Feb 21, 2023

নির্মলেন্দু গুণ

ভাষা, সুন্দরের শ্রেষ্ঠ ভূষণ

আমার প্রপিতামহ ছায়াগ্রামে যে বসতবাটি তৈরি করেছিলেন, 
তার শান্তিছায়ায় আমি আজও নিজেকে বহন করে নিয়ে যাই। 
আমার কী যে ভালো লাগে, মনে হয় এ যেন মাতৃগর্ভে ফেরা। 
প্রকৃতির কোল মাতৃকোলের চেয়ে স্থায়ী সুখে আমাকে জড়ায়। 

আমার পিতামহের খনন করা দীঘির স্ফটিকজলে স্নান করে
আমি জুড়াই আমার গ্রীষ্মের তাপদগ্ধদেহ।

আম জাম কাঁঠালের রসে যখন তৃপ্ত হয় আমার তৃষিত রসনা, 
আমি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি আমার পিতাকে, যিনি প্রায় 
সমমর্যাদায় সন্তানদের পাশাপাশি পরিচর্যা করতেন বৃক্ষের।

যখন আমি আমার জীবনের প্রিয় অনুভূতিগুলিকে লিখি,
আমি স্মরণ করি আমার অগ্রজ শহিদ বরকতকে,
 শত্রুর আক্রমণ থেকে বাংলা ভাষাকে রক্ষা করার জন্য 
যিনি উৎসর্গ করে গেছেন তাঁর অমূল্য জীবন।

আমি প্রপিতামহ, পিতামহ এবং আমার প্রিয় পিতার চেয়েও 
অধিক কৃতজ্ঞ বোধ করি আমার অগ্রজ ভাষাশহিদের প্রতি। 
কেননা এতোদিনে আমি বুঝে গেছি, আমি নিশ্চিত হয়েছি, 
আমার ভাইয়ের রক্তে বাংলাভাষা যদি সেদিন মুক্ত না হতো, 
তবে আমার শৃঙ্খলিত মাতৃভূমিও কোনোদিন মুক্ত হতো না।
যদি আমার ভাইয়ের রক্তে বাংলাভাষা সেদিন মুক্ত না হতো,
আমি আমার প্রেমের কবিতাগুলি লিখতে পারতাম না।

শৃঙ্খলিত ভাষায় আমি কি আমার প্রিয়তমার রূপের ঐশ্বর্য,
আমার আনন্দবেদনা আজকের মতো বর্ণনা করতে পারতাম? 
আমি বুঝতেও পারতাম না যে ভাষাই সুন্দরের শ্রেষ্ঠ ভূষণ।

অপাংশু দেবনাথ

মা তুমি

আমাদের স্কুলগুলো দেখতে দেখতে ইংরেজি মাধ্যম হয়ে যাচ্ছে,
পিঁপড়ের মতো শিশুরা সকাল সকাল ছুটে যাচ্ছে মায়ের হাত ধরে।
খাওয়া নেই, স্নান নেই,দাদু ঠাকুমার আদর নেই, ব্যাগে ভোর নিয়ে 
আমাদের অনাগাত ভবিষ্যৎ ঢুকে যাচ্ছে বিস্তৃত কুয়াশার ভেতর।

এই সন্তানেরা একুশ ফেব্রুয়ারির আলোকিত ভোরের কথা জানেনা,
উনিশে মে'র একশত চুয়াল্লিশ ধারায় বুকে বুলেট নেয়া শহীদদের চিনেনা,
একবারও শুনেনি তিন মার্চের জুলাই বাড়ির সেই ভাষা সেনানীর কথা। 

ওরা স্বদেশের গান শিখেনি
ওরা ঠাকুরমার ঝুলির গল্প শুনেনি
বেতাল পঞ্চবিংশতি ও বিক্রমাদিত্যের কাহিনি জানেনি।

আমি সেই শিশুটির জন্য তাকিয়ে আছি এতসব না জানা ভিড়ের মধ্য থেকে 
মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে,অসংখ্য মাতৃভাষায় বলে উঠবে---
"মা তুমি অন্তরে থেকো অনন্তকাল।"

সৌমিত বসু

ভাষাজ্বর

তুমি আমার শেখানো অক্ষর
তুমি আমার অন্নপূর্ণা ভাষা
বরফঠোঁটে জানিয়েছিলাম তাকে
সম্বলহীন তুচ্ছ ভালোবাসা।

তুমি আমার জন্ম প্রতিবেশী
বুকে তোমার অনন্তরাত জাগে
স্বপ্নে যারা মরতে চেয়েছিলো
শহীদ হতে ছোটে আলোর আগে।

আমি তোমার ছাত্র হয়ে শিখি
মায়ের ভাষা আগলাতে হয় কেন।

সংগীতা দেওয়ানজী

আগুন  একুশ

একুশ আমার একুশ তোমার 
এপার ওপার এক করে দিয়ে 
হাওয়ায়  ভাসে কথা 
অমর একুশ ঝড় তোলে
ভেঙে দিয়ে  সব  বাধা 
ফাগুনে  আগুন জ্বলে ওঠে 
একুশ তার লেলিহান শিখা ।

সেই  আগুনে নিরন্তর  জ্বলে
মা,ভাই ,বোনের বুক। 

বরকত,  সালাম, রফিক 
ভাইয়েরা আমার
আমাদের তন্রে তন্রে তোলপাড় তোলে
একুশের সূর্য  ওঠে
মাতৃভাষার আন্দোলনে
তোমাদের আত্মবলিদান ঋদ্ধ হয়
মানবতার  জয়গানে ।

চৈতন্য ফকির

কথাবার্তা

বর্ণমালা
বাংলা অক্ষরের শরীর জুড়ে জ্যোস্না ও উষ্ণতা।

এ দল ছেড়ে সে দলে নাম লেখাতে রাজনীতির মতো সাহিত্যিকদেরও জুড়ি নেই।কোন কোন প্রকাশক তো মওকা মারার মতো দল ভারি করেই আনন্দে আছেন।আবার কেউ কেউ দল ত্যাগ করে আনন্দ পান।বেশ জমছে খেলা।
আমি হাসবো না কাঁদবো না করে সম্মানীয়দের শ্রদ্ধাই করি।
নিজেকে আরো শাণিত করে কলম তরবারিতে শান দিই।
ঢেঁকি নরকে গেলেও ধানই কুটবে এ বিষয়টা আমার নিজস্ব। 
দলবল হলো না বলে আমি দলীয় নয়।

লিখতে এসে জানি কার কেমন পিপাশা।কে কতটুকু। 
কলম তাই খাপছাড়া তরবারি।যেদিন
কলম আর চলবে না নিজেই পরিয়ে দেবো 

সীমাবদ্ধতার দেওয়াল।

কত কত ডান হাত বাম হাত হয়ে যায়।
বাপুরাম তবু হেঁটে হাটে হেঁটে আসে যায়।

বনতট হাতে নিয়ে তবু  কেউ মিটমিটে চায়।
হারাধন পটাপট ক্লিক মেরে ছবি করে দেয়।

আমি বলি
প্রকৃত মানুষ খুঁজি
তাই
মাটি থেকে তুলে আনি কিছু
মানুষ।

আমি প্রকৃত মানুষ খুঁজবো
বারবার 
তাই ডাকবো
মানুষদের।

কুশল ভৌমিক

আমি বাংলাদেশের লোক 

চেয়ে দেখো,পলাশ শিমুলের ডালে
ফুল হয়ে ঝুলে আছে-আমাদের বর্ণমালা। 

মৌরঙা ফুল খোপায় গুজে গুজে বিষণ্ণ বাসন্তী 
চেয়ে দেখো
গোটা জীবন তোমার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে 
অভাবনীয় শব্দের আদরে ভরিয়ে দিচ্ছি 
জীবনের সবকটি সাদা পৃষ্ঠা। 

আরশিতে হেসে ওঠা আমাদের আনন্দ
বারোয়ারি জীবনের বিপন্ন বেদনা
মোহ মায়া প্রেম প্রাচুর্য 
আমাদের জল্পনা কল্পনা 
ভুল ভ্রান্তি প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির দোদুল দোলনা
শানিত শপথ প্রাণিত প্রতিজ্ঞা
এক থেকে বহু হবার দৃপ্ত প্রেরণা 
সব -সব সুগন্ধ বুকে নিয়ে 
দেখো, ফুল হয়ে ফুটে আছে
আমাদের বর্ণমালা। 

আমাদের প্রতিটি অক্ষর পাখি 
প্রতিটি শব্দ বিমূর্ত ওঙ্কার 
চর্যার সিঁড়ি ভেঙে আমাদের বর্ণমালা পোঁছে যায়
তোমাদের উত্তরাধুনিক দরোজায় 
শুক সারি ব্যাঙমা ব্যাঙমি
ঠোঁটে ঠোঁটে বলে দেয় আমাদের প্রত্নপরিচয়-

আমার ভাষা তোমার ভাষা
ভালোবাসা হোক
আমি ভাষার জন্য জীবন দেয়া
বাংলাদেশের লোক।

তৈমুর খান

সবাই শব্দচারী

একুশের মাঠে
এক একটি বৃক্ষের ফুল ফোটে
এক একটি পাতায় ডালে ডালে
বাংলা ভাষা কথা বলে
বৃক্ষদের কত কত নাম
বরকত রাফিক জব্বার সালাম
সবাই ভাষাকে ধরে মুঠো মুঠো
ছড়িয়ে দেয় মাঠময় 

মাঝি - নৌকো,কৃষক - লাঙল, চড়ুই - খড়কুটো
ভাষারা অনন্ত হয়ে জন্ম দেয় গান
ঘরে ঘরে ভাষাদের দুরন্ত সন্তান
আজ সব বৃষ্টি রোদে হাসি-কান্নায়
ভাষারা ঐশ্বর্যময়, ভাষাদের জয়
আমাদের সব আলো জ্বলে গাছে গাছে
ভাষাদের আলো সব, অশ্রু আর রক্তে মিশে আছে
একুশের সন্নিধানে উঠে আসে সুর
আবেগের পাখিগুলি ওড়ে হৃদয়পুর
ইতিহাসের নিভৃত বাগানে
শ্রদ্ধা এবং সম্পর্কের টানে 
আমরা রচনা করি মুগ্ধ বিশ্বাস 
জেগে থাকি অক্লান্ত ভাষার ইতিহাস

পথ জুড়ে ভাষাবিশ্ব, মন জুড়ে সৈনিক নিষাদ
আমরা সবাই শব্দচারী, সফল তিরন্দাজ
বসন্ত রচনা করি, বাসন্তীর আশ্চর্য বোধে
চৈতন্যের দরজা খুলে উপলব্ধিকে ডাকি উঠোনের রোদে
কালের সীমানা মুছে নিত্য মহাকালে
সংশপ্তক হয়ে দাঁড়াই ভাষার ছেলে
এইখানে এসে ডাকো যদি 
সাড়া পাবে, সাড়া পাবে অনন্ত কন্ঠস্বর
একুশের তারুণ্যে ভরে আছে সব ঘর

তৌফিক জহুর

ভাষার গান

গ্রহণ লেগেছে প্রাচীন সূর্যে
অথচ ভাবো সেই সময়ের কথা
যখন মধ্যরাতে সূর্যের আলোয় ধরা পড়ে কালোপাহাড়
সকালের আজান কত দীপ্ত 
পৃথিবী আঁধার করা ঝড় মুছে যায় আজানের ধ্বনিতরঙ্গে
প্রাতভ্রমণের মিছিল প্রবেশ করে অশ্বখুরে অগ্নিপোশাকে
থেমে যায়, থেমে যেতে থাকে পিশাচের হাসি
প্রতিটি বাড়ি পাড়া মহল্লায় বেজে ওঠে ভাষার গান
রহস্যের ফাঁক- ফোকর  দিয়ে বালক বংশধর -
রঙতুলিতে আঁকে পিতৃপুরুষের অর্জিত পিরামিড 
মা, মায়ের জন্য একদা যে লড়াই
আজো চলেছে সাঁওতাল পল্লী থেকে
প্রাসাদের চূড়ায়
মিছিল কখনো শেষ হয়না
মনে রেখো অ আ ক খ ছিলো আছে থাকবে
দৃষ্টি সুউচ্চ আকাশ পেরিয়ে আরো প্রসারিত

সন্দীপ সাহু

একুশ ও উনিশ

মা-ভাষা আধো আধো স্বরের হাত ধরে 
টলো টলো পায়ে হাঁটা শেখায়।
মা শেখে বাবা শেখে শেখে আত্মীয় বন্ধু।
দেশ শেখে পৃথিবীও শেখে ভালোবাসায়।

একুশের প্রভাত ফেরির রক্তাক্ত পাঁচ ছবি,
উনিশের কমলা সহ সবার ছবি,
পৃথিবীর সর্বত্র হাত ধরাধরি করে দাঁড়ায়।
নানা বর্ণের মানুষেরা তাদের ধরে রাখে হৃদে।

মা-ভাষা একুশ উনিশকে প্রতিবাদ করতে শিখিয়ে ছিল।
একুশ উনিশ শিখিয়েছে সারা পৃথিবীকে।
ভাষা শহিদ চত্তরে চার ও কোলে এক সন্তানকে নিয়ে
মা-ভাষা সারা পৃথিবীতে নবারুণের উদয় ঘটায়।

সমস্ত মা-ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য 
সমস্ত সন্তানেরা রক্ত-শপথ করে।

সত্যজিত দত্ত

একুশের সেন্ট আইটেম


পলাশ ছুঁয়েছি বলে টের পাচ্ছি অমর একুশে
নবীন অক্ষর জন্মাল আজ তোমায় ভালোবেসে।


যে ভাষায় ডেকেছি তোকে ভোরের পাখি 
সন্ধ্যায় সে ভাষায় তবে  বর্ণমালা আঁকি।


রয়েছ যোজন দূরে অচেনার গন্ধ মাখা তায়
বাংলায় ডেকেছি আর অচেনার পর্দা সরে যায় ।

রুদ্র মোস্তাফা

আজ কৃষ্ণচূড়ার দিন

হয়তো আজ গুলি বর্ষিত হবে
ভাসিয়ে দিবে বুকের জমিন রক্তে
ডুবিয়ে দিবে ধ্বনি,বাক্য,শব্দ
আর তিলতিল করে গড়া অস্তিত্বের
বর্ণমালা ।
জানি ওরা পিষে দিতে চাইবে
আমাদের বিশ্বাস-ভালোবাসা-সাহস
গুড়িয়ে দিতে চাইবে ঐতিহ্য-সংস্কৃতি
-মূল্যবোধ
বিচ্ছিন্ন করে দিতে চাইবে আমাদের
সংঘবদ্ধতা;
প্রস্তুত করো নিজেদের:
চেতনায় ফুটিয়ে তুলো কৃষ্ণচূড়া।
জেনে রেখো ওরা ধর্ম-মূল্যবোধ-ঐতিহ্য
কোন কিছুকেই ভয় পায় না
ওরা ভয় পায় কৃষ্ণচূড়া ।
বুকের সবুজে জাগিয়ে তুলো কৃষ্ণচূড়া,
একজন একজন করে এগিয়ে হয়ে উঠো সমুদ্র,
পায়ে পায়ে জাগিয়ে তুলো ঢেও-
কণ্ঠে কণ্ঠে গর্জন,
জেনে রেখো ওরা কৃষ্ণচূড়া ভয় পায়;
ওরা জানে না কার স্নেহে কৃষ্ণচূড়ার
পাপড়ি লাল
কার ভালোবাসায় পাতাগুলো সবুজ
ওরা জানে না ধ্বনি-বর্ণ-শব্দের কত
তলে কৃষ্ণচূড়া ফুটে
কত তলে লাল-সবুজের ঢেও জেগে উঠে;
চলো এগিয়ে চলো-চলো এগিয়ে চলো
আজ কৃষ্ণচূড়ার দিন ।

দেবাশ্রিতা চৌধুরী

মাতৃভাষা

জীবন বেদীর গাছে ফুটে থাকা
মাতৃভাষার ফুল
মায়ের শীতল আঁচল বাবার স্নেহের
মত কোল বিছিয়ে থাকে যেন 
যে ভাষায় মা বলে ডাকি
যে ভাষায় আমার পাখি গান গায়
যে ভাষায় বাগানের গাছে গাছে 
ভ্রমরেরা ফুলের বুকে মধু ছড়ায়
সে ভাষা শুধু আমার কানে বাঁশি
বাজায়,সে আমার হৃদয়ে অমৃত সুর।
নদীর বুকে ভাটিয়ালি সুরে, রাখালের
উদাস গান একটুকরো শান্তি এনে দেয়
সেই তো আমার ভাষা, আমার মাতৃভাষা।

নমিতা সরকার

কৃষ্ণচূড়া ডালে একুশ

ফাগুন এলেই আগুন বুকে কাঁদতে দেখি বাংলা মায়ের মুখ, মায়ের দু-চোখের আকাশ জুড়ে খোকার হাসিমুখ দেখবার অপেক্ষায় প্রহর গোনা রক্তঝরা বুকে, বাংলার মানচিত্রে অঙ্কিত হয়েছে বাংলা স্বরলিপির স্বাধীন সুখ। 

আমার বাংলা মায়ের দামাল সন্তানের বুক চিরে রক্তঝরা কৃষ্ণচূড়া ঝরে ঝরে লিখে দিয়ে গেছে অমর একুশের গান, যে গানের সুরে শিমুল, পলাশ, কৃষ্ণচূড়ার ডালে হেসে ওঠে সালাম, বরকত, রফিক জাব্বারের অমর গাঁথা প্রান। 

প্রাণে আছে গানে আছে, আছে প্রতিটি বাংলা মায়ের অন্তরে-

সোনার বাংলায় রক্তঝরা স্বর্ণাক্ষরে লিখে দিয়ে গেছে অ আ ক খ মাতৃভাষা মধুর সুরে। 

শহীদ সন্তানের হৃদয় জুড়ে আজও যেনো সেজে ওঠে রক্তরাঙা শিমুল পলাশ কৃষ্ণচূড়া ফুল, 

শহীদদের স্মরণে শ্রদ্ধায় মাথা নত করতে যেনো আমরা কোনদিন না করি যেনো কোন ভুল।

সুজান মিঠি

ভাষা

ববি দিদি মূক ও বধির পায়না কিছুই শুনতে।
তবুও জানে ওষ্ঠ পঠন, নতুন ভাষা বুনতে।

রবি দাদার দৃষ্টি নিষেধ, পড়ার নিষেধ নেই!
ব্রেইল দিয়ে দিনরাত্তির আলো সে পড়বেই!

উঠোন জুড়ে কিচিমিচি ভাষা লুটোয় পাখি,
হলুদ ভাষায় রোদ্দুরটা করে ডাকাডাকি।

বাউল দাদু মাটির ভাষায় যখন ছড়ায় গান,
চাষী তখন স্বপ্ন বাঁধে,...নরম সোনার ধান!

সব ফুলেরই মিষ্টি ভাষা, বায়ুর মুখে বোনা।
খিদের ভাষা সব প্রাণীদের একই রকম চেনা।

সৃজন বেদন সামলে মায়ের যখন ফোটে সুখ,
শিশু তখন কান্না ভাষায় ভরায় মায়ের বুক।

মাধুরী লোধ

বর্ণ মালার বর্ণ

বর্ণ মালার চাদর জরিয়ে দিলাম
তোমার শীতল গায়
ভালবাসার উম ছুঁয়ে দিলাম
পরম প্রতীক্ষায় ।
ফসলের মাঠে তোমার হাওয়া
খেলার মাঠে জিত
নৌকার বৈঠায় তোমার বাঁধন
অট্টালিকায় ভিত।
বটের ছায়ায় পাখীর পাখায়
শাপলা শালুক জলে
মন্দির মসজিদ শঙ্খ ঘন্টায়
পথে পদে মাতৃভাষা বলে ।
নদী সাগরে জোয়ার আসে
আসে ভাটার ক্ষন
আকাশে বাজে মেঘমল্লার
নাচে ময়ূর ময়ূরী র মন।
পাখার হাওয়ায় বর্ণমালা
শিশুর হাসির ছাপ
ওঝার ছু মন্তরে ও বর্ণমালা
পালায় ভূত পেত্নীর বাপ ।
ষড় ঋতু  যায় আসে
 আসে একুশে ফেব্রুয়ারি দিন
ভাষা দিবসে শপথ নিলাম 
শুধতে চাই ভাষা শহীদদের ঋন ।

প্রতীক হালদার

বাংলা আমার ভাষা 

বাংলা বলি,বাংলা বুঝি
বাংলা আমার ভাষা,
এই ভাষাতেই বলব কথা 
এটাই আমার আশা।

বাংলা আমার মায়ের ভাষা 
বাংলা আমার স্বর,
বাংলা ছিল,বাংলা আছে
থাকবে জীবনভর।

বাংলা ভাষা বাঁচিয়েছিল 
জীবন দিয়ে যাঁরা,
বাংলা ভাষার মধ্যে দিয়ে 
থাকবে বেঁচে তাঁরা।

যে বাংলায় রবীন্দ্রনাথ 
আজও বেঁচে আছে,
হয়তো ফুলে,নয়তো পাতায় 
নয়তো নদীর মাঝে।

বাংলা ভাষা ছড়িয়ে যাবে
এই বিশ্বের মাঝে,
এই স্বপ্ন প্রতিদিন যেন 
সবার মনে সাজে।

সাগর শাহ্

একুশে মানে

দেখো লাল সবুজের পতাকাটি 
নীল আকাশে উড়ে, 
তোমাদের এই প্রতিদানে আজ 
গর্ভে বুকটা ভরে। 
তোমরা ছিলে তোমরা আছো
বাঙালির হৃদয় জোরে,
তোমাদের দেওয়া স্বাধীনতা রক্ষায় 
রবো অস্ত্র ধরে। 
সবুজে আজ মাঠ ছেয়ে যায় 
রাখাল চড়াই গরু,
যে মাটিতে শুয়ে আছো তোমরা 
হবে না তা মরু। 
একুশে মানে বাঙালি জাতির 
মাতৃভাষা দিবস।
একুশে মানে শহীদের স্মরণে
হৃদয়ে রক্ত ক্ষরণ। 
একুশে মানে মায়ের বুক থেকে 
কেড়ে নেয়া মানিক রতন, 
একুশে মানে মাতৃভাষা রক্ষায় 
আমার ভাইয়ের মরন।
একুশে মানে স্লোগানে স্লোগানে 
শহীদের করি স্মরণ,
একুশে মানে জ্বালাও পোড়াও 
হায়নাদের ঘাঁটি বিচরণ। 
একুশে মানে রক্তে রঞ্জিত 
সেই রাস্তার বিবরণ 
একটি ফুল আজ রেখে গেলাম 
শহীদের তরে, করিয়া স্মরণ।

মৌসুমী খাতুন

ভাষার গান

আমি তোমায় ভালোবাসি
মাতৃভাষা জন্মভূমি
বীর যুবকের রক্তে রাঙা
স্মরণীয় আজ একুশে ফেব্রুয়ারি।

তাইতো ফাগুন রক্তে রাঙায়
শিমুল পলাশ দিয়ে
বাঙালি ভুলেছে শোক ব্যাথা
ভুলেনি প্রকৃতি কোনো ফাগুনে।

ভাষা শহীদের বুক চিরে আজ
জন্ম নেওয়া বাংলাদেশ
আত্মত্যাগী হার না মানা
শ্রদ্ধা জানায় একশো অস্টাশি দেশ।

আমরা কেনো পিছায় তবে
স্বাধীন বাংলা পেয়ে
যার জন্য এত লড়াই
সবই কি শুধু ইতিহাস হয়ে?

জাগো বাংলা জাগো বাঙালি
মাতৃ দুগ্ধ সম বাংলা ভাষা
প্রকৃতির মত স্মৃতিতে স্মরণে
বাংলাকে কভু ভুলিবো না

গোপী নাথ ঘোষ

নবপল্লবে বসন্তের সুর

জ্বলন্ত সূর্যের উত্তাপ মাখা রমনীর লাল মুখ
খুজে ফিরে হারিয়ে যাওয়া প্রাণ। 
প্রশান্ত মহাসাগরের নাভীমূলে ঘুমন্ত ছিল যে যুবক 
তারি অঙ্গ হতে আজি দ্রোহের আগুন।
বোকাসোকা আমার মাঝেও
জ্বেলেছে দ্রোহের গান।
ভালোবাসার উত্তাপ মাখা রঙের
বিবর্তিত হাওয়া, 
ঘোষণা করেছে দক্ষিণা হাওয়া। 
নতুন দিনের আগমনী গান
ফিরে পাওয়া হারানো সুর 
প্রকৃতির বুকে ভালোবাসা 
আজি নবপল্লবে বসন্তের সুর।

সংহিতা চৌধুরী

আমার একুশ

একুশে ফেব্রুয়ারি আমার ভাইদের রক্তে, কলিঙ্গের রূপে সেজে
আগুনের স্পর্শে দগ্ধ হলো শোকের বসন পরে। 
মুক্ত হাওয়া কিনতে গিয়ে, রক্তিম বর্ণে শহীদ হলো
হে স্বাধীনতা! তোমাকে চাই জন্ম জন্মান্তর, বর্ণমালা গেঁথেছি যে সযত্নে। 
মরণপণ রণক্ষেত্রে রক্তের হয়েছে জয়। 
বাংলা আমার মাতৃভাষা, বাংলা আমার প্রাণ। 
মাতৃ ধ্বনির উল্লাসে মিছিলের সমারোহ, কেঁপে উঠে ভুগর্ভ মুহুর্মুহু গুলির আঘাতে 
রক্ত ভেজা রাজপথ জোয়ারে ভেসেছে, আত্মত্যাগের বলিদানে বাংলাকে পেয়েছি ফিরে। 
বাংলা আমার মাতৃভাষা, মাতৃজঠরের সার্থকতা।
জয়ধ্বনি উঠুক দিকে দিকে আমার অমর একুশের।

শিপ্রা দাশ

অনুপ্রেরণা  
 
 উনিশ আমাদের প্রাণের ধন
 করেছিল সেদিন রক্তক্ষরণ l 
 একুশ আমাদের অনুপ্রেরণা
 উদ্দীপ্ত করেছে চেতনা l 
 আমার ভাইয়ের রাঙানো রক্ত
 সেদিনের পাতাঝরা বসন্ত...
 ম্লান হয়নি.. হৃদয়ের মর্মমূলে 
 আজও ছলনা পরিহাসে কাঁদায় l
আজ একুশে...
 শপথ করি রক্তিম ভাষায় l
 প্রতিটি একুশ অথবা উনিশে
নতুন সূর্য উঠবেই আঙিনায় ll

মীরা পাল

শহিদের নি:শ্বাসে

ভাষার পিদিমে লালচে পূব আকাশ
শত শত বেদী মূলে শহিদের নি:শ্বাস;
সেজেছে কৃষ্ণচূড়া আর পলাশ রাঙায়ে
শ্রদ্ধায় আনত রক্তস্নাত আত্মবলিদানে।

অ আ ক খ বর্ণেরা আজও সংগ্রামী মিছিলে 
প্রতিবাদ প্রতিরোধের ভাষা উনিশ একুশে,
শিশু কুঁড়িদের জন্মগত বুলি
কৃষকের মুখের ভাষা 
মাঝিমল্লারের ভাটিয়ালি গান...
সোচ্চারে বেঁচে থাকুক বলার ভাষা নিজস্বতায়,
লাভ করুক স্বীকৃতি ধ্রুপদী বর্ণমালায়।

স্বপন গায়েন

ঝলসে যাওয়া রুটি
 
ঝলসে যাওয়া রুটির মতো শরীর
পোড়া পোড়া গন্ধ পাই অজানা অন্ধকার থেকে
হিম পড়ছে, তবুও পরোয়া নেই এই জীবনের
বাঁচা মরা তো উপরওয়ালার হাতে ...

সন্ধ্যা নামছে চরাচর জুড়ে
চাঁদের পোড়া শরীর দেখে তার জ্যোৎস্না উপভোগ করে
কিন্তু মানুষের পোড়া শরীরে দগদগে ঘা
শুকিয়ে যায় না কখনও আরো বেড়ে যায় সময়ের সাথে সাথেই।

চাঁদের মায়াবী আলোয় আলোকিত হয় সর্বত্র
জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে সভ্যতার কৃত্রিম রঙ
পোড়া শরীর বাইরে দেখাতে লজ্জা নেই
চাঁদ ডুবে যাক, আবার উঠবে -
মানুষ ডুবে (মরণ) গেলে একটা অধ্যায় শেষ।

দীপান্বিতা পান্ডে দীক্ষিৎ

মনের আকাশে

সময়ের  অবসরে দিন বড় অল্প সময় নেই কারো ,
খবরের প্রয়োজন সিমাহীন ব্যস্ততার ভিড়ে ৷
জমে থাকা নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস 
বিদির্ন করে দেয় পৃথিবীর বুক , 
জল ভরা দুটি চোখ গোনে প্রতীক্ষার প্রহর অধীর আগ্রহে৷
সহসা জড়িয়ে ধরে আলোকের পৃথিবী,
সারিসারি অভিমানি মেঘ দুরে সরে যায় 
ঝরে পড়ে আনন্দের অশ্রু কবিতার আকারে৷
শতশত কবিতা ছড়িয়ে যায় উজ্বল নক্ষত্রে
ভালবাসার জলসাঘরে ,
চাঁদের জোছনা নিশিথের রাগিনীকে ভরিয়ে তোলে  মুচ্ছর্নায় ৷
নূতন সূর্যের রক্তিম আভায় রাঙা মনের আকাশ,
পলাশ ফোটে বয়ে যায় বসন্ত বাতাস অভিমানি মেঘে ৷
মেঘ ঝরে পড়ে বৃষ্টির সুরে শ্রাবণের ধারা হয়ে,
ধুয়ে যায় যত স্তুপিকৃত বাষ্পরাশি ধুলোবালি বৃষ্টির জল কণা দিয়ে ৷

শ্রী অভিষেক অধিকারী

অসময়ে

যারা অসময়ে ভিজেছিল,
তাদের একটা প্রশ্ন করা যেতে পারে
বাস্তব এর সঙ্গে পরাবাস্তবতা মিলে কি
তৈরী হতে পারে একটা যাপনচিত্র।

যারা অসময়ে লড়াই করেছিল,
তারা সমুদ্রের তীরে ঝিনুক কুড়াতে 
কুড়াতে যুদ্ধ বন্দীত্বের স্মৃতিচারণ করেছিল,
একটা স্মৃতির সরণী পাওয়ার। 

যারা অসময়ে প্রেম করেছিল,
তারা লিখতে পারে
নিজের বুজে যাওয়া কল্পিত অনুরাগের চরণ।
তারা ডাউন মেমোরি লেনের সরণীতে
আবার খুঁজতে পারে একটা ফাঁকা সম্পর্ক।

প্রদীপ কুমার মাইতি

অমর ২১ শে ফেব্রুয়ারি

বাঙালীর বুকে চির অমর
২১ শে ফেব্রুয়ারি,
বাংলার বুকে মাতৃভাষা 
চিরদিন রবে জারি।
একুশে ফেব্রুয়ারি গর্ব মোদের
ভাষা বিজয়ের দিন, 
বিজয় গর্বে প্রতিটি সকাল 
থাকবে সারাদিন। 
রাষ্ট ভাষা বাংলা হোক
লড়াইয়ের ময়দানে,
শহীদ হয়েছে কত বাঙালী 
তাদের জীবন দানে। 
যাদের ত্যাগে বাংলার ঘরে
বাংলা বর্ণমালা,
তাদের স্মৃতিতে জানাই প্রনাম
সাজিয়ে বরণ ডালা।
একুশে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষায় 
ভোরের সূর্যোদয়,
একুশে ফেব্রুয়ারি ইতিহাস আজ
সারা বিশ্বময়।

ছন্দা দাম

আমার একুশে

একুশে আমার হৃদজমিনে খনন করা...
রক্তরঞ্জিত একটা টলটলে বেহসতের ঝিল,
একুশে আমার মায়ের জিভে দোল খেতে থাকা...
মায়াময় ঘুমপাড়ানির প্রাণ ছোঁয়া অন্তমিল।

একুশে শরতের শিউলির সৌরভ নয়...
পলাশ অশোক শিমুলের খুনরাঙা উপাখ্যান,
মায়ের বুকের হারানো সন্তানের ভালোবাসার ধন...
দামাল ছেলেদের হাতে উড়তে থাকা বিজয় কেতন।।

একুশে শেখায়নি হেরে যেতে..
মায়ের পায়ে প্রাণের কুসুম দিয়েছে ছড়িয়ে,
মাতৃভাষার মাতৃদুগ্ধ রক্তের প্রতিটি কণায় মিশে,
কখনো যাবে না হারিয়ে।।

বাংলা মায়ের আঁচলের ছায়ায় বেড়ে উঠা আবেগ অভিমান আশা ভালোবাসা,
একুশে বাঙালির হৃদয়ের গভীরে জিইয়ে রাখা দুরন্ত বেঁচে থাকার নেশা।।

অলকা গোস্বামী

মাতৃভাষা

মাতৃভাষা বসন্ত - ফুল, উত্তাল যৌবন,
মাতৃভাষা অধিকার বোধ লড়াই প্রাণপন,
বাংলা আমার তৃষ্ণার জল
আজীবন জেগে থাকার গান,
কর্মব্যাস্ত ক্লান্ত রাতে,
মাতৃভাষা স্বপ্নের সন্ধান।

গৌরবের এই মাতৃভাষা,
বিশ্বজোড়া খ্যাতি তাঁর,
যুগে যুগে অমর তুমি
মাতৃভাষা লহ প্রনাম।

রমা চন্দ্র

শেকড়ের সান্নিধ্য

ভালবাসি শেকড়ের সান্নিধ্য
বাংলা মায়ের কোল
খুব ভালোবাসি আমি
বাংলা ভাষার বোল।
বাংলার সোনার মাটি...
পুকুর নদী ঝিল
অরণ্য ক্ষেত-প্রান্তর 
সবুজ জীবন সরল অন্তর।
আমি গর্বিত বাঙালি
সুমধুর বাংলা ভাষাতে
কথা গান গল্প বলি...
আমরা কৃষ্টি সংস্কৃতি সভ্যতার স্বপ্ন দিশারী।
এই বাংলায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মানবপ্রেমী বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল
সনেট স্রষ্টা মাইকেল মধুসূদন দত্ত
আরও গুণী শ্রেষ্ঠ কতশত!
মাতৃভাষা রক্ষার্থে- 
বাংলার বীর সন্তান
দিয়েছেন প্রাণ বলিদান
সেই শহীদদের লাল রক্তে-
বিশ্ব মানচিত্রে আঁকা
বাংলা অক্ষরের চির উজ্জ্বল সম্মান।

মীনাক্ষী চক্রবর্তী সোম

একুশ, আমার পরিচয়

"একুশ" আমার বুকের ভিতর একটি লাল গোলাপ
আদরে সোহাগে আগলে রাখি লাগতে দেই না আঘাত ।
মাতৃভাষার জয়ের কাহিনি শোনায় অমর একুশ  
চেতনায় জাগে নতুন জোয়ার আশায় ভরে বুক ।
শত চেষ্টাতেও পদানত হয়নি আমার মুখের ভাষা 
পৃথিবীর তিন দেশেতে দেখো উজ্জ্বল বাংলা ভাষা।
বর্ণপরিচয় আর বাল‍্যশিক্ষা মনের গভীরে প্রোথিত 
মননে, যাপনে, চিন্তনে, সৃজনে সদাই উদযাপিত।
বাহান্নতে বুলেটে ঝাঁঝড়া হৃদয়তন্ত্রী থামেনি
সহস্রকোটি রক্তবীজেরা এখনো দাপায় পৃথিবী।
আজো পথ দেখায় সালাম রফিক বরকত জব্বার
সেই পথে ছোটে ভাষাসেনানীরা দুর্বার অনিবার।
কোন ক্ষমতায় সম্ভব নয় মুখের ভাষা কাড়া
মাতৃভাষার অগাধ জোর তরবারি থেকে বাড়া।
লাল রঙে ধোওয়া বাংলাভাষা সূর্যের মত সত্যি 
যতদিন থাকবে চন্দ্র সূর্য ততদিন দেবে শক্তি।
নিপীড়নের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার অস্ত্র এই একুশ।
পৃথিবীর সব মাতৃভাষা উদযাপনের একুশ।।

রীতা চক্রবর্তী

অমর একুশে

এসেছে বসন্ত, ফাগুনের বিষাদ বেলার
একুশের অশ্রু মেখে—
রক্ত ঝরিয়ে ছিনিয়ে এনেছে
বহু সংগ্রামের অর্জিত ফসল
প্রাণের মাতৃভাষা।

একুশ মুক্ত করেছে বাংলাভাষা
কত শত শহীদের রক্ত দামে কেনা,
ভাষার জন্য শহীদ যাঁরা
শোধ হবেনা তাদের দেনা।

ঢাকার রাজপথ রক্তে রাঙিয়ে
সেদিন একুশের ভাষা তর্পণের কান্ডারী ছিল ওরা—
সালাম,রফিক,বরকত,সহ
আরো কত কত শহীদের আত্মবলিদানে
অমর একুশ হয়ে গেল
অক্ষয় অম্লান।

ওরা ঝরে গেছে, বিনিময়ে দিয়ে গেছে
সুললিত বাংলাভাষায় প্রাণ,
আজ এ ভাষাই পেয়েছে
বিশ্ব দরবারে জাতীয় সম্মান।

শ্বেতা ব্যানার্জী

মাতৃকোষ

একলা দুপুর নির্জনতায় আয়েশি হয় জানি,
ক্লান্ত পুকুর মাখছে দুপুর তবুও টানছে ঘানি।
কোন ঠিকানায় যায় বলাকা সাঁতারে আকাশ খানা,
উদ্দেশ্য হীন সাঁতরে চলা গন্তব্য অজানা...। 

আসবে সুদিন হাসবে ভাষা, জন্মদিন তার-ও, 
লাল গোলাপের ঝাঁকে ঝাঁকে উদাসিন চোখ কার-ও।
গোলাপ ছুঁয়ে দেখবে তখন কাঁটাতারের বেড়া,
কোন সৈনিক কানের কাছে নিত্য দেয় পাহারা। 

আজও শুনি মাতৃভাষা মাতৃকোষেই মজুত, 
সীমান্তের ওপার-এপার পারানিতে রাষ্ট্রদূত। 
কম্পাসের দিক নির্ণয়ে অশনিসংকেত  ভাসে, 
তবু,কবর ভেঙে স্বপ্ন খুলে  শহিদ ভাইরা হাসে।

ভাষার রক্তে লাল হয়েছে সবহারাদের পথ,
সব হারিয়ে শব পেরিয়ে ঐ আনছে জয়রথ। 
বর্ণমালায় হাত রেখেছে প্রত্যয়ী যত মুখ...।
স্বর্গ তখন বিস্বাদ লাগে মাতৃভাষাতে ই সুখ।

অ- বলতে অজগর বুঝি, আ- বলতে আম,
বর্ণমালা ছুঁয়েছি 'মা' হারিয়ে অনেক প্রাণ...।
আজও তবু গলায় ঝোলে অনেক দুঃখসাজ,
আমার চাওয়া উদ্ভিদে ঘাসেজলে ভাষার সম্মান।

প্রীতম চক্রবর্তী

বাঙালির ভাষা

বাঙালির অন্তঃপ্রাণে লুকানো আবেগ,
পরিস্ফুটিত হয়ে জেগে উঠে
বাঙালি কন্ঠের ভাষ্যলহমায়।
বৈশাখের ভোরে রবীন্দ্রসঙ্গীত কিংবা
শিউলির গন্ধমাখা আগমনী গানে,
বাঙালি যৌবন খুঁজে পায়,
"কারার ঐ লোহ কপাত" শুনে।
বাঙালি অমর।
জীবনানন্দের কবিতায় তারা বারবার 
নানারূপে ফিরে আসে সোনার বাংলায়।
বাঙালি নির্ভীক।
তাদের শিরায় বইছে নেতাজী, বিবেকানন্দদের রক্ত।
বাংলার মাটি বাঙালির কাছে মা।
তাই বাঙালি কৃষক লাঙ্গল চষে,
দিনশেষে শুয়ে পড়ে সেই মাতৃক্রোড়ে।
বাংলা ভাষা, বাঙালির প্রাণ।
সেই ভাষায় ভালোবাসা-সুখ-প্রতিবাদ
ব্যক্ত করে বাঙালি যুগে যুগে
উন্নতশীরে দন্ডায়মান।

পারমিতা মুস্তাফি

সত্যের লোক (গল্প)

সত্য জানলার দিকে তাকিয়ে বসে আছে, কখন বৃষ্টি আসবে জানে না। মনে হয় তার বাঁ দিকে কেউ রয়েছে চেয়ে, দিগন্তবিস্তৃত চোখ দুটো তাকে খাচ্ছে কুঁড়ে কুঁড়ে। সত্য ভাবলু হল আজ, তার নাম দিয়েছি সাথী। সত্য আপন খেয়ালে চলে প্রতিবার।

তার ঠোঁটের কোণে মিষ্টি সুবাস এলো। সত্য চেয়ে আছে ফুলের গন্ধের দিকে। তার মা এলো কাছে, বলল চল আমার সাথে স্বর্গে। সত্য কেমন যেন মূর্ছা গেল। সত্যর অদ্ভুত লাগত ঐ চোখ দুটো। যেন সে কাম্য না ঐ চোখের দিকে তাকাতে। সত্য অদ্ভুত বিচরণ  করত  খাটে, এর প্রান্ত থেকে অপ্রান্তে। সত্য চিন্তামনিকে ডাকলো কাছে। চিন্তামণি হঠাৎ উড়ে গেল পাখার সাথে শুয়ে। সত্য জেগে আছে তখন। সত্যর ভেতরে ভেতরে দুচিন্তা হত। সত্য যেন মহাজাগতিক  রূপে আসবে বনগাঁ  এ। সত্য ছিল এক সাঁঝবাতির প্রলেপ। সত্যর বয়স তখন এক। সত্যর মা খেলতে খেলতে মারতো সত্যকে। সত্য যখন বড় হলো তখন দুধ কলা দিয়ে পুষত  তাকে। সত্যর বয়স যখন আঠেরো তখন প্রেমে পরল  একটা মেয়ের। মেয়েটির নাম রুপা, বয়স তার তেরো বছর। সত্যর মা কিছুতেই তার দেবে না বিয়ে। সত্য ভাবল রুপা চলে গেছে পৃথিবী ছেড়ে। কিন্তু রুপা বেশ অবলীলায় বলত  আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না। সত্যর মা এখন অস্তাচলে। সত্য তখন জড়িয়ে ধরত মাকে। সত্য বুঝল  মা নিরুদ্দেশ এর পথে গেছে। সত্য একটু একটু করে তাপ দিত গায়ে। সত্য শেষ হবার ঝুকি নিল  আজ যেন সে চৌকাঠ পেরিয়েই  স্বর্গ খোঁজে।

নন্দিতা দাস চৌধুরী

অক্ষরের স্তবক 

পাহাড়সম হিসেবের বোঝা মাথায় নিয়ে শহরের  অলিগলি পথে উদ্ভ্রান্তের মতো খোঁজে মরি অস্তিত্বের ইতিহাস,

রুক্ষতার মাঝে তীব্র  বিরহের গতি ফাঁকা প্রান্তরে হৃদয়ের  দীপচন্দী-, 
ধূ ধূ মরুর  তরঙ্গায়িত আন্দোলনের  সুর তিল তিল করে গড়ে তোলে এক ব্যাকুলতা,

হৈ হোল্লোড় করে আঁধার  এসে গ্রাস করে যেমন, তেমনি গুটি গুটি পায়ে আলোও আসে, 
বাস্তবে শাশ্বত বলে কিছু হয়না,
সবই চাপা বিবর্ণ  পাতার মতো ঝরালো শব্দ,

ঝড়ের রোমাঞ্চ বুকে নিয়ে নক্ষত্রের  গন্ধে রোদের ভিতর জন্ম  হয়েছিল ভালোবাসার, 
তাই বিস্ময়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আজও  লিখে যাই পরিক্রমী অক্ষরের স্তবক।

গীতশ্রী ভট্টাচার্য্য

বুলি

উনিশ আমার রক্ত কণিকা, একুশ বুকের পাঁজর
দুটোই আমার মুখের ভাষা, দুটোই লিখার আখর।
বাংলা আমার মায়ের গর্ভ, বাবার জন্ম ঋণ
বাংলাতেই ভাবনা আমার মগজে রাতদিন।

রক্ত ঝরা শিকড় বেয়ে এসেছে ভাষার ধারা
মৃত্যু তাদের অমর করেছে প্রাণ হারাল যারা।
কৃষ্ণচূড়া, অশোক ,পলাশ আগুনফুলের মালা
শহীদ বেদী সাজিয়ে রাখে ভালবাসার ডালা।

এই ভাষাতে কথা বলি, এই ভাষাতেই লিখি
এই ভাষাতে শুনি আর এই ভাষাতেই দেখি।
আগলে রাখি মধুর আমার মায়ের মুখের বুলি
এ যে আমার পরিচয়, বল কেমন করে ভুলি! 

অভিজিৎ পাল

অমর একুশে  

কৃষ্ণচূড়ার আগুন রঙে ফাগুন দিনে 
শহীদ হয়েছিল যারা অম্লান বদনে , 
ভুলি কী করে আমার বর্ণমালা যে রক্তমাখা হয়েছিল -
সেদিন , আকাশ বাতাস ভারী হয়েছিল কত মায়ের রোদনে । 

বাংলা আমার , বাংলা সবার
বাংলার জন্যেই একুশে ফেব্রুয়ারি বার বার , 
বাংলার জন্যেই হৃদপিন্ডে রক্তজোয়ার
এই বাংলার জন্যেই শহীদ -
রফিক-সালাম-বরকত-সফিউর-জব্বার । 

বায়ান্নর সেই শীতের মিষ্টি রোদ্দুরে
আচমকা হায়েনাদের গুলির ঝরে , 
কত যে সন্তানহারা মায়ের কান্না-
নীরবে নির্জনে আজও গুমরে মরে । 

বাংলা আমার বুকের ভিতর
শহীদ বেদী ঘুরে ঘুরে , 
'আমি বাংলায় গান গাই/বাংলার গান গাই'
প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের সুরে সুরে । 

একুশের ওই ঢাকার শহীদেরা
বেঁচে থাকবে নীরবে কোটি কোটি বাঙালির অন্তরে , 
একুশের আগুন জ্বলুক নব প্রজন্মের বুকে-
ধিকি ধিকি , সুরমা থেকে বরাকের এপারে ।

ঝিমলি আচার্য

ঝঙ্কার 

মাতৃভাষার আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্বীকৃতি,
শহীদ "মা " এর  ত্যাগের প্রতিকার ।
ভাষা আন্দোলনে সমগ্র বীর শহীদদের প্রতি অফুরন্ত  ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সম্মানে " চির অঙ্গীকার" ।
রফিক, সালাম ,আব্দুল জব্বার ,শফিউল ,বরকত --
নিরলস সংগ্রামে গড়েছ সংস্কার ।
ধ্বনি, বর্ণ ,শব্দ ,ভাব প্রকাশে মাতৃভাষা 
অবর্ণনীয় আবিষ্কার ।
ভাষায় পূর্ণতা আনে, ভাষারই নিয়ম-নীতি 
শৃঙ্খলার লিপিকার ।
মাতৃভাষা আমাদের সর্বোৎকৃষ্ট নিদর্শন,
ন্যায্য অলংকার ।
চলার পথে সমগ্র ভাষার প্রতি সম্মান 
ও আয়ত্বে আনা কঠিন ,তবে চমৎকার ।
ভাষার অধিকার ,যোগায় বাঁচার তাগিদ  
জাগায় অহংকার ।
সাহিত্যে অবারিত প্রতিভার ধারা ,
ভাষারই টংকার ।
বাচন কৌশল ঘটায় মিলন ,
হিংসা ,রণহুঙ্কার ।
জীবন শৈলীর অন্তরালে ভাষা' ই 
প্রাণের স্পন্দনের ঝংকার ।

জগন্নাথ বনিক

রক্তে রাঙানো 

একুশ মানে রক্তে রাঙানো,
 রঞ্জিত রাজপথ।
একুশ মানে মায়ের ভাষা,
বাংলা ভাষার শপথ।।
একুশ মানে শ্রদ্ধা জানানো,
বীর শহীদের প্রতি।
বাংলা ভাষা পেয়েছে আজ,
রাষ্ট্র ভাষার স্বীকৃতি।।
একুশ মানে বীর শহীদের,
 আত্ম বলিদান।
বৃথা যায়নি তাজা রক্ত,
এসেছে বাংলা ভাষার সম্মান।।
একুশ মানে ভাষার লড়াই,
যারা দিয়েছে প্রাণ।
সালাম, বরকত, জব্বার, রফিক, সফিউর রহমান।।
আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস,
একুশে ফেব্রুয়ারি।
বীর শহীদের শ্রদ্ধা জানতে,
ফুল নিয়েছি যত্ন করি।।

কাজী নিনারা বেগম

এসেন্স 

পৃথিবীর নতুন এসেন্স এ ডাকছে তোমায়,
সূদূরে রয়েছো চারমিনার গেটে।
তোমার স্নিগ্ধ হাওয়া মাতাল এসেন্স ভেসে যায় বন্দরের দিকে।
আমি গরাদের ভেতর হাঁস ফাঁস,
সূদূরে চারমিনার গেটে দাঁড়িয়ে ।  
বিষন্ন সৈকতে সু্র্য দেবতা আজ খানিকটা সময় নিরাশার দোলাচলে। 
অন্ধ বাতিঘরে কামসূত্রের পোতাশ্রয়ে আমাকে নিবে আশ্রয়ের খোঁজে। 
নতুন পৃথিবীর আশ্রয়ের জন্য নিবে নতুন পৃথিবীর এসেন্সের নতুন পারফিউমের ফেলে দেওয়া বোতলে ,
চুমুক দিয়ে নতূন কোন   সুদূর পরাহত এক দ্বীপের দিকে।
মৃতুর কাছে যাওয়া দূরত্বের সাথে প্রতিদিন।

কল্যানী ভট্টাচার্য্য

অহংকার

মাটির বুকে লুটিয়ে পড়ে ভাষার জন্য কত প্রাণ
রক্ত জমার পলাশ বনে বর্ণমালা ছড়ায় গান। 
মান রাখিতে মাতৃভাষার হয়েছে কত প্রান বিসর্জন
মিছিল চলে এই জনতার বাহান্নরই সালে। 
বাংলা মোদের রাষ্ট্র ভাষা মোদের প্রানের ভাষা
যে ভাষাতে শিখেছি কথা মাতৃজঠর কালে। 
বিশ্বে দেখো কোথাও নেই এমন ইতিহাস
ভাষার জন্য মাটির জন্য রক্ত মাখা পলাশ। 
ছয় ঋতুর এই বাংলা ভাষা বারো মাসে ঘেরা
মায়ের ভাষা বাংলা ভাষা সবার মাঝে সেরা। 
নদীর পাড়ে বাড়ি আমার বাংলা মায়ের কোলে
নদীর জলে অঙ্গ জুড়ায় নাইতে নেমে জলে। 
এই ভাষাকে কদর দিতে রক্তে রঞ্জিত রাজপথ
ছিনিয়ে এনেছো বাঙালীর অধিকার বুলেট আর বারুদের গন্ধে। 
আমি বাংলাকে ভালোবাসি বাংলায় কথা বলি
মাতৃগর্ভে দশ মাস দশ দিন থেকে পেয়েছি বাংলার ঘ্রাণ। 
বাংলা আমার সারা শরীরের বিন্দু বিন্দু ঘাম
বাংলা আমার রক্তের ভাষা আমার স্বাধীনতা। 
হৃদয় তন্ত্রে শিহরণ জাগায় আমার মায়ের ভাষা
বাংলা আমার আশার আলো আমার মুক্তির পথ। 
যে ভাষাতে মধুর সুরে ডাকছে কোকিল গাছে গাছে
এই ভাষাতেই আমরা শুনি নদীর কলতান। 
একাত্তরের নতুন প্রভাত লাল সবুজের দেশ
ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ বাংলা ভাষার রেশ। 
বাংলা আমার মায়ের আঁচল আমার কন্ঠ হার
বাংলা আমার প্রাণের ভাষা আমার অহংকার।