জীবন্ত মৃত্যুবান
শতকরা নব্বই ভাগ দম্পতি সন্তান সন্তান করে জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ চাওয়া পাওয়াগুলোকে ত্যাগ করে শপে দেন নিজেদের জীবন।
সন্তান মানে নবজাতককে সুন্দর করে গড়ে তোলার দায়িত্ব। ভালোবাসা, বিশ্বাস, ভরসা, দিয়ে গড়ে দেওয়া মাথার ওপর একটা নিরাপদ আকাশ। একটা নিরাপদ আশ্রয়।
লেখার সূত্র ধরে যত মানুষের জীবনকে জানছি ততই অবাক হওয়ার মতো কিছু বিষয় লক্ষ্য করছি, পরিণত হচ্ছি, অভিজ্ঞ হচ্ছি আজকাল। সব দম্পতির কথা বলছিনা, কিছু কিছু মানুষের দাম্পত্য জীবন এতো এতো কন্টকাতীর্ণ যে জেনে গা শিউরে ওঠার মতো। পর্যবেক্ষণ করি, নিজেকে সেই স্থানে বসিয়ে উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছি অনেক সময়। চোখের জলে ভেসে গেছে চিবুক। উত্তর মিলেছে - সন্তান।
আমরা যারা সেই অর্থে প্রচন্ড অসুখী নয় তারা নিন্দা সমালোচনায় মুখর হয়ে তাদের জীবনকে আরও খানিকটা বিষিয়ে দিই হয়তো, কিন্ত মানবতা কী তাই বলে?এতোটা নির্দয় কী হওয়া উচিত যে কষ্টসহিষ্ণু মানুষের জীবনকে আরও খানিকটা নিন্দার ঘি ঢেলে উস্কে দেওয়া? শুনেছি বুঝেছি দেখেছি মানুষ পরিবর্তনশীল। কেউ ধীরে ধীরে উন্নতি করে, কেউ অবনতি। এই উন্নতি অবনতির সংজ্ঞা আবার বিভিন্ন জনের কাছে বিভিন্ন। এছাড়াও কিছু মানুষ থাকে যারা কোনোদিন বদলায় না, ভালো থাকতে জানে না, ভালো রাখতে জানেনা। ভালো থাকাটাও একটা আর্ট, এ বিষয়ে তারা মারাত্মক রকমের কাঁচা শিল্পী।
প্রসঙ্গটা যখন সন্তান, তখন সেটাতেই ফিরে আসি। জীবনের কাছে প্রচন্ড লাঞ্ছনা, গঞ্জনা, অশান্তি, অবহেলা পেয়ে যখন কোনো মানুষ মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে ফিরে আসে, ঘুমের ওষুধ হয় প্রয়োজনীয় নেশা, সমাজ সন্তানের কথা ভেবে যখন একটা আঁকড়ে ধরার মতো মানুষ তারা খুঁজে নিতে পারেনা তাদের মতো অসুখী ব্যক্তি পৃথিবীতে নেই বলে আমি মনে করি।
কিন্ত হয় কী, যে পিতা বা মাতাটি তার নিজের জীবনটাকে মৃত্যুর কাছে একপ্রকার উৎসর্গ করে দিলো বলা চলে, জীবন্ত লাশ হয়ে বেঁচে রইলো চারদেওয়ালের যান্ত্রিক শহরে তার প্রাপ্য কী? মনুষ্য জন্ম লাভ করে শুধুমাত্র একটা টক্সিক বিয়ের জন্য জীবন্ত লাশ?
এই লাশ বয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্বও তো একসময় সন্তান নেবে না। নেয় না বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। বোঝার বয়স হলে সন্তানেরও উচিত মা বাবাকে বুঝিয়ে ভালোবেসে একটা সুন্দর জীবন উপহার দেওয়া, নয়তো তাদের কে একটু ছাড় দেওয়া যে, "তোমাদের জীবন তোমরা তোমাদের মতো করে একটু ভালো থাকার চেষ্টা করো।" আমি সন্তান বলে, আমায় জন্ম দিয়ে লালনপালন করেছো বলে নিজের জীবনটাকে নরক বানিয়ে রেখোনা, তুমি মানুষ, সুন্দর এই পৃথিবীতে তোমার অধিকার আছে শ্বাস নেওয়ার।"
কিন্তু না! বেশিরভাগ সন্তানই নিজের মা বাবাকে এই স্পেসটুকু দেয়না। আমি কী পেলাম? আমার জন্য মা বাবা কী কী করলো? কী করলোনা? অন্যদের মা বাবা কতকিছু করেছে তাদের জন্য? আমার কতোটা স্পেস চাই" এসব নিয়েই তারা ভাবে। যদিও আজকাল ধারণা কিছুটা বদলাচ্ছে মুভিগুলোর জন্য। বেশ কিছু ভালো মুভি তৈরী হচ্ছে সমাজকে শিক্ষা দিতে, আগামী প্রজন্মকে শিক্ষা দিতে।
সন্তানদের উদ্দেশ্যে আমার বক্তব্য যে তারা হৃদয় দিয়ে বুঝতে চেষ্টা করুক মা-বাবার সম্পর্ক কেমন? মা- বাবা শুধুমাত্র তার জন্য স্যাক্রিফাইস করে যাচ্ছে না তো? মা-বাবার ঘুমের ওষুধ লাগে না তো? মা- বাবা কোনো জীবন্ত লাশ নয় তো শুধুমাত্র তার জন্য? মা বাবা চাইলে নতুন করে জীবন শুরু করতে পারতো, নতুন কারো বুকে আশ্রয় নিতে পারতো কিন্তু তা না করে যারা শুধুমাত্র সন্তানের কথা ভেবে জীবন্ত লাশ হয়ে বেঁচে রইলো সেই মা বাবাকে সোনার কাঠি ছুঁইয়ে বাঁচিয়ে তোলার দায় সন্তানের নয় কী?
শেষ বয়সে মা বাবার ওষুধ আনা বা খাবার জোগানোর কথা ছেড়েই দিলাম। বৃদ্ধাশ্রমের দৌলতে মা বাবা ওটুকুও আশা করেনা আজকাল। জানে জীবন চলে যাবে, ওটাকে দ্বিতীয় সন্তান বা আশ্রয় ভেবেই নিয়েছে বহু আধুনিকমনস্ক মা বাবা।
শেষ বয়সের কথা এখানে আমি বলছিনা, বলছি কষ্টকর জীবন নিয়ে চলাকালীন অবস্থার কথা।
যুগ বদলাচ্ছে, সমাজ বদলাচ্ছে বদলাচ্ছে চিন্তা ভাবনা আদব-কায়দা। সন্তানও খুঁজে নিচ্ছে নিজের প্রয়োজনীয় সঙ্গীটিকে, সেক্ষেত্রে সেও বলছে -"আমার জীবন আমি আমার মতো করে বাঁচবো, আমার একটু স্পেস চাই।" শুধু চাই বলার অধিকার নিয়ে জীবন্ত মৃত্যুবান হয়ে থাকলে চলবে সন্তানদের ? এতো আধুনিক হচ্ছে আর এইটুকু না বুঝলে হয় কীভাবে? মা বাবারও স্পেস দরকার। ওদেরকে একটু খোলা আকাশ দিতে হয়। তারাও বলুক -"প্ৰিয় মা বাবা,তোমরা একটু নিজের মতো করে বাঁচো, বাঁচার অধিকার তোমারও আছে। আমি সন্তান, জীবন্ত কোনো মৃত্যুবান নয়।"