Oct 31, 2023

রীতা রায়

সিঁদুর খেলা

বিজয়া দশমীর সন্ধ্যা। মা দুর্গাকে বিদায় জানানোর আয়োজন চলছে। পাড়ার সধবা বৌয়েরা জল মিষ্টি ধুপবাতি আর সিঁদুর কৌটো নিয়ে রেকাবি সাজিয়ে দুর্গামণ্ডপে সমবেত হয়েছে। মাকে মিষ্টিমুখ করিয়ে সিঁদুর পরিয়ে মায়ের অক্ষয় সিঁদুর আশীর্বাদ নিয়ে পরস্পরে মেতেছে সিঁদুর খেলায়। এ ওর সিঁথিতে কপালে গালে সিঁদুর লাগিয়ে লালে লাল হয়ে উঠছে পরস্পরের সংস্পর্শে।

মৌলি খানিক দূরে দাঁড়িয়ে। না, সে এখানে সিঁদুর খেলতে আসেনি, তার কপালে গালে কেউ সিঁদুর ছোঁয়ায়নি। এঁয়োতিদের সিঁদুর খেলা হয়ে গেলে তারা মণ্ডপ দখল করবে। দখল বলতে পাড়ার ছোটদের নিয়ে বিজয়া দশমীর সন্ধ্যা মাতাবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে।

দাঁড়িয়ে থেকে তার মন টানছে এক পুরাতন দৃশ্য। মৌলি সেবার পঞ্চানন্দপুর গেছিল, উদ্দেশ্য গঙ্গাস্নান। গঙ্গানদীর ভাঙ্গনে পঞ্চানন্দপুরের অনেকখানি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। নদীর ঘাট এখন বাসস্ট্যান্ডের প্রায় লাগোয়া। বেশির ভাগ বাড়িঘর এমনকী সুদৃশ্য গঙ্গাভবনও নদীগর্ভে। গ্রামের যে বাড়িগুলো রক্ষা পেয়েছে সেগুলো এখন নদীর তীর ছুঁয়ে আছে।

মৌলি গঙ্গাস্নান করে এদিক ওদিক লোকের ভিড় দেখে নদীর পাশেই একটি মাটির বাড়ি দেখতে পেয়ে সেখানেই ঢুকে পড়লো। বাড়িতে তখন গৃহবধূ ছাড়া আর কেউ নেই। তার অনুমতি নিয়ে ওদের ঘরে ঢুকে ভেজা কাপড় পাল্টে অন্য শাড়ি পরে খোলা চুলে বাইরে বেরিয়ে এসে দেখতে পেল উঠোনের ওপাশে ঠাকুরের একচালা। কাছে গিয়ে দেখলো মনসামূর্তি। ঝাঁপ সরিয়ে ভেতরে ঢুকে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করে দাঁড়াতেই গ্রাম্যবধূটি ঠাকুরের সিঁদুর চুপড়ি হতে সিঁদুর তুলে তার সিঁথি কপাল রাঙিয়ে দিল। সদ্যস্নাত মৌলিকে সধবা ভেবে গৃহবধূটি তার খালি সিঁথি ভরে দিয়েছে। আচমকা এরকম ঘটাতে হতভম্ব মৌলি গৃহবধূটির হাত টেনে সরাতে গিয়ে পুরো সিঁদুর দুজনের মাথায় কপালে ছড়িয়ে পড়লো। কিছু সিঁদুর ছিটকে পড়লো মা মনসার মাথায়। ওরা আশ্চর্য হয়ে পরস্পরের দিকে চাইলো।

এ এক অভিনব সিঁদুর খেলা। সধবা, অধবা স্বামী পরিত্যাক্তা.. তিনজনের একান্তের সিঁদুর খেলা।

অবিবাহিত মৌলি একছুটে বাইরে বেরিয়ে নিজেকে সাফ করতে গিয়ে লালে লাল হয়ে উঠছিল। সিঁদুরে রাঙা গ্রাম্যবধূটি বুঝতে পারলো না কী এমন ঘটলো যে মেয়েটা ছুটে পালালো, শুধু অলক্ষ্যে হাসলেন মা মনসা। স্বামী পরিত্যক্তা মা মনসার মনেও তো সাধ থাকতে পারে সবার সাথে সিঁদুর খেলার!