লোকায়ত জাগগান
ভূমিকা:- জাগগান ভারতের পশ্চিমবঙ্গ,অসম এবং বাংলাদেশের প্রচলিত একপ্রকার লোকসংগীত। অসমের ধুবড়ী জেলা পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি ও কোচবিহার জেলা এবং বাংলাদেশের দিনাজপুর পাবনা রংপুর জেলায় এই গান বিশেষ করে শোনা যায়।
ফসল ঘরে তোলার পর কৃষকদের অবসর যাপন। কৃষকরা তখন জাগগানের আয়োজন করেন। দর্শক শ্রোতারাও সারারাত জেগে খুব আনন্দের সহিত বিভোর হয়ে গান উপভোগ করেন।
জাগগানের নামকরণ:- সারারাত জেগে গান করা হয় বলেই হয়ত গানের নামকরণ প্রতিভাত হয়। আবার অন্যভাবে বললে বলা যায়,জাগগান গাওয়ার সময় মূল গায়ক চামর হাতে ধরে গান করেন। দোয়ার'রা মন্দিরা বাজিয়ে গানের ধুয়ো ধরেন। এই গানের দ্বারা কামকে জাগরিত করা হয় বলে এই গানের নাম 'জাগের গান' বা 'জাগগান' হয়েছে। আলকাপ গান,ঘাটু গান ইত্যাদিও সারারাত ধরে পরিবেশিত হয়ে থাকে,তবে সেগুলোকে জাগগান বলা যাবে না। এই গানের নামকরণে বিশেষ উপলক্ষ্য ও বিষয়গুন জড়িত থাকে। তাই কোথাও কোথাও পালা আকারে পরিবেশিত হয় অর্থাৎ সবাই মিলে দলগতভাবে,তার প্রধান গায়েন দোহার নর্তক বাজনার লোক পনেরো থেকে বিশ জন সদস্য নিয়ে একটি দল গঠন করা হয়।
জাগগানের প্রকারভেদ:- জাগগান মূলত তিন প্রকার।
১) মোটাজাগ ২)কানাই ধামালি বা লীলা জাগ ৩) বীররসাত্মক
মোটাজাগ:- আদি রসাত্মক গান।এই গান বাড়িঘরে খুব একটা গাওয়া হয় না,মাঠে হয়।কারণ এই গানে ডরাই পূজার মত কিছু অশ্লীলতা থাকে।
কানাই ধামালি বা লীলা জাগ:- রাধা কৃষ্ণের লীলা রসাত্মক গান। তবে এই লীলা গান সম্পূর্ণ লোক কবিদের কল্পনা। এর সঙ্গে পৌরাণিক মূল রাধা কৃষ্ণের কাহিনীর কোন মিল নেই। দুজন বালককে রাধাকৃষ্ণ সাজিয়ে একজন প্রৌঢ় ব্যক্তিকে 'বড়ায়ি' সাজিয়ে এগুলো অভিনীত হয়। 'পন্ডিতরাজ' নামক জনৈক সংগ্রাহক তার পালা সংকলনে এগুলোকে 'রতিরাম' নামক জনৈক কবির রচনা বলে উল্লেখ করেছেন। তবে সুশীল কুমার ভট্টাচার্য এই গানগুলির রচনা বৈষম্য পর্যবেক্ষণ করে এগুলো একাধিক কবি'র রচনাবলী বলে মত প্রকাশ করেছেন।
বীররসাত্মক:-সুশীল কুমার ভট্টাচার্য এক জমিদারের পৌরুষ বর্ণনাত্মক একটি বীর রসাত্মক গান সংগ্রহ করেছেন।গানটি এরূপ:-
সে কঠিন বুক দেখিয়া, শত্রুর শুকায় মুখ"
জাগগানের বিষয়:- জাগগানের বিষয় মানব প্রেম,যা প্রধানত রাধা কৃষ্ণের রূপ'কে প্রকাশ করা হয়। যে গান খন্ড আকারে আবার পালা আকারেও পরিবেশিত হয়। অর্থাৎ সবাই মিলে দলগতভাবে তার প্রধান গায়েন দোহার নর্তক বাজনার লোক পনেরো বিশজন সদস্য নিয়ে একটি দল গঠন করা হয়। জুরি ও তবলা বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। জাগগানে নাট্যগুণ যুক্ত হওয়ায় তাতে বিনোদনের মাত্রা থাকে অধিক। রংপুরের প্রচলিত রাধা'র 'শাক তোলা' পালা গীত আকারে পরিবেশিত হয়।
যেমন,
রাধা যায় শাক তুলিতে নয়া ডালি ধরি।।
সরু কাপড়া পরছে রাধা কেবল নয়া ধোপ।
নচা-পচা শাক দেখিয়া রাধার হইল লোভ।।
বাছের বাছ তুলে রাধা ক্ষেতের ভিতর যায়া।
কোচা ভরিয়া তুলে শাক থোয় ডালি ভরিয়া"।।
এখানে নারী নামেই 'রাধা',আসলে যে কোন পল্লীবধূ।রাধা রূপক অর্থে ব্যবহার হয়েছে। এই গানে রাধা কৃষ্ণের নামের আড়ালে পল্লীর যুবক-যুবতীদের কথাই বলা হয়েছে। রাধাকৃষ্ণের পৌরাণিক গ্রন্থে 'শাক তোলার' কোন প্রসঙ্গ নেই,প্রসঙ্গ নেই 'শ্রীকৃষ্ণের মাছ ধরা' পালার। বস্তুত রাধা কৃষ্ণের রূপকে লোককবি চারপাশের বাস্তব মানব জীবনকেই চিত্রিত করেছেন। এ কারণে সাধারণ মানুষের কাছে জাগগানের আবেদন বেশি।
রাধা কৃষ্ণের পৌরাণিক কাহিনী ছাড়াও মুসলমানদের পীর কাহিনী নিয়েও পরবর্তীতে জাগগান রচিত হয়েছে। সোনারায় বা সোনা পীরের জাগ,মানিক পীরের জাগ, গাজী কালুর জাগ,ও সত্য পীরের জাগ এগুলো নিয়েও জাগগান রচিত হয়েছে।উত্তরবঙ্গের প্রচলিত সোনা পীরের একটি গান এরূপ:-
আগনড়ি পাছ করে বাতানে দিল বাড়ি
নব লক্ষ ধেনু ম'ল বিশ লক্ষ বাছুরী।
সোনাপীর উঠে বলে মানিক পীররে ভাই মেরেছি গরিবের ধন জিয়াইয়া যাই"।
মনসুর উদ্দিন 'কৃষ্ণ জাগগান'এর একটি দীর্ঘ পালা সংগ্রহ করে প্রকাশ করেছেন।যার অংশবিশেষ নিম্নরূপ:-
মা হয়ে কেন বেটায় সদা বল ননীচুর।
কেষ্ট যায় মা বিষ্ণুপুরে, যশোদা যায় ঘাটে,
খালি গৃহ পেয়ে গোপাল সকল ননী লোটে।
ননী খালো কে রে গোপাল, ননী খালো কে?
আমিত মা খাই নাই ননী,বলাই খেয়েছে।
বলাই যদি খাইত ননী থুতো আদা আদা,
তুমি গোপাল খাইছ ননী,ভান্ড করেছ সাদা।
জাগগানের উৎসব:-ফাল্গুন মাসের মদন চতুর্দশী উপলক্ষে জাগের গান প্রচলিত। মোহাম্মদ মনসুর উদ্দিন পাবনা জেলার জাগগানের উল্লেখ করেছেন। তার মতে, 'গ্রামের হিন্দু মুসলমান উভয় অংশের রাখাল বালকেরা রাতের বেলায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে জাগগান গেয়ে গৃহস্থের কাছ থেকে চাল ডাল সংগ্রহ করে পৌষ সংক্রান্তির দিন শিরনি বা প্রসাদ রান্না ভোজন করে আনন্দ প্রকাশ করে থাকে। পাবনা জেলায় শ্রীকৃষ্ণের বাল্যলীলা গোষ্ঠ লীলা বিষয়ক জাগগানের প্রচলন আছে'।
কোথাও কোথাও চৈত্র ত্রয়দশী তিথিতে পুষ্পিত অশোক বৃক্ষের মূলে কামদেবের পূজা ও চামর ব্যজন করার শাস্ত্রীয় বিধান রয়েছে। উত্তরবঙ্গে অনেক প্রগতিশীল পরিবারে এই কামপূজা অনুষ্ঠিত হয়। বাড়ির বাইরে দুচারটা বাঁশের টুকরো মাটিতে পুঁতে দুই তিনটি দীর্ঘ কাপড়ের জড়ানো বাঁশের টুকরোর ডগায় চামড় দিয়ে সেই পোতা বাঁশের সঙ্গে বেঁধে কামপূজা করা হয়। রাজবংশীরাও এই কাম পূজায় অংশ নেন। তবে তাঁরা কিছু অশ্লীল শব্দ এড়াতে লোকালয় থেকে একটু দূরে কোন মাঠে গিয়ে এই পূজা করেন। পূজা উপলক্ষে গান হয় জাগের গান।
জাগগানের শেষকথা:-রাধাকৃষ্ণের পৌরাণিক কথায় 'শাক তুলার' যেমন কোন প্রসঙ্গ নেই অনুরূপভাবে প্রসঙ্গ নেই 'শ্রীকৃষ্ণের মাছ ধরা'র পালা। এটিও পল্লীর লোকজীবন থেকে নেয়া পল্লীর লোকেদের মনোরঞ্জনের জন্য এই পালা গান। উপরে উল্লেখিত স্থান ছাড়াও জাগগান থাকতে পারে কারণ এক অঞ্চলের লোক অন্য অঞ্চলে গিয়ে বসবাস করতেই পারে। তবে একেক অঞ্চলে নাম স্বতন্ত্র হতে পারে। যেমন উত্তরবঙ্গে 'কৃষ্ণ ধামালি'কে 'জাগেরগান' বলে। সেখানে এই গান দুই দলের পরস্পর উক্তি প্রত্যুক্তির মাধ্যমে পরিবেশিত হয়। রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা ছাড়াও পীর কাহিনী চৈতন্য লীলা ও স্থান পায়। প্রেম মূলক ভাবনির্ভর জাগগানে সাধারণ অশ্লীলতার গন্ধ থাকা সত্ত্বেও বাস্তব জীবনের সহৃদয় স্পর্শ ও রসবোধ জাগগানকে করে তুলেছে জীবনমুখী। অপকট সহজ-সরল আঞ্চলিক ভাষা জন-চিত্তজয়ী জাগগানের ভাবময়কে সাধারণ মানুষ অপকটে গ্রহণ করেছে জীবনাতীত সুষমায়। যাপিত জীবনের প্রাত্যহিকতায় নিহিত বিচিত্র ভাব অঙ্গীভূত করে অনুভবের ঐশ্বর্যে ঋদ্ধ জাগগান প্রজন্ম হতে প্রজন্মান্তরে বয়ে চলবে সাধারণ লোকের অন্তরে,আপন মহিমায়।
ঋণ স্বীকার:- লৌকিক জ্ঞানকোষ--ওয়াকিল আহমেদ,'জাগের গান'--সুশীল কুমার ভট্টাচার্য, 'কৃষ্ণজাগগান'-- মনসুর উদ্দিন, প্রচলিত।