বসন্ত জাগ্রত দ্বারে
খরার সময়। পুকুরের জল অনেক নীচে নেমে যায়। মানুষ বুদ্ধিমান। তেলের টিনের কানা নাইলনের দড়িতে বেঁধে দড়ি উঠা নামা করায় আর জল উপরে আসে। মাটিতে ছড়িয়ে যায়। তাই বলে শরীরের শক্তি কিছু কম লাগে তা নয়। পুস্পর বাবা অবশ্য এই কাজে মহাখুশি। রোজ দুপুরের পর বাজারে যাবার সময় ডাক দিয়ে যায়।
--- মাই গো, ভাইরে লইয়া খেতঅ জল দিয়ো।
বাবা বাজারে গেলেই ভাইয়ের উচাটন মন মাঠে যাবার জন্য। ঠানদির বিকালের কাজ নারকেল পাতার কাঠি তোলা, তাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এই সময়ই বেছে নেয় সহদেব। পুস্পর ফোন গান গাইছে --- মেরি জান। মুঝে...। ব্যস্, আর নয়, পুস্প মুখ চেপে ধরে ফোনের। আজও অন্যছবি নয়।
--- শোন।
--- শুনা.....। হি হি হাসির হিল্লোল তুলে পুস্প। ওপারে কোকিলের সুর ভাসে।
--- কি করস?
--- এই আরেকটু বাদে গাছে জল দিমু....।
--- আচ্ছা, শোন। ফাগুনের ঝিরিঝিরি হাওয়ায়....
--- ভাবলাম.... কি?
---- বসন্ত উৎসব হো যায়....
---- কবে?
--- এই.... সামনের রবিবার। শোন, তুই না.... তুই পাকিজার ও-ই গানটা... ঐ মীনাকুমারী নাচতে আছিল, সেইসময়ে হুইসেল... রেলের হুইসেল। মনে পড়ছে নি?
পুস্প চুপ। কেমন যেন ঘোর লাগে।
জলের দাবিতে কাকু, পিসিরা আজ রাস্তায় বসেছিল। এই কিছুক্ষন আগে ফিরলো। সবাই চিন্তায় আছে জলের কি ব্যবস্থা হয়? ঠানদি গল্প বলেছিল, অনেক আগে এই শুখার সময়ে জল চুরি হতো। শুধাংশুস্যারও বলেছিলেন, জলচুরির খবর পত্রিকায় বড় বড় করে বের হতো। তারপর কত মিটিং মিছিল শেষে এই জলের লাইন আসা। মেসিনে জল উঠিয়ে শুধু খাবারের জল নয়, খেতে সেচের জলও পাওয়া যেতো। পাইপ বেয়ে জল মাঠের মাটি ভিজিয়ে.... কিন্তু.... এখন.....।
---- কি রে? কি হইল তর?
--- না, কিছু না। কিন্তু আমার ফোনে এইসব নাই। আমি গান পামু কই?
--- ও... হো.... হো...। নো চিন্তা.... । ব্যবস্থা করুম...
ঠানদির গলা ভাসে।
--- পুস্প, অ পুস্প। মাইয়নি উঠ তর...।
--- আইলাম ঠানু।
পুস্প,ভাই, ঠানু, পিসি সব মিলে ঝুলে কাজ সারে। ঐদিকে দিনের ঠাকুর ডিউটি শেষ করে ধীরে ধীরে বাড়ির পথে রওনা দিলেন। বাঁশঝাড়ের ওপারে মাটি, টিলার গাছ,আকাশ লালে লাল। যেন দিনমনির বিজয় উতসবে ব্রম্ভাণ্ড মত্ত মাতাল।
আকাশে তারা ফুটছে। দোল আজ পাঁচদিন পার করলো। হাস্নুহানার হাল্কা সুগন্ধি বাতাসে ভাসে। চুপিসারে বলে, এই আর একটু পরে, আধা নয়, মাথা ভাংগা চাঁদ উঠবে। তোমার ডাঁটা খেত জল মেখে কি মিস্টিমধুর হাসি হাসবে। বাঁশ বাতাসে নুয়ে নুয়ে দোল খাবে। কি মজা! সারাদিনের রোদজ্বলার পর এই বাতাস বড় খুশির।
---- এই কারেন্ট আইল, কারেন্ট। আও রে সব।
বাড়ির যে যেখানে ছিল দৌড়ে যায়। কোথায় কার ঘরে মায়ে বোনে লড়াই, নয়তো কোথায় যুদ্ধ, কোথায় মারপিট, কথা কাটাকাটি সব এবারে গোগ্রাসে গিলতে থাকবে। তারপর কাকু বলবে, খবর শুনি।পিসি বলে সিরিয়াল। ভাইয়ের খেলা। এক টিভি বেচারা!! অবশ্য অন্য পথও তো নাই। খবর শোনার এত আগ্রহ মোবাইল আন। না, সেইটা না। পুস্প যদি বলে মোবাইল এনে দাও, তাহলেই সবার মাথা গরম।
পুস্প বারান্দায় বসে থাকে। ভিতর থেকে ডাক এলেও যায় না। চলতে চলতে ---গানটার কথা কল্পনা করে। কি সুন্দর লাগে পুরানো দিনের ও-ই মীনাকুমারী.....। নাচে আর গায়। কি সুন্দর সাজানো স্টেজ.... আ...হা... হা।...মনটায় নীরব আনন্দ.... এমন সময়ে রেলের হুইসেল!!!
সন্ধ্যায় শান্ত নির্জন ঠাণ্ডা হাওয়া। বারান্দায় বসে পুস্প। এইসময়ে শহরের ভাড়া বাড়ির কথা খুব মনে আসে। হা ক্লান্ত হয়ে সবার ঘরে ফেরা, আর তক্ষুনি কারেন্টবাবু হাওয়া। পড়া তো ঐসময়ে বস্তাবন্দি। গল্প আর মজার রাজ চলতো। সিনিয়র দিদি গল্প বলেছিল, কোনো এক রানী শহরে মজুর শ্রমিকেরা খাবারের জন্য মিছিল করলে জানতে চায়, ওরা চিত্কার করে কেন? রাজার লোকেরা ভয়ে ভয়ে বলে, ওদের খাবার নেই, খাবার চাইছে। রাণী আদেশ দিলেন, ওদের কেইক দাও। ওরা কেইক খাক্। দিদির গল্প বলার ভংগী খুব মনোহারি। সব মেয়েরা হেসে পাগল হয়ে যেতো।
ঘরে জোরে টিভি চলছে। আজ টিভিতে কি দেখাচ্ছে? কোথায় আগুনে পুড়ে সব খাক। মন্ত্রী নাকি ও-ই জায়গায় গিয়ে, লোকলস্কর নিয়ে আগুনপোড়াবাসীদের ত্রাণ, চাকরি টাকা সব দিচ্ছে। হায় রাম, আমাদের এই রাজ্যেও ত মারাকাটি, দলাদলি চলছে। কবে না আবার এ-ই সব নাটক শুরু হয়। তক্ষুনি গান বাজে। এই রে! ফোন টেবিলে ছিল?
--- এই পুস্প, নে তোর ফোন। কাকুর ডাক।
--- হ্যাঁ, বল।
--- তর গান কালকে দিমু।
--- শুন আমি ঐ নাচ তুলুম, তবে রং দে বাসন্তীর অন্য আরেকটা গান যদি আমরা চার পাঁচ জনরে নাচতে দেস তইলে। নইলে না।
--- ইস্। তুই না বড় পেঁচাল পাড়ছ। দাঁড়া, দেখি।
--- কি?
--- আরে বাবা....।
--- এই আহাম্মক... আরো অনেক মুখে আইতাছে.... কমু না অখন, শোন, এলাকায় জল নাই, মা-বইনেরা পুরা দিন রাস্তাত বইয়া। কই গান নাচ দেখাইবি, গোমতী তুমি এদিক পানে এসো। নয়তো আল্লা মেঘ দে, পানি দে।
পুস্পর কথা শেষ করতে দেয় না সহদেব।
--- আচ্ছা, আচ্ছা। মা ত্রিপুরারি শান্ত হও।
কট করে ফোন কাটে পুস্প। ওপারে সহদেব ভাবে, ওফ্ফ জাইগ্যা উঠলেন..... কন্যাতিয়া জমাতিয়া।