বাবা'র বিবর্তন
প্রতিটি সন্তানের কাছে তার বাবা নিরাপত্তার চাদর । নির্ভরতার আকাশ ।বাবা আছেন বলেই তার সন্তান বেঁচে থাকার সাহস পায় । আমাদের শাস্ত্রবাক্যেও রয়েছে 'পিতা স্বর্গ পিতা ধর্ম পিতাহি পরমং তপঃ । পিতরি প্রীতিমাপন্নে প্রিয়ন্তে সর্বদেবতাঃ । ব্যক্তিবিশেষের ক্ষেত্রে সবচেয়ে শ্রদ্ধার স্থান পিতা । পিতা বলতে যে শুধুমাত্র জনক বা জন্মদাতাকে বোঝায় তা নয় । পিতৃস্থানীয় শ্রদ্ধেয় মানবিক সম্পর্ককে পিতার আসনে বসানো হয় । শাস্ত্রমতে পাঁচ বা সাত বিশিষ্টজনকে পঞ্চপিতা বা সপ্তপিতা বলে মান্য করা হয় । তাঁরা হলেন :-
পঞ্চপিতা :- জন্মদাতা, অন্নদাতা,ভয়ত্রাতা, কন্যাদাতা ( শ্বশুর ), উপনয়নদাতা ( দীক্ষাগুরু ) ।
সপ্তপিতা :- জন্মদাতা, অন্নদাতা, ভয়ত্রাতা, কন্যাদাতা ( শ্বশুর ), উপনয়নদাতা ( দীক্ষাগুরু ), জ্ঞানদাতা ( শিক্ষাগুরু ), ও জ্যেষ্ঠভ্রাতা ।
এই পিতাকেই শ্রেষ্ঠ আসনে বসিয়ে কখনো সম্বোধন করা হয় 'পিতাঠাকুর' । আবার যেই শ্রদ্ধেয় বা সম্মাননীয়জন কোনো আদর্শজনিত কোনো বিষয়ে নেতৃত্ব দেন এবং তার ফলে কোনো বিষয় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় তখন সেই বিষয়ের আদ্যপ্রণেতা হিসাবে সেই উদ্যোক্তাকে 'পিতা' সম্বোধন করা হয় । তাঁর আদর্শে কোনো জাতিগোষ্ঠী বা রাষ্ট্র স্বাধিকার অর্জনের মাধ্যমে স্বনামে প্রতিষ্ঠিত হয় । তাঁর অগ্রগণ্য অবদানের জন্য তাঁকে 'পিতা' উপাধিতে সম্মানিত করা হয় । যেমন :- জাতির জনক মহাত্মা গান্ধি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ যমুজিবুর রহমান ।
আবার এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নিয়ন্তা এক অতিপ্রাকৃত সত্তা । এই এক ও অদ্বিতীয় বিমূর্ত সত্তাকে তথা পরম সত্তাকেও 'পিতা' বলে আরাধনা করা হয় । যেমন :- 'বিশ্বপিতা' তুমি, জগৎপিতা, বা পরমপিতা ।
এই পিতা শব্দটি সাধারণ 'জন্মদ' অর্থে বাংলায় বাবা হয়ে উঠল তার মধ্যে ভাষাতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ইতিহাস রয়ে গেছে । তার উৎস খুঁজতে গেলে আমাদের অনেকগুলো বিষয়ের উপর গুরুত্ব আরোপ করতে হয় । তার মধ্যে প্রথমেই আমাদের অভিধানের আশ্রয় নিতেই হয় । জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের অভিধানে 'বাবা' শব্দটির অর্থ ও উৎপত্তি সম্বন্ধে বেশ কয়েকটি তথ্য তুলে ধরা হয়েছে ।
১। বাবা [ তুর্কি শব্দ ] বাবা ( পিতা ) । আরবি আব্বা, হিন্দি বাপ, বাপ্পা, ইংরেজি– papa.
২। বাবু [ চট্টগ্রামে বাউ ] । সংস্কৃত বপ্তা > বপ্পা > বাপা > বাপু > বাবু ( সংস্কৃত ও হিন্দিতে পিতা, বৃদ্ধ, মান্য, সম্ভ
রান্ত অর্থে ) ও বাবা ( ফারসি বাবা– পিতা, বৃদ্ধ, মান্য, সম্ভ্রান্ত ) শব্দের মিশ্রণে সৃষ্ট । ফারসি বাবু ( ঈশ্বরপ্রিয়, ভগবদনুগৃহীত, প্রকৃত জ্ঞানী, যার সদগুণের সৌরভ বা যশের বিস্তার আছে ) । বা ( সহিত ) বু ( গন্ধ > সুগন্ধ ) যশসৌরভযুক্ত । মুসলমানযুগের পূর্বে বাংলায় 'বাপু' লব্দের ব্যবহার ছিল । ' শুন বাপু চাষার বেটা'–খনার বচন । মুসলমান যুগে 'বাবা' হতে উর্দুতে 'বাবু' প্রচলন হয়।
৩। বাপা [ সংস্কৃত বপ্র ]( যে বীজ নিষেক বা বপন করে ) > বাবা ( পিতা, জনক ) ।
এছাড়া সংস্কৃত বপ্তা থেকে হিন্দি বাপ্পা এবং প্রাচীন বৌদ্ধযুগের বাংলায় বপা ব্যবহার পাওয়া যায় । "সরহ ভনই বপা উজুকট ভাইলা"– চর্যাপদ ৩২/৫ ।
মধ্যযুগীয় বাংলায়ও 'বাপা'র ব্যবহার পাই – "সোনা রূপা নহে বাপা এ বেঙ্গা পিতল"–চন্ডীমঙ্গল/কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম ।
মধ্যযুগীয় বাংলায় চিঠিপত্রের ভাষায় 'বাবাজীবন' শব্দটি পাওয়া যায় । তেমনি মুসলমানি চিঠিপত্রের ভাষায় পাওয়া যায় অনুরূপভাবে 'আব্বাজান' বা 'বাপজান' । একটা জায়গায় দেখা যাচ্ছে যে, বপন শব্দ থেকে বাবা শব্দটির বিবর্তন ঘটেছে । এ থেকে বোঝা যায় যে, শব্দটির সঙ্গে কৃষিজীবনের প্রভাবও রয়ে গেছে । 'বাপ' শব্দটির দ্বারা বীজ পরিমাপের একক হিসাবেও বোঝানো হত । 'কুল্যবাপ' শব্দটি তারই প্রমান । সন্তানকেও অনেকসময় বাপ বা বাবা বলে ডাকা হয় । কখনো দেখা যায় ছেলেদের নাম রাখা হয় 'বাপন' । তাও এই 'বাপ' শব্দ থেকেই আগত । লৌকিক খেলার ছড়াতেও আওড়াতে শোনা যায় –'আপন বাপন চৌকি চাপন/এই ছেলেটি খাটিয়া চোর' ইত্যাদি ।
'বাবা' শব্দের উৎপত্তি ও রূপান্তরের ক্রমের মধ্যে এতসব বহুধাবিস্তৃত বিষয় রয়েছে তার মধ্যে একটা জাতির বহু বিবর্তনের কৌতুহলোদ্দীপক দিককে তুলে ধরে । সর্বোপরি এই শব্দের মধ্যে এক গভীর মানবিক আবেগের দিক রয়ে গেছে ।
সহায়ক গ্রন্থ :
১। চলন্তিকা-রাজশেখর বসু । এম. সি. সরকার এন্ড প্রা. লি. কলকাতা ।
২। বঙ্গীয় শব্দকোষ- হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সাহিত্য একাডেমি ।
৩। বাঙ্গালা ভাষার অভিধান ( ২য় খন্ড)- জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস, সাহিত্য সংসদ ।
৪। ব্যবহারিক শব্দকোশ- কাজী আব্দুল ওদুদ, প্রেসিডেন্সি লাইব্রেরী, কলিকাতা ।
৫। সরল বাঙ্গালা অভিধান– সুবলচন্দ্র মিত্র, নিউ বেঙ্গল প্রেস ।