মহাপ্রাণ বিদ্যাসাগর
২৯ জুলাই। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মহা প্রয়াণ দিবস আজ। বাংলা(ভাষা),বাঙালি আর বাঙালি হিন্দুর জন্য কত কিছুই যে করে গেছেন তিনি তা বর্ণনা অতীত। এ লেখা তাঁকে নিয়ে,অসীম মহাসমুদ্রকে সংজ্ঞায়িত করবার ব্যর্থ প্রয়াসকে স্বীকার করে...
রবীন্দ্রনাথের মতো বিদ্যাসাগরের জন্মও ব্রাহ্মণ পরিবারেই কিন্তু দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় বিত্তশালী ছিলেন না। তাই বিদ্যাসাগরকে বেড়ে উঠতে হয়েছে দারিদ্র্যের সাথে সংগ্রাম করে।
ছোটবেলা থেকেই তীক্ষ্ণ মেধাবী বিদ্যাসাগর। মাত্র চার বছর বয়সে গ্রামের পাঠশালায় ভর্তি করে দেওয়া হয় তাঁকে। আট বছর বয়সেই গ্রামের পাঠশালায় পড়াশোনা সম্পন্ন হয়। তাই গ্রামের পণ্ডিতমশাইয়ের পরামর্শে ঠাকুরদাস বিদ্যাসাগরকে নিয়ে যান কলকাতায়।সেখানে ভর্তি করা হয় তাঁকে। আর পিতৃদেব পড়াশোনার খরচ জোগাতে নিযুক্ত হন পাচকের কাজে।
কলকাতাতে ঠাকুরদাস আবাস ঠিক করলেন ভাগাড়ের নিকট। অন্ধকার পরিবেশ,চারদিক দুর্গন্ধময়। কক্ষে সূর্যের আলো প্রবেশ করে না। দিনের বেলাতেও সব কাজ করতে হয় প্রদীপ জ্বালিয়ে। রান্নাবান্না,কাপড় কাঁচা সব কাজ নিজ হাতে সম্পন্ন করেন। এসবের মাঝেই সকল প্রতিকূলতা ছাপিয়ে পূর্ণ মনোযোগে পড়াশোনা চালিয়ে যান বিদ্যাসাগর। কলেজের প্রথম পরীক্ষা,প্রথম হলেন পাঁচ টাকা বৃত্তি পেলেন।
আঠারো বছর বয়সে কলেজের পড়াশোনা সমাপ্ত করেন ।অতপর পণ্ডিতবৃন্দ তাঁকে বিদ্যাসাগর উপাধিতে ভূষিত করেন।
ছাত্রজীবন থেকেই সংস্কার পন্থী মন বিদ্যাসাগরের।স্কুল-কলেজে শুধু ছেলেদের বিচরণ। মেয়েরা স্কুল কলেজে যায় না। ব্যবস্থা নাই যাওয়ার।বিদ্যাসাগর মেয়েদের স্কুলে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করলেন।
বিদ্যাসাগর চোখের সামনে দেখলেন অল্প বয়সের হিন্দু মেয়েদের বহুবিবাহিত বুড়ো পুরুষের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অল্পদিন পরেই বিধবা হয়ে যাচ্ছে মেয়েগুলো।সামজিক ভাবে অভিশপ্ত হয়ে যাচ্ছে বিধবাদের জীবন।বিদ্যাসাগর এখানেও সংস্কার করলেন। বহু কষ্টে পাশ করালেন বিধবাবিবাহ আইন।
দেশে দুর্ভিক্ষ।মানুষের করুণ দশা। চারদিকে মানুষ মারা পড়ছে। বিদ্যাসাগর এগিয়ে এলেন।নিজের এবং সরকারি খরচে শত শত লঙ্গরখানা খুলে মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করলেন।
বিদ্যাসাগর তাঁর সারাটা জীবন মানুষের কল্যাণের জন্য ব্যয় করে গেছেন। কিন্তু শেষ জীবনে তিনি সেই মানুষের ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলেন। দুঃখ করে তিনি এক পত্রে লিখেছেন,"আমার দেশের লোক এত অসার ও অপদার্থ বলিয়া পূর্ব্বে জানিলে আমি কখনই বিধবাবিবাহ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করিতাম না।"
বিদ্যাসাগর বিধবাবিবাহ আইন পাশের জন্য অকাতরে লিখে গেছেন,মানুষের সমর্থন আদায় করেছেন,আন্দোলন করেছেন। এই কঠিন এক সংস্কার করতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন। বিধবাবিবাহ দিয়ে পাত্রপাত্রীর ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়ে প্রায় সর্বস্বান্ত হয়েছেন।
বিদ্যাসাগর বই লিখে উপার্জন করেছেনও অনেক। কিন্তু নিজের জন্য কিছুই করেননি। করেছেন মানুষের জন্য।এ জন্য তাঁকে দয়ার সাগরও বলা হতো।
শেষ জীবনে বিদ্যাসাগরকে বাঙালি মূল্যায়ন করেনি।সঙ্গীহীন হয়ে পড়েছিলেন তিনি। তখন তাঁর প্রিয় হয়ে উঠেছিলো রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রভাবতী নামের আড়াই বছরের ছোট্ট শিশুকন্যা। কিন্তু তাঁর বন্ধু তাঁকে ছেড়ে অসীমে পাড়ি জমালেন। বিদ্যাসাগর তাতে শোকার্ত হলেন,ভেঙে পড়লেন। তার স্মরণে লিখলেন প্রভাবতী সম্ভাষণ।
আসলে এই বাঙালি সংকর জাতি। ভালো-মন্দের মিশেলে তৈরি। ভালোর সংখ্যা নিতান্তই স্বল্প। সল্প সংখ্যক ভালো লোকগণ নিমকহারাম বাঙালির জন্য ভালো কিছু করে যান। কিন্তু নিমকহারামরা কৃতঘ্ন।তা মনে রাখে না।
বিদ্যাসাগর আপনি ভালো থাকবেন।
রেফারেন্স পুস্তক:
১.বিদ্যাসাগর;সৈয়দ নজমুল আবদাল।
২.বাঙালি নারী সাহিত্যে ও সমাজে;আনিসুজ্জামান।
৩.লাল নীল দীপাবলি বা বাঙলা সাহিত্যের জীবনী;হুমায়ুন আজাদ।
৪.বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা(নবম-দশম শ্রেণি)
৫.উইকিপিডিয়া
.jpeg)