Dec 27, 2022

মিঠুন রায়

অভিলাষ (গল্প)

ভোরবেলায় হাল্কা ঠান্ডা লাগতেই সুজয় বুকের উপর ছেঁড়া কাঁথা খানিকটা টেনে নিল। গতকাল রাতে ঘুমাতে পারেনি সে। এমনি

তে সুজয় একটি প্রাইভেট জব করে। পাশাপাশি অসুস্থ বাবার চিকিৎসা রং জন্য সে ওভারটাইম করে।

সম্প্রতি সে বিয়ে বাড়িতে ফুলের সাজসজ্জার কাজ হাতে নিয়েছে। উপার্জন খুব একটা মন্দ নয়। সুজয়ের মাতৃবিয়োগ হয়েছে ছয় মাস আগে।

  মাতৃশোক এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি সুজয়। কিন্তু কিছু করার নেই।ঘরে বৃদ্ধ বাবা বিছানায় শয্যাশায়ী প্রায় দুই বছর ধরে।

  আচমকা দরজায় কলিং বেল বাজতেই ঘুম ভাঙ্গল সুজয়ের। কাজের মাসী যে এসে গেছে। দরজা খুলতেই নজরে পড়ল একটি ছিমছিমে মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।কে তুমি,আমি সোমা। আপনাদের বাড়িতে তে কাজ করে, সেই সবিতা দেবের ছোট মেয়ে।

মায়ের শরীর ভীষণ খারাপ।তাই আজ আসতে পারেনি। আমিই এখন কাজ করব আপনার বাড়িতে।

   সুজয় আর কথা না বাড়িয়ে, তাকে কাজ বুঝিয়ে দিয়ে চলে গেল। বাথরুম থেকে বেরিয়ে বাবার রুমে গিয়ে দেখে,সোমা  সুজয়ের বৃদ্ধ বাবাকে সুপ খাওয়াচ্ছে। প্রথম দিনের কাজকর্মে সোমা যেন সুজয়ের মন অনেকটা জয় করে নিল।ব্রাকফাস্ট করতে করতে একসময় সুজয় বলে উঠল, সোমা তুমি লেখা পড়া কতটুকু করেছ।

  আমি গতবছর বি এ পাশ করেছি।বি এ পাশ করে তুমি অনর্থের বাড়িতে কাজ করছ।না,আসলে মায়ের অসুস্থতার দরুণ এসেছি আপনার বাড়িতে। সুজয়ের চোখে জল এল।

     আসলে অন্যের কষ্টে  চোখে জল আসাটাই স্বাভাবিক। দুপুরে রান্নার বিষয় সহ বাবার ঔষধের কথা বুঝিয়ে সুজয় চলে গেল অফিসে।আজ অফিসে গিয়েও কাজে যেন মন বসে না।সোমার হতভাগ্য জীবনের কথা যেন বারবার মনে পড়ছে। মনে হচ্ছে যেন অল্প সময়ে সোমা জায়গা করে নিয়েছে সুজয়ের মনে। সন্ধ্যায় অফিস থেকে বাড়ি ফিরে সুজয় দেখল , টেবিলে রাতের খাবার সাজানো। এমনকি ফ্লাস্কে গরম জল পর্যন্ত রাখা। হাত  পা ধুয়ে বাবার কাছে যেতেই অশীতিপর বৃদ্ধ বাবা বলে উঠলেন,বড় ভালো মেয়ে সোমা।নিজ হাতে আমাকে তিন বেলা পথ্য দিয়েছে।ও তে পরিবারে যাবে, সেখানেই ঘর আলোকিত করে রাখবে। সত্যিই এমন মেয়ে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। সুজয়ের মনের কথাটা যেন ওর বাবা বলে ফেলেছে।

     রাতের খাবার খেয়ে সুজয় বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবতে  সোমার কথা।যদি সোমা চিরদিনের জন্য এই বাড়িতে থেকে যায়, তবে বেশ ভালোই হতো।কখন যে স্বপ্নের জগৎ থেকে ঘুমের অতলে চলে গেছে সুজয়,তার সে নিজেও জানেনা।

   এভাবে বেশ কিছুদিন কেটে গেল। হঠাৎ হাজির সবিতা মাসী।কি গো,এখন শরীর কেমন।আছি বেশ।আজ সোমা আসে নি।

না,এখন আর ও আসবে না। 

কেন, সোমার বিয়ে ঠিক হয়েছে।ওর বড় মামা বিয়ের সম্বন্ধ এনেছে।পাএ পেশায়  অটো চালক। নিজের দুখানা অটো।

কথাটা শুনে যেন সুজয়ের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল।এ কি শুনলাম। সত্যিই তো, নিজেকে বড় অপরাধী মনে হচ্ছে। একদিনও তো সোমাকে নিজের অন্তরের সুপ্ত প্রেমের কথা জানানো হয় নি।

     নিজের এই ভুলের জন্য আজ সে অনুতপ্ত। তবে কি সোমা এ জীবনে আর তার হবে না। রাতে বিছানায় শুয়ে বারবার এই কথা ভাবছিল সে। রাতে খাওয়াও হয় নি।কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে,তার মনে নেই।

   সকালবেলায় ঘুম ভাঙ্গল অন্য খবরে। বাড়িতে বেশ জনসমাগম।আর কিছুক্ষণ বাদেই সবিতা দেবী সোমাকে নিয়ে হাজির হবেন।আজ তে সুজয়ের সাথে সোমার কোট ম্যারেজ।ছয় মাস বাদে বিয়ে। কিন্তু সুজয় তে কিছুই জানল না।তার বাবা গতকাল সবিতা দেবীর সাথে এ বিষয়ে একেবারে পাকা কথা বলেছে। সবকিছু শুনে যেন বিলম্বে হলেও সুজয় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে।আর জড়িয়ে ধরল তার বাবাকে।তার মনের অভিলাষ পূর্ণ করার জন্য।