রক্তজবা (গল্প)
আজ ধ্যানে বসে কিছুতেই জপে মন বসছেনা ভৈরব চৌধুরির। এই দীর্ঘ জীবনে এরকম খুব কম ঘটেছে। মন যখনই কোনো কারণে উতলা হয়েছে তক্ষুনি এই মন্দিরে ছুটে এসেছেন। ধ্যানমগ্ন হয়ে মন কে প্রশমিত করতে পেরেছেন। আজ এমন কেন?
অশিতিপর ভৈরব এখনো সম্পূর্ণ সুস্থ। ঋজু দেহ, বলিষ্ঠ বাহু। মা তারার একনিষ্ঠ উপাসক। স্ত্রী মঞ্জরী গত হয়েছেন অনেকদিন। একমাত্র কন্যা উমা,না তার নাম তিনি মুখেও আনেন না।
সকাল থেকেই ভক্তবৃন্দের আগমন লেগে থাকে এই কুটিরে। ভয় এবং শ্রদ্ধা মিশ্রিত ভাব নিয়ে আসে সকলে। ভৈরব চৌধুরীর বজ্রকঠিন ব্যক্তিত্বের কাছে আপনা থেকেই সকলে নতমস্তক হয়ে পড়ে। মায়ের ভোগ রাগের জন্য যে সমস্ত বস্তু ভক্তরা নিয়ে আসে, তাই স্বহস্তে রান্না করে মাকে ভোগ দেন। মায়ের প্রসাদ ই তার খাদ্য। দুপুরে কেউ এলে সেই ব্যক্তিও ভোগ প্রসাদ পায়।
আজ দুপুরেও মাকে ভোগ নিবেদন করে বাইরে প্রতীক্ষা করছিলেন ভৈরব। একটি মহিলা তখন ঢুকে আসে ভেতরে।সাদা মলিন সাদা শাড়ি, একমাথা ঘোমটা। জীর্ণ শীর্ণ দেহ। মুখ দেখা যাচ্ছেনা। অভাবী বলেই বোধ হচ্ছে। দূর থেকে দু হাত জড়ো করে সে প্রণাম জানায় মন্দিরের দিকে, ভৈরবের দিকেও।
ইঙ্গিতে ওকে উঠোনে বসতে বলেন । অন্ন প্রসাদ গ্রহণ করে তারপর যেতে বলে মন্দিরে প্রবেশ করেন তিনি। উঠোনের একপাশে পুরনো নিমের ছায়ায় মহিলাটি বসে পড়ে। যেন সে কত ক্লান্ত।
একখানা শালপাতায় করে মায়ের ভোগ এনে ওর কাছে রাখেন ভৈরব।
_ কিছু লাগলে চেয়ে নিও, লজ্জা করনা।
মাথা হেলায় মহিলা।
অদূরে একটি সিঁড়িতে বসেন ভৈরব। অতিথির খাওয়া শেষ হলে তিনি প্রসাদ গ্রহণ করবেন। এটাই ওর নিজস্ব নিয়ম।
একটু ঘুরে বসে মহিলাটি মাথায় ঠেকিয়ে প্রসাদ খেতে শুরু করে। অন্যমনস্ক ভাবে এদিক সেদিক তাকাতে তাকাতে মেয়েটির আঙুলে নজর যায় ভৈরবের। এই সবুজ পান্নার আংটি বড় পরিচিত। এত সাহস কী করে হল ওর! রাগে চোখ দুটো লাল হয়ে আসে। দ্রুত ওর কাছে দাঁড়িয়ে বলেন, তুমি কে আমি বুঝতে পেরে গেছি। উঠ, এখান থেকে বেরিয়ে যাও। তোমার সাহস দেখে আমি অবাক হয়ে গেছি।
ঘোমটা খসে পড়ে ওর। দুচোখে জলের ধারা।
_ বাবা!
এই একটি শব্দ শুধু বেরিয়ে আসে।
গেটের দিকে হাত তুলে ইঙ্গিত করেন ভৈরব। অর্ধভুক্ত খাবারের থালা ছেড়ে ধীরে ধীরে বেরিয়ে পড়ে উমা। ভৈরব কে এখন গোটা উঠোন জল দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। গোবর ছড়া দিতে হবে।
সারাদিন ভৈরব আর মুখে কিছু দেননি। বাড়ি ঘর পরিষ্কার করতে করতে বেলা চলে গেছে। সন্ধ্যে হতেই এসে মন্দিরে ঢুকেছেন। কিন্তু, জপে মনোসংযোগ হচ্ছেনা কিছুতেই। তারা মায়ের মুখে উমার মুখ ফুটে উঠছে বারবার। ওর চোখের জল যেন মায়ের চোখে টলটল করছে।
উমা একমাত্র সন্তান ওদের। আদরে, শাসনে বড় করেছেন। পড়াশোনা করতে করতেই ভালবেসে ফেলে একজনকে। যার সাথে কিছুতেই ভৈরব সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেন না। নিচ কুলশীল ওদের। মেয়েকে কড়া প্রহরায় রাখেন। লেখা পড়া সবকিছু বন্ধ করে দেন। কিন্তু, নিয়তির কবল থেকে কারো রক্ষা নেই। এমন কঠিন পাহারার মধ্যে থেকেও উমা পালিয়ে যায় একদিন। বিয়ে করে সেই ছেলেটিকে।
রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে অভিশাপ দেন ভৈরব , খুব শীঘ্রই পাপের শাস্তি পাবি। বিধবা হয়ে পথে পথে ঘুরবি। মঞ্জরী জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন এসব শুনে। এরপর খুব বেশিদিন বাঁচেন নি মঞ্জরী। তখন থেকেই একা ভৈরব। উমার কথা মনে আনাও পাপ বলে ভাবেন। নিজেকে আরো বেশি সঁপে দেন তারা মায়ের জপ ধ্যানে।
আজ ওর হাতের পান্নার আংটি দেখে চমকে উঠেছেন । এটি তিনিই ওকে ধারণ করিয়েছিলেন । অদ্ভুত এর নকশা। দুটো সাপের মুখ সামনে। মাঝখানে পাথরটি।
এত অভাবের মধ্যেও উমা এটি বিক্রি করেনি! আশ্চর্য!
আজ আসনে বসে শুধু মনে হচ্ছে এই জপ, যাগ যজ্ঞ সবকিছু মিথ্যে। শুধুই আড়ম্বর। যার মনে বিন্দুমাত্র ক্ষমা, স্নেহ নেই সে কীসের মানুষ! সেতো পাথর। বুক ফেটে হাহাকার বেরিয়ে আসতে চায়। কিন্তু কণ্ঠ শুষ্ক।মেয়েটি হয়ত কতদিন ভাল করে খেতে পায়নি। আর আজ তিনি ওকে খাবারের পাত থেকে উঠিয়ে বিদেয় করে দিলেন! মহাপাপ করেছেন , মহাপাপ।
তারা মায়ের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকেন ভৈরব। চোখ বেয়ে নেমে আসে অশ্রুধারা। উমা আর আসবেনা , জানেন তিনি। তবু অপেক্ষা করে থাকবেন। যদি আসে , তবে ক্ষমা চাইতে হবে ওর কাছে। নইলে মুক্তি নেই, মুক্তি নেই।
শুকিয়ে যাওয়া রক্তজবার মত লুটিয়ে পড়ে থাকেন ভৈরব চৌধুরী।
আজ ধ্যানে বসে কিছুতেই জপে মন বসছেনা ভৈরব চৌধুরির। এই দীর্ঘ জীবনে এরকম খুব কম ঘটেছে। মন যখনই কোনো কারণে উতলা হয়েছে তক্ষুনি এই মন্দিরে ছুটে এসেছেন। ধ্যানমগ্ন হয়ে মন কে প্রশমিত করতে পেরেছেন। আজ এমন কেন?
অশিতিপর ভৈরব এখনো সম্পূর্ণ সুস্থ। ঋজু দেহ, বলিষ্ঠ বাহু। মা তারার একনিষ্ঠ উপাসক। স্ত্রী মঞ্জরী গত হয়েছেন অনেকদিন। একমাত্র কন্যা উমা,না তার নাম তিনি মুখেও আনেন না।
সকাল থেকেই ভক্তবৃন্দের আগমন লেগে থাকে এই কুটিরে। ভয় এবং শ্রদ্ধা মিশ্রিত ভাব নিয়ে আসে সকলে। ভৈরব চৌধুরীর বজ্রকঠিন ব্যক্তিত্বের কাছে আপনা থেকেই সকলে নতমস্তক হয়ে পড়ে। মায়ের ভোগ রাগের জন্য যে সমস্ত বস্তু ভক্তরা নিয়ে আসে, তাই স্বহস্তে রান্না করে মাকে ভোগ দেন। মায়ের প্রসাদ ই তার খাদ্য। দুপুরে কেউ এলে সেই ব্যক্তিও ভোগ প্রসাদ পায়।
আজ দুপুরেও মাকে ভোগ নিবেদন করে বাইরে প্রতীক্ষা করছিলেন ভৈরব। একটি মহিলা তখন ঢুকে আসে ভেতরে।সাদা মলিন সাদা শাড়ি, একমাথা ঘোমটা। জীর্ণ শীর্ণ দেহ। মুখ দেখা যাচ্ছেনা। অভাবী বলেই বোধ হচ্ছে। দূর থেকে দু হাত জড়ো করে সে প্রণাম জানায় মন্দিরের দিকে, ভৈরবের দিকেও।
ইঙ্গিতে ওকে উঠোনে বসতে বলেন । অন্ন প্রসাদ গ্রহণ করে তারপর যেতে বলে মন্দিরে প্রবেশ করেন তিনি। উঠোনের একপাশে পুরনো নিমের ছায়ায় মহিলাটি বসে পড়ে। যেন সে কত ক্লান্ত।
একখানা শালপাতায় করে মায়ের ভোগ এনে ওর কাছে রাখেন ভৈরব।
_ কিছু লাগলে চেয়ে নিও, লজ্জা করনা।
মাথা হেলায় মহিলা।
অদূরে একটি সিঁড়িতে বসেন ভৈরব। অতিথির খাওয়া শেষ হলে তিনি প্রসাদ গ্রহণ করবেন। এটাই ওর নিজস্ব নিয়ম।
একটু ঘুরে বসে মহিলাটি মাথায় ঠেকিয়ে প্রসাদ খেতে শুরু করে। অন্যমনস্ক ভাবে এদিক সেদিক তাকাতে তাকাতে মেয়েটির আঙুলে নজর যায় ভৈরবের। এই সবুজ পান্নার আংটি বড় পরিচিত। এত সাহস কী করে হল ওর! রাগে চোখ দুটো লাল হয়ে আসে। দ্রুত ওর কাছে দাঁড়িয়ে বলেন, তুমি কে আমি বুঝতে পেরে গেছি। উঠ, এখান থেকে বেরিয়ে যাও। তোমার সাহস দেখে আমি অবাক হয়ে গেছি।
ঘোমটা খসে পড়ে ওর। দুচোখে জলের ধারা।
_ বাবা!
এই একটি শব্দ শুধু বেরিয়ে আসে।
গেটের দিকে হাত তুলে ইঙ্গিত করেন ভৈরব। অর্ধভুক্ত খাবারের থালা ছেড়ে ধীরে ধীরে বেরিয়ে পড়ে উমা। ভৈরব কে এখন গোটা উঠোন জল দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। গোবর ছড়া দিতে হবে।
সারাদিন ভৈরব আর মুখে কিছু দেননি। বাড়ি ঘর পরিষ্কার করতে করতে বেলা চলে গেছে। সন্ধ্যে হতেই এসে মন্দিরে ঢুকেছেন। কিন্তু, জপে মনোসংযোগ হচ্ছেনা কিছুতেই। তারা মায়ের মুখে উমার মুখ ফুটে উঠছে বারবার। ওর চোখের জল যেন মায়ের চোখে টলটল করছে।
উমা একমাত্র সন্তান ওদের। আদরে, শাসনে বড় করেছেন। পড়াশোনা করতে করতেই ভালবেসে ফেলে একজনকে। যার সাথে কিছুতেই ভৈরব সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেন না। নিচ কুলশীল ওদের। মেয়েকে কড়া প্রহরায় রাখেন। লেখা পড়া সবকিছু বন্ধ করে দেন। কিন্তু, নিয়তির কবল থেকে কারো রক্ষা নেই। এমন কঠিন পাহারার মধ্যে থেকেও উমা পালিয়ে যায় একদিন। বিয়ে করে সেই ছেলেটিকে।
রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে অভিশাপ দেন ভৈরব , খুব শীঘ্রই পাপের শাস্তি পাবি। বিধবা হয়ে পথে পথে ঘুরবি। মঞ্জরী জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন এসব শুনে। এরপর খুব বেশিদিন বাঁচেন নি মঞ্জরী। তখন থেকেই একা ভৈরব। উমার কথা মনে আনাও পাপ বলে ভাবেন। নিজেকে আরো বেশি সঁপে দেন তারা মায়ের জপ ধ্যানে।
আজ ওর হাতের পান্নার আংটি দেখে চমকে উঠেছেন । এটি তিনিই ওকে ধারণ করিয়েছিলেন । অদ্ভুত এর নকশা। দুটো সাপের মুখ সামনে। মাঝখানে পাথরটি।
এত অভাবের মধ্যেও উমা এটি বিক্রি করেনি! আশ্চর্য!
আজ আসনে বসে শুধু মনে হচ্ছে এই জপ, যাগ যজ্ঞ সবকিছু মিথ্যে। শুধুই আড়ম্বর। যার মনে বিন্দুমাত্র ক্ষমা, স্নেহ নেই সে কীসের মানুষ! সেতো পাথর। বুক ফেটে হাহাকার বেরিয়ে আসতে চায়। কিন্তু কণ্ঠ শুষ্ক।মেয়েটি হয়ত কতদিন ভাল করে খেতে পায়নি। আর আজ তিনি ওকে খাবারের পাত থেকে উঠিয়ে বিদেয় করে দিলেন! মহাপাপ করেছেন , মহাপাপ।
তারা মায়ের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকেন ভৈরব। চোখ বেয়ে নেমে আসে অশ্রুধারা। উমা আর আসবেনা , জানেন তিনি। তবু অপেক্ষা করে থাকবেন। যদি আসে , তবে ক্ষমা চাইতে হবে ওর কাছে। নইলে মুক্তি নেই, মুক্তি নেই।
শুকিয়ে যাওয়া রক্তজবার মত লুটিয়ে পড়ে থাকেন ভৈরব চৌধুরী।