ত্রিধারা সাহিত্য পত্রিকা

🔸🔸🔸🔸বর্ষ : যষ্ঠ ।। সংখ্যা : ২ ।। তারিখ : নভেম্বর ২০২৫ ইং🔸🔸🔸🔸

Oct 27, 2022


 

Email ThisBlogThis!Share to XShare to FacebookShare to Pinterest
Newer Post Older Post Home

নভেম্বর,২০২৫

নভেম্বর,২০২৫
এই মাসে ত্রিধারার আন্তর্জালিক কবিতা সংখ্যা প্রকাশ করতে পেরে আমরা আনন্দিত। প্রায় কুড়িটা কবিতার দেশ বিদেশের নতুন ও অভিজ্ঞ কবিদের সৃষ্টির সংকলন, একটি বহুস্বরের মঞ্চ তৈরি করেছে। নানা ভাষা, নানা অনুভূতি, নানা দৃষ্টিভঙ্গি একত্র হয়ে এই সংখ্যাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। শব্দের এই বহুমাত্রিক যাত্রায় পাঠক খুঁজে পাবেন হৃদয়ের স্পর্শ, প্রশ্ন, প্রতিবাদ এবং নিভৃত নির্জনতার নীরবতা। কবিতাই আমাদের যুক্ত করে- সময়, ভূগোল ও সংস্কৃতির সীমানা পেরিয়ে। এই সংখ্যার প্রতিটি কবিকে এবং সকল পাঠককে ত্রিধারার আন্তরিক শুভেচ্ছা। কবিতার এই পথচলা আরও দূর পর্যন্ত এগিয়ে যাক এটাই আমাদের কামনা। সম্পাদক, চয়ন সাহা।

অক্টোবর, ২০২৫

অক্টোবর, ২০২৫
বিরতির পর আবারও ফিরে এল ত্রিধারা সাহিত্য পত্রিকা— নতুন উদ্যমে, নতুন কলমে, নতুন স্বপ্নে। প্রায় এক বছর পর আমাদের এই অনলাইন সংখ্যার পুনর্জন্ম যেন এক নিঃশব্দ আনন্দের উৎসব। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পাঠকের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে সেই সাহিত্যরস, যা কাগজের গন্ধ না থাকলেও মন ছুঁয়ে যায় শব্দের সৌরভে। এই সংখ্যায় প্রায় পঁয়তাল্লিশজন কবি ও লেখক তাঁদের সৃষ্টিশীল মনন, হৃদয়ের ভাবনা আর কলমের ছোঁয়ায় ত্রিধারাকে সমৃদ্ধ করেছেন। প্রত্যেকেই তাঁদের নিজস্ব ভাষা, ছন্দ ও চেতনার ভুবনে আমাদের নিয়ে গেছেন এক বৈচিত্র্যময় সাহিত্যযাত্রায়। কবিতা, প্রবন্ধ ও গল্প বা ভাবনাগুচ্ছ— প্রতিটি লেখা যেন একেকটি সুর, যা মিলেমিশে গড়ে তুলেছে সাহিত্য নামক এক সিম্ফনি। একজন সম্পাদক হিসেবে আমি গভীর কৃতজ্ঞতা জানাই সেই সকল সৃষ্টিশীল মানুষদের, যাঁরা আবারও বিশ্বাস রেখেছেন ত্রিধারার উপর। ধন্যবাদ জানাই পাঠকদেরও— যাঁরা প্রতিবারই আমাদের শব্দের ভেলা ভাসিয়ে দেন ভালোবাসার নদীতে। সাহিত্য কখনো থেমে থাকে না— তা সময়ের স্রোতের সঙ্গে মিশে নতুন রূপে ফিরে আসে। এই পুনরাগমন সেই ধারারই অংশ। আসুন, আমরা সবাই মিলে এই সাহিত্যধারাকে আরও প্রসারিত করি, যেন শব্দ, চিন্তা ও অনুভূতির এই ত্রিধারা কখনো শুকিয়ে না যায়। – চয়ন সাহা, সম্পাদক, ত্রিধারা সাহিত্য পত্রিকা।

সম্পাদকীয়। সেপ্টেম্বর, ২০২৪ ইং

সম্পাদকীয়। সেপ্টেম্বর, ২০২৪ ইং
আমরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে কবিতা লিখি। কবিতায় গাই সাম্যের গান। আর প্রতিবাদ। কবিতা আমাদের এজমালি সম্পদ। একান্ত ব্যক্তিগত তরোয়াল। ত্রিধারা'র এবারের আয়োজন নির্বাচিত ১১ (এগারো) জন কবির কবিতায় সেজে উঠেছে। আমরা কৃতজ্ঞ আপনাদের ভালোবাসায়। এভাবেই এগিয়ে নিয়ে যাবেন প্রত্যাশা রাখি। সকলকে শুভেচ্ছা। চয়ন সাহা (সম্পাদক) রূপন মজুমদার ( সহ সম্পাদক) ত্রিধারা।।।

সম্পাদকীয়।। আগস্ট ।। ২০২৪ ইং

সম্পাদকীয়।। আগস্ট ।। ২০২৪ ইং
নদীর ঘাটে সিঁড়ি ওঠা নামার মতো আমাদের জীবন। জীবনে কিছু কিছু প্রত্যয় বিলম্বিত হলেও ভালো। সময় আর যাপনের সন্ধি ও সিন্ধু এক পর্যায়ে মিলিয়ে যায়। তারপর শুরু হয় এক নতুন পথের সন্ধান। সে পথেই হয়তো অগ্রসর হতে থাকে প্রজন্মশিশু। আমরা তার প্রতিনিধি মাত্র। আমাদের এই সংখ্যাটিও এমন এক বিলম্বিত যাপিত সময়ের কথা বলে। রাজ্যের এগারো জন তরুণের কলমে উঠে আসা মুকুল নিয়ে আমাদের এই নিবেদন। পাঠকের হাতে প্রস্ফুটিত হয়ে উঠুক। সবাইকে শুভেচ্ছা ও শুভকামনা জানাই। ত্রিধারা কৃতজ্ঞ আপনাদের ভালোবাসায়।এভাবেই এগিয়ে নিয়ে যাবেন প্রত্যাশা রাখি। চয়ন সাহা ও রূপন মজুমদার সম্পাদনা • ত্রিধারা

জুলাই, ২০২৪

জুলাই, ২০২৪
বিগত সময়গুলো আমাদের একটা প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও সামাজিক ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে দিয়ে গেছে। আমরা সেই ভয়াবহ দিনগুলোর কথা লিখতে চাইলেও পারব না। শুধু পারি মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে। সহানুভূতি ও সহমর্মিতা দিতে। এই বিপর্যয়ের দিনগুলোতে আমাদের পর পর দুমাস সংখ্যা প্রকাশ করা হয়ে ওঠেনি। তার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আপনারা এভাবেই আমাদের পাশে থাকবেন। ধন্যবাদ। চয়ন সাহা • রূপন মজুমদার । ত্রিধারা।

সম্পাদকীয়

সম্পাদকীয়
উত্তরীয় হল শরীরে পরিধানের জন্য একটি ঢিলেঢালা পোশাক। একক টুকরো কাপড়টি ঘাড়ের পেছন থেকে পড়ে উভয় হাতের চারপাশে কুঁকড়ে যায় এবং শরীরের উপরের অর্ধেক অংশ ঢাকতে পারে। উত্তরীয় শব্দটি সংস্কৃত থেকে এসেছে। উত্তরীয় হল উত্তর এবং প্রত্যয় ইয় এর সংমিশ্রণ। বেদে উত্তরীয় ঢিলেঢালা বস্ত্র বোঝায় যা শরীরের উপরিভাগের জন্য পরিধান করা হয় যেমন উপবসন, পরায়নহন ও অধিবাস, বরহতিক ও বর্ণক, উত্তরসংঘ সম্ব্যান। উত্তরীয় ছিল বৈদিক যুগে শরীরের উপরের অংশের জন্য একটি পোশাক। নিষ্ঠাবান পুরুষ এবং মহিলারা সাধারণত উত্তরীয় পরতেন শুধুমাত্র বাম কাঁধের উপর নিক্ষেপ করে, উপবীত নামক শৈলীতে"। মহাভারতেও পোশাক হিসেবে উত্তরীয়র ব্যবহারের উল্লেখ আছে। এমনকি ইন্দো-আর্য নারী-পুরুষরাও এটি ব্যবহার করত। উত্তরীয় এখনও ভারতীয় উপমহাদেশে পরিধান করা হয়। উত্তরীয় প্রসঙ্গে এত কথার মূলস্রোতে আমাদের কবি সাহিত্যিকদের মধ্যে উত্তরীয় এক প্রহসন। বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানে এই উত্তরীয় আসনে উপবিষ্টদের শোভা বাড়ায়। যে কোনো অছিলায় উত্তরীয় একটা গলায় ঝুলিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। এ অবধি ঠিক আছে। সমস্যা এর পরে শুরু হয়। একদল মানুষ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রাপ্ত এই উত্তরীয় জমা করেন সিন্দুকে। অতঃপর সুযোগে পরিস্থিতিতে অন্যদের গলায় ঝুলিয়ে দেন সেই জমা রাখা উত্তরীয় গুলো। আমাদের সংস্কৃতির এক ঐতিহ্যবাহী অংশ এই উত্তরীয় এখন আমাদের ব্যবসা আর স্বজন পোষনের বস্ততে পরিণত। না জানি এই পরিধেয় বস্ত্রটির গুরুত্ব, না জানি আচার আচরণ। শুধু বিশিষ্ট থেকে বিশিষ্টতা আর বিশিষ্ট কবিদের সংখ্যা বাড়িয়ে সাহিত্য চর্চার নামে সাহিত্য সাধনার ব্যবসায় আন্তর্জাতিকীকরণ করে বেড়াচ্ছি। প্রকৃত লেখিয়েরা রোষের মুখে পড়বেন চিন্তায় মৌনতা ধরে রাখেন। এত কিছু বলার উদ্দেশ্য নিজেদেরকে জাগিয়ে তোলা, কাউকে অপমান কিংবা হেয় করা নয়। ত্রিধারার জুন মাসের সংখ্যায় যারা লিখেছেন তাদের সকলের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। আপনাদের কলমে ত্রিধারা সমৃদ্ধ হয়ে চলেছে আর এভাবেই চলবে প্রত্যাশা করি। ধন্যবাদ চয়ন সাহা সম্পাদক, ত্রিধারা।

সম্পাদকীয় : মে,২০২৪

সম্পাদকীয় : মে,২০২৪
১৯ মে ১৯৬১ তে আমাদের পার্শ্ববর্তী রাজ্য আসামে অসমীয়া ভাষাকে সরকারি ভাষা করার প্রতিবাদে বাঙালী অধ্যুষিত বরাক উপত্যকার শিলচর শহরে আন্দোলনরত ১১ জন পুলিশের গুলিতে মারা যান। আসাম ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বাঙালীরা শিলচর রেলস্টেশনে নিহত ১১ জনের স্মরণে ১৯শে মে ভাষা আন্দোলন দিবস হিসেবে পালন করেন। বিশ্বের কোনো জাতি নিজের ভাষার জন্য বাঙালিদের মতো এত ত্যাগ স্বীকার করেনি। নিজের ভাষার জন্য, মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকারের জন্য যে প্রাণ দেওয়া যায়, নিজের সবটুকু উৎসর্গ করা যায়, সবকিছু নির্দ্বিধায় ছুঁড়ে ফেলা যায় বাঙালিরা তা করে দেখিয়েছে।আসামে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল বাঙালিদের। কিন্তু অসমীয়া ভাষাকে রাজ্যের একমাত্র দাপ্তরিক ভাষা করার প্রস্তাব ওঠে ১৯৬০ সালের এপ্রিলে, আসাম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটিতে। ফলে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় বাঙালিদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। বাঙালিরা এ প্রস্তাবের প্রতিবাদ জানালে অসমীয়া ভাষাভাষীরা বাঙালি অভিবাসীদের ওপর আক্রমণ চালায়। সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও অসমীয়াকে রাজ্যের একমাত্র দাপ্তরিক ভাষা করায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে আসামের বাঙালিরা। অসমীয়া ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদ জানাতে ১৯৬১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি কাছাড় গণসংগ্রাম পরিষদ নামে একটি সংগঠনের জন্ম হয়। সরকারের এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে ১৪ এপ্রিল শিলচর, করিমগঞ্জ আর হাইলাকান্দির বাঙালিরা ‘সংকল্প দিবস’ পালন করে। অথচ আমরা এ প্রজন্মের যারা ভাষা নিয়ে কথা বলি আমাদের ভাষার প্রতি নিজেদের কোনো সংকল্প নেই। ভাষার জন্য যারা বীরগতি প্রাপ্ত হয়েছেন তাঁদের নিয়ে আমাদের আনুষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা ছাড়া আর কিছু নেই।

সম্পাদকীয়

সম্পাদকীয়
সাহিত্যের প্রাচীনতম শাখা কবিতা। যখন গল্প উপন্যাস রচনা শুরুও হয়নি তখন থেকে কবিতার আধিপত্য। আর এই কবিতার হাত ধরেই মানুষ ছন্দকে ভালোবাসতে শেখে। শুরু হয় ছন্দের নাভি ধরে কবিতার দেহ গঠন। সেই প্রাচীন কাল থেকেই এই প্রবাহ চলে আসছে। যুগে যুগে পালাবদল হয়েছে কবিতার আঙ্গিকের। এসেছে ট্রেজেডি,বয়ান, হাস্যরস,বেদনা ইত্যাদি। এভাবে আস্তে আস্তে বিকশিত হতে শুরু করে কবিতা ও সাহিত্যের অন্যান্য শাখাগুলি। ইউরোপীয় দেশগুলোতে কবিতা রচনার ক্ষেত্রে আধুনিকতা ও সময়ের ছোঁয়া যত তাড়াতাড়ি এসেছে আমাদের দেশে তা অতটা তাড়াতাড়ি কবি সাহিত্যিকদের ছুঁতে পারেনি। এর দায় অবশ্য অনেকটা আমাদের রবি ঠাকুরের। উনার গীতিময় রোমান্টিক কবিতার ঘোরে মানুষ এত বেশি মগ্ন হয়েছিল, এর বাইরে বাংলা সাহিত্য অন্য কোন রূপ তারা কল্পনাই করতে পারতেন না এবং অনেকে চেষ্টা করলেও সফল হননি। সে থেকে সময় কে ধরে কবিতা রচনা করে যাওয়া কবিদের জন্য সংগ্রাম হয়ে উঠেছে। যা এখনো চলছে। আর আপনারা সেই সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। এই সংগ্রাম দীর্ঘজীবী হোক। রক্ত নয়,হিংসা নয়, বিদ্বেষ নয়। কমলের কালিতে ফুল ঝড়ুক। সবাইকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা ও শুভকামনা। চয়ন সাহা • সম্পাদক • ত্রিধারা

সম্পাদকীয় ।। মার্চ, ২০২৪ ইং

সম্পাদকীয় ।। মার্চ, ২০২৪ ইং
◾প্রতিদিন গুনে গুনে ৩০ কিলোমিটার পথ আসা যাওয়া। এই যাত্রাপথে শুধু জীবন দেখি। সমর্পিত জীবন। কোথাও কোনো সন্তুষ্টি নেই। এক একটা জীবন একটা করে সংগ্রামী চেতনার বাহক। তবুও ক্লান্তি নেই,অবসাদ নেই। যার যার মতো করে লড়াই করে যাচ্ছে। এই লড়াইয়ের ফলাফল প্রত্যাশিত নাও হতে পারে। তবুও লড়াই থেমে থাকে না। প্রতিদিন নতুন কিছু করার তাগিদ, নিজেকে আরও একটু পুড়িয়ে চকচক করে নেওয়ার ভাবনা। এভাবে অগ্রগতি আসে। যাপনের উত্থান আসে। অগ্রগতির মোহনায় এসে উত্থাপিত হয় সভ্যতার ইতিহাস,প্রাচীন থেকে বর্তমান পরিবর্তন সার সংক্ষেপ। প্রজন্ম ধারা এভাবেই নিয়মিত ও শৃঙ্খলিত হয়ে আমাদের দিয়ে যায় যুগসন্ধি আর যুগস্রষ্টা। আর যারা হারিয়ে যায় তাদের নামও পান্ডুলিপির কোথাও না কোথাও লিখিত হয় স্মৃতির চারণভূমির মতো করে। আপনারা সেই দিক থেকেই যুগের পরিবর্তন আনবেন,কেউ কেউ যুগসন্ধির মুহুর্তগুলো যাপনের মধ্য দিয়ে যুগস্রষ্টা হয়ে উঠবেন। নিজেদের ভেঙেচুরে নতুন করে গড়বেন। এর বেশি সমর্পণ সাহিত্যে প্রয়োজন নেই। ত্রিধারার মার্চ মাসের অনলাইন সংখ্যায় নিজেদের সৃষ্টি রোপন করে আমাদের সমৃদ্ধ করেছেন আপনাদের সকলকে শুভেচ্ছা জানাই। নিজেদের আরও ভাঙুন। গড়ুন। দিক পাল হয়ে আগামীর পথ দেখাবেন। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা রইল। চয়ন সাহা • সম্পাদক • ত্রিধারা

.

.
সম্পাদকীয় ◾একটি জাতির প্রধান হাতিয়ার হল তার মুখের ভাষা। আমাদের আবেগ, ভালোবাসা, প্রতিবাদ, সবকিছুই প্রকাশের একটিমাত্র মাধ্যম আমাদের মায়ের ভাষা। সংস্কৃতিকেও বহন করে এই ভাষাই। ইতিহাসের পাতা উল্টোলেই দেখা যায় পৃথিবীর নানা কোণে এই ভাষা রক্ষার অনেক আন্দোলনের কথা। শহীদদের রক্তাক্ত শরীরের উপর গড়ে উঠেছে যে শক্তিশালী ভাষার মিনার, আসুন অঙ্গীকার বদ্ধ হই, আমরা রক্ষা করবো, প্রহরী হয়ে বসে থাকবো মায়ের বর্ণমালার বুলি আঁকড়ে ধরে। আর আমাদের উত্তরসূরিদেরও সুস্পষ্ট জ্ঞান প্রদান করবো মাতৃভাষার। পরিশেষে যাঁদের কলমের স্পর্শে নন্দিত হয়েছে আমাদের এই আয়োজন সকলের কাছে আমরা ঋণী হয়ে রইলাম। ভাষার জয় হোক।

আমার ভাষা আমার অহংকার

আমার ভাষা আমার অহংকার
বিশেষ প্রতিবেদনঃ বাংলা ভাষার জন্য এক দারুণ ব্যাপার ঘটল সেদিন। দিনটি ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ইউনেসকোর ৩০তম অধিবেশন বসে। ইউনেসকোর সেই সভায় ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব পাস হয়। ফলে পৃথিবীর সব ভাষাভাষীর কাছে একটি উল্লেখযোগ্য দিন হিসেবে ২১ ফেব্রুয়ারি স্বীকৃতি পায়। বিশ্বের দরবারে বাংলা ভাষা লাভ করে বিশেষ মর্যাদা। ঠিক পরের বছর ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে পৃথিবীর ১৮৮টি দেশে এ দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন শুরু হয়।২১ ফেব্রুয়ারি বিশ্বে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পেছনের ঘটনা জানতে হলে আমাদের একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। আমরা জানি, একুশে ফেব্রুয়ারি মহান ভাষা আন্দোলনের দিন। প্রতিবছরই মর্যাদার সঙ্গে বাংলাদেশসহ বিশ্বে অনেক দেশে দিনটি পালিত হয়ে আসছে। এমনকি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং ত্রিপুরা রাজ্যে ‘বাংলা ভাষা দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে এই দিনটি।২১ ফেব্রুয়ারির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করার আগে, এই দিনটি মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের জন্য বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে দাবি শোনা যায়, বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকেও এ দাবি তোলা হয়। এ রকম আরও কিছু ব্যক্তিগত ও বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের কথা আমরা জানতে পারি। তবে এ বিষয়ে প্রথম সফল উদ্যোক্তারা হলেন কানাডার বহুভাষিক ও বহুজাতিক মাতৃভাষা-প্রেমিকগোষ্ঠী। এই গোষ্ঠী প্রথমে ১৯৯৮ সালের ২৯ মার্চ জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনানের কাছে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ নামে একটি দিবস ঘোষণার প্রস্তাব উপস্থাপন করে। সেখানে তাঁরা বলেন, ‘বাঙালিরা তাদের মাতৃভাষাকে রক্ষার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সেটা ছিল তাদের ভাষার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। আজকের পৃথিবীতেও অনেক জাতি-গোষ্ঠীর ভাষাও একই সমস্যা ও বিপদের মধ্যে আছে।’ কাজেই মাতৃভাষা দিবসের দাবিটি খুবই ন্যায়সংগত। মাতৃভাষা-প্রেমিকগোষ্ঠীর এই চিঠিতে স্বাক্ষর করেছিলেন সাত জাতি ও সাত ভাষার ১০ জন সদস্য। তাঁরা হলেন অ্যালবার্ট ভিনজন ও কারমেন ক্রিস্টোবাল (ফিলিপিনো), জ্যাসন মোরিন ও সুসান হজিন্স (ইংরেজি), ড. কেলভিন চাও (ক্যান্টনিজ), নাজনীন ইসলাম (কা-চি), রেনাটে মার্টিনস (জার্মান), করুণা জোসি (হিন্দি) এবং রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম (বাংলা)। জাতিসংঘ মহাসচিবের অফিস থেকে এই পত্রপ্রেরকদের জানিয়ে দেওয়া হয়; বিষয়টির জন্য নিউইয়র্কে নয়, যোগাযোগ করতে হবে প্যারিসে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি-বিষয়ক সংগঠন ইউনেসকোর সঙ্গে। জাতিসংঘের কর্মরত বাঙালি কর্মকর্তা হাসান ফেরদৌসেরও এ ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা ছিল সে সময়। এরপর প্রায় এক বছর পেরিয়ে যায়। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি ইউনেসকো। কানাডা প্রবাসী বাঙালি আবদুস সালাম ও রফিকুল ইসলাম (যাঁরা মাতৃভাষা-প্রেমিকগোষ্ঠীর সদস্য) এ বিষয়ে ইউনেসকোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করেন। প্রথমে টেলিফোনে এবং পরে চিঠিতে। ১৯৯৯ সালের ৩ মার্চ ইউনেসকো সদর দপ্তরের ভাষা বিভাগের কর্মকর্তা আন্না মারিয়া মেজলোককে রফিকুল ইসলাম একটি চিঠিতে জানান যে ‘২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার তোমাদের অনুরোধটি বেশ আকর্ষণীয় মনে হয়েছে।’ কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার একজন কর্মকর্তার কাছে এই প্রথম বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়। আন্না মারিয়া আরও জানান, ‘বিষয়টি ব্যক্তিগতভাবে উত্থাপনের কোনো সুযোগ নেই, ইউনেসকোর পরিচালনা পরিষদের কোনো সদস্য রাষ্ট্রের মাধ্যমে সভায় এটি তুলে হবে। ইউনেসকো সদর দপ্তরের ভাষা বিভাগের কর্মকর্তা মারিয়া রফিকুল ইসলামকে ইউনেসকো পরিচালনা পরিষদের কয়েকটি সদস্য দেশের ঠিকানাও পাঠিয়ে দেন। এতে বাংলাদেশ, ভারত, কানাডা, ফিনল্যান্ড এবং হাঙ্গেরির নাম ছিল। ইউনেসকো সাধারণ পরিষদে বিষয়টি আলোচ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করতে হলে কয়েকটি সদস্য দেশের পক্ষে প্রস্তাব পেশ করা জরুরি। তখন হাতে সময় ছিল খুবই কম। কেননা অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই সাধারণ পরিষদের সভা বসবে। কানাডা থেকে রফিকুল ইসলাম বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বিষয়টি রাষ্ট্রের জন্য গর্বের বিষয় মনে করে মন্ত্রণালয় অতি দ্রুত প্রধানমন্ত্রীর অফিসে অনুমতি চেয়ে নোট পাঠায়। বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সময়স্বল্পতার বিষয়টি উপলব্ধি করেন। তিনি সব ধবনের জটিলতা উপেক্ষা করে নথি অনুমোদনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছাড়াই ইউনেসকোর সদর দপ্তরে প্রস্তাবটি পাঠিয়ে দেন সরাসরি। ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৯৯ সালে সংক্ষেপে বাংলাদেশ জাতীয় ইউনেসকো কমিশনের পক্ষে এর সচিব অধ্যাপক কফিলউদ্দিন আহমদের স্বাক্ষরিত সেই প্রস্তাবটি প্যারিসে পৌঁছে যায়। তখন ইউনেসকোর নির্বাহী পরিষদের ১৫৭তম অধিবেশন এবং ৩০তম সাধারণ সম্মেলন ছিল। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের বিষয়টি নিয়ে ইউনেসকোতে দুটি সমস্যা দেখা দেয়। প্রথমত, ইউনেসকো ভেবেছিল, এমন একটা দিবস পালন করতে গেলে ইউনেসকোর বড় অঙ্কের টাকাপয়সা প্রয়োজন হবে। প্রতিবছর অনেক টাকাপয়সা খরচের কথা ভেবে প্রথমেই প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। একই সঙ্গে ইউনেসকো মহাপরিচালক International Mother Language Day নয়, International Mother Tonguae Day নামে একে অভিহিত করতে সচেষ্ট হন। মহাপরিচালক এ জন্য এক লাখ ডলারের ব্যয় বরাদ্দের প্রস্তাব করেন এবং দুই বছর পর নির্বাহী পরিষদের ১৬০তম অধিবেশনে একটি সম্ভাব্যতা জরিপের মাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরার আদেশ দেন। এর ফলে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার বিষয়টি আটকা পড়ে। প্রস্তাবটি কার্যকর হতে কমপক্ষে দুই বছর সময় লাগবে বলে মনে করা হয়। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী এ এস এইচ কে সাদেক। শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন ইউনেসকো অধিবেশনে যোগদানকারী বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতা। তিনি অধিবেশনে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, যেখানে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পটভূমি ও তাৎপর্য পৃথিবীর ১৮৮টি জাতির সামনে তুলে ধরেন। এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন দেশের শিক্ষামন্ত্রীদের সঙ্গে ঘরোয়া বৈঠক করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের পক্ষে অভিমতও গড়ে তুলতে চেষ্টা করেন। এমনকি উপস্থিত সদস্যদের বোঝাতে সক্ষম হন, দিবসটি পালন করতে প্রকৃতপক্ষে ইউনেসকোর এক ডলারও লাগবে না। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষাভাষীর মানুষ নিজেরাই নিজেদের মাতৃভাষার গুরুত্ব আলোচনা ও জয়গান গাইতে গাইতে দিনটি পালন করবে। এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার ডকুমেন্টেশন পুস্তিকায় সদস্যসচিব ড. মোহাম্মদ হাননান লিখেছেন, ‘শিক্ষামন্ত্রী এ এস এইচ কে সাদেক একই সঙ্গে কতকগুলো ব্যক্তিগত কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও চালান। এক রাতে তিনি পাকিস্তানি প্রতিনিধিদের নেতার সঙ্গেও একটি বৈঠকের আয়োজন করেন। প্রস্তাবটিতে পাকিস্তানের সমর্থন প্রয়োজন ছিল। কারণ, যে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রশ্ন ঘিরে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি সংঘটিত হয়েছিল, তাতে পাকিস্তানের মনোভাবে অবশ্যই না-বাচক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা ছিল। এ ছাড়া অন্যান্য মুসলিম দেশ, বিশেষ করে সৌদি আরবের সমর্থনের ক্ষেত্রেও সে দেশের ইতিবাচক ভূমিকা প্রভাব ফেলতে পারত। ১৯৯৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পাকিস্তানে সামরিক সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল। ফলে পাকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রী সে বছর ইউনেসকো সম্মেলনে যাননি, পাকিস্তানি দলের নেতৃত্ব দেন পাকিস্তানের শিক্ষাসচিব। বৈঠকে এ এস এইচ কে সাদেক আবিষ্কার করেন, পাকিস্তানের শিক্ষাসচিব একসময় তাঁর অধীনে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে কাজ করেছেন। আরও মজার বিষয়, পাকিস্তানের শিক্ষাসচিব বাংলায় চমৎকার কথা বলতে পারেন। ফলে এ বৈঠক খুবই সফল হলো। তিনি প্রস্তাবটি সমর্থনের আশ্বাস দেন। ...ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিয়েও কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছিল। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণায় তাদের আপত্তি ছিল না। তবে তারা ফেব্রুয়ারির ২১ তারিখ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। পাশ্চাত্য দেশগুলোর কাছে শিক্ষামন্ত্রী যুক্তি ও আবেগের সঙ্গে এই বিষয়টি তুলে ধরেন যে পৃথিবীতে বাঙালিরা মাতৃভাষার অধিকারের জন্য রক্ত দিয়েছে। সেটা ফেব্রুয়ারির ২১ তারিখে। তখন ইউরোপীয়রা ব্যাপারটা বুঝতে পারে।’এভাবে দীর্ঘ প্রক্রিয়া পার হওয়ার পর ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ২১ ফেব্রুয়ারি লাভ করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা। ইউনেসকোর ঐতিহাসিক সেই অধিবেশনে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের মূল প্রস্তাবক ছিল বাংলাদেশ এবং সৌদি আরব। আর সমর্থন করেছিল আইভরি কোস্ট, ইতালি, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, কমোরোস, ডোমিনিকান রিপাবলিক, পাকিস্তান, ওমান, পাপুয়া নিউগিনি, ফিলিপিন, বাহামাস, বেনিন, বেলারুশ, গাম্বিয়া, ভারত, ভানুয়াতু, মাইক্রোনেসিয়া, রুশ ফেডারেশন, লিথুয়ানিয়া, মিসর, শ্রীলংকা, সিরিয়া ও হন্ডুরাস। ১৯৯৯ সালে একুশে ফেব্রুয়ারির আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা লাভ শুধু বাংলা ভাষার বিশ্ববিজয় নয়; পৃথিবীর সব মাতৃভাষার জয়। তথ্যসুত্রঃ ইন্টারনেট থেকে।

খেজুরগাছে হাঁড়ি বাঁধো মন...

খেজুরগাছে হাঁড়ি বাঁধো মন...
অশোকানন্দ রায়বর্ধন : ছয়ঋতুর লীলাবিলাসের মধ‍্য দিয়েই গড়িয়ে যায় মানবজীবন । এই চক্রেরই একটা ঋতু শীতকাল । শীতকালে দরিদ্র মানুষের জীবনযাপন কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায় । প্রতিটি হিমের রাত তাদের জন‍্যে যন্ত্রণা বয়ে আনে । কিন্তু তার বিপরীতে শীতের ইতিবাচক দিকও রয়েছে । শীত আসার সঙ্গে সঙ্গে নানারকম সব্জীতে কৃষিক্ষেত্র উপচে পড়ে । শীতের আর একটা আকর্ষণ হল খেজুরের রস । গ্রামজীবনে শীতের সঙ্গে খেজুরের রসের একটা নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে । শীতের মরসুমেই গ্রামে গ্রামে ভোরবেলা গৃহস্থের ঘরে ঘরে বাংলার গৌরবের আর ঐতিহ‍্যের প্রতীক খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহের ধুম পড়ে যায় । এই মধুবৃক্ষের রস দিয়ে তৈরি হয় নানারকমের পায়েস, পিঠেপুলি, নলেনগুড় ইত‍্যাদি । একসময় অভিভক্ত দক্ষিণ ত্রিপুরা ছিল খেজুর রসের ভান্ডার । খেজুররসের একটা মিস্টি গন্ধ একসময় সকালসন্ধ‍্যা গ্রামের পরিবেশ মাতিয়ে রাখত । গ্রামের শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলেই খেজুরের রসের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ত । ঘরে তৈরি নানারকম পিঠেপুলি খেজুরের রসে ডুবিয়ে খাওয়া হত মহানন্দে । খেজুরের রস একটি জনপ্রিয় পানীয় । সন্ধ‍্যাবেলা আর ভোরবেলার কাঁচা রস খাওয়ার আগ্রহ ছিল প্রত‍্যেকের । বিশেষ করে 'সন্ধ‍্যারস'র স্বাদ ছিল অনবদ‍্য । খেজুরের রস থেকে ঝোলাগুড়, দানাগুড়, পাটালি বা নলেনগুড় তৈরি হয় । আজ সে আনন্দ হারিয়ে যেতে বসেছে খেজুরগাছের অভাবে এবং খেজুর রস সংগ্রহের দক্ষ শ্রমিক ব গাছির অভাবে । খেজুর, খেজুরের রস আমাদের জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে । লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন শাখায় খেজুর, খেজুরের রসের উপস্থিতি রয়েছে । খেজুর গাছ কাটা নিয়ে আঞ্চলিক গান রয়েছে― 'ঠিলে ধুয়ে দেরে বউ গাছ কাটতে যাব/সন্ধ‍্যের রস ঝাড়ে আনে জাউ রান্ধে খাব' । বাংলা প্রবাদ-প্রবচনেও আমরা খেজুর বিষয়টি পাই । যেধরনের আলাপ প্রাসঙ্গিক নয় । শ্রোতাদের বিরক্তির উৎপাদন করে, মিথ‍্যা, অবান্তর এবং হাস‍্যরসাত্মক মনে হয় সেজাতীয় আলাপকে 'খেজুরে আলাপ' বা 'খাজুইরগা আলাপ' বলা হয় । চূড়ান্ত অলস বোঝাতে 'গোঁফ-খেজুরে' প্রবচনটি ব‍্যবহার করা হয় । খেজুর গাছের তলায় শুয়ে থাকা ব‍্যক্তিটির গোঁফের উপর পাকা খেজুর পড়েছে, কিন্তু সে এত অলস যে ভাবছে সেটাও মুখে চিবিয়ে খেতে হবে । কত কষ্টকর বিষয় । কতটা পরিশ্রমের ! বাংলা লোকসাহিত‍্যে আর একটা অমূল‍্য সম্পদ ধাঁধায় ও খেজুর গাছের প্রসঙ্গ রয়েছে । 'মাইট্টা গোয়াল কাঠের গাই/বাছুর ছাড়া দুধ পাই' অথবা 'মাটির হাঁড়ি কাঠের গাই/বছর বছর দোয়াইয়া খাই' ।–( খেজুর গাছ ) । এমনি নোয়াখালির একটি ছদ্ম-অশ্লীল ধাঁধায় পাই–'দোম্বাই যাই জাপটাই ধরি/করে টানাটানি/মৈদ্দ আনে খিলি মাইচ্ছে/ভিৎরে হড়ে হানি' ।–( খেজুর গাছ থেকে রস পড়া ) । আমাদের নানা স্থাননামেও খেজুরপ্রসঙ্গ রয়েছে । খেজুরগাছের প্রাচুর্যের কারণে স্থানের নাম রয়েছে―খেজুরি (পশ্চিমবঙ্গ ), খাজুরা (যশোহর, বাংলাদেশ ), খেজুরবাগান ( আগরতলা, ত্রিপুরা ) । খেজুর, খেজুরগাছ, খেজুরের রস কবিদের ও নজর এড়ায়নি । কবির ভাষায় পাই–'খালি কলসি রেখে দিলে ভরে যায় রসে/সেই রসে দিয়ে জ্বাল মন জুড়াই সুবাসে' কিংবা 'এমন শীতল মিস্টি কোথায় আছে নীর/পানমাত্র তৃষিতের জুড়ায় শরীর' । রস সবার আকাঙ্ক্ষার বিষয় । শীতের রস যেমন গ্রামজীবনে সবার মনে রসসঞ্চার করে তেমনি সাহিত‍্য ও সংস্কৃতিতেও 'রস' একটি বিশেষ নান্দনিক বিষয় । বৈষ্ণবশাস্ত্রে আমরা পঞ্চরসের সন্ধান পাই । শান্ত,সখ‍্য, দাস‍্য, বাৎসল‍্য ও মধুর বা উজ্জ্বলরস । তেমনি নাট‍্যশাস্ত্রেও রয়েছে নবরস । শৃঙ্গার, হাস‍্য, করুণ, রুদ্র, বীর, ভয়ানক, বীভৎস, অদ্ভুত ও শান্তরস । তেমনি বাংলার বাউলদের গূঢ় সাধনায়ও রয়েছে রসপর্যায় । বাউলদের সাধনা রসের সাধনা । দেহকে কেন্দ্র করে বাউলদের সেই গোপন সাধনা । নারীকে নিয়ে তাঁদের সাধনপদ্ধতি এগিয়ে যায় । বাউলদের মতে রজ, বীর্য ও রসের কারণে এই দেহের সৃষ্টি । এগুলোকে বাঁচিয়ে রেখেই তার দেহসাধনা ।সেটাকে বাউলরা বলেন 'বস্তুরক্ষা' । বস্তুরক্ষা তাঁদের ধর্ম । বাউলদের হেঁয়ালিপূর্ণ গানেও রস শব্দটি পাওয়া যায় প্রায়শই । 'রস' তাদের পরিভাষা । বাউলদের গান বুঝতে হলে তাদের পরিভাষা বুঝতে হয় । পরিভাষা ব‍্যবহার করে বাউলদের গানের মধ‍্যে তাদের সাধনপদ্ধতির গোপন ইঙ্গিত থাকে । খেজুরগাছ, খেজুররস তাদের গানের মধ‍্যে তাই ব‍্যবহৃত হয় । ভবা পাগলার গানে পাই– খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন/খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন/ও গাছে জোয়ার আসিলে/ও গাছ কাটো কুশলে/কোনার দড়ি যেন পড়ে না তলে/কত গ‍্যাছো গ‍্যাছে মারা/নীচে পড়ে হয় মরন । আর একটি বাউল গানে আছে– আমার গোঁসাইরে নি দেখছ খাজুর গাছতলায়/গোঁসাই ল‍্যাজ লাড়ে আর খাজুর খায়। আবার অন‍্যত্র পাই– যদি রস খাবি মন নলিন দানা/গাছে ভাঁড় বেঁধে দেনা বেঁধে দেনা । বাংলা কথাসাহিত‍্যের অসাধারণ রূপকার কথাসাহিত‍্যিক নরেন্দ্রনাথ মিত্রের একটি অসাধারণ ছোটোগল্প 'রস' । খেজুরের রস ও গুড় তৈরির পেশায় নিযুক্ত গাছি মোতালেবের প্রেম ও দাম্পত‍্যজীবনকে ঘিরে অন্তর্দ্বন্দ্বময় জীবনচিত্র ফুটে উঠেছে এই গল্পে । একটি সাধারণ ঘটনা সাহিত‍্যিকের কলমের যাদুতে কিভাবে রসোত্তীর্ণ হয়ে উঠতে পারে এ গল্প তার উজ্জ্বল উদাহরণ । এই গল্পটিকে হিন্দি চলচ্চিত্রে রূপায়িত করা হয়েছে । সেখানে অমিতাভ বচ্চন অসাধারণ অভিনয় করেছেন । একসময় গ্রামের যত্রতত্র বিনা পরিচর্যায় বেড়ে উঠত এই মূল‍্যবান খেজুরগাছ । বলা হয়ে থাকে, এই খেজুরগাছের জন্ম আরবে । তা সত্ত্বেও কালক্রমে বাংলা ও তৎসন্নিহিত অঞ্চলের নিজস্ব বৃক্ষ হয়ে ওঠে এটি । কিনতু বর্তমানে নানাকারণে এই মধুবৃক্ষ দিনদিন কমে আসছে । কিন্তু এই বৃক্ষটি বৈজ্ঞানিকভাবে চাষ ও পরিচর্যা করলে তার উৎপাদিত ফসল গ্রামীন অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে ।

নেই কেন সেই 'গোলা' নেই কেন : অশোকানন্দ রায়বর্ধন :

নেই কেন সেই 'গোলা' নেই কেন : অশোকানন্দ রায়বর্ধন :
বাঙালির জীবনপ্রণালী একসময় মূলত কৃষির উপর নির্ভরশীল । ছয় ঋতুকে ঘিরে কৃষিকর্মের মধ‍্য দিয়েই সংবৎসরের আহার্য সংগ্রহ করা হত । গ্রীষ্মের দাবদাহের পর বর্ষার বৃষ্টিজলে ভিজে যে ফসল ফলানো হত , শরৎ পেরিয়ে হেমন্তের শেষদিকে সে ফসল ঘরে আসত । কার্তিক এবং অগ্রহায়ণ দুই মাস হেমন্তকাল । হেমন্তের দুটি রূপ । কার্তিক মাসটি ছিল অভাব অনটনের মাস । এইসময় বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ‍্যাভাব দেখা দিত । সারাবছরের অন্নসংস্থান করার জন‍্য যে খাদ‍্যশস‍্য জমিয়ে রাখা হত সেই ধান-চাল কার্তিকে এসে ফুরিয়ে যেত । ধান-চালের ভান্ডার খালি হয়ে যেত । তাই কার্তিকমাসের একটা দুর্নাম ছিল । এই মাসকে বলা হত 'মরা কার্তিক' । রবীন্দ্রনাথের কবিতায়ও মন্দাক্রান্ত কার্তিকের ইঙ্গিত পাওয়া যায় । আর অগ্রহায়ণমাসে পাওয়া যায় এর বিপরীত চিত্র। এই সময় মাঠে মাঠে সোনালি ফসলে ভরে যায় । শুরু হয় ফসল কাটা । ঘরে ঘরে শুরু হয় ব‍্যস্ততা । চলে নবান্নের আয়োজন । কৃষাণী বধূ উঠোন নিকানোর কাজ শুরু করে । চলে ধান মাড়াই, পাকা ধান শুকানোর কাজ । একসময় পাকা ধানে কৃষকের গোলা ভরে ওঠে । একসময় গ্রামে বর্ধিষ্ণু কৃষকের প্রতীক ছিল ধানের গোলা । ধানের গোলা বাঙালির গ্রামীন শস‍্যগুদাম । বাঙালির সংসার বলতেই একটা কথা প্রচলিত ছিল 'গোয়ালভরা গোরু, পুকুরভরা মাছ আর গোলাভরা ধান' । গ্রাম বাংলার সমৃদ্ধির প্রতীক ছিল এই ধানের গোলা । সম্পন্ন গৃহস্থরা ধান রাখার জন‍্যে এই গোলার ব‍্যবহার করতেন । অতীতদিনে বাড়িতে ধানের গোলা না থাকলে গৃহস্থরা সেই বাড়িতে মেয়ের বিয়ে দিতেন না । নোয়াখালি অঞ্চলের একটা প্রবাদে পাই 'হোলা বিয়া করাইবা জাত চাই / মাইয়া বিয়া দিবা ভাত চাই' । কৃষকের ধানের গোলার সঙ্গে ধনের দেবী লক্ষীর নিবিড় সম্পর্ক । লক্ষ্মীপুজোর আলপনায় ধানের গোলার চিত্রও অংকন করা হয় আজো । বিয়ের পর নববধূ শ্বশুরবাড়িতে এলে তাকে ধানের গোলা দেখানোর লোকাচার দক্ষিণ ত্রিপুরায় আজো রয়েছে । গ্রামদেশে শস‍্য সংরক্ষণের লোকজ প্রযুক্তি এই ধানের গোলা । গোলাঘরে ধান, বীজ রাখলে সেগুলো ভালো থাকে । শোবার ঘরে বা অন‍্যত্র ধান বা শস‍্যাদি রাখলে ইঁদুর ও সাপের প্রকোপ বেড়ে যায় । তাই গোলাঘরে ধান-বীজ সংরক্ষণ নিরাপদ । আগের দিনে বাড়িঘর নির্মানেও বাস্তুশাস্ত্র বা স্বাস্থ‍্যনীতি মেনে চলা হত । বলা হত ' দক্ষিণদুয়ারী ঘরের রাজা / পুবদুয়ারী তার প্রজা / উত্তরদুয়ারীর ভাত নাই / পশ্চিমদুয়ারীর কপালে ছাই' । আগেরদিনে বাড়িঘরের দক্ষিণদিক খোলা রাখা হত । সেই দিক দিয়ে বাড়ির প্রবেশপথ থাকত । গৃহস্থবাড়ির ঐশ্বর্যসূচক এই গোলাঘর দক্ষিণদিকেই একপাশে থাকত । যাতে বহিরাগতরা এই গৃহস্থের ঐশ্বর্যের অনুমান করতে পারতেন । প্রবাদেও তেমনি রয়েছে 'পুবে হাঁস, পশ্চিমে বাঁশ / উত্তরে কলা আর দক্ষিণে খোলা / গোলা' । এই ধানের গোলা নির্মানে লৌকিক প্রযুক্তির ব‍্যবহার ও ছিল সেইসময় । ধানের গোলা তৈরির জন‍্যে দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন । তখনকার দিনে দশগ্রামে হয়তো দুচারজন গোলা তৈরির দক্ষ শ্রমিক পাওয়া যেত । তাদের খবর দেওয়া হলে তারা এসে স্থান নির্বাচন করত । তারপর প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম যোগাড় হলে গোলা তৈরির কাজ শুরু হত । অপেক্ষাকৃত ধনাঢ‍্যরা বেশ শক্তপোক্ত গোলাঘর তৈরি করতেন । তারা পুরোটা বাঁশবেতের সাহায‍্যে করতেন । বাঁশ, বাঁশের পিঠের অংশের বেত,বাঁশ কেটে শক্ত কঞ্চি, বেত ইত‍্যাদি দিয়ে গোলাকার কাঠামো তৈরি করা হত । এরপর তার গায়ে ভেতরে ও বাইরে বেশ পুরু করে এঁটেল মাটির আস্তরণ লাগানো হত । চোর-ডাকাতের হাত থেকে বাঁচবার জন‍্যে গোলার মুখ রাখা হত অনেক উপরে । বন‍্যা ও ইঁদুরের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন‍্যে ধানের গোলা অনেক উঁচুতে বসানো হত । নির্মিত গোলার মাথায় বাঁশ, ছন বা খড়ের ছাউনি থাকত । ধনী গৃহস্থরা কেউ কেউ টিনের ছানিও দিতেন । সাধারণ গৃহস্থরা অল্প খরচে ধানের গোলা তৈরি করতেন । এই গোলা তৈরির প্রধান উপকরণ হল ধান মাড়াই শেষে উদ্বৃত্ত খড় । ধানের খড় দিয়ে দড়ির মতো লম্বা বিনুনি পাকানো হত । খড়ের গাদা থেকে খড় টেনে একজন বিনুনি পাকানো শুরু করতেন ।আরেকজন সহযোগী পাকের সঙ্গে সঙ্গে খড় সরবরাহ করে যেতেন । এভাবে খড়ের সাথে খড় জুড়ে জুড়ে দীর্ঘ বিনুনি তৈরি করা হয় । এই লম্বা দড়িকে গোলার জন‍্য নির্মিত বাঁশে কাঠামোর মধ‍্যে বৃত্তাকারে স্তরে সাজিয়ে একটা নির্দিষ্ট জায়গা ঘিরে ফেলা হত । এরপর এটার বাইরে ভেতরে গোবর-মাটি-তুষের মিশ্রণ পুরু করে লেপে দেওয়া হলেই শক্তপোক্ত মড়াই তৈরি হয়ে যায় । কালক্রমে দক্ষ শ্রমিকের অভাবে একসময় গোলাঘরে ব‍্যবহার কমে আসে । গোলাঘর নির্মানের অভাবে কৃষকরা বাঁশের তৈরি ছোটো আকারের জালাতে ধান রাখতে শুরু করেন । এগুলোকে 'ডোল' বলে । উত্তর ত্রিপুরার সিলেটিরা বলেন 'টাইল' । একসময় বাঁশের তৈরি ডোল বা টাইল সারা পূর্ববাংলায় ও ত্রিপুরার সর্বত্র ব‍্যবহার হত । চট্টগ্রাম, পার্বত‍্য চট্টগ্রাম ও ত্রিপুরা বনে প্রাপ্ত 'ডলুবাঁশ' নামে এক প্রজাতির বাঁশ দিয়ে বাঙালি ও উপজাতি কামলারা এই ডোল বানাতেন । ত্রিপুরার বাঙালি ও উপজাতিদের অনেকেই এই ডোল নির্মানে দক্ষ ছিলেন । তাঁদের নির্মিত ডোল কার্তিক অগ্রহায়ণ মাসে গ্রাম‍্য বাজারগুলিতে বিক্রির জন‍্য তোলা হত । বাজারের বিরাট অংশ জুড়ে থাকা সারি সারি ডোলের এ দৃশ‍্য এখন আর দেখা যায় না । সেই কামলারাও নেই । বন উজাড় হয়ে যাওয়ায় ডলুবাঁশ ও এখন দুর্লভ । বাঁশবেতের এই লৌকিক শিল্পটি এখন বিলুপ্তপ্রায় । প্রসঙ্গত উল্লেখ‍্য, ত্রিপুরার মগ জনগোষ্ঠীর মানুষেরা বুদ্ধ পূর্ণিমার সময় যে আকাশবাতি ওড়ান তার গঠন ডোলের আকৃতির হওয়ায় দক্ষিণ ত্রিপুরার বাঙালিরা এই আকাশবাতিকে 'ডোলবাত্তি'ও বলেন । এই ধানের ডোল নিয়ে দক্ষিণ ত্রিপুরার একটি প্রচলিত ধাঁধা হল 'রাজার বাড়ির মেনা গাই মেনমেনাইয়া চায় / হাজার টাকার ধান খাইয়া আরো খাইতো চায়' । লৌকিক ছড়াতে যেমন রয়েছে 'ছেলে ঘুমিওনা পাড়া জুড়াবেনা / বর্গী আছে দেশে / ধানের গোলা শেষ হয়ে যাবে / খড় কুড়াবে শেষে' । তেমনি আধুনিক কবির কবিতায়ও রয়েছে ধানের গোলার প্রসঙ্গ– 'ভাঙছ প্রদেশ ভাঙছ জেলা / ভাঙছ ঘর বাড়ি / পাটের আড়ত ধানের গোলা / কারখানা আর রেলগাড়ি ( তেলের শিশি-অন্নদাশংকর রায় ) । রবীন্দ্রনাথও তাঁর কবিতায় উল্লেখ করেছেন, 'রাখি হাটখোলা নন্দীর গোলা মন্দির করি পাছে / তৃষাতুর শেষে পঁহুছিনু শেষে আমার বাড়ির কাছে ( দুই বিঘা জমি- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ) । সময়ের গতির সঙ্গে সঙ্গে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী ধানের গোলা আজ হারিয়ে গেছে । বর্তমান প্রজন্মের কাছে তা রূপকথার মতো শোনাবে আজ । বর্তমানে ইট, বালি, সিমেন্ট দিয়ে তৈরি গুদামঘরে ধান রাখা হয় । বাড়িঘরে পাট প্লাস্টিক ইত‍্যাদির বস্তায়ই আজকাল ধান মজুত করা হয় । এখন আর সেই বর্ধিষ্ণু পরিবার নেই । গ্রামীন চাষপদ্ধতিতেও এসেছে আধুনিকতা । ছোটো ছোটো পরিবার হয়ে ভেঙে গেছে বাঙালির একান্নবর্তী পরিবার । স্থান সংকুলানের অভাবেও গোলাঘরকে বিদায় জানাতে হয়েছে । যেমন বিদায় জানিয়েছে বাঙালি তার বহুবিধ লৌকিক সংস্কৃতিকে ।

কার্তিকের কাব‍্যকথা

কার্তিকের কাব‍্যকথা
অশোকানন্দ রায়বর্ধন : হিমের রাতে ওই গগনের দীপগুলিরে হেমন্তিকা করলো গোপন আঁচল ঘিরে ঘরে ঘরে ডাক পাঠালো– দীপালিকায় জ্বালাও আলো জ্বালাও আলো, আপন আলো, সাজাও আলোয় ধরিত্রীরে । ( রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ) বাঙালি জীবনের বারোমাস‍্যায় কার্তিকেরও ভূমিকা রয়েছে ।আশ্বিনের সংক্রান্তির সাথে সাথে শুরু হয়ে যায় কার্তিকের আবাহন । হেমন্তের ঋতুর শুরুও এই সময় । প্রাচীন রীতি অনুযায়ী কার্তিকমাসব‍্যাপী রাত্রিবেলা প্রতি গৃহস্থের উঠোনে জ্বালানো হয় আকাশপ্রদীপ । ধর্মশাস্ত্র অনুযায়ী সারা কার্তিক মাস ধরে এই প্রদীপ জ্বালানোর মধ্য দিয়ে ভগবান বিষ্ণুর আশীর্বাদ প্রার্থনা করা হয় । শাস্ত্রে আছে ভগবান বিষ্ণু দীর্ঘ চারমাস যোগনিদ্রায় অভিভূত থেকে এই মাসেই জেগে ওঠেন । তিনি পৃথিবীকে পালন করেন । তাই তাকে সন্তুষ্ট রাখতে ধর্মপ্রাণ হিন্দু জনগণ সারা কার্তিক মাসব্যাপী প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা ঘি বা তেল দিয়ে প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখে । বাড়ির সবচেয়ে উঁচু জায়গায় পূর্ব বা উত্তরমুখী করে প্রদীপ জ্বালানো হয় । এই মাটির প্রদীপ আসলে মানবদেহেরই প্রতীক । ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ এবং ব‍্যোম এই পঞ্চভূতে যেমন নশ্বর দেহ তৈরি হয় মাটির প্রদীপ ঠিক তেমনি । ক্ষিতি বা মাটি দিয়ে প্রদীপের শরীর তৈরি হয় । অপ বা জল দিয়ে তার আকৃতি গঠন করা হয় । তেজ বা আগুন আত্মার মতো স্থিত হয় প্রদীপের অন্তরে । বাতাস সেই আগুনকে দহনে সহায়তা করে । আর ব‍্যোম বা অনন্ত শূন‍্য জেগে থাকে তার গর্ভে । জীবন্ত কর্মময় মানুষের প্রতীক প্রদীপ নির্বাপিত হওয়া জীবনেরই পরিসমাপ্তি । লোকবিশ্বাস মানুষ মৃত্যুর পরে বিষ্ণুলোকে গমন করে । কাজেই মৃত্যুর পরে মানুষের উপর বিষ্ণুরই অধিকার রয়েছে । সেকারণেই পূর্বপুরুষের আত্মার শান্তির লক্ষ্যেই ভগবান বিষ্ণুকে প্রসন্ন রাখার উদ্দেশ্যে এই সময়ের প্রদীপ প্রজ্জ্বলন । এছাড়া এইসময়ে শীতের শুরু হয়ে যেত একসময় । বর্তমানে পরিবেশে বিশাল পরিবর্তন হওয়ার ফলে মূল শীত ঋতুতেও ততটা শীত থাকে না । প্রাচীন মানুষ শীতনিবারণের জন্য অগ্নির ব্যবহার করত । শীত ঋতুতে অগ্নিসঞ্চয়ের অভ্যাসের কারণেও এই প্রদীপ জ্বালানোর প্রথা । আবার এইসময়ে নতুন ধান পাকতে শুরু করে । এই সুযোগে সুপুষ্ট ধানকে পোকায় কেটেও নষ্ট করতে থাকে । এই মাসে আকাশ প্রদীপের আলো দেখে ধানের পোকাগুলো আলোর দিকে উড়ে আসে । খেতের ফসল পোকার হাত থেকে রক্ষা করার লৌকিক পদ্ধতিও ছিল এই প্রদীপ প্রজ্জলন । এক কথায় কার্তিকমাসের এই প্রদীপ জ্বালানোর সঙ্গে বেশ কয়েকটা ধর্মীয় লোকবিশ্বাস, লোকসংস্কার এবং লোকবিজ্ঞান জড়িয়ে রয়েছে । কার্তিক মাস এলেই প্রকৃতি অপরূপ রূপ নিতে থাকে । গাছে গাছে সাদা শিউলি ফুটে থাকে । ভোরের দিকে ঝরে পড়া এই ফুল কুয়াশায় মিশে খইয়ের মত গাছ তলায় পড়ে থাকে । শিউলির মৃদুগন্ধ ভোরের পরিবেশকে মধুর করে তোলে । বিস্তীর্ণ ক্ষেতের ধান ধীরে ধীরে সোনালি রঙ ধরতে থাকে । কুয়াশামাখা সোনালি ধান মাঠের বুকে যখন ছড়িয়ে থাকে তখন মনে হয় সোনার বসন পরে যেন এক অপরূপা রমণী মাঠময় শুয়ে আছে । একদিন ঘরে নতুন ধান উঠে । কৃষকের প্রাণে নতুন বার্তা সঞ্চারিত হয় । আয়োজন চলে নবান্নের । কার্তিকের প্রকৃতির অপরূপ রূপ কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতায় অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে– আবার আসিব ফিরে ধানসিড়িটির তীরে– এই বাংলায় হয়তো মানুষ নয়– হয়তোবা শঙ্খচিল শালিকের বেশে হয়তো ভোরের কাক হয়ে কার্তিকের নবান্নের দেশে কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব এ কাঁঠাল ছায়ায় ( রূপসী বাংলা ) কার্তিক মাস এলেই নতুন ধানের সৌরভের প্রত্যাশায় প্রকৃতি আর মাঠের সোনালি ধানের সোনারঙের মধ্যে নিজেকে মিশিয়ে দেয় আবহমান বাঙালি । তার ভরসার মাস এই কার্তিক ।

উৎসর্গকথা

উৎসর্গকথা
যে মায়েদের কোল খালি হয়ে এই দেশের স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য উদয় হল আমাদের মহান ভারতবর্ষের আরো একটি প্রজাতন্ত্র দিবসের প্রাক লগ্নে জানুয়ারি মাসের এই সংখ্যা রত্নগর্ভা সেই সকল মায়েদের উৎসর্গ করা হলো।

সূচিপত্র

  • ►  2025 (63)
    • ►  November 2025 (20)
    • ►  October 2025 (43)
  • ►  2024 (254)
    • ►  November 2024 (22)
    • ►  October 2024 (22)
    • ►  July 2024 (43)
    • ►  May 2024 (28)
    • ►  April 2024 (57)
    • ►  February 2024 (29)
    • ►  January 2024 (53)
  • ►  2023 (504)
    • ►  December 2023 (57)
    • ►  November 2023 (1)
    • ►  October 2023 (66)
    • ►  September 2023 (46)
    • ►  August 2023 (29)
    • ►  July 2023 (34)
    • ►  June 2023 (46)
    • ►  May 2023 (39)
    • ►  April 2023 (57)
    • ►  March 2023 (44)
    • ►  February 2023 (41)
    • ►  January 2023 (44)
  • ▼  2022 (977)
    • ►  December 2022 (49)
    • ►  November 2022 (44)
    • ▼  October 2022 (44)
      • অশোকানন্দ রায়বর্ধন
      • অপাংশু দেবনাথ
      • তৈমুর খান
      • সৌমিত বসু
      • কুশল ভৌমিক
      • কৃষ্ণকুসুম পাল
      • তৌফিক জহুর
      • উমাশঙ্কর রায়
      • গোপেশ চক্রবর্তী
      • শান্তনু ভট্টাচার্য
      • রুদ্র মোস্তফা
      • সত্যজিৎ দত্ত
      • শুভ্রা সাহা
      • সত্যজিত সেন
      • সমরেন্দ্র বিশ্বাস
      • সন্দীপ সাহু
      • বিপ্লব উরাং
      • নবীনকিশোর রায়
      • আব্দুল গফফার
      • খোকন সাহা
      • নন্দিতা দাস চৌধুরী
      • শর্মিষ্ঠা ঘোষ
      • রাহুল সিনহা
      • পঙ্কজ কান্তি মালাকার
      • নমিতা সরকার
      • মিঠু মল্লিক বৈদ‍্য
      • অপর্ণা পোদ্দার সাহা
      • চন্দ্রা বিশ্বাস
      • ঝুমা শব্দকর
      • সন্ধ্যা ভৌমিক
      • অলকা গোস্বামী
      • নিচে পড়ুন নির্বাচিত ১১ জন তরুণের কবিতা
      • মো: রুবেল
      • রূপন মজুমদার
      • লিটন শব্দকর
      • শিউলী দাস
      • সহিদুল ইসলাম
      • সুচরিতা পাটারী
      • রুবেল হোসেন
      • সঞ্জয় দত্ত
      • রমা চন্দ্র
      • অনুপ দেবনাথ
      • সুতপা রায়
      •  
    • ►  September 2022 (40)
    • ►  August 2022 (31)
    • ►  July 2022 (117)
    • ►  June 2022 (87)
    • ►  May 2022 (93)
    • ►  April 2022 (96)
    • ►  March 2022 (116)
    • ►  February 2022 (151)
    • ►  January 2022 (109)
  • ►  2021 (658)
    • ►  December 2021 (116)
    • ►  November 2021 (100)
    • ►  October 2021 (102)
    • ►  September 2021 (105)
    • ►  August 2021 (102)
    • ►  July 2021 (133)

মহাবিদ্রোহ ও ভারতের স্বাধীনতার সূচনা

মহাবিদ্রোহ ও ভারতের স্বাধীনতার সূচনা
১৮৫৭–৫৮ সালে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে উত্তর এবং মধ্য ভারতে বিদ্রোহের ভারতীয় মহাবিদ্রোহ (সিপাহী বিদ্রোহ), ১৮৫৭ ছিল একটি পর্যায়কাল। এই বিদ্রোহ ছিল কয়েক দশকের ভারতীয় সৈন্য এবং তাদের ব্রিটিশ অফিসারের মধ্যে সাংস্কৃতিক পার্থক্যের ফল। মুঘল এবং পেশয়ার মত ভারতীয় শাসকদের প্রতি ব্রিটিশের ভিন্ন নীতি এবং অযোধ্যার সংযুক্তি ভারতীয়দের মধ্যে রাজনৈতিক মত পার্থক্য সূত্রপাত করছিল। লর্ড ডালহৌসীর স্বত্ত্ববিলোপ নীতি যা দিল্লীর মুঘল সাম্রাজ্যের অপসারণ, কিছু জনগণ রেগে গিয়েছিল। সিপাহী বিদ্রোহ সুনির্দিষ্ট কারণ যে ১৮৫৩ সালে তৈরি .৫৫৭ ক্যালিবার এনফিল্ড(পি/৫৩) রাইফেল কার্তুজ গরু ও শুকরের চর্বি দিয়ে তৈরি হতো। সৈন্যের‍া তাদের রাইফেলের কার্তুজ লোড করার সময় তাদের তা দাঁত দিয়ে ভাঙে লাগাতে হতো। যেহেতু গরু ও শুকরের চর্বি মুখে দেওয়া হিন্দু এবং মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের সৈন্যদের কাছে অধার্মিক কাজ ছিল। ফেব্রুয়ারি ১৮৫৭তে, সিপাহীরা (ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে ভারতীয় সৈন্য) নতুন কার্তুজ ব্যবহার করতে অস্বীকার করেছিল। ব্রিটিশ নতুন কার্তুজ প্রতিস্থাপন কর‍ার দাবী করেছিল এবং যা মৌমাছির তেল ও শাকসব্জী তেল থেকে তৈরী হবে। কিন্তু সিপাহীদের কাছে গুজব টিকে থেকেছিল। মঙ্গল পাণ্ডের নেতৃত্বে ১৮৫৭ সালের ২৯ মার্চ ব্যারাকপুরে শুরু হয় এবং শীঘ্রই তা মিরাট, দিল্লি এবং ভারতের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে। এটা সারা বাংলাদেশ জুড়ে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল। চট্টগ্রাম ও ঢাকার প্রতিরোধ এবং সিলেট, যশোর, রংপুর, পাবনা ও দিনাজপুরের খণ্ডযুদ্ধসমূহ বাংলাদেশকে সর্তক ও উত্তেজনাকর করে তুলেছিল। ১৮৫৭ সালের ১৮ নভেম্বর চট্টগ্রামের পদাতিক বাহিনী প্রকাশ্য বিদ্রোহে মেতে ওঠে এবং জেলখানা হতে সকল বন্দিদের মুক্তি দেয়। তারা অস্ত্রশস্ত্র এবং গোলাবারুদ দখল করে নেয়, কোষাগার লুণ্ঠন করে এবং অস্ত্রাগারে আগুন ধরিয়ে দিয়ে ত্রিপুরার দিকে অগ্রসর হয়। চট্টগ্রামে সিপাহিদের মনোভাব ঢাকার রক্ষা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে। সিপাহিদের আরও অভ্যুত্থানের আশঙ্কায় কর্তৃপক্ষ ৫৪তম রেজিমেন্টের তিনটি কোম্পানি এবং একশত নৌ-সেনা ঢাকায় প্রেরণ করে। একই সাথে যশোর, রংপুর, দিনাজপুরসহ বাংলাদেশের আরও কয়েকটি জেলায় একটি নৌ-ব্রিগেড পাঠানো হয়। প্রধানত ইউরোপীয় বাসিন্দাদের নিয়ে গঠিত স্বেচ্ছাসেবীদের সংগঠিত করে ঢাকা রক্ষা করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। নৌ-বিগ্রেড ঢাকা পৌঁছে সেখানে নিয়োজিত সিপাহিদের নিরস্ত্র করতে গেলে অবস্থা চরমে ওঠে। ২২ নভেম্বর লালবাগে নিয়োজিত সিপাহিগণকে নিরস্ত্র করতে গেলে তারা প্রতিরোধ সৃষ্টি করে। সংঘটিত খণ্ডযুদ্ধে বেশ কিছু সিপাহি নিহত ও বন্দি হয় এবং অনেকেই ময়মনসিংহের পথে পালিয়ে যায়। অধিকাংশ পলাতক সিপাহিই গ্রেপ্তার হয় এবং অতিদ্রুত গঠিত সামরিক আদালতে সংক্ষিপ্ত বিচারের জন্য তাদের সোপর্দ করা হয়। অভিযুক্ত সিপাহিদের মধ্যে ১১ জন মৃত্যুদণ্ড এবং বাকিরা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়। এ রায় দ্রুত কার্যকর করা হয়। বিভিন্ন অংশে, বিশেষ করে সিলেট, ময়মনসিংহ, দিনাজপুর এবং যশোরে চাপা ও প্রকাশ্য উত্তেজনা বিরাজমান ছিল। পলাতক সিপাহি ও ইউরোপীয় সৈন্যদের মধ্যে সিলেট এবং অপরাপর স্থানে কয়েকটি সংঘর্ষ ঘটে, যার ফলে উভয় পক্ষেই প্রাণহানি ঘটে। সিলেট এবং যশোরে বন্দি ও নিরস্ত্র সিপাহিদের স্থানীয় বিচারকদের দ্বারা সংক্ষিপ্ত বিচার করা হয়। ফাঁসি ও নির্বাসন ছিল এ সংক্ষিপ্ত বিচারের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। সিপাহি যুদ্ধের সময়ে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের ভূমিকা ও প্রতিক্রিয়া একটি অনুজ্জ্বল চিত্র প্রতিফলিত করে। জমিদার-জোতদারগণ নিশ্চিতভাবে সিপাহিদের বিরুদ্ধে ছিলেন এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ গরু ও ঘোড়ার গাড়ি এবং হাতি সরবরাহ; পলায়নরত সিপাহিদের গতিবিধির সন্ধান প্রদান এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে বিদ্রোহী সিপাহিদের প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে স্থানীয় স্বেচ্ছসেবক বাহিনী গড়ে কোম্পানির স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে কৌশলগত সমর্থন প্রদান করেন। সরকার কৃতজ্ঞতার সাথে জমিদার-জোতদারগণের এ সকল সেবার স্বীকৃতি প্রদান করে এবং পরে তাদেরকে নওয়াব, খান বাহাদুর, খান সাহেব, রায় বাহাদুর, রায় সাহেব প্রভৃতি উপাধিতে ভূষিত করে ও নানা পার্থিব সম্পদ দ্বারা পুরস্কৃত করে। জমিদার-জোতদারগণের প্রদর্শিত ভূমিকা অনুসরণ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণীও কোম্পানির সরকারের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে। সাধারণ মানুষ ও কৃষককুল সার্বিকভাবে এ বিষয়ে উদাসীন ছিল এবং সিপাহি যুদ্ধের স্পর্শ থেকে দূরে ছিল। তবে কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধির ফলে তারা যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এতদসত্ত্বেও এই মহাবিদ্রোহ আঠেরেশো শতকের পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণ অভ্যুত্থান হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে যা ইংরেজ শাসনের ভিতকে কাঁপিয়ে দেয়। জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিক ও পন্ডিতেরা তাই একে সিপাহী বিদ্রোহের বদলে জাতীয় মহাবিদ্রোহ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

বৈশাখের চেতনাময় পংক্তিমালা

বৈশাখের চেতনাময় পংক্তিমালা
অশোকানন্দ রায়বর্ধন: বৈশাখ বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস । চৈত্র মাসের শেষবসন্তের বিকেলে যখন অমলতাস বৃক্ষ ছেয়ে যায় পাকা সোনারঙা হলুদ ফুলের ঝাড়ে, কৃষ্ণচূড়া যখন গাছে গাছে লাল রং বিছিয়ে জাঁকিয়ে বসে তখনই আসে বৈশাখ । চৈত্রের চেতনাবিনাশী খরতাপের মধ্যেই প্রাণের স্পন্দন তৈরি করে আসে বৈশাখ । প্রখর তপ্ত দহন নিয়ে বৈশাখের আগমন ঘটে । বৈশাখের থাকে অগ্নিজ্বালা । কিন্তু তার মধ্যেই থাকে নূতন সৃষ্টির বার্তা । প্রাণের গুঞ্জরণ । ঋতু পরিবর্তনের শরীরীভাষ‍্য নিয়ে আসে প্রকৃতি । বৈশাখের মাঝেই প্রকৃতির দুই রূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে । সূর্যের রুদ্র তেজোদীপ্ত মূর্তির পাশাপাশি সৌম্য শান্ত রূপও দেখা যায় বৈশাখে । বৈশাখেই প্রকৃতিতে আসে তুমুল ধ্বংসাত্মক রূপ । তেমনি বৈশাখেই দেখি শান্ত সমাহিত উদাসী প্রকৃতিকে । এই বৈশাখেরই একটা প্রধান অনুষঙ্গ বৈশাখী ঝড় । যার নাম 'কালবৈশাখী' । কালবৈশাখী একটি স্থানীয় বৃষ্টিপাত ও বজ্রবিদ্যুৎসহ জোরালো ঝড় যা ভারতের ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা, আসাম, বিহার, ছত্রিশগড়, ঝাড়খন্ড ও বাংলাদেশে চৈত্র-বৈশাখ মাসে প্রবাহিত হয়ে থাকে । কবি মোহিতলাল মজুমদারের কবিতায়ও– 'নববর্ষের পুণ‍্যবাসরের কালবৈশাখী আসে' এবং 'চৈত্রের চিতাভস্ম উড়ায়ে জুড়াইয়া জ্বালা পৃথ্বীর' কালবৈশাখী ধেয়ে যায় । এই কালবৈশাখীকে নজরুল জাগরণের বার্তাবাহীরূপে দেখেন । তাঁর গানে পাই– 'নাচে ওই কালবোশাখী/ কাটাবি কাল বসে কি?/ দে রে দেখি/ ভীম কারার ওই ভিত্তি নাড়ি ।' আমাদের গ্রামজীবনে কালবৈশাখী নতুন জীবনযাত্রার সংকেত নিয়ে আসে । বাংলা ভাষাভাষী জনগণ অধ‍্যুষিত অঞ্চলে বৈশাখের প্রথমদিন পালিত হয় নববর্ষ উৎসব । যা রূপ নেয় অসাম্প্রদায়িক উৎসবের । জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আত্মীয়-পরিজন, প্রিয়জনের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়, ভালো খাওয়াদাওয়া এদিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ‍্য । হালখাতা দিয়ে শুরু হয় ব‍্যবসায়িক কাজকর্ম । পালিত হয় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর নানা উৎসব । ত্রিপুরিদের 'বুইসু', চাকমাদের 'বিঝু', মগদের 'সাংগ্রাই' ইত‍্যাদি । এই বৈশাখেরই শুক্লা তৃতীয়া তিথিতে পালিত হয় ' অক্ষয় তৃতীয়া' । 'অক্ষয়' মানে যার ক্ষয় নাই । প্রাচীন বিশ্বাস, এই পবিত্র তিথিতে কোন শুভ কাজ করলে তা অনন্তকাল অক্ষয় হয় । এ দিনেই ছয়মাস বন্ধ থাকা কেদার-বদ্রী-যমুনোত্রীর মন্দিরের দরজা খুলে দেওয়া হয় । দরজা খুললেই দেখা যায় ছয়মাস আগে জ্বালিয়ে রেখে যাওয়া অক্ষয়প্রদীপের শিখা । এছাড়াও অক্ষয়তৃতীয়াকে কেন্দ্র করে বহু পৌরাণিক কাহিনি ও ঘটনা জড়িয়ে রয়েছে । সম্প্রতি উত্তর ভারতীয় সংস্কৃতির প্রভাবে বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ‍্যেও পড়েছে অক্ষয়তৃতীয়ার দিন স্বর্ণ কেনার রীতি-রেওয়াজ । লৌকিক বিশ্বাস এই শুভতিথিতে রত্ন বা জিনিস পত্র কিনলে গৃহে শুভযোগ বৃদ্ধি পায় । সুখ-শান্তি ও সম্পদ বৃদ্ধি পায় । এই আশাতেই মানুষ এদিন কিছু না কিছু ক্রয় করে থাকেন । বৈশাখমাস বাঙালির শ্রেষ্ঠ কবি রবীন্দ্রনাথের জন্মমাস । স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও বৈশাখকে দেখেছেন অন‍ন‍্য বিভঙ্গে । তাঁর গানে পাই– তাপস নিঃশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক যাক এসো এসো । এসো হে বৈশাখ এসো এসো যাক পুরাতন স্মৃতি যাক ভুলে যাওয়া গীতি অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা । রবীন্দ্রদৃষ্টিতে বৈশাখ এসেছে গৈরিকরূপে । গেরুয়া রঙ বৈরাগ‍্যের প্রতীক। রবীন্দ্রনাথ বৈশাখের রূপে দেখেছেন গৈরিক বৈরাগ‍্য । এবছর এই বৈশাখেই পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাঙালি দুই জনগোষ্ঠী হিন্দুদের 'অক্ষয়তৃতীয়া' ও মুসলমানদের 'ঈদ-উল-ফিতর' । এই দুই অনুষ্ঠানের মধ‍্যেই রয়েছে প্রাচীন কৃষিজীবি মানুষের লোকায়ত বিশ্বাস । 'অক্ষয়তৃতীয়া'য় রয়েছে গোষ্ঠীজীবনের কৃষিপণ‍্যের বৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির ভাবনা । 'ঈদ'এর অর্থ উৎসব । কৃষিকার্যের মাধ‍্যমে প্রাপ্ত কৃষিজ ফসল সম্মিলিতভাবে ভাগ করে নেওয়ার প্রাচীন আনন্দোৎসব 'ঈদ' উৎসবের উৎস । এ দুয়ের মধ‍্যে কেমন এক মেলবন্ধনের ফল্গুধারা প্রবাহিত । সেই সূত্র ধরেই আমাদের প্রার্থনা হোক আজকের দিনে, এই বৈশাখে–অক্ষয় তৃতীয়া আর ঈদোৎসবের মিলনে অক্ষয় হোক আমাদের পারস্পরিক সম্প্রীতি, সৌভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক সহাবস্থান ‌।

এক চিরঞ্জীব বজ্রকন্ঠের সঙ্গে ক্ষীণ পরিচয়

এক চিরঞ্জীব বজ্রকন্ঠের সঙ্গে ক্ষীণ পরিচয়
অশোকানন্দ রায়বর্ধন: একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি একাদশ শ্রেণির ছাত্র । তার আগের বছর অর্থাৎ ১৯৭০ সাল থেকে মোটামুটি আমি বাংলাদেশ তথা তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের মানচিত্র সম্বন্ধে পরিচিত হই । সে বছর বাংলাদেশে এক ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাসে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছিল । একদিন আমাদের ক্লাসের ভূগোল স্যার সুখেন্দু চৌধুরী ক্লাসে ঢুকে খুব মনমরা হয়ে বসে রইলেন । অনেকক্ষণ যাবৎ কিছু পড়াচ্ছেন না । আমরাও তাঁর দিকে তাকিয়ে আছি । আমাদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত বয়সে বড়ো সহপাঠী কৃষ্ণকান্তদা সাহস করে স্যারকে জিজ্ঞেস করলেন, স্যার আপনার কি হয়েছে ? চুপচাপ বসে রয়েছেন কেন ? স্যার ধীরে ধীরে বললেন, পাকিস্তানে আমার বাড়ি । সেখানে আমার পূর্ব পুরুষরা রয়েছেন । আমাদের যেখানটায় বাড়ি নোয়াখালীর সন্দীপ । সেটা দ্বীপাঞ্চল । গতকাল সেখানে প্রচন্ড জলোচ্ছ্বাস হয়ে গেছে । বহু লোকের প্রাণহানি ঘটেছে । আমার মা বাবারা এখনো সেখানে রয়েছেন । দেশের মায়া ছেড়ে সেখান থেকে আসেননি । জানিনা তারা কেমন আছেন । আদৌ বেঁচে আছেন কিনা বলতে পারছিনা । বলতে বলতে তাঁর চোখ ছল ছল করে উঠেছিল সেদিন । একটু পরেই তিনি একজন ছাত্রকে স্টাফরুম থেকে গ্লোবটা আর ভারত ও পাকিস্তানের দুটো ম্যাপ আনার জন্য বললেন । একজন গিয়ে সেগুলো নিয়ে এল । প্রথমে তিনি গ্লোব থেকে ভারত ও পাকিস্তানের অবস্থান আমাদের সামনে তুলে ধরলেন । পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের অবস্থান স্পষ্ট করে দিলেন আমাদের কাছে ম্যাপের মাধ্যমে । তারপর পূর্ব-পাকিস্তানের কোথায় সন্দ্বীপ-হাতিয়া ও অন্যান্য চরাঞ্চল রয়েছে সেগুলো আমাদের দেখাতে লাগলেন । স্যার যখন বর্ণনা করছিলেন তখন মনে হচ্ছিল, তিনি যেন পূর্বপাকিস্তানে অবস্থান করছেন । মনে হচ্ছিল যেন তিনি সন্দ্বীপের তার জন্মভিটে দাঁড়িয়ে আছেন । তাঁর নিজের গ্রামের বর্ণনা করছিলেন আবেগের সঙ্গে । আমরাও পরিচিত হচ্ছিলাম আমাদের পূর্বপুরুষের বাস্তুভূমি পূর্ববাংলা তথা পূর্বপাকিস্তানের সঙ্গে । যে দেশের কথা আমি আমার মা-বাবার মুখে বারবার শুনেছি । একসময় স্যার থামলেন । আমাদের সামনে মানচিত্র তুলে ধরে সেখানকার বর্ণনা করে সেদিন তিনি নিজেকে অনেক হালকা বোধ করেছিলেন । সেই সুখেন্দু স্যারের কাছে আমরা পরের বছর অর্থাৎ ১৯৭১ সালের মার্চের এক ভোরে পড়া বুঝতে যাই । সুদর্শন সুখেন্দু স‍্যার তার ছোট্ট মেয়েটিকে কোলে নিয়ে সকালের প্রাতরাশ সারছিলেন । সামনে মারফি কোম্পানির একটা রেডিওতে সংবাদ চলছে । তিনি ইঙ্গিতে আমাদের বসতে বললেন । কথা বলতে বারণ করলেন । আমরা চুপচাপ বসে পড়লাম। একটু পরেই ভরাট এবং জোরালো কণ্ঠস্বর রেডিওতে ভেসে এলো । "ভাইয়েরা আমার, আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি । আপনারা সবই জানেন এবং বোঝেন । আমরা আমাদের জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি । কিন্তু দুঃখের বিষয় আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুরে আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে । আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায় ।...." যেন এক দৈবীকণ্ঠস্বরে স‍্যারের রুমটা গম গম করে উঠল । রেডিওর ছোটো ছোটো লাইটগুলো মুহুর্মুহু লাফিয়ে লাফিয়ে উজ্জ্বল আলো ছড়াচ্ছে । কারো মুখে কোন কথা নেই আমরা কয়েকটা ছাত্র মগ্ন হয়ে বসে আছি স্যারের সামনে । এমন কণ্ঠস্বর আমি কখনো শুনিনি । আমার চোখের সামনে যেন হাওয়ায় ভাসছে আমাদের ইতিহাস বইয়ের 'ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে'র পাতা গুলো । ভেসে উঠছে শহীদ ক্ষুদিরাম বসুর মুখ, মাস্টারদা সূর্যসেনের মুখ, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মুখ । তাহলে তারা কি এভাবেই জলদগম্ভীর ভাষণের মধ্য দিয়েই দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন ? "...তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো । মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব ।এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ । এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম । এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম । জয় বাংলা ।জয় বাংলা ।একসময় ১৮মিনিটের দীর্ঘ এই ভাষণ শেষ হয়। এক বিধ্বংসী ঝড় থেমে গেলে যেমন চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে থাকে অনেকক্ষণ । তেমনি স্যারের পড়ার টেবিলে বসা আমরা কয়েকজন কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে রইলাম । সেদিন আর স্যার পড়ালেন না । তিনি জানালেন আগের দিন ৭ মার্চ বিকাল বেলা ঢাকার রমনায় অবস্থিত রেসকোর্স ময়দানের ( বর্তমান সোরোয়ার্দী উদ্যান ) এক জনসভায় ভাষণ দিয়েছেন পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান । তিনি ধীরে ধীরে আমাদের সামনে সেদিন তুলে ধরলেন সেদেশের ৫২র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে তখনকার সময় পর্যন্ত গণআন্দোলনের ইতিহাস । সে দেশের সামরিক শাসক বর্গ যে বারবার তাদের উপর আঘাত হেনেছে তার কথা । আইয়ুব খানের মার্শাল ল'র কথা । ইয়াহিয়া খানের কূটনৈতিক চালের কথা । সে দেশের পূর্বপ্রান্তের এই অংশটি যে ধীরে ধীরে স্বাধীনতার দিকে এগোচ্ছে তার ইঙ্গিতও সেদিন দিলেন সুখেন্দু স‍্যার । প্রতিবেশী দেশ সম্পর্কে গভীর প্রত্যয় নিয়ে সেদিন বাড়ি ফিরে এসেছিলাম আর বারবার ভাবছিলাম এই মেঘমন্দ্রিত কণ্ঠস্বরের অধিকারী মানুষটি না জানি কেমন ! দু'একদিনের মধ্যেই বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় বিরাট ছবিসহ শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক সভার ছবি ফলাও করে প্রকাশিত হয় । সাদা রংয়ের পাঞ্জাবির উপর কালো হাতাকাটা কোট গায়ে পেছনদিকে আঁচড়ানো চুলের অধিকারী এক বিরাট সুপুরুষের তর্জনী তুলে ধরা শেখ মুজিবর এর ছবি সেদিন সব কাগজে বেরিয়েছিল ‌। তার সেই ঐতিহাসিক ভাষণের উন্মাদনা সেদিন ছড়িয়ে পড়েছিল এদেশের মাটিতেও । সেদিন রাজ্যের দৈনিক সংবাদ পত্রিকার একটি সংখ্যায় বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ পুরোপুরি তুলে ধরা হয়েছিল ‌। পাশে ব্লক করে তুলে দেওয়া হয়েছিল 'জাগো অনশন বন্দী ওঠো রে যত / জগতের লাঞ্ছিত ভাগ্যহত'–গানটি । সেদিন থেকেই এদেশের পথে-প্রান্তরে, হাটে-বাজারে, চায়ের দোকানে সর্বত্রই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণটি সকলের আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছিল । তারপর ২৫ শে মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তান বাহিনী নেমে পড়ে ঢাকার রাজপথে । ব্যাপক ধরপাকড়, নির্বিচারে গণহত্যা চালাতে থাকে । গ্রেফতার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে যান এবং তাঁর পক্ষে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে এই ঘোষণাটি সম্প্রচারিত হয় । নিজেদের জীবন ও সম্ভ্রম বাঁচাতে সেদেশ থেকে শরণার্থীর ঢল নামে ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয় রাজ্যের বুকে । পরদিন স্কুলের প্রেয়ার মিটিংয়ে সুখেন্দু চৌধুরী স‍্যার, সুনীল বর্মন সার, কাশিনাথ দাশ স‍্যার সংক্ষেপে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন । শরণার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের সাহায্যের হাত বাড়ানোর জন্য বার্তা দেন প্রধান শিক্ষক পূর্ণেন্দু বিকাশ দত্ত মহোদয় । সে অনুযায়ী আমি, প্রধান শিক্ষক মহাশয়ের ছেলে মৃন্ময় দত্ত ও একাদশ শ্রেণির আরো কয়েকজন ছাত্রের নেতৃত্বে জনগণের কাছ থেকে চাঁদা সংগ্রহ শুরু করি । আমাদের শিক্ষক-শিক্ষিকা ও অভিভাবকমন্ডলীর অধিকাংশেরই পূর্ব বাসস্থান পূর্ববঙ্গে হওয়ায় তাঁরা আমাদের একাজে উৎসাহ দিতে থাকেন । দেখতে দেখতে আমাদের লোকালয় শরণার্থীতে ভরে যায় । বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সেদিন যেন আমাদের প্রাণেও দোলা দিয়েছিল ১৯৭১ এর ১৩ এপ্রিল রাতে আকাশবাণী কলকাতার সংবাদ বিচিত্রায় প্রকাশ করা হয় বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ । সেইসঙ্গে গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা "শোনো একটি মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি / আকাশে বাতাসে ওঠে রণি / বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ" গানটি বাজানো হয় । এই গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছিলেন এপারের বিশিষ্ট শিল্পী অংশুমান রায় । হিন্দুস্থান রেকর্ড কোম্পানি থেকে ৪৫ আরপিএম এর একটি রেকর্ড বের করা হয় বঙ্গবন্ধুর ভাষণ এবং অংশুমান রায়ের গানের । রেকর্ডটি সেদিন এত জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল যে সেটি সে সময়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, পূজা প্যান্ডেলে প্রচুর বাজতে থাকে । সেই গানের রেকর্ড সেদিন ত্রিপুরার প্রত্যন্ত গ্রাম সাব্রুমের ছোটখিলের রানির বাজারের অনিল চৌধুরীর ( অনিল ঠাকুর ) চায়ের দোকানে অনবরত বাজত । সে সময় সারা সাব্রুমে একমাত্র অনিল ঠাকুরের কাছেই মাইকসরঞ্জাম ছিল । বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণ সেদিন অনবরত শুনতে শুনতে আমাদের মত কিশোর ও তরুণদের মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। তারপর ১০ মাস ব্যাপী বাংলাদেশের রক্তাক্ত স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের কথা সবারই জানা । ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ ঢাকায় পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে আসে বাংলাদেশের কাঙ্খিত স্বাধীনতা । দেশ স্বাধীন হলেও দেশবাসীর মনে শান্তি ছিল না । তাঁরা খুঁজছিলেন তাদের দেশ নায়ককে । আমরা এদেশের তরুণরাও সন্ধান করছিলাম প্রতিবেশী রাষ্ট্রের স্বাধীনতা যুদ্ধের মহানায়কে । বঙ্গবন্ধুকে । তিনি তখন পাকিস্তানের সামরিক কারাগারে বন্দি অবস্থায় নির্যাতন সহ্য করছেন ।তাঁর মুক্তির জন্য বাংলাদেশের জনগণের সাথে আমাদের দেশের তদানিন্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও বিশ্বজনমত গড়ে তোলেন । চাপে পড়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাঁকে মুক্তি দেয় । পাকিস্তানি কারাগারে বঙ্গবন্ধুর সেলের পাশে একটি কবরও খোঁড়া হয়ে গিয়েছিল । ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ৭জানুয়ারি রাত ২ টায় লন্ডনের উদ্দেশ্যে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারওয়েজের একটি বিমান লন্ডনের রাওয়ালপিন্ডি ত্যাগ করে । লন্ডন থেকে নয়াদিল্লি ফিরে এসে তিনি ভারতের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন । তিনি জনসমক্ষে ভাষণে ইন্দিরা গান্ধী ও 'ভারতের জনগণ আমার জনগণের শ্রেষ্ঠ বন্ধু' বলে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন । ১৯৭২ এর ১০ জানুয়ারি তিনি তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশের মাটিতে পদার্পণ করেন । দেশে ফিরেই তিনি একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের দিকে মনোনিবেশ করেন । দেশের উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিবিড় করার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি এগিয়ে যেতে থাকেন ‌। কিন্তু তার ক্ষমাসুন্দরশ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সেদিন স্বাধীনতার শত্রুরা পার পেয়ে যায় ‌। আর সেই সুযোগে তারা গোপনে বিষদাঁত, নখ বিস্তার করতে থাকে সে দেশের মাটিতে । তখন আমি কলেজে পড়ি । ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট । যেদিন আমাদের দেশে স্বাধীনতা দিবস পালনের প্রস্তুতি চলছে । রাত পোহালেই যেদিন দেশজুড়ে উড়বে তেরঙ্গা পতাকা । ঠিক সেদিনই ভোররাতে একদল সেনা কর্মকর্তা ট্যাংক নিয়ে সদ্যোজাত প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহর ঘিরে ফেলে । ঘিরে ফেলে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডিস্থ বাসভবন এবং শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবার ও ব্যক্তিগত কর্মচারীদের নির্বিচারে হত্যা করে । সেদিন ভোরে আমরা ছোটখিল থেকে দলবেঁধে সাব্রুম শহরে এসেছিলাম মেলার মাঠে আয়োজিত স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান দেখার জন্য । সকালের আকাশবাণীর সংবাদ সম্প্রচার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবাই জেনে যায় নির্মম মুজিব হত্যাকাণ্ডের সংবাদ ।আমরা একদল ছুটে যাই সাব্রুম বাজার ঘাটে ফেনী নদীর পাড়ে । ওপারেই বাংলাদেশের পার্বত‍্য চট্টগ্রামের রামগড় থানা ।দেখি সৈনিকের পোশাকপরা একজন থানার পেছনে নদীর দিকে এসে চিৎকার করে কাঁদছে আর থানার দেওয়ালে মাথা ঠুকছে । তার বুকফাটা আর্তনাদে দুপারের আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে । কিছুক্ষণ পরে কয়েক জন অস্ত্রধারী সৈনিক এসে তাকে নিয়ে যায় ভেতরের দিকে । সেদিন আমাদের এখানেও স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান নিষ্প্রভ হয়ে যায় । সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানের পর সবাইকে দ্রুত স্থান ত্যাগ এর নির্দেশ দেওয়া হয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে । আজ আমি দাঁড়িয়ে আছি ২০২২ এ । বাঙালি জাতিসত্তার প্রতীক ও একটি জাতিরাষ্ট্রের জনক শেখ মুজিবুর রহমানের শতবর্ষ পূর্তিলগ্নে । বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের ও বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ৫০ বছর পূর্তিকালে । কৈশোর থেকে বার্ধক্যকালীন সময় ধরে আমার জীবনের এই পথ চলায় গোমতী-ব্রহ্মপুত্র-গঙ্গা-পদ্মা-মেঘনার বুক বেয়ে অবিরত জলধারা বয়ে গেছে । আমাদের প্রজন্ম দেখেছে আমাদের পূর্বজদের স্বপ্নে দেখা বিশ্বকবির সোনার বাংলা, নজরুলের বাংলাদেশ, আর জীবনানন্দের রূপসী বাংলার,প্রথম শুভক্ষণ । চোখে না দেখলেও শুনেছি তার জনকের উদাত্ত কণ্ঠস্বর । তার জলদগম্ভীর কণ্ঠস্বরের প্রবাহ বহমান নদীর মতো আমাদেরও চেতনায় ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়েছে । তাঁর ঘোষিত ভ্রাতৃত্ববোধই আমাদের প্রতিবেশী সম্পর্ককে দৃঢ় করবে । ভালোভাবে চেনার আগেই নৃশংস ঘাতক তাঁকে কেড়ে নিয়েছে নতুন প্রজন্মের কাছ থেকে । এশূন‍্যতা পূর্ণ হবার নয় । তবুও দুই দেশের তরুণ প্রজন্ম প্রতিবশীর মতো হাতে হাত মিলিয়ে এগিয়ে চলেছে । বঙ্গবন্ধু জেগে থাকবেন আমার হৃদয়ে, আমাদের অন্তরে । জয় হিন্দ । জয় বাংলা । ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী দীর্ঘজীবী হোক ।

বিশেষ প্রতিবেদনঃ বাংলা ভাষার জন্য এক দারুণ ব্যাপার ঘটল সেদিন। দিনটি ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ইউনেসকোর ৩০তম অধিবেশন বসে। ইউনেসকোর সেই সভায় ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব পাস হয়। ফলে পৃথিবীর সব ভাষাভাষীর কাছে একটি উল্লেখযোগ্য দিন হিসেবে ২১ ফেব্রুয়ারি স্বীকৃতি পায়। বিশ্বের দরবারে বাংলা ভাষা লাভ করে বিশেষ মর্যাদা। ঠিক পরের বছর ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে পৃথিবীর ১৮৮টি দেশে এ দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন শুরু হয়।২১ ফেব্রুয়ারি বিশ্বে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পেছনের ঘটনা জানতে হলে আমাদের একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। আমরা জানি, একুশে ফেব্রুয়ারি মহান ভাষা আন্দোলনের দিন। প্রতিবছরই মর্যাদার সঙ্গে বাংলাদেশসহ বিশ্বে অনেক দেশে দিনটি পালিত হয়ে আসছে। এমনকি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং ত্রিপুরা রাজ্যে ‘বাংলা ভাষা দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে এই দিনটি।২১ ফেব্রুয়ারির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করার আগে, এই দিনটি মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের জন্য বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে দাবি শোনা যায়, বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকেও এ দাবি তোলা হয়। এ রকম আরও কিছু ব্যক্তিগত ও বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের কথা আমরা জানতে পারি। তবে এ বিষয়ে প্রথম সফল উদ্যোক্তারা হলেন কানাডার বহুভাষিক ও বহুজাতিক মাতৃভাষা-প্রেমিকগোষ্ঠী। এই গোষ্ঠী প্রথমে ১৯৯৮ সালের ২৯ মার্চ জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনানের কাছে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ নামে একটি দিবস ঘোষণার প্রস্তাব উপস্থাপন করে। সেখানে তাঁরা বলেন, ‘বাঙালিরা তাদের মাতৃভাষাকে রক্ষার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সেটা ছিল তাদের ভাষার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। আজকের পৃথিবীতেও অনেক জাতি-গোষ্ঠীর ভাষাও একই সমস্যা ও বিপদের মধ্যে আছে।’ কাজেই মাতৃভাষা দিবসের দাবিটি খুবই ন্যায়সংগত। মাতৃভাষা-প্রেমিকগোষ্ঠীর এই চিঠিতে স্বাক্ষর করেছিলেন সাত জাতি ও সাত ভাষার ১০ জন সদস্য। তাঁরা হলেন অ্যালবার্ট ভিনজন ও কারমেন ক্রিস্টোবাল (ফিলিপিনো), জ্যাসন মোরিন ও সুসান হজিন্স (ইংরেজি), ড. কেলভিন চাও (ক্যান্টনিজ), নাজনীন ইসলাম (কা-চি), রেনাটে মার্টিনস (জার্মান), করুণা জোসি (হিন্দি) এবং রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম (বাংলা)। জাতিসংঘ মহাসচিবের অফিস থেকে এই পত্রপ্রেরকদের জানিয়ে দেওয়া হয়; বিষয়টির জন্য নিউইয়র্কে নয়, যোগাযোগ করতে হবে প্যারিসে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি-বিষয়ক সংগঠন ইউনেসকোর সঙ্গে। জাতিসংঘের কর্মরত বাঙালি কর্মকর্তা হাসান ফেরদৌসেরও এ ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা ছিল সে সময়। এরপর প্রায় এক বছর পেরিয়ে যায়। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি ইউনেসকো। কানাডা প্রবাসী বাঙালি আবদুস সালাম ও রফিকুল ইসলাম (যাঁরা মাতৃভাষা-প্রেমিকগোষ্ঠীর সদস্য) এ বিষয়ে ইউনেসকোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করেন। প্রথমে টেলিফোনে এবং পরে চিঠিতে। ১৯৯৯ সালের ৩ মার্চ ইউনেসকো সদর দপ্তরের ভাষা বিভাগের কর্মকর্তা আন্না মারিয়া মেজলোককে রফিকুল ইসলাম একটি চিঠিতে জানান যে ‘২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার তোমাদের অনুরোধটি বেশ আকর্ষণীয় মনে হয়েছে।’ কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার একজন কর্মকর্তার কাছে এই প্রথম বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়। আন্না মারিয়া আরও জানান, ‘বিষয়টি ব্যক্তিগতভাবে উত্থাপনের কোনো সুযোগ নেই, ইউনেসকোর পরিচালনা পরিষদের কোনো সদস্য রাষ্ট্রের মাধ্যমে সভায় এটি তুলে হবে। ইউনেসকো সদর দপ্তরের ভাষা বিভাগের কর্মকর্তা মারিয়া রফিকুল ইসলামকে ইউনেসকো পরিচালনা পরিষদের কয়েকটি সদস্য দেশের ঠিকানাও পাঠিয়ে দেন। এতে বাংলাদেশ, ভারত, কানাডা, ফিনল্যান্ড এবং হাঙ্গেরির নাম ছিল। ইউনেসকো সাধারণ পরিষদে বিষয়টি আলোচ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করতে হলে কয়েকটি সদস্য দেশের পক্ষে প্রস্তাব পেশ করা জরুরি। তখন হাতে সময় ছিল খুবই কম। কেননা অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই সাধারণ পরিষদের সভা বসবে। কানাডা থেকে রফিকুল ইসলাম বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বিষয়টি রাষ্ট্রের জন্য গর্বের বিষয় মনে করে মন্ত্রণালয় অতি দ্রুত প্রধানমন্ত্রীর অফিসে অনুমতি চেয়ে নোট পাঠায়। বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সময়স্বল্পতার বিষয়টি উপলব্ধি করেন। তিনি সব ধবনের জটিলতা উপেক্ষা করে নথি অনুমোদনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছাড়াই ইউনেসকোর সদর দপ্তরে প্রস্তাবটি পাঠিয়ে দেন সরাসরি। ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৯৯ সালে সংক্ষেপে বাংলাদেশ জাতীয় ইউনেসকো কমিশনের পক্ষে এর সচিব অধ্যাপক কফিলউদ্দিন আহমদের স্বাক্ষরিত সেই প্রস্তাবটি প্যারিসে পৌঁছে যায়। তখন ইউনেসকোর নির্বাহী পরিষদের ১৫৭তম অধিবেশন এবং ৩০তম সাধারণ সম্মেলন ছিল। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের বিষয়টি নিয়ে ইউনেসকোতে দুটি সমস্যা দেখা দেয়। প্রথমত, ইউনেসকো ভেবেছিল, এমন একটা দিবস পালন করতে গেলে ইউনেসকোর বড় অঙ্কের টাকাপয়সা প্রয়োজন হবে। প্রতিবছর অনেক টাকাপয়সা খরচের কথা ভেবে প্রথমেই প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। একই সঙ্গে ইউনেসকো মহাপরিচালক International Mother Language Day নয়, International Mother Tonguae Day নামে একে অভিহিত করতে সচেষ্ট হন। মহাপরিচালক এ জন্য এক লাখ ডলারের ব্যয় বরাদ্দের প্রস্তাব করেন এবং দুই বছর পর নির্বাহী পরিষদের ১৬০তম অধিবেশনে একটি সম্ভাব্যতা জরিপের মাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরার আদেশ দেন। এর ফলে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার বিষয়টি আটকা পড়ে। প্রস্তাবটি কার্যকর হতে কমপক্ষে দুই বছর সময় লাগবে বলে মনে করা হয়। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী এ এস এইচ কে সাদেক। শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন ইউনেসকো অধিবেশনে যোগদানকারী বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতা। তিনি অধিবেশনে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, যেখানে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পটভূমি ও তাৎপর্য পৃথিবীর ১৮৮টি জাতির সামনে তুলে ধরেন। এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন দেশের শিক্ষামন্ত্রীদের সঙ্গে ঘরোয়া বৈঠক করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের পক্ষে অভিমতও গড়ে তুলতে চেষ্টা করেন। এমনকি উপস্থিত সদস্যদের বোঝাতে সক্ষম হন, দিবসটি পালন করতে প্রকৃতপক্ষে ইউনেসকোর এক ডলারও লাগবে না। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষাভাষীর মানুষ নিজেরাই নিজেদের মাতৃভাষার গুরুত্ব আলোচনা ও জয়গান গাইতে গাইতে দিনটি পালন করবে। এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার ডকুমেন্টেশন পুস্তিকায় সদস্যসচিব ড. মোহাম্মদ হাননান লিখেছেন, ‘শিক্ষামন্ত্রী এ এস এইচ কে সাদেক একই সঙ্গে কতকগুলো ব্যক্তিগত কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও চালান। এক রাতে তিনি পাকিস্তানি প্রতিনিধিদের নেতার সঙ্গেও একটি বৈঠকের আয়োজন করেন। প্রস্তাবটিতে পাকিস্তানের সমর্থন প্রয়োজন ছিল। কারণ, যে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রশ্ন ঘিরে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি সংঘটিত হয়েছিল, তাতে পাকিস্তানের মনোভাবে অবশ্যই না-বাচক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা ছিল। এ ছাড়া অন্যান্য মুসলিম দেশ, বিশেষ করে সৌদি আরবের সমর্থনের ক্ষেত্রেও সে দেশের ইতিবাচক ভূমিকা প্রভাব ফেলতে পারত। ১৯৯৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পাকিস্তানে সামরিক সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল। ফলে পাকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রী সে বছর ইউনেসকো সম্মেলনে যাননি, পাকিস্তানি দলের নেতৃত্ব দেন পাকিস্তানের শিক্ষাসচিব। বৈঠকে এ এস এইচ কে সাদেক আবিষ্কার করেন, পাকিস্তানের শিক্ষাসচিব একসময় তাঁর অধীনে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে কাজ করেছেন। আরও মজার বিষয়, পাকিস্তানের শিক্ষাসচিব বাংলায় চমৎকার কথা বলতে পারেন। ফলে এ বৈঠক খুবই সফল হলো। তিনি প্রস্তাবটি সমর্থনের আশ্বাস দেন। ...ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিয়েও কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছিল। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণায় তাদের আপত্তি ছিল না। তবে তারা ফেব্রুয়ারির ২১ তারিখ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। পাশ্চাত্য দেশগুলোর কাছে শিক্ষামন্ত্রী যুক্তি ও আবেগের সঙ্গে এই বিষয়টি তুলে ধরেন যে পৃথিবীতে বাঙালিরা মাতৃভাষার অধিকারের জন্য রক্ত দিয়েছে। সেটা ফেব্রুয়ারির ২১ তারিখে। তখন ইউরোপীয়রা ব্যাপারটা বুঝতে পারে।’এভাবে দীর্ঘ প্রক্রিয়া পার হওয়ার পর ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ২১ ফেব্রুয়ারি লাভ করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা। ইউনেসকোর ঐতিহাসিক সেই অধিবেশনে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের মূল প্রস্তাবক ছিল বাংলাদেশ এবং সৌদি আরব। আর সমর্থন করেছিল আইভরি কোস্ট, ইতালি, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, কমোরোস, ডোমিনিকান রিপাবলিক, পাকিস্তান, ওমান, পাপুয়া নিউগিনি, ফিলিপিন, বাহামাস, বেনিন, বেলারুশ, গাম্বিয়া, ভারত, ভানুয়াতু, মাইক্রোনেসিয়া, রুশ ফেডারেশন, লিথুয়ানিয়া, মিসর, শ্রীলংকা, সিরিয়া ও হন্ডুরাস। ১৯৯৯ সালে একুশে ফেব্রুয়ারির আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা লাভ শুধু বাংলা ভাষার বিশ্ববিজয় নয়; পৃথিবীর সব মাতৃভাষার জয়। তথ্যসুত্রঃ ইন্টারনেট থেকে।

সুভাষচন্দ্র বসুর আদর্শ ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

সুভাষচন্দ্র বসুর আদর্শ ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
বিভাস ঘোষাল : সুভাষ চন্দ্র বসু বলতেন এক সৈনিক হিসেবে সর্বদা তিনটি আদর্শ দ্বারা চালিত হবে । এই আদর্শগুলি হল- সত্য, কর্তব্য ও আত্মবলিদান। যে সিপাহী দেশের প্রতি বিশ্বস্ত থাকে এবং দেশের জন্য কর্তব্য ও বলিদান দিতে সর্বদা প্রস্তুত থাকে, সে অজেয়। তুমিও যদি অজেয় হতে চাও তাহলে এই তিনটি আদর্শ মেনে চল। সিঙ্গাপুরে দেওয়া একটি বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, সব থেকে বড় অপরাধ অন্যায়কে সহ্য করা এবং অন্যায়কারীর সঙ্গে সমঝোতা করা। বর্তমানে এখন যে রোগ ধরা পড়েছে তা হল দুর্নীতির সঙ্গে সমঝোতা, অন্যায়কারীর সঙ্গে সমঝোতা যা সমাজকে অন্ত:সারশূন্য করে দিচ্ছে। চোখের সামনে নারী নির্যাতন হচ্ছে, ঘুষ নিতে দেখা যাচ্ছে, কিন্তু আমরা পরিবারের দোহাই দিয়ে জীবনের ঝুঁকির দোহাই দিয়ে চাকরির দোহাই দিয়ে সবকিছুর সাথে সমঝোতা করি। নেতাজি বলতেন সমঝোতার চিন্তা বড্ড অপবিত্র বস্তু। তিনি বলতেন আমাকে তৈরি করেছে সংঘর্ষ, এই সংঘর্ষই আমার মধ্যে আত্মবিশ্বাস উৎপন্ন করেছে যা আগে ছিলনা। কষ্টের আন্তরিক নৈতিক মূল্য আছে। আমার জন্মগত প্রতিভা ছিল না, কিন্তু কঠোর পরিশ্রম থেকে বাঁচার প্রবৃত্তি আমার ছিলনা। আমরা সংঘাত ও তা সমাধানের মাধ্যমেই এগিয়ে চলি। আমাদের অবস্থা যতই ভয়ানক হোক বা কন্টকময় হোকনা কেনো তবুও আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। সাফল্যের দিন দূর হতে পারে, তবে তা অনিবার্য। যদি সংঘর্ষই না থাকে, ভয়ের সম্মুখীনই হতে না হয়, তখন জীবনের অর্ধেক স্বাদই শেষ হয়ে যায়। তাই বর্তমান সময়ে এই কথাগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া খুব প্রয়োজন। দেশের স্বাধীনতা এসেছে ঠিকই। কিন্তু এখনো আমরা নিজেরা নিজেদের পরাধীন করে রেখেছি ভয় এর কাছে। দুর্ধর্ষ ইংরেজদের বিরুদ্ধে সেই যুগে নেতাজী আত্মশক্তি বলে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন। বলেছিলেন আমাদের কর্তব্য হল- স্বাধীনতার মূল্য রক্ত দিয়ে চোকাতে হবে। আমাদের আত্মবলিদান ও পরিশ্রমের দ্বারা যে স্বাধীনতা পাওয়া যাবে তাকে রক্ষা করার শক্তি থাকতে হবে। এখন বার বার মনে হয় সেই শক্তি কি আমাদের আছে? আমরা তো এখনও পরাধীন? কিসের এত ভয়? সত্যি কথা বলতে ভয় কিসের? তিনি বলেছিলেন আলাপ আলোচনা করে কখনোই স্হায়ী পরিবর্তন হয়নি। আজ আমাদের ভিতরে কেবল একটাই ইচ্ছা থাকতে হবে - মৃত্যুর ইচ্ছা, যাতে স্বাধীনতার পথ শহীদের রক্তে প্রশস্ত হয়, যাতে ভারতবর্ষ বেঁচে থাকে। বর্তমানে নেতাজির আদর্শ গুলি বড্ড বেশি প্রাসঙ্গিক মনে হয়। কাউকে পড়ে থাকতে দেখে অসুস্থ দেখেও আমরা সাহায্যের হাত বাড়াই না। চোখের সামনে নারী নিগ্রহ দেখলেও এগিয়ে যাই না। কোনদিন দেখা যাবে নিজের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটছে, তখন কেউ এগিয়ে আসবেনা। কাউকে ঘুষ নিতে দেখলে আমরা তাকে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করি। আমরা হয়তো সুযোগ পাইনা তাই নিই না। সততা বড় আপেক্ষিক। তাই নিজের ভালো, পরিবার ও পরিবেশের এবং সমাজের ভালোর জন্যই আমাদের এমন পথ বেছে নিতে হবে যে পথ আমাদের ভবিষ্যৎ কে সুরক্ষিত করবে। এই পথ নেতাজির পথ। এতে পরিশ্রম আছে দুঃখ আছে, তবে মনে আছে তৃপ্তি। (গুগল থেকে সংগৃহীত)

রসের হাঁড়ি আর রসের গুড়

রসের হাঁড়ি আর রসের গুড়
অশোকানন্দ রায়বর্ধন : বাঙালি দুই ধরনের রসের সঙ্গে চিরপরিচিত। আখের রস।আর খেজুর রস । রসনাকে মিষ্ট স্বাদ দিতে এর জুড়ি নেই । খেজুর আরবদেশের ফল । কিন্তু খেজুরের রস বাঙালির একান্ত নিজস্ব উৎপাদিত সামগ্রী । বাংলার মধুবৃক্ষ হল খেজুরগাছ । খেজুরের গুড় বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত । শীতের আমেজে স্বাদে গন্ধে খেজুরের গুড়ের তুলনা মেলা ভার । বাংলা অগ্রহায়ণ মাস থেকে ফাল্গুন পর্যন্ত খেজুরের রস সংগ্রহ করা হয় । সেই রসকে জ্বাল দিয়ে ঘন করে শক্ত গুড়ে পরিণত করা হয় । শীতকালে খেজুরের রস ও গুড় দিয়ে নানা রকমের শীতকালীন সুস্বাদু পিঠা, সন্দেশ, মিষ্টি, মিষ্টান্ন ইত্যাদি তৈরি করা হয়ে থাকে । একসময়ে খেজুরের রস ও তা থেকে তৈরি করা গুড়ের প্রচলন ছিল দক্ষিণবঙ্গ অঞ্চল ও ত্রিপুরার ঘরে ঘরে । বাংলাদেশের ও ত্রিপুরার কোন কোন জেলা বা স্থান এই খেজুর রস বা গুড়ের জন্য বিখ্যাত হয়েছিল । প্রবাদে আছে, 'যশোরের যশ/ খেজুরের রস' কিংবা 'খেজুর রস, খেজুর গুড়/দক্ষিণের মুহুরীপুর' ‌। আমাদের ত্রিপুরা রাজ্য একসময় প্রচুর খেজুর গাছ দেখা যেত । কিন্তু বর্তমানের তা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে । শীত শুরু হলেই একদল গ্রামীণ মানুষ খেজুরের রস সংগ্রহ এবং তা থেকে তৈরি গুড় বিক্রি করে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করতেন । যারা খেজুর গাছ থেকে খেজুরের রস সংগ্রহ করতেন তাদের বলা হত গাছি । বর্তমানে খেজুরগাছের অভাবে খেজুরের রস ও তেমন পাওয়া যায় না এবং দক্ষ গাছিরও অভাব রয়েছে ‌। একসময়ের গ্রামের ঘরে ঘরে কুটির শিল্পের মতো চর্চা হতো খেজুরের রস থেকে খেজুরের গুড় তৈরির । বিভিন্ন ধরন অনুযায়ী খেজুরের গুড়কে রাব বা ঝোলা গুড়, দানাগুড়, পাটালি ও চিটাগুড় ইত্যাদি নানা ভাগে ভাগ করা হয় । পুষ্টিগুণেও খেজুরের গুড় অনন‍্য । কালক্রমে এই কুটির শিল্পটি হারিয়ে যেতে বসেছে । এখন বাজারে খেজুরের গুড় নামে যা বিক্রি হয় তার অধিকাংশই ভেজাল মিশ্রিত । ফলে খেজুর রস ও গুড় এর যে নিজস্ব স্বাদ সেটা আর এখন পাওয়া যায়না । খেজুরের রস আর গুড় বাংলা সাহিত‍্যের উপাদান ছিল । লোকসংগীতে রয়েছে– খেজুরগাছে হাঁড়ি বাঁধো মন / ও গাছে জোয়ার আসিলে / ও গাছ কাটো কুশলে / কোনার দড়ি ছিঁড়ে পড়োনা তলে । কালের প্রবাহে সেই লোকজীবনও হারিয়ে যাচ্ছে কর্পোরেট জীবনের গতির কাছে । লোকসংস্কৃতিও লুতপ্রায় চটজলদি খাবারের দাপটে । খেজুরগাছও নেই । হাঁড়ি বাঁধার তাগিদও আর নেই ।

আমাদের বই


জনপ্রিয় কবিতা

  • আলমগীর কবীর
    ইতিহাসের পথ যেখানে বাধা, সেখানেই জন্ম নেয় নতুন পথ। পাথরের দেয়াল যতই উঁচু হোক, মানুষের স্বপ্ন তার চূড়া ছুঁয়ে ফেলে। ঝড় যতই ভয়ংকর হোক, তার ভেতর...
  • অদিতি তুলি
    যাপিত জীবন ‎কোজাগরী জ্যোৎস্নায় শুদ্ধ স্নান সেরে উঠেছে প্রিয় সপ্তপর্ণী!  ‎রাত্রি দ্বিপ্রহর - ‎আনন্দময়ীর উঠোন জুড়ে কি সুতীব্র ঘ্রাণ  ‎নাম না ...
  • পাপিয়া দাস
    বার্ধক্য   আমার দিদিমা সাংসারিক বাজার সাজিয়েছেন, বাজারের পরসায়  ছেলে, মেয়ে ,নাতি নাতনি ,নাত বৌ, নাতিন জামাই, নাত ছেলে মেয়ে ,আরও কত কি! স...
  • সোমেন চক্রবর্তী
      রঙ এসো হলুদ হই দিন যেমন গড়ায়  কাঁচা রঙ জ্বলে যেভাবে বাদামী হয় শেষে নয়তো নীল একটা দু:খ, কাতরতা, দুজনকে ঘিরে আর্তি; লাল হবে? লাবণ্য, ঠোঁট, গ...
  • পিয়ালী সেনগুপ্ত
    ঠাঁই নাই দিন বদলে যায়, সময় বদলে যায়, দ্রুত বদলাতে থাকে ক্ষণ। বদল নাকি বদলানো,তুচ্ছাতি তুচ্ছ হতে থাকে মন। কাল যে ছিল চোখের মনি,রুপোর জবা ক...
  • সহিদুল ইসলাম দেবযান
    সারেং বিভূঁই শহরে চড়ছি ভেড়ার মতো নদীর চড় ডাকে ঘন রাইতে। ধানের ক্ষেতের তাজা গন্ধ নিয়া ঘুমাইতে চাই একটা ধুরুম কাইতে। যন্ত্র আমার অন্ত্র কাঁপায়...
  • আলম সাইফুল
    গণবিপ্লবটি ঐক্যের ডানায় আরও স্বপ্নবাজ হয়ে উঠুক অসম্ভব সম্ভাবনাময় একটি গণবিপ্লব গণকবরের দিকে পদযাত্রা করবার আগেই সে ঘুরে আসুক কৃষকের উঠান, ...
  • লিটন আচার্য
    একটা খোঁজ (অনুগল্প) এখন রাত গভীর। প্রতিবিম্বে নিজেকে খুঁটিয়ে দেখি। একফালি গামছা। জানান দেয় উলঙ্গ ন‌ই। অথচ জানি, কী ভীষণ রকম আবরণ হীনতায় ছ...
  • অনুরুপা বনিক
    আনমনা শুধু    কেন জানি এত আনমনা শুধু সে, ভুলে যায় দেওয়া কথা আর হারানো  সুর, মনে কি যেন ভয়ে নীরবে ‍থাকে সারাদিন, কোন কাজে বসে না মন  মন যে...
  • পঙ্কজ কান্তি মালাকার
    ছায়া-ভার অফিসপাড়ার গাছের ছায়া                     ঝাঁকি জালের মতো ঝেঁকে ধরে শহর শিলচরের ফুটপাত চোরাবালি হয়ে আছে, শহরের প্রতিটি পথ       ...

যোগাযোগ করুন

Name

Email *

Message *

Labels

  • কবিতা

Tags

কবিতা (1)
tridharapatrika. Picture Window theme. Theme images by fpm. Powered by Blogger.