May 30, 2024

মিঠুন রায়

প্রবন্ধ 

শতবর্ষে গল্পকার বিমল চৌধুরী 

বাংলা সাহিত্য চর্চার ইতিহাসে অরণ্যদুহিতা ত্রিপুরা একটা বিশেষ স্থান করে নিয়েছে । স্বাধীনতার উত্তরকাল থেকেই কাব্যচর্চার পাশাপাশি ছোটগল্প রচনায়ও রাজ্যের লেখকদের অবদান নেহাত কম নয় । রাজ্যের প্রথিতযশা গল্পকার বিমল চৌধুরী এমনই একজন , যার অনবদ্য রচনায় শিল্প- সুষমার ছাপ বরাবরই পরিলক্ষিত হয় । এ বছর সাহিত্যিক বিমল চৌধুরীর জন্মবর্ষ। বাংলা গল্পের ভগীরথ বিমল চৌধুরীর লেখালেখি শুরু বলতে গেলে চল্লিশের দশকে । পাঠকের দরবারে তিনি রেখে গেছেন বাংলা গল্পের অপূর্ব সৃষ্টি সাম্ভার । গল্পকার বিমল চৌধুরীর জন্ম ১৯২৩ সালের ২৭ জুলাই বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার গেন্ডারিয়া গ্রামে । পিতা কামিনী ভূষণ চৌধুরী ও মাতা কিরণ শশী দেবী । ঢাকার জুবিলি স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন হবার পর কলকাতার আয়ুবেদ সারস্বত মহাবিদ্যালয় থেকে শিক্ষাপর্ব শেষ করেন । তাঁর কৈশোর সময়ে ঢাকার অন্যতম সাপ্তাহিক সোনার বাংলা ' যে কাগজে বুদ্ধদেব বসু লিখতেন , সেই কাগজে তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশ পায় । ১৯৪০ সালে তিনি আগরতলায় বসবাস শুরু করেন । ঐ সময় তিনি রাজ্যের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় বেশ কিছু কবিতা লেখেন । একসময় নবজাগরণ পত্রিকায় প্রথম তাঁর লেখা গল্প প্রকাশিত হয় । আসলে চারের দশক থেকে নয়ের দশক মধ্যবর্তী প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে তিনি প্রচুর গল্প লিখেছেন , অনেক কবিতাও লিখেছেন । একসময় “ তোরে নাহি করি ভয় ” গল্পের জন্য তাকে রাজরোষে পড়তে হয়েছিল । তাঁর লেখা “ জাগরণ ” অন্যতম সেরা গল্প । “ হিজল খালের কান্না ” , “ ভগীরথের তালা ' অথবা ' সোয়াদ ' গল্পগুলি আজকের দিনেও পাঠককে নতুন করে ভাবতে শেখায় । ১৯৪৬ সালে নবজাগরণ পত্রিকায় তাঁর প্রথম গল্প ' একটি কাহিনি' প্রকাশ পায়।১৯৪৯ সালে চিনিহা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়  তার প্রথম প্রবন্ধ চাকলা জমিদারি । বিমল চৌধুরী লেখক জীবনের শুরু থেকে যতগুলি গল্প

লিখেছেন , তাদের মধ্যে চরিত্রগত পার্থক্য প্রচুর । এমনকি একই সময়ের দুটি লেখা তাঁর আলাদা মেজাজ , আলাদা ধর্ম আলাদা প্রকৃতি , ফলে পাঠকের কাছে লেখক চরিত্র অনেকটা অস্পষ্ট মনে হয় । একসময় মানুষ পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যা সম্পাদনা করেন । একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে চার দশকের মাঝামাঝি সময়ে সমগ্র বাংলা গল্প সাহিত্যের ক্ষেত্রে বিষয় আঙ্গিক ইত্যাদির ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছিল । গল্পের পটভূমি , চরিত্র সংলাপের খেত্রেও লেখকগণ প্রচলিত পথ থেকে অনেকটা ভিন্ন পথে সরে এসেছিলেন । বিমল চৌধুরী মূলত ঐ সময়ের লেখক । রাজন্য শাসিত পার্বতী ত্রিপুরায় তিনি মূলত স্থানীয় মানুষের সুখ - দুঃখ , প্রেম ভালোবাসা , মানুষের প্রতিবাদকে ভাষায় রূপ দিয়েছেন । ১৯৭৩ ইং সালে আগরতলা পৌণমী প্রকাশনী থেকে বিমল চৌধুরীর প্রথম গল্পগ্রন্থ “ মানুষের চন্দ্রবিজয় ও তার নাম " প্রকাশিত হয় । এ গ্রন্থে জাগরণ , অনুভব , বনস্পতির মৃত্যু , আলোর পরে দেয়াল , অন্যস্বাদ সহ বেশকিছু গল্প স্হান পেয়েছে । 

 এ গ্রন্থের ভূমিকায় লেখক লিখেছেন- গল্প মূলত প্রতীতির সমগ্রতা ও লেখকের ব্যক্তিমানসের তাৎপর্যময় দিক বলেই জীবনের চলস্রোতে একই প্রসঙ্গ নানাভাবে প্রতীকীগত হয়ে চলেছে । শুধুমাত্র পরিবর্তনশীল সমাজ জীবনের কথা ও বৃত্তান্তই শেষ কথা নয় , গল্প সাহিত্য লেখকের অন্তর্নিহিত কল্পনামিশ্রিত মানসিকতার ও শিল্পবিন্যাস । এই বিন্যাসকে কোনো সংজ্ঞা দিয়ে বেঁধে দেওয়া সম্ভব নয় বলে গল্পের রসাস্বাদন পাঠকের রুচির উপর নির্ভরশীল । 

  চারপাশের প্রকৃতি , মানুষ ও তার অন্তর বহি : সংঘাত বহমান জীবনের খণ্ডচিত্র সমূহ গল্পের উপকরণ । সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষের ব্যক্তি জীবনের অর্থনৈতিক সমস্যাকে তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন “ মানুষের চন্দ্রবিজয় ও তার নাম "গল্পে । গল্পটি ১৯৬৯ সালে লেখা । আবার দেশভাগের যন্ত্রণা , হিন্দু - মুসলমানের সংঘাত সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে দৃষ্টান্ত , পিপীলিকা উপখ্যান , হিজলখালের কান্না ইত্যাদি গল্পে । ১৯৯৭ সালে প্রকাশ হয় তাঁর লেখা অন্যতম গল্প সংকলন ভগীরথের তালা । মূলত ১৯৬১ ১৯৯৪ সালে পর্যন্ত লেখা ১৮ টি গল্প স্থান পেয়েছে এই সংকলনে । এই সংকলনে সদর উত্তরের চা বাগানের পটভূমি নিয়ে তৈরি গল্প সোয়াদ স্থান পেয়েছে । ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত হয় তৃতীয় গল্প সংকলন “ নায়কের জন্ম ” । প্রকাশক প্রত্যাশা পাবলিকেশন । এ সংকলনে ২৪ টি গল্প স্থান পেয়েছে । ভূমিকা লিখেছেন অধ্যাপক ড.শিশির কুমার সিংহ । এ সংকলনে রয়েছে “ ত্রিপুরা ৮০ ” , “ আর এক সমুদ্র ” , “ অন্য ক্ষুধা " , " বৃষ্টির স্বাদ " " এক চিতল হরিণ " । গল্পগুলোর মধ্যে অনেকটা নতুনত্ব আনার চেষ্টা করেছেন লেখক ।   অন্য ক্ষুধা গল্পে লেখক তুলে ধরেছেন সমাজে অবহেলিত এক ব্যক্তির দিনলিপি । সারাদিন পান বিক্রি করে কাটে যার জীবন । এ মানুষটির মনে আছে অনর্থ ক্ষুধা । একসময়ের সহপাঠী সুব্রত এসে হাজির হয় আচমকা তার জীবনে ।নানা প্রান্তের মানুষের কাহিনী শুনে উধাও হয়ে যায় সে।তারপর ঐ অবহেলিত মানুষটির জীবনে আসে নানা পরিবর্তন । সবমিলিয়ে গল্পটিতে এসেছে অন্য অনুভূতি । লেখালেখির স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন ত্রিপুরা রাজ্যে প্রথম রবীন্দ্র পুরস্কার । আসলে বিমল চৌধুরীর গল্পে কখনো রোমান্টিকতা , কখনোবা বাস্তব সামাজিক অব্যবস্থার প্রতিবাদের বিষয় স্থান পেয়েছে । মানুষ ও মনুষ্যত্বের সর্বাপেক্ষা তিনি আজীবন কলম চালিয়েছেন। 

 ২০০১ সালের ৬ অক্টোবর ৭৯ বছর বয়সে বিমল চৌধুরী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

পরিশেষে বলা যায় , কথাসাহিত্যিক বিমল চৌধুরী তার গল্পের আঁটোসাঁটো গাঁথুনিতে বাংলা ছোটগল্পকে শক্তিশালী করেছেন । রোমান্টিক মানসিকতার পাশাপাশি মানবিক আবেদন ফুটে উঠেছে তার লেখা গল্পগুলিতে । তাইতো তিনি একজন ব্যতিক্রমী গল্পকার । জন্মশতবর্ষে তাঁর রচনাবলী পুনঃপাঠ জরুরি ।