ছোটগল্প
তদস্তু হৃদয়ং তবঃ
আজ জয়েনিং। উত্তেজনা মেয়ের থেকে মায়েরই বেশি। ভোর রাতে উঠে মন্দিরে পুজো দিয়ে এসেছে। মেয়ের পছন্দের রান্না, টিফিন গুছোনোও সারা। ওর বাবা তো ইঞ্জিনিয়ারিং পাশের খবরটা ও শুনে যেতে পারেন নি। চোখের জল মুছলো সরযু।এই মেয়ের মুখ চেয়েই তো বেঁচে ছিলেন দুজনে। আর নিজে বেঁচে আছেন আজও।
--নেমে আয় মা,আর দেরি করিসনা,দুটো মুখে দিবি তো?
মিতুন ওদিকে বাবার ছবিতে মালা পরিয়ে কেঁদে আকুল হচ্ছিল। প্রণাম করে বলল,
-- আজ তোমার সব স্বপ্ন পূরণ করেছে তোমার মেয়ে, আশীর্বাদ করো বাবা।
মিতুন নেমে আসতেই, ওর মাথায় ফুল ছুঁইয়ে প্রসাদটুকু মুখে তুলে দিয়ে বলল,
-- কাঁদিসনা মা, তোর বাবার স্নেহের হাত সবসময় তোর মাথায় আছে রে মা।
মাকে প্রণাম করতেই, বুকে টেনে নিয়ে আবার বলল,
-- ঈশ্বর দয়াময়, তিনিই আবার তোর জীবনটা সাজিয়ে দেবেন, এই বিশ্বাস নিয়েই যে বেঁচে আছি রে মা।
" দুগ্গা দুগ্গা " বলে, মেয়েকে
রওনা করিয়ে, সোফায় এসে বসল সরযু। কাল সারারাত চোখের পাতা এক করতে পারেনি। স্বপ্ন পূরণ হলো যে আজ।
অফিসে ঢুকতেই বসের ঘরে ডাক পড়ল।
--- মে আই কাম ইন স্যার?
-- ইয়েস প্লিজ।
ঘরে ঢুকে বসকে দেখেই আঁতকে উঠল মিতুন ।বস ল্যাপটপ এ চোখ রেখেই বলল,
--আপনার নাম?
-- ম ম মৈত্রেয়ী সেন।
--
নামটা শুনই চোখ তুলে তাকাল বস্ সৃজন দাশগুপ্ত। তারপর তড়াক্ করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
--- মৈত্রেয়ী, মিতুন তুমি? সেন?
--- ভুল করছেন স্যার, আপনি বোধহয় অন্য কারও সাথে.......আমি মৈত্রেয়ী সেন।
---- ভুল? সৃজন তোমায় চিনতে ভুল করবে? দেশে ফিরে থেকে,পাগলের মত খুঁজছি তোমাকে।
-- স্যার প্লিজ বসুন আপনি। একটু স্টেবল্ হলে আবার আসব আমি।
--- মিতুন প্লিজ।
মৈত্রেয়ী ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। হতাশ সৃজন ধপ্ করে চেয়ারে বসে পড়ল। অনেকটাই সময় লাগল ওর ধাতস্থ হতে।বেল বাজাল, বেয়ারা ঢুকতেই বলল,
--অরিন্দম কো বুলাও আভি।
হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল ওর জুনিয়র অরিন্দম।
--- হোয়াটস্ রং স্যার,এনিথিং সিরিয়াস? আর ইউ ওকে স্যার?
--- আমি বেরোচ্ছি, আজ আর ফিরব না। তুমি একটু.......
--- নো প্রবলেম স্যার। কিন্তু আপনি ঠিক আছেন তো ?
---- ডোন্ট ওয়ারি, আই এম ফাইন।
বলে কোটটা কাঁধে চাপিয়ে ঝটপট বেরিয়ে গেল। মনের মধ্যে যেন তাণ্ডব চলছে।বাড়ি ফিরে জুতো খুলে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। কপালে হাতটা রেখে ভাবনার ডানা মেলে উড়িয়ে দিল , অতীতের সীমাহীন শূণ্যতায়।
তখন বারো ক্লাশ। অঙ্ক স্যারের কোচিন ক্লাশে সৃজন আর মৈত্রেয়ী। স্যারের নজর এড়াতে পারেনি ওদের সম্পর্কের রসায়ন। স্যার বলতেন,
ভাল নাম্বার পেলেই আমি খুশি, তোমাদের এই কেমিস্ট্রির দায় বা দায়িত্ব কোনটাই আমার নয়।
স্যারকে হতাশ করেনি ওরা। দুটো প্রেমিক মন স্বপ্ন আর উচ্চাশার শপথে, হাতে হাত রেখে সফলতার ম্যারাথনে ছুটেছিল।
মধ্য কলকাতার পৈতৃক বাড়িটায় আভিজাত্য ও বনেদিয়ানার তখনও রমরমা। বাবা মারা যাবার পরে, তিন ভাই মিলে ঠাকুর্দার হাতে গড়া ব্যবসাটায় লাভের অঙ্কটা বাড়িয়েই চলেছিল। ফলে অহঙ্কারটা আর প্রচ্ছন্ন থাকতনা। বাড়ির সুসজ্জিত দেবালয়ে নিত্য গোবিন্দ সেবা নিষ্ঠা সহকারে সম্পন্ন হতো।সৃজনের বাবা বড় ।কাকাদের বিয়ে হয়নি। তাই কূলতিলক সৃজন ছিল নয়নের মণি। কি স্কুলে, কি প্রতিবেশীদের, কি আত্মীয় পরিজনদের কাছে, সৃজন ছিল সেরার সেরা। শুধুমাত্র লেখাপড়া নয়, খেলাধুলাতে ও ছিল তুখোড়। মিতুনের বাবা ছিল না। দাদা একটু-আধটু দেখিয়ে দিত। টেস্টের রেজাল্ট খুব ভাল হলে, দাদা তিন মাসের জন্য কোচিং ক্লাশের ব্যবস্থা করল। সেই কোচিং ক্লাশেই সৃজনের সাথে প্রথম দেখা। ওখান কাছাকাছি এক বাড়িতে ভাড়া থাকত মিতুনরা। খুব ভাল রেজাল্ট করল ওরা দুজনেই।
আর এই উত্তেজনার মধ্যেই ওদের সম্পর্কের কথাটা জানাজানি হয়ে গেল দুই বাড়িতেই । প্রখ্যাত বনেদী বাড়ির সুদর্শন মেধাবী ছেলে আর বাপ-মা মরা ভাড়াটে বাড়ির মেয়ে? বাপ-কাকাদের মান-সম্মানের আর কিছু বাকি থাকবে? তাই পরামর্শ করে ওরা সৃজনকে বিদেশে পাঠিয়ে দিল
উচ্চ শিক্ষার জন্য। সৃজন শুধু নয় সকলেই বুঝলো সবটাই। যাবার আগে সৃজন চুপিচুপি মিতুনের সঙ্গে দেখা করে বলেছিল,
--আমার জন্য অপেক্ষা করো মিতুন।
মিতুনের দাদা বিয়ে করল। দাদা-বৌদির বন্ধু-বান্ধবরা আসত মাঝেমধ্যেই। মিতুনের রেজাল্ট সবে বেরিয়েছে। দাদা ও খুব খুশি। একদিন দাদার বন্ধুরা সব এসেছে। খাবার সার্ভ করছিল মিতুন বৌদির সাথে। কফির ট্রে হাতে মিতুনকে দেখে মুগ্ধ হলো অনীক সেন ,দাদার কলীগ জুনিয়র। দাদা তো প্রস্তাবে দারুণ খুশি। বিয়েটা আর আটকানোর কোনো সুযোগই পেলনা মিতুন। মিতুনের মতামত তো কেউ জানতে ও চায়নি। সৃজনকে মন থেকে মুছে দিতে চাইল মিতুন। অনীকের ভালবাসা আর নতুন জীবনকে বরণ করে নিল।
দুটো প্রেমিক মনের সব স্বপ্ন, সব উচ্চাশার ডানাগুলো একই সাথে ছেঁটে ফেলল দুই বাড়ির অভিভাবকরা। সৃজন তো অপেক্ষা করতে বলেছিল। মিতুনের কিছু করার ছিল?
সাতসাতটা বছর। দেশে ফিরেই মৈত্রেয়ীকে পাগলের মত খুঁজে বেরিয়েছে সৃজন। স্কুল- কলেজ এমন কি সেই ভাড়া বাড়িতে গিয়ে ও কড়া নেড়েছে। কোন খবর মেলেনি। ঈশ্বর আছেন তাই এভাবেই দেখা হল।আজ এতদিন পরে মিতুনকে দেখে আর মাথা ঠিক রাখতে পারেনি ও। কিন্তু মিতুন? ও কেন এত রূঢ় ব্যবহার করল? কেন এভাবে এড়িয়ে গেল ওকে? বিছানায় শুয়ে অতীত, বর্তমান একাকার করে ও যখন দিশাহারা, ঠিক তখনই মাথায় এলো প্ল্যানটা ।তাড়াতাড়ি উঠে ফ্রেশ হয়ে আবার ছুটল অফিসে। অরিন্দম অবাক।
--- স্যার আপনি?
--- হ্যাঁ, একটা জরুরী কাজ আছে।
অফিস রেজিস্টার ঘেঁটে বর্তমান ঠিকানা হদিশ তো মিলল ।তারপর পৌঁছে গেল নির্দিষ্ট ঠিকানায়। বেলা সবে তিনটে। বেল দিল। দরজা খুলল একজন বয়স্কা মহিলা।
--- কে আপনি?কাকে চাই?
--- এই বাড়িতে কি মৈত্রেয়ী থাকে?
---- কেন? কোনও বিপদ হলো না কি মেয়েটার?
---না না, মাসীমা শান্ত হোন প্লিজ। বিপদ নয়।
--- তবে?
--- আপনি মৈত্রেয়ীর কে?
---- আমি ওর মা।
--' মা? কি ভাবে? আমি তো ওর মা কে জানি। উনি আজ আর নেই। য
---- তোমার ওকে কি দরকার? একটু খুলে বলবে?
--- এই দরজায় দাঁড়িয়ে?
---- এসো ভেতরে এসো।
এক গ্লাস জল এনে রাখলেন টেবিলে।ওকে বসতে বলে নিজেও বসলেন। ভয়ে আতঙ্কে মুখ শুকিয়ে গেছে সরযুর। সৃজন তা লক্ষ্য করে বলে উঠল,
--- ভয়ের কিছু নাই মাসীমা। কিছু বলতে ও চাই, কিছু শুনতে ও চাই।
--- ভয়? ভয় পাবনা? এতদিনের ভয়, চিন্তা, উদ্বেগ, হতাশা সবটুকু মুছে, আজই সবে আশার প্রদীপটা জ্বেলেছি আমরা মা-মেয়েতে মিলে। আর নতুন কোনো আঘাত নেবার মত ক্ষমতা আমার নাই। মিতুন বাঢ়ি নাই।
---- জানি, তাই তো এলাম। আপনি ওর অভিভাবক। আপনার চাইতে বেশি ভাল আর কেউ নিশ্চয় চাইবেনা।
সৃজন ধীরে ধীরে সমস্ত অতীতটা গুছিয়ে বলল।আজ অফিসে যা হয়েছে তাও। সবটাই ঠাণ্ডা মাথায় শুনলো মিতুনের মা। তারপর ধীর স্বরে, খানিক স্বগতোক্তির মত বলল,
মিতুন আমার মেয়ে নয়, পুত্রবধূ।
বিয়ের সাতদিনের মাথায়, আমার একমাত্র সন্তান অনীক, এক ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনায় আমাদের ছেড়ে চলে যায়। ওর দাদা-বৌদি, পাড়া-প্রতিবেশী অপয়া বদনাম দিয়ে ওকে তাড়িয়ে দেয়। সন্তান শোক ভুলতে ওকে আমরা বুকে টেনে নিয়ে বেঁচে আছি এতকাল। ওর শ্বশুর ওকে পিতৃস্নেহে আগলে লেখাপড়ায় উৎসাহিত করেন। জীবন সম্বন্ধে একরাশ বিতৃষ্ণা নিয়ে, যে মেয়ে ঘরের কোণে মুখ লুকিয়েছিল, আজ এই জায়গায় তাকে আনতে ততটা সহজ ও ছিল না। আজই আমি সফলতার মুখ দেখেছি বাবা।
কথায় কথায় কখন সন্ধ্যা নেমেছে। বেল বাজলো। দরজা খুলতেই, সোফায় সৃজনকে বসে থাকতে দেখে,মিতুন
রেগে বলল,
--- আপনি? কেন এখানে?
সরযু দেবী মুচকি হেসে দুহাত কপালে ঠেকালেন।
--------------------------------
চন্দ্রা বিশ্বাস