Mar 29, 2022

নিমাই বারুই

মানুষ মানুষের জন্যে

সময় বড় রহস্যময়।সময় অদ্ভূত রকমের বাস্তব এবং কঠিন।আর এমনই এক অদ্ভুত সময়ে দাঁড়িয়ে বর্তমান বিশ্বের মানব জাতি। চারিদিকে কেবল সংকট আর সংকট।মানব জাতির জীবন, জীবিকা, সামাজিক, অর্থনৈতিক, মানবিক মূল্যবোধ সর্বত্র এক অদ্ভুত সংকটে বিরাজমান।আর এই সংকট থেকে উত্তরণের সঠিক কোন দিশা এখনো মানব জাতির কাছে অধরা। মানুষ আজ দিশেহারা। তবে আশার কথা হলো যে একশ্রেণীর মহামানবেরা রাত দিন এক করে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, পৃথিবীর মানব জাতি কে মহাসংকট থেকে বাঁচাতে। যদিও এরই মধ্যে বিশাল ক্ষতি হয়ে গেছে এবং এখনো হচ্ছে।

শুরুতেই সবাই নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন যে আমি এখানে করোনা বিষয়ক সংকটের কথাই বলতে চাইছি।এই অদ্ভুত পরিস্থিতি কেন কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে তা অবশ্য আমার আলোচ্য বিষয় নয়। আমরা দেখছি এই পরিস্থিতিতে মানব নামক জাতির চরিত্রের বিচিত্র রূপের বহিঃপ্রকাশ এবং পরিচিতির।এই প্রসঙ্গে বিখ্যাত একটি গানের কলি মনে পড়ে যায় " মানুষ মানুষের জন্য--"।

সু- সভ্য মানব জাতির সমাজে এটাই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তব টা কী দেখছি! মানব জাতির চরম সংকট কে কাজে লাগিয়ে মানুষ মানুষকে নির্মম ভাবে শোষণ করছে,নির্যাতন করছে,নির্দয় ভাবে শাসন করছে। মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের সম্পদের পরিমাণ এভারেস্ট এর চূড়া স্পর্শ করতে চাইছে। অন্যদিকে লক্ষ্য কোটি মানুষ সব হারিয়ে মৃত্যুর মিছিল কে দীর্ঘায়িত করছে।

আবার এটাও দেখছি অসহায় বিপদাপন্ন মানুষদের সাহার্যার্থে কিছু মানুষই আবার এগিয়ে এসেছে। কিন্তু তাদের মধ্যে ও ভাবনার অনেক রকমের রকম ফের রয়েছে। দশ জন দাতা মিলে একজন অসহায় মানুষ কে একটা পাউরুটি দিয়ে সোস্যাল মিডিয়াতে ছবি পোস্ট করতে দেখি। আবার এও দেখি কেউ কেউ নিজের সর্বস্ব দান করে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে।কী বিচিত্র এই মানব জাতি!

সাহিত্য সংস্কৃতি এবং সেবামূলক কাজের সঙ্গে জড়িত থাকার দৌলতে , মানুষ এবং মানব সমাজের বিচিত্র সব রূপ এবং চরিত্রের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ আমার হয়েছে।আর এই দৌলতেই আজ কলম হাতে নিলাম। ইদানিং কালে সমাজে ' বিশিষ্ট সমাজসেবী' নামে একটি শব্দের বেশ প্রচলন ঘটেছে। কোন ব্যাক্তির  নামের আগে বিশেষণ হিসেবে প্রায়সই এর প্রয়োগ হচ্ছে।আর এতে এই বিশেষণ শব্দটির যেমন অবমাননা করা হচ্ছে তেমনি এর প্রতি একটা আতঙ্ক ও ছড়াচ্ছে। আমার এই কথার পেছনে দুটো উদাহরণ দিচ্ছি, তাহলেই ব্যাপারটা পরিস্কার হয়ে যাবে। আমাদের অতি আপন কয়েকজন সমাজসেবী মহামানবের নাম এই প্রসঙ্গে আসতেই পারে।যেমন স্বামী বিবেকানন্দ,রাজা রামমোহন রায়,ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর ,মাদার টেরেসা প্রমূখ ‌। এমন বিশিষ্ট সমাজসেবী  বা সমাজ সংস্কারক পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন মানব সমাজে আবির্ভূত হয়েছেন একাধিক সময়ে। আর ঐ মহান সমাজসেবী মহামানবেরা ,মানব জাতির জন্য যে সেবামূলক কাজ করে গেছেন,তার দৌলতেই আমরা আজ সুসভ্য মানব জাতি।

আমি জানিনা তাঁদের নামের আগে যে বিশেষণ টি ব্যবহার করা হয়ে আসছে, সেই বিশেষণ টি এখনকার সময়ে কার বা কাদের নামের আগে ব্যবহার করা যায় বা আদৌ যায় কিনা ! কিন্তু অহড়হ তা করা হচ্ছে।এ ব্যাপারে বিদ্ব্যজন দের প্রতি আহ্বান রইলো এই ব্যাপার টা আপনারা একটু ভেবে দেখবেন। তবে হাঁ পাশাপাশি আরো একটি শব্দ বা বিশেষণ নিয়ে ভাবা যেতে পারে,সেটি হচ্ছে সমাজ কর্মী।যারা সমাজের জন্য কাজ করছেন তাঁদের কে সমাজ কর্মী বলা যেতেই পারে।কেউ ব্যক্তি স্বার্থে সমাজের জন্য করেন, আবার কেউ বা বৃহৎ স্বার্থে সমাজের জন্য কাজ করেন।

এই দুটো ক্ষেত্রে আমরা একটি করে উদাহরণ দিয়ে বলতে পারি যেমন, একজন কৃষক যখন মাঠে কৃষি কাজ করে ফসল ফলান উনি কিন্তু তখন সমাজের কথা ভাবেন না। নিজের পরিবারের সার্বিক সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভেবেই উনি জমিতে ফসল ফলান। কিন্তু আমরা দেখি কী ! যে কৃষকের উৎপাদিত ফসল থেকেই সমাজের অন্যান্য অংশের মানুষরা সরাসরি উপকৃত হচ্ছেন। সুতরাং এই দিক দিয়ে কৃষক সমাজ মানব জাতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবক সমাজ। কারণ কৃষি বা কৃষিজ ফসল উৎপাদন না হলে মানব জাতির অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে যাবে।এটা একটা উদাহরণ দিলাম।এমন অসংখ্য উদাহরণ আমাদের সমাজে বিদ্যমান। বিদ্যা দান কারি একজন শিক্ষক থেকে শুরু করে একজন সফাই কর্মী সবাই সমাজের কাজ করছেন।

আবার দ্বিতীয় ক্ষেত্রে আমরা উদাহরণ হিসেবে যদি বলি,জনগন বা দেশ সেবার নাম করে যারা রাজনীতি বা দেশের শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করতে আসছেন তাঁরা ও কিন্তু নিঃস্বার্থ ভাবে কিছু করছেন না।কেন না বিধানসভা বা লোকসভা নির্বাচনে নির্বাচিত সমাজ সেবা করতে আসা প্রতিনিধি রা ও কিন্তু অন্যান্য সরকারী কর্মীদের মতো মাসিক বেতন বা ভাতা নিচ্ছেন। শুধু তাই নয় পরবর্তী সময়ে অবসর কালীন ভাতা ও পান।সেই সঙ্গে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি রা অন্যান্য অনেক রকমের রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও পেয়ে থাকেন। অবশ্য বলা যেতেই পারে যে উনারা জনগণ তথা রাষ্ট্রের জন্য অনেক কিছু করতে এসেছেন যখন তখন বিনিময়ে কিছু পেতেই পারেন।

তাহলে উনাদের কীভাবে আমরা সমাজসেবী বলে মেনে নেবো ! কই প্রভু যীশু, ভগবান বুদ্ধ কিংবা মহাপ্রভু চৈতন্য দেব মানব সেবার বিনিময়ে কারো কাছ থেকে  কিছু নিয়েছেন বলে তো শুনিনি ! 

প্রসঙ্গত আসতেই পারে যে তথাকথিত ধর্মীয় গুরু বা পূজারীরা ও তো মানবের কল্যাণে নিবেদিত প্রাণ। তাহলে তাঁরা সমাজসেবী কি না ! যুক্তির বিচারে উনারা ও মানব সেবী বা সমাজ সেবী হতে পারেন নি। কেননা তথাকথিত ধর্মীয় গুরুরা ও কিন্তু শিষ্য দের দীক্ষা দেওয়ার বিনিময়ে দক্ষীণা বা প্রণামী নিচ্ছেন।আর মন্দিরের বা বাড়িঘর কিংবা বারোয়ারী ঠাকুর পূজার পূজারীরা তো পেশাদারী। শিক্ষকের শিক্ষা মানব জীবনে বা সমাজ কল্যাণে অপরিহার্য্য নিঃসন্দেহে। কিন্তু তথাকথিত ধর্মীয় গুরুর দের দীক্ষা বা মন্দির মসজিদ বা গির্জার পূজা প্রার্থনা মানব জীবনে কতটা জরুরি ! ভাববার বিষয় নিঃসন্দেহে, কেননা যুগ যুগ ধরে ধর্ম আর পূজা কে উপলক্ষ করে মানুষে মানুষে অসংখ্য রক্ত ক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটে গেছে।আজ ও তার ব্যতিক্রম কিছু নয়।

তবে নিশ্চিত ভাবেই এটা বলা যায় যে সমাজ সেবা বা মানব সেবা মানবের একটি পরম ধর্ম। কারণ যুগ যুগ ধরে আমরা জেনে আসছি যে " শুন হে মানুষ ভাই / সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই " । আমরা এটা ও জেনে আসছি যে " বহু রূপে সন্মুখে ছাড়ি কুথা খুঁজিছ ঈশ্বর / জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর ।"

সত্যিই তো, ঈশ্বর নামে কেউ আছেন কী নেই এই বিতর্কে না গিয়ে, ঈশ্বরের সৃষ্টি শ্রেষ্ঠ জীব মানুষের সেবাই হোকনা আমাদের পরম ব্রত! বর্তমান অদ্ভুত সংকট ময় সময়ে আমরা তো জীবন দিয়ে উপলদ্ধি করলাম, যে মন্দির মসজিদ বা গির্জা তে সর্বশক্তিমান বলে কেউ নেই! সভ্যতার চরম সংকটের সময়ে অসহায় মানুষের পাশে কেউ দাঁড়ায় নি। উপরন্তু বিপদ গ্রস্থ মানুষের জন্য প্রত্যেকের দ্বার ছিল বন্ধ। সুতরাং ঘুরেফিরে আবার সেই মহান সঙ্গীত শিল্পীর কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে বলতেই হচ্ছে " মানুষ মানুষের জন্যে---"