Aug 31, 2023

মিতা রায়

মায়া

রান্না ঘরে ঝন্ ঝন্ শব্দে ছুটে আসে শোভন।মাত্র অফিস থেকে ফিরেছে।শব্দে শোভন বুঝে নিলো,মিঠুর হাতেই কাপ-ডিশ কিছু একটা ভেঙেছে। শোভন কিচেনে গিয়ে দেখে,মিঠু দাড়িয়ে কাপঁছে!বাচ্চা মেয়ে প্রায়ই এমন ঘটে থাকে।শোভন,মিঠুর মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বলে,ভয় পাচ্ছিস কেন? কিচ্ছু হবে না।আয় কাছে আয়।....

শোভন বা মালা মিঠুকে কিছুই বলে না। বকা ঝকা তো দূরের ব্যাপার! কাজ করতে গেলে টুকটাক ভাঙবেই। সে'টা তো মালার হ্মেত্রেও হতে পারতো। 

যা,টি ভি দেখ মিঠু।

মালা তিন্নিকে পড়াতে নিয়ে বসেছে। এক ফাঁকে উঠে গিয়ে মিঠুকে সাহস জুগিয়ে এলো। আয় তুই আমার ঘরে এসে বোস।ঠিক যেমন আদর করে মেয়ে তিন্নি কে,সে ভাবেই মিঠুকে আদরে কাছে টেনে নিল মালা।......

শোভন-মালার একমাত্র মেয়ে তিন্নি। তিন্নিকে দেখে রাখা,ওর সঙ্গে খেলা করা,এরজন্যই মিঠু বহাল। তাদের সংসারে তিন্নির সংগেই বেড়ে বেড়ে উঠছে মিঠু।প্রায় দু'বছর হয়ে গেছে মিঠু এ বাড়িতে। মিঠুকে পাওয়া সেও এক মজার ব্যাপার!...... 

শোভনরা তখন উদয়পুর থাকত।পুজোর আগে প্রতিবছরই দৈনিক পেপার,এক্সট্রা বই পত্র ওজন দরে বিক্রি করে শোভন।প্রতিবছরই একজন মধ্যবয়স্ক লোক পুরানো পএিকা, শারদীয়া সংখ্যা ইত্যাদি কিনে নিয়ে যায়।বেশ ভালো জানাশোনা হয়ে গেছে। মালা,মাঝে মধ্যে, চা,সরবত্ করে খেতে দেয়।সেই একই নিয়মে।......

(২)

মালা- শোভন দুজনেই যার যার অফিস, স্কুলে চলে যায়।কয়েকটি বছর কাজের ঠিকে মেয়েটাকে বলে কয়ে টাকা বেশি দিয়ে পাঁচ সাত ঘন্টার জন্য রেখেছিল। এখন সেই মেয়েটি আর কাজে নেই।তার বিয়ে হয়ে গেছে। তো শোভন-মালার মাথায় চিন্তা, কি করে তিন্নি কে একা রেখে যাওয়া!!..... 

দিন দিন তিন্নি বড় হয়ে উঠছে। ওর খেলার সঙ্গী চাই, নয়তো শোভন কিংবা মালাকেই সঙ্গ দিতে হয়। মাঝে মধ্যে ক্লান্ত হয়ে ফিরে দু'জনই।তখন ঠিকঠাক সামাল দিতে কষ্ট হয় তাদের!

তো একদিন শোভন, সেই পএিকাওয়ালাকে বললো,আমাকে একজন মেয়ে বা অল্প বয়সী বউ দিতে পারবে?সারাদিন ঘরে থাকবে। টুকটাক কাজকর্ম করবে, ফাই-ফরমাস খাটবে,আর তিন্নির সংগে খেলাধুলো করবে। শোভন কাকুতি মিনতি করে বলে,একটু দেখো আমার জন্য। লোকটি বললো,হ্যাঁ বাবু,আমার একটি ভাতিঝি আছে। ওই দাদার তিনটিই মেয়ে। তো ভালো বাড়ি পেলে একজনকে খাওয়া - পরায় থাকতে দিয়ে দেবে। লোকটি বললো,ঠিক আছে বাবু,আমি কথা বলে জানাবো।.....

কয়েকদিন পর একদিন  পএিকাওয়ালা,মিঠু ও তার বাবাকে নিয়ে আসে। কথাবার্তা বলে,মিঠুকে রেখে গেল তার বাবা। শোভন তার বাবার হাতে আগাম পাঁচশ টাকা দিল। মিঠুর বাবা,শোভন কে পায়ে ধরে প্রণাম করলো। আর মেয়েকে বলে গেলো,"বাবুদের মন জুগিয়ে চলবি----আর ছোট্ট বোনটির সঙ্গে খেলা করবি"। বাবা চলে যাওয়াতে মিঠুর চোখে  জল গড়িয়ে পরে!.....

মালা কাছে ডেকে নিয়ে বললো,কাঁদিস না,দেখ বোনটা তোর হাত ধরে টানছে.....মিঠু কান্না ভেজা চোখে হাসি দিলো!

(৩)

তিন্নি আর্ট পেপার নিয়ে এসে বললো,"দিদি তুমি একটি ঘর আঁকবে, আর আমি গাছ আকঁবো। মিঠু ঠিকঠাক একটি গ্রাম্য পরিবেশের ঘর আঁকলো, তিন্নি জিজ্ঞেস করলো, কার ঘর এটি? মিঠু বললো,"আমাদের ঘর"!মা,বাবা,দিদি থাকে এখন। আর আমি তো তোমাদের ঘরেই থাকি।.....তিন্নি বললো,হ্যাঁ, তুমি কিন্তু এখন থেকে এখানেই থাকবে।তোমাদের বাড়ি যাবে না। আমার সঙ্গে খেলবে,পড়বে কেমন? মিঠু খুশিতে মাথা নারে.....

মালা, শোভন  কতহ্মনই বা সঙ্গ দিতে পারে মেয়েকে বাবা-মা হিসেবে! রবিবার ছুটি  হলেও ব্যাস্ততা সে দিন আরও বেশি। সভা-সমিতি, মিটিং এই সব করতে করতে কখন যে দিন রাত চলে আসে বুঝতেই পারে না দু'জন। যদিও বিকেলে তিন্নি ও মিঠুকে নিয়ে 

প্রতি সপ্তাহেই পার্কে নিয়ে যায়।দু'জনই বেশ আনন্দে,হৈ হৈ রৈ রৈ,করতে করতে বাড়ি ফেরে। এই আনন্দের পরিবেশটা দেখার জন্য মালা, শোভন কতই না দিন গুনেছিল।বেশ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মালা।.....

আজকাল রাতেও তিন্নি মিঠুর সঙ্গে গল্প করতে করতে ঘুমাতে চায়।মিঠুও ভূতের গল্প,রাহ্মসের গল্প বলে বলে তিন্নিকে ঘুম পাড়ায়। পাশের ঘর থেকে শোভন শুনতে পায়,তিন্নি ঘুম জড়ানো গলায় জিজ্ঞেস করছে,বলো না মিঠুদি,তারপর, তারপর কি।হলো?......

এমন করে দিনগুলো বেশ ভালোই কাটছিল। বেশ কিছুদিন পর মিঠুর বাবা ফোন করে বলে,মিঠুর মা'র শরীর ভালো নেই। মিঠুকে কয়েকদিনের জন্য বাড়ি আনতে চাই। শোভন শুনে বলে,আচ্ছা ঠিক আছে। আপনি আসুন,মিঠুকে কয়েকদিনের জন্য নিয়ে যান।ফোনের কথাটা মিঠুকে বলতে ভুলে যায় শোভন। কিন্তু মালাকে জানিয়ে শোভন অফিস চলে যায়।

অফিস গিয়ে শোভন ভাবে, মিঠু চলে গেলে তো তিন্নি একা হয়ে যাবে!কি ভাবে তিন্নি থাকবে! মালাকে ছুটি নিতে হবে।প্ল্যানটা মাথায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই ভেবে নেয়.....না,মিঠুকে বাড়িতে দেওয়া যাবে না!

ফোন করার চারদিন পর মিঠুর বাবা আসে বিকেলের দিকে।অফিস ফেরত শোভন এসে দেখে মিঠু কান্না করছে। মালাও সেই সময়ে বাড়ি ফিরে আসে। ফ্রেশ হয়ে মালা, দু'জনের জন্য চা করে আনে। চা খাওয়ার পর মিঠুর বাবা বলে-আজ মিঠুকে নিয়ে যাবো, ওর মা হাসপাতালে ভর্তি আছে.......শোভন উত্তরে বলে-থাক না কয়েকটি দিন।সামনেই পুজো পুজোর পর না হয় যাবে.....নিয়ে যান,মাকে দেখিয়ে আবার দিয়ে যাবেন..... যদি আপনার অমত না থাকে।ওর মার খবরাখবর আমি ফোন করে জেনে নেবো।মিঠু কথা বলবে না হয় মাঝে মধ্যে ওর মা'র সঙ্গে।

(৪)

মিঠুর বাবা চলে যাওয়ার পর,শোভনের একটা চাপা কষ্ট হচ্ছে বুকে!মিঠুর বাবার আকুতি শোভনকে দগ্ধ করছে! মিঠুর মা'র যদি অঘটন কিছু ঘটে যায়!

শোভনের মাথা ঝিম্ ঝিম্ করছে। নিজের প্রতি ধিক্কার আসছে!....নাহ্ কাজটা ঠিক হয় নি!অমানবিকতার পরিচয় প্রকাশ পেলো। শোভনের তাই মনে হচ্ছিল!..... শোভন ভাবছে,

নাহ্ কাল আমি নিজে গিয়েই মিঠুকে তার বাড়ি দিয়ে আসবো। ভাবতে ভাবতে পাশের ঘরে এলো, এসে দেখে  তিন্নিকে জড়িয়ে, হাতে একটি তিন্নির বই নিয়ে ঘুমিয়ে গেছে মিঠু!......শোভনের মায়া হলো!

তিন্নিকে যদি, এ ভাবে অন্যের বাড়ি রেখে দিয়ে চলে আসতে হতো,তো আমার বুকটা ফেটে চৌচির হয়ে যেতো!.....

অজানা আশংকায় মন কেঁপে উঠল শোভনের!.....

মালাকে কাছে ডেকে নিয়ে বললো, কাল আমিই মিঠুকে ওর বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসবো।ওর বাবাকে বলে আসবো,কিছুদিন বাদে মা সুস্থ হলে ফের আমাদের কাছে দিয়ে যেতে! 

মালা বললো,তাই করো তবে!

(৫)

শোভন আর মালা মায়া ভরা চোখে দেখছে, মিঠু নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। মিঠুর প্রতি মায়া জন্মে গেছে..... 

ঠিক তিন্নিরই মতো.....

কখনও শোভন দগ্ধ হচ্ছে, নিজেদের স্বার্থে  মিঠুকে কি শিশুশ্রমিক বানিয়ে নিচ্ছি??......