ছোটগল্প
অভাগী
সবুজ বনানী ঘেরা, তটিনী নদীর তীরে পুতুলপুর গাঁও। সেখানে নিত্যানন্দ দাস ও ভগবতী দেবী ছোট্ট সংসার নিয়ে কুরে ঘরে জীবন কাটাচ্ছে। অভাব নিত্য সঙ্গী। সন্তান-সন্ততির আশায় নিত্যানন্দ দাশ গাঁয়ের ছোট্ট মন্দিরটি তে রোজ আনাগোনা। ভগবানের আশীষে একটি ফুটফুটে সুন্দর কন্যার জন্ম দিল মাতা ভগবতী। মেয়েটির জন্মের ৩ দিনের মাথায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো মা ভগবতী। গাঁয়ের লোক নাম দিয়েছে অভাগী। পিতা বহু কষ্টে মেয়েটিকে তিলে তিলে মানুষ করে তুলল। এভাবেই সময়ের চাকা ঘুরতে লাগল।
মেয়ের বয়স হয়েছে। পাড়া গাঁয়ের লোক নিত্যানন্দ দাশ কে মেয়ের বিবাহ প্রসঙ্গে অবগত করালো। এদিকে আর্থিক অনটনে জর্জরিত নিত্যানন্দ দাস চিন্তায় উদ্বিগ্ন। একদিন সকালে বিনয় বাবু এক শহুরে ছেলের আলাপ নিয়ে এসেছে। জমিদার বাড়ির ছেলে। শ্যামনগরের জমিদার রুদ্রকান্ত বাবু
"মানুষ হিসেবে মাটির মানুষ"।
কেন জানি না! প্রথম দেখাতেই অভাগীকে মনঃপুত মনে হলো।
না, তেমন একটা দাবি দাওয়া নেই । আগামী বৈশাখে অভাগীর বিবাহ স্থির হল। এদিকে পিতা নিত্যানন্দ তার একমাত্র পৈত্রিক ভিটার অর্ধাংশ বিক্রয় করি যথা সামর্থ্য মেয়েকে উজাড় করে দিল। দিনক্ষণে অভাগীর বিবাহ হয়ে গেল। পিতা নিত্যানন্দের কন্যাদান সম্পন্ন করল। বর অভাগী কে খুব ভালোবেসে দিন কাটাতে লাগলো।
ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! কিছুদিনের মধ্যেই বরের হৃদয়ে 'ফুটো' ধরা পরল। বহু যন্ত্রণা আর্তনাদ করে বর শহুরে হাসপাতালে প্রাণ রাখলো। এদিকে শ্বশুরবাড়ির লোকেরা
"অভাগীকে অলক্ষী বলে মন্তব্য করলো"।
শ্বশুর বাড়ির লোকেরা অভাগীকে শত দোষে দোষী করে নতুন প্রভাত এর আগে জমিদার বাড়ি ত্যাগ করার আদেশ দিল। চিরকালের সুখ হীন, আনন্দহীন
"অভাগী অভাগী হয়েই থেকে গেল"।
কত বসন্তে কোকিলের মিলনের সুর, বর্ষায় ব্যাঙের ডাক, ময়ূরের মিলনের তরে নাচন, বসন্তে প্রকৃতির সমীরন, নব যুবতীর আলতা রাঙানো পা, অভাগীকে টুকরো টুকরো দুঃখ দিয়ে যায়।
"অশ্রুজল শুকিয়ে গেছে আর কান্না আসে না"।
কত উৎসব রাতিতে নববধূর সাজ, কত আনন্দে রমনীদের নাচন, ফুলের শোভা আর গাছে ধরে না যখন, কত প্রমত্ত ভ্রমর নাচন ভঙ্গিমায় ব্যস্ত, তখন নিত্যানন্দ দাশের কুঁড়েঘরে অভাগী চোখের জল ফেলে!বলে-
এ কেমন বিচার?
সেদিন বসন্তের শেষ বেলা। প্রতিদিনের ন্যায় আজও ওই রাঙা ফুলগুলির দিকে নজর রেখে অভাগীর চেয়ে রইল , আজও সেই ভাসমান মেঘ, প্রকৃতির নিঠুর খেলা দেখতে লাগলো, এমনি সময়, কোন আগন্তুক যেন হাতে হাত রাখলো। এক মুহূর্তে যেন এক বিশ্বাসের পৃথিবীতে নিয়ে গেল অভাগীর বহুদিন পরে কোন বিশ্বাসের ভিত্তি তৈরি হলো অভাগীর মন মন্দিরে। কত প্রতিজ্ঞা, তার অভাগীর চোখের জল মুছে দেওয়া, এগুলো যেন নতুন সম্পর্কের ইশারা দিচ্ছে। অভাগী নতুন করে বাঁচতে দ্বিধা জড়িত। আধো আধো কণ্ঠে পিতা নিত্যানন্দ দাস কে জানালো এক মুহূর্তের সুখ দায়ক আগন্তুক পুরুষের কথা। দু ফোটা চোখের জল যেন গড়িয়ে পরল নিত্যানন্দ দাশের চোখের নিচে। নতুন সম্পর্কে যেন সম্পূর্ণ রুচিবোধ হারিয়ে ফেলেছেন পিতা নিত্যানন্দ। সেই অচেনা পুরুষ অভাগীর কুঁড়েঘরে এসে পিতা নিত্যানন্দ দাস কে সান্তনা জোগাতে লাগলো। বহু প্রতিজ্ঞা, ও জানালার ডিপিতে রাখা ভগবানের প্রতিকৃতির সম্মুখে জ্বলন্ত তৈল প্রদীপ সাক্ষী থাকলো
"সেই নতুন বন্ধনের"।
ছেলেটি ওই সাদা শাড়ি পরা বিধবা অভাগীর সম্মুখে আলতা ,লালচুরি, শাঁখা পলা, লাল বেনারসি ,সিঁদুরের কোটা রাখলো। অভাগীর চিন্তন জগতের তীব্র আলোড়ন ঘটতে ঘটতে এক সময় যেন "অভাগীর মুখ থেকে এক টুকরো শব্দ বের হলো হ্যাঁ।"
সাহসী অভাগী যেন বলে উঠলো আমি প্রস্তুত।
চিরকালের সুখহীন, বেদনা যুক্ত, অশ্রুজল সমন্বিত, কষ্ট সহিষ্ণু, অভাগীকে এক টুকরো সুখ প্রদান করতে এসেছে ছেলেটি।
আবারো একবার সাত পাকে বাঁধা পড়ল অভাগী আর আগন্তুক ছেলেটি।বিবাহের পর জানা গেল ছেলেটি অর্থাৎ মোহন শহুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ। পিতা নিত্যানন্দ দাশে যেন আনন্দে আপ্লুত । ভগবানের নিকট হাজারো প্রণামের ঝড় উঠলো। জানা গেল নতুন বর কাজের সুবাদে ছোট্ট পাড়ার গাঁয়ের " Life experience" এর জন্যই এসেছিল।
"ভগবান যেন তাহাকে দেবদূত করে পাঠালো"। এখন বর চিরকালের অভাগীকে নিয়ে শহরে চলে গেল ।