Apr 30, 2022

সুমনা রায়

ছায়াসঙ্গী

“তোমার প্রশ্রয় তো কিছু কম নয়। কোনো কিছুরই তোয়াক্কা নেই। এবার বোঝো!"

রত্নদীপা চুপচাপ চায়ের কাপদুটো টেবিল থেকে তুলে নিতে নিতে একবার ছেলের ঘরের বন্ধ দরজার দিকে তাকায়। ভেতরে যেন অনেকগুলো দরজা দুমদাম করে বন্ধ হয়ে যায়। চলে যায় রান্নাঘরের দিকে যেখানে নিজেকে সবচেয়ে বেশি কাছে পায়। পঁচিশ বছরে নিলয়ের এইসব কথা শোনাটা এখন অভ্যস্ততায় দাঁড়িয়ে গেলেও আজ যেন ব্যথাটা ভেতরে চিনচিন করছে। এমনিতে নিজেকে সামলে চুপ থাকে আর আজ চেষ্টা করেও ভেতর থেকে দু ঠোঁটের ফাঁকে কথা টেনে আনতে পারছে না। আজ যে অনেক কথা শুনতেই  হবে এটা জানাই ছিল। শোভন আবার চাকরিটা ছেড়ে এসেছে। এতো ভালো প্যাকেজ! এতো ভালো পোস্ট! তারপরও।

প্রতিবার শোভন নতুন চাকরিতে ঢোকার সময় রত্নদীপা বিদেশের মাটিতেও নাম না জানা বেশি বেশি ফুল দেবদেবীর চরণে দেয়। অসহায় প্রার্থনা করেন ছেলের মতিগতি শুধরে দিতে। কিন্তু কোনোবারই তার শঙ্কা আর প্রার্থনা পৌঁছয় না জায়গামতো। চোখের সামনে ছেলের পাগলামোগুলো দেখে। তিনবছরে কতবার যে দেখেছে বিষাদ নদীর ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া! ছোট থেকে এই ছেলের জন্য কত কথাই না শুনতে হয়েছে! নিলয়ের কাছে, শোভনের স্কুলের টিচারদের কাছে; আত্মীয়দের কাছে। বকুলতলায় কতবার যে ও স্কুল পালিয়ে নদীর ধরে চলে যেত! গাছের তলায় বসে থাকতো চুপচাপ। বাড়ি ফিরে সন্ধ্যায় পড়তে বসে অন্যমনস্ক হয়ে পড়তো। উল্টো পাল্টা কী কী বলতো। যেদিন বললো, “জানো মা আজ দেখলাম আমার প্রিয় গাছটা হেঁটে যাচ্ছে কনকলতা নদীর কাছে। কনকলতার হাত ধরে কত কী গল্প করছে! কনকলতা তাকে গান শোনাচ্ছে। একসময় সে কনকলতার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লো।“ 

রত্নদীপা খুব ভয় পেয়েছিল সেদিন। অনেক কথাই চেপে গেলেও এই কথাটা নিখিলকে না বলে পারেনি। শ্বশুর বাড়ির কেউ কেউ বলেছে মাঠে মাঠে বেলা অবেলায় ঘুরে বেড়ায়। নির্ঘাত ভুতে  ধরেছে। কেউ বলেছে কালাজাদু করেছে। কেউ তো সরাসরি পাগলই বলে দিয়েছে। চুপ থেকেছে রত্নদীপা। ভেতরে দুঃখের একটা নীরবনদী বয়ে গেছে তিরতির। তারপরই নিখিল ট্রান্সফারের তোড়জোড় করে। শহরে চলেও আসে। সংসার আর ছেলের কথা ভেবে রত্নদীপা নিজের ভালোলাগার ঘরে সেই কবেই তালা লাগিয়ে দিয়েছে।

পড়াশুনোয়-গানে-গিটারে ছেলেটা একেবারে চৌখস। তাই তেমন কোনো কমপ্লেন আর আসে না। আসে বড় বড় সার্টিফিকেট, মেডেল। নিখিল বুকভরা গর্ব নিয়ে বিদেশে পাড়ি দেয় সুখের সংসার নিয়ে।

সুখ আর দুঃখ বুঝি সংসারে পেন্ডুলামের মতোই। স্থির থাকে না। এবার সমস্যা হয়ে গেছে চাকরিতে। খুব ভালো ভালো চাকরি কদিন পরে পরেই ছেড়ে দেয়। অচেনা কোনো কান্ট্রিসাইডে চলে যায় কিছুদিনের জন্য। আর যখন বাড়িতে থাকে টেবিলল্যাম্প জ্বালিয়ে হাতদুটো দিয়ে দেওয়ালে ছায়ার নানারকম আকৃতি তৈরি করে। ঘন্টার পর ঘন্টা। রাতের পর রাত। তাকিয়ে থাকে আপন খেয়ালে। কখনো ডাকতে গেলে জোর করে আটকে মাকেও দেখায় নদীর, মাঠের, গাছের, ফুলের,পাখির কাহিনী। রত্নদীপাও মাঝে মাঝে হারিয়ে যায় ওখানে। নিখিলের অবশ্য এই ভালোলাগাগুলো চাপাই থাকতো যদি সেদিন হঠাৎ শোভন অসুস্থ হয়ে না পড়তো। ঘন ঘন অসুস্থ হয়ে পড়ছে আজকাল। অনেক ডাক্তার দেখানো হলো কিন্তু তেমন পরিবর্তন কিছু নেই। নিখিলের মর্নিংওয়াকের বেশ কজন বন্ধুর মধ্যে একজন বাঙালিও আছেন। নিখিলের মনখারাপটা কিছুদিন ধরেই লক্ষ্য করেছেন। সেদিন জিজ্ঞেস করে পুরো ব্যাপারটা জেনে ওকে হাসপাতালে ডাকলেন। মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে রত্নদীপার মন চাইছিলো না কিন্তু নিখিল জোর করেই নিয়ে গেলো। ডাক্তারবন্ধু কয়েকদিন অনেকটা সময় একা শোভনের সাথে গল্প করলেন। পরীক্ষা নিরীক্ষার পর রিপোর্টগুলো খুব মন দিয়ে দেখলেন। তারপর নিখিল আর রত্নদীপাকে চেম্বারে দেখেই হেসে উঠলেন খুব জোরে। “হিরাইফ (Hiraeth)। এ নস্টালজিক লংগিং ফর এ প্লেস হুইচ ক্যান নেভার বি রিভিজিটেড। সোজা মানেটা হলো শোভনের কোনো রোগই নেই। একটা গ্রামবাংলাকে ও বুকে লালন করে যাচ্ছে সারাজীবন ধরে। আপনারা আপনাদের স্বপ্নে ওকে বাঁচিয়ে রাখতে চাইছেন কেন! ওর ভালোবাসায় ওকে বাঁচতে দিননা! ওর প্রিয় গ্রামটায় যেতে দিন। ওর প্রিয় জগতে। শ্যাডোগ্রাফি কেন করে জানেন? ওই গ্রাম আর নদীটাই ওর ছায়াসঙ্গী। ওদের নিয়েই ছায়ার মায়ায় খেলে যায়। নিখিল রত্নদীপার দিকে চেয়ে থাকে। আনন্দ আর দুঃখের মিশ্ররাগে উজ্জ্বল হয় শেষ বিকেলের কলাপাতা মোড়া রোদ। রাঙামাটির পথ ভেসে ওঠে চোখের ঝাপসা পর্দায় …