Mar 29, 2022

অলকা গোস্বামী

নীল বিচ্ছেদ

সন্ধ্যে হয়ে আসছে। রাস্তার লাইট আর আকাশের কালচে নীল রঙ মিশে একটা মায়াবী আলোয় ভরে আছে চারদিক।
এরকমই আরো একটি সন্ধ্যায় ছিল বিচ্ছেদের কান্না, বিষাদের নিরবতা,আর নিরাশার মেঘ বৃষ্টি হয়ে অঝোরে ঝরছিল শিবানীর দু চোখ বেয়ে। 
এই সময়টা খুব পছন্দের শিবানীর। নিজেকে খুঁজে পায় একান্ত ভাবে এই সময়টাতে। ছাদে পায়চারি করতে করতে কত কথা উপছে পড়ে স্মৃতির ভাড়ার থেকে।
ছোট্ট রিনি খেলায় মেতে আছে বন্ধুদের সাথে।
"এই রিনি  ঠাকুমা ডাকছেন,  বাড়িতে অতিথি এসেছে, আর নূতন বন্ধুও এসেছে একজন"। পূর্নিমা দিদির কথায়
রিনি একছুট লাগায় বাড়ির দিকে, হটাৎ করেই পা পিছলে ধড়াম করে পড়ে যায় রিনি।
"ইস দেখি দেখি , কপালটা তো ফুলে নীল হয়ে গেছে। কেন দৌড়াচ্ছিলি বলত"!
"আয় আয় ঘরে গিয়ে ওষুধ লাগিয়ে দিচ্ছি"। পূর্ণিমার হাত ধরে আস্তে আস্তে বাড়িতে ঢোকে রিনি।
বড়ো উঠান তার সামনেই রান্নাঘর, উল্টো দিকে ঠাকুর ঘর,আর বারান্দা। রিনি দেখলো বারান্দায় ওরই বয়সী একটি মেয়ে হাঁটুতে মুখ গুজে বসে আছে। আস্তে করে কাছে গিয়ে পিঠে হাত রাখলো রিনি। ওপাশ থেকে বিজন বলল," এই শিবানী চেয়ে দেখ তো তোর বোন রে, পিসতুতো বোন। ওর নাম রিনি।
মেয়েটি চোখ তুলে তাকাল, দু চোখে নদী বইছে।
ছপ ছপ একটানা শব্দ..…বৈঠার ঘায়ে নদীর জল সরে সরে যাচ্ছে। নৌকার ভিতরে গাদাগাদি লোক, বেশির ভাগই মহিলা, আর কিশোরী। অন্যদিনের মত সেদিনও বিকেলে আমিনা, আর সুলতানা দের সঙ্গে খেলতে গেছে শিবানী। খেয়াল করল আরে আজ তো রূপালী খেলতে এলো না। ঘরে ফিরে মা কে জিজ্ঞেস করল,"মা জানো রপালি আজ খেলতে আসেনি, একবার চলো না দেখে আসি..."। শিবানী দেখল কেমন জানি বদলে গেছে মা এর চোখ মুখ। চোখ দুটো যেনো চৈত্রের পলাশ।গত রাতেই রূপালী দের ধানের গোলাতে কারা যেন আগুন লাগিয়ে দেয়। সবাই যখন আগুন নেভাতে ব্যাস্ত তখন ঘুমন্ত রূপালী কে উঠিয়ে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।এই ঘটনার পর শিবানীর মা বাবা শিবানিকে ওদেশে পিসির বাড়ী তে পাঠানোর বন্দোবস্ত করেন।
"লক্ষ্মী মেয়ে, আমরা পরে একদিন যাব,এখন তোমার বই পত্র, আর কিছু কাপড় গুছিয়ে নাও তো, আমরা একটু পরেই  বেরিয়ে পড়ব"।
"কোথায় যাব আমরা....,
ওই যে তোমার বিজন দাদা এসেছে। তোমাকে পিসির বাড়ী বেড়াতে নিয়ে যাবে।"
তুমি যাবেনা মা"?
"যাব তো....,
অনেক কাজ পড়ে আছে মা,তুমি বইপত্র কি নেবে দেখে নাও, আমি রান্না ঘরে আছি"।
সন্ধ্যে নামতেই শিবানীর মা, বাবা, শিবানী কে নৌকায় তুলে দিলেন। গলা জড়িয়ে ধরলো শিবানী," মা, তুমি যাবেনা"?
"ভাই ছোট আছে তো আমরা কিছুদিনের মধ্যেই যাব। ওখানে তুমি বড় স্কুল এ যাবে, কত কিছু শিখবে"।
মার কথায় শিবানী নৌকায় উঠে বসে। অস্ফুট কান্না দলা পাকিয়ে গলায় আটকে থাকে শিবানীর।
বাবা ধুতির খুঁটে চোখ মুছতে মুছতে শিবানীর হাতে চুমু খেয়ে বলেন,"পিসির কথা শুনে চলো মা, নিজেকে ভালো রেখো। সম্মান রক্ষার জন্যে ওদেশে তোমাকে পাঠাচ্ছি। এভাবে যে আর কত নির্যাতন আমাদের উপর দিয়ে যাবে কে জানে! সময়ে অসময়ে, উৎসব পার্বনে কখন কার উপর খাড়া পড়বে কোন ঠিক নেই। আর কত ভয় আর আতঙ্ক নিয়ে থাকা যায়।"
 গভীর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে শিবানীর বাবার বুক চিরে। ছোট্টো শিবানী নৌকার ভিতরে এক কোনায় বসে পড়ে নদীর ঠাণ্ডা বাতাসে কখন ঘুমিয়ে পড়ে আর মনে নেই।নৌকো ওদের দুলালী গ্রাম ছেড়ে, শৈশব,মেয়েবেলা, পুতুল খেলা, রান্নাবাটি, সব একপাশে ফেলে দিয়ে বয়ে চললো অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে।
সেই বন্ধু,সবুজ মাঠ, ধানের গোলা, ওদের কবলি, ধবলি গাই দুটোর কথা আজো মনে পড়ে। কিছু অনুভূতি কারো সাথে ভাগ করা যায় না। শুধু মুখোমুখি নিজের সাথেই করা যায়।
 জন্মভূমিতে আর ফিরে যেতে পারে নি শিবানী হয়ত চায় ও নি। সত্যিই তো কোথায় যাবে !
ওদের সব কিছু জবরদখল হয়ে গেছে এতদিনে। ভাই কে নিয়ে মা বাবা ও চলে এসেছিলেন এ দেশে। পিসির সহায়তায় একটা কাজও জুটে গেছে ভাইয়ের।
জান হয়ত বেঁচেছে এদেশে এসে। কিন্তু যোগ্য সম্মান, মর্যদা এখনও পাওয়া যায় নি। উদ্বাস্তুর তকমা এখনও সরেনি কপাল থেকে।
পিসির একান্নবর্তী সংসারে সবাই খুব আপন করে নিয়েছিল শিবানী কে। রিনি নিজের বোনের থেকেও বেশী ছিল বন্ধু। একসাথে পড়াশুনা, ঘোরা ফেরা সবকিছু তেই ছিলো ওদের ভারি মিল।
পিসি, পিসেমশাই এবং পরিবারের সাহচর্য না থাকলে হয়ত এই জীবন এতো সহজ হতো না শিবানীর।
সেই কালো রাত পেরিয়ে, সকালে নৌকা যখন করিমগঞ্জ স্টিমার ঘাটে এসে পৌঁছাল। তখন সূর্য লাল আলো ছড়িয়ে নুতন দিনের সূচনা করছেন।
আজ আবার এই করিমগঞ্জ শহরেরই সাব ইন্সপেক্টর হয়ে জয়েন করেছে শিবানী। খুব চাইছিল এই শহরেই যেন পোস্টিং হয়। এখনও অনেক রূপালী কে খুঁজে বের করতে হবে যে।