Oct 31, 2023

প্রদীপ কুমার দাস

দিন বদলের সঙ্গে পরম্পরাও বদলে যাচ্ছে

ঢাকে কাঠি পড়ে গেছে। পুজো নিয়ে চারিদিকে সাজো সাজো রব। বনেদি বাড়ির পুজো কিংবা বারোয়ারি পুজোর কর্মকর্তাদের কর্মতৎপরতা এখন অনেক বেশি। দম ফেলার শেষ নেই। লাস্ট মিনিটে ফিনিশিং টাচ দিতে তাঁরা খুবই ব্যস্ত। তবে সময়ের পরিবর্তনে পুজো দালান বা মন্ডবের ছবিটা খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আগেকার দিনে বনেদিবাড়ির পুজোদালান বা বারোয়ারি পুজোমন্ডবে ঠাকুর গড়ার কাজ দেখতে কার না ভাল লাগতো? স্কুল চলাকালীন মনটা সব সময় আঁকুপাঁকু করতো কখন পুজোদালানে হাজির হবো। ঠাকুরদালানে কুমোরকাকা সহ সহকারীরা কাঠামো গড়া থেকে একমেটে, দোমেটে, রং করা, চোখ আঁকার কাজের ফাঁকে ফাঁকে তাঁদের চটকদারী মজার মজার কথাতে হাসির খোরাক জোগাতেন সেটা উভয় পক্ষের কাছে বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠতো। কিন্তু দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে কুমোরকাকাদের জায়গাটা দখল করে নিয়েছে কুমোরপাড়া বা কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীরা। তাঁদের তৈরী রেডিমেড মূর্তি এখন শোভা পায় মন্ডপে মন্ডপে।

আর কুমোরপাড়া বা কুমোরটুলি থেকে লরি, টেম্পো বা ট্রাকে করে প্রতিমা আনার সময়ে হৈ চৈ, নাচা-গানা, চীৎকার-চেঁচামেচি এখন পুজো বদলের অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগেকার দিনের পুজোমন্ডপে হাতের কাজের কারুকার্য শিল্পকলার পরিচায়ক হয়ে উঠতো। এখন সে জায়গায় চলে নানান থিমের পুজো। সেখানে পরিবেশ বান্ধব উপকরণের তূলনায় পরিবেশ-দূষণই মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বনেদি বাড়ির পুছোয় আগেকার দিনে ভোজনপর্ব সবই বাড়িতে ভিয়েন বসিয়ে টাটকা-খাবার বানানো হতো ও সেগুলোর গুণগত মানও ছিল খুবই উন্নত।একালের পুজোয় সে জায়গাটা চলে গেছে ক্যাটারিং গোষ্ঠীর হাতে যাদের খাবারের গুণগত ও পরিমাণগত  মান প্রশ্নাতীত নয়। আগেকার দিনে অনেক বনেদি বাড়ির পুজোয় দুর্গাপুজো উপলক্ষ্যে বিনোদনপর্ব হিসেবে বাবু কালচারের চল ছিল, সময়ের পরিবর্তনে এখন পুজো উপলক্ষ্যে দেখা যায় অন্তক্ষরী, গানের জলসা ও কান ফাটানো আওয়াজে ডি জে'র কেরামতি। সেইসঙ্গে সারারাত ধরে চলতে থাকে উদ্যোম নৃত্য। রাতজেগে ঠাকুর দেখার জন্যে মন্ডপে মন্ডপে ঘোরা, দোকান-রেষ্টুরেন্টে খানা-পিনা করে সূর্য্যদোয়ের আগে বাড়ি ঢোকা। খাবার মেনুতেও ঘটে গেছে বিরাট পরিবর্তন। আগে যেখানে দুপুরের খাবার বলতে ভাত, ডাল, ধোঁকার ডালনা, ঝিংএ পোস্ত, কুমড়োর ঘ্যাঁট, আলুর দম পেলে চেটে-পুটে খেত, এখন সে জায়গাটা নিয়েছে ফাস্টফুডের রকমারি খাবার দাবার যেগুলো শুধুই বাড়তি ক্যালোরি দিতে পারে কিন্তু মন ভরাতে পারে না। বিজয়া দশমীতে এয়োতি মেয়েরা সিঁন্দুর খেলতো ঠিকই, এখন পাড়ায় পাড়ায় পুজোমন্ডপে আধুনিকাষললনাদের সিঁন্দুর খেলাকে কেন্দ্র করে সেলফি সহ ফটো তোলার মাতামাতি দেখা যায় কিন্তু তাতে প্রাণের আবেগ বা হৃদয়ের অনুরাগ কোথায়? বরং লোক দেখানো মেকি ভঙ্গিটাই ফুটে ওঠে। ঠাকুর বিসর্জনের পরে পরষ্পর কোলাকুলি, বড়দের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম এখন খুব বেশি দেখা যায় না, মোবাইল, হোয়াটসআপ, ফেসবুক, ইনস্ট্রাগ্রাম ও ইমেলে বিজয়া দশভীর শুভেচ্ছা, প্রণাম সব জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। নিয়ম মেনে চলা হচ্ছে ঠিকই তবে পরম্পরাটা আর থাকছে না। কালের নিয়মে সব কিছু বদলের সঙ্গে সঙ্গে পুজো বদলও ঘটে যাচ্ছে দ্রুতভাবে।