Jul 2, 2024

দেবব্রত চক্রবর্তী

থাপড়াইয়া দাঁত ফালাই দিমু

আমাদের পাড়ার বিকাশ কাকু, উনি নিঃসন্দেহে গুণবান এবং শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। উনাকে দেখলে আমরা মাথা নত করে চলি। উনার মধ্যে একটি অভিভাবক শুলভ আচরণ লক্ষ্য করা যায়, যা আমাদেরকে মাথা নত করে দিতে বাধ্য করে। তো সেই কাকুর সম্পর্কে একটি কথা, কাকু ব্রাহ্মন,কর্মসূত্রে পৌরহিত্য করেন বা করে থাকেন। এটাই তাঁর পেশা।কাকু সাংসারিক মনোযোগী সচেতন মানুষ। এক ছেলে আর এক মেয়ে নিয়ে চারজনের সংসার, ছেলে মেয়েদের পড়াশোনা নাচ গান তবলায় খামতি নেই লালনে। পারিবারিক ও আনুসাঙ্গিক খরচায় মোটামুটি চলে যায় মাস।উদ্বৃত্ত ইনকাম বলতে কিছুই নেই এই কাকুর পরিবার।সেই সুবাদে সৌখিন জীবন যাপন করার মতো সুযোগ কখনও কাকুর জীবনে আসেনি। খুব অল্প বয়সে পিতৃ হীন হওয়ায় নিজেই নিজেকে কাঁধে নিয়ে তৈরি করেছেন ভালোবাসা নামক সংসার। নিজেকে পাথরের মত আঘাত করতে করতে চারজনের সংসার সুখী ও সুন্দর করে তুলছেন কাকু।দুর থেকে দেখলে মনে হয় যেন বাচ্চা শিশুর মত খিলখিলিয়ে হাসছে এনাদের সংসার। পারিবারিক জীবনের বাইরের কেউ বুঝতেই পারবে না, এই সংসারেও কেউ নিজেকে পুড়িয়ে সোনামুখ হাসি ফুটিয়ে তুলেছেন। এইভাবেই নিজেকে সামনে রেখে প্রতিনিধিত্ব করেছেন নিজের সংসারের‌।
   একদিন হেলায় কিংবা বলা যায় কৌতুকের ছলে কাকু কাকিমণিকে বলেছিলেন_
 'বেশি কথা কইয়ো না, থাপড়াইয়া দাঁত ফালাই দিমু।'
  জীবনের একমাত্র সহ-সঙ্গী কাকিমনির প্রতি শ্রদ্ধবনত প্রেম,হাজারো যন্ত্রণার শাক্ষী কাকিমনির দেখছেন কাকুর জীবনে আসা দৈন্যতা, দেখেছেন নুনভাতের সকাল,একপাতে মেখে ভাত খেয়ে ও সুখে থেকেছেন দু'জনে।হয়তো রাত্রী নিশীথে একে অপরে আবদার বায়না,চোখের জল মুছতে মুছতে ছেড়ে এসেছেন জীবনে।এই উপলব্দি কাকু একা করেন নি কাকিমনি ও ভাগ করে নিয়েছেন। 
তাই হয়তো কাকুর বলা কটু কথা কাকিমনির নিজের গায়ে মাখে নি।
বেখেয়ালে,হেলায় বলে যাওয়া কথাগুলো জুড়ে যায় জীবনের সাথে কেমন করে। যেন বিক্ষিপ্তভাবে ক্রমাগত আঘাত হানে আমাদের জীবনে, আসলো কাকু কাকিমণির জীবনেও। কালক্রমে বহু বছর পর কাকিমনির সামনের দাঁত দুটো পড়ে যায়, পোকার আক্রমণ। যাই হোক বিষয়টা স্বাভাবিক দাঁত পড়া এটা প্রায় সবারই হয়ে থাকে। কিন্তু, মূল ঘটনা হলো এখন কাকিমনি এই দাঁত পরা মুখ নিয়ে কোথাও যায় না,কোনো অনুষ্ঠানে ও যেতে অস্বস্তি বোধ করেন, লজ্জা বোধ করেন। তাই কাকিমনি নিজের অপরাগ আবেগের আবদারে কাকুকে বলেছেন_ "দাঁত দুটো লাগিয়ে দওনা গো্" যার মানেটা হল আর্টিফিশিয়াল বা আমরা যাকে বলি অপারেশন করে আলগা দাঁত লাগানো। এটাই বলেছিলেন কাকিমনি। যেমনি আবদার তেমনি বায়না পূরণে ব্যস্ত আমার কাকু। ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে বুঝা গেল যে পুরনো ক্ষয় হয়ে যাওয়া দাঁতগুলো ফেলে দিতে হবে তারপর নতুন আর্টিফিশিয়াল দাঁত লাগানো হবে। সেই মতো ছোটখাটো একটা সার্জারিও করতে হবে। শহরের নামকরা দন্ত বিশেষজ্ঞ ডক্টর 'শ্রীমান নন্দদুলাল শর্মা, উনার পরামর্শে দাঁত দুটুর জন্য অ্যাপোয়েন্টমেন্ট হয়ে গেল কিছুদিন পর। টুকটাক কিছু চেক আপ করার পর আসলো সেই শুভক্ষণ।
বহুবছর পর কাকু দেখবেন দাঁত মুখে কাকিমনির চাঁদমাখা হাসি।সেই অপেক্ষায় কাকু নতুন প্রেমিকের মতো করে আদর যত্নে কাকিমনি কে চিকিৎসা করিয়েছেন। কাকিমনির জীবনে আজ আবার নতুন দাঁত আসার সময়, নতুন দাঁত লাগানোর দিন। 
এমনই ঘন চৈত্র মাসে কালবৈশাখীর আবহে এক দ্বৈব প্রেমিক যুগল হাতে হাত রেখে, আঙুলে আঙুল চেপে বিনা আড়ম্বরে দাঁত দুটো লাগিয়ে ঘরে ফিরলো।আজ নব দম্পতির মতোই খুশি কাকু কাকিমণির পরিবারটি। যেন আর মুখে ভাত খাওয়ার দিন। বিকাশ কাকু আবেগপ্লুত ভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজে ঘরে গিয়ে পকেটে হাত দিয়ে দেখল সর্বমোট খরচ বাইশ হাজার টাকা। এমনই হেঁয়ালিপনায় বলে দেওয়া কথা 'থাপরাইয়া দাঁত ফালাই দিমু' এই কথাটির মূল্য গিয়ে দাঁড়াল ২২ হাজার টাকা। এইভাবে জীবনে লক্ষ লক্ষ টাকা আমরা হেলায় বল ফেলি,ভাবি না একটুকুও। ভাবা যায়? হিসাব করলে দিন শেষে আমরা গরিব হচ্ছি কাকার মত।