Dec 30, 2022

অপাংশু দেবনাথ

ষট্‌পদী-তিন

চতুর বিকেল,শূন্য মাঠ, চারিদিকে কুয়াশা-কবচ,
বুক পেতে ডাকে সেই রাত্রি, আয় মরমি-প্রভাত।
সকল-সুখ সাজিয়ে রাখি,হয়তো তুমি গোপণে,
ভ্রমডানা মেলে উড়ে যাও, হারাও আদি অসুখে।

ভালোবাসা যদি নিঃস্ব করে,সব ভুল থাকে পড়ে,
ঈশ্বর জানে এই হৃদয়ে, ফুটেছে ফাল্গুনি-ফুল।

সন্তোষ রায়

শেকড়যাত্রা 

আমার আয়ুর সমান গাছ
আমি তার নিচে হাত-পা মেলা
সে আমার থেকে অনেক বড়
আমি ছোট হতে হতে শেকড়ে ফিরি।

সে যত আকাশ চায়
আমি চাই জল
নিজেকে চেনার তৃষ্ণা প্রবল।

কৃষ্ণকুসুম পাল

পাঁচ প্রেমে পাকা

প্রেম কি,না জেনে,প্রেম করে বোকা,
মরো না,মেরো না,পাঁচ প্রেমে পাকা।
প্রথম ধোকা খেয়ে,তোমার শুধু কান্না,
দ্বিতীয় ধোকা খেয়ে,ভাবো প্রেম আর না,
তৃতীয় ধোকা খেয়ে,নির্জনে একা,জীবন শেখা,
চতুর্থ ধোকা খেয়ে,বিয়ে করে এঁটে থাকা ,
পাঁচে আর প্যাঁচে নয়, পৃথিবী সাথী,
জীবন দিন যাপন আর সাঁঝে বাতি।
                 
প্রেম তো প্রেম নয়-অসীম আকাশ,
প্রেম যা'কে সে ষড়ঋতুর ঘূর্ণী বাতাস,
তোমার মেঘের মতো মিছে ছোটাছুটি,
তুমি কাঁদবে,বন্যা হবে, কাদায় লুটোপুটি।
প্রেম বিনিময় প্রথা নয়, প্রেমে নেই জয়,পরাজয়,
চার পালালেও,পঞ্চম তোমার জন্য পথ চেয়ে রয়।

সৌমত বসু

মায়া বৌ-২৪ 

আমি রাত্রির কথা লিখি , 
লিখি আত্মজনের আলো 
লিখি বেহুলা চলেছে ভেসে 
পাশে লখিন্দরের শব।

তুমি গাঙচিল হয়েছিলে 
কতো উঁচুতে মেলেছো ডানা
দেখি পাতার উপর আঁকা 
সেই আনন্দ ছায়াছবি।

লিখি জীবন তো একটাই
তাকে এভাবে পোড়াতে হয় ?
দেখি চোখেমুখে এসে লাগে 
শুধু বিশ্বাস পোড়া ছাই।

আব্দুল গফফার

গোল নিয়েই যত হিসাব

একটা গোল তার কোন মুল্য নেই, 
শূন্যের সংখ্যা বাড়িয়ে দাও,
শত হাজার লাখ কোটি কোটি-
কত হিসাবের খেলা সারাদিন,
যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ লাভ লোকসান..।
খেলার মাঠে প্রতিযোগিতায় কত উল্লাস,
বারপোস্টের মধ্যে ঢুকলেই হল, গো ও ও ল!
ফুটবলের উন্মাদনা উচ্ছাস সেই গোল-কে ঘিরেই,
গোল না পেলেই ভুল নিয়ে কাটাছেঁড়া-
কার দোষ,ভুল কার ?
এই নিয়ে বাধে কত গন্ড'গোল'।
জয় হলেই মেরে দিয়েছো গোল,
পরাজয়ে চোখ ছানাবড়া, পাকায় গোল।
হেঁসেলেও 'গোল' এর খেলা-
রমণীর হাতের গুণে রুটি হয় গোল
বাঙালির সেরা আবিষ্কার রসের গোল-লা গোল।
তাইতো মিঠাই এত জনপ্রিয়,
চাঁদ সূর্য পৃথিবী, ভুবন জুড়ে গোল,
গোলের কত মহিমা-
গোল নিয়েই যত হিসাব।

শান্তনু ভট্টাচার্য

সাপ 

মাঝে মাঝে বেশ  বুঝতে পারি
নিজেকে গোটাতে গোটাতে কুণ্ডলী পাকিয়ে ফেলছি 
তবে কি শরীরে জমেছে নিদারুণ বিষ?
না বেঁকেই চলেছে শিরদাঁড়া

অসহ‍্য গ্রীষ্মের দাবদাহ মাঝে
অসহায় শীতঘুম চারিদিকে।

এখন লাখ টাকার প্রশ্ন- 
আক্রমণ না হয় বাদই দিলাম 
আত্মরক্ষার সময়ে উঠে দাঁড়িয়ে শত্রুর চোখে চোখ রেখে মারতে পারবো ছোবল?

নাকি শীতঘুমে মজতে মজতে শুধু  
খোলস বদলে বদলে কাটিয়ে দেব চিরকাল...

কুশল ভৌমিক

অলজ্জ দুঃখগুলো

একটা ট্রেন চলে যাবার পর
মফস্বলের স্টেশনটা যেমন শুরু করে অস্থির পায়চারি  
হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় যাত্রীদের বাড়ি
আমার মন খারাপগুলো ঠিক তার বিপরীত। 
কেমন যেন ঘরকুনো, শত গঞ্জনা সয়েও সংসারে পড়ে থাকা বাঙালি বউ
ভাঁজে ভাঁজে দাগ পড়ে যাওয়া পুরনো শাড়ি
মুখ গুজে শুয়ে থাকে আলমিরায়।

তারপর বহু বহুদিন পর তালা ভেঙে বের করে আনি
জানালা খুলে দিয়ে বলি-বিদেয় হ
নাছোরবান্দা দুঃখগুলো
দুলতে থাকে বারান্দায়, রেলিঙে, কার্নিশে
ইলেকট্রিক পাখায়, ফুলের টবে, এটোবাসনে 
ভাঙা কাঁচের টুকরোর মতো ঘরময় ছড়িয়ে পড়ে 
নিজস্ব ভঙিমায়। 

উপায়ান্তর না দেখে দুঃখের টুকরোগুলো 
পুটলিতে বেঁধে তুলে রাখি আলমিরায়
যেভাবে সতর্ক রমণী লকারে ভরে রাখে
স্বর্ণালঙ্কার।

নন্দিতা দাশ চৌধুরী

অবগুন্ঠনে ডুবে যাই 

মাঝ রাতের যে ভাবনা তোমায় রাত ভর জাগিয়ে রাখে আমি হন হন করে ছুটে যাই সেই আচ্ছন্ন  করা ভাবনার কাছে,

নক্ষত্র  মাখা রাতের গন্ধে যেখানে তোমার সাগর চোখের ক্যানভাসে মেঘ ভাঙা শব্দ ভাঙার উল্লাসী নৃত্যের জলছবি আঁকা, আমি ছুটে যাই, 

ঝুমুরের সাথে মাদলের সুরে উপসুরে নিরবধি ছুঁয়ে থাকার কৌশল নিই, ভালোবাসলে নিজের তো আর কিছুই  থাকেনা পায়ে পায়ে হোঁচট খেয়ে মরতে হয়

অপরাজিতার নীল রঙ  বারবার  আমায় কাঙাল করে যেমন করে গজলের সরগম,

পাশানের মাঝে শিল্পের সৃষ্টি তাই বলে পাশানই শিল্প নয়, 

একটা শব্দহীন কাতরতা আমার দোরগোড়ায় পাথর  ভাঙে পাহাড় ভাঙে আকাশ  ভাঙে,ক্রমান্বয়ে আমি কালের চিতার অবগুন্ঠনে  ডুবে যাই।


রুদ্র মোস্তফা

প্রেমিক ও পুরুষের পার্থক্য 

মানুষের ভিড়ে মানুষের শোভা
আমাকে মনে করিয়ে দেয়
শীতের সকালের কুয়াশা কুড়ানো রোদের মুখে 
পুরে দেওয়া পরিত্যক্ত প্রেমিকার 
আশ্চর্য রঙিন প্রণয়ের কথা। 
অপরাহ্নে উড়ে যায় যেন অনেক কথার ধুলো।
বিরান মাঠ এগিয়ে আসে চুমোর ঠোঁট বাড়িয়ে। 
শহরের ব্যস্ত গাড়িগুলো 
ব্রেক কষে, একে একে থেমে যায় যেন কার সামনে.... 
স্মৃতির সামনে বসে চক্কর খাই লাটিমের মতো।
এ এক দারুণ খেলা! 
তুমি নেই যে শহরে সেই শহরে তোমার ভিড় 
বাড়িয়ে দেয় প্রেমিক ও পুরুষের পার্থক্য।

গোপেশ চক্রবর্তী

সঙ্গী 

বোধের ভেতর মায়া-স্টেশন 
তুমিও হও প্রকট-

একদম একা না-হলে...

নিবারণ নাথ

প্রেম

প্রতি রাতই যে বৃষ্টি ধূঁয়ে দেয় শরীর
এক উন্মাদনা আমাকে
বিব্রত করে
রক্তচাপ বাড়ে।

ভোরের কুয়াশায়
আহ্লাদে নাচে হাত পা
বাড়ির রাস্তায় দেখি সেই বৃষ্টি। 

অন্তমিলে 
আমি এক নষ্ট পুরুষ।

তৈমুর খান

বকশিক (অনুগল্প)

 হন্তদন্ত হয়ে রোজকার মতো আজও ট্রেনে উঠেছি। সকাল সাড়ে আটটায় ট্রেন। এক মিনিট দেরি হলেই মিস হয়ে যাবে। আজও ভিড়ে ঠাসা ট্রেন সিট ফাঁকা নেই বললেই চলে। সিটের এক ধারে একটি ব্যাগ রাখা আছে। কার ব্যাগ? কার ব্যাগ? বারকয়েক চিৎকার করে কারও সাড়া না পেয়ে ব্যাগটাকে কোলের ওপর নিয়েই বসে পড়ি। ট্রেন চলতে শুরু করে। প্যাসেঞ্জার ওঠানামা করতে-করতেই তিন-চার স্টেশন পেরিয়ে যায়। কিন্তু ব্যাগের মালিক কই? এখনো কেউ খোঁজ করল না! আর দুই স্টেশন পেরিয়েই আমাকে নামতে হবে। সেখান থেকে টোটো ধরে পনেরো মিনিট এগিয়ে গেলে তারপর আমার অফিস।

    আমি একটা বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। সর্বসাকুল্যে বাইশ হাজার টাকা বেতন পাই। এখনও ঘর করে উঠতে পারিনি। দীর্ঘদিন থেকেই ছেলে বাইক কেনার বায়না করলেও ওকে থামিয়ে রেখেছি। আর কয়েক মাস যাক তারপর কিনে দেবো। এমনি করেই তিন বছর পেরিয়ে গেছে। একমাত্র মেয়ের জন্য বিয়ের ঋণ নেওয়া ব্যাংকের টাকা এখনও পরিশোধ করা যায়নি। বছরে একবার ভেলোর যেতে হয় স্বাস্থ্য চেকআপের জন্য। তার জন্য আগে থেকেই ছুটি জমিয়ে রাখতে হয়। প্রতি মাসের ঘর ভাড়া দিয়ে, ওষুধের জন্য আলাদা করে কিছু খরচ রেখে এবং প্রতিমাসে ছেলের জন্য কোচিং সেন্টারের ফি বাবদ খরচ যোগ করে বাদবাকি যা থাকে তাতে কোনওরকম বেঁচে থাকা যায়। এরপর শখ-তামাশা-আহ্লাদ বলে আর কিছু থাকে না।            গিন্নি মাঝেমাঝেই খোঁচা মেরে বলে: 

    তোমার আর অভাব ঘুচবে না! কখনও একটা দামি শাড়ি দিতে পারলে না। হাতখরচের জন্য মাসে এক হাজার টাকাও দিতে পারোনি। নিজেদের একটা ঘরও হল না আজ পর্যন্ত!

     এসব কথার উত্তর দিতে গিয়ে আমার কন্ঠস্বরে কম্পন অনুভব করেছি। গলা নামিয়েই বলতে হয়েছে:

 দেখে নিও একদিন সবই হবে। ছেলেটাকে বড় হতে দাও আর ব্যাংকের ঋণ শোধ করে ফেলি। তারপর থেকেই আমাদের আর কোনও খরচ থাকবে না। তখন তোমাকে হাতখরচও দিতে পারব।

 কতকী ভাবতে-ভাবতেই ট্রেন আমার গন্তব্যে পৌঁছে গেছে। সিট থেকে উঠতেই সামনে দাঁড়ানো একজন প্রায় জোর করেই বসে পড়লেন। হাতের ব্যাগখানা ওর হাতে দিয়ে বললাম: 

    কার ব্যাগ জানি না, এই সিটেই রাখা ছিল, চাইলেই দিয়ে দেবেন। বলেই দ্রুত ব্যাগখানা তাকে দিয়ে নেমে পড়লাম।

 ততক্ষণে মাইকে ঘোষণা হচ্ছে:

   একটি বিশেষ ঘোষণা, এই ট্রেনের তিন নং কম্পার্টমেন্টে পঞ্চাশ লক্ষ টাকার একটি ব্যাগ রাখা ছিল। ব্যাগটি যিনি নিজের কাছে রেখেছেন দয়া করে স্টেশন মাস্টারের কাছে জমা দিয়ে যান।কালো রঙের লাল বর্ডার দেওয়া ব্যাগ। কর্তৃপক্ষ তাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা বকশিশ দেবেন।

   ঘোষণাটি শুনতে-শুনতেই আমার একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গেল। ওই ব্যাগটি কালো রঙের লাল বর্ডার দেওয়াই ছিল! 

    বার কয়েক নেমে আসা কম্পার্টমেন্টের দিকে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলাম।ততক্ষণে পুলিশ এসে ঘিরে ফেলেছে চারিপাশ।

সন্দীপ সাহু

শেষের কবিতা

ঘনতম অতল নীল, প্রেমিকার মতো
চোখ চেয়ে ইশারা করে। ইশারায়
তারায় তারায় নৌকা ভেসে আসে!
নৌকাটা নীল গোলাপে একেবারে ভর্তি!

ভেসে এসে গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে
বাসর শয্যায় নোঙ্গর ফেলে! প্রেমিকার মতো হেসে!
কখনো কেউ ভালোবাসেনি! যোগ্যতাও ছিল না!
সমস্ত ব্যর্থতাগুলো একে একে জরো হয়!

বিরোধী দলের মতো চিৎকার করে 
অনাস্থা এনে সমস্ত শাদাকে কালোতে মোছে!
বৈধ সম্পর্কগুলো চাবিকাঠি খুঁজতে
দেহে ময়নাতদন্ত চালায় দক্ষ ব্যোমকেশের মতো!

সাতপাকে ঘুরলেই সাত জন্ম, পাঁকে ডোবে!
পাঁকে পাঁকে সম্পর্কগুলো চাবিকাঠির ওপর
অধিকার নিয়ে পচা গন্ধ ছোটায়! ওই গন্ধে
মানুষ মরে। মানুষ মরলে সম্পর্ক থাকে কি!

ঘন অতল নীল আবার চোখ তুলে চায়!
চাবিকাঠি বৈধ সম্পর্কের মৃত মানুষগুলো কাছে রেখে,
ওই চোখের ইশারা-পথে এগিয়ে যাই।সেই চোখ 
সেই হাসি নায়িকার মতো ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে!

শিল্পীর কাছে একান্ত অনুরোধ, ওর একটা
ছবি এঁকো! মুখটা কোরো ঠিক আমার মতো!
মুখে যেন কাপুরুষের জামা পরিও না!
লড়াই করে পরাজয়ের যে রঙ হয়, তা-ই এঁকো!

জানি তুমি অম্লান বদনে আঁকতে পারবে!
তুমি এমন একটা নদী, জোয়ার ভাটা সমানে খেলে!

নিয়তি রায় বর্মন

মায়ের অশ্রু

আমার মায়ের অনেক কষ্ট
পিতৃহীন সংসারে মায়ের উৎকন্ঠার শেষ নেই--
কোটি কোটি ভাই বোনের গ্রাসাচ্ছাদন, হায়! 
কাগজে স্বাধীনতা এলেও সন্তানের জীবনে বসন্ত আসে নি। 
মায়ের সন্তানরা অনেক কেজো, দুই হাত দুই পায়ে অনেক বল--
সোনার ফসল ফলায়, গগন চুম্বী অট্টালিকা সাজায়--
জগৎজোড়া নাম তাদের। 
চারু শিল্পে, কারু শিল্পে, সাহিত্য সংস্কৃতিতেও 
বিশ্ব জয় করেছে অনেক সম্মানে ও পদকে। 
মায়ের রবি, সত্যজিৎ, জগদীশ, অমর্ত্য, 
অভিজিৎ প্রত্যেকে মায়ের অলঙ্কার। 
বীর নেতাজী, সূর্য সেন, ক্ষুদিরাম, ভগৎ সিং, 
সোমেন চন্দ, প্রীতিলতা, কল্পনা, কল্পনা চাওলা স্বনামেই জ্যোতিষ্ক। 
দেশের অন্নদাতা নিরন্ন, শ্রমিকরা কাজ হারায়--
কোভিড ঊনিশ জালে সবাই দিশেহারা। 
মায়ের সাম্রাজ্যের ভার যারা নিয়েছেন--তারা দিক ভ্রান্ত--
মায়ের চোখের অশ্রু আর শুকোয় না। 

খোকন সাহা

বাঁধ ও বাধা

' কি করে কাছে টানি
দুই পাঁজরের ঝাপটানি '।
ঘুরে ফিরে অসংখ্যবার
এইখানে  থামি ;
যেখানে আবিস্কারের চেয়ে
অনাবিস্কারের রক্তগুলি 
জ্বল জ্বল বাণী ।

হয়তো ঝোঁপঝাড়ের মুখে
অথবা প্রণতি সিন্ধু তীরের চোখে
চাপা হাসি চরিয়ে যায়
মিতালি বঁধুয়ার জলমাটিতে ----- ;
কত রকমের ফুল ফোটা,
কত খোলা চোখের জ্বলন্ত শাসানি ----
পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা খুলে যায় ;
আর তার রঙ রেখায় ফুটে ওঠে
ভূমিকাসুন্দর পৃথিবীর জানালা ।

তবুও সময়ের বাকমেরু
অন্ধকার থেকে ছুটে চলে ---
রোদ্দুরের দিকে।
আমাদের রক্তের নদীতীর হাটবাট পালাগান জুড়ে,
তখন তোমার অধৈর্য মুখ থেকেও
ফুটে ওঠে -----ফুল আর স্বপ্ন পংক্তিমালা  । 
ভেঙ্গে যায় সব বাঁধ ও বাধা ।

নমিতা সরকার

আবেগের রঙ নেই 

নিজেকেই ভুলে গেছি প্রকৃত সুখ  পাখির পৃথিবীতে ঘুরে ঘুরে, না না এভাবে আর নিজেকে দূরে সরানো ঠিক হবে না...

অনেক তো হলো নিজেকে ভুলে ফুলে ফুলে উড়ে বেড়ানো ভ্রমরের গান শোনা, 

চোখের ঘুম সরতে না সরতে যে সুকণ্ঠ পাখির স্বর শুনতে ইচ্ছে জাগে অধির আগ্রহে... 

সে পাখি, আমার কাছে আসতে ভুলে গেছে, ভুলে গেছে আমার ভুবন গায়ে ঘুরে ঘুরে গান শোনাতে অথচ তাকে শুনতে আমি নিজেকে ভুলে গেছি-

অনেক তো হলো নিজের আত্মাকে অনুভূতির ব্যস্ত শহরে আবেগের অদ্ভূদ রঙে রাঙিয়ে দেওয়া... 

আবেগে নাকি প্রেম নেই... 

তাহলে নিশ্চয়ই চিতার দহন জ্বালা আছে, তারজন্যই হয়তো নিজস্বতাকে ভুলে আবেগের আগুনে আহুতি দিতে হয়...

আর পাখি আমার আপন মনে আপন প্রেমে উড়ে উড়ে ঘুরে বেড়ায় সুখের নেশায়... 

থাকসে পাখির ইচ্ছে ডানায় আপন বাসায়, আমি নাহয় নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকি অগ্নি চিতায়।

পৃথ্বীরাজ দেবনাথ

অকিঞ্চিৎকরগুচ্ছ

ডুব দাও, ডুব দাও
পিছলে যাচ্ছে সময়।
হে হিরণ্যগর্ভ! আমার জন্যে অবশিষ্ট রয়েছে কি আর কোন সূর্য উদয়?

একখানি স্বপ্ন ক্রমশ সর্পিল গতিতে 
অন্তর্হিত হচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে,
রেশ তার রয়ে যাচ্ছে, 
অথচ বিষয়বস্তুর গভীরে আদি আর অকৃত্রিম পরমশূন্য।
তাহলে স্বপ্নটি কার? 

দিনান্তে বা নিশান্তে জাগে আমার অহং, জাগে আমার প্রাণ। বিস্ময়ে ক্লান্ত আমি, তবুও দিগন্তে অশ্বমেধের ঘোড়া, তবুও যুদ্ধের প্রান্তরে উন্মুক্ত সাম্রাজ্যের তলোয়ার। হে ঋতবান, আর কত রক্তের বিনিময়ে তুমি প্রেমিক হবে?

অদিতি তুলি

বয়স বাড়লেই ঘর ছাড়ে মানুষ

মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে হঠাৎ আমার কথাই তোমার মনে পড়ে আমি জানি। 
একটা চাপা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলেই হয়ত ভাবো মেয়েটা কি করছে ঠিক মত খাচ্ছে কি না মাথায় তেল দিচ্ছে কি না....।
গত শীতে দুটো কাঁথা দিয়েছিলাম একটা কম্বল আগেই ছিল। 
এবার না হয় আরো একটা কম্বল পাঠিয়ে দেব।  যা চাপা স্বভাব কখনো মুখ ফুটে কিছু বলে না। 
অনিয়ম করে করে আবার কোন অসুখ না বাধায়। 
মেয়েটার আর কত হল বয়স..! 
এসব ভাবতে ভাবতে রাতের প্রহর বাড়ে,  জাগতিক নিয়মে বাড়ে চিন্তাগুলিও। 
হয়ত দু এক ফোটা জল ও গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে তোমার অজান্তেই। 
তখন হয়ত আমাদের ঘরের পেছনের হিজল গাছটা থেকে টুপটুপ করে ঝরে পড়ে ফুলগুলো মাটিতে। ঝোপের ধারে কুয়ো থেকে ঝিঁঝি পোকার ডাক ভেসে আছে। নাম না জানা দু একটা পাখির ক্ষীণ শব্দ মিলিয়ে যায় উত্তরে।  
তোমার এই চাপা সংলাপের দীর্ঘশ্বাস কেউ হয়ত শোনে না দেখে না বোঝে না কিন্তু আমি অনুভব করতে পারি নয়ত আমার বুকের মধ্যে এত চাপা কষ্ট কেন হয়? 
নিজেকে বড্ড ভারী লাগে।  
চিৎকার করে ডাকতে ইচ্ছে করে তোমায় মা -
মা  মা  মা....
আমি ভালো নেই….।
অথচ মাধ্যমিকের পর আমি সেমন্তীকে কত করে উপহাস করেছিলেম -
 "তুই কি সারাজীবন বাচ্চাই থাকবি? বড় হবি কবে? মায়ের আঁচল ধরে সারাজীবন বসে থাকলে গেঁয়ো ভূত হবি ..."
বয়স বাড়লেই ঘর ছাড়ে মানুষ 
আমিও ছেড়েছিলাম
এখন বড্ড ঘরে ফিরতে ইচ্ছে করছে..! 
মনে হচ্ছে দেয়াল ঘড়ির কাটা তিনটি উপহাস করে বলছে আমায় তুমি তো জড়িয়ে গেছো এক
আস্তাকুঁড়ে সভ্যতায়, শিল্পায়নের ঘূর্নিপাকে।। 
ঘড়ির কাটায় ঠিক রাত দুটো চল্লিশ 

সাগর শাহ্

এক নিমেষেই শেষ

চলছে দেখো দমের গাড়ি 
দম ফুরাইলেই শেষ, 
মিছে মায়ার দুনিয়া-দারী 
কাটছে নাতো রেষ।

তুমি আমি সেই গাড়িরচাকা, 
চলেছি দেখো আঁকাবাকা
পায়না তো চালকের দেখা। 
কি সমান্তরাল ভাগ্যরেখা.! 

জমাট বাঁধা গোলক-ধাঁধা 
গাড়ি চলছে সাদামাটা, 
নিত্য দিনই চলে গাড়ি 
চলছে চলুক বেশ।

কালো কেশটা সাদা হলেই 
গাড়ির গতি শেষ। 
তাও ভয় করে গাড়ির মনে 
সবইতো জানে মহাজনে।

কতদিন আর চলবে গাড়ি 
হয়ে কেবল দেশান্তরি, 
এভাবে তে কেমনে দিবে
হিসাবনিকাশ আপন বাড়ি। 

এভাবে তেই চলছে গাড়ি 
চলছে চলুক বেশ, 
দমের গাড়ি দম ফুরাতে 
এক নিমেষেই শেষ।

দুলাল চক্রবর্তী

শান্তি রক্ষার্থে

গিন্নি যেন নয়ন মনি
খাটে বসে রয়,
সব দেখভাল করে
বিশ্রাম পেতে হয়।

হালকা একটু ফল-মূল
বারে বারে চায়,
খাবার জিনিস নজরে পড়লে
হাতে নিয়ে খায়।

গিন্নির মনে খুশি আনতে
কর্তা করেন কাজ,
রাঁধুনী সেজে কর্তা করে
নেই যে মনে লাজ।

ভালো- মন্দ খাবার করে
রোজ খাওয়াতে হয়,
গিন্নি তুষ্ট থাকলে পরেই
জগৎ শান্তি রয়।

সংসারাতে শান্তি রাখার জন্য
সদা তৎপর স্বামী,
গিন্নির হুকুম তালিম করা
সেবার চেয়েও দামি!

অলকা গোস্বামী

নবান্ন

খুব খুব কাছে দুজন,
শীতের অলস দুপুর,
 কিংবা শিশির ভেজা মধ্যরাতে;
ইচ্ছে করলেই ছুঁয়ে যাওয়া যায় সর্বস্ব।
প্ৰেমই হারায় চোরা নদীর বাঁকে।

শুধুই দুজন,
অদৃশ্য হাজার জনের ভীড়ে,
নিজেদের অস্তিত্ব খুঁজে পায়না অহরহ, যা
হারিয়েছে কবেই অপ্রাপ্তির
 ট্রাফিক জ্যামে।

কত যে অছিলা....,
শেষ কালে
তবু ছুঁতে চায় দুটি হাত পরস্পরে,

অঘ্রান 
ঘরে ঘরে ধানের পোয়াতি ভাঁড়ার,
হৃদয়ের কোথাও...,
খুব কাছেই
দুজনের নবান্ন উৎসব।

লিটন শব্দকর

দেখা আর না দেখায়

ভিক্টোরিয়া ল্যাম্পপোস্ট জ্বলে উঠেছে 
ভালোবাসায় ভালোবাসায়

বাদামের ঠোঙা হাতে চোখজোড়ার দিঘীতে ডুব
অবশিষ্ঠ কথা মাছেদের সাথে

মৃগেলের ঠাহরে পথবাতির আলো ধরে আমি
ছড়িয়ে দিতেই খই, তুমুল বৃষ্টি
ফুরোলে, ঠা ঠা শুকনো দুপুরের রোদে
রুপোলী আঁশের সাথে প্রথম দেখা

দৃষ্টি সরানোর অনভ্যাসে বৃষ্টি আসে
চোখ বলে বাকি রোদ রুপোলী হবে 
ঠোঙার বাদামে ক্রমশ ঘন বিকেল

জগন্নাথ বনিক

স্বপ্ন 

হলুদ খামে বন্দি থাকো,
অনেক দামি তুমি।
তোমায় খুঁজে পাওয়ার স্বপ্ন,
আজও দেখি আমি।।

আসবে কী তুমি আমার কাছে,
সত্যি হবে কী আমার স্বপ্ন।
তোমার জন্য আজও অপেক্ষায়,
দিও না তুমি আমার জীবনে দু-স্বপ্ন।।

Dec 27, 2022

ভবানী বিশ্বাস

সুখ দৃশ্য

মহিলাটা হাঁটছেন, 
মাথায় খাড়া রোদ।

ওই গ্রামের সরকার বাড়ির
পইঠায় বসলেন, 
সঙ্গে শিশুটি। 
পানের আসর শেষে
পুকুরে নামলেন। 

তারপর হাঁটছেন,হাতে কলমী। 
সাদা আঁচলটা শিশুর মাথায়, 
একটু হাপাচ্ছেন আর হাঁটছেন। 

শিশুটি তাঁর হাত ধরে হাঁটছে।
বলছে- ঠাম্মা!
আজ আমরা শাকপাতা দিয়ে ভাত খাব।

ছন্দা দাম

প্রলয় আনো

তাকাও ওহে পাহাড়,
পায়ে যে ঢেউটা আছাড় খেয়ে পড়ে...তার নীরব ক্রন্দন শোনো কি?
রাসায়নিক স্নানে দগ্ধ তার পাথুরে হৃদয় ও...
বুকে বয়ে ফেরে হেমলকের নীল জল,ভাসায় দু কূল...
সন্তান সন্ততির ক্ষিধের জঠর যাতনার তৃপ্তি দেয়।
ক্ষত বাড়ে দিনে দিনে... নিশ্চুপ নদীর অভিধানের ভাষারা হারায়,
প্রকাশের দৈন্যতা বুকের ভেতরে গুমড়ে গুমড়ে মরে!

তাকাও ওহে পাহাড়,
ভেঙে ফেলো গুরু গর্জনে ঐ গম্বোজের চুল্লিটা,...
বমি করে যে বিষাক্ত ধোঁয়ার কুণ্ডলী,
দখিনা বাতাসের পথ বদলে সৃষ্টি করো ঝড়,
গুড়িয়ে দাও সিমেন্টের অসুরগুলোর ইটগাথা দেহ!

ওহে পাহাড়...কতো আর নিঃসীম শূন্যে দৃষ্টি ছুঁড়ে তাকিয়ে থাকবে মূকবৎ!
আকাশের মেঘগুলোকে মুঠোয় ভরে নিয়ে...
ঘর্ষণ করে জন্ম দাও নতুন এক অশনীর,
ঝড় জলোচ্ছ্বাস স্রোতের তোড়ে ভাসিয়ে নিয়ে তাকে সৃষ্টি,
গঠিত হোক অর্বাচীন এক পৃথিবী...
ইথেন,মিথেন, হিলিয়াম...
আরো কতো বিষোদগারী দানব ডুবে যাবে এই প্লাবনে।।

পারমিতা মুস্তাফি

চড়ুই ভাতি

মিষ্টি শীতের দুপুর বেলা,
চড়ুই ভাতি হবে -
গাইছে যত নয়নতারা,
মাঠে ঘাটে এক সাথে।
রোদের ঝিলিক পরছে  গায়ে,
আহা কি আরাম -
হাসির ঢেউয়ের চমক লাগে,
নেই কোনো বিরাম।
ছোট্ট ছেলে খেলছে খেলা,
সবুজ মাঠ  টাতে -
কত রকম ফুলের বাহার,
সবুজ মাঠের প্রাতে।
এমন দিন কি ভুলতে পারি,
দারুন আনন্দ -
আবার আসুক এই দিনটাই,
চির বসন্ত।

শ্বেতা ব্যানার্জী

২২২ X বলছি

হ্যালো, হ্যালো, দ্রি,দ্রি দ্রি...।
ডোমিথি, ইরিয়স, এদের কে তৈরি রাখ।
হ্যাঁ, হ্যাঁ,  লালমুখো উই , আর হাজার হাতের মাকড়সা। 
পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার মানুষ, ওদের উচ্ছেদ চাই।
ইরিয়স চারদিকে জাল বিছিয়ে ওদের ঘিরে রাখুক, 
তারপর ডোমিথিদের ছেড়ে দাও। 
ওদের বুঝতে দাও উচ্ছেদের প্রতিকার নেই। 
ওরা আমাদের মাটি কেড়েছে, কেড়েছে জল,গাছপালা, থাকার বাসস্থান। 
 বাতাসে বিষাক্ত  বিষ ঢেলে দাও, নিঃশ্বাসের সুগভীর কষ্ট দাপিয়ে বেড়াক ওদের বুকে। 
 সভ্যতার নামে যে বর্বরতা দিয়ে ওরা পৃথিবী দাপাচ্ছে, তারও বেশি নৃশংস হও তোমরা। 
 কোনো ভ্যাক্সিন সৃষ্টির আগেই ল্যাবরেটরিতে জীবাণু XXX,  --- জেট থেকে ছড়িয়ে দাও।
জৈবিক ঝড় তুলে ধ্বংস কর, অতি সভ্যতা। 
হ্যালো, হ্যালো, কন্ট্রোল রুম,  ২২২ X বলছি----
এবার প্যারাশুটে নেমে যাও উপবৃত্তাকার পথে। 
কেড়ে নাও "ম্যান্টল " যা পৃথিবীর উষ্ণ গলিত স্রোত 
পৃথিবীর হৃদস্পন্দন। ধ্বংস কর চৌম্বক শক্তি,
ম্যান্টলের ব্রিজম্যানাইট, যা পৃথিবীর বাঁচার রসদ। 
পৃথিবীকে অ- বাসযোগ্য করে তোলো।
হ্যালো, হ্যালো, দ্রি,দ্রি,দ্রি
ইনোভাস  বিএফআর রকেট তৈরি তো।

অনুভব ধর রায়

চিঠি দিও


চিঠি দিও,
তোমার না বলা কথাগুলো লিখে—
হলদে খামে কিংবা পাখির পায়ে বেঁধে,
পাঠিয়ে দিও; আমার মনের কোনো এক দিকে।

চিঠি দিও,
শত যান্ত্রিক বাঁধা উপেক্ষা করে,
স্মার্টফোনে কথা কিছুদিন বা নাই হোক!
তোমার হাতের স্পর্শে উজ্জ্বল হোক—সেই চিঠিখানা।

চিঠি দিও,
তোমার রোজ ভালোবাসার অভ্যাসে,
শত ব্যস্ততার ফাঁকে; আমি সেই চিঠি পড়ে নেবো,
যতই জোৎস্না ভর্তি হয়ে চাঁদনী রাত আসুক—
কিংবা বৃষ্টি হয়ে ভিজুক সেই চিঠিখানা!

চিঠি দিও,
তোমার মন খারাপের দিনে,
না কোনো আন্দোলনে,
আকাশের ঠিকানায় লিখে কিংবা মনের সকল অভিযোগ জানিয়ে দিও,
তবুও চিঠি  দিও!
তোমাকেই শুধু লিখে দিও।

চিঠি দিও 
ঐ যৌবনে ফিরে গিয়ে নয়,
মনের কথা লিখে দিও—
এই যুগ যেন স্নিগ্ধ হয়।

চন্দ্রা বিশ্বাস

তুমি কার

জীবন আনত মস্তকে করজোড়ে,
কাঁধের ঝোলা সামলে, কলিং বেলে হাত
বেল বাজে, বেজে যায়, বেজে ওঠে শ্ঙ্খধ্বনিও।
জীবন পূজায়, যে যার মত, দোর খোলে না।
ধূপকাঠির ফেরিওয়ালা হতাশায় ঘুরে দাঁড়াতেই,
কাকে চাই? ব্যস্ত পরিচারিকা উঁকি মারে।
না মানে , যদি ধূপকাঠি , লাগবে? 
কত্তামা পূজোয়, দরজা সজোরে বন্ধ হলো।
ডাল পোড়ার গন্ধে মাতে বাতাবরণ।
পূজা,ধূপকাঠি, ডালপোড়া, কলিংবেল, শঙ্খধ্বনি
ফেরিওয়ালা, পরিচারিকা, কত্তামা,
শব্দ-গন্ধময় জীবন পঞ্চমে।
পঞ্চ তন্মাত্রময় এই জীবনে 
হে ঈশ্বর, তুমি কার?

গীতশ্রী ভট্টাচার্য্য

সখা

তবু, ইচ্ছে জাগে আবার জেগে উঠি স্ফুলিঙ্গের মত
তারপর নয় দপ করে নিভে যেতাম হালকা হাওয়াতেই।
আমার চাওয়াটা কোনো অসাধারণ কিছু নয় জানি
তবু, আমি জাগতে পারিনা, জ্বলে উঠতে পারিনা।

এই যে সমস্ত দুপুর জুড়ে ঠকঠক শব্দেরা মাথায় ঘা মারে, ভেতর থেকে বের করে আনতে চায় দু চারটে 
অর্থহীন শব্দ, তাদের প্রসব করতে গিয়েই আমি 
অচেতন হয়ে পড়ি রক্তক্ষরণে আর ক্লান্তিতে।

তবু, সাধ হয় একটিবার ফুল হয়ে ফুটুক আমার আমি
নাই বা থাকল বেশিক্ষণ গাছের বোঁটায়, ঝরে পড়ুক 
মুহূর্তে, অকালে হারিয়ে যাক ঘাসের মাঝে। 
পাঁপড়ি গুলি শুধু এধার ওধার ঘুরে বেড়াক, পখিলার মত রঙিন,  উড়ে উড়ে বসুক কোনো ডালে।

আবার জ্বলে উঠার জন্য একটি চকমকি পাথরের 
খুব দরকার, দরকার কিছু জ্বালানি।
হাত বাড়িয়ে দাও সখা, তোমার উষ্ণতার বারুদে
অন্তত একবার স্ফুলিঙ্গ হই, ফুল হই, কবিতা হই।

মিঠুন রায়

অভিলাষ (গল্প)

ভোরবেলায় হাল্কা ঠান্ডা লাগতেই সুজয় বুকের উপর ছেঁড়া কাঁথা খানিকটা টেনে নিল। গতকাল রাতে ঘুমাতে পারেনি সে। এমনি

তে সুজয় একটি প্রাইভেট জব করে। পাশাপাশি অসুস্থ বাবার চিকিৎসা রং জন্য সে ওভারটাইম করে।

সম্প্রতি সে বিয়ে বাড়িতে ফুলের সাজসজ্জার কাজ হাতে নিয়েছে। উপার্জন খুব একটা মন্দ নয়। সুজয়ের মাতৃবিয়োগ হয়েছে ছয় মাস আগে।

  মাতৃশোক এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি সুজয়। কিন্তু কিছু করার নেই।ঘরে বৃদ্ধ বাবা বিছানায় শয্যাশায়ী প্রায় দুই বছর ধরে।

  আচমকা দরজায় কলিং বেল বাজতেই ঘুম ভাঙ্গল সুজয়ের। কাজের মাসী যে এসে গেছে। দরজা খুলতেই নজরে পড়ল একটি ছিমছিমে মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।কে তুমি,আমি সোমা। আপনাদের বাড়িতে তে কাজ করে, সেই সবিতা দেবের ছোট মেয়ে।

মায়ের শরীর ভীষণ খারাপ।তাই আজ আসতে পারেনি। আমিই এখন কাজ করব আপনার বাড়িতে।

   সুজয় আর কথা না বাড়িয়ে, তাকে কাজ বুঝিয়ে দিয়ে চলে গেল। বাথরুম থেকে বেরিয়ে বাবার রুমে গিয়ে দেখে,সোমা  সুজয়ের বৃদ্ধ বাবাকে সুপ খাওয়াচ্ছে। প্রথম দিনের কাজকর্মে সোমা যেন সুজয়ের মন অনেকটা জয় করে নিল।ব্রাকফাস্ট করতে করতে একসময় সুজয় বলে উঠল, সোমা তুমি লেখা পড়া কতটুকু করেছ।

  আমি গতবছর বি এ পাশ করেছি।বি এ পাশ করে তুমি অনর্থের বাড়িতে কাজ করছ।না,আসলে মায়ের অসুস্থতার দরুণ এসেছি আপনার বাড়িতে। সুজয়ের চোখে জল এল।

     আসলে অন্যের কষ্টে  চোখে জল আসাটাই স্বাভাবিক। দুপুরে রান্নার বিষয় সহ বাবার ঔষধের কথা বুঝিয়ে সুজয় চলে গেল অফিসে।আজ অফিসে গিয়েও কাজে যেন মন বসে না।সোমার হতভাগ্য জীবনের কথা যেন বারবার মনে পড়ছে। মনে হচ্ছে যেন অল্প সময়ে সোমা জায়গা করে নিয়েছে সুজয়ের মনে। সন্ধ্যায় অফিস থেকে বাড়ি ফিরে সুজয় দেখল , টেবিলে রাতের খাবার সাজানো। এমনকি ফ্লাস্কে গরম জল পর্যন্ত রাখা। হাত  পা ধুয়ে বাবার কাছে যেতেই অশীতিপর বৃদ্ধ বাবা বলে উঠলেন,বড় ভালো মেয়ে সোমা।নিজ হাতে আমাকে তিন বেলা পথ্য দিয়েছে।ও তে পরিবারে যাবে, সেখানেই ঘর আলোকিত করে রাখবে। সত্যিই এমন মেয়ে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। সুজয়ের মনের কথাটা যেন ওর বাবা বলে ফেলেছে।

     রাতের খাবার খেয়ে সুজয় বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবতে  সোমার কথা।যদি সোমা চিরদিনের জন্য এই বাড়িতে থেকে যায়, তবে বেশ ভালোই হতো।কখন যে স্বপ্নের জগৎ থেকে ঘুমের অতলে চলে গেছে সুজয়,তার সে নিজেও জানেনা।

   এভাবে বেশ কিছুদিন কেটে গেল। হঠাৎ হাজির সবিতা মাসী।কি গো,এখন শরীর কেমন।আছি বেশ।আজ সোমা আসে নি।

না,এখন আর ও আসবে না। 

কেন, সোমার বিয়ে ঠিক হয়েছে।ওর বড় মামা বিয়ের সম্বন্ধ এনেছে।পাএ পেশায়  অটো চালক। নিজের দুখানা অটো।

কথাটা শুনে যেন সুজয়ের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল।এ কি শুনলাম। সত্যিই তো, নিজেকে বড় অপরাধী মনে হচ্ছে। একদিনও তো সোমাকে নিজের অন্তরের সুপ্ত প্রেমের কথা জানানো হয় নি।

     নিজের এই ভুলের জন্য আজ সে অনুতপ্ত। তবে কি সোমা এ জীবনে আর তার হবে না। রাতে বিছানায় শুয়ে বারবার এই কথা ভাবছিল সে। রাতে খাওয়াও হয় নি।কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে,তার মনে নেই।

   সকালবেলায় ঘুম ভাঙ্গল অন্য খবরে। বাড়িতে বেশ জনসমাগম।আর কিছুক্ষণ বাদেই সবিতা দেবী সোমাকে নিয়ে হাজির হবেন।আজ তে সুজয়ের সাথে সোমার কোট ম্যারেজ।ছয় মাস বাদে বিয়ে। কিন্তু সুজয় তে কিছুই জানল না।তার বাবা গতকাল সবিতা দেবীর সাথে এ বিষয়ে একেবারে পাকা কথা বলেছে। সবকিছু শুনে যেন বিলম্বে হলেও সুজয় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে।আর জড়িয়ে ধরল তার বাবাকে।তার মনের অভিলাষ পূর্ণ করার জন্য।

প্রদীপ কুমার মাইতি

কে বলে সূর্য অস্তাচলে

কে বলে সূর্য অস্তাচলে?
মাটির হাহাকারে দিনের শেষে সূর্য ঘরে ফিরে
সিক্ত নয়নে তুষের আগুনে জ্বলে ধিকিধিকি করে। 
তাই সে অন্তরালে। 
সূর্য কভু যায় না অস্তাচলে।
সূর্য ফিরে আসে অন্ধকার পাড়ি দিয়ে ভোরের আকাশে  প্রত্যাশার স্বপ্ন এঁকে দিতে, 
সূর্য ফিরে আসে আমাদের অন্তরের অন্তস্থলে বেঁচে থাকার ঠিকানায় মুক্তির মশাল তুলে দিতে,
সূর্য  ফিরে আসে দেহের শিরা- উপশিরায় জমাট রক্তে উত্তাপ ছড়িয়ে দিতে,
সূর্য ফিরে আসে বিপ্লবী মন্ত্রে যজ্ঞের আগুন জ্বালিয়ে দিতে,
যে আগুনে পুড়ে ছাই হবে শোষণের চাকা,
নিপীড়ন, উৎপীড়ন, লোভ-লালসা যাকিছু আছে স্তব্ধ হবে একা-একা।
সেদিন নয় বেশি দূরে।
যে দিন সূর্য আর জ্বলবে না ধিকিধিকি,
ফিরবে ঘরে জয়ের ভেলায় আলোকোজ্জ্বল আঁখি। 
দিনের শেষে ফিরবে না আর নয়ন ভরা জলে, 
সূর্য কভু যায় না অস্তাচলে।

কৃপা ঘোষ

স্বপ্নপুরীর গান

বৃষ্টি তুমি একবার জানিয়ে দিয়ো তাকে
তার আমার ভালোবাসার গল্পঃ জমে আছে।

চোখের দিকে তাকায় না সে ,দেখে না আসক্তি
একা একাই আমি পরে গুমরে গুমরে মরি।

আসবেনা কী? তুমি !
প্রহর গুনি আমি
 
বাসবে না কী? ভালো !
আর কতকাল থাকবো অবহেলো

ব্যাকুলতার বেদনা গান গায় বাতাসে 
কবে জানিনা এই শব্দ তুমার কাছে পৌঁছবে।

রাত্রিরা নিঝুম আজ 
কিটেরা স্তব্ধ শুনাতে আমাকে তোর আসার শব্দ।

কৃষ্ণ ধন শীল

প্রভাতী শোভা

ভোরের কূজন যেন শ্যামলে ভজন, 
আলতো আভায় মনে লাগে শিহরণ, 
কচি কচি কিশলয়ে কচি কাচার দল
নির্ভয়ে নেচে গেয়ে করে শোরগোল। 
ফুল কলি ফুটে ওঠে আপনিতে হাসে, 
কাক-চাতক কত পাখী আকাশেতে ভাসে, 
ফুলে ফুলে ঢলে অলি লুটে নেয় রজ্ঞন, 
প্রভাত ফেরীর ভ্রমরা জুটে করে গুঞ্জরণ। 
এতক্ষণে পূবের ভানু বাড়ায় তার জাল, 
নীল-সাদায় ভরে গগন ছেড়ে দিয়ে লাল, 
ঘাসের'পরে রামধনু বিলীন হয়ে যায়, 
রঙহীন কর্মসূচী শুরু হয় তাই।

মীনাক্ষী চক্রবর্তী সোম

আখাউড়া সীমান্তে 

স্মৃতিমেদুর মনগহনে অবিকৃত ছিল  যাপনকালের ইতিবৃত্ত।
একদিন বিষণ্ন সময়ের কথকতা সাথে নিয়ে 
পাড়ি দিয়েছিল কাঁটাতারের ওপারে 
কোনদিনও ফিরবে না বলে 
নাকি ফেরার রাস্তা বন্ধ বলে
সেদিন কেঁদেছিল খুব।
দেখা হল না 
গাভীন গরুর সন্তান....
সবুজ ধানের খেত হলদে হওয়া....
গোলা ভরা হয়নি তখনও....
ঠাকুর দালানে মূর্তিতে কাজলের টান....
আজন্ম লালিত ভিটের নাড়িছেঁড়া বড় কঠিন!!
বাপ-ঠাকুর্দার সঞ্চিত স্মৃতি বন্ধক রেখে
নিরুদ্দেশের উদ্দেশ্যে যাত্রায় ছিল উদ্বেগ!
অনেক বছর পর দাগের এপারে দাঁড়িয়ে 
মাটির গন্ধ শুঁকে চোরা দীর্ঘশ্বাসেরা
অজান্তেই সারি দিয়ে চলে যায় দিগন্তে ।
লালপেড়ে শাড়িতে অথর্ব শরীর
ছুঁয়ে পেতে চায় হারিয়ে যাওয়া শেকড়ের সন্ধান।
দুপাশে দুদেশের সীমান্ত প্রহরীকে সাক্ষী রেখে
প্রণাম করে উঠে চোখ মুছেছিল আঁচলের খুঁটে
আখাউড়া সীমান্তের সবুজ প্রহরী
তারও চোখ ভিজেছিল বুঝি মায়ের সৌরভে ।।

প্রতীক হালদার

সংসারের কাণ্ডারী 

নৌকার ন্যায় সংসার টার
কাণ্ডারী যে বাবা,
ঝঞ্ঝা-তুফান যতই আসুক 
শিরদাঁড়া রাখে সোজা।

সংসারেতে অর্থ নিয়ে 
যুদ্ধ যখন চলে,
ঝরে পড়া ঘামের কণা 
তোমার কথা কথা বলে।

নেই অজুহাত,নেই বিশ্রাম 
নেই তো তোমার শখ,
গাছের ছায়ার মতো তুমি 
সংসারে-ই রক্ষক।

নতুন জামা,নতুন জুতো 
খেলনা কিবা খাবার,
শুধুমাত্র তোমার পরিশ্রম 
এসব করে জোগাড়।

ভাবনা তোমার অনেক বেশি
তাই তো তুমি সেরা,
সংসারটা তাই তো বাবা
তোমার শ্রমে ঘেরা।

সাগর শর্মা

এইখানে সূর্য উঠে

এইখানে সূর্য উঠে-দিনের আলো ফিরে আসে বারবার,
সোনালি রোদে ঘেমে উঠা পাতা পত্ররন্ধ্র দিয়ে হাঁপ ছাড়ে;
প্রভাত রাঙা হয় আজও ওই দূরে জুরি নদীর পারে।
কলকলে বয়ে চলে,লক্ষ্য তার দূরের গাজীপুর পাহাড়,
ধ্রুপদীর সুরে চোখের আড়ালে কে দোলায় সেতারের তার?
শীতের সবুজ পাতা শিশিরের ভারে কাত হয়ে পড়ে;
বসন্তে শুধু নয়,এখানে কোকিল বারোমাস গেয়ে চলে রাগিনীর সুরে।
সন্ধ্যায় অচেনা রেল কুহুরবে বয়ে চলে শত যাত্রীর ভার।।

এখানে শরৎ এলে এখনও শিউলি সাদা হয়ে ফোটে,
পুজোর গন্ধ পেয়ে বাঙালি হৃদয় নিয়মিত করে আনচান।
সোনালি ধান জন্ম নেয় গ্রামগঞ্জের শস্যশ্যামল মাঠে-
এ রীতি আজকের নয়,যখন একাত্তরে বাঙালি দিয়েছিল প্রাণ;
সবকিছু এক ছিল,হারানো অতীত ভেবে কেবলই বুক ফাটে!
এইভাবে হেমন্তও আসে,অপেক্ষায় থাকি কবে শুনব হেমন্তের গান।।

সজীব কুমার পাল

অলৌকিক এক সংসার (গল্প)

      তুষার এই জীবনকে ভালোবাসে না।সে চেয়ে ছিল অন্য কোনো জীবন।যে জীবনে সুখ থাকবে অথচ অহংকার থাকবে না,প্রেম থাকবে কিন্তু সেই প্রেমে অবহেলা থাকবে না।তবে কি তুষার জুই এর কাছে অবহেলিত?জুই কি এখন অন্য আকাশের নিচে বসে জ্যোস্না রাতের চাঁদের আলোর খেলা দেখে?তুষার আবার ভাবতে থাকে ,আচ্ছা পুরুষ জাতি নারীদের সৌন্দর্যে নিজেকে সঁপে দেয়,নাকি নিজের যৌবন উত্তেজনার কঠিন বাস্তবতায় নারীর প্রতি প্রবল আকর্ষণ জন্মায়? যদি নারীর সৌন্দর্যে পুরুষ মোহিত হতো তাহলে পৃথিবীর অসুন্দর নারীরা কখনো পুরুষের ভালোবাসা পেতো না।আজ রোববার ।তুষারের অফিস নেই।ঘরে বসে আছে।হাতে মোবাইলটা নিয়ে জুইকে ফোন দিল,,,,

-"হ্যালো "

-কেমন আছো জুই?

- ভালো ।তুমি কেমন আছো?

- পৃথিবীতে সবচেয়ে সহজ ভালো থাকা,আবার সবচেয়ে কঠিন ভালো রাখা ।আমি ভালো নেই ,তবে ভালো আছি।

- কি বলছ এইসব ?

- আচ্ছা জুই তোমার কাছে ভালোবাসা মানে কি?

- জীবন।

- কেমন জীবন ?

- যে জীবনে নদী থাকবে অথচ জলের স্রোত থাকবে না।সেই নদীতে "তুমি" নামে একটা মাঝি থাকবে, তার লগি দিয়ে "আমি" নামে একটা মানুষকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে সাত সমুদ্র তেরো নদী। হঠাৎ করেই প্রবল বৃষ্টি হবে।সেই বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে "আমি" নামে সে মানুষটা "তুমি" নামে মাঝিকে বলবে ,"আচ্ছা,অঝোর বৃষ্টিতে সাগরের মতো নদীতে কখনো ঝড় ওঠে?"তখন মাঝি বলবে," ওঠে ।সেই ঝড় অন্যরকম,সেখানে মিলন হয় জলের সাথে হাওয়ার।,,,,,,"

তুষার জুইকে থামিয়ে বলছে ,"কই সে জীবন তো আজও আমি পাইনি?"

- তুমি আমাকে আপন করতে চেয়েছ,ভালোবাসাকে নয়।কারণ আমাকে তোমার প্রয়োজন,একটা পুরুষক একটা নারীকে একটা বয়সে কাছে চায় ।তুমি সেই চাওয়ার টানে চেয়েছ আমায়।

তুষার কোনো কথা বলল না আর।কলটা কেটে দিলো।জুই অনেকবার কল করছে ,মোবাইলের শব্দ তার কানে পৌঁছাতে পারছে না ।সে এখন অন্য একটা জগতে।সে ভাবছে,সে কি তবে জুইকে শুধু রাতের সঙ্গী হিসেবে চেয়েছে! কখনো জীবনের সঙ্গী হিসেবে নয়!কিন্ত তুষার ত তাকে নিয়ে সংসার করতে চেয়েছে ঠিক তবে বিয়ের পর ।কিন্তু বিয়ের আগে যে সংসার ভালোবাসার নামে গড়া হয় সেই সংসারের সুখ উপভোগ করতে সে চায়।যে সংসার দেখা যায় না,ছুঁয়া যায় না।শুধু অনুভব করা যায় ।

সুপ্রতিম ভৌমিক

অন্ন চাই (গল্প)

            অনাথ, ক্ষুধার্ত, অন্নহারা শিশুরা ক্ষুধা নিবারণ হেতু পথে বেরিয়েছে । খাদ্যের সন্ধানে দ্বার হতে দ্বারে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে পথ চলছে । কোথাও অন্নের সংস্থান মেলেনি । আশাহীন অন্তরে ক্ষুধার তাড়নায় পথ পাড়ি দিচ্ছে । অবশেষে দলবদ্ধ হয়ে এসে পৌঁছেছে এক দানবীর উদার মনুষ্যের দ্বারে ।

                  প্রকৃত মানবিকতার অধিকারী সেই মানব গৃহ হতে অনাথ, অন্নহীন শিশুদের কন্ঠধ্বনি শুনতে পেলেন । দ্বারে এসে প্রত্যক্ষ করলেন, একদল অন্নহীন অসহায় শিশুকে ; শিশুরা ক্ষুধার্ত, আহার প্রার্থী, ভিক্ষা চাইছে । আর শিশুরাও ভাবছে তিনি হয়তো কিছু একটা দেবেন,জঠর জ্বালা উপসম হেতু । গৃহকর্তাকে সম্মুখে উপস্থিত দেখে তারা নিরাশ অন্তরে একটুখানি আশার পরশ পেলো , মনে আশার আলো জাগলো । গৃহকর্তা শিশুদের আশ্বস্ত করে অন্দরমহলে প্রবেশ করলেন । গৃহ হতে দু'হাত  ভরে সেই দানবীর অন্ন নিয়ে খুশীতে বাইরে বেরিয়ে এলেন । শিশুদের সামনে এসে প্রাণ মন উজাড় করে অন্নদানে রত হলেন । ক্ষুধার্ত শিশুদের প্রসারিত উন্মুক্ত হস্তে অন্ন ঢেলে দিলেন । আর শিশুরাও তা' আপন মনে অনাবিল আনন্দে গ্রহণ করে ক্ষুধা নিবারণের খানিকটা পথ খুঁজে পেলো ।

স্বপন দেবনাথ

এসেছিলে একদিন

হঠাৎ এসেছিলে একদিন এই বিজন পথের বাঁকে 
চেয়েছিলাম আমরা দুজন দুজনার দিকে।
হয়েছিল অনেক কথা , যদিও ছিল না বলার কিছু
তথাপিও তোমার শব্দের ধ্বনিরা ধাবমান তোমার পিছু।
প্রস্ফুটিত এই পথের ধারে কতশত রকমারি ফুল
তোমার সেই কবরীর মাঝে খেয়েছিল তারা দোল ।
যৌবনের অরুণোদয় থেকে পরেছিল এক ক্লান্তির ছায়া 
তোমার স্পর্শে স্নিগ্ধ হলো আমার কবোষ্ণ কায়া ।
রূপে পরাক্রান্ত হয়ে তুমি করেছিলে কলরব 
তোমার রবে বিভোর হয়ে আমি হয়েছি পরাভব।

কল্যানী ভট্টাচার্য্য

সঠিক ইন্দ্রিয়

তুমি সুন্দর তুমি শ্রেষ্ঠ স্রষ্টা
তোমার শক্তি নীরেট
জীবন মৃত্যুর অনুভূতি তুমি। 
যেমন হয় আলো আঁধার
আকাশ,বাতাস,জল,বায়ু
সুখ দুঃখের সম্মিলন। 
শিরায় উপশিরায় রক্তের উপস্থিতি
ঠিক তেমনি তুমিই এ ধরিত্রীর
বেঁচে থাকা। 
তুমি কোমল,তুমিই সর্বশক্তিমান
বিলিয়ে দেওয়া তোমার অধিকার। 
গড়ে তোলাই তোমার পরিচয়
শাসন তোমার অধিকার। 
সযতন স্পর্শে যুঝে নাও
জাগিয়ে তোলো জেগে থাকা
ইন্দ্রিয়ের সঠিক প্রয়োগ চাই।

পাপিয়া দাস

নির্লজ্জ

কোথা থেকে এল 
তিন তিনটে বেড়াল।
প্রতিদিনই ঘরে বাইরে
যন্ত্রণা দেয়  বেসামাল।
কর্তা যখন মারতে যায়
বলি মারবে একটু যতনে।
আমরা যদি খাবার  না দেই
খাবার  পাবে ওরা কেমনে।
ভীষণ জ্বালাতন করে সারাক্ষণ 
স্বভাব তো ওদের নির্লজ্জতা।
বাঁচিয়ে বাাঁচিয়ে রাখি তাদের
তারাই করে আমার  সাথে কপটতা।
চুরি করে খাবার খাই
আবার  বিছানায় ওঠে ঘুমাতে চায়
কতো জ্বালা সহ‍্য করব
তিন তিনটে বিড়ালের।
আমি দয়া দেখাই  তাদের প্রতি
নষ্ট করে,চুরি করে খায়
সবার খাবার।

রাজীব বসাক

ধর্না

আমি ধর্না দেবো নির্জন প্রান্তরে,
শূন্য মরুভূমির বালুচরে,
যেখানে সকাল হবে শূন‍্যতায়,
সন্ধ্যা আসিবে মরুর বালুঝড়ে।।

আমি ধর্না দেবো মৃত্যুর পরে,
যখন ধোঁয়া হয়ে বিলীন হবো,
যখন আমায় ভুলে যাবে সব, 
আমি ধর্না দেবো আমার শূন‍্যতায়।।

আমি ধর্না দেবো ভুলের মাঝে,
দূর্ভীক্ষমাখা শহরের তীরে,
যেখানে ভোরের আলো ছড়াবে,
আর্তনাদ আর মৃত্যুর কলরবে।।

আমি ধর্না দেবো মিথ‍্যার শাসনে,
রক্তচক্ষু আর অত‍্যাচারের পদযাত্রায়,
ভূমির মাটি যখন রক্তে রাঙা,
যেখানে রাত না ফুরিয়ে চলে আসে সন্ধ্যা।।

সংগীত শীল

নিস্পন্দ

তোমার তানপুরার মতো
অনেকদিন আগে থেকে
আমাদের সম্পর্কেও ঘুণ ধরেছে
শিল্পী যেমন মাধুরি মিশিয়ে 
গানগুলোকে আগলে রাখে;
আমরা পারিনি; তাই মুক্তি দিয়েছি।

হুলুস্থুলি খাঁ খাঁ দুপুর নেই বলে বোধহয় 
হ্যাপিত্যেশের কোনো সমাগম পাচ্ছি না।
হয়তো দগ্ধ চোখে ঝর্ণার জল বইছে,
অনুচ্চারিত বর্ণমালা গলা শুকিয়ে কাঠ!

এ্যালবামের স্মৃতিগুলি নিষ্প্রভ বেলায় হারিয়ে ফেলবো দুজনে,
জমানো অভিসারও একদিন কেটে যাবে।
নতুন মানুষ শ্রাবণে দীপশিখা জ্বালাবে
নতুন গানে নতুন প্রেমে বাঁধবে।

শেওলাপড়া শ্বেত পাথরে লেখা নামটি 
অবশেষে নিস্তব্ধতার ভীড়ে লুকোবে,
তোমার আমার দেখা হবে কথা হবে
শুধু কুসুমের নীড়ে পাল্টে যাবে স্বপ্নের খেলাঘর।

রমা চন্দ্র

স্পর্শ

নিদ্রাহীন রাতের আঁধার ভাঙে...
চৌকিদারের বাঁশি,
ফুটপাতে শায়িত বয়োবৃদ্ধের কাশি,
রেলগাড়ির হুইসেল...
রেলপথে চাকার ঘর্ষণ
রাতজাগা শিকারীর আঘাতে
নিরীহ পাখির অসহায় ক্রন্দন...,
গাড়ির ঘোষণা-
অনুক্ত একাকিত্বের বেদনা,
ঝিঁঝিঁ পোকা সারমেয়দের একটানা চিৎকার...
বদ্ধ উন্মাদের বিকার-
সব মিলেমিশে একাকার...!
এক ভীষণ শক্তিশালী শব্দশেল
অবিরত অবিরাম...
কান পর্দায় দেয় টোকা
উত্তেজিত অডিটরি নার্ভটি বোকা!
অস্থিরতায় ছাড়ি শয্যা
শুরু করি পদচারণা 
অজান্তে বারান্দায় যাই
মায়ের হাতের মাধবীলতার ছোঁয়া পাই,
পলকে স্পর্শিত আমি
চাঁদনী প্লাবনে ভেসে যাই-
দূর-নীহারিকায়...!

দীপান্বিতা পান্ডে দীক্ষিৎ

শুধু নিজেকে নিয়ে

সকলেই বড় ব্যস্ত নিজেকে নিয়ে, 
তাকাবার  নেই সময় অন্য কোনো দিকে ৷
ইচ্ছা সকলেই দেখুক আমাকে৷
আর আমি উঠে গেছি খুব উপরে,
নিচেটা বড্ড ছোটো মনে হয়
 দেশলাইয়ের বাক্স কি লিলিপুটেব মতো ৷
তাই সব গুলো ঠিক দেখা হয়ে উঠেনা,
কেবলই বড়গুলো থাকে ফ্রেমে বাঁধানো ৷
সাদা কাগজ না হলে অক্ষরগুলো পরিচিতি পাই না,
অর্থ না হলে অনর্থের সংস্থান হয় না ৷
মুল্যবোধ এখন লুকিয়ে থাকে কালো চাদরে ,
পাছে সম্মান হারায় লক্ষ তারার মাঝে ৷
আকাশটা শুধু ঢাকা থাক অমাবস্যার আঁধারে ৷

সায়ন্তন সরকার

সময়যাপন

ফেনা ওঠা সমুদ্রের মতো
ফনা তুলে সবাই ছুঁতে চায় আকাশ
ব্যর্থ প্রয়াস সময়ের পরিহাস ;
অঙ্গে তারুণ্যের তরঙ্গ
ঢেউ এর মতো ভেঙে যায় ,
মোহনায় মোহভঙ্গ হয় ;
তবু আসমুদ্রহিমাচল ;
ঢেউ এর পর ঢেউ এসে যায়
কেউ কেউ কেমোফ্লেজ করে ,
কেউ বা ফেকলুর মতো
কেউ কেউ করে ছুটে মরে
সাময়িক সুখ সময়ে ,
থিতিয়ে যায় নিয়মের নিয়ন্ত্রনে
কালের কলমে অমৃতের বিষে ,
মিশে যেতে হয় ;
গভীরতার সাথে সময়যাপনের
অনন্ত সুখ সবার সয় না !

রিয়া বৈদ্য

তোমাকেই

হে সাথী, তোমার প্রাণের ভিতরে
বিপ্লবের আগুন জ্বলেছিল ,
তোমার ভরাট কণ্ঠে
এখনও শুনি সম্প্রীতির সুর
তোমার হৃদয় ক্ষেতে ফুটেছিল
ভালোবাসার গন্ধরাজ ।
পথ ভ্রষ্ট পথিকের অচেনা পথে
প্রকৃত বন্ধু তুমি ।
আদর্শে ধুয়ে নিয়েছো
শরীরে নোনা ঘাম ।
জীবনের পথ পরিক্রমায়
ছড়িয়েছে সত্যের বচন ।
তোমার না বলা কথারা
ভেসে ওঠে আয়নায় ,
খেই হারানো শব্দগুলো
জড়িয়ে ধরে শুধু তোমাকেই !

অম্পিকা পাল

গর্বিত

সেদিনের উপহাস করা মানুষগুলো
তাকে এগিয়ে দিচ্ছে-
ওরা নিজেরাই জানেনা কীভাবে-
ওরা শুধু দমন করতে জানে,
দুঃখ দিতে জানে,
শোষণ করতে জানে!
কিন্তু ওরা জানেনা ওদের দেওয়া দুঃখরাই 
সন্তান রূপে জন্ম নিচ্ছে 
খাতার পাতায়।
সে একসাথে তাদের 'পদ্য' বলে ডাকে।
ওরা বিকশিত হচ্ছে, দেশ-বিদেশে হচ্ছে প্রকাশিত!
আর তাদের মা
যে একটা সময় ভয়ে ভয়ে থাকতো,
মুখের উপর কোনো উত্তর দিতে পারতো না,
সে আজ পদ্যের গরবে গরবিনী।
সেদিনের উপহাস করা মানুষগুলো 
আজ চুপ হয়ে গেছে।
আজ সে 
মুখের উপর দিতে পারছে
জমানো প্রশ্নের উত্তর!
আজ অবাঞ্চিত যা কিছু,
চাপিয়ে দেওয়া মনগড়া নিয়ম;
তার বিরুদ্ধে গিয়েও 
সফলতার হাসি হাসে ;
আজকাল কবিতারও জন্ম দেয় সে,
'যেন' শব্দটি কবিতায় যুক্ত করলেও-
তাতে রয়েছে গভীর সত্য।
আধুনিকতার পরশে 
তারা আরো প্রাণবন্ত হয়ে উঠে।

দিন দিন প্রেমিকরা কবিতার প্রেমে পড়ে
কিন্তু কে!
কে তার জীবনের পদ্য পড়বে,
প্রেমে নয় ভালোবাসায়?