Nov 29, 2022

শান্তনু মজুমদার

 ইন্দ্রের সভা (গল্প )


শুভ সকালের খাবার খেয়ে বাড়ি থেকে নিজের প্রিন্টিং এর দোকানে যাচ্ছিল সাইকেলে করে। চন্দ্রাদের বাড়ির সামনে ভিড় দেখে এগিয়ে গেলো। জ্যেঠিমার শরীর এমনিতেই ভালো নেই অনেকদিন ধরে। কিছু আজে বাজে ঘটে গেলো না তো আবার। কিন্তু কেউই যে বাড়ির ভেতর ঢুকছে না করোনা আতঙ্কে। 

শুভ ঢুকবে কি না ভাবছে। এমনিতেই চন্দ্রার বাবা শুভকে দু' চোখে দেখতে পারেন না। কোন প্রেম টেম নয়। শুধু সমবয়সি বন্ধুত্ত্ব। মনের মিল একটু বেশী। কিন্তু উনাকে কে কি বোঝাবে। চন্দ্রার বাবা তো শুভকে সুযোগ পেলে অপমান করতে ছাড়েন না। উনি চাকরি বাকরি করে না এমন ছেলে একদম পছন্দ করেন না। তাও আবার সামান্য দোকানদার শুভ, যে কিনা উনার মেয়ের সাথে একটু যেন বেশী ঘনিষ্ট। একদমই সহ্য হয় না উনার।

অনেক সাহস করে, আর বাড়ি থেকে বেরোবার সময় একটা ঘটনার কথা মনে হতেই শুভ তাদের বাড়িতে ঢুকে গেলো। 

কি বাজে অবস্থা। মাসিমা অসুস্থ হয়ে পরে গেছেন বাজে ভাবে। এমনিতেই দুটো কিডনী  খারাপ। পড়ে গিয়ে কিডনী জয়েন্টে আরো মারাত্মক ব্যথা পেয়েছেন। চন্দ্রা আর জ্যেঠু একা তুলতে পারেননি মাটি থেকে। রুগ্ন মানুষটার সাথে তারা দুজনও নিচে বসে রয়েছেন অ্যাম্বুলেন্সের অপেক্ষায়। জ্যেঠু নিজেও অসুস্থ খুব। পারকিনসন্স, স্পন্ডালাইটিস এর সমস্যা আছে। অ্যাম্বুলেন্সে চন্দ্রার সাথে শুভও উঠলো। লোকাল হাসপাতাল থেকে রেফার করা হল রাজধানীর গোবিন্দ বল্লভ পন্থ হাসপাতালে। সব মিলিয়ে প্রায় দু' লাখ টাকা লাগবে। অপারেশন হবে। 

চন্দ্রার বাবা সারা জীবন সামান্য বেতনে সরকারি চাকুরি করেছেন। যা রোজগার করেছেন সব স্বামী, স্ত্রীর চিকিৎসা, সন্তানদের পড়াশোনা ও বড় মেয়ের বিয়েতেই শেষ। পেনশনের টাকা দিয়ে অনেক কষ্টে সংসার চলে। ফোনে চন্দ্রার মুখে দু' লাখ টাকার কথা শুনে    পাগলের মত এদিক ওদিক অনেককেই অনুরোধ করলেন এই দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানোর জন্যে। বড় মেয়ের জামাই কিছু টাকা পাঠালো। দুদিনে ৫০ হাজার টাকা ব্যবস্থা হল। বিমর্ষ হয়ে পড়লেন তিনি। তখনই জানতে পারেন উনার অপছন্দের শুভ তার তিনটি দামী কম্পিউটার, একটি দামী প্রিন্টার ও প্রজেক্টর বিক্রি করে এবং নিজের কিছু সেভিংস মিলিয়ে প্রায় এক লক্ষ ৭০ হাজার টাকা ব্যবস্থা করে নিয়েছে।

প্রায় এক মাস অতিক্রান্ত। চন্দ্রার মা আজ অনেকটাই সুস্থ। শুভ আর চন্দ্রা আজ উনাকে নিয়ে বাড়ী ফিরছে। ট্রেনে আসার সময় চন্দ্রা শুভকে বললো, "জানিস শুভ আমি জানতাম মার কিছু হবে না। যেদিন মা পড়ে গেলো ঠিক তখনই আকাশে ইন্দ্রের সভা বসেছিল। আমি আগে কখনো দেখি নি। কিন্তু বইতে পড়েছি। তখন ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করলে সবাই মিলে আশীর্বাদ করেন।"

শুভ মনে মনে হাসে। ওইদিন সাইকেলে উঠার আগে আকাশে চোখ পড়তেই দেখেছিল সূর্যের চারিদিকে গোল রামধনু। আগে কোনদিন দেখে নি। মাকে ডেকে দেখাতেই মা বলেছিল, "প্রণাম কর বাবা, ইন্দ্রদেবের সভা বসেছে। তোর মঙ্গল হবে। আশীর্বাদ নে বাবা। তুই যা করবি তাতেই জগতের মঙ্গল হবে। তোরও ভালো হবে।"

চন্দ্রাকে বলল শুভ সেই কথা। দুজনেই দুজনকে নতুন করে আজ দেখতে লাগলো। সাতরঙা তৃপ্তির হাসি দুজনের মুখে।