শহুরে ব্যাধি
ক'দিন থেকে খুব গরম পড়েছে। একেবারে ভিজে প্যাঁচপ্যাঁচে গরম। ভাদ্রের এই দাবদাহ যেন গ্রীষ্মের রদ্দুরকেও হার মানায়। প্রত্যেকদিন বর্ষা ঘুম থেকে উঠেই ব্যালকনিতে এসে আকাশ দেখে। যদি কোথাও এক খণ্ড কালো মেঘ আকাশের গায়ে লেগে থাকে তবে ওর মন অজানা ভালোলাগায় ভরে ওঠে। মনে মনে ভাবে,ও বর্ষা বলেই কি মেঘের সঙ্গে এত ভাব ওর!! মনে হয় যেন, বিগত জনম থেকেই ও মেঘের সঙ্গে এক অমোঘ ভালোবাসায় জড়িয়ে আছে। বর্ষা আসলে বৃষ্টিবিলাসী । কিন্তু এবার তো সেভাবে বর্ষা নামেনি,তাই চাতক হয়ে আছে ওর মন। ও মনে মনে ভাবে,অভিমানী বর্ষা যেন এবার সূর্যের গায়ে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। শত আহ্বানেও মেঘর মান ভাঙছে না।
অবসর সময়ে এভাবে সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে বর্ষা একদিন দেখল,কবে যেন শরৎ এসে বর্ষার চৌকাঠ ডিঙিয়ে প্রকৃতির আঙিনায় পা রেখেছে। ওর ভাবনায় শরৎ মানেই আগমনির সুরে সুরে মুখর বাতাসের গুনগুন গান। আজ ছুটির দিন। তায় আবার স্তিমিত সূর্য আজ মেঘের আঁচলে মুখ ঢেকেছে। কালো কালো ধোঁয়ার মত কুন্ডলি পাকিয়ে মেঘের দল ছুটে আসছে। দেখে বর্ষার আনন্দ আর ধরেনা। মনে মনে ভাবে,অফিস বাড়ি ছাড়া বহুদিন ওর কোথাও বেরোনো হয়নি ,আজ যদি একটু বন্ধু মোহনার সঙ্গে ফুরফুরে মেজাজে আড্ডা দিয়ে আসে তবে একঘেয়েমি কেটে যাবে। আবহাওয়া যখন অনুকূলে, তারপর না হয় দুজনে কিছু টুকিটাকি পুজোর শপিং করে ফেলবে! কিন্তু... শরীরটাও যেন আজ বড্ড ম্যাজম্যাজ করছে ওর। বেরোবে কি বেরোবে না ভাবতে ভাবতে কাজের মেয়ে বকুলকে ডেকে এককাপ চা দিতে বলে অলস ভঙ্গিমায় ব্যালকনির চেয়ারটায় গা এলিয়ে দিল। চা পান করতে করতে লক্ষ্য করল,দূরের নারকেল, সুপুরি, ইউক্যালিপটাস গাছগুলো যেন আজ মেঘলা দিনের আঁচল গায়ে জড়িয়ে চনমনে হয়ে শাখা দুলিয়ে দুলিয়ে শরতকে স্বাগত জানাচ্ছে। মায়ের আগমনী বার্তা নিয়ে শরৎ আসে বলে এই ঋতুটি বরাবরই বর্ষার কাছে এক আলাদা মূল্য রাখে। এই সময়টাতে ওর যেমনি অপরিসীম সুখ অনুভব হয় তেমনি অপরিসীম দুঃখও ওকে উন্মনা করে তুলে। এমনি সব এলোমেলো ভাবনায় তলিয়ে যেতে যেতে আনমনা বর্ষার হঠাৎ চোখ পড়ল ফ্ল্যাটবাড়ির নিচে দেওয়ালের লাগোয়া একটি ইউক্যালিপটাস গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা দুটো ক্ষীণকায় কিশোর ছেলের দিকে। অহেতুক কৌতুহলে বর্ষা একটু গলা বাড়িয়ে দেখার চেষ্টা করল ছেলে দুটোকে। জীর্ণ মলীন কাপড় পরা দুটি কিশোর ছেলে। দুজনের শরীরী অবয়ব দেখে মনে হচ্ছে যেন কিছু একটা নিয়ে বিবাদ করছে। ব্যাপারটা বুঝার জন্য ও উঠে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। পায়ে পায়ে ফটকের কাছে এসে ছেলেদুটোকে দেখেই বিস্ময়ে চমকে উঠল। আরে ...!! এই দুটো ছেলেকে তো ও চেনে! একজন অন্ধ এবং আর একজন বোবা,কথা বলতে পারে না। বর্ষার গাড়িটি যখন অফিস যাবার সময় ট্রাফিকে আটকে থাকে তখন ছেলে দুটো হাতে হাত ধরে এসে ওর গাড়ির জানালার কাঁচে হাত পাতে। প্রতিদিন বর্ষা ওদের জন্য দু-চার টাকা খুচরো রেখে দেয় ব্যাগে। কিশোর বয়সের ছেলে দুটোর প্রতি নিয়তির এমন নিঠুর বিধান দেখে ওর মন ব্যথায় ভরে ওঠে। একদিন ওদের জিজ্ঞেস করে জেনে ছিল ওরা দুইভাই। নাম যদু ও মধু। ছোটভাইটি জন্ম থেকেই কথা বলতে পারে না আর ওর চোখদুটো নষ্ট হয়ে গেছে গুটি বসন্তয়। মা লোকের বাড়িতে বাসন মাজে। বাবা ওদের ফেলে অন্যখানে গিয়ে সংসার পেতেছে। ছেলে দুটোর এমন দুর্ভাগ্যজনক গল্প শোনে বর্ষার সংবেদনশীল মন বেদনায় কাতর হয়ে ওঠেছিল। কিন্তু আজ একি দেখছে ও!! লক্ষ্য করে দেখল,একটির হাতে একটি নেশাজাতীয় দ্রব্যের টিউব নিয়ে টানাহেঁচড়া চলছে। আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনল,একজন অপরজনকে বলছে, ' আবে ওই হলুদ শার্ট তোর হাতে কুরি টাকা দিয়েছিল,সে ভাগ তুই আমাকে দিসনি। আর এখন নীল শাড়ি কাকিমার দেওয়া খুচরো কতকগুলিও তুই হাপিস করবি'? এমনি বাকবিতণ্ডার মাঝে হঠাৎ হাত থেকে টিউবটি পড়ে যেতেই দিব্যি অন্ধ ছেলেটি নিচু হয়ে টিউবটি তুলে ফেলল। তবে তো ছেলেটি অন্ধ নয় ! বোবাটিও সমানে তর্কবিতর্ক চালিয়ে যাচ্ছে। বর্ষার প্রতিবাদী মন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।পা টিপে টিপে এগিয়ে গিয়েই খপ করে দুহাতে দুটি ছেলের হাত চেপে ধরল। ওরাও বর্ষাকে দেখেই ভয়ে চমকে ওঠে হাত ছাড়িয়ে পালাবার চেষ্টা শুরু করল। বর্ষা ধমকে ওদের বলল,পালিয়ে যাবার চেষ্টা করলেই এবার ও পুলিশের হাতে তুলে দেবে ওদের এবং ওসব বাজে নেশা করার জন্য ওদের পুলিশ হেফাজতেই পচে মরতে হবে। এদিকে বর্ষার উত্তেজিত কথাবার্তা শুনে আবাসনের চৌকিদার পায়ে পায়ে সেখানে এসে ভীড়ে গেল। পথচারী দু'একজনও সেখানে এসে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ওনারা বর্ষার কাছে ছেলে দুটোকে আটকে রাখার কারণ জানতে চাইলে,ও মুখ খুলতে না খুলতেই ছেলে দুটো ভ্যাঁ করে কেঁদে দিল। এরপর হাউমাউ করে যা বললো,সেটা খুবই বেদনাদায়ক । ওরা আদতে দুই ভাই নয়। দুজনেই ষ্টেশনের পাশের ঝুপড়িগুলোতে থাকে। স্কুলের দোরগোড়ায় যায়নি কোনোদিন। একদিন ওরা ঝুপড়ি থেকে বেরিয়ে পথে প্লাস্টিক কুড়াচ্ছিল, তখন দু'জন দাদা এসে বলল , ওরা যদি এই দাদাদের দলে যোগ দেয় তবে আর ওদের কোন কষ্ট করতে হবেনা। আরো বলেছিল, ওরা যদি বোবা ও কালার বেশ ধরে ঘুরে ঘুরে ট্র্যাফিকের ভীড়ে লোকের কাছে ভিক্ষা করে তবে দয়াপরবশ হয়ে অনেকেই হয়তো ওদের বেশি বেশি পয়সা দেবেন। এতে ওদের কষ্ট করে স্কুলও যেতে হবেনা আর বিনাকষ্টে পেট ভরে খেতেও পাবে। কিন্তু এখন দিনশেষে দাদারাই ওদের সারাদিনের সব পয়সা কেড়ে নেয়। ওদের হাতে যা দেয়,তা খুবই সামান্য। কাজ ছাড়বে বললেও খুব মারে। ওদের মত আরো ক'জন ধারেকাছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। শুরুতে এই বাজে নেশা করাও দাদারাই শিখিয়েছিল। এখন আর ওরা না খেয়ে থাকতে পারে না। এরপর ধুপ করে বর্ষার পায়ের কাছে বসে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, 'এবার আমাদের ছেড়ে দিন দিদিমনি। আমরা দুজন ওই ঝুপড়ি থেকে পালিয়ে যাব। আর ওই দাদাদের কথায় ওমন মিথ্যে অভিনয় করে লোক ঠকাব না'। কিশোর দুটোর কথা শুনে বর্ষা ভয় আতঙ্ক হতাশায় একেবারে কুকড়ে গেল। লোকমুখে শুনেছে ও, সমাজবিরোধীদের কাজ এসব । বেছে বেছে পথশিশুদের ধরে ওরা নানা অসামাজিক কাজ চালিয়ে যায়। এগুলো আসলে শহরের দুরারোগ্য ব্যাধি। এর থেকে নিস্তার পাওয়া বড়ই কঠিন। বেশিরভাগ বড় শহরেই একটি বড় গ্যাং থাকে,যারা এসব অসামাজিক কার্যকলাপ চালিয়ে যায়। কিন্তু ছেলেদুটোকে নিয়ে এবার কি করবে ও!! এভাবে তো ছেড়ে দেওয়া যায়না! পথচারী অনেকেই বললেন পুলিশের হাতে তুলে দিতে। বর্ষার মন মানছে না। সদ্য ফুটা দুটো কিশোর ছেলে, পুলিশের ওমন লাঠির ঘাঁ সইতে পারবে তো!! তারচেয়ে যদি নেশা ছাড়িয়ে ওদের শুধরে দেওয়া যায়! তবেই ওদের ভাগ্যলিখন বদলে যাবে। এই ভেবে বর্ষা ফোনের বাটন টিপতে লাগল,গাড়ি ডেকে ছেলেদুটোকে নিয়ে Rehabilitation Centre যাবে বলে। আজ অধরাই রইল বর্ষার টুকিটাকি পুজোর বাজার.......