Nov 13, 2024

তৈমুর খান

ব্যবসা

রোজ আমাদের বিবেক বিক্রি হয়
রোজ আমাদের লজ্জা বিক্রি হয়
তোমরা শুধু দোকান খুলে রাখো
তোমরা শুধু ব্যবসা চালাও

শরীর জুড়ে তোমার দোকান
শরীরী দোকানগুলি
আমরা শুধু মোহ কিনতে যাই
আমাদের শুধু মোহের নেশা পাই

কোন্ আগুনে পুড়তে থাকে দেশ?
কোন্ আগুনে পুড়তে চায় মন?
কেউ বোঝে না, মন বোঝে না
পুড়তে পুড়তে সবাই নিঃশেষ

সবাই দেখি বিজ্ঞাপন দেয়
 বিজ্ঞাপনে শরীরী আশ্লেষ 
সব পর্দা উড়ে গেলে একইরকম টান
সব দোকানেই এখন শুধু সহজলভ্য কাম।

সমরেন্দ্র বিশ্বাস

মহারাজ তোমাকে আজও ভোলেনি

দূরে ব্লাস্টিং-এর আওয়াজ, পৃথিবীকে খুঁড়ছে মানুষ।
সমস্ত গাছগুলি দীর্ঘকায় সৈনিকের মতো স্তব্ধতায় দাঁড়িয়ে আছে
যেন এক্ষুনিই কুচকাওয়াজ শুরু হবে।
এইসব সুসংবদ্ধ সৈনিক বৃক্ষের মধ্য দিয়ে হেঁটে চলেছি
আমি মহারাজ!

ঢাল তলোয়ার দূরে ফেলে এসেছি আজ
হালকা নীল আকাশ খাটিয়েছে সামিয়ানা
গাছপোকা কিংবা ঝিঁঝিঁরা ধরেছে সানাই।
আমার শরীরে এখন কোনো লং মার্চ নেই, নেই কোন আস্ফালন
এই মুহূর্তে যে কোন মানুষের সঙ্গে
আমি মহারাজ, ভাগাভাগি ভাত খেতে পারি।

বাতাস আঁচড়ে দিচ্ছে বন-বালিকার চুল।
ওগো হলুদ মেয়ে, তুমি তো আমারই ছিলে
সেই কবে কতকাল আগে
আমরা দুজনে একই সঙ্গে ঝুলতাম
পাগলা হাওয়ায় ছুটতাম
ঘাসের জঙ্গলে গড়াগড়ি যেতাম।
বালিকা, তুমি আজ কোথায়?
অদলবদলের স্রোতে কোথায় তুমি হারিয়ে গেলে?

এই দ্যাখো, জঙ্গলের মধ্য দিয়ে তোমার মহারাজ হেঁটে চলেছে
একা একা সঙ্গী নেই সাথী নেই
শুধু সুন্দর পোষাকের নীচে একটা সিসের ভারি জামা, কিংবা রক্ষাকবচ।
এখনও হয়তো তুমি নীল শাড়ি দুলিয়ে আনমনে হেঁটে যাচ্ছ
যেন এক রাজকন্যা।
মনে কি পড়ে তোমার মহারাজকে
যাকে তুমি চুপি চুপি মুকুট পরাতে।

এই অনন্ত বনমালার মধ্য দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে
আকাশে একটা দুটো করে তারা ফুটবে
দূরে বক্সাইটের খাদানে ব্লাস্টিং এর আওয়াজে 
আমি থমকে গিয়ে দেখবো
তোমার জেন্টেলম্যান দিনগুলো ক্যালেন্ডারে উল্টো হয়ে ঝুলছে।

পথ হাঁটতে হাঁটতে কোন এক স্ট্রীটে
তুমি এখন অসহায় থমকে দাঁড়িয়েছ,
আকাশের তারায় চোখ রেখে 
তোমার নাকেও ভেসে আসছে পুরোণো দিনের গন্ধ!

হু হু করে বাতাস বইছে।
সরলবর্গীয় অরণ্যের সৈনিকেরা এখন আমার সামনে কুচকাওয়াজ করবে,
আর অক্ষমতার আক্রোশে আমি আদেশ দেব নক্ষত্রকে: ‘নীলডাউন হও।’
তারপর ক্যাম্পে ফিরে গিয়ে আহত সৈনিকের মতো অসহায় পড়ে থাকব
শুধু একটা কথাই বলার জন্যে: ‘মহারাজ তোমাকে আজও ভোলেনি।’

সোমেন চক্রবর্তী

আবার দেখা হলে 

কয়েনটা টস করে জিতে গেলাম

চাই 
      এগিয়ে এসে কথা বলুন 
      এতদিন নীরব থাকার কৈফিয়ত দিতে হবে না
      শুধু বলে যান এই সময়ের কথা 
      উপায় বাতলে দিন ছেড়ে আসা শূন্যতাকে কীভাবে ভোলা যায়

আপনি যুদ্ধবন্দী সৈনিক নন
নীরবতা ভাঙুন,
চাইলে এক পা পিছিয়ে যান। 
আবার খেলা শুরুর কথা উত্থাপন করতে পারেন
অথবা ময়দান ছেড়ে যেতে পারেন।

যদি কয়েন আপনাকে জিতিয়ে দেয়!
আপনিও হয়তো চাইবেন আমার এগিয়ে আসা

আমি তখন তাকিয়ে দেখবো আপনার দৃষ্টির ভেতর 
স্মৃতির ভেতর
কোনো শূন্যতা আছে কিনা?

জ্যোতির্ময় মুখোপাধ্যায়

দেখা হবে

এটুকুই তো? তবে দেখার 
সিদ্ধান্তে রেখো কিছু খুচরো আদর

প্রতিশ্রুতি ছিল, অধৈর্য ঊরু
থেকে স্থিতধী নাভি পর্যন্ত আমরা হেঁটে যাব

আমরা চুমু খাব, আমরা
হেলায় হারিয়ে ফেলব যাবতীয় কথা

আমরা ‘কবিতা সামনে রেখে কথা বলব’

উমাশংকর রায়

একটি গেরো ও তার দুই প্রান্ত

সাগরময় দুঃখের মুখ চেয়ে দুঃখীরাম হাসে।
দিনরাত জলে ভিজে। 
সে জলে ডুবে আর ভাসে। 

দুঃখ নিয়ে তার কোনও ভাবনা নেই। সে জানে দুঃখ মানেই অন্তহীন অপার সাগর। অন্তহীন ঢেউ। শুকোবে না কখনও। 

সেই দুঃখীরাম কানাগলি থেকে রাজপথ ঘোরে। আর চিৎকার করে বলে, কে বেঁধেছে এ গেরো?! ডাকো। ধরো তাকে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ কোন বেয়াদপি! এ কী অসভ‍্যতা তার?! 

কাকে বকছে দুঃখীরাম এভাবে ? 
সবাই কান পেতে শোনে। 

মাথায় মুকুট পরে জৈববাদীরা এলেন। মাথা নাড়লেন। গেরোটির আগাপাশতলা দেখলেন। গেরোটির হাত-পা-মুখ-উদর আবিষ্কার করলেন।
কিন্তু তারপর একদিন 
সেই দলটি জাদুকরের মতো শূন‍্যে বিলীন হয়ে গেল! 

আরও অনেকেই এলো 
দুঃখীরামের চিৎকার শুনে 

সাদা বকগুলো উড়ে এসে লাল চঞ্চু ফাঁক করে সেই যে ডুব দিলো জলে - উঠে এলো না ডাঙায় আজও! 
ওরাই বলেছিল, আমরা আসবই। 

শকুনি তার ভাগ্নের চোখে লেজার ট্রিটমেন্টের পরামর্শ দিয়ে ডুবেই মরল। 
পার পেলো না কোথাও। সব শর্ত ডুবিয়ে মারল। 

এভাবেই 
একে একে সব ধসে গেল! 
ধ্বংস হল বন! মৌন পাহাড় ফেটে পড়ল। 
লড়াই হল। যুদ্ধ হল। 
আরও কত-কী হল! 

কিন্তু দুঃখীরাম চিৎকার করে বলে, 
ওরে - বিপ্লব হল কই?! 

চিৎকার থেমে গেলে সবাই দেখে 

গেরোর এক প্রান্তে রাষ্ট্র!
অন‍্য প্রান্তে ক্লান্ত দুঃখীরাম -
পাশে তার আপামর সব সই!

দেবাশ্রিতা চৌধুরী

 নির্মোহ

আমি প্রকৃতি আমি পৃথিবী
আমি আকাশ আমি মাটি
পৃথিবীর প্রত্যেকটি ধূলিকণা আমি 

সম্পর্কের সূঁচে সুতো গেঁথে 
অবিরাম সেলাই করে যাই
আবার ছিঁড়ে যায় আবার 
প্রানপণে জুড়ে দেবার চেষ্টা 
নকশাগুলো শেষ পর্যন্ত 
ছবি আঁকতে ব্যর্থ হাহাকার 
করে সরে সরে যায়...
কুম্ভীপাকের আহ্বানে ভয়ে 
কাতর কন্ঠে মাকে ডাকি
ফিরিয়ে দাও তোমার গর্ভজল
অন্ধকারে বত্রিশ নাড়ি জড়িয়ে 
নির্মোহ হয়ে আরেকবার বাঁচি...

ভবানী বিশ্বাস

যেমন আছি

"পুতুল, ভালো আছ?"
সারাচিঠি জুড়ে শুধু এটুকু কথা...

প্রতিটি বিকেলে পুকুরপাড়ে বসে থাকা
গভীর অপেক্ষায় দিন কাটা 
তারপর বহু অপেক্ষার পর একটা চিঠি!
সেখানেও কৃপণের মতো 
শুধু ভালো থাকার কুশল জানতে চাও...

বাণীদা' ভাল থাকার বাইরে আর কিছু জানার নেই বুঝি?
নাকি চেয়েও বলতে পারো না!

শেষ পর্যন্ত আমাদের কিছুই হল না।
আমরা কিছু গড়তেও পারিনি।
পারিনি কিছু ভাঙতে...
বাণীদা, তোমার প্রশ্ন আর আমার নীরব উত্তরের মাঝে পড়ে আছি।
আমাদের আর এগোনো হল না…

নবীনকিশোর রায়

জোনাকি'র রাত 

জ্বলে নিভে, ভিতরে ভিতরে জ্বলে,নিভে না,
জীবন্ত বোধের ভিতর জোনাকি'র পেটে আগুনের ফুলকি বেঁচে থাকে! 

অমানিশার প্রতি পক্ষকাল 
অন্তর দহনের তীব্রতায়---
আগুন পুষে রাখে,পুড়িয়ে ফেলতে চায় ক্ষুধার্ত সময়ের নাগপাশ---

দুর্বিসহ অন্ধকারাচ্ছন্ন দীর্ঘরাত, 
জোনাক জীবনে কাঙ্ক্ষিত সূর্যসকাল,শতাব্দিব্যাপী কোঠরিতে বন্দিবাস, 
ঠেলে ঠেলে রাতের মিনারে চাপা পড়ে থাকে... 

সুশান্ত নন্দী

মহাবোধি এবং বৌদ্ধস্তুতি

(১)
জোছনা ভাঙা আলোপথে হেঁটে যায় শুধু বৌদ্ধ ভিক্ষুই...

(২)
"তুমি এলেই জোছনা প্রজ্জ্বলিত হবে অন্ধকারে "

(৩)
আমার সমর্পনে জুড়ে দাও অজস্র বৌদ্ধস্তুতি

(৪)
স্তব্ধতায় হেঁটে যাচ্ছি মহাবোধির দিকে

(৫)
তোমার দু চোখের প্রশান্তি আমাকে আলোকিত করে

অমিত সরকার

দু' জন দু'ঘরে  দু' তীরে

জানি না কতটুকু প্রেম,ত্যাগ,সন্মান করেছি
কতরাত জাগতে পেরেছি,
কতদিন ভাবতে ভাবতে ভাব হয়ে গেছে অন্তরের তরল ।
অনেক দূর পাহাড়,দেশ সীমানা নিষিদ্ধ আমার ,সেখানেই তোমার বাস । 
কোন ক্ষন ফিরে তাকাবার সময় হয় নি তোমার,
আমি বারবার মনে করেছি,।
কতগুলি বছর পার হয়ে, নদীর তীরে তোমার সাথে দেখা,
আমার এপাড়, তোমার ওপাড়,
তুমি সে তীরে ভালো আছো,
একবার আমন্ত্রন করনি সে তীরে যেতে,
শুধু ঐ পাড় থেকে  বললে, 
প্রতিদিনের  গৌধুলিতে এসো ।
সন্ধ্যা পাখীদের ঘরে ফেরার ছায়া দেখবো দুজনে দু তীর থেকে ।
পদ্মফুল ভাসতে ভাসতে কোথায় মিলিয়ে যাবো
দেখবো দু'জনে ।
সন্ধ্যা হতে হতে গাঢ় অন্ধকার নদীতে কুয়াশা উঠবে, তরঙ্গ মিলে যাবে নিজের সাথে ।
ফিরে যাবো দু' জন দু' ঘরে  দু'তীরে ।
এক ঘরের বাতি নিভে গেলে ,আরেক ঘরের নিভে যাবে ।
এমন এক গৌধুলি আসবে,  
একজনের সে সময়ে আজ আর  আসা হয়নি 
অপেক্ষা করতে করতে অন্ধকার,
আজ এক  ঘরে আর বাতি জ্বালায় নি ।
ঝড় উঠেছে  এক তীরে,
তবু শান্ত  ঐ তীরে আর  যাওয়া হয় নি ।

মিঠু মল্লিক বৈদ‍্য

শার্দূলী হবো এবার

এই মেয়ে তুই আবার এখানে?
তোর চিৎকারে আজও শিহরণ জাগে গায়ে,
প্রতিটি ক্ষত চিহ্ন জানান দেয়, তোরা শুধু ভোগের বস্তু । চোখের তাজা রক্ত বলে 
মানুষ রূপী হায়নাদের বর্বরতার কথা।

তোর যোনী ভরা আঠালো সাদা রস বলে 
হিংস্র শার্দূলদের যৌন ক্ষুধার বিভৎসতা।
তবুও তুই এখানে? আবারও এসেছিস মেয়ের রূপে।
যেদিন শেষ বিদায় জানালাম,বার বার বলেছি "আর কখনো আসবি এখানে।" তবুও!

বীভৎস দাবানলের মতো জ্বলতে জ্বলতে 
মেয়েটি এগিয়ে চললো আমার চোখের সামনে।
খোলা চুল,চোখে আগুন, হাতে তীক্ষ্ণ নখ
পায়ে রক্ত, কথা শুনে খানিক দাঁড়ালো সমুখে,
আমি নির্বাক।

চিৎকার করে বলে উঠলো 
অন‍্যায়ের সাথে আপোষ করিনি কখনো
আজও না,তাই এসেছি এবার রণরঙ্গিনী হয়ে
প্রতিটি অন‍্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করার অঙ্গীকারে
দেবীতে বিশ্বাস নয়,এবার খড়গ তুলবো নিজ হাতে।

প্রতিটি হিংস্র দূর্বিত্তের মুন্ডশ্ছেদে হবো ক্ষান্ত,
মিথ‍্যার বুকচিরে সত‍্যকে  স্থাপনে,
অন‍্যায়ের মুখোমুখি প্রথম প্রতিবাদে 
আমাকেই পাবে সবার আগে।
হাজার তিলোত্তমার মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে এসেছি আবার।

ঐ যে দেখছো অন‍্যায়ের প্রতিবাদে নারী পুরুষ নির্বিশেষে, রয়েছে রাজপথে 
তাদের নিরাপত্তা দিতে আমি এসেছি রণ সাজে।
এবার যুদ্ধ হবে যুদ্ধ।
আপোষহীন যুদ্ধ। জিততে হবে আমাকে।

হবো শার্দূলী
অধিকার আর নিরাপত্তার দায় নিজের,
প্রতিষ্ঠা করেই আমি হাঁটতে থাকবো পৃথিবীর পথে
নতুন পৃথিবী,যেখানে শার্দূলরা ভয়ে কাঁপতে থাকবে
তীক্ষ্ণ নখের আঘাতে ক্ষত বিক্ষত হবে যৌন ক্ষুধা।

বুঝবে সেদিন বুঝবে 
মেয়েরা ভোগ‍্য নয়,অধিকার আর নিরাপত্তা আদায়ে 
ওরা যুদ্ধ ও করতে জানে।
ত্রিশূল,বজ্র,গদা, খড়গ ওরাও তুলতে জানে
রাত দিন ওদের দখলে নিতে জানে।

Nov 2, 2024

মিলনকান্তি দত্ত

ঘোটালাভৈরোঁ 

শরীর আমাকে বারবার
আঘাত করে,আমিও
তাকে মন দিয়ে
প্রত্যাঘাত করি। কে
কার ঘা খেয়ে মরে! 
ঘুম চিৎ শুয়ে আছে
শরীর উপুড় ঢেলে দিই,
ডার্কসার্কেলের ওপরতলায় 
মিটমিট চোখের আলোয় 
ভেসে আসে ঘুমবাংলো,
শরীরে মৃত্যুর ব্যথা
মেঘে-মেঘে 
         ঘোটালাভৈরোঁ! 
যে যায় সে তার
সময়েই যায়,প্রিয়জন
চলে গেলে আমাদেরই 
অসময় মনে হয়,
সময় তো একটা 
ময়লাখলা নদী,
কখন যে সেটাও বেশ
        প্রিয় হয়ে ওঠে।

মাহমুদ কামাল

প্রিয় ট্রামলাইন

যে জীবন ফড়িংয়ের সে জীবনই আপনার
পরবর্তী দশকে দশকে
আক্রান্ত হয়েছিল নির্দ্বিধায় 
নবীন কিশোর থেকে তরুণ প্রবীণ 
আলোবিপরীত হয়ে অবলীলাক্রমে 
আপনার বৃত্তেই তাদের পঙক্তিনিচয়
তাদের কি আপনি ইশারায় ডেকেছিলেন?
ট্রামলাইন আপনাকে ডেকেছিল কাছে?
আপনি কেন জীবনের দুঃখ নিয়ে? 
হেঁটে হেঁটে অবশেষে প্রিয়ট্রামলাইন....
আপনি নেই কবিতারা আছে
ট্রামলাইন উঠে যেতে আর কিছুদিন

সেলিম মুস্তাফা

হাততালি দিও না

হাততালি দিও না
কানের ভেতর দিয়ে এগুলো আমার
মাথার ভেতরে চলে যায়—
মাথা ঝুঁকে পড়ে, পিঠ বেঁকে যায়,
কুঁজো হয়ে চলা বড় কষ্টকর

হাততালি দিও না

অপাংশু দেবনাথ

জলে তবু ভাসে

কখনো বাগানে ফুল ছিলনা বলেই,
প্রজাপতির অসংখ্য পাখা পড়ে আছে
                     সময়ের অতস-মাটিতে।
ফুল নেই একটাও তবু জল দিই 
ভাবনার ঊষ্ণ-মৃত্তিকায়।

জলের নিজস্ব গন্ধ নেই,
একথা জেনেছি আমি,তোমার প্রণয়ে।

কোন্ গন্ধ মেখে প্রজাপতি ফেলে যায় পাখা?
এখন পিঁপড়েরা সেসব পাখা নেয় টেনে।
                       কেনো যে কষ্ট হয় এমন!
রঙীন ডানায় মানুষের ভালোবাসার মৃতগন্ধে।

বিস্তৃত বাগানে প্রতি রাতে ঘুমোবার আগে,
ভাঙা পাখাগুলো সব জড়ো করে রাখি
                              জল ঢালি, শুধু জল।
এতটুকু জানি জলে তবু ভাসে রোজ
                              অসাম্প্রদায়িক ফুল।

সৌমিত বসু

ঘুম নেই অপেক্ষার চোখে 

পূর্ণতা চেয়েছি আমি। পূর্ণতা অপার।
কোন ফুল থেকে আজ কোন ফুলে যাবো।
অস্পষ্ট রাত্রির কাচ 
ঘসে ঘসে আলো করে তোলা।
কেউ কি ঘুমিয়ে আছে একরোখা মন্দির চাতালে 
ছাদের ওপর দিয়ে উড়ে যেতে যেতে নিশিডাক মায়াবী আলোয় এই ঘোর অবেলায় তোমার পাশেই দেখো ঘুমিয়ে রয়েছে কেউ 
তুমি তাকে আবিষ্কার বলো?
মা বলে যে আছে সে যাবে কেন?
জল ঢালো, জল ঢালো শিকড়ে, ফাটলে 
যেন কোনোদিন ব্যথা এসে জ্বালাতে না পারে কোনো অযাচিত সন্ধ্যার আলো ,
যেন অপরূপ এসে হাত ধরে পার করে মায়ার দুপুর।

অনেক দিনের পর মেয়েরা উড়ছে দ্যাখো সন্ধ্যার আকাশে ,
অনেক দিনের পর 
ছাদের ওপর ,কারা যেন জেগে বসে আছে।

গোবিন্দ ধর

ভোরবেলার গান

চারদিকে স্বপ্ন নিয়ে প্রহরীরা আবার দাঁড়িয়ে পড়বে।ইহাই ইতিহাস।

যদিও ইতিহাস তচনচের যাদু চলছে।যাদুবিশ্বাস নিয়ে এক প্রজন্ম বড় হচ্ছে। তাদের ভেতরে আলো ফেলা নিষিদ্ধ করে দেওয়ার হুলিয়া জারি হয়েছে অলিখিতভাবে। সেমিফাইনাল চলছে।

যদি জিতে যায় যাদুবিশ্বাস তবেই ফাইনাল। ইতিহাস এখান থেকেই হেঁটে যেতে শুনেছি হাঁসুলিবাঁক।

আমাদের বোতলবাতিজ্বলা গ্রামগুলো দাবানলে জ্বলে ওঠে শুধু আলো পৌঁছে দিতে আসেনি কেউ।

অসম্ভব রকম প্রক্রিয়ায় শিশুদের কিচিরমিচির মুছে যাবে এরকম গোলকধাঁধা রচনার পরেও ইতিহাস বারবার নতুন করে জেগে ওঠে নিশ্চিত। 

ভোরবেলার গান লেখবে বলে একদল বালক পুনরায় ইতিহাস রচনার অপেক্ষায় জেগে উঠবে নিশ্চিত। 

কুশল ভৌমিক

জন্মদাগ

ছেলেবেলায় একদিন 
ডান উরুর মাঝখানে একটা কালচে দাগ আবিস্কার করলাম 
মা জানালেন এ আমার জন্মদাগ।
সেই থেকে বহুদিন আমি একাকী বহন করেছি
জন্মদাগের রহস্য 
হঠাৎ জন্মদাগটি আমার কাছে ভীষণ অসহ্য 
আর বিরক্তিকর মনে হতে লাগলো 
প্রতিদিন স্নানের সময় সাবান দিয়ে সজোরে ঘষে 
আমি জন্মদাগটি উঠিয়ে ফেলতে চাইতাম 
মা খুব হাসতেন আর বলতেন--
"লাভ নেই খোকা, জন্মদাগ কোনোদিন ওঠে না"। 

মা নেই,বাবা নেই -অনেক গুলো বছর 
বাবার আঙুলের স্পর্শ 
মায়ের দেয়া চুমুর দাগ 
সদুল্যাপুর গ্রাম,ধলেশ্বরী নদী,শৈশবের রঙ ছড়ানো  ভিটেমাটি আর ঘূর্ণায়মান পৃথিবীর
শরীর জুড়ে লেগে থাকা অন্ধকারের মতো 
'তুমি' নামক একটি দুঃখ 
আজও লেপ্টে আছে আমার শরীরে। 

হে দুঃখ জাগানিয়া 
তুমিও কি জন্মদাগ?

কমল সরকার

খেলনা

হাত ধরে বাবা নিয়ে চলেছিলেন মেলায়।
রাস্তার এপারে আমাকে দাঁড় করিয়ে রেখে 
পছন্দমতো একটা খেলনা কিনে দিতে তিনি
চলে গেলেন অন্য পারে;

তারপর কত গাড়িঘোড়া পার হয়ে গেল সেই রাস্তা বরাবর,
কত শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা পেরিয়ে...
আমি একা একা কত খেলে গেলাম নিজেরই সঙ্গে,
নিজের মন, শরীর, নারী, বিবাহ, সংসার, সন্তান—

তবু
বাবার কিনতে যাওয়া সেই পছন্দসই খেলনাটা পাইনি বলে 
আমি আজও 
রাস্তাটুকু পেরোতে পারছি না

গোপেশ চক্রবর্তী

উল্লম্ফন

একটা কবিতার ছায়া ভাসছে 
রাতের নিঃসঙ্গ বিস্তীর্ণ জলাভূমির শব্দ বাজছে বুকে
অন্ধকার ঢেউয়ের ভেতর জ্বলজ্বল করে ওঠা আলোক বিন্দুর দিকে চেয়ে আছে মায়া চোখে পথিক
দুুরের খাঁ খাঁ রোদে গাছ কেঁটে শূন্য করে ফেলছে চরাচর 
সমস্ত চিৎকার ভেসে যাচ্ছে মহাশূন্যে 
রমণীয়-বাতাসে দাঁড়িয়ে হেলে পড়ছে নদীর দিকে এক নাবিক
প্রেমিকার বিশ্বাস রূপান্তরিত হয়ে যায় ছলে 

ভাষাবিদ বানান পদ্ধতির কথা বলে,পণ্ডিতেরা দেয় নীতির বিধান

বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে দেখছে কান্নার জল
কাঁটাতারেরও একটা নীরব চিৎকার বাজছে কানে
দুহাত শূন্যে তুলে ভেসে যাওয়া ছায়ার আশ্রয় চায় কবি
এই উল্লম্ফনের ভেতর কবিতার শরীর কেঁপে ওঠে 
কবির দীর্ঘশ্বাস ঝরে পড়া পাতার মতো উড়ে উড়ে যায়

রুদ্র মোস্তফা

আমি কোনোদিন প্রেমিক হতে পারিনি 

আমি এক হতে গিয়ে একের ভেতর হয়েছি অসংখ্য
অথচ আমি এককভাবে শুধু প্রেমিক হতে চেয়েছি।
প্রেমিক হলে নিশ্চয়  হত্যা করতে পারতাম না তনুকে
নিশ্চয় বিচার করতাম ত্বকী কিংবা সাগর-রুনি হত্যার
অমন দাউ দাউ আগুনে পুড়িয়ে মারতাম না নুসরাতকে
কিংবা আটকে দিতে পারতাম মুনিয়ার মৃত্যুও।

আমি প্রেমিক হতে গিয়ে হয়েছি ডাক্তার
আমার হাতেই বদলেছে মৃতের ময়নাতদন্ত— 
আমিই হয়েছি সাংবাদিক অথবা পুলিশ অফিসার
আমার হাতেই ঘটনা ঘুরেছে ভিন্নখাতে— 
হয়েছি ইঞ্জিনিয়ার,ভবন ধসিয়ে মেরেছি মানুষ
আমিই হয়েছি শিল্পপতি, হয়েছি খুব বড়ো আমলা 
আমি প্রেমিক হতে গিয়ে হয়েছি উকিল
জজ,ব্যারিস্টার অথবা আর যা যা হওয়া যায় 
তার সবই হয়েছি— শুধু প্রেমিকই হতে পারিনি।
কেননা, প্রেমিকেরা হয় অন্যরকম 
তাদের বুকের ভেতর থাকে প্রেম,থাকে নিজস্ব শ্রম 
হৃদয় খুঁড়ে তারা উত্তোলন করে মুঠোভরা মায়খনিজ 
প্রেমিকদের হতে হয় ভীষণ রকমের শ্রমিক।
আমি কোন দিন প্রেমিক হতে পারিনি  । 
মোহ দিয়েছে বাধা,ক্ষমতা আটকে দিয়েছে পথ—
অথচ আজীবন আমি শুধু প্রেমিক-ই হতে চেয়েছি!

সুমনা রায়

বাহাদুরি 

খুব বিখ্যাত এক জন্মদিন ভুলে গেলে 
বাবা একদিন কিছুটা রেগে বলেছিলো  
ভুলে যাওয়ার মধ্যে কোনো বাহাদুরি নেই 
তখন মাথা নিচু করে মেনে নিয়েছিলাম 
এক শীতসকালে পড়তে বসে বারান্দায় 
নরম রোদের সঙ্গে খেলছিলাম
মা রেগে বলেছিলো ফাঁকি দিচ্ছ দাও 
জেনে রেখো ফাঁকি দেওয়ার মধ্যে 
কোনো বাহাদুরি নেই 
আমি সেদিনও মেনে নিয়েছিলাম
তোমরা দুজনই যে যাঁর সময়মতো 
ছিঁড়ে দিলে সুতো, গুটিয়ে নিলে লাটাই  
তোমাদের স্নেহডোরে মাখামাখি জীবন 
ভুলে এই দ্যাখো দিব্যি আছি বেঁচে 
আকাশের চোখে চোখ রেখে বলি 
ভুলে যাওয়ার মধ্যেও বাহাদুরি আছে
যেমন আছে নিজেকে ফাঁকি দিয়ে বাঁচার মধ্যেও۔۔۔

Oct 18, 2024

চন্দন পাল

ডালাক

অমরপুর ছুঁয়ে দু'ক্রোশ দক্ষিণে গোমতী ডিঙে ডালাক বাজার,
জাতি উপজাতি কাউমারা ঘিরে মালবাসা থালছড়া  সবুজ বাহার।

নদী চর মাটি,  সবুজ পাহাড়,  অন্ন যোগায় প্রতিদিন, 
সহজ সরল জীবন কাটে পড়াশোনা চাষবাস ক্লান্তি হীন।

জেলে তাঁতী ডাক্তার মাস্টার সকালব হলেই কাজে জুটে।
ধান পাট আখ রাবার    সোনার ফসল জুড়ে হাটে।

ডালাক ছুঁয়ে তীর্থমুখ গণ্ডাছড়া চণ্ডীবাড়ি ছবিমুড়ায় ছুটে গাড়ি,
দেখবে এসো পৌষ সংক্রান্তি,  স্বজন ভরা ডালাক বাড়ি। 

নবীনকিশোর রায়

ফেকাশে ছবি 

মোড়ে এখানে সেখানে
বড় রাস্তায় ছবি থেকে রঙ
চুইয়ে পড়ছিল একসময়! 

উপর উপর মিশে যাচ্ছিল
জোয়ারে নরম গরম ভীড়
ওয়ার্ড ভিত্তিক দালালি মারফত... 

বেশ কিছু বছর যাবত 
ঘরে ঘরে  চুল্লির ভিতর 
জমাট বাঁধা ছাই স্তূপে 
চাপা পড়ে থাকে---
কয়লার বুকে আগুনের অবশেষ... 

মাথায় ভূত চেপে বসলে, 
ফেকাশে ফাটা ছবি লক্ষ্য করে
সুখ তলদেশ খয়ে যাওয়া চটি, এসে আঘাত করে---
জুড়ে যায় রাগী যুবকের নাম! 

মিঠু মল্লিক বৈদ‍্য

ইচ্ছে করে খুব

আমার মাটির কাছাকাছি আসতে ইচ্ছে করে খুব,
কাঁদা মাখা পথ ; খোলা আকাশ 
নিঝুম মধ‍্যাহ্নে দূরের পারে ক্লান্ত পাখীর গান,
সুখ ঘুমের মায়াবী আহ্বান,
হারাতে  চায় মন বারে বারে শতবার।

সবুজের ভাঁজে বিছানো আবেগ,
মিষ্টি স্মৃতির হাতছানি,
আলপথে বিছানো ক্লান্ত আঁচল,
একা দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছটির নীরব চাহনী,
তাঁতী পাখীদের অনন‍্য  বুনন, ভীষণ কাছে ডাকে।

আমার জন্মভূমির সেই চেনা গন্ধ,
পুকুর পারের রসালো আমের স্বাদ,
নদীর বুকে বয়ে চলা রোদেলা দুপুর, সোনালী ধানের মোহিনী রূপ, নকশা কাটা ধানের ক্ষেত,
কাছে ডাকে নকশী কাঁথার মাঠের মতন।

আবেগের বেচাকেনা করতে করতে
আমি ক্লান্ত পথিক এক, সময়ের হাতে 
বিকিয়ে যাওয়া শহরতলীর ঝলমলে আলোয় আর কংক্রিটের চার দেওয়ালের আবদ্ধতায় ক্লান্ত আমি।
মাটির কাছাকাছি আসতেই ইচ্ছে করে খুব।।

বিপ্লব উরাং

মানুষগিলান বদলে যাছে

মানুষগিলান ক্যামন জানি।
দিনকে দিন বদলে যাছে।
আপন মানুষ সটকে যাছে। 
ভালবাসার ভরা কলস 
দিনকে দিন শূন্য হছে। 

ছোট্ট কন আঘাত হলেই 
ক্যামন জানি হয়ে যাছে।
সব কিছুতেই লাভালাভের হিসাব খোঁজছে। 

ভুলায় যাছে।-
কত কষ্ট করে গড়ে ছিল দুইটা শব্দ ---ভালবাসা। 
ছোট্ট থরা আঘাত হলেই 
সটকে যাছে। 

এত আপন,তবু ক্যানে জানি
দুর দুর মনে হছে।
মানুষগিলান বদলে যাছে।

চয়ন,ভুইল্যা গেসলাম।
দেরি হইয়া গেসে।

নন্দিতা ভট্টাচার্য্য

শুধু নিজের জন্য 
         
তোমার মঙ্গল কামনায় 
অনেক পূজা অর্চনা করেছি,
    রেখেছি কত ব্রত 
      কত উপবাস
    কত নিয়ম নিষ্ঠা,
নানা রঙের সুতো মাদুলি বেঁধে
     ধরে রাখতে চেয়েছি
           ভালোবাসা -
সে তো ছিল না মোটেই 
    উপোসী দেহে মনে 
ছিল শুধু উপেক্ষা আর অপমান-
হিমবাহ অবশেষে নেমেআসে
অকেজো বাঁধন সব ছিঁড়ে যায়

এখন আর উপোস করিনা,
ধর্মের, সমাজের কোনো দায়ভারও 
    ‌‌  আর নেই।
এখন আমি বাঁচি 
শুধু নিজের জন্য-

সপ্তশ্রী কর্মকার

সম্পর্ক 

সম্পর্ক একটি ধান,
বছরের পর বছর পরিচর্যায় 
তা প্রস্ফুটিত হয়ে চারা জন্মালে
চারদিকে বিস্তীর্ণ হয় লতাপাতায়
 
সম্পর্কের মিথস্ক্রিয়ায় অজস্র 
পাপ পুণ্যের পাঁচমেশালি জীবনে 
কে কখন সংসারী ফোড়ার আঘাতে
বাইসনের দেহে ফিরে যায় 
তা অজানা!
অথচ যার কাছে এত ঋণী
কেউ যেতে চায় না সেই শিকারি জীবনে

রাহুল শীল

 তবুও 
     
আমাকে ঘৃণা করে ঘুরেছো
        দেশের পর দেশ,
        শহরের পর শহর,
        গ্রামের পর গ্রাম
আমাকে ঘৃণা করে পেয়েছো
তোমার মনের মতোই শূন্যতা।।

সঞ্জয় দত্ত

 স্পর্শ

তুমি আমার সামনে বসলে
মন শান্ত নদী হয়ে যায়,,
তার উপর সেতু বাঁধি বাষ্প দিয়ে।
আর সেই সেতুর নাম হয় হৃৎপিণ্ড,
সেখানে যাতায়াত করে একটা সংসার, জীবন, পৃথিবী।
যেদিন স্পর্শ করেছিলে বুক 
নাভিমুল ছিড়ে সেদিন জন্ম নিয়েছিল একটি গোলাপ।
পাপড়িতে লেখা ছিল অনেক গুলো লেখা,
আমি আলাদা আলাদা করে এক একটির নাম দিয়েছি কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ!

মীনাক্ষী চক্রবর্তী সোম

হারানো শৈশব

অলস বিকেলে সেদিন একা ছিলাম দাঁড়িয়ে
আজন্ম লালিত নদীমাতৃকার চরে।
পাথুরে আঘাতে আহত নদীটি এখন শান্ত
তীরে ধানখেত নিয়ে ঘোর সংসারী, সংযত।
সূর্যডোবার আগে অস্তরাগ ছড়িয়ে 
মায়াময় রঙ হানে হৃদয়ের গভীরে।
নিস্তরঙ্গ নদীর বুকে শব্দহীন শান্ত অভিমান 
কানে কানে বলে গেল হারানো শৈশবের গান।
স্থিরবিন্দু হয়ে দূরে দাঁড়ানো অটল গাছটিতে  
খুঁজে ফিরি হারানো সময় ঝাপসা দৃষ্টিতে।
দুধ সাদা বকের দল ধ‍্যানমগ্ন তপস্বী 
দূরত্ব মাপে শিকারের জলে রাখে স্থিরদৃষ্টি  
অবচেতনে নদীর চরে দাঁড়ায় ছোট মেয়েটি।
জলকেলি করা এক শৈশব আমি তখন দেখছি, 
নিখাদ ভালোবাসায়, মমতায় জড়ানো কৈশোর
জলের গভীরে ডুবসাঁতারে তালাশ চলে রঙের ।
হারিয়ে যাবার খেলা খেলে বিনিময় করি শৈশব
আগে যদি জানতাম অনাবিল শৈশবের বৈভব!

চন্দ্রা বিশ্বাস

 দায় 
                
সবটুকূ আবেগ, সবটুকু অনুভূতি ধুয়ে মুছে 
মোম জ্বালিয়ে আঁধার কাটাই, 
কালো বৃত্তের পরিধি দীর্ঘ হলো আরও খানিক। 
মনেও  লোডশেডিং? জানতে চাইলে তুমি।
শীত নেমে এল পলাশে-কিংশুকে 
ব্যথা লুকোই আপোষের পশমের ওমে ।
স্মৃতিকে সময়ের গর্ভে পুনর্রোপিত করে ,
প্রসব যণ্ত্রণা গিলে ফেলি। 
কালো মেঘ আর নীল আকাশ 
তখন মিলেমিশে একাকার।
 কৃর্ত্রিমতার দাউদাউ দাবানল,  এক ফুঁ এ নিভিয়ে,
মন তখন মেঘদূতের ভূমিকায়। 
ব্যথা-যন্ত্রণায় নুয়ে পড়া, আবেগ অনুভূতিহীন একটা মন, 
মোমের আলোয় সে মলিনতা মুছবে তো?
ঈষৎ মাথা হেলিয়েছি, 
বোঝা -পড়ার দায় এখন তোমার। 
           

রীতা চক্রবর্তী ( লিপি )

 পারিজাত সঞ্চয়

মাঝে মাঝেই মনের ভিতরে 
অনেক শব্দেরা এসে ডানা ঝাপটায় 
প্রকাশের ভাষা খুঁজে ফেরে....
তারপর নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাসে
কথাগুলো হারিয়ে যায় 
পারিনা তাদের ভাষা রূপ দিতে 
তছনছ হয়ে যায়।

হঠাৎ ফ্ল্যাশব্যাকে ভেসে ওঠে
ওপারে দাঁড়িয়ে আছ আবছা 
চেহারা নিয়ে 
কুয়াশার মাঝে দেখা 
সূর্যের মত।
আপাত আলোয় তোমায় দেখি 
নিঃশব্দের ঘোর কাটে বাতাসের শব্দে।

আফশোস, একবার শুধু একবার 
যদি ফের দেখা হতো 
না বলা কথাগুলো উগরে দিতাম 
জ্যোৎস্নাস্নাত স্বপ্নময় রাত
একাকিত্ব মুছে দিত আমার,
মনে হয় বুকের ভিতরে জমে থাকা 
কথাগুলো সব পারিজাত সঞ্চয়।

রিপন সিংহ

 নাবিক (৩)

হে নাবিক
যেয়ো নাকো আর
পাবে না হৃদয় তার
যেয়ো না
যে'য়ো না
সন্ধ্যার সাগরে
যামিনীর তারাদলে
যেয়ো না তুমি 
তার মনের গভীরে।
থেমে যা 
থেমে যা
এ'বার একটু থেমে যা
তারপর আবার যা।

নৃপেশ আনন্দ দাস

দেয়াল ঘড়ি

মানুষের মনে যখন রাজনৈতিক ভয় জন্ম নেয়,
তখন দেয়ালের কান জন্মায় ।
অথচ এই দেয়াল ধরেই হাঁটতে শিখেছি, এই দেয়াল ধরেই হেঁটে যাই ক্রমাগত,  --- ''এখানে আমার নিজস্ব বলে কিছু নেই" এই শব্দগুচ্ছকে বিশ্বস্ত ধরে নিয়ে হেঁটেও যাবো ক্রমাগত ।

সুজন দেবনাথ

ক্ষত

নদীর বুকের উথাল পাথাল 
ঢেউ দেখেছি কতো,
দুকুল ভাঙার কাঁদন শুনেছি 
সয়েছি অজস্র ক্ষত।

দুচোখ মেলে দেখেছি কেবল 
সাধ্য ছিলোনা রোধ,
নিজের করে রাখতে পারিনি 
কেড়েছে সকল বোধ।

জীবনের ভুল ছাপিয়ে দুকুল 
বিলীন অথই জলে,
পথ ফুরালেই ফুরাবে যাতনা 
ডুবে যাবো অতলে।

ঝিমলি আচার্য্য

বর্ষা সাজে 

বর্ষা এলো বর্ষা এলো 
ও মাঝি ভাই নৌকা খুলো ।
দূর আকাশে মেঘ করেছে 
যাবে যদি জলদি চলো ।
ও পারেতে দুর্গা দিদি
তুলছে খাঁচায় সবজিগুলো ।
মা এর মুখে খাবার দিতে
ঠায় দাঁড়িয়ে ছেলে ভূলো ।
সূর্য্যি মামা বলছে ডেকে 
ঘরে ফিরো ঘরে ফিরো ——
মেঘেদের রক্ত চক্ষু 
                আমায় বিধলো ।
উৎসবে দেখো মেতেছে মেঘেরা
চারিদিকে কোলাহল ।
চাষিরা সব ঘরে ফিরছে 
কাঁধে নিয়ে লাঙল ।
মাঠে বসে দুর্গা দিদি করছে 
প্রার্থনা ,ঢেলোনা বেশি জল 
শান্তনা দিয়ে চলে যেও তুমি ,
চরণে রাখবো শতদল ।
বিদ্যুৎ চমক মেঘের গর্জন 
বর্ষার আকাশ আজ রণাঙ্গন ।
মাঝি কাকা তুমি মাকে নিয়ে 
এসো হাওয়ায় খেলছে জল ।
আম বাগানে গড়াগড়ি যায় 
কতশত আম্রফল ---
দেখতে ভীষণ লাগছে ভালো 
কুড়াতে চাইছি বৃষ্টি এলো ।
জেলেরা সব খালে বিলে 
জাল পেতে অপেক্ষায় রইল ।
বর্ষা মোদের এমনি হাঁসায় এমনি 
কাঁদায়, জল ঢেলে প্লাবন ঘটায় ।
 কিনারার খোঁজে হাবুডুবু
 খায় অসহায় জীবের দল ।
বর্ষা মাঝে সুখ দুঃখ চলতে 
                     থাকে অবিরল ।
কিন্তু প্রকৃতিই মোদের শেষ সম্বল ।

খুকুরানী দে

দেহ কষ্ট 

শরীর স্বাস্থ থাকে না নিজের অনুগত
কেমন করে বল জীবন করি গত?
যাপিত জীবনে তো থাকে আর ও কত
বেদনা, হতাশা, দুশ্চিন্তা অবিরত।

ইচ্ছে করে আনন্দ উল্লাস করে
থাকতে বাঁচতে জগত মাঝে,
ভয়ানক ব্যধি জটিলতা রোগের
অভিশাপ যে বড় বাজে।

বিষাদ পুর্ন জীবন হয়ে যায়
ধূসরময় মোটেও নয় সুখকর,
আছে এক ভয়ানক মানসিক 
স্বাস্থ সমস্যা অতি ভয়ংকর।

মোরগ ডাকা শেষ প্রহরে
ঘুম যে ভেঙ্গে যায় ওরে ,
রোগ ভোগ দুশ্চিন্তার সব শত্রু 
সৈন্য মোরে ধরেছে ঘিরে।

সংসারের রণক্ষেত্রে আমি
এক পরাজিত সৈনিক,
পালাবার ও উপায় নেই
অবরুদ্ধ সব দিক।

বিষন্নতায় জাগে প্রাণে
আত্ম দহনের প্রবণতা,
পরাজিত জীবন যাপনে কভু কভু
এসে যেতে চায় পরাভবতা।

বিষক্রিয়া পেয়ে বসেছে দেহে
যেতে চায় নাকো ছেড়ে,
তবুও বাঁচতে চাই আমি
সন্মানের মৃত্যু কামনা করে।।

রমা চন্দ্র

অরূপজ্যোতি

আমরা হারিয়ে যাচ্ছি দ্রুত লয়ে 
অপেক্ষারত কাল প্রলয়ে...,
ছন্দহীন দিশাবিহীন পার হচ্ছি...
সকাল দুপুর সাঁঝ নির্ঘুম রাত...!

গতিহীন অনাহারী প্রাণের
দুখের হাহাকার... 
শব্দহীন করে-
বিত্তশালীর সুখ-চিৎকার!

অবাধ্য বাতাস শুষে নেয়-
নগ্ন দেহের দীর্ঘশ্বাস...,
তীব্র দহনে ঝরা পাতায় লাগে আগুন...
দাবানল রূপে পোড়ায় অযাচিত ফাগুন!

হর্ম্য প্রাসাদ পাষাণ অন্তর
লীন হয় মহাকাল স্রোতে...
প্রান্তে অপেক্ষায় 'অরূপজ্যোতি'
হাতে অমল পরশ বাতি!

শৈলেন দাস

মিলি

তুমি হয়তো ভুলেই গেছো
আমার দেওয়া প্রীতি তবুও
আমি কলম ধরে লেখি
তোমার সাথে জড়িয়ে 
থাকা শত সহস্র স্মৃতি

তুমি হয়তো ভালোই
আছো আমায় ছাড়া বেশ
বিচ্ছেদের এই যন্ত্রনায় 
আমার জীবনে শুধুই এখন ক্লেশ

দীপান্বিতা পান্ডে

হিসাব

আমরা সকলেই বলতে চাই
কিন্তু শোনার ইচ্ছা করোর নেই ৷ একটু শুনতে শিখি
বলুক না সে
যা বলতে চাই কম কিম্বা বেশী। 
তাহলে আমার টাও তো বলা হয়ে যায় অনায়াসে
আকারে প্রকারে দৃষ্টির
 ভাবাবেগে। 
বলার পরে একটু থামা তাহলে তো প্রসঙ্গ টা গুরুত্ব পাই অনেক বেশী। 
কিন্তু না অভ্যাসটার বড্ড মেজাজ
শোনেনা কোনো শাসন বারণ
বলেই চলে নিজের মতন করে। 
অন্যের যে বলার থাকে 
সেই কথাটি আসেনা কখনও মনে। 
শোনা আর বলা দুটোই বড্ড হিসাব মেনে চলে। 

শর্মি দে*

বিলম্বিত আক্ষেপ

প্রতিবারই আসে সে ঋতু সে মাস সে ক্ষণ
আর সেই পলে জেগে ওঠে উপবাসি মন
খানিক অপেক্ষা আর অনেকখানি উপেক্ষা মিলে
উদযাপনের হিড়িক!
একাধারে সুখের বৈশাখী পথ...
মাঝধারে পলাশের গায়ে রক্তের ছোপ 
শেষটায় বিদ্রোহীর !
তবুও আলপথ বেয়ে কৃষ্ণচূড়ার মিছিল--
কিছু পাপড়ি উড়ে যায়! কিছু, আরো লাল হয়!
ঝড় দাপট ঘুর্ণি---
খোঁপায় কৃষ্ণচূড়া, প্রেম ফুটে ওঠে!
উনিশ চলে গেছে তবুও রয়ে গেছে আক্ষেপ--

সাগর শর্মা

চুম্বন

আমার সামনে যখনই মেমসাহেব হয়ে বসেছ
বাঁ হাতে ঘড়ি দেখে
ডান হাতের স্মার্টফোনে রেখেছ চোখ
ইচ্ছে ছিল
তোমার হাতে ধরে চুম্বন করার

সুমিত রঞ্জন আচার্য

এক দোয়াত রক্ত পেলে

এক দোয়াত রক্ত পেলে-
এবং কিছু সাদা কাগজ,
লিখা যেত বিমূর্ত সব বিপ্লবের কথা!
অরাজনৈতিক আখ্যান,
বৃষ্টিহীন কৃষি জমিতে-
উদোম গায়ের কৃষকের কবিতা!
এক দোয়াত রক্ত পেলে-
শহরের অলিতে গলিতে আলপনা আঁকত সেই বখাটে প্রেমিক তার প্রেমিকার ফুলশয্যার রাতে!
লেখা হতো জীবনি শতক 
সমস্ত রুগ্ন যৌনকর্মীর
যারা অন্ধকারে দাঁড়ায়
সাদা ভাতের গন্ধ নিতে,
 
এক দোয়াত রক্ত পেলে-
বিষণ্ণ প্রেমিকা চিঠি লিখত
শহরের সমস্ত দৃশ্য দূষন বিজ্ঞাপণের ব্যানার জুড়ে,
তার সেই অসমাপ্ত চিঠিরা
কবিতা হয়ে ঝরে পরতো..
প্রতিটি বাড়ির দরজায়
প্রভাতী পত্রিকার ভাঁজে ভঁজে!
এক দোয়াত তাজা রক্ত পেলে
আমিও এঁকে নিতাম ভোরের সূর্যকে 
এক অদ্ভুত লাল রং-এ!

Jul 2, 2024

মিলনকান্তি দত্ত

সূচ্যগ্রমাটির যুদ্ধে

আমাদের সদাপ্রভু তাঁর ন্যাংটোলীলায়
মাটি খেয়েছিলেন। গোপালের মা
উলঙ্গের হাঁ থেকে যতোখানি মাটি
বের করে এনেছিলেন,ততোখানিই
আমাদের গোবর্ধন,অন্নকূট,
        ইজরাইল - গাজাউপত্যকা। 

বহুব্রীহিবনে আমাদের সিন্দূরবর্ণের
নারীরা যায়। মুখের ভিতর উলু উলু
রসনা নেড়ে গীত গায়। ওলো ধানপাতাসই
আজ তোর গর্ভসংক্রান্তি,আশ্বিনে রেঁধে 
কৃত্তিকার পাতে আমরাও খাব
          মাটির মৃত্তিকা।

সূচ্যগ্রমাটির যুদ্ধে এক সত্যার্থীর রথ নাকি
মাটি স্পর্শ করত না, উচ্চারিত
মিথ্যের চাকা একদিন মাটির বুকে
নেমে এসেছিল? বুঝি না
বাংলাভাষা, যাপনের এমন শূন্যগানকে
কেন যে মাটি হয়ে যাওয়া বলে!

সৌমিত বসু

তুমি চলে যাওয়ার পর

এই পথে রোজ ডাক দিয়ে যায় বিষণ্নতা । এই পথে রোজ আমদুধরঙা চাঁদের সাথে দেখা হয়। গা বেয়ে নেমে আসছে কেউটের লম্বা খোলস। ইঁটের ভাঁজে জন্ম দেবে বলে প্রস্তুত হয়ে উঠছে অনুষঙ্গ। মেঘগুলো পাথরের ভঙ্গিতে নিঃসাড়। শুধু জন্মদিনের আতঙ্কে আনন্দকে মোচড় মেরে বেরিয়ে আসছে বিষণ্নতা। লালচে পাতাগুলো থমথম করে জেগে উঠছে খিদেয়।

একটা প্রকান্ড মাঠ। মা-হারার মতো সারাটা বুক ধু -ধু নিঃসাড় , কতজন্ম পর চোখ মেলছে হাতের ইশারায়। এই পথ জুড়ে বিষণ্নতা ডাক দিয়ে যায়। এই পথ জুড়ে পাতা ঝরে। তার মর্মরিত অশ্রুদাগ লেগে থাকে পথের ওপর। এই পথ বেয়ে কতজন চলে গেছে নতুন বউয়ের সাথে। এই পথে মা পুড়িয়ে ফিরেছে অনেকে । উপুড় কলসি থেকে ফোঁটা ফোঁটা বিষণ্নতা মিশে যায় ধুলোর পরতে। আমি দেখি।

রাত যত ঘন হয় ছায়াগুলো দীর্ঘ হয় তত। পাতা বেয়ে অশ্রু ঝরে পড়ে। মাথার ওপর ঘুরে ঘুরে বেজে চলে অসহ্য চিৎকার। খসখস শব্দ তুলে পায়ে পায়ে কারা যেন আসে। তোমার নামের পাশে আহত অক্ষর। এই অক্ষর গেঁথে তৈরি করা ছাদে বিষণ্নতা পতাকা ওড়ায়। 

অর্পিতা আচার্য

আয়ু 

সন্ধ্যার বৃষ্টিতে ভেজা চায়ের দোকানে 
তোমার সিগারেটের ধোঁয়া 
দু-পয়সার কবিতা লিখে মনে মনে 
আমি তোমার বন্দনা করি 
চুলের গুঁড়ো গুঁড়ো জল মুক্তাভ্রম হয় 
পুরুষের জন্যেও এমন হতে পারে সে কথা পুরুষ জানেনা 
তারা নিজেদের বুদ্ধিমান ভেবে অস্ত্র তৈরি করে 
বাতিল নারীর মুখের ওপর ছুঁড়ে দেয় ধোঁয়া 
প্রত্যেক এপ্রিল মাসে নতুন তাজা ফুল তুলে 
উপহার দেয় অন্যান্য কাউকে 
বদলে বুকের ভেতর বিষ ভরে নিয়ে 
পুরোনো নারীটি তার অসুখের ভাগ নিয়ে নেয়-
আর সামান্য আয়ু ফেরত পেয়ে পুরুষটি
নতুন ধোঁয়ার রিং ছড়ায়।

অশোক দেব

দেবীস্তোত্র

নদীটি তমসালীন, করপুটে অন্ধকার 
এনেছি, এনেছি বীজ। বৃক্ষরাজি শুদ্ধতার 
কথা বলাবলি করে, শুনি। অত কি জানা ছিল? 
আমি তো এসেছি ভুলে, কারা পথ বলে দিল 
ভুলে গেছি বেমালুম।

অন্ধকার। কেবল তোমার 
যোনিদীপ জ্বলে - 
আকাশের নক্ষত্রের তলে।
মুণ্ডমালা দেখি, আমারই
অযুত মুণ্ডের মালা- 
ওদিকে সরিয়ে রাখো 
যাবতীয় হত্যালীলা।

শুয়েছি অবান্তরে, শিশ্নদোষ অভ্রে তুলে। 
এসো দেবী আলো দাও। রক্ত, হত্যালীলা, ভুলে 
পদভারে দেহের শেষে যে দেহটি তিরতির 
তাহাকে দলিত করো, শবাধিপত্নী, গম্ভীর 
মৃত্যু দাও অন্তিম সঙ্গমে।

কুশল ভৌমিক

আইডেন্টিটি কার্ড

এই মাটিতে প্রোথিত আমার হৃদয় 
আমি ভূমিপুত্র এই পৃথিবীর। 

আমার গলায় ঝুলছে আইডেন্টিটি কার্ড
ভিসা অফিস সেঁটে দিচ্ছে রাষ্ট্র পরিচয় 
ধর্মজাজক পুরোহিত নির্ধারণ করছে গন্তব্য
আমি সংকুচিত হচ্ছি 
ক্রমশ গুটিয়ে যাচ্ছি নিজের ভেতর। 

আমার কণ্ঠ বাজেয়াপ্ত 
মুখস্থ অভিব্যক্তি ছাড়া
নিজস্ব কোনো কথা নেই
নিজস্ব কোনো ক্রোধ নেই
নিজস্ব কোনো বেঁচে থাকা নেই।

আমার জন্ম হয়েছে বহুদিন আগে
আমার মৃত্যু হয়েছে বহুদিন আগে
আমি পেরেক ঠুকেছি আমার কফিনে 
নিজের কাঁধে তুলেছি নিজের লাশ 
নিজের সমাধির সামনে 
গোলাপ হাতে দাঁড়িয়ে থেকেছি বহুকাল 
একনজর নিজেকে দেখার আকাঙ্ক্ষায়।

আমার শরীরে আটকে থাকা লবণ 
কোনো এক কবি ভালোবেসে সমুদ্র বলেছে
আমার পাঁজরে আটকে থাকা অন্ধকার 
গল্পকারের কলমে হয়েছে জীবন 
অথচ আমার ব্যক্তিগত কবর 
যার ওপর রক্তবর্ণের গোলাপ 
বিদ্রুপের হাসি দিয়ে  দিনরাত 
হয়ে গেছে প্রিয়তম স্বদেশ 
মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা মাতৃভূমি। 

এইখানে প্রোথিত আমার হৃদয় 
অথচ খুব সহজেই অখন্ড আকাশ অতল সমুদ্র 
আদিগন্ত শস্যের মাঠ 
হতে পারতো আমার বসতভিটা 
এই পৃথিবী হতে পারতো আমার মাতৃভূমি। 

যারা কেড়ে নিয়েছে আমার আদিগন্ত জলের শৈশব 
আমার শরীরে গেঁথে দিয়েছে বিভৎস যুদ্ধের ভৌতিক চিহ্ন
মন্দির মসজিদ প্যাগোডায় বন্দী করেছে আমার ঈশ্বর 
আমার হাতে তুলে দিয়েছে বিরাম চিহ্নের অবিরাম আর্তনাদ। 

আমার প্রেমিকার টুকরো হওয়া স্তন
পিতার প্রলম্বিত চিৎকার 
এক টুকরো কাফনের কাপড় হয়ে
দুলতে থাকা মায়ের সাদা থান 
আমাকে ঘুমোতে দিচ্ছে না। 
যীশুর পুনরুত্থানের মতো 
আমি উঠে এসেছি কবর থেকে 
অভিশাপ দিচ্ছি অবিরাম 
মৃতদের ভাষায় লিখছি কবিতা। 

কবিতা কোনো আনন্দ ভ্রমণ নয়
কবিতা এক মহিমান্বিত বিপ্লব 
জীবিতদের মতো নতজানু নয়
তবু মৃতদের কবিতা দুর্বোধ্য? 

অথচ মৃত্যুর পর জেনেছি 
মৃত্যু অযাচিত এক বিরাম চিহ্ন 
ওইখানে সারিবদ্ধ আমার লাশ 
গলায় ঝুলছে আইডেন্টিটি কার্ড...

গোবিন্দ ধর

কবিতা আমার একমাত্র পতাকা 
এবং 
সময়ের পাঁচালী 

এত বুঝে কী হয়
কী হয় বুঝে?
এখন সৎ ও স্বচ্ছতা 
আছে মুখ গুঁজে! 

এক অদ্ভুত নিরবতা 
আমাদেরে গিলে খায়।
এই-ই কি পরিনতি 
রাজা ও প্রজায়?

বাঁচা ও বেঁচে থাকতে 
কত কী কসরত। 
রাম আর রাবণ
কই হ্যাঁ দশরথ? 

সত্য বলার সাহস
বড়ই সংকুচিত। 
মিথ্যা এসে গ্রাস করে
সত্যের ইমারত!

দিক্বিদিক হাহুতাশ 
মানবতা নেই। 
নিজেই নিজের জন্য 
যুদ্ধ যুদ্ধ খেই।

সন্যাস বেরাম নিয়ে এত ভয়ের কী।এ রোগ নতুন নয়। সকলেই কমবেশি কোনো না কোনো রোগাক্রান্ত।হোক সন্যাস।কিংবা সাঁই।আসলে সমস্ত রোগই মুক্তির পথ খোঁজা।কিন্তু মুক্তি কী কোথাও আছে বন্ধু।কবিতাই পারে প্রকৃত ভালোবাসা ও মুক্তি নামক পাখিটির নিকট পৌঁছে দিতে। 

কবিতা আমার একমাত্র পতাকা।আর কোনো রঙ নেই।রঙচঙ মাখি না আমি।আমিই আমার রঙ।নিজের পতাকা আমি নিজেই বহন করি।আমার কোনো তল্পিবাহক নেই। শববাহী গাড়ী নেই। শবযাত্রা নেই। দেওজলে ভেসে গেলেও ক্ষতিবৃদ্ধি নেই। শূন্য থেকে শুরু হয়ে শূন্যে বিলীন হতে আপত্তি নেই। আমি শূন্য। আমার কোনো সংখ্যা নেই। সকলেই আমার।আমার আমার বলে আমি করতালি দিই না।কবিতার কাছে যাই।কবিতা আমার পতাকা ও  নগ্নতা ঢেকে রাখার একমাত্র অস্ত্র। ধারালো না হোক তবুও শান দিই খাপখোলা তলোয়ার। 

কবিতার নিকট সঁপেছি নিজেকে। কত বন্ধু আপন হয়ে ঘরে ঢুকে সিঁদকেটে হুকুতৈসার গভীর জঙ্গলে হারিয়ে গেছেন সে হিসেব রাখি না। কারণ আমি নেগেটিভিটির তীব্র রশ্মির সাথে মিতালি করি না।সকল ধ্বংস স্তুপ থেকে তুলে আনি আবিস্কারের মুদ্রা। আগুন নিভে গেলে নিশ্চিত জানি জুমের ভেতর থেকে লকলকে লাউডগা বেতলিংচিপ ডিঙিয়ে লঙ্গাই পেরিয়ে যাবে হাকমরাজার দেশে।দেশটেশ মানি না।ভূগোল মানি না।কবিতার কোনো মানচিত্র নেই। দশক নেই। শূন্যতা নেই। কবিতা আসলে বিচ্ছেদ বাড়ায়।কিন্তু বিচ্ছিন্ন করে না। গেঁথে রাখার কৌশল কবিতার অন্তরে অন্তঃসলিলা ফল্গুর মতো প্রবাহিত। যে বুঝে সে বুঝে।সে-ই লালন।গভীর অন্তর্ভুক্তির তাড়ানা থেকেই কবিতার কৌপীন লোটাকম্বল হাতে আমি পরিযায়ী পাখি। জুম পোড়া ময়াল।

আমার পরিক্রমায় সবুজ ইটপাথর গচ্ছিত রাখি।পাটকেল মারি না আমি।কারণ আমিই পাটকাঠি।পাটশাক। 

কবিতার কাছে নিজেকে রিক্ত করে দিতে আপত্তি নেই। কবিতা আমার একমাত্র পতাকা। এই পতাকার রঙ হৃদয়ের আকাশ।

কমল সরকার

একদিন বৃষ্টিতে 

তারপর একদিন আমাদের দেখা হয়ে যাবে, কোনো একদিন বৃষ্টির বিকেলে।  পূর্বাভাস ছাড়াই হঠাৎ কখনও বৃষ্টি নেমে এলে সমস্ত পথচারী যেমন আশ্রয় নেয় কোনো অস্থায়ী ফুটপাতি দোকানের ছাউনির নিচে, আমরাও এসে দাঁড়াব পাশাপাশি, ভেতরে ভেতরে সামান্য কেঁপে গিয়ে।

কোনো প্রয়োজন নেই তবু নিছক কিছুটা সময় কাটানোর ছলে সাজানো পসরা থেকে একটা দুটো জিনিস হাতে তুলে নিয়ে যেমন অবান্তর দরদাম চলে, আমরাও তেমনই বলব একটা দুটো অহেতুক কথা। যতটা মুখর সংলাপ, তার চেয়ে ঢের বেশি নীরবতা জড়িয়ে থাকবে দুজনের মাঝে।

তুমি বলবে, তুমি শুরু করেছিলে নৃত্য অ্যাকাডেমি। তারপর ওই যা হয়, স্বামী-সংসার, একটা থেকে দুটো সন্তান... এখন আর অবসর মেলে না তেমন। কবেকার কোন্ মঞ্চ-কাঁপানো ভারতনাট্যম নর্তকীর কথা মনে পড়ে বিষণ্ণ মেঘের কালো ঘিরে ধরবে তোমার মুখ। একটা গোপন দীর্ঘশ্বাস জলের অতলে ডুব দেওয়া পানকৌড়িটির মতো খুব ধীরে গড়িয়ে যাবে তোমার নিশ্বাস বেয়ে।

আমিও বলব, লিটিল ম্যাগাজিন থেকে দুবারে দুটো পাতলা কবিতার বই — তারপর ওই যা হয়! ফুরসত মেলে না। আমার ঠোঁটের কোনায় ক্লান্তিকর একটা হাসির রেখা,  আমাদের পোশাকে লেগে থাকা জলের দাগের মতো।

আর কোনো কথা হবে না আমাদের। বৃষ্টি সামান্য ধরে এলে তুমি শাড়ির আঁচল মাথায় তুলে জল বাঁচিয়ে উঠে যাবে অটোয়। একবার আমার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়বে, তারপর নামিয়ে দেবে অটোর পর্দাটি মুখের উপরে। 

আমিও নেমে আসব রাস্তায়। আর তখুনি আকাশ ঝেঁপে  বৃষ্টি নামবে আবার। জলের ছোঁয়াচ থেকে নিজেকে বাঁচানোর আর কোনো অজুহাত থাকবে না আমার। যেমন ছিল না আগেও কখনো।

তমালশেখর দে

১. দৃশ্যপট

বারান্দার হুকে ঝুলে রয়েছে আমার বিবস্ত্র শরীর 
ভিতর থেকে ঝরে পড়ছে টুপটাপ জল ।   

২. দৃশ্যপট

সেদিন  চুমু খেতে গিয়ে তোমার 
খোঁপায় অচেনা দীর্ঘশ্বাসের গন্ধ পেলাম! 

৩. দৃশ্যপট

তোমার আর আমার মাঝে  
এখন একটা সেফটিপিনের  অভাব কেবল।

গোপেশ চক্রবর্তী

একা

প্রকৃতই একাকীত্বের ক্ষণে জীবনানন্দ মনে আসেনি
ভেতরে চিৎকার ও হাহাকার টের পেয়েছি কেবল
প্রেমের আর্তির দীর্ঘ বেলাভূমিতে একটা বাঁক এসেছে
এক শরীরের ভেতর একজন ধূসর হয়ে গেছে, জেগেছে অন্যজন
তারপর এলো বন্ধু, রঙীন দুনিয়া, অচেনা বাতাস,দূরের হাতছানি, বাঁকের কারিগর,হল ভেতর ঘরে আড্ডা 

শেষ 

বিনয় মজুমদারে ডুবতে গিয়েও 'ফিরে এসো চাকা' বলে আটকে যাইনি ঘরে

আজ যাপনের ভাষা ও জীবনের আয়োজন মেলাতে পারি না বলে তোমরা আড়ালে রাখো সিস্টেমের কৌটোগুলো

বিনা বাধায় সিঁড়ি পেরুতে গোপন খুঁটির আশ্রয় নিয়ে সেও পড়ে যাচ্ছে গাড্ডায় 

জীবনানন্দের মৃত্যুর কারণ ও বিনয়ের একাকীত্বের ভাষা
বুঝতে যে পথ পেরোতে হয়,ওদের দেখা যায় না সে-পথে 

তোমরা এগিয়ে যাচ্ছো, যাও

অমলকান্তি চন্দ

এখন ঘুমোনোর সময়

এখন ঘুমোনোর সময় 
রাত্রি অনেক হয়ে গেছে ,তারারা নেমে এসেছে উঠোনে 
দরজায় কড়া নাড়ছে ,চন্দ্র বিন্দুর সামনে চোখ বুজে আছি , নড়ছি না, মুখ খুলছি না,দরজা খুলছি না, অদ্ভুত ইশারায় 
বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি থেকে কেবল বিরত থাকছি ,আমি ধ্যান করছি। 

চন্দ্রের সুগোল বিন্দুটাকে সেঁটে দিচ্ছি আমাদের কালো গাভীর কপালে। মনকে স্থির করতে চাইছি, বাঁধা মানছে না। আমি ধ্যানের মধ্যে ভ্রমণ করছি। সুখ পান করছি,দুঃখ পান করছি ।
আর 
নিরিবিলি পেঁচকের ঠোঁট কামড়ে দিচ্ছি,
কেবলই  কাম জাগ্রত হচ্ছে। 

আমি বিন্দুর ভেতর ঢুকতে চাইছি ।গভীর কপাল থেকে নাচতে নাচতে তোমার কপালে। আমি ধ্যানের ভেতর পাশ ফিরছি,
আবার ছুটছি, ঘন ঘন শ্বাস নিচ্ছি 
তোমার ভেতর, 
ঘুমের ভেতর,জোড়া শব্দের ভেতর 
ক্যারি ক্যারি খেলছি। 

“এখন ঘুমানোর সময় 
মশারির ভেতর ধ্যানস্থ শব হয়ে শুয়ে আছো !”

ড. আম্রপালি দে

গৃহবধূ


এখন আমার অঢেল সময়
দিনের প্রতিটি পর্যায়
প্রতিবেশী গাছেদের 
মাথায় হারিয়ে যায়, দেখি

আমি গৃহবধূ
জীবনে আমার ভূমিকা পরিশিষ্টের মত 

এই ধরো আজ কিছু ভাবলাম
সুশ্রী কিছু, 
উপচে পড়া পানীয় নয়
মায়ের পলকহীন চোখের মত 
যেভাবে একদিন স্থির হয়ে যাব---


"অসতো মা সদগময়
তমসো মা..."
প্রকাশ্য দিবালোকে আবৃত্তি করে আদিপুরুষ
অন্দর থেকে শব্দ আসে, 
গন্ধ আসে, সাথে
বাসনের টুং টাং
কড়াইয়ে ঘৃতাহুতি
স্বাহা! স্বাহা! স্বাহা!

চন্দন পাল

পদধ্বনি 

ময়না, বাবুইয়ের প্রভায় ঈর্ষান্বিত, 
কাক শকুনের রায়; বড় আসর (বড়) অভদ্র !  
প্রচার সহায়ক শালিক,  যমকুলি আরও।
অপব্যাখ্যা অপমানে বিস্মিত সুরেলালোক।

গড্ডালিকাময় পাখিসমাজ প্রচার গিলে খায়।
 নিম্নমেধায় ভরে অরণ্যপ্রান্তর। 
খেচরকূল ভাবল অধুনা আধুনিকতা। 
ছানারা বুঝলো বেসুরই সুর! কাক শকুনের রমরমা। 

যমকুলির চাপে  সুখাসুখি বুঝা দূষ্কর।
দূরে এক মধুরশ্মির পদধ্বনি শুনা যায়...। 

আব্দুল গফফার

প্রবন্ধ 

বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প

বৈশাখ ও মে মাসটা বাংলা সাহিত্য জগতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি মাস। এই মাসে কবিগুরুর জন্মদিন। আর কবিগুরুর সাথে জড়িয়ে তাঁরই সৃষ্টি এক বিশাল সাহিত্য সাগর। সাহিত্য বলতে আমরা কি বুঝি? শুধু কি কবিতা, শুধুই প্রবন্ধ? আসলে কবিগুরু সাহিত্যের সবকটি ধারায় অনায়াসে বিচরণ করেছেন। কবিতা, সঙ্গীত, পত্রাবলী, উপন্যাস, নাটক, গল্প, ছোট গল্প, প্রবন্ধ সব শাখায় তাঁর উপস্থিতি। যার মধ্যে ছোট গল্প নিয়ে কি অসাধারণ কাজ করে গেছেন। ছোট গল্পের মধ্য দিয়ে যে সমাজ জীবনের ছোট ছোট চিত্রের ক্যানভাস গড়তে পারেন, কবিগুরু সৃষ্ট ছোট গল্পগুলি না পাঠ করলে অন্তঃস্থ হয়ে ওঠেনা। এই অগাধ সিন্ধু পারাপার করা আমার পক্ষে খুবই দুঃসাধ্য। তবুও চেষ্টা করেছি যদি একটু সাঁতার দিতে পারি। 

ছোটগল্প কথাটি বললেই প্রথমেই যে প্রশ্নটা মনে আসে তা হল গল্পটা ছোট নাকি ছোট ছোট গল্প। এই প্রশ্নের উত্তর পেতে তার আগে ছোট গল্পের আবির্ভাব কি করে হলো তা জানতে হবে। ফিরে যেতে হবে যন্ত্রযুগে। যন্ত্রযুগের বিবর্তনের সাথে সাথে যন্ত্র যেমন মানুষকে গতিময় করে তুলেছিল। তেমনই গতিশীল মানব জীবনের সঙ্গে সঙ্গে অতি দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে চলতে শুরু করেছিল ছোট গল্প। যেমনটি কবিগুরু তার ছোটগল্পে জীবনের কোন একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে তা পূর্ণ চরিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। ছোট থেকে বড় জীবনযাত্রায় এক পূর্ণ চিত্র তিনি সর্বদা অঙ্কন করতে পেরেছিলেন। 

আমরা জানি ছোটগল্পের শুরুটা হয় ১৯ শতকের প্রাকলগ্নে। এই সময় থেকে তাঁর ছোটগল্পে জীবন বোধের গভীরতা এবং জীবন সত্যের উদঘাটন করার চেষ্টা করেছেন তিনি। তিনি ছোট পরিসরে একটা সমাজ জীবনের বড় বৃত্তের আভাস দিতে পেরেছিলেন।

বাংলা সাহিত্যে ছোটগল্পের রচনায় একপ্রকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সার্থক। তিনি সবসময় গল্পের মধ্যে প্রকৃতি, প্রেম মানবপ্রীতি, বিশ্মাত্ববোধ এবং বিচিত্র অনুভূতির প্রকাশ তাঁর ছোট গল্পের সৃষ্টিতে উল্লেখ করেছেন। 

১৮৭৭ সালে মূলত ছোটগল্পের সূত্রপাত ঘটে ভিখারিনী গল্প দিয়ে। তারপর ১৮৯১ সাল থেকে তিনি একের পর এক ছোট গল্প রচনা সৃষ্টি করতে থাকেন। এই সময় মাসিক পত্রিকাগুলির ভীষণ চাহিদা ছিল। সেই পত্রিকাগুলির চাহিদা মেটাতে ১৮৯১ সালের মে মাসে প্রকাশিত হয় হিতবাদী। তারপর আত্মপরিচয়, সাধনা ভারতী সবুজপত্র একের পর এক ছোটগল্প সৃষ্টি করতে থাকেন কবি। যার মধ্যে সাধনা'তে ছিল ছত্রিশটি গল্প। আসলে মাসিক পত্রিকাগুলিতে এই ভাবেই কবিগুরুর গল্পের ফসল ফলতে শুরু করে। এই সময় সোনার তরী এবং চিত্রা যে কাব্য দু'টি রচনা করেছিলেন তার প্রতিফলন অন্য গল্পগুলিতে ধরা পড়েছে। সোনার তরী'তে প্রকৃতি প্রেম এবং বিশ্বাত্মবোধ এবং চিত্রা'য় একটা যুগ নক্ষত্রের মতো যুগের সত্তা অনুভব করা দেখিয়েছেন। কি অসাধারণ তাঁর সৃষ্টি। কাব্য রচনা কে প্রতিপাদ্য করে তিনি ছোট গল্প এবং কালজয়ী সৃষ্টি ছিন্নপত্রের পত্রগুলিতে সেই আভাস আমরা দেখতে পাই। সেখানে প্রকৃতির সঙ্গে মানব ব্যক্তিত্বের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন তিনি। 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্পগুচ্ছেন গল্পগুলিতে বিশ্বপ্রকৃতির প্রাণ প্রাচুর্যে ভরা অম্লানাকার স্পর্শ রেখে গেছেন তিনি। যা এক কথায় বলা যায় বিশ্বপ্রকৃতির পটভূমিকায় মানব জীবনের আলেক্ষ্য এঁকেছেন।

একটা পরিসংখ্যানে জানা যায় এ পর্যন্ত যতগুলি গল্প লিখেছেন তিনি সেগুলি কতগুলি বিষয়ে ভাগ করা যায়। যেমন অতি প্রকৃতি পরিবেশে রচিত গল্প। উদাহরণ স্বরূপ: ক্ষুধিত পাষাণ, কঙ্কাল, নিশিথে, মনিহারা। আবার মেঘ ও রৌদ্র, ত্যাগ, অতিথি, বলাই, শুভদৃষ্টি এবং শুভা-এই গল্পগুলিকে প্রকৃতির সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক স্থাপন করেছেন।

এদিকে এখনো পর্যন্ত স্মৃতির মনিকোঠায় বারবার ফিরে আসে যে গল্পগুলি সেগুলি হল স্নেহ ও ভালোবাসার গল্প। কি অসাধারণ সৃষ্টি। কাবুলিওয়ালা পোস্টমাস্টার ছুটি জীবিত অমৃত এই গল্পগুলি বেশ স্মৃতি বিজড়িত।

প্রণয় ও দাম্পত্য জীবন নিয়ে লেখা নষ্টনীড় সাংসারিক রঙ্গমঞ্চে এক কথায় মঞ্চ সফল। তার মধ্যে বেশ কিছু গল্প অর্থের প্রতি আসক্তির চিত্র বর্ণনা করেছেন তিনি। যেমন গুপ্তধন, প্রতিহিংসা দান-প্রতিদান ব্যবধান, মণিহার।

সমাজ জীবনে ধর্মীয় সংস্কার কতটা লজ্জাজনক এবং সমাজ অবক্ষয় চিত্র হতে পারে তাও তিনি সুনিপুণ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন দেনাপাওনা, ত্যাগ, মহামায়া, সমস্যা পূরণ, প্রায়শ্চিত্ত, অনধিকার প্রবেশ, এবং দুরাশা গল্পে।

তাঁর সৃষ্টি বিভিন্ন গল্পগুচ্ছতে বিভিন্ন বিষয়ের মোট ১১৯টি গল্পকে টেনে যদি সারাংশ করে বলা হয়, তাহলে দাঁড়ায় এইরূপ: তার গল্প করছো বলিতেই বিশ্ব প্রকৃতির পট ভূমিকায় মানব জীবনের আলেখ্য থেকে মানবহৃদয়ের দ্বন্দ্ব-সংঘাত, আশা-নিরাশা, দুঃখ-বেদনা, স্নেহ-মমতা, ভালবাসা-অভিমান এবং লোভের কথা তুলে ধরেছেন। তাই পাঠক সমাজের কাছে আমার অনুরোধ থাকবে অন্তত একবার ছোট গল্পের পাড়ায় ভ্রমণ করে আসুন। দেখবেন সমাজ ঘরানার রঙিন চিত্র আপনার মনবাগানে উঠে আসবে।

তথ্য সূত্রঃ 

১) ছোটগল্পে রবীন্দ্রনাথ,কালি কলম।

২) রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প,বইয়ের ঠিকানা।৩) রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পে মনস্তত্ত্ব ও রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প ও কাব্য ভাবনা, দৈনিক ইনকিলাব।

৩) ছোটগল্প, রবীন্দ্র রচনাবলী এবং পশ্চিমবঙ্গ রবীন্দ্র সংখ্যা।

গোপালচন্দ্র দাস

লোকায়ত জাগগান

ভূমিকা:- জাগগান ভারতের পশ্চিমবঙ্গ,অসম এবং বাংলাদেশের প্রচলিত একপ্রকার লোকসংগীত। অসমের ধুবড়ী জেলা পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি ও কোচবিহার জেলা এবং বাংলাদেশের দিনাজপুর পাবনা রংপুর জেলায় এই গান বিশেষ করে শোনা যায়। 

ফসল ঘরে তোলার পর কৃষকদের অবসর যাপন। কৃষকরা তখন জাগগানের আয়োজন করেন। দর্শক শ্রোতারাও সারারাত জেগে খুব আনন্দের সহিত বিভোর হয়ে গান উপভোগ করেন।

জাগগানের নামকরণ:- সারারাত জেগে গান করা হয় বলেই হয়ত গানের নামকরণ প্রতিভাত হয়। আবার অন্যভাবে বললে বলা যায়,জাগগান গাওয়ার সময় মূল গায়ক চামর হাতে ধরে গান করেন। দোয়ার'রা মন্দিরা বাজিয়ে গানের ধুয়ো ধরেন। এই গানের দ্বারা কামকে জাগরিত করা হয় বলে এই গানের নাম 'জাগের গান' বা 'জাগগান' হয়েছে। আলকাপ গান,ঘাটু গান ইত্যাদিও সারারাত ধরে পরিবেশিত হয়ে থাকে,তবে সেগুলোকে জাগগান বলা যাবে না। এই গানের নামকরণে বিশেষ উপলক্ষ্য ও বিষয়গুন জড়িত থাকে। তাই কোথাও কোথাও পালা আকারে পরিবেশিত হয় অর্থাৎ সবাই মিলে দলগতভাবে,তার প্রধান গায়েন দোহার নর্তক বাজনার লোক পনেরো থেকে বিশ জন সদস্য নিয়ে একটি দল গঠন করা হয়।

জাগগানের প্রকারভেদ:- জাগগান মূলত তিন প্রকার। 

১) মোটাজাগ ২)কানাই ধামালি বা লীলা জাগ ৩) বীররসাত্মক 

মোটাজাগ:- আদি রসাত্মক গান।এই গান বাড়িঘরে খুব একটা গাওয়া হয় না,মাঠে হয়।কারণ এই গানে ডরাই পূজার মত কিছু অশ্লীলতা থাকে।

 কানাই ধামালি বা লীলা জাগ:- রাধা কৃষ্ণের লীলা রসাত্মক গান। তবে এই লীলা গান সম্পূর্ণ লোক কবিদের কল্পনা। এর সঙ্গে পৌরাণিক মূল রাধা কৃষ্ণের কাহিনীর কোন মিল নেই। দুজন বালককে রাধাকৃষ্ণ সাজিয়ে একজন প্রৌঢ় ব্যক্তিকে 'বড়ায়ি' সাজিয়ে এগুলো অভিনীত হয়। 'পন্ডিতরাজ' নামক জনৈক সংগ্রাহক তার পালা সংকলনে এগুলোকে 'রতিরাম' নামক জনৈক কবির রচনা বলে উল্লেখ করেছেন। তবে সুশীল কুমার ভট্টাচার্য এই গানগুলির রচনা বৈষম্য পর্যবেক্ষণ করে এগুলো একাধিক কবি'র রচনাবলী বলে মত প্রকাশ করেছেন। 

            বীররসাত্মক:-সুশীল কুমার ভট্টাচার্য এক জমিদারের পৌরুষ বর্ণনাত্মক একটি বীর রসাত্মক গান সংগ্রহ করেছেন।গানটি এরূপ:-

"মাঠের মতন,কেমন ওতার পাটার মতন বুক
  সে কঠিন বুক দেখিয়া, শত্রুর শুকায় মুখ"

                  জাগগানের বিষয়:- জাগগানের বিষয় মানব প্রেম,যা প্রধানত রাধা কৃষ্ণের রূপ'কে প্রকাশ করা হয়। যে গান খন্ড আকারে আবার পালা আকারেও পরিবেশিত হয়। অর্থাৎ সবাই মিলে দলগতভাবে তার প্রধান গায়েন দোহার নর্তক বাজনার লোক পনেরো বিশজন সদস্য নিয়ে একটি দল গঠন করা হয়। জুরি ও তবলা বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। জাগগানে নাট্যগুণ যুক্ত হওয়ায় তাতে বিনোদনের মাত্রা থাকে অধিক। রংপুরের প্রচলিত রাধা'র 'শাক তোলা' পালা গীত আকারে পরিবেশিত হয়।

যেমন,

"খুরিয়া বতুয়া শাকে ক্ষেত গেইছে ভরি।
রাধা যায় শাক তুলিতে নয়া ডালি ধরি।।
সরু কাপড়া পরছে রাধা কেবল নয়া ধোপ।
নচা-পচা শাক দেখিয়া রাধার হ‌ইল লোভ।।
বাছের বাছ তুলে রাধা ক্ষেতের ভিতর যায়া।
কোচা ভরিয়া তুলে শাক থোয় ডালি ভরিয়া"।।

          এখানে নারী নামেই 'রাধা',আসলে যে কোন পল্লীবধূ।রাধা রূপক অর্থে ব্যবহার হয়েছে। এই গানে রাধা কৃষ্ণের নামের আড়ালে পল্লীর যুবক-যুবতীদের কথাই বলা হয়েছে। রাধাকৃষ্ণের পৌরাণিক গ্রন্থে 'শাক তোলার' কোন প্রসঙ্গ নেই,প্রসঙ্গ নেই 'শ্রীকৃষ্ণের মাছ ধরা' পালার। বস্তুত রাধা কৃষ্ণের রূপকে লোককবি চারপাশের বাস্তব মানব জীবনকেই চিত্রিত করেছেন। এ কারণে সাধারণ মানুষের কাছে জাগগানের আবেদন বেশি। 

রাধা কৃষ্ণের পৌরাণিক কাহিনী ছাড়াও মুসলমানদের পীর কাহিনী নিয়েও পরবর্তীতে জাগগান রচিত হয়েছে। সোনারায় বা সোনা পীরের জাগ,মানিক পীরের জাগ, গাজী কালুর জাগ,ও  সত্য পীরের জাগ এগুলো নিয়েও জাগগান রচিত হয়েছে।উত্তরবঙ্গের প্রচলিত সোনা পীরের একটি গান এরূপ:-

"সোনাপীর উঠে বলে মানিক পীররে ভাই এসেছি গোয়ালপাড়া জাহির রেখে যাই।
আগনড়ি পাছ করে বাতানে দিল বাড়ি
নব লক্ষ ধেনু ম'ল বিশ লক্ষ বাছুরী।
সোনাপীর উঠে বলে মানিক পীররে ভাই মেরেছি গরিবের ধন জিয়াইয়া যাই"।

                  মনসুর উদ্দিন 'কৃষ্ণ জাগগান'এর একটি দীর্ঘ পালা সংগ্রহ করে প্রকাশ করেছেন।যার অংশবিশেষ নিম্নরূপ:-

"ওমা,দয়া নাইরে তোর,
মা হয়ে কেন বেটায় সদা বল ননীচুর।
কেষ্ট যায় মা বিষ্ণুপুরে, যশোদা যায় ঘাটে,
খালি গৃহ পেয়ে গোপাল সকল ননী লোটে।
ননী খালো কে রে গোপাল, ননী খালো কে?
আমিত মা খাই নাই ননী,বলাই খেয়েছে।
বলাই যদি খাইত ননী থুতো আদা আদা,
তুমি গোপাল খাইছ ননী,ভান্ড করেছ সাদা।

                 জাগগানের উৎসব:-ফাল্গুন মাসের মদন চতুর্দশী উপলক্ষে জাগের গান প্রচলিত। মোহাম্মদ মনসুর উদ্দিন পাবনা জেলার জাগগানের উল্লেখ করেছেন। তার মতে, 'গ্রামের হিন্দু মুসলমান উভয় অংশের রাখাল বালকেরা রাতের বেলায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে জাগগান গেয়ে গৃহস্থের কাছ থেকে চাল ডাল সংগ্রহ করে পৌষ সংক্রান্তির দিন শিরনি বা প্রসাদ রান্না ভোজন করে আনন্দ প্রকাশ করে থাকে। পাবনা জেলায় শ্রীকৃষ্ণের বাল্যলীলা গোষ্ঠ লীলা বিষয়ক জাগগানের প্রচলন আছে'। 

কোথাও কোথাও চৈত্র ত্রয়দশী তিথিতে পুষ্পিত অশোক বৃক্ষের মূলে কামদেবের পূজা ও চামর ব্যজন করার শাস্ত্রীয় বিধান রয়েছে। উত্তরবঙ্গে অনেক প্রগতিশীল পরিবারে এই কামপূজা অনুষ্ঠিত হয়। বাড়ির বাইরে দুচারটা বাঁশের টুকরো মাটিতে পুঁতে দুই তিনটি দীর্ঘ কাপড়ের জড়ানো বাঁশের টুকরোর ডগায় চামড় দিয়ে সেই পোতা বাঁশের সঙ্গে বেঁধে কামপূজা করা হয়। রাজবংশীরাও এই কাম পূজায় অংশ নেন। তবে তাঁরা কিছু অশ্লীল শব্দ এড়াতে লোকালয় থেকে একটু দূরে কোন মাঠে গিয়ে এই পূজা করেন। পূজা উপলক্ষে  গান হয় জাগের গান।

            জাগগানের শেষকথা:-রাধাকৃষ্ণের পৌরাণিক কথায় 'শাক তুলার' যেমন কোন প্রসঙ্গ নেই অনুরূপভাবে প্রসঙ্গ নেই 'শ্রীকৃষ্ণের মাছ ধরা'র পালা। এটিও পল্লীর লোকজীবন থেকে নেয়া পল্লীর লোকেদের মনোরঞ্জনের জন্য এই পালা গান। উপরে উল্লেখিত স্থান ছাড়াও জাগগান থাকতে পারে কারণ এক অঞ্চলের লোক অন্য অঞ্চলে গিয়ে বসবাস করতেই পারে। তবে একেক অঞ্চলে নাম স্বতন্ত্র হতে পারে। যেমন উত্তরবঙ্গে 'কৃষ্ণ ধামালি'কে 'জাগেরগান' বলে। সেখানে এই গান দুই দলের পরস্পর উক্তি প্রত্যুক্তির মাধ্যমে পরিবেশিত হয়। রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা ছাড়াও পীর কাহিনী চৈতন্য লীলা ও স্থান পায়। প্রেম মূলক ভাবনির্ভর জাগগানে সাধারণ অশ্লীলতার গন্ধ থাকা সত্ত্বেও বাস্তব জীবনের সহৃদয় স্পর্শ ও রসবোধ জাগগানকে করে তুলেছে জীবনমুখী। অপকট সহজ-সরল আঞ্চলিক ভাষা জন-চিত্তজয়ী জাগগানের ভাবময়কে সাধারণ মানুষ অপকটে গ্রহণ করেছে জীবনাতীত সুষমায়। যাপিত জীবনের প্রাত্যহিকতায় নিহিত বিচিত্র ভাব অঙ্গীভূত করে অনুভবের ঐশ্বর্যে ঋদ্ধ জাগগান প্রজন্ম হতে প্রজন্মান্তরে বয়ে চলবে সাধারণ লোকের অন্তরে,আপন মহিমায়।

ঋণ স্বীকার:- লৌকিক জ্ঞানকোষ--ওয়াকিল আহমেদ,'জাগের গান'--সুশীল কুমার ভট্টাচার্য, 'কৃষ্ণজাগগান'-- মনসুর উদ্দিন, প্রচলিত।

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।

মেঘমল্লার

মাঝে মাঝেই দুচোখে জেগে ওঠে মেঘমল্লার
গভীর রাতে বর্ষা আসে ঝমঝমিয়ে।
পাষাণীর কাজল চোখে আজীবন বর্ষাঋতু
ভালোবাসাহীন আদিখ্যেতাহীন...... 
এক একটি সাদাকালো বর্ষাযাপন আর
রাত গভীর হলেই হৃদয়ে জমাট বাঁধে
ঘন কালো মেঘের শামিয়ানা, জমা হয়
ছলছল জলকথা, থইথই বর্ষাযাপন ব্যথা।

মেঘমেদুর এ বর্ষা যাপনে 
কেন শুধু বাজে মল্লার ?
বৃষ্টিভেজা মধ্যদিনে 
ওঠে না কেন বিলাসখানি বাহার ?
অতীত কথারা সব অলীক হয়ে যায় একদিন
বিন্দু বিন্দু বৃষ্টিবারি বয়ে চলে নিশিদিন
জীবনধারারই মতো বহমান সাগরমেঘের পানে। 
মরুকথা সমাপনে গড়ে ওঠে জলছাপ ইতিহাস
ভেঙে যায় সব যাপন ব্যথা, ভালোবাসাবিহীন।

অর্ধেন্দু ভৌমিক

 তবু আমি লিখি

লিখতে হবে আমায়, তোমার জীবন কাহিনি
অবুঝ আকাশের কানে লাগে ভালো লাগা
আর রঙ মিশিয়ে মুখোশ পরে অবয়
পাথর বুকে নিঃশ্বাস বায়ুর হাহাকার ।

বৈশাখী ঝড়ে  ভেঙ্গে পড়া কৃষ্ণচূড়ার ডাল
ডিসেস্টার রেসকিও দলের মেশিন করাত
খান খান হয়ে রাস্তা খুলে গেলো ...

তবু আমি লিখি,  তোমার ভালোবাসার গল্প।

রুপালী মান্না

জীবন্ত মৃত্যুবান

শতকরা নব্বই ভাগ দম্পতি সন্তান সন্তান করে  জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ চাওয়া পাওয়াগুলোকে ত্যাগ করে শপে দেন নিজেদের জীবন। 

সন্তান মানে নবজাতককে  সুন্দর করে গড়ে তোলার দায়িত্ব। ভালোবাসা, বিশ্বাস, ভরসা, দিয়ে গড়ে দেওয়া মাথার ওপর একটা নিরাপদ আকাশ। একটা নিরাপদ আশ্রয়। 

লেখার সূত্র ধরে যত মানুষের জীবনকে জানছি ততই অবাক হওয়ার মতো কিছু বিষয় লক্ষ্য করছি, পরিণত হচ্ছি, অভিজ্ঞ হচ্ছি আজকাল। সব দম্পতির কথা বলছিনা, কিছু কিছু মানুষের দাম্পত্য জীবন এতো এতো কন্টকাতীর্ণ যে জেনে গা শিউরে ওঠার মতো। পর্যবেক্ষণ করি, নিজেকে সেই স্থানে বসিয়ে উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছি অনেক সময়। চোখের জলে ভেসে গেছে চিবুক। উত্তর মিলেছে - সন্তান। 

আমরা যারা সেই অর্থে প্রচন্ড অসুখী নয় তারা নিন্দা সমালোচনায় মুখর হয়ে তাদের জীবনকে আরও খানিকটা বিষিয়ে দিই হয়তো, কিন্ত মানবতা কী তাই বলে?এতোটা নির্দয় কী হওয়া উচিত যে কষ্টসহিষ্ণু মানুষের জীবনকে আরও খানিকটা নিন্দার ঘি ঢেলে উস্কে দেওয়া?  শুনেছি বুঝেছি দেখেছি মানুষ পরিবর্তনশীল। কেউ ধীরে ধীরে উন্নতি করে, কেউ অবনতি। এই উন্নতি অবনতির সংজ্ঞা আবার বিভিন্ন জনের কাছে বিভিন্ন। এছাড়াও কিছু মানুষ থাকে যারা কোনোদিন বদলায় না, ভালো থাকতে জানে না, ভালো রাখতে জানেনা। ভালো থাকাটাও একটা আর্ট, এ বিষয়ে তারা মারাত্মক রকমের কাঁচা শিল্পী। 

প্রসঙ্গটা যখন সন্তান, তখন সেটাতেই ফিরে আসি। জীবনের কাছে প্রচন্ড লাঞ্ছনা, গঞ্জনা, অশান্তি, অবহেলা পেয়ে যখন কোনো মানুষ মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে ফিরে আসে, ঘুমের ওষুধ হয় প্রয়োজনীয় নেশা, সমাজ সন্তানের কথা ভেবে যখন একটা আঁকড়ে ধরার মতো মানুষ তারা খুঁজে নিতে পারেনা তাদের মতো অসুখী ব্যক্তি পৃথিবীতে নেই বলে আমি মনে করি। 

কিন্ত হয় কী, যে পিতা বা মাতাটি তার নিজের জীবনটাকে মৃত্যুর কাছে একপ্রকার উৎসর্গ করে দিলো বলা চলে, জীবন্ত লাশ হয়ে বেঁচে রইলো চারদেওয়ালের যান্ত্রিক শহরে তার প্রাপ্য কী? মনুষ্য জন্ম লাভ করে শুধুমাত্র একটা টক্সিক বিয়ের জন্য জীবন্ত লাশ? 

এই লাশ বয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্বও তো একসময় সন্তান নেবে না। নেয় না বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। বোঝার বয়স হলে সন্তানেরও উচিত মা বাবাকে বুঝিয়ে ভালোবেসে একটা সুন্দর জীবন উপহার দেওয়া, নয়তো তাদের কে একটু ছাড় দেওয়া যে, "তোমাদের জীবন তোমরা তোমাদের মতো করে একটু ভালো থাকার চেষ্টা করো।" আমি সন্তান বলে, আমায় জন্ম দিয়ে লালনপালন করেছো বলে নিজের জীবনটাকে নরক বানিয়ে রেখোনা, তুমি মানুষ, সুন্দর এই পৃথিবীতে তোমার অধিকার আছে শ্বাস নেওয়ার।" 

কিন্তু না! বেশিরভাগ সন্তানই নিজের মা বাবাকে এই স্পেসটুকু দেয়না। আমি কী পেলাম? আমার জন্য মা বাবা কী কী করলো? কী করলোনা? অন্যদের মা বাবা কতকিছু করেছে তাদের জন্য? আমার কতোটা স্পেস চাই" এসব নিয়েই তারা ভাবে। যদিও আজকাল ধারণা কিছুটা বদলাচ্ছে মুভিগুলোর জন্য। বেশ কিছু ভালো মুভি তৈরী হচ্ছে সমাজকে শিক্ষা দিতে, আগামী প্রজন্মকে শিক্ষা দিতে। 

সন্তানদের উদ্দেশ্যে আমার বক্তব্য যে তারা হৃদয় দিয়ে বুঝতে চেষ্টা করুক মা-বাবার সম্পর্ক কেমন? মা- বাবা শুধুমাত্র তার জন্য স্যাক্রিফাইস করে যাচ্ছে না তো? মা-বাবার ঘুমের ওষুধ লাগে না তো? মা- বাবা কোনো জীবন্ত লাশ নয় তো শুধুমাত্র তার জন্য? মা বাবা চাইলে নতুন করে জীবন শুরু করতে পারতো, নতুন কারো বুকে আশ্রয় নিতে পারতো কিন্তু তা না করে যারা শুধুমাত্র সন্তানের কথা ভেবে জীবন্ত লাশ হয়ে বেঁচে রইলো সেই মা বাবাকে সোনার কাঠি ছুঁইয়ে বাঁচিয়ে তোলার দায় সন্তানের নয় কী? 

শেষ বয়সে মা বাবার ওষুধ আনা বা খাবার জোগানোর কথা ছেড়েই দিলাম। বৃদ্ধাশ্রমের দৌলতে মা বাবা ওটুকুও আশা করেনা আজকাল। জানে জীবন চলে যাবে, ওটাকে দ্বিতীয় সন্তান বা আশ্রয় ভেবেই নিয়েছে বহু আধুনিকমনস্ক মা বাবা। 

শেষ বয়সের কথা এখানে আমি বলছিনা, বলছি কষ্টকর জীবন নিয়ে চলাকালীন অবস্থার কথা। 

যুগ বদলাচ্ছে, সমাজ বদলাচ্ছে বদলাচ্ছে চিন্তা ভাবনা আদব-কায়দা। সন্তানও খুঁজে নিচ্ছে নিজের প্রয়োজনীয় সঙ্গীটিকে, সেক্ষেত্রে সেও বলছে -"আমার জীবন আমি আমার মতো করে বাঁচবো, আমার একটু স্পেস চাই।" শুধু চাই বলার অধিকার নিয়ে জীবন্ত মৃত্যুবান হয়ে থাকলে চলবে সন্তানদের ? এতো আধুনিক হচ্ছে আর এইটুকু না বুঝলে হয় কীভাবে? মা বাবারও স্পেস দরকার। ওদেরকে একটু খোলা আকাশ দিতে হয়। তারাও বলুক -"প্ৰিয় মা বাবা,তোমরা একটু নিজের মতো করে বাঁচো, বাঁচার অধিকার তোমারও আছে। আমি সন্তান, জীবন্ত কোনো মৃত্যুবান নয়।"

জহর দেবনাথ

ভুলে যাওয়া শেকড়

রিয়া একটি গ্রাম্য পরিবারের মেয়ে, যার ছোটবেলা কাটে মায়ের আদর আর বাবার শাসনের মধ্যে। মেধাবী রিয়া বড় হতে হতে নিজের গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসে উচ্চ শিক্ষার জন্য। পড়াশোনা শেষ করে সে একটি বড় কর্পোরেট অফিসে চাকরি পায়। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হয়ে ওঠার পর, তার ব্যস্ত জীবন তাকে গ্রাম ও পরিবারের থেকে অনেক দূরে সরিয়ে দেয়। শহরের ঝলমলে আলো আর ব্যস্ততার মধ্যে রিয়া তার গ্রামে থাকা বৃদ্ধ মা-বাবার কথা ভুলে যেতে বসে।

প্রতিদিন অফিসের কাজ, মিটিং, প্রেজেন্টেশন—এই সবের মধ্যে রিয়া এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে যে মায়ের ফোনের উত্তর দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব হয় না। মা প্রতিদিন মেয়ের ফোনের অপেক্ষায় থাকেন, কিন্তু রিয়া প্রতিবারই অফিসের কাজের অজুহাত দেখিয়ে ফোন ধরতে পারে না। সময়ের সাথে সাথে মা-বাবার স্বাস্থ্য খারাপ হতে থাকে, কিন্তু রিয়া এসবের খবরই পায় না।

একদিন অফিসে একটি মিটিংয়ে রিয়া জানতে পারে, ওর মা গুরুতর অসুস্থ, শয্যাশায়ী। তাড়াহুড়ো করে সে গ্রামে ফিরে আসে। বাড়ি পৌঁছে দেখে, ওর মা বিছানায় শুয়ে আছে, শরীরের চেহারা পাল্টে গেছে, আর বাবা অসহায় নিরুপায় চোখে তাকিয়ে আছেন। 

রিয়া মায়ের হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘’মা- মাগো, আমি এতদিন কোন মোহে আচ্ছন্ন হয়ে ছিলাম! কর্পোরেটের আলো ঝলমলে মোহে তোমাদের খোঁজ রাখিনি! আমাকে ক্ষমা করে দাও, মা।’

 মা কষ্টের হাসি হেসে বলেন, ‘’তুই ভালো থাকলেই আমি খুশি, মা।’

রিয়া বুঝতে পারে, কর্পোরেট জীবনের সাফল্যের মোহে সে তার শেকড় ভুলে গিয়েছিল। মা-বাবার ভালোবাসা ও সান্নিধ্যই তার আসল সম্পদ। সে সিদ্ধান্ত নেয়, কাজের পাশাপাশি পরিবারের জন্যও সময় বরাদ্দ করবে। সে নিজের জীবনের ব্যস্ততা কমিয়ে মা-বাবার সাথে আরও সময় কাটানোর প্রতিজ্ঞা করে।

বিভুলাল চক্রবর্তী

ওগো বর্ষা


ওগো বর্ষা- 
তুমি নেমে এসো অঝোর ঝরে, 
খরাতপ্ত এ ধরা পুষ্ট করো
তোমার মেঘবারি সিঞ্চনে।
বর্ষা, তুমি এলে- 
খালবিল সব ভরে
স্রোতস্বিনী হয় যৌবনবতী, 
দু বাহু বাড়ায়ে,দু কুল ছাপিয়ে ছোটে দুর্বার- 
খোঁজে তার আজন্ম লালিত আকাঙ্ক্ষা, 
সন্ধানে অনন্ত মোহনার। 
ওগো বর্ষা- 
তুমিই তো জাগাও কৃষকের মনে ভরসা, 
উদাসী বাউলের একতারে উঠে আসে
মাঝি মাল্লার প্রাণের ভাষা। 
গ্রীষ্মের দাবদাহে ওষ্ঠাগত প্রাণ - 
বনস্পতি থেকে তরুলতা,
অপেক্ষায় থাকে শুধু তোমাকে ছোঁয়ার। 
ওগো বর্ষা ঋতুরাণী- 
তোমার সিঞ্চন শুধায় শীতল করো, 
সজীব করো এ জীবজগৎ
গড়ে উঠুক সৃষ্টির নব নব সৃজনী

সুশান্ত নন্দী

বরফি মেয়ে

টুকটুকে লাল ঠোঁট ধবধবে গাল
গায়ে ছিল জড়ানো পশমিনা শাল
টোল পড়া হাসি নিয়ে আপেলের দেশে
ওই মেয়ে ঘোরে ফেরে ফেরিওয়ালা বেশে
ঝুলি ভরা আখরোট,কাজু কিশমিশ
গলা যেন সুরেলা দোয়েলের শীষ।
হেঁটে যায় পথ ধরে কাশ্মীরি মেয়ে
আমি শুধু ঐদিকে অপলক চেয়ে।
বরফের পথ ধরে ফেরি করে ও যে
জাফরান হাতে নিয়ে খদ্দের খোঁজে।
আজও যেন দুই চোখ খোঁজে সেই ছবি
ভেবে যাই একমনে শুধু এসবই।।

নন্দিতা ভট্টাচার্য্য

যেতেই যখন হবে 
        
যেতেই যখন হবে - যাব। 
তবে কবিতার হাত ধরে 
 সময়কে উপেক্ষা করে
 তোমাদের বুকের মধ্যে
      রেখে যাব
 এক টুকরো বসতবাড়ি।

 যেতে তো হবেই - যাব।
 থেকে যাব গভীর বিশ্বাসে 
  কবিতার ঘেরাটোপে
 দুর্বিনীত জীবনের স্পর্ধা
 ভেঙে চুরমার করবে যখন
    আমার নীরব অস্তিত্ব।

সনজিৎ বণিক

আমি মানুষটা 

এই যে দেখছেন আমি মানুষটা বারবার লড়াই করতে করতে কীরকম গো হারা হেরে যাচ্ছি ,ধুপে টিকছে না আমার ভাবনা ও মেধার ভিত্তিপ্রস্তর, কেউ আজকাল পাত্তাই দেয় না আমার রহস্যময়তা কিম্বা মনের উদারতা ও সৌন্দর্যের মায়াজাল, এখন দুনিয়াজুড়ে যে হাওয়া বইছে তা যাচাই করে নিজের ভেতরে নিজেকে সামলে রাখলে চলবে না।‌ আকাশে উড়তে হবে, বাতাসের সাথে সখ্যতা বাড়াতে হবে, সূর্যের আলোয় আলোকিত হতে হবে এবং চুপচাপ স্বপ্নের ভেতর হারিয়ে যেতে হবে আর লিখতে হবে চিরকাল, কল্পনার জগতে প্রবেশ করতে পারলেই দিন দিন আমি মানুষটা নতুন পৃথিবীর স্বপ্নে বিভোর হয়ে রচনায় মন ভরিয়ে দেবো আর এঁকে যাবো স্বপ্নের ডালপালা আর নতুন মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষার বিশ্বাসযোগ্য এক সময় অভিধান যেখানে পৃষ্ঠা উল্টিয়ে বারবার খুঁজে পাবো বদলে যাওয়া সময়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মুখমণ্ডল।

নবীনকিশোর রায়

দহন

শেষ না হওয়া পথের বাঁকে 
খোঁজে ফিরি নিরবধি... 
যেখান থেকে ফিরে গেছে
হৃদয় পুরের অভিমানী নদী,, 

বিরহের মায়াবন ছুঁয়ে বাষ্পমেঘ উড়ে যায় - - -
মরূপথে দহন জ্বালা, 
চাতকের চিৎকার থেমে যায়! 

তৃষ্ণার মরূদ্যান ঢেকে দেয় 
সম্মুখ বালিঝড় এসে---
ভগ্ন মনোরথ বিচ্ছিন্ন করে
ভেসে উঠে দগ্ধকাতর মায়াবন! 

জহরলাল দাস

 প্রবন্ধ 

প্রান্তিক সমাজ ভাবনায় অদ্বৈত মল্লবর্মণ

প্রান্তিক ও শ্রমজীবী জনজীবনের কথাকার অদ্বৈত মল্লবর্মণ তাঁর সাহিত্যকৃতির মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন শ্রমজীবী মানুষের কথা, মানুষের ক্ষুধা দারিদ্র্যতার কথা।

অদ্বৈত মল্লবর্মণের জন্ম তৎকালীন ত্রিপুরার ব্রাম্মনবাড়িয়া জেলার গোকর্ন গ্রামে তিতাস নদীর পাড়ে মালোপাড়াতে।

তিনি নিজে যেমন প্রান্তিক মালো জনগোষ্ঠী থেকে উদ্ভূত তেমনি শৈশব থেকেই দেখেছেন এইসব ছিন্নমূল, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষের জীবন যাত্রা।জাল ও জলকে কেন্দ্র করেই তাদের জীবন আবর্তিত।এইসব দারিদ্র্যক্লিষ্ট মানুষের জীবন ছবি তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর --" তিতাস একটি নদীর নাম" উপন্যাসে।

সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও শ্রমজীবী জনগণের জীবন সংগ্রামের অমর গাঁথা তাঁর এই " তিতাস একটি নদীর নাম" উপন্যাস।

এই তিতাস একটি নদীর নাম " উপন্যাসটিই হলো অদ্বৈত মল্লবর্মণের প্রান্তিক সমাজ ভাবনার একটি অন্যতম প্রামাণ্য দলিল। 

লেখক এমন একটি জনগোষ্ঠী থেকে উঠে এসেছেন এবং যে জনগোষ্ঠীর ছবি তাঁর এই উপন্যাসে বিধৃত করেছেন যারা সমাজের একেবারে প্রান্তীয় জনগোষ্ঠীর লোক।জল,জাল,জনমুজুরি যাদের বাঁচার একমাত্র অবলম্বন। দুর থেকে কোন কাল্পনিক গল্প বা উপন্যাস তিনি রচনা করেন নি কারণ বাংলা সাহিত্যে এমন নদী কেন্দ্রীক উপন্যাস আরো অনেক আছে। কিন্তু এই সমস্ত উপন্যাসের ঔপন্যাসিকরা এই জনগোষ্ঠী থেকে উদ্ভূত নয় কি‌ংবা তাঁরা ঐসব জনগোষ্ঠীর সাথে সম্পৃক্ত নয়। অথচ অদ্বৈত মল্লবর্মণ এই প্রান্তীয় জনগোষ্ঠীর এক অন্যতম প্রতিনিধি। শৈশব থেকেই দারিদ্র্যতার কষাঘাতে বড় হয়েছেন তিনি। দরিদ্র পিতামাতার ঘরে তাঁর জন্ম। স্বভাবতই তাঁর লেখক দর্পণে অনিবার্যভাবে ফুটে উঠবে প্রকৃত বাস্তবতার উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।

তিতাসের বহমান জলধারার মতই লেখক তাঁর উপন্যাসে মালো সমাজের ছবি বিধৃত করেছেন।

তিতাস পাড়ের দারিদ্র্যক্লিষ্ট, মৎস্যজীবী সম্প্রদায় মালো সমাজের বাস।জাল ও জলকেই কেন্দ্র করে তাদের জীবন জীবিকা।

চারটি খন্ডের আটটি পর্বে বিন্যস্ত এই উপন্যাস।

খন্ডগুলির যোগসূত্র বা কেন্দ্রীয় চরিত্র বলতে ঐ তিতাস নদী যে-  "তিতাস শাহী মেজাজে চলে।তার সাপের মত বক্রতা নাই। কৃপণের মত কুটিলতা নাই। কৃষ্ণ পক্ষের ভাটায় তার খানিকটা শুষিয়া নেয়, কিন্তু কাঙাল করে না, শুক্ল পক্ষের জোয়ারের উদ্দীপনা তাকে ফোলায় কিন্তু উদ্বেল করে না।"

সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও  জীবনসংগ্রামের অমর গাঁথা তাঁর এই -- "তিতাস একটি নদীর নাম " উপন্যাস। অদ্বৈত তাঁর এই উপন্যাসে দেখিয়েছেন শোষক এবং শোষিত শ্রেনীর কোন ধর্ম বা জাত নেই। উপন্যাসে তিনি তা তুলে ধরেছেন তিন বিশিষ্ট চরিত্রের মাধ্যমে। তিনি লিখেছেন --" ধনী কৃষক জোবেদ আলীর বাড়িতে কর্মরত দুই দায়বদ্ধ শ্রমিক করম আলী ও বন্দে আলী বলদ ও ষাঁড়ের মত সারাদিন জোবেদ আলীর জমি ও বাড়িতে খাটে। নিজের বাড়িতে যাওয়ার কোন অধিকার নেই। তাদের স্ত্রীরা ও অন্যের বাড়িতে কম মজুরিতে খাটে। তাদের জীবনে আনন্দ - সুখের কোন স্থান নেই। মালিকের দাস ও দাসী হয়েই তাদের জীবন কাটাতে হয়।একই অবস্থা মালো পাড়ার জেলে সম্প্রদায়ের। তিনি লিখেছেন, " বেপারী পিন্দে লেস পাইরের ধুতি,আর জাল্লার লেংটি শুকায় না।"

মহাজনী শোষনের এক নির্মম চিত্র এঁকেছেন অদ্বৈত তাঁর তিতাস উপন্যাসে।

তৎকালীন সময়ে ভারতের গ্রামীণ শ্রমজীবী নারী সমাজ কিভাবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণ ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন তার ও আভাস রয়েছে তাঁর রচনায়। সবচেয়ে কম খেয়ে কিংবা না খেয়ে পরের বাড়ীতে উদয়াস্ত শ্রম দিয়ে ক্লান্ত অবসন্ন অবস্থায় বাড়ি ফিরে সংসারের সমস্ত দায় তাদেরই বহন করতে হয়।

উপন্যাসে করম আলী ও বন্দে আলীর স্ত্রী-দের অবস্থা বর্ননা করতে গিয়ে অদ্বৈত মূলতঃ তৎকালীন সমাজের নারীদের দুর্দশাকেই তুলে ধরেছেন যা আজও আমাদের বর্তমান সমাজে সমান প্রাসঙ্গিক।

তিনি ছিলেন বাস্তববাদী লেখক। তাঁর লেখায় কল্পনা ও রোমান্টিকতার কোন স্থান ছিল না। কলমের কালির তুলিতে তিনি বাস্তবের ছবি আঁকতেন।যা আমরা তাঁর "তিতাস একটি নদীর নাম" উপন্যাসে দেখতে পাই।

লেখক, ঔপন্যাসিক অদ্বৈত মল্লবর্মণ তিতাস নদী ও মানুষের অন্তরাত্মার ছবি এঁকেছেন। তিতাস তাঁর কাছে একটি নদীই শুধু নয়, তিতাস যেন তাঁর কাছে এক জীবন্ত জলপরি।তার বুকে কান পেতে তিনি শুনেছেন তার বুকে বয়ে যাওয়া জলের গোপন কথা, তার বুকে বসবাসকারী জলজীবি মানুষের মনের গোপন ব্যথা বেদনার কথা।জল ও জীবনকে তিনি এক করে দেখেছেন। অধ্যাপক শান্তনু কায়সার একারনে " তিতাস একটি নদীর নাম" উপন্যাসকে নদী ও মানুষের যুগলবন্দী বলেছেন।সুস্নাত জানা বলেছেন , " জেলে জীবনের মহাকাব্য"।

তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসে লেখক অদ্বৈত মল্লবর্মণ মালো সমাজের জলকেন্দ্রীক জীবন জীবিকা, সমস্যা সংকটের পাশাপাশি অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সাথে তাদের জীবন প্রবাহের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত লোক সংস্কার, লোক রীতিনীতি ইত্যাদি উপস্থাপন করেছেন। জীবন জীবিকা, সমস্যা সংকট, আচার আচরন, খাওয়া খাদ্য, সংস্কৃতি সবটাকে লেখক আশ্চর্য দক্ষতার সাথে তুলে ধরেছেন। তাছাড়া তাঁর বিভিন্ন প্রবন্ধে নিবন্ধে লোকসংস্কৃতির নিখুঁত বর্নাঢ্য সমাহার আমরা দেখতে পাই।যেমন -- ত্রিপুরার বারমাসী গান,পল্লীসংগীতে পালাগান,মাঘমন্ডল,বরজের গান, শেওলার পালা, ভাইফোঁটার গান, অপ্রকাশিত পল্লীগীতি, অপ্রকাশিত পুতুল বিয়ের ছড়া, অপ্রকাশিত বাউল সঙ্গীত ইত্যাদি।

তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থে মাটির কাছাকাছি অন্ত্যজ শ্রেনীর অবহেলিত নিষ্পেষিত অংশের শিক্ষার এক আলোকপ্রাপ্ত এক আধুনিক মনের মানুষ।

মালো সমাজের রিক্ততা,নিঃস্বতা বর্ণনা করেই তিনি ক্ষান্ত থাকেন নি।এই রিক্ততা,নিঃস্বতার মধ্যে দিয়ে জমি ও জলের শোষিত মানুষ কেমন করে ঐক্য,অভিন্নতা এবং আত্মীয়তা অনুভব করে - সেই অনন্য চিত্রটিও প্রস্ফুটিত করে তুলেন লেখক অদ্বৈত মল্লবর্মণ।

মানুষে মানুষে সম্পর্কেরই এক বিশেষত্ব সেখানে ফুটে ওঠে। অনন্তর মার মৃত্যু হলে বাবা মার সঙ্গে বিবাদ করে বাসন্তী অনন্তকে আগলায়। সেই অনন্তই অভিমানে তাকে ছেড়ে যায়। বনমালীর নৌকায় উদয়তারার সঙ্গে চলে যায় বনমালীর গ্রামে। নদীর বুকে নৌকা প্রতিযোগিতার সময় উদয়তারাদের কাছে মার খায় বাসন্তী, অনন্তকে ফিরে পেতে চায়।পরে তিতাসের জলে দাঁড়িয়ে তারাই আবার দুজনে মিলে অনন্তর কথা পাড়ে।কত বিচিত্র অনুপঙ্খ ই না ধরা পরে নদী পাড়ের মানুষদের ঘরে বাইরের জীবন।

তিতাসের তীর জুড়ে মানবসমাজের যে বসতি গড়ে উঠেছে, সেই প্রকৃতির কোলে বসবাসকারী মানুষের যাপিত জীবন,হাসিকান্না, মানবিক মূল্যবোধ, জীবন বোধ, সংস্কার,লোকজ বিশ্বাস, দারিদ্র্য - অশিক্ষা - অনাহারের অর্থনৈতিক জীবন, সংস্কৃতি ও শোষণের অভিঘাত ফুটিয়ে তুলেছেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ তাঁর এই উপন্যাসে। যার প্রাসঙ্গিকতা ও গুরুত্ব আজ ও আমাদের কাছে সমান বহমান।


শ্রীঅনির্বাণ

ওরা, প্রগতি চায় না 
                  
সত্যকে সত্য বলার অধিকার ধর্মে নেই।
অবাস্তব অবিশ্বাস্য হলেও 
নির্বোধের মতো মেনে নিতে হবে তোমাকে, 
নতুবা নাস্তিকতায় লেখাতে হবে নাম।                    
ধর্মীয় গ্রন্থ বাইবেল রামায়ণ মহাভারত কোরানে
ব্যাখ্যা ছিল -সূর্য পৃথিবীর চতুর্দিকেই ঘুরে ।
বিজ্ঞানী কোপার্নিকাস প্রথম বলেছিলেন-সূর্য নয় 
পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরে। 
ধর্মীয় ভাবাবেগের বিশ্বাসে আঘাতের 
অপরাধে ধর্মযাজকের অঙ্গুলী হেলনে 
জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের মুখোমুখি হন,
কোপার্নিকাসকে সমর্থন করার অপরাধে 
জর্দ্দানো ব্রণোকে সাত বছর জেলে পুড়ে 
অবশেষে নৃশংস হত্যা। 
সত্যকে সত্য বলার অপরাধে লিভোসিয়াকে 
খুন করা হয়েছিল গলা টিপে।
কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে গ্যালিলিও বলেছিলেন 
আমি আবারও বলছি, সূর্য স্থির 
পৃথিবী সূর্যের চারদিকেই ঘুরে ।
আমাকে শাস্তি দিয়েও
সূর্যের চারপাশে পৃথিবীর প্রদক্ষিণ
আপনারা বন্ধ করতে পারবেন না, 
পৃথিবী আগের মতই ঘুরবে। 
বিচারশালায় অট্টহাসিতে সাজা 
সারা জীবন গৃহ বন্দি,
সত্যকে সত্য বলার অপরাধে 
অত্যাচারের তীব্রতায় এঞ্জেল টিউরিঙ্গ
বাধ্য হয়েছিলেন আত্মহত্যায়।
ধর্মীয় সতীদাহ প্রথা বন্ধ করার আন্দোলনে 
পিতা রমাকান্ত রায়ের ত্যাজ্য পুত্র হলেন রামমোহন, 
গর্ভধারিনী মা সন্তানের মৃত্যু কামনায় 
প্রার্থনায় রত ইষ্ট দেবতায়। 
আসলে তথাকথিত ধর্মীয় গোঁড়ামি 
কোনদিন মানবের প্রগতি চায় না
 চায় শুধু প্রতিপত্তি ও নিজস্ব সাম্রাজ্য।

পঙ্কজ কান্তি মালাকার

আশ্রয়

যদিও রাতে আঁধারে চরাচর ঢাকে 
ওপিঠে আলো থাকে,
যদিও উপত্যকা বন্যায় জলমগ্ন
কোথাওতো ভূমি জেগে আছে -
জলপ্রলয়েও মন্দার ভেসে ছিল;
ধৈর্যেরে আরো দু'পা এগিয়ে দাও আশ্রয়।

পূর্বে ভেগেছ চিতার থাবা থেকে
এবার নাহয় উপত্যকার স্রোতের থেকে,
জীবনের আশ্রয় আসলে দৌড় খেলার জয়।

ঘাড় ঘুরিয়ে দেখো কাঁধে শ্রমণকুমারের বাঁক,
এই বোঝাই তোমার শক্তি তোমার ভক্তি
হাঁটুর ধৈর্য- দায়,
চলাই তোমার অধিকারে,আশ্রয় স্থানসন্মত।

তোমাকে যে দৃঢ়পণে এগোতেই হবে,বীর।


টিংকুরঞ্জন দাস

ছবি প্রেম 

পলকহীন তাকিয়ে থাকি ছবিটার দিকে 
তেমন কোন বিশেষত্ব না থাকলেও 
ছবিটাকে বারবার দেখতে ইচ্ছে করে। 

সব তো একই রকম 
সেই নাক, চোখ, ঠোট, বুক, স্তন 
সবকিছুই তো প্রতিটা নারীতে থাকে 
তবু কেন বারবার চোখ ফিরে যায় ছবিটার দিকে? 

ছবিটার প্রতি একটা মোহ জন্মে গেছে 
দৃষ্টিহীন হয়ে গেলেও শুধু গন্ধ শুঁকে 
বলে দিতে পারব ছবিটা কার 
আমি যে প্রেমে পড়ে গেছি সেই ছবিটার।

এই ছবির মালিকানা সম্পূর্ণভাবে আমার না হলেও 
নির্দ্বিধায় বলে দিতে পারি সে একমাত্র আমার 
যেদিন কেউ এসে তুলে নিয়ে যাবে 
সেদিন তার স্থলে আমার নিথর দেহটা পড়ে থাকবে।

রাহুল সিনহা

একটি ফেসবুক পোস্ট

আমি কভার ফটোগ্রাফে কমরেড লেনিনের ছবি লাগিয়ে লিখলাম 'লাল সালাম!'  আর সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এলো জাতীয়তাবাদী ট্রোল সেনা,শুরু হলো হুমকি,  মাওবাদী বলে কাঁচা খিস্তি আর 'চীনের দালাল' বলে

চৌদ্দ পুরুষের আদ্যশ্রাদ্ধের প্রক্রিয়া। 

আমি আমার 'বায়ো'তে লিখলাম,

'এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ নয়'।

আর ঠিক তিন মিনিট পরই সতেরোটা রিপোর্ট,মেসেঞ্জারে 'ভক্ত'দের হুঙ্কার, সরকারি খরচে চীন বা কিউবায় পাঠিয়ে দেবার ঘোষণা। 

নিখরচায় বিদেশ ভ্রমণ করার আশায় যখন খুশি হয়ে উঠছি, তখনই দেখি, দরজায়

কড়া নাড়ছে একুশ শতকের ভারতীয় গেস্টাপো বাহিনী। 

একটা 'না কবিতা' এই অবধি লেখার পর আমি সিগারেটের অনুপান হিসেবে এক কাপ তেতো কফির তৃষ্ণায় রাস্তায় নেমেছি, আর  ফিরে এসে দেখি, আমার ছবি সহ ভাইরাল ফেসবুক পোস্ট, 'সর্বহারার দলের কর্মীর 

আজকাল আর চায়ে হচ্ছে না, এখন কফিও চাই'।

মধুমিতা ভট্টাচার্য

না ফেরা 

বাসি রাতের ভেতর তারাদের জৌলুশ খুঁজে
পুঁজ জমা গদগদে ক্ষত শুকোবে না
কতবার চোখ নামিয়েছি পায়ের বুড়ো আঙুলে 
মাটিতে মিশে যাবো বলে
পারি কই 
ছেঁড়া পালকের রক্তদাগ লেগে আছে আয়নায় 
নীরবতার বুক ভাঙা শব্দ বিদ্যুৎ চমকানো রাতের
পুঁজি 
সামনে দাঁড়িয়ে নির্লজ্জ আঘাত
পলিথিনের মতো মাটিতে মিশে যাবার ভান করে 
পাখির আত্মহত্যার কারণ
জাটিঙ্গার বাতাস কি জানে ?

যে যায় তাকে আর ফেরানো যায় কই !

মঞ্জু দাস

 বন্দি

যুবক যুবতীরা ভীড় করে 
ভাষনের ময়দানে 
থিক থিক ভীড়ের পদভারে 
পাতাল কাঁপে।

এ ময়দান থেকে ও ময়দানে
যুবক যুবতীদের স্বপ্ন সাঁতার 
কেউ কেউ ডুবে যেতে যেতে
স্বপ্ন আঁকড়ে থাকে 
কেউ কেউ  ভাবে ডাহা মিথ্যে
সবাই একসঙ্গে জ্বলে। 

স্বপ্নরা সব ভোটের বাক্সে বন্দি
ডাহা-ডাহা মিথ্যেরাও।।

মীনাক্ষী চক্রবর্তী সোম

একবুক বৃষ্টিকথা দূরত্ব

গভীর মন্দ্রিত আষাঢ়ের ঘনঘটায়
অবিরাম ঝরছে মেঘের শোকবারি
রিমঝিম একতান তুলে বৃষ্টিরা কথা বলে  
স্মৃতির আঁচলে কুড়োন সময় 
বৃষ্টির সাথে ঝেঁপে আসে।
ভিড় জমে প্রকোষ্ঠের গভীরে
ঋজু মেঘ প্রেমবার্তা ঢালে সকুশলে
খরাযাপিত প্রকৃতির অতৃপ্ত বুকে 
উর্বরা হবার আশায় প্রতীক্ষার প্রহর বেয়ে
নেমে আসে জলভার।
ধারণের অশরীরী আবেদন একগোছা ফুলের মত
ঝরে পড়ে হারিয়ে যাওয়া ধুলোর ওপর।
কবেকার মনোময় সময়ের হিসেব 
রাখেনি কেউ, তবু বৃষ্টি আসে।  
ভাবনাকে প্লাবিত করে বৃষ্টি পড়ে অঝোরে 
শুষে নেয় প্রকৃতির ঘনায়িত উত্তাপ
তারপর ফিরে যায় সাদাকালো মেঘের পাহাড় 
রেখে যায় দায়ভার একবুক তৃষিত যাপনকথার 
তখন তোমার আমার মাঝে বাস করে
একবুক বৃষ্টিকথা দূরত্ব।।

তাপস দত্ত

বিশ্বাস 
 
বিশ্বাসের তকমা হারিয়ে গেছে,
শুধু আছে ঝাপসা্ এক মায়া।
ঘরে ফেরার বৃথা চেষ্টায়
হাসি মুখে দুঃখ ফেরী করে,
নীরবে সয় যন্ত্রনা পলকহীন দৃষ্টিতে।

ঘণীভূত দীর্ঘশ্বাস স্থায়ীত্ব কতটুকু?
জানে না, আজ ও বোঝা হয় নি।
অপেক্ষার পান্ডুলিপিতে লেখা হয়েছে কত কবিতা,
শুধু পেছনে ফিরে দেখা হয় নি।

স্মৃতির পাতা ভেসে বেড়ায় অশ্রু ঘেরা জলে,
দৃঢ বিশ্বাস ফিরে যাবে তো নিশ্চয়,
শান্তির খোঁজে!মায়ের কোলে।

অনুপ দেবনাথ

অকাল বোধন

আমার শ্রাবন সন্ধ্যাবেলায়
পুকুর ঘাটে,উঠোনে,চৌকাঠ- বারান্দায় 
হয়না আর কোলাহল! 
বুঝে গেছি সন্ধ্যা ঘনিয়ে অন্ধকার রাত।
এখন শুধু স্মৃতির ঘড়িতে বাজে ঘন্টা ধ্বনি। 
মাঝেমাঝে, ডাইরিতে কান পাতলেই শোনতে পাই-
কত গুঞ্জন, মধুর আলাপন।
ভাবছি, আমাকে আমিই করবো অকালবোধন!
চারিদিকে প্রদীপ,বাদ্য,বাজনা ।
জানাবো তোমাদের আমন্ত্রণ।

স্বরূপা দত্ত

১) সুদিন

তোমরা যারা অসহিষ্ণু, পশ্চিমে এসে বসো
পশ্চিম আকাশ অপেক্ষা করতে শেখায়। 
সে জানে অপেক্ষার ফল মধুর হয়। 
এখন আলোর কিরণ তির্যক,
 ভূমন্ডলে তীব্র তাপ প্রতিফলিত হচ্ছে। 
সবেতে ঘাম নিঃসৃত যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। 
একটু বসো, কিছুক্ষণ অপেক্ষা কর, 
দেখবে অস্তরাগের গান গেয়ে
পাখিরা উড়ে যাবে দিগন্তের দিকে। 
আকাশ তখন হেসে বলবে, "শুভ সন্ধ্যা"।

২) অভিমানী মেঘ

বাইরে এখন গ্রীষ্মকালীন রাগ ঝরছে 
একটু পরে অভিমানী মেঘেরা অঝোরে কাঁদবে। 
ঘরের এক কোণে দুঃখ জ্বেলে রাখা মেয়েটা হয়তো জানেনা,
জল থই থই ঘরে উরু ডুবে গেলে 
বুকের আগুন ঠিক নিভে যাবে, 
ভেসে যাবে অতীতের সব জমানো স্মৃতি। 
মেয়েটা তখন বুঝতে পারবে 
যাকে ধরে রাখা যায় না 
তাকে একদিন ভেসে যেতে হয়।

সুধীর দাস

আত্মোপলব্ধি

নিষ্প্রাণ দেহ পড়ে আছে বালি  ঘাসের ওপর,
একদল লোক পাশে গান জুড়ে হরিবোলা বোল হরি,
আর একদল আধুনিকতার ছোঁয়ায় নেশায় আসক্ত ।
তাদের নাকি এটাই ধর্ম বিশ্বাস।
দুয়েকজন নিয়ে আসে কাঠকুড়ো আর কেরোসিন তেল।
পুরোহিত মশায় বলে যাচ্ছেন তার সংস্কৃত পাঠ,
কেউ শোকাহত , কেউ শির্নত , কেউ নেশাগ্রস্ত।
দাউ দাউ করে জ্বলে আগুন ধুয়ে মুছে হবে সব ছাই।
কোথায় আত্মগরিমা? কোথায় জয় করা রাজ্যের বিজয়কেতন?
কোথায় সারাজীবন লুটে খাওয়া  ধনসম্পদ?
কোথায় আত্মীয়পরিজন?
সবকিছুই বৃথা এ জগত সংসারে।
থেকে যায় শুধু কর্মের নাউ আর বদনামের ঘানি।

এ দেহ ক্ষণিকের সময় পায়নি করতে আত্মোপলব্ধি।

দিব্যেন্দু নাথ

পুটকিবায় ভরি দে

- এখন আর কিতা করাইতে? 
- হিনান।
- করতাম নায় আমি।
- কেনে?
- ঠাণ্ডা চায় না বে শরীলে।
- কইলে অইল-নি! দুই দিন ধরি ছানপানি নাই। 
- যে-তা মনে অর, অ-তা কর-রে। লম্বাটানে বিরক্ত প্রকাশ করে লবণি নাথ বললেন।
- ভালা হওয়া লাগত নায় নি তোমার?
- কিগ্গিয়ে কইছে বে, আশি বছরর মানু ভালা অইন আবার।
- না অইলে নাই; ছান করা লাগব আইজ। 
- বাদ-দিলা রে বা, কাইল করমু!
- না। আমার এক মাত!
- তোর কথা মতোঔ তোৎ হক্কলতা অর। 
- অইতো নানি! আমি কিতা হরু নি অখন? 
- অয় অয়, বেটা বনিগেছচ।
- তুমি কইলে, বনছি আ-রি।
- অতার-লাগি বাপোর লগে বেটাগিরি দেখাইতে?
- ইতা রে বেটাগিরি কইন নি?
- তে কিতা কইন! বে-মা-রি শরীল পাইছচ তো...!!
- হরুকালো আমি একদিন ছান না করলে, কিতা করতায়, পাউরি লাইছো নি? 
 
সঙ্গে সঙ্গে প্রসঙ্গ পাল্টে দেন বৃদ্ধ লবণি। কড়মড় করা হাড়ের যন্ত্রণায় শরীর কাতর। তবুও অভিমানভরা স্বরে বললেন, - টেকার হরাদ কররে।
- করমু তো।
- কিতার-লাগি?
- লবণি নাথোর অটাল সম্পত্তি, ইতা খাইবো কেগ্গুয়ে?
- তোমরার বাঁচা লাগত না-য়নি?
- বাঁচমু এমনেও।
- পাঠাইলে তো ভেলোর, চেন্নাই। আর কোনোবায়...! বাদ দে রে-বা।
- ইতা অইত নায়। 
- তে কিতা অইত?
- আবার পাঠাইমু।
-  কুবাই?
- হায়দ্রাবাদ।
- হিনোর ডাক্তার ইগু ভগবান নি বে?
- অইলে অউক, নাঅইলে নাই, যাওয়া লাগব তোমার। বলেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠল লোচন। 
- কাঁন্দচ কেনে? 
- কৈতাম পারতাম নায়। 
- বুঝিয়ার, বাপোর মায়া। কাঁন্দিচ না। তোর মা আর বইন-অগুর খিয়াল রাখিচ। বলতে বলতে শায়িত লবণি নাথের অশ্রুসিক্ত নয়ন দুইটির কোণা বেয়ে পড়তে লাগল জল।
- আমি ইতা পারতাম নায় রেবো?
- কিতা পারতে নায় রে বাবা, লোচন? বলে, হাতে আনা গরম গ্লাসের দুধে চামচ নাড়াতে নাড়তে ঘরে প্রবেশ করলেন লবঙ্গলতিকা দেবী। 
- হুনো! বাবার মাত?
- কিতা মাতরায় তার লগে?
- কোনতা-নায়।
- আইচ্ছা কইয়ো না; আমার হুনা লাগতনায়, আছে-এউ বাপ বেটার দরবার। অখন হা করো, দুধ এক চামুষ দেই? 
- আধা চামুষো খাইতাম নায়? 
- খাইলাও রেবা? আনতস্বরে লোচন বলল। 

অসুস্থ লবণি বুড়া রাগছেন। মুখে বহুদিন ধরে রুচি নেই। খাবারের কথা বললেই তিক্ততায় ভরে যায় মগজ। আনকোরা স্বরে বললেন, - আমার পুটকিবায় ভরি দে। 
- ইতা কিতা কউ পুয়ারে? পাশ কাটিয়ে বললেন লবঙ্গলতিকা। 
- তে কইতাম কিতা? গলা-বায় যে কিচ্ছু গেলে, খালি পুরপুরাইয়া জ্বলে। ই কথা ইখান তোমরারে আর কয় দিন কইতাম? অঃ মর ফাটা কপাল! কই বেটা ঠাকুর? দেখরায় নানি আমারে! আর কয়দিন রাখতায় ইলা...।

নীলিম রায়

রঙের বসন্ত 

বসন্ত সর্বদা আবিরের উৎসব হয়ে আসেন,
জীবনের রঙ হয়েও আসে।
তাকে দেখা যায় বহুরূপে বহু ভাবে --
বসন্ত রজনীগন্ধার হাট 
কখনো  বা রোদে পোড়া মাঠ।

বসন্ত উপোস করা তারিখ 
আবার কখনো পূর্ণিমার চাঁদ,

বসন্ত কখনো রঙিন ডালপালা
অথবা কবিদের হৃদয়ের মন্বন্তর।

বসন্ত সর্বদা ফুলের আগুন নয়,
 বসন্ত কখনো দুর্ভিক্ষের অব্যক্ত আর্তি।

বসন্ত সর্বদা রঙের উৎসব হয়েও আসেনা,
ঋতু পরিবর্তনের চিরন্তন সত্য হয়েও আসে।

ড. পূর্বিতা গুপ্ত

কবিতার জন্ম

কবিতা, তুমি ধ‍্যানপ্রিয় সত্ত্বা
তোমার অন্ত:গুহার 
ডুবুরি তুমি নিজেই
ভিতরে প্রবল ঝড় 
শব্দেরা জোটবদ্ধ 
তাই সৃষ্টির আয়ুধকে
শাণিত করছো তুমি
করছো নিয়ত
নীরবে-গোপনে
ঠিক তখনই 
তোমার ধ‍্যানস্হ হৃদয় 
ডাক শোনে
অবয়বজুড়ে চোখ রাখে
বাহুডোরে মিলন দুজনার
অন্ত:প্রকাশ ও বহিঃপ্রকাশের 
সুক্ষ্ণ সমীকরণ শেষে
মধুর হাওয়া আবেশে
চেতনার জন্ম হয় 
বোধ জাগ্রত হয় 
কবিতা, তুমি ধ‍্যানপ্রিয় সত্ত্বা

দেবব্রত চক্রবর্তী

থাপড়াইয়া দাঁত ফালাই দিমু

আমাদের পাড়ার বিকাশ কাকু, উনি নিঃসন্দেহে গুণবান এবং শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। উনাকে দেখলে আমরা মাথা নত করে চলি। উনার মধ্যে একটি অভিভাবক শুলভ আচরণ লক্ষ্য করা যায়, যা আমাদেরকে মাথা নত করে দিতে বাধ্য করে। তো সেই কাকুর সম্পর্কে একটি কথা, কাকু ব্রাহ্মন,কর্মসূত্রে পৌরহিত্য করেন বা করে থাকেন। এটাই তাঁর পেশা।কাকু সাংসারিক মনোযোগী সচেতন মানুষ। এক ছেলে আর এক মেয়ে নিয়ে চারজনের সংসার, ছেলে মেয়েদের পড়াশোনা নাচ গান তবলায় খামতি নেই লালনে। পারিবারিক ও আনুসাঙ্গিক খরচায় মোটামুটি চলে যায় মাস।উদ্বৃত্ত ইনকাম বলতে কিছুই নেই এই কাকুর পরিবার।সেই সুবাদে সৌখিন জীবন যাপন করার মতো সুযোগ কখনও কাকুর জীবনে আসেনি। খুব অল্প বয়সে পিতৃ হীন হওয়ায় নিজেই নিজেকে কাঁধে নিয়ে তৈরি করেছেন ভালোবাসা নামক সংসার। নিজেকে পাথরের মত আঘাত করতে করতে চারজনের সংসার সুখী ও সুন্দর করে তুলছেন কাকু।দুর থেকে দেখলে মনে হয় যেন বাচ্চা শিশুর মত খিলখিলিয়ে হাসছে এনাদের সংসার। পারিবারিক জীবনের বাইরের কেউ বুঝতেই পারবে না, এই সংসারেও কেউ নিজেকে পুড়িয়ে সোনামুখ হাসি ফুটিয়ে তুলেছেন। এইভাবেই নিজেকে সামনে রেখে প্রতিনিধিত্ব করেছেন নিজের সংসারের‌।
   একদিন হেলায় কিংবা বলা যায় কৌতুকের ছলে কাকু কাকিমণিকে বলেছিলেন_
 'বেশি কথা কইয়ো না, থাপড়াইয়া দাঁত ফালাই দিমু।'
  জীবনের একমাত্র সহ-সঙ্গী কাকিমনির প্রতি শ্রদ্ধবনত প্রেম,হাজারো যন্ত্রণার শাক্ষী কাকিমনির দেখছেন কাকুর জীবনে আসা দৈন্যতা, দেখেছেন নুনভাতের সকাল,একপাতে মেখে ভাত খেয়ে ও সুখে থেকেছেন দু'জনে।হয়তো রাত্রী নিশীথে একে অপরে আবদার বায়না,চোখের জল মুছতে মুছতে ছেড়ে এসেছেন জীবনে।এই উপলব্দি কাকু একা করেন নি কাকিমনি ও ভাগ করে নিয়েছেন। 
তাই হয়তো কাকুর বলা কটু কথা কাকিমনির নিজের গায়ে মাখে নি।
বেখেয়ালে,হেলায় বলে যাওয়া কথাগুলো জুড়ে যায় জীবনের সাথে কেমন করে। যেন বিক্ষিপ্তভাবে ক্রমাগত আঘাত হানে আমাদের জীবনে, আসলো কাকু কাকিমণির জীবনেও। কালক্রমে বহু বছর পর কাকিমনির সামনের দাঁত দুটো পড়ে যায়, পোকার আক্রমণ। যাই হোক বিষয়টা স্বাভাবিক দাঁত পড়া এটা প্রায় সবারই হয়ে থাকে। কিন্তু, মূল ঘটনা হলো এখন কাকিমনি এই দাঁত পরা মুখ নিয়ে কোথাও যায় না,কোনো অনুষ্ঠানে ও যেতে অস্বস্তি বোধ করেন, লজ্জা বোধ করেন। তাই কাকিমনি নিজের অপরাগ আবেগের আবদারে কাকুকে বলেছেন_ "দাঁত দুটো লাগিয়ে দওনা গো্" যার মানেটা হল আর্টিফিশিয়াল বা আমরা যাকে বলি অপারেশন করে আলগা দাঁত লাগানো। এটাই বলেছিলেন কাকিমনি। যেমনি আবদার তেমনি বায়না পূরণে ব্যস্ত আমার কাকু। ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে বুঝা গেল যে পুরনো ক্ষয় হয়ে যাওয়া দাঁতগুলো ফেলে দিতে হবে তারপর নতুন আর্টিফিশিয়াল দাঁত লাগানো হবে। সেই মতো ছোটখাটো একটা সার্জারিও করতে হবে। শহরের নামকরা দন্ত বিশেষজ্ঞ ডক্টর 'শ্রীমান নন্দদুলাল শর্মা, উনার পরামর্শে দাঁত দুটুর জন্য অ্যাপোয়েন্টমেন্ট হয়ে গেল কিছুদিন পর। টুকটাক কিছু চেক আপ করার পর আসলো সেই শুভক্ষণ।
বহুবছর পর কাকু দেখবেন দাঁত মুখে কাকিমনির চাঁদমাখা হাসি।সেই অপেক্ষায় কাকু নতুন প্রেমিকের মতো করে আদর যত্নে কাকিমনি কে চিকিৎসা করিয়েছেন। কাকিমনির জীবনে আজ আবার নতুন দাঁত আসার সময়, নতুন দাঁত লাগানোর দিন। 
এমনই ঘন চৈত্র মাসে কালবৈশাখীর আবহে এক দ্বৈব প্রেমিক যুগল হাতে হাত রেখে, আঙুলে আঙুল চেপে বিনা আড়ম্বরে দাঁত দুটো লাগিয়ে ঘরে ফিরলো।আজ নব দম্পতির মতোই খুশি কাকু কাকিমণির পরিবারটি। যেন আর মুখে ভাত খাওয়ার দিন। বিকাশ কাকু আবেগপ্লুত ভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজে ঘরে গিয়ে পকেটে হাত দিয়ে দেখল সর্বমোট খরচ বাইশ হাজার টাকা। এমনই হেঁয়ালিপনায় বলে দেওয়া কথা 'থাপরাইয়া দাঁত ফালাই দিমু' এই কথাটির মূল্য গিয়ে দাঁড়াল ২২ হাজার টাকা। এইভাবে জীবনে লক্ষ লক্ষ টাকা আমরা হেলায় বল ফেলি,ভাবি না একটুকুও। ভাবা যায়? হিসাব করলে দিন শেষে আমরা গরিব হচ্ছি কাকার মত।

সৈকত মজুমদার

কুমীরাশ্রু

একদিন 
আমার অনুভূতি মরে যাবে 
আর আমি তোমাকে ভুলে যাব;

তোমার সব মিথ্যে প্রতিশ্রুতি
জাবর কাটতে কাটতে আমি
কোমায় চলে যাব!

আর আমার জীবন্ত লাশের পাশে
তোমার কুমীরাশ্রু ফেলবে...

অতনু রায় চৌধুরী

শূন্যতার ভীড়ে 

গভীর রাত নির্জনতায় ঘেরা 
ফিরছি বাড়ি একা।
জীবনের হিসাব করতে করতে 
আজ যৌবনের শেষ ছোঁয়া।
প্রশ্ন থাকে একা মনে, উওর অজানা।
ক্লান্ত শরীর বিশ্রাম খোঁজে 
তবুও হাঁটতে হচ্ছে একা।
ঘুমিয়ে আছে রাস্তার ধারে কুকুরের দল কত,
সেই রাস্তাতেই দাঁড়িয়ে আমি ভীষণ ক্ষুধার্ত।
অথচ কেউ নেই পাশে, নেই কোনো আবদার
ভরা শহরে শূন্যতার ভীড়ে এইভাবেই জীবন আটকে থাকে বারবার।

গৌরব নাথ

 সেফটিক পুঁজ 
 
চলো দেখে নেওয়া যাক একটা
একটা কী? হৃৎপিণ্ডে পালিশ লাগনো খোলা দরজা
ও তার ভেতর
কেউ যাওয়া আসা করে কিনা
কেউ থাকা খাওয়া করে কিনা
কেউ এমনি এমনি হাসতে হাসতে বলে উঠেছিল কি
এবার কাঁদতে চাই

তরল দম্পতির মেঝেতে প্রচুর বালুর ঝগড়া
আমার কানের পাশ দিয়ে যেতে চায়
যায়‌ও
কেন ছুঁয়ে যায় না অসম্ভব শীতলতার সেফটিক পুঁজ

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

প্রস্তাবনা 

তোমার গোপন দুঃখগুলো আমায় দিও
আমি তোমায় দেবো আমার সূর্যসকাল
ই-মেল নয়, জেল পেনেতে চিঠি দিও 
গোলাপ হয়ে লিখবো আমি তোমার নাম।

তোমার যত চোখের জলের হিমবাহ
উষ্ণতাতে গলিয়ে দেবো এক নিমেষে 
তুমি শুধু আপন করে 'বন্ধু ' বোলো 
সবুজ চারা বুনবো আমি মরুর দেশে।

বঞ্চনা আর হাহাকারে ভরেছে দিন
দুর্নীতি আর অবাধ লুঠের মহোৎসব
শান্তিপ্রিয় সুজন মানুষ গুনছে প্রহর
লক্ষ কোটি বেকার স্বজন ছন্দহীন।

তোমার মনের অনেক খবর জানা আমার
কাছের তবু অন্তরীনে আছো দূরে 
স্বপ্ন নিয়ে আসছে দেখো নতুন দিন
সংগ্রামীমন জ্বালাও আলো বিশ্বলোকে।

May 30, 2024

অপাংশু দেবনাথ

জলসত্রলিপি

সুতরাং এমন ভাবনাবসত তুমি যেতে পারো প্রান্তর ছাড়িয়ে,
স্বপ্নপ্রণয়ে কেউ এভাবে স্বজনের মাঝে স্বজন খুঁজে মরে! 
আমি প্রতিস্রোতে ছুটে যাওয়া এক বৈকালিক বৈভব।
হাওয়া ফুরোলে দমবন্ধ হয়ে আসে নীল ঘুর্ণমান ধোঁয়াভোরে।

অনাবৃষ্টিতে বিজয়সিঁড়ি কতোটা মোহময় ছিলো স্নায়ুসমর জানে,
কবে ঘরে সাজিয়েছো পাথর এখনো সমান উজ্জ্বল।
রাত্রি এক অপার মায়ারূপে জড়িয়ে ধরে, সাজো তুমি,
দিন থেকে দিনে গলে গলে পড়ে ঘৃণা, যাবতীয় প্রসাধনসামগ্রি।
প্রণয় তো একফসলা বৃষ্টি নয়, বন্ধ্যানগরীর পথধুলো ভাবো, 
ইচ্ছে-হাতে ঝাড়ু নিয়ে পৌর নর্দমা সাফাইকর্মী হবে?

পথে পথে আমার স্বজনের প্রশ্বাস লেগে আছে , ঘর্ম, তিয়াসও।
ইচ্ছেমায়া ছড়াই, সে পথে যাই , ছুঁয়ে ছুঁয়ে লিখি সমর্পিত জলসত্রলিপি।

সনজিৎ বণিক

অধিকার 

সময়টা ভালো নেই 

ভারতবর্ষের মানুষ দিন দিন হারিয়ে ফেলছে তার ঐতিহ্য ও অঙ্গীকারের ভাষা ,

সাধ আর সাধ্যের সীমারেখায় কেউ সহজ থাকতে চায় না,এক আজব ও মিথ্যে দুনিয়ার সাধ আর ষড়যন্ত্রের ভেতর মানুষ তার পারিপার্শ্বিক মানুষকেই  মিথ্যে দুনিয়ার পরিভাষায় লালন করতে চায় আর ভয়ঙ্কর সুন্দর স্বপ্নের ভেতর হারিয়ে ফেলছে এ সময়ের সুন্দর পরিবেশ।

অধিকার তো মনজুড়ে প্রাণ জুড়ে জেগে থাকতে চায় সকলেই , এই দেশ ভারতবর্ষ আমার তোমার ও এই দুনিয়ার, এখানে রোজ ভোরে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে পশু পাখিদের আনাগোনা, বাতাসের নীরব ঠান্ডা পরশ সব স্বপ্নের মায়াজালে জড়িয়ে রেখেছে আমাদের, এই সনাতন সুন্দর ভারতবর্ষ জেগে উঠুক মানুষের জন্যে আবার।

মিঠুন রায়

প্রবন্ধ 

শতবর্ষে গল্পকার বিমল চৌধুরী 

বাংলা সাহিত্য চর্চার ইতিহাসে অরণ্যদুহিতা ত্রিপুরা একটা বিশেষ স্থান করে নিয়েছে । স্বাধীনতার উত্তরকাল থেকেই কাব্যচর্চার পাশাপাশি ছোটগল্প রচনায়ও রাজ্যের লেখকদের অবদান নেহাত কম নয় । রাজ্যের প্রথিতযশা গল্পকার বিমল চৌধুরী এমনই একজন , যার অনবদ্য রচনায় শিল্প- সুষমার ছাপ বরাবরই পরিলক্ষিত হয় । এ বছর সাহিত্যিক বিমল চৌধুরীর জন্মবর্ষ। বাংলা গল্পের ভগীরথ বিমল চৌধুরীর লেখালেখি শুরু বলতে গেলে চল্লিশের দশকে । পাঠকের দরবারে তিনি রেখে গেছেন বাংলা গল্পের অপূর্ব সৃষ্টি সাম্ভার । গল্পকার বিমল চৌধুরীর জন্ম ১৯২৩ সালের ২৭ জুলাই বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার গেন্ডারিয়া গ্রামে । পিতা কামিনী ভূষণ চৌধুরী ও মাতা কিরণ শশী দেবী । ঢাকার জুবিলি স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন হবার পর কলকাতার আয়ুবেদ সারস্বত মহাবিদ্যালয় থেকে শিক্ষাপর্ব শেষ করেন । তাঁর কৈশোর সময়ে ঢাকার অন্যতম সাপ্তাহিক সোনার বাংলা ' যে কাগজে বুদ্ধদেব বসু লিখতেন , সেই কাগজে তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশ পায় । ১৯৪০ সালে তিনি আগরতলায় বসবাস শুরু করেন । ঐ সময় তিনি রাজ্যের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় বেশ কিছু কবিতা লেখেন । একসময় নবজাগরণ পত্রিকায় প্রথম তাঁর লেখা গল্প প্রকাশিত হয় । আসলে চারের দশক থেকে নয়ের দশক মধ্যবর্তী প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে তিনি প্রচুর গল্প লিখেছেন , অনেক কবিতাও লিখেছেন । একসময় “ তোরে নাহি করি ভয় ” গল্পের জন্য তাকে রাজরোষে পড়তে হয়েছিল । তাঁর লেখা “ জাগরণ ” অন্যতম সেরা গল্প । “ হিজল খালের কান্না ” , “ ভগীরথের তালা ' অথবা ' সোয়াদ ' গল্পগুলি আজকের দিনেও পাঠককে নতুন করে ভাবতে শেখায় । ১৯৪৬ সালে নবজাগরণ পত্রিকায় তাঁর প্রথম গল্প ' একটি কাহিনি' প্রকাশ পায়।১৯৪৯ সালে চিনিহা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়  তার প্রথম প্রবন্ধ চাকলা জমিদারি । বিমল চৌধুরী লেখক জীবনের শুরু থেকে যতগুলি গল্প

লিখেছেন , তাদের মধ্যে চরিত্রগত পার্থক্য প্রচুর । এমনকি একই সময়ের দুটি লেখা তাঁর আলাদা মেজাজ , আলাদা ধর্ম আলাদা প্রকৃতি , ফলে পাঠকের কাছে লেখক চরিত্র অনেকটা অস্পষ্ট মনে হয় । একসময় মানুষ পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যা সম্পাদনা করেন । একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে চার দশকের মাঝামাঝি সময়ে সমগ্র বাংলা গল্প সাহিত্যের ক্ষেত্রে বিষয় আঙ্গিক ইত্যাদির ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছিল । গল্পের পটভূমি , চরিত্র সংলাপের খেত্রেও লেখকগণ প্রচলিত পথ থেকে অনেকটা ভিন্ন পথে সরে এসেছিলেন । বিমল চৌধুরী মূলত ঐ সময়ের লেখক । রাজন্য শাসিত পার্বতী ত্রিপুরায় তিনি মূলত স্থানীয় মানুষের সুখ - দুঃখ , প্রেম ভালোবাসা , মানুষের প্রতিবাদকে ভাষায় রূপ দিয়েছেন । ১৯৭৩ ইং সালে আগরতলা পৌণমী প্রকাশনী থেকে বিমল চৌধুরীর প্রথম গল্পগ্রন্থ “ মানুষের চন্দ্রবিজয় ও তার নাম " প্রকাশিত হয় । এ গ্রন্থে জাগরণ , অনুভব , বনস্পতির মৃত্যু , আলোর পরে দেয়াল , অন্যস্বাদ সহ বেশকিছু গল্প স্হান পেয়েছে । 

 এ গ্রন্থের ভূমিকায় লেখক লিখেছেন- গল্প মূলত প্রতীতির সমগ্রতা ও লেখকের ব্যক্তিমানসের তাৎপর্যময় দিক বলেই জীবনের চলস্রোতে একই প্রসঙ্গ নানাভাবে প্রতীকীগত হয়ে চলেছে । শুধুমাত্র পরিবর্তনশীল সমাজ জীবনের কথা ও বৃত্তান্তই শেষ কথা নয় , গল্প সাহিত্য লেখকের অন্তর্নিহিত কল্পনামিশ্রিত মানসিকতার ও শিল্পবিন্যাস । এই বিন্যাসকে কোনো সংজ্ঞা দিয়ে বেঁধে দেওয়া সম্ভব নয় বলে গল্পের রসাস্বাদন পাঠকের রুচির উপর নির্ভরশীল । 

  চারপাশের প্রকৃতি , মানুষ ও তার অন্তর বহি : সংঘাত বহমান জীবনের খণ্ডচিত্র সমূহ গল্পের উপকরণ । সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষের ব্যক্তি জীবনের অর্থনৈতিক সমস্যাকে তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন “ মানুষের চন্দ্রবিজয় ও তার নাম "গল্পে । গল্পটি ১৯৬৯ সালে লেখা । আবার দেশভাগের যন্ত্রণা , হিন্দু - মুসলমানের সংঘাত সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে দৃষ্টান্ত , পিপীলিকা উপখ্যান , হিজলখালের কান্না ইত্যাদি গল্পে । ১৯৯৭ সালে প্রকাশ হয় তাঁর লেখা অন্যতম গল্প সংকলন ভগীরথের তালা । মূলত ১৯৬১ ১৯৯৪ সালে পর্যন্ত লেখা ১৮ টি গল্প স্থান পেয়েছে এই সংকলনে । এই সংকলনে সদর উত্তরের চা বাগানের পটভূমি নিয়ে তৈরি গল্প সোয়াদ স্থান পেয়েছে । ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত হয় তৃতীয় গল্প সংকলন “ নায়কের জন্ম ” । প্রকাশক প্রত্যাশা পাবলিকেশন । এ সংকলনে ২৪ টি গল্প স্থান পেয়েছে । ভূমিকা লিখেছেন অধ্যাপক ড.শিশির কুমার সিংহ । এ সংকলনে রয়েছে “ ত্রিপুরা ৮০ ” , “ আর এক সমুদ্র ” , “ অন্য ক্ষুধা " , " বৃষ্টির স্বাদ " " এক চিতল হরিণ " । গল্পগুলোর মধ্যে অনেকটা নতুনত্ব আনার চেষ্টা করেছেন লেখক ।   অন্য ক্ষুধা গল্পে লেখক তুলে ধরেছেন সমাজে অবহেলিত এক ব্যক্তির দিনলিপি । সারাদিন পান বিক্রি করে কাটে যার জীবন । এ মানুষটির মনে আছে অনর্থ ক্ষুধা । একসময়ের সহপাঠী সুব্রত এসে হাজির হয় আচমকা তার জীবনে ।নানা প্রান্তের মানুষের কাহিনী শুনে উধাও হয়ে যায় সে।তারপর ঐ অবহেলিত মানুষটির জীবনে আসে নানা পরিবর্তন । সবমিলিয়ে গল্পটিতে এসেছে অন্য অনুভূতি । লেখালেখির স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন ত্রিপুরা রাজ্যে প্রথম রবীন্দ্র পুরস্কার । আসলে বিমল চৌধুরীর গল্পে কখনো রোমান্টিকতা , কখনোবা বাস্তব সামাজিক অব্যবস্থার প্রতিবাদের বিষয় স্থান পেয়েছে । মানুষ ও মনুষ্যত্বের সর্বাপেক্ষা তিনি আজীবন কলম চালিয়েছেন। 

 ২০০১ সালের ৬ অক্টোবর ৭৯ বছর বয়সে বিমল চৌধুরী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

পরিশেষে বলা যায় , কথাসাহিত্যিক বিমল চৌধুরী তার গল্পের আঁটোসাঁটো গাঁথুনিতে বাংলা ছোটগল্পকে শক্তিশালী করেছেন । রোমান্টিক মানসিকতার পাশাপাশি মানবিক আবেদন ফুটে উঠেছে তার লেখা গল্পগুলিতে । তাইতো তিনি একজন ব্যতিক্রমী গল্পকার । জন্মশতবর্ষে তাঁর রচনাবলী পুনঃপাঠ জরুরি ।

দেবারতি গুহ সামন্ত

শোপিসটা

শোপিসটা ভেঙ্গে গেল অসাবধানতায়,
উঁচু তাকে পড়ে ছিল অবহেলায়,
পরতে পরতে ধুলো জমেছিল,
চকচকে কাঁচে আবছা আঁচড়।

টুকরো কুড়োতে গিয়ে,
হাতে গেঁথে গেল কাঁচ,
রক্তক্ষরণ হলো,
হাতে এবং হৃদয়ে।

মনে পড়ে গেল,
উপহার প্রদানকারীর কথা,
এতোদিন যত্নে লুকিয়ে ছিল মনের সিন্দুকে,
আজ বেড়িয়ে এলো,নির্লজ্জ ভাবে!

অলকা গোস্বামী

ভালো থাকা সহজ 


গভীর কষ্টে যখন
বুকের পাঁজর গুলো কেঁপে উঠে ,
ইচ্ছে করে রাশ খুলে 
মনের সব কথা খুলে বলি তোকে।
তোর হরিণ চোখ আর 
ছেলেমানুষী ভরা মুখটি দেখে
ভরসা পাইনা।
চাইনা তোর চোখ ভরে উঠুক
আমার কষ্টগুলো মেপে।

দৃষ্টি ঝাপসা হচ্ছে ক্রমশ
ওই দূরের নীল আকাশ 
ছুঁয়ে যায় 
লাল কৃষ্ণচূড়া।
মাথার উপর দিয়ে উড়ে যায়
ক্লান্ত পাখি সব।
 ভালো থাকা সহজ,
যতক্ষন আলো ছড়িয়ে থাকে।
শুধু ভয়
অন্ধকার হবার আগে যেন 
ঘরে ফিরতে পারি।

প্রিয়াঙ্কা দেবনাথ

বৃষ্টি

বৃষ্টি আমার বুক থেকে
স্বপ্ন কেড়ে নেয়।
কেড়ে নেয় শান্তির ঘুম।

বিনিদ্র রাত পোহায়,
রাত জুড়ে ডেকে যায় সাইরেন
চারপাশ নিশ্চুপ, নিঝুম।

ভারী হয়ে উঠে বাবার
তপ্ত বুকের বাঁ পাশ।
বৃষ্টি তাকে শীতল করতে পারেনা।

প্রতি বর্ষায় বেড়ে যায়
মায়ের চোখে উৎকণ্ঠা।
আমার ব্যর্থ দুচোখ দেখেও দেখেনা।

বৃষ্টি আমায় রোমাঞ্চিত করেনা।
হারিয়ে যাই একরাশ শূন্যতায়,
বৃষ্টি আর আলোর ঝলকানি তে।

রিপন সিংহ

তোমার রহস্য

পৃথিবী আজ কতদূর এগিয়ে! আমি সেই পুরোনো পথে,
অর্থহীন, ব্যর্থ এক নাবিকের মতো
অপরিচিত এক নতুন জগৎ, লোকালয় থেকে দূরে
অনেকটা দূরে---
আমি এক ভুল শূন্যতার মধ্যে
সমস্ত কিছু,
শিশুকাল হয়ে, জন্ম থেকেই অনাথ;
আজও! হয়তো আজীবন
জীবন প্রায় থমকে গেছে
তবু তোমার রহস্য আজও শূন্য আমার কাছে।

সূত্রা সরকার সাহা

দিগন্ত রেখায় 
 
উদাসী মন ধেয়ে যায় দিগন্ত রেখায়,
শূন্যাঙ্কের বৃথা সমাধান খোঁজে নীল নীলিমায়,
মন ধায় ঘন কালো মেঘের ঘনঘটায়,
অশান্ত হৃদয়ের উথাল পাথাল ঢেউ নিঃসঙ্গতায়।

জ্যোৎস্নার মিঠি আলোয় পূর্ণতার আশা জাগায়,
অমানিশার ঘোর অন্ধকারে জোছন বেলা হারায়,
কালচক্রের গতি সময়ে নিত্য ঘুরপাক খায়,
শূন্যতার সমাধান খোঁজে জীবন লিপির বর্ণমালায়।

ছবি আঁকে কল্পনায় দূর গগন ছায়,
নক্ষত্রখোচিত জ্বলজ্বল তারকারাজির মিটিমিটি আলোক দীপমালায়,
অনন্ত অসীম মাঝে সুন্দরের কল্পনায়,
রামধনুর সাতরঙে মিশে স্নিগ্ধতার পরশ পায়।

শান্তির বারতা আশা জাগায় বৃষ্টিস্নাত ধরায়,
আলো ছায়ার লুকোচুরি খেলা নেশার মাদকতায়,
বিদ্যুতের ঝিলিক মাঝে বৃষ্টিকে খুঁজে পায়,
প্রেমের কবিতা ভালোলাগার গান গায়।