Oct 31, 2023

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

কোজাগরী

হারানো পরম মুহূর্তগুলো সযত্নে তুলে
রাখে কোজাগরী রাত।
সাঁঝবাতি নিভে গেলেই তার শরীর বেয়ে
উপচে পড়ে আলো আর আলো। 
সে আলোর আছে মাদক আকর্ষণ।  
আলোর ভাঁজে ভাঁজে সে তার নগ্ন
শরীর মেলে ধরে। নগ্নতার মাঝে 
কোনো মিথ্যাচার থাকে না। 
কোনো ছলাকলাও নয়। আলোময়তা 
শরীরকে সুন্দর করে নাকি শরীর
সুন্দর করে আলোকে? লাখ টাকার প্রশ্ন 
বাঁচিয়ে রাখে কোনো অতীতকথা।
মৃতসঞ্জীবনী  অনুভব মৃদু মন্দিরার শব্দে
এপাশ ওপাশ হেলে ঢলে পড়ে।

ভোর না হওয়া পর্যন্ত কোজাগরীর 
দায় থাকে জেগে থাকার। 
ক্ষণিকের বিভ্রমে নষ্ট হয়ে যেতে পারে
চাঁদের নগ্নতার পোষাক।

চন্দন পাল

গৌরব

কবিতা, 
তুই যখন পাশ দিয়ে যাস কিংবা চোখে বসে থাকিস--
ছৈ এর জানলায়, পাখির ডানায় উড়ে উড়ে উঁকি দিয়ে যাস। 
ভাবি আমার কী লাভ !
হাজারো কবিতা আর কৃতিইতো চোখে পড়ে, প্রেম জাগে।
একটু সোহাগ, একটু উষ্ণ সম্ভাষ নাইবা পেলাম।
ক্ষতি নেই, প্রকাশের বিস্তারতো দূর দেশে শিহরণ তোলে।
আর আমার দেশেও সম্পদ আছে শুনে বুক ভরে।

রুদ্র মোস্তফা

ইতিহাস যেভাবে মিথ হয়ে মিশে যায় 

রাজা চলে যায়, থেকে যায় ধুধু গমনের দাগ
প্রজার চরণে রয়ে যায় ধুলো দাসত্ব রাগ।
অতীত উঠোনে খাদ্য-কথন পাঠ করে কেউ কেউ
নিত্য হাভাতে পেটের ভেতর কুকুরের মতো কাঁদে ঘেউঘেউ। 

কান্নার কালি হস্ত রেখায় ওয়ারিশ এঁকে
ক্রমাগত মিশে অভগ্ন দিনে সূর্য গলিয়ে জোছনার বাঁকে।
কখনো কখনো চিত হয়ে পড়ে চুপসানো চরাচরে
তবু ইতিহাস থেকে থেকে রোজ মিথের জন্ম দেয় গাল ভরে।

প্রমোদ গৃহের প্রমীলা এখনো পাঠকের মনে
ভাতঘুম তার আকুলিবিকুলি ঘুমচাপা উনুনে
মননের দেনা তাই মুমূর্ষু পেটে মিথ হয়ে মাথা পাল্টায়
রাজ্যের কথা রাজত্ব ছেড়ে শূন্য কাগজে এভাবেই মুখ লুকায়।

সুশান্ত নন্দী

আসছি তবে

পান্তা ভাত আর কচুর শাকে
লাঞ্চটা আজ সেরে,
সপরিবার দুগ্গা রানী
শ্বশুর বাড়ি ফেরে।

বিদায় বেলায় দুগ্গা জানায়
থাকিস তোরা সুখে,
বিজয়াটা কাটুক তোদের
শুধুই মিষ্টি মুখে।

নবীন কিশোর রায়

রক্তে লাল মাটি

শিশুরা তখন আপন মনে 
খেলায়, অকস্মাৎ থেমে গেল 
সবকিছু নিথর মৃতশরীরে! 

প্রাণভয়ে লুকিয়ে থাকা হাসপাতালে রোগীর পাশে মৃত্যু বিভীষিকা! 

ত্রয়ীশক্তি মারণাস্র নিয়ে
হিসেব নিকেষ করে---

সমাজতত্ত্বের মোড়কে সাঁটা দেশের মতিগতি স্পষ্ট নয়, ক্ষুদ্রাকার দেশের মাটি দরকার,এসবে ঘোর নেশা তার! 

প্রতিবার নরসংহার যজ্ঞে 
ঘি ঢালে এক নম্বর দোসর 
বিশ্বগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদ ! 

একশ চল্লিশ কোটির দেশ
আমার, সাহস হয় না  কিছু বলার... 

যুদ্ধ ভূমির মাটি ধুয়ে বয়ে আসে রক্তস্রোত
ভূমধ্যসাগর হয়ে উঠে লাল! 

পঙ্কজ কান্তি মালাকার

কলসীভূত

একবার বসার অভ্যেস হয়ে গেলে আর কি দাঁড়ানো যায়?
চার শেয়াল দাঁতে ছিঁড়ে খায় হাঁটুর শিরা থেকে রক্ত,
একটা রাক্ষুসে হাঁ-মুখ থলেথলে ভুরি দশজনকে গিলতে
পারে,
তেমনি এক কলসী-আসনের ছদ্মবেশে এসেছে
নরপিশাচ।

দুর্গার মহিষমুণ্ডু-ছেদনের মতো তার চার দাঁত ভাঙতে পারবে কি পায়ের লাথে?
দশটা কাজ দশ হাতে সারতে হয়
দশহাতে দশদিকে ডাকছেন মা ভবানী
ছুটে চলো ক্ষেত বাজার কারখানা মাঠ..... ডিঙিয়ে
চেয়ার দেখুক দশদিক জুড়ে তুমি চেয়ারের চেয়ে বিশাল
চাষার মতো এক কর্মঠ গঠন,হাতে অপরাজিতার কবচ।

রাহুল শীল

টানেল

বাবার কাছে আমার বিশেষ পরিচয় নেই
একজন সদ্য বেকার চাকরিপ্রার্থী ছাড়া,

পুত্রস্নেহের বিষাক্ত লালা 
এমনভাবে স্পর্শ করেছে
আমার শরীরী ভাষা অন্ধের মতো যেন মুখস্থ,

প্রতিটি প্রয়োজনের নখ 
বড়ো হওয়ার আগেই কেঁটে দিচ্ছেন সময় সময়!
রোদ মুছে ক্লান্তি ধুয়ে 
স্নান করাচ্ছেন এই বিষাদ বালককে।

আত্মক্ষয়ের দীর্ঘ টানেলে বাবা হেঁটেই যাচ্ছেন,

আর আমি আলোকিত মঞ্চে 
বাংলা কবিতা পড়ে বেড়াচ্ছি!!

সনজিৎ বণিক

স্বপ্নের জানালা

খুলে যাচ্ছে কেবল খুলে যাচ্ছে ঘুমন্ত শরীরের জানালা, মায়াময় বিহ্বলতায় জেগে ওঠছে তোমার যাবতীয় সুখ অসুখের বর্ণমালা,

ঐ দূরে দেখো আকাশের নীল তারা মিটমিট হাসছে,

তোমাকে জড়িয়ে নিতে মেলে দিয়েছে ডানা,

আজ এমন সুরভিত সকাল শেষে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যায় রেখেছে তার মনোযোগ যদি দেখা যায় অন্তরঙ্গ মুহূর্তের পদাবলী যা বড় বেশি মায়াময় ও স্বপ্নিল।

বিপ্লব উরাং

লিখতে হয়

লিখব লিখব বলে কনই লিখা নাই হছে।
ভাবি ভাবতে থাকি--
কি লিখব,কেনে লিখব।

চখের সামনে কত কিছু
ভাসে উঠছে, মিন্তুক 
সাজাই গোছায় লিখাটাত কষ্টের। 
তবু লিখতে হয়--নিজের জনে,
কেউ জানুক হামি কবি-।

কবি হওয়া এতই সোজা
তবু কবি হতে খোঁজি।
কবিরা সুখ,দুখ,যন্তনা, হাসি আনন্দ, মানুষ, অমানুষ সবকে লিয়ে লিয়ে।
সব কুছ ঠিক ঠাক হয়ত?
কে জানি বাপ্।

তবু লিখে,--
না লিখলে, আসছে দিনের ছানাপোনারা জানবেক কি করে।
লিখতে হয়।

লিটন শব্দকর

তোমাকে 

আজ যদি বৃষ্টি আসে 
তোমাকেই লিখে যাবো দাবদাহে পুড়ে যাওয়া গানের কলি
আমি জানি তোমার হাতে রচিত রাতে সংসারে জুড়ে বসে
দুটো বারোমাসের কোকিল 

উত্তপ্ত বিকেলে এক এক করে ঝরে যায় বকেয়া কৃষ্ণচূড়ারা,
তার লালে যে শ্রাবণের মাউথ অর্গান ফুরিয়ে যায়নি 
তোমার বুকে তার কোলাজে 
কোথাও আমি হাঁটছি অথবা মনে রাখতে পারি

যখন সন্ধে...
আমি বিশ্বাস করি এফ টিভি, চ্যানেল ভি-র পাশাপাশি একটি
ইলেক্ট্রিক পোস্টে উড়ে এসে প্যাঁচার গুটিসুটি হয়ে বসার 
টাইমিংয়ে একটি রেডিওর ট্রানজিস্টরের মতো প্রেমের দিন পৃথিবীও মনে রাখে। শুপুরি গাছ নীরব। 
গ্রাম্য দোকানের ঝাপ বন্ধ। হেঁটে আসি জড়িয়ে ধরা নরম সুতির আদরে তুমি আর আমি। ছোট ছোট ক'টা ছেলেমেয়ে দৌড়ে যায় ছানাপোনা নিয়ে ডাহুক হেঁটে যাওয়া উঠোনে। আজ যদি বৃষ্টি আসে তোমার হাতে রেখে দেব বেলাভূমির সমস্ত সঞ্চয়।

আব্দুল গফফার

লালবাতির পরী যুবতীরা

দুর্বাসিনী এখনও দাঁড়িয়ে আছে
ঝাপ্টা খাওয়া বারান্দায়-
দমকা হাওয়ায় ধুয়ে মুছে গেছে, 
পঙ্কিল ঘাম আর শরীর বিক্রির শ্রমগুলো!

নিস্তব্ধ রাত্রে যখন তারারা প্রেম করে-
বাধ্য হয় কলঙ্কের চাষ করতে, 
গভীর অভিসারে লিপ্ত হতে হয় তখন,

নেশাখোরদের চক্রযানে,
প্রতিনিয়ত ঝাপ্টা খায় লালবাতির পরী যুবতীরা-
উন্মত্ততায় কেটে যায়, যাপন করে লালসা নিশি,
মেঘাচ্ছন্ন এ এক অন্য জগৎ।

বেরিয়ে আসে রঙিন সুরাপানের গেলাস
ঠনঠন শব্দে ঋতু বদলে আকাশ খোলসা হয়,
দমকা হাওয়ায় প্রতিনিয়ত ঝড় ওঠে,

টাকা-কড়ি নয়, স্ক্যান করে 
পেশাদারিত্বের হিসাব মেটে,
নগদ মেসেজে পেট ভরে যায় এইভাবে!
যৌনতার স্বাদ আজ মলিন,
শরীর পেতে টাকা ওঠে- 
নিয়নবাতির ঝিমবাতিতে,
সুর ওঠে বেলা বয়ে যাওয়ার গানে।

দিপ্সি দে

জন্মের পরে

শব্দ ভেঙে গেলে হারিয়ে যাওয়া কবিতা জেগে উঠে
কলঙ্ক লিখতে লিখতে ভেঙে যাওয়া 
শব্দের জঠর থেকে জন্ম নেয় 
ভাত ঘুমে হারিয়ে ফেলা কাব্য।

ভবানী বিশ্বাস

তরুনী নদী

আমার একটা নদী আছে। একান্তই আমার। নিজের সম্পদ বলতে সেই নদীই। তাকে স্বযত্নে পুষি হৃদয় কোঠায়। হেমন্তকালে সে উজ্জীবিত হয়। নাম রাখি তরুণী।বহুবছর ধ্যানবিষ্ট কোনো এক সন্ন্যাসীর মতো একটা অশ্বত্থ গাছ পাহারা দেয় তাকে। তরুণীর বুক পবিত্র হয় তার ঝরাপাতায়।শরতের শিশিরবিন্দুর সাথে মিশে সে ধীরে ধীরে পুষ্ট হয়। সে হাসে খিলখিলিয়ে।যা আমার সুখের রসদ যোগায়।হেমন্তে তার পাড়ের বাঁশপাতা ঝরে পড়ে । তার স্বচ্ছ জলে দেখা যায় নিজ রূপে মশগুল নার্সিসাস। চারিদিকে মাঠ জুড়ে কাটা ধানের  গন্ধ।কৃষকের ঘামে মাখা পথঘাট।প্রশান্তিকর একটা পরিবেশ।

আমার একান্ত নিঃসঙ্গতাগুলো তাকে দিই। সে আপন করে নেয়। তার জন্ম হয়েছে বেশিদিন হয়নি। আমার মতনই সে নতুন এ জগতে। মাঝি ভাটিয়াল গায়না এখানে। সূর্যোদয়ের দৃশ্য যদিও দেখা যায় না তবে তার অস্ত যাওয়ার রক্তিম আভা বেশ আবিষ্ট করে রাখে।আমি তার পাড়ে বসে দেখি এসব।এখানে বসে তৃতীয়ার একফালি বকফুলি চাঁদ দেখা যায় দূরে বহুদূরে আবছা এক পাড়াগাঁয়ের উপর।শোনা যায় "চোখ গেল'' বলে রাতপাখির ডাক।....

ভাবি,এসব উপহার দেব তোমায়। আমার একান্ত বলতে এসব ছাড়া আর কিছুই নেই। তোমার যাপন ক্ষমতা বহুদূর বিস্তৃত। তুমি চাইলেই বানাতে পার এমন হাজারো পাহাড় নদী সমুদ্র। কিন্তু আমি আমার সবটুকু দিয়েই বানিয়েছি আমার তরুণী নদীকে। তুমি নেবে?

শর্মি দে

নিস্তব্ধ শহর

আত্মার গভীরে বিনোদিনী রাইয়ের খোঁজ
বেসামাল শহর বেআব্রু রাত
নিকোটিনে পুড়ে যাওয়া ঠোঁটের কোণে অভিমানী ঝড়
মনসিঁড়িতে উচাটনের সোদাল গন্ধ

ঝিরিঝিরি বৃষ্টিপথে তোমার খেয়ালী পনা 
অর্গল বেয়ে পড়ছে নিখোঁজ ক্লান্তি!
বিদ্ধস্ত মন খুঁজে নেয়
এক দিগন্ত ক্যানভাস
সেখানে ভেসে চলে একটুকরো নীল রোদ ...
প্রেম নদী হয়!

সংগীত শীল

 বটবৃক্ষ 

রোদে পুড়ে বৃষ্টি ভেজে,
পার আঁকড়ে নদী ধরে, ছায়া দেয় নিরালায়।

যেন এক বলিষ্ঠ বিশ্বস্থ হাত মাথায় থাকে অবিরাম,
অন্ধকার উদ্বিগ্ন মনের গহন সুরঙ্গে
আশার বাণী গায়।

শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে ভরসার বিস্তার, দূরদূরান্তে।

তুমি কঠোর বলেই
আমার জীবনতরী আজও অঙ্গিকারবদ্ধ।
তোমার দৃঢ় আশ্বাসে দুঃসাহসিক বীজ বপন করি।

তোমার জন্যই আমার বাগানে সফল হিল্লোল প্রবাহিত। 
হঠকারি শহরে আমি সাহসি দীপ্ত,
আত্মবিশ্বাসে বিশ্বজয়ী ।

বাবা তুমি বটবৃক্ষ।

আদিমা মজুমদার

নিকাহ

বিয়ে বাড়িতে প্রচন্ড হইচই শুনে রাস্তার লোক জড়ো হতে থাকে। একজন জিজ্ঞেস করে, কিতা বা কিতা হইছে, আপনার ভাগিনীর বর নাকি নিকাহ  কবুল করতে চাইছে না, সেটা কি ঠিক! সে নাকি আমাদের হাজার বছরের পরম্পরা ভেঙে দিতে চাইছে।কী দু:সাহস ছেলেটার। 

__ আর বলিস না ভাই, দিদিকে বলেছিলাম দেশি কুত্তা খোঁজ। দেশি কুত্তারা বিদেশ গেলে আর দেশি থাকে না, সব বিদেশী কালচার শিখে নেয়। দিদি বলে, মাহির নাকি ১০ বছর থেকে লাভ চলছে। একদিনে সব লাভ লোসকান করে দিল।

__ এই ব্যাপারটা আগে তোমাদের সমাধান করা উচিত ছিল। কথাটি শুনে মাহির মামা চুপ হয়ে যায়।

           মোল্লার গায়ে তীব্র আতরের গন্ধ। বরের কাছে গিয়ে নিকাহ পড়াতে বসেন। প্রথমে দুরুদ শরীফ পাঠ করেন।  ছাঙ্গুর তল নিবাসী জনাব হারিস আলি মজুমদার  সাহেবের প্রথম কন্যা  মাহি খানম পাঁচ লাখ টাকা মহর সাব্যস্ত করে আমাদের উকিল হিসেবে পেশ করেছেন আপনি কবুল করেন, বলেন আলহামদুলিল্লাহ।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে বর নিষাদ চৌধুরী বলে ওঠেন ' এটা আমার দ্বারা সম্ভব নয়'। বিয়ে মানে শুধু দুজন মানুষের দৈহিক মিলন নয়।শুধু বন্ধু খুঁজে পাওয়া ও নয়।বিয়ে মানে দুটো পৃথক আত্মা, পৃথক প্রাণ এক হওয়া বুঝায়।

বিয়ে মানে কাউকে একান্ত নিজের করে পাওয়া। যার সাথে ঝগড়া হবে, ভাব হবে... তবু কেউ কাউকে ছেড়ে যাবে না।একটা বিশ্বাস। কথাটা শুনে সবাই হতবাক হয়ে যান। মোল্লা সাহেব বলেন নাউজুবিল্লাহ মিন জালিক।বিশিষ্ট কথা সাহিত্যিক শরৎচন্দ্রের' শ্রীকান্ত' উপন্যাসের  শীকান্তের মত উপস্থিত সকলে কে কতখানি হা করিতে পারে তারই যেন লড়াই চলে।

নিষাদের বন্ধু মোবাইল থেকে একটি ভিডিও সবার সামনে তুলে ধরে। সেই ভিডিওতে দেখা গেল ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে নিষাদ আর মাহি দাঁড়িয়ে ইংরেজিতে শপথ করছে 'আজ থেকে তুমি আমার 'ল ফুল' হাসবেন্ড। '

বর নিষাদ সকলকে উদ্দেশ্য করে বলে, শুনছেন দেখছেন  পরিষ্কার করে, এক ভারতবর্ষে একটাই আইন থাকে এবং আমরা তা সজ্ঞানে পালন করছি, এখন আবার বস্তা পচা 'আলহামদুলিল্লাহ 'বলতে হবে কেন। আপনারা তো পড়াশোনা জানা মানুষ, কেন শুধু শুধু পেছনদিকে হাঁটছেন।

 মাহির মামা শব্দ করে বলেন লা হাওলা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ!

                    বউ সেজে বসে আছে মাহি। বন্ধুরা খবর বইছে বাতাসে। কেউ কেউ খিল খিল করে হাসছে। খিস্তি উড়াচ্ছে। মাহি শাড়ির পাড়ের দিকে চেয়ে রয়েছে। পেখম মেলা ময়ুরের ছবি আঁকা পাড়। নিষাদ এরকম কিছু একটা শয়তানি করবে বলে মাহির মাথায় আগেই চিন্তা ছিল।রসুই ঘরের করিডোরে গোল হয়ে বসে পাড়ার মেয়েরা গান ধরেন-' দামান্দ বড় হাউসিয়া মাথার বেসর আনছইন দামান্দে বাছিয়া, আর বাজুবন্দ আনছইন দামান্দে সুন্দরীর লাগিয়া নারে...

           মোল্লা সাহেব বারবার ছদরী ছেড়ে উঠে যাচ্ছেন আবার কারো অনুরোধে বসছেন, বলেন এমন ছন্নছাড়া বর জীবনে দেখেননি। হাজার খানেক নিকা পড়িয়েছেন এ জীবনে। বাড়ি ভর্তি লোক ফিসফাস করছে ।  কেউ কেউ ফোন করে বন্ধুদের জানাচ্ছেন নতুন খবর, টক ঝাল মিষ্টি মিশিয়ে।

       মাহি স্বাগদুক্তি করে," It is very difficult to live with the very successful men, they are not normal. পাশের রুম থেকে ফোন করে নিষাদকে, কেন এমন করছ,' আলহামদুলিল্লাহ' বলে দিলে কি হয়। প্রান্তিক মানুষের আবেগকে মূল্য দিতে তুমিই আমাকে শেখালে। না মাহি ব্রিটিশ আমলের নিয়মগুলো আমাদের পাল্টাতে হবে। কোর্টশিপ করার পর আবার নিকাহ কিসের। প্রান্তিক মানুষদের একথাও বুঝানো দরকার। আত্মীয়-স্বজনদের সাথে পরিচয় হবে বলে আজ এসেছি। কাবিননামায় স্বাক্ষর করেছি।আর কি।দাদিজির মতো কথা বলো না তো।

অবাক বিস্ময়ে সবাই তাকিয়ে থাকে নিষাদের দিকে,  যেন মিউজিয়ামে কোন নতুন প্রজাতির জন্তু দেখছে।

মোল্লা সাহেব এবার পবিত্র কুরআন শরীফ থেকে সূরা পড়া শুরু করেন। আস্তাগফিরুল্লাহ।

মাহির বাবা বলেন ভালোবাসার লোক আর খুঁজে পেলে না মা, এ তল্লাটে। আমার ইজ্জত বরম সব খোয়া গেল। সঙ্গে অনেকেই সহমত পোষণ করেন, মাথা নেড়ে।

বাবার কথা শেষ হতে না হতে মাহি বলে, আমি বলছিলাম এরকম আয়োজনের কোন দরকার নেই। আমি তো এখন কচি খুকিটি নই, আমি পুরো ম্যাচিওর।' চুপ থাক 'দুদিন পরে যখন লাথ খাবি, যাবার জায়গা থাকবে না বলে দিলাম। নিষাদের মা বাবাও আলাদা থাকেন। আর সে কি করবে আমার ভালো জানা আছে।

নিষাদের বাবা কাচুমুচু করে ছেলের কাছে এসে বলেন, 'বাবা আর লজ্জা দিস না। 'নিষাদ বলে এটা কোনো লজ্জার ব্যাপার না আব্বু। সত্য বলার জন্য কত কত বিজ্ঞানীদের বিষ প্রয়োগে  মেরে ফেলা হয়েছে তোমার জানা আছে না? এটা তো সামান্য ঘটনা। বলছিলাম আমরা দুজন খুব ভালো ছিলাম,তোমাদের জন্যই...

মাহির মা, মামি দুজনে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন, মোল্লা এসে জল পড়ে মুখে বুকে ছিটা দিচ্ছে।

নিষাদ এবার মোল্লাকে ইশারা করে নিয়ে যায় রাস্তায়। দশ হাজার টাকার বান্ডিল হাতে দিয়ে বলে, 'আলহামদুলিল্লাহ 'না বলে কি করা যায় দেখো। মোল্লা এতগুলো টাকা পেয়ে ভ্যাবাচ্যাকা  খেয়ে যায়। লুঙ্গির খুটে টাকাগুলো রেখে, ঘরে ঢুকেই ইয়াসিনের প্রথম মুমিন পাঠ করে।"  ইয়াসিন অল কোরায়ানিল হাকিম,ইন্নাকা লা মিনাল মুরছালিন, আলা সিরাতিম মুস্তাকিন... "বড় বড় করে বলেন শুনুন, শুনুন সবাই_ আমাদের কাবিন নামায় দস্তাখত হয়ে গেছে। কোর্টের কাগজও আমরা দেখেছি। মাই হাওয়া বাবা আদমের তাও ছিল না। এই বিয়ে বিধি সম্মত হয়েছে। এবার সবাই হাত তুলুন আল্লাহর দরগায় দোয়া করি__

রব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতে হাসানাতাও ওয়াকিনা আজাবান্নার... মাহি এবং নিষাদের জীবন উজ্জ্বল শান্তিময় হোক। এক নতুন পথের দিশারী হয়ে রইল তারা।

একজন জনৈক কবি সেখানে উপস্থিত ছিলেন, তিনি পড়তে থাকেন----

কুরআন-হাদিস সবাই বলে -
পবিত্র সে বেহেস্ত নাকি,
মিলবে সেথায় আসল শারাব
তন্বী হুরি ডাগর আঁখি 
শারাব এবং প্রিয়ায় নিয়ে
দিন কাটে মোর, দোষ কি তাতে?
বেহেশতে যা হারাম নহে-
মর্ত্যে হবে হারাম তা কি?

বি:দ্র: আমার গল্প ঠিক কোনখানে শেষ করবো বুঝতে পারিনা। প্রুফ রিডার বলেন- তারপর? নিষাদ এবং মেহেকের বিয়ে কি হয়েছিল?  

আমার গল্পে অন্য কেউ কথা বললে আমি বিরক্ত হয়ে যাই।প্রুফ রিডারকে বলি, হ্যাঁ হয়েছিল এবং তারা খুব সুখি দম্পতি। 

শেষ দিকটা নাহয় তুমি লিখে নিও।আচ্ছা বদমাশ লোকটা। 

শুভ্রা দেব

আস্তরণ
   
কাত্যায়নীর অঙ্গে অঙ্গে 
ঝলমলে রূপার ঝিলিক,

গানের ছন্দে আলোর খেলা....
দশমী আবহে মাতোয়ারা ভক্তবৃন্দ,
মাটির প্রতিমার অনিচ্ছাতেও
মুখে গুজে সুস্বাদু মিষ্টি সন্দেশ!

চিলেকোঠার নিভু আলোয় 
আধপেটা জীর্ণকায়া,

সূঁচ সূতোর প্যাঁচ তোলা 
ছেঁড়া কাঁথার আস্তরণে
লুকিয়ে দুধেল ঋণ ভরা
নিষ্পাপ মায়ের মুখ!

প্রতীক হালদার

ভেবেই দেখো 

ভাবলে সবাই আপন আর
না ভাবলে সবাই পর,
ভাবলে ভীষণ খুশি আছি
না ভাবলে খুবই দুঃখী।

ভাবলে সবাই পাশে আছে
না ভাবলে বড়ই একাকী,
ভাবলে আমিও সব পারি
না ভাবলে আমিও অপারক।

ভাবলে আমিও জয়ী হতে পারি
না ভাবলে আমি পরাজিত,
ভাবলে আমিও সাহসী 
না ভাবলে খুবই ভীতু।

ভাবলে আমিও ধনী
না ভাবলে গরীব ভীষণ,
ভাবলে আমিও পরিশ্রমী 
না ভাবলে ভীষণ অলস।

জীবনে ভাবনা-চিন্তা অত্যন্ত জরুরি।

জগন্নাথ বনিক

দর্শকের মনে ভাবনা 

আমি দর্শক আসনে বসে, কবিদের কবিতা পাঠ শুনছিলাম।
কবিরা একে একে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে,
কবিতা পড়লেন।
দর্শক আসনে বসা সবাই,
কবিদের কবিতা পাঠ শুনে হাততালি দিলেন।।
আর আমি ভাবতে লাগলাম,
কীভাবে কবিরা কবিতা লেখেন।।
যদি আমি লিখতে পারতাম কবিদের মতো,
মঞ্চে দাঁড়িয়ে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে কবিতা পড়তাম।।
আর দর্শকের হাততালি শুনে, 
অভিনন্দন পেতাম।।

অভিষেক অধিকারী

যুদ্ধ

একটা যুদ্ধ সব পাল্টে দিতে পারে,
তার উত্তপ্ত ক্ষমতার খিদে গ্রাস করে 
নিরীহ তাজা প্রাণ। 
তবুও তার খিদে মেটে না।

সাম্রাজ‍্যবাদের ক্ষুধার মেনু হয়
মানব রক্ত।

মানুষের চোখের জলকে ক্ষমা করে না
সাম্রাজ‍্যবাদীর ছোঁরা উত্তপ্ত বুলেট।

সাম্রাজ‍্যবাদীর ট‍্যাঙ্কারে পিষে যায় 
মানুষের যাবতীয় শৈল্পিক মূল‍্যবোধ।

একটা যুদ্ধ সব পাল্টে দিতে পারে,
অস্ত্রের হানাহানি হয়ে ওঠে মানুষের বিভেদকামীতার
ভয়াবহ ফলাফল।

সভ‍্যতার গর্বে গর্বিত মানুষের অবশেষ খুঁজে পাওয়া যায় না যুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে। 

বঞ্চিত মানুষের অশ্রু ঝরে পরে বোমারু বিমানের 
আঘাতে।
তবুও মানুষ যুদ্ধ করে......
নিজের আদিম পশু সত্ত্বা দিয়ে সভ‍্যতাকে ব‍্যঙ্গ করার জন‍্যে। 

পান্থ দাস

যাই হারিয়ে

হারিয়ে যাই
একাকী রাতে,
মন আটকানো
বন্ধ আলোতে ।

হারিয়ে যাই
গোলাপের ঘ্রাণে,
ভ্রমরের পাখনায়
ছুটে চলি বনে।

হারিয়ে যাই
ধুলো মাখা স্মৃতিতে,
মেঘ জমে মনে
আর ভিজে চোখ বৃষ্টিতে।

সোনালী গোস্বামী

অতীতের ছবি

অতীতের ছবিগুলো আজও মনে পড়ে..
প্রাণখোলা হাসির ঝলকানি,
সারাদিন এদিক ওদিক করে কেটে যাওয়া
বন্ধুদের সাথে কতো কথা কানাকানি।

ছবির আছে রং আছে সাজ
নানান স্বপ্নের সাজানো প্রহর,
আছে কথা, আছে কাহিনী
সব মিলে সুখের বাণী।

সময়ের সাথে বদলে গেছে সব
নেই কোনো সখ কোনো সাধ,
আছে শুধু গভীর ভাবনার অথৈ সাগর
যার লোনা জলে শুষে নিয়েছে সকল স্বাদ।

হ্যা, বড্ড কঠিন বড্ড এক ঘেয়েমি
বড্ড বাস্তবতার তীব্র ঝড়...
যার নেই শেষ নেই বিরাম
আছে শুধু এক স্মৃতির প্রলেপ।

আর এই যাত্রার শেষে নিজেই নিজের সম্বল
নিজেই নিজের সাথী,নিজের আপন
বর্তমান ও ভবিষ্যতের যাত্রায়
অতীত কেবল মায়া স্মৃতির বন্ধন।

রমা চন্দ্র

মা

বিচিত্র মণ্ডপ সজ্জা
নানা রঙের আলোর খেলা...
মানুষের মিলন মেলা
সবের মাঝে 'মা' মহামায়া 
শক্তিরূপিনি কন্যা ভগিনী জায়া,
'মা' আভূমি বিস্তৃত আঁচল...
'মা'তেই নিয়ত সব সৃষ্টি
'মা' সুখবৃষ্টি...
'মা'এর বিশ্বজোড়া রূপ
অরূপের মাঝে-
তিনি অপরূপা অনুপমা উমা
কখন‌ও রণচণ্ডী অসুরদলনী
অশুভনাশিনী দূর্গা,
'মা' এর পূজার অর্ঘ্য
যদি হয় মনের ভক্তি
এজগতে সেই ভক্ত
মায়ের শুভাশীষে-
লাভ করে অপরাজেয় শক্তি।

গৌতম চন্দ্র

বোধ

বোধের গোচরে-
জীবের জন্ম একবার‌ই হয়
জীবন তাই একটা,
শুধু একটাই।
জীবন সায়াহ্নে
কৃতকর্মের জন্য
কোন আফশোস যেন না থাকে!
জন্মভূমি ও একটাই
মাটির ঋণ পরিশোধে-
কোন ভুল যেন না হয়!
জ্ব'লে জ্ব'লে গন্ধ বিলিয়ে...
প্রেরণা ছড়িয়ে...
হৃদয় জড়িয়ে...
সচল সফল কর্মযোগ রচনায়
নিষ্ঠা যেন সঙ্গ না ছাড়ে
পূর্ণ কর গো আমারে!

অশ্বিনী কুমার মন্ডল

চিরবিদায় 

যা পাখী তুই যা 
তোকে মুক্তি দিলাম আজ। 
এই ভালোবাসার অন্ধ গলিতে 
বন্দি থেকে; নেই আর কোনো কাজ?
এক আকাশ স্বাধীনতায় তুই 
থাকবি রে হেসে খেলে,
জানি আমার আর করবি না খোঁজ 
অগাধ সময় পেলে? 
আমার শেখানো বুলি রে পাখী
জানি বলবি না আর কোনও দিন।
আমি যে শুধু তোর চোখেতে
একজন সহায়সম্বলহীন !
অস্তকালে নিজের ছায়াও
যার রে অনেক দূরে সরে,
আমাদের ভালোবাসার সূর্য ও হয়তো
ফিঁকে হয়েছে পশ্চিম দিগন্ত ভরে? 
এ বট বৃক্ষে আর কখনো
পাখি ফিরবি না তুই হায়!
তাই এ মন থেকে তোরে আমি
জানাই চিরবিদায়।

অসীম পাঠক

অনুগল্প 

আত্মহত্যা                                

রবীন্দ্রনাথের রূপনারানের কূল জুড়ে এখন কবিতা নেই, আছে এক মুঠো খাবারের। জন্য লড়াই। বিধ্বংসী বন্যায় ভাসছে গোটা এলাকা। চারদিক অন্ধকারে ছেয়ে আছে। পতিতা পল্লীতে লাশ পাওয়া গেছে। অনাহারে কাটানো মধ্য পঞ্চাশের অভুক্ত কামিনী যে একসময় গিলেছে সহস্র যৌবন সে আত্মহত্যা করেছে। থানা পুলিশ মিডিয়া সব যেনো হামলে পড়েছে। হাজার হাজার উৎসুক চোখ কামিনীর নগ্ন লাশে গল্প খো়ঁজে, রহস্যময় থ্রিলার। আর কামিনী যখন খাবার চেয়েও পায়নি , খদ্দের তো কতোকাল জোটেনি, পড়ন্ত রূপে কে আর মজবে। সে বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায় ঠিক বুঝেছিলো যে মরাটা খুবই কঠিন বেঁচে থাকার চেয়েও কঠিন। দু দিন তো চেষ্টা করেও পারেনি । তিন দিনের দিন ঠিক পারলো খবর করতে। নিম্নচাপে ঝালমুড়ি গরম খিচুড়ি আর ইলিশের মুখরোচক রেসিপির সাথে বেশ তাজা খবর। একটি আত্মহত্যা দেখিয়ে দিয়ে গেলো আত্মহননের আরও সহস্র অভিমুখ। জল বাড়ছে রূপনারানের কূলে। ভাসছে স্বপ্ন, ভাসছে যৌবন, বাড়ছে আত্মহত্যা।

সোনালী মন্ডল

স্বাধীনতার সাধ

ইতিহাস ঘেঁটে দেখছি বসে বইয়ের পাতায় লেখা,
বিদেশী দের দেশ শাসনে দুর্বিসহ  ভারতীয়রা।
কতো মায়ের কোল হারিয়েছে জন্ম ভূমির জন্য,
পথের ধুলো লাল হয়েছে,দুর্ভিক্ষে খুঁজেছে অন্ন।
ক্লান্ত পায়ে হার মানেনি প্রতিবাদের ভাষায় ছন্দ,
লড়াই শেষে জয়ী হয়ে পেল স্বাধীনতার আনন্দ।
স্বাধীনতার দিবস পালন পার করেছে কয়েক দশক,
তার স্মৃতিতে মেতে ওঠা শিল্পীর সৃষ্টিতে দর্শক।
বর্তমানের জীবন দর্শনে মনে লাগে ভীষণ খটকা,
দেশটা যেন আমার নয়,পালা বদলে শাসকের ছক্কা।
জন দরদী বহুরূপীরা বিদেশীদের থেকে আলাদা,
থাকছে দেশে খাচ্ছে পাতে নর মাংস কষা।
উপরে তারা গিরগিটির রূপ,ভিতরে বন্য পশু,
মানুষ নাকি ভিন্ন গ্রহের?কিছুতে হয়না কাবু।
পেটে তাদের সাগর সমান গভীর উদর থাকে,
যতই খায় ততই যেন অভুক্ত ভাবে নির্বোধ লোকে।
স্বাধীন দেশের পথে থাকে সাজানো বইয়ের সারি,
নৈরাজ্যে ভরা সর্বত্র জানি,অশ্লীল জ্ঞানে নারী।
মূর্খরা করে দেশ শাসন,বুলি জ্ঞানের ভাষণ,
একটি প্রজন্মকে ধ্বংসের চক্রান্তে শিক্ষা ব্যবস্থা গঠন।
সবুজে ভরা দেশের মাটি মুক্ত বায়ুর খোঁজে,
ঘরে ঘরে নিরীহ মানব পকৃত খলতা বোঝে।
পরাধীনতার ষড়যন্ত্র চাইনা স্বাধীনতার অর্থে,
ফিরে কবে আসবে আবার মনুষ্যত্বের বিবেক কর্মে?

পাপিয়া দাস

বিসর্জন

বিসর্জন মানেই বিষাদের সুর
আমরা ভয়ঙ্কর  একটা বাস্তবতার শিখরে,
বিশাল একটা আনন্দের পর
দুঃখ প্রশমিত।

দেবীর আগমনে আমরা
প্রস্তুতি  নেই দু' তিন মাস ধরে 
রকমারি পোষাক, সাজসজ্জা
আর  রকমারি খাবারে নিমজ্জিত।

আলোকসজ্জা, প্রতিমা লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে
আনন্দের বিরাট সমাহার,
কিন্তু সেই দশমীতে মায়ের বিদায়
চোখ জ্বলজ্বল করে পিতামাতার।

যেন এতোদিন অন্নপূর্ণা পাশে ছিল
ঘরে অভাব ছিলো নাতো
আলোময়ী মা আলো বিচ্ছুরণ করছিলো
ঘরের ভিতরে বাইরে প্রতিনিয়ত।

চার দিনের সেই আনন্দ শেষে
বিষাদের সুর কানে বাজে প্রতি ক্ষণে ক্ষণে।
যেখানে উল্লাসের বলিদান মাকে দিতে হল
জলে বিসর্জিত হয়ে।

সুচরিতা পাটারী

সহজ সমাধান

শিয়র এর পাশেই একটা গাছ রোপণ করেছিলাম। এরপর কয়েক বসন্ত কেটে গেলো। বসন্ত এলেই সমস্ত পাতা ঝরে যায় কিন্তু একটি পাতা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। জন্মলগ্ন থেকে সে পাতার আর স্থানচ্যুত  হয়নি কখনো। সে পাতায় বহুকাল ধরে সালোকসংশ্লেষ প্রায় হয়না বললেই চলে। ধীরে ধীরে হলুদ বর্ণ ধরে যাচ্ছে বছর তিনেক ধরেই। হঠাৎ তাকে একদিন বিবর্ণতায় বেঁচে থাকার কারণ জিজ্ঞেস করতেই সে জানালো এমন উত্তর দেওয়ার মতো শব্দ এ পৃথিবী আবিষ্কার করতে পারেনি।

বুঝলাম কোনো এ প্রশ্নের উত্তর তার জানা নেই। শুধু হলুদ বিবর্ণতার মাঝে মাঝে ক্ষাণিকটা সবুজের ছিঁটেফোঁটা ঘিরে প্রতি বসন্ত শেষে আবার বাঁচার স্বপ্ন দেখে সে।

 জীবনের কঠিন উত্থান পতন উপেক্ষা করে কেবল মায়ায় জড়িয়ে বসন্তের পর বসন্ত দিব্যি  কাটিয়ে দিচ্ছে। পরিশেষে আবার জানতে চাইলাম এ জীবনের শেষ কোথায়? অমলিন ভাবে হেসে জানালো শেষ শুরু ভেবে কখনো কোনো কাজ করা যায় না।  শরীরে যে কিছুটা সবুজের ছিঁটেফোঁটা আছে হয় সেগুলো প্রাধান্য পেয়ে আবার পুরো সবুজে ভরে উঠবে নয়তো হলুদ এর প্রাধান্যে বৃক্ষ ত্যাগ করবে। শুনে খুবই সহজ সমাধান মনে হলেও জীবনের এমন সহজ সমাধানে আসতে যে কাঁটা পথগুলো পেরিয়ে আসতে হয় সেগুলোর অভিজ্ঞতা বাস্তবে কারোর উপভোগ্য না হলে প্রায় বিবর্ণময় পাতার গল্প আমাদের চেতনায় সেই সরলতার ছাপ ফেলতে পারবে না কখনোই।।

রামমোহন বাগচী

জীবনের যাদুকর

ভাবি মনে মনে এটাই কি জীবন ?
অন্তর হীন আত্মীয়ের যাদুর খেলায়
ঝড়ে আত্মার অশ্রু। 
মুক  বধির শিক্ষার রাজ প্রাসাদে  
দাপিয়ে বেড়ায় অন্তর হীন আত্মা
ছড়িয়ে রঙ্গিন স্বপ্ন। 
স্বপ্নের মাঝে আছে স্বপ্ন, এ এক অপূর্ব স্বপ্ন
ধরা ছোয়ার  বাহিরে থেকেও নির্ভয়ে
চালায় আপন খেলা, দিবানিশি। 
সরস্বতীর হংস উড়ে আকাশে
ভুলে নির্মল নীরের  সরোভর
শুভ্র চরিত্রে অভিনয়ের স্বর্ণপদক পরে গলে। 
যাদুঘরে যাদুর খেলা,যাদুকর বিনে
এমনি মন্ত্র শিখায়, মন্ত্র হীন আত্মা  
ছরিয়ে মায়ার জাল রাজার ভান্ডারে। 
বিশ্বের অর্ঘ দূত প্রেরণার উৎস
জ্ঞানের যোয়ার  ভাটার, রত্নের ভান্ডার
রাধানগরে কৃষ্ণের অবতার। 
চক্ষু হীন আত্মা ছরিয়ে মায়ার জাল    
প্রজাহিতৈষী মন্ত্রের নকল ঋষি করে
 প্রজার সর্বনাশের  মন্ত্র পাঠ।।। 
ভাবি মনে মনে এটাই কি জীবন ?

সঞ্জীব কুমার রাহা

অসহায় মহাদেব

কৈলাশে মহাদেব প্রচণ্ড রেগে গিয়েছেন।

উনি মা দুর্গাকে কিছুতেই মর্তে আসতে দেবেন না কারন ওখানে করোনা ভীষন ছোঁয়াচে ব্যাধি ।উনি মর্তে ওনার দূত নারদকে পাঠিয়ে খবর নিয়েছেন যে কেউ আক্রান্ত হতে পারে আর এর কোনো ওষুধ নেই।

কিন্তু দুর্গা নাছোড়বান্দা ওনার জেদ ,প্রত্যেক 

বছরেরতো এবছরও  মাত্র কটা দিনই সপরিবারে যেতে চান।তাই তার দাবি 

যেতে দিতে হবে।

এদিকে স্বর্গের অন্যান্য দেবতারাও নাছোড় বান্দা তারা মহাদেবকে হুমকি দিয়েছে।

--অন্তত তিন মাস মহাদেবের পরিবারকে আর স্বর্গে ঢুকতে দেবে না। অথবা সবাইকে করোনা টেস্ট করিয়ে নেগেটিভ রেজাল্ট দেখিয়ে ঢুকতে হবে।না হলে কৈলাশের ওই ঠান্ডায় এবার তাদের কাটাতে হবে।

মহাদেব দুর্গাকে হাজারো কাকুতি মিনতি করে বোঝাচ্ছে যে, দেবতারা তাদের বয়কট করার হুমকি দিয়েছেন,

এই অবস্থায় না যাওয়াই শ্রেষ্ঠ।

দুর্গা কোনো বারণ শুনতে চাইছেন না।

বড় ছেলে গণেশও মাকে বোঝাচ্ছে কিন্তু কাজ হচ্ছে না। 

এবার মহাদেব নন্দী ফিরিঙ্গি  সহ সপরিবারে মিটিং ডাকলো

সকলের মতামত চাইলো।দুর্গা বাদে সকলের মত এবার না যাওয়াই ভালো

দুর্গা তবুও রাজি না।

অগত্যা মহাদেব ব্রহ্মার সাথে দেখা করে সব বললো, উনি বললেন আমি সব জানি কিন্তু কি করবো ?

দুর্গাতো আমার কথাও শোনে না।

আমি নিজেও এখন আর ঘর থেকে বার হই না করোনার ভয়ে যদি এখানেও চলে আসে। আমি তো এবার মর্তে যাওয়ার  ঘোরতর বিরোধী। তুমি গিয়ে ওকে বলো আমি বারণ  করছি ।এবার যাওয়া যাবে না। ওখানে মহামারী আর ও গেলে মানুষ অবুঝ তাই ভিড় করবে দেখতে ,আর বেশি বেশি  করে ছড়াবে রোগ।

কাতারে কাতারে লোক মরবে।

দুর্গার জন্য এত মানুষের বিপদ মেনে নেওয়া যায় না। ওনার পরিষ্কার কথা

গেল ওকে ভুগতে হবে, স্বর্গে আর আমি ঠাঁই দেব না।তোমরা ঠান্ডায় মর।

মহাদেব কাঁদো কাঁদো হয়ে ওনার পা জড়িয়ে ধরে বল্লো --প্রভু,এতটা কড়া শাস্তি দেবেন না।

ব্রহ্মা- তোমার বউকে তুমি মানাও 

আমার কথার ন

অলকা গোস্বামী

কিছু কথা

কুয়াশা ভেজা শিউলি ভোর
স্তিমিত সব কোলাহল
পিঠে ঢাক, দূরগমন
দোরগোড়ায় অপেক্ষায় চোখ।

কিশোরী মন, ছুঁয়ে যায়
রঙিন স্বপ্ন জানালা,
শরৎ শেষে শীতের পরশ
কমলা রোদ,ভালোবাসা।

জীবন নদী বয়ে চলে ধীরে
অভিঘাত সংশয়ে,
বটের ছায়া আরো ঘন হয়
দিনের আলো শেষে।

যাপনের স্রোতে ভেসে
মশগুল মোরা
উৎসব সমারোহে,
এভাবেই চলুক, হাসি আনন্দে
যতদিন আছি বেঁচে।

রীতা রায়

সিঁদুর খেলা

বিজয়া দশমীর সন্ধ্যা। মা দুর্গাকে বিদায় জানানোর আয়োজন চলছে। পাড়ার সধবা বৌয়েরা জল মিষ্টি ধুপবাতি আর সিঁদুর কৌটো নিয়ে রেকাবি সাজিয়ে দুর্গামণ্ডপে সমবেত হয়েছে। মাকে মিষ্টিমুখ করিয়ে সিঁদুর পরিয়ে মায়ের অক্ষয় সিঁদুর আশীর্বাদ নিয়ে পরস্পরে মেতেছে সিঁদুর খেলায়। এ ওর সিঁথিতে কপালে গালে সিঁদুর লাগিয়ে লালে লাল হয়ে উঠছে পরস্পরের সংস্পর্শে।

মৌলি খানিক দূরে দাঁড়িয়ে। না, সে এখানে সিঁদুর খেলতে আসেনি, তার কপালে গালে কেউ সিঁদুর ছোঁয়ায়নি। এঁয়োতিদের সিঁদুর খেলা হয়ে গেলে তারা মণ্ডপ দখল করবে। দখল বলতে পাড়ার ছোটদের নিয়ে বিজয়া দশমীর সন্ধ্যা মাতাবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে।

দাঁড়িয়ে থেকে তার মন টানছে এক পুরাতন দৃশ্য। মৌলি সেবার পঞ্চানন্দপুর গেছিল, উদ্দেশ্য গঙ্গাস্নান। গঙ্গানদীর ভাঙ্গনে পঞ্চানন্দপুরের অনেকখানি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। নদীর ঘাট এখন বাসস্ট্যান্ডের প্রায় লাগোয়া। বেশির ভাগ বাড়িঘর এমনকী সুদৃশ্য গঙ্গাভবনও নদীগর্ভে। গ্রামের যে বাড়িগুলো রক্ষা পেয়েছে সেগুলো এখন নদীর তীর ছুঁয়ে আছে।

মৌলি গঙ্গাস্নান করে এদিক ওদিক লোকের ভিড় দেখে নদীর পাশেই একটি মাটির বাড়ি দেখতে পেয়ে সেখানেই ঢুকে পড়লো। বাড়িতে তখন গৃহবধূ ছাড়া আর কেউ নেই। তার অনুমতি নিয়ে ওদের ঘরে ঢুকে ভেজা কাপড় পাল্টে অন্য শাড়ি পরে খোলা চুলে বাইরে বেরিয়ে এসে দেখতে পেল উঠোনের ওপাশে ঠাকুরের একচালা। কাছে গিয়ে দেখলো মনসামূর্তি। ঝাঁপ সরিয়ে ভেতরে ঢুকে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করে দাঁড়াতেই গ্রাম্যবধূটি ঠাকুরের সিঁদুর চুপড়ি হতে সিঁদুর তুলে তার সিঁথি কপাল রাঙিয়ে দিল। সদ্যস্নাত মৌলিকে সধবা ভেবে গৃহবধূটি তার খালি সিঁথি ভরে দিয়েছে। আচমকা এরকম ঘটাতে হতভম্ব মৌলি গৃহবধূটির হাত টেনে সরাতে গিয়ে পুরো সিঁদুর দুজনের মাথায় কপালে ছড়িয়ে পড়লো। কিছু সিঁদুর ছিটকে পড়লো মা মনসার মাথায়। ওরা আশ্চর্য হয়ে পরস্পরের দিকে চাইলো।

এ এক অভিনব সিঁদুর খেলা। সধবা, অধবা স্বামী পরিত্যাক্তা.. তিনজনের একান্তের সিঁদুর খেলা।

অবিবাহিত মৌলি একছুটে বাইরে বেরিয়ে নিজেকে সাফ করতে গিয়ে লালে লাল হয়ে উঠছিল। সিঁদুরে রাঙা গ্রাম্যবধূটি বুঝতে পারলো না কী এমন ঘটলো যে মেয়েটা ছুটে পালালো, শুধু অলক্ষ্যে হাসলেন মা মনসা। স্বামী পরিত্যক্তা মা মনসার মনেও তো সাধ থাকতে পারে সবার সাথে সিঁদুর খেলার!

বিধর্না মজুমদার

বিদায়

তোমার বিদায়ে
আমার আঁখি করিছে টলমল
ইহার যেন সমাপ্তি বর্ষ দূরে! 
হাজারে হাজারে ডুবিছ তুমি 
জানু জলোচ্ছ্বাসে। 
নতুনের ভীড়ে ক্ষাণিকটা ভুলিতে পারিলেও, 
বিদায় যেন অনিবার্য।।

রীতা চক্রবর্তী ( লিপি )

শহুরে ব্যাধি

ক'দিন থেকে খুব গরম পড়েছে। একেবারে ভিজে প্যাঁচপ্যাঁচে গরম। ভাদ্রের এই দাবদাহ যেন গ্রীষ্মের রদ্দুরকেও হার মানায়। প্রত্যেকদিন বর্ষা ঘুম থেকে উঠেই ব্যালকনিতে এসে আকাশ দেখে। যদি কোথাও এক খণ্ড কালো মেঘ আকাশের গায়ে লেগে থাকে তবে ওর মন অজানা ভালোলাগায় ভরে ওঠে। মনে মনে ভাবে,ও বর্ষা বলেই কি মেঘের সঙ্গে এত ভাব ওর!! মনে হয় যেন, বিগত জনম থেকেই ও মেঘের সঙ্গে এক অমোঘ ভালোবাসায়  জড়িয়ে আছে। বর্ষা আসলে বৃষ্টিবিলাসী । কিন্তু এবার তো সেভাবে বর্ষা নামেনি,তাই চাতক হয়ে আছে ওর মন। ও মনে মনে ভাবে,অভিমানী বর্ষা যেন এবার সূর্যের গায়ে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। শত আহ্বানেও মেঘর মান ভাঙছে না। 

           অবসর সময়ে এভাবে সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে বর্ষা একদিন দেখল,কবে যেন শরৎ এসে বর্ষার চৌকাঠ ডিঙিয়ে প্রকৃতির আঙিনায় পা রেখেছে। ওর ভাবনায় শরৎ মানেই আগমনির সুরে সুরে মুখর বাতাসের গুনগুন গান। আজ ছুটির দিন। তায় আবার স্তিমিত সূর্য আজ মেঘের আঁচলে মুখ ঢেকেছে। কালো কালো ধোঁয়ার মত কুন্ডলি পাকিয়ে মেঘের দল ছুটে আসছে। দেখে বর্ষার  আনন্দ আর ধরেনা। মনে মনে ভাবে,অফিস বাড়ি ছাড়া বহুদিন ওর কোথাও বেরোনো হয়নি ,আজ যদি একটু বন্ধু মোহনার সঙ্গে ফুরফুরে মেজাজে আড্ডা দিয়ে আসে তবে একঘেয়েমি কেটে যাবে। আবহাওয়া যখন অনুকূলে, তারপর না হয় দুজনে কিছু টুকিটাকি পুজোর শপিং করে ফেলবে! কিন্তু... শরীরটাও যেন আজ বড্ড ম্যাজম্যাজ করছে ওর। বেরোবে কি বেরোবে না ভাবতে ভাবতে কাজের মেয়ে বকুলকে ডেকে এককাপ চা দিতে বলে অলস ভঙ্গিমায় ব্যালকনির চেয়ারটায় গা এলিয়ে দিল। চা পান করতে করতে লক্ষ্য করল,দূরের নারকেল, সুপুরি, ইউক্যালিপটাস গাছগুলো যেন আজ মেঘলা দিনের আঁচল গায়ে জড়িয়ে চনমনে হয়ে শাখা দুলিয়ে দুলিয়ে শরতকে স্বাগত জানাচ্ছে। মায়ের আগমনী বার্তা নিয়ে শরৎ আসে বলে এই ঋতুটি বরাবরই বর্ষার কাছে এক আলাদা মূল্য রাখে। এই সময়টাতে ওর  যেমনি অপরিসীম সুখ অনুভব হয় তেমনি অপরিসীম দুঃখও ওকে উন্মনা করে তুলে। এমনি সব এলোমেলো ভাবনায় তলিয়ে যেতে যেতে আনমনা বর্ষার হঠাৎ চোখ পড়ল ফ্ল্যাটবাড়ির নিচে দেওয়ালের লাগোয়া একটি ইউক্যালিপটাস গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা দুটো ক্ষীণকায় কিশোর ছেলের দিকে। অহেতুক কৌতুহলে বর্ষা একটু গলা বাড়িয়ে দেখার চেষ্টা করল ছেলে দুটোকে। জীর্ণ মলীন কাপড় পরা দুটি কিশোর ছেলে। দুজনের শরীরী অবয়ব দেখে মনে হচ্ছে যেন কিছু একটা নিয়ে বিবাদ করছে। ব্যাপারটা বুঝার জন্য ও উঠে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। পায়ে পায়ে ফটকের কাছে এসে ছেলেদুটোকে দেখেই বিস্ময়ে চমকে উঠল। আরে ...!! এই দুটো ছেলেকে তো ও চেনে! একজন অন্ধ এবং  আর একজন বোবা,কথা বলতে পারে না। বর্ষার গাড়িটি যখন অফিস যাবার সময় ট্রাফিকে আটকে থাকে তখন ছেলে দুটো হাতে হাত ধরে এসে ওর গাড়ির জানালার কাঁচে হাত পাতে। প্রতিদিন বর্ষা ওদের  জন্য দু-চার টাকা খুচরো রেখে দেয় ব্যাগে। কিশোর বয়সের ছেলে দুটোর প্রতি নিয়তির এমন নিঠুর বিধান দেখে ওর মন ব্যথায় ভরে ওঠে। একদিন ওদের জিজ্ঞেস করে জেনে ছিল ওরা দুইভাই। নাম যদু ও মধু। ছোটভাইটি জন্ম থেকেই কথা বলতে পারে না আর ওর চোখদুটো নষ্ট হয়ে গেছে গুটি বসন্তয়। মা লোকের বাড়িতে বাসন মাজে। বাবা ওদের ফেলে অন্যখানে গিয়ে সংসার পেতেছে। ছেলে দুটোর এমন দুর্ভাগ্যজনক গল্প শোনে বর্ষার সংবেদনশীল মন বেদনায় কাতর হয়ে ওঠেছিল। কিন্তু আজ একি দেখছে ও!! লক্ষ্য করে দেখল,একটির হাতে একটি নেশাজাতীয় দ্রব্যের টিউব  নিয়ে টানাহেঁচড়া চলছে। আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনল,একজন অপরজনকে বলছে, ' আবে ওই হলুদ শার্ট তোর হাতে কুরি টাকা দিয়েছিল,সে ভাগ তুই আমাকে দিসনি। আর এখন নীল শাড়ি কাকিমার দেওয়া খুচরো কতকগুলিও তুই হাপিস করবি'? এমনি বাকবিতণ্ডার মাঝে হঠাৎ হাত থেকে টিউবটি পড়ে যেতেই দিব্যি অন্ধ ছেলেটি নিচু হয়ে টিউবটি তুলে ফেলল। তবে তো ছেলেটি অন্ধ নয় ! বোবাটিও সমানে তর্কবিতর্ক চালিয়ে যাচ্ছে। বর্ষার প্রতিবাদী মন  আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।পা টিপে টিপে এগিয়ে গিয়েই খপ করে দুহাতে দুটি ছেলের হাত চেপে ধরল। ওরাও বর্ষাকে দেখেই ভয়ে চমকে ওঠে হাত ছাড়িয়ে পালাবার চেষ্টা শুরু করল। বর্ষা ধমকে ওদের বলল,পালিয়ে যাবার চেষ্টা করলেই এবার ও পুলিশের হাতে তুলে দেবে ওদের এবং ওসব বাজে নেশা করার জন্য ওদের পুলিশ হেফাজতেই পচে মরতে হবে। এদিকে বর্ষার উত্তেজিত কথাবার্তা শুনে আবাসনের চৌকিদার পায়ে পায়ে সেখানে এসে ভীড়ে গেল। পথচারী দু'একজনও সেখানে এসে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ওনারা বর্ষার কাছে ছেলে দুটোকে আটকে রাখার কারণ জানতে চাইলে,ও মুখ খুলতে না খুলতেই ছেলে দুটো ভ্যাঁ করে কেঁদে দিল। এরপর হাউমাউ করে যা বললো,সেটা খুবই বেদনাদায়ক । ওরা আদতে দুই ভাই নয়। দুজনেই ষ্টেশনের পাশের ঝুপড়িগুলোতে থাকে। স্কুলের দোরগোড়ায় যায়নি কোনোদিন। একদিন ওরা ঝুপড়ি থেকে বেরিয়ে পথে প্লাস্টিক কুড়াচ্ছিল, তখন দু'জন দাদা এসে বলল , ওরা যদি এই দাদাদের দলে যোগ দেয় তবে আর ওদের কোন কষ্ট করতে হবেনা। আরো বলেছিল, ওরা যদি বোবা ও কালার বেশ ধরে ঘুরে ঘুরে ট্র্যাফিকের ভীড়ে  লোকের কাছে ভিক্ষা করে তবে দয়াপরবশ হয়ে অনেকেই হয়তো ওদের বেশি বেশি পয়সা দেবেন। এতে ওদের কষ্ট করে স্কুলও যেতে হবেনা আর বিনাকষ্টে পেট ভরে খেতেও পাবে। কিন্তু এখন দিনশেষে দাদারাই ওদের সারাদিনের সব পয়সা কেড়ে নেয়। ওদের হাতে যা দেয়,তা খুবই সামান্য। কাজ ছাড়বে বললেও  খুব মারে। ওদের মত আরো ক'জন ধারেকাছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। শুরুতে এই বাজে নেশা করাও দাদারাই শিখিয়েছিল। এখন আর ওরা না খেয়ে থাকতে পারে না।  এরপর ধুপ করে বর্ষার পায়ের কাছে বসে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, 'এবার আমাদের ছেড়ে দিন দিদিমনি। আমরা দুজন ওই ঝুপড়ি থেকে পালিয়ে যাব। আর ওই দাদাদের কথায় ওমন মিথ্যে অভিনয় করে লোক ঠকাব না'। কিশোর দুটোর কথা শুনে বর্ষা ভয় আতঙ্ক হতাশায় একেবারে কুকড়ে গেল। লোকমুখে শুনেছে ও, সমাজবিরোধীদের কাজ এসব । বেছে বেছে পথশিশুদের ধরে ওরা নানা অসামাজিক কাজ চালিয়ে যায়। এগুলো আসলে শহরের দুরারোগ্য ব্যাধি। এর থেকে নিস্তার পাওয়া বড়ই কঠিন। বেশিরভাগ বড় শহরেই একটি বড় গ্যাং থাকে,যারা এসব অসামাজিক কার্যকলাপ চালিয়ে যায়। কিন্তু ছেলেদুটোকে নিয়ে এবার কি করবে ও!! এভাবে তো ছেড়ে দেওয়া যায়না! পথচারী অনেকেই বললেন পুলিশের হাতে তুলে দিতে। বর্ষার মন মানছে না। সদ্য ফুটা দুটো কিশোর ছেলে, পুলিশের ওমন লাঠির ঘাঁ সইতে পারবে তো!! তারচেয়ে যদি নেশা ছাড়িয়ে ওদের শুধরে দেওয়া যায়! তবেই ওদের ভাগ্যলিখন বদলে যাবে। এই ভেবে বর্ষা ফোনের বাটন টিপতে লাগল,গাড়ি ডেকে ছেলেদুটোকে নিয়ে Rehabilitation Centre যাবে বলে। আজ অধরাই রইল বর্ষার টুকিটাকি পুজোর বাজার.......

প্রতিমা দেববর্মা :

 মহিষাসুরমর্দিনীর আগমন

 শরতের নীল আকাশে ভাসছে মেঘের ভেলা
 ভোরের ঘাসে দুলছে শিশির কাশফুলের মেলা।
 শিউলি ফুলের গন্ধে হচ্ছে আকাশ ভরপুর
 প্রাণে জাগায় হিল্লোল আগমনীর সুর।
 ধরায় নেমে আসলে গো মা সঙ্গে ছেলে মেয়ে
 পূ জিত হবেন সবার ঘরে মৃন্ময়ী মা চিন্ময়ী হয়ে।
 সপ্তমীতে সবাই তোমার আরাধনায় মেতে উঠে
 অষ্টমীতে তোমার অঞ্জলি নবমীতে মহাভোগ জুটে।
 দশমীতে বড়দের জানাই প্রণাম, সিঁদুর খেলার পর  আসে বিদায় বেলা
সঙ্গে ছোটদের আশীর্বাদ ও
অফুরন্ত ভালোবাসার মেলা।
হৃদয়ে হৃদয়ে ছড়িয়ে পড়ুক প্রেম প্রীতি ভালবাসা
বিদায় বেলায় জলভরা চোখে এটাই শুধু প্রত্যাশা।
যৎসামান্য ছিল আয়োজন মাগো তোমার জন্য
দুর্গা মায়ের আশীর্বাদ পেয়ে আজকে হলাম ধন্য।
মৃত্যু থেকে অমৃতের দিকে অশুভ থেকে শুভর জগতে
আধার থেকে আলোর পথে নিয়ে চলো মাগো জয়রথে ।

সুখ চন্দ্র মুড়াসিং

বুলবুলি

  শরীফ এবং আয়েশার নিকার দেড় বছরের মাথায় সুস্থ স্বাভাবিক ভাবে ফুটফুটে কন্যা সন্তানের জন্ম হয়।জেলা হাসপাতালে তিনদিনের হ্যাপা সামলে আজ বাড়িতে আনা হয়েছে , দু'জনেই উৎফুল্ল খুশি তাদের ভিন্ন ধর্মীয় আশ্রয় দাতা।  বেবি সিটে মোড়ানো বাচ্চা কোলে নিয়ে সেবিকা হাকডাক করছে আয়েশার  - কে আছে বাচ্চাটি নাও ! শরীফ তাদের আশ্রয় দাতাকে দেখিয়ে বললো উনি বাচ্চাটির দাদু উনার কোলে দিন । বাচ্চা কোলে নিয়ে লোকটি নাম রাখলেন "বুলবুলি" । সুসংবাদ শুনেও তাদের কোন পক্ষের কেউই দেখতে আসা তো দূর খোঁজ খবর পর্যন্ত কেউ নেয়নি । না নেবার ই কথা তাদের সম্পর্ক কোন পক্ষই মেনে না নেওয়ায় বাধ্য হয়ে রাতের আঁধারে এক বস্ত্রে দূর সম্পর্কের এক আত্মীয় বাড়ীতে আশ্রয় নিয়েছিল ।

            আশ্রয় দাতা লোকটির  কাজের লোক খুব দরকার ছিল , খোঁজ পেয়ে আলাপচারিতায় সহমত হওয়ায় কাজী ডেকে নিকা করিয়ে বাড়িতে তুলে নেন । দু' পক্ষের আমতের কারণ হল - আয়েশার মা তৃতীয় সন্তান প্রসবের সময় বাচ্চা সহ ইন্তেকাল হলে ওর বাবা নিঃসন্তান তালাক প্রাপ্ত এক মহিলাকে নিকার আয়োজন করে কিন্তু নিকার আগের রাতে তিন সন্তানের জনক শরীফের বাবা দলবল নিয়ে জোর করে ঔ মহিলাকে তুলে  বাংলাদেশে নিয়ে নিকা করে । শরীফের মা অবজ্ঞা সইতে না পেরে আত্মহত্যা করে , শরিফরা তিনভাই বোন নানার কাছে আয়েশা ও একমাত্র ভাই বোয়ার কাছে অবহেলায় বড় হতে থাকে । তখন থেকেই দুই পরিবারের মধ্যে সপে নেওলে সম্পর্ক । 

          গ্রামের দু'য়েকজন মহিলা বাচ্চা দেখতে এসে দেখতে পায় শরীফ তার ঘুমন্ত শিশুকে কোলে নিয়ে নিষ্পলক চেয়ে আছে , দুচোখে আনন্দ অশ্রু টলটল .. টলটল...।

ইমতিয়াজ কবির

অবলামানবি

সৃষ্টির ঊষা লগ্ন থেকে আজও
চর্চিত ' তুমি ' হাজারও প্রশ্নের মায়াজাল,
তোমা হতে সৃষ্ট সৃষ্টির সেরারা সন্দিহান- 
সংসার ধর্ম পালনে সপিন্ডিকরণ!
পূর্ণিমার জোছনা আলোয় হারানো ' তারা ' 
স্ফুলিঙ্গে নেমে আসা উল্কাপিন্ড।
শব্দহীন সাদা কাঁচের ওপারে ভয়ার্ত হাহাকার;
এপারে দর্শক পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টি ' সনাতন ' 
নারী পুরুষের নির্ধারিত ভূমিকার,
বাইরে পুরুষ, নারী সামলাবে মাতৃত্ব ঘর।
মেয়েদের ' স্বধীন অস্তিত্ব ' স্বীকৃতি বিপন্ন
অনীহা নিদারুণ কর্মক্ষেত্র পুরুষের ছায়াতল
পুরুষতান্ত্রিকতার সর্বব্যাপ্তি গার্হস্থ্য হিংসায়
দ্বন্দের মীমাংসা দূরঅস্ত লিঙ্গ বৈসাম্য অধিকার
জীবিকা সন্মান ছাঁটাইয়ের খাঁড়ায়, পেশা সুরক্ষা
সংগঠিত অসংগঠিত ক্ষেত্রের ব্যাবধান ক্রমশঃ লুপ্ত
পশ্চাদগমনে অধিকার- নায্যতার রাজনীতি দর্শন।
কুড়ম্বশ্রী ,জন্মভূমি কর্মসূচি অ্যান্টি- ইনকাম্বেন্সি
জনকল্যাণমুখী শত চেষ্টায়, মহিলা ক্ষমতায়ন!
অশিক্ষা সমুদ্রে,অজ্ঞান তিমিরে অশিক্ষার প্রলম্বিত ছায়া
বেলা শেষের রোদ- ভেজা সোনালী বৃষ্টি ' তুমি ' 
আনারকলির ছদ্মবেশে আজও বোরখায় যামিনী।
চারিদিক ঝিকমিক তবু ভয় দ্বিধা স্পর্শকাতর অসহায়ত্ব
কান্না দিয়ে ভাতমেখে খাও আজও নিত্য।
কন্যাদায় পিতার অসহায় কাতর আর্তনাদ;
নারী স্বধীনতার রুপোলি আলোকরেখা
দুমড়ে মুচড়ে অবাধ বিচরণে ' বীরপুঙ্গব ' 
মুক্তমনা নারীর ব্যাতিক্রমী ভাবনার আশ্বাস অবসান।
' অপারেশন সার্চলাইটে ' অমানুষিকতা বীরাঙ্গনার আব্রু
স্বদেশপ্রেমে শহিদরা, বীরঙ্গণার মান ধর্ষিত বারবার!
সহানুভূতিহীন আত্মীয় পরিজন
দেশত্যাগ আত্ম হননে-ই রক্ষিত সম্ভ্রম।
চেতনায় উদ্বুদ্ধ প্রতিবাদী করে বাঁচার পথ নির্মাণ।
প্রজ্বলিত সদা প্রদীপ শিখা অনির্বাণ ।


রাজীব ভট্টাচার্য

প্রিয়কবি কে 

অসুখ হবার ভয়ে ছুঁয়ে দেখনি 
অক্ষম অক্ষর প্রয়াস 
অন্ধকার ঘরে জ্বালাতে চাওনি 
কোনদিন মাটির প্রদীপ । 

মদ ও মেধা 
ফুল ও পাখি নিয়ে দূরে 
পরিবৃত পরিজন 
বাগান বাহার গুণীজন । 
উপেক্ষার চাল শিখেছ
সহজ খেলা জেতবার ! 

অসুখের বীজ কে রোপন করে
আর কে পালিয়ে বেড়ায় 
বাল্মীকি প্রতিভা থেকে দূরে ? 

আমি না হয় রোগগ্রস্থ,
আমার অসুখ । 
আপনার ভিতরে এতো সুখ 
তবে কেনো বিষ ছোবল মারে  ?

সপ্তমিতা নাথ

তোমার আমার দুর্গা 

দুর্গা দুর্গতিনাশিনী 
দুর্গার ই কেন বিপদ জুটে?
জয় দুর্গা অসুর বিনাশিনী ,
অসহায় চর্মদুর্গা অসুর মাঝে।
আসনের দুর্গা রাজসাজে সজ্জিত ,
ঘরের দুর্গা চ্ছিন্ন বস্ত্রে লজ্জিত ।
দেবী দুর্গার আয়োজনে ঘটাঘরে নিমজ্জিত ,
মানুষ দুর্গা নিত্যদিনে স্বাধীনতা থেকেও বঞ্চিত।
কল্যাণী যে সব অমঙ্গল হরণী,
শ্যামলী সে সব অমঙ্গল কারিণী।
দুর্গা সে যে ত্রিশূলধারিনী, বলপ্রদায়িনী,
মাংস দূর্গা অস্ত্র হাতে সে যে নটী বিনোদিনী ।
ত্রেতার দুর্গা ত্রিকালদর্শী, ছিল চিন্ময়ী,
আজকের দুর্গা স্তব্ধ মৃতপ্রায় ,শুধুই মৃন্ময়ী।

স্নিগ্ধা ভট্টাচার্য

গোধূলির অস্তরাগ

অনেকটা পথ পেড়িয়ে এলাম।  
যা পেয়েছি সেইটুকু ঝুলি ভরা থাক।  
মান অভিমান গেছে দূরে।
অভিযোগ নেই যে আর।
দিনের শেষে ক্লান্তি যত, 
মুছিয়ে দিল   গোধূলির অস্ত রাগ।
মানাতে, মানিয়ে  বেশ আছি।
পাশাপাশি  আবেগ জড়িয়ে।
 গোধূলির অস্ত রাগে  নীরবতায় হাতে হাত।


মিনাক্ষী চক্রবর্তী সোম

গোধূলির সান্ধ‍্যআসর

গোধূলির সময়টুকু পার হয় ধীরে
তখন বোঝাপড়ার সময় 
কাজলদাগ তুলে আকাশের গায়
পাখিরা ফিরে যায় নীড়ে
দিনশেষের আলো-আঁধারি খেলায়
মেঘেরা এলিয়ে বেড়ায়
আকাশের গায় উৎসবের সাজ
তবু সন্ধ‍্যাতারা দেখা দেয়।
মায়াময় কারুকাজ গায়ে মেখে 
তুলো মেঘপরিরা সাজে সীমান্তপাড়ে 
ঘুম ঘুম আঁধারে ডোবে চারপাশ 
নেমে আসে অন‍্য এক পৃথিবী।
জাদু লেপ্টে থাকে গায়ে
বিস্তার হয় সান্ধ্যআসর।
গোধূলি সময়টকু নিবিড় মায়াময়
প্রলম্বিত রঙবাহারি আলপনা থেকে 
হৃদয় লাল রঙ চুষে নয়।
ঘনঘোর প্রেমের দাবানল জ্বলে উঠে ক্রমশ
অলস শরীরে ভর করে কথা আর কবিতা
কলমের পাশে গোধূলির আকাশ ঘুমোয়।।

সুজন দেবনাথ

যাহা সত্য

জানি একদিন থামতেই হবে
তাই আর ভয় করিনা,
লক্ষ্য আমার আকাশ ছোঁয়া
চেষ্টা এখনো ছাড়িনা।

সময় যেদিন থমকে দাঁড়াবে
মেনে নেবো পরাজয়,
ভাববো সেদিন অসম্পূর্ণ টা 
এ জীবনের জন্য নয়।

ছন্দা দাম

অসমাপ্ত গল্প

জানালা গলে আছড়ে পড়া জ্যোছনাজলের তোড়ে...
ধুয়ে যাচ্ছিল একে একে ডায়রীর সব কবিতাগুলো,
ভেজা শিউলির মাদক স্পর্শে দোলছিল কাশেরা...
পুকুরের জলে যেন ফুটে উঠছিল কার আঁখি ছলোছলো!
তুমি কি সেই মেয়েটি যে কাঁখের কলসিটা ঘাটে ভুলে...
চলে গেছিলে কোন দূরে ,না শেষ হওয়া ছোটগল্পের দেশে,
কার কবিতারা কাঁদে আজও তোমার দোটানা খুঁজে...
বলো কেন তুমি চলে গেলে সেদিন ভেজা চোখে খানিক হেসে!

আর কটা দিন... তোমার পশমি শালটা কাঁদে জানো...
প্রতিটি শীতের ওমে ছুঁতে তোমায়, জমছে গায়ে তার স্মৃতিধুলো,
তুমিই তো সেই,যে এক্কাদোক্কা খেলত উঠোনের ওদিকে
সজনে ফুলের ছায়াময় মায়া মেখে ছড়াতে আলো।

পাটিগণিতের সিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক যার কাছে জলবৎ...
তবু জীবনের সরল অঙ্ক ভুল করলে আঙুলের হিসেব করতে,
জানালা গলে আছড়েপড়া জ্যোছনা আজও ঝরে চোখ বেয়ে...
মেয়েটি চাইলে কি তুমি পারতে না জীবনের অঙ্কটা শুদ্ধ করতে!

কাজি নিনারা বেগম

মনু নদীর পশ্চিম পার

সময়টা ছিল প্রায় ১৯৯৪ আগষ্ট মাসে আমি তখন বারো ক্লাসে পড়ি। হেমন্ত কালে প্রায় যায় শীতের নিমন্ত্রণে মরসুম  ফুলগুলো যেনো নেচে উঠেছে । দুপুর বেলা সূর্য দেব কিছুটা দোলা চলে মনটা আনচান করছে । আপন মানুষের  আদর সোহাগের জন্য  যাইহোক বুকে ভালো বাসা চেপে লোকালয় ভুলে খানিকটা সময় নিজেকে নিজের মধ্যে হারিয়ে গেলাম। আমাদের বাড়ির সামনে মনু নদী বাধ। সুন্দর চৌরাস্তা সামনে দাঁড়িয়ে আছে শ্মশান কালি মন্দির টি। পাশে সীমান্ত ঘেষা মসজিদ জোহরের আযানের  মিষ্টি সুর শোনা যাচ্ছে। মনু নদীর উপর বাঁধ খানা শহরের উপর দিয়ে চলেছে পাশাপাশি ছোট একটি পাড়া ঐপাড়াতে  শ্বশান মন্দিরের পূজা দেন  কাজলীর বাবা ঐদিন টি ঘোর অমাবস্যা ছিল ওনি রাতে পূজা দেবার জন্য ফুল বেলপাতা নদীর পাড়ে জবা ফুল তুলছেন। নদীতে জল তেমন নেই পাশের পাড়ার কয়েকটি ছেলে নদী থেকে জাল দিয়ে মাছ ধরে বাজারে বেচা কেনা করে । নদী অপর প্রান্তে একটি বি এস ক্যাম্প আছে।  ওরা প্রায় সময় বৌট দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করা লোকজন  যাহাতে  না যায় কড়া পাহারায় থাকে। ঐদিন ছোট ছোট বাচ্চারা মাথায়  কিছু জিনিস পত্র মানে পণ্যসামগ্রী

 করে  নিয়ে নদী পার হচ্ছিল অবৈধ ভাবে। এমন সময় নদীর অপার থেকে এক জোয়ান নদীতে উপর থেকে লাফ দিল সীমান্ত বর্তী ছোট ছোট বাচ্চাদের ধরার জন্য। তখনই হঠাৎ মনু নদীর  তলদেশে চলে গেল

নদীঅতে মাছ ধরছিল বোবা একটি ছেলে  ওর মা আদর করে নাম রেখে ছিল কানু। 

ঐ বোবা ছেলেটি তাকিয়ে আছে নদীর  জলের দিকে হতবাক ও কাউকে বুঝাতে পারে পারছেনা ওকি করল নৌকার মাঝে দাড়িয়ে একটি বাঁশ বা অন্য কিছু দিয়ে শব্দ করছে ওপার থেকে বি এস এফ এর বাকি জোয়ানরা নেমে এল দৌড়া দৌড়ি করে একে একে নেমে এল। নদীতে নেমে খোঁজাখুঁজি করতে লাগল নিমিষের মধ্যে কোথায় চলে গেল। উপস্থিত সবাই মিলে চেষ্টা করে কিছু করতে পারছেনা। আমি আগে বলে ছিলাম মনু নদীর পশ্চিম বাঁধে র কোনায় শ্মশান মন্দিরছিল জাগ্রত সবার মনস্কামনা পু্র্ন হয়। এমতাবস্থায় পাড়ার বয়োজেষ্ট একজন জেঠু এসে বলল আপনাদের মধ্যে একজন মনূ নদী স্নান সেরে  মা কালির মন্দির  পূজা দেন। হয়তো সব ঠিক হবে। তাড়াতাড়ি কোলকাতা একজন সৈনিক স্নান সেরে পূজা দিতে বসে গেলেন

যথারীতি সময়ে পুজা শেষ হলো। আর এদিকে নদীতে খুঁজা খুঁজিতে কিছুটা হয়রানি হয়ে গেল। আমরা সবাই দাড়িয়ে দেখছি। এমন সময় একজন সৈনিক চিৎকার করে উঠল মিল গায়া মিল গায়া সবাই হকচকিত সাথে সাথে ওই সৈনিক কে জল থেকে কয়েক জন  সাধারণ লোকজন  সৈনিক রা জল থেকে ধরাধরি করে উপরে উঠালেন। সৈনিক দের  মধ্যে একজন মেডিকেল অফিসার ছিলেন ওনি লাশের হাত ধরে কিছু পরিক্ষা করলেন বললেন নেই। কিছুক্ষণ পর ফায়ার সার্ভিস  আসল নিয়ে গেল হাসপাতালে ডাক্তার বললেন জল খেয়ে ছেন জল বেড়ে হল সুস্থ হয়ে যাবেন। সবাই খুব খুশি যথারীতি সৈনিক টিকে নিয়ে আসলেন ক্যম্পে। ঘটা করে আবার অমাবস্যায়  শ্মশান কালি  মন্দিরে পুজা হল পাড়ার সবাই মিলে।  আমি আবার বলছিবিশ্বাস করলে ঈশ্বর আললাহ ভগবান মানবকল্যাণে সহায়তা করেন। ঐদিন শ্বশান মন্দিরকে জাগ্রত বলে জানে।

এদিকে বিএস এফ কোম্পানি তে কয়েকজন মাইনরিটি জোয়ান জুম্মা বার ছিল দলবদ্ধ হয়ে  শ্বশান মন্দিরের খানিকটা পেছনে মনু নদীর বুকে পশ্চিম পারে একটি জামে মসজিদ আছে নামাজ আদায় করেছিল ঐ  বিএস এফ জোয়ানের জন্য অনেক দোয়া করেছিলেন সবাই আল্লাহ তায়ালার অশেষ মেহের বানিতে  ঐ যাত্রা বেঁচে গেলেন ঐ জোয়ান মায়ের কোলে ফিরে গেলেন।

তাপস শীল

পুকুরের প্রতিক্ষা

বছর কয়েক আগে গ্রামের বেশির ভাগ ছেলে মেয়েরাই পুকুরে স্নান করতো। তখন সবার বাড়িতে কল বা কুয়ো ছিলো না। পুকুরে স্নান করার সুখটা ছিল আলাদা। সকালে ঘুম থেকে ওঠে প্রাইভেট পড়তে যেতাম। ঠিক সাড়ে নয়টায় প্রাইভেট ছুটি হতো। দৌড়ে দৌড়ে বাড়িতে আসতাম কারন যত তাড়াতাড়ি আসা যাবে তত বেশি পুকুরে ডুবাতে পারবো। দশটার মধ্যেই স্নান ছেড়ে খাওয়া -দাওয়া, পোশাক পরে স্কুলের দিকে ছুটতে হতো। সবাই দিন গুনতাম রবিবার কবে আসবে তার অপেক্ষা। 

দীর্ঘ প্রতিক্ষা অবসান ঘটে রবিবার আসে। রবিবার দিন প্রাইভেট ও থাকতো না ব্যাস্; দুপুর বেলায় যে ঋতুতে যে ফল থাকতো সেই ফল ভর্তা করে খেয়েই পুকুরে ডুবানো আমাদের সবচেয়ে বড় কাজ। একে একে সাঁতার কাটা প্রতিযোগিতা, কতক্ষন জলে ডুবে থাকা,  তা এক-দুই করে গুনতাম আরো থাকতো কতো কি!  এর ফাঁকে পুকুরে মালিক এসে অনেক গালাগালি করতো, মাঝে মাঝে পাথর ও মারতো, তারপর বাড়িতে নালিশ দিয়ে আসতো। তারপর ও আমরা চুপ করে মালিককে এড়িয়ে  করে সবাই মিলে ভেজা গায়ে হাসতে হাসতে চলে যেতাম।আর সবাই মিলে বলতাম সামনে রবিবারে আবার হবে...

আধুনিক যুগে এখন আর ছেলেমেয়েরা পুকুরে স্নান করে না, সাঁতার কাটতেও জানে না।আমাদের যেমন প্রত্যাশা পুকুরের ডুবানোর প্রতি তা আজ হারিয়ে গিয়েছে মুঠোফোনের ছোঁয়ায়।কিন্তু আজও পুকুরটা দিন গুনছে আধুনিকতার মাঝে পুরাতন কে খুঁজে পাওয়ার প্রত্যাশায়।

আমিনুল ইসলাম

ত্রাস

এবার বন্ধ হোক তোমাদের ত্রাস
আর কত ঝড়াবে তাজা রক্ত
কত মায়ের বুক করবে খালি
কত সন্তান কে পিতৃহারা।
লেলিহান শিখার স্বাদ নিতে ব্যাস্ত সমাজ
ভাবেনা এরাও মানুষ ,এদের ওহ আছে প্রাণ।
যুদ্ধ নয় শান্তি চাই, 
এই বিশ্বে ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতে চাই।

মিঠুন রায়

 জন্মশতবর্ষে স্মরণ

 সমরেশ বসু: এক শিল্পী -ব্যক্তিত্ব

অপ্রতিরোধ্য কলমে বাংলা সাহিত্যে তিনি নিজের স্থান নিজেই প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি সমরেশ বসু । তাঁর জন্ম নাম সুরথ নাথ বসু । জীবনের প্রতি পদক্ষেপে অনিশ্চয়তা , দারিদ্র্য, তাকে বিধ্বস্ত করেছে বারবার ।কিন্তু পরাস্ত করতে পারেনি তাঁকে। বরাবরই মাথা উঁচু করে বাঁচতে  শিখেছেন । বলা যেতে পারে , জীবনের প্রতিকূলতা গুলিই তাঁকে শক্তি জুগিয়েছে।

  তিনি লিখেছেন একশোর বেশী উপন্যাস এবং তিন শতাধিক গল্প। অনেক ছোটগল্প লিখেছেন । তাঁর  রচনায় রাজনৈতিক কর্মকান্ড , শ্রমজীবী মানুষের জীবন এবং যৌনতা সহ বিভিন্ন অভিজ্ঞতার সুনিপুণ বর্ণনা ফুটে  উঠেছে।

  ১৯২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর ঢাকা শহরের রাজনগর গ্রামে জন্ম হয় সমরেশ বসুর । বাবা মোহনীমোহন বসু ও মা শৈবলিনী দেবী । পাঁচটি সন্তানের মধ্যে সমরেশ চতুর্থ । সদ্যোজাত এই চতুর্থ সন্তানের নাম রাখা হয় তড়বড়ি ।সব অংশের মানুষের সাথে সহজেই মিশে যেতেন এই বালক । প্রতিবেশীরাও তাকে খুব স্নেহ করতেন । বরাবরই ছিল নির্জনতা প্রিয় । নির্জনতার সন্ধানে চলে যেতেন শ্মশানে । স্কুলের গতানুগতিক শিক্ষা তার ভালো লাগত না । স্কুল ফাকি দিয়ে নানা রকম দুঃসাহসিক অভিযানে বের হতেন । তবে অবসর সময়ে প্রচুর গল্পের বই পড়তেন । ছবি আঁকার প্রতি প্রবল ঝোঁক ছিল । সমালোচক সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা থেকে জানা যায় সমরেশ বসু ভাল বাশি বাজাতে এবং গান গাইতে পারতেন । বালক সুরথ নাথের নাম সমরেশ দেন তাঁর বন্ধু ও শ্যালক দেবশঙ্কর মুখোপাধ্যায় । ১৯৩৯ সালে নৈহাটীর মহেন্দ্র স্কুলে ভর্তি হন  সমরেশ বসু । পরীক্ষায় ফেল করেন । এখানেই প্রথাগত শিক্ষার ইতি টানেন । কিছুদিন ঢাকেশ্বরী কটন মিলে কাজ করেন সমরেশ বসু । পরে আবার চলে আসেন নৈহাটীতে । 

  এক সময় কঠিন রোগে আক্রান্ত হন । বন্ধুর দিদি স্বামী পরিত্যক্তা গৌরী দেবী অসুস্থ সমরেশ বসুকে সুস্থ করে তোলেন । এই নারীই ছিল তাঁর প্রথমা স্ত্রী । চরম দারিদ্র্যতার জেরে এক সময় গরিফা থেকে ব্যারাকপুর পর্যন্ত সাহেবদের কোয়ার্টারে ডিম বিক্রি করে সংসার চালাতেন তিনি । এ সময় মার্ক্সবাদী ভাবধারার সাথে তিনি যুক্ত হন । ১৯৪৩ - ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত ইছাপুর বন্দুক কারখানায় চাকরি করেন তিনি । এই সময় পর্বে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েন । একসময় কারাবরণও করেন । জেল থেকে মুক্তি পাবার পর লেখাই হয়ে উঠে তাঁর নেশা । 

  আসলে জীবনে ব্যাপক অভিজ্ঞতা তাঁর সৃষ্টির পরিমাণকে বিশাল করে তুলেছে । ১৯৪৫ সালে প্রথম উপন্যাস 'নয়নপুরের মাটি' গ্রন্হাকারে বের হয় । পরবর্তী পর্যায়ে বের হয়েছে শ্রীমতী কাফে ( ১৯৫৬ ) , অমৃত কুম্ভের সন্ধানে(১৯৫৪ ) ,গঙ্গা ( ১৯৫৬ ) , শেষ দরবার ( ১৯৬৩ ) , স্বর্ণ পিঞ্জর ( ১৯৬৫ )।

    সমরেশ বসু প্রথমে গল্পকার , পরে ঔপন্যাসিক । মহাকালের রথের ঘোড়া , মানুষ শক্তির উৎস,যুগ যুগ জীয়ে, শেকল ছেঁড়া হাতের খোঁজে, তিন পুরুষ ইত্যাদি তাঁর লেখা রাজনৈতিক উপন্যাস । জগদ্দল , গঙ্গা , বাথান  ইত্যাদি গোষ্ঠী ভিত্তিক উপন্যাস । বিবর , প্রজাপতি , পাতক - এই উপন্যাস গুলিতে উচ্চবিত্ত শ্রেণীর সঙ্কট ও যৌনতার অনাবরণ প্রকাশ পেয়েছে । 

  তিনি রাজনীতি আশ্রিত উপন্যাস গুলিতে সমকালীন সমস্যা এবং শাশ্বত মূল্যবোধের মিশ্রণ ঘটিয়েছেন । মহাকালের রথের ঘোড়া তার লেখা অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস । এই উপন্যাসের নায়ক রুহিতন করছি । তার বাবা পোশপত কুরমি তরাইয়ের চা বাগানে চার পুরুষের মজুর । গল্পের শুরু থানার লকআপে রুহিতনের উপর চলছে অকথ্য অত্যাচার।নকশাল আন্দোলনের পটভূমিকায় ফুটে উঠেছে থানার উপর চলছে প্রচন্ড পুলিশি অত্যাচারের , নকশাল আন্দো রচিত এই কাহিনিতে লেখকের রাজনৈতিক দ্বিধার পরিচয় ফুটে উঠেছে রুহিতন চরিত্রে । আবার তিন পুরুষ উপন্যাসে দেখা যায় , সূর্যমোহন । সৌরীন , সুদীপ- তিন পুরুষ রাজনৈতিক জীবন থেকে রাজনীতিহীন জীবনের দিকে যাত্রা করছে । এই উপন্যাসের আর একটি চরিত্র সীতানাথ চরিত্রেও বিপ্লব সাধনার সঙ্গে মিশে গেছে রোমান্টিক স্বপ্নময়তা । 

  গ্রাম জীবনের পাশাপাশি নগর জীবনকেও খুব নিকট থেকে দেখেছেন সমরেশ বসু । তবে গোষ্ঠীজীবনের কথা লিখতে গেলে গ্রামই বার বার প্রাধান্য পায় । রাজনীতি ও গোষ্ঠী জীবন ওতোপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে  উত্তরঙ্গ উপন্যাসে । জগদ্দল উপন্যাসে পাওয়া গেছে অন্যতম জটিল রূপায়ণ । একজন কর্মচ্যুত বেকার শিল্প শ্রমিক গোবিন্দর স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গের কাহিনী ফুটে উঠেছে বি.টি রোডের ধারে উপন্যাসে । শিল্প শ্রমিকদের জীবনই এর মুখ্য বিষয় । টানাপোড়েন উপন্যাসে বিষ্ণুপুরের পাটরাঙাদের জীবনযাপনের ছবি পাওয়া যায় । ধনতান্ত্রিক সমাজে তাঁতী গোষ্ঠীর জীবন দৈন্যতার চিত্র অঙ্কিত হয়েছে - এই উপন্যাসে । আবার ছিন্নবাধা উপন্যাসের গ্রাম সমাজ ও শহরের শ্রমিক জীবনের চিত্র রূপায়িত করা হয়েছে । 'পদক্ষেপ' উপন্যাসে ইউনিয়ন আন্দোলনের স্বরূপ বর্ণিত হয়েছে । অনেকেই হয়তো জানেন না , যে জেলখানায় বসে সমরেশ বসু তাঁর প্রথম উপন্যাস ' উত্তরঙ্গ' রচনা করেন ।

    কালকূট শব্দের অর্থ বিষ । তিনি কালকূট ছদ্মনাম দিয়ে বেশ কিছু উপন্যাস লিখেছেন । অমৃত কুম্ভের সন্ধানে , কোথায় পাব তারে , ঐ সব উপন্যাসে তিনি কালকূট নাম ব্যবহার করেছেন । 'ভ্রমর' ছদ্মনামে লেখা তিনটি উপন্যাস – 'যুদ্ধের শেষ সেনাপতি ', 'হাতে তোমার রক্ত' , প্রেম - কাব্য রক্ত যথাক্রমে ১৩৮৯ , ১৩৯০ ও ১৩৯১ সালে প্রকাশ হয় । সমরেশ বসুর কালজয়ী জীবন কাহিনী থেকে প্রবাহ পত্রিকায় প্রকাশিত 'ভোট দর্পণ ' নামে রচনায় কালকূট নামটি ব্যবহার করেন ।

  ১৯৪৬ সালে পরিচয় পত্রিকায় আদাব গল্প প্রকাশ হয় । তার আগে স্বাধীনতা পত্রিকায় প্রকাশ হয় অন্যতম ছোটগল্প ' 'শের সর্দার '। এই সব গল্প তাঁকে ছোটগল্পাকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয় । অকালবৃষ্টি , ঋতু , মনোমকুর , পাহাড়ী ঢল , সুবর্ণা , বনলতা , মানুষ , চেতনার অনুকার , ধর্ষিতা , কামনাবাসনা ইত্যাদি তাঁর লেখা অন্যতম গল্প সংকল্পন। শিশু - কিশোরদের জন্যও তিনি অনেকগুলি গল্প - উপন্যাস লিখেছেন । তাঁর রচিত ছোটগল্পগুলি আমাদের মনে দোলা দেয়।যেমন- 'ফটিচার ' গল্পে আছে কয়েকটি রিক্সার মালিক আর শ্রমিক স্বার্থের লড়াই । শিশু শ্রমিকদের দৈন্যদশা নিয়ে লিখেছেন অন্যতম গল্প' নিষিদ্ধ ছিদ্র' ও 'পেলে লেগে যা' । এসমালগার ' গল্পে তেরো বছর বয়সী এক চোরাচালানকারীর কথা উল্লেখ রয়েছে । তাঁর লিখিত গল্প সম্পর্কে সুমিতা চক্রবর্তী মন্তব্য করেছেন যে,-' সত্তরের দশকের নকশালবাড়ি আন্দোলনের বিস্ফোরণের পর সেই বাস্তবতাবোধের অভিঘাত আত্মস্থ করে নিয়ে বাংলা সাহিত্যে যে একজন তরুণ গল্পকারের আবির্ভাব হয়েছিল , তাঁদের পূর্বসূরী ছিলেন সমরেশ বসু ।' 

   অন্যভাবে বলা যায়  উচ্চবিত্ত - মধ্য ও নিম্নবিত্তদের জীবনচিত্রের সঙ্গে সঙ্গে তথাকথিত ভদ্রলোক যারা নন , স্মাগলার , ওয়াগান ব্রেকার , পকেটমার , ডোম , গুনিন এদের নিয়েও অসংখ্য গল্প লিখেছেন তিনি । যেমন : সাধ গল্পের দেশে আছে গোপীনাথ নামে এক রিক্সাওয়ালা । 'মেঘলা ভাঙা রোদ 'গল্পে বিশু নামক এক ড্রাইভারের মানবিকতার কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে । 'খিঁচাকালা সমাচার' গল্পের কেন্দ্রবিন্দু এক পকেটমার । ওয়াগন ব্রেকার এবং সমাজবিরোধী ফটিককে নিয়ে লিখেছেন  আটাত্তর দিন পরে গল্পটি । ১৯৭৮ সালের এপ্রিল মাসে সমরেশ বসুর সাথে শান্তিনিকেতনে সাক্ষাৎ হয় ভাস্কর শিল্পী রামকিঙ্কর বেজের । তখন শিল্পী রামকিঙ্করের বয়স ৭২। তখন সমরেশ বসু জীবনী লিখবার তাগিদে তথ্যসংগ্রহ শুরু করলেও রামকিঙ্করের বৈচিত্র্যময় জীবন হয়ে ওঠে উপন্যাসের উপকরণ। লেখকের শেষ উপন্যাস দেখি নাই ফিরে । ১৯৮৭ সালের ৩ জানুয়ারি থেকে দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে । যদিও লেখকের আকস্মিক মৃত্যু উপন্যাসটিকে অসমাপ্ত রেখে ছিল । 

  ১৯৮৮ সালের ১২ মার্চ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন  সমরেশ বসু । 

  পরিশেষে বলা যায় , সমাবেশ বসুর সমস্ত রচনা , সব সাহিত্যকর্ম তাঁর জীবনযাপনের অঙ্গ । তাঁকে উৎকণ্ঠিত করে তুলত ব্যক্তির বিপণ্নতা । জন্মশতবর্ষে সৃষ্টিকর্মের আবহে - আবেগে - বিতর্কে বাংলা সাহিত্যে তাকে প্রাণবন্ত করে রাখা সত্যিই ভাববার বিষয় । 

প্রতীচী ভৌমিক

দুর্গার ভিড়ে দুগ্গা

মা তুই দুর্গা হলি দুর্গতিনাশিনী
তোর মত হাজার দুগ্গা খিদায় কাতর অতি।

শৈলবালা এক দুর্গা দিনমজুর খাটে
উমা নামের আরেক দুর্গা রোজ মাটি কাটে।

গৌরী নামের দুর্গা যত চায়ের পাতা তুলে
পার্বতীরা দুঃখ ভুলে নিত্য দিনের কাজে।

শংকরীরা ভয়ংকরী হাতুড়ি পেটায় জোরে
গিরি রাজের কন্যা দুর্গা জন্মায় আকাশতলে।

ভবানীরা বিকায় কেমন- দেখো জলের দরে
সতী নামের দুর্গা যত অসতীদের দলে।

মহামায়া মহা মায়া বিস্তার করে
দুর্গা যত অভুক্ত রয় ছেলেপিলে কোলে।

কাত্যায়নী দ্রাক্ষায়নী শারদা চান্ডিকা
কত শত যোগমায়া দুর্ভিক্ষের কায়া। 

এরই মাঝে কিছু দুর্গা রাধেন বাড়েন খান
আবার এক দুগ্গা রাগ করে বাপের বাড়িও যান।

মৃন্ময়ী এই দুগ্গাই পুঁজি দশভূজা দেবী
সর্বজনীন আনন্দেতে সকল দুর্গা ভুলি।

বদন চন্দ্র মল্লিক

কলুষিত সমাজ

আমরা কি চেয়েছিলাম আর কি পাচ্ছি সুন্দর পৃথিবীটাকে আমরা কলুষিত করে তুললাম নিজ নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য। আধুনিক সভ্যতার চরম শিখরে এসে আমরা ফিরে গেলাম আদিম যুগের গুহাবাসী মনুষ্য সমাজের মতো। সর্বক্ষেত্রে আমরা আধুনিক সমাজে এসে পিছনের দিকে চলে যাচ্ছি, মানুষে মানুষে হানাহানি, মা, বোনদের বানিয়ে ফেলেছি চাহিদার আঁতুড় ঘর, এই ভাবে চলছে আমাদের সমাজ। বিরামহীন চাহিদার রাস্তা, যেন শেষ নেই।

কারো রাজ সিংহাসনের চাহিদাn শাসন করার চাহিদা, নিজের আধিপত্য বিস্তার করার চাহিদা, এই চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে আমরা নিজেরাই নিজের ক্ষতি করে ফেলছি। কোথাও নিজের স্বার্থ রক্ষার জন্য মানুষকে খুন করতে চিন্তা করিনা, সাংবিধানিক পরিকাঠামো মধ্যে বাস করেও আমরা সংবিধানকে মানিনা। যখন নেতা বনে যাই তখন এক এক জন যেন এক একটি সংবিধানের রূপ ধারণ করি। কিভাবে  ক্ষমতা ধরে রাখবে তার কৌশল রচনা করি, আবার যখন ধর্মক্ষেত্রে থাকাই বিভেদের শেষ নাই। সবার কাছে সবার ধর্মগুরু মহান, তবুও এক একটি এএএধর্ম নিয়ে এক একটি জাতির ভিতরে শুরু হয় হানাহানি, আজও বুঝলাম না ধর্ম কি? সৃষ্টিকর্তার এই পৃথিবীটাকে আমরা ধীরে ধীরে বিকৃতি রূপ করে তুলেছি। একদিকে বনভূমি ধ্বংস, এবং বন্য পশুপক্ষীর বিলুপ্তি,  বনভূমি ধ্বংসের ফলে পৃথিবী তাপমাত্রা দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে, আমরা এগিয়ে চলেছি বিনাশের শেষ ঠিকানার দিকে। ভূমিক্ষয়ের ফলে চাষাবাদের  জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে, জলস্তরে নিচে নেমে যাচ্ছে ,আর চাষাবাদী জমিগুলোতে তৈরি করছি  বড় বড় অট্টালিকা ।

কোথাও তৈরি হচ্ছে অত্যাধুনিক শিল্পের কারখানা, নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ, আর বাড়ছে নানা ধরনের মারণ ব্যাধি।

মানুষ ভূমি থেকে পাড়ি দিচ্ছে চাঁদে, মঙ্গল গ্রহে নতুন কে আবিষ্কারের ধান্দায়, কিন্তু এই পৃথিবীর বুকে সীমিত পরিমাণ ভূমি যে ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে অট্টালিকায় ভরিয়ে যাচ্ছে,, তার বোধগম্য নাই।। আগামী দিনে খাদ্য ভান্ডার শূন্য হয়ে যাবে, মানুষ জলের জন্য যুদ্ধ করবে, খাদ্যর জন্য লড়াই হবে, আবার একদিকে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে নানা বিধ ভাইরাসের কারণে, অতি তাপমাত্রায় বরফ গলার ফলে  ভাইরাস পৃথিবীটাকে গ্রাস করে ফেলছে, তবুও আমাদের চৈতন্য  হয়না।

 আমরা বিলাসিতা চরমে ওঠে পিছনে ফেলা দিনগুলোকে ভুলে গিয়ে আধুনিক থেকে অতি আধুনিক হয়ে পড়ছি। জানিনা এর পরিণাম কি হবে ? মনুষ্যত্ব জ্ঞান শূন্য হয়ে বিবেককে অজ্ঞানের সমুদ্রে বিসর্জন দিয়ে আমরা বিবেকহীন হয়ে পড়েছি, আধুনিক বিজ্ঞানের ছোঁয়ায় অশ্লীলতা আজ সকলের হাতের মুঠোয়। এই দৃশ্যমান, ঘটনাগুলি থেকে মানুষের মেমোরিতে ডাউনলোড হচ্ছে অমানবিক যত ঘটনা, আপন পর সম্পর্কটা এমন একটি জায়গায় এসে সীমাবদ্ধ হচ্ছে, মানুষের শরীরটাই এখন চরম চাহিদা ও ভোগ বিলাসের আসল সম্পদ হয়ে উঠেছে। যত শিক্ষিত হচ্ছি তত জ্ঞানহীন হয়ে অমানবিক কাজ করতে আমরা কুণ্ঠিত হচ্ছিনা,আগামী প্রজন্মকে আমরা সাময়িক সুখের লালসায় মহা বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছি।  টাকা, বাড়ি, গাড়ি, নারীর নেশায় এবং নানা ধরনের নেশা সামগ্রী কবলে পড়ে শেষ করে দিচ্ছি যুবক সমাজটাকে। যারা আগামী দিনে দেশের হাল ধরার কথা, কিন্তু  তারা  তিলে তিলে নিজেকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে নেশা ও অসামাজিক কাজে লিপ্ত হয়ে। সুতরাং আর নয় স্বার্থপরতা, এগিয়ে আসুন সকলে সুন্দর পৃথিবীটাকে আবার আগের মত ফিরিয়ে আনি। গাছ লাগান পরিবেশ বাঁচান, শুধু শিক্ষিত নয় জ্ঞানী হোন, বিবেকবান হোন মনুষ্যত্ব জাগ্রত করুন, মানুষে মানুষে হিংসা নয়, সকলে আমরা  মানব জাতি, ভেদাভেদ নয়, ধর্ম শিক্ষা জ্ঞান প্রসারণের একটা পথ মাত্র।

 আর স্বর্গ নরক সব এখানেই বিরাজমান, "আমি কি করছি" তার মাঝে স্বর্গ ও নরককে খুঁজে পাবেন।

প্রদীপ কুমার দাস

দিন বদলের সঙ্গে পরম্পরাও বদলে যাচ্ছে

ঢাকে কাঠি পড়ে গেছে। পুজো নিয়ে চারিদিকে সাজো সাজো রব। বনেদি বাড়ির পুজো কিংবা বারোয়ারি পুজোর কর্মকর্তাদের কর্মতৎপরতা এখন অনেক বেশি। দম ফেলার শেষ নেই। লাস্ট মিনিটে ফিনিশিং টাচ দিতে তাঁরা খুবই ব্যস্ত। তবে সময়ের পরিবর্তনে পুজো দালান বা মন্ডবের ছবিটা খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আগেকার দিনে বনেদিবাড়ির পুজোদালান বা বারোয়ারি পুজোমন্ডবে ঠাকুর গড়ার কাজ দেখতে কার না ভাল লাগতো? স্কুল চলাকালীন মনটা সব সময় আঁকুপাঁকু করতো কখন পুজোদালানে হাজির হবো। ঠাকুরদালানে কুমোরকাকা সহ সহকারীরা কাঠামো গড়া থেকে একমেটে, দোমেটে, রং করা, চোখ আঁকার কাজের ফাঁকে ফাঁকে তাঁদের চটকদারী মজার মজার কথাতে হাসির খোরাক জোগাতেন সেটা উভয় পক্ষের কাছে বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠতো। কিন্তু দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে কুমোরকাকাদের জায়গাটা দখল করে নিয়েছে কুমোরপাড়া বা কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীরা। তাঁদের তৈরী রেডিমেড মূর্তি এখন শোভা পায় মন্ডপে মন্ডপে।

আর কুমোরপাড়া বা কুমোরটুলি থেকে লরি, টেম্পো বা ট্রাকে করে প্রতিমা আনার সময়ে হৈ চৈ, নাচা-গানা, চীৎকার-চেঁচামেচি এখন পুজো বদলের অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগেকার দিনের পুজোমন্ডপে হাতের কাজের কারুকার্য শিল্পকলার পরিচায়ক হয়ে উঠতো। এখন সে জায়গায় চলে নানান থিমের পুজো। সেখানে পরিবেশ বান্ধব উপকরণের তূলনায় পরিবেশ-দূষণই মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বনেদি বাড়ির পুছোয় আগেকার দিনে ভোজনপর্ব সবই বাড়িতে ভিয়েন বসিয়ে টাটকা-খাবার বানানো হতো ও সেগুলোর গুণগত মানও ছিল খুবই উন্নত।একালের পুজোয় সে জায়গাটা চলে গেছে ক্যাটারিং গোষ্ঠীর হাতে যাদের খাবারের গুণগত ও পরিমাণগত  মান প্রশ্নাতীত নয়। আগেকার দিনে অনেক বনেদি বাড়ির পুজোয় দুর্গাপুজো উপলক্ষ্যে বিনোদনপর্ব হিসেবে বাবু কালচারের চল ছিল, সময়ের পরিবর্তনে এখন পুজো উপলক্ষ্যে দেখা যায় অন্তক্ষরী, গানের জলসা ও কান ফাটানো আওয়াজে ডি জে'র কেরামতি। সেইসঙ্গে সারারাত ধরে চলতে থাকে উদ্যোম নৃত্য। রাতজেগে ঠাকুর দেখার জন্যে মন্ডপে মন্ডপে ঘোরা, দোকান-রেষ্টুরেন্টে খানা-পিনা করে সূর্য্যদোয়ের আগে বাড়ি ঢোকা। খাবার মেনুতেও ঘটে গেছে বিরাট পরিবর্তন। আগে যেখানে দুপুরের খাবার বলতে ভাত, ডাল, ধোঁকার ডালনা, ঝিংএ পোস্ত, কুমড়োর ঘ্যাঁট, আলুর দম পেলে চেটে-পুটে খেত, এখন সে জায়গাটা নিয়েছে ফাস্টফুডের রকমারি খাবার দাবার যেগুলো শুধুই বাড়তি ক্যালোরি দিতে পারে কিন্তু মন ভরাতে পারে না। বিজয়া দশমীতে এয়োতি মেয়েরা সিঁন্দুর খেলতো ঠিকই, এখন পাড়ায় পাড়ায় পুজোমন্ডপে আধুনিকাষললনাদের সিঁন্দুর খেলাকে কেন্দ্র করে সেলফি সহ ফটো তোলার মাতামাতি দেখা যায় কিন্তু তাতে প্রাণের আবেগ বা হৃদয়ের অনুরাগ কোথায়? বরং লোক দেখানো মেকি ভঙ্গিটাই ফুটে ওঠে। ঠাকুর বিসর্জনের পরে পরষ্পর কোলাকুলি, বড়দের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম এখন খুব বেশি দেখা যায় না, মোবাইল, হোয়াটসআপ, ফেসবুক, ইনস্ট্রাগ্রাম ও ইমেলে বিজয়া দশভীর শুভেচ্ছা, প্রণাম সব জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। নিয়ম মেনে চলা হচ্ছে ঠিকই তবে পরম্পরাটা আর থাকছে না। কালের নিয়মে সব কিছু বদলের সঙ্গে সঙ্গে পুজো বদলও ঘটে যাচ্ছে দ্রুতভাবে।

চন্দ্রা বিশ্বাস

ছোটগল্প

তদস্তু  হৃদয়ং তবঃ 

আজ জয়েনিং।  উত্তেজনা মেয়ের থেকে মায়েরই বেশি। ভোর রাতে উঠে মন্দিরে পুজো দিয়ে এসেছে। মেয়ের পছন্দের রান্না, টিফিন  গুছোনোও সারা। ওর বাবা তো ইঞ্জিনিয়ারিং পাশের  খবরটা ও শুনে যেতে পারেন নি। চোখের জল মুছলো সরযু।এই মেয়ের মুখ চেয়েই  তো বেঁচে ছিলেন দুজনে। আর নিজে বেঁচে আছেন আজও। 

--নেমে আয় মা,আর দেরি করিসনা,দুটো মুখে দিবি তো?

মিতুন ওদিকে বাবার ছবিতে মালা পরিয়ে কেঁদে আকুল হচ্ছিল। প্রণাম করে বলল, 

--  আজ তোমার সব স্বপ্ন পূরণ করেছে তোমার মেয়ে, আশীর্বাদ করো বাবা। 

মিতুন নেমে আসতেই, ওর মাথায় ফুল ছুঁইয়ে প্রসাদটুকু মুখে তুলে দিয়ে বলল,

-- কাঁদিসনা মা, তোর বাবার স্নেহের হাত সবসময় তোর মাথায় আছে রে মা। 

  মাকে প্রণাম করতেই, বুকে টেনে নিয়ে আবার বলল,

  --  ঈশ্বর দয়াময়, তিনিই আবার তোর জীবনটা সাজিয়ে দেবেন, এই বিশ্বাস নিয়েই যে বেঁচে আছি রে  মা।  

 " দুগ্গা দুগ্গা " বলে, মেয়েকে

 রওনা করিয়ে, সোফায় এসে বসল সরযু। কাল সারারাত চোখের পাতা এক করতে পারেনি। স্বপ্ন পূরণ হলো যে আজ। 

             অফিসে ঢুকতেই বসের ঘরে ডাক পড়ল। 

 --- মে আই কাম ইন স্যার? 

-- ইয়েস প্লিজ। 

ঘরে ঢুকে বসকে দেখেই আঁতকে উঠল মিতুন ।বস ল্যাপটপ এ চোখ রেখেই বলল,

  --আপনার  নাম? 

  -- ম ম মৈত্রেয়ী সেন। 

  --

নামটা শুনই চোখ তুলে তাকাল বস্ সৃজন দাশগুপ্ত। তারপর তড়াক্ করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। 

--- মৈত্রেয়ী, মিতুন তুমি? সেন?

--- ভুল করছেন স্যার, আপনি বোধহয় অন্য কারও সাথে.......আমি মৈত্রেয়ী সেন।

---- ভুল? সৃজন তোমায় চিনতে ভুল করবে? দেশে ফিরে থেকে,পাগলের মত খুঁজছি তোমাকে।

 --  স্যার প্লিজ বসুন আপনি। একটু স্টেবল্ হলে আবার আসব আমি।

--- মিতুন  প্লিজ। 

       মৈত্রেয়ী ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। হতাশ সৃজন ধপ্ করে চেয়ারে বসে পড়ল। অনেকটাই সময় লাগল ওর ধাতস্থ হতে।বেল বাজাল, বেয়ারা ঢুকতেই বলল, 

 --অরিন্দম কো বুলাও আভি।

       হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল ওর জুনিয়র অরিন্দম। 

---  হোয়াটস্ রং স্যার,এনিথিং সিরিয়াস? আর ইউ ওকে স্যার? 

--- আমি বেরোচ্ছি, আজ আর ফিরব না। তুমি একটু.......

--- নো প্রবলেম  স্যার। কিন্তু আপনি ঠিক আছেন তো ?

----  ডোন্ট ওয়ারি, আই এম ফাইন। 

বলে কোটটা কাঁধে চাপিয়ে ঝটপট বেরিয়ে গেল। মনের মধ্যে যেন তাণ্ডব চলছে।বাড়ি ফিরে জুতো খুলে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। কপালে হাতটা রেখে ভাবনার ডানা মেলে উড়িয়ে দিল , অতীতের সীমাহীন শূণ্যতায়। 

           তখন বারো ক্লাশ। অঙ্ক স্যারের কোচিন ক্লাশে সৃজন আর মৈত্রেয়ী।  স্যারের নজর এড়াতে পারেনি ওদের সম্পর্কের রসায়ন। স্যার  বলতেন, 

  ভাল নাম্বার পেলেই আমি খুশি, তোমাদের এই কেমিস্ট্রির দায় বা দায়িত্ব কোনটাই আমার নয়। 

  স্যারকে হতাশ করেনি ওরা। দুটো প্রেমিক মন স্বপ্ন আর উচ্চাশার শপথে, হাতে হাত রেখে সফলতার ম্যারাথনে ছুটেছিল।


মধ্য কলকাতার পৈতৃক বাড়িটায়  আভিজাত্য ও বনেদিয়ানার তখনও রমরমা। বাবা মারা যাবার পরে, তিন ভাই মিলে ঠাকুর্দার হাতে গড়া ব্যবসাটায় লাভের অঙ্কটা  বাড়িয়েই চলেছিল। ফলে অহঙ্কারটা আর প্রচ্ছন্ন থাকতনা। বাড়ির সুসজ্জিত দেবালয়ে নিত্য  গোবিন্দ সেবা নিষ্ঠা সহকারে সম্পন্ন হতো।সৃজনের বাবা বড় ।কাকাদের বিয়ে হয়নি। তাই কূলতিলক সৃজন ছিল নয়নের মণি। কি স্কুলে, কি প্রতিবেশীদের, কি আত্মীয় পরিজনদের কাছে, সৃজন ছিল সেরার সেরা। শুধুমাত্র লেখাপড়া নয়, খেলাধুলাতে ও ছিল তুখোড়। মিতুনের বাবা ছিল না। দাদা একটু-আধটু দেখিয়ে দিত। টেস্টের রেজাল্ট খুব ভাল হলে, দাদা  তিন মাসের জন্য কোচিং ক্লাশের ব্যবস্থা করল। সেই কোচিং ক্লাশেই সৃজনের সাথে প্রথম  দেখা। ওখান  কাছাকাছি এক বাড়িতে ভাড়া থাকত মিতুনরা। খুব ভাল রেজাল্ট করল ওরা দুজনেই।

আর এই উত্তেজনার মধ্যেই ওদের সম্পর্কের কথাটা জানাজানি হয়ে গেল দুই বাড়িতেই । প্রখ্যাত বনেদী বাড়ির  সুদর্শন  মেধাবী ছেলে আর বাপ-মা মরা ভাড়াটে বাড়ির মেয়ে? বাপ-কাকাদের মান-সম্মানের আর কিছু বাকি  থাকবে? তাই পরামর্শ করে ওরা সৃজনকে বিদেশে পাঠিয়ে দিল

উচ্চ শিক্ষার জন্য। সৃজন শুধু নয় সকলেই বুঝলো সবটাই। যাবার আগে সৃজন চুপিচুপি মিতুনের সঙ্গে দেখা করে বলেছিল, 

   --আমার জন্য অপেক্ষা করো মিতুন। 

    মিতুনের দাদা বিয়ে করল। দাদা-বৌদির বন্ধু-বান্ধবরা আসত  মাঝেমধ্যেই। মিতুনের রেজাল্ট সবে বেরিয়েছে। দাদা ও খুব খুশি। একদিন দাদার  বন্ধুরা সব এসেছে। খাবার সার্ভ করছিল মিতুন বৌদির সাথে। কফির ট্রে হাতে মিতুনকে দেখে মুগ্ধ হলো অনীক সেন ,দাদার কলীগ   জুনিয়র। দাদা তো প্রস্তাবে  দারুণ খুশি। বিয়েটা আর আটকানোর কোনো সুযোগই  পেলনা মিতুন। মিতুনের মতামত তো কেউ জানতে ও চায়নি।  সৃজনকে মন থেকে মুছে দিতে চাইল মিতুন। অনীকের ভালবাসা আর নতুন জীবনকে বরণ করে নিল।

দুটো প্রেমিক মনের সব স্বপ্ন, সব উচ্চাশার ডানাগুলো একই সাথে ছেঁটে ফেলল দুই বাড়ির অভিভাবকরা। সৃজন তো অপেক্ষা করতে বলেছিল। মিতুনের কিছু করার ছিল?


সাতসাতটা বছর।  দেশে ফিরেই মৈত্রেয়ীকে পাগলের মত খুঁজে বেরিয়েছে সৃজন। স্কুল- কলেজ এমন কি সেই ভাড়া বাড়িতে  গিয়ে ও কড়া নেড়েছে। কোন খবর মেলেনি। ঈশ্বর আছেন  তাই এভাবেই দেখা হল।আজ এতদিন পরে মিতুনকে দেখে আর মাথা ঠিক রাখতে পারেনি ও। কিন্তু মিতুন? ও কেন এত রূঢ় ব্যবহার করল? কেন এভাবে এড়িয়ে গেল ওকে? বিছানায় শুয়ে অতীত, বর্তমান একাকার করে ও যখন দিশাহারা, ঠিক তখনই মাথায় এলো প্ল্যানটা ।তাড়াতাড়ি উঠে ফ্রেশ হয়ে আবার ছুটল অফিসে। অরিন্দম অবাক। 

--- স্যার  আপনি? 

---  হ্যাঁ, একটা জরুরী কাজ আছে।

অফিস রেজিস্টার ঘেঁটে বর্তমান ঠিকানা হদিশ তো মিলল ।তারপর পৌঁছে গেল নির্দিষ্ট ঠিকানায়।  বেলা সবে তিনটে। বেল দিল। দরজা খুলল একজন বয়স্কা মহিলা। 

--- কে আপনি?কাকে চাই? 

--- এই বাড়িতে কি মৈত্রেয়ী থাকে?

---- কেন? কোনও বিপদ হলো না কি মেয়েটার? 

---না না, মাসীমা  শান্ত হোন প্লিজ। বিপদ নয়। 

--- তবে?

--- আপনি  মৈত্রেয়ীর কে?

---- আমি ওর মা।

--' মা? কি ভাবে? আমি তো ওর মা কে জানি। উনি আজ আর নেই। য

---- তোমার ওকে কি দরকার? একটু খুলে বলবে?

--- এই দরজায়  দাঁড়িয়ে? 

---- এসো ভেতরে এসো। 

    এক গ্লাস জল এনে রাখলেন টেবিলে।ওকে বসতে বলে নিজেও বসলেন। ভয়ে আতঙ্কে মুখ শুকিয়ে গেছে সরযুর। সৃজন তা লক্ষ্য করে বলে উঠল,

--- ভয়ের কিছু নাই মাসীমা। কিছু বলতে ও চাই, কিছু শুনতে ও চাই। 

--- ভয়? ভয় পাবনা? এতদিনের ভয়, চিন্তা, উদ্বেগ, হতাশা সবটুকু মুছে, আজই সবে আশার প্রদীপটা  জ্বেলেছি আমরা মা-মেয়েতে মিলে। আর নতুন কোনো আঘাত নেবার মত ক্ষমতা আমার নাই। মিতুন বাঢ়ি নাই। 

---- জানি, তাই তো এলাম। আপনি ওর অভিভাবক।  আপনার চাইতে বেশি ভাল আর কেউ নিশ্চয় চাইবেনা। 

        সৃজন ধীরে ধীরে সমস্ত অতীতটা গুছিয়ে বলল।আজ অফিসে যা হয়েছে তাও। সবটাই  ঠাণ্ডা মাথায় শুনলো  মিতুনের  মা। তারপর ধীর স্বরে, খানিক  স্বগতোক্তির মত বলল, 

মিতুন আমার মেয়ে নয়, পুত্রবধূ। 

বিয়ের সাতদিনের মাথায়, আমার একমাত্র সন্তান অনীক, এক ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনায় আমাদের ছেড়ে চলে যায়। ওর দাদা-বৌদি, পাড়া-প্রতিবেশী অপয়া বদনাম দিয়ে ওকে তাড়িয়ে দেয়।  সন্তান শোক ভুলতে ওকে আমরা বুকে টেনে নিয়ে বেঁচে আছি  এতকাল। ওর শ্বশুর ওকে পিতৃস্নেহে আগলে লেখাপড়ায় উৎসাহিত করেন। জীবন সম্বন্ধে একরাশ বিতৃষ্ণা নিয়ে, যে মেয়ে ঘরের কোণে মুখ লুকিয়েছিল, আজ এই জায়গায় তাকে আনতে ততটা সহজ ও ছিল না। আজই আমি সফলতার মুখ দেখেছি বাবা।

      কথায় কথায় কখন সন্ধ্যা নেমেছে। বেল বাজলো।  দরজা খুলতেই,  সোফায় সৃজনকে বসে থাকতে দেখে,মিতুন 

রেগে বলল,

--- আপনি? কেন এখানে?

সরযু দেবী  মুচকি হেসে দুহাত কপালে ঠেকালেন। 

      --------------------------------

                   চন্দ্রা  বিশ্বাস

জয়িতা ভট্টাচার্য

ছোটগল্প

ফেরা

অস্পষ্ট অস্বস্তি ভেঙে অনীতা প্রথমেই অনুভব করল এক দুরন্ত গতি।শরীর জুড়ে ক্লান্তি।ট্রেনের জানলায় ছায়াছবির মতো নিমেষে সরে যাচ্ছে দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তর। সবুজ চাদর ,গাঢ়তর সবুজ, মাটিরবাড়ি,দূরে হাইওয়ে, সব সরে যাচ্ছে অতীতে। যেমন করে সরে যাচ্ছে অন্ধ গলিটা,খোলা ড্রেন,ভাঙা বাড়ির  উঠোনে দড়িতে মেলে দেওয়া লাল ব্রা, শায়া,শাড়ি।মুখের সারি,মিতা,রাবেয়া,অঞ্জনা,মামনি.... কোঁচকানো বিছানার চাদর সব সরে যাচ্ছে। দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে।শোকের না মুক্তির আনন্দে কে জানে।প্রাতঃকৃত্য সেরে ব্যাগ গুছিয়ে রেডি হয় অনীতা।

অচেনা স্টেশনে রোদের আলো, ভাঁড়ের চা।

কুড়ি কুড়ি বছর,কেটে গেছে।মনে পড়ে পড়ে সেই রাত।স্বামী সাবিরের হাত ধরে বাড়ি ছেড়েছিলো অভাবের দায়।মদ আর জুয়া,বেকার স্বামীর মার,।আম্মা আর শাশুড়ি মায়ের বিলাপ।সাবির বলেছিলো কলকাতায় অনেক কাজ। দুজনে থাকবে।তারপর হিসেব মেলেনি। সাবির মামনির কাছে রেখে সেই রাতে চলে গেছিলো।

সোনাগাছির পুরোনো বাড়ির জায়গায় এখন ফ্ল্যাট। মামনি মানুষটা অবশ্য খারাপ নয়।

একসময় কান্নার শেষ।একসময় কাজ হয়ে গেছে গা সহা।ক্রমে নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছিল সে। ক্রমে নিজের কিছু ব্যাংক ব্যালান্স। সবই মামনির পরামর্শে।উঠে দাঁড়াল সে একসময়।একসময় মন থেকে নিজেকে আর ঘৃণা নয় এই তার মতো মানুষগুলোর জন্য সংগঠন।নানা মানুষ এগিয়ে এলেন।একসময়

আট বছর আগে খবর পেয়েছিল ইন্তেকাল হয়েছে সাবিরের।তার কাছে তো সাবির সেই রাতেই মৃত,যেদিন তাকে বিক্রি করে পালিয়ে গেছিল সে।তার প্রথম কাস্টমার সেই 

কাঁচা পাকা চুল অচেনা মানুষটাকে ভোলেনি বরং সে।একমাস মামনির তত্বাবধানে থাকার পরে ক্রমশ শান্ত,দৃঢ় হয়েছিল সে।মানুষটা 

  তাকে ইচ্ছে মতো ঘেঁটেছিল। খুব খারাপ লাগেনি একথা সে স্বীকার করেছিল মনে মনে।

যাবার সময় আলাদা করে মোটা টাকার সঙ্গে  খুচরো উপহার।সেই মানুষটা আর কারো কাছে আসতো না টানা পাঁচ বছর পর মারা গেছিল গাড়ি চাপা পড়ে।

তারপর একে একে এসেছে অনেকে।এখানে রহমত চাচা তাদের সুরক্ষায়। থানা তাদের পাশে।

অন্তত সোনাগাছিতে প্রবঞ্চক স্বামী  নেই।অন্তত দুবেলা খাওয়া। সুরক্ষা।সততা।

ট্রেনে তুলে দিতে এসেছিল রহমান চাচা আর লাল্লু যাদব।তিন অনাত্মীয়। চোখে জল।" মুন্নি মোবাইল মে নং সেভ হ্যায় চিন্তা মত্ কর।আল্লাহ্ কে দোয়া সে তু খুশি রহেগি অগর  গরবড় হুয়া তো লৌট আনা" রহমান চাচা বলেছে।

সেই ফাল্গুন মাসে কাজ বন্ধ হয়ে গেলো।লকডাডাউন, ভাইরাস,মৃত্যু মিছিল।পেশা বন্ধ। ছ মাস পড়েও শোনা গেল এ পেশা অনিশ্চিত।শরীর বেচা মেয়েদের  দানের টাকা হজম  হয় না।ধীরে ধীরে খালি হচ্ছিল সোনাগাছি। সাবিরকে মনে পড়ে না।মনে পড়েছিল ছায়াঘেরা গ্রামটা।এখনো ফিরে গেলে কিছুদিন চলে যাবে।চিঠি করে দিয়েছে মামনি কোনো এক নেতার যাতে না তাড়িয়ে দেয় তাকে।

লাল সুরকি বিছানো স্টেশন। কুড়ি বছরে অনেক বদল।রংচঙে চায়ের দোকান খাবার স্টল।জিও, এয়ারটেলের ফ্লেক্স।

বুড়ো বটগাছটি আছে এখনও স্টেশনের বাইরে।সাক্ষী তার যাওয়ার আর আজ এই ফেরার।

অনীতা কলরব ছেড়ে পা দেয় বাড়ির পথে।নীলের ওপর হলুদ ফুলছাপ শাড়ি, বুক অবধি ঘোমটা আর গোলাপি চাদরে মোড়া দুর্গা খাতুন বাসে চড়ে।তারপর টোটো,তারপরে ভ্যান।পথ এক, বদল অনেক।শেষটুকু পায়ে হাঁটা পথ।

ওই যে কামারপাড়া ছাড়িয়ে মাঠ তারপর পাঁচপোতা।পুকুর,গাছ,ঘন জঙলা পথ।

অতিমারী তাকে আবার ফিরে আসার সুযোগ করে দিয়েছে। 

ওই যে দূরে ভাঙাচোরা মাটির ঘর টালির চাল।উঠোনে দুটো ছাগল। ওখানে রাখা আছে তিন হাত জমিন। ন্যুব্জ এক বুড়ি বেড়িয়ে আসছেন। হাতে লাঠি। শুভ্রকেশ।সাদা শাড়ি।একাকী এক মা।    

দুর্গা খাতুন ওরফে অনীতা কঞ্চির আগল খুলে প্রবেশ করে আবার দ্বিতীয় জীবনে।

               

বিশ্বজিৎ মানিক

ভালোবাসার ব্যাকুলতা
             
ভালোবাসার অনেক জ্বালা,অনেক ঝঞ্জাট ।
যাদের আমি ভালোবাসি
তারা হাসলে আমারও হাসতে ইচ্ছে করে,
দুঃখ পেলে নিজের মনটাও পীড়িত হয় ।
ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ে ভালোবাসা
এর থেকে নিস্তার নেই,নেই মুক্তি ।
যাদের আমি ভালোবেসে,পেয়েছি ভালোবাসা
পরিতৃপ্ত হয়েছিল আমার মনপ্রাণ
সময়ে অসময়ে অনেকে গেল চলে,দূরে বহু দূরে ।
তারপর ভালোবাসা হারা ভালো থাকতে হয়,
দিনগুলো কেটে যায় বেশ।
বিবাদ-বচসা,মারামারি,দলাদলি,অর্থের কাড়াকাড়ি
কিছু শুনি কিছু দেখি কিছু বলে লোকে ।
আমন্ত্রণ নিমন্ত্রণ বইপড়া, লেখালেখিতে
সকাল দুপুর সন্ধ্যা,রাত্রিও কেটে যায় বেশ;
সব মিলিয়ে ভালো আছি,সুখেই আছি বলতে হয় ।
তবুও ভালোবাসা হারা হয়ে ওদের কথাই ভাবি,
ভাবতে ইচ্ছে করে,ভালো লাগে ।
ওদের দেখতে ইচ্ছে করে,স্বপ্নে দেখি ।
কথা বলতে ইচ্ছে করে,মনে মনে কথা বলি ।
ভালোবাসার ব্যাকুলতা যে বড়ো অসংযত,
অনেক সময় বড়ো দুঃসাধ্য,কষ্টকরও বটে ।

দীপা সরকার

বোধন... 

অবশেষে কি না তোর মতো একটা ব্রাইট ছেলে এরকম একটা কাজ করলি? তোর থেকে এমন কাজ কোনোদিনই আশা করিনি। তোকে আমি অনেক ভরসা করতাম, বিশ্বাস করতাম আর তুই কিনা আমাদের না জানিয়ে এই মেয়েকে বিয়ে করে আনলি অনুপ, আমি তোকে কিচ্ছু বলতাম না যদি না এই মেয়ের সাথে... 

তুমি কি ভাবলে, আমি কিছু না জেনেই ওকে বিয়ে করেছি না মা আমি ওর সবটা জেনেই ওকে গ্রহন করেছি।

ওর কি দোষ বলো মা ওর ফিউচার ও তো আমাদের মতোই ব্রাইট ছিলো, তবে এখন কেন ওকে অন্ধকার জীবন নিয়ে গোটা জীবনটা কাটাতে হবে? কেন মা বলো কেন? সেদিন রাতে তো পল্লবীর কোনো দোষ ছিল না! সেদিন সন্ধ্যায় নাচের শো টা শেষ করেই আমাকে ফোন করেছিল...

হ্যাঁ বলো পল্লবী, এই যে এই মাত্র আমার শো শেষ হলো, তোমাকে কত করে বললাম আসতে এলে না...

কি করবো বলো অফিসে কাজ পরে গেছে, পরের বার যখন শো হবে আমি নিশ্চয়ই আসবো, তো এখন বাড়ি ফিরবে কি করে?

এই তো মাত্র সাতটা বাজে, অটো করে ঠিক বাড়ি পৌঁছে যাবো তুমি চিন্তা করো না এখন রাখি ফোনটা...

সেদিন যদি আমি ওর ফোনটা রিসিভ করতাম, হয়তো কোনো ভাবে সেদিন ওকে নরপিশাচ গুলির হাত থেকে বাঁচতে পারতাম, আর যখন কল ব্যাক করি ততক্ষণে যে ওর অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে... কেন ঐ নরপিশাচ গুলির শিকার হতে হলো ওকে?

 আর এখন কেন ই বা ও এই অন্ধকার জীবনটা কাটাবে?

যদি অন্ধকার জীবন কেউ কাটায় তাহলে কাটাবে ওই পাপী গুলো পল্লবী নয়, ও আগে আমার কাছে যতটা পবিত্র ছিলো এখনও তাই আছে।

ও নিজেকে কেন বিনা দোষে শুভ অনুষ্ঠান আনন্দ থেকে দুরে রাখবে? আমি আমার সিঁদুরে নতুন করে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে শেখাবো, তোমার চিন্তা তো আমায় নিয়ে তাই না? আমি ওর সাথে ভালো থাকবো মা, আজ তো বিজয়া, আমি চাইনা ওর আনন্দ, উল্লাস, ভালো থাকার অধিকার মায়ের সাথে বিসর্জন হয়ে যাক, যদি বিসর্জন হবার ই হয় তাহলে মানুষ রূপী পিশাচ গুলির বিসর্জন হবে, তুমি ওকে মেনে নাও মা।

 আমার ভালোবাসাকে আমি বিনা অন্যায়ে বিসর্জন হতে দেবো না, আমার সিঁদুরে রাঙ্গা করে আমি এভাবেই বোধন করবো আমার ভালোবাসার। যাতে আমার সিঁদুরের শক্তি একে অশুর বিনাশে শক্তি দেয়...

শুভ শক্তির জোরে বারবার যেন অশুভ শক্তি বিনাশ হয়।

সায়ন পাল

ছোটগল্প 

অভাগী

সবুজ বনানী ঘেরা, তটিনী নদীর তীরে পুতুলপুর গাঁও। সেখানে নিত্যানন্দ দাস ও ভগবতী দেবী ছোট্ট সংসার নিয়ে কুরে ঘরে  জীবন কাটাচ্ছে। অভাব নিত্য সঙ্গী। সন্তান-সন্ততির আশায় নিত্যানন্দ দাশ গাঁয়ের ছোট্ট মন্দিরটি তে রোজ আনাগোনা। ভগবানের আশীষে একটি ফুটফুটে সুন্দর কন্যার জন্ম দিল মাতা ভগবতী। মেয়েটির জন্মের ৩ দিনের মাথায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো মা ভগবতী। গাঁয়ের লোক নাম দিয়েছে অভাগী। পিতা বহু কষ্টে মেয়েটিকে তিলে তিলে মানুষ করে তুলল। এভাবেই সময়ের চাকা ঘুরতে লাগল।

            মেয়ের বয়স হয়েছে। পাড়া গাঁয়ের লোক নিত্যানন্দ দাশ কে মেয়ের বিবাহ প্রসঙ্গে অবগত করালো। এদিকে আর্থিক অনটনে জর্জরিত নিত্যানন্দ দাস চিন্তায় উদ্বিগ্ন। একদিন সকালে বিনয় বাবু এক শহুরে ছেলের আলাপ নিয়ে এসেছে। জমিদার বাড়ির ছেলে। শ্যামনগরের জমিদার রুদ্রকান্ত বাবু 

"মানুষ হিসেবে মাটির মানুষ"।

কেন জানি না! প্রথম দেখাতেই অভাগীকে মনঃপুত মনে হলো। 

না, তেমন একটা দাবি দাওয়া নেই  । আগামী বৈশাখে অভাগীর বিবাহ স্থির হল। এদিকে পিতা নিত্যানন্দ তার একমাত্র পৈত্রিক ভিটার অর্ধাংশ বিক্রয় করি যথা সামর্থ্য মেয়েকে উজাড় করে দিল। দিনক্ষণে অভাগীর বিবাহ হয়ে গেল। পিতা নিত্যানন্দের কন্যাদান সম্পন্ন করল। বর অভাগী কে খুব ভালোবেসে দিন কাটাতে লাগলো।

         ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! কিছুদিনের মধ্যেই বরের হৃদয়ে 'ফুটো' ধরা পরল। বহু যন্ত্রণা আর্তনাদ করে বর শহুরে হাসপাতালে প্রাণ রাখলো। এদিকে শ্বশুরবাড়ির লোকেরা 

"অভাগীকে অলক্ষী বলে মন্তব্য করলো"। 

শ্বশুর বাড়ির লোকেরা অভাগীকে শত দোষে দোষী করে নতুন প্রভাত এর আগে জমিদার বাড়ি ত্যাগ করার আদেশ দিল। চিরকালের সুখ হীন, আনন্দহীন 

"অভাগী অভাগী হয়েই থেকে গেল"।

         কত বসন্তে কোকিলের মিলনের সুর, বর্ষায় ব্যাঙের ডাক, ময়ূরের মিলনের তরে নাচন, বসন্তে প্রকৃতির সমীরন, নব যুবতীর আলতা রাঙানো পা, অভাগীকে টুকরো টুকরো দুঃখ দিয়ে যায়। 

"অশ্রুজল শুকিয়ে গেছে আর কান্না আসে না"।

কত উৎসব রাতিতে নববধূর সাজ, কত আনন্দে রমনীদের নাচন, ফুলের শোভা আর গাছে ধরে না যখন, কত প্রমত্ত ভ্রমর নাচন ভঙ্গিমায় ব্যস্ত, তখন নিত্যানন্দ দাশের কুঁড়েঘরে অভাগী চোখের জল ফেলে!বলে-

এ কেমন বিচার?

     সেদিন বসন্তের শেষ বেলা। প্রতিদিনের ন্যায় আজও ওই রাঙা ফুলগুলির দিকে নজর রেখে অভাগীর চেয়ে রইল , আজও সেই ভাসমান মেঘ, প্রকৃতির নিঠুর খেলা দেখতে লাগলো, এমনি সময়, কোন আগন্তুক যেন হাতে হাত রাখলো। এক মুহূর্তে যেন এক বিশ্বাসের পৃথিবীতে নিয়ে গেল অভাগীর বহুদিন পরে  কোন বিশ্বাসের ভিত্তি তৈরি হলো অভাগীর মন মন্দিরে। কত প্রতিজ্ঞা, তার অভাগীর চোখের জল মুছে দেওয়া, এগুলো যেন নতুন সম্পর্কের ইশারা দিচ্ছে। অভাগী নতুন করে বাঁচতে দ্বিধা জড়িত। আধো আধো কণ্ঠে পিতা নিত্যানন্দ দাস কে জানালো এক মুহূর্তের সুখ দায়ক আগন্তুক পুরুষের কথা। দু ফোটা চোখের জল যেন গড়িয়ে পরল নিত্যানন্দ দাশের চোখের নিচে। নতুন সম্পর্কে যেন সম্পূর্ণ রুচিবোধ হারিয়ে ফেলেছেন পিতা নিত্যানন্দ। সেই অচেনা পুরুষ অভাগীর কুঁড়েঘরে এসে পিতা নিত্যানন্দ দাস কে সান্তনা জোগাতে লাগলো। বহু প্রতিজ্ঞা, ও জানালার ডিপিতে রাখা ভগবানের প্রতিকৃতির সম্মুখে জ্বলন্ত তৈল প্রদীপ সাক্ষী থাকলো 

"সেই নতুন বন্ধনের"।

ছেলেটি ওই সাদা শাড়ি পরা বিধবা অভাগীর সম্মুখে আলতা ,লালচুরি, শাঁখা পলা, লাল বেনারসি ,সিঁদুরের কোটা রাখলো। অভাগীর চিন্তন জগতের তীব্র আলোড়ন ঘটতে ঘটতে এক সময় যেন "অভাগীর মুখ থেকে এক টুকরো শব্দ বের হলো হ্যাঁ।"

সাহসী অভাগী যেন বলে উঠলো আমি প্রস্তুত।

    চিরকালের সুখহীন, বেদনা যুক্ত, অশ্রুজল সমন্বিত, কষ্ট সহিষ্ণু, অভাগীকে এক টুকরো সুখ প্রদান করতে এসেছে ছেলেটি। 

আবারো একবার সাত পাকে বাঁধা পড়ল অভাগী আর আগন্তুক ছেলেটি।বিবাহের পর জানা গেল ছেলেটি অর্থাৎ মোহন শহুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ। পিতা নিত্যানন্দ দাশে যেন আনন্দে আপ্লুত ‌। ভগবানের নিকট হাজারো প্রণামের ঝড় উঠলো। জানা গেল নতুন বর কাজের সুবাদে ছোট্ট পাড়ার গাঁয়ের " Life experience" এর জন্যই এসেছিল।


"ভগবান যেন তাহাকে দেবদূত করে পাঠালো"। এখন বর চিরকালের অভাগীকে নিয়ে শহরে চলে গেল ।

অনিমেষ দাস

বনফুল

বনফুল ফোটে বনে, আপনমনে
কেউ রূপসী সুন্দরী,কেউ গুনবতী বড়।
মৌমাছি আসে প্রয়োজন মেটাতে ফোটায় হুল,
কভু রাজার বাগানে যায়নাকো বনফুল,
সেখানে তো মানুষ আপন লীলায় মশগুল।
ছিঁড়ে নিয়ে গুঁজে দেয় প্রেয়সীর চুলে
ফুলেদের কাছে এসব অর্থহীন যায় ভুলে।
বাতাসে ছড়ায় ফুলের মৃত্যুর বেদনা
হাহাকার ওঠে,ফুলেরা করে না মৃত্যুর কামনা।
মধুপ ছাড়া আর কেউ প্রিয়জন নয় তার,
মানুষরা তো রাজারই চাটুকার।
রাজা সেতো নিজেও মানুষ
তাই মসনদে বসে ওড়ায় রঙিন ফানুস।
প্রতিবাদী বনফুল যায়নাকো রাজার বাগানে,
ডাকে নাকো রাজা তাকে মধু সম্ভাষনে।
আশীর্বাদ নিতে অথবা ওষুধের প্রয়োজনে,
রাজা নিজেই যান মসনদ থেকে বনে,
বনফুলের স্তুতি করেন মধুর আলাপনে।

চৈতালী ভট্টাচার্য্য

ছোটগল্প

ক্ষমাই পরম ধর্ম 

 মন্দিরের অন্দরে দন্ডায়মান ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্বেতশুভ্র প্রস্তর মূর্তির সন্মুখে নিমীলিত চক্ষে পদ্মাসনে বসে গভীর আবেশে তানপুরায়  ভক্তি সংগীত পরিবেশন করে চলেছেন বীরজু প্রসাদ। 
"প্রভু মুঝে কভু ছোড় না যাইও
তুঝে মুঝে সাহারা বিলাও।
ম্যায় তুম বিনা ক্যায়সে রহু
এ অন্ধেরি জগৎমে—--"
 সংগীতের অপূর্ব সুরমাধরীতে  স্তব্দ ঊষা যেন তার  দিগন্ত প্রসারিত রক্তাভ আঁচল উন্মিলিত করতে যেন দ্বিধাগ্রস্ত। ঘুম ভাঙা পাখিরা কূজন বন্ধ করে সঙ্গীত সুধা পান করতে যেন অধিকতর ব্যগ্র। সুদাম মন্দিরের সিঁড়ির শেষ ধাপে বসে চোখ বন্ধ করে একাগ্রচিত্তে গান শুনে যাচ্ছে। যদিও সে জানে গুরুজী তাকে এই স্থানে এই অবস্থায় দেখলে খুব অসন্তুষ্ট হবেন। তাই সে সদা সতর্ক। ,কেননা এই সংগীত গুরুজীর ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদিত একান্ত নিজস্ব ভগবত সাধনা। কেউ এই বিষয়ে কিছু জানুক তিনি তা একেবারেই চান না। গুরুজীর আরাধনা শেষ হওয়ার আগেই তাই সে এই স্থান ত্যাগ করে গুরুজীর জন্য মধু আদার চা প্রস্তুত রাখবে।
     "গুরুজী আপনার চা প্রস্তুত। আপনি সেবন করুন। " 
"সুদাম বেটা আমি তো তোমাকে আগেই বলেছি আমার এসব কিছুই লাগবে না। তুমি এখন পড়াশোনার দিকে মন দাও। আর একটা কথা তোমাকে তো আমি আগেও অনেকবার গুরুজী বলে ডাকতে নিষেধ করেছি । তাও তুমি কেন শুনোনা। সেরকম মনে হলে তুমি আমাকে নানা বলে ডাকবে। আর যেন এই ভুল না হয়। শোনো আজ আমি শহরে যাবো একটু বিশেষ কাজে । তুমি সারাদিন শান্ত ও খুব ভালো হয়ে থাকবে। তোমাকে সেদ্ধভাত ফুটিয়ে দিচ্ছি। তুমি খেয়ে  যথাসময়ে ইস্কুল চলে যাবে। আমি বিকেলের আগেই চলে আসবো।"
   গুরুজী চলে গেলে বই নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলো সুদাম। কিন্তু কিছুতেই পড়ায় মন বসাতে পারছে না। অন্যদিন গুরুজী পড়া দেখিয়ে দেন। তারপর সে খেয়েদেয়ে ইস্কুলে যায়। সুদাম ভাবে এতো অপূর্ব গলা গুরুজীর অথচ গান শেখানোর কথা বললে গুরুজী প্রচন্ড রেগে যান। সারাদিন একেবারের জন্য তানপুরায় হাত ছোঁয়ান না। একমাত্র  প্রত্যুষে সবাই যখন গভীর ঘুমে 
আচ্ছন্ন , ঊষাদেবী যখন ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তখন গুরুজী স্নান সেরে শুদ্ধ পট্ট বস্ত্র পরিধান করে  ইষ্টদেবতাকে সঙ্গীতের মাধ্যমে আরাধনা করেন।  অথচ এই গুরুজীর নাকি একসময় কতো গানের ছাত্র ছিল। এমনকি তার বাবাও নাকি গুরুজীর খুব প্রিয় ছাত্র ছিলেন। তারপর কি যে হলো কেজানে। পড়শীদের মুখ থেকে শুনেছে বাবা নাকি গুরুজীর কাছেই মানুষ। সাত্ত্বিক ব্রাক্ষণ পরিবারে বাবার জন্ম হয়েছিল। খুব ছোটবেলায় বাবার মা মারা যান।  সৎমার অত্যাচারে বাবা নাকি পালিয়ে এসে গুরুজীর আশ্রয় গ্রহণ করেন।  আজীবন ব্রক্ষচারী গুরুজী বাবাকে সন্তান স্নেহে পালন করে তোলেন।
"বেটা সুধাময় আমি  তোমাকে আমার স্নেহের সবটুকু দিয়ে তোমাকে মানুষ করার চেষ্টা করেছি এবং সেই সঙ্গে স়়ংগীত বিদ্যার সবটাই তোমাকে দান করেছি। দেখো এর যেন কোনো অমর্যাদা করো না। স়়ংগীত হলো স্বয়ং ঈশ্বর। তাঁকে কখনও বিক্রয় করো না। জীবনে অনেক সুযোগ আসবে , কিন্তু শ্রোতাদের মনোরঞ্জন যেন একমাত্র ধ্যানজ্ঞান না হয়ে ওঠে। তুমি মনে করবে সংগীত নয় তুমি ঈশ্বরের সাধনা করছো। তাহলে সর্বময় ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করবেন।"
"আপনার আদেশ শিরোধার্য গুরুদেব"_বলে প্রনাম করে সুধাময়। গুরুজী মাথায় হাত রেখে আশির্বাদ করেন।
সুধাময়কে তার বন্ধুরা বললো _"কিরে শুনিসনি?  পাশের গ্রামে সিনেমার শুটিং হচ্ছে। ওরা নাকি একটা নতুন গলার সন্ধান করছে  নায়কের গলার প্লেব্যাক করার জন্য। ভালো পারিশ্রমিক দেবে। তোর এতো ভালো গলা। তুই  ঠিক চান্স পেয়ে যাবি । এখানে  শুধুমুধু পড়ে থেকে তোর প্রতিভা নষ্ট হচ্ছে।  এই বুড়োটার কাছে বেকার পড়ে আছিস। নিজেও কিছু করবে না আর কাউকে কিছু করতেও দেবে না। "
" নারে গুরুজী এসব পছন্দ করেন না। এসব করলে উনি খুব রাগ করবেন। উনি স্বপ্ন দেখেন আমি একদিন একজন সঙ্গীতের দিকপাল হবো। তারজন্য এখনও প্রচুর সাধনার দরকার।"
"আরে সাধনা করতে করতে যে বুড়ো হয়ে যাবি। জীবনে সুখভোগ করবি কবে?"
সুধাময় বললো "ওনার  মতো একজন মানুষ যার সঙ্গীতের ওপর এতো বিশাল দখল উনি তো ইচ্ছা করলেই কলকাতা বা মুম্বাই চলে গিয়ে বিশাল সুনাম করতে পারতেন। কিন্তু উনি করেননি। সঙ্গীত ওনার কাছে ঈশ্বরের সাধনা।  তাই তিনি এই বাড়ি ছেড়ে আর এই কৃষ্ণের মন্দির ছেড়ে কোথাও এক পা দিতে চান না।"
"তাহলেই বোঝ উনি নিজের জীবন তো নষ্ট করেছেন এমনকি তোর জীবনও নষ্ট করে দিতে চাইছেন।"
সুধাময় ভাবে "সত্যি তো এই গুরুজীর কাছে পড়ে থাকলে কিছুই তার জীবনে করা সম্ভব হবে না। বেরোতে হবে।  তাই সে শুটিং করতে আসা দলের সঙ্গে দেখা করে। আর প্রথম অডিশনেই সিলেক্ট হয়ে যায়।  তারা অবশ্য কলকাতার স্টুডিওতে গিয়ে ফাইনাল গানের টেক আপের কথা বলে এবং তাকে দিয়ে কনট্র্যাক্ট পেপারে সাইন করে দিয়ে বেশকিছু অ্যাডভান্স দিয়ে একটা নির্দিষ্ট ডেট বলে দেয়।
  গুরুজীকে লুকিয়ে কলকাতা যাত্রা করে সুধাময়। রঙিন জীবনের হাতছানিতে  আর টাকার মোহে গুরুদেবের সব নির্দেশ ভুলে যায়। পয়সা রোজগার তার একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হয়ে যায়। টাকার জন্য অনেক নিম্নমানের গানে গাইবার জন্য সে সাইন করে। হাওয়াই বাজীর মতো চড়চড় করে সে ওপরে উঠতে থাকে।
 কোনো কিছুই আর গোপন থাকেনা গুরুজীর কাছে। আকন্ঠ মদ্যপান আর নারীসঙ্গ একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হয়ে দাঁড়ায়। এরমধ্যে এক হোটেলের গায়িকা মুসলিম রমণীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। কিন্তু সুখ বেশি দিন চিরস্থায়ী হয় না।  ছায়াছবিতে চটুল গানের জন্য তার যে ডিমান্ড ছিল তা ক্রমাগত কমতে থাকে। বেশ কিছু গানের রেকর্ড সুপার ফ্লপ হয়। কোনো সঙ্গীত পরিচালক আর তার সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন না।  আর্থিক চরম দুরবস্তায় পড়ে সুধাময়ের পরিবার। ইতিমধ্যে তাদের সন্তান চারবছর বয়স অতিক্রম করেছে। বউয়ের গানের রোজগারে কোনো মতে স়়ংসার চলতে থাকে। সুধাময় নিজের ভুল বুঝতে পারে। গুরুজীর স্বপ্ন ছিল তাকে বড় বড় ওস্তাদদের মাঝে পেশ করা। তার জন্য আরও অনেক সাধনার আর ধৈর্য্যের দরকার ছিল। কিন্তু তার হটকারীতার জন্য সব পন্ড হলো। এখন গুরুজীর সামনে কোন মুখ নিয়ে সে দাঁড়াবে। মানসিক দুশ্চিন্তা ও হতাশায় সে ক্রমাগত অসুস্থ হয়ে পড়তে থাকে।


  অবশেষে তারা কলকাতা থেকে গ্রামে ফেরার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু পথিমধ্যেই সুধাময় খুব অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে শহরের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার সিরোসিস অফ লিভার ধরা পড়ে। প্রচুর টাকার দরকার। বউ সন্তানকে নিয়ে সুধাময়ের গ্রামে ফিরে আসে। কিন্তু কোথাও ঠাঁই বা কাজ জোটেনা। অবশেষে ছেলেকে নিয়ে গুরুজীর দরজায় হাজির হয়।  ছেলেকে মন্দিরের সামনে বসিয়ে দিয়ে বলে "আজ থেকে গুরুজী তোর আপনজন আমরা তোর কেউ নই। যতই গুরুজী তোকে তাড়িয়ে দিক না কেন পা আঁকড়ে এখানেই পড়ে থাকবি। তারপর ছেলেকে আদর করে রাতের অন্ধকারে কোথায় যেন হারিয়ে যায়।
ঊষাকালে মন্দিরের সিঁড়িতে কান্নাভেজা এক ঘুমন্ত শিশু সন্তানকে দেখে হকচকিয়ে যান বিরজু প্রসাদ।  তার কথায় জানতে পারেন যে সে সুধাময়ের ছেলে নাম সুদান। তার মা তাকে গুরুজীর কাছেই থাকতে বলে কোথায় যেন চলে গেছে। প্রথমে তাঁর অন্তরাত্মা গভীর বিমুখ হয়ে উঠলেও  কৃষ্ণমূর্তির দিকে তাকিয়ে তাঁর সব মনের কালিমা দূর হয়ে যায়  তিনি পরম আবেশে শিশু সন্তানটিকে বুকে টেনে নেন _
"বলে ওঠেন ঐ যে দেখতে পাচ্ছিস কৃষ্ণ,আজ থেকে ও তোর বন্ধু , আর তোর নাম দিলাম সুদাম। সুদামের যে বাবা সুধাময় সে যতো বড় অপরাধী হোক না কেন তাকে কি আর না ক্ষমা করে পারা যায়। ক্ষমাই যে পরম ধর্ম রে বেটা।"

নিতাই শর্মা

শারদোৎসব

ভাদ্রের হাত ধরে শরতের আগমন,
বর্ষার কালো মেঘেরা করে গমন।
নীল গগনে ভাসে সাদা মেঘের ভেলা,
চারিদিকে উদ্ভাসিত আলোকের মেলা।

শিউলির সৌরভ ছড়ায় ভোরের বাতাসে,
খালে বিলে জলাশয়ে পদ্ম ফুলেরা হাসে।
নদীর তীরে সাদা কাশফুল বাতাসে দোলে,
হিমেল প্রাতে শিশির বিন্দু ঝরে পড়ে ফুলে।

বিশ্বকর্মা পূজোর সাথে ভাদ্রের সমাপন,
অষ্টমী তিথিতে  শ্রীকৃষ্ণ করেন জন্মগ্রহণ।
মহালয়া হয় আশ্বিনের অমাবষ্যা তিথিতে,
পিতৃপক্ষের সমাপন ঘটে গোটা পৃথিবীতে।

মাতৃপক্ষের শুরু মহালয়ার অন্তিম ক্ষণে,
আনন্দধারা বহে জগত সংসারে জনমনে।
শারদীয়া দুর্গোৎসবে মাতোয়ারা ভুবন,
ষষ্ঠী তিথিতে হয় দেবীমায়ের বোধন।

মা জগজ্জননী আসে তিন দিনের তরে,
দশমী তিথিতে মায়ের গমন পতির ঘরে।
অশ্রু সজল নয়নে হয় মায়ের বিদায়,
পরস্পর আলিঙ্গন করে শুভ বিজয়ায়।

দুর্গোৎসবের পর ধন লক্ষীর আগমনে,
ধনী গরীব নির্বিশেষে মত্ত লক্ষী পূজনে।
লক্ষী পূজনে হয় দেবীপক্ষের সমাপন,
আগামীর প্রত্যাশায় হয় দেবীর বিসর্জন।

রূপালী রায়

দেবীপক্ষ 

ভাবনার শূন্য এঁকেছি যত গল্প 
একে একে বন্দী সব 
চার দেওয়ালের কক্ষে ।
যে দূরত্বে সময় গেছে চলে 
আকাশটা ক্রমশ হচ্ছে ছোট
স্বপ্নের জাল থেমে গেছে বুনা 
 মানুষ থেকে বেশি 
হয়েছি নারীতে পরিণত ।
বুকে জমা সব কথা 
অপ্রকাশ্য  জটিল ব্যাথা 
চাপা পড়ে গেছে সে কবেই ।
চার পাশে চেয়ে দেখি 
দখলে গেছে সমস্ত জমি 
ইচ্ছে ছিল খুব আঁকড়ে ধরে বাঁচবার ।

রাজীব আচার্য্য

আমার কাশফুল

নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা
চোরা বৃষ্টি মাঝে মধ্যেই করছে খেলা,
দিনগুলো বষর্ণমুখর নয়
তাইত ভয় হয়।
ওই দূরে চঞ্চল কাশবন
দুরন্ত বাতাসে তার সাথে দোল খায় মন।
শরৎ সেজেছে কাশফুলে থরে বিথরে বালুচরে!
সাদা মেঘের শতদল উড়ছে অপরূপা নীলাম্বরে!
ভাটির দেশে শুভ্র কাশবন কেড়ে নিয়েছে মন,
নদীর তীর কত যে নিবিড়; মন হয় উচাটন!
হাওয়ায় দোলে ফুল দল উড়ে যেতে চায় সুদূরে;
মায়া-মমতায় আটকে আছে পাশাপাশি অঙ্গাঙ্গীভাবে!
ধূসর সাদা কাশফুলে ছেয়ে গেছে বালুচর।নীলাকাশে উড়ছে সাদা মেঘ স্তরে স্তর।
ধরাধামে নেমে এলো এলোকেশী উর্বশী!কপালেতে নীল টিপ যেন পূর্ণিমা শশী।

প্রসেনজিৎ রায়

প্রেমের এক উপাখ্যান

তোমার আঙ্গুল ছুঁয়ে স্বপ্ন উড়ান শুরু,
পাথরের ইমারত ছাড়িয়ে মোহনা পেরিয়ে সীমাহীন দিগন্তরেখা বরাবর...
কোনো এক সংজ্ঞাহীন অবেলায়।
বিশ্বাসের ভরসায় সভ্যতার নখরীকুঞ্জে ভিড়ে ভিনদেশী নৌবহর,
মৃদুমন্দ হাওয়ার তোপে স্বপ্ননগরীতে ধ্বজ উড়ায় সোনালী আলখাল্লা।
ভোররাতে যখন আমি ভোরঘুমে বিভোর তোমার স্পর্শে আবেশী ফানুস তখনও উড়ে চলে,
নাম না জানা কোনো এক কল্প নদীর গভীরে লুক্কায়িত ব-দ্বীপের হৃদয় ছুঁয়ে,
কোনো এক হৈমন্তী প্রভাতে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আমি গড়ে উঠতে দেখি এক নিঃশব্দ প্রেমের উপাখ্যান।

কৃষ্ণকুসুম পাল।

দিন যায় কবিতা থাকে

দিন যায় - কবিতা থাকে,
রাত যায় - স্বপ্ন থাকে।
              
সময় যায় - প্রেম থাকে,
স্রোত যায় - নদী থাকে।
               
যৌবন যায় - স্মৃতি থাকে,
জীবন যায় - কীর্তি থাকে।
                 
ছায়া যায় - মায়া থাকে,
কায়া যায় - আত্মা থাকে।
                 
দিন যায় - কবিতা থাকে,
রাত যায় - স্বপ্ন থাকে।

শ্বেতা ব্যানার্জী

কোথায় হারাই!

শব্দেরা পথ ছেড়ে চলে গেছে কবেই, শুধু ইচ্ছে এখনো বেঁচে।
সে বলে, এতো সহজেই হেরে যাবে! 
তোমার কবিতা তোমারই মতো বেঁচে।
যাবে যদি চলে ; কেন বেঁধেছিলে 'অরিগ্যামি' সুখ
শব্দের যৌবনে 
কেন রাখলে  নবজাতকের  কাঁথার উপভোগে,
কেন সাজলে প্রেমিক!
ছিন্ন মূলের বেদনার ঘর কেন কেড়ে নিতে চাও!
শব্দ তো শুধু  সম্মতি দিয়েছিল, আমি তো বাড়িয়ে ছিলাম দু'হাত।
নির্দ্ধিধায় বুকে টেনে নিয়ে  চাটাই-এর যোগ্য করে 
বসতে দিয়েছিলাম তোমাকে। 
কেন সংকোচ? অস্ত্র তোমারই হাতে;
সেই যে খেলাচ্ছলে শব্দের 'এক্কা-দোক্কা' ঘর।
শব্দেরা নির্নিমেষ তাকিয়ে ছিল তোমারই
অপরিপক্ক কলমের দিকে... 
তারপর তো বয়ে গেছে ঝড়। 
এলোমেলো ভাবনারা গড়েছে সেতু,
রেচনতন্ত্রে পরিপাক। 
দোহাই তোমায় ফাল -ফাল করে স্বর্গসুখ তুমি মুছোনা,
বির্সজন দিওনা তোমার কবিতাকে। 
বৃক্ষচক্রের বিশ্লেষণ করে বুঝি তার বয়সের মাপ।
তোমার কোষে হামলা চলুক 
ভাঙুক নিরাপদ আশ্রয়। 
উপেক্ষার যৌবন যাক ঝ'রে...। 
চাদরের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসুক পরিপুষ্ট 
প্রেমিক। 
আদরে- আবদারে শর্তহীন সখ্য গড়ে তুলুক কবিতার ঘরে।

স্বপন গায়েন

যুদ্ধ

ক্ষমতা লড়াই দম্ভ 
যুদ্ধের আর এক নাম 
রক্তে ভেসে যায় দেশের মানুষ 
তবুও যুদ্ধ থামে না।

মৃত্যুহীন প্রাণ -
মৃত্যু মিছিল অব্যাহত 
সারা পৃথিবীর জুড়ে চলছে নগ্ন নৃত্য 
চিতায় জ্বলছে সারি সারি লাশ।

পদাতিক সৈন এখন মূল্যহীন 
আকাশ পথে যুদ্ধ বিমান 
রকেট হানা, বিমান থেকে ফেলছে বোমা 
ধ্বংস স্তূপে পরিণত হচ্ছে শহর থেকে গ্রাম।

যুদ্ধের কী খুব প্রয়োজন?
নিরীহ মানুষ মরছে শ'য়ে শ'য়ে 
রক্তাক্ত পৃথিবী -
দম্ভ ক্ষমতায় অন্ধ হয়ে যুদ্ধ খেলায় মেতে উঠেছে স্বৈরতান্ত্রিক দেশ।

গীতশ্রী ভট্টাচার্য্য

প্রার্থনা

যেভাবেই নিতে চেয়েছি তোমায় নিজের গভীরে
তুমি ঠিক আড়াল করে নিতে পেরেছে তোমার সত্তা।
কত অর্ঘ্য তোমার পায়ে ঢেলেছি, সময়ে সময়ে 
তোমার পাথর বুকে চকমকি ঠুকেছি নিরন্তর ।
তুমি তবু পাথরই থেকে গেলে, এক বিন্দু জল দিলেনা।

তোমার সাজানো অজুহাত এতই দুর্বল যে ভেঙে পড়তে
পারে সমস্ত কেল্লা, মন্দিরের প্রাচীর আর বিশ্বাসের মন।
শক্তি জড়ো করে তবু কৌশল খুঁজি ভরসা বাঁচিয়ে রাখার, মন্ত্রে মন্ত্রে জলছড়া দেই দেবালয়ে,বিগ্রহে।

জাগিয়ে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছি দিন রাত
জানি তুমি জাগবে না আমার আর্তনাদে।
তুমি কৃপণ বড়, অনিচ্ছুক দানে এবং ধ্যানে।
তোমার সকল পূজো জুড়ে শুধু বলির রক্ত,
তোমার বেদিতে তাই আজও আমার শোণিত কান্না।