Apr 30, 2022

গীতশ্রী ভট্টাচার্য্য

হাইওয়ে

খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যায় ললিতার। দুজন লোক ঘরে। শ্বাশুড়ি আর বউ।  যাদব শহরে কাজ করে। ওদের ঘরে টিভি নেই। এমনি এমনি বিজলী পুড়িয়ে কী লাভ! তাই জলদি খাওয়া দাওয়া করে দুজনেই নিজের নিজের বিছানায় শুয়ে থাকে। ভোরে উঠে পড়ে তাই।

একটু আশেপাশে হেঁটে আসে ঘুম থেকে উঠে।  বয়স হয়েছে। তাও একেবারে মাজা পড়ে যায়নি এখনও। হাঁটতে হাঁটতে পথের দুপাশে যা শাক টাক পাওয়া যায়, সেটা তুলে নিয়ে আসে চাদরের ভেতরে ঢুকিয়ে। 

দুদিন ধরে আবহাওয়া ভাল নেই। বৃষ্টি পড়ছে থেকে থেকে। তাও , বেরিয়েছে বুড়ি। গায়ের চাদর টেনে নেয় পিঠের উপর দিয়ে। বিহু এসেই পড়ল। এবারে তাঁতে বসতে পারেনি বউ পখিলি। বাচ্চা হবে ওর।  পেট নিয়ে এখন বসা কষ্ট ওর ।  ললিতাই  বারণ করেছে।

অন্য বছর বিহুর আগে কিছু গামোচা, চাদর তৈরি করে পখিলী। ওর হাতের কাজ ভাল। পাড়ার বউ ঝি রা বিহুবান দেওয়ার জন্য ওর থেকেই গমোচা , রুমাল নিয়ে যায়। 

হাতে কিছু টাকা আসে এই করে। এবার আর হবেনা। না হোক, এতদিনে কৃষ্ণ গোঁসাই মুখ তুলে চেয়েছেন। আইতা হবে ললিতা। 

বউয়ের জন্য হাঁটতে বেরোলে রাস্তার পাশের গাছ থেকে বগরি, জলপাই যা যখন পায় কুড়িয়ে নিয়ে আসে। এই অবস্থায় কত কিছু খেতে সাধ যায়, সে কী আর বোঝেনা ললিতা। কিন্তু , কোথা থেকে জোগাড় করবে। না একটু ফল, না ডিম, না দুধ কিছুই দিতে পারেনা। তবু, বউয়ের মুখের হাসি দেখলে মন শান্ত হয়ে পড়ে। 

যাদব কে কষ্ট করেই বড় করেছে সে। যাদবের বাবা  যখন মারা যায়, সে তখন মেট্রিক দিয়েছে। পাস ও করল। কিন্তু, আর পড়াবার টাকা কোথায়! নিজেই ছাত্র পড়িয়ে হায়ার সেকেন্ডারি দিল। পাস করতে পারেনি। 

ললিতা হাঁস মুরগি পুষে, ওদের ডিম বিক্রি করে সংসার চালিয়েছে। মাঠে ধান রুয়ার দিনে অন্যের খেতে ধান রুয়েছে, কারো বাড়িতে ধান সেদ্ধ, চাল ভাজার কাজ থাকলেও করেছে তখন। এভাবেই চলে যাচ্ছিল তখন মা ছেলের দিন। 

বাড়িটা ছিল বলে রক্ষে।

গ্রামের ছেলে নবীন শহরে কাজ করে অনেকদিন ধরে। সে ই ললিতা কে বুঝিয়ে যাদব কে নিয়ে শহরে নিয়ে যায়। কাজে ঢুকিয়ে দেয়।

দেখেশুনে বিয়ে দেয় পখিলির সাথে। বাপ মা নেই ওর। মামাবাড়ি থেকে বড় হয়েছে। এখানে এসে ললিতার  সাথে খুব মিশে গেছে। বউ কে চোখে হারায় শ্বাশুড়িও। 

এতদিন বাচ্চা কাচ্চা আসেনি বলে একটু মন মেরে থাকত বউ। ললিতা সবসময় বুঝিয়েছে , ধৈর্য ধরতে বলেছে। 

যাক, এবারে কনমানি আসবে। ললিতার সময় পেরিয়ে যাবে এখন তর তর করে। 

পখিলি কদিন ধরেই কাঁচা আম খেতে চাইছে। এদিকের  কোনো গাছে এখনো আম সেরকম আসেনি। হাইওয়ের দিকে রমেশ মাস্টারের বাড়িতে বেশ আম ধরেছে। গাছটা রাস্তার দিকেই ঝুঁকে থাকে। 

গত রাতে বেশ ঝড় বৃষ্টি হয়ে গেল।  তাই সকাল সকাল উঠেই বেরিয়েছে যদি দুটো আম পায়। বউটা তাহলে দুপুরে ভর্তা বানিয়ে খেতে পারবে।

রমেশ মাস্টারের বাড়ির সামনে গিয়ে বেশ কটা কাঁচা আম পড়ে থাকতে দেখে মন খুশ হয়ে যায় বুড়ির। মেখলার কোঁচরে ভরে নেয় আমগুলো। 

আবার ঝিরঝির করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ললিতা জোরে পা চালায়। একা আছে ঘরে বউ। আজকাল ললিতার চোখের দৃষ্টিও ঝাপসা হয়ে আসছে। 

পেছন থেকে হঠাৎ  লরি এসে সজোরে ধাক্কা মারে ললিতাকে। হাইওয়ে দিয়ে স্পিডে গাড়ি যায় সারাদিন , সারারাত। 

বাড়ির চোতালে ললিতাকে শুইয়ে  রাখা আছে। যাদব পৌঁছে গেছে বাড়ি। পখিলি আছড়ে আছড়ে কাঁদছে।  

সূর্যের শেষ আলো এসে তখন ললিতার কপালে পড়েছে। ওর শরীর স্থির। 

মেখলার ভাঁজ থেকে কটা আম গড়িয়ে পড়ে থাকে ভিজে উঠোনে।