আজন্ম বুকে চাষ করেছি স্বপ্ন কিংবা ভুল,
সারা জীবন ধরে জেনেছি, আমিই প্রথম ফুল।
হেঁটে যাও বলে হাওয়ায় ওড়ে সে আঁচল,
এই জীবন বুঝি শেখায়, ভালোবাসা সমর্পণ।
স্নান সেরে ওঠে এখনো কি পোড়াও শরীর?
বুকে চাষ করি বারোমাস তোমার অসুখ!
মায়াবৌ - ১৩১
ছাই উড়ছে। চোখের ওপর দিয়ে গুঁড়ো গুঁড়ো ছাই উড়ে যাচ্ছে বাতাসের সীমানা পেরিয়ে। আমি ভাবি ,কোথাও হয়তো বা লেগেছে আগুন। কারো পুড়ে যাওয়া আসবাব ,বিছানাপত্র হু -হু করে ছড়িয়ে পড়ছে বুঝি বাতাসের সাথে।
ইস্কুলে বেরোবো ,আবার সামনে সেই ছাই। আমি ভাবি, কারোর জীবনে বা লেগেছে আগুন। সংসার ভেঙে ভেঙে চতুর্দিকে। তারই ছাই ওড়ে দিনের বাতাসে।
বিকেলে পার্কে দেখি মুখচোখ সাদা হয়ে ছাইয়ের প্রলেপ। এবার ভেবেছি ,কারোর কবিতাখাতা হয়তোবা আগুনে পুড়ছে।হয়তোবা পুড়ে যাচ্ছে হারমোনিয়াম।
রাতে স্বপ্নের ভেতর দেখি ছাই ওড়ে। আলোটা জ্বালাই।ছাইগুলো মেখে নিই দু-হাতে আঙুলে।ভালো করে দেখি ,ও মেয়ে ,এতো তোর শরীর পোড়া ছাই।
জেব্রার থিওরোম
জেব্রার সাদা কালো দাগে হাত বুলিয়ে কেউ কি সমাধান করতে পারে জ্যামিতির থিওরোম? চিড়িয়াখানা থেকে বেরিয়ে এসেছে যে স্কুল, সেখানে আমার সেকেন্ডারীর ক্লাসটা ঝোলানো আছে ধার করা জামার ছেঁড়া পকেটে।
টানটান টাকার-সেতার বাজে ফেমাস স্কুলে। শহরে শহরে শিক্ষকদিবসের ইভিনিং শো-তে আজকাল খুব ভীড়। আমার কি আর ম্যাট্রিক, থুরি, সেকেন্ডারীটা পাশ করা হলো না? আকাশ থেকে উড়ে আসে বইএর বিচিত্র মলাট; কাকের পালকেরা লেপ্টে থাকে ল্যাপটপের সৌখীন ঘাসে। জীবনের ক্যালেন্ডার আর পরীক্ষার সিলেবাসে কোন তালমিল আছে কি? তবুও যানজটে দিশেহারা আমি পৌঁছে যাই প্রেইরী ঘাসের জঙ্গলে। সেখানে ফিস্ দেয়া সম্ভ্রান্ত ছেলেমেয়েরা ঘাসের বেলুন ফোলাচ্ছে। জেব্রার জামা পরে শিক্ষকেরা ঘুরে ঘুরে ঘাস খাচ্ছে।
বিজ্ঞাপনের সাইরেণ বাজলে তথাকথিত শিক্ষা পর্ষদের জুতোর লেস খুলে যায়। ঘোষিত হয় – হায়ার সেকেন্ডারী পাশের ধূলোট বাদামী রাস্তা পোলট্রির মুরগীদের মতো মিথ্যে মিথ্যা মিথ্যা! মেশিনে ঢালাই করা নতুন নতুন রাস্তা চলে গেছে অসম্ভব সমস্ত বর্ণাঢ্য থিওরোমের দিকে, সেখানে সোনার খনি বাজছে! আপাততঃ টাকা দিয়ে কয়েকটা ফড়িং ধরে আনতে পারলেই এডুকেশন সিস্টেম ছাত্রদের গলায় ঝোলাবে কর্পোরেট মেডেল, ভূর্য্যপত্রের স্বাক্ষরবিহীন ডিজিটাল মার্কসশীট।
বর্ণাঢ্য থিওরোম আর মেশিনে ঢালাই নতুন রাস্তারা সুনীল আকাশের দিকে মাস্টার্স ডিগ্রীর ডিজিটাল রুমাল নাড়ছে। কয়েকটা সাদা পায়রা সেই সব রুমাল পকেটে গুঁজে তাদের স্বচ্ছ্বল ডানায় অন্য দিগন্তের দিকে উড়ে গেলো, যেখানে লকারে ঘেরা জীবনের ডিকশেনারি।
জেব্রার সাদাকালো দাগে হাত বুলিয়ে ভাবাচ্যাকা আজও আমি বসে আছি থিওরোমের কিনারায়। বিষয়টা খুবই সহজ, অথচ আমার এখনোও ম্যাট্রিক পাশটা হলো না।
ইন্দ্রের সভা (গল্প )
শুভ সকালের খাবার খেয়ে বাড়ি থেকে নিজের প্রিন্টিং এর দোকানে যাচ্ছিল সাইকেলে করে। চন্দ্রাদের বাড়ির সামনে ভিড় দেখে এগিয়ে গেলো। জ্যেঠিমার শরীর এমনিতেই ভালো নেই অনেকদিন ধরে। কিছু আজে বাজে ঘটে গেলো না তো আবার। কিন্তু কেউই যে বাড়ির ভেতর ঢুকছে না করোনা আতঙ্কে।
শুভ ঢুকবে কি না ভাবছে। এমনিতেই চন্দ্রার বাবা শুভকে দু' চোখে দেখতে পারেন না। কোন প্রেম টেম নয়। শুধু সমবয়সি বন্ধুত্ত্ব। মনের মিল একটু বেশী। কিন্তু উনাকে কে কি বোঝাবে। চন্দ্রার বাবা তো শুভকে সুযোগ পেলে অপমান করতে ছাড়েন না। উনি চাকরি বাকরি করে না এমন ছেলে একদম পছন্দ করেন না। তাও আবার সামান্য দোকানদার শুভ, যে কিনা উনার মেয়ের সাথে একটু যেন বেশী ঘনিষ্ট। একদমই সহ্য হয় না উনার।
অনেক সাহস করে, আর বাড়ি থেকে বেরোবার সময় একটা ঘটনার কথা মনে হতেই শুভ তাদের বাড়িতে ঢুকে গেলো।
কি বাজে অবস্থা। মাসিমা অসুস্থ হয়ে পরে গেছেন বাজে ভাবে। এমনিতেই দুটো কিডনী খারাপ। পড়ে গিয়ে কিডনী জয়েন্টে আরো মারাত্মক ব্যথা পেয়েছেন। চন্দ্রা আর জ্যেঠু একা তুলতে পারেননি মাটি থেকে। রুগ্ন মানুষটার সাথে তারা দুজনও নিচে বসে রয়েছেন অ্যাম্বুলেন্সের অপেক্ষায়। জ্যেঠু নিজেও অসুস্থ খুব। পারকিনসন্স, স্পন্ডালাইটিস এর সমস্যা আছে। অ্যাম্বুলেন্সে চন্দ্রার সাথে শুভও উঠলো। লোকাল হাসপাতাল থেকে রেফার করা হল রাজধানীর গোবিন্দ বল্লভ পন্থ হাসপাতালে। সব মিলিয়ে প্রায় দু' লাখ টাকা লাগবে। অপারেশন হবে।
চন্দ্রার বাবা সারা জীবন সামান্য বেতনে সরকারি চাকুরি করেছেন। যা রোজগার করেছেন সব স্বামী, স্ত্রীর চিকিৎসা, সন্তানদের পড়াশোনা ও বড় মেয়ের বিয়েতেই শেষ। পেনশনের টাকা দিয়ে অনেক কষ্টে সংসার চলে। ফোনে চন্দ্রার মুখে দু' লাখ টাকার কথা শুনে পাগলের মত এদিক ওদিক অনেককেই অনুরোধ করলেন এই দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানোর জন্যে। বড় মেয়ের জামাই কিছু টাকা পাঠালো। দুদিনে ৫০ হাজার টাকা ব্যবস্থা হল। বিমর্ষ হয়ে পড়লেন তিনি। তখনই জানতে পারেন উনার অপছন্দের শুভ তার তিনটি দামী কম্পিউটার, একটি দামী প্রিন্টার ও প্রজেক্টর বিক্রি করে এবং নিজের কিছু সেভিংস মিলিয়ে প্রায় এক লক্ষ ৭০ হাজার টাকা ব্যবস্থা করে নিয়েছে।
প্রায় এক মাস অতিক্রান্ত। চন্দ্রার মা আজ অনেকটাই সুস্থ। শুভ আর চন্দ্রা আজ উনাকে নিয়ে বাড়ী ফিরছে। ট্রেনে আসার সময় চন্দ্রা শুভকে বললো, "জানিস শুভ আমি জানতাম মার কিছু হবে না। যেদিন মা পড়ে গেলো ঠিক তখনই আকাশে ইন্দ্রের সভা বসেছিল। আমি আগে কখনো দেখি নি। কিন্তু বইতে পড়েছি। তখন ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করলে সবাই মিলে আশীর্বাদ করেন।"
শুভ মনে মনে হাসে। ওইদিন সাইকেলে উঠার আগে আকাশে চোখ পড়তেই দেখেছিল সূর্যের চারিদিকে গোল রামধনু। আগে কোনদিন দেখে নি। মাকে ডেকে দেখাতেই মা বলেছিল, "প্রণাম কর বাবা, ইন্দ্রদেবের সভা বসেছে। তোর মঙ্গল হবে। আশীর্বাদ নে বাবা। তুই যা করবি তাতেই জগতের মঙ্গল হবে। তোরও ভালো হবে।"
চন্দ্রাকে বলল শুভ সেই কথা। দুজনেই দুজনকে নতুন করে আজ দেখতে লাগলো। সাতরঙা তৃপ্তির হাসি দুজনের মুখে।
সোমরস
জীবনের স্বপ্ন আঁকি তোমার বুকে, চন্দ্রালোকিত জ্যোৎস্নার মাদকতায় তোমার মুখে শতাব্দীর ক্লান্তিরেখা গুলি আমার কপালে এঁকে বলি এসো --- আমার ভালোবাসার মোহানায় মিশে যাও এক নিবিড় পূর্ণতায়, জীবনের মাদকতায় অস্ত গোধূলির সন্ধ্যারাগে প্রেমের সোমরস আকন্ঠ পানে আমি নেশাতুর হতে চাই , আমি যে প্রেমের পূজারী ,কামনার ক্রীতদাস নই , মৃত্যুর শীতলতায় ডুবে যাবো যেদিন সেদিনও আমার ওষ্ঠে লেগে থাকবে শাশ্বত ভালোবাসার সোমরস।