Nov 29, 2022

অপাংশু দেবনাথ

ষট্‌পদী-এক

আজন্ম বুকে চাষ করেছি স্বপ্ন কিংবা ভুল,
সারা জীবন ধরে জেনেছি, আমিই প্রথম ফুল।

হেঁটে যাও বলে হাওয়ায় ওড়ে সে আঁচল,
এই জীবন বুঝি শেখায়, ভালোবাসা সমর্পণ।

স্নান সেরে ওঠে এখনো কি পোড়াও শরীর?
বুকে চাষ করি বারোমাস তোমার অসুখ!

তৈমুর খান

পরজন্ম

পথ গুটিয়ে থাকুক 
গুটিয়ে থাকুক পথ 
তস্তরিতে পাণ্ডুবর্ণ আলো 
আবছা ভবিষ্যৎ।
 
মুঠোয় জোনাক রাখি 
জোনাক রাখি মুঠোয় 
সঞ্চয় এটুকুই 
পিপাসা থাকুক কলসির ফুটোয়।
 
দুয়ার আগলায় চোখ 
চোখ আগলায় দুয়ার 
নিঃস্ব ইচ্ছাগুলি বাঁচে 
বাঁচিয়ে রাখে খোঁয়াড়।
 
জলছবিতে সূর্য 
সূর্য জলছবিতে 
পরজন্ম এঁকে রাখি 
নিসর্গ নিশিতে।

সৌমিত বসু

মায়াবৌ - ১৩১

ছাই উড়ছে। চোখের ওপর দিয়ে গুঁড়ো গুঁড়ো ছাই উড়ে যাচ্ছে বাতাসের সীমানা পেরিয়ে। আমি ভাবি ,কোথাও হয়তো বা লেগেছে আগুন। কারো পুড়ে যাওয়া আসবাব ,বিছানাপত্র হু -হু করে ছড়িয়ে পড়ছে বুঝি বাতাসের সাথে।

ইস্কুলে বেরোবো ,আবার সামনে সেই ছাই। আমি ভাবি, কারোর জীবনে বা লেগেছে আগুন। সংসার ভেঙে ভেঙে চতুর্দিকে। তারই  ছাই ওড়ে দিনের বাতাসে।

বিকেলে পার্কে দেখি মুখচোখ সাদা হয়ে ছাইয়ের প্রলেপ। এবার ভেবেছি ,কারোর কবিতাখাতা হয়তোবা আগুনে পুড়ছে।হয়তোবা পুড়ে যাচ্ছে হারমোনিয়াম।

রাতে স্বপ্নের ভেতর দেখি ছাই ওড়ে। আলোটা জ্বালাই।ছাইগুলো মেখে নিই দু-হাতে আঙুলে।ভালো করে দেখি ,ও মেয়ে ,এতো তোর শরীর পোড়া ছাই।

কুশল ভৌমিক

মানুষ কে উড়তে দিন 

মানুষ কে উড়তে দিন
কেননা প্রতিটি মানুষ ভেতরে ভেতরে
একেকটা পাখি
পরিযায়ী মেঘের মতো মানুষ ভেসে বেড়াতে চায় আত্মরচিত সুনীল আকাশে 
দোহাই আপনাদের, এমন অদৃশ্য শেকলে
মানুষকে বাঁধবেন না
তাকে দিন উড়বার স্বাধীনতা। 
একবার, অন্তত একবার,মানুষ বুঝতে শিখুক -
এইসব কাঁটাতার, ব্যারিকেড, সংবিধান
নরেন্দ্র -ট্রাম্প-ওসামাদের বাইরেও
 মানুষের একটা আকাশ আছে,
যে আকাশটা শুধুই মানুষের। 

মানুষ কে উড়তে দিন
মানুষ বিশ্বাস করুক -
উন্মুক্ত আকাশটাই মানুষের মাতৃভূমি।

অনিক রায়

শ্মশানের যৌবন

হ্যাঁ ফিরেছে শ্মশানের কাঙখিত যৌবন, 
শ্মশান সাজছে নব আভরণ।

সাজাও সাজাও নদীর পাড়ে ফুলশয্যার খাট, 
বয়সের বাধা নেই কাকে যে টেনে নেবে- 
পেতে যৌবনের স্বাদ!
নতুন নাটে নাম হয় বসে চাঁদের হাট। 

হ্যাঁ শ্মশানের যৌবন ফিরেছে, আগুনে  ঘেরা চাদরে। 
শ্মশানের নাকি অহংকার হয়েছে, শ্যামা মা-র আদরে- শুনেছি যার দিকে তাকায় শ্মশান, 
তাকেই মোহিত করে।
যৌবনের অস্তি রাখে শেষ কাঠের কোটরে, 
তোমরা বাজাও খোল করতাল।
 চর্চা হোক শ্মশানের যৌবনের, 
নীরব নিশিত জ্বালাও প্রদীপ-
একে একে সঙ্গী হবো যৌবনের, প্রতিটি ক্ষণের।

পঙ্কজ কান্তি মালাকার

হাসি মোহন

তার গোলাপ ঠোঁটের হাসিতে
আনন্দ ছড়ায় বাতাস,
পলাশ রাঙা কপোল আভায়
রঞ্জিত হয় আকাশ,

তার বকুলচোখের তীর চাহনি
আদর বোলায় মনে,
গালে হাত দিয়ে ভাবছি তা'ই
বুঁজাচোখে আনমনে।

দাঁতপড়া মুখে ফ্যালফ্যালিয়ে
তখন বুড়ি দিল দেখা
"রসে মজেছ দাদুভাই!" -বলে
দিল মোরে ঝটকা,

"যাও সরে চামড়াকুচোঁ
দাঁতপড়া বুড়ি",
তেড়েমেড়ে বুড়ি বলে
"এককালে বুড়িও ছিল ছুড়ি,

এককালে এই রূপবাহারে
মজত রাজ্যের ছোড়া,
এই রূপবাহারে মুগ্ধচোখে
তোর দাদু হত আত্মহারা,

এখন আমার দিন গেল
মনে কি ধরবে তোর?
আন না এক রূপসুন্দরী
চামড়াকুঁচ পর্যন্ত কর ঘর।"

এই কি তবে রূপের মোহন
কচুরজলের মত!
বুড়ি ভাঙেনি স্বপ্ন,সত্য দেখালো
দিনের আলোর মত।

সুমিতা বর্ধন

ভিন্নতা

মনে হয় নিরুত্তাপ, নির্জীব একটি মানুষ,
উত্তাপের মাত্রা  কবেই শূন্যের কোঠায়, 
দিন যায়, সময় বয়ে  যায়
সেই গতিতে  কোন ফারাক  পড়ে না,
পার্থিব গতিতেও যে অবিশ্বাস,
চলার পথে কেমন একটা ধোঁয়াশা অন্ধকার,
সেই অন্ধকারের গতি পথ ধরেই
নির্জীব, নিরুত্তাপ মানুষের চলা,
হঠাৎ খেয়ালের বশে  দৃষ্টি  যায়
অন্ধকারের আকাশ ফুঁড়ে 
ভোরের  সূর্য উঠে,
কিন্তু ঐ সূর্যের তাপ ও যে 
বড়োই  শীতল ঠেকে।

রুদ্র মোস্তফা

প্রথা বিলুপ্তির পরের প্রথা 

ক্রীতদাস পিতার নয়নে কেউ পুঁতে ছিলো হিরে,
আভিজাত্যের আশায় রোজ সে চোখ খনন করছি...
অনেক বিপ্লব বয়ে গেছে কাগজের বুক চিরে  
আমরা তবু খনির মজুর জন্ম দিচ্ছি অভ্যাসের আঁতুড়ঘরে।
ভুলে যাচ্ছি কে কার জনক!
চোখের সুরঙ্গ ধরে খুঁজছি ভালো থাকার সকল শর্ত
খুঁড়ে চলছি পুঁজির গোপন গর্ত! 
রূপকথার রঙিন আদর ভুলিয়ে দিচ্ছে সমাজ
কথার রূপে আমরা হারাচ্ছি কণ্ঠের নির্মল স্বাধীনতা 
পুত্রের চোখ ফসকে পালাচ্ছে পিতার কোলাজ 
প্রতিদিন ভুলে যাচ্ছি পূর্বের পরাধীনতা। 
কেউ বলেনি হিরায় বিষ থাকে, 
কখনো কেউ প্রশ্ন করেনি, কে চড়ালো তার মূল্য? 
খনি ভেবে খুঁড়ে চলছো যাকে 
সে যে তোমার-ই পিতা,তুমি যে তারই সমতুল্য। 
পাথর গড়িয়েছে অনেক 
না দেখে মায়ের মুখ,দেখছি নয়া সাম্রাজ্যের ঘোমটা 
নিজেই বিক্রি করে নিজের মাথা 
আমরাই টিকিয়ে রাখছি দাস প্রথা— প্রথা বিলুপ্তির পরে।

সমরেন্দ্র বিশ্বাস

জেব্রার থিওরোম  


জেব্রার সাদা কালো দাগে হাত বুলিয়ে কেউ কি সমাধান করতে পারে জ্যামিতির থিওরোম? চিড়িয়াখানা থেকে বেরিয়ে এসেছে যে স্কুল, সেখানে আমার সেকেন্ডারীর ক্লাসটা ঝোলানো আছে ধার করা জামার ছেঁড়া পকেটে।

টানটান টাকার-সেতার বাজে ফেমাস স্কুলে। শহরে শহরে শিক্ষকদিবসের ইভিনিং শো-তে আজকাল খুব ভীড়। আমার কি আর ম্যাট্রিক, থুরি, সেকেন্ডারীটা পাশ করা হলো না? আকাশ থেকে উড়ে আসে বইএর বিচিত্র মলাট; কাকের পালকেরা লেপ্টে থাকে ল্যাপটপের সৌখীন ঘাসে। জীবনের ক্যালেন্ডার আর পরীক্ষার সিলেবাসে কোন তালমিল আছে কি? তবুও যানজটে দিশেহারা আমি পৌঁছে যাই প্রেইরী ঘাসের জঙ্গলে। সেখানে ফিস্‌ দেয়া সম্ভ্রান্ত ছেলেমেয়েরা ঘাসের বেলুন ফোলাচ্ছে। জেব্রার জামা পরে শিক্ষকেরা ঘুরে ঘুরে ঘাস খাচ্ছে।

বিজ্ঞাপনের সাইরেণ বাজলে তথাকথিত শিক্ষা পর্ষদের জুতোর লেস খুলে যায়। ঘোষিত  হয় – হায়ার সেকেন্ডারী পাশের ধূলোট বাদামী রাস্তা পোলট্রির মুরগীদের মতো মিথ্যে মিথ্যা মিথ্যা! মেশিনে ঢালাই করা নতুন নতুন রাস্তা চলে গেছে অসম্ভব সমস্ত বর্ণাঢ্য থিওরোমের দিকে, সেখানে সোনার খনি বাজছে! আপাততঃ টাকা দিয়ে কয়েকটা ফড়িং ধরে আনতে পারলেই এডুকেশন সিস্টেম ছাত্রদের গলায় ঝোলাবে কর্পোরেট মেডেল, ভূর্য্যপত্রের স্বাক্ষরবিহীন ডিজিটাল মার্কসশীট।

বর্ণাঢ্য থিওরোম আর মেশিনে ঢালাই নতুন রাস্তারা সুনীল আকাশের দিকে মাস্টার্স ডিগ্রীর ডিজিটাল রুমাল নাড়ছে। কয়েকটা সাদা পায়রা সেই সব রুমাল পকেটে গুঁজে তাদের স্বচ্ছ্বল ডানায় অন্য দিগন্তের দিকে উড়ে গেলো, যেখানে লকারে ঘেরা জীবনের ডিকশেনারি। 

জেব্রার সাদাকালো দাগে হাত বুলিয়ে ভাবাচ্যাকা আজও আমি বসে আছি থিওরোমের কিনারায়। বিষয়টা খুবই সহজ, অথচ আমার এখনোও ম্যাট্রিক পাশটা হলো না।

কৃষ্ণকুসুম পাল

প্রেমের কবিতা

হিমালয় কবিতা লিখছে-
বরফে ঢেকেছে শরীর
সৃষ্টি হচ্ছে নদী
আকাশে তুলেছে শির
তাই সে মৌন।
               
সাগর কবিতা লিখছে
নোনা জলে উঠছে গর্জন
বুকে খেলছে অসংখ্য প্রাণী
চোখে নেই ঘুম
তাই সে উত্তাল।
               
কবি কবিতা লিখছে-
অসীম বিশ্বে সে একা
প্রেমেপাগল,প্রতিবাদে আগুন
সে হিমালয় হতে চায়
সে সাগর হতে চায়
তাই সে প্রাণ বিলায়।

আব্দুল গফফার

এখন বড় একাই লাগে

নীলাঞ্জনা একবার তাকিয়ে দেখো,
আমার দুচোখের পলক স্তব্ধ!
তোমার পটলচেরা চাহনিতে একবার দৃষ্টি ফেরাও,
শুভদৃষ্টি হয়ে ফিরে আসুক -
তোমার গভীর অনুরাগের ছোঁয়া।

নীলু তোমার মনে পড়ে,
যেদিন আমাদের প্রথম দেখা-
আগুন আর বৃষ্টি খেলায় মেতে উঠেছিল,
বৃষ্টিকে সাক্ষী রেখে তোমার উতলা মন,
গ্রাস করেছিল আগুনের আঁচকে!

ওত পেতে বসে থেকে, 
কত সময় কেটে গেছে প্রেমালাপে;
কখন জন্ম নিয়েছিল ঘর বাঁধার স্বপ্ন বুঝিনি-
যে স্বপ্ন বৃষ্টি আগুনকে মাড়িয়ে,
আজও ফানুসের মত ছুটে বেড়াচ্ছে!

জানো তোমার ভালোবাসার অঝোড় বৃষ্টিতে - 
অবগাহন করে চলেছি নিরন্তর।
কোনদিন আর আসবে না, শুভলগ্নের সেই মুহূর্ত,
আগুনে জ্বেলে পুড়ে খাক আমার মনবাগান।
আমাকে এখন বড় একাই লাগে!

নমিতা সরকার

সত্য

ঘুম আমার জেগে আছে রাতের শহরে আলোক সজ্জার ভীড়ে ব্যস্ততার শহরে -
গাড়ির সাইরেনের বেজে ওঠা সমস্ত শব্দ উপেক্ষা করে হৃদয়ে বেজে উঠে একটি শব্দ আমি কে বা কে আমার?
মাতাপিতার বিন্দু বিন্দু রক্তকণিকা ক্ষয় করে পৃথিবীর বুকে যে জীবন প্রতিস্থাপন করেছি তাদের হতে পেরেছি? না তাদেরও হতে পারি নি - 
তাই তোমারো হতে পারি নি, তবুও সেই তোমাকেই খুঁজি বারবার -
আমার জন্মই বলে দিয়েছে মৃত্যু অনিবার্য তাই আমি শুধুই তার।

রাহুল সিনহা

নিশিডাক

এই কলহপর রাত ও অমিল সিডেটিভ
লিখে রাখে বায়বীয় হাতছানি,
যতটা তীব্র মনখারাপ আমাকে
বন্দরের দিকে টেনে নিয়ে গেছে,
তার সুরে হারমোনিকা বাজাও,
হয়তো চন্দ্রাহতের মতো
ফিরে আসবো তোমার জানালায়।

নন্দিতা দাস চৌধুরী

ঘনছায়া আশ্রয়


প্রতিদিন নিভৃতে তোমার  সাথেই কথা বলি আর ডুব দেই অতলে,
ভালো করে তাকিয়ে দেখি অগোছালো জীবনটাকে যা এখনো অপেক্ষায় রাত গুনে,
প্রেমিক  হওয়া তো সহজ কথা নয় তবুও পা তো সেদিকেই বাড়াই,
আকাঙ্ক্ষা আরাবল্লী পর্বত, প্রতিনিয়ত ছুটছে পূর্ণা গিরণা খাম্বাতের টানে,
যে ঘাটে তুমি মাঝি সে ঘাটেই আমার জলসোঁই সে যত ঝড় তুফানই হোক না কেন,
যে ভাবনা আমায় অন্তরে অন্তরে বাউল করে সেতো তোমারই অভ্যর্থনা, এক ঘনছায়া আশ্রয়।

শান্তনু মজুমদার

 ইন্দ্রের সভা (গল্প )


শুভ সকালের খাবার খেয়ে বাড়ি থেকে নিজের প্রিন্টিং এর দোকানে যাচ্ছিল সাইকেলে করে। চন্দ্রাদের বাড়ির সামনে ভিড় দেখে এগিয়ে গেলো। জ্যেঠিমার শরীর এমনিতেই ভালো নেই অনেকদিন ধরে। কিছু আজে বাজে ঘটে গেলো না তো আবার। কিন্তু কেউই যে বাড়ির ভেতর ঢুকছে না করোনা আতঙ্কে। 

শুভ ঢুকবে কি না ভাবছে। এমনিতেই চন্দ্রার বাবা শুভকে দু' চোখে দেখতে পারেন না। কোন প্রেম টেম নয়। শুধু সমবয়সি বন্ধুত্ত্ব। মনের মিল একটু বেশী। কিন্তু উনাকে কে কি বোঝাবে। চন্দ্রার বাবা তো শুভকে সুযোগ পেলে অপমান করতে ছাড়েন না। উনি চাকরি বাকরি করে না এমন ছেলে একদম পছন্দ করেন না। তাও আবার সামান্য দোকানদার শুভ, যে কিনা উনার মেয়ের সাথে একটু যেন বেশী ঘনিষ্ট। একদমই সহ্য হয় না উনার।

অনেক সাহস করে, আর বাড়ি থেকে বেরোবার সময় একটা ঘটনার কথা মনে হতেই শুভ তাদের বাড়িতে ঢুকে গেলো। 

কি বাজে অবস্থা। মাসিমা অসুস্থ হয়ে পরে গেছেন বাজে ভাবে। এমনিতেই দুটো কিডনী  খারাপ। পড়ে গিয়ে কিডনী জয়েন্টে আরো মারাত্মক ব্যথা পেয়েছেন। চন্দ্রা আর জ্যেঠু একা তুলতে পারেননি মাটি থেকে। রুগ্ন মানুষটার সাথে তারা দুজনও নিচে বসে রয়েছেন অ্যাম্বুলেন্সের অপেক্ষায়। জ্যেঠু নিজেও অসুস্থ খুব। পারকিনসন্স, স্পন্ডালাইটিস এর সমস্যা আছে। অ্যাম্বুলেন্সে চন্দ্রার সাথে শুভও উঠলো। লোকাল হাসপাতাল থেকে রেফার করা হল রাজধানীর গোবিন্দ বল্লভ পন্থ হাসপাতালে। সব মিলিয়ে প্রায় দু' লাখ টাকা লাগবে। অপারেশন হবে। 

চন্দ্রার বাবা সারা জীবন সামান্য বেতনে সরকারি চাকুরি করেছেন। যা রোজগার করেছেন সব স্বামী, স্ত্রীর চিকিৎসা, সন্তানদের পড়াশোনা ও বড় মেয়ের বিয়েতেই শেষ। পেনশনের টাকা দিয়ে অনেক কষ্টে সংসার চলে। ফোনে চন্দ্রার মুখে দু' লাখ টাকার কথা শুনে    পাগলের মত এদিক ওদিক অনেককেই অনুরোধ করলেন এই দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানোর জন্যে। বড় মেয়ের জামাই কিছু টাকা পাঠালো। দুদিনে ৫০ হাজার টাকা ব্যবস্থা হল। বিমর্ষ হয়ে পড়লেন তিনি। তখনই জানতে পারেন উনার অপছন্দের শুভ তার তিনটি দামী কম্পিউটার, একটি দামী প্রিন্টার ও প্রজেক্টর বিক্রি করে এবং নিজের কিছু সেভিংস মিলিয়ে প্রায় এক লক্ষ ৭০ হাজার টাকা ব্যবস্থা করে নিয়েছে।

প্রায় এক মাস অতিক্রান্ত। চন্দ্রার মা আজ অনেকটাই সুস্থ। শুভ আর চন্দ্রা আজ উনাকে নিয়ে বাড়ী ফিরছে। ট্রেনে আসার সময় চন্দ্রা শুভকে বললো, "জানিস শুভ আমি জানতাম মার কিছু হবে না। যেদিন মা পড়ে গেলো ঠিক তখনই আকাশে ইন্দ্রের সভা বসেছিল। আমি আগে কখনো দেখি নি। কিন্তু বইতে পড়েছি। তখন ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করলে সবাই মিলে আশীর্বাদ করেন।"

শুভ মনে মনে হাসে। ওইদিন সাইকেলে উঠার আগে আকাশে চোখ পড়তেই দেখেছিল সূর্যের চারিদিকে গোল রামধনু। আগে কোনদিন দেখে নি। মাকে ডেকে দেখাতেই মা বলেছিল, "প্রণাম কর বাবা, ইন্দ্রদেবের সভা বসেছে। তোর মঙ্গল হবে। আশীর্বাদ নে বাবা। তুই যা করবি তাতেই জগতের মঙ্গল হবে। তোরও ভালো হবে।"

চন্দ্রাকে বলল শুভ সেই কথা। দুজনেই দুজনকে নতুন করে আজ দেখতে লাগলো। সাতরঙা তৃপ্তির হাসি দুজনের মুখে।

সাগর শাহ্

তোমরা হও আগুয়ান

ওহে নওজোয়ান হও আগুয়ান
ভাঙ্গ জালিমের ঘাঁটি।
বাংলায় আজ আগাছা জন্মেছে,
অনুর্বর আজ মাটি। 

নজরুল সুকান্ত ফিরবে কবে.! 
প্রতিবাদী এক মিছিল হবে,
গরীব দুঃখী আছি সবে।
বলো না,বলো আমায়
তারা আবার ফিরবে কবে.?

কে আছ এমন, কে এমন রবে ?
তবে কি কেউ নেই.!
যে এমন তাদের মতো হবে।
তবে কি গরীব দুঃখী ভোগবে.!
নিপীড়ন নির্যাতনে,
বিদ্রোহ জানাবে শুধু মনে মনে।

বাংলার মাটি হবে খাঁটি, 
যদি তোমরা হও আগুয়ান। 
ওহে নবীন নওজোয়ান 
আমার উদাত্ত আহ্বান, 
তোমরা হও আগুয়ান।

মো: রুবেল

সমর্পণ

যে মেয়েটা তোমার বুকে আকাশ খুঁজে।
যে মেয়েটা ঐ আকাশের পাখি হতে চায় অনায়াসে।
যে মেয়েটার 'তুমিহীন' প্রবল প্রলয়ের উদ্ভাবন।
যে মেয়েটার সব তোমার নামেই সমর্পণ।
যে মেয়েটা স্বপ্ন সাজায় অবিরত।
যে মেয়েটা সব প্রথা ভাঙে নিজের মতো।
যে মেয়েটার মেঘের মতো জমাট দুঃখে,
যে মেয়েটা 'সুখ বলতে' তোমায় বুঝে।
যে মেয়েটা তোমায় নিয়ে বাঁচতে বলে,
আর যাই হোক
সে মেয়েটা তোমায় ভালোবাসতে জানে।।

শান্তনু মজুমদার

আর কত দিন

কাজে মন বসে না।
দেখেছি বাবার মনভাঙা খাটুনি,
আপোষহীন চুপ জীবন।
মাথার খুলিটাকেও সাদা হয়ে ছাই হতে দেখেছি।
বুক ভেঙেছে, চোখ ভেজে নি।
কেউ তাঁকে মনে রাখেনি।
শুধু দাগ গুলি থেকে গেছে 
আলোচনায়।

মুক্ত পথিক এবার ভবঘুরে হতে চায়।
গলি পথ, মাঠ, অন্যের ড্রইংরুম,
বইয়ের গন্ধ, ট্রেনের কামরা-
মানুষ থেকে অনেক আলাদা।
তারা শর্ত লঙ্ঘনে হারিয়ে যায় না দূরে।
দুহাত মেলে কাছে টানে।

আকাশ অনেক বড়,
তোমার পৃথিবী বিশাল,
চোখের সীমানা ছাড়িয়ে বৃষ্টি পরে।
সেই বৃষ্টিতে আমি ভিজি।
আর কটা দিন, ভিজতে দাও।
যতদিন না খুলিটা সাদা হয়।

মীনাক্ষী চক্রবর্তী সোম

চন্দ্রাহত

অভিসার রাত্রিতে 
ছায়াপথের সাথে কত রাত হেঁটেছে চাঁদ।
বিনিদ্র যাপনে ফিরেও দেখেনি  
আকাশের নীলিমায় ছিল সমর্পণের ইঙ্গিত।
নিঃশব্দ পদচারণায়  
চন্দ্রাহত জোছনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে 
মুখ ঢেকেছিল মেঘের ওড়নায় 
সাথে ছিল অগুনতি নক্ষত্রপুঞ্জ।
সূর্যের প্রতীক্ষায় থাকা আলো
তখনো বিদ্রোহ করে নি 
সেরকম প্রতিবাদের ভাষা 
ওদের জন্য লিখে রাখেনি কেউই।
লিখেছিল শুধু আলোকবর্ষ,
দূর থেকে বয়ে এনেছিল 
অনেক উল্কাপাতের সাথে আশঙ্কার সারি।
ধূমকেতু তখনো জাগেনি
যে পরিমাণ আলোর প্রয়োজন  
আশ্লেষে, প্রতিবাদে অথবা বিদ্রোহে
সেটুকু ধূসর হয়ে মিশেছিল সূর্যের সাথে ।
রোদের সাগর সাঁতরে পেরিয়ে এলে
ছায়াপথের মোহনায় মেশা যায় 
একথা চাঁদও জানে।।

পারমিতা মুস্তাফি

তুমিই মূল

ঝড় উঠেছে এলোমেলো সব,
কতই না রং মাখবো -
কত যে সাজবো দিঘল  চুলে,
কত না আচার শুনবো।
বর  এলো বর এলো -
কাজলা দিদির মেয়ে,
দেখতে এসে বললো শেষ -
আমি তোমার হয়ে।
সেই যে এলো রাজকুমার -
রাজপুত্র শুয়ে,
এক যে আছে রাজ কন্যে -
কদমতলা হয়ে।
হাসি খুশি মিনতি দি -
ঘুমিয়ে আছে চিতে,
এক যে আছে চাঁদমামা -
গাইছে সমান শীতে।
চাঁদের বুড়ি চরকা কাটে -
গন্ধে ভরা ফুল,
একুল ওকুল দুকুল আছে -
তুমিই আমার মূল।

জগন্নাথ বনিক

আপন পরের খেলা 

আপন মানুষ কাছের যেমন,
আপন মানুষ আবার পর।
আপন পরের চলছে খেলা,
     এই পৃথিবীর ঘর।

যাকেই আমি আপন ভেবে,
বলছি মনের কথা।
দুঃখ দিয়ে কষ্ট দিয়ে আপন মানুষ,
দিয়ে যায়, আবার মনের ব‍্যথা।।

ভাই বলো, বন্ধু বলো,
সবাই আপন মানুষ।
অর্থের স্বার্থে হয় যে পৃথক,
থাকে না তখন আপন মানুষের হুঁশ।।

একই রক্ত আপন পরের,
রঙ যে আবার লাল।
এই পৃথিবী তোমার আমার,
হিংসা নয়, যুদ্ধ নয়, ভালোবাসা থাকে যেন চিরকাল।।

গৌতম দাস

চ্যানেল

যান্ত্রিক জমানায় বৈদ্যুতিক
সংযোগ ছাড়াই চলে এক চ্যানেল।
ঝড়, বৃষ্টি, তুফানেও এই চ্যানেল পরিষ্কার দেখায়।
চোখের ইশারায় আর মুখোশের দাপটে চলে এটা।
রোগী,যোগী, তীর্থস্থান দর্শনেও ফাটাফাটি কাজ করে এই চ্যানেল।
লাইনে দাঁড়াতে দাঁড়াতে যখন কোমর ভাঙার অবস্থা।
হঠাৎই চোখে পড়ে চ্যানেলে দেখায় গন্তব্যস্হলের রাস্তা।
পূজা মন্ডপে আর শনিতলাতে-
নকুলদানা না পেয়ে কারোর মনে লাগে দুঃখ। 
একই স্হানে চ্যানেলের এক চুটকিতে -
চলে আসে আপেলের টুকরো আর ভোগ।
বাড়ি ঘরের আয়োজনেও পিছপা হয়না এই চ্যানেল।
সমাজের লোকে শুনে শুধু খিচুড়ি আর সব্জি,পায়েস এখন শেষ।
ওমা আড়ালে দিচ্ছে পায়েস যাদের চ্যানেল আছে বেশ।
এই চ্যানেলটা ভীষণ ভোগী-
কারোর মেধা পিষে মেরে, কামিয়ে খেয়ে সাজে শান্ত যোগী।
চ্যানেলটার আছে এক ধাঁধা-
ঘোড়াকে দাবিয়ে রেখে বানিয়ে ফেলে গাধা।
হাঁটে, ঘাটে, মাঠে সর্বত্র চলছে চ্যানেলের কড়াল গ্রাস।
শিরদাঁড়া সোজা করে না দাঁড়ালে-
চ্যানেলে দেখাবে উর্বর সমাজের সর্বনাশ।

অভিষেক অধিকারী

পাথুরে প্রমাণ 

সংকেত চিহ্নের প্রতিটি স্বাক্ষর,
আর একটা উদ্দাম আশাহীন খাদ,
এঁকে চলে সভ‍্যতার প্রত্ন চিত্র।

একটা নগর ঐতিহ‍্যের কারখানা
সঙ্গে মৃত্তিকা স্তরের শেষ পদচিহ্ন 
নিয়ে আসে যুগচক্রের প্রশ্ন।

একটা যুগ নিজেকে প্রমাণ করতে পারে,
প্রমাণ করতে পারে নিজের অস্তিত্ত্বের।
খননকৃত পাথুরে দ্রব‍্যের কাছে তার নিজেকে
মেলে ধরার কিছু নেই।
 
সে ধরা দেয় না,
পাথুরে লিপিকার গায়ে তার কোন স্বাক্ষর নেই।
সে স্বাক্ষর করে না।
হাজারটা পাথুরে স্থাপত‍্যের জনসভায় তার কোন স্থান নেই।
তবুও খননকার্য চলতে থাকে,
আর একটা যুগচক্রকে ব‍্যঙ্গ করতে
একটা পাথুরে প্রমাণের আশায়।

মীরা পাল

অনিশ্চয়তার সময়টুকু

এখন আর জ্যোৎস্নার জলে গা ভাসিয়ে দিই না
যদিও অনিশ্চয়তার মেঘ এখন সারা আকাশ জুড়ে,
বাঁধভাঙা প্রবল জলোচ্ছ্বাসে এক লহমায় জীবন ভাসিয়েছিল খরস্রোতে!
শহর জুড়ে সেদিন ছিল শুধু মন খারাপের বর্ষা,
বন্যার জলে ডুবে থাকা শহরেও জীবন খুঁজতে দেখেছি,
মানব সৃষ্ট বিপর্যয়; বুকের ভিতর অবিরাম ক্রন্দন,
বাঁচার লড়াই, সর্বস্বান্তের হাহাকার গুঞ্জরণের ঝড়..
জেগেছিল কেবল নৈশব্দ আর অব্যক্ত উৎকন্ঠা রাত একাকী...
অবচেতনের প্রতিটা রাত জানে জমানো কষ্টকথা,
তাইতো আর মায়ার বাঁধনে জড়াতে সাহস হয় না-
অথচ জ্যোৎস্না রাতের আলো ভালোবাসার মালা গেঁথে
আবারও মায়ায় জড়াতে চায়।

ড.রঞ্জিত দে

পাহাড়ে একদিন 

ছোট পাহাড় ঘোরানো রাস্তা,
কয়েকঘর বসতি-দুয়ারে লাউ ঝিঙের লতা,
পাশে কলা,কাঁঠাল,আম-গাছে গাছে।
পাহাড়ের গায়ে গায়ে ছোট ছরা-
ওটাই নদী-ওখানে ঘুরে বেরায় কয়েকটা হাঁস। 
পাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে বন মোরগ। 
বনফুলের গন্ধে আন্দোলিত বাতাসে-
বন পাখি মনের সুখে ডেকে চলে,
উপজাতি রমণীদের নিত্য দিনের কাজ-
ঐ ছোট নদীর স্বচ্ছ জলে,
তামাটে হয়ে আসা বিকালের রোদে,
ঘরে ফিরে জুমিয়া বোনেরা-
জুমের ফসল ঘিরে তাদের কাজ।
শীত নেমে আসে পাহাড়ের বুকে-
দূরে কোনো জুম ক্ষেতে জ্বলে উঠে আগুন, 
আগামী দিনের ফসলের আশায়। 
পাহাড়ে একদিন ভোরের আলোয় হাঁটতে হাঁটতে, 
বিকালে কুয়াশা মাখা হলুদ আলোয় দেখেছিলাম যাকে,
হারিয়ে যাওয়ার আগে খুঁজে নেবো ভেবেও,
যাওয়া হলো না,রাস্তা ভুলে যাই বারে বারে।।

কাজী নিনারা বেগম

জীবন রহস্য

ব্যর্থতার চাদর গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছি।
তবুও  ধৈর্যের ইচ্ছের হাঁসিগুলো বড় রহস্যময়, 
নতুন   রঙে রঞ্জিত স্বপ্নের দেয়ালে।
ইঁট কাঠ পাথরের পুরানো বাড়িটির পা ছড়ানো আভিজাত্যের অমসৃণ দেয়ালে। 
সমাজে বিতাড়িত হয়েও লাথখোর হয়েও চলেছি   একা,
অদ্ভুত এক জীবন  রহস্যের চলচ্চিত্র সেখানে শুধু মুখোশের আড়ালে  পাঠ আদায়ের পালা। 
পালা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ!

রমা চন্দ্র

অভীপ্সা

রামধনুকে ধরব বলে
যেমন বাড়াই ইচ্ছা...
তুমি চোখের কাছাকাছি
কেবল‌ই খেলি কানামাছি!
ঝকঝকে সাঁঝের আকাশে-
শুকতারার আশে,
দূর- কাঞ্চনজঙ্ঘায়
সূর্যোদয়ের পাশে!
ছুঁয়ে যাওয়া মন
স্পর্শিত হ‌ওয়ার অপেক্ষায়...
চঞ্চল হৃদয় খোঁজে-
শুধু খুঁজে চলে যায়...
কবিতা লিখবে বলে
জীবনের শেষ অধ্যায়-
জীবনরূপী উপন্যাসের...
সাদা পাতায়!

অপর্না পোদ্দার সাহা

ডাকঘর

হাজার চিঠি লালঘরে
জমে থাকে রোজ
ডাক পিওনের হাতটি ধরে
পাই যে তোমার খোঁজ। 

অপেক্ষারা থাকে বুঝি
হৃদয়ান্ত ডোরে
ভোর হতেই চেয়ে থাকি
রাণার পাখীর 'পরে।

অফিস আদালত কর্মব্যস্ততা 
ছুটাছুটি নিত্য
অজানাকে খুঁজে বেড়াই
পাহাড় প্রমাণ সত্য। 

আয় ব্যয় হিসাব নিকাশ 
সবই তোমায় যুক্ত
পরপারে পৌঁছে গেলে 
অর্থকড়ি সব মুক্ত।

সাগর শর্মা

স্বপ্নিল পাখি

স্বপ্ন দেখতে দেখতে রাতে অনিদ্রা হয়!
সকালে টিভিতে মৃত্যুর হেডলাইন দেখে-
চেয়ারেই ঘুমিয়ে পড়ি।

এ স্বপ্ন আমাদের নয়-
তবু স্বপ্ন দেখে সকলেই ঘুম তাড়াবার জন্য।
পথ অন্য পথে মিশে গেলে
অজানা দেশ থেকে স্বপ্ন ভাড়া করে আনি!
অবচেতনে চিন্তা করতে চাইলে,
মনোবিজ্ঞান বই খুলে দেখি
ঘুমের বদলে স্বপ্ন দেখার পদ্ধতি খুঁজি।

এই শহরে কেউ ঘুম খুঁজতে এসো না!
শুয়ে শুয়ে শরীর অবশ হলে,
গান শুনিয়ে যাবে স্বপ্নিল পাখি।

স্বপন দেবনাথ

ছত্রে ছত্রে তুমি

তোমার ওই লালচে-বাদামী চোখের আঙ্গিনায় বসে 
লিখতে চাই তোমায় নিয়ে একটি কবিতা,
যেখানে ছত্রে ছত্রে থাকবে শুধু তুমি -
আর তুমি।
তখন ভোরের সূর্য উঁকি দেবে আমার হৃদাকাশে 
আর তুমি পৃথিবীর পরে বসে থাকবে 
আমার কবিতার ছন্দালঙ্কার হয়ে ।

অসীম পাঠক

সোমরস

জীবনের স্বপ্ন আঁকি তোমার বুকে, চন্দ্রালোকিত জ্যোৎস্নার মাদকতায় তোমার মুখে শতাব্দীর ক্লান্তিরেখা গুলি  আমার কপালে এঁকে বলি  এসো --- আমার ভালোবাসার মোহানায় মিশে যাও এক নিবিড় পূর্ণতায়, জীবনের মাদকতায় অস্ত গোধূলির সন্ধ্যারাগে প্রেমের সোমরস আকন্ঠ পানে আমি নেশাতুর হতে চাই , আমি যে প্রেমের পূজারী ,কামনার ক্রীতদাস নই , মৃত্যুর শীতলতায় ডুবে যাবো যেদিন সেদিনও আমার ওষ্ঠে লেগে থাকবে শাশ্বত  ভালোবাসার সোমরস।

গীতশ্রী ভট্টাচার্য্য

 রক্তজবা (গল্প)

আজ ধ্যানে বসে কিছুতেই জপে মন বসছেনা ভৈরব চৌধুরির। এই দীর্ঘ জীবনে এরকম খুব কম ঘটেছে। মন যখনই কোনো কারণে উতলা হয়েছে তক্ষুনি এই মন্দিরে ছুটে এসেছেন। ধ্যানমগ্ন হয়ে মন কে প্রশমিত করতে পেরেছেন। আজ এমন কেন? 
অশিতিপর ভৈরব এখনো সম্পূর্ণ সুস্থ। ঋজু দেহ, বলিষ্ঠ বাহু। মা তারার একনিষ্ঠ উপাসক। স্ত্রী মঞ্জরী গত হয়েছেন অনেকদিন। একমাত্র কন্যা উমা,না তার নাম তিনি মুখেও আনেন না। 
সকাল থেকেই ভক্তবৃন্দের আগমন লেগে থাকে এই কুটিরে। ভয় এবং শ্রদ্ধা মিশ্রিত ভাব নিয়ে আসে সকলে। ভৈরব চৌধুরীর বজ্রকঠিন ব্যক্তিত্বের কাছে আপনা থেকেই সকলে নতমস্তক হয়ে পড়ে। মায়ের ভোগ রাগের জন্য যে সমস্ত বস্তু ভক্তরা নিয়ে আসে, তাই স্বহস্তে রান্না করে মাকে ভোগ দেন। মায়ের প্রসাদ ই তার খাদ্য। দুপুরে কেউ এলে সেই ব্যক্তিও ভোগ প্রসাদ পায়। 
আজ দুপুরেও মাকে ভোগ নিবেদন করে বাইরে প্রতীক্ষা করছিলেন ভৈরব। একটি মহিলা তখন ঢুকে আসে ভেতরে।সাদা মলিন সাদা শাড়ি, একমাথা ঘোমটা। জীর্ণ শীর্ণ দেহ। মুখ দেখা যাচ্ছেনা। অভাবী বলেই বোধ হচ্ছে। দূর থেকে দু হাত জড়ো করে সে প্রণাম জানায় মন্দিরের দিকে, ভৈরবের দিকেও। 
ইঙ্গিতে ওকে উঠোনে বসতে বলেন । অন্ন প্রসাদ গ্রহণ করে তারপর যেতে বলে মন্দিরে প্রবেশ করেন তিনি। উঠোনের একপাশে পুরনো নিমের ছায়ায় মহিলাটি বসে পড়ে। যেন সে কত ক্লান্ত। 
একখানা শালপাতায় করে মায়ের ভোগ এনে ওর কাছে রাখেন ভৈরব।
 _ কিছু লাগলে চেয়ে নিও, লজ্জা করনা। 
মাথা হেলায় মহিলা। 
অদূরে একটি সিঁড়িতে বসেন ভৈরব। অতিথির খাওয়া শেষ হলে তিনি প্রসাদ গ্রহণ করবেন। এটাই ওর নিজস্ব নিয়ম। 
একটু ঘুরে বসে মহিলাটি মাথায় ঠেকিয়ে প্রসাদ খেতে শুরু করে। অন্যমনস্ক ভাবে এদিক সেদিক তাকাতে তাকাতে মেয়েটির আঙুলে নজর যায় ভৈরবের। এই সবুজ পান্নার আংটি বড় পরিচিত। এত সাহস কী করে হল ওর! রাগে চোখ দুটো লাল হয়ে আসে। দ্রুত ওর কাছে দাঁড়িয়ে বলেন, তুমি কে আমি বুঝতে পেরে গেছি। উঠ, এখান থেকে বেরিয়ে যাও। তোমার সাহস দেখে আমি অবাক হয়ে গেছি। 
ঘোমটা খসে পড়ে ওর। দুচোখে জলের ধারা।
_ বাবা!
এই একটি শব্দ শুধু বেরিয়ে আসে। 
গেটের দিকে হাত তুলে ইঙ্গিত করেন ভৈরব। অর্ধভুক্ত খাবারের থালা ছেড়ে ধীরে ধীরে বেরিয়ে পড়ে উমা। ভৈরব কে এখন গোটা উঠোন জল দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। গোবর ছড়া দিতে হবে। 
সারাদিন ভৈরব আর মুখে কিছু দেননি। বাড়ি ঘর পরিষ্কার করতে করতে বেলা চলে গেছে। সন্ধ্যে হতেই এসে মন্দিরে ঢুকেছেন। কিন্তু, জপে মনোসংযোগ হচ্ছেনা কিছুতেই। তারা মায়ের মুখে উমার মুখ ফুটে উঠছে বারবার। ওর চোখের জল যেন মায়ের চোখে টলটল করছে। 
উমা একমাত্র সন্তান ওদের। আদরে, শাসনে বড় করেছেন। পড়াশোনা করতে করতেই ভালবেসে ফেলে একজনকে। যার সাথে কিছুতেই ভৈরব সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেন না। নিচ কুলশীল ওদের। মেয়েকে কড়া প্রহরায় রাখেন। লেখা পড়া সবকিছু বন্ধ করে দেন। কিন্তু, নিয়তির কবল থেকে কারো রক্ষা নেই। এমন কঠিন পাহারার মধ্যে থেকেও উমা পালিয়ে যায় একদিন। বিয়ে করে সেই ছেলেটিকে। 
রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে অভিশাপ দেন ভৈরব , খুব শীঘ্রই পাপের শাস্তি পাবি। বিধবা হয়ে পথে পথে ঘুরবি। মঞ্জরী জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন এসব শুনে। এরপর খুব বেশিদিন বাঁচেন নি মঞ্জরী। তখন থেকেই একা ভৈরব। উমার কথা মনে আনাও পাপ বলে ভাবেন। নিজেকে আরো বেশি সঁপে দেন তারা মায়ের জপ ধ্যানে। 
আজ ওর হাতের পান্নার আংটি দেখে চমকে উঠেছেন । এটি তিনিই ওকে ধারণ করিয়েছিলেন । অদ্ভুত এর নকশা। দুটো সাপের মুখ সামনে। মাঝখানে পাথরটি। 
এত অভাবের মধ্যেও উমা এটি বিক্রি করেনি! আশ্চর্য! 
আজ আসনে বসে শুধু মনে হচ্ছে এই জপ, যাগ যজ্ঞ সবকিছু মিথ্যে। শুধুই আড়ম্বর। যার মনে বিন্দুমাত্র ক্ষমা, স্নেহ নেই সে কীসের মানুষ! সেতো পাথর। বুক ফেটে হাহাকার বেরিয়ে আসতে চায়। কিন্তু কণ্ঠ শুষ্ক।মেয়েটি হয়ত কতদিন ভাল করে খেতে পায়নি। আর আজ তিনি ওকে খাবারের পাত থেকে উঠিয়ে বিদেয় করে দিলেন! মহাপাপ করেছেন , মহাপাপ।
তারা মায়ের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকেন ভৈরব। চোখ বেয়ে নেমে আসে অশ্রুধারা। উমা আর আসবেনা , জানেন তিনি। তবু অপেক্ষা করে থাকবেন। যদি আসে , তবে ক্ষমা চাইতে হবে ওর কাছে। নইলে মুক্তি নেই, মুক্তি নেই। 
শুকিয়ে যাওয়া রক্তজবার মত লুটিয়ে পড়ে থাকেন ভৈরব চৌধুরী।

চন্দ্রা বিশ্বাস

কবি ও কাব্য

তিথি-লগ্নের শুভ ও অশুভর যথার্থ ব্যাখ্যা 
ঠিক ঠিক মিলে যায় কিনা আমার জানা নেই ।
মাহেন্দ্রক্ষণ অথবা অমৃতযোগ ঠিক কোন ক্ষণ টুকু 
তা নিয়ে গবেষণায় বসতে আমি রাজি নই ,
শুধু বুক উজাড় করে , "আমি ভালবাসি" এই দুটো শব্দ
যে মুহূর্তে বলে ফেলা গেলো ,
সেই মুহূর্তটুকুই জীবনের সেরা মুহূর্ত, মহা শুভ ক্ষণ।
প্রকৃত কবি কোন জন, তা আমার জানা নেই ,
ঠিক ঠিক কবিতা হয়ে উঠলো কোন ছন্দবদ্ধ অংশ টুকু,
সে ও এক বিতর্কিত বিষয় ।
সবটুকু দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে, "আমি ভালবাসি" 
এই দুটো শব্দ,যিনি বলে ফেলতে পেরেছেন,
তিনিই প্রকৃত কবি। আর, আ---র
"আমি"ও "ভালোবাসি"এই দুটো শব্দ মিলেই
রচিত হয়ে গেলো, বিশ্বের সেরা কবিতাটি।

অলকা গোস্বামী

আমিও নারী

কবিতার সারাংশ আমিই ছিলাম,
ছিলাম ভালবাসার মোড়কে।
কেওনঝাড় এর উদ্দাম ঝরনা
আমারই চলার ছন্দে।
অরন্য সবুজ শৈশব আমার
কৃষ্ণচূড়া লাল যৌবন,
যত্নের বাগান থেকে বিদায় নিয়ে,
গেলাম পরের ঘর।

বৃষ্টি ঝরিয়ে মেঘেদের ছুটি
শরৎ আকাশ নীল,
তুলোর মত সাদা মেঘ,
ভেসে বেড়ায় চারদিক।

জীবন নদী বয়ে চলে ধীরে
সুখ পাখি বাঁধে ঘর,
দানপত্র আমি তুলে দিই হাতে
চির সবুজ হোক মিলন।

অভিযোগের গাঁঠারি ভরে, চোখ ভরা অভিমান।

চারিদিকে শুধু ধূ ধূ বালি,
আর তেপান্তরের মাঠ।

স্বপ্নভাঙা যাপন নদী, অকুলান সাথে ভাসে।
জীবনটা দামী, কোনো
আপোস আর চলেনা তার সাথে।

প্রেমে অপ্রেমে অল্পেতেই
খুশি,
বোঝেনা কেন সমাজ,
নারীসত্তা শুধুই  সম্মানটুকু চায়।

শ্বেতা ব্যানার্জী

মহাকর্ষ এক প্রেমিকার নাম

-----তারপর তুমি বললে 
তুমি যেন মৃত নক্ষত্র, 
অবাক দৃষ্টিতে আমি তোমার দিকে তাকিয়ে রইলাম, 
তুমি বললে, তোমার মহাকর্ষের বন্ধন ছেড়ে আমি কিছুতেই বেরিয়ে যেতে পারিনা। 
তোমার আকর্ষণ নয়, তোমার ভালোবাসার তরঙ্গ
আমাকে ভাসিয়ে রাখে।
ও তাই!! আমি বুঝি কৃষ্ণগহ্বর!!
হ্যাঁ সুপার ম্যাসিভ, যেখানে  আমার হৃদয়ের ম্যাসিভ আ্যটাক।
দ্যাখো, আমি তোমাকে কেন্দ্র করে কেমন ঘুরে চলেছি...।
তোমার অনন্যতায় তুমি অসীম  ---
তুমি সময়কে দাঁড় করিয়ে জবাবদিহি করো।
 তোমার দিগন্তে আমার জমা রাখা মন আজও ফিরিয়ে নিতে পারলাম না, 
কবির ভাষায় "ওই যে সুদূর নীহারিকা... "
ব্রহ্মাণ্ডের সহজ সরল গ্যাসে নিউক্লীয়ভাবে আবদ্ধ
হয়ে আজ আমাদের মন,  দুটি হিলিয়াম অণু।
তুমি বোঝনা এটা ফিউশন। 
আমাদের ভালোবাসার বিস্ফোরণ। যে বিস্ফোরণের 
আলোর রোশনাই নক্ষত্র হয়ে সংসার করে আমাদের
মনের আকাশে। 
কিন্তু ভয় হয় অনির্বাণ, 
কিসের ভয় আমি থাকতে। 
ভালোবাসার বিস্ফোরণ যদি হাঁফিয়ে ওঠে?  যদি জ্বালানি ফুরিয়ে যায়?
আমি আছি তোমার সাথে সূর্যের তেজদীপ্ত রূপ নিয়ে। 
তুমি যে বললে আমার ভালোবাসা কৃষ্ণগহ্বর। 
সে তো আমার মনের  "ইভেন্ট  হরাইজন টেলিস্কোপে" 
প্রকৃত ভালোবাসা উপলব্ধি করতে হয়,স্পর্শ নয়।
কৃষ্ণ ও কালী দুইজনেই কালো। 
প্রেম ও সংহার যেখানে মিলেমিশে একাকার। 
যেমন পদার্থবিদ্যার সূত্র ভেঙে আমরা দুই অপদার্থ প্রেমিক।

সংগীত শীল

নাহার

আঁকা বাঁকা পথের অপকটে 
আপন গভীরে আমাদের সূচপাত।
বিচিত্র বিস্ময় পুলকিত হতে থাকে
অপ্রস্তুত মুহুর্তে রোমাঞ্চিত শিহরণ জাগে দুজনার।

অমলিন স্মৃতিরা প্রহার করছে  বরাবর
তবুও কি অপরিসীম মমতা তোমার!
আমার হৃদয়াভ্যন্তরে;
অনুল্লিখিত বর্ণমালার ভিড় জমছে।

তোমার ছোঁয়াতে শীতল প্রাপ্তির অবগাহন,
দু-চোখের কাজল আমার শরীর বেয়ে নেমে আসে।
নক্ষত্রপুঞ্জ খসে যেন
ভেসে যাচ্ছি জলোচ্ছাসে।

চাঁদ মাখানো সুখের অতল সাগরে
আশা আকাঙ্ক্ষাগুলো লুটিয়ে দিয়ে,
ইচ্ছে হয় নিছক পিপাসাকাতর স্নায়ুতে,
স্পর্শ সুখের ঘ্রাণ নিতে।

প্রদীপ কুমার মাইতি

কত ঝরবে রক্তের ফোঁটা 

কত ঝরবে রক্তের ফোঁটা। 
রক্তস্রোতে ভেসে যাওয়া মাটির দিকে তাকিয়ে বোবা চোখ এক নদী জলে ডুবে থাকবে আরো কত দিন?
কতদিন থাকবে আরো স্বজন হারানো অভিশাপ,
বাতাসে ভাসবে শোকের দীর্ঘশ্বাস।
শহরে-গ্রামে,পথ-প্রান্তরে রক্তে ভেজা মাটির বুক থেকে ভেসে আসে কত শিহরিত কান্না,
জনতার স্রোত লাভ লোভের অঙ্ক কষে, নীরব প্রতিবাদে ফিরে আসে।
কেন খুন হয় স্বপ্ন গুলো? কার স্বার্থে? জানি তাঁরা মখমলের সজ্জায় শুয়ে স্বার্থের উদরে রাজ ভোগের ঢেকুর তোলে, 
ওরা পিশাচ, ওরা জল্লাদ,
ওদের অস্ত্রে উল্লাস করে ওদেরই ভাড়াটে উন্মাদ। 
ঝড় আসছে ঝড় আসবেই উড়ছে ধুলোবালি, 
লক্ষ জনতা নেমেছে পথে আগুন হয়েছে লাল,
পুড়ে ছাই হবে স্বার্থের সৌধশিখর, 
মখমলের সজ্জায় প্রহরী হবে ঘৃনার আগুন, 
রাজ ভোগের ঢেকুরে উদগিরিত হবে চাপ-চাপ রক্ত,
পুড়ে ছাই হবে পিশাচের বোনা জাল।
মাটির বুকে জন্ম নেবে নতুন সভ্যতা,
রক্ত নয় জীবন চাই জাগবে মানবতা।

পৃথ্বীরাজ দেবনাথ

বিচ্ছিন্নতা

সকালবেলা উঠে দেখি 
আমি বিচ্ছিন্ন। অথচ সূর্য উঠেছে, পাতা ঝরে পড়েছে, নদী বয়ে গেছে তার মত।
আমি নিশ্চিতভাবে বিচ্ছিন্ন। 

তাই মূল খুঁজে বেড়াই।
মূল খুঁজতে খুঁজতে রূপকথা তার নিজস্ব পথে বাঁক নেয়। বৃষ্টি নামে। দৃশ্যপট পাল্টে যায়, কালের গর্ভে জন্মায় আরেক দৃশ্যপট।

এই যে এত আলো, এত ছায়া 
আর এত উত্তাপ, এরই মধ্যে
নদী বয়ে গেছে? 
এরই মধ্যে সন্ধ্যা নেমেছে ধীরে,
এরই মধ্যে একটি প্রদীপ জ্বলেছে তুলসীতলায়,
এরই মধ্যে আমি জেগেছি,
আরও একবার দুঃস্বপ্নে 
বিচ্ছিন্ন হব বলে।

শর্মি দে

চন্দ্রাবলী বিষাদ

কোমল নিষাদেও সে বিরহী!

সুমেরু কুমেরুর ব্যবধান সময়ের অনুভূতির সাথে যেন ক্রমাগত বেড়েই চলেছে...
এরই মাঝে দুএকটুকরো হৈমন্তিক ইশারা,
নিকুঞ্জবন আজও নেচে উঠে কথাকলি সাজে!

বিন্দু বিন্দু ঘামের ফোটায় কখনো বা অজান্তে ভাগ করে বৃষ্টিসুখ,
ভিতর ঘরে জমে থাকা তার বিজন অসুখ।

একদিন সে প্রশ্রয় দেয় তার চাতক ইচ্ছেদের
ওরা যেন মায়াময় করে তোলে তার চন্দ্রাবলী রাত।
উদাসী হাওয়া যুবতী হলে...
কুজ্ঝটিকা ছুঁয়ে ঘাসফুল সাজালো নির্ঘুম রাতের আকাশ!
সোহাগী পাপড়িগুলো মেলে তার ময়ূরী পেখম
কুয়াশার অবগুণ্ঠনে ঢাকা পড়ে যায় তার সোমত্ত বিষাদ!

শতাব্দী দেবনাথ

শীত ঘুম

আধো আধো কুয়াশায় ঘুমন্ত সব ফড়িং, 
শিশির ভেজা চাঁদরের প্রলেপ ঘাসে... 
কত বার ভিজেছে মন ঘন কুয়াশায় 
হিসেব নেই তার... 
আগুনের  মিঠে তাপের ছোঁয়ায় হঠাৎ-ই চোখ লেগে যায়,
বাঁধ সাধে শুধুই অগনিত ইচ্ছে গুলো। 
শীত ঘুমে স্বপ্নের মায়া জালে 
ইচ্ছেরা সাড়া দেয় বাস্তবতার রূপে। 
আচমকাই দমকা হাওয়ায় বজ্র বিদ্যুতে 
আগুনের নীল শিখা বয়ে আনে অশ্বিনী সংকেতের বোঝা, 
কোমল শিশিরের শব্দে তিন প্রহরের  ঘুম কেটেছে আমার।
চোখ খুলেই অস্পষ্ট বাস্তবতা.. 
পরিণত পায় অবাস্তব কল্পনায়।।

রামমোহন বাগচী

জীবনের যাদুকর

ভাবি মনে মনে এটাই কি জীবন ?
অন্তর হীন আত্মীয়ের যাদুর খেলায়
ঝড়ে আত্মার অশ্রু। 
মুক বধির শিক্ষার রাজ প্রাসাদে  
দাপিয়ে বেড়ায় অন্তর হীন আত্মা
ছড়িয়ে রঙ্গিন  স্বপ্ন। 
স্বপ্নের মাঝে আছে স্বপ্ন, এ এক অপূর্ব স্বপ্ন
ধরা ছোয়ার  বাহিরে থেকেও নির্ভয়ে
চালায় আপন খেলা, দিবানিশি। 
সরস্বতীর হংস উড়ে আকাশে
ভুলে নির্মল নীরের সরোবর
শুভ্র চরিত্রে অভিনয়ের স্বর্ণপদক পরে গলে। 
যাদুঘরে যাদুর খেলা,যাদুকর বিনে
এমনি মন্ত্র শিখায়, মন্ত্র হীন আত্মা  
ছরিয়ে মায়ার জাল রাজার ভান্ডারে। 
বিশ্বের অর্ঘ দূত প্রেরণার উৎস
জ্ঞানের জোয়ার ভাটার , রত্নের ভান্ডার
রাধানগরে কৃষ্ণের অবতার। 
চক্ষু হীন আত্মা ছড়িয়ে মায়ার জাল    
প্রজাহিতৈষী মন্ত্রের নকল ঋষি করে
প্রজার সর্বনাশের  মন্ত্র পাঠ।।। 
ভাবি মনে মনে এটাই কি জীবন ?

ছন্দা দাম

ছেলেটা পণ করেছিল

ছেলেটা পণ করেছিল কাঠের লাঙ্গল হবে...
পৃথিবীর বুক চিড়ে সবুজ আঁচলে সাজাবে এক ফোঁটা দুগ্ধ সুধা,
ছেলেটা পণ করেছিল হলুদ ধানের গোলা হবে...
আঁধারের ওপারে যারা হারিয়ে গেছে ফোটাবে তাদের চোখে আলোর ক্ষুধা।

ছেলেটার পণ ছিল শক্ত হাতের পাঁচ আঙুলে... 
ভেঙে ফেলবে সব অর্থহীন ব্যরিকেট ,
হয়তো মাটি ছোঁয়া হাতে থাকবে না প্রযুক্তির আঁকিবুঁকি...
কিন্তু শান্তির ছায়াময় নিঃশ্বাসে ভরে থাকবে তার প্রিয় বুকপকেট।

ছেলেটা মশালের আলোয় অ আ ক খ র স্বরলিপি লেখবে আশ্বাস দিয়েছিল...
প্রজন্মগুলো ঘুমহীন রাত তারই অপেক্ষায় ঠাঁয় দাঁড়িয়ে...
হাত বাড়িয়ে মাইলস্টোন  ছুঁয়ে দেবে এই স্বপ্নে 
আকাশটা দিগন্তের অন্ধকার ঈশানে যায়নি হারিয়ে।।

কতো স্বপ্ন,কতো বাস্তব কতো ইচ্ছে ,কতো পূর্ণতা...
ছেলেটার ছোট্ট নোটবুকের কালো অক্ষরে ঘুমিয়ে আছে...
ছেলেটা আজো জোনাকির কাছে আলো চায় ধার..
একটা শান্তির ঘুম ছেলেটা খুঁজে ফেরে...
এখনো সন্ধ্যের শোকতারা জ্বলা রাতের কাছে।

অনির্বাণ মিশ্র

প্রেয়সী

রূপের আগুন জ্বালি কে তুমি গো বনমালী
এ জনমে হলে ওগো রাধা।
এমনি সে প্রেমডোর বাঁধিয়াছ হৃদে মোর
 পড়েছি তোমারি প্রেমে বাঁধা।।
মোহন মুরতি খানি সমুখে চিকুর টানি
অপার লাবণী শোভা পায়।
কাজলে রাঙানো আঁখি অপরূপ শোভা দেখি
রবি শশী লাজে মরি যায়।।
ললাটের ওই বিন্দু, হৃদয়ের প্রেমসিন্ধু
চাহনি তব তীরসম ধায়।
প্রেয়সী গো প্রেমময়ী গীতি বর্ণ ছন্দময়ী
কবির প্রেরণা তুমি তাই।।