Sep 28, 2022

মিঠু মল্লিক বৈদ‍্য

সুপারহিরো

(গল্প )

সেদিন সকাল থেকেই  হালকা বৃষ্টি। অনিমেষ বেরিয়ে পড়ল অফিসের উদ্দেশ্যে। প্রতিদিন তাকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার চলে অফিস করতে হয়। যত বেলা বাড়ছিল তত বৃষ্টিও বাড়ছিল। বৃষ্টি বাড়ার সাথে সাথে পূর্ণিতার ভাবনাও বাড়ছিল। কিন্তু সকল ভাবনা আড়াল করে অলীক ও অনীককে নিয়ে সব দিনের মতই দিনটা কাটিয়ে দিলেও সন্ধ‍্যা ঘনাতেই পূর্ণিতা খুব চিন্তিত হয়ে উঠলো অনিমেষের ঘরে ফেরা নিয়ে।

অলীক ও অনিক  পূর্ণিতা -অনিমেষের দুই ছেলে। মায়ের মুখ দেখে ও বৃষ্টির অবস্থা দেখে বুঝতে বাকি রইলো না মায়ের চিন্তার কারণ।এবার বাবার ঘরে ফেরা নিয়ে ওরাও চিন্তিত হয়ে পড়ল।

বারবার প্রশ্ন ভেসে যেতে লাগল  "মা বাবা কি করে আসবে এই বৃষ্টি ও বাতাসের মধ‍্যে?" পূর্ণিতা তার সকল ভাবনা চাপা দিয়ে মিষ্টি হেসে বলল "চলে আসবে, চিন্তা নেই তোমাদের।" ঠিক তখনই মোবাইলে রিং বেজে উঠল। পূর্ণিতা কল রিসিভ করার সাথে সাথে ওপার থেকে আস্তে কথা  এলো  "পূর্ণি!আজকে তো বাড়ি ফেরা হবে না। যারা পাঁচটায় বেরিয়েছে তারা এখনো এক দেড় কিলোমিটারও গিয়ে পৌঁছায়নি "  তখন সন্ধ্যা প্রায় ছয়টা । পূর্ণিতা মৃদু কন্ঠে বলে উঠল " ঠিক আছে এসো না। তবে থাকবে কোথায়? " ওপার থেকে বলল " গেস্ট হাউসে। "দুই ছেলেকে নিয়ে পূর্ণিতা একা একা ঘরে কিভাবে রাত কাটাবে এই বৃষ্টির দিনে ভাবতে ভাবতে হঠাৎ অনীক প্রশ্ন করল "মা, বাবা কি বললো? আজ আসবেনা? তাহলে আমরা থাকবো কি করে?  ভয় লাগবে না আমার? " পূর্ণিতা বলে উঠলো "মা তো  আছি, কিসের ভয়?" মাত্র ছয় বছরের অনীক। বাবা এক রাত বাড়ি ফিরবে না শুনেই চোখে জল এসে পড়ল। কিন্তু মুখে কিছুই বলল না। সে জানত রাস্তায় জল জমেছে, ঝড়োহাওয়া বইছে। বাইরের পরিস্থিতি ভীষণ খারাপ। তাই হয়তো বাবা আসতে পারবে না। কিন্তু বাবাকে এক রাতও ছেড়ে থাকতে যে সে পারবে না সেই কষ্টটাই চোখের জল হয়ে বেরিয়ে আসলো। অথচ মুখে বাবাকে না আসার  সায় দিয়েছিল। 

কিছুক্ষণ পর অনিমেষ আবারও কল করলো। রিসিভ করেই পূর্ণিতা জিজ্ঞেস করল " থাকার জায়গা পেয়েছ?" বলল "হু"।বাবার কথা শুনেই অলিক ও অনীক দৌড়ে এসে বলল "বাবা তুমি আসবে না?" বলতেই অনীকের গলা ভিজে উঠলো কান্নায়। অনিমেষ ওপার থেকে আদর করে অনিককে জিজ্ঞেস করল " বাবাই একরাত মায়ের কাছে থেকে যেতে পারবে তো? " চাপা গলায় অনীক বলল " না, বাবা; পারবো না,ভয় করবে তো।" বলেই কান্না চেপে চোখ মুছতে মুছতে চলে গেল অন‍্য ঘরে।

মুহুর্তেই অনিমেষ সিদ্ধান্ত পাল্টে নিয়ে বলল -"ঠিক আছে বাবা আমি থাকবো না, বাড়িতেই আসব।তবে অনেক রাত হবে।" পূর্ণিতা বলল " না না আসার দরকার নেই, বাবাই একটু পরে ঠিক হয়ে যাবে ওকে আমি বুঝিয়ে সুজিয়ে আজ রাতটা রেখে দিতে পারবো।এই দূর্যোগের মধ‍্যে আসার কোন দরকার নেই।" অনিমেষ  কথা শুনল না। ছেলের চোখের জল সহ‍্য করা ওর  সকল দুর্যোগের চেয়েও অনেক বেশি কঠিন মনে হল। রাস্তায় রাস্তায় এতটা জল বাড়লো যে গাড়ি চালানো প্রায়ই অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। তার উপর এত লম্বা জ‍্যাম তিন মিনিটের রাস্তা পার হতেই ত্রিশ মিনিট প্রায়। অনীকের কথাগুলি কানে বেজে উঠতেই ওর সব কষ্ট যেন কম হয়ে যায়। এদিকে অস্থির হয়ে যায় অলীক। বাবার জন‍্য সে পাগল হলেও ঐ রাতে না আসার কথা বার বার বলেছিল। ছোট ভাইকেও সে বুঝাতে চেয়েছিল দুর্যোগের কথা, বাবার কষ্টের কথা। কিন্তু,,,,। বাবার জন‍্য অপেক্ষা করতে করতে শেষে কেঁদে দিল অলিক। কারণ অনিমেষের মোবাইল ততক্ষণে অফ হয়ে গেছিল। কতবার যে সে ঘরের বাইরে করিডোরে গেছে তার ঠিক নেই। মা পূর্ণিতাকেও বেশি কিছু বলতে পারছিল না,কারণ মাও যে টেনশনে আছে।ঘরে বেশ নিস্তব্ধতা বিরাজ করছিল। যে ঘর দুই ভাইয়ের দুষ্টমিতে ভরে থাকে সেই ঘর একে বারে শান্ত হয়ে আছে। পূর্ণিতার কিচ্ছু ভালো লাগছিল না। অলিকের সঙ্গে অনীকও কাঁদতে লাগল। পূর্ণিতা নিজের ব‍্যাকুলতাকে সামলে নিয়ে দুই ছেলেকে বুকে নিয়ে বলল " টেনশনের কিচ্ছু নেই,বাবা তো তোমাদের  সুপারহিরো, ঠিক এসে পড়বে বাড়িতে। বাবা কখনো হারতেই পারেনা। ঠিক কিনা? দুই ছেলে এক সংগে বলে উঠলো "হ‍্যাঁ। বাবা সুপারহিরো।"

সন্ধ‍্যা গড়িয়ে রাত,রাত গড়িয়ে মধ‍্যরাত। রাত একটা নাগাদ কলিং বেল টা বেজে উঠতেই দৌড়ে গিয়ে দরজা খোলে অলিক, অনীক। অনিমেষ ঘরে ঢুকতেই দুই ছেলে জড়িয়ে ধরে বাবাকে। অনীক প্রশ্ন করে "বাবা খুব কষ্ট হয়েছে?"খুব জল রাস্তায়?কিন্তু বাবা তুমি না এলে যে অন্ধকারে ঘুমোতে পারতাম না, ভয় পেতাম খুব।" অনিমেষ হেসে বলল" না সোনা কষ্ট নেই, তুই ভয় পাবি ঐ টা যে আমার কষ্টের ছিল।" টুপ করে একটা চুমু কেটে বাবাকে বলল -আমাদের সুপার হিরো বাবা।"