Mar 29, 2022

মিঠুন রায়

ব‍্যতিক্রমী সাহিত‍্যিক রাজশেখর বসু

একদা 'পরশুরাম' ছদ্মনামের আড়ালে যিনি মাসিকপত্রে হাস‍্যরসের গল্প লিখেছিলেন তাঁর নাম রাজশেখর বসু।তিনি ছিলেন একজন সাহিত‍্যিক,একাধারে অনুবাদক,রসায়নবিদ ও অভিধান প্রণেতা।বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী রাজশেখর বসু অবশ‍্য বেশী বয়সেই সাহিত‍্যচর্চা শুরু করেন।ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে,'রাজশেখর বসু নৈষ্ঠিক সাহিত‍্যিক ছিলেন না,তিনি পরিণত বয়সেই সাহিত‍্যরঙ্গে অবতীর্ণ হন।

রাজশেখর বসুর বড় ভাই শশি শেখর বসুর মতে,রাজশেখর বসুর সাহিত‍্যচর্চা শুরু হয় ১৮৯৩ সালে।তাঁর প্রথম বই 'গড্ডলিকা 'বেরোলে রবীন্দ্রনাথ থেকে আরম্ভ করে তৎকালীন সময়ের কবি -সাহিত‍্যিকরা তাকে অভিনন্দন জানান।আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় রাজশেখরের বই পড়ে  লিখলেন-'এই বুড়ো বয়সে তোমার গল্প পড়িয়া হাসিতে হাসিতে Choked হইয়াছি'।

   রাজশেখর বসুর জন্ম ১৮৮০ সালের ১৮ মার্চ বর্ধমান জেলার শক্তিগড়ের নিকটবর্তী বামুনপাড়ায়।বাবা চন্দ্রশেখর বসু দ্বারভাঙ্গা রাজ এস্টেটের ম‍্যানাজার ছিলেন।১৮৯৭ সালে রাজশেখর বসু পাটনা কলেজ থেকে দ্বিতীয় বিভাগে এফ.এ পাশ  করেন।১৯০০ সালে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে রসায়নে এম.এ পাশ করেন।রাজশেখরের 'চলন্তিকা' প্রথম প্রকাশ হয় ১৩৩৭ সালে।প্রকাশক এম. সি.সরকার।'চলন্তিকা' প্রকাশের পর গুরত্বপূর্ণ সমালোচনা বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশ হয়।হরপ্রসাদ শাস্ত্রী 'প্রবাসী' পত্রিকায় বিভিন্ন বিষয়ে চলন্তিকার সমালোচনা করেন।আসলে বাংলায় উপযুক্ত পরিভাষা প্রস্তুতের ক্ষেত্রে রাজশেখর বসুর বিরাট ভূমিকা রয়েছে।কাশীরাম দাশ,কৃত্তিবাস ওঝা বা তুলসীদাসের মতো তার রামকথা এবং মহাভারত চিরজীবী।তিনি রামায়ণ কাহিনীকে উপন‍্যাসের মতো আকর্ষণীয় করেছেন।চলিত ভাষা ব‍্যবহার,দুরূহতা ও জটিলতা পরিহার,সর্বোপরি উপন‍্যাস সুলভ কাহিনীবৃও গ্রন্হটিকে আদ‍্যন্ত রমণীয় করেছে।রাজশেখরের প্রবন্ধ সংখ‍্যা ৬০ এর বেশী নয়।তাঁর প্রবন্ধ গ্রন্হ মূলত তিনটি-লঘুগুরু(১৯৩৯),বিচিন্তা(১৯৫৫),চলচ্চিন্তা(১৯৫৮)।তাছাড়া কুটির শিল্প ও ভারতের খনিজ -শীর্ষক দুটি ক্ষুদ্র পুস্তিকাও তিনি লিখেছেন।তার সমস্ত প্রবন্ধের বিষয়বস্তু ছিল অসাধারণ বৈচিত্র্যপূর্ণ।তাঁর প্রবন্ধের অতিরিক্ত প্রাপ্তি হালকা পরিহাসের ভঙ্গি।তাঁর সমস্ত প্রবন্ধ সহজ,সরল অথচ কৌতুক মিশ্রিত।

   ব‍্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন অত‍্যন্ত সরল প্রকৃতির।তিনি প্রথমে বেঙ্গল কেমিক‍্যাল অ‍্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়াকস্ কোম্পানিতে কর্মজীবন শুরু করেন।স্বীয় দক্ষতায় অল্পদিনেই তিনি আচার্য  প্রফুল্ল চন্দ্র রায় ও তৎকালীন ম‍্যানেজিং ডিরেক্টর ডাঃকার্তিক বসুর প্রিয় ভাজন হন।১৯০৪ সালে কোম্পানির পরিচালক পদে উন্নীত হন।

    ১৯০৬ সালে ব্রিটিশ শাসিত অবিভক্ত ভারতে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ গঠিত হলে রাজ শেখর বসু তাতে সক্রিয় অংশনেন।এক সময় লুম্বিনী পার্ক মানসিক হাসপাতাল তৈরীর জন‍্য তিনি জমি দান করেন।১৯৪০ সালে ৫ ফেব্রুয়ারি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়।সাহিত‍্য কর্মকান্ডের স্বীকৃতি স্বরূপ পেয়েছেন জীবনে বহু পুরষ্কার।১৯৩৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক গঠিত বানান -সংস্কার সমিতি এবং ১৯৪৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ  সরকারের পরিভাষা সংসদে সভাপতিত্ব করেন রাজশেখর বসু।১৯৫৫ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক রবীন্দ্র পুরষ্কার পান তিনি।১৯৫৫-৫৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষ্যে ডি.লিট উপাধিতে ভূষিত হন তিনি।যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক সান্মনিক ডক্টরেট ডিগ্রি পান তিনি।১৯৪০ সালে জগত্তারিণী পদক ও ১৯৫৫ সালে সরোজিনী পদকে ভূষিত হন।

   ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনেও তিনি পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন।স্বাধীনতা সংগ্রামে বিপ্লবীদের রাসায়নিক পদার্থ,টাকা ও রাসায়নিক বিদ‍্যা সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা দিয়ে সাহায‍্য করতেন।বিখ‍্যাত চলচ্চিত্রকার অস্কার জয়ী সত‍্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় রাজশেখর বসু র দুটি ছোটগল্প,যথাক্রমে -পরশপাথর এবং বিরিঞ্চিবাবা অবলম্বনে চলচ্চিত্র প্রকাশ হয়।

    ১৯৫৯ সালে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়ে অসুস্থ  হয়ে পড়লেও লেখালেখি চালিয়ে যান।অবশেষে ১৯৬০ সালে ২৭ এপ্রিল ঘুমন্ত অবস্থায় রাজশেখর বসুর মৃত‍্যু হয়।আজও তিনি বাঙালির হৃদয়ে আধুনিক পরশুরাম হিসেবে চিরজীবী হয়ে আছেন।