Mar 29, 2022

অপাংশু দেবনাথ

ক্লোজআপ ছবি

আমাদের কোনো ক্লোজআপ ছবি হয় না আলোকিত মঞ্চে,
মাটির কাছাকাছি থাকা অতি সাধারণ মানুষ। 
স্ক্রিনজুড়ে আপনারা হেসে উঠবেন বলেই আমরা কাজের মানুষ, 
রোদে, ঝড়ে, বৃষ্টিতে কিংবা ধুলোয় মুসকিল আসান করি।
জানতেও পারেন না আপনাদের হাসির আড়ালে আমাদের ঘর্ম ও অশ্রু ঝরে পড়ে।

আপনাদের ক্লোজআপ ছবির ঠিক নীচেই আমাদের ছবি,
পৃথিবী তার অনন্ত বুকে ফ্রেমবন্দী করে রেখেছে আবহমানকাল।

সৌমিত বসু

চাইনি কখনো চাইনি 

সকালের বুকে মুখ গুঁজে শুয়ে রয়েছে নিরপরাধ বিকেলে ।
নিরপরাধ এই কারণেই ,কোনো চাহিদা নেই। মেঘনির্ভর জীবনে বিকেল যে আসতেই হবে তেমন কোন নিশ্চয়তাও নেই ।
আসলে প্রদীপ হ'য়ে জন্মে নক্ষত্র হ'তে চাওয়া কিছু প্রাণ
আজও আমাদের চোখে জল আনে।

তাহলে কি যেখানে আছি শুয়ে থাকবো সারাটা জীবন?
নাকি নিজেকে ছাপিয়ে বেড়ে ওঠা কার্নিশে
ফুটে থাকবো কাগজফুল হয়ে?
রোদ যেখানে এসে মেরে যায় হালকা ছোবল প্রতিবেশী ভঙ্গিমায় ; 
নাকি ওপরের দিকে তাকিয়ে চশমা পরার ভঙ্গিতে 
আকাশের গায় ঝুলে থাকা তারাদুটোকে ডেকে এনে চোখে পুরে নেবো
আর সমস্ত জীবন উত্তল লেন্স হয়ে ঘুরে বেড়াবে সামনে-পেছনে
কেউ না কেউ আমাদের ডেকে বলবেই ভালোবাসা ভরা মুঠো কখনো খুলো না।

কথা যখন উঠলো তখন ভালোবাসার গায়ে বসে থাকা প্রজাপতিগুলোকে 
হাত বাড়িয়ে ডেকে নিই ?
যে ফ্যাকাসে দিনগুলো এতকাল মাড়িয়ে এসেছি একটা প্রদীপ নিয়ে খুঁজে দেখি কোন মায়া লেগে আছে কিনা,সবাইকে অবাক করে 
ওপরে উঠতে চেয়ে যে সিঁড়িটি মেয়ে আমার আলগোছে হারিয়ে ফেলেছে
আজ তা খুঁজে এনে তুলে রাখি প্রাচীন বারকোশে।

তমা বর্মণ

উড়াল 

তোমার বুকে দুঃখ নেই কি পাখি? শুধু সুখ!
যদি এ আকাশ হতে পারতাম, পালকে অক্লান্ত ভুবনে ওড়াওড়ি 
দুঃখ থাকত না আমার, বেদনা উড়িয়ে প্রণয়ে নির্ভয়
সব আষাঢ় খুলে দিতাম 
শেষপাতার মতন চেয়ে যেতাম রৌদ্রের হরিদ্রা 
দিনবদলের জীবন, পাখি তোমার জীবন যেমন অনন্তে!    
ভয় নেই, আগুনের হিংসার ধ্বংসের মানুষের ভয় আছে 
শোক আছে মনখারাপ আছে 
কণ্ঠ জুড়ে ডাকলে শূন্য মুখ বাতাস হয়ে কেবল ফিরে আসে
মুখ আর মানুষ জেব্রার চকরাবকরা!
আমলকী বনে রাখা পিরিতি জ্বালিয়ে ভিটেমাটি অঙ্গার
পাখি, মুকুলের গায়ে আগুনের পরাগ
তোমার ভালোবাসা যেমন রেণুতে রেণুতে
যদি হত মানুষ ঢল বেয়ে আগুন হত জোছনার জল! 
মানুষ এখন সেঁকোবিষ তিনপুরুষ দলদাস 
দানা ফেলে বিশ্বাসে তুমিও বুঝি বোকা হলে!
আকাশ বনানী অনার্য হাতে সরাইখানায় ঝলসে খায় 
পূর্ণিমার যৌনচাঁদ, পাখির মাংসে! 
ঋতুফুলে বদলে যদি যেত সব 
পাখি, বদলে যদি যেত সব!
ছিনিমিনি খেলা উঠে যেত নীড়পাতার ঘরে
কুয়াশা ভেলার মতন উড়ে তোমার সঙ্গে আকাশের সঙ্গে 
আত্মীয় হলে খুলে যায় মানুষের অনাত্মীয়তা 
বন্ধ জানালার শিক, এসো 
এবার অন্তত ডানার ঈশ্বরে আমরা মুক্ত হই।

চন্দন পাল

আলোর চিঠি 

ঐ যে আলো ফুটলো, এ আর নতুন কী!
উষাকালে আসে,  গোধূলিতে  যায়। 
পথে, ফুল ফুটাক, পাখি জাগাক, অক্ষর চেনাক, মেঘ, চাঁদ কিবা বড়দিন বানাক।
তোমার কী?  
আমারই বা  কী?
আমরা এই ভেবে খুশি থাকি যে, অন্ধকারের রাজত্বি হলে,
তোমার যা,  আমারও তা। 
তাই বোধ হয়, বিবেক আনন্দের ধার ধারি না !

তৌফিক জহুর

তিনি 

সন্তর্পণে এগিয়ে যাই সেই মাঠে
যেখানে একদিন সাড়ে সাতকোটি জীবন
সকলেই দাঁড়িয়ে থাকে নতুন সূর্যের আশায় 
নতুন একটা ভোরের খিড়কি খুলে দিলেন তিনি,
রঙতুলি দিয়ে আঁকা একটা জমিন দেখলো সবাই 

তিনি আমাদের রঙধনু চেনালেন
স্বপ্নের ঘোমটা খুলে দিয়ে তিনি দেখালেন
একটা মুক্ত আকাশ যেখানে অলৌকিক তুলির পরশ

আমরা জলে- জঙ্গলে কাদায় ডুবে 
তাঁর যাদুতে জেগে উঠি পরাধীনতার শেকল ছিঁড়ে 

আমরা মুক্ত বাতাসে উড়িয়ে দেই আমাদের লাল-সবুজ 
পদাতিক হয়ে লেফটরাইট করি
অভিবাদন জানাই তাঁকে 
আমরা তাঁর শেখানো বুলি আওড়াই
" দাবায়া রাখতে পারবানা"......

তাঁর আঁকা মেঠো পথে আমরা ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনি।

সুমনা রায়

বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধু, তুমি নেই তবু তুমি আছো 
সাত কোটি মানুষের চোখে 
তুমিই এঁকেছো মুক্তির স্বপ্ন 
তোমারই প্রত্যয়ে লক্ষ জনতা 
বেরিয়ে এসেছে নির্ভিক বলিদানে
তাই তো এক মুজিবুরের থেকে 
লক্ষ মুজিবুরের কণ্ঠে ধ্বনিত 
স্বাধীনতার গান
বাহান্ন থেকে একাত্তর তুমি ঝরালে রক্ত 
বিদ্রোহ আর বিপ্লবে 
আজও জেগে আছে সোহরাওয়ার্দী 
বারবার প্ৰতিধ্বনিত সাতই  মার্চ  

তুমি ছিলে তুমি আছো 
নিঃস্ব প্রাণের দ্বিধাহীন আশ্রয় 
তুমি আছো পাল তোলা নৌকায় 
তুমি আছো তুফানী হিল্লোলে 
তুমি আছো ফলন্ত শস্যের মাঠে 
আছো আমাদের হৃদমাঝারে 
রাত যখন ঘুমায় হ্যামিলনের বাঁশিতে 
অতন্দ্র জেগে থাকে টুঙ্গিপাড়া 
জেগে থাকে বত্রিশ নম্বর 

তুমি নেই তবু তুমি আছো 
তুমি আছো লাল সবুজ পতাকার মাঝে 
বাংলার স্বাধীনতা, এতো তোমারই দান 
বাংলাদেশের আরেক নাম 
শেখ মুজিবুর রহমান

সুতপা রায়

বঙ্গবন্ধু 

বাংলাকে যারা ভালোবাসে তারা বাংলার বন্ধু 
ভালোবাসা মানে সুসময়ে এসে পাশে থাকা নয় শুধু 
ভালোবাসা মানে ক্ষয়ে যাওয়া দেখে নয় নীরব অশ্রুপাত 
ভালোবাসা মানে রক্ষা করার দৃঢ় প্রত্যয়ে বাড়িয়ে দেওয়া হাত

বাংলা পূর্ব বাংলা পশ্চিম আসাম ত্রিপুরা এবং বিশ্ব জুড়ে
বাংলা নিয়ে বলতে গেলেই বাঙালী এসে পড়ে
নিজেকে না বেসে ভালো কী করে বুঝবো অন্যকে ভালো বাসতে হয়
একথাটা তিনি বুঝিয়েছিলেন, বাঙালী নেহাৎ-ই তুচ্ছ নয়

রক্তে দৃপ্ত চেতনা জাগানো ভাষণ, কর্ম, শ্রম দিয়ে
হায়, বাংলা বাঁচাতে তেরোটি বছর কারাবাসে গেল হারিয়ে
সংগ্রাম তবু থেমে যায় নি
মুক্তদেশের স্বপ্ন মরে নি 

এত জোর তিনি কোথায় যে পান জানে অন্তর্যামী 
সাতই মার্চের বক্তৃতা শুনে শিউরে উঠেছি আমরা ও আমি
মহান মানুষ এ বাংলা বিশ্বে, গাই তাঁর জয়গান
'জয়বাংলা' শ্লোগান তোলেন শেখ মুজিবুর রহমান
 
'মনুষ্যত্বে' নিশ্চয় তাঁর প্রথম পরিচয়
রাজাকারদের এ শব্দটি একটুও চেনা নয়
একটি চেতনার নাম বঙ্গবন্ধু, তাঁকে হাজার সেলাম
তাঁরজন্যে যুদ্ধ শেষে প্রিয় বাংলাদেশটা পেলাম

দিলীপ বসু

বঙ্গবন্ধুকে চিঠি

বঙ্গবন্ধু তোমাকে আজ আমার বড়ো দরকার
টুঙ্গিপাড়ার কবরথেকে আরেকবার 
উঠে দাঁড়াও,
আকাশেরদিকে দুহাত তুলে বলো,
বাংলাদেশী নয় বাঙালি জাতি সত্তাই
আমার আকর।
আরেকবার তোমাকে দরকার বন্ধু,আরেকবার
সূর্যের ধমনী ঘিরে আছে মওসুমি পঙ্গপাল
গুলিস্তানের  সেই বাড়িটায়
তোমার কুর্শিতে বাসাবেঁধেছে তিনটে
ছারপোকা
আরেকবার তোমাকে দরকার
জলৌকায় ভরে গেছে নীল যমুনা

আমাকে একটু চুনদাও, তোমার কোটের
জেব থেকে মোতিহারি তামাকভর্তি
একটা দেহাতি চুরুট।
 
নয়নাভিরাম নীলে আজ ভিন্ন প্রতিক্রিয়া,
জান্নাত থেকে তুমিকি  হলুদের  আস্ফালন
দেখতে পাচ্ছনা?
পিঁপড়ের ডিমগুলো টেনে নিয়ে যাচ্ছে মড়াপিঁপড়ে।

মনস্তাপেও  ফুটবেনা আর ফাটা ডিম
আকাশ-পৃথিবী-নক্ষত্র অনন্ত গ্রহরাজি  
তোমার দিকে তাকিয়ে আছে,বাঙালির  মাথারউপর চিল না আবাবিল,  উড়ছে ভ্যাম্পায়ার
তুমি আরেকবার উঠে দাঁড়াও
এই অজল প্লাবনে বাঙালির 
তোমাকে বড়ো দরকার।

তোমার অঙ্গুলিহেলনে জেগে উঠেছিল
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া,
আকাশের সূর্য মুখ লুকিয়েছিল গন্ধমাদনের আড়ালে,  জিব্রাইলের ডানা ছড়িয়েছিল পুষ্পবৃষ্টি
কাফের বলে যারা তোমাকে অভিসম্পাত দিয়েছিল
আজ তারা হাবিয়াদোজখে বসে মুজিবকীর্তন গায়,

তুমি আরেকবার উঠে দাঁড়াও বঙ্গবন্ধু 
তর্জনী উঁচিয়ে বলো, যথার্থ কোনওদিন সত্য হয়না
নিমকহারামের রক্তবীজ থেকে
ভূমিষ্ঠ হয় লক্ষকোটি নিমকহারাম।
এমন বুলেট কোথায় আছে যে তোমার রক্ত
শুষে খায়,এমন ট্রিগার কোথায় আছে যে তোমার
 অব্যর্থ নিশানায় নাম লেখে বাংলাদেশ বাংলাদেশ।

নিমাই বারুই

মানুষ মানুষের জন্যে

সময় বড় রহস্যময়।সময় অদ্ভূত রকমের বাস্তব এবং কঠিন।আর এমনই এক অদ্ভুত সময়ে দাঁড়িয়ে বর্তমান বিশ্বের মানব জাতি। চারিদিকে কেবল সংকট আর সংকট।মানব জাতির জীবন, জীবিকা, সামাজিক, অর্থনৈতিক, মানবিক মূল্যবোধ সর্বত্র এক অদ্ভুত সংকটে বিরাজমান।আর এই সংকট থেকে উত্তরণের সঠিক কোন দিশা এখনো মানব জাতির কাছে অধরা। মানুষ আজ দিশেহারা। তবে আশার কথা হলো যে একশ্রেণীর মহামানবেরা রাত দিন এক করে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, পৃথিবীর মানব জাতি কে মহাসংকট থেকে বাঁচাতে। যদিও এরই মধ্যে বিশাল ক্ষতি হয়ে গেছে এবং এখনো হচ্ছে।

শুরুতেই সবাই নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন যে আমি এখানে করোনা বিষয়ক সংকটের কথাই বলতে চাইছি।এই অদ্ভুত পরিস্থিতি কেন কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে তা অবশ্য আমার আলোচ্য বিষয় নয়। আমরা দেখছি এই পরিস্থিতিতে মানব নামক জাতির চরিত্রের বিচিত্র রূপের বহিঃপ্রকাশ এবং পরিচিতির।এই প্রসঙ্গে বিখ্যাত একটি গানের কলি মনে পড়ে যায় " মানুষ মানুষের জন্য--"।

সু- সভ্য মানব জাতির সমাজে এটাই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তব টা কী দেখছি! মানব জাতির চরম সংকট কে কাজে লাগিয়ে মানুষ মানুষকে নির্মম ভাবে শোষণ করছে,নির্যাতন করছে,নির্দয় ভাবে শাসন করছে। মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের সম্পদের পরিমাণ এভারেস্ট এর চূড়া স্পর্শ করতে চাইছে। অন্যদিকে লক্ষ্য কোটি মানুষ সব হারিয়ে মৃত্যুর মিছিল কে দীর্ঘায়িত করছে।

আবার এটাও দেখছি অসহায় বিপদাপন্ন মানুষদের সাহার্যার্থে কিছু মানুষই আবার এগিয়ে এসেছে। কিন্তু তাদের মধ্যে ও ভাবনার অনেক রকমের রকম ফের রয়েছে। দশ জন দাতা মিলে একজন অসহায় মানুষ কে একটা পাউরুটি দিয়ে সোস্যাল মিডিয়াতে ছবি পোস্ট করতে দেখি। আবার এও দেখি কেউ কেউ নিজের সর্বস্ব দান করে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে।কী বিচিত্র এই মানব জাতি!

সাহিত্য সংস্কৃতি এবং সেবামূলক কাজের সঙ্গে জড়িত থাকার দৌলতে , মানুষ এবং মানব সমাজের বিচিত্র সব রূপ এবং চরিত্রের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ আমার হয়েছে।আর এই দৌলতেই আজ কলম হাতে নিলাম। ইদানিং কালে সমাজে ' বিশিষ্ট সমাজসেবী' নামে একটি শব্দের বেশ প্রচলন ঘটেছে। কোন ব্যাক্তির  নামের আগে বিশেষণ হিসেবে প্রায়সই এর প্রয়োগ হচ্ছে।আর এতে এই বিশেষণ শব্দটির যেমন অবমাননা করা হচ্ছে তেমনি এর প্রতি একটা আতঙ্ক ও ছড়াচ্ছে। আমার এই কথার পেছনে দুটো উদাহরণ দিচ্ছি, তাহলেই ব্যাপারটা পরিস্কার হয়ে যাবে। আমাদের অতি আপন কয়েকজন সমাজসেবী মহামানবের নাম এই প্রসঙ্গে আসতেই পারে।যেমন স্বামী বিবেকানন্দ,রাজা রামমোহন রায়,ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর ,মাদার টেরেসা প্রমূখ ‌। এমন বিশিষ্ট সমাজসেবী  বা সমাজ সংস্কারক পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন মানব সমাজে আবির্ভূত হয়েছেন একাধিক সময়ে। আর ঐ মহান সমাজসেবী মহামানবেরা ,মানব জাতির জন্য যে সেবামূলক কাজ করে গেছেন,তার দৌলতেই আমরা আজ সুসভ্য মানব জাতি।

আমি জানিনা তাঁদের নামের আগে যে বিশেষণ টি ব্যবহার করা হয়ে আসছে, সেই বিশেষণ টি এখনকার সময়ে কার বা কাদের নামের আগে ব্যবহার করা যায় বা আদৌ যায় কিনা ! কিন্তু অহড়হ তা করা হচ্ছে।এ ব্যাপারে বিদ্ব্যজন দের প্রতি আহ্বান রইলো এই ব্যাপার টা আপনারা একটু ভেবে দেখবেন। তবে হাঁ পাশাপাশি আরো একটি শব্দ বা বিশেষণ নিয়ে ভাবা যেতে পারে,সেটি হচ্ছে সমাজ কর্মী।যারা সমাজের জন্য কাজ করছেন তাঁদের কে সমাজ কর্মী বলা যেতেই পারে।কেউ ব্যক্তি স্বার্থে সমাজের জন্য করেন, আবার কেউ বা বৃহৎ স্বার্থে সমাজের জন্য কাজ করেন।

এই দুটো ক্ষেত্রে আমরা একটি করে উদাহরণ দিয়ে বলতে পারি যেমন, একজন কৃষক যখন মাঠে কৃষি কাজ করে ফসল ফলান উনি কিন্তু তখন সমাজের কথা ভাবেন না। নিজের পরিবারের সার্বিক সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভেবেই উনি জমিতে ফসল ফলান। কিন্তু আমরা দেখি কী ! যে কৃষকের উৎপাদিত ফসল থেকেই সমাজের অন্যান্য অংশের মানুষরা সরাসরি উপকৃত হচ্ছেন। সুতরাং এই দিক দিয়ে কৃষক সমাজ মানব জাতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবক সমাজ। কারণ কৃষি বা কৃষিজ ফসল উৎপাদন না হলে মানব জাতির অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে যাবে।এটা একটা উদাহরণ দিলাম।এমন অসংখ্য উদাহরণ আমাদের সমাজে বিদ্যমান। বিদ্যা দান কারি একজন শিক্ষক থেকে শুরু করে একজন সফাই কর্মী সবাই সমাজের কাজ করছেন।

আবার দ্বিতীয় ক্ষেত্রে আমরা উদাহরণ হিসেবে যদি বলি,জনগন বা দেশ সেবার নাম করে যারা রাজনীতি বা দেশের শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করতে আসছেন তাঁরা ও কিন্তু নিঃস্বার্থ ভাবে কিছু করছেন না।কেন না বিধানসভা বা লোকসভা নির্বাচনে নির্বাচিত সমাজ সেবা করতে আসা প্রতিনিধি রা ও কিন্তু অন্যান্য সরকারী কর্মীদের মতো মাসিক বেতন বা ভাতা নিচ্ছেন। শুধু তাই নয় পরবর্তী সময়ে অবসর কালীন ভাতা ও পান।সেই সঙ্গে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি রা অন্যান্য অনেক রকমের রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও পেয়ে থাকেন। অবশ্য বলা যেতেই পারে যে উনারা জনগণ তথা রাষ্ট্রের জন্য অনেক কিছু করতে এসেছেন যখন তখন বিনিময়ে কিছু পেতেই পারেন।

তাহলে উনাদের কীভাবে আমরা সমাজসেবী বলে মেনে নেবো ! কই প্রভু যীশু, ভগবান বুদ্ধ কিংবা মহাপ্রভু চৈতন্য দেব মানব সেবার বিনিময়ে কারো কাছ থেকে  কিছু নিয়েছেন বলে তো শুনিনি ! 

প্রসঙ্গত আসতেই পারে যে তথাকথিত ধর্মীয় গুরু বা পূজারীরা ও তো মানবের কল্যাণে নিবেদিত প্রাণ। তাহলে তাঁরা সমাজসেবী কি না ! যুক্তির বিচারে উনারা ও মানব সেবী বা সমাজ সেবী হতে পারেন নি। কেননা তথাকথিত ধর্মীয় গুরুরা ও কিন্তু শিষ্য দের দীক্ষা দেওয়ার বিনিময়ে দক্ষীণা বা প্রণামী নিচ্ছেন।আর মন্দিরের বা বাড়িঘর কিংবা বারোয়ারী ঠাকুর পূজার পূজারীরা তো পেশাদারী। শিক্ষকের শিক্ষা মানব জীবনে বা সমাজ কল্যাণে অপরিহার্য্য নিঃসন্দেহে। কিন্তু তথাকথিত ধর্মীয় গুরুর দের দীক্ষা বা মন্দির মসজিদ বা গির্জার পূজা প্রার্থনা মানব জীবনে কতটা জরুরি ! ভাববার বিষয় নিঃসন্দেহে, কেননা যুগ যুগ ধরে ধর্ম আর পূজা কে উপলক্ষ করে মানুষে মানুষে অসংখ্য রক্ত ক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটে গেছে।আজ ও তার ব্যতিক্রম কিছু নয়।

তবে নিশ্চিত ভাবেই এটা বলা যায় যে সমাজ সেবা বা মানব সেবা মানবের একটি পরম ধর্ম। কারণ যুগ যুগ ধরে আমরা জেনে আসছি যে " শুন হে মানুষ ভাই / সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই " । আমরা এটা ও জেনে আসছি যে " বহু রূপে সন্মুখে ছাড়ি কুথা খুঁজিছ ঈশ্বর / জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর ।"

সত্যিই তো, ঈশ্বর নামে কেউ আছেন কী নেই এই বিতর্কে না গিয়ে, ঈশ্বরের সৃষ্টি শ্রেষ্ঠ জীব মানুষের সেবাই হোকনা আমাদের পরম ব্রত! বর্তমান অদ্ভুত সংকট ময় সময়ে আমরা তো জীবন দিয়ে উপলদ্ধি করলাম, যে মন্দির মসজিদ বা গির্জা তে সর্বশক্তিমান বলে কেউ নেই! সভ্যতার চরম সংকটের সময়ে অসহায় মানুষের পাশে কেউ দাঁড়ায় নি। উপরন্তু বিপদ গ্রস্থ মানুষের জন্য প্রত্যেকের দ্বার ছিল বন্ধ। সুতরাং ঘুরেফিরে আবার সেই মহান সঙ্গীত শিল্পীর কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে বলতেই হচ্ছে " মানুষ মানুষের জন্যে---"

খোকন সাহা

হয় বসন্ত, নয় তালাক

বাঁকা চাঁদ যখন   বেনু বনে ছুটে পালায় ,
বুড়ো বাপ'টারে বলি , তোর লতানো মেয়ে
পাতানো গাছের আড়ালে , লাল পেড়ে শাড়ী পড়ে নামে
আমাদের মৌচাক বনে ।

তেষ্টা তূরুপ তালিয়া বসন্তে,  'ফুল ফুটুক, না ফুটুক'  ;
বুকের আগুনে পুড়ে যায় , রাতকানা কথার নূপুর।
প্রাণের প্রণয় প্রাণেই মরে , তবু এক গেলাস জল তেষ্টা মাপে ।

শুনেছি বুড়ো ,  তুই সোজা কথার বাঁকা মানুষ !
সর্ষক্ষেতে পেতে রাখিস ,  রং তূরুপের তাস  ;
পাখীপ্রলাপের রত্ন মানিক ,  অক্ষরের চাষ ।

যদি পড়ে গো ধরা ,  পিন্ডি  চট্ কানোর   আগে
বলিস্  কেন তারে , দে তোর স্বাধীন দুটো ডানা।
নিয়ে যা,  আমার আদুরি! চাঁদমেয়ে সোনা !
যারে জ্যোৎস্নাবেগম জড়িয়ে ধরে , সুখের সাগরে
দুঃখের নদী বায় !  কালচক্র সুতোর প্রতিপাদ্য ভুখা যায় 


হায় বসন্ত ! আয় !  তোকে উজার করি ।
তোর বুকের ভিতরে দাঁড়িয়ে আছে  প্রকান্ড গাছ  ;
ফুল-পাতাহীন মৃত শাখাদের অসংখ্য স্মারকগ্রন্থ ,
আচরের দীর্ঘ হতশ্বাস । তুই ছাড়া কে আছে আমার
আত্মদানের নিবাস !

মাটির সোঁদাগন্ধ মাখা ,  পরানের দু'কূল ছাপা
কোথাকার হেঁটে যাওয়া মানুষের বসবাস !
রক্ত তরুণ সৈনিকের অভিষেকে
ফুটিল মালতি ফুল, মরুদানবের দুঃসহ কারাগারে    

আজ।  হয় বসন্ত ,  নয় তালাক !
সর্ষক্ষেতে রক্ত চাবুক ,   অন্ধকারে উঠোনলিপি।
বুক চিরে মুখ লুকায় , চকিত চপলা মৃগয়ার
স্বর্ণ-কলিজা আভা ।
বলি শীলা !  কী প্রয়োজন আর
অযথা অগ্নুৎপাত ,  অন্ধকারে গলিত লাভা ?

শ্রীমান দাস

টুঙ্গিপাড়ার সেই ছেলেটা

টুঙ্গিপাড়ার সেই ছেলেটা, বারুদ ঠাসা বুক
মুক্তিনেশায় উঠলো হয়ে জাতির অভিমুখ।

অত্যাচারী ব্রিটিশ শোসন-হানাদারের ঘাঁটি,
ভাষারক্তে লাল হয়েছে বাংলা মায়ের মাটি।

সেই ছেলেদের জীবন বাজি,মাতৃভাষার মান
প্রাণের দামে গেয়ে গেল লাল সবুজের গান।

পদ্মা মেঘনা বুড়িগঙ্গায় বইলো অশ্রুধারা
মধুমতির বুকের উপর ঢেউ আপনহারা।

সেই ছেলেরা মুক্তি সেনা , লক্ষ্যে অবিচল
গুঁড়িয়ে দিল পদাঘাতে রাজাকারের ছল।

রক্ত ঢেলে আনলো ঘরে একাত্তরের হাসি
সেই ছেলেকেই বন্ধু বলে জানে বঙ্গবাসী।

টুঙ্গিপাড়ার সে ছেলেটার মগজ জুড়ে শান
সে ছেলেটাই জাতির পিতা মুজিব রহমান।

রুদ্র মোস্তফা

স্বদেশের মুখ 

শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ কান্না কথা বলে 
রবীন্দ্রনাথ-নজরুল ছুঁয়ে ছুঁয়ে তোমার ছায়ায়। 
তোমাকে নিয়ে ভাবা আমার প্রতিটি ভাবনা 
ধানমন্ডি বত্রিশ নাম্বার থেকে টুঙ্গিপাড়া 
হয়ে এক পলকে পৌঁছায় হাজার বর্গমাইল। 
যেখানে ভেসে উঠে শিশুর কলতান
পদ্মা মেঘনা যমুনার সুর...

তোমার মুখ মনে পড়লেই জ্বলে উঠে বর্ণমালা 
চোখের সামনে ভেসে উঠে 
জেল জুলুমের কারাগার 
বায়ান্ন- ছেষট্টি- উনসত্তরের উত্তাল সময়। 
চোখের সামনে ভেসে উঠে
রেসকোর্স ময়দানের একটি তর্জনী। 

পিতা, আমি তোমার চোখের ভাষা পড়তে গিয়ে 
পৃষ্ঠা উলটাই  বাংলাদেশের ইতিহাসে
আমি থমকে থমকে চমকে গিয়ে দেখি
পঁচিশে মার্চের কাল রাত 
চোখের সামনে ভেসে উঠে স্বাধীনতার ঘোষণা
যুদ্ধের ভয়াল রাত-দিন— 

প্রত্নতাত্ত্বিক খনন শেষে
অস্তিত্বে আলো ছড়ায় 
লাল-সবুজ  পতাকা
একটি স্বাধীন দেশ 
আর একটি নিথর দেহ।
সিঁড়ি দিয়ে গড়াতে গড়াতে
দেহটি নেমে পড়ে দেশের একান্ত গভীরে। 

 'স্বাধীনতা' শব্দটি লিখতে গিয়ে
আমার কলম থেমে যায়—
থমকে যাওয়া চোখে দেখি 
স্বাধীন দেশের  ম্লান মুখ।
তবু উঠে দাঁড়াই দারুণ তেজে
তোমার শোক-ই হয়ে উঠে আমাদের ভীষণ শক্তি।

ইরফান হোসেন

জাগো মানুষের দল 

আকাশে আজ প্রলয়ের ডঙ্কা বাজে......
মিহি করে ধুনা তুলার মতো ওড়ে কপটচারীর ঘোমটা।
এইতো সময় উন্মত্ত উল্লাসের । 
এইতো সময় জেনে নেবার_
পার্থক্য মানুষ কিংবা শেয়াল কুকুরের।

জাগো মানুষের দল_
ঐ শোনো, ঈসরাফিলের শিঙা ধ্বনি।
মানুষের আজ আলাদা কাতার হবে,
আলাদা কাতার হবে শেয়াল কুকুরের।
বুক পকেট হাতড়ে দেখো।
হৃদয়টি কি আছে ঠিক যেখানে থাকবার কথা ছিল।

কোমর ভাঙ্গা বিড়ালের মত_
যারা টেনে হেঁচড়ে চালিয়ে নেয় গ্লানি।
তাদের তুমি কি ভয় দেখাও জীবন?
শ্বাপদের রক্ত লাল চোখ উপেক্ষা করতে শিখে গেছে আজ,
শুকুর মাঝি কিংবা ভানু বেওয়া।

হয়তো এই প্রলয়ে মাটি আর পাহাড়,
আবার মিলে যাবে একই তলে।
আসবে নতুন জোয়ার এই মেঘনায়।
উঠবে নতুন রবি নতুন কোন দিনে।।

শান্তনু ভট্টাচার্য

দ্বন্দের মাঝখানে 
                              
রোদের ভেতর যেমন 
লুকিয়ে থাকে তীক্ষ্ণ শীত
হাসির ভেতরে ভেতরে সফল অভিনয়। 

একটা বড় ক্যানভাসের 
একপ্রান্ত দখল নিয়েছেন -"দালি 
অন্যপ্রান্ত পিকাসো  
মাঝখানে তুলি হাতে 
দাঁড়িয়ে আছে লিওনার্দো  

মেঘের ফাঁক থেকে চাঁদ মুখ বাড়ালেই 
মোনালিসার মুখে এঁকে দেবেন 
অজ্ঞাত জ্যামিতিক সব চিহ্ন...

নমিতা সরকার

ঢেউ

চাঁদের হাসি ঠোঁটে চেপে তুমি ঘুরে বেড়াও ভালোবাসার রাজ্যে চুম্বনে ভরিয়ে দাও ডিঙ্গি নৌকার  শূণ্য হৃদয়।

তবুও তুমি বুঝনি বুঝি শূণ্য ডিঙ্গি  নৌকার হৃদয়ের ভাষা ...

ঢেউয়ের আছড়ে আছড়ে ব্যথার জলকেলি শরীরে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পরে নির্জন দ্বীপে আঁধারের বুকে। 

আর তুমি চাঁদের দেশে ভীড় করো নক্ষত্রের মেলায় 

আলোয় আলোয় ভরে যায় তোমার ভালোবাসার রাজ্য, চাঁদের হাসি ঠোঁটে জমা রেখে হৃদয়ে অাঁক লিউনার্দোর আঁকা সেরা চিত্রের হাসি।

আর ডিঙ্গি নৌকার বুকে নুড়ি জমে জমে তৈরি হয় ব্যথার পাহাড় তবুও গোধূলিবেলায় ভাসিয়ে দেয় শূণ্য হৃদয় শুক্লপক্ষের আঁধারের প্রতিক্ষায়, 

শুধুই তোমার হাসিমাখা ঠোঁটে চুম্বন আঁকবে পূর্ণিমার আলোয়।

অর্ধেন্দু ভৌমিক

মাটির গন্ধ

শ্রাবণের ভাতথালা, নাড়া-পচা ঘ্রাণ
জীবন থেকে অনেকদূর সরে... 
বাবার দু'চাষে ফেলা বুক ,কেঁচোর ঢিপি
লাঙল-হালে জমা অলংকার
মা'কে নিয়ে সাজাতো সংসার ... 

আজও  স্নায়ু খোঁজে
বাবার সেই ভালোবাসার অনুভূতি---

কর্পোরেশন, গজানো টংঘর
মাটির গন্ধ আগলে  নর্দমার কালো জল।

লিপি ভৌমিক

স্বাধীনতার খোঁজে

তুমি বেঁচে আছো শত বাঙালির রিদয়ে
তুমি শিখিয়েছ বেঁচে থাকা  নির্ভয়ে।
তুমি প্রেরনার উৎস  কোটি প্রানে
তুমি বেঁচে আছো আত্মত্যাগের মহীয়ানে।
গর্বিত আমি,গর্বিত আমরা 
গর্বিত জাতি, দেশ,
তোমার ত্যাগেই সুজলা সুফলা  সোনার বাংলাদেশ।
ভালোবাসার গভীরতা প্রকাশিত হলো তোমার দেশপ্রেমে,
তুমি অমর তুমি অম্লান 
তুমি রবে প্রতিটি  মনের ফ্রেমে।
বীর বাঙালির বীরত্বের পদবী
সেতো তোমার প্রতিদান,
জাতির পিতা তোমার মহিমায় স্বাধীনতা অম্লান। 
এ নিখিল ভুবন,বাঙালির জীবন
তুমি ভরেছো গৌরবে,
প্রতিটি প্রাণে তোমার প্রেরনা ছড়াক সৌরভে।
সোনার দেশের সোনার মানুষ হোক দেশপ্রেমিক, 
তোমার লালিত স্বপ্নসুখে ভরুক চারিদিক।।

অলকা গোস্বামী

নীল বিচ্ছেদ

সন্ধ্যে হয়ে আসছে। রাস্তার লাইট আর আকাশের কালচে নীল রঙ মিশে একটা মায়াবী আলোয় ভরে আছে চারদিক।
এরকমই আরো একটি সন্ধ্যায় ছিল বিচ্ছেদের কান্না, বিষাদের নিরবতা,আর নিরাশার মেঘ বৃষ্টি হয়ে অঝোরে ঝরছিল শিবানীর দু চোখ বেয়ে। 
এই সময়টা খুব পছন্দের শিবানীর। নিজেকে খুঁজে পায় একান্ত ভাবে এই সময়টাতে। ছাদে পায়চারি করতে করতে কত কথা উপছে পড়ে স্মৃতির ভাড়ার থেকে।
ছোট্ট রিনি খেলায় মেতে আছে বন্ধুদের সাথে।
"এই রিনি  ঠাকুমা ডাকছেন,  বাড়িতে অতিথি এসেছে, আর নূতন বন্ধুও এসেছে একজন"। পূর্নিমা দিদির কথায়
রিনি একছুট লাগায় বাড়ির দিকে, হটাৎ করেই পা পিছলে ধড়াম করে পড়ে যায় রিনি।
"ইস দেখি দেখি , কপালটা তো ফুলে নীল হয়ে গেছে। কেন দৌড়াচ্ছিলি বলত"!
"আয় আয় ঘরে গিয়ে ওষুধ লাগিয়ে দিচ্ছি"। পূর্ণিমার হাত ধরে আস্তে আস্তে বাড়িতে ঢোকে রিনি।
বড়ো উঠান তার সামনেই রান্নাঘর, উল্টো দিকে ঠাকুর ঘর,আর বারান্দা। রিনি দেখলো বারান্দায় ওরই বয়সী একটি মেয়ে হাঁটুতে মুখ গুজে বসে আছে। আস্তে করে কাছে গিয়ে পিঠে হাত রাখলো রিনি। ওপাশ থেকে বিজন বলল," এই শিবানী চেয়ে দেখ তো তোর বোন রে, পিসতুতো বোন। ওর নাম রিনি।
মেয়েটি চোখ তুলে তাকাল, দু চোখে নদী বইছে।
ছপ ছপ একটানা শব্দ..…বৈঠার ঘায়ে নদীর জল সরে সরে যাচ্ছে। নৌকার ভিতরে গাদাগাদি লোক, বেশির ভাগই মহিলা, আর কিশোরী। অন্যদিনের মত সেদিনও বিকেলে আমিনা, আর সুলতানা দের সঙ্গে খেলতে গেছে শিবানী। খেয়াল করল আরে আজ তো রূপালী খেলতে এলো না। ঘরে ফিরে মা কে জিজ্ঞেস করল,"মা জানো রপালি আজ খেলতে আসেনি, একবার চলো না দেখে আসি..."। শিবানী দেখল কেমন জানি বদলে গেছে মা এর চোখ মুখ। চোখ দুটো যেনো চৈত্রের পলাশ।গত রাতেই রূপালী দের ধানের গোলাতে কারা যেন আগুন লাগিয়ে দেয়। সবাই যখন আগুন নেভাতে ব্যাস্ত তখন ঘুমন্ত রূপালী কে উঠিয়ে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।এই ঘটনার পর শিবানীর মা বাবা শিবানিকে ওদেশে পিসির বাড়ী তে পাঠানোর বন্দোবস্ত করেন।
"লক্ষ্মী মেয়ে, আমরা পরে একদিন যাব,এখন তোমার বই পত্র, আর কিছু কাপড় গুছিয়ে নাও তো, আমরা একটু পরেই  বেরিয়ে পড়ব"।
"কোথায় যাব আমরা....,
ওই যে তোমার বিজন দাদা এসেছে। তোমাকে পিসির বাড়ী বেড়াতে নিয়ে যাবে।"
তুমি যাবেনা মা"?
"যাব তো....,
অনেক কাজ পড়ে আছে মা,তুমি বইপত্র কি নেবে দেখে নাও, আমি রান্না ঘরে আছি"।
সন্ধ্যে নামতেই শিবানীর মা, বাবা, শিবানী কে নৌকায় তুলে দিলেন। গলা জড়িয়ে ধরলো শিবানী," মা, তুমি যাবেনা"?
"ভাই ছোট আছে তো আমরা কিছুদিনের মধ্যেই যাব। ওখানে তুমি বড় স্কুল এ যাবে, কত কিছু শিখবে"।
মার কথায় শিবানী নৌকায় উঠে বসে। অস্ফুট কান্না দলা পাকিয়ে গলায় আটকে থাকে শিবানীর।
বাবা ধুতির খুঁটে চোখ মুছতে মুছতে শিবানীর হাতে চুমু খেয়ে বলেন,"পিসির কথা শুনে চলো মা, নিজেকে ভালো রেখো। সম্মান রক্ষার জন্যে ওদেশে তোমাকে পাঠাচ্ছি। এভাবে যে আর কত নির্যাতন আমাদের উপর দিয়ে যাবে কে জানে! সময়ে অসময়ে, উৎসব পার্বনে কখন কার উপর খাড়া পড়বে কোন ঠিক নেই। আর কত ভয় আর আতঙ্ক নিয়ে থাকা যায়।"
 গভীর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে শিবানীর বাবার বুক চিরে। ছোট্টো শিবানী নৌকার ভিতরে এক কোনায় বসে পড়ে নদীর ঠাণ্ডা বাতাসে কখন ঘুমিয়ে পড়ে আর মনে নেই।নৌকো ওদের দুলালী গ্রাম ছেড়ে, শৈশব,মেয়েবেলা, পুতুল খেলা, রান্নাবাটি, সব একপাশে ফেলে দিয়ে বয়ে চললো অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে।
সেই বন্ধু,সবুজ মাঠ, ধানের গোলা, ওদের কবলি, ধবলি গাই দুটোর কথা আজো মনে পড়ে। কিছু অনুভূতি কারো সাথে ভাগ করা যায় না। শুধু মুখোমুখি নিজের সাথেই করা যায়।
 জন্মভূমিতে আর ফিরে যেতে পারে নি শিবানী হয়ত চায় ও নি। সত্যিই তো কোথায় যাবে !
ওদের সব কিছু জবরদখল হয়ে গেছে এতদিনে। ভাই কে নিয়ে মা বাবা ও চলে এসেছিলেন এ দেশে। পিসির সহায়তায় একটা কাজও জুটে গেছে ভাইয়ের।
জান হয়ত বেঁচেছে এদেশে এসে। কিন্তু যোগ্য সম্মান, মর্যদা এখনও পাওয়া যায় নি। উদ্বাস্তুর তকমা এখনও সরেনি কপাল থেকে।
পিসির একান্নবর্তী সংসারে সবাই খুব আপন করে নিয়েছিল শিবানী কে। রিনি নিজের বোনের থেকেও বেশী ছিল বন্ধু। একসাথে পড়াশুনা, ঘোরা ফেরা সবকিছু তেই ছিলো ওদের ভারি মিল।
পিসি, পিসেমশাই এবং পরিবারের সাহচর্য না থাকলে হয়ত এই জীবন এতো সহজ হতো না শিবানীর।
সেই কালো রাত পেরিয়ে, সকালে নৌকা যখন করিমগঞ্জ স্টিমার ঘাটে এসে পৌঁছাল। তখন সূর্য লাল আলো ছড়িয়ে নুতন দিনের সূচনা করছেন।
আজ আবার এই করিমগঞ্জ শহরেরই সাব ইন্সপেক্টর হয়ে জয়েন করেছে শিবানী। খুব চাইছিল এই শহরেই যেন পোস্টিং হয়। এখনও অনেক রূপালী কে খুঁজে বের করতে হবে যে।

গোপী নাথ ঘোষ

শতবর্ষে মুজিব

আজি এ শতবর্ষে তব স্পর্শের খোঁজে 
স্মরি তোমায় বিনম্রতায় হে কবিবর।
তুমি জন্মাও দূর্লভ নির্লোভ বৃত্তে
আশাহীন বৃত্তে দাও খোঁজ চিত্তের।
যেথা ভয় সংশয় ধায় শূন্যে
আশায় জাগায় চিত্ত
তুমি নিত্য তুমি নৃত্য।
অদ্ভূত তুমি, হে উদার, হে বন্ধু
বাংলাকে করেছো গীতিনাট্য।
তোমার আশায় আশা জাগায় 
জাগায় ভাব প্রেমাবেগ।
তোমার স্বপ্নে স্বপ্ন দেখি
গড়ি স্বদেশ স্বর্গ
তুমি বঙ্গের বন্ধু, হে মুজিব, হে বঙ্গবন্ধু।

শুক্লা চক্রবর্তী

বসন্ত আমায় ছেড়ে যেও না

ওগো ঋতুপতি বসন্ত আমি কোকিল... 
তোমার নিকট করি এই নিবেদন, 
আমায় ছেড়ে যেও নাগো থাকো তুমি পাশে আমার সারাজীবন। 
তোমার আগমনে আমি ফিরে পাই যেই সুর, 
তোমার প্রস্থানেই তা হারিয়ে যায় আমা হতে বহুদূর! 
ভুলে যায় সবে আমার মিষ্টি সুর, 
তুলনা হয় আমার কাকের মতন
আমার সুর যে তখন হয় না আর সবের নিকট শ্রুতিমধুর। 
তাই ঋতুরাজ করি তোমার নিকট নিবেদন... 
তোমার আগমনে কিংবা প্রস্থানে যেনো না হারিয়ে যায় আমার সুর, 
কুহু কুহু ডাকটি যেনো পৌঁছে সকলের কর্ণে বারোমাস চাই তোমার নিকট তবে এই বর। 
যে সুরে আমার কোকিল পরিচয়... 
হে ঈশ্বর সেই সুর যেনো আমার সাথে সদা রয়, 
কারণ সুরবিনা আমি কোকিল
আমার নেই যে অন্যকোনো পরিচয়।

গৌতম ভৌমিক

 বারমাসের সাতকাহন 

গ্রীষ্মের দাবদাহ রোদে এল যে রবি। 
গাছে গাছে পাকে ফল আর দই মিষ্টি।।
বর্ষার জলে নদী হাসে কাঁদে পথ ঘাট। 
গ্রামের মানুষ ছুটে বেড়ায় নাচে ময়ূর মাঠ।।
ভাদ্র মাসে কচু খেয়ে গলা গেল ফুলে।
আশ্বিনেতে আগমনীর বার্তা দিকে দিকে।।
নবান্নের গন্ধ নিয়ে কার্তিক এল ঘরে। 
কনকনে ঠান্ডা নিয়ে অগ্র বাবজি চলে।।
পৌষের পিঠেপুলি খেতে বড়ই মজা। 
বীনাপানির হাতে বই পুস্তকে ভরা।।
টক মিষ্টি কুল ফাগুনের গুন গুন।
বসন্তে বাসন্তী আসে ধুম ধুম।।

কুশল রায়

বঙ্গবন্ধু মানে

বাঙালির প্রিয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
তুমি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম নেতা
বাংলা তোমা ছাড়া কিছু নয়
আজ যে স্বাধীনতা পেয়েছে বাংলাদেশ
তা তো তোমার সংগ্রামের পরিণয়,
শৃঙ্খল ভেঙে তৈরি করলে এক নতুন বাংলা
মা মাটি মানুষের দেশে আনলে স্বাধীনতা
আজ বাংলা দেখছে কত স্বপ্ন
একদিন তুমিই শিখিয়েছো 
স্বপ্ন দেখতে লড়াই করতে
মায়ের ভাষা কে সঙ্গে নিয়ে 
বুক উজার করে দিয়ে 
নতুন ভাবে ভীতিহীন হয়ে বাঁচতে ৷
আজ বাংলার মাটি তোমায় জানায় প্রনাম 
বাঙালির প্রতিটি বাচ্চা তোমায় করে সম্মান ||

পিয়াল দেবনাথ

বসন্তপুর আজ বসন্তহীন

সেই এক কালে বসন্তপুরে
বয়ে চলত মিঠে বাতাস,
রাস্তায় ফুলের হালকা চাদর
সাদা,হলুদ,লাল।
বসন্তের আগমন সর্বদাই আড়ম্বর,
উৎসবে,গানে মাতোয়ারা ছোট বৃদ্ধ সমবেত।
এক অপরূপ কচি কোকিলের ডাকে 
বসন্ত দু এক ‌ক্ষন পূর্বেই আসত।
কালের মায়ায় সেই কোকিল আজ বৃদ্ধ।
চির অন্ধে পরিণত।
শুধু কণ্ঠই তার সম্বল,
পথ চলার সাথী।
বসন্তপুর আজ বসন্তহীন।
না বয় বাতাস,
না ফুটে ফুল।
অন্ধ কোকিল আজও একই ডালে বসে।
না বোঝে দেশের সীমানা,
না বোঝে মানচিত্র,
না বোঝে দেশ ভাগাভাগি।
সেই গাছটি আজ দু দেশের সীমান্তে।
কেউ শুনতে পায়না কোকিলের গান।
দুধারে খরতপ্ত ফাটল ধরা মাটি,
ফাটল ধরা মানবতা।

আব্দুল হান্নান

কখন কেমন

সময় কখন কেমন চালায়
জানায় না তো কিছু 
হঠাৎ করেই উঁচুই তোলে
হঠাৎ নামায় নিঁচু।
বলে কারুর আসেনা কাছে 
চলেই গতি দ্রুত 
ঝড় ঝাপটা থাক বা না থাক
মারে পেশিই গুঁতো।
এগিয়ে চলা লাফিয়ে বলা
বলার সুযোগ সবার
কথায় যাকে পটু দেখায়
চেতনায় তার অভাব।
অজুহাতের সুযোগ নিয়ে 
আঁটে কত ছুতো
কখন কাকে সমীহা দেখায়
কখন করায় তিতো ।।

মিঠুন রায়

ব‍্যতিক্রমী সাহিত‍্যিক রাজশেখর বসু

একদা 'পরশুরাম' ছদ্মনামের আড়ালে যিনি মাসিকপত্রে হাস‍্যরসের গল্প লিখেছিলেন তাঁর নাম রাজশেখর বসু।তিনি ছিলেন একজন সাহিত‍্যিক,একাধারে অনুবাদক,রসায়নবিদ ও অভিধান প্রণেতা।বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী রাজশেখর বসু অবশ‍্য বেশী বয়সেই সাহিত‍্যচর্চা শুরু করেন।ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে,'রাজশেখর বসু নৈষ্ঠিক সাহিত‍্যিক ছিলেন না,তিনি পরিণত বয়সেই সাহিত‍্যরঙ্গে অবতীর্ণ হন।

রাজশেখর বসুর বড় ভাই শশি শেখর বসুর মতে,রাজশেখর বসুর সাহিত‍্যচর্চা শুরু হয় ১৮৯৩ সালে।তাঁর প্রথম বই 'গড্ডলিকা 'বেরোলে রবীন্দ্রনাথ থেকে আরম্ভ করে তৎকালীন সময়ের কবি -সাহিত‍্যিকরা তাকে অভিনন্দন জানান।আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় রাজশেখরের বই পড়ে  লিখলেন-'এই বুড়ো বয়সে তোমার গল্প পড়িয়া হাসিতে হাসিতে Choked হইয়াছি'।

   রাজশেখর বসুর জন্ম ১৮৮০ সালের ১৮ মার্চ বর্ধমান জেলার শক্তিগড়ের নিকটবর্তী বামুনপাড়ায়।বাবা চন্দ্রশেখর বসু দ্বারভাঙ্গা রাজ এস্টেটের ম‍্যানাজার ছিলেন।১৮৯৭ সালে রাজশেখর বসু পাটনা কলেজ থেকে দ্বিতীয় বিভাগে এফ.এ পাশ  করেন।১৯০০ সালে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে রসায়নে এম.এ পাশ করেন।রাজশেখরের 'চলন্তিকা' প্রথম প্রকাশ হয় ১৩৩৭ সালে।প্রকাশক এম. সি.সরকার।'চলন্তিকা' প্রকাশের পর গুরত্বপূর্ণ সমালোচনা বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশ হয়।হরপ্রসাদ শাস্ত্রী 'প্রবাসী' পত্রিকায় বিভিন্ন বিষয়ে চলন্তিকার সমালোচনা করেন।আসলে বাংলায় উপযুক্ত পরিভাষা প্রস্তুতের ক্ষেত্রে রাজশেখর বসুর বিরাট ভূমিকা রয়েছে।কাশীরাম দাশ,কৃত্তিবাস ওঝা বা তুলসীদাসের মতো তার রামকথা এবং মহাভারত চিরজীবী।তিনি রামায়ণ কাহিনীকে উপন‍্যাসের মতো আকর্ষণীয় করেছেন।চলিত ভাষা ব‍্যবহার,দুরূহতা ও জটিলতা পরিহার,সর্বোপরি উপন‍্যাস সুলভ কাহিনীবৃও গ্রন্হটিকে আদ‍্যন্ত রমণীয় করেছে।রাজশেখরের প্রবন্ধ সংখ‍্যা ৬০ এর বেশী নয়।তাঁর প্রবন্ধ গ্রন্হ মূলত তিনটি-লঘুগুরু(১৯৩৯),বিচিন্তা(১৯৫৫),চলচ্চিন্তা(১৯৫৮)।তাছাড়া কুটির শিল্প ও ভারতের খনিজ -শীর্ষক দুটি ক্ষুদ্র পুস্তিকাও তিনি লিখেছেন।তার সমস্ত প্রবন্ধের বিষয়বস্তু ছিল অসাধারণ বৈচিত্র্যপূর্ণ।তাঁর প্রবন্ধের অতিরিক্ত প্রাপ্তি হালকা পরিহাসের ভঙ্গি।তাঁর সমস্ত প্রবন্ধ সহজ,সরল অথচ কৌতুক মিশ্রিত।

   ব‍্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন অত‍্যন্ত সরল প্রকৃতির।তিনি প্রথমে বেঙ্গল কেমিক‍্যাল অ‍্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়াকস্ কোম্পানিতে কর্মজীবন শুরু করেন।স্বীয় দক্ষতায় অল্পদিনেই তিনি আচার্য  প্রফুল্ল চন্দ্র রায় ও তৎকালীন ম‍্যানেজিং ডিরেক্টর ডাঃকার্তিক বসুর প্রিয় ভাজন হন।১৯০৪ সালে কোম্পানির পরিচালক পদে উন্নীত হন।

    ১৯০৬ সালে ব্রিটিশ শাসিত অবিভক্ত ভারতে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ গঠিত হলে রাজ শেখর বসু তাতে সক্রিয় অংশনেন।এক সময় লুম্বিনী পার্ক মানসিক হাসপাতাল তৈরীর জন‍্য তিনি জমি দান করেন।১৯৪০ সালে ৫ ফেব্রুয়ারি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়।সাহিত‍্য কর্মকান্ডের স্বীকৃতি স্বরূপ পেয়েছেন জীবনে বহু পুরষ্কার।১৯৩৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক গঠিত বানান -সংস্কার সমিতি এবং ১৯৪৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ  সরকারের পরিভাষা সংসদে সভাপতিত্ব করেন রাজশেখর বসু।১৯৫৫ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক রবীন্দ্র পুরষ্কার পান তিনি।১৯৫৫-৫৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষ্যে ডি.লিট উপাধিতে ভূষিত হন তিনি।যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক সান্মনিক ডক্টরেট ডিগ্রি পান তিনি।১৯৪০ সালে জগত্তারিণী পদক ও ১৯৫৫ সালে সরোজিনী পদকে ভূষিত হন।

   ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনেও তিনি পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন।স্বাধীনতা সংগ্রামে বিপ্লবীদের রাসায়নিক পদার্থ,টাকা ও রাসায়নিক বিদ‍্যা সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা দিয়ে সাহায‍্য করতেন।বিখ‍্যাত চলচ্চিত্রকার অস্কার জয়ী সত‍্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় রাজশেখর বসু র দুটি ছোটগল্প,যথাক্রমে -পরশপাথর এবং বিরিঞ্চিবাবা অবলম্বনে চলচ্চিত্র প্রকাশ হয়।

    ১৯৫৯ সালে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়ে অসুস্থ  হয়ে পড়লেও লেখালেখি চালিয়ে যান।অবশেষে ১৯৬০ সালে ২৭ এপ্রিল ঘুমন্ত অবস্থায় রাজশেখর বসুর মৃত‍্যু হয়।আজও তিনি বাঙালির হৃদয়ে আধুনিক পরশুরাম হিসেবে চিরজীবী হয়ে আছেন।

তপনকান্তি মুখার্জি

কাঁটাতারে বিক্ষত মানচিত্র 

আলোটা কাঁপছে তিরতির করে । শিখার দিকে ঠায় তাকিয়ে বসে । ছাই করতে চাই মনের ভাবনাগুলো । সত্যিই যদি হতো ? 

একরাশ হাহাকার গড়িয়ে নামে অশ্রু হয়ে । জন্মদেশ আজ বিদেশ । এতোদিনের চেনাজানা মানুষগুলো আজ যোগাযোগহীন , সম্পর্কহীন । মানচিত্রের গায়ে দগদগে ক্ষত। 

স্বপ্ন খুঁজে খুঁজে রাত গভীর হয় । অশ্রু বেড়ে নদী । চোখের জল দেখারই বা কে আছে ? জীবন - ছেঁচা মানুষগুলো দাঁড়িয়ে এপারে ওপারে । মাঝের কাঁটাতার জ্বলছে ঐতিহাসিক ভুল হয়ে। .........

রূপশ্রী চক্রবর্তী

কাঁটাতার

ক্ষত বিক্ষত হৃদয়ের আর্তনাদ 
বুক চাপা দীর্ঘশ্বাস
নিথর স্তব্ধ স্মৃতির পাহাড় 
হারিয়ে যায় আত্মবিশ্বাস l
সেই মাটির মিঠে ঘ্রাণ
ওলি গলি তরুলতা ,
এঁকে বেঁকে চলে মেঘনা পদ্মা 
কাঁটাতারের নেই প্রতিবন্ধকতা।
ভালোবাসার নিবিড় আলাপন 
কুলুকুলু জল কলধ্বনি ,
তরঙ্গায়িত প্রেমের জোয়ার 
যেনো সৃষ্টি সুখের খনি l
হিংসা আর স্বার্থান্ধতায় 
মানুষ হারায় মানবিকতা ,
বিবেক দংশন আত্মশুদ্ধি  
আর রাত জাগা নীরবতা l
অসীম আকাশ অতল সাগর 
কাঁটাতারে কী আসে যায় !
মাটির টানে বাউল গানে আজও
ভারত বাংলা কাঁদে হায় !

কাঞ্চন দেবনাথ

ঋতুরাজ

ধরণী সেজেছে আজ,
নানা রঙিন সাজে-
দখিণা বায়ু লেগেছে গায়,
ভ্রমরের গুঞ্জন কানে বাজে।

কুকিলের কুহু তানে,
শীত ঘুম ভাঙে আজ-
দ্বারে এসে গেলো বুঝি,
মোদের প্রিয় ঋতুরাজ।

শুষ্ক বৃক্ষ পরিপূন‍্য,
দেখি সবুজ পল্লবে-
আম্র মুকুলে ভীর জমায়,
মাতাল সহস্র মধুকরে।

মিঠেল রোদে ঝলমলিয়ে
হাসে সারা ভুবন-
মিষ্টি সুরে কুকিল ডাকে,
উদাস হয়ে যায় মন।

প্রকৃতির এই নানা রঙে,
আনন্দে মাতোয়ারা সবে-
শিমূল,পলাশ,কৃষ্ণচূড়া,
মন রাঙালো অনুভবে।

রিয়া বৈদ্য

কোকিল

ঘুমন্ত এ সুন্দর জগৎ জেগে ওঠে ,
তোমাদের মিষ্টি মধুর কুহক তানে ।
প্রাণ জুড়িয়ে যায় যখন বোল ওঠে তোমার ঠোঁটে ,
তোমার সুরের বার্তা আসে বসন্তের আগমনে ।গাছে গাছে ফুলের সুরভিত সৌরভে , 
কোকিলের গানে ধরিত্রী নব যৌবন লাভ করে ।
কালো রঙেও গুণের কদর তোমার ও সুরের গৌরবে ,
তাও অলস বলে বদনাম তুমি এ সমাজ সংসারে ।
কুহু কুহু কোকিলের রক্তাক্ত আঁখিতে , মাদকতাময় গানে ,
মুকুলের গন্ধে প্রকৃতি প্রেমের সুর তুলে ছন্দ বাঁধে মনে ।। বৈদ্য 
ঘুমন্ত এ সুন্দর জগৎ জেগে ওঠে ,
তোমাদের মিষ্টি মধুর কুহক তানে ।
প্রাণ জুড়িয়ে যায় যখন বোল ওঠে তোমার ঠোঁটে ,
তোমার সুরের বার্তা আসে বসন্তের আগমনে ।গাছে গাছে ফুলের সুরভিত সৌরভে , 
কোকিলের গানে ধরিত্রী নব যৌবন লাভ করে ।
কালো রঙেও গুণের কদর তোমার ও সুরের গৌরবে ,
তাও অলস বলে বদনাম তুমি এ সমাজ সংসারে ।
কুহু কুহু কোকিলের রক্তাক্ত আঁখিতে , মাদকতাময় গানে,
মুকুলের গন্ধে প্রকৃতি প্রেমের সুর তুলে ছন্দ বাঁধে মনে ।।

অভিষেক অধিকারী

বঙ্গবন্ধু

বেয়নেটের আগুনটা এখনো নেভেনি,
সঙ্গে লক্ষ জনতার আর্ত চিৎকার,
টুঙ্গিপাড়ার ছেলেটার হাতে স্বাধীনতার পতাকা।
তোমার জীবনের প্রতিটি অনুকাব‍্য দিয়ে গাঁথা হয় স্বাধীনতার চরণ।

ঢাকার প্রতিটি অলি গলি আজও সাক্ষি দেয়,
তোমার জীবন সংগ্রামের।
ভাষা আন্দোলন আর আগরতলা থেকে একাত্তর
জাতির স্বাধীনতার প্রশ্নে তোমার কন্ঠ দিয়েছে উত্তর।

তবুও,
বেয়নেটের আগুন আজও নেভেনি।
কালভৈরবের নৃত‍্যে খসে পরছে গণতন্ত্রের আবরণ।
আজও তোমাকে চাই,
স্বাধীনতা সংগ্রামের পতাকা নিয়ে তুমি ছুটে চলবে।
তোমার স্পর্শে জেগে উঠবে পরাধীন জাতি।
স্বাধীনতার যূপকাষ্ঠে শয়তানের বলি দেবে তুমি।
বন্ধ হবে কালভৈরবের তান্ডব নৃত‍্য।
আবার জেগে উঠবে পৃথিবী।
কোন পুঁজিপতি নায়ক নেতার জন্ম সেখানে হবে না।
খেটে খাওয়া মানুষ আবার তৈরী করবে সমাজ।
যে সমাজের নিশান কথা বলবে তোমার ভাষায়।
হ‍্যাঁ মুজিব তোমাকে বড় প্রয়োজন,
বেয়নেটের উদ্ধত আগুনকে নেভাতে।

রণজিৎ রায়

বঙ্গবন্ধু মুজিবুর

উদাত্ত আহ্বান সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো আছড়ে
 পড়েছিল উন্মত্ত যৌবনে
বাঙালির রক্তে তখন মুক্তির স্রোত
কোমলতা জমে মুহূর্তে পাষাণ
বারুদের আগুনে ঝাঁপ উচ্চারণের মাদকতায় ;
তারপর ইতিহাস লেখা শুরু হয়ে যায়
লোমহর্ষক, বিবর্ণ, সন্দেহ, ষড়যন্ত্র
শেষে মনুষ্যত্বের মরণ
বিপরীত দিক হতে বিজাতীয় ইতিকথা ।

প্রশিক্ষক খেলার কায়দাকানুন, কৌশল শেখায়
অন্যদের মতো মাঠে খেলে না
রেষারেষিতে কাদা ছিটে ল্যাং মারে
আক্রমনে পঙ্গু হতে পারে জীবন
নিজের রক্তে দেশের মাটি ভিজিয়ে ঈশ্বরের প্রিয়
হয়ে গেল-

স্যাৎস্যাতে মাটি আড়ালে কেঁদে কেঁদে
নিজেকে ভাসায়
দশকের পর দশক পেরিয়ে
আজো শুকিয়ে ঝরঝরে হতে পারে না-

আব্দুল গফফার

বসন্তের কোকিল, কোকিলা বসন্ত

কতশত পাখির কিচিরমিচির,
নীল সবুজের আভা,পীতাভ চিতি -
কোকিলার কুহু কুহু ডাকে,
বসন্তের গানে, মন হয় উদাসী।

তোমার ডাকেই স্বাগত,
ঋতুরাজ বসন্ত, রঙিন বাসন্তি -
বাঙালির চেতনায় তোল হিল্লোল,
আপন করো মোদের মৈত্রীবন্ধনে।

শীতের জীর্ণতা শেষ, শুরু উষ্ণতা,
ফুলেল গন্ধে মাতোয়ারা মানবমন -
পলাশ,শিমুল, পারিজাত, কাঞ্চন,
গাঁদার রঙে রঙিন নব বসন্ত।

পর্ণমোচী তরু,আস্তানা যে তোমার,
তোমার অপেক্ষায় কাটে বছর -
ফাগুনের বসন্তে তুমি আসবে বলে,
তোমার কুহু কুহু কুহুরে ডাকে।

পয়লা ফাগুনের হাওয়ায়,
শিমুল পলাশের মেলায় -
তোমার মিষ্ট কুহু কন্ঠে,
মেতে উঠেছে ফুলে ফুলে ভ্রমর।

ও কোকিলা, মন রে আজ উতলা,
নব মঞ্জরীর শোভায় কত আনন্দ -
তোমার ডাকেই সাজ সাজ রব,
শুরু হোক পলাশ রাঙা সকাল ।

সুব্রত ভৌমিক

কোকিল

কালো আমি, নামটি কোকিল
কালোয় জীবন ভরা।
কাকটি ভেবে উপল ছুড় ,
শব্দে, আত্মহারা।

জন্ম আমার কালো পাকে,
শূন্য জীবন সরা।
শেষ ঋতুর ঐ সকল আশা,
আমার সুরে ভরা।

বছর শেষের তপ্ত ফাগুন,
ক্লান্ত দিনের রেস।
তান টি আমার দোলায় পাতা
গন্ধে ভরায় দেশ।

জানবেন কালোয় জগত ভরা
তাইতো আলোর দাম।
হয়তো, ফাগুন তৃপ্ত বলেই
কোকিল স্বরের নাম।

ঘরটি আমার পাবেনা কো
বছর শেষেই থাকি।
তৃপ্তি দিয়ে তৃপ্ততা পাই
আমি কোকিল পাখি।

অশোক মণ্ডল

এ দেশ আমার 

এ দেশ আমার এ দেশ তোমার এ দেশ সবার 
জন্ম যেন হয় মাগো এ দেশে বারবার।
সবুজে সবুজে ভরা এ দেশে ডালে ডালে পাখি ডাকে 
বহু জাতি বহু ভাষা হেথা তবু সৌভাতৃত্ব হেথা রাখে।
গঙ্গা যমুনা সরস্বতীর পূণ্য ধারায় পবিত্র এ ধরা 
কত মহামানবের বীরত্বে আমার এ দেশ ভরা।
পাহাড়ে পর্বতে ভরা আহা কি অপরুপা মনোহরা 
ঝরনা কত ঝরছে হেথা ঝিরিঝিরি অঝোর ঝরা।
বীর বিপ্লবীদের স্পর্শে পবিত্র আমার ভারত ভূমি।
নত শিরে সকলে মোরা এ দেশের মাটি চুমি।
বিভেদের মাঝেও মিলন ঐক্য ফুলের মত ফোটে 
আজানের সুরে ঘুম ভাঙে হেথা সিঁদুর লাগে পূণ্য ঘটে।
এ দেশ দিয়েছে ঠাঁই করেছে সবারে আপন 
শপথ করি রুখে দেব সব আঘাত  হোক এই পণ

অশ্বিনী কুমার মন্ডল

রক্তে লেখা বর্ণপরিচয় 

একুশ মানেই লাল ফাগুয়ার 
রক্তে রাঙা যৌবন,
একুশ মানেই ভাতৃহারা বোনেরা
সব কাঁদে সর্বক্ষন। 
একুশ মানেই ভাষা আন্দোলন 
বাহান্নের ফেব্রুয়ারী, 
একুশ মানেই পাক হানাদারের
যত নির্মম অত্যাচারী। 
একুশ মানেই রক্তে রাঙা পথ
শবদেহ শত শত , 
একুশ মানেই রফিক জাব্বার 
সালাম বরকত। 
একুশ মানেই দুই বাংলার প্রিয়
প্রাণের বাংলা ভাষা,
একুশ মানেই শত অত্যাচারেও
হারায়নি মোরা আশা। 
একুশ মানেই পাক হানাদারের 
কাছে আমরা অকুতোভয়,
একুশ মানেই শহীদের রক্তে লেখা
বাংলা ভাষার বর্ণপরিচয় ।

রূপালী মান্না

এ শতকে, আজও মানুষ ভালোবেসে অসুস্থ হয়

এ শতকে,
আজও মানুষ ভালোবেসে অসুস্থ হয়, 
শুধু ভালোবেসেই।
কৈশোর থেকে যৌবন
যৌবন থেকে প্রৌঢ়
 প্রৌঢ় থেকে বার্ধক্য, 
প্রেম বেঁচে থাকে মনের মধ্যে
মরে যায় না।
স্বীকার করো বা নাই করো ,
প্রেমহীন জীবন জড়পদার্থ।
যারা বলো,
এ শতকে প্রেম নেই, ভালোবাসা নেই ,
কেবলই মোহ , কামনা-বাসনা,চাহিদার ঘোড়দৌড়। 
বিশ্বাস করো,
এ শতকে,
আজও মানুষ ভালোবেসে অসুস্থ হয়,
শুধু ভালোবেসে।

সুমন্ত রবিদাস

ধর্ম - সাধন পদ্ধতি

বৌদ্ধ সাধন ভাজন সংক্রান্ত চর্যাপদ থেকে শুরু করে নাথ সাহিত্য,  বৈষ্ণব সাহিত্য, শাক্ত সাহিত্য, বাউল গান এবং সুফি সাহিত্য পর্যন্ত লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এগুলিতে একই ধরনের সাধন-ভাজন সংক্রান্ত নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এগুলির সাধনপদ্ধতি মোটামুটি এক এবং একই কথা বলা হয়েছে। কীভাবে বা কোন পথে ঈশ্বর লাভ করা যায়, যা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চর্যাপদ থেকে শুরু করে সুফিবাদ পর্যন্ত একই পথের কথা বলা হয়েছে। আবার এই সাহিত্য গুলিতে প্রায় গুরুবাদী সাধন পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে।
         এক্ষেত্রে আমাদের আলোচ্য বিষয়, কিভাবে এই বিভিন্ন সাহিত্য ধারার মধ্যে একই পথ বা মার্গ এর কথা বলা হয়েছে, তা তুলে ধরাই মূল লক্ষ্য। এই সাহিত্য গুলির মধ্যে একটা ঐক্য রয়েছে, কিভাবে সাধ্য বস্তুকে লাভ করা যায় তার যে পথের কথা বলা হয়েছে উপরিউক্ত সাহিত্য গুলিতে, সেই পথগুলি মোটামুটি একই। তবে বিভিন্ন রূপকের সাহায্যে তা ব্যক্ত করেছেন বিভিন্ন সাহিত্য বিভিন্নভাবে। তবে আবার কোনো কোনো রূপক এর মধ্যে সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যাবে। যেমন চর্যাপদে ‘ইড়া-পিঙ্গলা’র কথা আছে, আবার তা শক্ত নাথ সাহিত্যেও আছে। এইরকম কিছু রূপক আছে এবং কিছু গানও আছে, যাদের মূল অর্থ একই। তবে আমাদের সেগুলো শুধু আলোচ্য বিষয় নয়, আমাদের মূল আলোচ্য বিষয় কিভাবে সাহিত্যের বিভিন্ন  শাখাতে সাধ্য বস্তু লাভের জন্য একই পথের কথা বলা হয়েছে।
         সাধ্য বস্তুকে (ঈশ্বরকে) কিভাবে পাওয়া যাবে? তার কথা চর্যাপদ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের অন্যান্য সাহিত্যের শাখাতেও একই রকম পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে। চর্যাপদে যেমন ‘কায়া’ সাধনার কথা বলা হয়েছে, তেমনি নাথসাহিত্যেও ‘কায়াসাধন’ পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে। যদিও নাথ সাহিত্য ও চর্যাপদ এর সময়কাল কাছাকাছি, আবার একই ব্যক্তি চর্যাপদ রচনা করেছেন এবং নাথ সাহিত্য পদ রচনা করেছেন। যেমন কাহ্নপাদের (কানফার) পদের কথা চর্যাতেও পাওয়া যাচ্ছে আবার নাথ সাহিত্যেও পাওয়া যাচ্ছে। তিনি চর্যাতে সবথেকে বেশি সংখ্যক পদ রচনা করেছেন (১২/১৩); আবার নাথ সাহিত্যে দেখা যায় নিরঞ্জনের কান থেকে কানফার জন্ম হয়ে দেবের অভিশাপে ‘ডাহুক’ রাজ্যে চলে যায় শাস্তি ভোগের জন্য - ‘তুরিতে গমনে যাঅ ডাহুক চলিয়া।’ তবে এই কাহ্নপাদ বা কানফা একই ব্যক্তি কিনা বিতর্ক আছে। কিন্তু সাধণ পদ্ধতিগত এবং ভাষা কত মিল আছে। যেমন চর্যার ‘১’ নং পদটিতে আছে – 
      “কাআ তরুবর পঞ্চবি ডাল।
      চঞ্চল চীএ পইঠো কাল।।
      দিঢ় করিঅ মহাসুহ পরিমাণ।
      লুই ভনই গুরু পুচ্ছিঅ জাণ।।”
এখানে যেমন ‘কাআ’(কায়া) রুপ দেহের পঞ্চ ইন্দ্রিয় কে যেমন পাঁচটি ডাল বলা হয়েছে এবং সেই ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যেমন কায়া সাধনার কথা বলা হয়েছে তেমনি নাথ সাহিত্যেও ‘কায়া’ সাধনার কথা আছে –
      “অচেতন রৈলা গুরু কিছু নয় ভাল,
      কায়া সাধিয়া গুরু জিন জম কাল।’
এখানে  গোর্খনাথ কর্তৃক  মীননাথের চেতনা ফিরিয়ে আনার উপদেশ দেওয়া হয়েছে এবং কায়া সাধনার দ্বারা গ্রুরুকে এই মায়া থেকে মুক্তির কথা বলেছেন। এখানে চর্যাপদ এবং নাথ সাহিত্যে গুরু-শিষ্য পরম্পরা লক্ষ্য করা যায় ।
        আবার চার্যার ‘৬’ নং পদে আছে- 
        “কাহেরে ঘিনি মেলি অচ্ছহ কীস।…
        তিন ন চ্ছুপই হরিণা পিবই ন পাণী।
        হরিণা হরিণির নিলঅ ণ জাণী।।
        হরিণী বোলঅ সুণ হরিণা তো।
        এ বন চ্ছাড়ী হোহ ভান্তো।।
        তরঙ্গতে হরিণার খুর ন দীসঅ।”
এই পদে ‘হরিণ’ অর্থাৎ জীবাত্মা আর ‘হরিণী’ অর্থাৎ পরমাত্মার মিলনের কথা বলা হয়েছে। জীবাত্মা হরিণ মায়ায় পরে সেটাকে সত্য বলে মেনে নিয়েছিল অর্থাৎ জীবাত্মা ও পরমাত্মা রংস হয়েও পরমাত্মাকে ভুলে মায়ার জগতকেই সত্য বলে মনে করে নিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হরিণটির মুক্তি ঘটল এবং শেষে হরিণটির এমন অবস্থা হল যে, মায়ার জগত থেকে বেরিয়ে এসে জগতের সব কিছুকে এমন কি খাদ্য- পানীয়কেও বর্জন করল। আর তখনই পরমাত্মার আহবানে তার মুক্তি ঘটল। আবার ‘28’ নম্বর পদে আছে দেহের মধ্যে উচ্চতম শৃঙ্গের নৈরাত্মার অবস্থান যা বাউল সাধকেরাও মনে করেন দেহের মধ্যে ঈশ্বরের অবস্থানকে। তাই তারা দেহ সাধনার কথা বলেন–
       “আমার মনের মানুষ যে রে,
       আমি কোথায় পাব তারে,
                     বেড়াই ঘুরে ঘুরে।।”
এখানে ‘মনের মানুষের’ সাধনার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ ঈশ্বরের সাধনার কথা বলা হয়েছে। দেহের মধ্যে ঈশ্বরের অবস্থান বাউলেরা স্বীকার করে নিয়েছে। আবার সুফিরা ও একই কথাই বলেছে। কিন্তু এই ঈশ্বরকে আমরা চিনতে পারিনা, বিভিন্ন সাজসজ্জায় আবৃত থাকার কারণে। তাই ‘28’ নং চরর্যায় আছে–
      “উঁচা উঁচা পাবত তহিঁ বসই সবরী বালী।
       মোরঙ্গি পীচ্ছ পরহিণ সবরী গিবত গুঞ্জরী মালী।।….
       নানাতরুবর মৌলিল রে গঅণত লাগেলী ডালী।
       একেলী শবরী এ বন হিগুই কর্ণকুণ্ডলবজ্রধারী।।”
এই নৈরাত্মা রুপি অর্থাৎ ঈশ্বর ময়ূরপুচ্ছ অর্থাৎ ভাববিটল্পাদি, কর্ণকুণ্ডল অর্থাৎ জ্ঞানমুদ্রা আবৃত থাকায় আমরা তাকে চিনতে পারিনা। তেমনি নাথ সাহিত্যে (গোর্খবিজয়ে) দেখা যায় মীননাথ যখন মায়ায় পড়ে সত্যটাকে চিনতে পারছেন না তখন গোর্খনাথ গুরুকে উদ্ধারের জন্য বলেছিলেন–
       “কদলীত আসিয়া পাইলা উপভোগ,
       কামিনীর কোল পাইয়া পাসরিলা যোগ।
       আপনি হইলা ভুলা না চিনিলা পিছে,
       গুরুর বচন তুমি সব কৈলা মিছে।”
এখানে মীননাথ মায়ায় পড়ে গুরুর সব বচন ভুলে গেছে এবং মায়াকেই সত্য বলে মেনে নিয়েছে। কিন্তু গোর্খনাথ শেষ পর্যন্ত মীননাথের পুত্র বিন্দুনাথকে মেরে ফেলে আবার বাঁচিয়ে দিয়েছে এবং শেষে সকলকে বাদুড়ে পরিণত করেছে। এভাবে গুরুকে সত্য দর্শন করিয়েছে যে, জগতের সবকিছুই মিথ্যা, একমাত্র ঈশ্বরই সত্য। এই সত্য দর্শন এরপর মীননাথ আবার স্বধর্মে বা কর্মে ফিরে আসে। নিজের কি করনীয় তা সে বুঝতে পারে। আবার মুক্তি কিভাবে আসে তা বলতে গিয়ে চর্যার মতো নাথ সাহিত্যে বলা হয়েছে–
      “নাদ নয়, বিন্দু নয়, রবি-শশীমন্ডল নয়,
       চিত্তরাজ স্বভাবতই মুক্ত।
       ঋজু রে ঋজু ছাড়িয়া বাঁক লইও না,
       বোধি নিকটেই লঙ্কায় যাইও না।”
এই একই কথা ‘৫’ নং চর্যায় আছে–
       “সাঙ্কমত চড়িলে দাহিণ বাম মা হোহী।
       নিয়ড্ডী বোহী দূর মা জাহী।”
অর্থাৎ সাধ্য বস্তুকে পেতে হলে ডান- বাঁম বা বাঁকা পথে যাওয়া উচিত নয়, সব সময় সোজা পথে অর্থাৎ সমস্ত রকম লোভ- লালসা, কামনা- বাসনা,মায়া - মোহ ত্যাগ করে ঈশ্বরের সাধনা করা উচিত। সাধন পথে যেতে যেতে কখনো কামাসক্ত হওয়া যাবে না বা ডান- বামে চলা যাবে না।
      বাউলেও আছে নাথ সাহিত্যের মত চারি চন্দ্রের কথা। লালনের একটি গানে আছে-
        “চেয়ে দেখ না রে মন দিব্য নজরে।
         চারি চাঁদ দিচ্ছে ঝলক মণিকোটার ঘরে।
        হলে সেই চাঁদের সাধন অধরা  চাঁদ পায় দরশন,
        পায় রে চাঁদেতে চাঁদের আসন রেখেচে ফিকিরে।।”
এখানেও সেই চার চাঁদের কথা বলেছেন লালন। এই চার চাঁদের সাধনা করলে অধরা চাঁদ পাওয়া যায়। অর্থাৎ কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ ত্যাগ করে অধরা চাঁদের অর্থাৎ মনের মানুষের বা ঈশ্বরের সাধনা করলে তাকে পাওয়া যায়। কিন্তু তার জন্য আগে মায়া মুক্ত হতে হবে। অর্থাৎ চোখের সামনে দৃশ্যমান জগতের মায়াকে দূরীভূত করতে হবে এবং মনের সেই দিব্য নজর কে জাগাতে হবে, তবেই সাধ্যবস্তুকে পাওয়া যাবে। এই একই কথা  বৈষ্ণব সাহিত্যেও রয়েছে। তারা ‘রাধা -কৃষ্ণ’ রূপকের মাধ্যমে তার কথা বলেছে। রাধা অর্থাৎ ‘জীবাত্মা’ কৃষ্ণ অর্থাৎ ‘পরমাত্মার’ অংশ হয়েও প্রকৃত স্বরূপ ভুলে এই মায়ার জগতে পড়ে আছি আমরা সকলে। সকল জীবকে রাধা বলে অভিহিত করেছে বৈষ্ণব সাহিত্য। রাধাকে যেমন দেখা গিয়েছিল যে, শ্রীকৃষ্ণের স্ত্রী (লক্ষী) হয়েও নিজের সব ভুলে গিয়ে আইহনের ঘরনী তে পরিণত হয়েছে, কৃষ্ণকে সে তখন আর চিনতে পারছে না। কিন্তু মাঝেমধ্যে  বাঁশির শব্দে তার মন বিচলিত হচ্ছে। ঠিক তেমনি কৃষ্ণের বাঁশির শব্দ আমাদের কানে এসে পৌঁছায় না, যারা সিদ্ধ যোগী তারাই মাত্র তারা আভাস পায়। রাধার মতো আমরাও মায়ায় পড়ে নিজের প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে ভুলে গিয়েছি এবং মায়ার জগত- সংসারকেই সত্য বলে মেনে নিয়েছি। একমাত্র সিদ্ধ সাধকের আই সেই বৃন্দাবনে কৃষ্ণের বাঁশির আওয়াজ শুনতে পায়, কিন্তু তাদের কাছেও তা ধরাছোঁয়ার বাইরে। শুধুমাত্র মনকে মাঝেমধ্যে বিচলিত করে। শেষপর্যন্ত যেমন রাধার মায়া কেটে গিয়েছিল এবং নিজেকে ও কৃষ্ণ কে চিনতে পেরেছিল, সেই জন্যই বৈষ্ণব সাহিত্যে এই ‘রাধা’ ও ‘ কৃষ্ণ’ রূপকে সাধনতত্ত্বের কথা বলা হয়েছে।
       গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের মূল তত্ত্ব হলো ‘অচিন্ত্যভেদাভেদতত্ত্ব’ এই তত্ত্বের উপর ই এই ধর্ম প্রতিষ্ঠা। এই তত্ত্বে বলা হয়, জগতের সব কিছু ব্রহ্ম থেকে সৃষ্টি। অর্থাৎ এই জীবজগৎও ব্রহ্ম বা ঈশ্বর বা কৃষ্ণ থেকে সৃষ্টি। সুতরাং সমস্ত কিছুই কৃষ্ণের অংশ। সেই জন্য ভক্ত ও ভগবানের মধ্যে কিছু ভেদ বা  বৈসাদৃশ্য এবং কিছু অভেদ বা মিল আছে। যেমন মাতা- পিতার সঙ্গে সন্তানের ভেদাভেদ আছে, তেমনি কৃষ্ণ ও জীব অর্থাৎ ভক্ত ভগবানের মধ্যেও ভেদাভেদ আছে। কিন্তু আমরা মায়ায় পড়ে তা যাই, যেমন রাধা ভুলে গিয়েছিল। তেমনি আমাদের দেহের স্বরূপকে জানতে হবে আর তার জন্য প্রয়োজন মায়া অপসারণ করা। এইজন্য চর্যাপদ, বাউল, নাথ সাহিত্য, শক্ত, সুফি প্রভৃতি সাহিত্যে দেহ সাধনা, মায়া মুক্তির কথা বলা হয়েছে। জীবজগৎ যে কৃষ্ণের অংশ তা বোঝাতে ‘শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতে’ কৃষ্ণদাস কবিরাজ বলেছেন-
       “অনন্ত স্ফটিক যৈছে এক সূর্যভাসে।
       তৈছে জীব গোবিন্দের অংশ প্রকাশে।।”
দেহের মধ্যে যে ঈশ্বরের অবস্থান এবং দেহ সাধনার দ্বারাই যে জীবের সাধ্য বস্তু লাভ সম্ভব সেকথা শাক্ত সাহিত্যও আছে। রামপ্রসাদ সেন এর একটি পদে আছে-
        “ডুব দে রে মন কালী বলে।
         হৃদিরত্নাকরের অগাধ জলে।।
         রত্নাকর নয় শূন্য কখনো,
         দু-চার ডুবে ধন না পেলে।
         তুমি দম সামর্থে এক ডুবে যাও,
         কুলকুণ্ডলিনীর কূলে।।”
এখানেও সেই দেহের মধ্যে ‘রত্নাকরের’ অবস্থানকেই বোঝানো হয়েছে। দেহের মধ্যেকার সেই রত্ন আরোহন করার কথাই এখানে বলা হয়েছে। আবার শক্ত সাহিত্যেও সেই মায়াবাদ এর কথা এসেছে রামপ্রসাদের একটি পদে-
      “কেবল আশার আসা, ভবের আসা, আসা মাত্র হলো
      যেমন চিত্রের পদ্মেতে পড়ে ভ্রমর ভুলে রলো।।
     মা নিম খাওয়ালে চিনি বলে, কথাই করে ছলো।
     ওমা! মিঠার লোভে, তিত মুখে সারা দিনটা গেলো।।”
এই পদেও আছে মায়ার কথা, যেকথা চর্যাপদ থেকে শুরু করে বাউল, সুফি বিভিন্ন সাহিত্যে আছে। এই পদে পদকর্তা মায়ের (ঈশ্বরের) কাছে অনুযোগ জানিয়েছে, এই মায়া থেকে উদ্ধার করার জন্য। এই মায়া মুক্তি এবং সাধ্য লাভের কথা বৈষ্ণব সাহিত্যে বা গৌড়ীয় বৈষ্ণব সাহিত্যে সাধ্য- সাধন তত্ত্বে বলা হয়েছে। রামানন্দের সঙ্গে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য দেব গোদাবরীর তীরে এই তত্ত্ব আলোচনা করেছিলেন। এখানেই উঠে এসেছিল জ্ঞানশূন্য ভক্তির কথা। অর্থাৎ জ্ঞানশূন্য ভক্তি দ্বারাই যে ঈশ্বর লাভ করা যায় তার কথা-
       “জ্ঞানের প্রয়াস মুদপাস্য নমন্ত এব
       জীবন্তি সম্মুখরিতাং ভবদীয়বার্তাং।
       স্থানস্থিতাঃ শ্রুতিগতাং তনুবাঙ্মনোভি-
       র্যৈ প্রায়শোহজিতজিতোহপ্যসি তৈ স্ত্রিলোক্যাং।।”
                                (শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত(শ্রীমৎভাগবত))
এখানেও সেই জ্ঞান মার্গের পথ ছেড়ে ভগবানের উদ্দেশ্যে উপাসনার কথা বলা হয়েছে। আবার রামানন্দ মহাপ্রভু চৈতন্য সঙ্গে আলোচনার সময় ‘প্রেমভক্তি’ যে সর্বসাধ্যসার তাও বলেছেন।  আর এই প্রেমভক্তি কি রকম হওয়া চাই, পা বলতে গিয়ে ‘কান্তা প্রেম সর্বসাধ্যসার’। অর্থাৎ প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যে যেমন প্রেম ভক্তি থাকে, সেরকম ভক্তির দ্বারাই ঈশ্বরকে লাভ করা যায়। এর উদাহরণ হিসাবে ‘রাধার’ কথা রামানন্দ বলেছেন। অর্থাৎ কৃষ্ণ বা ভগবানকেই সবকিছু ধরে জাগতিক বাধা বন্ধন অতিক্রম করে কৃষ্ণের সাধনা করতে হবে।
       আবার সুফিবাদেরও অভীষ্ট হচ্ছে ঈশ্বরে লীন হয়ে যাওয়া, যা কিছুটা সহজিয়া বৈষ্ণব ধর্মের মতো ঈশ্বরকেই সর্বোস্ব মেনে তার কাছেই আত্মসমর্পণ করা, বাউলে যা ‘মনের মানুষের’ সন্ধান, চর্যাপদে কায়াসাধন, নাথ সাহিত্যেও কায়াসাধন। এই যে সুফিবাদে ঈশ্বরের সঙ্গে লীন হয়ে যাওয়া অর্থাৎ জীবাত্মা ও পরমাত্মা একাত্ম হওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি স্তরের কথা বলা হয়েছে। ঈশ্বরের নৈকট্য লাভে ইসলামী শাস্ত্রে সাধন পথের চারটি স্তর অতিক্রম করতে হয়-শরিয়ত, তরিকত, হকিকত ও মারিফত। পাঞ্জু শাহ  তাই বলেন-
        “আল্লাহতালা চার রাহা করিয়াছে তায়।
        শরীয়ত তরিকত জানিবা ত্বরায়।। 
        হকিকত মারুফত এই চারি হয়।
        চারি রাহে দুই ভেদ জানিবা নিশ্চয়।।”
এই চারটি স্তরের মধ্যে মারিফত ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভের সর্বোচ্চ স্তর। এই স্তরে তর্ক- যৌক্তিকভাবে পরিহার করা হয়। ঠিক একই কথা সহজিয়া বৈষ্ণব সাহিত্যে ও বলা হয়েছে, যে যুক্তি- তর্কহীন ঈশ্বরের প্রতি প্রেম নিবেদন। এই তর্ক- যুক্তি পরিহার করেই ঈশ্বরের জ্ঞান লাভ করা সম্ভব । সুফি যখন ফানা থেকে বাকায় পৌঁছেন তখন তার বিভ্রম কেটে যায়। সাধক সার্বিক মিলনের স্তরে একাত্ম হয়ে যান। সুফিবাদেও বলা হয়েছে নিজেকে জানার দ্বারাই ঈশ্বরকে জানা যায়। এ কথা চর্যাপদ, নাথ সাহিত্যে ও বাউলেও আছে। চর্যাপদ, নাথ সাহিত্যে এবং বাউলে সেই দেহ সাধনার কথা বলা হয়েছে। আবার সুফিবাদেও পীর বা গুরু শিষ্য কে পথ দেখান, যেমন চর্যাপদ, নাথ সাহিত্য, বৈষ্ণব সাহিত্য, ও বাউলে গুরু- শিষ্য পরম্পরা আছে, তেমনি সুফিবাদেও আছে‌।
        চর্যাপদ, নাথ সাহিত্য, বৈষ্ণব সাহিত্য, শাক্ত সাহিত্য,  বাউল, ও সুফিবাদ প্রভৃতির যদি এভাবে তুলনামূলক আলোচনা করা হয় তবে দেখা যাবে উভয়ের মধ্যেই সাদৃশ্য বর্তমান। উভয় সাহিত্য ধারাতেই সাধ্য বস্তু লাভের জন্য একই রকম পথের কথা বলা হয়েছে। চর্যাপদে যেমন দেহ সাধনার কথা আছে, তেমনি নাথ সাহিত্যেও আছে। বৈষ্ণব সাহিত্যে শ্রীকৃষ্ণের কে লাভের কথা বলা হয়েছে জ্ঞানশূন্য ভক্তির দ্বারা অর্থাৎ সাধকের মনে জগতের কোনো রকম জ্ঞান থাকবে না । নিঃস্বার্থভাবে ভগবানের চরণে প্রেম নিবেদন করা । শ্রী চৈতন্যদেবের শেষ অবস্থা যেমন হয়েছিল দীব্যউন্মাদ, কোনোরকম জাগতিক জ্ঞান ছিল না। ঠিক যেমন চার্যার ‘৬’ নং পদে হরিণ ও হরিণীর রুপক এর মাধ্যমে দেখানো হয়েছে। হরিণের যেমন শেষ অবস্থা হয়েছিল, জাগতিক মায়া কেটে গিয়েছিল, খাদ্য-পানীয় সবকিছু ত্যাগ করেছিল। এক চরম উন্মাদের মতন অবস্থা হরিণেরও হয়েছিল, তার পরেই হরিণ মোক্ষলাভ করেছিল। নাথ সাহিত্যেও গোর্খনাথ কর্তৃক মীননাথের মায়া মুক্তি ঘটানো হয়েছে। শাক্ত সাহিত্য, বাউল, সুফিবাদ প্রভৃতিতেও মায়া মুক্তির কথা বলা হয়েছে। আবার এইসব সাহিত্যে দেহ সাধনার দ্বারা যে সাধ্য বস্তু লাভ করা যায় তাও বলা হয়েছে।
       শুধু এইসব সাহিত্যেই নয়, মাই পড়ার কথা ওমা মুক্তির কথা আধুনিক যুগের রচিত দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্বপ্নপ্রয়াণ কাব্যেও আছে- 
         “এই ঠাঁই মনেরে সংযত কর, সিদ্ধি লাভ হবে।
                     হয়্যে উপবিষ্ট
                     হও উপদিষ্ট,
      সেই ধন পা'বে যা’র তুল্য নাই ভবে।।”
আবার এখানেও সংসার রূপ গভীর অরণ্যের কথা বলা হয়েছে। আর এই অরণ্যে মায়া রূপে সাপ, ডাকিনী, বাঘ বাঘ প্রভৃতির কথা বলা হয়েছে। এই গভীর অরণ্য রুপ সংসারকে পার করলেই (কাব্যে যাকে পর্বত শিখর বলা হয়েছে) সেখানে উপনীত হলেই পরম কাম্য বস্তু পাওয়া যাবে। কিন্তু এই বন পার করা সহজ নয়, সেখানে নানান হিংস্র জন্তুর বাস। বাঘ, সাপ প্রভৃতি ভয়ঙ্কর জন্তুর দাঁড়া আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা অর্থাৎ এই গহীন ভব সংসার করতে গেলে লোভ, মায়ায় পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই মায়া থেকে মুক্ত হওয়াও কঠিন। চর্যাপদে যা সাঁকোর রূপকের মাধ্যমে বলা হয়েছে যে, ডান-বাঁমে গেলেই বিপদ, এখানেও ঠিক তাই হিংস্র জন্তুর দ্বারা আক্রান্তের সম্ভাবনা। অর্থাৎ সংসারে চলতে গেলে ডানে-বাঁমে বা লোভ-লালসার দ্বারা আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা। কিন্তু আমাদের উচিত লোভ-লালসা মুক্ত হয়েই সোজা পথে চলা।
       এই লোভ - লালসা বা মায়া - মোহ থেকে মুক্ত হওয়ার কথা চর্যাপদ থেকে শুরু করে বাউল, সুফি সমস্ত সাহিত্যেই বা ধর্মীয় আদেশেই পাওয়া যায়। কিন্তু চর্যাপদ এ সাধ্য বস্তু রূপে যেমন মোক্ষলাভের কথা বলা আছে, তেমনি বৈষ্ণব বা গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম বা সাহিত্যে ঈশ্বর লাভের কথা বলা আছে। তেমনি নাথ সাহিত্যে অমরত্ব লাভ, সুফিতে মনের মানুষ বা ঈশ্বর লাভের কথা বলা হয়েছে। এভাবে দেখলে দেখা যাবে সাধ্যবস্তুর কিছুটা পার্থক্য থাকলেও সাধ্যবস্তু লাভের যে পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে তা মূলত একই। লৌকিক জগতের মায়া মুক্ত হয়েই যে সাধ্য বস্তু লাভের পথে অগ্রসর হওয়া যায়, সেই কথা সকল সাহিত্যেই আছে। এই মায়ার জন্য আমরা আমাদের প্রকৃত স্বরূপটাকে চিনতে পারি না। আমরা আমাদের উদ্দেশ্য- লক্ষ্য সম্পর্কেও ভুলে যাই এবং এই জাগতিক মায়াকেই সত্য বলে মেনে নেই। এই মায়া মুক্তির কথা, সাধ্যকে লাভ করার পদ্ধতির কথা চর্যাপদ, নাথ সাহিত্য, বৈষ্ণব সাহিত্য, বাউল, সুফি, শাক্ত সাহিত্য মধ্যযুগের এই সাহিত্য ছাড়াও আধুনিক যুগের সাহিত্য আছে। যেমন- ‘স্বপ্নপ্রয়াণে’ও সেই  রকম  কথা বলা হয়েছে। এইসব সাহিত্যেই মায়া মুক্তির উপদেশ দেওয়া আছে এইসব সাহিত্য গুলির মধ্যে তুলনা করলে সাদৃশ্যই চোখে পড়ে।

মিঠু মল্লিক বৈদ‍্য

খুকির চাওয়া

খুকির প্রশ্ন "কিসের এতো হাহাকার?
ভারী বাতাস, কেমন বারুদ বারুদ গন্ধ !
ঐ--দূরের কোণে লা-ল আকাশ
মনে হয় আগুন,কিসের মাগো?
মাটিতে নেই সৌদাঘ্রাণ,রক্তের বিদঘুটে
গন্ধ নাকে লাগছে,কেন মাগো?

কালো ধোঁয়া,পাখিদের হাহুতাশ
বিষাক্ত বাতাস,অক্সিজেনের  ঊনতা
বাঁচার তাগিদ, ছুটাছুটি এদিক ওদিক
অগুনিত জনতার আত্মচিৎকার।
বিধ্বস্ত জীবন, ধ্বংসের লেলিহান শিখা
বলল খুকি  এই কোন পৃথিবী ?

নিদারুণ শত্রুতা,আমার মতো
শত শিশুর ক্ষুধার কাতরতা কানে বাজে,
যুদ্ধ নেশায় মানবিক ধর্মে দীনতা,
বাঁচার আর বাঁচানোর আশায়  সহস্র উদ্বাস্তুদের ছুটেচলা,বীভৎস সর্বনাশ,প্রশ্ন খুকির
এত যাতনায় কিসের তৃপ্তি?
 
ততাই আমার সেই খুকি,বলল এসে 
"সবুজের বুকে বাঁচতে এসেছি আমরা
চাই না এই ভয়াবহতা,চাইনা বিবাদ -রক্তক্ষয়,
চাই না মানচিত্রের মর্মঘাত 
মাটির ঘ্রাণে, প্রেম নিবন্ধে আমাদের বাঁচতে দাও
শান্তির বাতায়ন খোলে মুক্ত পৃথিবীর বুকে
হাসার  অধিকারটুকু দাও।"

রঞ্জন ভাওয়াল

মা গো জীবন দিতে চায়

রক্ত মাখা শ্যামল চাদর
তোমার সর্ব গায়
কোটি সন্তান তোমার বুকে
আজ পাহারায়। 
ওরা যে গান গায় 
মা-গো জীবন দিতে চায়। 
ভয় পেওনা শত্রু তোমার
আসুক যতই ঝড়
তোমার বুকে সূর্য সেনা 
বাঁধছে নতুন ঘর। 
যাবেনা কেউ ছেড়ে তোমায়
মা-গো জীবন দিতে চায়। 

হাজার তারা নীল আকাশ
গায় তোমার-ই গান--
রক্ত দিয়ে জীবন দিয়ে
রাখছে তোমার মান। 
শুধু তোমার ইশারায়
মা-গো জীবন দিতে চায়

কন্ঠে মা-গো যাদু মাখা
শীতল মধু জল
আছে কি আর কোনো দেশে? 
তোমার গাছের ফল। 
কেউ যাবে না তোমার মায়ায়
মা-গো জীবন দিতে চায়। 

তোমার বুকে নদীর জলে
বট বৃক্ষের ছায়া
তোমার মতো আছে কি মা? 
বুকে এত মায়া। 
চায় না কেহ দেশ হারায়
মা-গো জীবন দিতে চায়।

সোনালী মণ্ডল

স্মৃতি

এমনি এক বৃষ্টির দিনে,
ঝোড়ো হাওয়ায় উথাল পাথাল করে,
দুটি মনে ছিলো জনসম্মুখে রাজ পথে,
ভিজে ছিলো সমস্ত বই খাতার সঙ্গে,
ভিজে ছিলো কেবল ঐ দুটি মনে।
সময়টি তখন উনিশের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে,
সে বোধ হয় সবে এসেছে একুশে,
দুজনেই চলেছে উদ্দাম স্রোতে ভেসে,
কত শত মুহূর্ত উকি মারে নিঃসঙ্গতার ঘরে,
আঁকড়ে থাকা শুধু তারই স্মৃতিতে।
মনে পড়ে সেই কলেজ ক্যান্টিনে,
জমিয়ে আড্ডায় গানের তালে নেচে,
সমস্ত দুপুরের কিছুটা সময় গেছে,
চোখাচোখিতে ভরা প্রিয় লাইব্রেরিতে বসে,
একই পেয়ালায় চুমুকের খোশ মেজাজে।
এমন অনেক রাত কেড়েছিল ঘুম নিঃশব্দে,
অন্ধকার ফাঁকা ঘরে পাইচারি করে,
টেবিল ল্যাম্পের সামনে ডাইরির পাতাগুলিকে,
ছিড়ে টুকরো টুকরো করে উড়ে ছিলো ঘরে,
জানা ছিলোনা কি ভাষা লিখবে।
আজো তারা ভাবে নতুন করে নতুনের খোঁজে,
ইতিহাস গোড়বে নতুন সূর্যের সম্মুখে,
আজো তারা পথ খোঁজে চুপিসারে,
অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ঘর বাঁধে দুজনে,
আজো তারা কাতর ধর্মের বেড়াজালে।
কোনো এক সুবর্ণ সুযোগের সন্ধিক্ষণে,
হাতছানি পেয়ে ছিলো ঘরের বাহির হোতে,
সার্থক ছিলোনা উদ্দেশ্য সফলে,
আজ বোধহয় দুজনারই চুলে পাঁক ধরেছে,
জীবনের সব বসন্ত হারিয়েছে গোধূলিতে।
আজো তেমনি এক মুহূর্ত মনে পড়ে,
সব কিছুই হয়তো পূর্ণতা পেতো একটু সার্থপর হলে,
তখনো ছিলো বন্ধুর সেই পথে,
আজো আছে সমাজ ধর্মের তালে,
শুধু মিলছেনা জীবনের অঙ্ক হিসাবে।।

সৌরভ বাগচী

বসন্ত ঋতুর রঙিন উৎসব

রঙে রঙে রাঙা হল, 
বসন্ত ঋতুর প্রকৃতি। 
রঙবেরঙের সাজেই এই মার্চ মাসের , 
দোল ও হোলি উৎসবের পরিচিতি । 
কথাও থাকে রঙের জোগান   তো ; 
কোথাও থাকে বসন্তের 
ফলের  বাহার , 
উৎসবমুখর মানুষজনের 
চলতে থাকে ; 
নানান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আহার। 
সরবত, মিষ্টি, নোনতা , ঠান্ডাই বহুজনের ; 
আয়োজন হয় নানান রকম , 
সান্ধ্যকালীন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও রবিঠাকুরের গানে ;
তা পূর্ণতা পায় 
আরো কয়েক কদম। 
এভাবেই বছর বছর রঙের উৎসবে নানাভাবে ; 
পালিত হয় দোল এবং হোলি , 
আর ভরে ওঠে  উৎসবপ্রেমী অসংখ্য মানুষের; 
রকমারি ভোজন ও সুরের বৈচিত্র্যময় সব ডালি।

রাজীব বসাক

অন্য বসন্ত

কবে যে বসন্ত এসে চলে গেল, তারা তা জানে না।
কোকিলের কুহু ডাক, শোনা যায় না আর,
পড়ে না পদতলে,পাতার মর্মর শব্দ,
দোলের রঙমাখা আনন্দ, ব‍্যস্ত জীবন পায়নি স্বাদ,
কবে যে বসন্ত এসে চলে গেল, তারা তা জানেনা।
ডাস্টবিনে ফেলে রাখা কত খাবার,
অথচ খালি পেটে ক্ষুধার্ত কতশত আমার শহর,
তারাই ইমারত গড়ে, জীবন চলে বস্তীর ভীড়ে,
বাদল দিনে শরীর ভেজায়,হাড়ভাঙ্গা শীত বহন করে শরীরে,
কবে যে বসন্ত এসে চলে গেল, তারা তা জানে না।
চাঁদের আলো ছুঁইনি মাটি, সূর্য ঢাকা ইমারতের ছাঁদে,
জোনাক পোকা আঁধার খোঁজে,
বিষাক্ত রাসায়নিকের মাঝে,
ফুলগুলি পাপড়ি মেলে হতাশ হয় অন্ধের শহরে,
দিনরাত্রি মিথ্যে হয় পৃথিবীর নিকট,
কবে যে বসন্ত এসে চলে গেল, তারা তা জানে না

আলমগীর কবীর

সীমান্ত

দেশের সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া
চুড়ান্ত সীমানায় পিলারের স্তম্ভ।
স্বদেশী কিছু পরিবারের বসবাস।
পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ!
উশৃঙ্খল কিছু অমানুষ।
জাতির নামে কলঙ্ক
আর আছে কিছু সমাজের আবর্জনা।
মাঝে মাঝে কিছু গোবরে পদ্মফুল।
ঘরে ঘরে মানুষ হয়ে জন্ম
আর অমানুষ হয়ে বেড়ে উঠার প্রসার।
দিন দিন পরাধীনতার বিস্তার।
হাতেগোনা এক শ্রেণী তার কারণ।
বাকিরা তার প্রভাব ভুক্ত প্রাণী।
একসময় ছিলোনা কোনো বাধা;
ছিলোনা কোনো কাঁটাতার নামে বেড়া
জানতাম না “জিরো পয়েন্ট” নামে কোনো পরাধীনতার
শেকল।
নাগরিকদের স্বাধীনতা হচ্ছে ক্ষুন্ন
সীমান্তরক্ষী বাহিনী থেকেও হচ্ছেনা কোনো সংস্কার।
সীমান্ত আজ ভরে গেছে স্মাগলার আর অমানুষো
অসহায় দিন কাটছে আর ভুগছে কিছু ভালো মানুষ!

জয়িতা দেবনাথ

আবার সেই অন্ধকার

এখনো অন্ধকার,রাত এখনো 
চুমু খায়নি শিশিরের কপালে,
চারিদিকে শুধু স্বপ্ন ভাঙার হাহাকার।
করোনা নদীর ভাঁটার টান
প্রচন্ড গভীরে তলিয়ে নিলো জীবনটাকে।
ভেবেছিলাম এই বুঝি অন্ধকার শেষ!
আবার নতুন করে আলোকে ছুঁতে পারবো,
কিন্তু আবার সেই অন্ধকার রূপী
মহামারী ফিরে এলো দেশে।
আবার অনাহারে কাটাতে হচ্ছে দিন
স্বপ্ন সত্যির সব কাঁচামাল নষ্ট হয়ে গেলো,
কিন্তু স্বপ্ন গুলো ঠিক আমাকে
 জাপ্টে ধরে বেঁচে রইলো।

সৌমেন্দ্র দত্ত ভৌমিক

ভিন্নতার সময়ে 

দিব্যি প্রতিবেশীর মাটি পৃথক বুঝি চলনে। 
কাঁটাতারের আক্রোশ চুঁয়ে চুঁয়ে পড়ে 
দুটি দেশের চাওয়া -পাওয়ার মধ্যিখানে। 
বেড়া ভেঙে একাত্ম হতে কত কত চাহিদা 
গুমরে গুমরে মরে কলিজার হাহাকারে। 
তবু নদী বয়ে চলে তরীটির উথাল-পাথাল 
সাক্ষী হয়ে নিজস্ব ভঙ্গিমায়। 
এখানেই দুঃখ হামাগুড়ি দিয়ে ক্ৰমবর্ধমান ,
এখানেই ভিন্ন ভিন্ন অস্তিত্বে মনটা আনচান। 
তবে আরো আরো সহজ-সরল জীবনভূমিতে 
দু-পাড়ের মানুষের একাত্মতাই বড় প্রাঞ্জল।
কাঁটাতারের  বিভীশিখায় ভাবনার অলিগলি এড়িয়ে 
এখনো রবিঠাকুর বেঁচে দুটি প্রান্তের জাতীয় সংগীতে।
এখানেই সুখ জ্বলজ্বল মুখে বেড়ার আস্ফালন
তুচ্ছাতিতুচ্ছ ভেবে গর্বে অনুভবে দারুণ মাতে। 

নীতা সরকার

রঙিন বসন্ত

বসন্ত আজ জাগ্রত দ্বারে
পলাশের বন বিকশিত হয় রক্তিম ফুলে
হৃদয়ে জাগে প্রাণের দোলা।

কোকিলের কুহু কুহু ডাকে মনে হয়
তোমার আগমনের বার্তা এসেছে।
বসন্তের আগমনে পুরাতন প্রেম উঠে জেগে।
তুমি আসবে বলেছিলে কবে আসবে? 

আমার মন প্রাণ দিয়ে মাখাবো রং
কি রং মাখবে তুমি? 
লাল,নীল,হলুদ,সবুজ
না গোলাপী।

এসেছে আজ রঙের উৎসব
দুয়ার রেখেছি খোলা।
তুমি এলেই মাতবো আমরা রঙিন উৎসবে।
রঙের দোলায় দুলবো দুজনে।

এই নাও রং মাখাও আমার শরীরে
পূরণ হোক প্রেমের জ্বালা।
এমন ভাবে মাখাবে রং
যেন থেকে যাই জীবন ভর।

সহিদুল ইসলাম

 স্বজাতি প্রেমের লীলা

‘মুসলমান মুসলমান আমরা মুসলমান,
মোদের জন্য রাষ্ট্র চাই, নামেতে পাকিস্তান’
এই শ্লোগানে ভারতবর্ষ খন্ড করল যারা।
মুসলিম নিধনে কিছুদিন পর মগ্ন হইল তাঁরা। 
বাঙালি মুসলমানের খুনি উর্দু মুসলমান।
'স্বজাতি প্রেমের' ভন্ডতা নিমেষেই অবসান।
পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে ‘স্বজাতি প্রেমের’ দোহাই দিয়ে,
হাসিল হয়েছে গদিটা শুধু, হুজুগে ভীড়ের রক্ত খেয়ে।
এই পৃথিবীর একটি জাতি মানব সম্প্রদায়। 
ভালোবাসো বিনা যুক্তিতে, মেনে সকল অন্তরায়।

পাপিয়া দাস

বসন্তের  কোকিল

এল রে বসন্ত 
কোকিল সুরে ভেসে।
শীতের পালক ফেলে
নতুন আবরনের উল্লাসে।

বসন্ত জাগে নতুন কুঁড়িতে
বসন্ত জাগে কোকিলের গানে।
বসন্ত হাসে রঙিন  সাজে
ভালোবাসা  জাগায় প্রানে।

হোলির উৎসবে মাতাল চারিদিক 
ফুলের গন্ধে ভ্রমরের গুঞ্জন।
কোকিলের সুরে  সুরে পাখিরা সব গাইছে  গান
কবির হাতে কলম আর চিত্রশিল্পী  দিচ্ছে  তুলির টান।

ঝিমলি আচার্য

মুখরক্ষা

কোকিলের সুমধুর কুহুতানে
 বসন্তের আবাহন ।
 ফাল্গুনী তরঙ্গে অবগাহনকারী কোকিল 
 প্রান্তরে প্রান্তরে সুরের মুক্তা ঝরায়।
 কল-কারখানা ,যানবাহনের রকমারি
 আওয়াজ তার কণ্ঠস্বরের তীক্ষ্ণতার 
 কাছে হারমানে, কখনো কখনো
 শহুরে ঝংকৃত তার সুমধুর স্বর 'কে 
 ফেকাশে করে তুলে ।
 এই সুমধুর স্বর আর ক'জন 
 শহরবাসীর ভাগ্যেজুটে ?
 তার কুহুতানে গ্রাম বাংলা মুখরিত।
 হাজারো কোকিলের প্রাণচঞ্চল 
 উন্মাদনা, উন্মোচিত গ্রামে ।
 খেলা ছলে শিশুরা তার সুরে
 সুর মিলায়, কোকিল সঙ্গ দেয় ।
 আবার ওরা আমাকে ব্যঙ্গ করছে
 ভেবে রাগান্বিত হয়ে উঠে ।
 সঙ্গ ছেড়ে , মুখরক্ষায় ছুটে ।

অভিজিৎ পাল

বসন্ত সংলাপ

তোমার বসন্ত রাধাচূড়া কৃষ্ণচূড়ার হলুদ লাল ,
আমার বসন্ত এখন শুধুই পাতাঝরার কাল ।
তোমার বসন্ত গায়ে জড়ানো পলাশরঙা শাড়ি ,
আমার বসন্ত ফি-বছর হিজল সারি সারি ।
তোমার বসন্ত নিত্যদিন কোকিল ডাকা প্রাতে ,
আমার বসন্ত দুঃখ দারিদ্র নিজের অজান্তে ।
তোমার বসন্ত ভেসে ফাগুনের ফাগ সোহাগে ,
মন কাদায় লুটোপুটি , আমার বসন্ত সংরাগে ।
তোমার বসন্ত অ্যাকুরিয়ামের নীলাভ আলোয় ক্যাটফিস মুখোমুখি ,
আমার বসন্ত প্রত্যাখাত প্রেমের উপাখ্যান রচনাতেই সুখী 
তোমার বসন্ত দখিনা হাওয়া , মন কেমনের ভেলায় ,
আমার বসন্ত চিন্তাভারে অলিন্দে উষ্ণরক্তস্রোত বয়ে যায় 
তোমার বসন্ত বাসন্তিকা রঙের ডালি সাজিয়ে জীবনভর 
আমার বসন্ত চোখে রঙিন হওয়ার স্বপ্ন নড়বড় ।
সুপ্ত বাসনা হৃদি উপবনে সোহাগে কিংবা প্রলাপে ,
মনোবীণায় বসন্তরাগ কোকিলের কুহু কলতান বসন্ত সংলাপে ।

নীতা কবি মুখার্জী

বীর বঙ্গবন্ধু স্মরণে

আমাদের প্রিয় বঙ্গবন্ধু ! সেলাম, তোমাকে সেলাম
তোমার শুভ জন্মদিনে তোমারই গাই গুনগান।
বাংলামায়ের লক্ষ লক্ষ বীর-শহীদ সন্তান
নিজের জীবন তুচ্ছ করে রেখেছে মায়ের মান।

বিজয় এনেছো তুমি ,বঙ্গ- বন্ধু !তুমি আমাদের গর্ব
আমার বাংলা সবার সেরা, হবে না সম্মান খর্ব।
যতদিন রবে বাংলা, বাঙালি অমর থাকবে তুমি
তোমায় নিয়ে গর্ব করবে আমার জন্মভূমি।

আমাদের প্রিয় শেখ মুজিবর, তোমারে করি সেলাম
তোমারই নামের জয়গানে গাই তোমারই শুভনাম
মুক্তিযোদ্ধা নামে তুমি খ‍্যাত বিশ্বভুবন মাঝে
জাতির পিতা তোমারেই বলি, এই নামেতেই সাজে।

জীবনের ব‍্যথা, লড়াইয়ের কথা আজ ইতিহাস কথা
স্বাধীন বাংলার সাথে জুড়ে আছে তোমার জীবনগাথা
শত শত বীর শহীদ হলো তোমার বীর আহ্বানে
মহান দেশের মহান নেতা, তাই তো সবাই জানে।

পাকিস্তানের অত‍্যাচারের যোগ্য জবাব দিলে
সকল ঝঞ্ঝা, সকল বাধা মাথায় তুলে নিলে
তোমার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে, সফল বলিদান
আমার বাংলা বিশ্ব মাঝে পেয়েছে নিজ স্থান।

কতো মায়ের কোল খালি হয়ে গেছে, কতো যে শিশু অনাথ
দেশমাতৃকার মান রেখেছো এক করে দিনরাত
আবালবৃদ্ধবনিতা হয়েছে মুক্তির সংগ্ৰামী
 বীরের মতো আগুয়ান হয়ে থেকেছো অগ্ৰগামী।

জয় বাংলা,জয় মুজিবর, আজো ওঠে শ্লোগান
বাংলা আমার প্রাণের অধিক, একই ঐক‍্যতান
বীর-শহীদদের জয় হোক  আর জয় হোক বাংলার
তোমার নামটি অক্ষয় হোক মুখে মুখে সবাকার।

তোমার মতন বিরল নেতা জন্মাক ঘরে ঘরে
অবহেলা করে জীবনকে, দেখালে দেশই সবার উপরে
বাংলাদেশের ঘরে ঘরে আজও তোমারই পূজা হয়
তোমার মন্ত্রে দীক্ষা নিয়ে তোমারই শপথ নেয়।

শুভ্রা সাহা

পড়ন্ত বাসন্তী

বসন্ত , তোমায় দেখছি কত যুগ ধরে,
যখন ছিলে ভোরের কলমি লতা ,
কেমন টলটলে জলে ঠোঁট খোলে ওরা, 
স্নিগ্ধ বাতাসে ঘ্রাণ নেয় কমলা আলোয় ।

একদিন হারিয়েও যায় জলজদের বুভুক্ষায়, তুমিও যেন কেমন মুখ লুকাও অবহেলায় ।

বসন্ , তুমি  ভুলে যাও, তোমার উত্তাল- বৈভবেও হাজারো কিটের বাসা ।
মধু খেয়ে , ওরাও জানে না -
ছুড়ে ফেলতে নেই যৌবনের লালসা।

বসন্ত , হাতে হাত রেখেই তোমার চলার উচ্ছ্বাস ,
দমকা বাতাসে কেন তবে,  পাপড়িদের বিনাশ !  যারা প্রান ভরে সাজায় তোমারই. পূর্বরাগ ,
বেহাগ সুরে শুধুই কাঁদে বিষাদী নদীর বাঁক।

মেঘ মল্লারে হারায় তোমার মোহনা সুবাস, 
বিষণ্ণ বিকেল আঁকড়ে রাখে অভিমানীর অনুরাগ।

নীলকণ্ঠ সাহা

সুরঙ্গমা 

সংসার ঘরের ব্যস্ততা শেষে-
ঘুমিয়ে তখন এ- শহর। 
সেই নিস্তব্ধ মধ্য রাতে-
তোমার জন্য কলম ধরি সুরঙ্গমা। 
যত হিজিবিজি ভাবনায় 
আঁকড়ে থাকি যেন, 
চেয়ে দেখো সুরঙ্গমা আজ -
শুদ্ধ বাতাসে মিশে যাচ্ছে ভারী বিষ...! 
বোমা, বারুদে পুতিন জেলেনস্কিরা-
যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলায় উন্মত্ত  
 আর,ধ্বংস হয় কত আগামী ..! 
সভ্যতার ইমারত খসে পরে মুহুর্মুহু। 
সংসার সমাজের প্রতিটি রন্ধ্রে
নেমে আসে চরম অবক্ষয় ..! 
তবু- বাঁচি, বেঁচে থাকি-
 নীরব এক যন্ত্রণা সাথে নিয়ে ... 
এমনি করে তুমিও চলে গেছো একদিন ওই দূরে... 
জানি, ঘুমিয়ে আছো ওই শান্তির দেশে তুমি আজ। 
আর দেখো না এ- পৃথিবীর তরে
থেমে গেলে এ-যুদ্ধ খেলা, দেখো চেয়ে না হয় তখন- 
হাসবে আগামী পৃথিবী যখন আবার ...। 

          

অনুমন

স্বাধীন তুমি সোনার বাংলা

স্বাধীনতা তুমি শহীদের ভূমি সন্তানহারা মায়ের মুখের হাসি,
ঝর্ণার গান নদীর কলতান 
রাখালের মধুর বাঁশি ।
কবি নজরুল যেন বুলবুল 
তোমার সুরের রেশ,
রবির কবিতা তাঁর তুমি মিতা
ছন্দে দোলাও দেশ।
তুমি স্বাধীনতা যেন রূপকথা
রক্ত নদীর গান,
উদাসী বাউল বনে ফোটা ফুল মা
ঝির সুরের তান।
তুমি অপরূপ সুগন্ধি ধূপ
ভোরের রক্ত রবি,
তুমি বাংলার কন্ঠের হার
সোনার রঙে আঁকা ছবি।
তুমি নকসীরকাঁথা গৌরবগাঁথা
পাখির গানের সুর, 
সুরের আকাশে বাউল বাতাসে
সোনার রোদ্দুর ।
স্বাধীনতা তুমি এই মাটি নমি
সলের মাঠে হাসো,
গোলা ভরা শস্য দিয়ে
 আমাদের ভালোবাসো।

সেখ আব্দুল মান্নান

বসন্ত বিলাপ

তুমি কি জানো করোনার কষাঘাতে
পৃথিবী হাসতে  ভুলে গেছে 
কাঁদতে কাঁদতে শুকিয়েছে চোখের দরিয়া 
আত্মজনের সমাধিতে দুফোঁটা অশ্রুর বদলে
ফেলছে বিরহমেদুর হাপরের দীর্ঘ শ্বাস!

শীত গ্রীষ্ম হেমন্ত বর্ষারা বৈভবের গান ভুলে
নীরব অভিমানের মূর্ছনায় হয়েছে‌ একাকার।
তবুও তুমি পৃথিবীর অবশ‌ মন
পিচকারির বাসন্তীতে রাঙিয়ে দিতে
তুমি নেড়ে চলেছ উদ্দীপনার কড়া অহরহ
সকাল সন্ধ্যে রাত দুপুর প্রহর দ্বিপ্রহর।

পৃথিবীর বুকে আঘাত হানতে হানতে
করোনা আজ বড় শ্রান্ত ক্লান্ত 
যুদ্ধ-বিধ্বস্ত সৈনিকের মত।
তাই বুঝি ভেবেছ তোমার পথ বড় সুগম,
রাঙিয়ে দিতে জীবকুলের উপোসি হৃদয়, 
জ্বালিয়ে দিতে আগুন পলাশ শিমুলের ডালে!

দেখ ভাষা ভুলে পৃথিবী  কুলুপ এঁটেছে মুখে,
বারুদ পোড়া মাংসের গন্ধে বিষাক্ত বাতাস,
কোথায় কেমন করে ফেলবে তোমার শ্বাস!
ইউক্রেনের সর্বাঙ্গে রাশিয়ার নির্মম বিভিষিকা,
তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সাইরেন শুনেও
তাবড় তাবড় রাষ্ট্রশক্তি কাঠের পুতুল,
মায়ের বুকে স্তন্যপায়ী শিশুর ভয়ার্ত চাহনি।

বসন্ত, ‌তুমি থাক অন্তঃপুরে নিভৃতে একাকী
দুর্দম ইচ্ছার টুঁটি টিপে
নিগুঢ় শিশুর মত মুখ লুকিয়ে মায়ের বুকে।
পরিযায়ী পাখিরা বাঁধবে না বাসা শাখে শাখে,
ফাগুন আগুনে পুড়বে না পলাশ শিমুলের ডাল,
তুমি এলে পুড়ে খাক হবে যত বাসন্তী বাহার
নিরন্তর গোলাগুলির বিধ্বংসী তান্ডবে।

অভিজিৎ দত্ত

কর্তব্য 

সব মানুষই  জীবনে 
বাঁচতে চাই 
কিন্ত কেন কোনো ভাল কাজে
আগ্রহ নাই?

মানব জন্ম দুর্লভ জন্ম 
যা মানুষ একবারই পাই
তাহলে একে ভালো কাজে লাগাতে 
মানুষের আগ্রহ নাই?

উৎসবে,অনুষ্ঠানে কিংবা বিনোদনে
নিজেদের বিলাস-ব্যসনে 
মানুষ দেদার খরচ করে
একটুকুও খরচ করা যায় না
অসহায় মানুষের কল্যাণে?

আসলে প্রকৃত শিক্ষার 
অভাব আজ সর্বত্র 
ধর্ষণ, ইভটিজিং এর মতো ঘটনার
আজ তাই এতো বাড়-বাড়ন্ত। 

গুরুজনদের করে না শ্রদ্ধা
নিজেদেরই ভাবে সবজান্তা
সমাজে এইভাবেই বিশৃঙ্খলা বাড়ে 
সমাজ এইভাবেই শেষ হবে
খারাপ মানুষের অনাচারে।

রাহুল শীল

হরিতকি

স্থূলতা কমাতে গিয়ে দেখেছি 
নতজানু হয়ে পড়ে নদীর মতো দেহ,
দয়ার বশে নামিয়ে দিই অভিমানরেখা।

অথচ রঙিন ফুল নিয়ে ছুটে বেড়াই ধর্মীয় সভায়
পথে যেতে দেখি শাখানটাং এর গায়ে শীতকালীন বৃষ্টি,
মায়ের বিকেলে বসে থাকে হরিতকি অরন্য
মা হরিতকি পছন্দ করেন,
বাবা দুঃখ পায় আমাদের কোনো‌ জমি নেই ভেবে!

একদিন কিনে আনি এক বিশাল হরিতকি বন
শাখানটাং পাহাড়ের কাছে,
মা তখন ভুলে গেছে‌ হরিতকির ঘ্রান!
মা তখন ভালোবাসতো বাবার দুঃখস্নাত পালংশাকের চাষ।

শীতকাল শেষ হলে তখন আমরা পাহাড়ে হারিয়ে যেতে থাকি,
বনজ দ্রব্য কুড়িয়ে নিতে থাকি,কুড়িয়ে নিতে থাকি
মায়ের জন্য বিকেল, দুপুর আর সকালবেলা
কিন্তু রাতের বেলা কুড়ানো হয় না আমাদের।

মা একদিন বাবাকে কানে কানে বলেন চর্মরোগ আর হরিতকীর সুসম্পর্ক!

অভয় সাহা

বসন্ত বকুল

যাবার পথে
বকুলের গন্ধ...
তবে কি বসন্ত এলো??
বসন্ত তো অস্তগামী রবি!
হৃদয়হীন তারা...
প্রেমের ঝরাপাতা।


আমি এখনো,ওই
শুকনো বকুলের গন্ধ শুকি,
কান পেতে শুনি বসন্তের কোকিলের কা কা..
বসন্ত এসেছিল, কালের নিয়মে চলে গেছে..
দূরে....বহুদূরে....
ওই দিগন্তের-ও দূরে...
দূরে আরও দূরে..

একদিন তুমি চলে গেলে,তারপর...
বকুল গাছটায় আর কুঁড়ি আসেনি,
আসেনি কোকিলের কুহুকুহু তান,
এসেছিল,বুনোকাক 
বসেছিল ওই বকুল ডালে..
মিলেছিল ডানা।
যাবার পথে আজ,
বকুলের গন্ধ...
গাছে গাছে নব পল্লব,
তবে কি আবার বসন্ত এলো??

আমি ওই শুকনো গন্ধ ভালোবাসি,
ভালোবাসি ওই বকুলমালা,
আমি তো গন্ধগোকুল!
জানো,আমাদের শেষ উপহার ছিল,
তোমার চুলের ওই বকুলমালা।
ফিরে এসো কোকিলের কুহুতানে...
ওই বকুলের গন্ধ মেখে!

সানী ভট্টাচার্য

বসন্ত
         
বসন্ত মানেই শীত শেষ,
বসন্ত মানেই ঋতু বিশেষ।
বসন্ত মানেই রং খেলা,
বসন্ত মানেই হৃদয়ের মেলা।
বসন্ত মানেই কোকিলের ডাক,
বসন্ত মানেই প্রেমের আবির্ভাব।
বসন্ত মানেই প্রকৃতির শৈশবের দর্পন,
বসন্ত মানেই প্রকৃতির শোভা- তর্পণ।
বসন্ত মানেই কিশোরদার কোনো রোমান্টিক গান,
বসন্ত মানেই হৃদয়ে শোনা যায় ভালবাসার আজান।

Mar 28, 2022

লিটন শব্দকর

ক্ষতবসন্ত

এখানে বসন্তে যেমন শুকনো ঘাস
দু'পা এগোলে তেমনই মাটির শ্বাস
মাটিতে আবির পড়া ইতিহাস দিন
ইতিহাসের ভেতর যন্ত্রণার সীমানা
সীমানার দুটি পাড়ে গুমরে গুমরে
কোকিল ডাকে,কোকিল কি বাঁশি!
বাঁশি বাজুক তবে, নিরুপায় হাসি।
ভুলে থাকি হাতে মাটি হাতে এখন
ধুলো মাখতে গেলে ভুল হয়ে যায়
ধুলোতেও অবিশ্বাস্য হিমোগ্লোবিন 
বসন্তদিন এভাবে রঙিন হয়ে ওঠে
রঙিন হয় কৃষ্ণচূড়া পলাশের রঙে

গৌরী বর্মন

বসন্ত জাগ্রত দ্বারে 

খরার সময়। পুকুরের জল অনেক নীচে নেমে যায়। মানুষ বুদ্ধিমান। তেলের টিনের কানা নাইলনের দড়িতে বেঁধে দড়ি উঠা নামা করায় আর জল উপরে আসে। মাটিতে ছড়িয়ে যায়। তাই বলে শরীরের শক্তি কিছু কম লাগে তা নয়। পুস্পর বাবা অবশ্য এই কাজে মহাখুশি। রোজ দুপুরের পর বাজারে যাবার সময় ডাক দিয়ে যায়। 

--- মাই গো, ভাইরে লইয়া খেতঅ জল দিয়ো। 

বাবা বাজারে গেলেই ভাইয়ের উচাটন মন মাঠে যাবার জন্য। ঠানদির বিকালের কাজ  নারকেল পাতার কাঠি তোলা, তাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এই সময়ই বেছে নেয় সহদেব। পুস্পর ফোন গান গাইছে --- মেরি জান। মুঝে...। ব্যস্, আর নয়, পুস্প মুখ চেপে ধরে ফোনের। আজও অন্যছবি নয়। 

--- শোন। 

--- শুনা.....। হি হি হাসির হিল্লোল তুলে পুস্প। ওপারে কোকিলের সুর ভাসে। 

--- কি করস?  

--- এই আরেকটু বাদে গাছে জল দিমু....। 

--- আচ্ছা, শোন। ফাগুনের ঝিরিঝিরি হাওয়ায়.... 

--- ভাবলাম.... কি? 

---- বসন্ত উৎসব হো যায়.... 

---- কবে?  

--- এই.... সামনের রবিবার। শোন, তুই না.... তুই পাকিজার ও-ই গানটা... ঐ মীনাকুমারী নাচতে আছিল, সেইসময়ে হুইসেল... রেলের হুইসেল। মনে পড়ছে নি? 

পুস্প চুপ। কেমন যেন ঘোর লাগে।

জলের দাবিতে কাকু, পিসিরা আজ রাস্তায় বসেছিল। এই কিছুক্ষন আগে ফিরলো। সবাই চিন্তায় আছে জলের কি ব্যবস্থা হয়? ঠানদি গল্প বলেছিল, অনেক আগে এই শুখার সময়ে জল চুরি হতো। শুধাংশুস্যারও বলেছিলেন, জলচুরির খবর পত্রিকায় বড় বড় করে বের হতো। তারপর কত মিটিং মিছিল শেষে এই জলের লাইন আসা। মেসিনে জল উঠিয়ে শুধু খাবারের জল নয়, খেতে সেচের জলও পাওয়া যেতো। পাইপ বেয়ে জল মাঠের মাটি ভিজিয়ে.... কিন্তু.... এখন.....। 

---- কি রে?  কি হইল তর? 

--- না, কিছু না। কিন্তু আমার ফোনে এইসব নাই। আমি গান পামু কই?  

--- ও... হো.... হো...। নো চিন্তা.... । ব্যবস্থা করুম... 

ঠানদির গলা ভাসে। 

--- পুস্প, অ পুস্প। মাইয়নি উঠ তর...। 

--- আইলাম ঠানু। 

পুস্প,ভাই, ঠানু, পিসি সব মিলে ঝুলে কাজ সারে। ঐদিকে দিনের ঠাকুর ডিউটি শেষ করে ধীরে ধীরে বাড়ির পথে রওনা দিলেন। বাঁশঝাড়ের ওপারে মাটি, টিলার  গাছ,আকাশ লালে লাল। যেন দিনমনির বিজয় উতসবে ব্রম্ভাণ্ড মত্ত মাতাল। 

আকাশে তারা ফুটছে। দোল আজ পাঁচদিন পার করলো। হাস্নুহানার হাল্কা সুগন্ধি বাতাসে ভাসে। চুপিসারে বলে, এই আর একটু পরে, আধা নয়, মাথা ভাংগা চাঁদ উঠবে। তোমার ডাঁটা খেত জল মেখে কি মিস্টিমধুর হাসি হাসবে। বাঁশ বাতাসে নুয়ে নুয়ে দোল খাবে। কি মজা!  সারাদিনের রোদজ্বলার পর এই বাতাস বড় খুশির। 

---- এই কারেন্ট আইল, কারেন্ট। আও রে সব। 

বাড়ির যে যেখানে ছিল দৌড়ে যায়। কোথায় কার ঘরে মায়ে বোনে লড়াই, নয়তো কোথায় যুদ্ধ, কোথায় মারপিট, কথা কাটাকাটি সব এবারে গোগ্রাসে গিলতে থাকবে। তারপর কাকু বলবে, খবর শুনি।পিসি বলে সিরিয়াল। ভাইয়ের খেলা। এক টিভি বেচারা!! অবশ্য অন্য পথও তো নাই। খবর শোনার এত আগ্রহ মোবাইল আন। না, সেইটা না। পুস্প যদি বলে মোবাইল এনে দাও, তাহলেই  সবার মাথা গরম। 

পুস্প বারান্দায় বসে থাকে। ভিতর থেকে ডাক এলেও যায় না।  চলতে চলতে ---গানটার কথা কল্পনা করে। কি সুন্দর লাগে পুরানো দিনের ও-ই  মীনাকুমারী.....। নাচে আর গায়।  কি সুন্দর সাজানো স্টেজ.... আ...হা...  হা।...মনটায় নীরব আনন্দ.... এমন সময়ে রেলের হুইসেল!!! 

সন্ধ্যায় শান্ত নির্জন ঠাণ্ডা হাওয়া।  বারান্দায় বসে পুস্প।  এইসময়ে শহরের ভাড়া বাড়ির কথা খুব মনে আসে। হা ক্লান্ত হয়ে সবার ঘরে ফেরা, আর তক্ষুনি কারেন্টবাবু হাওয়া। পড়া তো ঐসময়ে বস্তাবন্দি। গল্প আর মজার রাজ চলতো। সিনিয়র দিদি গল্প বলেছিল, কোনো এক রানী শহরে মজুর শ্রমিকেরা খাবারের জন্য মিছিল করলে জানতে চায়, ওরা চিত্কার করে কেন? রাজার লোকেরা ভয়ে ভয়ে বলে,  ওদের খাবার নেই, খাবার চাইছে। রাণী আদেশ দিলেন, ওদের কেইক দাও। ওরা কেইক খাক্।  দিদির গল্প বলার ভংগী খুব মনোহারি। সব মেয়েরা হেসে পাগল হয়ে যেতো। 

ঘরে জোরে টিভি চলছে। আজ টিভিতে কি দেখাচ্ছে? কোথায় আগুনে পুড়ে সব খাক। মন্ত্রী নাকি ও-ই  জায়গায় গিয়ে, লোকলস্কর নিয়ে আগুনপোড়াবাসীদের ত্রাণ, চাকরি টাকা সব দিচ্ছে। হায় রাম, আমাদের এই রাজ্যেও ত মারাকাটি, দলাদলি চলছে। কবে না আবার এ-ই সব নাটক শুরু হয়। তক্ষুনি গান বাজে। এই রে! ফোন টেবিলে ছিল? 

--- এই পুস্প, নে তোর ফোন। কাকুর ডাক। 

--- হ্যাঁ, বল। 

--- তর গান কালকে দিমু। 

--- শুন আমি ঐ নাচ তুলুম, তবে রং দে বাসন্তীর অন্য আরেকটা গান যদি আমরা চার পাঁচ জনরে নাচতে দেস তইলে। নইলে না। 

--- ইস্। তুই না বড় পেঁচাল পাড়ছ। দাঁড়া, দেখি। 

--- কি?  

--- আরে বাবা....। 

--- এই আহাম্মক... আরো অনেক মুখে আইতাছে.... কমু না অখন, শোন, এলাকায় জল নাই, মা-বইনেরা পুরা দিন রাস্তাত বইয়া। কই গান নাচ দেখাইবি, গোমতী তুমি এদিক পানে এসো। নয়তো আল্লা মেঘ দে, পানি দে।  

পুস্পর কথা শেষ করতে দেয় না সহদেব। 

--- আচ্ছা, আচ্ছা। মা ত্রিপুরারি শান্ত হও। 

কট করে ফোন কাটে পুস্প। ওপারে সহদেব ভাবে, ওফ্ফ জাইগ্যা উঠলেন..... কন্যাতিয়া জমাতিয়া। 



সুস্মিতা পাল

ঋতুরাজ বসন্ত 

কুয়াশায় ঘেরা চাদর সরিয়ে আসল ঋতুরাজ,
পলাশ ফুলের সুগন্ধে তৃপ্ত তাই আকাশ বাতাস।
কোকিল গুলি ডাকলো যেনো কুহু কুহু সুরে,
বসন্ত এলোরে বসন্ত এলো একটি বছর ঘুরে।
তেমনি যেনো কৃষ্ণ চূড়া ফুলে সাজল রাজ ঘাট,
আসছে রাধা কৃষ্ণের দোল পূর্ণিমার পবিত্র রাত।
আবার তোমায় নিয়ে যে সকলের কতো স্বপ্ন,আশা বুনতে থাকা।
কারোর হয় স্বপ্ন পূরণ,কারোর পূর্ন হয়বা আশা,
কেউ আবার অপূর্ণতার ব্যর্থতায় যে পথ হারা।
তবে সকল দুঃখ খুশির মাঝে আজ বাজলো বিদায় সুর,
ঋতুরাজ বসন্ত তোমার যে বিদায় নিতে হবে।
তোমার বিদায়ে হয়তো ফিরবেনা কারুর শান্তি,
ব্যর্থ পথিকও ফিরবেনা হয়তো নিজ ঘরে।
অপ্রিয় মানুষও হতে পারবেনা কারুর প্রিয়!
এমনকি কারুর হৃদয় হয়তো রাঙাবেনাও আর।তবুও,
সবাই বলবো বসন্ত তোমায় অনেক ভালোবাসি।

মনচলি চক্রবর্তী

 বসন্তের রং

মোহন ছোট্ট একটি  গ্রামে থাকে। গ্রামটা  ছোটো তাতে কি হয়েছে, প্রকৃতি উজাড় করে সাজিয়ে দিয়েছে তাকে।

বসন্তের আগমনে কোকিলের মধুর সুর হৃদয় উতলা করে।

লাল কৃষ্ণচূড়া,পলাশ, শিমূলে বসন্তের রং মেখেছে।কোকিল ডাকে গাছের ডালে সুরে সুরে, ফুলে ভ্রমরেরা গুনগুন করে।

 বসন্তে নতুন রং মেখে  সুন্দরী হয়ে উঠেছে মোহনের ছোট্ট গ্রাম রামপুর।  গ্রামের শেষেপ্রান্তে  মা,  বাবা,আর মোহন বাস করে ।মোহনের বাবা চাষবাস  করে। মোহন ছোটবেলা থেকেই পড়াশুনোতে ভালো ছিলো কিন্তু কলেজে পাশের পরে আর পড়া হয়ে উঠে নি।

মোহন  কিছু দিন হলো  চাকুরি পেয়েছ।রামপুরের প্রাথমিক স্কুলে পড়াতে শুরু করেছে। 

আসা  যাওয়ার পথে তার চোখ শুধু  খুঁজে বেড়ায়   তার  ভালবাসা রাধিকাকে, নীরবে চোখের জল ফেলে যায় ওর বাড়ির দিকে তাকিয়ে। 

রাধিকার সাথে  একসময় মোহন ছোটবেলায়  খেলাকরতো,একসাথে  স্কুলে যেতো।বসন্তে  দুজনে একসাথে কোকিলের ডাক ডাকতো, বকুল ফুল তুলতো।বসন্তের উৎসবে সবার সাথে রাধিকা আর মোহন ও মেতে উঠতো।

রাধিকার বাবা মোহনের সাথে  বেশি কথা বলা, স্কুলে যাওয়া, দুজনের একসাথে থাকাটা বেশি পছন্দ কোরতনা। কারন মহোনের বাবা গরীব চাষি। ওদের টাকা নেই, জমি নেই,মোহনের পরিবার খুব সাধারণ। 

একটা সময়ে কখন যে মোহন খৈলার সাথি 

রাধিকাকে মনে মনে  ভালোবাসতে  শুরু করেছিলো  সে নিজেও  সেকথা বুঝতে পারে নি।স্কুল শেষ করে কলেজে উঠছে দুজনেই।এরই মধ্যে একদিন  মোহন শুনতে পেলো রাধিকার বাবা ওর বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে।ছেলে অনেক বড় ব্যাবসা করে,অনেক টাকা পয়সা  আছে,জমি আছে  তাদের।

রাধিকার  বাবা  গরীব, সাধারণ লোকেদের খুব একটা  পছন্দ কোরতনা , খুব টাকার গরম ছিলো ওর  বাবার।

রাধিকা খুব সুন্দরী উনার একমাত্র মেয়ে। মোহনের সাথে রাধিকার  মেলামশাটাও উনার পছন্দ নয়, উনার ও বয়স হচ্ছে  বড়লোক ছেলে পেয়েছেন  বিয়ের  দিন ও ঠিক করে  ফেলেছেন উনি খুব তাড়াহুড়ো করে।

রাধিকার বিয়ের কথা শুনেই মোহনের মনটা উদাস হয়ে গেলো। রাধিকাকে ভালোবেসে ফেলেছে  এই কথাটাও আর বলা হয়ে উঠলো না মোহনের।

কারন  মোহন খুব সাধারণ আর  গরীব । 

 বাবা  চাষ করে, নিজে কষ্ট করে কলেজে পড়ছে। 

কিভাবে মনের কথাটা বলবে?  যদি টাকা থাকতো, চাকুরি  করতো  তবে  হয়তো বা  রাধিকাকে তার মনের কথাটা  মুখ ফুটে সে বলতে পারত।চোখের জল ফেলা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা রইল না মোহনের।

রাধিকা কলেজে পড়তে চাইছিলো ওর  বিয়ে করার   ইচ্ছেই ছিলো না , কিন্তু ওর  বাবা বিয়ে  দেবেই ওর।পাত্র  ওর চেয়ে  বয়সে  অনেকটাই  বেশি । 

রাধিকার বিয়ের দিন এসে পরেছে, মোহন অনেকবার বলার চেষ্টা করেও রাধিকাকে কিচ্ছু বলে উঠতে পারলোনা। 

সুন্দর ভাবে রাধিকার বিয়ে হয়ে গেলো, আর মোহন ঘরেবসে  শুধু চোখের জল ফেলছিলো।রাধিকা শ্বশুর বাড়ি চলে গেলো ।

মোহন গ্রামের যেদিকেই তাকায়  শুধু  রাধিকাকেই দেখে।  তার মন শুধু খুঁজে বেড়ায় রাধিকাকে।

বসন্ত এসেছে, আকাশে, বাতাসে, গাছে, ফুলে সবখানে মনে হয় যেনো নতুন রং লেগেছে।কোকিল ডাকছে  সুরে সুরে। মোহন শুধু রাধিকার কথা ভাবে আর কষ্ট পায় মনে মনে ।দোলের দিন রং খেলার সময় মন খারাপ করে ঘরে বসে থাকে। অনেক দিন হয়ে গেলো  রাধিকাকে  দেখেনা সে  মন ভরে ।

কলেজ শেষ করে  চাকুরি পেয়েছে এখন মোহন।গ্রামের সবাই বলাবলি করে রাধিকাকে বাড়িতে আসতে দেয় না ওর স্বামী। 

দিন কেটে যাচ্ছে  হটাৎ একদিন খবর এলো গ্রামে  রাধিকার স্বামী  মারা গেছে। 

রাধিকার  বাবা মা ওকে বাড়িত নিয়ে এসেছে ।মোহন শুনতে পেলো গ্রামের সবাই বলাবলি করছিলো রাধিকার স্বামী নাকি  অনেক ধরনের বাজে নেশার সাথে যুক্ত ছিলো , খুব বাজে লোক ছিলো।স্বভাব চরিত্র ও ভালো ছিলো না ওর স্বামীর।

এসব কিছু বাড়ির সবাই  জানতে পারবে, তাই রাধিকাকে ওর স্বামী  ওর বাড়িতে  আসতে দিতো না। রাধিকার বাবা কোনো রকম  খোঁজ খবরও ভালোভাবে  নেয়নি তখন। দেখেছে শুুধু অনেক টাকা আছে ছেলেটির।

নানা রোগে  অসুস্থ হয়ে  ওর স্বামী  মারা গেছে। রাধিকাকে সামন্য শান্তি ও দেয়নি লোকটা, গ্রামের  সবাই বলাবলি কোরছিলো। 

মোহনের মা গিয়েছিলো রাধিকাদের  বাড়িতে গ্রামের সবার সাথে। বাড়িতে মোহনের  মা এসে বলছিলো- এমন সুন্দরী মেয়েটা কেমন হয়ে গেছ, শুকিয়ে গেছে,পাথর হয়ে গেছে।

ওর স্বামী ওকে  অনেক দুঃখ দিয়েছে, অনেক কষ্ট দিয়েছে। রাধিকা   কিছু  কথাও বলছে না,খেতেও চাইছে না।  চোখে জল এসে পরলো মোহনের এসব কথা শুনে। সারাদিন রাত্রি শুধু চোখের জল ফেলছে নাকি রাধিকা ।

যাকে মোহন  এতো ভালবাসে তার কপালে এতো কষ্ট,এতো দুঃখ 

মানতে পারছিলো  না মন থেকে সে। 

দুদিন পরে মোহন ভাবলো একবার নিজে গিয়ে রাধিকাকে  বাড়িতে  দেখে আসবে।গ্রামের , কজন মিলে রাধিকার বাড়িতে গেলো মোহন ।রাধিকার বাবা ও অনেকটা  বদলে  গেছে, মনের কষ্টে নরমও হয়ে  গেছে। 

খারাপ ব্যবহার করে  নি  ওদের  সাথে।

গিয়ে দেখে রাধিকা নীরবে বসে আছে । মোহন শুধুই ভাবছে এটা কোন রাধিকা?।ওকে  তো চিনতে পারছেনা মোহন।সাদা শারী পরা,চোখ মুখ শুকনো,চুল খোলা পাগলের মতো। এই রাধিকার  মাঝে তো  কোনো প্রানই নেই।এভাবে  রাধিকাকে  দেখতে   না পেরে  তাড়াতাড়ি মোহন ওদের  বাড়ি থেকে   বেরিয়ে  এসেছে। হাটতে হাটতে মোহন শুধু ভাবছে কাকে দেখলো সে।তার রাধিকা তো কোথায়  হারিয়ে গেছে ।একটা গাছের নিচে বসে  শুধু সে ভাবছে আর কাঁদছে।

দেখতে দেখতে একটা বছর হয়ে গেছে। 

 বসন্ত এসে গেছে তার নতুন রং  নিয়ে।কোকিল ডাকছে সুরে সুরে। 

দোল পূর্ণিমা সামনেই আকাশে  বসন্তের উজ্জ্বল  চাঁদ উঠেছে । মোহন জানালার দিকে তাকিয়ে  রাধিকার কথাই ভাবছে  ।বসন্ত এসেছে,প্রকৃতিও নতুন ভাবে সেজে উঠেছে । শুধু  সাজ নেই তার রাধিকারই।নেই প্রাণ খোলা হাসি তার মুখে। নেই  কোনো  আনন্দ ও আর উচ্ছাস।

দোল  পূজোর দিন গ্রামের সবাই  মন্দিরে গেছে, 

 মোহনও গেছে।আসার  সময় দেখে রাধিকা ওর  মায়ের সাথে পূজো করতে  যাচ্ছে ।

সব রং হারিয়ে  সব সাজ হারিয়ে  কেমন যেনো হয়ে গেছে রাধিকা।বিবর্ণ প্রজাপতির মতো। আগের প্রানবন্ত রাধিকার সাথে এই রাধিকার কোনো মিল নেই।

দোলের পরের দিন রং  খেলা, গ্রামে সবাই আনন্দে  সকাল থেকেই  রং খেলা নিয়ে মেতে উঠেছে।  মোহনকে  সবাই টানাটানি করছে খুব   রং খেলতে। কিন্তু এসব কিছুই মোহনের ভালো লাগছে না। একটা গাছের ছায়ায় বসে   চুপচাপ শুধু ভাবছে ।হটাৎ করে  কি তার মাথায় এলো হাটতে হাটতে গ্রামের মন্দিরে গিয়ে  ঠাকুরেরর পায়ের  রক্তিম সিঁদুরের থালা নিয়ে হাটতে হাটতে রাধিকার বাড়িতে  এসে গেলো। বাড়িতে ডুকে  দেখে রাধিকা ফুল তুলছে। মোহন কিছু  না বলেই   রাধিকার মাথায়  সিঁদুর  দিয়ে দিলো।রাধিকা অবাক হয়ে   শুধু তাকিয়ে  রইলো মোহনের দিকে।  রাধিকার কপাল, আর শাড়িটাও  লাল  রঙ্গের সিঁদুরে  রঙিন হয়ে গেলো। 

মোহন রাধিকার হাতটা  ধরে শুধু বলে উঠলো- 

রাধিকা দেখো বসন্ত এসেছে তার সব রং নিয়ে ,  আমি আমার ভালবাসার লাল রং  দিয়ে আজ তোমায় রাঙ্গিয়ে দিলাম। 

ঘর থেকে রাধিকার বাবা ছুটে বেড়িয়ে এলেন। এসব দেখে উনি রাগে হাতের লাঠিটা দিয়ে  মোহন কে মাথায় আঘাত করতে গেলেন। এমন সময়ই রাধিকার মা এসে উনার হাতটা ধরে ফে, ললেন। রাধিকার মা বললেন- একবার আমার মেয়ের জীবনের লাল রং টা হারিয়ে গেছে  সাদা শাড়ি পড়েছে ,অনেক কষ্ট পেয়েছে মেয়েটা আর নয়। এবার আমার মেয়ে নতুন জীবন শুরু করবে।

আশে পাশের সব লেকেরা  এসে সবটা  দেখলো।সবাই মিলে বুঝিয়ে রাধিকারর বাবা কে বিয়ের জন্য  রাজি করালেন । রাধিকা আর মোহন কে নিয়ে  গ্রামের সবাই মিলে মন্দিরে গেলো। রাধিকার আর মোহনের বাড়ির সবার সামনে  রাধিকার আর মহোনের বিয়েটা হয়ে গেলো।

রাধিকার জীবনে আজ বসন্ত  সব রং দিয়ে রঙিন করে  সাজিয়ে দিলো।ভালোবাসার রং  মেখে   লাল শাড়ি, আর লাল সিঁদুরে মোহনের রাধিকা আবার প্রানবন্ত হয়ে উঠলো।

আজ বসন্তের কোকিলও নতুন সুরে মধুর গানে মেতে উঠলো।

ছন্দা দাম

বাসন্তী বিকেলের অপেক্ষায়

ড্রেসিং টেবিলে রাখা সিঁদুর দানিতে ধুলোর আস্তরন
আয়নায় গেথে রাখা টিপটায় অবহেলা,
ফাল্গুনী রাতে সাজানো ফুলদানিতে গোলাপের মৃতদেহ.....
সবই যেন চিৎকার করে মেটাতে চায় ছোঁয়াচে সোহাগের দেনা পাওনা।
                             
মেয়েটা এলো চুলে হঠাৎ হয়ে উঠে সন্ত্রস্ত,
আয়নায় তাকিয়ে চোখের দুঃস্বপ্নকে আঁচলে মুছে,
ঘড়ির কাঁটাদের শাসন করে বারবার,
যে মেয়েটা চেয়েছিল রোজ সাজাতে হৃদয়ের ফুল বাগান,
সেই আজ বাগানে ইচ্ছে জল দিতে কেন জানি ভুলে যায়,
আবেগ উচ্ছাসের বেনো জল লুকায়......
                  কাঁপা কাঁপা ঠোঁটের রক্তাক্ত কামড়ে,
                                 
রূপকথার রাজকন্যার স্বপ্ন পুষে না সে আর সোনা রূপার কাঠিতে,
রাজপুত্র যে তার হৃদয়ের দামে কিনেছে শীষ মহল,
কি হবে থেকে আর বাসন্তী বিকেলের অপেক্ষায়!!

অষ্ট দেয়াশী

বসন্ত তুই

বসন্ত তুই আবির রাঙা 
পাগলা হাওয়ার দেশ
বসন্ত তুই খোঁপার পলাশ
আমার লাগে বেশ। 
বসন্ত তুই ভালোবাসার
নতুন ভোরের দেশ
বসন্ত তুই আমার মনে
আগুন লাগাস বেশ। 
বসন্ত তুই কোকিলের
কুহু কুহু আবেগ 
গানের সুরে কোকিল
ডাকে প্রিয়তমা কে। 
বসন্ত তুই আমার কাছে
ভালোবাসার নতুন আবেগ
বসন্ত তুই মেঘলা আকাশ
বৃষ্টি বাদল রৌদ্র মাখা। 
আমার কাছে রঙিন গানের
ভালোবাসার গল্প কথা।

পায়েল সূএধর

শেখ মুজিবুর  রহমান 

বাংলাদেশে জন্ম তোমার,
বাংলাদেশ তোমার ঘর।
বাংলা মায়ের মুক্তির জন্য,
লড়েছ তুমি কত লড়াই ।
পাকিস্তান বাহিনীকে জব্দ করে ।
মাতৃভূমিকে রক্ষা করেছিলে।
কত কষ্ট সহ্য করলে,
মাতৃভূমিকে ভালোবেসে । 
ঘাতকেরা বুলেট মারেন,
তোমার বুকে শেষে । 
মুজিব তোমার জন্য আজ,
বাংলা গায় তার জয় গান।
শস্য শ্যামলা যেন অবিরাম,
তোমার কথা বলে যায় ।
বাতাসে বাতাসে ভেসে আসে,
তোমার সাহসের গুণগান । 
 
তুমি থাকবে বাঙালির বুকে  চির অমর হয়ে ।

শান্তনু মজুমদার

সম্রাট

মন খারাপ, সে প্রকাশে কি বা লাভ!
দশের আনন্দে তোমার পরিচয়,
একদিন যে হবে তোমারই জয়।
মনের দুঃখ রাখো ঠাকুরের ঘরে,
তিনিও যে দিয়েছেন কিছু তোমায় কাজ,
সম্পূর্ণ কর তাহা নিয়ে শ্রেষ্ঠত্বের সাজ,
কীসের চিন্তা, করে যাও কাজ, তুমি যে সম্রাট।

সুরমা আকতার

বসন্তের কোকিল

বসন্তের মধুর ধারায়
নবপত্র পল্লবের সাজ।
সুগন্ধী ভরপুর বসন্তের আগমন,
চারিদিকে বসন্তের সুভাষ 
মাতোয়ারা করেছে উদাসী কোকিলকে।
সারাবছর নেই যার খোঁজ
আজ বসন্তের সাজে সেজে,
বসন্তের পরশে হাজির হয় তদরূপ।
নিজ বর্ণ ভুলে গিয়ে 
মধুর কন্ঠে গাইছে গীত।
কোকিলের সুমধুর কন্ঠে  
বুঝিয়ে দিল গুণে সে ভরপুর।
রূপ দেখে করোনা বিবেচনা
গুণেই তার শ্রেষ্ঠতা।
আমি বসন্তের কোকিল গাইছি গীত
রূপ যাই হোক,
সেজেছি আজ বসন্তের প্রীত।

বিক্রমজিৎ সাহা

রক্ত আবির

যে মেয়েটি আবির মেখে
দাঁড়িয়ে সমাজের উঁচু টিলায়
হলুদ বরন আঁচল নিশান
উড়ছে বাতাসে আবির হয়ে।

স্নিগ্ধ সকালের মিষ্টি বাতাসী
সেজেছে বসন্তে সমাজের কোলে
প্রকৃতির একান্ত নির্মল নৃত্য
সমাজের তরে নাচল মেয়েটি

আবির রঙে আকাশ গোলাপী
স্রোতা নদী বইছে কলস্বরে
সবুজ প্রাণে রঙ লেগেছে
সেই সমাজের রঙ মশালে ।

মেয়েটির বাসন্তি শাড়ি জুড়ে
আপন সমাজের মাদক শাপে
রঙ লেপেছে রক্ত আবির 
সেই মেয়েটির আবির মুখে
শেষ বেলায় বয় দুটি নদী।।

তপন সরকার

স্বাধীনতা লাভে বঙ্গবন্ধুর অবদান

বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পাছে
মহান যার অবদান,
তিনি আর কেউ নন 
যিনি মুজিবুর রহমান।

সাত মার্চ উনিশশো একাত্তর 
বঙ্গবন্ধুর জোরালো আহ্বান,
আবাল বৃদ্ধ বনিতা মিলে
সবাই করলো যোগদান।

অত্যাচারী পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে 
লড়তে মানসিক বল,
দেশের যুবকদের ঐক্যবদ্ধ করে
হোলো শক্তিশালী দল।

যেই দলের ব্রত ছিলো
গড়বো ঘাঁটি শক্ত,
দেশের মাটি রক্ষা করতে 
দেবো মোরা রক্ত।

পাকিস্তানি সেনাদের অতর্কিত হামলায় 
নিহত বহু মানুষ,
মুজিবর রহমানের তীব্র প্রতিবাদে 
জাগলো যুবকদের হুঁশ।

মুজিবুর রহমানের সক্রিয় ডাকে
উদ্বুদ্ধ সকল যুবক,
সেদিনের বর্বর পাকিস্তানি আক্রমণে
বাংলায় হোলো শোক।

নারীদের উপর অত্যাচার দেখে
মুজিবের চোখে জল,
দেশের মানুষদের সঙ্গে নিয়ে
তৈরি হোলো যৌথদল।

দেশ প্রেমে পাগল হয়ে
যুবকের হোলো গান,
দেশের জমি রক্ষা করতে 
আমরা দেবো প্রাণ।

শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বই
গর্জে উঠেছিল দেশ,
দেশবাসী সেনাদের যৌথ আক্রমণে 
পাকিস্তানের দর্প শেষ।

মুজিবের ধিক্কারে তীব্র আক্রমণে 
পাকিস্তান হোলো কোণঠাসা,
যৌথদলের লড়াকু অদম্য প্রচেষ্টায় 
জাগলো স্বাধীনতার আশা।

রক্তের বিনিময়ে এলো স্বাধীনতা,
জাহির হোলো মুজিবুরের মান্যতা।

সুবীর কুমার দে (শব্দ শ্রমিক)

বীর ক্যাপ্টেন

হে প্রিয় বীর!
মৃত্যুর কাছেও কোনও দিন হয়নি তোমার নত শির।
তুমি যে বীর ---------
সোনার বাংলার সকল হৃদয়ে শ্রদ্ধেয় তুমি বীর।

ভাষা আন্দোলনে শহীদ হয়ে বাঁচিয়েছিল যারা বাংলা ভাষার সম্মান,
রাজাকারদের গুলিতে বরকত রফিক জব্বর সালাম দিয়েছিল প্রাণ।

পলাশ রাঙ্গা শিমুল ফুল শহীদের রক্তে হয়েছিল আরও লাল,
রক্তে ভেসেছিল বাংলাদেশের যত নদী নালা খাল।

তারপর কেটে গেল অনেকগুলো বছর,
চলতে থাকলো চক্রান্ত সোনার বাংলা কে ধ্বংস করার,
শুরু হলো নতুন করে রাজাকারদের নির্মম অত্যাচার।
শুরু হলো লড়াই সংগ্রাম আবার।

শোনা গেল তোমার সেই বজ্র কঠিন কন্ঠস্বর -------
"তোমাদের যার কাছে যা কিছু আছে তাই লইয়া বাইরই পরো" -------
এই একটা কন্ঠ, হ্যাঁ এই একটা কন্ঠ,
এই একটা কন্ঠ গর্জে উঠলো, গোটা জাতি দুলে উঠলো,
একটা কন্ঠ সোচ্চার হলো, বাংলাদেশে ফুল ফুটলো।

ফুল ফোটানোর লড়াই আন্দোলনে ঝড়ে পড়লো ত্রিশ লক্ষ প্রাণ,
গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়লো ক্যাপ্টেন বঙ্গবন্ধুর ঘ্রাণ।

তুমি নেই আজ আছে বাংলা সোনার দেশের মাটি,
যোগ্য কন্যার হাতে পড়ে তা হয়েছে আরও খাঁটি।

তুমি বীর তুমি ক্যাপ্টেন তুমিই জাতির পিতা,
তোমার স্মরণে প্রতিটা বছর ভরবে কবিতার খাতা।

চেতনায় আছে মুক্তি যুদ্ধ, বেদনায় শহীদ মৃত্যু,
তোমার স্বপ্ন হবেই সফল, খতম হবেই শত্রু।।

সুবীর কুমার দে (শব্দ শ্রমিক)
কলকাতা, ভারত।