বকশিক (অনুগল্প)
হন্তদন্ত হয়ে রোজকার মতো আজও ট্রেনে উঠেছি। সকাল সাড়ে আটটায় ট্রেন। এক মিনিট দেরি হলেই মিস হয়ে যাবে। আজও ভিড়ে ঠাসা ট্রেন সিট ফাঁকা নেই বললেই চলে। সিটের এক ধারে একটি ব্যাগ রাখা আছে। কার ব্যাগ? কার ব্যাগ? বারকয়েক চিৎকার করে কারও সাড়া না পেয়ে ব্যাগটাকে কোলের ওপর নিয়েই বসে পড়ি। ট্রেন চলতে শুরু করে। প্যাসেঞ্জার ওঠানামা করতে-করতেই তিন-চার স্টেশন পেরিয়ে যায়। কিন্তু ব্যাগের মালিক কই? এখনো কেউ খোঁজ করল না! আর দুই স্টেশন পেরিয়েই আমাকে নামতে হবে। সেখান থেকে টোটো ধরে পনেরো মিনিট এগিয়ে গেলে তারপর আমার অফিস।
আমি একটা বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। সর্বসাকুল্যে বাইশ হাজার টাকা বেতন পাই। এখনও ঘর করে উঠতে পারিনি। দীর্ঘদিন থেকেই ছেলে বাইক কেনার বায়না করলেও ওকে থামিয়ে রেখেছি। আর কয়েক মাস যাক তারপর কিনে দেবো। এমনি করেই তিন বছর পেরিয়ে গেছে। একমাত্র মেয়ের জন্য বিয়ের ঋণ নেওয়া ব্যাংকের টাকা এখনও পরিশোধ করা যায়নি। বছরে একবার ভেলোর যেতে হয় স্বাস্থ্য চেকআপের জন্য। তার জন্য আগে থেকেই ছুটি জমিয়ে রাখতে হয়। প্রতি মাসের ঘর ভাড়া দিয়ে, ওষুধের জন্য আলাদা করে কিছু খরচ রেখে এবং প্রতিমাসে ছেলের জন্য কোচিং সেন্টারের ফি বাবদ খরচ যোগ করে বাদবাকি যা থাকে তাতে কোনওরকম বেঁচে থাকা যায়। এরপর শখ-তামাশা-আহ্লাদ বলে আর কিছু থাকে না। গিন্নি মাঝেমাঝেই খোঁচা মেরে বলে:
তোমার আর অভাব ঘুচবে না! কখনও একটা দামি শাড়ি দিতে পারলে না। হাতখরচের জন্য মাসে এক হাজার টাকাও দিতে পারোনি। নিজেদের একটা ঘরও হল না আজ পর্যন্ত!
এসব কথার উত্তর দিতে গিয়ে আমার কন্ঠস্বরে কম্পন অনুভব করেছি। গলা নামিয়েই বলতে হয়েছে:
দেখে নিও একদিন সবই হবে। ছেলেটাকে বড় হতে দাও আর ব্যাংকের ঋণ শোধ করে ফেলি। তারপর থেকেই আমাদের আর কোনও খরচ থাকবে না। তখন তোমাকে হাতখরচও দিতে পারব।
কতকী ভাবতে-ভাবতেই ট্রেন আমার গন্তব্যে পৌঁছে গেছে। সিট থেকে উঠতেই সামনে দাঁড়ানো একজন প্রায় জোর করেই বসে পড়লেন। হাতের ব্যাগখানা ওর হাতে দিয়ে বললাম:
কার ব্যাগ জানি না, এই সিটেই রাখা ছিল, চাইলেই দিয়ে দেবেন। বলেই দ্রুত ব্যাগখানা তাকে দিয়ে নেমে পড়লাম।
ততক্ষণে মাইকে ঘোষণা হচ্ছে:
একটি বিশেষ ঘোষণা, এই ট্রেনের তিন নং কম্পার্টমেন্টে পঞ্চাশ লক্ষ টাকার একটি ব্যাগ রাখা ছিল। ব্যাগটি যিনি নিজের কাছে রেখেছেন দয়া করে স্টেশন মাস্টারের কাছে জমা দিয়ে যান।কালো রঙের লাল বর্ডার দেওয়া ব্যাগ। কর্তৃপক্ষ তাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা বকশিশ দেবেন।
ঘোষণাটি শুনতে-শুনতেই আমার একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গেল। ওই ব্যাগটি কালো রঙের লাল বর্ডার দেওয়াই ছিল!
বার কয়েক নেমে আসা কম্পার্টমেন্টের দিকে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলাম।ততক্ষণে পুলিশ এসে ঘিরে ফেলেছে চারিপাশ।