শুধু ভাই, রাখীর দিনে এসে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছে ছেলেটা। হাতে রাখী নাই বা পরালো, মনে মনে ওর মঙ্গল কামনা ঠিকই করলো সে ।

বিতান নিচে নেমে এসেছে। পেছন পেছন এগিয়ে দিতে এসেছে লতা। গেটের কাছে গিয়ে বিতান হঠাৎ পিছু ফিরলো। লতার দিকে ডান হাত বাড়িয়ে হাতের রাখীটা দেখিয়ে বললো -- লতাদি, রাখীর সূতোটা ঢিলা হয়ে গেছে.. একটু শক্ত করে বেঁধে দাও তো!

লতা চমকে তাকালো বিতানের দিকে। বিতানের চোখে দুষ্টু দুষ্টু হাসি। রাখী পরতে এসে রাখী না পরে সে যাচ্ছে না। সত্যিই উপস্থিত বুদ্ধির তারিফ না করে পারা যায় না। রাখীর সূতো বাঁধতে বাঁধতে মাধবীলতার চোখ ভিজে আসলো। ভালোবাসার অশ্রুধারা সিক্ত করলো আজকের এই অটুট রাখীর বন্ধন। লাঘব হল লতার মনের ভার। বিতানও খুশি খুশি ফিরলো। লতা-বিতানের রাখীর বাঁধন দেখে বিধাতা কী সুখ পেলেন তিনিই জানেন!