Oct 31, 2023

জয়িতা ভট্টাচার্য

ছোটগল্প

ফেরা

অস্পষ্ট অস্বস্তি ভেঙে অনীতা প্রথমেই অনুভব করল এক দুরন্ত গতি।শরীর জুড়ে ক্লান্তি।ট্রেনের জানলায় ছায়াছবির মতো নিমেষে সরে যাচ্ছে দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তর। সবুজ চাদর ,গাঢ়তর সবুজ, মাটিরবাড়ি,দূরে হাইওয়ে, সব সরে যাচ্ছে অতীতে। যেমন করে সরে যাচ্ছে অন্ধ গলিটা,খোলা ড্রেন,ভাঙা বাড়ির  উঠোনে দড়িতে মেলে দেওয়া লাল ব্রা, শায়া,শাড়ি।মুখের সারি,মিতা,রাবেয়া,অঞ্জনা,মামনি.... কোঁচকানো বিছানার চাদর সব সরে যাচ্ছে। দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে।শোকের না মুক্তির আনন্দে কে জানে।প্রাতঃকৃত্য সেরে ব্যাগ গুছিয়ে রেডি হয় অনীতা।

অচেনা স্টেশনে রোদের আলো, ভাঁড়ের চা।

কুড়ি কুড়ি বছর,কেটে গেছে।মনে পড়ে পড়ে সেই রাত।স্বামী সাবিরের হাত ধরে বাড়ি ছেড়েছিলো অভাবের দায়।মদ আর জুয়া,বেকার স্বামীর মার,।আম্মা আর শাশুড়ি মায়ের বিলাপ।সাবির বলেছিলো কলকাতায় অনেক কাজ। দুজনে থাকবে।তারপর হিসেব মেলেনি। সাবির মামনির কাছে রেখে সেই রাতে চলে গেছিলো।

সোনাগাছির পুরোনো বাড়ির জায়গায় এখন ফ্ল্যাট। মামনি মানুষটা অবশ্য খারাপ নয়।

একসময় কান্নার শেষ।একসময় কাজ হয়ে গেছে গা সহা।ক্রমে নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছিল সে। ক্রমে নিজের কিছু ব্যাংক ব্যালান্স। সবই মামনির পরামর্শে।উঠে দাঁড়াল সে একসময়।একসময় মন থেকে নিজেকে আর ঘৃণা নয় এই তার মতো মানুষগুলোর জন্য সংগঠন।নানা মানুষ এগিয়ে এলেন।একসময়

আট বছর আগে খবর পেয়েছিল ইন্তেকাল হয়েছে সাবিরের।তার কাছে তো সাবির সেই রাতেই মৃত,যেদিন তাকে বিক্রি করে পালিয়ে গেছিল সে।তার প্রথম কাস্টমার সেই 

কাঁচা পাকা চুল অচেনা মানুষটাকে ভোলেনি বরং সে।একমাস মামনির তত্বাবধানে থাকার পরে ক্রমশ শান্ত,দৃঢ় হয়েছিল সে।মানুষটা 

  তাকে ইচ্ছে মতো ঘেঁটেছিল। খুব খারাপ লাগেনি একথা সে স্বীকার করেছিল মনে মনে।

যাবার সময় আলাদা করে মোটা টাকার সঙ্গে  খুচরো উপহার।সেই মানুষটা আর কারো কাছে আসতো না টানা পাঁচ বছর পর মারা গেছিল গাড়ি চাপা পড়ে।

তারপর একে একে এসেছে অনেকে।এখানে রহমত চাচা তাদের সুরক্ষায়। থানা তাদের পাশে।

অন্তত সোনাগাছিতে প্রবঞ্চক স্বামী  নেই।অন্তত দুবেলা খাওয়া। সুরক্ষা।সততা।

ট্রেনে তুলে দিতে এসেছিল রহমান চাচা আর লাল্লু যাদব।তিন অনাত্মীয়। চোখে জল।" মুন্নি মোবাইল মে নং সেভ হ্যায় চিন্তা মত্ কর।আল্লাহ্ কে দোয়া সে তু খুশি রহেগি অগর  গরবড় হুয়া তো লৌট আনা" রহমান চাচা বলেছে।

সেই ফাল্গুন মাসে কাজ বন্ধ হয়ে গেলো।লকডাডাউন, ভাইরাস,মৃত্যু মিছিল।পেশা বন্ধ। ছ মাস পড়েও শোনা গেল এ পেশা অনিশ্চিত।শরীর বেচা মেয়েদের  দানের টাকা হজম  হয় না।ধীরে ধীরে খালি হচ্ছিল সোনাগাছি। সাবিরকে মনে পড়ে না।মনে পড়েছিল ছায়াঘেরা গ্রামটা।এখনো ফিরে গেলে কিছুদিন চলে যাবে।চিঠি করে দিয়েছে মামনি কোনো এক নেতার যাতে না তাড়িয়ে দেয় তাকে।

লাল সুরকি বিছানো স্টেশন। কুড়ি বছরে অনেক বদল।রংচঙে চায়ের দোকান খাবার স্টল।জিও, এয়ারটেলের ফ্লেক্স।

বুড়ো বটগাছটি আছে এখনও স্টেশনের বাইরে।সাক্ষী তার যাওয়ার আর আজ এই ফেরার।

অনীতা কলরব ছেড়ে পা দেয় বাড়ির পথে।নীলের ওপর হলুদ ফুলছাপ শাড়ি, বুক অবধি ঘোমটা আর গোলাপি চাদরে মোড়া দুর্গা খাতুন বাসে চড়ে।তারপর টোটো,তারপরে ভ্যান।পথ এক, বদল অনেক।শেষটুকু পায়ে হাঁটা পথ।

ওই যে কামারপাড়া ছাড়িয়ে মাঠ তারপর পাঁচপোতা।পুকুর,গাছ,ঘন জঙলা পথ।

অতিমারী তাকে আবার ফিরে আসার সুযোগ করে দিয়েছে। 

ওই যে দূরে ভাঙাচোরা মাটির ঘর টালির চাল।উঠোনে দুটো ছাগল। ওখানে রাখা আছে তিন হাত জমিন। ন্যুব্জ এক বুড়ি বেড়িয়ে আসছেন। হাতে লাঠি। শুভ্রকেশ।সাদা শাড়ি।একাকী এক মা।    

দুর্গা খাতুন ওরফে অনীতা কঞ্চির আগল খুলে প্রবেশ করে আবার দ্বিতীয় জীবনে।