Apr 25, 2022

পুলক রায়

গোবরে পদ্মফুল

প্রবাদ বাক্য বাস্তবের রূপান্তর প্রকট সত্য। নবেন্দু দিব্যেন্দু সুখেন্দু পূর্ণেন্দু ইত্যাদির যৌথ সংসার ।প্রত্যেকেরই দুটি বা তিনটি করে ছেলে মেয়ে ।পৃথা দিব্যেন্দুর প্রথম কন্যা ,মামার বাড়ি থেকে মাধ্যমিক পাস করার পর গ্রামে গ্রামে রটে গেল পৃথা এখন বিবাহযোগ্য কন্যা ।যদিও বংশের অন্যান্য ছেলে মেয়ে কেউ ইস্কুলে যায় বা স্কুল পালানোর মত মাঠে ডাংগুলি, মার্বেল ,দাপাদাপি ছুটোছুটি করে বিকেলে বাড়ি ফিরে আসে স্বরস্বতীর পিন্ডি চটকে।

   হঠাৎ একদিন মেঘ না চাইতে জলের মতো এক ঘটকউপযুক্তছেলে(পাত্র )সহযোগে সম্বন্ধ নিয়ে অগ্রহায়ণের শীতের বিকালে উপস্থিত। কথাবার্তা দেখাশোনা সব নিমেষের মধ্যে

শেষ হলে আনন্দ উৎসবের সন্ধান খুঁজে পেল সকলে। "ওঠ মেয়ে তোর বিয়ে"। বাড়ি শুদ্ধু সকলের আনন্দে উচ্ছ্বাসের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস বাতাসে বাড়ি বাড়ি গ্রাম শুদ্ধু ছড়িয়ে পড়ল। কারো কারো মুখে প্রকাশ পেল আমাদের  পৃথা সাক্ষাৎ লক্ষী এক কথায় বিয়ে, ভাবা যায়। তাছাড়া বড় ঘরের উচ্চ শিক্ষিত ছেলে, এসব কোন ঘরের কন্যাগ্রস্থ পিতা মাতা ,কাকু কাকিমা ছাড়ে? রাতারাতি বিসমিল্লাহ সানাই এর সুরে অঘ্রানের তৃতীয় সপ্তাহে পতিগৃহে যাত্রা সমারোহে সম্পন্ন হয়ে যায়।


         অষ্টমঙ্গলা, দ্বিরাগমন, হানিমুন ,প্রথম জামাই ষষ্ঠী ইত্যাদিঅনুষ্ঠানেআসা-যাওয়ায় যখন বোঝা গেল জামাই মিলুকে মিশুকে দিলখোলা দরদী পরোপকারী সহানুভূতি প্রবণ ইত্যাদি, তখন সব শ্বশুর-শাশুড়ির হৃদয় গর্বে 56 ইঞ্চি হয়ে দাঁড়ায় ।গর্বে চঞ্চল চক্ষু ও মনের কথা কয় ,মেয়ের মুক্তমনের স্বাধীনতা যদি বাপের বাড়ির জলে মিশে জল বাড়ায় তবে মেয়ে-জামাইয়ের সব আসা-যাওয়া উৎসবের রূপ নেয়।

পতির বেহিসেবি পয়সায় বিলাসিতা সোনার গয়না পোশাকি আড়ম্বরের পর মন কান্দে গ্রাম্য বাবা-মা ভাই ও আত্মীয়দের অসচ্ছলতার জন্য। স্বামীর অর্থ খরচ করা বেড়ে যায় স্বহস্তে কিন্তু স্বামীকে না বলে বাপের বাড়িতে অর্থ দিলে অন্য অর্থে চুরি করা হয়, অন্যায়। এই দূরদর্শিতা মাধ্যমিক বিদ্যাগুনে। এমন স্বজ্ঞান কর্তব্য পরায়না প্রাজ্ঞ স্ত্রীর জন্য জামাইবাবাজীবন স্ত্রীর কথায় অন্ধ। পৃথার চোখেই জামাই শ্বশুরবাড়ির সবাইকে চেনেন জানেন এবং বিশ্বাস করেন।

পৃথা প্রিয়দর্শনী কর্তব্য পরায়না বাক ও কর্ম চতুর আহ্লাদিনী হৃদয়হরনী , কুহকিনী ও বটে ।পৃথার বিয়ে হয়েছে ব্যবসায়ী বিলাসের  সাথে। বর্তমানে পৃথা একমাত্র কন্যা সন্তানের মা। পুত্র সন্তানের কামনায় জামাই বিলাস তিরুপতির মানত করে এবং হাতের নাগালেই সিদ্ধি লাভ হয় কিন্তু নারী কালনাগিনী অন্ধবিশ্বাসে।পৃথার গর্ভে দ্বিতীয় সন্তান এলে পৃথা পুত্র সন্তানের সুখা পেক্ষা পিতা ও সহোদরের সুখান্বেষণে স্বামীর কাছে গল্প করে তোমার এই বিস্তৃত ব্যবসায় যদি আমাদের সুমন টা কে সংসারে ঠাঁই দাও কিছুটা তো স্বস্তি পেতে পারো। 

বর্তমান এই দুর্মূল্যের বাজারে এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সদিচ্ছায় দ্বিতীয় ইস্যুর প্রয়োজন আছে কি? সুমনকে পুত্র-স্নেহের সংসারে ঠাঁই দিয়ে মানুষ করলে ওই ভবিষ্যতে আমাদের পুত্র সন্তানের কাজ করে দিতে পারবে। বয়সে তোমার থেকে কত ছোট দেখেছ।তাছাড়া আমাদের মেয়েটাকে আরো ভালো করে মানুষ করতে হবে ।সে বিরাট বড় হবে, ভবিষ্যতে প্লেন চালাবে ,সে দেশ বিদেশ ঘুরবে তার সাথে আমরাও ঘুরবো ভবিষ্যৎ ভালো হবে ।সুমন তখন আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য দেখবে জমি জায়গা লক্ষ্য করবে।

পৃথার কথা বিলাসের পছন্দ হয়নি তাই গম্ভীর মুখে রাত্রে বিছানায় পাশ ফিরে শোয় অশান্তি গোপন করে এবং মনে মনে ভাবে নিজের ছেলে মেয়ে  বাপ-মাকে দেখে না, সম্বন্ধী দেখবে ?আকাশ কুসুম স্বপ্ন !এইসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ে।

দিন গড়ায় সুমনের ঠাঁই হয়ে যায় বোনের বাড়িতে বোনের সদিচ্ছায় ।অন্যদিকে পৃথার উল্টি  উদগীরণ বাড়ির সবার চোখে পড়ে ।সকলেই চাপা আনন্দে উৎফুল্ল হয়। এসব অগ্রাহ্য করে মাতৃত্ব বিসর্জন দিয়ে, স্বামীকে ভুল বুঝিয়ে, শাশুড়িকে হেয় প্রতিপন্ন করে ওষুধ সেবনে ভ্রুন নষ্ট করে  বৃষবিক্ষের বীজ রোপন করে। এই কৃতকর্মের জন্য সমগ্র পরিবার ও বিলাসের হতাশা যন্ত্রণা ব্যাকুল কান্না লোকচক্ষুর দৃষ্টি এড়ানো গেলোনা, অথচ আত্মসুখে পৃথার সহোদর সব জেনেও ভগ্নির বাড়িতে কর্মব্যস্ত। বাবা-মাকে শেয়ার পর্যন্ত করলো না। ভ্রুন প্রাণ পেল না,বংশ প্রদীপ ঠাঁই পেল না, বিলাস কন্যা ভাই বোনের সম্পর্ক বুঝলো না, হিন্দু শাস্ত্র মতে বিলাস মুখাগ্নি রক্ষাকর্তা পেল না । জামাইয়ের বে-হিসাবি অর্থে পৃথা ও সহোদর সুমন ছিনে জোঁকের মত বসে স্বার্থসিদ্ধির স্বপ্ন পূরণ করতে থাকে।


কথায় বলে "ধর্মের কল বাতাসে নড়ে "ভ্রুন নষ্ট করে মরনরোগ সঙ্গী করে পরপারের খাতায় নাম লেখায়। পৃথা যাওয়ার পূর্বে জীবন সাথীর হাত ধরে বলে- ক্ষমা করো আমায় ,তোমার স্বপ্ন সত্যি করতে পারিনি, তোমার কথা রক্ষা করতে পারিনি ,তাই চললাম। যেকোনো মৃত্যুই দুঃখের কারণ ।দিদির মৃত্যু ভাই অনুভব করলে ও ষোল কলা ইচ্ছা পূরণের লক্ষ্যে পিতা-মাতাকে চিন্তার অকূল সমুদ্রে রেখে চুপ থাকে। সন্তান হারানোর জ্বালা সব পিতা-মাতার বুকে শেল বিদ্ধ করে ,তাই আজ ও অশ্রু সম্বরন করতে পারেন না ।দিন যায়, ক্ষন যায়, সময় বদলায়। স্মৃতি জলে ঢিল পড়া  ঢেউয়ের মত মিলিয়ে যায়। আজ মেয়ে পৃথার দৌলতে বাপের বাড়ি পরিচয় যোগ্য শহুরে অট্টালিকায় খয়ের খাঁ। ক অক্ষর গোমাংস মামা চাঁদের হাটের উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাই মেয়ের প্রশংসায় আজ  সন্তান হারা পিতা নির্দ্বিধায় উচ্চারণ করে আমার মেয়েপৃথা যদি আর দু'টো বছর বাঁচতো তবে আমি শিলাইদহের জমিদারিত্ব সহ কোটিপতি হয়ে যেতাম। এখানে স্বস্তি এবং অনুশোচনা কি একে অপরের পরিপূরক জানি না!

তাই বলি--

যদি কুরুক্ষেত্র হয় শকুনি বিধান ,

তবে সংসারে সম্পর্কিতকে দিও না স্থান।


পৃথা ইহলোক ত্যাগ করেছে 5 বছর আগে। বিপত্নীক বিলাস তাই শ্বশুরবাড়ীর অভিমুখী খুব একটা হয় না ,তবু সম্পর্কটা অস্বীকার করে না কারণ নাবালিকা কন্যার জন্য।মামার বাড়ি প্রীতি সব সন্তানের কাছে অন্যরকম, যতদিন যায় সম্পর্ক ততটাই বিপরীত পথে হাঁটতে থাকে। যেটুকু সম্পর্ক টিকে আছে তা জামাইয়ের বিলাস বৈভব সম্পত্তির জোরে। দাদু দিদা দু-একবার নাতনিকে হারিয়ে যাওয়া মেয়ের স্মৃতিটুকু হিসেবে আদরে আবদারে নিয়ে গেছে ,হয়তো বা জামাইকে ও। মামা বাড়িতে গোপনে কেউ কেউ জিজ্ঞাসা করেছে -"বাবা তোকে  ভালোবাসে তো ?মারধর করে নাকি? যা চাস এনে দেয় তো?" ইত্যাদি ইত্যাদি। নাতনি চুপ করে সব শুনে বাড়ি ফিরে বাবাকে সব শেয়ার করেছে, বাবা শুধু জিজ্ঞাসা করে কে কে জিজ্ঞাসা করেছিল? সঙ্গে আর কে কে ছিল?সব শোনার পর বাবা মেয়েকে বোঝায়--মা তুমি এত অল্প বয়সে মাতৃহীন হয়েছে, তাই সবার মনে একটা সংশয় তৈরি হয়েছে। তাছাড়া স্বরস্বতীর পিন্ডি চটকানো অকালকুষ্মাণ্ডের বিদ্যা বুদ্ধি সংকীর্ণ মনের কাছে বেশি কি আশা করা যায়?

দেখতে দেখতে আরও কয়েক বছর কেটে গেছে, নাতনি এখন গ্রাজুয়েট ।বাড়িতে থাকে সময় অতিবাহিত করার জন্য ছবি আঁকে ,দু-চারটি মেয়েকে টিউশনি পড়ায়, মাঝে মাঝে খুড়তুতো ভাইদের সঙ্গে খেলে গল্প করে ।যখন  দেখে তারা মামা বাড়ি যায়, পিসতুতো ভাই বোনেরা তার মামাবাড়ি আসে, তখন একাকীত্বটা নিরবে ঢাকে মায়ের ছবি তে, মনস্থির করে। বাবার চোখে পড়লে বাবা মনে শক্তি যোগায়-- মায়ের প্রতি ভক্তি থাকলে তুইও বড় হবি প্রতিষ্ঠা পাবি। বিদ্যাসাগর মাইকেল বিবেকানন্দকে দেখেছিস তো ,তোকে ধরে রাখবে কে ? তুই ও আমার মা আমার শক্তি।

এবার মামার দেশের বাড়ি থেকে নিমন্ত্রণ পত্র এসেছে মায়ের খুড়তুতো বোন তথা মাসির বিয়ে ।বাবার যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না কিন্তু রক্তের সম্পর্ক মেয়ের ইচ্ছেটা বাবা অবহেলা করতে পারল না। বিয়ের দিন দুজনে উপস্থিত হল ।দিদিমার অভ্যর্থনায় রাত্রিটা কোনমতে কাটলো, "কোনমতে" বলার কারণ নিজের দিদা দাদু ছাড়া কেউই তেমন আর আগের মতো চেনে না ,মায়ের অবর্তমানে। মায়ের কাকু-কাকিমার ও অন্যান্য মামা মাসিরা সকলেই যেন অপরিচিত অনুষ্ঠানে। রাত্রের খাওয়া টা বুফে সিস্টেম ছিল তাই অসুবিধে হলো না ।পরের দিন সকালে সদ্যবিবাহিতা মাসির পতিগৃহে যাত্রা সমাপন হওয়ায় গুটিকয়েক আত্মীয় নিয়ে বিয়ে বাড়ির পাত্র,বরকর্তা অন্যান্য সকল কাজকর্ম এবং ক্যাটারারের পরিবেশন, প্যান্ডেল ইত্যাদির আলোচনায় প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠে।তারই মাঝে সুখেন্দু দিব্যেন্দু পূর্ণেন্দু ইত্যাদির বউ ছেলে মেয়েরা যে যার নিজের নিজের ভাই ভাঁজ মেয়ে জামাইকে নিয়ে ব্যস্ত। মেয়ের দিদা যৌথ সংসারের কাজে ব্যস্ত থাকায় বিপত্নীক বিলাস বাবু  এবং মেয়ে ঠক বাছতে মনের গাঁ উজার করে ফেললেন। সকালের চা জলখাবার ,দুপুরে স্নানেরতেল গামছা জুটলো অবহেলায় অসময়। দ্বিপ্রাহরিক আহার ও  তথৈবচ। ঘড়ির কাঁটা দুটো ছাড়িয়ে গেলে বিলাস বাবু নিজেদের অবহেলা গোপন করে বাড়ি ফেরার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন দেখে হন্তদন্ত হয়ে শাশুড়িমা হাজির ।নিজের বউমাকে ডেকে বললেন--বৌমা তোমাদের নন্দাই ভাগ্নি গার্হস্থ্য অনুষ্ঠান বাড়ি থেকে ভরদুপুরে না খেয়ে চলে যাবেন তোমরা দেখবে না? ছোট বৌমা উত্তর করলো-- বাড়ির অন্যান্য কাকিমারা কাকুরা তাদের মেয়ে জামাই ভাই ভাঁজেদের নিয়ে এক একটা টেবিলে বসে আছেন কোথায় দেব ?টেবিল-চেয়ার ফাঁকা নেই !

জামাই:-মা, ব্যস্ত হবেন না। আমি এইমাত্র পাশের বাড়ির রাজুদা জোর করে ধরে নিয়ে গেছিল অনেক খাইয়েছে আর খাব না ।আপনি বরং মেয়েটা কে খাইয়ে দিন ।

শাশুড়ি :-সে কি করে হয়?

দুই শালা ভাজ শহুরে হাওয়ায় গ্রাম্য রীতিতে  অনভ্যস্ত। সব বাধা কাটিয়ে বিলাস বাবু সব অবহেলা করে গোপন করে মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন ।পথে মেয়েকে বললেন মা আমি কেন আসতে চাইছিলাম না বুঝলি? এই বংশে তোর মা ছিল গোবরে পদ্মফুল মামার বাড়ির শিক্ষাদিক্ষায়, আর সব মামারা ক অক্ষর পলাশ ফুল, আর অন্যান্য মামামাসিরা অন্তঃসারশূন্য এখন। তাই কথায় বলে "ঝিউড়ি ছাড়া শশুরঘর মিছে প্রত্যাশা জামাই আদর!"মা ছাড়া মামাবাড়ি ---দিনগুনে পাপ ক্ষয়করি।