শূর্ন্য (একটি প্রবন্ধ)
'শূন্য' একটি সংখ্যা। এই সংখ্যাটিই বোধ হয় সকলের মাথা খারাপ করে দেবে। কী একটা সংখ্যা রে বাবা! এমনিতে তার কোনো অস্তিত্ব নেই বটে কিন্তু একবার কোনো সংখ্যার পাশে বসতে পারলেই হয়েছে। শুনে ভাবতে বসেছেন নিশ্চয়ই এটি একটি পরজীবী সংখ্যা। কিন্তু মশাই আপনি বোধ হয় এর ক্ষমতা সম্পর্কে জানেন না। এ যে কী করতে পারে তাই নীচে সংক্ষেপে তুলে ধরছি।
আপাতদৃষ্টিতে শূন্য একটি পরজীবী সংখ্যা,মানতে কোনো দ্বিধা নেই। সমগ্র সংখ্যাতে এর স্থান আছে বটে কিন্তু সে একটি অস্বাভাবিক সংখ্যা। কারণ শূন্যের সাথে যারই গুণ দাও না কেন,ফল কিন্তু শূন্যই হবে। ভাই (সংখ্যা) তুমি হতে পারো অনেক বড়ো বিত্তশালী তবে সাবধান! শূন্যের সাথে লাগতে এলেই বিপত্তি। সে তোমাকে টেনে হিঁচড়ে নিজের সমান বানিয়েই ছাড়বে। সংখ্যার প্রণেতা সম্ভবত তার এই অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ্য করেই তাকে স্বাভাবিক সংখ্যায় স্থান দেন নি।
শূন্য গুণের বেলায় এরকমটি হলেও গুণের ছোটো ভাই যোগের বেলায় সে একেবারে ধোয়া তুলসীপাতা। যোগের সংক্ষিপ্ত নিয়ম যদি গুণ হয় তাহলে তারা ভাইই হল। শূন্যকে বলা হয় যোগজ অভেদ। আগেই বলেছি যোগের বেলায় সে সর্বদাই নির্লিপ্ত থাকে। এবার আসা যাক বিয়োগ ও ভাগের ক্ষেত্রে। বিয়োগের ক্ষেত্রেও সে তার প্রভাব দেখায় না। সে তার ঔদাসীন্য বজায় রাখে যেমনটি দেখা যায় যোগের ক্ষেত্রে। আর ভাগের বেলা? না সেটি বলে কাজ নেই,আমি আর আপনাদের মাথা নষ্ট করতে চাই না।
শূন্যের অস্তিত্ব দিতে হলে তাকে যথাযথভাবে ব্যবহারও করতে হবে। কোনো সংখ্যার সাথে জুড়ে দিলেই শূন্য অস্তিত্ব ফিরে পাবে এমনটি ভেবে যদি কোনো ব্যক্তি সংখ্যার বাঁদিকে একের পর এক শূন্য দিতে থাকেন তাহলে তার সময় ব্যয় হবে ঠিকই কিন্তু তার লাভ হবে শূন্য। এই শূন্যকে সর্বদাই সংখ্যার ডানদিকে বসাতে হবে। এমনিতে অস্তিত্বহীন সংখ্যাটিকে যদি আবার ডানদিকে বসাতেই থাকেন তাহলে এটি এতো বড়ো আকার নেবে যে গণকযন্ত্রেও জায়গা হবে না। তবে হ্যাঁ, বামে শূন্য বসানোরও মূল্য আছে - ভোডাফোনে কল করার ক্ষেত্রে।
কোনো অঙ্কের সংখ্যার শুরুর সংখ্যায় কিন্তু শূন্য অবশ্যই থাকবে। এক্ষেত্রে তার প্রয়োজনীয়তা অতুলনীয়। তাই একে নেহাত অনর্থক বলাও চলে না। এ কারণে এই সংখ্যাটি আমাকে এত অভিভূত করে। অতএব, সর্বোপরি এই সংখ্যাটির আবিষ্কর্তা আর্যভট্ট (মতান্তর আছে) কে ধন্যবাদ না জানালে আমি নিজেকে অকৃতজ্ঞ মনে করব।
শেষে বলা যায়,এই শূন্য আমাদের মানব জীবনের সঙ্গে তুলনীয়।আমাদের জীবন শুরু হয় শূন্য থেকে,শেষ হয় শূন্যতেই। এই দুটি সময়ে আমরা পোশাকশূন্য,শক্তিশূন্য,পরিচয়শূন্য,ন্যায়শূন্য,ভয়শূন্য,আচারশূন্য,বিচারশূন্য,আশাশূন্য,আকাঙ্খাশূন্য - সর্বশূন্য।মরণের পর দেহের যে শক্তি অন্য মাধ্যম লাভের লক্ষ্যে অন্তর্হিত হয় তারও পরিণতি সেই শূন্যে।
তাই শূন্য অস্তিত্বহীন হলেও শূন্যকে বাদ দিয়ে আমাদের জীবন চলতে পারে না। আমাদের মাথার উপরেও রয়েছে এক মহাশূন্য যার কোনো আদি কিংবা অন্ত নেই। কে যে তার সৃষ্টিকর্তা সেকথা কেউ বলতে পারে না। এই মহাশূন্য,এই ব্রহ্মাণ্ড সেই অচেনা স্রষ্টার নিয়মাধীন। এই প্রকান্ড ব্রহ্মাণ্ডে শক্তি ও ভর যেখানে পরস্পরের রূপান্তর মাত্র সেখানে এই প্রশ্ন বারবার উঠে আসে তাহলে এই ব্রহ্মাণ্ডের বাইরেও কী আরো ব্রহ্মাণ্ড আছে? বিজ্ঞানীরা এর ইতিবাচক উত্তর দিয়ে আরও অনেক ব্রহ্মাণ্ডের অস্তিত্বের জানান দিয়েছেন বটে কিন্তু তাহলে ব্রহ্মাণ্ডের যেখানে শেষ তারপর কী আছে?
যতই তাকে দেখি ততই বিস্মিত হই। যদি প্রশ্ন করি,এই মহাশূন্যের ধ্বংস কবে তখনও উত্তরশূন্য থাকি। এমন হাজারো প্রশ্ন আছে যাদের উত্তর শূন্য।এমন হাজারো বিষয় আছে যাদের কারণ শূন্য। সর্বোপরি এই অপ্রাপ্তির শূন্যতা আবহমান কাল ধরে মানবহৃদয়ে চিরস্থায়ী হয়ে রয়েই গেল।
