Oct 31, 2023

চৈতালী ভট্টাচার্য্য

ছোটগল্প

ক্ষমাই পরম ধর্ম 

 মন্দিরের অন্দরে দন্ডায়মান ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্বেতশুভ্র প্রস্তর মূর্তির সন্মুখে নিমীলিত চক্ষে পদ্মাসনে বসে গভীর আবেশে তানপুরায়  ভক্তি সংগীত পরিবেশন করে চলেছেন বীরজু প্রসাদ। 
"প্রভু মুঝে কভু ছোড় না যাইও
তুঝে মুঝে সাহারা বিলাও।
ম্যায় তুম বিনা ক্যায়সে রহু
এ অন্ধেরি জগৎমে—--"
 সংগীতের অপূর্ব সুরমাধরীতে  স্তব্দ ঊষা যেন তার  দিগন্ত প্রসারিত রক্তাভ আঁচল উন্মিলিত করতে যেন দ্বিধাগ্রস্ত। ঘুম ভাঙা পাখিরা কূজন বন্ধ করে সঙ্গীত সুধা পান করতে যেন অধিকতর ব্যগ্র। সুদাম মন্দিরের সিঁড়ির শেষ ধাপে বসে চোখ বন্ধ করে একাগ্রচিত্তে গান শুনে যাচ্ছে। যদিও সে জানে গুরুজী তাকে এই স্থানে এই অবস্থায় দেখলে খুব অসন্তুষ্ট হবেন। তাই সে সদা সতর্ক। ,কেননা এই সংগীত গুরুজীর ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদিত একান্ত নিজস্ব ভগবত সাধনা। কেউ এই বিষয়ে কিছু জানুক তিনি তা একেবারেই চান না। গুরুজীর আরাধনা শেষ হওয়ার আগেই তাই সে এই স্থান ত্যাগ করে গুরুজীর জন্য মধু আদার চা প্রস্তুত রাখবে।
     "গুরুজী আপনার চা প্রস্তুত। আপনি সেবন করুন। " 
"সুদাম বেটা আমি তো তোমাকে আগেই বলেছি আমার এসব কিছুই লাগবে না। তুমি এখন পড়াশোনার দিকে মন দাও। আর একটা কথা তোমাকে তো আমি আগেও অনেকবার গুরুজী বলে ডাকতে নিষেধ করেছি । তাও তুমি কেন শুনোনা। সেরকম মনে হলে তুমি আমাকে নানা বলে ডাকবে। আর যেন এই ভুল না হয়। শোনো আজ আমি শহরে যাবো একটু বিশেষ কাজে । তুমি সারাদিন শান্ত ও খুব ভালো হয়ে থাকবে। তোমাকে সেদ্ধভাত ফুটিয়ে দিচ্ছি। তুমি খেয়ে  যথাসময়ে ইস্কুল চলে যাবে। আমি বিকেলের আগেই চলে আসবো।"
   গুরুজী চলে গেলে বই নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলো সুদাম। কিন্তু কিছুতেই পড়ায় মন বসাতে পারছে না। অন্যদিন গুরুজী পড়া দেখিয়ে দেন। তারপর সে খেয়েদেয়ে ইস্কুলে যায়। সুদাম ভাবে এতো অপূর্ব গলা গুরুজীর অথচ গান শেখানোর কথা বললে গুরুজী প্রচন্ড রেগে যান। সারাদিন একেবারের জন্য তানপুরায় হাত ছোঁয়ান না। একমাত্র  প্রত্যুষে সবাই যখন গভীর ঘুমে 
আচ্ছন্ন , ঊষাদেবী যখন ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তখন গুরুজী স্নান সেরে শুদ্ধ পট্ট বস্ত্র পরিধান করে  ইষ্টদেবতাকে সঙ্গীতের মাধ্যমে আরাধনা করেন।  অথচ এই গুরুজীর নাকি একসময় কতো গানের ছাত্র ছিল। এমনকি তার বাবাও নাকি গুরুজীর খুব প্রিয় ছাত্র ছিলেন। তারপর কি যে হলো কেজানে। পড়শীদের মুখ থেকে শুনেছে বাবা নাকি গুরুজীর কাছেই মানুষ। সাত্ত্বিক ব্রাক্ষণ পরিবারে বাবার জন্ম হয়েছিল। খুব ছোটবেলায় বাবার মা মারা যান।  সৎমার অত্যাচারে বাবা নাকি পালিয়ে এসে গুরুজীর আশ্রয় গ্রহণ করেন।  আজীবন ব্রক্ষচারী গুরুজী বাবাকে সন্তান স্নেহে পালন করে তোলেন।
"বেটা সুধাময় আমি  তোমাকে আমার স্নেহের সবটুকু দিয়ে তোমাকে মানুষ করার চেষ্টা করেছি এবং সেই সঙ্গে স়়ংগীত বিদ্যার সবটাই তোমাকে দান করেছি। দেখো এর যেন কোনো অমর্যাদা করো না। স়়ংগীত হলো স্বয়ং ঈশ্বর। তাঁকে কখনও বিক্রয় করো না। জীবনে অনেক সুযোগ আসবে , কিন্তু শ্রোতাদের মনোরঞ্জন যেন একমাত্র ধ্যানজ্ঞান না হয়ে ওঠে। তুমি মনে করবে সংগীত নয় তুমি ঈশ্বরের সাধনা করছো। তাহলে সর্বময় ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করবেন।"
"আপনার আদেশ শিরোধার্য গুরুদেব"_বলে প্রনাম করে সুধাময়। গুরুজী মাথায় হাত রেখে আশির্বাদ করেন।
সুধাময়কে তার বন্ধুরা বললো _"কিরে শুনিসনি?  পাশের গ্রামে সিনেমার শুটিং হচ্ছে। ওরা নাকি একটা নতুন গলার সন্ধান করছে  নায়কের গলার প্লেব্যাক করার জন্য। ভালো পারিশ্রমিক দেবে। তোর এতো ভালো গলা। তুই  ঠিক চান্স পেয়ে যাবি । এখানে  শুধুমুধু পড়ে থেকে তোর প্রতিভা নষ্ট হচ্ছে।  এই বুড়োটার কাছে বেকার পড়ে আছিস। নিজেও কিছু করবে না আর কাউকে কিছু করতেও দেবে না। "
" নারে গুরুজী এসব পছন্দ করেন না। এসব করলে উনি খুব রাগ করবেন। উনি স্বপ্ন দেখেন আমি একদিন একজন সঙ্গীতের দিকপাল হবো। তারজন্য এখনও প্রচুর সাধনার দরকার।"
"আরে সাধনা করতে করতে যে বুড়ো হয়ে যাবি। জীবনে সুখভোগ করবি কবে?"
সুধাময় বললো "ওনার  মতো একজন মানুষ যার সঙ্গীতের ওপর এতো বিশাল দখল উনি তো ইচ্ছা করলেই কলকাতা বা মুম্বাই চলে গিয়ে বিশাল সুনাম করতে পারতেন। কিন্তু উনি করেননি। সঙ্গীত ওনার কাছে ঈশ্বরের সাধনা।  তাই তিনি এই বাড়ি ছেড়ে আর এই কৃষ্ণের মন্দির ছেড়ে কোথাও এক পা দিতে চান না।"
"তাহলেই বোঝ উনি নিজের জীবন তো নষ্ট করেছেন এমনকি তোর জীবনও নষ্ট করে দিতে চাইছেন।"
সুধাময় ভাবে "সত্যি তো এই গুরুজীর কাছে পড়ে থাকলে কিছুই তার জীবনে করা সম্ভব হবে না। বেরোতে হবে।  তাই সে শুটিং করতে আসা দলের সঙ্গে দেখা করে। আর প্রথম অডিশনেই সিলেক্ট হয়ে যায়।  তারা অবশ্য কলকাতার স্টুডিওতে গিয়ে ফাইনাল গানের টেক আপের কথা বলে এবং তাকে দিয়ে কনট্র্যাক্ট পেপারে সাইন করে দিয়ে বেশকিছু অ্যাডভান্স দিয়ে একটা নির্দিষ্ট ডেট বলে দেয়।
  গুরুজীকে লুকিয়ে কলকাতা যাত্রা করে সুধাময়। রঙিন জীবনের হাতছানিতে  আর টাকার মোহে গুরুদেবের সব নির্দেশ ভুলে যায়। পয়সা রোজগার তার একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হয়ে যায়। টাকার জন্য অনেক নিম্নমানের গানে গাইবার জন্য সে সাইন করে। হাওয়াই বাজীর মতো চড়চড় করে সে ওপরে উঠতে থাকে।
 কোনো কিছুই আর গোপন থাকেনা গুরুজীর কাছে। আকন্ঠ মদ্যপান আর নারীসঙ্গ একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হয়ে দাঁড়ায়। এরমধ্যে এক হোটেলের গায়িকা মুসলিম রমণীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। কিন্তু সুখ বেশি দিন চিরস্থায়ী হয় না।  ছায়াছবিতে চটুল গানের জন্য তার যে ডিমান্ড ছিল তা ক্রমাগত কমতে থাকে। বেশ কিছু গানের রেকর্ড সুপার ফ্লপ হয়। কোনো সঙ্গীত পরিচালক আর তার সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন না।  আর্থিক চরম দুরবস্তায় পড়ে সুধাময়ের পরিবার। ইতিমধ্যে তাদের সন্তান চারবছর বয়স অতিক্রম করেছে। বউয়ের গানের রোজগারে কোনো মতে স়়ংসার চলতে থাকে। সুধাময় নিজের ভুল বুঝতে পারে। গুরুজীর স্বপ্ন ছিল তাকে বড় বড় ওস্তাদদের মাঝে পেশ করা। তার জন্য আরও অনেক সাধনার আর ধৈর্য্যের দরকার ছিল। কিন্তু তার হটকারীতার জন্য সব পন্ড হলো। এখন গুরুজীর সামনে কোন মুখ নিয়ে সে দাঁড়াবে। মানসিক দুশ্চিন্তা ও হতাশায় সে ক্রমাগত অসুস্থ হয়ে পড়তে থাকে।


  অবশেষে তারা কলকাতা থেকে গ্রামে ফেরার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু পথিমধ্যেই সুধাময় খুব অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে শহরের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার সিরোসিস অফ লিভার ধরা পড়ে। প্রচুর টাকার দরকার। বউ সন্তানকে নিয়ে সুধাময়ের গ্রামে ফিরে আসে। কিন্তু কোথাও ঠাঁই বা কাজ জোটেনা। অবশেষে ছেলেকে নিয়ে গুরুজীর দরজায় হাজির হয়।  ছেলেকে মন্দিরের সামনে বসিয়ে দিয়ে বলে "আজ থেকে গুরুজী তোর আপনজন আমরা তোর কেউ নই। যতই গুরুজী তোকে তাড়িয়ে দিক না কেন পা আঁকড়ে এখানেই পড়ে থাকবি। তারপর ছেলেকে আদর করে রাতের অন্ধকারে কোথায় যেন হারিয়ে যায়।
ঊষাকালে মন্দিরের সিঁড়িতে কান্নাভেজা এক ঘুমন্ত শিশু সন্তানকে দেখে হকচকিয়ে যান বিরজু প্রসাদ।  তার কথায় জানতে পারেন যে সে সুধাময়ের ছেলে নাম সুদান। তার মা তাকে গুরুজীর কাছেই থাকতে বলে কোথায় যেন চলে গেছে। প্রথমে তাঁর অন্তরাত্মা গভীর বিমুখ হয়ে উঠলেও  কৃষ্ণমূর্তির দিকে তাকিয়ে তাঁর সব মনের কালিমা দূর হয়ে যায়  তিনি পরম আবেশে শিশু সন্তানটিকে বুকে টেনে নেন _
"বলে ওঠেন ঐ যে দেখতে পাচ্ছিস কৃষ্ণ,আজ থেকে ও তোর বন্ধু , আর তোর নাম দিলাম সুদাম। সুদামের যে বাবা সুধাময় সে যতো বড় অপরাধী হোক না কেন তাকে কি আর না ক্ষমা করে পারা যায়। ক্ষমাই যে পরম ধর্ম রে বেটা।"